জামাই – নরেন্দ্রনাথ মিত্র
গভর্নমেন্ট প্লেসের বড় অফিস বাড়িটার সামনে দশটা বাজতে না বাজতেই পানের পুঁটলি নিয়ে এসে বসল প্রমদা। এত সকালে বাবুরা পান খায় না। অন্য কেউ এসে যে তার জায়গা দখল করে বসবে তেমন আশঙ্কাও নেই। তবু প্রমদা সকাল-সকালই আসে। বিক্রী তেমন হোক আর না হোক অফিসের সামনে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঠায় বসে থাকে। বয়স বছর পঁয়তাল্লিশেক হবে। কিন্তু চেহারাটা আরো বেশি বুড়ি বলে মনে হয়। চুলে পাক ধরেছে। রোগা লম্বা দেহটা নুয়ে পড়েছে সামনের দিকে। বেশ-বাসের ওপর কোনরকম লক্ষ্য নেই। চুলপেড়ে শাদা একখানা আধময়লা ধুতি পরনে! গায়ে কোথাও কোন গয়না নেই। অথচ একটু যত্ন নিলে দেহ এখনো সুন্দর দেখায় প্রমদার, লক্ষ্য করলে চোখে-মুখে বিগত যৌবনশ্রীর এখনো কিছুটা আভাস মেলে।
ভাগ্য ভালো। অফিসে ঢুকবার আগে চবিবশ-পঁচিশ বছরের দুজন যুবক আজ সামনে এসে দাঁড়াল।
একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘মিঠে পান হবে?’
‘হবে বাবা।’
‘তাহলে দাও দুটো।’
সঙ্গীটি বলল, ‘আঃ, আবার আমার জন্যে নিচ্ছ কেন সুকুমার? আমি পান খাব না।’
সুকুমার বলল, ‘আহা, খাও না শুভেন্দু, বেশ ভালো পান।
শুভেন্দু বলল, ‘তাহলে দাও। কিন্তু জর্দা-টর্দা দিওনা যেন।’
প্রমদা পান সাজতে-সাজতে যুবক দুটির দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, ‘জর্দা না খেলে দেব কেন বাবা।’
সুকুমার বলল, ‘আমারটায় দাও। ওরটায় দিয়ো না। খাওয়া তো ভালো, জর্দার নাম শুনলেই আমাদের শুভেন্দুর মাথা ঘোরে।’
শুভেন্দু বাধা দিয়ে বলল, ‘আঃ, কি হচ্ছে। তাড়াতাড়ি সেরে নাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
দাম চুকিয়ে দিয়ে সুকুমার একটু সরে এসে সিগারেট ধরাল।
শুভেন্দু বলল, ‘পানওয়ালীদের মুখে অমন বাবা শুনতে আমার বড় খারাপ লাগে।’
সুকুমার একটু হেসে বলল, ‘কি করবে বলো, ওর বাবু ডাকবার বয়স তো আর নেই।’
শুভেন্দু লজ্জিত হয়ে বলল, ‘যাঃ। কিন্তু বয়স না থাকলেও তাকাবার ভঙ্গিটি প্রায় তেমনি আছে। পান সাজতে-সাজতে আমাদের মুখের দিকে কি রকম করে বার-বার চাইছিল দেখলে তো?’
সুকুমার বলল, ‘দেখছি। শুধু তোমার মুখের দিকে নয়, তোমার আমার বয়সী সকলের মুখের দিকেই ও অমনি করে তাকায়। কিন্তু তুমি যা ভাবছ তা নয়। প্রমদা ওর জামাইকে খোঁজে।’
হাসতে গিয়ে সুকুমার হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
শুভেন্দু বিস্মিত হয়ে বলল, ‘জামাই মানে?’
গলাটা একটু চড়ে গিয়েছিল শুভেন্দুর। সুকুমার তার দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘আস্তে হে আস্তে। শুনতে পাবে। চল, এবার ভিতরে চল।’
রাস্তা পার হয়ে দুই বন্ধু অফিসে ঢুকল। একদল মেয়ে ঢুকল তারপর। তাদের পিছনে-পিছনে আর-একদল ছেলে। প্রমদা পান সাজা থামিয়ে তাদের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে একটুকাল তাকিয়ে রইল, তারপর ফের নিজের কাজে মন দিল। শুনতে সে পেয়েছে। চোখের মত কানও আজকাল তীক্ষ্ণ হয়ে গেছে প্রমদার। কে কি বলে না-বলে সব সে বুঝতে পারে। প্রমদা সব দ্যাখে, সব শোনে, সব টের পায়। লোকে ভাবে আগের মত এখনো বুঝি তার মাথা খারাপই আছে। ওদের ভুল। প্রমদার মাথা অনেক দিন হল ফের ঠিক হয়ে গেছে। আজকাল তার সব মনে পড়ে।
মনে পড়ে সেই কৃপানাথ দে-র গলি। দোরের সামনে রাতের পর রাত সেই আগন্তুকের জন্য অধীর প্রতীক্ষায় দাঁড়ান। শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই, বর্ষা-বাদল নেই, পথে এসে দাঁড়াতেই হবে। মাস-মাস ভাড়া না পেলে বাড়িওয়ালী ছাড়ে না। পোড়া পেটের তাগিদও কি কম। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত না প্রমদাকে। মানদা-মোক্ষদাদের তুলনায় ওর ঘরে লোকজন ঘন-ঘনই আসত রূপ স্বাস্থ্য বয়স বুদ্ধি দলের মধ্যে তারই সবচেয়ে বেশি ছিল। নিত্য নতুন ধরনের সাজসজ্জা করত প্রমদা। সিঁথিতে কপালে সিঁদুর লেপে শাঁখা চুড়ি পরে কোনদিন কুলবধূ হত, কোনদিন বা কুমারীর বেণী পিঠে লুটিয়ে পড়ত।
মানদা মুখ ঘুরিয়ে বলত, ‘ঢং! তুই থিয়েটারে গেলেই পারিস। এখানে পড়ে মরছিস কেন।’
মালতী বলত, ‘সোনাগাছিতে চলে যা। ছ’বছর বাদে বড় রাস্তার ওপর বাড়ি তুলতে পারবি। এই এঁদো গলিতে পড়ে মরছিস কেন।’
প্রমদা হেসে জবাব দিত, ‘তোদের জ্বলে মরা দেখব বলে!’
