কুয়াশার ফুল – ৭
সপ্তম অধ্যায়
দূর থেকে আলো দেখতে পেয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে এল মধু। এত রাতে জঙ্গলে আলো জ্বেলেছে কে? তার উপর এমন নীলচে মায়াবী আলো! জঙ্গলে এত রাতে আসবেই বা কোন অভাগা?
মধু এমনি এমনি রাত-বিরাতে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছিল না। এই গ্রামে তার একটি গোপন প্রেমিকা আছে। প্রেমিকা ঠিক বলা যায় না, বরং মধুই ভালোবাসে মেয়েটিকে। সে ঘুরেও তাকায় না ওর দিকে।
তার বাড়ির সামনে গিয়ে অকারণেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মধু। উঁকিঝুঁকি দেয় বাড়ির ভেতরে। কখনও জানলা দিয়ে দেখতে পেয়েও যায়।
মধুর বয়স প্রায় চল্লিশ পেরিয়েছে। বিয়ে-থা করেনি এখনও। সম্ভবত আর করবেও না। মন খুব খারাপ করলে সে তার প্রেমিকার বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। তাকে একবার দেখতে পেলেই মনটা ভালো হয়ে যায় ওর। ও বুঝতে পারে দিনদিন ওর ভেতরে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ জন্মাচ্ছে, খানিকটা পাগলামিও। তবে এই পাগলামিটা ও মনে মনে ভারি উপভোগ করে।
তবে আজ একটু আগে হঠাৎ মনটা ভেঙে গেছে। এতদিন মধু নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিত যে ওর প্রেমিকার ওর প্রতি কোনও আগ্রহ যেমন নেই, তেমনি এ দুনিয়ার অন্য কারও দিকে সে ফিরেও তাকায় না। কিন্তু আজ ও দেখেছে তার বাড়িতে অন্য একটা মানুষকে ঢুকতে। চুপি চুপি চোরের মতো ঢুকেছে লোকটা। আধঘণ্টা কি পঁয়তাল্লিশ মিনিট ভেতরে ছিল। ততক্ষণ ভিতরে কী হয়েছে না হয়েছে মধু কিছুই বুঝতে পারেনি। তেমনি সতর্ক বিড়াল পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেছে।
লোকটা সম্ভবত অনেক দূর থেকে এসেছিল। সঙ্গে আর কেউ ছিল বলে মনে হল না মধুর। তবে সমস্ত ব্যাপারটা দেখে মধু বুঝতে পারে, ওর গোপন প্রেমিকারও এক গোপন প্রেমিক আছে।
রাগ হচ্ছিল মধুর। মাটির উপর সজোরে কয়েকটা ঘুষি মারতে ইচ্ছা করছিল। কোনওরকমে সামলে নিয়েছে নিজেকে। ইশ! এতদিন এসব জানলে ও বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি একরকম বন্ধই করে দিত। কিন্তু কে লোকটা? আসেই বা কোথা থেকে?
এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই ও বাড়ি ফিরছিল। এমন সময় জঙ্গলের মধ্যে চোখে পড়ল সেই আলোটা। হালকা নীল আভা। যেন জঙ্গলের ভেতর ইলেকট্রিকের কানেকশন করে নীল আলো জ্বেলেছে কেউ। ব্যাপার কী?
কৌতূহল বেড়ে উঠতে ও আরও কিছুটা এগিয়ে আসে জঙ্গলের ভেতরে। এবং আসতেই শুনতে পায় একটা অদ্ভুত আওয়াজ আসছে সেখান থেকে। খুব মন দিয়ে শুনলে বোঝা যায়, সেটা একটা মন্ত্র উচ্চারণের আওয়াজ।
মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করে মধু। না, এর আগে যত মন্ত্র ও শুনেছে তার কোনওটার সঙ্গেই এই মন্ত্রের কোনও মিল নেই। এমনকী ভাষাটাও আগে কখনও শুনেছে বলে মনে পড়ে না। কেমন যেন বিশ্রী অশুভ একটা সুর মন্ত্রের। অথচ শুনলে স্পষ্ট মনে হয়, মন্ত্র পড়ে কিছু পুজো হচ্ছে যেন!
