চিল্কিগড়ের জঙ্গলে – কৌশিক সামন্ত
“মিস্টার মল্লিক, মিস্টার মল্লিক, শুনতে পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ, ও সরি ডক্টর, আসলে চোখ দুটো লেগে গেছিল, হাউ ইজ শি?”
“ডোন্ট ওরি, শি ইজ ফাইন নাও।”
“আমি কি এখন ওর সাথে দেখা করতে পারি ডক্টর সেন?”
“এখন না মিস্টার মল্লিক, এতবড়ো একটা সার্জারি, জ্ঞান আসতে সময় লাগবে, সিস্টার উইল লেট ইউ নো।”
“থ্যাঙ্কস এ লট ডক্টর, আপনি না থাকলে এসব কিছুই পসিবল ছিল না, লুসিকে হয়তো আমি আর ফিরেই পেতাম না।”
“এখন এসব কথার সময় নয় মিস্টার মল্লিক, রিজয়েস করুন, পুরোনো কথা ভুলে যান।”
“সে তো করবই ডক্টর, ইট উইল বি এ গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন, আপনি দেখে নেবেন। বাট ডক্টর, ইফ আই যে, ডোনারের ডিটেলস্টা যদি জানতে পারতাম, মল্লিক এম্পায়ারের একমাত্র উত্তরআধিকারিণীকে নতুন জীবন দানের মূল্যটা কিছুটা অন্তত চোকাতে পারতাম।”
“দেখুন মিস্টার মল্লিক, আপনাকে আমি আগেও বলেছি আর আবারও বলছি, হয়তো শেষবারের জন্য বলছি, ডোনারের সম্বন্ধে কিছু ডিসক্লোজ করা আমাদের পলিসি নয়। আপনার কাছ থেকে ডোনেশান স্বরূপ যা নেওয়া হয়েছে, সবটাই যাবে ডোনারের কাছে, সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আর এর বাইরেও যদি কিছু উপহার দিতে আপনার মন চায়, তাহলে আমাদের অ্যাসিড ভিক্টিম মহিলাদের জন্য একটা স্পেশাল ওয়ার্ড রয়েছে, যেটা আমরা নিজেরাই চালাই, ওখানে আপনি কন্ট্রিবিউট করতে পারেন, যেটা আপনার মন চায়।”
“শিউর, শিউর ডক্টর সেন, আই উইল ডেফিনিটলি, আপনারা আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এটুকু তো করতেই পারি আমি।”
“তাহলে ওই কথাই রইল মিস্টার মল্লিক, বাকিটা সিস্টার এসে আপনাকে জানিয়ে দেবে, আপনি এখানে এসে আর না বসে, আমাদের গেস্টরুমে গিয়ে বিশ্রাম নিন, আমি সিস্টারকে সব বলে যাচ্ছি, আমাকে এবার যেতে হবে একটু।
তিনি ঈশ্বর দেখেননি, কিন্তু ঈশ্বর বুঝি এরকমই হয়…. ডাক্তার সেনের চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মিস্টার মল্লিক, শ্যামসুন্দর মল্লিক, মল্লিক গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের একমাত্র মালিক। কিন্তু কী অসহায় হয়ে পড়েছিলেন মাত্র কদিন আগে, যখন জানতে পেরেছিলেন তার জীবনের একমাত্র সম্বল, তার আদরের লুসির দুটো কিডনিই বিকল। নিমেষে পায়ের তলার মাটি নড়ে গেছিল তার, কারণ মা-মরা মেয়েটার জীবনে তিনিই যেমন একমাত্র সহায়, তেমনি মিস্টার মল্লিকের জীবনেও লুসিই ছিল একমাত্র সম্বল। কিন্তু সবটুকু উজাড় করে দিয়েও, না তার নিজের গ্রুপ মিলছিল লুসির সাথে, আর না ঠিকঠাক ডোনার। তারপর হঠাৎ একদিন ডাক্তার সেনের সাথে অদ্ভুতভাবে যোগাযোগ হয়, নাহ্ এসব কী ভেবে চলেছেন তিনি, আর এসব ভাববেন না তিনি, এবার লুসিকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা।
চোখের জলটা মুছে ভিআইপি গেস্টরুমের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন মিস্টার মল্লিক।
.
