Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    নিমফুলের মধু – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

    April 25, 2026

    মন্দ মেয়ের উপাখ্যান – সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার

    April 25, 2026

    প্রফেসর সোম – কৌশিক সামন্ত

    April 25, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    মন্দ মেয়ের উপাখ্যান – সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার

    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার এক পাতা গল্প713 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ঝরা পাতা – তসলিমা নাসরিন

    প্রজাপতির পিছনে সারাদুপুর

    রমনার ফুটপাতে যখন দাঁড়াই, আলোর নীচে মুখখানা পড়ে, ফর্সা ফর্সা লাগে। সোডিয়াম আলো একেবারেই রং পালটে দেয়। আমার গায়ের রং তামাটে, আর তামাটেকেই আলোর নীচে কাঁচা হলুদ মতো লাগে। রং দেখেই আমাকে অনেকে তুলে নিয়ে যায়, অবশ্য বাড়ি নিয়ে দেখে আমি কালো একটি মেয়ে, মুখে বসন্তর দাগ। দেখে কেউ মুখ ভরে-গাল বমি করে, কেউ মোটে পয়সা বের করতে চায় না। কেউ আবার যারা খুব মদে চুর থাকে, তারা ওই রংটঙের দিকে তেমন তাকায় না, কাজ হয়ে গেলেই টাকা, বরং দশ-বিশ টাকা বেশি দিয়ে বিদেয় করে। অবশ্য সব মদ্যপ এই কাজ করে না। অনেকের আবার পকেটে পাই পয়সাও নেই, দিব্যি দরদাম করে উঠিয়ে নিয়ে যায়, টাকা চেয়ে চিৎকার করলে চড় থাপ্পড় কষায়।

    বিকেল হলেই রমনার ফুটপাতে চলে আসি। কেবল খদ্দের পাওয়ার জন্য আসি তা কিন্তু নয়। পুলিশ জ্বালায়, রিকশাওলারা হামলে পড়ে, তবু হাঁটতে ভালো লাগে আমার। যখন হাঁটি, আমার মাঝে মাঝে মনেই থাকে না আমি এখানে একটি কাজে এসেছি, আমার এদিক-ওদিক লক্ষ রাখতে হবে। রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে সবুজ পাতা ছাওয়া গাছগুলির দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকি। একটি ঝাউগাছে রঙিন একটি প্রজাপতিকে উড়তে দেখে সেদিন চোখ ফেরাতে পারিনি। দেওয়াল টপকে প্রজাপতির পিছনে ছুটেছি, ওটিকে ধরতে ইচ্ছে করছিল খুব। ছোটোবেলায় আমার ফড়িং ধরার শখ ছিল। ফড়িঙের পিছনে সুতো বেঁধে ঘুড়ির মতো ওড়াতাম। আবার মায়াও হত, ছেড়ে দিতাম। প্রজাপতি দেখলে সুতো বেঁধে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছা হয় না আর, কেবল অল্প একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। একটু ছোঁব বলে ঝাউ-এর গা গেঁষে দৌড়াই, পাতার ফাঁকে প্রজাপতির ল্যাজে পড়ে থাকে চোখ। এ দিকে আমাকে দেখে লোকের ভিড় জমে যায়, কী ব্যাপার এ মেয়ে দৌড়য় কেন?’ রসুলপুরের লোকেরাও এমন বলত, বলত ‘এই মেয়ে বনে বাদাড়ে এত দৌড়য় কেন?’ আমি জিভ ভেংচে দিতাম আরও দৌড়। অনেকদিন কাউকে ভেংচি কাটি না। খুব কাটতে ইচ্ছে করে। ওই যারা আমাকে নেওয়ার জন্য রিকশা থেকে নামে, তাদের ভেংচি কেটে দৌড় দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোথায় যাব দৌড়ে? কার কাছে? একবার অবশ্য দৌড়েছিলাম, দৌড়তে দৌড়তে একবারে সিতারা খালার কোলে, খালা বললেন, ‘কারে ভয় পাস। ওরা তো মানুষ। মানুষরে ভয় পাইতে নাই।’

    মানুষকে ভয় পেতে নেই, সে আমিও বুঝি। কিন্তু ভয় কি আমি যেচে আনি? বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ শব্দ করে মানুষ দেখলে, সেটি কি চাইলেই থামানো যায়? আর আমিই বুঝি ভয় পাওয়ার মেয়ে ছিলাম—লোকে বলত, ‘এই মেয়ে ডাকাইত হইব। রাইতে রাইতে জঙ্গলে ঘোরে। ডর ভয় নাই।’ তেরো বছর বয়সেও সন্ধে মানিনি, শুকনো পাতা আর খড়ি টুকোতে চলে যেতাম বনে। ফিরে এলে মা উঠোনে খড়ি, পাতা পুড়িয়ে ভাত রাঁধত। চুলোর পাশে বসে আগুন তাপাতাম। আর ভাত ফুটলে দমদম করে যে ধোঁয়া বেরতো, তাতে আমার মুখ ডুবিয়ে রাখতে ইচ্ছে হত। মাও লোকের মতো সুর করে আমাকে বলত, ‘তর কি ভয়ডর নাই? সাঁঝ লাগার আগেই ফিইরে আসতে পারস না?’ কে মানে এসব? রাত হলে বনের মধ্যে এক সুগন্ধ ভাসে। কোন ফুল যে রাত করে ফোটে কে জানে। গজারি, শাল, সেগুন, সব তো চেনা! কবে কোন গাছে পাতা গজায়, কোন গাছে কবে মুকুল দেখা দেয়, সব। তবুও রাত হলে সুগন্ধ ভাসে কোত্থেকে, আজও আমি জানি না। মাঝে মধ্যে মনে হয় মাটি থেকে বুঝি। মাটি থেকেই গন্ধ উঠছে। আমার ইচ্ছে করে মাটিতে গা মেখে স্নান করি। জলে স্নান করার চেয়ে ধুলোয় স্নান করতেই আমার ভালো লাগে বেশি। পুরো বন সাদা পূর্ণিমায় ভেসে যাবে আর মা যদি বলেন ‘জঙ্গলে জ্বিন আছে, রাইতে রাইতে জ্বিনগুলান গাছের ডালে বইসা কথা কয়।’ তবে কি মন মানে? আমি এক বনজ্যোৎস্নার নীচে ধুলোয় গা গড়াতে দৌড়ে যেতাম বনের দিকে। ঝিঁঝি ডাকত, জোনাক জ্বলত, আমার পায়ের তলে পাতাগুলি মচমচ করে বাজত, পিছনে মা ‘আঙুরি আঙুরি’ বলে ডেকেই যেত।

    আঙুরি বলে আমাকে আর কেউ ডাকে না। রিকশা থেকে যে পুরুষেরা আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘এই ছেমরি তর নাম কীরে?’ আমি বলি, ‘আমার কোনও নাম নেই।’

    ‘নাম নাই? নাম ছাড়া মানুষ হয় নাকি?’

    ‘হয়। আমি যেমন নাম ধাম ছাড়া মানুষ।’

    ‘বাপের নাম কী?’

    ‘জানি না।’

    ‘বাপের নাম নাই। জাউরা নাকি?’

