সাকীর প্রথম রাত্রি – রমেশচন্দ্র সেন
অনেক দুঃখ কষ্টের পর বারিবালা রূপজীবিনীদের পাশে আসিয়া দরজায় দাঁড়াইল। সবে তখন সন্ধ্যা হইয়াছে, করপোরেশনের লোকে মই লাগাইয়া উত্তরে গলির মোড়ে ও দক্ষিণে মেসবাড়ির দেওয়ালের গ্যাস জ্বালিয়া দেয়। বাদ পড়ে তাদের মাট-কোঠার সামনের আলোটা।
হরিমতী বারিবালার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, সে বলিল, মিনসের মুখে আগুন, আমাদের আলোটা দেখতে পায় না। মারো ঝ্যাঁটা।
পাঁচি বলে, আমাদের বাতি যে খারাপ হয়ে গেছে।
হরিমতী জবাব করে, ইচ্ছে করে ওরা খারাপ করে দেয়। জানে ত যে আমরা কিছু করতে পারব না। যত সব হারামজাদার দল।
পাঁচি বলিল, অন্ধকারও মন্দ নয়। ভদ্দর নোকেরা এদিক ওদিক চেয়ে টুক করে ঢুকতে পারে।
হরিমতী বলে, সেদিন তোর ঘরে কলেজের সেই মাস্টার আসার পর থেকেই তুই আঁধারের ভূত বনে গেছিস। মর অন্ধকার নিয়ে।
খোয়া ও ইট তোলা গলি, উঁচুনিচু এবড়ো খেবড়ো। সংস্কারও হয় নাই বহু দিন। এক পাশে কতগুলি ঘরে টিনের সুটকেশ তৈরি হয়। আর এক ধারে মাট-কোঠায় পতিতারা বাস করে। লোকে বলে সুটকেশের গলি।
কিছুদিন যাবৎ বারিদের বাড়ির সামনেটা অন্ধকার তবে দুই দিকের আলোর জন্য পথ ধরিয়া কোন রকমে চলা যায় কিন্তু মানুষের মুখ দেখা যায় না। বারিবালার মনে হয় যেন কতগুলি ছায়া মূর্তি চলিতেছে। মধ্যে মধ্যে এক একটা ফুলকি জ্বলিয়া ওঠে, পথচারিদের মুখের বিড়ি সিগারেটের আগুন।
চলিতে চলিতে রূপজীবিনীদের দিকে চাহিয়া কেহ বলিয়া ওঠে, মেরি জান, কেহ বা—প্রাণ তর হয়ে গেল।
তুফানের উপর পানসির মতন কেহ কেহ মদের নেশায় টলিয়া চলে। দুইটি প্রৌঢ় কোন বিখ্যাত সিনেমা স্টারের গল্প করিতে করিতে যাইতেছিল। একজন বলিল, পমেটম ত, ওর দাম ছিল দুটাকা। হাওড়ায় থাকত, ওর ঘরে কত গেছি।
তার বন্ধুটি সশ্রদ্ধভাবে বলিল, তুই মাইরি একখানা এনসাইক্লোন।
পমেটমের পরিচিত ব্যক্তিটি হরিমতীদের সামনে আসিয়া দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালাইয়া তাদের মুখের উপর তুলিয়া ধরে। বারুদের গন্ধ ও ধোঁয়া সবই যেন বারিবালার নাকের মধ্যে যাইয়া ঢোকে। সে পিছাইয়া পাঁচির পাশে আসিয়া দাঁড়ায়।
পথচারিদের উদ্দেশ্যে হরিমতী বলে, ধুত্তোর হাড় হা-ভাতের দল।
প্রৌঢ় দুইটি একসঙ্গে হাসিয়া ওঠে, সে কি হাসি—যেন করপোরেশনের দুইটা হাইড্রান্ট দিয়া কলকল করিয়া জল বাহির হয়।
বারিবালা এই সুটকেশের গলিরই মেয়ে। যেখানে মিত্র বাবুদের আস্তাবল উঠিয়াছে তার মা পরিবালা ঐখানে এক খোলার ঘরে থাকিত। তার বাবা কে বারিবালা তাহা জানে না, পরিবালাও জানিত কিনা সন্দেহ !