এবার একটু ভয় ভয় লাগে মধুর। ও কয়েকবার কানাঘুষো শুনেছে এই গ্রামে নাকি ডাইনির দৃষ্টি আছে। সেই কি তাহলে জঙ্গলে এসে পুজো-আচ্ছা করছে?
বুক দুরু দুরু করে ওঠে ওর। পায়ে পায়ে আরও একটু এগিয়ে আসে। আসতেই একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ে। জঙ্গলের মধ্যে কয়েকটা গাছে ঘেরা একটা ছোট্ট ফাঁকা জায়গা। সেখানে ওর দিকে পেছন ফিরে হাঁটু মুড়ে বসে আছে একটা মেয়ে। তার বয়স অল্প তবে গোটা পিঠ জুড়ে মা কালীর মতো ঝালর চুলের ঢল নেমেছে। আর সেই চুলের পাশ দিয়ে ওর শরীর থেকে বেরোচ্ছে নীলচে আলোটা! সেই আলোই জঙ্গলের এই প্রান্তটা ভরে রেখেছে। মানুষের শরীর থেকে কি এরকম আলো বের হতে পারে? মধু বুঝতে পারে ওর সামনেই অলৌকিক কিছু একটা ঘটছে!
মন্ত্রের তীব্রতা বেড়ে ওঠে। স্পষ্ট দৃঢ় গলায় মেয়েটা মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছে। এবার নীল আলোটা আরও বাড়ল! মেয়েটার সামনে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে একটা নীলচে রঙের সরু বৃত্ত। যেন হাওয়ার উপর অসংখ্য অদৃশ্য টুনি বাল্ব জ্বলছে। ক্রমশ বড় হচ্ছে বৃত্তটা। একটু একটু করে মেয়েটার মন্ত্রচারণের ছন্দে সেটা বেড়ে উঠছে।
মধুর পা কাঁপতে শুরু করে। ঠোঁটের ফাঁকে অজান্তেই ‘ডাইনি’ শব্দটা বেরিয়ে আসে। মেয়েটা অবশ্য শুনতে পায়নি। সে একমনে মন্ত্র পড়েই চলেছে।
বৃত্তের অপর দিকটা অন্ধকার। সেখানে ধীরে ধীরে কিছু একটা ফুটে উঠতে শুরু করেছে। একটা কম্পমান মানুষের ছায়া শরীর। সেও বসে আছে মেয়েটার মতোই। অন্ধকারের মধ্যে যেন পেন্সিল দিয়ে মানুষের শরীরের আউটলাইন টানছে কেউ। মধু অনেকক্ষণ সেদিকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। ঠিক যেন একটা নীলচে আয়না মেয়েটার সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে কেউ!
ক্রমশ সেখানে যা ফুটে ওঠে সেটা দেখে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায় মধু। ওর মনের গভীর থেকে কেউ বলে ওঠে এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আর একটা মেয়ে বসে আছে সেই গোল বৃত্তের মাঝে। এবং সেই মেয়েটা…
দ্রুত পিছিয়ে আসে মধু। তারপর অন্য কোনওদিকে না তাকিয়ে দৌড়াতে থাকে গ্রামের রাস্তার দিকে। ওর বুকের ভেতরটা একটা তীব্র ভয়ের ধাক্কায় বরফ হয়ে গেছে। দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মেয়েটা একটু একটু করে ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরে তাকাচ্ছে ওর দিকে…
টিমটিম করে জ্বলছে প্রদীপটা। তার আলোয় মন্দিরের ভিতরের ছোট্ট ঘরটা আলোকিত হয়ে আছে। একদিকের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন মাধব ভট্টাচার্য। তার ঠিক অন্যদিকে হাঁটুর উপর হাত রেখে বসে গুপি। আজ সন্ধে আরতি শেষ করে মাধব ভট্টাচার্য ঠিক এইভাবেই বসেছেন। তারপর সেখান থেকে এতটুকু নড়েননি তিনি। মাঝেমধ্যে কেঁপে ওঠা প্রদীপের শিখার দিকে তাকাচ্ছেন, তারপর আবার নেমে আসছে তার চোখ। পাশেই খড়্গ হাতে কালীর মূর্তি। মিশকালো রঙ তাঁর।
গুপির শরীরে অস্বস্তি হয়েই চলেছে। সে কিছুতেই স্থির হয়ে বসতে পারছে না। চোখ বন্ধ করলেই কালকের দৃশ্যটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। অবাস্তব মনে হচ্ছে সমস্ত ঘটনাটা। অমন বীভৎস মৃতদেহ সে আগে কখনও দেখেনি। মনে পড়লেই একটা শিরশিরানি দলা পাকিয়ে উঠছে তার শরীরে।
‘তুই ঠিক দেখেছিলি তো গুপি, একটা মেয়েমানুষই ছিল?’
