চন্দ্রমুখী – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
রাত্রিতে দুই বন্ধু বেশ-বিন্যাস করিয়া বাহির হইল। দেবদাসের এ-সকলে তেমন প্রবৃত্তি ছিল না, কিন্তু চুনিলাল কিছুতেই সামান্য পোশাকে বাহির হইতে রাজি হইল না। রাত্রি নয়টার সময় একখানা ভাড়াটিয়া গাড়ি চিৎপুরের একটি দ্বিতল বাটীর সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। চুনিলাল দেবদাসের হাত ধরিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। গৃহস্বামিনীর নাম চন্দ্রমুখী—সে আসিয়া অভ্যর্থনা করিল। এইবার দেবদাসের সর্বশরীর জ্বালা করিয়া উঠিল! সে যে এই কয়দিন ধরিয়া নিজের অজ্ঞাতসারে নারীদেহের ছায়ার উপরেও বিমুখ হইয়া উঠিতেছিল, ইহা সে নিজেই জানিত না। চন্দ্রমুখীকে দেখিবামাত্রই অন্তরের নিবিড় ঘৃণা দাবদাহের ন্যায় বুকের ভিতর প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। চুনিলালের মুখপানে চাহিয়া ভ্রূকুটি করিয়া কহিল, চুনিবাবু এ কোন হতভাগা জায়গায় আনলে? তার তীরকণ্ঠ ও চোখের দৃষ্টি দেখিয়া চন্দ্রমুখী ও চুনিলাল উভয়েই হতবুদ্ধি হইয়া গেল। পরক্ষণেই চুনিলাল আপনাকে সামলাইয়া লইয়া দেবদাসের একটা হাত ধরিয়া কোমল-কণ্ঠে কহিল, চল চল ভিতরে গিয়ে বসি।
দেবদাস আর কিছু কহিল না—ঘরের ভিতরে আসিয়া নীচের বিছানায় বিষণ্ণ নতমুখে উপবেশন করিল। চন্দ্রমুখীও নীরবে অদূরে বসিয়া পড়িল। ঝি রূপা-বাঁধানো হুঁকায় তামাক সাজিয়া আনিয়া দিল—দেবদাস স্পর্শও করিল না। চুনিলাল মুখ ভার করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। ঝি কি করিবে ভাবিয়া না পাইয়া অবশেষে চন্দ্রমুখীর হাতেই হুঁকাটা দিয়া প্রস্থান করিল। সে দুই-একবার টানিবার সময়, তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেবদাস তাহার মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া, হঠাৎ নিরতিশয় ঘৃণাভরে বলিয়া উঠিল, কি অসভ্য আর কি বিশ্রীই দেখতে।
ইতিপূর্বে চন্দ্রমুখীকে কেহ কখনো কথায় ঠকাইতে পারে নাই। তাহাকে অপ্রতিভ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু দেবদাসের এই আন্তরিক ঘৃণার সরল এবং কঠিন উক্তি তাহার ভিতরে গিয়া পৌঁছিল। ক্ষণকালের জন্য সে হতবুদ্ধি হইয়া গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আরও বার-দুই গুড়গুড় করিয়া শব্দ হইল, কিন্তু চন্দ্রমুখীর মুখ দিয়া আর ধোঁয়া বাহির হইল না। তখন চুনিলালের হাতে হুঁকা দিয়া সে একবার দেবদাসের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহার পর নিঃশব্দে বসিয়া রহিল। নির্বাক তিনজনেই। শুধু গুড়গুড় করিয়া হুঁকার শব্দ হইতেছে, কিন্তু তাহা যেন বড় ভয়ে ভয়ে। বন্ধুমণ্ডলীর মাঝে তর্ক উঠিয়া হঠাৎ নিরর্থক একটা কলহ হইয়া গেলে, প্রত্যেকেই যেমন নীরবে নিজের মনে ফুলিতে থাকে, এবং ক্ষুব্ধ অন্তঃকরণ মিছামিছি কহিতে থাকে, তাইত! এমনি তিনজনেই মনে মনে বলিতে লাগিল, তাইত! এ কেমন হইল।
যেমনই হোক, কেহই স্বস্তি পাইতেছিল না। চুনিলাল হুঁকা রাখিয়া দিয়া নীচে নামিয়া গেল, বোধ করি আর কোন কাজ খুঁজিয়া পাইল না,—তাই। ঘরে দুইজনে বসিয়া রহিল। দেবদাস সহসা মুখ তুলিয়া কহিল, তুমি টাকা নাও?