কৈশোরের ফুল মুকুলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবালা মেয়ের বিবাহ দেয়। পুরোহিত আসে, মন্ত্র পড়া হয়, মালা বদল হয়। কয়েকটি লোকও নিমন্ত্রণ খায়, সব চেয়ে বেশী খায়, তাদের পোষা একটা বাঁদর। একথালা চালমাখা, একছড়া কলা ও আট দশটি বিলাতী আমড়া। তার পর সোল্লাসে হাত তালি দিতে থাকে।
বিবাহের পরদিন বালিবালার স্বামী জামাকাপড়, এই গলিতে তৈরি একটি সুটকেশ ও নগদ কয়েকটি টাকা লইয়া সেই যে বিদায় হয় তারপর আর এ পাড়ায় কেহ তাকে দেখে নাই। জামাইর ঠিকানা ও পরিচয় পরিবালা হয়ত জানিত। কিন্তু সে সম্বন্ধে কোনো কথা উঠিলেই সে বলিত, তার ঠিকানায় দরকার? এ বিয়ে ত পিত্তিরক্ষে।
পরিবালার কৈশোরেও এইরূপ পিত্তরক্ষার ব্যবস্থা হইয়াছিল। কিন্তু সেজন্য বারবনিতার জীবন যাপনে তার মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় নাই। কিন্তু বারিবালা বেশ্যাবৃত্তি করিতে রাজী হইল না। পরিবালা বলিল, কি অলক্ষুনে কাণ্ড, তুই আমার নাম হাসালি।
পরিবালা মেয়েকে গালি দিত, তার খাওয়া বন্ধ করিত, মধ্যে মধ্যে তালা দিয়া তাকে ঘরে পুরিয়া রাখিত। কিন্তু বারির সুবুদ্ধির উদয় হইল না।
ক্ষুধার তাড়নায় সেই বারিবালা আসিয়া দরজায় দাঁড়ায়। আজ সকালেও সে পাঁচিকে বলিয়াছে, দুনিয়ায় পেটের জ্বালাই সব চাইতে বড়।
পাঁচি বলে, এক শ’ বার। এ রাস্তায় পনের আনা মেয়ে আসে পেটের জন্যে, যৈবনের তাড়ায় আর কটা?
হরিমতী গামছা পরিয়া কলতলায় স্নান করিতেছিল। সে প্রতিবাদ করিয়া উঠিল, আমি কিন্তু পেটের জন্য আসিনি। এসেছি যৈবন লুঠতে। নইলে মা মাসী ঘুঁটে দিয়ে আমায় সুখেই রেখেছিল, সকালে মুড়ি বেগুনি খেতুম আর চা। বিকেলে চায়ের সঙ্গে কোনদিন পাঁপড়, কোনদিন পকৌড়ি।
মাতার মৃত্যুর পর অন্নের জন্য বারিবালা গলির দক্ষিণ প্রান্তে বড় রাস্তার মোড়ে পানের দোকান করে। তার খরিদ্দার জোটে অনেক, নানা বয়সের, নানা জাতির। লুঙ্গি পরিহিত কেহ উর্দু মিশ্রিত বাংলায় পান ও পানওয়ালীর সুখ্যাতি করে, যজন যাজন করিয়া টিকিতে ফুল বাঁধিয়া পুরোহিত বালিবালার পানের মিঠা খিলি খাইয়া যায়।
বই বগলে কলেজের একটি ছেলে তার দোকানের সামনে আসিয়া গান ধরে, ভাটিয়ালি সুরে তার প্রাণ ও বারিবালার পানের অনন্ত মিলনের গাথা।
বারিবালা সব উপদ্রবই নীরবে সহ্য করে। একদল ভাবে মেয়েটি বোকা। কেহ কেহ বা মনে করে গভীর জলের মাছ।