‘আমার সঙ্গে মণিও দেখেছে। শুধু তাই নয়, আকাশে কিছু একটা উড়ে যেতেও দেখেছে। হুশ করে এপাশ থেকে ওপাশ চলে গেল। সেটা অবশ্য আমি পুলিশকে বলিনি। আজ সকালে দিলুবাবু বলছিলেন পুলিশ গঙ্গাকে সন্দেহ করছে…’
উপরে নিচে মাথা নাড়ান মাধব ভট্টাচার্য, ‘সন্দেহ যে আগে আমারও হয়নি তা নয়। কিন্তু মন মানতে চায় না রে গুপি…’
গুপি অনেকক্ষণ থেকেই একটা প্রশ্ন করতে চাইছিল, এবার সেটা করেই ফেলে, ‘আপনি তো ছোট থেকে দেখছেন, কোনওদিন মনে হয়নি ও ভেতরে ভেতরে এমন কিছু হতে পারে?’
কপালের উপর একবার হাত চালান মাধব ভট্টাচর্য, ‘ছোট থেকে ঘরমুখো। আমার বাবা তখন এ মন্দিরের পুরোহিত। তখন দেখেছি ওর মা মন্দিরে আসতেন খুব। কয়েকবার ওকেও টেনে এনেছিলেন। ওর মুখ দেখে বুঝতাম এখানে আসতে খুব একটা ভালো লাগত না ওর…ওই বাইরে সিঁড়িতে বসে মাঝে মাঝে উঁকিঝুঁকি দিত ভেতরে।’
‘আপনার সঙ্গে কথা হয়নি কখনও?’
‘তেমন একটা না। তবে পশুপাখির সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই একটা বন্ধুত্ব ছিল ওর। মনে হত যেন কথা বলছে ওদের সঙ্গে। মন্দিরের চাতালে তখন কয়েকটা ছাগল বাঁধা থাকত। তাদের নিজে হাতে করে খাওয়াত। একবার একটা ছাগলকে খাওয়াতে গেছে আর অমনি ছাগলটা দৌড়ে পালিয়ে গেছে। শেষে আমিই দৌড়ে গিয়ে ধরে নিয়ে আসি ছাগলটাকে। সেদিন খানিক কথা হয়েছিল…’
স্মৃতিচারণ করতে বসলেন মাধব ভট্টাচার্য, ‘আর এক দিনের কথা খুব মনে পড়ে, জানিস। কোনদিন মনে নেই, তবে সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। বাবার ল্যাজে ল্যাজে ঘুরে বেড়াই। পুজো আচ্চার ধরন-ধারণ শিখি। বাবা কোথাও গেলে আমাকেও নিয়ে যান। একদিন বেশ সন্ধেরাতের দিকেই গঙ্গার মা মন্দিরে এসে হাজির। এ সময় কেউ বড় একটা মন্দিরে আসে না। বাবা নিজেই গোছগাছ করে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করছে। ওর মা বলল ওর শরীরটা নাকি হঠাৎ করে খুব খারাপ হয়েছে। বাবা বলল, শরীর খারাপ হয়েছে তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেই হয়। উনি আর কী করতে পারেন, কিন্তু ওর মা বলল, শরীর খারাপ নাকি এমন যা ডাক্তারে সরাতে পারবে না।