    ‘হ।’ আমি যখন ‘হ’ বলি, লক্ষ করেছি, আমার গলার স্বর এতটুকু কাঁপে না। কাঁপবে কেন? এ কথা তো ঠিকই, যে, জন্মে আমি কোনও বাবা নামক জিনিস দেখিনি। বাবা কেমন দেখতে, কোথায় থাকে, কী নাম তার—এসব জিজ্ঞেস করে মায়ের কাছ থেকে কোনও উত্তর পাইনি। তাই আমার কোনও দায় নেই বাবার পরিচয় দেওয়ার। মাঝে মধ্যে মা রাগ করে বলত, ‘গরিবের আবার বাপ কীরে? গরিব পয়দা হয় অভাবে। জন্মের এত ঠিকানা চাস ক্যান? ঠিকানা দিয়া কী হইব? গরিবি যাইব?’ মা যখন ফুঁকনি ফুঁকতেন, টগবগ করে ভাত ফুটত, আমি চুলোর কিনারে বসে মার লালা হয়ে ওঠা মুখখানা দেখে মুগ্ধ হতাম, মা বলত, ‘অত বাপ বাপ করস ক্যান, যে তর মুখে দুইটা ভাত দিব, সেই তর বাপ।’

    ‘ভাত তো আমারে তুমি দেও। তুমি কি আমার বাপ?’

    মা মুখ ঝামটা দিয়ে বলত, ‘হ আমিই তর বাপ।’

    আমি খিল খিল করে হেসে উঠতাম।

    লোকে বলত, আমার বাবা নাকি সদরুদ্দিন। কেউ আবার বলত নছু পাগলা, আর দুটো নাম শুনেছিলাম, আম্মানুল্লাহ আর বারেক মিঞা। মাকে এই চারটি নাম শুনিয়েও অনেকদিন জিজ্ঞেস করেছি, ‘এগো মধ্যে কেডা, কও তো?’

    মা হেসে বলেছে, ‘এগো মধ্যে কেউ না।’

    ‘তাইলে?’

    ‘তাইলে আর কী। তরা মর গিয়া বাপ লইয়া। ভাত পাইব কই, খাওন দিব কেডা, হেই চিন্তা করন লাগব না? এই যে বনে বনে ঘুরস, তার বাপ কেডা হেই নিয়া মাইনসের ঘুম নাই। হেরা তরে একবেলা খাওয়াইব? আমি যে না খাইয়া মরতে বইছিলাম, কোন ভালো মাইনসের পুত আইসা আমার মুখে এক মুঠা ভাত দিছে।’

    আমি জন্ম থেকে মাকে ছাড়া কাউকে দেখিনি আপন। মা আমাকে বেড়ার ভাঙা ঘরটাতে বুকে জাপটে ধরে ঘুমোত। অনেক রাত অবধি মাথার কাছে কুপি জ্বালাত। মা কুপি নিবোত না। তেল খরচ জেনেও সে কেন কুপি নিবাতো না। পরে আমার মনে হয়েছে সে আমাকে আসলে আগলে রাখত। যে মানুষের স্বামী নেই সংসার নেই, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে, বনের কাঠচোরাদের পিছনে পাতা কুড়োনি সেজে ঘুরঘুর করে দু-চার পয়সা পায়, দু-বেলা খেতে পায় না, সন্ধেয় একবার কেবল ভাত চড়ে বাড়িতে, তার বুকের ধন বলতে তো একটিই। এটি হারালে আর থাকে কী! শীতের রাতে ছেঁড়া কাঁথার তলায় দুটো শরীর গুটিসুটি হয়ে থাকে, সকালে আবার সেই রোজগারের ধান্দা। মা বলত, ‘কাছে কাছে থাকবি, দূরে যাবি না, মাইনসের মতলব ভালো না। বনে বনে ঘুরবি না।’

    ‘ঘুরুম না ক্যান? বন কী কার কেনা? বন গরমেন্টের? তুমি না এদিন কইলা বন গরমেন্টের?’

    ‘গরমেন্টের হইলে কী হইব? মাইনেসে গরমেন্ট মানে?’

    ‘তুমি গরমেন্ট মানো না?’

    ‘গরিবের কত কিছুই মানতে হয়। বড়ো হ। বুঝবি।’

    বড়ো হয়েছি। দেখতে দেখতে মাকেও লম্বায় ছাড়িয়ে গিয়েছি, মা কিন্তু মোটেও মিথ্যা কথা বলেনি। গরিবকে অনেক কিছু মানতে হয়। যে জিনিস বড়োলোকের না-মানলেও চলে, গরিবের সেটা চলে না। আমি কি এখন চাইলে পারি ওই যে রিকশাওয়ালা আমাকে দেখে ফ্যাক ফ্যাক হাসছে আর বলছে ‘কী রে মাগী কতয় বেচবি?’ তার গালে দুটো চড় কষাতে পারি না। হাতে আমার সে জোর থাকতে পারে, মনে নেই। নেই, কারণ আমাকে এক চড়ের জন্য দশ চড় খেতে হবে। কে চায় আগ বাড়িয়ে মার খেতে?

    মা আমাকে আগলে রাখত, রাতে দরজায় টুকুটুক—মা কুপি হাতে নিয়ে উঠত, চেঁচিয়ে বলত, ‘কুন হারামজাদার পুত আইছে ঘরের দুয়ারে। কুপাইয়া দু-খণ্ড কইরা দিব কলাম।’ আমার মাঝে মধ্যে মনে পড়ে মায়ের আগুনমূর্তি। দু-বেলা ভাত খেতে পারত না। অথচ কী ভীষণ জোর ছিল গায়ে। সারা দুপুর প্রজাপতির পিছনে ঘুরে বেড়িয়ে যে মেয়ে ঘরে ফেরে তাকে গায়ে শক্তি দিয়ে আগলে রাখে মা। জীর্ণ ঘরের দুঃখিনি মা, দুটো লাথি খেলে যে ঘর তার ছালবাকর ছাউনিসহ ধড়াস করে পড়বে, সেই ঘরেই একটি টিমটিমে কুপি আর একটি ভোঁতা দা সম্বল করে। সেই তেরো বছর থেকে আমি টের পেলাম এতদিনে। বনে বাদাড়ে ঘুরি ফিরি কেউ তেমন ফিরে দেখে না, রাতে আমার দাম চড়ে যায়, রাতে আমার দিকে সবাই আড়ে আড়ে চায়। পূর্ণিমা রাতে আমি মাকে কুপি জ্বেলে রাখতে দিই না। জানালা খুলে রাখি, জ্যোৎস্নায় ঘর ভরে যায়। মাকে বলি, ‘কুপি জ্বালাও ক্যান? গোটা আশমান জুইড়া কত বড়ো কুপি জ্বলতাছে দেখ না?’ এখনও পূর্ণিমার ঘোর আমার কাটে না। রমনার মাঠে সারা রাত শুয়ে থাকি। পূর্ণিমাগুলি একা আমার, আমি কারও সঙ্গে এই রাত ভাগ করি না। উপরে আকাশ, নীচে মাটি, মাঝখানে একটি ঘাস ফুলের মতো আমি আর কেউ নেই জগৎ জুড়ে মাঝে মাঝে নিজেকে আমার ঘাসফুলই মনে হয়। ছোট্ট ছোট্ট এতটুকু একটা ফুল। স্বজন নেই, পড়শি নেই, একা। আমার আছে কেবল আকাশ আর মাটি, আছে জল, বৃক্ষ, আছে অনন্ত নক্ষত্র বীথি।

    মা তুই জোনাক পোকা?

