কুয়াশার ফুল – শেষ
শেষ
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ছেলের জন্য চা করেন বিপ্লববাবু। দিনতিনেক হল সে ফিরেছে মতিপুর থেকে। সেখানকার কয়েকজন গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে একটা বড়সড়ো মামলা ঠুকেছেন তিনি। এই বিংশ শতাব্দীতে এসেও কতগুলো বর্বর লোক শুধু সন্দেহের বশে একটা মানুষকে ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারে, এ তার ধারণারও বাইরে। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী ও দিলীপ দোস্তিদারকে তারই বসার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পোস্টমর্টেমে বিষ পাওয়া যায় ওদের শরীরে। সে বিষ কোথা থেকে এল তা নিয়ে পুলিশের তদন্ত চলছে।
গোটা ঘটনাটা বিপ্লব মজুমদারের কানে পৌঁছায় ঘটনার পরদিন সকালবেলায়। তখনও তিনি দিল্লিতে। কিছুতেই সায়নের খোঁজ পাওয়া যায়নি। বন্ধুর মৃত্যুসংবাদের শোক চাপা পড়ে যায় সায়নের নিখোঁজ হবার খবরে। তিনি তখনই দিল্লি থেকে বেরোনোর তোড়জোড় করছিলেন। কলকাতায় ফিরে সায়নের খোঁজ মিলতে মেজাজ একটু শান্ত হয় তার। তবে সমস্ত ঘটনাটা এখনও তার কাছে পরিষ্কার নয়। তিনি ঠিক করেছেন, সায়ন একটু সুস্থ হলে নিজে আরও একবার মতিপুর গিয়ে সমস্তটা খতিয়ে দেখবেন।
সায়ন যখন বাড়ি ফেরে তখন ওর ধুম জ্বর। সমস্ত গায়ে কাটা ছেঁড়া দাগ। পায়ে একটা মারাত্মক চোট ছিল। এখনও ভালো করে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না।
গ্রামেরই একটা মাঠে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায় সায়নকে। এলাকার কয়েকজন লোক যখন তাকে উদ্ধার করে ততক্ষণে গঙ্গার পোড়া শরীর থেকে ছাই ঝরে প্রায় মিলিয়ে এসেছে। একটু দূরে পড়েছিল সাব ইন্সপেক্টর সঞ্জয় সিং আর দুজন রিপোর্টার। অদ্ভুত ব্যাপার হল এই চারজনেরই সেদিনের আগে কয়েকদিনের স্মৃতি কিছুই মনে নেই।
তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। সায়ন যে ঘটনার সাক্ষী থেকেছে তা মনে থাকা মানে সারাজীবন মনের উপর একটা দগদগে ঘা তৈরি হওয়া। ডাক্তার বলেছে সিভিয়ার মেন্টাল ট্রমা থেকে এ জিনিস হতে পারে মাঝে মাঝে।
প্লেটে চা নিয়ে ছেলেকে ঘুম থেকে তুললেন বিপ্লববাবু। সে প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও মুখ ব্যাজার করে উঠে বসল বিছানার উপরে। তেমনই ভ্যাবলা হয়ে বসে থাকতে থাকতে বলল, ‘এখন উঠে কি ভ্যারেন্ডাটা ভাজব আমি? কিছুই তো করতে পারছি না।’
বিপ্লববাবু চায়ের কাপ সামনে ধরতে ধরতে বললেন, ‘ওমা! এখনই তো মজা রে। কাজকর্ম কিছু করতে হবে না। লোকে কিছু করতে বললে বলবি পায়ে ব্যথা, আর জমিয়ে গল্পের বই পড়বি…এই দেখ…’
টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া বই টেনে বের করলেন বিপ্লব মজুমদার। সেটা সায়নের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ছোটবেলায় এটা না পড়ে ঘুমাতেই চাইতিস না। মনে আছে?’
বইটা হাতে নেয় সায়ন—মরা ডাইনির অভিশাপ। উপরে একটা হলদে চোখের ডাইনির ছবি। হাতদুটো সামনে উঁচিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে সে।
‘আরে! এটার কথা তো ভুলেই গেছিলাম!’ ছবিটা দেখে ভারি মজা পায় সে। খুলে পড়তে শুরু করে।
বিপ্লব মজুমদার ছেলের মাথায় একবার হাত বুলিয়ে উঠে পড়েন। এই বয়সে, ছেলের খুশি ছাড়া জীবনে অন্য কিছুই নেই তার। সায়ন বইতে মনোনিবেশ করতে ওকে আপাতত কিছুক্ষণ মরা ডাইনির জিম্মায় ছেড়ে তিনি কাজে মন দেন।
বইটা পড়তে পড়তে একবার পাশে তাকাতেই একটা জিনিস চোখে পড়ে সায়নের। ওর বিছানার পাশে একটা ছোট টেবিল আছে। টুকটাক জিনিসপাতি রাখে তার উপরে। আপাতত সেটার উপর রাখা আছে একটা নীলচে ফুল। নীলের উপর ছাই ছাই রঙ যেন। কী মনে হতে সেটা হাতে তুলে নেয় সায়ন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কে রেখে গেল ফুলটা?
কাল ওকে দেখতে কিছু বন্ধুবান্ধব এসেছিল। তারাই হয়ত রেখে গেছে। কিন্তু আজ অবধি এত তাজা আছে?
বইটা পড়তে আর ইচ্ছা করে না সায়নের। সেটা টেবিলের উপরে রেখে দেয়। তার ঠিক উপরে রাখে ফুলটা। প্রচ্ছদের ডাইনির হাতের উপরে রাখা ফুলটা একবার যেন নড়ে ওঠে। তারপর স্থির হয়ে যায়…
***