শেষের দিকে জুটিল এক প্রৌঢ়। আপিস ফেরার পথে ভুঁড়িওয়ালা এই ব্যক্তিটি রোজ দু’ পয়সার পান কেনে, চুন নিবার অছিলায় বারিবালার হাতে একবার করিয়া হাত ঠেকায়। একখানা আনি দিয়া বাকি দু’পয়সা ফেরত নেয় না। খানিকটা আগাইয়া গিয়া একবার ফিরিয়া তাকায়।
শুনিয়া হরিমতী বলে, ঐ দুটো পয়সা হ’ল তোর যৈবনের পেন্নামি। যৈবন একটা দেবতা ত। দুনিয়ার সেরা দেবতা।
দোকান বন্ধ হইল কলিকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য। ঐ রাস্তাটা ছিল হিন্দু-মুসলমানের শক্তি পরীক্ষার অন্যতম কেন্দ্র।
বারিবালা এবার গলির উত্তর প্রান্তে হিন্দু পল্লীতে দোকান করিল। নূতন এই রোয়াকের মালিক ঘোষজা মশাই বলিলেন, তুই পরীর মেয়ে, তুই দোকান করবি, সে ত সুখের কথা। তোর মাকে চিনতুম। সে মামাদের ভাড়াটে ছিল। তোর আর ভাড়া লাগবে না, তবে রোজ আমাদের ফ্যামিলির যা পান দরকার সেইটে দিস।
আগের রোয়াকের মালিক ছিল গরিব, ভদ্রলোকও নয়। কিন্তু সে কখনও ভাড়ার কথা তোলে নাই, বিনা পয়সায় একটা পান খায় নাই। ভাড়ার বিনিময়ে রসিকতাও করিত না।
বারিবালার এই নূতন দোকান বেশী দিন চলিল না। সে একদিন শুনিল, মোটা সেলামি এবং ভাড়া পাইয়া ঘোষজা রোয়াকটা আর একজনের সঙ্গে বন্দোবস্ত করিতেছেন। সে যাইয়া তাকে ধরিল, আপনি রোয়াকটা আর কাউকে দিলে আমি যে না খেয়ে মরব।
ঘোষজা কহিলেন, দূর পাগলি। তুই হলি পরির মেয়ে। তোকে কি তুলে দিতে পারি?
কৃতজ্ঞ গদগদ কন্ঠে বারিবালা বলে, আর জন্মে আমি আপনার মেয়ে ছিলুম।
মেয়ে নয়রে, নাতনি—বলিয়া ঘোষজা এদিক ওদিক চাহিয়া বারিবালার গালে দুইটা টোকা দেন, তারপর বলেন, বারি নামটা ভারী সুইট।
পরের দিন বারিবালা যাইয়া দেখে হিন্দু রাজমিস্ত্রীরা রোয়াকে ইটের উপর ইট গাঁথিতেছে।
রেশন কন্ট্রোলের বাজারে দিনের পর দিন অর্ধভুক্ত, অভুক্ত থাকিয়া সামান্য একখানা কাপড় জোগাড় করিতে না পারিয়া বারিবালা শেষটায় হরিমতীর উপদেশ মানিয়া লয়। হরিমতী বলে, গতরের উপর দিয়ে যৈবনের জোয়ার বয়ে যাবে আর তুই শুকিয়ে মরবি। সে কী হয়? আয় আমাদের পাশে এসে দাঁড়া।
বারিবালাকে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করিতে হয় না। মিনিট কুড়ির মধ্যেই বাবু জুটিয়া যায়। অলষ্টার পরিহিত একটি লোক তাদের দরজার সামনে আসিয়া ডাকে, শোন…
পাঁচি বারিবালাকে বলিয়া দিয়াছিল, তোর সাজ সজ্জে নেই কিন্তু যৈবন আছে ত। আগুনের মতন যৈবন। তুই ঘন্টায় চার টাকা চাইবি। কয়লা, ঘুঁটে, কেরোসিন সব মাগগি। একটা উনুন ধরাতে গেলেও আট গণ্ডা পয়সার দরকার।