    ‘মা তুই কার মেয়ে?’ এই প্রশ্নটি আমি মাকে করেছিলাম ছোটোবেলায়। মা বলেছিল, ‘জানি না।’

    মায়ের, ‘জানি না’ উত্তর আমাকে অদ্ভুত এক মজা দিত। জোনানিক যেমন জানে না কোথায় তার জন্ম। মাকেও আমার জোনাকির মতো মনে হত। হাতের মুঠোয় জোনাকি ধরে এনে মায়ের মুখের কাছে ছেড়ে নেচে উঠতাম। ‘মা তুই জোনাক পোকা।’

    মাও হাসত। মা বুঝত কেন আমি তাঁকে জোনাক পোকা বলতাম। আমার মনে হত জোনাকি জানে না অন্ধকার কোন জংলা থেকে জন্ম তার, সে কেবল আলো বয়ে বেড়ায়। মাও তেমন, জংলা থেকে বের হয়ে কুপি হাতে বসে থাকে।

    মা অবশ্য ঘরের দাওয়ায় বসে খুব মন খারাপ করা সময়ে নিজের গল্প বলত। বলত, ‘বাড়ি ঘর তো ছিলই আমার, বাপ-মা ছিল। জমিও ছিল দুইকানি। অভাব কোনো দিন চক্ষে দেখি নাই। মুটকি ভইর্যা ধান রাইখা দিত মায়ের। তিনবেলা পেট ভইরা ভাত খাইতাম, পুস্কুনির মাছ দিয়া। দুইডা গাইও আছিল। বাজামন নিজে দুধ পানাইত। পাঁচ সের কইরা দুধ দিত গাই। আচমকা, কোন দিক দিয়া কী হইল কেডা জানে, শুনি দেবাকে কয় ‘খিদা লাগে। খিদা লাগে। তবে ক্যান লাগে? খিদা তো দেখি আমারও লাগে। মায়ের তিনবেলা জায়গায় এক বেলা রাঁধে। তাও মাইপা। বুঝদেয় বেশি রানলে খড়ি ফুরাইয়া যাইব। খড়ি বাঁচাইবার লাগি মা আমাগো ভাত দেয় না। এইডা যেন আমার বিশ্বাস হইবার চায় না। একসময় এমন হইল এক বেলা যে ভাত চড়ত তাও চড়ে না। খিদায় আমাগো পেট মোচড়ায়। আমরা কোথায় জুইর্যা খিদায় দাপাই। কোত্থেইকা কোন আকাল নাইমা আইল দেশে। বাজান দিল গাই বেইচা। দুইকানি জমিও বেচল। বেচার টাকা লইয়া হাটে বাজারে দৌড়ায় বাজান। নাই, চাইল নাই। এক মহাজন কিছু চাইল দিল। হেইডা শেষ হইল, আবার হাত-পাতা। খালি হাস পাতলে কেউ দেয় না কিছু হাতে। জমি গেল বাড়ি গেল। গোরু গেল কাঠের খাট সিন্দুক সবই গেল। শেষে বাজান কইল, ‘জরিনা হাঁটা দে।’ আমি জিগাই ‘বাজান আমি আবার কোন হাঁটা দিয়াম?’ বাজান কইল ‘আইজ বুইধবার হাটের দিন। চল তোরে ফরক কিন্যা দিই।’ পেটে ভাত নাই, আর ফরক কিনতে আমার বাড়ি ছাইড়া বাহির হওয়া জন্মের মতো বাহির হওয়া। বাজান আমারে বাজারে নিয়া এক বেডার কাছে তিনটেকা দিয়া বেইচা দিল। তিনডা টেকা হাতে লইয়া বাড়ির দিকে দৌড়াইয়া গেল বাজান। আমি ‘বাজান’, বইলা চিল্লাইয়া কাইন্দা তারে ফিরাইতে পারি না। গলা দিয়া তেমন স্বরও বাহির হয় না আমার। না-খাওয়া হইল্লে অত জোর কই?

    মায়ের জন্য আমার মায়া হয় খুব। নিজের বাবা বিক্রি করে দিল মেয়েকে। আমারও যদি বাবা থাকত, সেও বোধহয় এরকম বিক্রি করে দিত আমাকে। মায়ের গল্প শুনে বাবা বিষয়ে আমার এক ভয় কাজ করত। যেন বাবা নেই এ আমার অনেক বড়ো ভাগ্য। মা কখনও কখনও তার বাবাকে মনে করে কাঁদে, ‘আহা বাজান খিদা সইতে পারে না। নিজের মাইয়া বেইচা খাইল।’

    আবার হঠাৎ হঠাৎ রুখে ওঠে মা। বলে, ‘না না আমার কোনও বাপ ছিল না। আকাল আইলে বাপেরা বুঝি মাইয়া বেইচা দেয়? হেই বেডা আমার বাপ ছিল না। ছিল, আমার মায়ের সোয়ামি।’

    ‘মায়ের সোয়ামিরেই তো বাপ কয়।’ আমি তর্ক জুড়ে দিতাম।

    মা বলত, ‘তরে কেডা কইল মায়ের সোয়ামিরেই বাপ কয়। বাপ হওয়া সহজ কথা না। বাপ হইতে গেলে পাতের ভাত তুইলা দিতে হয় সন্তানের পাতে। বাপ হইতে সবাই পারে না।

    মাকে তাই জোনাক পোকা ডাকতে আমার ভালো লাগে। মিশমিশে কালো গায়ের রং। নাক ভোঁতা। কিন্তু চোখের ভিতর দেখে মনে হয়—আলো ঠিকরে বের হয়। আমারও এমন চোখ হয়েছে। আয়নায় তাকালে মায়ের চোখে আর আমার চোখকে তফাত করতে পারি না। রুখ্য চুল সে মায়েরও যেমন, আমারও তেমন। আমি মার মতো অত কালো না-হলেও কালো, সম্ভবত আমার জন্মের জন্য মার সে পুরুষ সঙ্গীটি দায়ী। সে খানিকটা কালোই ছিল। আচ্ছা, তারপর কী হল মার? সেই হাটে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে?

    ‘কী আর কমু। যেই বেডার কাচে বেচল, হে শক্ত কইরা আমার হাত ধইরা রাখল, বাজানের পিছন আর যাইতে দিল না। বেডা আমারে টানতে টানতে আমাগো বাড়ি ছিল উত্তরে, আমারে লইয়া গেল দক্ষিণে। পথ চিনি না, ঘাট চিনি না। খিদায় পা চলে না। বেডার আমার হুকনা দুইটার রুটি দিল খাইতে। আহা যে আমি মুনে লয় রুটি পাইয়া ভুইলা গেলাম আমার বাজান কেডা, মা কেডা, ভুইলা গেলাম সোহাগি গেরামের আমি মাইয়া। ওই বেডা আমারে লইয়া গেল শ্যামগঞ্জে। কতদূর শ্যামগঞ্জ! বীর পার হইলাম, হাওড় পার হইলাম, সাইঞ্ঝা লাইগা যায়, তবু গেরাম আসে না। লাইনের উপরে দিয়া মাইলের মাইল পার হই, কই হেগো গেরাম কই? নিশুত রাতে শ্যামগঞ্জ পৌঁছালাম। আহারে, আমার খুব পানি খাইতে ইচ্ছা করতাচ্ছিল, কেউ আমারে এক ঢোক পানি খাইতে দেয় নাই। ছাতি ফাইটা যায় এই অবস্থা। মুনে হইলা সেই তিয়াসটা আমার আইজও হয়।’