আমার একটু অবাকই লাগল। এই গ্রামের লোকজন কিছু হলেই আগে গুণিন ওঝার কাছে ছোটে। পুরোহিতের কাছে আসাটা খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার না। বাবার সঙ্গে আমিও গেলাম গঙ্গার বাড়ি। আমাকে কিন্তু বাবা দরজার কাছেই দাঁড় করিয়ে রাখল। বাইরে থেকে শুনে যেটুকু বুঝতে পারলাম, তাতে মনে হল গঙ্গার রোগ শরীরে নয়। মাথাতে।
শুনলাম ক’দিন হল তার নাকি জ্বর হয়েছিল। এমন সময় হঠাৎ তেড়েফুঁড়ে উঠে কাকে যেন আক্রমণ করে সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পথচলতি মানুষকে আঁচড়ে কামড়ে দিতে থাকে। একটা ঘরে বন্ধ করে দেওয়ায় নিজেই নিজের শরীরে আঁচড় কাটতে থাকে। সারা শরীর একেবারে রক্তারক্তি করে ফেলেছে আঁচড়ে কামড়ে। একটা পোষা কুকুর ছিল গঙ্গার। কুচকুচে কালো কুকুর। তার আবার একটা পা ভাঙা ছিল। সেই কুকুরটাকেও নাকি আঁচড়ে কামড়ে শেষ করে ফেলেছে। শেষে বাড়ির লোক যখন বুঝতে পারে যে-কোনও সময় ভয়ংকর কিছু একটা করে বসবে তখন বাবার কাছে এসে উপস্থিত হয়।’
‘মাথার রোগই তো মনে হচ্ছে!’
‘কিন্তু মাথার রোগ এমন দুম করে হয়? তিনদিনের জ্বরে?’
‘তাও বটে, কিন্তু উনি কী করলেন?’
পুরোহিতমশাই যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন ঘটনাটা। মাথার তেল চকচকে টাকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘কী করলেন তা জানি না, বাবা এই নিয়ে আর কোনওদিন কোনও কথা বলেননি আমাকে। কিন্তু সেদিনের পর থেকেই গঙ্গা কেমন যেন বদলে যায়। আমি পরদিন দেখতে গেছিলাম ওকে। দেখি ততক্ষণে গঙ্গা শান্ত হয়ে গেছে। সে শান্তি যেন শ্মশানের শান্তি। দেখে মনে হল শরীরের উপর দিয়ে একটা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। সেই ঝড়েই ওর অনেকটা খাবলে নিয়ে গেছে। সারা শরীরে নিজের নখের কাটাকুটির দাগ, চুল উসকো-খুসকো, গায়ে হাতে পায়ে এলোমেলো রক্ত লেগে আছে। বিশেষ করে কপালে নখ দিয়ে একেবারে ফালাফালা করে দিয়েছে। আমাকে দেখে জানি না কেন কাঁদতে শুরু করল। খুব…খুব কাঁদল…আমার হাতদুটোকে জাপটে ধরে একেবারে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল…’
‘আপনার সঙ্গে তো তেমন পরিচয় ছিল না, তাও কাঁদল?’
