কুয়াশার ফুল – ৯
নবম অধ্যায়
দিলীপ দস্তিদারের বসার ঘরে অন্ধকার জমেছে। সন্ধের পর থেকেই কয়েকটা ছায়া মূর্তি এসে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছে এখানে। তার মধ্যে কেউ পুলিশ, কেউ স্থানীয় লোক, কেউ বা এলাকার হত্তাকর্তা। টেবিলের উপর রাখা চা ঠান্ডা হচ্ছে। চাপা শলাপরামর্শের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। টেবিলের মাঝখানে একটা ল্যাম্প রাখা। সেটার আলো কেবল চায়ের কাপগুলোকেই আলোকিত করেছে।
দিলীপ দস্তিদার এখানেও টেনে এনেছেন সেই রিপোর্টার ছেলে মেয়েদুটোকে। বড্ড বেশি যেন নাক গলাচ্ছে তারা। সব কিছুতেই আগ্রহ। বিরক্ত লাগে ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীর। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারেন না।
চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখে ঘন অন্ধকার চাদর টেনে রেখেছে। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী নড়েচড়ে বসলেন। সোফার পেছনে হেলান দিয়ে বললেন, ‘মেয়েটাকে যতক্ষণ না উদ্ধার করা যাচ্ছে কিছুই জানা সম্ভব নয়। তবে ওয়ারেন্ট যেহেতু জোগাড় করা গেছে, বাড়িটা নিশ্চয়ই সার্চ করা যাবে।’
‘দরকার হলে তালা ভাঙতে হবে। গঙ্গার কোনও খোঁজ?’ দিলীপ দস্তিদার বললেন।
‘তারও এখন অবধি কোনও পাত্তা নেই…মেয়েটাকে যারা ধরে নিয়ে গেছিল তাদের কনভিক্ট করা হচ্ছে। তবে কোনও অ্যাকশন নেওয়া এই মুহূর্তে বাড়াবাড়ি হবে। আগে ধরা পড়ুক।’
সায়ন উল্টোদিকের সোফায় মাথা নিচু করে বসেছিল। সমস্ত শরীরে একটা চাপা উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার ছাপ। ওর দিকে তাকিয়ে দিলীপ দস্তিদার বললেন, ‘সায়ন বলছিল, ছবিগুলোর কিছু মানে আছে নাকি…মানে ওর একটু ওই ডাকিনীবিদ্যা নিয়ে আগ্রহ আছে আর কী…’
‘তাই নাকি? ছবিগুলোর কিছু মানে বের করতে পারলেন?’ কথাটা বলে ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী সামনে পড়ে থাকা ছবিগুলোর মধ্যে থেকে একটা ওর দিকে তুলে ধরেন। সেটার উপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলেন, ‘এটা তো অলিম্পিকের লোগো মনে হচ্ছে। একটার পর আরেকটা গোল…’
ছবিটার দিকে ভালো করে তাকায় সায়ন। তারপর আবার সেটা টেবিলের উপর রেখে দেয়। ছবিতে মৌলির শরীরে অন্তর্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই। পেটের কাছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে আছে। সেটা সম্ভবত জামাটা টেনে ছিঁড়তে গিয়ে কারো নখ লেগে হয়েছে। ছবির মৌলির চোখদুটো অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সায়নের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করল না ওর। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ধরা কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, ‘ওটা অলিম্পিকের চিহ্ন নয়। ওটাকে উইচ-মার্ক বলে। অনেকে এপোট্রোপাইক সিম্বলও বলে। অনেক পুরনো চার্চ আর বাড়িতে এসব চিহ্ন পাওয়া গেছে।’
দিলীপ দস্তিদার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, গাঙ্গুলী তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চার্চে ডাইনির চিহ্ন কেন?’