    তিয়াস তিয়াস বলে মা আজও বুক চাপড়ায় আমি অবাক হই। সেই তার দশ বছর বয়সের তিয়াস কেন তাকে আজও তাড়িয়ে ফেরে বুঝি না। মা যখন বুকে চাপড় দিয়া বলে, ‘হায় রে তিয়াস। যেন পুরার কংস নদীর পানি এক ঢোকে খাইয়া ফেলতে পারুম।’ তখন আমারও জানি না কেন বড়ো তৃষ্ণা হয়। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। আমার যখন ষোলো বছর বয়স, আমার তৃষ্ণা হয়েছিল। এক লোকে আমার গায়ের উপর চড়ে বসেছিল। সে কী ওজন লোকটির! আমি পানি পানি বলে চেঁচাই। লোকটি হা হা হাসে। কারও কষ্ট হলে কেউ যে হাসতে পারে সেই প্রথম দেখলাম। চড়ে বসা লোকটির চেয়ে আমাদের সুবলই ভালো। লক্ষ্মী ছেলে। যা বলতাম তাই শুনত। বনে পা ছড়িয়ে বসে বলতাম, ‘এই রে একটা কাঠবিড়ালি ধইরা নিয়ে আয় তো।’ অমনি সে দিত দৌড়। দৌড় দৌড়। ফিরে আসত ঠিকই একটি কাঠবিড়ালি নিয়ে। নামাতেই সুড়ুৎ করে পাতার ফাঁক দিয়ে দৌড়ে যেত। দৌড়ে যে গেল এটি নিয়ে আর কোনও দুঃখ থাকত না সুবলের। সে যে এনেছে, এনে দিতে পেরেছে আমার হাতে, এটি তার জন্য মহা শোকের বিষয়। ছেলেটির নাক বেয়ে সর্দি ঝরত। কোমরে ঘুনসি বাঁধা। হাড় গিলে। ছেলেটি ফাঁক পেলে আমার কাছে এসে বসত। যদি বলতাম, ‘সুবল, তর বাপ নাই, আমারও নাই। চল আমরা দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া এমন দূরে যাই, খুজইয়া পাইব না কেউ।’

    ‘কত দূর?’

    ‘ধর দিল্লি।’

    ‘দিল্লি?’ দিল্লি কুনু? নদীর এই পার হেই পার?’

    ‘হেই পার মনে হয়।’

    ‘তাইলে তো মাঝি লাগব।’

    ‘মাঝি বাদ দে, আমরা চল সাঁতরাইয়া পার হই।’

    ‘সাঁতরাইয়া?’

    দুজনের স্বপ্নগুলি শুকনো পাতার মতো পড়ে থাকত নীচে-আমরা দুজনেই সেই স্বপ্ন মাড়িয়ে বাড়ি ফিরতাম। আমার তো তবু বাড়ি বলতে কিছু ছিল, সুবলের তাও ছিল না। ফরেস্ট অফিসারের বাড়ির বারান্দায় ঘুমোত। ও আমার অর্ধেক বয়সের এক ছেলে। বাপ-মা নেই। দয়া করে কারও বাড়ি থেকে কেউ যদি কিছু দিত তো খেত। মাকে যদি কখনও বলি, ‘সুবল্যারে আজ কিছু খাওন টাওন থাকলে দেওতো।’

    মা প্রথম অবাক হয়ে বলত, ‘কেল্লিগা?’

    ‘দুই দিন খায় নাই।’

    আহা ‘বেচারাকে ডাক, ডাক, জলদি কিছু মুখে দে।’

    মায়ের ভিতরে আমি দেখেচি খুব নরম একটি মানুষ বাস করে। একবার দেখেছিলাম ফরেস্টের সেকেন্ড অফিসারের কাছে সুবল হাত পাতল। সুবলের গলা থেকে স্বর বেরোচ্ছিল না খিদেয়। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল ফরেস্টের লোকেরা। কিন্তু মা গরিব হয়েও ফেরায় না সুবলকে। মাঝে মধ্যে মাকেই মনে হয় ওদের চেয়ে বড়ো লোক। মায়ের এই আলো আমাকেও আলোকিত করে।

    কাঠবিড়ালি কাঠবিড়ালি

    ‘সুবল চোখের পলকে কাঠবিড়ালি ধরে এনে আমার পায়ের কাছে ফেলে দেবে। ঘুনসি বাঁধা সাত বছরের শরীরখানা শুকনো পাতার ওপরে রেখে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়বে। সুবলকে জিজ্ঞাস করি, ‘এই সুবলা বড়ো হইয়া কী হইবিরে?’

    ‘ডাকাইত।’

    ‘ডাকাইত হইবি? কেন রে? বড়োলোক হইতে চাস বুঝি?’

    ‘ডাকাত হইমু আর মানুষ খুন করুম।’

    ‘কারে খুন করবি রে?’

    ‘কমু না।’

    ‘হ্যাঁরে সুবল। আমারে কওয়া যাইবে না? ক না রে। আমি কি কাউরে কইয়া দিমু, ক? আমারে বিশ্বাস নাই তর? সুবল শুকনো পাতায় শুয়ে পায়ের ওপর পা তুলে নাচায়। ওর আধ আঙুলে নুনু ঝুলতে থাকে। পায়ের ফাঁকে। সারা গায়ে সুতো বলতে কোমরের কালো সুতোই। সুবল কিছুতেই বলে না কাকে খুন করবে। সেই রাতে আমি কেবলই ছটফট করেছি মা টের পেয়ে জিজ্ঞেস করেছে, ‘কি রে ঘুম আহে না?’

    ‘না।’

    ‘স্বপন দেহস?’

    ‘হ।’

    ‘কী স্বপন?’

    ‘সুবল্যা ডাকাইত হইছে। মানুষ খুন করে।’

    ‘আলাইবালাই সুবল্যা ডাকাত হইব কেন? ভাত নাই আপদ নাই। নাক টিপলে দুধ বার হয়। হেয় কিনা ডাকাইত হইব।’

    ‘আমারে কইল তো? কইল কইল। তাতে হইল কী।’

    ‘আমিও ডাকাইত হইমু।’

    মা খিল খিল করে হাসল। বললও ‘ডাকাইত হইয়া কী করবি?’

    ‘ডাকাইত মানুষ মারুক কারে মারতে ইচ্ছা করে?’

    জমির মুনষিরে।

    ‘জমির মুনষির তরে কী করল?’

    ‘হেইদিন আমি কাঠবিড়ালি কাঠবিড়ালির পিছে দৌড়াতেছি।’

    ওই ছেড়ি, ওই ছেড়ি। আমি কই কী কন?’

    বেডায় কয় মায়েরে আমি…’

    ‘মায়ের আমি কী? ক।’

    ‘আমি কইতে পারুম না।’

    ‘বুঝেছি, আমি পাশ ফিরে শুই। কিন্তু মায়ের জন্য বড়ো মন খারাপ লাগে। মা দুঃখ পেলে আমার বুকের কোথায় যেন দুঃখ লাগে। চিন চিন করে ব্যথা হয় মা যখন আমাকে আদর করে মনে হয় আমি যেন মায়ের কাঠবিড়ালি। আমি কাঠবিড়ালি দু-হাতের তালুচেত বাদাম নিয়ে খাওয়াই। মাও আমাকে টিনের একটি থালে যখন ভাত বেড়ে দেয়, মনে হয় ছোট্ট একটি কাঠবিড়ালিকে মা আদর করছে। মা প্রায়ই নিজে না-খেয়ে আমাকে খাওয়ায়। একদিন হাপুস হুপুস করে খেয়ে দেখি মা ঢকঢক করে পানি খাচ্ছে। জিজ্ঞেস করি, তুমি খাইয়াবা না?’

