তলানি – নবেন্দু ঘোষ
ছেলেটা লুকোবার চেষ্টা করল।
অফিস টাইমের ভিড়, কিন্তু তবু আমার সন্ধানী সর্তক দৃষ্টি এড়াতে পারল না ছেলেটা। আজকাল ট্রাম-কোম্পানিতে একটু কড়াকড়ি শুরু হয়েছে, ইনস্পেক্টররাও বাধ্য হয়ে কড়া নজর রাখে। আর সেকেন্ড ক্লাসগুলোতেই যত রাজ্যের ফাঁকিবাজ, চোর-জোচ্চোর আর বদমাশদের ভিড় হয়। ফলে আমরা যারা সেকেন্ড ক্লাসে কন্ডাক্টরি করি তাদের পদে পদে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়, ঝগড়া করতে হয়, মারামারিও যে মাঝে মাঝে হয়, একথা অস্বীকার করতে পারব না। তাই দম ফেলতে পারি না, ইচ্ছে করলেও দয়া দেখাবার উপায় নেই। আপনি বাঁচলে বাবার নাম—বাপ, যা দিনকাল পড়েছে।
ধরলাম ছেলেটাকে, ‘এই ছোঁড়া, তোর টিকিট?’
ছেলেটা ভয় পেল না, হাসল। কালো, রোগা চেহারা। পাঁচ-ছ-বছর বয়েস। পরনে একটা কালো রঙের হাফপ্যান্ট, আধছেঁড়া, ময়লা চিটচিটে একটা শার্ট গায়ের ওপর জমানো কালো ময়লা আভাস। আর উজ্জ্বল দুই চোখ, কুকুরের চোখের মতো। বন্য আর নির্ভয়। কোথায় যেন দেখছি ছেলেটাকে!
‘হাসছিস যে! টিকিট কই?’
‘নেই।’
‘কেন নেই?’
রাগ হল। এই ছোঁড়াগুলো ভারি জ্বালাতন করে। যুদ্ধের পর কোথা থেকে যে এদের আমদানি হচ্ছে। পিলপিল করে যেন বেড়ে চলেছে শয়তানেরা।
কানটা ধরে একটু মনের ঝাল মেটাতে চাইলাম, ‘বল কেন নেই?’
আমার হাতের ওপর ধাঁ করে একটা চড় মেরে এক ঝটকায় কানটাকে মুক্ত করে নিয়ে ছেলেটা ফুঁসে উঠল, কুটিল চোখে বলল, ‘নেই।’
‘নেই তো চড়েছিস কেন?’
‘নেমে যাব।’
‘নেমে যাব! বটে! তার আগে তোকে আমি পুলিশে দেব।’
যাত্রীরা ব্যাপারটা উপভোগ করছিল, কয়েকজন সহাস্যে সমর্থন করল আমাকে।
একজন বলল, ‘পুলিশেই দিন দাদা। এমনিভাবে ভেসে ভেসেই এরা কালে আমাদের পকেট মারবে, গলা কাটবে আর রিভালবার নিয়ে ব্যাংকে ঢুকবে।’
আর একজন ছেলেটাকে প্রশ্ন করল, ‘হ্যাঁরে ছোঁড়া, তোর মা-বাপ নেই?’
ছেলেটার ঠোঁট বাঁকা হয়ে উঠল, দু-চোখের তারায় আক্রোশ ঝিলিক দিয়ে গেল। সে জবাব দিল না। কোথায় যেন দেখেছি ছোঁড়াকে!
‘আহা গোসা করছ কেন বাবা—বলো না—’
‘নেই’, ধমকে জবাব দিল ছেলেটা। যেন কোণঠাসা কুকুরছানা দাঁত খিঁচাল।
জগুবাবুর বাজারে ট্রাম থামল।
আমি ছেলেটাকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিলাম, ‘যা ভাগ—’
ছেলেটা নেমে গেল, কয়েক হাত দূরে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শা-লা—’
‘অ্যাই!’ ধমকে উঠলাম।
ছেলেটা নড়ল না, দুচোখ পাকিয়ে, একটা হাত তুলে শাসানির ভঙ্গিতে আবার বলল, ‘ইট মেরে তোর মাথা ভেঙে দেব—তোর মুখে হেগে দেব—’
হুড়মুড় করে যাত্রীরা উঠছিল। তাদের ভেতর দিয়ে চটেমটে নামবার চেষ্টা করছিলাম এমন সময় ফার্স্ট ক্লাসের ঘন্টা বেজে উঠল। বাধ্য হয়ে থামলাম, আমিও ঘন্টা বাজালাম। ট্রাম চলতে শুরু করল।
সমস্ত কোলাহলকে ভেদ করে ছেলেটার তীক্ষ্ণ গলা আবার ভেসে এল, ‘এই শালা—এই—শালা—’
ট্রামের পাশাপাশি কয়েক পা দৌড়ে এল সে গালাগালি করতে করতে। শেষে এক-সময়ে থেমে গেল। আর সেই সময়েই ছেলেটাকে চিনতে পারলাম।
যাত্রীরা সহানুভূতি জানিয়ে বলল, ‘দেখেছেন মশাই দেখেছেন, শালার ছেলে যেন একেবারে বিচ্ছু—’
‘হবে না, ব্যাটাদের মা-বাপের ঠিক নেই যে—’
হয়তো তাই। কিন্তু ওই ছেলেটার মা-বাপ ছিল। আমি তাদের দেখেছি। অন্তত ওর মাকে আমি বহুদিন ধরেই চিনতাম। সে চেনা অবশ্য শুধু দেখার। কন্ডাক্টরি করতে করতে ট্রামের মধ্যে মাঝে মাঝে দেখতাম ওর মাকে। সে কবেকার কথা। সেই যেবার আমি কন্ডাক্টর হয়ে কোম্পানিতে ঢুকলাম তার মাসকয়েক পর থেকেই—