‘সেটাই আশ্চর্যের। তখন আমার খানিক ভয়ও লেগেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ভারি মায়া হল, জানিস? বড্ড অসহায় মেয়েটা। বাপ-মা তেমন ভালোবাসে না, খেয়াল রাখে না। একা একাই ঘুরে বেড়ায়। না জানি, কী মাথার ব্যামো ঢুকেছে ওর ভেতরে। আমি একবার বলেছিলাম মাথার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি। তবে সেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেলা মেয়েটা যে ডাইনি হয়ে গেছে তা আমার বিশ্বাস হয় না।’
কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল গুপি। ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে একটা ফ্যাসফ্যাসে গলা ভেসে আসে। ওরা দুজনেই দরজার দিকে মুখ বাড়ায়। তিনটে ছায়া মূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। তাদের মধ্যেই একজন ডাক দিয়েছে।
পুরোহিতমশাই গলা তুলে বলেন, ‘ভেতরে এসো…’
ছায়াগুলো কয়েক পা এগিয়ে আসতে ওদের চিনতে পারেন মাধব ভট্টাচার্য। প্রভাকর, হরি আর জগন্নাথ। প্রভাকরকে ভালো করেই চেনেন পুরোহিতমশাই। ক’মাস আগে যে শেষ বাচ্চাটা গ্রাম থেকে উধাও হয়েছে সেটা প্রভাকরের ছিল। একেবারে নাকি চোখের সামনে থেকে তুলে নিয়ে গেছে বাচ্চাটাকে।
এই মুহূর্তে ঘরের কম্পমান আলোকশিখায় প্রভাকরের মুখ হিংস্র দেখায়। বাকি দুজনকে অবশ্য ভালো করে চেনেন না পুরোহিতমশাই। তবে মনে হয়, আগে বারকয়েক দেখেছেন।
গুপি লক্ষ করে প্রভাকরের চোখ ধিকিধিকি জ্বলছে। যেন হিংস্র আগুন ঝরছে সেখান থেকে। পুরোহিতমশাই হাত তুলে ইশারা করেন, ‘বসো প্রভাকর।’
প্রভাকর কথা না বাড়িয়ে বসে পড়ে। ওর পেছনের দুজনও ওর সঙ্গে বসে। অন্যজনকে এবার চিনতে পারেন পুরোহিতমশাই। জগন্নাথ। আজ থেকে বছরদশেক আগে ওর ছেলেকে ডাইনিতে তুলে নিয়ে যায় বলে শোনা যায়। মাসখানেক পরে সেই শোকে ওর বউও জলে ডুবে মরে। এতদিনে জগন্নাথের স্বাস্থ্য আরও ভেঙে পড়েছে। তবে ক্রোধ আর প্রতিহিংসাও বেড়ে উঠেছে তার চেয়েও বেশ কয়েকগুণ।
কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে মাধব ভট্টাচার্য জিগ্যেস করেন, ‘পুলিশ কী বলল?’
এদের মধ্যে প্রথাগত শিক্ষা প্রভাকরেরই বেশি। গ্রামের লোক তাকে মান্যিগণ্যি করে, সেই জবাব দিল, ‘কী আর বলবে, ওরা চেষ্টা করছে…এছাড়া আর কী বলার আছে ওদের?’
‘পুলিশের কাজকর্মের উপর ধৈর্য হারিও না, প্রভাকর। ওদের কাজ এগোয় ধীরে, কিন্তু ওটাই একমাত্র…’
‘দেখুন মাধববাবু, এসব ফলটল আমাদের আর কিছু চাই না। এবার যা করার আমরাই করব। আপনি গ্রামের গুরুজন…তাই আপনার থেকে অনুমতি নিতে এসেছি।’
‘করবে মানে? কী করতে চাইছ তোমরা?’
‘যা অনেকদিন আগে করা উচিত ছিল।’ জগন্নাথ উত্তর দেয়, ‘এ গ্রামে সবাই জানে ওই বাচ্চা চুরি কার কীর্তি। শুধু কেউ দিনমানে ভয়ে বলতে পারে না। তার মানে এই নয় যে আমরা সব মেয়েছেলে হয়ে বসে থাকব…’ কথাটা বলে জিভে অস্বস্তি হয় জগন্নাথের। ওর সামনেই কালীমূর্তি খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে। ও চুপ করে যায়। বাকিটুকু প্রভাকর বলে, ‘জগন্নাথের বউ স্পষ্ট দেখেছিল গঙ্গাকে। তখন আমরা কেউ বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এতগুলো লোক বলছে যখন। তাছাড়া পুলিশ তো আর এমনি এমনি বলেনি গঙ্গার বাড়ি তল্লাশ করবে!’