    ‘খামুনে পরে। তুই ঘুমা।’

    ‘আমি খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মাও শুল। শুয়ে মা ঘুমিয়ে পড়ল। আমি পা টিপে টিপে পাতিলের ঢাকনা তুলে দেখি ভাত নেই। কিছু না-বলে আমিও শুয়ে পড়লাম। মা’র জন্য আমার বড়ো কান্না পেল। পরদিন মা পুকুর থেকে শাপলা তুলে সেদ্ধ করে খেল। আমি আড়ে আড়ে দেখলাম নিজেকে কাঠবিড়ালির মতো মনে হল। কাঠবিড়ালিকে যেমন নিজে না-খেয়ে পেয়ারা খাওয়াই, মাও ঠিক তেমন। আমি বোধহয় মার একটি পোষা কাঠবিড়ালিই।

    বনফুলের লোভ

    সুবল নয়, বনফুলই আমি আবিষ্কার করি। খড়ি টুকোতে গেছি, টুকোতে টুকোতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ ঘুম ভাঙে মিষ্টি এক গন্ধে। আমি উঠে চোখ কচলে গন্ধের পেছন ছুটেছি। ছুটতে ছুটতে গারোদের বাড়ি। সেই বাড়ি ডিঙিয়ে দিঘি পার হয়ে আবারও বন, সেই বনে ফুটে আছে ফুল। ছোটো, লাল ফুল। ফুলের এত গন্ধ থাকে। এত গন্ধও থাকে ফুলের!ইচ্ছে করে ফুলের উপর শুয়ে থাকি। জীবনভর শুয়ে থাকি। মা না-থাকলে জীবনভর শুয়ে থাকতাম। সুবলের সেই সুবিধেটা আছে। ইচ্ছে করলেই যেখানে খুশি রাত কাটাতে পারে। সারাদিন টই টই করে ঘুরলেও আমাকে ফিরতে হয় শনে ছাওয়া একটি ঘরে। ওখানে ধোঁয়া ওঠা ভাত রাঁধে মা। খেতেও মন চায়। মায়ের গায়ের ওম নিয়ে ঘুমোতেও মন চায়। হঠাৎ হঠাৎ আবার কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। ফুলের উপর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ফুলের গন্ধ নেব আর আকাশ দেখব এর চেয়ে সুখ আর কী আছে! আমার কোথাও বাধা নেই, আবার কোথায় যেন বাধা।

    সুবলের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয় না। ও ছেলে আবার অনায়াসে বাজার চলে যায়। আনারস বিক্রি হয়, রাস্তার পাশে টুকরি ধরে বসে থাকে, বিক্রি শেষে দু-এক টাকা পায় হাতে। ওই নিয়ে নাচতে নাচতে ফিরে আসে। সে ক-দিন হয় একটি হাফপ্যান্ট পরে। অফিসারের বউ দিয়েছে। ও হাফপ্যান্ট পরল যেদিন, খুব হেসে তাকাচ্ছিল আমার দিকে, আমিও হাফপ্যান্ট পরি, সুবলও পরে, আর যেন পার্থক্য রইল না আমাদের মধ্যে। যেন সুবলও যা, আমিও তা। সে আর আমার ফুট ফরমাস খাটবে না। তাকে দিয়ে কাঠবিড়ালি আনানো যাবে না। বনে রাজত্ব আমার যেন আর হল না। আমি খুব মন খারাপ করে বসেছিলাম। সুবল আমার চুলে আমচকা টান দিয়ে বলল ‘কী বড়োলোক হইছি, দেখছিস?’

    ‘দেখছি।’

    ‘এইডা পাতা রঙের। আরেকটা পাইমু মাটি রঙের।’

    ‘ও।’

    ‘তোর ব্যবসা বুঝি খুব চলে?’

    ‘আমি আনারসের খেত দিমু। আনারস বেইচা বড়ো দালান তুলুম।’

    ‘কই ঢাহা শহরে?’

    ‘না দুবাই।’

    ‘দুবাই আমারে নিবি?’

    ‘দেহি।’

    বলে চলে যায় সুবল। আমার খুব কষ্ট হতে থাকে। সুবল দুবাই চলে যাবে। আমি যাব কোথায়। আমি যাব কোথায়, এই রসুলপুর ছেড়ে আমি কি কোথায় যেতে পারব না? রসুলপুর আমার একবার ভালও লাগে, আবার লাগে না।

    পরদিনই আবার সবুজ রঙের হাফপ্যান্ট পরা সুবলের সঙ্গে দেখা। বলে, ‘যাই বাজার যাই।’

    ‘আমারে নিবি?’

    ‘দুর, তরে নিব কী! তুই না ছেড়ি।’

    ‘তাতে কী হইছে? ছেড়িরা কি বাজারে যাইতে পারে না?’

    ‘ছেড়িরা তো যায় না।’

    ‘না যাক, আমি যামু।’

    ‘তাইলে নিজের ইচ্ছাসারে যা। আমারে কস ক্যা নিতে।’

    ‘গল্প কইরা কইরা গেলাম ধর।’

    ‘আমার টাইম নাই।’

    ‘ইহিরে টাইম কওয়া শিখছিস!’

    সুবল হেসে ওঠে। তার সবুজ প্যান্টে ময়লা জমেছে। দিন দিন চাই এটি মলিন হয়ে যাক। ছিঁড়ে যাক। ছিঁড়ে যাক। ও আসলে যতদিন ন্যাংটা ছেলে ছিল ততদিন যেন আমার আপন ছিল বেশি। একটা প্যান্ট পরেই সে বাজারে যায়, ব্যবসা করে, দুবাই যাবে। আমার কেমন হিংসে হয়। রাগও হয়। সুবলকে বলি, ‘আমিও দুবাই যামু।’

    সুবল খিল খিল করে হাসে। বলে, ‘ইহিরে।’

    ‘ইহিরে কস ক্যা। তুই যাইতে পারস। আমি পারি না?’

    ‘না তুই পারস না।’

    ‘পারি পারি পারি। কী করবি কর।’

    সুবল হাসে। ঝকঝক করে ওর দু-পাটি দাঁত। ওর সামনে নিজেকে দীন হীন মনে হয়। বলি ‘আড়ি, তর সাথে আমার আড়ি।’

    ‘ইহিরে। আড়ি দেয় ছেমড়ি’

    ‘তুই আমারে দুবাই নিবি?’

    ‘না।’

    ‘বাজারেও না?’

    ‘না।’

    সুবল বলে উঠে চলে যায়। আমি বসেই থাকি শুকনো পাতায়। কাঠবিড়ালি ডাকে। আমি ফিরে তাকাই না। একটি বাচ্চা ছেলের প্রতি আমার নির্ভরতা বাড়ছে টের পাই! সুবল চলে যাওয়ায় আমার কণ্ঠ ধরে যায়। টের পেয়ে আমি দৌড়ে বাড়ি চলে যাই। মা জিজ্ঞেস করে, ‘কীরে খড়ি কই?’

    ‘টুকাই নাই।’

    ‘হইল কী?’

    ‘ওই শালা সুবল্যা। হে নাকি দুবাই যাইব।’

    ‘সুবল্যা দুবাই যায় কী কইর্যা। ওর তো মুখ টিপলে এহনও…’

    ‘ও একল্যা যাইব।’

    ‘যাউক, গেলে ত ভালোই। মা-বাপ নাই বেচারা।’

    ‘আমার বাপ নাই, তাই বইল্যা কী আমি দুবাই গেছি?’

    ‘যাইতে পারলে যাইবি।’

    ‘ছেড়িরা নাকি যায় না।’

    ‘ছেড়ি আবার কি? ছেড়ি কী? ছেড়িগোর কি খিদা কম লাগে? ছোড়িগোর কি হাতা পাও নাই। ছেড়িরা কী পেডে পাথর বান্ধে? দুবাই যাইবি? যা, দুবাই আমি পাডামু।’

    ‘মিছা কথা কও জানি। আইচ্ছা মা, দুবাই কি গাঙের ওই পার?’

    ‘হ।’

    ‘দুবাই-এ কয়বেলা ভাত দেয়?’

    ‘মনে অয় চাইর বেলা।’

    ‘দুনিয়াতে কয়ডা দ্যাশ অছে কও তো দেখি?’