এলগিন রোড পার হল ট্রামটা! তারপর থিয়েটার রোড। গতি বাড়ল ট্রামের। চাকায় চাকায় শব্দ উঠল। কর্মব্যস্ত জগতের ধ্রুপদের সঙ্গে যেন পাখোয়াজের বোল তুলে আমার ট্রাম এগল। মাঝে মাঝে তারের গায়ে বিদ্যুতের তীব্র ঝলসানি যেন মাত্রা নির্দেশ করতে লাগল। দুলে দুলে ভিড় ঠেলে ঠেলে টিকিট দিতে দিতে গলদঘর্ম হয়েও কিন্তু ছেলেটার মায়ের কথা এড়াতে পারলাম না। সব মনে পড়তে লাগল।
বিয়াল্লিশ সনে ম্যাট্রিক পাশ করেই ট্রামের চাকরিটা পেলাম। বারকয়েক ফেল করার পর অতি কষ্টে পাশ করেছিলাম। তাছাড়া সামর্থ্যও আর ছিল না, আমাকে দেখলেই দাদা-বৌদির মুখ অন্ধকার হয়ে উঠত। তাই বাবু শ্রেণিতে টিকে থাকার করুণ চেষ্টা না করে একধাপ নীচেই নেমে গেলাম।
তখন বিয়াল্লিশের গোলমাল শুরু হয়েছে। কন্ডাক্টরি করতে করতে ক্রীতদাসত্বের জ্বালায় জ্বলি আবার ভয়ে ভয়েও থাকি। দেশের উত্তেজনা মাঝে মাঝে ট্রামের ওপর হিংস্রভাবে ভেঙে পড়ে। সেই বিপ্লবের দিনেই আমার চাকরি-জীবনে হাতে-খড়ি। তারপর বিয়াল্লিশ সন গেল, তেতাল্লিশ এল। পৃথিবীময় তখন যুদ্ধ চলছে। ভারতবর্ষের দ্বারপ্রান্তেও যুদ্ধদানবের লোহার রথ এগিয়ে এল। দেশে মৃত্যু এল দুর্ভিক্ষের রূপ নিয়ে।
কত মৃত্যু দেখলাম তখন। দেখে দেখে মন তখন নিরাসক্ত হয়ে উঠেছে। নিত্যদিন বিদ্যুৎ যানের মধ্যে, ভিড়ে গরমে, ঘামে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টিকিট বেচে বেচে বেশ পাকাপোক্ত হয়ে উঠলাম। কিন্তু তবু প্রমোশন পেলাম না। সেকেন্ড ক্লাসেই দিন কাটতে লাগল আমার।
সেই সময়। বোধ হয় সেটা শ্রাবণ কী ভাদ্র মাস। অশ্রান্ত বর্ষণের ফলে সেদিন সন্ধ্যের পর সবে রাস্তায় জল জমতে শুরু করেছে। বৃষ্টির জন্য ট্রামে ভিড় হয়নি। সেদিন আর দাঁড়িয়ে নেই, আমি, বসে বিড়ি ধরিয়েছি।
ট্রামটা থামল পূর্ণ থিয়েটারের সামনে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই ছোটো একটি ছাতা মাথায় দিয়ে একটি তের-চোদ্দ বছরের মেয়ে ট্রামে উঠে একপাশে বসল।
ট্রাম চলতে লাগল। অন্ধকার আর বৃষ্টিধারায় বাইরের রাস্তাবাড়ি সব ঝাপসা। গাড়ির কাচ নামানো। বাধ্য হয়ে ভেতরের যাত্রীদের দিকে তাকাতে তাকাতে মেয়েটির ওপর নজর পড়ল। মনে হল একে যেন কোথায় দেখেছি। একটু ভাবতেই চিনতে পারলাম। ক-দিন ধরেই মেয়েটিকে ঠিক সন্ধের পর ট্রামে দেখি। এসপ্ল্যানেডে গিয়ে নামে রোজ। আর ফেরে সেই শেষ ট্রামে।
ভালো করে তাকালাম। অল্প বয়েস কিন্তু অনুপাতে যে শ্রী থাকা দরকার তা নেই। রোগা, গালভাঙা, শুকনো। একটা রঙিন সস্তা শাড়িকে যথাসম্ভব গুছিয়ে আঁটসাট করে পরেছে। গলায় একটা পুঁতির মালা, হাতে কাচের চুড়ি, মাথায় চুল আছে খুব, সেগুলো সযত্নে মস্ত বড়ো খোঁপায় বাঁধা। মুখের ওপর পাউডারের একটা ক্ষীণ আভাস, আর অল্প-দামি এসেন্সে সুরভিত ছোট্ট একটা রুমাল হাতে। এতে আকৃষ্ট হবার কিছুই ছিল না। কিন্তু সব মিলিয়ে মেয়েটির যে বসার ভঙ্গি, মুখের মধ্যে পাকা পাকা ভাব আর চোখের মধ্যে যে আশ্চর্য একটা জ্বালাময় দীপ্তি ছিল তা আমাকে আকৃষ্ট করতে বাধ্য করল। আমি তখন যুবক, বাইশের কোঠায় পা দিয়েছি, রক্ত আমার উগ্র পৌরুষের সঙ্গে লোভ-লালসার অনুচর। কিন্তু জীবন কী সেটা টের পেয়েছিলাম বলেই রাশ আমার হাতছাড়া হয়নি আর মানুষের মুখ দেখেই তার চরিত্র অনুমান করে নেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা জন্মেছিল। সেই ক্ষমতাবলেই আবিষ্কার করলাম যে ওই মেয়েটির চোখে গরিব পাঁকের বিষাক্ত ইতিহাস।
এসপ্ল্যানেড নয়, মিউজিয়ামের কাছাকাছি আসতেই মেয়েটি একবার এদিক ওদিক দেখে ছাতাটা খুলে নেমে গেল।
বুড়ো ইনস্পেক্টর তারিণীদা ছিলেন তখন আমাদের ক্লাসে, মেয়েটি যেতেই বললেন, ‘ওই গেল একটি’—
প্রশ্ন করলাম, ‘কী গেল তারিণীদা?’
তারিণীদা গাল দিলেন, ‘শালা ন্যাকা সাজছিস—বিদ্যেধরীদের তুই দেখিসনি?’