তারপর তেইশ বছর বয়সে বকুল কোলে এল প্রমদার। বাড়িওয়ালী বলল, ‘এতদিনে তোর দুঃখ ঘুচলো পেরমো। পেট থেকে পড়তে না-পড়তেই যা চোখ-মুখ বেরিয়েছে, তোর চেয়ে লাখো গুণে রূপসী হবে। সারাজীবন পায়ের ওপর পা তুলে নিশ্চিন্তে খেতে পারবি।’
মোক্ষদা বলল, ‘একেই বলে ভাগ্যি। আমাদের ঘরে ব্যাটাছেলে পাঠিয়ে ভগবান ওকেই মেয়ে দিলে। দেবে না? সে-ও তো একচোখো পুরুষের জাত। সুন্দর মুখ দেখলে সে-ও ভোলে।’
কিন্তু সবাই যা ভেবেছিল তা হল না। বকুলের বছর সাতেক বয়স হতে না হতেই তাকে নিয়ে কৃপানাথ দে-র গলি ছেড়ে চলে এল প্রমদা। সোনাগাছিতে রূপাগাছিতে নয়, বেলগাছিয়ার বস্তিবাড়িতে এসে বাসা বাঁধল।
নিজের পেশার ওপর তার অপ্রবৃত্তি জন্মে গেছে। দু-দুবার যথাসর্বস্ব চুরি হয়েছে প্রমদার। একবার হতাশ প্রেমিকের ছোরার মুখ থেকে বেঁচেছে। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে প্রমদার। এ-পথ আর নয়। পথে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সামনের দোতলা বাড়ির অল্পবয়সী বউটির স্বামী-শাশুড়ী-ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের ঘরকন্না দেখতে-দেখতে প্রমদা মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করেচে—তার বকুলকে কিছুতেই সোনাগাছিতে পাঠাবে না সে, বোসেদের বউয়ের মতই একটি সোনার সংসার বকুলকে সে গড়ে দেবে।
বেলগাছিয়াতে এসে সধবার বেশ ছেড়ে ফেলল প্রমদা। পুরুষ সঙ্গে না থাকলে শাঁখা-সিঁদুর নিয়ে অনেক কৈফিয়তের তলায় পড়তে হয়। তার চেয়ে শাদা থান আর শাদা সিঁথিতে আপদ কম। একেবারে অনাথা বিধবা সাজল প্রমদা। এই বয়সেই সব সোহাগ, আহ্লাদ, সাজসজ্জা ছেড়ে ফেলতে প্রথমটায় অবশ্য খুবই কষ্ট হল। কিন্তু মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রমদা নিজেকে সান্ত্বনা দিল। ওর সিঁথিতে সত্যিকারের সিঁদুর তুলে দেওয়ার জন্যে নিজের লোক-দেখানো সিঁদুরের দাগ না-হয় মুছেই ফেলল প্রমদা। তাতে দুঃখ কিসের।
বস্তিতে সবাই গৃহস্থ নয়। আধা-গৃহস্থও কয়েক ঘর আছে। দিন দুপুরে, রাত-দুপুরে ভুল করে কেউ কেউ প্রমদার দোরে এসেও হানা দিতে লাগল। কিন্তু ফের কোন ফাঁদে পা দেওয়ার মত মেয়ে নয় প্রমদা। জীবনে তার শিক্ষা কম হয়নি।
কয়েক পা এগিয়েই পাইকপাড়া। সেখানে ডাক্তার বাবুদের বাড়িতে ঠিকে-ঝির কাজ নিল প্রমদা। বাসন মাজে, বাটনা বাটে, বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা কাঁদলে কোলে তুলে নেয়। আর মনে-মনে স্বপ্ন দ্যাখে, নিজে ঝি-গিরি করলেও বকুলকে সে এমনি একটি বড়লোকের বাড়ির বউ করে পাঠাবে।
শুধু ঝি-গিরির পয়সায় সংসার চলে না। যুদ্ধের বাজারে জিনিসপত্রে আগুন লেগেছে। দুপুরবেলায় পানের পুঁটলি নিয়ে প্রমদা অফিস-আদালতের সামনে গিয়ে বসে। বিক্রি মোটামুটি মন্দ হয় না। অফিসের বাবুরা অনেকেই এসে ভিড় করে দাঁড়ায়, চুনের বোঁটা হাতে নিয়ে গল্প করে।
একদিন ডাক্তারবাবু বললেন, ‘তোমার মেয়ে তো বেশ চালাক চতুর দেখছি। লেখাপড়া শিখল কোথায়? ওকে স্কুলে দিয়েছ নাকি?’
প্রমদা লজ্জিত হয়ে বলল, না বাবু। বস্তির সামনে নিমাই মুদির দোকান আছে। বই-খাতা নিয়ে সেখানে যায়। পড়াশুনো পেলে বকুল আর কিছু চায় না। দিনরাত বই নিয়ে থাকে। রামায়ণ- মহাভারত ওর মুখস্থ।
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘শুধু রামায়ণ-মহাভারত কেন। ও আরো অনেক বই পড়েছে! ওকে এবার ভালো একটা ইস্কুল-টিস্কুল দেখে ভর্তি করে দাও প্রমদা। মুদির দোকানে ফেলে রেখ না। তোমার মেয়ে দেখতে তো অমনিতেই সুন্দরী। লেখাপড়াটা যদি ভালো করে শেখে ওর বিয়ের জন্যে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। যে দেখবে সে-ই ওকে পছন্দ করবে!’
প্রমদা আধখানা ঘোমটার আড়াল থেকে অস্ফুটস্বরে বলল, ‘সে আপনাদের আশীর্বাদ, কর্তা!’
শ্যামবাজারে ডাক্তারবাবুর জানা মেয়ে-স্কুল আছে। সেখানে আধা-মাইনেতে বকুলকে ভর্তি করে দিল প্রমদা। স্কুলে পুরো নাম জিগ্যেস করায় বলল, বকুলমালা দাসী।’
পরদিন বকুল এসে বলল, ‘আজকাল আর মেয়েরা দাসী লেখে না মা। আমাদের ক্লাসের দিদিমণি রেজিস্টার খাতায় আমার নাম বকুলমালা দাস লিখে নিয়েছেন।’
প্রমদা চমকে উঠে বলল, ‘রেজিস্টার। সে আবার কি রে।’
বকুল হেসে বললে, বাঃ রে। রোজ যে নাম ডাকা হয় ক্লাসে। স্কুলে গেলাম কি গেলাম না তার হিসেব রাখার জন্যে নামের খাতা আছে প্রত্যেক ক্লাসে।’
প্রমদা আশ্বস্ত হয়ে বলল, ‘ও।’
ক্লাসের পর ক্লাস ডিঙিয়ে চলল বকুল। ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরল। স্কুল ছেড়ে কলেজ।
বস্তির সবাই বলল, ‘আর কেন, এবার মেয়ের বিয়ে দাও।’
প্রমদা বলল, ‘আমি তো অনেক দিন ধরেই বলছি। কিন্তু মেয়ে যে কথা শোনা না।
কত সম্বন্ধ এলো, কত সম্বন্ধ হাত-ছাড়া হল, কিন্তু বকুল কিছুতেই বিয়ের প্রস্তাবে সায় দিল না।
প্রমদা একদিন মেয়েকে ডেকে বলল, ‘তুই কি ভাবলি বল দেখি। বিয়ে-থা ঘর-গেরস্থালি করবি নে?’
