আদরিণী – প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
ভাদ্র মাসের এক পড়ন্ত বেলায় খালধার দিয়ে বাড়ি ফিরছিলুম। ক’দিন থেকে বৃষ্টি বন্ধ, দারুণ চাপা গরমের ঠেলায় শহরবাসীরা অস্থির। মধ্যে মধ্যে প্রকৃতি দেবী তাঁর ত্যজ্যসন্তান বঙ্গবাসীদের ওপর দিয়ে তাপসহনশীলতার যে পরীক্ষা চালান তারই একটি মহলা চলেছিল। ঘামে আর খালধারের মেটে রাস্তার ধুলোয় অঙ্গটি পচা ভাদ্রের একটি বিশিষ্ট সংস্করণ হ’য়ে উঠেছে, এমন সময় আকাশের এক কোণে কালো মেঘ দেখা দিল।
দেখতে দেখতে মিনিট কয়েকের মধ্যেই সারা শহর অন্ধকার হ’য়ে গেল। বরাতে দুঃখ আছে ভেবে দৌড়ে-হাঁটা শুরু করলুম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা! কিছুদূর যেতে না যেতেই মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেল। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হ’য়ে আশ্রয়ের চেষ্টায় মারলুম দৌড়। শেষকালে একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়ে এক খোলার চালের বাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়া গেল।
যে জায়গাটায় এসে আশ্রয় নিলুম সেখানে আরও দু’চারজন রাহীলোক দাঁড়িয়েছিল। একটা বড় খোলার চালের বাড়ি, রাস্তার ধারে চালাটা খানিকটা বের করা আর ঝোলা—তাঁরই নিচে মাথা গুঁজে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে লাগলুম। মাথা বাঁচল বটে, কিন্তু জলের ছাটে সর্বাঙ্গ ভিজতে লাগল আর মাঝে মাঝে দমকা বাতাস আত্মসম্ভ্রমের ওপর বলাৎকার শুরু করে দিলে।
অনন্যোপায় হ’য়ে কাকভেজার আনন্দ উপভোগ করতে লাগলুম। বৃষ্টির ছাট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার আশপাশে যারা দাঁড়িয়েছিল তারা একে একে সরে পড়তে লাগল। আমার বাড়ি অনেক দূরে—বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়া সুবিচেনার কাজ হবে না, কাজেই স্থির করা গেল জল না থামলে নড়ব না।
এতক্ষণে আমার আশপাশের চারিদিকে ভালো ক’রে দেখবার সুযোগ হল। গলিটা বেশ চওড়া—দু’খানা গরুর গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারে। গলির দু’ধারেই খোলার বাড়ি—একেবারে শেষ অবধি।
দেখলুম আমার সামনেই রাস্তার ওপাশে আর একখানা খোলার বাড়ির গা ঘেঁষে এক ভিখারী বসে অবিশ্রান্ত চেঁচিয়ে ভিক্ষা চাইছে। লোকটি অন্ধ। মাথায় লম্বা চুল ও মুখের লম্বা দাড়ির অধিকাংশই পাকা। হিন্দুস্থানী ভাষায় সে চ্যাঁচাচ্ছিল—সে আক্ষেপের মধ্যে আল্লা ও খোদার বাহুল্য শুনে মনে হল সে ব্যক্তি মুসলমান।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি চলেছে। বৃষ্টির সঙ্গে প্রতিযোগিতা ক’রে সামনের সেই অন্ধ ভিখারীও অবিশ্রান্ত চিৎকার করছে। কখনো বা বৃষ্টির শব্দ তার আওয়াজকে ঢেকে ফেলছে, কখনো বা তার কণ্ঠস্বর বৃষ্টির আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠছে। আমি এপারে দাঁড়িয়ে ভিজে লোকটার কৃচ্ছ সাধনা দেখছি আর মনে মনে গবেষণা করছি, আল্লা ওরফে খোদা হিন্দুস্থানী ভাষা বুঝতে পারে কি না!
বেলা পড়ে আসতে লাগল। ক্রমে রাস্তা জনবিরল হ’য়ে পড়ল। বৃষ্টিধারা কখনো একেবারে কমে আসে কিন্তু আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়বার উপক্রম করলেই আবার চেপে আসে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জলসমাধিস্থ হওয়ার চাইতে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়া শ্রেয়ঃ এই রকম একটা সঙ্কল্প মনে মনে দৃঢ় করবার চেষ্টা করছি, এমন সময় আমার কানের কাছে করুণ কন্ঠে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ধবনিত হল—কিছু ভিক্ষে দাও বাবা!
চমকে পাশে চেয়ে দেখি একটি মেয়ে! বয়স তার বাইশ-তেইশ বছর হবে, রংটি ফিকে মেঘের মত ময়লা। একখানা ছেঁড়া শাড়ী দিয়ে সর্বাঙ্গ আবৃত! শাড়ীখানা ভিজে গায়ের সঙ্গে একেবারে লেপ্টে গিয়েছে, তার ছিন্ন অবকাশ দিয়ে উত্তমাঙ্গের প্রায় সবটাই দেখা যাচ্ছে। অঙ্গ তার ভিখারিনীর মত কৃশ নয়, বেশ সুপুষ্ট—বিশেষজ্ঞের চোখে প্রথমেই তা ধরা পড়ে। সমস্ত দেহে এমন কমনীয়তা ও লাবণ্য যে রাস্তা দিয়ে চলে গেলে ফিরে চাইতে হয়, পাশে এসে দাঁড়ালে তো কথাই নেই।
ভিখারিনী আবার বললে, কিছু ভিক্ষে দাও বাবা!