‘বিদ্যেধরী! ওইটুকু তো মেয়ে’—ইচ্ছে করেই বোকা সাজলাম। তারিণীদাকে চটালে লাভই হয়।
‘ওইটুকু!’ তারিণীদা অনুকম্পার হাসি হেসেই আমাকে নস্যাৎ করার উপক্রম করলেন, ‘আরে এই কলিতে সবই সম্ভব। আর তোদের দেশে তো ওসব আকছার চলেছে। তোদের দেশে রাজা থেকেও রাজা নেই, তোরা দেশের লোক হয়েও মানুষ নস তো ওসব হবে না? তাছাড়া ইজ্জত বেচেও কিছু হয় না, তারপরেও তো ফুটপাথে মরে শালা। তোদের দেশে ওটুকু মেয়েরাও রাতের আঁধারে এই ঝড়জলের রাতে ঘুরে বেড়ায় আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমোস। ঘুমোবিই তো—তোরা কি মায়ের দুধ খেয়েছিস’—
বাধা দিয়ে বিনীতকণ্ঠে বললাম, ‘মায়ের দুধ তুমি খেয়েছ তো তারিণীদা?’
‘আমি!’ তারিণীদা মাথা নাড়লেন, ‘না। তাছাড়া আমি তো তোদের মতো ব্যাটাছেলে নই, মেয়েছেলেও না। আমি কি তা জানি না, তা ভাববারও চেষ্টা করিনি—শুধু দিনরাত একটি কথাই মনে রেখেছি যে আমি ট্রাম কোম্পানির একটি টিকিট ইনস্পেক্টর’—
এসপ্ল্যানেড। কারো দিকে না তাকিয়েই তারিণীদা নেমে গেলেন।
তারিণীদার কথাগুলো ভাবলাম। কথার মধ্যে বুড়ো এমন একটি আবেগ সঞ্চারিত করেছিলেন যে অনেকক্ষণ ধরে ট্রামের তালে তালে তা আমার মাথায় হাতুড়ির মতো আঘাত করেছিল। অনেকক্ষণ ধরে তাঁর কথাগুলো আমাকে লজ্জা দিয়েছিল।
তারপরেও দু-তিনদিন আমি মেয়েটিকে লক্ষ্য করলাম। সেই একই রকম প্রসাধন তার। সন্ধ্যের পর সে ট্রামে ওঠে। নিঃশব্দে, ক্লান্ত, বিষণ্ণ ও করুণ ভঙ্গিতে এককোণে বসে থাকে। নড়ে না চড়ে না, কিন্তু তার জ্বলজ্বলে চোখের তারা দুটো কামরার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত মাঝে মাঝে দেখে নেয়। যেন কী খোঁজে সে। কাজের ফাঁকে তার সেই সন্ধানী দৃষ্টির গতি লক্ষ করেছি আমি। আমাকেও রেহাই দেয়নি তা, লেহন করেছে আমার সর্বাঙ্গ!
এমনিভাবেই ক-দিন কেটে গেল।
সেদিন বিকেলে আমার ডিউটি ছিল না। শ্যামবাজারে আমার মাসিমার ওখানে বেড়াতে গিয়ে ফিরতে প্রায় রাত দশটা হল। এসপ্ল্যানেডে এসে একটা টালীগঞ্জগামী ট্রামের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। এমনি সময়ে লক্ষ্য করলাম সেই মেয়েটাকে। ওয়েটিং-রুমের একটা থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকেই চোখ রাখলাম তার ওপর।
লোকজন আসছে, দাঁড়াচ্ছে, গল্প করছে। দু-একজন পায়চারি করছে। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম যে তাদের মধ্যে একজন আধাবয়সী পশ্চিমা লোক পায়চারি করতে করতে মেয়েটিকে দেখল, তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে মেয়েটির দু-তিন হাত দূরে গিয়ে দাঁড়াল, পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল লোকটা। ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে ছেড়ে দিয়ে মেয়েটার দিকে মাথাটা ঘুরিয়ে কী যেন বলল। মেয়েটা আস্তে আস্তে তার দিকে মাথা ঘোরাল। লোকটা আবার কী যেন বলল। মেয়েটা তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সোজা এগিয়ে গেল কার্জন পার্কের দিকে। লোকটা দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে লাগল।
বালিগঞ্জের একটা ট্রাম এল। একদল লোক আমার সামনে দিয়ে ছুটে গেল। দৃষ্টিপথ পরিষ্কার হতেই দেখলাম যে লোকটা সেখানে নেই।
কৌতূহল মেটাবার জন্যে পার্কের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঠিকই ধরেছি। আধো অন্ধকারেও প্রায় কুড়ি-পঁচিশ হাত দূরে সেই মেয়েটিকে দেখতে পেলাম। তারপাশেই লোকটা। মাঠের নির্জনতা আর অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।
নতুন করে তারিণীদার কথাগুলো মনের মধ্যে খচ খচ করতে লাগল যে-বিদ্যুতে লোহার ট্রাম মাটি কাঁপিয়ে ছোটে সেই বিদ্যুতের মতোই একটা নাম না-জানা ঢেউ আমার রক্তে দোলা দিল, বারবার আমার পেশিগুলোতে এসে মাথা খুঁড়তে লাগল। তবুও কিছু করতে পারলাম না।
কদিন পর। আমার বিকেলের দিকে ডিউটি। আবার মেয়েটাকে দেখলাম। দেখেই কেমন যেন রাগ হল। তারিণীদার কথা সত্য। কিন্তু দেশের অবস্থা তো একদিনেই বদলাতে পারব না আমরা। ততদিন কি এইভাবেই গোল্লায় যাবে সব?
টিকিট চাইতে গিয়ে কড়া নজর মেলে তাকালাম মেয়েটার দিকে।
মেয়েটা একটা দু আনি দিয়ে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলল, ‘এসপ্ল্যানেড’—তারপরেই মুখ ফিরিয়ে নিল।
টিকিটটা পাঞ্চ করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার নাম কী বল তো? তোমায় যেন চিনি।’
মেয়েটা তাকাল আমার দিকে, তার চোখের তারায় শানিত দীপ্তি। কিন্তু মুখের কোথাও একটুকু রেখাপাত হল না তার, স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘আপনি আমাকে চেনেন না’—
‘নামটা কি বলই না।’
‘না, টিকিট দিন।’
টিকিটটা দিয়ে বললাম, ‘রোজই রাতেরবেলা বাড়ি থেকে বেরোও তুমি—কেন?’