কিন্তু লোকটির সামনে বারিবালার সব গুলাইয়া যায়। কত চাই তোমার? —এই প্রশ্নের উত্তরে বারিবালা বলে, যা দেন।
হরিমতী আজ সকালে তার চৌকাঠে ঘোড়ার নাল লাগাইয়া দিয়াছিল। ইহা নাকি তাদের ব্যবসায়ের লক্ষ্মী। বারিবালা সেই লক্ষ্মীর উদ্দেশে প্রণাম করিয়া ঘরের শিকল খুলিয়া আগন্তুককে ভিতরে লইয়া যায়।
ঘরে একটা হারিকেন জ্বলিতেছিল। তার পলিতা বাড়াইয়া বারিবালা আগন্তুকের দিকে চায়। দৃঢ় বলিষ্ঠ গড়ন, বেঁটে খাটো মানুষ, মাথায় টাক, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গোঁফ, তাতে পাক ধরিয়াছে। চোখ দুটি শিকারী বিড়ালের মতন।
বারিবালার ভয় করে। মানুষটিকে বলিতে ইচ্ছা করে, আপনি আমার বাপের বয়সী। আপনি এখানে কেন? যান এক্ষুনি চলে যান।
কিন্তু পেটের চিন্তা সব ছাপাইয়া ওঠে।
ছোট ঘর, পাকা মেজে তার উপর মাদুর ও বালিশ পাতা। একপ্রান্তে তোলা উনানের উপর মাটির হাঁড়ি, পাশেই কড়াইতে কি যেন ঢাকা রহিয়াছে। আর এক কোণে দুটা বালতি, একটায় জল আর একটায় পানের দোকানের সরঞ্জাম।
দেওয়াল মাটির, তার উপর বিভিন্ন আকার ও বর্ণের কতগুলি কাগজ আঁটা। তার মধ্যে থিয়েটার বায়স্কোপের বিজ্ঞাপন ও চিত্রতারকাদের ছবিই বেশী।
বারিবালা মাদুরের একপাশে পান সাজিতে বসিলে লোকটি বলিল, ও কি চাঁদ, অত দূরে কেন? পান পরে হবে খন। তোমার নামটি কি বল দেখি?
বারিবালা।
না, না, তোমার নাম দিলুম সাকী। তুমি আমার মদ ঢেলে দেবে, বলিয়াই আগন্তুক অলষ্টারের পকেট হইতে দেশী মদের একটা বোতল বাহির করে, আর এক পকেট হইতে পাঁউরুটি ডিম সিদ্ধ ও পেয়াজের কুচি এবং কর্ক স্ক্রু। মানুষটা যেন চলন্ত একটা ক্যান্টিন। সে বলে, দুটো সোডা আনাও, আর দুটো গেলাস দাও।
বারিবালা বলে, গেলাস ত আমার ঘরে নেই।
তার সাজা একটা পান মুখে ফেলিয়া আগন্তুক বলিল, গলিতে পানওয়ালা নেই?
হ্যাঁ, আছে।
তাকে বল সোডা ও সিগারেটের সঙ্গে যেন দুটো গেলাসও দেয়। গেলাস ভাঙলে দাম দেব খন।
একটা গেলাসেই চলবে। আমি মদ খাই না।
মদ খাও না? এ্যাঃ! একেবারে নিরিমিষ্যি মেয়ে মানুষ, হাঃ হাঃ।
বারিবালা বড় রাস্তার পানওয়ালাকে সিগারেট সোডা ও গেলাস দিতে বলার জন্য বাহিরে গিয়াছিল। আসিয়া দেখে আগন্তুক বোতলটা মুখে লাগাইয়া ঢক ঢক করিয়া মদ গিলিতেছে। দেখিলে মনে হয় শুঁড়ওয়ালা একটা জানোয়ার।
বোতলটা নামাইয়া তালুতে জিভ ঠেকাইয়া চুম্বনের মত শব্দ করিয়া সে বলে, এত দেরি হল যে চাঁদ? এস এস, কাছে এস—বলিয়া সে বারিবালাকে কাছে টানিয়া নেয়।