    ‘এই ধর কলিকাতা, ভারত, ইন্ডিয়া, আসাম আর দুবাই।’

    ‘সৌদি কইলা না? আসলাম ভাই না সৌদি গেল?’

    ‘সৌদি ত আল্লা রসুলের জাগা। সৌদি কী দ্যাশ নাহি।’

    ‘ও। তাও ত কহ।’

    দিন দুই পর দুবাই ইচ্ছাও আমার আর হয় না। ভর দুপুরবেলায় কাঠবিড়ালিকে পেয়ারা খাওয়াচ্চি। সুবল এসে সামনে দাঁড়ায়। ওর হাতে একটি টুকরি। বলে, ‘আনারসের ব্যাবসায় নামলাম।’

    ‘নাকি খড়ি টুকাইবি?’

    ‘না।’

    ‘বনে আহস না ক্যা?’

    ‘শহরে চইল্যা যামু।’

    ‘দুবাই শহর?’

    ‘হ।’

    ‘যা। আমি যামু না।’

    সুবল অবাক হয়ে বসে পড়ে। বলে, ‘যাইবি না?’

    ‘না। দুবাই আমার ভালো লাগে না। এই বন ভাল্লাগে। কাঠবিড়ালি ভাল্লাগে।’

    ‘ও।’

    সুবল চলে যায়। আমি কাঠবিড়ালি ছেড়ে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকি। চোখ ধাঁধিয়ে নেয়। চোখ বুজে থাকি। দুপুরের কড়া রোদেও ঘুম চলে আসে। তখন আবার সেই গন্ধটা পাই। বনফুলের গন্ধ। আবার পিছু পিছু যাই। সুগন্ধের পিছু পিছু। আমি যে একা একটি মানুষ, বনে বনে ঘুরি, গাছ-পাতা পাখি-পশু আমার বন্ধু, মানুষ সুবলও বন্ধু, মাও। সেই আমি যেন কারও থাকি না। একা হয়ে যাই। একেবারে একা। আমি যখন একা হই, লক্ষ করি তখন ডাকাতে ইচ্ছে করে না, দুবাই যেতে না। ইচ্ছে করে শুয়ে শুয়ে কেবল বনফুলের গন্ধ নিই। প্রাণ ভরে ফুসফুস ভরে কেবল বনফুলের গন্ধ নিই।

    বয়স নিয়ে কথা

    অনেকদিন জিজ্ঞেস করেছি মাকে, মা আমার বয়স কত? মা বলে, ‘কত আর? দশ।’

    ‘দশ? দুই বছর আগেও আমি কইছ দশ।’

    ‘আমি কি জানি বয়সের হিসাব? গণ্ডগোলের বছর হাঁটা শিখছিস।’

    ‘ও বুঝেছি তাইলে এহেন চইদ্দ যোগ এ পনর বছর।’

    ‘পাঠশালায় যাস না, হিসাব শিখলি কই?’

    ‘তেঁতুলের বিচি গুনি ফতেমাগো লগে।’

    ‘ও।’

    ফাতেমাদের বাড়িতে মাঝে সাঝে যাই। ওরা এটা-সেটা খেতে দেয়, খাই না। আসলে ও বাড়িতে আমি খেলতে যাই। তেঁতুলের বিচির খেলা, ষোলোগুটি খেলি। মা আমার বয়স জানে না, বয়স আমিই বার করেছি। বয়স যখন পনেরো, লক্ষ করি আমি খুব একা হয়ে যাচ্ছি, নতুন নতুন বন্ধু জুটছে আমার। নিজামুদ্দিন, রাইস আক্কাস, মনিরুদ্দি, আবদুল—এসব বন্ধু। এরা দিনে দু-বেলা বাড়ি এসে আমার খবর নেয়। কেমন আছি, শরীরটা ভালো কিনা, কোনও কিছু লাগবে টাগবে কিনা, চুড়ি ফিত্যা শাড়িকাপড়, যদি ইচ্ছা থাকে তবে তারা কোনওরকমে আপত্তি করবে না দিতে। একই গ্রামের মেয়ে আমি, তাই তারা নাকি এক রকম দায়িত্ব অনুভব করে খোঁজ খবর নেওয়ার। আমি হাসিমুখে সবাইকে না-বলে দিই যে লাগবে না, আমার তেল সাবান লাগবে না, ‘…পুস্কুনিতে দুইঘন্টা ডুব পাড়লে আপনাতেই শইলের ময়লা খইসা যায়, সাবান লাগে না। রিঠা দিয়া চুল ঘসলেই চলে, অত তেলের দরকার হয় না।’

    ওরা আলাদা এসে এসে বলে

    ‘লাগবে না বুঝলুম। তবু যদি…’

    ‘নিমু না তো নিমু না।’

    আমার রাগ দেখে ওরা খেপে যায়।

    ‘নিবি না, কোনও দেশে রাজরানিরে তুই? ফকিরের ঝি!’

    ‘ফকিরের ঝি হইলে বুঝি নেয়?’

    ‘তা তো নেয়ই। তর কীসের এত দেমাগ?’

    ‘জানি না।’

    মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মা অরা তোমারে তেল সাবান দিতে চায় কেন?’

    ‘তুই যে ডাঙর হইছস। ডাঙর হইলে এরম দিতেই চায়।’

    ‘তুমারেও চাইছিল?’

    ‘ক-ত!’

    ‘নিচ্ছিলা তুমি?’

    মা চুপ করে যায়। মা যদি বলতে পারত, ‘নিমু ক্যা? তেল সাবান ছাড়া মানুষের কি চলে না?’ আমি বোধহয় স্বস্তি পেতাম। মা নিশ্চয়ই নিত। মারও তেল সাবান চুড়ি ফিতের লোভ ছিল। টের পাই আমার গায়ের জামাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বগলের দিকে ছিঁড়েছিল। মা সেলাই করেও দিয়েছিল। আবার ছিঁড়েছে। মাকে বললাম, ‘কী জামা যে ছিঁড়তাছে সেই খেয়াল আছে?’

    মা আবারও চুপ করে গেল। বলল, ‘ফতেমার কাছে পুরান জামা টামা চাইয়া নে।’

    ‘তাইলে মর।’

    মায়ের এমন রাগমূর্তি আগে কখনও দেখিনি। মন খারাপ হয়ে যায়। কোত্থেকে জামা কিনে দেবে? এক বাড়িতে ছুটা কাজ করে। মাসে কুড়ি টাকা করে দেয়। কুড়ি টাকায় কি মাস চলে? দিনে না-হয় একবেলা খাই, তবু একবেলার খাওয়ার খরচ কী কম?

    রাতে রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয় কারা যেন আমাকে তেল সাবান দিচ্ছে, কারা যেন আমার হাত ধরে টান দিচ্ছে। টানতে টানতে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন। চিনি না এমন কোথাও। ভয়ে মায়ের শরীর আঁকড়ে রাখি। মা বলে, ‘কীরে ডর লাগে?’

    আমি কথা বলি না। চুপ হয়ে থাকি। মা নিজেই বলে, ‘ডরাইস না। ডরাইলে গরিবের চলে না।’

    ‘তা হলে কী ডর সব বড়োলোকের লইগ্যা?’

    ‘হ!’