বকুল বলল, ‘না মা, এই বেশ আছি।’
প্রমদা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এই বেশ আছি! তুই দিনরাত বই নিয়ে পড়ে থাকবি আর আমি জীবন-ভর পরের বাড়িতে দাসীগিরি করব, রাস্তায় বসে পান বেচব, এই বুঝি তোর ইচ্ছে?’
বকুল কালো ব্যথাভরা চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল, ‘আমি তো তোমাকে বলেছি মা, ওসব কাজ ছেড়ে দাও।’
প্রমদা রাগ করে বলল, ‘কেবল ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও। ছেড়ে দিলে চলবে কি করে শুনি? দু-বেলা অন্ন জুটবে কি করে?’
বকুল বলল, ‘আমি ট্যুইশন করব মা, চাকরি-বাকরি জুটিয়ে নেব। তবু তোমাকে ও-সব কাজ করতে দেব না।’
তারপর সত্যিই যখন বকুল একটা স্কুলের মাস্টারির খবর আনল, প্রমদা বাধা দিয়ে বলল, ‘উঁ, তা হবে না। তার চেয়ে তুমি যা করছিলে তাই কর বাপু। পাস-পরীক্ষা শেষ করো। ভাতের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।’
বকুল বলল, ‘কিন্তু রাস্তায় বসে পান বিক্রি করতে তোমাকে আর আমি দেব না মা। কলেজে তো আমার মাইনে লাগে না। প্রিন্সিপাল যে ট্যুইশনটা আমাকে জুটিয়ে দিয়েছেন, তাতে সংসারের অনেক খরচ আমাদের চলে যাবে। তারপর বি.এ. টা পাস করে কোন অফিস টফিসে ঢুকতে পারলে যা আনব, কষ্টেসৃষ্টে আমাদের দুজনের তাতেই চলবে। তোমাকে আর আমি কষ্ট করতে দেব না।’
মেয়ের মুখের দিকে মমতাভরা চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রমদা বলল, ‘দূর পাগলী। আমার আবার কষ্ট কিসের। তোকে পেয়ে আমি সব দুঃখ ভুলেছি।
বি. এ. পাশ করবার কিছুদিন বাদেই চাকরি জুটিয়ে নিল বকুল। আগে থেকেই চেষ্টা-চরিত্র করছিল। কলেজের এক প্রফেসরের স্বামী সরকারী অফিসে ভাল চাকরি করেন। সেখানেই কাজ জুটল বকুলের।
পান বিক্রি আগেই বন্ধ হয়েছিল, চাকরি পাওয়ার পর ডাক্তারবাবুর বাড়িতে ঝি-গিরিও আর মাকে করতে দিল না বকুল।
প্রমদা বলল, ‘কেন, পেটের জন্য তুই খাটবি আর আমি খাটতে পারব না? আমার কি গতর গেছে?’
বকুল বলল, ‘ও-কথা কেন বলছ, মা। এতকাল তো তুমি আমাকে খাইয়ে-পরিয়ে মানুষ করেছ। এবার তুমি বিশ্রাম করো। নিজের ঘর-সংসার দ্যাখ।’
প্রমদা বলল, ‘ঘর-সংসার না ছাই। তোর বিয়ে হবে, জামাই আসবে , কোল ভরে ছেলেমেয়ে আসবে—তবে তো আমার সংসার। তার আগে আমার সংসার কিসের রে?’ বলে মেয়ের দিকে তাকাল প্রমদা। একুশ-বাইশ বছরের সোমত্ত মেয়ে। কিন্তু বিয়ের কথায় ওর মুখে রং লাগল না। চোখের পাতা লজ্জায় আনন্দে নেমে এলো না।
বকুল আর কোন কথা না বলে চোখ নামিয়ে নিল। একটু বাদে সে উঠে চলে যাচ্ছিল, প্রমদা তাড়াতাড়ি তার হাত চেপে ধরে ব্যাকুল স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ জানি। কিন্তু তাতে তো তোর কোন দোষ নেই , তুই যে আমার পাকের পদ্ম, বকুল। সেই দুঃখে তুই কেন বিয়ে করবি নে?’
বকুল বলল, ‘আমার কোন দুঃখ নেই, মা। আমার জন্যে তুমি ভেবনা, আমি বেশ আছি।’
এবার বকুল উঠে গিয়ে কালো মলাটের একখানা ইংরেজী মোটা বই খুলে বসল। দুঃখে বুক ভেঙে যেতে লাগল প্রমদার। মেয়েরা হৈ-চৈ করে, কত আনন্দ আহ্লাদ করে, কিন্তু বকুল সেই এগারো-বারো বছর বয়স থেকেই ভারি গম্ভীর, ভারি বিষণ্ণ। বকুল প্রথম-প্রথম তার বাপের খোঁজ করেছে, কাকা, মামা, দাদাদের খোঁজ করেছে। প্রমদা মেয়েকে বুঝিয়েছে, তারা কেউ বেঁচে নেই। বকুল তবু অবুঝের মত জিজ্ঞাসা করেছে, ‘মা, কি অসুখে মরল বাবা? শীলা-লীলাদের মত আমার কি জ্যাঠামণি ছিল? তাঁর কি নাম ছিল মা?’
ধৈর্যের সীমা আছে সকলেরই। প্রমদাকেও একসময়ে বিরক্ত হয়ে বলতে হয়েছে, ‘রাতদিন অত আমি বকতে পারি নে বাপু, যা বলেছি, বলেছি। আর আমি কিচ্ছু জানি নে।’
কিন্তু প্রমদা না জানালে কি হবে, বকুল ক্রমে ক্রমে সবই জেনেছে। বস্তিতে কুটকচালো লোকের তো অভাব নেই। তাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে, ইশারা-ইঙ্গিতে সবই বুঝতে পেরেছে বকুল। ঝগড়ার সময় প্রতিবেশিনীদের ভাষা আরও স্পষ্ট, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। বকুলের খেলার সঙ্গীরা পর্যন্ত খোঁটা দিয়েছে, ‘বেশ্যার মেয়ে, তোর বাপের ঠিক নেই! তুই কেন খেলতে আসিস আমাদের সঙ্গে?’