‘আপনার তাতে দরকার কী?’ মেয়েটার গলাতে প্রচণ্ড ঝাঁজ।
‘তোমার মা-বাবা নেই?’
‘তাতেই বা দরকার কী আপনার? যান টিকিট বেচুন গে—’
চটে আরো কড়া কিছু বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু একজন যুবক যাত্রী হঠাৎ কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠল, ‘অত জেরা করছেন কেন মশাই? আপনি কি দারোগা সাহেব?’
বললাম, ‘দেখছেন না এ কী?’
মেয়েটা সাপের মতো ফুঁসে উঠল, ‘শুনছেন? শুনছেন আপনারা? কী ছোটোলোক!’
সেই যুবক যাত্রীটি আমায় ধমকে বলল, ‘খবরদার মশাই, ফের ভদ্রলোকের মেয়ের সঙ্গে ওভাবে কথা বললে আপনাকে এবার মার লাগাব—’
কামরার মধ্যে আরো কয়েকজন ওদের সমর্থন করল। শেষ পর্যন্ত সেই অপমান হজমই করলাম।
জগুবাবুর বাজারের কাছে এসে মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। সেই যুবকটির দিকে চকিত একটি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড বাদে যুবকটিও নেমে গেল।
দাঁতে দাঁত ঘষলাম শুধু।
কালীঘাট থেকে ডালহাউসি রুট। তারপরেও কতদিন দেখেছি মেয়েটিকে। সেই একই ভঙ্গি। নিঃশব্দ, করুণ কিন্তু কুটিল চাউনি। দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিতাম আমি। ঘৃণায়।
হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম মেয়েটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলাম আপদ গেছে।
তারপর তেতাল্লিশ সন শেষ হয়েছে। যুদ্ধ একইভাবে চলেছে পৃথিবীতে। দুর্ভিক্ষের বীভৎসতা তখন আর রাস্তাঘাটে বেশি নজরে পড়ে না। যারা নিম্লবিত্ত, নিতান্ত দরিদ্র ছিল তারা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু দুর্ভিক্ষ তখন মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে, তার থালায় অন্নের মাপ কমিয়েছে, তার নারীর লজ্জাবস্ত্রে দুঃশাসনের মতো আকর্ষণ করছে আর তাদের রক্তে এনেছে নতুন জীবনের প্রতিজ্ঞা। আমার বুকেও সে প্রতিজ্ঞা ধবনিত হয়েছে, গুমরে মরেছে, কিন্তু তবু আমি কিছু করতে পারিনি। ট্রাম চলেছে আমার—বিদ্যুতের তারে নীল আলোর স্ফুলিঙ্গ ছিটিয়ে, লোহার লাইনে লোহার চলার গান গেয়ে, পৃথিবীর মহৎ নতুনদের অশান্ত পদক্ষেপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, মাটি কাঁপিয়ে। আর সেকেন্ড ক্লাসের কামরায় চামড়ার থলি থেকে টিকিট বের করে সবাইকে পাঞ্চ করে দিয়েছি আমি, পয়সা গুনে নিয়েছি, বিনা-টিকিটের যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছি। পঞ্চাশ টাকা মাইনের চাকরি বজায় রাখার দুরন্ত প্রয়াসে কখনো দেখতেই পাইনি যে বসন্তের সন্ধ্যায় নিবে আসা দিনের রাঙা আলোর তলায় ময়দানকে কেমন দেখায়, কিংবা শরতের দুপুরে।
শরৎ নয়, শীতকাল তখন। সেদিন বেশ কনকনে উত্তুরে বাতাস বইছিল। কোম্পানির গরম কোটেও যেন শীত আটকাচ্ছে না। এলগিন রোডের কাছে ঘ্যাঁচ করে ট্রামটা থেমে পড়ল। সামনেই একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। হৈ হৈ শুরু হল। প্রায় পাঁচমিনিট বাদে ট্রামের মোটর আবার গোঁ গোঁ করে উঠল। আর ঠিক সেই সময়ই একজন যুবতী এসে ট্রামে বসল।
টিকিট চাইতে গিয়ে চমকে গেলাম। এ যে সেই মেয়েটা! আরে! চেহারাটা যে বেজায় পালটে গেছে। গায়ে গতরে মাংস জমেছে, গাল ভরেছে, ঠোঁটের ওপর হালকা লিপস্টিকের রক্তাভা। পরনে ভালো একটি রঙিন তাঁতের শাড়ি, হাতে ব্যাগ, পায়ে ভালো চটি।
‘টিকিট’—
‘পাঁচ পয়সা’—মেয়েটার গলা আগের চেয়ে অনেক সরল হয়েছে।
‘কোথায় যাবেন?’
মেয়েটা তাকাল আমার দিকে। স্পষ্ট বুঝলাম সে আমাকে চিনতে পারল, কিন্তু মুখে চোখে তা ফুটে উঠল না। মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘আপনি টিকিট দিন না, অত কথার দরকার কি?’
রাগ দমন করে টিকিট দিয়ে সরে গেলাম। ব্যাবসা জমিয়েছে মেয়েটা। পাপের সিঁড়ি বেয়েই ওপরে উঠেছে। চেহারাটা পালটেছে। আশ্চর্য, দেখতে ভালোই দেখাচ্ছে। পাপচারণের ফলে দেহের ওপর একটা বিচিত্র ছাপ পড়েছে। চোখের তারায়, ঠোঁটের বঙ্কিম রেখায়, বসবার ভঙ্গিতে তাকাবার কায়দায় এক বিচিত্র বার্তা। সে বার্তা পড়তে বা বুঝতে কারো ভুল হয় না।
একটা স্টপ পরেই নেমে গেল মেয়েটা। আমি মুখ বাড়িয়ে দেখলাম যে এগিয়ে গিয়ে ফার্স্ট ক্লাসে উঠে বসল। ওপরে উঠছে মেয়েটা তাই আমার সান্নিধ্য এড়িয়ে গেল। ট্রামের সেকেন্ড ক্লাসে সে আর চড়বে না।
সেকেন্ড ক্লাসের কন্ডাক্টর হওয়াটা সেদিন যেন কেমন খুব গৌরবের বলে মনে হল না।
মনের দুঃখটা বোধ হয় কেউ টের পেয়েছিল। ক-দিন বাদেই আমাকে ওয়েলিংটন-গড়িয়াহাটা রুটের ফার্স্ট ক্লাসে অস্থায়ীভাবে কাজ করতে দেওয়া হল।
নতুন রুটে ফার্স্ট ক্লাসে কাজ আরম্ভ হল। খুব মন দিয়ে কাজ শুরু করলাম নতুন উদ্যমে।
শীত গেল। বসন্ত এল।
হঠাৎ একদিন দুপুরে দেখতে পেলাম। রাতের ছায়াতে নয়, বসন্ত দুপুরের উজ্জ্বল আলোতে। কিন্তু এ রুটে এল কী করে? তাও কি জীবিকার জন্যে?