দেখলুম সে থর-থর করে কাঁপছে।
বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করব কিনা ভাবছি এমন সময় আবার সে বলে উঠল—একটি পয়সা ভিক্ষে দাও বাবা।
এবার তার চোখে চোখ পড়ল। চোখ দুটি এমন কিছু সুন্দর নয়, কিন্তু কি অদ্ভুত চাহনি সে চোখে! এমন করুণ দৃষ্টি আমি খুব কমই দেখেছি। হতশ্রী মালঞ্চের এক কোণে জঙ্গল পরিবেষ্টিত নির্জন স্বচ্ছ পুষ্করিণীর ধারে বসে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে ধরণীর যে মর্মব্যথা সেই কালো জলের বুকে ফুটে উঠতে দেখা যায়, তার দৃষ্টিতে যেন সেই ব্যথা স্থির হয়ে আছে। কোনো প্রশ্ন না ক’রে একটা পয়সা পকেট থেকে বের ক’রে তার হাতে দিলুম।
ওপারে সেই অন্ধ বৃদ্ধ তখনো তারস্বরে খোদাকে আবেদন জানাচ্ছে, বৃষ্টিধারা সমানে চলেছে। মেঘমণ্ডিত স্তিমিত সূর্যালোক আমার চারদিকে অলৌকিক মায়াজাল বিস্তার করতে লাগল।
পাশের মেয়েটির দিকে চেয়ে দেখলুম, আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে রাস্তার দিকে চেয়ে আছে।
তার সঙ্গে আমি যে কথা বলতে চাই, তার সম্বন্ধে জানতে চাই তা বুঝতে পেরে আমার কাছ থেকে সে বেশ একটু দূরে সরে দাঁড়াল। তারপরে হঠাৎ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাস্তার ওপারে গিয়ে সেই অন্ধ বৃদ্ধের হাতে পয়সাটা দিয়ে সামনের খোলার বাড়িটার ভেতর ঢুকে গেল।
ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকল। মনে হ’তে লাগল, ঐ মেয়েটা বোধ হয় ঐ বুড়োরই কেউ হবে, চারিদিক থেকে ভিক্ষে ক’রে নিয়ে এসে বুড়োর কাছে জমা দেয়। ঐ বাড়িটার মধ্যেও সে নিশ্চয় ভিক্ষা করতে ঢুকেছে—ব্যাপারটা শেষ অবধি দেখবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলুম।
বৃষ্টি সমানে চলেছে। ওরি মধ্যে কখনো চেপে আসে, কখনো বা প্রায় থেমে যায়। সন্ধ্যে হ’য়ে এলেও মেঘ কেটে যাওয়ায় তখনো একটু আলো আছে। বৃদ্ধ ভিখারীর চিৎকার একটু মন্দা পড়েছে, বোধ হয় সারাদিন চেঁচিয়ে এবার তার দম ফুরিয়ে এসেছে। আমি একদৃষ্টে সেই খোলার বাড়ির দরজার দিকে চেয়ে আছি।
হঠাৎ দেখলুম, একটি স্ত্রীলোক সেই বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে দরজার ধারের বাঁধানো রকের ওপর এসে বসল। চামচিকের মতন কালো আর রোগা, ধপধপে সাদা একখানা চওড়াপাড় শাড়ি পরা—চুল বাঁধার বাহার দেখেই বুঝতে পারলুম কে সে—কেন ওখানে বসে আছে।
মিনিট কয়েকের মধ্যে আর একটি স্ত্রীলোক বেরিয়ে এসে রকে বসল। আমি যে বাড়িটার ধারে দাঁড়িয়েছিলুম, দেখলুম সেখানকার দরজাতেও দু’চার জন স্ত্রীলোক এসে জমা হয়েছে। অন্ধকার ঘোর হবার আগেই তারা বেসাতি খুলে বসল। দেখলুম ওপারের সেই অন্ধ বৃদ্ধও তার জায়গা ছেড়ে উঠে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে চলে গেল। কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই দেখলুম, আমার সেই দয়াময়ী ভিখারিনী পরিষ্কার কাপড় পরে দরজায় এসে দাঁড়াল। বোধ হয় এই অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে বৃষ্টিও একেবারে থ মেরে গেল।
সংসারে আশ্চর্য ব্যাপারের অভাব নেই। শহরে যারা চোখ চেয়ে বাস করে অনেক আশ্চর্য ব্যাপারই তাদের কাছে অতিসাধারণ হ’য়ে ওঠে, তবুও এই ভিখারিনীর ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকল। আমি স্থির করলুম তার সম্বন্ধে জানতেই হবে।
জামাটা গা থেকে খুলে নিংড়ে কাঁধে ফেলেছিলুম। সেই অবস্থাতেই রাস্তা পার হ’য়ে ভিখারিনীর কাছে গিয়ে দরদস্তুর করে একেবারে তার ঘরে গিয়ে উঠলুম।
ঘরের ভেতরকার আসবাব ও তৈজসপত্রের বিবরণ আর দেব না। বাঙালী পাঠক-পাঠিকারা সে বিবরণ বহুবার অন্যত্র পাঠ করেছেন।
জিজ্ঞাসা করলুম, তোমার নাম কি?
আদরিণী, আৎরী বলে সবাই ডাকে।
ঘরের মধ্যে একটা ডিটমারের আলো জ্বলছিল, আদরিণী তার পলতেটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে আমার কাছে এসে বসল।
জিজ্ঞাসা করলুম, আমাকে চিনতে পারছ?
প্রশ্ন শুনেই আৎরী হাসতে আরম্ভ করে দিলে। হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করায় সে বললে, আহা কত ঢংই জান! আজ কি নেশা করা হয়েছে শুনি?
এই বলেই সে ভিজে জামটা আমার কাঁধ থেকে তুলে নিয়ে বললে, দাঁড়াও। উনুনের ধারে এটাকে টাঙিয়ে দিয়ে আসি—এক্ষুণি শুকিয়ে যাবে।
আদরিণী জামাটা আমার হাত থেকে একরকম কেড়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি বসে বসে ভাবতে লাগলুম, কি জানি বেপোট জায়গায় এসে আজ জামাটাই বুঝি আক্কেলসেলামী দিতে হয়। কিন্তু তখুনি সে ফিরে এসে বললে, এক্ষুণি শুকিয়ে যাবে।
তারপর আমার ধুতিটাতে হাত দিয়ে বললে, এঃ, ধুতিও যে ভিজে গিয়েছে। একখানা শাড়ী পরে ওটা খুলে দাও, শুকোতে দিয়ে দি।
সে উঠে গিয়ে আলনা থেকে একখানা চিরকুট ময়লা শাড়ী নিয়ে এসে বললে, নাও ওটা ছেড়ে ফেল।
ধুতিখানা আর বেহাত করবার ইচ্ছে ছিল না। বললুম— ও এখুনি গায়েই শুকিয়ে যাবে। তুমি একটু স্থির হ’য়ে ব’সো তো, তোমায় গোটাকতক কথা জিজ্ঞাসা করি!
শাড়ীখানা ছুঁড়ে একপাশে ফেলে দিয়ে সে আমার গা ঘেঁষে বসে বললে—বল।
আবার জিজ্ঞাসা করলুম, ঠিক করে বল তো আমায় চিনতে পারছ কি না?
তুমি তো মোড়ের ঐ বাঁশগোলায় কাজ কর। আগে দু’তিনবার এসেছিলে।
একটু রসিকতা করবার লোভ সামলাতে পারলুম না। বললুম, ছেলেবেলা থেকে বাঁশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকলেও ঠিক বাঁশগোলায় কখনো কাজ করিনি।
রসিকতাটা ঠিক বুঝতে না পেরে আদরিণী হাঁ করে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। আমি বললুম, দেখ তোমার কাছে একটা বিশেষ কাজে এসেছি। গোটাকতক কথার ঠিক উত্তর দিতে হবে—আমার অন্য কোন মতলব নেই, অবিশ্যি তোমার যা প্রাপ্য তা দেবো ভয় নেই।
আমার কথা শুনে আদরিণী ভয় পেয়ে গেল। সে আমায় ঠেসে গা ঘেঁষে বসেছিল, বেশ বুঝতে পারলুম অতি সন্তর্পণে আমার স্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত ক’রে নিচ্ছে। হঠাৎ মুখ তুলে আমার দিকে সেই দৃষ্টিতে চেয়ে বলল—আপনি কি পুলিশের লোক? বাবা আমি কোনো দোষ করিনি, আমার ওপর কোনো অত্যাচার করবেন না, আমি আপনার মেয়ে—মেয়েকে রক্ষে করুন।
এই বলে সে আমার পা দু’টো চেপে ধরলে।
আমি অপ্রস্তুত হ’য়ে পড়লুম। কেন যে আদরিণী অতখানি বাড়াবাড়ি করলে, তা বুঝতে পারলুম না। তাকে অভয় ও সান্ত্বনা দিয়ে বললুম, আমি মোটেই পুলিশের লোক নই বরং আমার দ্বারা যদি তোমার কোনো উপকার হয় তো বল আমি তা করতে চেষ্টা করব। তুমি বড় ভালো মেয়ে। তোমার মনের একটু পরিচয় পেয়েছি বলেই তোমার সঙ্গে ভাব করতে এসেছি—তোমার কোনো ভয় নেই।
আদরিণীর মুখে হাসি ফুটল। আশ্বাস পেয়ে সে আবার ‘আপনি’ ছেড়ে ‘তুমি’ ধরলে। বললে, আমি তোমার মেয়ে, তুমি আমার বাবা।
এই বলে সে আমার পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললে—বাবার বয়েস কত?