প্রমদা ঝাঁটা নিয়ে ছুটে গিয়েছে তাদের মারতে, কোমরে আঁচল জড়িয়ে অকথ্য ভাষায় তাদের বাপ-মার সঙ্গে ঝগড়া শুরু করেছে। বকুল ব্যাকুল হয়ে তাড়াতাড়ি মাকে হাত ধরে ঘরে টেনে এনেছে। ‘মা, চুপ কর, চুপ কর।’
কিন্তু ক’বছর পরে সেই দুঃখের দিনগুলিও গেছে। নিজের কুল-পরিচয়ের কথা, আত্মীয়-স্বজনের কথা বকুল মাকে আর জিজ্ঞাসা করে না। তার সঙ্গে বস্তির কারো আর ঝগড়া হয় না। কারো সঙ্গে বড়-একটা মিশতে যায় না বকুল। স্কুলে যায়, স্কুল থেকে ফিরে আবার বই নিয়ে বসে।
প্রমদা মাঝেমাঝে জিজ্ঞাসা করে, ‘এত বই তুই কোত্থেকে পাস, বকুল?’
বকুল জবাব দেয়, ‘শহরে বইয়ের কি অভাব আছে, মা? স্কুলের মেয়েদের কাছ থেকে আনি, দিদিমণিদের কাছ থেকে আনি।’
প্রমদা বলে, ‘বই ছাড়া তুই কি দুনিয়ায় আর কিছু চোখে দেখতে পাস নে? লীলারা কেমন সুন্দর তাদের ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে, তোর সঙ্গে বুঝি কারো ভাব নেই?’
‘আছে।’
‘তবে আনিস নে কেন তাদের?’
বকুল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘ভয় করে মা। যদি তারা আমাদের ঘেন্না করে।’
প্রমদা হঠাৎ কোন কথা খুঁজে পায় না।
স্কুল থেকে ভালোভাবে পাস করে কলেজে ভর্তি হল বকুল। কিন্তু মেয়ের স্বভাব বদলাল না। সেই বইয়ের রাশ, ঘরের কোণ আর নিজের মন নিয়ে পড়ে থাকে। দুনিয়ার আর কিছুতে ওর কোন আসক্তি নেই।
ওর সমবয়সী শীলা লীলা দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেল। বছর ঘুরতে না ঘুরতে একজন ছেলে কোলে নিয়ে আর একজন পেটে নিয়ে বাপের বাড়ি এলো বেড়াতে। প্রমদার সাজা পান খেয়ে তারা ঘরের মেঝেয় পা ছড়িয়ে শ্বশুরবাড়ির কত গল্প করল। শেষে লীলা হাসতে হাসতে বলল, ‘মাসীমা, ওই গোমরামুখীকে এবার বিয়ে দিয়ে দিন। ওর যা ভাবভঙ্গি দেখছি, কবে যে ও সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসিনী হয়ে যাবে ঠিক নেই।’
সন্ন্যাসিনী হতে বাকিই বা কি। বকুল গয়নাগাটি কিছু পরে না, অত বড় চুলের গোছ মাথায়, কিন্তু ভালো করে যত্ন নেয় না। মেয়ে তো নয়, এ এক অনাসৃষ্টি।
প্রমদা জিজ্ঞাসা করে, ‘আচ্ছা বকুল লীলাকে দেখে তোর কি হিংসে হয় না?’
‘হিংসে কেন হবে মা?’
‘তুই কি চাস বল তো?’
বই থেকে মুখ তুলে বকুল মৃদু হাসে। ‘সেই তো সমস্যা। কী চাইব বল তো?’
প্রমদা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘হাসিস নে বাপু, তোর হাসিতে আমার গা জ্বলে। কী চাইবি, তা-ও আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে? সোয়ামী, সংসার, গা-ভরা গয়না, কোলভরা ছেলে। মেয়েমানুষে দুনিয়ায় আর কী চায়।’
বকুল বইয়ের দিকে চোখ রেখে মৃদুস্বরে বলে, ‘ও-সব আমি কিচ্ছু চাই নে।
প্রমদা গালাগাল দিয়ে ওঠে, তা, চাইবি কেন, পোড়াকপালী, হতচ্ছাড়ী। এ যে রক্তের দোষ, ঘর সংসারে তোর মন চাইবে কেন? কিন্তু তুই চাস নে, আমি চাই। যেমন করে পারি জামাই আমি আনবই।’
বকুল বই নিয়ে মায়ের চোখের আড়ালে গিয়ে বসে।
রাগে জ্বলে যায় প্রমদা। ইচ্ছে করে টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলি ওই বইয়ের রাশ। বই তো নয়, শত্রু। ওই বইপড়া বিদ্যার জন্যেই মেয়ে তার এমন করে পর হয়ে গেছে। ও কী ভাবে, কি চিন্তা করে, তা প্রমদা বুঝতে পারে না! এমন কি ওর মুখের ভাষা পর্যন্ত যেন আলাদা। অথচ এই মেয়েকে বুকে করেই এই মেয়ের সুখের জন্যই প্রমদা অকালে নিজের সব সাধ-আহ্লাদ ত্যাগ করেছে। এক এক সময় তার মনে হয়, এর চেয়ে বকুলকে নিয়ে তার সেই কৃপানাথ দে লেনেই পড়ে থাকা ভালো ছিল। বাড়িওয়ালী মাসীর মেয়ে আলতার মত বকুলেরও সেখানে দর থাকত, আদর থাকত। আর বকুলের খাতিরে খাতির বাড়ত প্রমদার। সব আটঘাট, ফিকির-ফন্দী বকুলকে সে শিখিয়ে দিত। যেমন বাড়িওয়ালী মাসী শেখায় তার মেয়েকে। হয়তো তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে চুলোচুলি খুনোখুনি হত, যেমন আলতা আর তার মা বিনী মাসীর মধ্যে প্রমদা হতে দেখেছে। কিন্তু ঝগড়া মিটে গেলে আবার সুখ-দুঃখের কথাও হত দুজনের মধ্যে, একজন আর একজনের যত্ন করত, মাতাল হয়ে পড়ে থাকলে বিছানায় তুলে দিত, খারাপ অসুখ বিসুখ হলে প্রাণ দিয়ে সেবা করত, মা মেয়ে কেউ কারো কাছে কিছু লুকোত না। কেউ কাউকে ঘৃণা করত না। নিজের রক্তমাংসের মেয়েকে একেবারে নিজের করে পেত প্রমদা। বকুল তখন মা-র কাছ থেকে এমন দূরে-দূরে থাকতে পারত না, মনে মনে এমন করে ঘৃণা করতে পারত না। মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে, ভদ্রলোকদের সঙ্গে মিশতে দিয়ে ভারি আহাম্মকিই করেছে প্রমদা।
কিন্তু কলেজের পড়া শেষ করে অফিসে ঢুকে একমাস বাদে যখন মাইনের টাকাগুলি তার হাতে এনে দিল বকুল, প্রমদার মন অন্যরকম হয়ে গেল। সে যা ভেবেছিল তা নয়। মেয়েটার মনে তাহলে সত্যিই মায়া মমতা আছে।
‘এই কি সব টাকা, বকুল?’