উন্নতি হয়েছে। ধাপে ধাপে অনেক ওপরে উঠেছে মেয়েটা। পরনে ক্রেপ সিল্কের রঙিন শাড়ি, গায়ের বর্ণ ঘষামাজাতে ফর্সা হয়েই উঠেছে। গায়ের গয়নাগুলো সবই সোনার। ভ্যানিটি ব্যাগ হাতে দুলিয়ে খুটখুট করে সে ট্রামে উঠল, সঙ্গে ত্রিশ-বত্রিশ বছরের একটি স্বাস্থ্যবান কৃষ্ণবর্ণ লোক। লোকটার চেহারা কর্কশ, রুক্ষ। ঘাড়ছাঁটা, দামি জামাকাপড়। উদ্ধত, দুর্বিনীত ভঙ্গি। কালোবাজার করে রাতরাতি বড়োলোক হয়েছে। দেখেই বোঝা যায়।
‘টিকিট’—মেয়েটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
‘আমি দেব,’ সেই লোকটা বলল।
‘না আমি’, মেয়েটা বলল।
লোকটা হাসল, পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে টস করে বলল, ‘হেড না টেল?’
মেয়েটা বলল, ‘হেড।’
লোকটা হাত মেলে পরাজিতের মুখভঙ্গি করল, ‘আচ্ছা তুমিই দাও।’
মেয়েটা নির্লজের মতো হেসে উঠল। একগাড়ি লোক কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই তার। হাসতে হাসতে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে অনেকগুলো নোটের ভেতর থেকে একটা দশটাকার নোট বের করে আমার দিকে তাকিয়েই হাসি থামাল। সে আমায় চিনতে পারল। আমি তার জীবনের প্রথম অধ্যায়ের সাক্ষী।
‘দুটো চৌরঙ্গি’, গম্ভীর হয়ে বলল সে।
আমি নোটটা ফিরিয়ে দিলাম, ‘চেঞ্জ নেই।’
বিরক্ত মুখে ভুরু কুঁচকে মেয়েটা বলল, ‘আমার কাছেও নেই।’
মনের ভেতরে বহুদিন ধরে একটা আক্রোশ জমা ছিল। এই মেয়েটার জন্য একদিন যে অপমানিত হয়েছিলাম সেকথা এখনো ভুলিনি।
বললাম, ‘তা আমি কী করব? চেঞ্জ নিয়ে বেরোতে পারেন না?’
মেয়েটার চোখেও শত্রুতা লক্ষ্য করলাম, সে বিষভরা গলায় বলল ‘ছোটোলোকের মতো কথা বলছ কেন?’
আস্পর্ধা দেখে জ্ঞান হারালাম, বললাম, ‘মুখ সামলে কথা বলো, তোমায় আমি চিনি’—
মুহূর্তে সেই কৃষ্ণবর্ণ লোকটা আমার ওপর লাফিয়ে পড়ল, ‘শাট আপ ইউ ব্লাডি সোয়াইন—শালা’—
আচমকা সামলাবার আগেই একটা চড় এসে লাগল গালে। সঙ্গে সঙ্গে আমি লাফালাম। যাত্রীরা হৈ হৈ করে উঠল। ইনস্পেক্টর ইদ্রিস মিঞা এসে পড়ল মাঝখানে। সবাই আমাকে দোষী সাব্যস্ত করল, চাকরি বাঁচাবার জন্য সেই মেয়েটা আর সেই লোকাটার কাছে মাপ চাইতেও হল। তবু আমার কথা বলতে পারলাম না। আর সেকথা বললেই বা কে বিশ্বাস করত? ঐশ্বর্য থাকলে অনেকের সমাজে সম্মান পাওয়া যায়। টাকা থাকলে চোর-লম্পটেরাও আজকের সমাজে সাধু এবং বিশ্বাসভাজন বলে নাম কেনে। ষাট টাকার চাকরি যার জীবন-ভোমরা তার কথায় কান দেবে কে?
ব্যাপারটা বেশিদূর গড়ায়নি। ইদ্রিস মিঞা রিপোর্ট করতে বাধ্য হয়েছিল, তবে বাঁচাবার চেষ্টাও করেছিল। অস্থায়ীভাবে আরো কিছুদিন কাজ চলবে কিন্তু হঠাৎ একদিন যে আবার সেকেন্ড ক্লাসে ফিরে যেতে হবে তা বুঝতে পারলাম।
মনের ভেতর অপমান জমা হয়ে রইল। আক্রোশের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলতে লাগল। একদিন কি সুযোগ পাব না। তারিণীদার কথা সব বাজে। এদের জন্য দরদ দেখানোর কোনো মানে হয় না।
বসন্তের পর গ্রীষ্ম এসেছে তখন। আবার দেখলাম ওদের। দুজনকেই।
একি! মেয়েটার কপালে সিঁদুর। না, ভুল দেখেছি। সিঁথিতে নেই, শুধু কপালে। গৃহস্থ-বধূ সাজার চেষ্টা করছে।
ওরা চিনল ঠিকই। কিন্তু আজ আর কোনো গণ্ডগোল হল না।
ওদের কথাবার্তা শোনার কৌতূহল হয়েছিল আমার। চেষ্টাও করেছিলাম। অতি সাধারণ কথাবার্তা। শাড়ি, সিনেমা, চাকরবাকরের গল্প, লোকটার নতুন কনট্র্যাকটের কথা।
আশ্চর্য হয়েছিলাম। মেয়েটা আজকাল তরতর করে বেশ কথা বলে।
ট্রাম থেকে ওদের নেমে যাবার সময় একটা জিনিস লক্ষ করলাম। মেয়েটার সন্তান হবে। আশ্চর্য! আর কত দেখব!