‘বলছি। এপোট্রোপাইক সিম্বল দু-ধরনের হয়। এক ধরনের চিহ্ন ব্যবহার হয় ডাইনিকে মার্ক করতে। আগেকার দিনে উইচ হান্টাররা যাকে ডাইনি বলে চিহ্নিত করত তার গায়ে এই সিম্বল ট্যাটু করে দিত। আর এক ধরনের সিম্বল ব্যবহার হয় ডাইনিরা যাতে কাছে আসতে না পারে সেই জন্যে। কারণ ডাইনিরা কাছে এলে তাদের ম্যাজিক্যাল পাওয়ার কমে যায়। তখনকার দিনের প্রবাদ ছিল এসব বাড়ির বাইরে এঁকে রাখলে ভূত-প্রেত বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে না। সোজা কথায় বলতে গেলে ডাইনিদের দূরে রাখতেই এই চিহ্নটা ব্যবহার করা হত। এখানে আপনারা যে সিম্বলটা দেখতে পাচ্ছেন সেটা এই দ্বিতীয় ধরনের…’
‘ডাইনিদের দূরে রাখতে!’ থুতনিতে হাত দিয়ে কী যেন ভাবেন গাঙ্গুলী, ‘কিন্তু এটা মেয়েটার গায়ে কে এঁকেছিল? গঙ্গা?’
দিলুবাবু কাঁধ ঝাঁকান, ‘তা তো বলতে পারব না। ওর গায়ে যে এতগুলো উলকি করা আছে সেটা আমি আগে জানতাম না।’
তনুজা এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। এবার সে বলল, ‘মেয়েটি যদি ডাইনি হয় তাহলে তার শরীরে ডাইনি দূরে রাখার চিহ্ন কেন আঁকা থাকবে?’
‘হয়তো গঙ্গা আঁকেনি ওটা। গঙ্গার থেকে যাতে দূরে থাকে তার জন্য হয়তো অন্য কেউ ওর শরীরে এঁকে দিয়েছিল চিহ্নটা…আর সবথেকে বড় কথা ওই মেয়েটি যে ডাইনি সেটা এতদিন কেউ বলছিল না আজ হঠাৎ করে…’
দিলুবাবু একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। এবার তিনি একটু দম নিয়ে বললেন, ‘গুপি বলছিল যেদিন রাতে সমীরণ খুন হয় সেদিন ওর সঙ্গে মণি বলে একটা বাচ্চা ছেলে ছিল। সে নাকি দেখেছে আকাশ দিয়ে কিছু একটা উড়ে যেতে…’
‘আপনি কী বলেন সায়নবাবু? ডাইনিরা ঝাঁটা নিয়ে আকাশ দিয়ে উড়ে যায়? এসব তো ছোটবেলায় পড়েছি…’ তনুজা প্রশ্ন করে।
সায়ন মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ করে বিরক্তি প্রকাশ করে। তারপর বলে, ‘ছোটবেলায় পড়েছেন বলেই এই গল্পটা শুনেছেন…’
‘মানে?’
‘মানে বড়বেলায় যদি ডাইনিদের নিয়ে একটু খোঁজখবর করতেন তাহলে বুঝতেন যে পয়েন্টি হ্যাট পরে, ঝাঁটায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো, কালো বেড়াল পোষা, এগুলো হাল আমলে উইচ ট্রায়ালের নামে লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ মহিলাকে খুন করার ইতিহাস লঘু করার জন্য তৈরি করা। আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে মানুষ ডাইনি বলতে এসব বুঝত না।’
‘তাহলে কী বুঝত?’
‘ডাইনির উদ্ভব হয়েছিল দুটো কারণে। আমাদের বাপ ঠাকুরদাদার শারীরিক এবং বৌদ্ধিক অক্ষমতা এবং ঈর্ষা থেকে। ভেবে দেখুন আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে যখন আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত হয়নি, এত দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া অসম্ভব ছিল…সেই সময়ে পুরুষদের কাজে যেতে হত, যুদ্ধে যেতে হত, বহুদিন পর্যন্ত তাদের বাড়ি ফেরা হত না। যুদ্ধ হোক বা চাকরি তারা যাই করতে গিয়ে থাকুন না কেন তাদের মনে একটা দুশ্চিন্তা লেগেই থাকত—তাদের অবর্তমানে তাদের সহধর্মিণীদের যৌন চাহিদা মিটছে না। এবং সেই যৌন চাহিদা থেকে তারা সম্ভবত অন্য কোনও সক্ষম পুরুষের সঙ্গে যৌন ক্রিয়ায় লিপ্ত হচ্ছে!