মদের উগ্র গন্ধে বারিবালার দম বন্ধ হইয়া আসে, খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘষায় মনে হয় গাল ছিঁড়িয়া যাইতেছে। সে আগন্তুককে হাত দিয়া ঠেলিয়া দেয়।
মাগনা নাকি? এর জন্য পয়া দেব না? —বলিয়া লোকটা আবার বারিবালাকে কাছে টানিয়া নেয়।
দুঃখ কষ্টের সঙ্গে বারিবালার পরিচয় যথেষ্ট, বহু লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সে সহ্য করিয়াছে কিন্তু জীবনের এত কদর্য রূপ কখনও কল্পনা করিতে পারে নাই। বিরক্তিতে, ভয়ে ঘৃণায় তার মাথা ঝিমঝিম করিতেছিল এই সময়ে তাকে রক্ষা করিল পানওয়ালা ভালু সাহ। দরজায় ধাক্কা দিয়া সে ডাকিল, বারি দি।
আগে ডাকিত পানওয়ালী। তার জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একদিনে পানওয়ালী বারিদি বনিয়া গেল।
সোডা গেলাস সিগারেট রাখিয়া ভালু সাহ দাম চায়। আগন্তুক বলে, পরে হবে খন। তুমি জামিন রইলে দিদিমণি—বলিয়া ভালু সাহ চলিয়া যায়।
আগন্তুক এবার খাইতে আরম্ভ করে, একবার পাঁউরুটিতে কামড় দেয়, সঙ্গে খানিকটা কাটলেট মুখে পোরে আর পেঁয়াজের কুঁচি, কখনও আস্ত একটা সিদ্ধ ডিম। মধ্যে মধ্যে মদ দিয়া গলা ভিজায়, তাতে সোডা থাকে খুব কম। বারিবালা আলিপুর পশুশালায় সিন্ধুঘোটকের খাওয়া দেখিয়াছিল, তার মনে পড়ে সেই দৃশ্য।
খানিকটা পরে লোকটি বলিল, তুমি খাচ্ছ না যে? ডিম, কাটলেট সব ফাষ্টো কেলাস জিনিস। খাও।
হ্যাঁ খাচ্ছি—বলিয়া বারিবালা শশব্যস্তে একটা ডিম তুলিয়া লয়।
আরও খানিকটা মদ খাইয়া আগন্তুক বলে, আমায় তুমি ডাকবে রোজা বলে।
এর পরে সে অনর্গল বকিয়া যায়, সে একজন বে-পরোয়া লোক, যাকে বলে ডোন্টো-কেয়ার ম্যান। রোজগার করে, ফুর্তি করে, রেস খেলে। যে ঘোড়া তাকে বেশী পয়সা দেয়, নিজে সেই ঘোড়ার নাম গ্রহণ করে, পরের সপ্তাহে আবার অন্য ঘোড়ার নাম। জেতে খুব কম তাই অনেক সময় এক নামেই দীর্ঘ দিন চলিয়া যায়। মধ্যে মধ্যে রেসও বন্ধ থাকে। গেল বছর একটানা প্রায় ছয়মাস তার নাম ছিল ব্ল্যাক ডেভিল। আজ রোজা তাকে তিন টাকায় এক শ’ পঞ্চান্ন টাকা দিয়াছে। রোজা একটা মাদী ঘোড়া, ফিরোজার মেয়ে।
নিজের রোজা নামের ইতিহাস সে শেষ করিল এই বলিয়া—শেষটায় একটা মাদী ঘোড়ার নাম নিতে হ’ল এই হ’ল যা দুঃখ।
একটি ইঁদুর বালতি দুইটার মধ্য হইতে উঁকি মারিতেছিল। কেহ কিছু না বলায় ক্রমে তার সাহস বাড়ে। শেষটায় মাদুরের কাছে আসিয়া পেঁয়াজের কুঁচি ও রোজার উচ্ছিষ্ট মাংসের ছিবড়া কুট কুট করিয়া খাইতে থাকে। একবার আসে আবার ছুটিয়া যায়।
রোজা বলে, ওটাকে ধরে একটু মদ খাইয়ে দেব নাকি?