তারপর অনেকদিন দেখিনি ওদের। আবার দেখলাম পঁয়তাল্লিশের গোড়ায়। তখন আমি টালিগঞ্জ থেকে ডালহাউসিতে কাজ করছি। আবার সেই সেকেন্ড ক্লাসে। দেখলাম মেয়েটার কোলে একটা ছেলে। সঙ্গে লোকটা কিন্তু মেয়েটাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে। লোকটাও কথা বলছে না বেশি, গম্ভীর হয়ে আছে। ওর বেশি সেকেন্ড ক্লাস থেকে আর বোঝা গেল না।
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেছি আমি। আবার সেকেন্ড ক্লাসে ফিরে এলাম। ওই মেয়েটাকে একদিন অপমান করতে পারলাম না। অক্ষম পুরুষের মতো এই প্রতিশোধ কামনার হাত থেকে আমি নিষ্কৃতি পাইনি।
যুদ্ধ শেষ হল। কনট্রাকটের বাজার মন্দা হয়ে এল। দেশে নিত্য নতুন বেকারের দল বাড়তে লাগল। উত্তেজনা। আন্দোলন। সে ঢেউ এসে ট্রামের গায়ে লাগে। ছেচল্লিশ সাল এল।
এরই মধ্যে দেখলাম মেয়েটাকে। দিনের বেলা। টালিগঞ্জের একটা স্টপে। এক বছরের ছেলেটাকে কোলে করে সে দাঁড়িয়ে। একবার ফার্স্ট ক্লাসের দিকে এগিয়ে গিয়ে তারপর ফিরে এসে সেকেন্ড ক্লাসেই উঠল। সঙ্গে আজ লোকটি নেই।
‘টিকিট’—
মেয়েটা তাকাল। আজ তার চোখে সেই আগুন দেখলাম না। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বিষণ্ণ দুটি চোখে সে একবার তাকিয়েই হাতের ছোট্ট একটা মানিব্যাগ থেকে পয়সা বের করতে লাগল।
‘ভবানীপুর একটা’—
‘কেন? চৌরঙ্গি নয়?’ খোঁচা দিয়ে ক্লেশ তিক্ত কণ্ঠে বললাম। আমার আক্রোশ এখনো যায়নি।
‘না’, মেয়েটা মুখ তুলল না।
‘সেই লোকটা কোথায়?’
‘কার কথা বলছেন?’
‘আপনার সঙ্গেকার’—
‘আমার স্বামী’, মেয়েটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে তাকাল একবার আমার দিকে। কিন্তু চোখে আর সেই আগুন নেই কেন? কী বিশ্রী চেহারা হয়েছে এখন! সোনার গয়নাও কমে গেছে দেখছি। শাড়িটাও সাধারণ তাঁতের। ব্যাপার কি?
হেসে বললাম, ‘স্বামী! ওহো—তা তিনি কোথায়?’
”কাজে।”
ব্যঙ্গভরা গলায় বললাম, ‘কাজে? না পালিয়েছে?’
মেয়েটা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো তাকাল আমার দিকে, তারপর বলল, ‘আপনি কি চান যে আমি চেঁচাব?’
মুহূর্তের জন্য বোধ হয় মেয়েটার চোখে একটা বন্যভাব ঘনিয়ে এল। দেখে মনে মনে থমকে গেলাম, কিন্তু মুখে একটা বেপরোয়া হাসি ফুটিয়ে অন্য কোণে চলে গেলাম। থাক, আর ঘাঁটাব না। তবে শিগগিরই অপমান করার সুযোগ পেয়ে যাবো। ধাপে ধাপে যেমন উঠেছিল, তেমনি ধাপে ধাপেই আবার নামতে শুরু করেছে।
আবার সেই করুণ বিষণ্ণ ভঙ্গিটা ফিরে এসেছে মেয়েটির।
ক-দিন পরেই দাঙ্গা শুরু হল। ঝড়ের মতো এল শয়তান, কলকাতার রাস্তায় রক্তের হোলি খেলে হিন্দু-মুসলমান। গুলি, অ্যাসিড, বোমা। আর আতঙ্কে শহর কাঁপে, দিনরাত কাঁপে। তার মধ্যে আমাদের ধর্মঘট গেল। এমনিভাবে ছেচল্লিশ গেল, সাতচল্লিশ এল। দেশভাগের আয়োজন শুরু হল।
মনের মধ্যে আরো জ্বালা জমা হল। পাঁচ বছর ধরে চাকরি করছি। বয়স প্রায় ছাবিবশ-সাতাশ হল কিন্তু বিয়ে করলাম না, এমনকি কোনো মেয়েকে ভালোবাসার চেষ্টা করব সে-ভরসাও হল না। কী হবে তা করে? তাতে শুধু চিত্তে তাপই বাড়ে, দুঃখই বাড়ে। তার চেয়ে ভুলে যাওয়াই ভালো যে পুরুষের জীবনে নারীর দরকার আছে। ওসব আমাদের দরকার নেই। আমাদের মতো গরিবদের ত্যাগ এবং ব্রহ্মচর্যের পাঠ নিয়ে কামিনী-কাঞ্চনের ব্যাপারটা বড়োলোকেদের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। আমাদের বঞ্চনাকে ওরা হিসেব করে পুষিয়ে নেবে।
এমনি যখন মনের অবস্থা হয়ে উঠেছে তখন একদিন সন্ধ্যায় দেখলাম সেই মেয়েটিকে।
‘টিকিট?’