পুরুষের চিরাচরিত এই দুশ্চিন্তা তার কাছে লিবিডোকে ভিলেন বানিয়ে দেয়। নারীর শারীরিক চাহিদা যে ভয়াবহ তা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারণেই যেসব নারীর শারীরিক চাহিদা বেশি তাদের ডাইনি বলে অভিহিত করা হতে থাকে।
মেয়েদের যৌন চাহিদা মারাত্মক। ফলে ডাইনিদের চেহারা হয় বিকৃত! তাদের স্তন ঝুলে পড়ে, যোনি ফাঁক হয়ে থাকে, উদর স্ফীত হয়ে যায়। মোট কথা এটা বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, বেশি যৌন সংসর্গ করলে শরীর বিকৃত হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত যত ডাইনি দেখেছেন, খেয়াল করবেন তাদের চুল সব সময় খোলা থাকে। বাঁধা চুল ম্যারিটাল সেক্স, আর খোলা উড়ন্ত চুল আনব্রিডল্ড সেক্সের সিম্বল!
এই ছিল ডাইনিদের প্রাচীন রূপ। পরে ক্যাথলিক চার্চ যখন বুঝতে পারে যে নির্বিচারে অসংখ্য নারীকে হত্যা করা হচ্ছে, তখন প্রোপাগান্ডা করে তাদেরকে বাচ্চাদের খেলার পুতুল বানিয়ে দেয়। তাদের বাঁকানো লম্বা টুপি হয়, সূচালো নাক, কালো বিড়াল নিয়ে বাচ্চাদের ভয় দেখায় তারা আর ঝাঁটার পিঠে উঠে ঘুরে বেড়ায়…’ কথাটা বলে একটু দম নিয়ে আবার ইন্সপেক্টরের দিকে তাকায় সায়ন, ‘ফলে বুঝতেই পারছেন—এ গ্রামে ডাইনি বলে যদি কিছু থেকেও থাকে সে অন্তত ঝাঁটায় চড়ে উড়তে পারে না। ওটা বাচ্চাদের ছবির বইতে দেখে কেউ কল্পনা করেছে…’
কিছুক্ষণ কেউ কোনও কথা বলে না। টিকটিক করে ঘড়ির কাঁটা এগোতে থাকে। ঘরের আলো কেঁপে উঠতে থাকে।
একটু দম নিয়ে সায়ন বলে, ‘তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার আপনারা খেয়াল করেননি…হয়ত জানেন না বলে…’
‘কী ব্যাপার?’ গাঙ্গুলী জিগ্যেস করেন।
‘যে দুটো খুন আর বাচ্চা চুরি হয়েছে এ গ্রামে, সেগুলো সবই করা হয়েছে একটা প্রাচীন বইয়ের নিয়ম মেনে…’
‘মানে, কী বলতে চাইছেন আপনি! কোন বই?’