    মা এমন কঠিন সুরে ‘হ’ বলে যে আমি আরও চুপ হয়ে যাই। গরিবের ডরভয় থাকতে নেই এ কথাটি আমার মনে কেমন গেঁথে যায়। নিঝুম রাতে মার এই রাগি উচ্চারণ আমারে সাহসী করে তোলে।

    ফরেস্টে ইট ভাঙার কাজ চলছে। ফইজুদ্দিন চাচা, আমিরুল্লাহ আর নবী কাজ পেয়েছে। দাঁড়িয়ে ওদের ইট ভাঙা দেখি। একদিন ফইজুদ্দিন চাচার শরীর কেঁপে জ্বর নামল। চাচা একটি গাছের তলে শুয়ে শুয়ে থির থির করে কাঁপছেন আর সেই ফাঁকে আমি হাতুড়ি দিয়ে দিব্যি ইট ভাঙতে লেগে যাই। লোকে বলে, ‘আঁতুড় থ। আঁতুড় থ। আঙুল ছেঁইচা যাইব।

    ছন্দে ছন্দে ভাঙতে থাকি ইট, কী যে খুশি লাগে। পুরুষেরা যা পারে তা যে আমি এত সহজে পারব আগে ভাবিনি। বিকেল পর্যন্ত ইট ভাঙি।’ আমিরুল্লাহ আর নবী হাসতে হাসতে বলল, ‘হইছে গারোগা মতো এহেন থেইক্যা মাইয়ারা বাইরের কাম লাইগা পারুক, আমার ঘরে গিয়ে আবুদুবাইন পালি। কী কস?’

    ‘হ। তাইত কথা।’

    ফইজুদ্দিনের বয়স পঞ্চাশ, সে জানেও না কে তার হাতুড়ি নিয়েছে। কে তার ছাতার তলে বসে ইট ভাঙছে।

    আমিরুল্লাহ আড়ে আড়ে লক্ষ করে আমি ভাঙছি ইট। ফুইজুদ্দিন চাচার কাছে ও খবর যায় যে তাঁর ইট ভেঙে দিচ্ছি আমি ফরেস্টের লোক একদিন ধরে ফেলে আমাকে। বলে, ‘তুই কে রে?’

    ‘আমি বলি, ‘ফইজুদ্দিন চাচা…’

    ‘তুই পারিস এই কাজ?’

    ঘাড় নেড়ে বলি, ‘হ্যাঁ।’

    ওরা হা হা করে হাসে। দিন শেষে আমার কাজের টাকা চলে যায় ফইজুদ্দিনের হাতে।

    আমি খালি হাতে বাড়ি ফিরি।

    ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই আবার দৌড়ে যাই কাজে। কাজের নেশা পেয়ে যায় আমার।

    মা বলে, ‘ডাঙর হইছস, অহন ছাড় তো জঙ্গল ছাড়।’

    ‘আমি বলি ‘জঙ্গলে তো কাম পাইছি। কাইল থেইকা কুড়ি টাকা কইরা আমিও কামাইতাছি। বড়ো সাইবের পছন্দ হইছে আমার কাম।’

    দিনে কুড়ি টাকার কাজ পেয়েছি, মার চোখ খুশিতে নাচে। কুড়ি টাকার কাজ পেয়েছি, মুখেই কেবল বলি, হাতে পাই না কিছু। পাই কেবল একটি হাতুড়ি। পনেরোদিন পর ফইজুদ্দিনের বাড়িতে টাকার জন্য যাই। আমার হাতে পাঁচ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘আরে মাইয়া হইয়া বেডাগোর কামে লাগছস, এইডাই তো বেশি। আবার টেহাপয়সা চাস কেন?

    দিনে একটাকা দেড়টাকা হিসাবে ফইজুদ্দিনের কাজ করে যাই। এভাবে একমাস কাটে। একদিন কাজ শেষে অফিসারকে সাহস করে জিজ্ঞেস করি, ‘কামডা কী আমারে দেওয়া যায় না?’

    অফিসার জুল জুল করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। তারপর হা হা হাসেন। আমি হাঁ করে ওঁর হাসির দিকে তাকিয়ে থাকি। পরদিন কাজে গিয়ে দেখি ফইজুদ্দিন হাজির। আমি দু-পা মেলে যেমন গাছতলায় বসি তেমন বসে রইলাম। ফইজুদ্দিন আমাকে একবারও বলল না, ‘কামে লাগ। পাঁচটা করে টেহা হইলেও তো পাইবি।’ যেন ঘটনাটি এরকম ছিল যে ধরিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমি কি বাতাসা খাবার জন্য এসেছি? আমি কাজ করতে চাই এ কথা কেউ বুঝল না, অথবা বুঝেও ভাবল যে মেয়েমানুষ আবার কাজ করবে কী। আমি পা ছড়িয়ে আগে বসে থাকতাম, তেমন বসে রইলাম। সুবলও নেই, কাঠবিড়ালিও নেই। আমার খুব একা লাগে।

    বেকার বসে থাকি বাড়িতে। ইট ভেঙে আঙুল ইটের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছে। শক্ত আঙুল দেখতে আনন্দ হয়। হাত-পাগুলো যদি এমন শক্ত হত, শক্ত শক্ত কাজ করতে পারতাম, আনারসের খেতে কাজ করা যেত। নিজের পলকা শরীরটির জন্য মায়া হয়, রাগও হয়। মন খারাপ করে বসে থাকি দাওয়ায়।

    জমির মুনষি একদিন বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মাকে দেখে থামে জিজ্ঞেস করে ‘ছেমরিডার বয়স কত?’

    ‘আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। বয়স কেমনে কই?’ মা কলপাড়ে দাঁড়িয়ে বলে।’

    ‘বিয়া শাদি দিবি না?’

    ‘বিয়া? কাইচলা আবুর বিয়া?’

    ‘কাইচলা আবু কী না একবার পাঁচজনে খুইলা দেখুক তাইলে।’

    ‘কী কন এইগুলান? খাওন পরন নাই। বিয়ার কতা ভাবে কেডা?’

    ‘বিয়া দিলেই ত খাওন পরন আইব।’

    জমির মুনশি বাঁ-হাতে উরুসন্ধি চুলকোয়। উঠোনে লাউয়ের মাচার কাছে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখি আমি। মা খুব জবুথবু দাঁড়িয়েছিল। আমি বুঝে পাই না আমার বিয়ে দিচ্ছে না বলে মা এখন অপরাধীর মতো ভঙ্গি করছে কেন? আমাদের যখন ভাত থাকে না ঘরে, মা-মেয়ে মিলে দিনরাত আকাশ দেখি, আর আকাশে ভেড়ার লোমের মতো থাক। মেঘ ভাসে। আমার তখন খুব মেঘ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, ভাতের খিদেও লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে—তখন তো জমির মুনশি খবর নিতে আসে না আমরা কেন খাচ্ছি না। কেন আমরা চুলো ধরাচ্ছি না।

    বিয়ের আমি বেশি কিছু তখন বুঝি না। মাকে জিজ্ঞেস করি, ‘মা মা মা, বিয়া কেন করে মানুষ?’

    ‘বাইচ্চা কাইচ্চা আইব। তাই।’

    ‘বাচ্চা যদি না অয়?’

    ‘জামাইয়ে খেদাইয়া দিয়া আবার বিয়া করব।’

    ‘আমারেও খেদাইয়া দিব?’

    ‘খেদাইত না তো কী! বংশ না-বাড়াইল বয়ইয়া বয়ইয়া খাওয়াইব নাকি?’

    ‘ও।’

    আমি এসবের কতক বুঝি, কতক বুঝি না। আমার জানবার তৃষ্ণা দিন দিন বাড়ে। বিয়ে কী কেবলই এ কারণে করে? আমার মনে হয় আরও কোনও কারণ আছে। মা একদিন ঝিঁ ঝিঁ ডাকা রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলল, ‘বিয়াডা হইছে খুব ভালো জিনিস। আবার খারাপও। ধর, তর বিয়া হইল, তুই যেন আর চিল্লাইয়া কথাকইতে না পারস, এই লিগাই বিয়া।’

    চিৎকার করে কথা বললে কার অসুবিধে? পুরুষ লোকেরা কি চিৎকার করে না? তারা কি মিনমিন করে কথা বলে? আমি ঠোঁট উলটে বলি, ‘উঁহু আমি যেরম চিল্লাই, সেরমই চিল্লামু।’

    ‘তারপর ধর, সোয়ামির খেদমত। সওয়াব কামাইতে গেলে হের সেবাযত্ন তো করতে হইব।’

    ‘সেবাযত্ন কেন? সোয়ামির কী অসুখ্যা হয়?’