‘ছ পয়সা—এসপ্ল্যানেড।’
তাকালাম, ‘এসপ্ল্যানেড।’
ও মাথা নেড়ে বিষণ্ণভাবে হাসল।
দাঁতে দাঁত ঘষলাম, দাঁড়াও রাক্ষসী, তোমাকে অপমান করার দিন পাব।
কিন্তু কী বিশ্রী হয়ে গেছে মেয়েটা! কানের রিং দুটো ছাড়া যে আর সোনা নেই গায়ে! হাতে আবার কাচের চুড়ি ফিরে এসেছে, গলায় নকল মোতির মালা।
এসপ্ল্যানেডেই নেমে গেল ও।
তারপর অনেকদিন দেখিনি। অনেকদিন।
লোহার লাইনে শব্দের তরঙ্গ তুলে, আমার ট্রাম যখন বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ ছিটিয়ে ময়দানের পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে তখন মাঝে মাঝে মেয়েটার কথা বিদ্যুৎ-চমকের মতোই মাথার মধ্যে খেলে গেছে। বোধহয় ময়দানকে দেখেই মনে পড়েছে। দিনেরবেলা ময়দানের সবুজ, স্নিগ্ধ আলো-টলমল রূপটি দেখে আমার তার রাতের রূপের কথা মনে পড়েছে। নির্জন, অন্ধকার ময়দানে হয়তো ওই মেয়েটি এখানো যায়। চৌরঙ্গির মোড়ে দাঁড়িয়ে বা চলতে চলতে কারো গায়ে পড়ে ভাব জমিয়ে হয়তো কোনো কুলি কিংবা কোনো গাড়োয়ানকে বগলদাবা করে ওই ময়দানেরই কোথাও গিয়ে মাঝে মাঝে মেয়েটা বসে—তারপর—
‘টিকিট করেছেন? আপনার টিকিট? টিকিট মশাই?’
ঢং ঢং—
আমার ট্রাম চলেছে। দিন গেছে রাত। তবু আমার ট্রাম চলেছে। ট্রামের চাকার লোহার গান শুনতে শুনতে আমার প্রতিদিন শক্তি বেড়েছে। আমার লোহার রথের উদ্দাম গতি আর যৌবন চাঞ্চল্য আমাকে প্রতিদিনই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে লোহার মতো কঠিন না হলে, লৌহযানের মতো একরোখা না হলে কখনো জীবনকে বদলানো যাবে না।
দিন কেটেছে আর একটু একটু বদলেছি।
কিন্তু এর মধ্যে আর দেখিনি সেই মেয়েটাকে। মনে হয়েছে যে আমাকে এড়িয়ে সে গাড়িতে চড়ে তার নৈশ অভিযানে যায়। আমি তার উত্থান-পতনের, সেই বিয়োগান্ত কাহিনির আংশিক সাক্ষী—আমার সামনে দাঁড়াতে যে লজ্জা করে।
কিন্তু দেখা আবার হল। ঊনপঞ্চাশে। তখন বৈশাখ মাসের শেষ, রাতের বেলা ফিরছি বালিগঞ্জের দিকে। এসপ্ল্যানেড ছাড়তেই কালবৈশাখী এল। রাস্তায় লোকজন কমে গেছে, রাত নিঃশব্দ হয়ে আসছে, মনের সুখে ঝড় ধুলো উড়িয়ে হা হা করে ছুটল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমার ট্রাম ছুটল। ড্রাইভার রামবিরিজ দুবের মনেও ঝড়ের দোলা লাগল। ঝড়ের বুক চিরে ট্রাম ছুটল। কিন্তু যাদুঘরের কাছাকাছি স্টপে কে যেন হাত তুলল! থামল ট্রাম। একটি মেয়েলোক উঠল। আবার ট্রাম ছুটল।
‘টিকিট’—
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, ‘পয়সা নেই’—
খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘নেই তো উঠলে কেন? নেমে যেতে হবে’—
মেয়েলোকটি আমার দিকে তাকাল। ঝড়ো হাওয়াকে চিরে আমার ট্রাম তখন বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ ছিটিয়ে চলেছে, হাওয়া এসে চোখের ওপর চিলের মতো ঝাপটা মারছে, তবে চিনলাম। সেই মেয়েটি।
‘তুমি!’
মেয়েটি বলল, ‘রাত হয়েছে, বাড়ি ফিরতেই হবে’—
অনেকদিন আক্রোশ জমা ছিল, বললাম, ‘একদিন চড় মেরেছিল তোমার সেই দুদিনের নাগর মনে আছে?’
সে বলল, ‘মাপ করুন দাদা।’
দাদা! বুকের ভেতর যেন হাতুড়ি পড়ল একটা।
মেয়েটি বলে চলল, ‘আজ কিছুই পাইনি—ওদিকে ছেলেটার জ্বর, একা পড়ে আছে বাড়িতে’—
খুক খুক করে কাশতে শুরু করল সে। তাকালাম। কালো কুচিছত হয়ে গেছে তার চেহারা, বুড়িয়ে গেছে। ছ’বছর আগেকার সেই গালভাঙা শীর্ণ চেহারা আবার ফিরে এসেছে কিন্তু সেদিন অল্প বয়েসের ছাড়পত্র ছিল দেহে, আজ কোনো সম্বলই নেই। সাধারণ মোটা একটা মিলের শাড়ি পরনে। নিরাভরণ।
‘দাদা’
বললাম, ‘বোসো।’
ঝড়ের শব্দ থেমে গেল আমার কানে। ট্রামের চাকার লৌহ-সঙ্গিত যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। করুণ বিষণ্ণ, সেই পুরনো ভঙ্গিতে বসে রইল মেয়েটি। লোক উঠল, নামল, টিকিট দিলাম, পয়সা নিলাম আর তারই ফাঁকে ফাঁকে সেদিন মেয়েটির জীবনের টুকরো টুকরো খবর নিলাম, ছ-বছর ধরে দেখেছিই শুধু, অথচ ওর জীবনের কিছুই তো জানি না।