তার পরই সে শুরু করে প্রেমের গল্প। ছেলেবেলা হইতে অনেককে সে ভালোবাসিয়াছে। প্রথম বাসিয়াছিল তাদের গ্রামের এক নাপিতানীকে, সে রোজার চেয়ে অন্তত পনের বছরের বড়। নারী জাতির প্রতি এই দুর্বলতা এখন আসিয়া এক জায়গায় ঠেকিয়াছে। রোজা বলিল, এই ভালোবাসাই ফাইনেল।
সে ভালোবাসে তার মনিবের স্ত্রীকে। মেয়েটি অসাধারণ সুন্দরী। তার স্বামী তাকে ডাকে সাকী বলিয়া।
তোমায় যদি আগে দেখতুম তাহ’লে তোমায়ই ভালোবাসতুম সারি। মেয়েলোক দেখলেই ডাকতুম সারি বলে, সাকী নয়। যাক তোমায় সেকেণ্ডো করে নিলুম। সাকীর পর সারি। কি বল ভাই?
বারিবালা বলিল, আমার নাম সারি নয়, বারি।
ভালো, বেশ তুমি আমার সেকেণ্ডো সাকী—আর আমি রোজা—বলিয়া রোজা বারিবালার গায়ে ঢলিয়া পড়ে।
হঠাৎ তার খেয়াল হয় যে ঘরের আলোটা খুব তীব্র। সে বলে, আলোটা কমিয়ে দাও ত সাকী।
বারি বলে, থাক না।
না না, আলোতে ভালোবাসা ঠিক জমে না।
বারি তবুও ইতঃস্তত করিতেছে দেখিয়া রোজা তাকে ধমক দেয়, যাও, জলদি উঠে বাতিটা কমিয়ে দাও।
বারিবালা উঠিয়া বাতিটা কমাইয়া দিলে রোজা জিজ্ঞাসা করিল, এ রাস্তায় এসেছ ক’দ্দিন?
বারিবালা কোন উত্তর করে না। রোজা বলে, ভাগ্যিস বলনি, যে নতুন এসেছো। তা হ’লে রাগ করতুম।
কেন?
সবাই বলে, আমি নতুন আনকোরা। ও সব আমি ধরে ফেলতে পারি। পাকা জহুরী ত, ঝুটো আর আসল মাল চিনি।
বারিবালা বলে, হ্যাঁ আমি পুরোনো, খুব পুরোনো—এ রাস্তায় এসেছি অনেক দিন।
রোজা বলে, মদ আর মেয়েমানুষ পুরনোই ভালো, হেঃ হেঃ। সে আবার বিনা সোডায় খানিকটা মদ খায়। তারপর হঠাৎ বারিবালার মুখ তুলিয়া ধরিয়া বলে, খাও তুমি একটুখানি খাও—তার মতামতের আর অপেক্ষা করে না। বারির মুখ জোর করিয়া খুলিয়া খানিকটা মদ ঢালিয়া দেয়।
না খাইলে রোজা হয়ত গলা টিপিয়া মারিবে। এই ভয়ে বারিবালা একটুখানি মদ গিলিয়া ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে বমি হইয়া যায়।
রোজা এরপর আর তাকে মদ খাওয়ার জন্য জিদ করে না। বলে, তুমি শুধু আমার সাকী হও। মদ ঢালো, আমি খাই। বেশী সোডা মিশিও না কিন্তু, ও হচ্ছে মেয়েদের ড্রিঙ্ক।
বারি মদ ঢালে, রোজা ঢুক ঢুক করিয়া খায় আর গল্প করে, দেশের গল্প, চাকরির গল্প।
আমি হচ্ছি মৈষণ্ডির দে। নাম ডাক আমাদের কত। ঠাকুরদা ডাকাত ছিল। বাবাটা গোবেচারী, পাঠশালার পণ্ডিত আর গাঁয়ের পোষ্ট মাষ্টার। লোকে বলে, ঠাকুরদাদার উপযুক্ত নাতি হচ্ছি আমি? পেতুম একটা ডিলারি, তা সে তেলেরই হ’ক আর চিনি কাপড়েরই হ’ক। দেশে তাহ’লে কোঠা করতুম সাকী মঞ্জিল, আর সাকীর নামে দিঘি কাটাতুম।
বড় বড় মিলিটারি সার্ভিসও অনেক করেছি এখন করি সিভিল।