‘হ্যাঁ মা, সব।’
‘হ্যাঁ রে, সব দিলি? তোর নিজের কাছে কিছুই রাখলি নে?’
‘না মা, তোমার কাছেই সব থাক।’
এতখানি বিশ্বাস আলতা তার মাকে করত না। নিজের রোজগারের পুরো টাকা তো ভালো অর্ধেক টাকা, সিকি টাকাও সে মাকে প্রাণ ধরে দিত না কোনদিন। তার চেয়ে প্রমদার বকুল হাজার গুণ ভালো, লক্ষ গুণ ভালো।
প্রমদা এগিয়ে সস্নেহে মেয়ের চিবুক তুলে ধরল, ‘হ্যাঁ রে বকুল, আমি কি তোর কাছে রোজগার চেয়েছি, টাকা চেয়েছি।’
বকুল বলল, ‘কিন্তু সংসারে টাকারও তো দরকার আছে, মা।’
প্রমদা বলল, ‘না কোন দরকার নেই। টাকা আমি যেমন করে পারি আনব। ঝি-গিরি করব, পান বিক্রি করব। টাকার ভাবনা তোকে ভাবতে হবে না। তোর কাছে আমি টাকা চাই নে।’
বকুল মৃদুস্বরে বলল, ‘তবে তুমি কি চাও?’
‘কি চাই? হতভাগী, তা কি তুই এতদিনেও বুঝতে পারলি নে? আমি আমার জামাই চাই, ঘর-ভরা নাতি-নাতনী চাই। সেই দোতলা বাড়ির বউয়ের মত আমি তোকে ভরা-সংসারের মাঝখানে দেখতে চাই যে বকুল।’
প্রমদার দু-চোখ জলে ভরে উঠল।
বকুল কোন কথা না বলে আস্তে আস্তে সরে গেল সামনে থেকে।
তারপর খেতে বসে মাকে আনমনা করার জন্যে নিজের অফিসের গল্প শুরু করল। খুব বড় অফিস। ঠিক যে-তেতলা বাড়িটার সামনে বসে প্রমদা পান বিক্রি করত, সেই বাড়ি। বকুলের মত আরো কত মেয়ে আছে সেখানে। শুধু মেয়ে? না, শুধু মেয়ে না, ছেলেরাও আছে। তাদের সংখ্যাই বেশি। মিলেমিশে কাজ করতে প্রথম প্রথম খুব লজ্জা করত বকুলের, এখন আর করে না।
প্রমদা অবাক হয়ে বলে, ‘বলিস কি? আমাকে একদিন দেখিয়ে আনবি?’
বকুল হেসে বলে, ‘বেশ তো যেও একদিন।’
কিন্তু ওই কথাই। সত্যি-সত্যি প্রমদাও যায় না, বকুলেরও তাকে নিয়ে যাওয়ার কোন গরজ নেই।
তারপর মাস পাঁচ-ছয় চাকরি করতে না-করতেই মেয়ের বেশে-বাসে চেহারায় বেশ একটু পরিবর্তন লক্ষ্য করে প্রমদা। বকুল আগে পরত আটপৌরে মিলের শাড়ি, এখন রঙিন তাঁতের শাড়ি পরেই বের হয়। সে রং কখনো সবুজ, কখনো গোলাপী, কখনো হলদে। বকুলের নিজের গায়ে রং গৌর। ওকে সব রংই মানায়। আগে চুলের রাশ ছিল যেন বাবুই পাখির বাসা , এখন বকুল নিজেই বিনুনি করে। সে-বেণী কোমর ছাড়িয়ে অনেক নিচে যায়। কোনদিন বা আলগা খোঁপা বাঁধে বকুল। তাতেও ওকে চমৎকার দেখায়। স্নো-পাউডারের দিকে এতকাল মেয়ের বিশেষ ঝোঁক ছিল না। এখন এক-একটি করে সে-সবও আসতে শুরু করেছে। সময় বুঝে নিজের হার চুড়ি আর দুল মেয়েকে বের করে দিল প্রমদা। এর আগেও কয়েকবার দিয়েছে। কিন্তু বকুল কিছুতেই পরেনি।
এবার বলল, ‘ওই-সব ডিজাইন আজকাল কেউ পরে নাকি মা?’
প্রমদা মনে মনে হাসল—ভিতরে-ভিতরে সব জ্ঞানই দেখি আছে মেয়ের।
বকুল লজ্জিত হয়ে বলল, ‘হাসছ যে।’
প্রমদা বলল, ‘হাসলাম আবার কই। বেশ তো, ও-সব ডিজাইন পুরনো হয়ে গিয়ে থাকে, হালের নতুন ডিজাইন গড়িয়ে নে। দুবার বলার পর নিমরাজী, তিনবারের পর পুরোপুরি রাজী হয়ে গেল বকুল।
তারপর ক্রমে মেয়ের চালচলন ভাবভঙ্গি দেখে আরো অনেক কথা টের পেল প্রমদা। এ কেবল শাড়ি বদল নয়, মেয়ের ঘর-বদলের দিনও এসেছে। বকুল আজকাল আর শুধু মনে-মনে বই পড়ে না, সুর করে ছড়া আওড়ায়। ছড়া বললে বকুল ভারি রাগ করে। ও বলে, কবিতা। বেশ, না হয় কবিতাই হল। তুই যা বলে খুশী হোস তাই বল। এতদিন বইয়ের শুকনো পাতা ছাড়া কোন দিকে মেয়ের লক্ষ্য ছিল না। এখন গোছায়-গোছায় নিয়ে আসে রজনী গন্ধার ডাঁটা। একদিন চোখে পড়ল, বকুলের খোঁপায় লাল গোলাপ ফুল গোঁজা।
ও যখন ছোট ছিল এক বিছানায় শুত প্রমদা। কিন্তু বড় হওয়ার পর মেয়ে নিজেই আলাদা বিছানা করে নিয়েছে। কিন্তু সে-বিছানাও প্রমদা নিজে পেতে দেয়। মশারি গুঁজে আলো নিবিয়ে মেয়ের বিছানার কাছে সেদিন একবার দাঁড়াল প্রমদা, তারপর আস্তে-আস্তে জিজ্ঞাসা করল, ‘বকুল, আমার কাছে আর লুকোসনি। বল না সে কে?’