।। দুই।।
“ইত্ত কী ভাবছিস রে বাবু?”
“ওরা বোধহয় আমাদের আর একসাথে থাকতে দেবে না রে পারুল।”
“ধুস কী যে বলিস লা তুই, আমি কিচ্ছু মাথামুণ্ডু বুঝিনে বাপু।”
“তুই বুঝবিও না সাঁওতাল গবেট কোথাকার!”
“হি আমি মুখ্যু সাঁওতাল আছি বটে, তুকে কে আসতে বলছিল আমার সাথে পিরিতটো মাড়াতে? যা দিকিনি আমার কাজ আছে অনেক।”
“রাগ করিস না রে, আমার মাথার ঠিক নাই।”
“জানি রে বাবু, তুই ভাবিসনি, উই সেদিন যেমন আমার এই হেঁসোটা দিয়ে গোখরোটাকে আধলা করে দিছলাম, তেমনই আমাদের যে আলাদা করতে আসবে তাদের সব শালার মাথা অমনি করে কেটে লিব।”
খুব কষ্টে মুখের হাসি মুখে চেপে রেখে অবাক হয়ে পারুলের চোখ দুটো দেখতে থাকেন দর্পনারায়ণ, কী সরলতা মাখা সেখানে, পারুলের বিশ্বাসটা ভাঙতে তাঁর মন চায় না।
কিন্তু তিনি নিজেও জানেন জামবনির রাঘুনাথগড়ের জমিদার বাড়ির কুলপ্রদীপ দর্পনারায়ণের সাথে তাঁদেরই প্রজা এক সামান্য সাঁওতাল কন্যার মিলনটা কতটা অবাস্তব। সব জানে সব বোঝে, কিন্তু তবুও তো মানুষ ভুল করে, যেমনটা তিনি করেছেন, ভালোবেসে ফেলেছেন। বিদেশ ফেরত সুপুরুষ দর্পনারায়ণ চাইলেই পারতেন কোনো সাহেব-মেম অথবা কোনো উচ্চবংশীয় জমিদারকন্যাকে ঘরে আনতে। কিন্তু নাহ্, তার ওই মেঘের মতো শ্যামলা মেয়েটাকেই পছন্দ হল। যার চুলে মহুয়ার আবেশ। যার গায়ে বৃষ্টি পড়া প্রথম মাটির গন্ধ।
“তুই ফের আকাশটো-পাতালটো ভাবতে লেগেছিস?”
“তোর এসব মাথায় ঢুকবে না রে পাগলি। তুই যেমন মাথায় সুড়সুড়ি দিচ্ছিস দে, ওটা তুই বড্ড ভালো পারিস।”
“এই যা তো, আমাকে মানুষটো বলেই জ্ঞান করিস না তুই।” এক ঝটকায় নিজের কোল থেকে দর্পনারায়ণের মাথাটা মাটিতে ফেলে দেয় পারুল।
“আহ্…….” করে হালকা আর্তনাদ করে ওঠেন দর্পনারায়ণ
“লাগল বাবু? মুকে ক্ষমাটো করে দিস, আমি বুঝতে পারিনি অতটো জোরে লেগে যাবে।” রুক্ষ পাথুরে জমি, আঘাতটা বুঝি জোরেই গেছিল, দর্পনারায়ণের কপালের একপাশটা কেটে যায়, দরদর করে সেখান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। এক ঝটকায় নিজের পরনের কাপড়টা ছিঁড়ে ফেলে পারুল, তারপর শক্ত করে চেপে ধরে দর্পনারায়ণের কপালটা। তার মাথাটা নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে পারুল।
“তুই কিচ্ছু ভাবিসনি বাবু, তুকে লিয়ে যাব আমাদের কিঙ্কিনী দেবীর মন্দিরে, মা খুব জাগ্রত জানিস, উখানে যাদের বিয়ে হয় তাদের সাতজন্ম কেউ আলাদা করতে পারে না, তুর বাপ, বাপের লেঠেল সব ফেল মেরে যাবে দেবীর সামনে, আমরা সেখানেই বিয়ে করব দেখিস, আমাদেরও কেউ আলাদা করতে পারবেনি। মাথার ব্যাথাটা ক্রমশ কমে আসে দর্পনারায়ণের, পারুলের নরম মাংসল বুকের গরম ছোঁয়া, ওর চোখের জলের সরলতা, আর সেই মেটে গন্ধটা, কেমন যেন হারিয়ে যেতে থাকেন তিনি।
.
।। তিন।।
“নদীটার নাম কী রে?”
“ডুলুং।”
“ডুলুং! এটা আবার কীরকম নাম হল?
“কেন খারাপ কী?”
“কীরকম জংলি-জংলি, তাই না?”
“হুম, উড বি বিদেশিনির তো সবই এখন জংলা- জংলাই লাগবে।”
“দেখ তোকে আমিও আগেও বলেছি, এটা নিয়ে ইয়ার্কি আমার ভালো লাগছে না।”
“ইয়ার্কি কই করলাম ম্যাডাম, এটা তো দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল ফ্যাক্ট, যে যায় সে আর ফিরে আসে না।”
“একজন আইটি ইন্ডাস্ট্রির ভেটেরান হয়েও তুই কীভাবে এত ব্যাকডেটেড চিন্তা-ভাবনা এখনও পুষে রাখিস বলতো?”
“ভালোবেসেছিলাম কিনা তাই।”
“ওহ্, আর আমি বুঝি ভালোবাসিনি? সেই কলেজের পর আজ সাত বছর হয়ে গেল কোনোদিন শুধু নিজেরটা করে ভেবেছি?”
“তাহলে আজ ভাবছিস কেন সুপর্ণা?”
“আজও নিজেদের জন্যই ভাবছি শুভ, ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটির সুযোগটা আমার পক্ষে ছাড়া সম্ভব নয়, এমন তো নয় আমি ওখানেই সেটেল হয়ে যাব। কাজ শেষ হলেই আবার ফিরে আসব এখানে তোর কাছে।”
“ওরকম সবাই বলে রে, বাট লং ডিসট্যান্স রিলেশানশিপের পরিণতি কারও অজানা নয়।”
“দেখ নিজেই সব প্ল্যান করলি আর আমার যাওয়ার আগে শেষ উইক এণ্ডটাও কি আমরা ঝগড়া করেই কাটাব? আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়েই কি তুই মজা পাস?”
“শেষ উইক এন্ড, হুম সেটাই বটে।”
“দেখ এবার কিন্তু সত্যিই চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে যাব।”
“সরি সরি, আর বলব না। এই কান ধরলাম ভুল হয়ে গেছে মাইরি।” শুভর ছেলেমানুষি দেখে হাসি পায় সুপর্ণার, এত বয়স হয়ে গেল তবু বড্ড অবুঝ মানুষটা।
“হাসছিস কেন রে?”
“কিচ্ছু না, তুই মন দিয়ে গাড়ি চালা, ভাবিস না অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে আমার বিদেশ যাওয়াটা আটকাটে পারবি।” মুচকি হাসে শ্রীপর্ণা।
“যথা আজ্ঞা ম্যাডাম অ্যাজ ইউ উইশ।”
তারা দুজনেই চুপ করে যায়, গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর তাদের বুকের চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। ডুলুং নদীর পাশ দিয়ে তাদের সবুজ অলটো-টা এগিয়ে যেতে থাকে।
.