তেইশ বছর!
আদরিণী খিল খিল করে হেসে উঠে বললে, বেশ হ’ল, বাপ আর মেয়ে একই বয়সী। আমারও তেইশ বছর বয়েস বাবা।
ঠিক এই সময় আমাদের চমকে দিয়ে ঘরের বাইরে কে ঝঙ্কার দিলে—কে রে! কার সঙ্গে অমন মস্করা হচ্ছে! কে এয়েছে?
আদরিণীর হাসি থেমে গেল। এক মুহূর্তে চুপ ক’রে থেকে সে বলে উঠল, তোর বর এয়েছে। রাস্তা থেকে তোর বর নিয়ে এয়েছি—আয় না ভেতরে।
দরজা ধাক্কা দিয়ে এক নারী ঘরের মধ্যে ঢুকল। আমার মনে হ’ল দীনবন্ধু মিত্তিরের ‘জগদম্বা’ বুঝি নাটক থেকে উঠে এল।
আদরিণী বললে, দেখ তোর জন্যে কেমন বর জুটিয়ে এনেছি।
তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, কি বাবা পছন্দ হয়?
মুখ্যে আগুন! দিনে দিনে কত রঙ্গই হচ্ছে ! নে নে আদিখ্যেতা রেখে শীগগির কর। আবার লোক আসবে…
এই বলে স্ত্রীলোকটি বেরিয়ে গেল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম।
আদরিণী হাসতে হাসতে বললে, কেমন বাবা, পছন্দ হয়েছে আমার মাকে?
জিজ্ঞাসা করলুম, উটি কি তোমার মা নাকি?
আদরিণী অন্যদিকে মুখ করে সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একটু পরেই আমার জামাটা হাতে নিয়ে সে ফিরে এল। দেখলুম আমার ধপধপে সাদা সিল্ক টুইলের সার্ট ধোঁয়ায় প্রায় কালো হ’য়ে গিয়েছে আর তা থেকে মাছের ঝোল আর ধোঁয়া মিলিয়ে এমন বিকট গন্ধ বেরুচ্ছে যে, গায়ে দেওয়া দূরের কথা, সেটাকে কাছে রাখলে বমি ঠেলে আসে।
জামাটাকে গুটিয়ে পাশে রেখে বললুম, রসিকতা তো খুব হ’ল, এবার আমার কথার জবাব দাও দিকিন।
কি বল?
আমার কাছ থেকে একটা পয়সা চেয়ে নিয়ে ঐ যে অন্ধ বুড়োটাকে দিলে, ও তোমার কে হয়?
আদরিণী কিছুক্ষণ অবাক হ’য়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললে, ও তুমিই বুঝি ঐখানে দাঁড়িয়েছিলে! এতক্ষণে বুঝেছি!
কে হয় ও বুড়োটা তোমার?
কে আবার হবে! ও তো মোচলমান।
তবে?
আদরিণী কোনো কথা বললে না, চুপচাপ মাটির দিকে চেয়ে বসে রইল।
বললুম, তোমার তো অভাব কিছুই দেখছি না, তবে তুমি ভিক্ষাবৃত্তি কর কেন? আর কার জন্যেই বা কর?
আদরিণী চট ক’রে উঠে দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে বাইরের দিকে কি দেখে ফিরে এসে বললে—বাবা, আজ তুমি বাড়ি যাও, বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে—বলব—তোমাকে আমার সব কথা বলব, কিন্তু আজ নয়—কবে আসবে বল?
আবার আসতে হবে?
নিশ্চয় আসতে হবে। ভুলো না, আমি তোমার মেয়ে।
আদরিণী আমায় জিজ্ঞাসা করলে, তোমরা কি জাত?
জাতটাত আমি মানি না, তবে আমার শরীরে ব্রাহ্মণেব রক্ত আছে, এইটুকু বলতে পারি।
কি গোত্তর?
ভরদ্বাজ।
তোমার ভরদ্বাজের দিব্যি রইল, পরশু এস।
আদরিণীর বাবা ছিল ব্রাহ্মণ। বাঁকুড়ার কোন এক গ্রামে তাদের বাড়ি ছিল। কলকাতার রসুইয়ে বামুনের কাজ ক’রে সে বেশ দু’পয়সা উপার্জন করত। পরিবার থাকত দেশে, কিন্তু আদরিণীর যখন সাত বছর বয়েস, তখন তার বাপ তাকে ও তার মাকে কলকাতায় নিয়ে এসে এই বাড়িতে তুললে। বছরখানেক যেতে না যেতেই তার এক ভাই জন্মাল, আর তার ফলে তার মা মারা গেল। বাপের সঙ্গে আগে থাকতেই বাড়িউলির প্রণয় ছিল, মা মারা যেতে সে খোলাখুলিভাবেই ঐ মেয়েমানুষটির সঙ্গে ঘর করতে লাগল। আট বছরের আদরিণী তার মা-মরা ভাইটিকে মানুষ করতে লাগল।
ভাইটি তার কাছেই থাকে, সেই তাকে খাওয়ায় দাওয়ায়, ঘুম পাড়ায়। তার ওপরে নতুন মার সঙ্গে খাটে, সংসারের কাজে যোগান দেয়, বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে আনে। দোষ করলে বাপও ঠেঙায়, নতুন মাও ঠেঙায়—গালাগালিগুলো ধর্তব্যের মধ্যেই নয়।
এমনি ক’রে দিন চলছিল। যখন তার দশ এগারো বছর বয়েস, সেই সময় তার বাপ মারা গেল। বাপ মারা যেতে নতুন মা তাকে এক বাবুদের বাড়ি বাসনমাজার কাজে লাগিয়ে দিলে। সক্কালবেলা উঠে সে তার ভাই নন্দকে নিয়ে বাবুদের বাড়ি চলে যেত কাজ করতে, আর বাড়ি ফিরত রাত্রি দশটা এগারোটার সময়—সেখানেই দু’বেলা খেতে পেত। দু’টাকা তার মাইনে ছিল বটে , কিন্তু সে টাকা সে পেত না। তার নতুন মা ঠিক সময়ে বাবুদের কাছে গিয়ে তার মাইনেটা নিয়ে আসত—ছেলেমানুষ হারিয়ে ফেলতে পারে।
আদরিণী নন্দকে মানুষ করে তুলবে—এই তার বালিকামনের অভিমান। নন্দর জামাকাপড় কোনো কিছুর খরচই নতুন মা দেয় না। তাই কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে বাবুদের বাড়ি থেকে নন্দকে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে ভিক্ষে করতে। দু’চার পয়সা যা পায়, তাই জমিয়ে ভাইকে জামাকাপড় কিনে দেয়। মধ্যে মধ্যে বাবুদের বাড়ির ছোট ছেলেদের ছেঁড়া জামাও পায়।
নন্দ বড় হবে, লেখাপড়া শিখবে, বিয়ে ক’রে বৌ নিয়ে এসে সংসার পাতবে, দিদির দুঃখ ঘোচাবে এই তার চিন্তা, এই তার সুখ। এই লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্য সে সব কষ্টই সহ্য করে। আরও কষ্ট সহ্য করতে রাজী।
নন্দর ছ’বছর বয়স হল। আদরিণী ঠিক করলে তাকে ইস্কুলে পাঠাবে। তার জামাকাপড়, ইস্কুলের মাইনে, বইয়ের দাম এসব কোথা থেকে আসবে? নতুন মা কিছুই দিতে চায় না। নন্দকে ইস্কুলে পাঠাবার জন্য বেশি জেদাজেদি আরম্ভ করায় নতুন মা বললে, আমি এত পয়সা কোথায় পাব? তুই তো উপযুক্ত হয়েছিস, এবার পয়সা রোজগার ক’রে ভাইকে মানুষ কর।