সায়ন আবার সোফায় পিঠ এলিয়ে দেয়। শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলে, ‘আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে লেখা একটা বই। বাংলায় সে বইয়ের অনুবাদ আছে বলে মনে হয় না।’
‘যা বলছেন স্পষ্ট করে বলুন—।’
‘পৃথিবী শাসন করার দৌড়ে মানুষ অন্যান্য প্রাণীর থেকে যেভাবে এগিয়েছে প্রায় তার সমানুপাতিক হারেই ছেলেরা ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মেয়েদের থেকে এগিয়ে গেছে। তারাই আইন তৈরি করেছে, ধর্ম তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসে নানাসময় কিছু স্বাধীনচেতা নারী সে নিয়ম মানতে চাননি। তারা মাথা উঁচু করে আইনকে প্রশ্ন করেছেন। ফলাফল বলাই বাহুল্য— নির্বিচারে উইচ ট্রায়াল…’ টেবিলের উপর হাত রেখে গড়গড়ে গলায় বলে সায়ন।
‘সব ধর্মে, সব যুগে, সব দেশে চালু ছিল ডাইনির মিথ। আলাদা আলাদা নামে। কিন্তু তার কোনও গাইড বুক ছিল না। কীভাবে ডাইনিদের ধরতে হবে, শাস্তি দিতে হবে, তাদের মুখ থেকে কনফেশন বের করার জন্য ঠিক কোন টর্চার ফলপ্রসূ হবে তার একটা ব্যাকরণ বইয়ের অভাব ছিল।
‘আজ থেকে প্রায় ছ’শো বছর আগে অস্ট্রিয়ার এক আর্চবিশপের ডানহাত ছিলেন হাইন্রিখ ক্রেমার নামের এক ভদ্রলোক। বিশপ তাকে দায়িত্ব দেন গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডাইনি খুঁজে বের করার। বলা বাহুল্য, ক্রেমারের খোঁজের একমাত্র সম্বল ছিল এলাকায় চালু গুজব আর কানাঘুষো।
তো এরকমই খুঁজতে খুঁজতে ইন্সব্রুক বলে একটা জায়গায় হেলেনা স্কুবেরিন নামে এক মহিলার ব্যাপারে জানতে পারেন তিনি। ক্রেমারের মনে হয় হেলেনার যৌনজীবন ঠিক স্বাভাবিক নয়। একজন মহিলার এত যৌন চাহিদা ভীষণ বিরক্তিকর লাগে তার কাছে। ব্যাপারটা নিয়ে তিনি উঠে পড়ে লাগেন। হেলেনাও একদিন রাস্তায় দেখতে পেয়ে তার গায়ে থুতু ছিটিয়ে দেন ও গালিগালাজ করেন। ক্রেমার নিজের ক্ষমতা বলে হেলেনাকে ডাইনি বলে ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু বিশপ তাতে রাজি হন না। তিনি দাবি করেন হেলেনার বিরুদ্ধে নিয়ে আসা ক্রেমারের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
ক্রেমার মনে মনে রেগে গেলেও মুখে কিছু বলেন না। তার এই পুষে রাখা রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে তিনি একটা বই লিখে ফেলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্মগ্রন্থ আর এই একটি বই ছাড়া অন্য কোনও বইয়ের দোহাই দিয়ে এত মানুষকে খুন করা হয়নি। হাইনরিখ ক্রেমারের লেখা সেই বইটার নাম—ম্যালিয়াস ম্যালিফিকেরাম। বইতে ডাইনি ধরা, অত্যাচার করে স্বীকারোক্তি আদায় করা এবং শেষ পর্যন্ত নৃশংস যন্ত্রণা দিয়ে তাদের নির্বিচারে ধর্ষণ ও খুন করার বিধান দেওয়া আছে। সেই সঙ্গে বইয়ের মাঝে ফলাও করে ছাপানো আছে পোপ ইনোসেন্ট দি এইঠথের জারি করা একটা নির্দেশ। তাতে লেখা ছিল—ডাইনিরা সত্যিই আছে, এবং তাদের শাস্তি বিধান করার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ক্রেমারকে।
পুরুষের হিংসা, নারীর উপর ক্ষমতা দখলের লোভ, সেডিস্টিক প্লেজার, আর তার উপর ধর্মের সিলমোহর! বুঝতেই পারছেন বইটা বাজারে এসে পড়ার পর উড়ে যেতে বিশেষ সময় লাগেনি। উইচ হান্ট এক সামাজিক উন্মাদনায় পরিণত হয়! সেই বইতেই বর্ণিত দুটো খুনের মধ্যে দুটো হল ন’বার, আর ছত্রিশবার ছুরি দিয়ে আঘাত করে খুন। আর গাছ থেকে পেছনে হাত বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া…’
‘মানে এই চারজনকে এই বইতে লেখা শাস্তি বিধান মেনেই খুন করা হয়েছে…’ গাঙ্গুলীর ভুরুতে অস্বাভাবিক কিছু ভাঁজ গজিয়ে উঠছে। মুখটা ভারী হয়ে এসেছে তার। কিছুক্ষণ সেভাবেই থম হয়ে বসে থেকে আর একটা ছবি সায়নের দিকে এগিয়ে দেন তিনি, ‘এই ছবিটা মৌলির পিঠের দিক থেকে তোলা। এই ট্যাটুটা কীসের বুঝতে পারেন কিনা দেখুন তো—।’
সায়ন ছবিটা হাতে নিয়ে দেখে মৌলির পিঠে আগের মতোই কালচে অক্ষরে কিছু ট্যাটু করা আছে, ‘একটা সংখ্যা আর তার নিচে দুটো এলফাবেট। এক পাঁচ আট সাত, ডব্লিউ এইচ…’
সায়ন কিছুক্ষণ একমনে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। স্বগতোক্তির স্বরে বলে, ‘সংখ্যাটা তো একটা সাল মনে হচ্ছে। পনেরোশো আটাত্তর! কিন্তু লেখাটা…কারো নামের আদ্যাক্ষর?’
ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে, দস্তিদারের দিকে তাকান ইন্সপেক্টর, ‘দেখুন, আমাদের টিম গোটা গ্রাম চষে ফেলছে। যেহেতু গ্রামে একটা জঙ্গল আছে, সেখানে গিয়ে লুকিয়ে থাকারও সম্ভবনা আছে। তবে বেশি দিন লুকোতে পারবে না। দেখামাত্র মা-মেয়ে দুজনকে এরেস্ট করা হবে!’
দিলুবাবুর মুখে একটা চাপা হাসি খেলে যায়। অ্যারেস্ট করার ব্যাপারটা ভেতর ভেতরে খুশি করে তাকে।
‘আমি আগেই বলেছিলাম এ গ্রামের ডাইনি আসলে…’
‘ওয়াল্পারগা হাস্মানিন!’ সায়নের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে কথাটা। শুনতে না পেলেও ওর দিকে ঘুরে তাকান সকলে।
‘কী বললেন?’
‘ওই ট্যাটুটা আসলে একটা মানুষকে ডিনোট করছে। ওয়াল্পারগা হাস্মানিন। ডাইনি অপবাদে ১৫৮৭ সালে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।’
থমথমে মুখ নিয়ে সায়নের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকেন সবাই।
‘মহিলার জন্ম জার্মানিতে আঠেরোশো দশ নাগাদ। পেশায় ধাইমা। অন্য আর পাঁচটা ডাইনির মতোই উইচ ট্রায়াল চলে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু অন্য ডাইনিদের থেকে হাস্মানিনের কেস একটা বিশেষ কারণে ভয়ঙ্কর রকম আলাদা এবং বহুচর্চিত!’
‘কেন?’
‘বলছি, কিন্তু তার আগে হাস্মানিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ছিল সেটা জানা দরকার। ডাইনি সন্দেহে যখন তাকে ধরা হয় তখন তার বয়স অন্তত ষাটের কাছাকাছি। অভিযোগ ছিল তিনি নাকি প্রায় গোটা পঞ্চাশেক শিশুকে মায়ের কোল থেকে চুরি করে তাদের মাংস খেয়েছিলেন। বড় লোকের বাড়ির বাচ্চা প্রসব করানো, বাচ্চার দেখাশোনা করা—এই ছিল তার কাজ। ফলে চুরির কাজটা তার পক্ষে সহজ হয়।’
ঘরে উপস্থিত সকলে কোনও অজানা কারণে সোজা হয়ে বসেন। চেয়ার থেকে উঠে পড়ে সায়ন। ছবিটা টেবিলের উপর উল্টে রাখে। তারপর ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে শুরু করে। ওর গলাটা যেন কোন সুদূর থেকে ভেসে আসছে।
‘সারাজীবন ভয়ানক দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই কাটে ভদ্রমহিলার। পঞ্চাশ বছর বয়সে স্বামী মারা যায়। অভাবের সংসার, কিন্তু একটা মানুষের সংস্থান কোনওরকমে হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ চার্চের লোক এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। দাবি করা হয় যে, তিনি নাকি মায়ের কোল থেকে ছেলে চুরি করে খিদে মেটান। তারপর ডাইনি সন্দেহে তার বিচার শুরু হয়।
এই উইচ ট্রায়াল ছিল একটা মজার জিনিস। কাউকে একবার ডাইনি বলে ধরলে বিচার বলে আর কিছু হত না। বিচার ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত নির্যাতন চালানো যতক্ষণ না সে সমস্ত দোষ স্বীকার করে নিচ্ছে। হাত মচকে পেছনে ভেঙে দেওয়া, মাথা-চোখ কিংবা নাভির ভিতর পিন ফুটিয়ে দেওয়া, বিশাল ধারাল বটির উপর বসিয়ে রাখা, জ্বলন্ত শলাকার ক্রমাগত ছ্যাঁকা, এসব অত্যাচারের ব্যাপারে মধ্যযুগীয়দের জুড়ি ছিল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এত নির্যাতনের মুখে এসব মহিলারা নিজেদের ডাইনি বলে স্বীকার করে নিতেন। স্বাভাবিক, দিনের পর দিন অকথ্য নির্যাতন থেকে মৃত্যু অনেক বেশি শান্তির।