‘বেশ, তো করুক না। তার জন্য তো একটু অপেক্ষা করতে হয়।’
‘আপনার মনে হয়—পুলিশ কবে তল্লাশ করবে, তার জন্য ওসব সাক্ষ্য প্রমাণ ওই ডাইনি বাড়িতে সাজিয়ে রেখে দেবে? এত বোকা ভাবেন ওকে?’
গুপির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেন পুরোহিতমশাই। সে স্তব্ধ হয়ে প্রভাকরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘গঙ্গা যে সত্যিই ডাইনি তা তোমরা নিশ্চিত হলে কী করে? জগন্নাথের বউ ভুল দেখে থাকতে পারে।’
‘ওই ওকে জিগ্যেস করুন না…’ গুপির দিকে আঙুল নির্দেশ করে প্রভাকর, ‘কাল রাতে ও গঙ্গাকে দেখেনি? জানলা ভেঙে বেরিয়ে যেতে?’
‘ও কাউকে একটা বেরিয়ে যেতে দেখেছে। সেটা একটা নারী মূর্তি হলেও হতে পারে। গঙ্গাকে দেখেছে এ কথা ও একবারও বলেনি।’
‘আপনি তার মানে আমাদের অনুমতি দেবেন না?’
‘কীসের অনুমতি চাইছ সেটা আগে জানতে হবে আমাকে।’
‘ডাইনিদের সঙ্গে যা করা উচিত…’
পুরোহিতমশায়ের মুখে ছায়া নামে। মুখ নামিয়ে নেন তিনি। তারপর বলেন, ‘এ গ্রামে এমন অনেক মানুষ আছে যারা গঙ্গাকে ভালোবাসে। এ গ্রামের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে ও একজন। এত লোকের উপকার করেছে। কারও কারও প্রাণও বাঁচিয়েছে হয়ত। তাদের কী জবাব দেবে তোমরা?’
‘তাদের কারো বাচ্চা খোয়া যায়নি পুরুমশাই! তাদের কারও বাড়িতে বাচ্চা নেই। যাদের খোয়া গেছে তাদের কষ্ট তারা বুঝবে কেন? আমার বউয়ের চোখের সামনে থেকে আমার বাচ্চাকে তুলে নিয়ে গেছে। আমার অতটুকু মেয়েটাকে ভালো করে কাঁদতে পর্যন্ত দেয়নি…’ কথাটা বলতে গিয়ে প্রভাকরের গলা কেঁপে যায়।
সমীরণ মিত্রের সঙ্গে হরির হৃদ্যতা ছিল। বন্ধু আর বন্ধুর বউয়ের বীভৎস শরীরটা দেখে ক’দিন রাত্রে ঘুমাতে পারেনি ও। এবার ওর ধরা গলা শোনা যায়, ‘আমার ভাইয়ের শরীরে ছত্রিশবার বার ছুরি মেরেছে। বউদিকে পেটে কাঁধে গলায় যেখানে পেরেছে এলোপাথাড়ি ছুরি মেরেছে। আমি ওকে ছাড়ব না পুরোহিতমশাই!’
‘পুলিশ কিছু করবে না। ওরা কিছু খুঁজে বের করতেও পারবে না। আর যতদিন না কোনও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, দিলুবাবুও গঙ্গাকে গ্রাম ছাড়া করতে পারবেন না। আমরা নিজে থেকে যদি কিছু না করি এ গ্রাম থেকে আরও বাচ্চা উধাও হবে, এই আমি বলে রাখলাম পুরোহিতমশাই!’ প্রভাকর মাটির উপর একটা চাপড় মেরে বলে। ওর সমস্ত মুখ ঘামে ভেজা। উত্তেজনায় কপালের শিরা ফুলে উঠছে কথা বলতে গিয়ে।
গুপি এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। তার দিকে এগিয়ে যায় প্রভাকর, ‘কীরে, তুই কিছু করবি না? নিজেই তো দেখলি—।’
গুপি উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে।
‘হ্যাঁ, তুই কেনই বা করবি?’ ভর্ৎসনা করে প্রভাকর, ‘আমাদের বুকের ভেতরে কী চলছে তুই আর বুঝবি কেন?’