নতুন মার প্রস্তাব শুনে আদরিণী বুঝতে পারলে নন্দর সঙ্গে তারও বয়েস বেড়েছে—বিনা সুপারিশে সে নিজেই পয়সা রোজগার করতে পারে।
ভাইকে সে ছেলের মত ক’রে মানুষ করেছে, তার জন্য বেশ্যা-বৃত্তি তো দূরের কথা, প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে—বাবুদের বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়ে সে রাস্তায় দাঁড়াতে আরম্ভ করলে।
নন্দ রোজ সকালে সেজেগুজে বই বগলে নিয়ে ইস্কুলে যায়, আর তারই খরচ যোগাবার জন্য আদরিণী সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে রাস্তায় দাঁড়ায়। প্রতি রাত্রে যা রোজগার হয়, নতুন মা নিয়ে নেয়। সে বলে, তোদের মানুষ করার জন্য আমার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকাটা উঠে গেলে তোর পয়সা তুই রাখিস—তার আগে একটি পয়সাও পাবিনে।
আদরিণীর কোনো দুঃখ নেই। ভাই মানুষ হবে, যে ভাইকে সে বুকে ক’রে মানুষ করেছে, তার তুলনায় কোনো কষ্টই কষ্ট নয়।
বছর পাঁচ ছয় বেশ কাটল। একদিন আদরিণী শুনতে পেলে নন্দ আর ইস্কুলে যায় না। সারাদিন ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে সিদ্ধি বিড়ি খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়—ইস্কুলের মাইনে তাতেই খরচ হয়ে যায়।
খবরটা শুনে সে কেঁদে ফেললে। ভাইকে ডেকে বোঝালে, এমন করিসনি ভাই। তুই লেখাপড়া শিখে মানুষ হ’লে আমার দুঃখ ঘুচবে।
ভাই মানলে না। লেখাপড়া তার হবে না। নতুন মাও তার সঙ্গে সায় দিলে। বললে, এতগুলো ক’রে টাকা মিছিমিছি নষ্ট করা—যদিও সে টাকা তারই রোজগার।
নন্দ খায়দায়, হৈ হৈ ক’রে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে রাতে বাড়ি আসে না। বলে কোথায় কাজ শিখছে, সারারাত খাটতে হয়। সকালবেলা বাড়ি আসে—চুল উস্কোখুস্কো, চোখ রাঙা।
নতুন মার সঙ্গে নন্দর ঝগড়া হয়। নতুন মা বলে, তোকে আর খেতে দিতে পারব না—বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।
আদরিণী তাকে বোঝায়। নিজেও বুঝতে পারে নন্দ আর সে নন্দ নেই। ভরত ঋষির হরিণের মতন সে হরিণীর সন্ধান পেয়েছে—তার বুকের মধ্যে হা হা করে ওঠে।
একদিন নতুন মার সঙ্গে কি নিয়ে নন্দর ঝগড়া বাধল। নতুন মা তাকে বাড়ি থেকে দূর ক’রে দিলে। আদরিণী তাকে কত মানা করলে। বললে, যাসনি নন্দ, তুই চলে গেলে আমার কি রইল। দু’দিন থাক, দেনাটা শোধ হ’য়ে গেলে আমরা দুজনেই চলে যাব?
নন্দ শুনলে না, চলে গেলে।
আদরিণীর সংসার শূন্য হ’য়ে গেল। ভাইকে মানুষ ক’রে তুলবে, সে লেখাপড়া শিখে পয়সা রোজগার করবে, তার বিয়ে হবে, ছেলেমেয়ে হবে, তাদের কোলে ক’রে মানুষ করবে—এই তার চিন্তা ছিল। এইজন্য তেরো বছর বয়সে সে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু কোথা থেকে কালো মেঘ এসে তার মানসউদ্যান ছেয়ে ফেললে, তার জীবন অন্ধকার হ’য়ে গেল। তার একমাত্র অবলম্বন, যাকে কেন্দ্র করে সে বেঁচেছিল, সে-ই অতি বড় আঘাত দিয়ে তাদের সুখস্বপ্ন নষ্ট করে দিলে।
নন্দ মধ্যে মধ্যে আসে। রুক্ষ চুল, মনে হয় কতদিন নাওয়াখাওয়া হয়নি! সে পয়সা চায়। কিন্তু আদরিণী পয়সা কোথায় পাবে !
আবার সে ভিক্ষায় বেরতে লাগল। দুপুরবেলা ঘন্টা দু’তিন ঘুরে বেশ রোজগার হ’তে লাগল। ভিক্ষার পয়সা জমিয়ে জমিয়ে সে নন্দকে সাহায্য করতে থাকে। আশা কুহকিনী আবার তার মনে রঙীন কল্পনা জাগিয়ে তুলতে থাকে। নন্দ মানুষ হবে—তাকে নিয়ে সে নিজের সংসার গড়ে তুলবে।
এই সময় আদরিণীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তার জীবনের এই ইতিহাস একদিন নয়, তার ঘরে চোদ্দ পনেরো দিন গিয়ে কিছু কিছু দেখে শুনে একটু একটু করে জানতে পারলুম।
সাধারণ মানুষ একসঙ্গে দুটো জীবন যাপন করে। এক তার কর্মজীবন অর্থাৎ বাস্তব জীবন। যেখানে সে খায়দায় কাজকর্ম করে, অর্থ রোজগার করে, নিজের সুখ ও স্বার্থের সঙ্গে নিয়ত যেখানে বাইরের সংসারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে। যাকে বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন জীবন সংগ্রাম। অন্যটি তার মানসজীবন, সেখানে বাস্তবের সঙ্গে কোন সংগ্রাম নাই। নিজের মনের গঠন, অভিরুচি ও কল্পনা দিয়ে সে এক রাজ্য তৈরি ক’রে সেখানে বাস করে। হয়ত বাস্তবজীবনে সে রাস্তার মুটে, মানসজীবনে সে বিশ্বের রাজা। এই কর্মজীবনের সঙ্গে মানসজীবনের যে যত বেশি আপোষ করাতে পারে, সেই তত বেশি কাজের লোক। অধিকাংশ লোকই সে আপোষ করতে পারে না, তাই জগতে কাজের লোকের সংখ্যা কম।
বাস্তবজীবনে অতি নিম্লশ্রেণীর দেহোপজীবিনী হ’লেও আমি দেখতে পেতুম মানসজীবনে আদরিণী মহীয়সী নারী। বৃহৎ সংসারের কর্ত্রী সে সেখানে স্বামী, পুত্র, পরিজন ও আশ্রিতজনে ভরা তার গৃহ। বাস্তবজীবনে সে নিঃস্ব, কিন্তু মানসজীবনে তার দানধ্যানের অন্ত নাই—দুঃখীজনের প্রতি সহমর্মিতায় সে পরমকারুনিক। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত্রি দ্বিপ্রহর অবধি দেহ বিক্রয় করা তার উপজীবিকা, কিন্তু মনে সে সাবিত্রীসমা সেখানে স্বামী ছাড়া তার অন্য ধ্যান নাই।
একদিন আদরিণী আমায় বললে, বাবা, আমি আর সহ্য করতে পারছিনে যে ভাইকে মানুষ করবার জন্য স্বেচ্ছায় এই বৃত্তি বরণ করেছিলুম, সে তো বদমায়েস হ’য়ে গেল। আর কেন! তুমি আমায় নিয়ে চল তোমার বাড়িতে।
বললুম, আমার বাড়িতে গিয়ে কি করবে?