তো একসময় এই মহিলাও সেই পন্থা নিলেন এবং কনফেস করলেন যে তিনি সত্যিই ডাইনি। কিন্তু একইসঙ্গে একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। তিনি তার স্বীকারোক্তিতে লম্বা চওড়া এবং অত্যন্ত অবাস্তব একটা গল্প বললেন। আপনারা যদি চান সেই গল্প আমি আপনাদের শোনাতে পারি…’
‘গল্প?’ ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ কেউ বলে উঠল।
‘হ্যাঁ, উনি বললেন, স্বামী মারা যাবার পর থেকেই নাকি ওনার যৌন চাহিদা মারাত্মক বেড়ে যেতে থাকে। শেষে থাকতে না পেরে গ্রামেরই এক কুটিরে একজন লোককে আহ্বান জানান যৌন সংসর্গ করতে। সারারাত মহিলা সেই ঘরে অপেক্ষা করলেন। কিন্তু সেই লোকটি এল না। তার বদলে এল একটি বড়সড় চেহারার ডিমন। মহিলা অগত্যা ডিমনের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করলেন।
শেষে সেই ডিমন তাকে বলল, তুমি এরকম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছ, আমাদের রাজা শয়তানের ছত্রছায়ায় এসো—সুখের জীবন পাবে। মহিলা রাজি হলেন। পরের দিন তিনি ওই ডিমনের সঙ্গে গেলেন নরকের অন্ধকারে। সেখানে তার দেখা হল শয়তানের সঙ্গে।
শয়তান তাকে নানানরকম খাবার-দাবার খেতে দিলেন। যার মধ্যে একটি উপাদান ছিল পোড়ানো শিশুর মাংস। সমস্ত রকম আহারাদির পর শয়তানের সঙ্গে তার একটি লিখিত চুক্তি হল। সেই চুক্তিতে শয়তান ঘোষণা করলেন যে, তিনি মহিলাকে অনন্ত সুখ আর যৌনতা দেবেন। শয়তান মহিলাকে একটা কৌটোতে মলম জাতীয় কিছু দিয়েছিল। সেই মলম শরীরে প্রবেশ করলে নাকি মহিলার দেহে কিছু বদল আসবে। তখন অল্পবয়সি শিশুদের গলা টিপে খুন করে রক্ত খেতে হবে।
মহিলা তাতে রাজি হয়ে বাড়ি চলে গেলেন। তারপর থেকেই একটার পর একটা শিশুকে গলা টিপে কিংবা কপালের একটি বিশেষ জায়গায় টিপে ধরে খুন করা শুরু করলেন।
বুঝতেই পারছেন, এক ডাইনির মুখ থেকে স্বীকারোক্তি হিসেবে চার্চ যা শুনতে চায়, এ গল্প তাদের প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গেল। তারা হই হই করে এই কনফেশন চারিদিকে রটিয়ে বেড়াতে লাগল। এতদিনে একটা প্রকৃত ডাইনি ধরতে পেরেছে তারা। মহিলার মৃত্যুদণ্ড হওয়া ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ডাইনিদের হত্যার সব থেকে ভয়ংকর উপায় ছিল গাছের সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে মারা। কিন্তু এক্ষেত্রে সে বিধান আরেকটু বেশি ভয়ংকর হল। জেলখানা থেকে পোড়ানোর জায়গা অবধি নিয়ে যাবার মধ্যে মোট পাঁচবার দাঁড় করানো হল তাকে। এবং প্রত্যেকবার দাঁড় করিয়ে একটি করে স্তন কিংবা একটি করে হাত কেটে ফেলা হল। যখন পোড়ানোর জায়গায় এসে তিনি দাঁড়ান তখন তার শরীরে কেবল দুটি পা অবশিষ্ট ছিল। সেই অবস্থায় গাছে বেঁধে তাকে পোড়ানো হয়। এবং তার পোড়া ছাই নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।’
চেয়ারের কাছে আবার ফিরে আসে সায়ন। এই মহিলার কথাই উল্লেখ আছে ছবিটায়…’
‘কিন্তু এর সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক?’