    ‘না, তা হইব কেন? বেডাইন তো জমিদারের জাত। জমিদারেরা কি নিজের কাম নিজে করে? কেউ কইর্যা দেয়। আসল কথা বান্দিগিরি করবার লাইগা মাইয়া মাইনেসে জন্মায়, বান্দিগিরি করতে করতেই হেরা মরে।’

    আমার বিয়ে করতে কোনও ইচ্ছে হয় না। বরং আসমাদের মতো লেখাপড়া করতে ইচ্ছে করে। ওরা যেমন সুর পড়ে স্বর অ স্বরে আ। আমি যদি পড়তে পারতাম। মাকে একদিন বলি, ‘মা রে, লেখাপড়া কি খালি বড়োলোকেরই করে?’

    ‘হ।’

    ‘আমরা কেন বড়োলোকের হইলাম না?’

    ‘আল্লায় করল না।’

    ‘আল্লাডা খুব একচোখ্যাপনা করে। হেরা বড়োলোক, হেগোরে খাওয়ায়, হোগরে পড়ায়, হেগোরে জামাকাপড় দেয়।’

    মার কপালে কুঁচকে ওঠে। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ঈর্ষায় নাকি বেদনায় ঠিক বোঝা যায় না।

    মানুষ হওয়া খুব দুঃখের

    জমির মুনশি কাজটি করল প্রথম, মুখ বেঁধে নিয়ে। জ্বর ছিল, শুয়েছিলাম। মা গিয়েছিল ফিরোজাদের বাড়িতে চাল ধার চাইতে। এমন সময় মুনশি মাকে খুঁজতে এসে দেখে আমি শুয়ে আছি। কপাল ছোঁয়। আহা আহা করতে করতে হাতখানা বুকে নামায়। বুক থেকে পেটে। আমি তার হাত সরিয়ে দিতে চাই গায়ের সবটা শক্তি দিয়ে। পারি না। জমির মুনশি আমার গায়ের উপর চড়ে বসে। ভয়ে আমার মাথা ঘোরে। বমি আসে।

    মা ফিরে এল যখন, জমির মুনশিকে দেখেনি। ততক্ষণে চলে গিয়েছে। মাকে সারারাত ধরে লোকটির ব্যবহারের কথা বললাম। ভোররাতের দিকে মা বলল ‘অঙ্গুরি। বুকটায় যেমন কেমন করেন।’

    সুজি সাগু খেয়ে জ্বর সারল আমার। মা বলল, ‘আর বাইরে যাইস না। ঘরে বইসা থাক। দুনিয়াডের শেষ কী একদিন হইব না?’

    দুনিয়াটার শেষ দেখব বলে আমি আর মা দাওয়ায় বসে থাকতাম। খিদে লাগত। মা রাঁধত না। হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, কখন আকাশ গড়িয়ে বৃষ্টির মতো চাল ডাল নামে। চাল ডাল নামত না। খিদেয় পেট জ্বলত। মা বলত, ‘জমির মুনশি তো তর বাপ লাগে আঙ্গুরি। ও বোধহয় আমরাও বাপ লাগত।’

    আকাশে ভেড়ার গায়ের মতো থাক থাক লোম দেখি, আমার খুব ভেড়া হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ভেড়াদের মনে কি কোনও দুঃখ থাকে? কী জানি। আমার কেবলই মনে হয় মানুষ হওয়া খুব দুঃখের।

    আমার এখনও মনে হয় মানুষ হওয়া খুব দুঃখের। রসুলপুর থেকে হঠাৎ এক রাতে একটি পেঁটালা বগলে নিয়ে সেই যে চুরি করে ঢাকা চলে এসেছি, আর রসুলপুর ফিরিনি। মায়ের কথা, সুবলের কথা মাঝে মধ্যে মনে পড়ে। সুবল ডাকাত হয়েছে কী পাঁড় ব্যবসায়ী হয়েছে জানি না। ছোটোবেলায় মানুষের দেখাদেখি কত কিছু হওয়ার কথা ভাবছি। ওসব খুব ভিতরের ইচ্ছে নয়। আমার আসলে ইচ্ছে করে ঘাসফুল হতে। এখনও রমনায় যখন হাঁটি, মনে হয় যদি ঘাসের সঙ্গে মিশে থাকতে পারতাম, পুরুষগুলো আমাকে এমন ছেঁকে ধরত না। আমার এখনও ঠিক মনে পড়ে না কেন কী করে কবে থেকে আমি রমনায় এলাম। কবে থেকে আমি সোডিয়াম আলোর তলে হাঁটছি। মাঝে মাঝে আমার দম বন্ধ লাগে। মনে হয় বেঁচে আছি কেন? দু-বেলা ভাত খাওয়ার জন্য বেঁচে আছি? খুব ইচ্ছে করে রসুলপুর চলে যাই। ওখানে গজারি গাছের তলায় উইয়ের একটা ঢিবি আছে, ওতে মাথা রেখে শুয়ে থাকি, কিন্তু দিনগুলো আমাকে কেবল সামনে ঠেলে দিচ্ছে। যত সামনে আসছি, পিছনে শক্ত দেওয়াল তৈরি হচ্ছে।

    সিতারা খালা কাল বলছে, ‘আঙ্গুরি, গারমেন্টে কাম করবি?’

    ‘গারমেন্ট?’

    ‘হ। চাকরি। দশটা-পাঁচটা। বেতন দেয়।’

    ‘বেতন মানে কি ট্যাকা?’

    ‘হ। ট্যাকা।’

    ‘আমরা তা মাইয়া মানুষ। মাইয়া মানুষরা কী ওইতা কাম ছাড়া ট্যাকা পায়?’

    সিতারা খালা দুলে দুলে হাসল। বলল, ‘চাকরি করলে কাইল আইস আমারে লগে।’

    রমনায় হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ঠিক করে নিই কাল আমি সিতারা খালার সঙ্গে গারমেন্টে যাব কাজ করতে। কাল সকালে অনেকক্ষণ স্নান করে নেব। শরীরেধুলো ময়লা যা লেগেছে, তা ঝামা ঘষে সাফ করতে হবে।

    ঝামা? হঠাৎ মাকে মনে পড়ে। মা গা মেজে স্নান করিয়ে দিত। ঝামা দিয়ে ময়লা তুলতে তুলতে বলত, ‘জঙ্গলের ভূতেরা তর শইল হাইগা যায় নাকি?”

    মা কী জানে শহরের ‘বেডাইনেরা’ প্রতিরাতে আমার শরীরে ‘হাইগা’ যায়? মায়ের জন্য রমনার একটি একলা ঝাউগাছে উপুড় হয়ে আমার বড়ো কাঁদতে ইচ্ছে করে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleপ্রফেসর সোম – কৌশিক সামন্ত
    Next Article নিমফুলের মধু – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    নিমফুলের মধু – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

    April 25, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    নিমফুলের মধু – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

    April 25, 2026
    Our Picks

    নিমফুলের মধু – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

    April 25, 2026

    মন্দ মেয়ের উপাখ্যান – সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার

    April 25, 2026

    প্রফেসর সোম – কৌশিক সামন্ত

    April 25, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }