অচেনা প্যাসেজ – কৌশিক সামন্ত
“কী মিত্তিরদা, অফিস শেষ হয়ে গেল নাকি?”
“আজ্ঞে না, বসকে ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে শুনিয়ে, ঘুমাতেই এই পালিয়ে এলুম।”
“আহা গিন্নি নেই বলে কি মন খারাপ নাকি দাদা?”
“এই ভর সন্ধ্যেবেলা আর ইয়ার্কি করিসনি তো বাপু, যা দেখি যা, আর আমাকেও যেতে দে।”
নাহ্ মেজাজটা সত্যিই ভালো নেই রমাপদবাবুর, রমাপদ মিত্তিরের। মানে প্রতিটা জিনিসের একটা সিস্টেম থাকা দরকার, মনে মনে ফোঁস ছাড়লেন রমাপদবাবু। এই যে শশীদার আজ ফেয়ারওয়েল গেল, সবাই কীরকম কবজি ডুবিয়ে মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ খেলো বলো দেখি হ্যাঁ, আর তার বেলায় কিনা স্রেফ ভেজ প্যাটিস আর দুটো জলভরা! মানে নেমকহারামির একটা সীমা থাকা দরকার তো। ওদিকে, গিন্নিও কদিন বাপের বাড়ি গিয়ে সেঁটে রয়েছে, শালা কপালটাই খারাপ, ধুর ধুর… তড়িঘড়ি লিফটে উঠে ঘটাং করে বোতামখানা টিপে দিলেন রমাপদবাবু, যাকগে এই লিফটখানাই যা ভয় ছিল, এর পরে এক দৌড়ে প্যাসেজ, ব্যস নিজের ফ্ল্যাট, আর কোনো অপোগণ্ডের মুখদর্শন করতে হবে না।
টুং টাং করতে করতে খটাস্ করে লিফটের দরজাখানা খুলে গেল। যাক, অবশেষে গন্তব্য, এইবার একটা জমিয়ে স্নান, মনের সব গ্লানি দূর হয়ে যাবে, বেরিয়ে এলেন রমাপদবাবু। কিন্তু এ কী, এটা কীরকম হল? প্যাসেজটা কীরকম অচেনা অচেনা ঠেকছে, তাড়াহুড়ো করে ভুল তলার বোতাম টিপে দিলেন নাকি? এই ফ্ল্যাটে খুব বেশিদিন না হলেও ছমাস তো কেটেই গেছে। এরকম অদ্ভুত ভুল তো আগে হয়নি তার কোনোদিন, আর প্যাসেজটাও আজ যেন বড্ড বেশি অন্ধকার, তবে কি ল্যাম্পটা কেটে গেছে? আলো-আঁধারিতে, স্রেফ মনের ব্যালেন্সে পা রেখে এগিয়ে চলেন রমাপদবাবু, প্যাসেজের শেষ প্রান্তের ফ্ল্যাটখানাই তার। একটা আলোর রেখা অবিশ্যি বের হয়ে এসেছে একটা আধখোলা দরজার আড়াল থেকে। তাই বেসিক হিউম্যানসুলভ রিপুর কারণে চোখ চলে গেল রমাপদবাবুর, আর ব্যস। হায় ঈশ্বর, ওটা কী দেখলেন তিনি?
কে যেন একটা ঝুঁকে পড়ে মেঝে থেকে কীসব তুলে তুলে খাচ্ছে।
মৃদু আলোয় চোখটা সেট হতে রমাপদবাবুর মেরুদণ্ডের ঝনঝনানিটা আরও বেড়ে গেল, নিশ্বাস বন্ধ করে তিনি দেখে চললেন সেই ভীষণ দৃশ্য।
মেঝে থেকে দু হাত দিয়ে পাগলের মতো রাশি রাশি মাংস আর হাড় তুলে আনছে সেই লোকটা, আর স্রেফ চালান করে দিচ্ছে মুখের ভেতরে। তার দু হাত, দু গাল, মুখের কষ বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে অস্থি-মাংসের মজ্জা, পরম মমতায় সে চেটে চেটে খাচ্ছে সেই নারকীয় অবশিষ্ট।
ও মা গো, আর পারলেন না রমাপদবাবু, সেই অগুরু দৃশ্যের প্রবলতা তার অস্তিত্বকেও বুঝি নাড়া দিয়ে গেল, তাই নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে অকস্মাৎ এই চিৎকার।
রমাপদবাবুর চিৎকারে হুঁশ ফেরে সেই লোকটার, পেছনে ফিরে তাকায় সে রমাপদবাবুর দিকে।
উফ কী ভয়ংকর সেই দৃষ্টি, কী ঘৃণা সেই চোখ জুড়ে, পারলে বুঝি রমাপদবাবুকে শুষেই নেয় তার সেই চোখ দিয়ে। একটু একটু করে সে দরজার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।
এনাফ ইজ এনাফ, আর না, নিজের শরীরের শেষ প্রাণশক্তিটাকে সঞ্চয় করে দৌড় দেন রমাপদবাবু। ‘শালা পাঁচতলার খোঁচো রমাপদ মিত্তির না? ঢ্যামনা বুড়োর নকশাটা একবার দেখলে? হুহ বাওয়া, দাদাবউদির মাটন বিরিয়ানির গোটা প্যাকেট এক ঝটকায় মাটিতে পড়ে যাওয়ার মর্ম তুমি কী বুঝবে শালা? ব্লাডি ভেজিটেরিয়ান কূপমণ্ডূক কোথাকার!’ মেঝে থেকে বিরিয়ানির অবশিষ্ট প্যাকেটা তুলে নিয়ে সজোরে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেন প্রাণকেষ্টবাবু, প্রাণকেষ্ট পাড়ই। বাকি বিরিয়ানিটাও শেষ করতে হবে যে…।