।। চার ।।
“মিস্টার মল্লিক, লুসির জ্ঞান ফিরেছে, আপনি ওর সাথে দেখা করতে পারেন এখন।”
চোখটা একটু লেগে গেছিল, সিস্টারের ডাকে হুঁশ ফেরে মিস্টার মল্লিকের, উফ কী ভয়ংকর একটা স্বপ্ন দেখছিলেন এতক্ষণ তিনি। একটা গভীর জঙ্গলে তিনি আর লুসি একা একা পথ হারিয়ে ফেলেছেন, সামনে দেখলেন একটা পোড়ো মন্দির, সাহায্য চাইতে যাবেন কিনা ভাবছেন, হঠাৎ কটা কাপালিকের মতো লোক বেরিয়ে এসে লুসিকে আচমকা জাপটে ধরল, তারা যেন লুসিকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে মিস্টার মল্লিকের হাত থেকে। আহ্, এখন এসব কী ভাবছেন তিনি, মন দুর্বল হলে এরকম ভুলভাল প্রেডিক্ট করে। কিন্তু আর ভয় নেই, ইটস টাইম ফর আ গ্র্যান্ড সেলিব্রেশান।
“থ্যাঙ্কস সিস্টার, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।” আমি জানতাম আমার লুসিকে আমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
হোটেলের করিডোর ধরে লুসির কেবিনের দিকে পাগলের মতো মিস্টার মল্লিকের দৌড়টা লক্ষ করতে থাকেন সিস্টার শোভনা।
.
“আর পারছি না রে পারুল, আমি আর পারছি না, আমি এই এখানেই বসলাম, তুই পালিয়ে যা, নয়তো ওরা তোকেও মেরে ফেলবে।”
“হি, বললেই হল আর পারবি না, তুর ঘাড় পারবে, দরকার পড়লে তুকে কাঁধে তুলে লিয়ে যাব আমি আর লয়ত ইখানে একসাথে তুর বাপের লেঠেলদের হাতে জানটো দিব।” পারুলের ঘামে ভরতি মুখটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন দর্পনারায়ণ, নাহ্ তিনি কোনো ভুল করেননি এই পাগলি মেয়েটাকে ভালোবেসে। কিন্তু এটা যদি সমাজ বুঝত কিংবা বুঝত তার জমিদার বাবা, তবে বুঝি উপসংহারটা অন্যরকম দাঁড়াত।
“ওরে জংলি দৌড়ে আমি তোর সাথে কী আর পারব রে। তুই বরং পালিয়ে যা, আর তোদের গ্রামপ্রধানের ওই মোটু কালু ব্যাটাটাকেই বিয়ে করে নে।” হেসে ফেলেন দর্পনারায়ণ।
“উফ বাবুর আবার মজাক বারায় দেখ এই সময়ে! তুই যাবি? না তুকে ঘাড়টো ধরে নিয়ে যাব কিঙ্কিনীদেবীর মন্দিরে?”
“পারুল তুই সত্যিই বিশ্বাস করিস কিঙ্কিনীদেবীর সামনে বিয়ে করে নিলে, আমাদের আর কেউ আলাদা করতে পারবে না…?”
.
“ডু ইউ রিয়েলি বিলিভ ইন দিজ বুলশিট শুভ?”
“না বিশ্বাসের কী আছে সুপর্ণা। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর, তাই না?”
“আই কান্ট বিলিভ ইট ম্যান, হ্যাভ ইউ গন ম্যাড? কবেকার একটা সেকেলে গ্রাম্য গল্প, আর তার ওপর ভরসা করে তুই আমাকে এখানে নিয়ে এলি?”
“আহা তা কেন, তোর বিদেশ যাওয়ার আগে আমাদের শেষ উইক এণ্ড, আমি আমার মতো করে সেলিব্রেট করতে চেয়েছিলাম। বাট তোর যদি আপত্তি থাকে, দ্যান ইটস ওকে, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু বি এ পার্ট অফ অল দিস।”
“ওলে বাবালে, অমনি বাবুর রাগ হয়ে গেল তাই না, তুই সেই বাচ্চাই রয়ে গেলি বল!” শুভর আদুল শরীরটাকে আরও তীব্রভাবে নিজের বুকে টেনে নেয় সুপর্ণা, শুভর অভিমান ভরা দীর্ঘশ্বাসগুলো তার বুকে আছড়ে এসে পড়ে।
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুই যদি মনে করিস ওই কিঙ্কিনী দেবীর মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করলেই আমি আর বিদেশে গিয়ে তোকে ভুলে যাব না, তাহলে তাই হোক, আমি রেডি, কাল সকালেই হোক। তবে শুভ একটা কথা বলি, তোর কিঙ্কিণীদেবীর থেকে যদি তুই একটু বেশি বিশ্বাস আমাকে করতিস, তাহলে এই প্রশ্নগুলোই আর আসত না…।
.