চন্দ্রমুখী সহসা উত্তর দিতে পারিল না। আজ তার চবিবশ বৎসব বয়স হইয়াছে, এই নয়-দশ বৎসরের মধ্যে কত বিভিন্ন প্রকৃতির লোকের সহিত তাহার ঘনিষ্ঠ পরিচয় হইয়াছে , কিন্তু এমন আশ্চর্য লোক সে একটি দিনও দেখে নাই। একটু ইতঃস্তত করিয়া কহিল, আপনার যখন পায়ের ধুলো পড়েচে…
দেবদাস কথাটা শেষ করিতে না দিয়াই বলিয়া উঠিল, পায়ের ধুলোর কথা নয়। টাকা নাও তো?
তা নিই বৈ কি। না হলে আমাদের চলবে কিসে?
থাক, অত শুনতে চাইনে। বলিয়া সে পকেটে হাত দিয়া একখানা নোট বাহির করিল এবং চন্দ্রমুখীর হাতে দিয়াই চলিতে উদ্যত হইল—একবার চাহিয়াও দেখিল না কত টাকা দিল।
চন্দ্রমুখী বিনীতভাবে কহিল, এরি মধ্যে যাবেন?
দেবদাস কথা কহিল না—বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইল।
চন্দ্রমুখীর একবার ইচ্ছা হইল টাকাটা ফিরাইয়া দেয় , কিন্তু কেমন একটা তীব্র সংকোচের বশে পারিল না, বোধ করি বা একটু ভয়ও তাহার হইয়াছিল। তা ছাড়া, অনেক লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও অপমান সহ্য করা অভ্যাস তাহাদের আছে বলিয়াই নির্বাক নিস্পন্দ হইয়া চৌকাঠ ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। দেবদাস সিঁড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া গেল।
সিঁড়ির পথেই চুনিলালের সহিত দেখা হইল। সে আশ্চর্য হইয়া প্রশ্ন করিল কোথায় যাচ্চ দেবদাস?
বাসায় যাচ্চি।
সে কি হে?
দেবদাস আরও দুই-তিনটি সিঁড়ি নামিয়া পড়িল।
চুনিলাল কহিল, চল আমিও যাই।
দেবদাস কাছে আসিয়া তাহার হাত ধরিয়া বলিল, চল।
একটু দাঁড়াও, একবার উপর থেকে আসি।
না, আমি যাই, তুমি পরে এসো , বলিয়া দেবদাস চলিয়া গেল।
চুনিলাল উপরে আসিয়া দেখিল, চন্দ্রমুখী তখনও সেইভাবে চৌকাঠ ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছে।
তাহাকে দেখিয়া কহিল, বন্ধু চলে গেল?
হ্যাঁ।
চন্দ্রমুখী হাতের নোট দেখাইয়া কহিল, এই দেখ। কিন্তু ভালো বোধ কর ত নিয়ে যাও , তোমার বন্ধুকে ফিরিয়ে দিয়ো।
চুনিলাল কহিল, সে ইচ্ছে করে দিয়ে গেছে, আমি ফিরিয়ে নিয়ে যাবো কেন?
এতক্ষণ পরে চন্দ্রমুখী একটুখানি হাসিতে পারিল , কিন্তু হাসিতে আনন্দ ছিল না। কহিল, ইচ্ছে করে নয়, আমরা টাকা নিই বলে রাগ করে দিয়ে গেছে। হাঁ, চুনিবাবু লোকটা কি পাগল?
একটুও না। তবে আজ ক’দিন থেকে বোধ করি ওর মন ভালো নেই।
কেন মন ভালো নেই—কিছু জানো?
না জানিনে। বোধ হয় বাড়িতে কিছু হয়ে থাকবে।
তবে এখানে আনলে কেন?