সে বললে, তোমাদের বাড়িতে গিয়ে ঝিয়ের কাজ করব। আমায় মাইনে দিতে হবে না—দু’বেলা দুটি খেতে দেবে।
সমানবয়সী মেয়ে নিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হ’লে আমার পিতৃত্বে যে কেউ বিশ্বাস করবে না, সে কথা বলে তাকে আঘাত দিতে সঙ্কোচ হল। বললুম, আচ্ছা বাড়িতে জিজ্ঞাসা করে দেখব।
কিছুদিন পরে আদরিণীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখি তার ঘরের সামনে উঠোনে একটা ছোঁড়া দাঁড়িয়ে আছে, আর সে তার ঘরের দরজায় একটা পাল্লা ধরে তার সঙ্গে গল্প করছে। আমাকে দেখেই ছোঁড়াটা চলে গেল। দেখলুম, আদরিণীর ডান দিকের ভুরুর পাশে রগটা একটু ফোলা আর তার চারদিকে অনেকখানি জায়গা কালশিরে পড়ে আছে।
জিজ্ঞাসা করলুম, কি হয়েছে, কি ক’রে লাগল ওখানটায়?
আদরিণী গম্ভীরভাবে বললে, পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে বাবা।
নেশা ক’রে পড়ে গিয়েছিলে বুঝি?
খেতে পাইনে আবার নেশা!
জেরায় প্রকাশ পেল দিনদশেক আগে একদিন তার ভাই নন্দ মদ খেয়ে এসে তার কাছে টাকা চায়। টাকা কাছে ছিল না। ক’দিন থেকে শরীর খারাপ থাকায় দুপুরবেলা ভিক্ষায় বেরুতে পারেনি। নন্দ সে কথা মানলে না। শেষকালে রেগে গিয়ে সে তাকে মেরে অজ্ঞান ক’রে রেখে যায়।
আদরিণীর দুই চোখ জলে ভরে উঠল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, একে পাপের প্রায়শ্চিত্ত বলব না তো আর কি বলব।
সেদিন সে আশ্চর্য রকমের গম্ভীরভাবে কথাবার্তা বলতে লাগল। তাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখার কি হল, একবারও সে প্রশ্ন আমাকে করলে না। যদিও প্রতি মুহূর্তেই আমি আশঙ্কা করছিলুম এবার বোধ হয় সে-কথা জিজ্ঞাসা করবে।
অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর একবার সে বললে, বাবা, তোমাকে একটা কথা বলব।
কি বল?
আমি এই বৃত্তি ছেড়ে দিতে চাই।
খুব ভালো। কি করবে?
আমি বিয়ে ক’রে চলে যাব এখান থেকে।
সে তো ভালো কথা। কাকে বিয়ে করবে।
হেমাকে। তোমায় সম্প্রদান করতে হবে কিন্তু।
বললুম, সম্প্রদান করতে আমার কোনো আপত্তি নেই কিন্তু হেমাটি কে?
ঐ যে লোকটি উঠানে দাঁড়িয়ে ছিল, তুমি আসতে চলে গেল।
ও কাদের ছেলে?
হাড়ীদের!!!
আদরিণীদের বস্তির একটু দূরেই একটা বড় মাঠ পড়ে ছিল। বড় মানে শহরের হিসাবে বড়। এই মাঠের একদিকে কয়েকঘর মুসলমান বাস করত। এরা সারা মাঠে বড় বড় চেটাই পেতে টিকে দিত, এইজন্য এই মাঠকে ও-অঞ্চলের লোকেরা, ‘টিকেপাড়া’র মাঠ বলত। সে সময় কলকাতার অনেক জায়গায় এই রকম টিকেপাড়ার মাঠ ছিল। এই টিকেপাড়ার মাঠের আর এককোণে ছিল ত্রিশ পঁয়ত্রিশ ঘর হাড়ীর বাস। হাড়ীরা শুয়োর পুষত আর সেই শুয়োরের দল মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ে টিকেপাড়ায় গিয়ে চেটাইয়ের আধশুকনো টিকে চটকে দিত বলে টিকেওয়ালাদের সঙ্গে হাড়ীদের দস্তুরমতন যুদ্ধ বেধে যেত। হাড়ীরা স্ত্রীপুরুষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হত।
হাড়ীদের মধ্যেও বড়লোক, মেজোলোক ও ছোটলোক এই তিন সম্প্রদায়। বড়লোকের মেয়েরা মেথরানীর কাজ ছেড়ে দিয়ে ছেঁড়া জামাকাপড়ের বদলে বাসন বিক্রি করত। ছেলেরা পূজোপার্বনে লোকের বাড়িতে শানাই বাজাত ও অন্য সময় বাঁশের চ্যাঁচারি দিয়ে ঝুড়ি, চেটাই, দর্মা ও শোভাযাত্রায় বাহার দেবার বড় বড় পুতুল তৈরি করত। মেজোলোকদের মেয়েরা লোকের বাড়ি মেথরানীর কাজ করত আর পুরুষেরা বাঁশের কাজ করত। আর ছোটলোকদের স্ত্রীপুরুষ মেথরের কাজ করত। হেমা হচ্ছে হাড়ীদের মধ্যে বড়লোকের ছেলে। তাদের বাড়ির কেউ মেথর মেথরানীর কাজ করে না। হেমা সানাই বাজায় আর অন্য সময়ে বাঁশের কাজ করে।
আদরিণীর নতুন মায়ের নাম ছিল নিস্তারিণী। তার অধীনে আদরিণী ছাড়া আরও অনেকগুলি হতভাগিনী বাস করত। এদের সবার রোজগারই তার তহবিলে জমা হত। এই মেয়েগুলি তাকে নিস্তার-মা বলে ডাকত। আমি তার নাম দিয়েছিলুম—ফাদার নিস্তার।
নিস্তারিণীর বাড়িতে কতকগুলো খালি ঘর ছিল। সেগুলোকে সে ঘন্টা হিসাবে ভাড়া দিত। এই ঘরগুলোকে বলা হত খোঞ্চে। আসলে কিন্তু ঘরগুলো ছিল গোপন মিলনকুঞ্জ। বাইরের যে-কোনো স্ত্রীপুরুষ এসে ঘন্টায় দু’আনা দিয়ে এই ঘর ভাড়া নিতে পারত। ফাদার নিস্তারের খোঞ্চের কথা তখনকার দিনে গুণীলোক মাত্রেরই জানা ছিল।
হাড়ীপাড়ার মেয়েদের দেহসৌষ্ঠবের কথা সকলেই জানে। রাস্তা দিয়ে চলবার সময় তারা দু-পট্টির লোকের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করতে করতে যেত। ফলে তাদের মধ্যে অনেককেই ফাদার নিস্তারের খোঞ্চেতে দেখা যেত। মাঝে মাঝে সেখানে শাশুড়ী-বৌয়ে, মায়ে-ঝিয়ে ঠোকাঠুকি হ’য়ে গিয়ে তুমুল কাণ্ড উপস্থিত হত। এইখানকারই এক বয়স্থা হাড়ীগিন্নীর সঙ্গে হেমার প্রণয় হয়েছিল এবং তারা প্রায়ই ফাদার নিস্তারের খোঞ্চেতে আসত মিলনের জন্য। এই সূত্রে আদরিণীর সঙ্গে হেমার পরিচয় ঘটে।
হেমাকে নিয়ে তাদের পাড়ার যে স্ত্রীলোকটি খোঞ্চেতে আসত, তার বেশ প্রতিপত্তি ছিল। এদিকে ফাদার নিস্তারের দাপটে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। এরা দুজনেই তাদের বিয়ে নিয়ে ঘোঁট বাধিয়ে তুললে। এই ঘোঁট যখন বেশ জমে উঠেছে, সেই সময় আমি তাদের বিয়ের কথা শুনলুম।
সত্যি কথা বলতে কি, আদরিণীর বিয়ের সম্বন্ধটি আমারও ভালো লাগল না। বিয়েতে আমার কিছু আপত্তি ছিল না। কিন্তু হাড়ীর ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে, এই চিন্তা আমাকে পীড়া দিতে লাগল।
আদরিণী আমায় বার-বার জিজ্ঞাসা করতে লাগল, বাবা তুমি কি বল?
জিজ্ঞাসা করলুম, আচ্ছা, তুমি বিয়ে করতে চাও কেন? এখন যে অবস্থায় আছ, বিয়ে করে কি তার চেয়ে ভালো থাকবে?
আদরিণী বললে, এখন আমি কিছুই ভালো নেই, বিয়ে করলে হয়ত এর চেয়ে ভালো থাকতে পারি, নন্দকে মানুষ করব বলে এ কাজ আরম্ভ করেছিলুম, নইলে লোকের বাড়ি গতর খেটে আমার ভাতকাপড়ের খরচ উঠে যেত। হয়ত একটা ভালো লোকের সঙ্গে ঘর করতে পারতুম। কিন্তু আমার বরাত। যার জন্য এত করলুম সে হল একটা অমানুষ—আমার দুঃখ সে বুঝলে না। বিয়ে করলে আর যাই হোক, তবু নিজের ঘর পাব—ছেলেপিলে পাব। এ জীবন আর সহ্য করতে পারছি না।
আমি বললুম, আচ্ছা, তোমাকে যদি লেখাপড়া শেখবার বন্দোবস্ত ক’রে দিই। তুমি নিজের জীবিকার জন্য কোন একটা কাজ শিখে স্বাধীনভাবে থাকবে। কোনো ভদ্রলোককে বিয়ে করবে—না হয় এমনিই ভদ্রভাবে থাকবে—এমন তো অনেক মেয়ে আছে…
আমার কথা শুনে আদরিণীর মুখখানা খুশিতে ভরে উঠল। সে বললে, আমার লেখাপড়া হবে বাবা? বয়েস যে অনেক হয়ে গিয়েছে তোমার মেয়ের!
লেখাপড়ার আবার বয়েস আছে নাকি? মন দিলে সব বয়েসেই লেখাপড়া শেখা যায়।
সেই ভালো বাবা। তুমি তার ব্যবস্থা কর—বিয়ে এখন থাক।
বাল্যকালে একটি বিধবা মহিলা আমাদের পড়াতেন। ভবিষ্যতে ইনি শিক্ষয়িত্রীর কাজ ছেড়ে দিয়ে এক বিধবা আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর নিজের টাকাকড়ি কিছু ছিল না, চারদিক থেকে চাঁদা তুলে কোনো রকমে আশ্রম চালাতেন। আমার বাবা এই আশ্রমের একজন মুরুববী ছিলেন। আশ্রমে অনেকগুলি বিধবার সঙ্গে কয়েকটি অনাথা কুমারীও প্রতিপালিত হত। আমি সাহস ক’রে একদিন আশ্রমের কর্ত্রী ঠাকুরানীর সঙ্গে দেখা করে আদরিণীর কথা বললুম। বলা বাহুল্য আদরিণী যে ফাদার নিস্তারের আশ্রমের লোক, সে কথা একদম চেপে গিয়েছিলুম। তার সম্বন্ধে সত্যমিথ্যায় মিলিয়ে বেশ একটি করুণ কাহিনী রচনা ক’রে তাঁকে শোনালুম।
সব শুনে তিনি প্রথমেই আমাকে প্রশ্ন করলেন, তার সঙ্গে তোমার কি সম্বন্ধ? কোথায় আলাপ হল?
এই রকম সব প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত হ’য়েই গিয়েছিলুম। প্রায় আধ ঘন্টাটাক জেরা ক’রে তিনি আমায় বললেন, আপাততঃ তাঁদের ফাণ্ড কম থাকায় কিছুদিন নতুন মেয়ে আশ্রমে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, আমার হাতে যে একটি উদ্ধারকামী যুবতী আছে এবং তার হিতাহিতের প্রতি আমি বিশেষ মনোযোগী—এই শুভ সংবাদটি অবিলম্বে আমার বাড়িতে জানিয়ে দিলেন।
আমার বাবার সঙ্গে একই সরকারী দপ্তরে এক ভদ্রলোক চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন ক্রীশ্চান এবং অবিবাহিত। আতুর ও দুঃখীজনের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিল অপরিসীম। ইনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন, বাবাও মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ে তাঁর বাড়িতে যেতেন। কলকাতার রাস্তায় যে অসংখ্য আতুর ও অনাথ বালক-বালিকা ঘুরে বেড়ায়, তাদের জন্য কি ক’রে একটা আশ্রম খোলা যায়, এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হত। কিছুদিন পরে ভদ্রলোক সত্যিই একদিন চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কাজে নেমে পড়লেন। আমাদের বাড়ির কাছেই সস্তায় একখানা ভাঙা বাড়ি ভাড়া নিয়ে রাস্তা থেকে আটদশজন আতুর কুড়িয়ে নিয়ে এসে তিনি কাজ শুরু করে দিলেন। সহায় সম্পদ তাঁর কিছুই ছিল না। প্রতিদিন সকালে বড় একখানা থলি বগলে নিয়ে তিনি মুষ্টি ভিক্ষায় বেরুতেন। বেলা প্রায় বারোটা নাগাদ আধমনটাক চাল ও কিছু তরকারি নিয়ে বাড়ি ফিরে রান্না চড়িয়ে দিতেন। তারপর নিজের হাতে আতুরদের স্নান করিয়ে খাইয়ে আবার বেরুতেন ভিক্ষা সংগ্রহে। কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর সেই প্রচেষ্টা বিরাট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হল। সাধারণ ও সরকারের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট হল—দেশজোড়া তার নামডাক হল, তাঁর মনস্কামনা সিদ্ধ হল। কিন্তু বিখ্যাত হওয়ার বিপদ আছে। বৃদ্ধবয়সে বদনামের পশরা মাথায় নিয়ে তাঁকে সেই নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে সরে যেতে হল।
সে কথা যাক, আমি একদিন সন্ধ্যের সময় তাঁর কাছে গিয়ে আদরিণীকে তাঁর আশ্রমে স্থান দিতে পারেন কিনা জিজ্ঞাসা করলুম। আদরিণীর যে যে দুঃখের কাহিনী আমি তৈরি করেছিলুম, তা শুনে ভদ্রলোকের চক্ষু সজল হ’য়ে উঠল। কি ক’রে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হল, তার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক, বাবা এ বিষয়ে কিছু জানেন কি না, সে সব কোনো প্রশ্নই তিনি আমাকে করলেন না। কিছুক্ষণ চিন্তা ক’রে বলেন, দেখ হে, আমাদের আশ্রমে কোনো মেয়ে নেই তো। পুরুষদের আশ্রমে তাকে নিয়ে এসে রাখা সুবিবেচনার কাজ হবে না। তুমি ছেলেমানুষ (তখন আমার চবিবশ বছর বয়স), এ সব কথা তুমি ঠিক বুঝতে পারবে না। এই বলে, ভবিষ্যতে আশ্রমে মেয়েদের যে বিভাগ হবে, সে সম্বন্ধে আমাকে বলতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ আলোচনার পর আমি উঠতেই তিনি বললেন, তাইত হে, তবে সে মেয়েটির সম্বন্ধে কি করা যায়? তুমি যে রকম বললে, তাতে তো মনে হচ্ছে সে যদি ভালো আশ্রয় না পায় তা হ’লে বিপথগামিনী হ’তে পারে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তা পারে।
তবে! তার সম্বন্ধে আমরা যখন জানতে পেরেছি, তখন কিছু দায়িত্ব আমাদের ওপরেও এসেছে। তার ভালোমন্দের বিষয়ে একেবারে নিরপেক্ষ তো হ’তে পারছি না। কি বল?
আমি আর কি বলব। চুপ ক’রে থাকা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না।
তিনি বললেন, এক কাজ করা যাক। মেয়েটিকে নিয়ে এস। আপাতত তাকে আমার ভাই কিংবা বোনের বাড়িতে রেখে দেব। পরে একটা ব্যবস্থা হবেই। ভগবান যখন তাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, তখন একটা ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন।
পরদিন সকালে আদরিণীকে গিয়ে বললুম, তোমার সব ব্যবস্থা ঠিক ক’রে ফেলেছি। ভালো গৃহস্থের বাড়িতে থাকবে, লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে—খুব ভালো লোক তারা।
আদরিণী একেবারে লাফিয়ে উঠল। আনন্দের আতিশয্যে সে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি আমার সত্যিকার বাবা। গেল জন্মে তুমি আমার বাবা ছিলে নিশ্চয়।
শুনলুম ফাদার নিস্তার এ কয়দিন উঠতে-বসতে আদরিণীকে ঠেঙিয়েছে। হেমাকে সে বাড়িতে ঢুকতে বারণ ক’রে দিয়েছে, কিন্তু হেমা কিছুতেই নিস্তারের কথা শোনে না। আদরিণী বললে, আহা ! আমি চলে গেলে ছোঁড়াটার ভারী কষ্ট হবে—বড্ড ভালোবাসে সে আমাকে।
আনন্দের উৎসাহে গড় গড় ক’রে সে অনেক কথা বলে যেতে লাগল। আমি বললুম, আর সময় নষ্ট ক’রে লাভ নেই, তোমার জিনিসপত্র কি নেবার গুছিয়ে নাও—এইবেলা বেরিয়ে পড়ি।
আদরিণী বললে, এখানকার কোনো জিনিস নেব না বাবা—এ পাপের জিনিস নিয়ে গেরস্তর পুণ্যের সংসারে ঢুকব না। নতুন ক’রে জীবন আরম্ভ করব। এতদিন আমার জীবন যেভাবে কেটেছে, আমি মনে করব সে আমার নয় ! এই পৃথিবীতে আমি যেন এমনি এসেছি, আমার বাপ, মা, ভাই কেউ নেই—কেউ কোনদিন ছিল না। আমি যেন এক্ষুণি জন্মিয়েছি—যারা আমায় আশ্রয় দিলে, তারাই হবে আমার সব।
আমি বললুম, তবুও একটা শাড়ী-গামছা ইত্যাদি নাও, কি জানি সেখানে গিয়ে তুমিও অসুবিধায় পড়বে, তাদেরও অসুবিধা হবে।
আমার কথায় রাজী হ’য়ে আদরিণী আলমারি থেকে কতকগুলো কাপড় বার করলে। পোঁটলা বাঁধতে বাঁধতে সে বললে, এবার বাবা আমি মন্তর নেব। তোমাকে তার ব্যবস্থা ক’রে দিতে হবে কিন্তু…
বললুম, বেশ।
আদরিণী জিজ্ঞাসা করলে, কি জাত তারা?
কারা?
যেখানে যাচ্ছি।
তারা ক্রীশ্চান, জাতটাত মানে না।
এ্যাঁ! ক্রীশ্চান! গরু খায়?
আদরিণীর মুখ একেবারে শুকিয়ে গেল। সে পোঁটলাটাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে একদিকে সরিয়ে দিলে।
বললুম, ক্রীশ্চান হ’লেই কি গরু খেতে হবে নাকি? তারা বোধ হয় মাছমাংসও খায় না।
আদরিণী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কঠিন সুরে বললে, না বাবা, জীবনভোর অনেক পাপ করেছি, আর ক্রীশ্চানের অন্ন খাব না। বরাতে যা আছে হবে, সেখানে যাব না। হাজার হোক হিন্দুর মেয়ে।
কথাগুলো শুনে আমার রাগ হল। প্রতিদিন ছত্রিশ জাতের কাছে দেহ বিক্রী ক’রে যে হিন্দুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে, ক্রীশ্চানের ঘরে থাকলে সে হিন্দুত্ব যে কিছুতেই নষ্ট হবে না, এই সোজা কথাটা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলুম। কিন্তু কিছুতেই সে সেকথা মানতে রাজী হল না। শেষকালে সে কাঁদতে আরম্ভ করলে।
ফাদার নিস্তার বোধ হয় কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে আমাদের কথাবার্তা শুনছিল। এরি মধ্যে সে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলে, আবার কি হল? দিনরাত অমন ক’রে মরছ কেন?