।। পাঁচ।।
“ওকে বেব, এইবার নামতে হবে এখানে, আর গাড়ি যাবে না জঙ্গলের রাস্তায়।”
“হোয়াট দা ফা… মানেটা কী শুভ? আমাকে এই জংলা রাস্তায় সাপ-ব্যাং পাড়িয়ে তোর কিঙ্কিণীদেবীর মন্দিরে যেতে হবে।”
“সাপ-ব্যাং মানুষ কিচ্ছু নেই এই রাস্তায়, এই পথ দিয়ে কিছুটা গেলে তবেই মন্দিরটা।”
“তুই যেন কতবার এসেছিস এমন একটা ভাব দেখাচ্ছিস।”
“বহুবার নয়, জাস্ট একবার। তুই তো জানিসই প্যারানর্মাল স্টাফ নিয়ে আমার ভালোবাসাটা, রিসার্চ না করে আমি এক পা-ও এগোই না।”
“হ্যাঁ, তোর মতো অ্যাবনর্মাল লোককে ভালোবাসাটাই মস্ত বড়ো ভুল হয়ে গেছে, হাড়ে হাড়ে বুঝছি এখন।”
“টু লেট বেব, টু লেট।” গাড়ি থেকে নেমে তারা একটু একটু করে জঙ্গলের রাস্তা ধরে এগোতে থাকে।
চারিদিকে জংলা গাছ, নাম না-জানা পাখি ডাকছে, লম্বা ঘাসের মাঝে শিরশিরে আওয়াজ তুলে কারা যেন ছুটে ছুটে যাচ্ছে, আর সুপর্ণা বারবার শুভকে ভয়ে জড়িয়ে ধরছে।
“ওই দেখ মন্দিরটা, আমাদের গন্তব্য ওটাই।” সুপর্ণার কানে ফিশফিশিয়ে জানায় শুভ।
দূরে একটা ভাঙাচোরা মন্দির দেখা যাচ্ছে, যার গায়ে শতাব্দী প্রাচীন জরা লেগে আছে, বট-অশ্বথের ডালপালা চারপাশে বয়সের ঝুরি নামিয়েছে। মন্দিরের প্রাঙ্গণে এক লাল কাপড় পরা অশীতিপর বৃদ্ধকে দেখা যাচ্ছে।
“এই মন্দিরের একমাত্র পুজারি, রমাপতি নাথ, ওনাদের বংশ বহুকাল ধরে কিঙ্কিণীদেবীর পুজো করে এসেছে এবং উনিই ওনার বংশের লাস্ট পুরুষ।”
“বাবাহ্, পুরো বায়োডেটা তো তোর নখদর্পণে, বিয়েটাও আমার সাথে করবি, নাকি তোর রমাপতিবাবুকেই?”
“সব ব্যাপারে ইয়ার্কি মারিস না, একটাই অনুরোধ, মুখ বুজে বাকি কাজটা হতে দিস।” সুপর্ণার হাতটা চেপে ধরে শুভ এগিয়ে যেতে থাকে মন্দিরের দিকে।
“এই জলটা খাও মা, ওটা না খেলে পুজো সম্পূর্ণ হবে না।” গমগমানো গলায়, আদেশ করলেন রমাপতি নাথ।
স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, বুনো ফুল, ধূপ-ধুনো মেশানো কেমন একটা অগুরু অগুরু-গন্ধ, আর সামনে ওই কদাকার মূর্তি, দেবী না প্রেতনী বোঝা ভার। শরবতের গ্লাসটা নিয়ে তাই কিন্তু-কিন্তু করছিল সুপর্ণা, এদিকে শুভ তো কখন নিজের গ্লাস শেষ করে ফেলেছে, আবার সুপর্ণার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে ওর হাতে ধরা গ্লাসটা শেষ করানোর জন্য।
.