আমি আনতে চাইনি, সে নিজে জোর করে এসেছিল।
চন্দ্রমুখী এবার যথার্থই বিস্মিত হইল। কহিল, জোর করে নিজে এসেছিল? সমস্ত জেনে?
চুনিলাল একটুখানি ভাবিয়া কহিল, তা বৈ কি। সমস্তই ত জানত। আমি ত আর ভুলিয়ে আনিনি।
চন্দ্রমুখী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া কি ভাবিয়া কহিল, চুনি, আমার একটি উপকার করবে?
কি?
তোমার বন্ধু কোথায় থাকেন?
আমার কাছে।
আর একদিন তাকে আনতে পারবে?
তা বোধ হয় পারব না। এর আগেও কখনো সে এ-সব জায়গায় আসেনি, পরেও বোধহয় আর আসবে না। কিন্তু কেন বল দেখি?
চন্দ্রমুখী একটু ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল, চুনি, যেমন করে হোক, ভুলিয়ে আর একবার তাকে এনো।
চুনি হাসিল , চোখ টিপিয়া কহিল, ধমক খেয়ে ভালোবাসা জন্মাল নাকি?
চন্দ্রমুখীও হাসিল , কহিল, না দেখে নোট দিয়ে যায়—ওটা বুঝলে না?
চুনি চন্দ্রমুখীকে কতকটা চিনিতে পারিয়াছিল। ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না—না, নোট-ফোটের লোক আলাদা—সে তুমি নও। কিন্তু সত্যি কথাটা কি বল ত?
চন্দ্রমুখী কহিল, সত্যিই একটু মায়া পড়েচে।
চুনি বিশ্বাস করিল না , হাসিয়া কহিল, এই পাঁচ মিনিটের মধ্যে?
এবার চন্দ্রমুখীও হাসিতে লাগিল। বলিল, তা হোক। মন ভালো হলে আর একদিন এনো—আর একবার দেখব। আনবে ত?
কি জানি।
আমার মাথার দিব্যি রইল।
আচ্ছা—দেখব।
চারি-পাঁচদিন পরে একদিন ঠিক সন্ধ্যার সময় চুনিবাবু বাহির হইতেছিল—দেবদাস কোথা হইতে আসিয়া হাত ধরিল—চুনিবাবু, সেখানে যাচ্চ?
চুনিলাল কুন্ঠিত হইয়া বলিতে গেল, হাঁ—না, বল ত আর যাইনে।
দেবদাস কহিল, না যেতে বারণ করচি নে কিন্তু, একটি কথা বল, কি আশায় সেখানে তুমি যাও?
আশা আর কি? এমনি সময় কাটে।
কাটে? কৈ, আমার সময় ত কাটে না! আমি সময় কাটাতে চাই।
চুনিলাল কিছুক্ষণ তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিল, বোধ করি তাহার মনের ভাব মুখে পড়িতে চেষ্টা করিল। তাহার পর কহিল, দেবদাস, তোমার কি হয়েচে খুলে বলতে পারো?
কিছুই ত হয়নি।
বলবে না?
না চুনি, বলবার কিছুই নেই।
চুনিলাল বহুক্ষণ অধোমুখে থাকিয়া কহিল, দেবদাস, একটা কথা রাখবে?
কি?
সেখানে আর একবার তোমাকে যেতে হবে। আমি কথা দিয়েচি।
যেখানে সেদিন গিয়েছিলাম—সেইখানে ত?
ছিঃ—আমার ভালো লাগে না।
যাতে ভালো লাগে, আমি করে দেব।
দেবদাস অন্যমনস্কের মত কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, আচ্ছা, চল যাই।
অবনতির এক সোপান নীচে নামাইয়া দিয়া চুনিলাল কোথায় সরিয়া গিয়াছে। একা দেবদাস চন্দ্রমুখীর ঘরে নীচে বসিয়া মদ খাইতেছে। অদূরে বসিয়া চন্দ্রমুখী বিষণ্ণমুখে চাহিয়া চাহিয়া সভয়ে বলিয়া উঠিল—দেবদাস, আর খেয়ো না।
দেবদাস মদের গ্লাস নীচে রাখিয়া ভ্রূকুটি করিল, কেন?
অল্পদিন মদ ধরেচ, অত সইতে পারবে না।
সহ্য করব বলে মদ খাইনে। এখানে থাকব বলে শুধু মদ খাই।
এ কথা চন্দ্রমুখী অনেকবার শুনিয়াছে। এক-একবার তাহার মনে হয়, দেয়ালে মাথা ঠুকিয়া সে রক্তগঙ্গা হইয়া মরে। দেবদাসকে সে ভালোবাসিয়াছে। দেবদাস মদের গ্লাস ছুঁড়িয়া ফেলিল। কৌচের পায়ায় লাগিয়া সেটা চূর্ণ হইয়া গেল। তখন আড় হইয়া বালিশে হেলান দিয়া জড়াইয়া জড়াইয়া কহিল, আমার উঠে যাবার ক্ষমতা নেই, তাই এখানে বসে থাকি—জ্ঞান থাকে না, তাই তোমার মুখের পানে চেয়ে কথা কই—চন্দ—র—তবু অজ্ঞান হইনে—তবু একটু জ্ঞান থাকে—তোমাকে ছুঁতে পারিনে—আমার বড় ঘৃণা হয়।
চন্দ্রমুখী চক্ষু মুছিয়া ধীরে ধীরে কহিতে লাগিল, দেবদাস, কত লোক এখানে আসে, তারা কখনো মদ স্পর্শও করে না।
দেবদাস চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া উঠিয়া বসিল। টলিয়া টলিয়া ইতস্ততঃ হস্ত নিক্ষেপ করিয়া বলিল,—স্পর্শ করে না? আমার বন্দুক থাকলে তাদের গুলি করতাম। তারা যে আমার চেয়েও পাপিষ্ঠ—চন্দ্রমুখী!
কিছুক্ষণ থামিয়া কি যেন ভাবিতে লাগিল , তাহার পর আবার কহিল, যদি কখনও মদ ছাড়ি—যদিও ছাড়ব না—তা হলে আর কখনো ত এখানে আসব না। আমার উপায় আছে, কিন্তু তাদের কি হবে?
একটুখানি থামিয়া বলিতে লাগিল, বড় দুঃখে মদ ধরেচি—আমাদের বিপদের, দুঃখের বন্ধু! আর তোমাকে ছাড়তে পারিনে—
দেবদাস বালিশের উপর মুখ রগড়াইতে লাগিল। চন্দ্রমুখী তাড়াতাড়ি কাছে আসিয়া মুখ তুলিয়া ধরিল। দেবদাস ভ্রূকুটি করিল—ছিঃ, ছুঁয়ো না—এখনো আমার জ্ঞান আছে। চন্দ্রমুখী, তুমি ত জান না—আমি শুধু জানি আমি কত যে তোমাদের ঘৃণা করি। চিরকাল ঘৃণা করব—তবু আসব, তবু বসব, তবু কথা ক’ব—না হলে যে উপায় নেই। তা কি তোমরা কেউ বুঝবে? হাঃ—হাঃ—লোকে পাপ কাজ আঁধারে করে, আর আমি এখানে মাতাল হই—এমন উপযুক্ত স্থান জগতে কি আর আছে। আর তোমরা—
দেবদাস দৃষ্টি সংযত করিয়া কিছুক্ষণ তাহার বিষণ্ণ মুখের পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, আহা! সহিষুতার প্রতিমূর্তি। লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অপমান, অত্যাচার, উপদ্রব—স্ত্রীলোকে যে কত সইতে পারে—তোমরাই তার দৃষ্টান্ত!