বারি তার মুখের দিকে চায়।
রোজা বলে, কোহিমা জান? মণিপুর কোহিমা, যে অবধি নেতাজী এসেছিলেন? কোহিমায় আমি মিলিটারি সাহেবের গাড়ির ক্লিনার ছিলুম। এখন করি ড্রাইভারি, বাসের ড্রাইভার। গাড়ির মালিক হচ্ছে সাকী।
রোজা গল্প বলে আর বারিবালাকে আদর করে। কখনও বলে, তোমার মাথাটা আমার ঘাড়ের উপর রাখ। কখনও তাকে কোলে বসায়।
এইভাবে অনেকক্ষণ কাটিয়া যায়। হঠাৎ তার শখ হয় বারিবালার গান শুনিবার। সে গান জানে না শুনিয়া নিজেই শুরু করিয়া দেয়,
এক রাজকুমারী স্বপ্নে দেখেছে সে।
কয়েক কলি গাহিয়া বলে, না সুবিধে হচ্ছে না। শোন একখানা মিলিটারি গান :
কদম কদম বাঢ়ায়ে যাও—
বাঢ়ায়ে যাও
পরক্ষণেই ধরে :
বুড়া বয়সে নূপুর দেখি পায়
গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচে, ধেই ধেই নৃত্য। যেমন কণ্ঠস্বর তেমনি লয়মান বোধ তার উপযোগী নাচ, সে এক মহাতাণ্ডব।
মাথায় টাক, চুলে পাক ধরিয়াছে কিন্তু লোকটা যেন উৎসাহের অবতার। নাচের পরই বারিবালাকে আদর করিতে আরম্ভ করে।
প্রথম প্রথম সিগারেটের ধোঁয়া মদের গন্ধ ও রোজার দাড়ি গোঁফের খোঁচায় বারিবালা অস্বস্তি বোধ করিতেছিল। কিন্তু এখন আর তাহা নাই। সব কথা তার কানে যায় কিনা সন্দেহ। যন্ত্রচালিত পুতুলের মতন সে কখনও কখনও সাকীর গলা জড়াইবার ভান করে।
রোজা ভারী খুশি হয়। বলে, সাকী বরাতে ছিল তোকে পাব তাই আজ বেঁচে গেছি। সকালে যা ফাঁড়া গেছে আমার উপর দিয়ে।
নূতন এই প্রসঙ্গের অবতারণায় বারিবালা খানিকটা স্বস্তি বোধ করে। জিজ্ঞাসু নেত্রে রোজার দিকে চায়।
রোজা বলে, সকাল আটটায় কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট দিয়ে বাস চালাচ্ছি। গাড়ি তীরের মতন ছুটছে। পাশেই আর একটা বাস, সেটা অনেকক্ষণ হেদোর মোড়ে দাঁড়িয়েছিল। পিছন থেকে আমি এসে ধরায় সেই গাড়ির ড্রাইভারও স্পিড বাড়িয়ে দিলে। চলল রেস।
হঠাৎ একটা চিৎকার—চিৎকার না যেন সমুদ্দুরে বাণ ডেকেছে। তার পরই শুনি, ধর ধর, মার শালাকে মার।
চেয়ে দেখি আমার সামনের চাকার তলায় একখানা কচি হাত। দিলুম পা দিয়ে এ্যাকসিলেটর চেপে, গাড়ি আরও জোরে ছুটল।
বারিবালা বলিল, আপনি গাড়ি থামালেন না?
আরে পাগলি। জানি, ছেলেটা চাকার তলায় থেৎলে পিষে যাচ্ছে! কিন্তু গাড়ি থামালে তোকে কি আজ আদর করতে পারতুম?
বারিবালা যেন আপন মনেই বলিতে লাগিল, ছেলেটা থেৎলে গেল, আর আপনি…
রোজা গর্জন করিয়া উঠিল, আপনি নয় তুমি। বল তুমি।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি।
রোজা বলিল, একটু দূরে সেফ সাইডে গিয়ে গাড়ি বাঁধলুম। আর তার পরই নেমেই দে ছুট—
আর ছেলেটি?