।। ছয়।।
“স্পিরিটের বোতলটা দে তো সুবল, শালা জহর এমন আঠা মেরেছে দাড়িটা উঠছেই না। এত বছর ধরে আমার সাথে কাজ করছে, বাট প্রফেসনালিজমের অভাব ছেলেপুলের, যেটা এসব কাজে সবথেকে বেশি দরকার পড়ে।”
“এই নিন গুরুদেব।”
“মিহিরকে বলেছিলি তো গাড়িটার পাত্তা লাগিয়ে দিতে।”
“আজ্ঞে গুরুদেব।”
“সব কথায় গাধার মতো ঘাড় নাড়িস না, একটু বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করতে শেখ সুবল। মন্দিরের সামনে সেদিন রক্ত নেওয়ার কিটব্যাগটা ফেলে রেখেছিল কোন শালা?”
“আজ্ঞে ভুল হয়ে গেছে গুরুদেব।”
“ভুল হয়ে গেছে গুরুদেব! শালা একবার লোক জানাজানি হলে আর রেহাই পাবি? যদিও বড়বাবুকে মাল দেওয়াই আছে, বাট সাবধানের মার নেই, একটা যেন ট্রেসও না পড়ে থাকে, মিডিয়ার লোক কিন্তু খুব খারাপ, একটা তিল পেলে তাল বানিয়ে দেবে।”
“না গুরুদেব আর ভুল হবে না।”
“না হলেই ভালো।”
“গুরুদেব, ওদের নাড়ি তো খুব চঞ্চল কিছু একটা হয়ে যাবে না তো?”
“এতদিন আমার সাথে থেকেও তোদের শিক্ষা হল না রে সুবল, যেই গবেটের সেই গবেটই রয়ে গেলি।” ওরা ঘুমাচ্ছে, গভীর ঘুমে ওরা স্বপ্ন দেখছে সাতজন্মের জন্য এক হওয়ার, ঠিক যেমনটা দেখেছিল দর্পনারায়ণ আর পারুল, কিন্তু ওদের স্বপ্নটাও এই মন্দিরের চারটে দেওয়ালেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, তেমনি শুভ আর সুপর্ণার স্বপ্নটাও…
এক ঝটকায় নিজের সাদা দাড়িটা খুলে ফেলেন রমাপতি নাথ, মুখের বাকি মেকআপগুলো তুলতে তুলতে এগিয়ে যান শুভ আর সুপর্ণার সাড়বিহীন পড়ে থাকা শরীর দুটোর দিকে।
“জয় মা কিঙ্কিনীর জয়, জয় দর্পনারায়ণ আর পারুলের জয়, এইভাবেই গল্পটা বাঁচিয়ে রাখিস মা, ছড়িয়ে দিস দিকে দিকে, আগামী অমাবস্যায় তোকে একটা হিরের নাকছাবি দেব মা!”
“জয় মা কিঙ্কিণীর জয়।”
“সুবল?”
“আজ্ঞে গুরুদেব।”
“ডাক্তার সেনকে ফোন লাগা, বল ওনার নতুন অ্যাসাইনমেন্টের জন্য নতুন ফ্রেশ মাল রেডি আছে, উনি টাকা নিয়ে রেডি থাকুন, মাল ঠিক পৌঁছে যাবে।”
“যথা আজ্ঞা গুরুদেব।”
কিঙ্কিনীদেবীর জয়ধ্বনিতে মুখরিত হতে
মন্দিরের চারটে দেয়াল, জঙ্গলের প্রতিটা গাছ, প্রতিটা পাখি, প্রতিটা ঘাসের আগায় লেগে থাকা শিশিরবিন্দু, তার সাক্ষী থেকে গেল, জয়ধ্বনিটা শুধু শুনতে পেল না শু আর সুপর্ণার নিস্পন্দ শরীর দুটো…