তাহার পর চিত হইয়া শুইয়া পড়িয়া, চুপি চুপি কহিতে লাগিল—চন্দ্রমুখী বলে, সে আমাকে ভালোবাসে—আমি তা চাইনে—চাইনে—চাইনে—লোকে থিয়েটার করে, মুখে চুনকালী মাখে—চোর হয়—ভিক্ষা করে—রাজা হয়—রানী হয়—ভালোবাসে—কত ভালোবাসার কথা বলে—কত কাঁদে—ঠিক যেন সব সত্য! চন্দ্রমুখী আমার থিয়েটার করে, আমি দেখি! কিন্তু তাকে যে মনে পড়ে—একদণ্ডে কি যেন সব হয়ে গেল। কোথায় সে চলে গেল—আর কোন পথে আমি চলে গেলাম। এখন একটা সমস্ত জীবনব্যাপী মস্ত অভিনয় আরম্ভ হয়েচে। একটা ঘোর মাতাল—আর এই একটা—হোক, তাই হোক—মন্দ কি! আশা নেই, ভরসা নেই—সুখও নেই, সাধও নেই—বাঃ ! বহুৎ আচ্ছা—
তাহার পর দেবদাস পাশ ফিরিয়া বিড়বিড় করিয়া কি বলিতে লাগিল।
চন্দ্রমুখী তাহা বুঝিতে পারিল না। অল্পক্ষণেই দেবদাস ঘুমাইয়া পড়িল। চন্দ্রমুখী তখন কাছে আসিয়া বসিল। অঞ্চল ভিজাইয়া মুখ মুছাইয়া দিয়া, সিক্ত বালিশ বদলাইয়া দিল। একটা পাখা লইয়া কিছুক্ষণ বাতাস করিয়া, বহুক্ষণ অধোবদনে বসিয়া রহিল। রাত্রি তখন প্রায় একটা। দীপ নিভাইয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া অন্য কক্ষে চলিয়া গেল।
২
পিতার মৃত্যুর ছয় মাস ধরিয়া ক্রমাগত বাটীতে থাকিয়া, দেবদাস একেবারে জ্বালাতন হইয়া উঠিল। সুখ নাই, শান্তি নাই, একান্ত একঘেয়ে জীবন।
দেবদাস জননীকে কিছুদিনের জন্য কাশীতে রাখিয়া আসিয়া, কলিকাতায় চলিয়া গেল। কলিকাতায় আসিয়া তিন-চারদিন ধরিয়া দেবদাস চুনিলালের সন্ধান করিল। সে নাই, বাসা পরিবর্তন করিয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছে। একদিন সন্ধ্যার সময় দেবদাস চন্দ্রমুখীর কথা স্মরণ করিল। একবার দেখা করিলে হয় না? এতদিন তাহাকে মোটেই মনে পড়ে নাই। দেবদাসের যেন একটু লজ্জা করিল, একটা গাড়ি ভাড়া করিয়া সন্ধ্যার কিছু পরেই চন্দ্রমুখীর বাটীর সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল। বহুক্ষণ ডাকাডাকির পর ভিতর হইতে স্ত্রীকণ্ঠে উত্তর আসিল—এখানে নয়।
সম্মুখে একটা গ্যাসপোস্ট ছিল, দেবদাস তাহার নিকটে সরিয়া আসিয়া কহিল বলিতে পার সে স্ত্রীলোকটি কোথায় গেছে?
জানালা খুলিয়া কিছুক্ষণ সে চাহিয়া দেখিয়া কহিল, তুমি কি দেবদাস?
হাঁ।
দাঁড়াও দোর খুলে দিই।
দ্বার খুলিয়া সে কহিল, এস—
কণ্ঠস্বর যেন কতকটা পরিচিত, অথচ ভালো চিনিতে পারিল না। একটু অন্ধকারও হইয়াছিল। সন্দেহে কহিল, চন্দ্রমুখী কোথায় বলতে পার?
স্ত্রীলোকটি মৃদু হাসিয়া কহিল, পারি , ওপরে চল।
এবার দেবদাস চিনিতে পারিল—অ্যাঁ, তুমি?
হাঁ আমি। দেবদাস আমাকে একেবারে ভুলে গেলে?
উপরে গিয়া দেবদাস দেখিল, চন্দ্রমুখীর পরনে কালাপেড়ে ধুতি, কিন্তু মলিন। হাতে শুধু দু’গাছি বালা, অন্য অলঙ্কার নাই। মাথার চুল এলোমেলো। বিস্মিত হইয়া বলিল, তুমি? ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিল, চন্দ্রমুখী পূর্বাপেক্ষা অনেক কৃশ হইয়াছে। কহিল, তোমার অসুখ হয়েছিল?