সায়ন দুদিকে মাথা নাড়ে, ‘তা বলতে পারব না।’
তনুজা এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিল কথাগুলো, সে কৌতূহলী গলায় বলে, ‘কিন্তু এক্সিকিউশনের নৃশংসতা বেড়ে যাবে জেনেও মহিলা এমন একটা স্বীকারোক্তি দিলেন কেন? মানে কথাগুলো যে সত্যি হওয়া সম্ভব নয়, সে তো এখন শিক্ষিত মানুষমাত্রই জানে, তাই না?’
‘এখানে একটা বিতর্ক আছে। কেউ কেউ বলে ওয়াল্পারগার কথাগুলো স্বীকারোক্তি ছিল না। ছিল সংকেত। তিনি জানতেন চার্চ এটাকে প্রচার করবে। তার বানানো গল্পের মধ্যে এমন কিছু ছিল যা তিনি ভবিষ্যতের মানুষকে মেসেজ হিসেবে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তবে সেটা ঠিক কী তা কেউ বলতে পারে না।’
সমস্ত তথ্যগুলো মাথার মধ্যে ধরতে একটু সময় লাগল সবার। দিলীপ দস্তিদার এতক্ষণে বেশ কয়েকবার জল খেয়েছেন। এবার একটা ঢোঁক গিলে বললেন, ‘আমরা ভারি জটিল করে ফেলছি ব্যাপারটা, ওর পেটে কী চিহ্ন আঁকা আছে না আছে, সেটা তো বড় কথা নয়। আজকাল ছোঁড়া-ছুঁড়িরা তো গায়ে পায়ে কতরকম কিছু আঁকে। সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর অত দরকার নেই। খুনগুলো যে ওই মেয়েটা আর ওই মা মিলে করেছে সেটা তো একরকম নিশ্চিত হয়েই যাচ্ছি আমরা…’
ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী মাথা নাড়ান, ‘এখনও না, দুটো খুনই ওদের দুজনের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কোনও মানুষের পক্ষেই নয়…’ কথাটা শেষ না করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন তিনি। উঠতে উঠতে বলেন, ‘গঙ্গার বাড়িটা আমরা সিল করে দিয়েছি। আজ রাতটা পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। কাল সকালে একবার খুঁজে দেখা যাবে কিছু পাওয়া যায় কিনা। মিস্টার মজুমদার—’ সায়নের দিকে চেয়ে কথাটা বলেন তিনি, ‘আপনিও কালকে আসবেন আমাদের সঙ্গে।’
রাতে শুয়ে উশখুশ করতে লাগল সায়ন। কিছুতেই ঘুম আসছে না। দূরে নারকেল গাছের মাথাগুলো ইতস্তত হাওয়ায় দুলছে। যেন হাত নাড়িয়ে ডাকতে চাইছে ওকে। এর মাঝে কয়েকবার উঠে জানলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইরে তাকিয়ে খুঁজতে চেয়েছে কাউকে। কে যেন সারারাত বাইরে থাকে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। লক্ষ রাখে একমনে।
এই অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রাম্য প্রান্তরের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে মৌলি। কোথায় আছে কে জানে। গঙ্গাই বা গেল কোথায়? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার এসে শুয়ে পড়েছে।
কালকের পর থেকে অকারণেই কী ভীষণ নিরাপদে রাখতে ইচ্ছা করছিল মৌলিকে। আর এখন ও নিজেই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
ঘড়ির কাঁটার খসখস আওয়াজটা বিরক্তিকর লাগতে শুরু করেছে। কে জানে কখন সকাল হবে।
তন্দ্রা এসেছিল সায়নের। ঠিক এমন সময় একটা শব্দে ওর ঘুমটা ভেঙে যায়। চারপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। ঘর আগের মতোই ফাঁকা। আবার শুতে গিয়ে পায়ের কাছে তাকাতেই চমকে ওঠে সায়ন। একটা নারীমূর্তি বসে আছে সেখানে। অন্ধকারে মিশে আছে বলে ভালো করে মুখ দেখা যায় না।
ও চমকে ওঠে। আবার কি স্বপ্ন দেখছে?