কথাগুলো গুপিকে উদ্দেশ্য করে বললেও পুরোহিতমশায়ের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করে শব্দগুলো। তিনি উঠে দাঁড়ান। গলা চড়িয়ে বলেন, ‘তোমরা যা করবে বলছ সেটা করলে পুলিশ তোমাদের ছেড়ে দেবে? ইতিমধ্যে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে, এর মাঝখানে তোমরা গিয়ে যদি একজনকে তুলে আনো তার বাড়ি থেকে, তাহলে তোমরাও কিন্তু আইনের চোখে অপরাধী হয়ে যাবে, এই আমি বলে দিলাম…’
‘দেখুন পুরোহিতমশাই, আইনকানুন কিছু বোঝাবেন না। আগে গ্রামের বাচ্চাগুলো বাঁচুক, আপনি আমি বাঁচি, তারপর ওইসব আইন দেখাতে আসবেন!’
‘আর আপনি আইনের কথা কী বলছেন? আপনি না মা কালীর পুজো করেন? অন্যায়ের সংহার করা আপনার ধর্মে লেখা নেই?’
‘গঙ্গা যে অন্যায় করেছে তা তুমি প্রমাণ করতে পারবে?’
‘আজ না হোক কাল পারব!’
‘বেশ, তাহলে যতদিন না সেই প্রমাণ বের হচ্ছে ততদিন অপেক্ষা করো।’
হঠাৎ করেই একটা বাঁকা হাসি হাসে জগন্নাথ। উগ্র প্রতিহিংসা ছাড়া লোকগুলোর মুখে আর কোনও অনুভূতি নেই। এরা হাতের সামনে যাকে পাবে তাকেই শত্রু ভেবে ধ্বংস করবে।
বিরক্ত গলাতেই বলেন মাধব ভট্টাচার্য, ‘তোমরা যা পারো করো, কিন্তু আমার অনুমতি কিছুতে পাবে না!’
গুপির দিকে একবার তাকিয়ে মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে আসেন পুরোহিতমশাই, ‘এখন তোমরা এসো। আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।’
‘বেশ, আমরা চলে যাচ্ছি, কিন্তু আপনি একটু আসতে পারবেন আমাদের সঙ্গে?’ প্রভাকর বলে।
‘কোথায়?’
‘আসুন না, বেশিক্ষণ লাগবে না। দশ মিনিট। গুপি তুইও চল।’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়ায় ওরা দুজনে। পাঁচজনে মন্দির ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। প্রভাকর ওদের দুজনকে হাতের ইশারা করে জঙ্গলের দিকটা দেখিয়ে বলে, ‘এই যে, এই দিকটায় আসুন—।’
রাতের অন্ধকার এখন আরও জমাট বেঁধেছে। জঙ্গলের ভিতরে কোনও পাখপাখালির শব্দ নেই। কেবল ওদের হাতে ধরা টর্চ মাটির উপর পড়ে সামনের কিছুটা অংশ আলোকিত করছে। সেই আলোতেই পথ হাঁটছে ওরা পাঁচজন। ঝিঁঝি ডাকছে একটানা। বাকি সব আওয়াজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
জঙ্গলের সরু রেখা পেরিয়ে ঢুকতেই মাধব ভট্টাচার্যের বুকের ভিতরটা কেমন শীতল হতে শুরু করে। কোথায় নিয়ে চলেছে ওরা? একটু আগেই ওদের মুখের উপর না বলে দিয়েছেন তিনি। লোকগুলো রগচটা, এবং এইমুহূর্তে ভীষণ রকম প্রতিহিংসাপরায়ণ! কী যে করতে পারে ঠিক নেই। গুপির গায়ে অবশ্য জোর আছে। তবে ওরা তিনজনে একসঙ্গে অস্ত্র নিয়ে চড়াও হলে সে আদৌ সামলাতে পারবে কিনা কে জানে!