চন্দ্রমুখী হাসিয়া কহিল, শারীরিক একটুও নয়। তুমি ভালো করে বোস।
দেবদাস শয্যায় উপবেশন করিয়া দেখিল, ঘরটির একেবারে আগাগোড়া পরিবর্তন হইয়াছে। গৃহস্বামিনীর মত তাহারও দুর্দশার সীমা নাই। একটিও আসবাব নাই—আলমারি, টেবিল, চেয়ারের স্থান শূন্য পড়িয়া আছে। শুধু একটি শয্যা , চাদর অপরিষ্কৃত, দেয়ালের গায়ে ছবিগুলি সরাইয়া ফেলা হইয়াছে, লোহার কাঁটি এখনো পোঁতা আছে, দুই-একটায় ফিতা এখন ঝুলিতেছে। উপরের সেই ঘড়িটা এখনো ব্রাকেটের উপর আছে, কিন্তু নিঃশব্দ! আশেপাশে মাকড়সা মনের মত করিয়া জাল বুনিয়া রাখিয়াছে। এক কোণে একটা তৈল-দীপ মৃদু আলোক বিতরণ করিতেছে—তাহারই সাহায্যে দেবদাস নূতন ধরনের গৃহসজ্জা দেখিয়া লইল। কিছু বিস্মিত, কিছু ক্ষুব্ধ হইয়া কহিল চন্দ্র, এমন দুর্দশা কেমন করে হ’ল?
চন্দ্রমুখী ম্লান-হাসি হাসিয়া কহিল, দুর্দশা তোমাকে কে বললে? আমার ত ভাগ্য খুলেচে।
দেবদাস বুঝিতে পারিল না , কহিল, তোমার গায়ের গয়নাই বা গেল কোথায়?
বেচে ফেলেচি।
আসবাবপত্র?
তাও বেচেচি।
ঘরের ছবিগুলোও বিক্রি করেচ?
এবার চন্দ্রমুখী হাসিয়া সম্মুখের একটা বাড়ি দেখাইয়া কহিল, ও-বাড়ির ক্ষেত্রমণিকে বিলিয়ে দিয়েচি।
দেবদাস কিছুক্ষণ মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া কহিল, চুনিবাবু কোথায়?
বলতে পারিনে। মাস-দুই হ’ল ঝগড়া করে চলে গেছে, আর আসেনি।
দেবদাস আরও আশ্চর্য হইল—ঝগড়া কেন?
চন্দ্রমুখী কহিল, ঝগড়া কি হয় না?
হয়। কিন্তু কেন?
দালালি করতে এসেছিল, তাই তাড়িয়ে দিয়েছিলুম।
কিসের দালালি?
চন্দ্রমুখী হাসিয়া বলিল, পাটের। তারপর কহিল, তুমি বুঝতে পার না কেন? একজন বড়লোক ধরে এনেছিল, মাসে দু’শ টাকা, একরাশ অলঙ্কার, আর দরজার সুমুখে এক সেপাই। বুঝলে?
দেবদাস বুঝিয়া হাসিয়া কহিল, কৈ, সে-সকল ত দেখিনে?
থাকলে ত দেখবে। আমি তাঁদের তাড়িয়ে দিয়েছিলাম!
তাদের অপরাধ?
অপরাধ বেশি কিছু ছিল না, কিন্তু আমার ভালো লাগল না।
দেবদাস বহুক্ষণ ধরিয়া ভাবিয়া বলিল, সেই পর্যন্ত আর কেউ এখানে আসেনি?
না। সেই পর্যন্ত কেন, তুমি যাবার পরদিন থেকেই এখানে কেউ আসে না। শুধু চুনি মাঝে মাঝে এসে বসত, কিন্তু মাস-দুই থেকে তাও বন্ধ।
দেবদাস বিছানার উপর শুইয়া পড়িল। অন্যমনস্কভাবে বহুক্ষণ মৌন থাকিয়া ধীরে কহিল, চন্দ্রমুখী, তবে দোকানপাট সব তুলে দিলে?
হাঁ। দেউলে হয়ে পড়েচি।
দেবদাস সে-কথার উত্তর না দিয়া বলিল, কিন্তু খাবে কি করে?
এই যে শুনলে কিছু গহনাপত্র ছিল, বিক্রি করেচি।
সে আর কত?