নাঃ, দরজায় খুটখুট আওয়াজ নেই। ঘরের ভেতর নীল আলোটাও দেখা যাচ্ছে না। নারীমূর্তি যদি বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে থাকে তাহলে জানলা দিয়ে আসা ছাড়া অন্য উপায় নেই ওর। কিন্তু জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকল কেমন করে?
কাঁপা কাঁপা পায়েই উঠে পড়ে ও। যতক্ষণ পাশ ফিরে শুয়েছিল তার মধ্যেই ঢুকেছে তার মানে।
কয়েক পা সামনে এগোতেই নারীমূর্তিকে চিনতে পারে সায়ন। ওর সমস্ত শরীরে একটা শিহরন খেলে যায়। শরীরে কাপড় নেই মৌলির। কেবল অন্তর্বাসটা দেখা যাচ্ছে।
‘মৌলি!…’ সায়ন এগিয়ে গিয়ে উত্তেজিত গলায় ডাকে।
সমস্ত শরীর রক্তে মাখামাখি। নানা জায়গায় কাটা-ছেঁড়ার দাগ। মৃদু গোঙানির শব্দ আসছে তার নামিয়ে রাখা মুখ থেকে। ও কি কাঁদছে? ধীরে ধীরে চুল সরিয়ে মুখ তোলে ও।
ওর মুখের দিকে তাকাতেই সায়নের বুকের ভেতর একটা চাপা কান্নার দমক ছিটকে বেরিয়ে আসে, ‘তুমি? তুমি সারাদিন কোথায়…’
‘চুপ!’ চকিতে মাটি থেকে উঠে সায়নের মুখটা চেপে ধরে মৌলি, ‘শব্দ কোরো না। ওরা আমাকে দেখতে পেলেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে…’
মৌলির রক্তাক্ত শরীরটা সায়নের বুকে লেপ্টে আছে। ধীরে ধীরে ওর পিঠে একটা হাত রাখে সায়ন। ক্ষতর উপর হাত পড়তে শিউরে ওঠে মৌলির শরীরটা। ফিসফিসে গলায় সে বলে, ‘আলো জ্বেলো না। বাইরে থেকে কেউ দেখে ফেলতে পারে…’
সায়ন দুহাতে জড়িয়ে ধরে ওকে, ‘আজ সারাদিন আমার উপর দিয়ে কী গেছে কিছু জানো না তুমি…আমি তোমার কোনও ক্ষতি হতে দেব না মৌলি!’
সায়নের বুক থেকে মুখ তোলে মৌলি। চোখ দুটো ভিজে গেছে ওর। জমাট অন্ধকার সরে গেছে সেখান থেকে। টলটলে চোখে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মৌলি। তারপর ওর একটা হাত নিজের হাতে নেয়। অন্য হাতে কিছু একটা রাখে ওর হাতের উপর। সায়ন তাকিয়ে দেখে সেই পরিচিত নীল ফুলটা। ডাইনির ফুল। একহাতে সেটাকে শক্ত করে চেপে ধরে সায়ন।
মৌলি হাসে, ‘বলেছিলাম না, রোজ একটা করে এনে দেবো!’
সায়নের চোখে জলের ধারা নেমেছে। মৌলির কপালে ওর ঠোঁট ছুঁয়ে যায়।
মৌলি চোখ বুজে আবার মাথা রাখে ওর বুকে, ফিসফিসে কয়েকটা শব্দ বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে, ‘আমাকে ক’টা দিন এখানে থাকতে দেবে, তোমার কাছে?’