আর ছেলেটি! তার ঘি আর রক্ত মাংসে রাস্তাটা তখন একাকার হয়ে গেছে। হাঃ হাঃ হাঃ।
রোজা আগেও কয়েকবার অট্টহাস্য করিয়াছে। প্রতিবারের হাসি আগের বারের চেয়ে হিংস্র। কিন্তু এবারের হাঃ হাঃ’র তুলনা হয় না, ঠিক যেন ভালুকের হাসি।
রোজা বলিয়াই চলে, কম স্পিডে আমি চালাতে পারি না। আরও অনেকবার এ রকম হয়েছে। কিন্তু ধরা পড়িনি কোন দিন। আমি হচ্ছি মানুষ চাপা দেওয়ার কল।
আপনি আরও অনেক মানুষ মেরেছেন?
আরে পাগলি। ঢাল ঢাল আর একটু মদ ঢাল। আর দুটো পান সেজে দে।
বারিবালা গেলাসে মদ ঢালে। তার হাত কাঁপে, চোখের উপর ভাসে একটি কিশোরের পিষ্ট দেহ। তার রক্ত মাংসে রাজপথ ক্লেদাক্ত হইয়া গিয়াছে।
রোজা বলিয়া উঠিল, তোর হাত কাঁপছে যে বড়? সন্ধ্যের পর আমি ত ঐ পথ দিয়েই এলুম। একটু নজর দিতেই চোখে পড়ল ফুটপাথের নিচে একটা ঝাঁঝরির পাশে ক’টা দাঁত। ছেলেটির দাঁত, কচি কচি—
বারিবালা আর শুনিতে পারে না। তার মনে হয় লোকটা খুনী। সকালে ছেলেটিকে চাপা দিয়া সন্ধ্যায় তাকে মারিয়া ফেলিতে আসিয়াছে। সে বলিয়া উঠিল, যাও যাও—তুমি—আপনি যাও এখান থেকে।
রোজা বলে, মাগনা নাকি? হাঃ হাঃ। তার মুখ দিয়া তখন গাঁজলা বাহির হইতেছে!
বারিবালা শতরঞ্জির উপর চোখ বুজিয়া পড়িয়া আছে। তার ডান পায়ের কাপড় হাঁটুর একটু উপরে উঠিয়াছে। পাশেই রোজার উচ্ছিষ্টের উপর মাছি ভন ভন করে।
খুব দূরে সাইরেন বাজিলে যেরূপ শব্দ হয় তার কানে আসে সেই রকম অর্ধস্পষ্ট শব্দ। রাস্তায় মানুষের কলরব। সাইরেন শুনিয়া দলে দলে মানুষ ছুটিয়া পালায়। সেও পলাইতেছিল, পিছন হইতে চুলের মুঠি ধরিয়া তার মা বলিল, পালাচ্ছিস কোথায়? বাবু করবি না ত খাবি কি?
বারিবালা ভয়ে ভয়ে বলে, মের না মা, মের না। আমি সব করব।
এই সময় পানওয়ালা ভালু সাহ ডাকে, বারি দিদিমণি। বারিবালা আধ ঘুমের ঘোরেই বলে, হ্যাঁ শুনব, বাবু…
ভালু সাহ বেশ একটু উঁচু গলায় বলে, ঝুটমুট কি বকছ?
বারিবালা এবার চোখ মেলিয়া চায়।
ভালু সাহ বলে, আমার পয়সা দাও। সোডা, সিগ্রিট, গিলাচ।
বারি বলে, পয়সা কিসের?
তার সর্ব শরীরে একটা গ্লানি, গা ঘিন ঘিন করে। পর মুহূর্তেই মনে পড়ে অলষ্টার পড়া মানুষটাকে। সে চাহিয়া দেখে মেজেয় বোতল, ভাঙা গেলাস, পাশেই পেঁয়াজের কুচি ও চিংড়ির খোসা ছড়ানো।
মনে পড়ে লোকটার নৃত্য, তার আদর। সে আদর করিয়া গিয়াছে কিন্তু একটা কানা কড়িও রাখিয়া যায় নাই।