বেশি নয়। প্রায় আট-ন’শ টাকা আমার আছে। একজন মুদির কাছে রেখে দিয়েচি—সে আমাকে মাসে কুড়ি টাকা দেয়।
কুড়ি টাকায় আগে ত তোমার চলত না?
না, আজও ভালো চলে না। তিন মাসের বাড়িভাড়া বাকী, তাই মনে করচি, হাতের এই দুগাছা বালা বিক্রি করে, সমস্ত পরিশোধ করে দিয়ে আর কোথাও চলে যাব।
কোথায় যাবে?
তা এখনো স্থির করিনি। কোন সস্তা মুলুকে যাব—কোন পাড়াগ্রামে—যেখানে কুড়ি টাকায় মাস চলে।
এতদিন যাওনি কেন? যদি সত্যই তোমার আর কিছু প্রয়োজন নেই ত এতদিন মিথ্যা কেন ধার-কর্জ বাড়ালে?
চন্দ্রমুখী নতমুখে কিছুক্ষণ ভাবিয়া লইল। তাহার জীবনে এ কথাটা বলিতে আজ তাহার প্রথম লজ্জা করিল। দেবদাস বলিল, চুপ করলে যে?
চন্দ্রমুখী শয্যার একপ্রান্তে শঙ্কুচিতভাবে উপবেশন করিয়া ধীরে ধীরে কহিল—রাগ করো না , যাবার আগে আশা করেছিলাম, তোমার সঙ্গে দেখা হলে ভালো হয়। ভাবতাম তুমি হয়ত আর একবার আসবে। আজ তুমি এসেচ, এখন কালই যাবার উদ্যোগ করব। কিন্তু কোথায় যাই, বলে দেবে?
দেবদাস বিস্মিত হইয়া উঠিয়া বসিল , কহিল, শুধু আমাকে দেখবার আশায়? কিন্তু কেন?
একটা খেয়াল। তুমি আমাকে বড় ঘৃণা করতে। এত ঘৃণা কেউ কখনো করেনি, বোধ হয় তাই। আজ তোমার মনে পড়বে কিনা জানিনে, কিন্তু আমার বেশ মনে আছে—যেদিন তুমি এখানে প্রথম এলে, সেইদিন থেকেই তোমার উপর আমার দৃষ্টি পড়েছিল। তুমি ধনীর সন্তান তা জানতাম , কিন্তু ধনের আশায় তোমার পানে আকৃষ্ট হইনি। তোমার পূর্বে কত লোক এখানে এসেচে গেছে, কিন্তু কারো ভিতরে কখনো তেজ দেখিনি। আর তুমি এসেই আমাকে আঘাত করলে , একটা অযাচিত, উপযুক্ত অথচ অনুচিত রূঢ় ব্যবহার , ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে রইলে, শেষে তামাশার মত কিছু দিয়ে গেলে। এসব মনে পড়ে কি?
দেবদাস চুপ করিয়া রহিল। চন্দ্রমুখী পুনরায় কহিতে লাগিল, সেই অবধি তোমার প্রতি দৃষ্টি রাখলাম। ভালোবেসে নয়, ঘৃণা করেও নয়। একটা নূতন জিনিস দেখলে যেমন তা খুব মনে থাকে, তোমাকেও তাই কিছুতেই ভুলতে পারিনি—তুমি এলে বড় ভয়ে ভয়ে সতর্ক হয়ে থাকতাম, কিন্তু না এলে কিছুই ভালো লাগত না। তারপর আবার কি যে মতিভ্রম ঘটল—এই দুটো চোখে অনেক জিনিসই আর একরকম দেখতে লাগলাম। পূর্বের ‘আমি’র সঙ্গে এমন করে বদলে গেলাম—যেন সে ‘আমি’ আর নয়। তার পরে তুমি মদ ধরলে। মদে আমার বড় ঘৃণা। কেউ মাতাল হলে তার ওপর বড় রাগ হ’ত। তুমি মাতাল হলে রাগ হ’ত না , কিন্তু বড্ড দুঃখ পেতাম। —বলিয়া চন্দ্রমুখী দেবদাসের পায়ের উপর হাত রাখিয়া ছলছল চক্ষে কহিল আমি বড় অধম, আমার অপরাধ নিয়ো না। তুমি যে কত কথা কইতে, কত বড় ঘৃণায় সরিয়ে দিতে , আমি কিন্তু তোমার তত কাছে যেতে চাইতাম। শেষে ঘুমিয়ে পড়লে—থাক সে-সব কথা বলব না, হয়ত আবার রাগ করে বসবে।
দেবদাস কিছুই কহিল না—নূতন ধরনের কথাবার্তা তাহাকে কিছু ক্লেশ দিতেছিল। চন্দ্রমুখী গোপনে চক্ষু মুছিয়া কহিতে লাগিল, একদিন তুমি বললে—আমরা কত সহ্য করি। লাঞ্ছনা, অপমান—জঘন্য অত্যাচার, উপদ্রবের কথা—সেইদিন থেকেই বড় অভিমান হয়েছে—আমি সব বন্ধ করে দিয়েছি।
দেবদাস উঠিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কিন্তু দিন চলবে কি করে?