আদরিণী কিছু না বলে নীরবে কাঁদতে লাগল। নিস্তারিণী আমার দিকে চেয়ে বললে—হ্যাঁ গা, ভালোমানুষের বাছা ! ওর মাথায় এ-সব কি বুদ্ধি দিচ্ছ? এতে কি তোমার ভালো হবে, না ওরই ভালো হবে? ক’দিন থেকে যে এমন নাচানাচি শুরু করেছে—বলি কেন? কিসের জন্য শুনি?
জিজ্ঞাসা করলুম, কি হয়েছে?
বলে চলে যাব, বিয়ে করব—নেখাপড়া শিখব। যা দিকিন তুই…
আদরিণী এবার গর্জে উঠল, আলবাৎ যাব।
তবে রে? বলে ফাদার নিস্তার একেবারে সিংহবিক্রমে আদরিণীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পরে তাকে অমানুষিক প্রহার করতে আরম্ভ করল। আদরিণী কোনো বাধা দিলে না। সে মাটিতে পড়ে বলতে লাগল—মার, মার, মেরে যদি ফেলতে পারিস তবে বুঝব।
ফাদার নিস্তারের চিৎকারে বাড়ির অন্যান্য মেয়েরা এসে ভিড় ক’রে দাঁড়াল, কিন্তু তারা কেউ আদরিণীকে বাঁচাবার জন্য এগিয়ে এল না। এদিকে নিস্তারিণী মেরেই যেতে লাগল। শেষকালে খাটের তলা থেকে একটা ঘটি টেনে নিয়ে তাই দিয়ে আদরিণীর মাথা ও মুখ থেঁতলাতে আরম্ভ করে দিল।
এবার আমি ছুটে গিয়ে নিস্তারিণীকে ধরে ফেললুম। বাড়ির মধ্যে বাইরেরও অনেক স্ত্রীপুরুষ এসে জমা হয়েছিল, তাঁরা সকলেই পাড়ার লোক, সকলেই আৎরী ও ফাদার নিস্তারকে চেনে।
আমি ধরামাত্র নিস্তারিণী গর্জে উঠল, ভালো হবে না বলছি, তুমি সরে যাও। আমি নিস্তারিণী বাড়িউলি—আমায় চেনো না?
আমার মাথায় তখন রাগ চড়ে গিয়েছে। নিস্তারিণীকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে এলুম। সেখানে যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদের বললুম, আমি একে পুলিশে দোব—তোমরা সবাই দেখছ, এ আৎরীকে কি রকম মেরেছে।
পুলিশের নাম শুনেই ভিড়ের পুরুষ দর্শকরা একে একে সরে পড়তে আরম্ভ করলে। ঠিক সেই মুহূর্তেই হেমা ও তাদের পাড়ার এক পাল স্ত্রীপুরুষ দৌড়ে বাড়ির মধ্যে এসে ঢুকল।
হেমা জিজ্ঞাসা করতে লাগল, কে কাকে মেলে! আৎরী—আৎরী কোথায়?
একবার চারিদিক চেয়ে নিয়ে সে তড়াক করে দাওয়ায় উঠে ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে আদরিণীকে দেখে বললে, ইঃ, এ যে মেরে ফেলেছে রে! কে মেলে? বল কে মেলে?
আদরিণীর মুখে কথা নেই, চোখে তার অশ্রু পর্যন্ত নেই—একটা বিশ্রী নিস্তব্ধতা। এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে, হেমাদের পাড়ার মেয়েরা ফাটি ফাটি করছে, এমন সময় হেমা বললে, চ আৎরী আমাদের ঘরকে চ—কাল নগনসা আছে…
আদরিণী মাটি থেকে উঠে টলতে টলতে বললে, চ!
ফাদার নিস্তার এতক্ষণ আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাপরের মতন ভোঁস ভোঁস করছিল। মোটা মানুষ, পরিশ্রম ক’রে কিছু ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। কিন্তু আদরিণীকে অগ্রসর হতে দেখে সে গর্জে উঠে বললে—খবর্দার আৎরী, বাড়ির বাইরে পা বাড়িয়েছ কি খুন করে ফেলব—আমার নাম নিস্তারিণী…
নিস্তারিণীর মুখের কথা শেষ হ’তে না হ’তে আদরিণী ঘরের ভেতর থেকে লাফিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট দাওয়া টপকে একেবারে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল! নিস্তারিণীর নাকে ছিল ইয়া ফাঁদি নৎ। দুই কানের ওপর থেকে ডিম অবধি সারি করে মাকড়ী—এক মুহূর্তের মধ্যে নাকের নৎ ও কানের দু-তিনটে মাকড়ী ও তার সঙ্গে যথোচিত চামড়া ও মাংস উড়ে গিয়ে রক্তধারা ছুটতে লাগল।
ওরে বাবা, এত রক্ত—বলে নিস্তারিণী তো ঘুরে মাটিতে পড়ল ঐরাবতের মতন। রক্ত দেখে আদরিণীর মাথায় যেন খুন চেপে গেল। সে তারই ওপরে তার পেটে দমাদম লাথি মারতে আরম্ভ ক’রে দিলে।
বাড়ির অন্য মেয়েরা হাঁ ক’রে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল। কেউ এগিয়ে এসে তাকে ধরলে না—উঠোন রক্তে ভেসে যেতে লাগল! আদরিণীকে গিয়ে ধরব না পলায়ন করব ভাবছি, এমন সময় হেমা গিয়ে তাকে ধরে ফেললে।
আদরিণী হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, চ হেমা!
আমি গুটিগুটি দরজা অবধি এগিয়ে পড়েছিলুম। আদরিণী এসে আমার একখানা হাত ধরে বললে, বাবা বুঝি মেয়ের কীর্তি দেখে সরে পড়ছিলে?
আমরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম। মাঠের কাছে পৌঁছে আমি বললুম, আচ্ছা এবার আমি চললুম।
আদরিণী বললে, চললে বাবা! আচ্ছা তাহ’লে কাল নিশ্চয় এস—কাল আমার বিয়ে।
বললুম, ঠিক বলতে পারছি না, তবে দু’এক দিনের মধ্যে আসব।
না না, কাল আসতেই হবে।
তারপর একটু হেসে বললে, তোমার ভরদ্বাজের দিব্যি রইল।
তার সঙ্গে সেই প্রথম আলাপের কথা মনে পড়ল।
ভরদ্বাজের দিব্যি রাখতে পারিনি। বোধ হয় সপ্তাহখানেক পরে একদিন বিকেলে আদরিণীর সঙ্গে দেখা করতে গেলুম। দেখলুম তার বিয়ে হ’য়ে গিয়েছে। এক মাথা সিঁদুর দিয়ে একখানা লালপেড়ে কোরা শাড়ী পরে সে আমায় প্রণাম করলে।
বিয়ে ক’রে কেমন লাগছে সে কথা জিজ্ঞাসা করবার প্রলোভন হ’তে লাগল।
কিন্তু কোনো প্রশ্ন করবার আগেই খুশিতে ডগমগ হ’য়ে আদরিণী বললে, জান বাবা, আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি পশ্চিমে। আমাদের দু-জনেরই রেলে চাকরি হয়েছে—মেথর ও মেথরানীর কাজ। ও পাস আনতে গেছে, কাল সকালবেলায় চলে যাব…