‘কার কথা বলছ, মা।’
‘তুই যাকে ভালোবেসেছিস। তোকে যে ভালোবেসেছে।’
‘কি বাজে বকছ। আমাকে আবার কে ভালোবাসবে?’
প্রমদা একটু হাসল, ‘আচ্ছা বকুল তুই আমার পেটে হয়েছিস, না আমি তোর পেটেহয়েছি!’
বকুল তরল সুরে বলল, ‘তুমিই আমার পেটে হয়েছ, মা। লক্ষ্মী খুকু, যাও, এখন ঘুমোও গিয়ে। রাত অনেক হয়ে গেছে।’
প্রমদা হাসি চেপে নিজের বিছানায় গিয়ে শোয়। আজ গোপন করল, কিন্তু ক’দিন আর তার কাছ থেকে সব গোপন রাখতে পারবে বকুল। কালই হোক, পরশুই হোক, বলতে তাকে হবেই।
অনেক রাত অবধি সেদিন প্রমদার ঘুম এলো না। বার-বার মনে পড়তে লাগল সেই প্রথম মানুষটির কথা। সে বলেছিল প্রমদাকে নিয়ে ঘর বাঁধবে। প্রমদা বিশ্বাস করেছিল। ভেবেছিল, মানুষের সব কথাই বুঝি সত্যি। প্রমদা ভারি বোকা ছিল তখন। তারপর ক্রমে বয়স বাড়ল জ্ঞান বুদ্ধি বাড়ল। প্রমদা চিনতে শিখল মানুষকে। এমন অবিশ্বাসী জীব দুনিয়ায় আর দুটি নেই। তার কথা মানেই মিছে কথা। কিন্তু এমন শুভদিনে এ-সব কি অলুক্ষণে কথা মনে আনছে প্রমদা। তার চেয়ে বকুলের যে-বর আসবে তার কথা ভাবুক। প্রাণ জুড়িয়ে যাবে। তার অল্প বয়স, কিন্তু অগাধ বিদ্যাবুদ্ধি। যেমন রূপ তেমনি স্বাস্থ্য। এতকাল তপস্বিনী থেকে বকুল কি আর যাকে তাকে পছন্দ করেছে। সে কি প্রমদার তেমন মেয়ে।
আর একদিন মেয়েকে প্রমদা অনুরোধ করল, ‘তার নামটা আমাকে বল না, বকুল।’
বকুল ক্ষীণ প্রতিবাদের সুরে বলল, ‘কি যে বল, মা। কার নাম আবার বলব?’
প্রমদা একটু হাসল, ‘নাম ধরে ডাকতে তোর লজ্জা করছে, আচ্ছা তাকে তুই আপিসের পর একদিন আমার কাছে নিয়ে আয়। আমি তার কাছে থেকেই সব জেনে নেব—’
বকুল একটুকাল চুপ করে থেকে বলল, ‘তাকে কি এ-সরু জায়গায় আনতে পারি মা?’
প্রমদা বলল ‘খুব বড়লোক বুঝি? তবে থাক, এই বস্তির মধ্যে তাকে আর এনে কাজ নেই। এবার একটা ভালো ঘর-টর দেখে উঠে যেতে হবে। আর এই নোংরা বস্তির মধ্যে আমরা পড়ে থাকবো না।’
বকুল যেন নিজের মনেই বলল, ‘শুধু বাড়িঘর বদলালেই বা কি হবে।’
প্রমদা একদৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওঃ, নিজের মা বদলাতে না পারলে বুঝি তুই আর তাকে আনবি নে! আমাকে এত ঘেন্না তোর! কেন কী করেছি আমি? জ্ঞান হওয়ার পর থেকে তুই আমাকে মদ খেতে দেখেছিস, না কোন পুরুষের সঙ্গে বেলেল্লাপনা করতে দেখেছিস, যে এত ঘেন্না করবি তুই আমাকে? হায়, হায়, দুধ-কলা দিয়ে এতদিন কি সাপই আমি পুষেছি রে! এর চেয়ে তখন যদি বিনী মাসীর কথা শুনতুম, বিক্রি করে দিতুম, সে-টাকা আমার আখেরে লাগত।’
বকুল বলল, ‘চুপ কর মা। ঘরে-ঘরে সবাই কান পেতে রয়েছে। সবাই শুনতে পাচ্ছে তোমার কথা।’
প্রমদা মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘শুনুক, আমার বয়ে গেল।’
ঘর-সংসারের কাজ সেরে খানিক বাদে প্রমদা মেয়ের খোঁজ নিতে এসে দেখল, বকুল তার ছোট্টো টেবিলখানির উপর মাথা নুইয়ে চুপ করে রয়েছে। পিঠ ভরে ছড়িয়ে পড়েছে কালো চুলের রাশ। প্রমদা আস্তে আস্তে সেই চুলগুলির উপর হাত রাখল। পরের বাড়িতে বাটনা বেটে-বেটে ক্ষয়ে গেছে, ফেটে গেছে আঙুলগুলি। বকুলের মসৃণ চুলের রাশের ওপর নিজের খরখরে, খসখসে হাতখানা রেখে একটুকাল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল প্রমদা। তারপর আস্তে-আস্তে বলল, ‘বকুল, তুই কাঁদিস নে। সত্যি আমি তোর মা হওয়ার যুগ্যি নই মা, আমি যুগ্যি নই।’
বকুল হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে ছোট মেয়ের মত প্রমদাকে আঁকড়ে ধরল, ‘ও-কথা বলো না, মা।’
জল-ভরা ঝাপসা চোখে আর দুটি ছলোছলো কালো চোখের দিকে তাকাল প্রমদা, তেমনি আস্তে-আস্তে বলল, ‘সত্যি বকুল, আমি তোর মা নই। আমার কথা তার কাছে তুই বলিস নে। বলিস, তোর আসল মা তোর ছেলেবেলায় মরে গেছে। সে ঠিক তোর মতই ছিল, তোর মতই লেখাপড়া জানত, ভদ্দরলোকের ঘরে থাকত, ভদ্দরলোকের সঙ্গে মিশত। আমি তোর মা নই বকুল, সে-ই ছিল তোর আসল মা। আমি কেবল তোকে পেলে পুষে বড় করেছি।’
বকুল ধরা গলায় বললে, ‘কোথায় বড় করেছ, মা। আমি সেই ছোটই রয়ে গেছি।’
প্রমদা নিজের কথাই বলে চলল, ‘তাকে আমার কথা বলে দরকার নেই, তাকে আমার সামনে এনে দরকার নেই তোর। শুধু একবার আড়াল থেকে আমাকে দেখাস। এখানে আনতে হবে না। আমি তোর অফিসের সামনে বসে পান বেচতে-বেচতে একবার শুধু তার মুখখানা দেখে নেব।’
বকুল বলল, ‘ছিঃ মা। আবার ও-সব কথা বলছ। আমি তাকে এখানে নিয়ে আসব। সে তোমার পায়ের ধুলো নিয়ে তোমাকে প্রণাম করবে। সে মোটেই অহংকারী নয় মা। সে বড় ভালো।’
‘সত্যি!’ প্রমদা একটু হেসে মেয়ের দিকে তাকাল। দুজনেরই চোখে জল, ঠোঁটে হাসি!