চন্দ্রমুখী কহিল সে ত আগেই বলেছি।
মনে কর, সে যদি তোমার সমস্ত টাকা ফাঁকি দেয়—
চন্দ্রমুখী ভয় পাইল না। শান্ত সহজভাবে কহিল, আশ্চর্য নয়, কিন্তু তাও ভেবেছি। বিপদে পড়লে তোমার কাছে কিছু ভিক্ষা চেয়ে নেব।
দেবদাস ভাবিয়া কহিল, তাই নিয়ো। এখন আর কোথাও যাবার উদ্যোগ কর।
কালই করব। বালা দু’গাছা বেচে, একবার মুদির সঙ্গে দেখা করব।
দেবদাস পকেট হইতে পাঁচখানা একশত টাকার নোট বাহির করিয়া বালিশের তলে রাখিয়া কহিল, বালা বিক্রি ক’রো না, তবে মুদির সঙ্গে দেখা ক’রো। কিন্তু যাবে কোথায়? কোন তীর্থস্থানে?
না দেবদাস। তীর্থধর্মের উপর আমার তত আস্থা নেই। কলকাতা থেকে বেশি দূরে যাব না, কাছাকাছি কোন গ্রামে গিয়ে থাকব?
কোন ভদ্র-পরিবারে কি দাসীবৃত্তি করবে?
চন্দ্রমুখীর চোখে আবার জল আসিল। মুছিয়া কহিল, প্রবৃত্তি হয় না। স্বাধীন ভাবে স্বচ্ছন্দে থাকব। কেন দুঃখ করতে যাব? শরীরের দুঃখ কোনদিন সইনি, এখনো সইতে পারব ন। আর বেশি টানাটানি করলে হয়ত ছিঁড়ে যাবে।
দেবদাস বিষণ্ণ-মুখে ঈষৎ হাসিল , কহিল, কিন্তু শহরের কাছে থাকলে আবার হয়তো প্রলোভনে পড়বে—মানুষের মনকে বিশ্বাস নেই।
এবার চন্দ্রমুখীর মুখ প্রফুল্ল হইল। হাসিয়া কহিল, সে কথা সত্যি, মানুষের মনকে বিশ্বাস নেই বটে, কিন্তু আমি আর প্রলোভনে পড়ব না। স্ত্রীলোকের লোভ বড় বেশী তাও মানি, কিন্তু যা-কিছু লোভের জিনিস যখন ইচ্ছে করেই ত্যাগ করচি তখন আর আমার ভয় নেই। হঠাৎ যদি ঝোঁকের ওপর ছাড়তাম, তাহলে হয়ত সাবধান হবার আবশ্যক ছিল, কিন্তু এতদিনের মধ্যে একটা দিনও ত আমাকে অনুতাপ করতে হয়নি। আমি যে বেশ সুখে আছি।
তথাপি দেবদাস মাথা নাড়িল , কহিল, স্ত্রীলোকের মন বড় চঞ্চল—বড় অবিশ্বাসী।
এবার চন্দ্রমুখী একেবারে কাছে আসিয়া বসিল। হাত ধরিয়া কহিল, দেবদাস!
দেবদাস তাহার মুখপানে চাহিল, এখন আর বলিতে পারিল না—আমাকে স্পর্শ ক’রো না।