মিনিটদশেক জঙ্গলের রাস্তায় হাঁটার পর টর্চগুলো নিভিয়ে ফেলে প্রভাকরের দলবল। পুরোহিতমশাই অবাক হয়ে লক্ষ করেন জঙ্গলের গভীরে একটা ছোট জায়গায় জনাদশেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে তাদের মুখ ঢাকা। ভালো করে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এরা সবাই প্রভাকরের দলের লোকজন। তবে এরা মুখ দেখাতে চায় না। যেন জঙ্গলের ভিতরে জটলা করেছে তারা কোনও বিশেষ উদ্দেশে। ব্যাপার কী? এরা দল বেঁধে ডাকাতি করতে যাবে নাকি?
দলের মধ্যে একজনকে আঙুল তুলে নির্দেশ দেয় প্রভাকর, ‘যা বলেছিলাম রে মনা, পুরোহিতমশাই রাজি হচ্ছেন না। তাই ওনাকেই দেখাতে নিয়ে এলাম…’
অপরজন কোনও শব্দ করে না। সম্ভবত নিজের পরিচয় গোপন রাখতেই। পুরোহিতমশাই লক্ষ করেন এদের সবার হাতেই কিছু না কিছু অস্ত্র আছে। কারো হাতে দা, কারো হাতে কুড়ুল, আবার কোথাও বা সাধারণ লাঠি জাতীয় কিছু। কিন্তু এত লাঠিসোটা নিয়ে এরা কি গঙ্গাকে ধরতে যাবে?
প্রভাকরকে একটা ছোট ধাক্কা দেন পুরোহিতমশাই, ‘এসব কী করেছ তোমরা? তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
‘মাথা খারাপ হতে এখনও খানিকটা বাকি আছে পুরোহিতমশাই। এ তো কিছুই নয়…’
হাত ধরে টেনে ওদের দুজনকে আরও কিছুদূর নিয়ে আসে ওরা। একটা চাপা ঘরঘর আওয়াজ কানে আসে ওদের। আর সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিতমশায়ের বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে।
তিনি কিছু বলে ওঠার আগেই হাতের টর্চের আলোটা জ্বেলে সামনে ফেলে প্রভাকর। একটা গাছের গুঁড়ির ওপর গিয়ে পড়েছে আলোটা। সেই আলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটা মানুষের শরীর। গাছে বাঁধা আছে শরীরটা। তার সর্বাঙ্গের বস্ত্র ছেড়া, কেবল অন্তর্বাসটুকু লেপ্টে আছে শরীরে। কয়েকটা মাঝবয়সি গ্রাম্য লোক মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় মেয়েটার সেই নগ্ন দেহের ছবি তুলছে। তাদের পরনে কেবল গামছা। মাঝে মাঝেই হেসে উঠছে তারা। কখনও এগিয়ে গিয়ে চড় মারছে মেয়েটার গালে। সে ককিয়ে উঠছে।
মেয়েটার মুখটা শক্ত কাপড় দিয়ে বাঁধা। শরীরে অসংখ্য আঘাতের ক্ষতচিহ্ন। পায়ের ঠিক নিজেই পড়ে আছে একটা কালো বিড়ালের শরীর। কোনও একটা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ফালাফালা করা হয়েছে শরীরটাকে। বোঝা যাচ্ছে বাঁধা মানুষটার চোখের সামনেই খুন করা হয়েছে তার আদরের পোষ্যকে। মেয়েটার চোখে জল আর লেপ্টে যাওয়া কাজলের দাগ।
পুরোহিতমশাইয়ের হতভম্ব মুখ থেকে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে আসে, ‘মৌলি!’