বকুল লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়ে মৃদুস্বরে বলল, ‘হ্যাঁ মা সত্যি। অত ভালো আমি আর কাউকে দেখিনি।’
প্রমদার দুটি কান যেন মধুতে ভরে গেল। আর তার কিছু জানবার দরকার নেই? নাম নয়, ধাম নয়, অবস্থার কথা নয়। মানুষ ভালো হলেই সব হয়। ভালোবাসলেই সব পায়।
কিন্তু তারপর ফের মাস দুই যেতে না-যেতেই দেখা গেল, বকুলের আবার পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ওর মুখে হাসি নেই। গলা ছেড়ে কবিতা পড়া বন্ধ হয়েছে। চুল বাঁধায়, রঙিন শাড়ি পরায় তার ফের সেই ঔদাসীন্য দেখা দিয়েছে। ক’দিন বাদে গয়নাগুলিও বকুল খুলে ফেলল।
প্রমদা এবার রাগ করে বলল, ‘তোর কি হয়েছে রে?’
বকুল বলল, ‘কি আবার হবে?’
প্রমদা বলল, ‘নিশ্চয়ই ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে।’
বকুল চুপ করে রইল।
প্রমদা এবার হেসে বলল, ‘যত ভালো ছেলে আর ভালো মেয়েই হোক, দুজনে কাছাকাছি এলে ঝগড়া দু-চার বার হবেই। সেই দোতলার বউটিকেও দেখতুম। সোয়ামী-স্ত্রীর মধ্যে দিনরাত যেমন ভাব ঠিক তেমনি ঝগড়া। ঝগড়া শুনে মনে হত ওরা বুঝি কোনদিন জীবনে কেউ আর কারো মুখ দেখবে না। কিন্তু দু-দণ্ড যেতে না যেতেই আবার তাদের মধ্যে বেশ মিলমিশ হয়ে যেত। বিয়ে-করা সোয়ামী, একজন আর-একজনকে ফেলে যাবে কোথায়। তোরা এবার বিয়ে করে ফ্যাল বকুল।
মুখ নিচু করে বকুল বলল, ‘তার আর উপায় নেই, মা।’
প্রমদা চমকে উঠে বলল, সে কি রে! বিয়ে করার উপায় নেই কেন? সে কি জাতের কথা তুলেছে? তাকে বলিস, তুই বামুনের মেয়ে। আমি যা-ই হই, জাতে সে বামুনই ছিল। পৈতে ছিল গলায়। বামুনের চেয়ে তো উঁচু জাত কিছু আর নেই। তার মেয়েকে সবাই বিয়ে করতে পারে।’
বকুল তেমনি নতমুখে বলল, ‘বামুন-কায়েতের কথা নয় মা, তার ঘরে বউ আছে, ছেলেমেয়ে আছে। আমাকে সে আর বিয়ে করতে পারে না।’
প্রমদা মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর বলল, ‘গোড়া থেকে তুই সব জানতিস?’
বকুল বলল, ‘না। আমিও তাকে সব কথা জানাইনি, সে-ও আমাকে সব কথা বলেনি। কিন্তু তার কথা যে এত মারাত্মক সে আমি ভাবতে পারিনি, মা!’
প্রমদা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আরো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, ‘কিন্তু বিয়ে করেছে, করেছে , ছেলেমেয়ে আছে, আছে। তোর কাছে তাকে আসতেই হবে। অমন কত সুন্দরী গরবিনী বউয়ের স্বামী, কত সোনার চাঁদ ছেলেমেয়ের বাপকে আমি ঘর ছাড়িয়েছি, আর তুই একজনকে ছাড়াতে পারবি নে? খুব পারবি। কি করে পারতে হয় আমি তোকে শিখিয়ে দেব।’
বকুল বলল, ‘ছিঃ, মা, চুপ কর।’
আস্তে-আস্তে সেখান থেকে উঠে চলে গেল বকুল।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের সেই যাওয়ার দিকে একটুকাল তাকিয়ে থেকে প্রমদা দ্রুতপায়ে তার পিছনে-পিছনে গেল। তারপর খপ করে মেয়ের একখানা হাত শক্ত করে ধরে কঠিন স্বরে বলল, ‘বকুল, আমার দিকে তাকা। আমার চোখের দিকে চেয়ে কথা বল।’ কিন্তু বকুল আর মুখ তুলল না।
প্রমদা মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে ঘরের এক কোণায় নিয়ে এলো। দোর-জানালা সন্তর্পণে বন্ধ করে গলা নামিয়ে বলল, ‘পোড়ারমুখী, নিজের এমন সর্বনাশ কেন করতে গেলি! তুই-না লেখাপড়া শিখেছিস!’