ওর নাম ছিল বাসনা। মা ছিল না, বাপ কোনো ছুতোরের দোকানে কাজ করত। টাইফয়েডে বাপ মরল। ও এল ওর দিদির ওখানে ভবানীপুরে। ভগ্নীপতি কাজ করে কোন মোটর কোম্পানিতে। কিছুদিন বাদেই ভগ্নীপতি কলেরা হয়ে মরল। দুইবোন অন্ধকার দেখে। তিনটি বাচ্চা আছে দিদির। শেষ পর্যন্ত দুইবোন রাস্তায় বেরোলো। দুজন দুদিকে যেত! পাড়ার মধ্যে ওসব করলে ইজ্জত থাকবে না। এমনি ভাবে চলতে চলতে অবস্থা একটু ফিরল। হঠাৎ কালোবাজারের সওদাগরকে পাকড়াও করে বাসনা। মিথ্যা এক কাহিনির জৌলুসে সওদাগর তাকে আনকোরা ভেবে আলাদা এক ফ্ল্যাটে নিয়ে তুলল। কিন্তু সওদাগরের ফুর্তির দিকেই ঝোঁক। বাচ্চাটা হতেই রস উড়ে গেল তার। তারপর একদিন নিরুদ্দেশ হল সে। আবার সব গেল। হতভাগী ঘর বাঁধতেই চেয়েছিল, ফলে মনের ওপর আঘাত পড়ল! একের পর এক গয়না আর টাকা সব গেল। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য গেল। দিদির সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করে অন্য বাসা করল সে। কিন্তু কঠিন ব্যাধি হল। তা সত্ত্বেও আবার নতুন করে বেরোতে লাগল সে, কিন্তু আগের মতো আর জমল না। দেহে ঘুণ ধরেছে—
খুক খুক কাশতে লাগল মেয়েটা। তার দুচোখ দিয়ে জল গড়ায়।
কালীঘাটের মোড় এল।
‘যাই দাদা’—নেমে গেল সে। ধুলোর ঘূর্ণির মধ্যে তাকে ছেড়ে দিয়ে আমার ট্রাম বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে গেল।
ট্রামের চাকায় চাকায় হঠাৎ যেন শব্দ উঠল—’দাদা-দাদা-দাদা’—
তারপর আরো দুবার দেখা হয়েছিল।
প্রথমবার দিনেরবেলা। চিত্তরঞ্জন সেবাসদনের কাছে, সঙ্গে তার ছেলে।
ছেলেটাকে সেই কবে দেখেছিলাম। এখন সে পাঁচ বছরের। রোগা খিটখিটে।
‘চড়ব দাদা—জ্বর হয়েছে, আর হাঁটতে পারছি না।’
‘ওঠ।’
উঠে দাঁড়িয়ে রইল এক পাশে। সংকোচে।
বললাম, ‘বসো।’
বসল। সেই করুণ, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে। চোখের দৃষ্টিতে আর সেই ধার নেই। ঘোলাটে, মৃত দৃষ্টি। খুক খুক করে কেশে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
ছেলেটা নাকিসুরে কাঁদতে লাগল সারা রাস্তা, ‘খিদে পেয়েছে—কখন খেতে দিবি? বল না, কখন খেতে দিবি? এই রাক্কুসী’—
সমানে শুনে গেল মেয়েটা। নড়ল না, কথাটি বলল না।
শেষ দেখা পূর্ণ-র সামনে। ফুটপাতে ছেলেটাকে নিয়ে বসে আছে। ছেলেটা ভিক্ষে চাইছিল, ‘ও, বাবু—খিদেয় মরে যাচ্ছি, বাবু ও বাবু—’
কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখেছিলাম। তারপর ট্রাম ছেড়ে দিয়েছিল। ফিরেও তাকাইনি। তাকালেই ‘দাদা’, ডাকটা মনে পড়ে। তার চেয়ে না তাকানোই ভালো।
এরপর মেয়েটাকে আর দেখিনি। কিন্তু ছেলেটাকে দেখেছিলাম মাস ছয় পরে। পঞ্চাশ সালে।
একজন কনস্টেবল ছেলেটাকে নিয়ে কালীঘাটের মোড়ে আমার ট্রামে উঠল।
যাত্রীরা প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার? চুরি করেছে?’
কনস্টেবল মাথা ঝাঁকাল, ‘উহুঁ, ওর মা মরেছে—’
‘কেন? কী হয়েছিল?’
‘ব্যামো। ঘরে মরে পড়ে ছিল—এই ছোঁড়া কাঁদছিল—যাচ্ছি থানায় নিয়ে রিপোর্ট দিতে।’
‘তা এখন কি হবে ছেলেটার?’
‘ওর কে এক মাসি আছে—সেখানে যাবে। সরকার এখন দেশশুদ্ধ অনাথের বোঝা বইবে নাকি?’
‘তা তো নিশ্চয়ই সিপাইদাদা—তা কী করে বইবে?’
ছ-মাস আগে ছেলেটাকে কাঁদতে দেখেছিলাম। আজ কিন্তু ছোঁড়া কাঁদল না।
কিন্তু আশ্চর্য। মেয়েটা মারা গেল! সেই কবে থেকে দেখে আসছিলাম। কত চেনা হয়ে গিয়েছিল?
ট্রামের চাকায় যেন প্রতিধবনি উঠল, ‘দাদা—দাদা—দাদা—’
তবু কিছু করতে পারলাম না, ছেলেটার দিক থেকে মুখটা শুধু ফিরিয়েই নিলাম।
সেই ছেলেটা—একটু আগে জগুবাবুর বাজারে যে আমাকে গাল দিয়ে নেমে গেল, কিন্তু ও থাকে কোথায়? মাসির ওখানে? নিশ্চয়ই না, ও থাকে রাস্তায়, ফুটপাথে, এ-বাড়ি ও-বাড়ির বারান্দায়। স্বাধীন কুকুর কিংবা ইঁদুরের মতো।
ট্রামটা থামল। আমার ট্রাম এখন ডালহাউসি ছুঁয়ে আবার বালিগঞ্জে ফিরছে। ভিড় কম।
যাদুঘরের স্পট থেকে একটি মেয়ে উঠল সেকেন্ড ক্লাশে।
‘টিকিট।’ তাকাল, বলল, ‘কালীঘাট।’
টিকিট দেবার সময় চিনতে পারলাম। সেই একই চোখের চাউনি।
বাসনারই মতো আর একটি মেয়ে। বাসনা মরলেও ওদের দল বাড়ছে। সবংশে।
মুখটা ফিরিয়ে নিলাম। ট্রামের চাকার লোহার গান শুনতে শুনতে দাঁতে দাঁতে ঘষলাম। আমার প্রতি নখের ডগা দিয়ে যেন বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ বেরোতে চাইল। কিন্তু তবু কিছুই করতে পারলাম না শুধু একজন যাত্রীর কাছে হঠাৎ অকারণে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘টিকিট—টিকিট মশাই?’