বকুল তেমনি চুপ করে রইল।
প্রমদা বলল, ‘আমার গোড়া থেকেই সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু তুই আমার পেটের মেয়ে আমার চোখে এই তিন মাস ধরে ধুলো দিয়েছিস, আমার কাছে কেবল মিছে কথা বলেছিস। কেন এমন সর্বনাশ করলি বকুল? কেন না জেনে-শুনে নিজেকে এমন করে বিলিয়ে দিলি! ভেবেছিলি সব দিলেই বুঝি সব পাবি। ওরে পোড়াকপালী, যারা অমন করে নেয়, তারা কিছুই দেয় না, কিছুই দেয় না।’ চাপা কান্নায় গলা ধরে এলো প্রমদার।
কিন্তু বকুলের চোখে একফোঁটাও জল নেই।
সে শান্ত স্বরে বলল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও মা, যেতে দাও আমাকে।’
প্রমদা বলল, ‘কোথায় যাবি তুই মুখপুড়ী, দুদিন বাদে যে আর তুই বেরুতেও পারবি নে। তোকে ঘরেই বা কদিন আমি লুকিয়ে রাখতে পারব। আমার সেই বিনী মাসী এখনো বেঁচে আছে। তোকে তার কাছে রাখব, সে সব ফিকির-ফন্দী জানে, ডাক্তার-বদ্যির বাবা। চল আমার সঙ্গে।’
বকুল শঙ্কিত হয়ে বলল, ‘না মা, সেখানে আমি এক মুহূর্তও টিকতে পারব না।’
প্রমদা বলল, ‘ঈশ, কি আমার সতীসাধবী রে। না টিকতে পারবার কি হয়েছে। সে তোকে নিজের মেয়ের মত রাখবে।’
বকুল বলল, ‘না। আমার জন্যে তোমাদের কাউকে কিছু ভাবতে হবে না। আমার ব্যবস্থা আমি নিজে করব।’
প্রমদা রাগ করে বলল, ‘কী ব্যবস্থা করবি তুই! এ-সবের কী তুই জানিস! ব্যবস্থা করতে-করতে বুড়ী হয়ে গেলাম। তবু এখনো আমাদের গা কাঁপে।’
বকুল মৃদু হাসল, ‘আমার গা কাঁপে না, মা। তার সব চিহ্ন আমি মুছে ফেলব।’
প্রমদা বলল, ‘সেই হাড়হাভাতে আঁটকুড়োর ব্যাটার নামটা এবার বল। সব খরচ তার কাছ থেকে আদায় করব, সহজে না দেয় আদালতে নালিশ করব। কি নাম তার?’
বকুল বলল, ‘তার নাম মুখে আনার মত নয়, মা। এতদিন যখন শোননি, আজও সে-নাম তোমার শুনে কাজ নেই।’
প্রমদার কোন পরামর্শই বকুল নিল না। অফিস থেকে একমাসের ছুটি নিল। গয়না বিক্রি করল। মোটা-মোটা বইগুলি সব বিক্রি করে ফেলতে তার চোখে জল এলো।
তারপর একদিন সন্ধ্যাবেলায় প্রমদার পায়ের ধুলো নিয়ে বকুল বলল, ‘আসি মা।’
প্রমদার মনে পড়ল, বকুল বলেছিল, তার পায়ের ধুলো আর-একজন এসে নেবে। প্রমদা ভেবেছিল ওরা দুজনে একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নেবে। সেদিন আর এলো না। আজ না আসুক, একদিন আসবেই। যেমন করে পারুক, বকুলের বিয়ে দেবেই প্রমদা। বয়সের মেয়ে। শরীর সারতে ওর আর কদিন লাগবে।
প্রমদা বলল, ‘কোথায় যাচ্ছিস? কত দূরে?’
বকুল বলল, ‘দূরে নয়, মা। এই শহরের মধ্যে। খুব ভাল ডাক্তারখানা। ভারি যত্ন করে। টাকা পেলে তারা সব করে।’
প্রমদা বলল, ‘আমাকে ঠিকানা দিয়ে যা। আমি তোকে দেখতে যাব।’
একটু ইতঃস্তত করে এক টুকরো কাগজে মাকে ঠিকানাটা লিখে দিল বকুল।
প্রমদা সেই কাগজখানা হাত পেতে নিয়ে বলল, ‘দাঁড়া।’
তারপর বাক্সের ভিতর থেকে একটা পুরনো কবচ এনে বকুলের বাহুতে যত্ন করে বেঁধে দিয়ে বলল, ‘এটা পরে থাকিস, বকুল। আমাদের সেই বিনী মাসীর দেওয়া কবচ। আপদে-বিপদে সকলেই এতে ফল পেয়েছে। তুই তো বিনী মাসীর কাছে গেলি নে। ও-সময় কিন্তু তার নামটা স্মরণ করিস। ধন্বন্তরী আমাদের বিনী মাসী। পুরো নাম বিনোদিনী দাসী। মনে থাকবে, বকুল?’
বকুল একটু হেসে বলল, ‘থাকবে।’
দুদিন বাদে সেই গোপন ডাক্তারখানার লোকেই রাত্রির অন্ধকারে গোপন সংবাদ বয়ে নিয়ে এলো বকুলকে বাঁচানো যায়নি।
মাস-কয়েকের জন্যে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল প্রমদার। পোড়া অফিসের ঘরে-ঘরে গিয়ে প্রত্যেকের কাছে দাবি করত, ‘কে আমার মেয়েকে খুন করেছে, বাপের বেটা হও তো বলো। তাকে ফিরিয়ে দাও।’
গোলমালে কাজের ক্ষতি হয়। অফিসের দারোয়ান পাগলীকে জোর করে বের করে দিয়েছে। তারপর থেকে কিছুতেই তাকে আর ভিতরে ঢুকতে দেয়নি।
বন্ধ-দরজায় মাথা ঠুকতে-ঠুকতে মাথা ফের ঠিক হয়ে গেছে প্রমদার। পাইকপাড়ার ডাক্তারবাবুর বাড়িতে আবার সে ঠিকে-কাজ নিয়েছে। দুপুরবেলায় পানের পুঁটলি নিয়ে অফিসের সামনে আগের মত ফের বসতে শুরু করেছে। তার বকুলের অফিস।
পান বিক্রি করতে-করতে প্রমদা প্রত্যেকটি যুবকের মুখের দিকে তাকায়। তার ঝাপসা চোখে আর জ্বালা নেই। সে জানে, কোনোদিন সে শোধ নিতে পারবে না। শোধ নিতে আর চায়ও না প্রমদা। কি হবে শোধ নিয়ে। যে গেছে তাকে কি আর ফিরে পাবে। শোধ নিতে চায় না প্রমদা। শুধু একবার চোখের দেখা দেখতে চায়। বকুল যাকে ভালোবেসেছিল তার মুখখানা কেমন। শুধু একবার দেখবে।
