কুয়াশার ফুল – ১
প্রথম অধ্যায়
‘দেখো, বেশ কিছু দিন ধরেই গঙ্গার ওপর সন্দেহ হচ্ছে আমার। কিন্তু, সেই অর্থে কিছুই করে উঠতে পারছি না, কারণ…’ কারণটা বলার জন্য দিলীপবাবু সময় নিলেন বটে কিন্তু সায়ন আসার সময় দেখে এসেছে কারণটা।
আজ মঙ্গলবার, পিলপিলিয়ে লোকজন জড়ো হয়েছে গঙ্গাদের পুরনো লজ্ঝড়ে বাড়িটার সামনে। গোটা বাড়িটা ভালো করে দেখতে পায়নি সায়ন। তবে বাইরে হরেকরকম মানুষের বিশাল লাইন চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। বেশিরভাগই গরিব খেটে-খাওয়া গ্রাম্য লোক। তাদের একেকজনের একেকরকম সমস্যা। গঙ্গা মিনিটদুয়েক সময় নেয়। কিছু ছোটখাটো জড়িবুটি কিংবা টোটকা বলে দেয়। তাতে নাকি চমৎকারী কাজ দেয়। হাসি মুখে দরজার গোড়ায় কপাল ঠুকতে ঠুকতে বাড়ি ফিরে যায় রোগীর বাড়ির লোকজন। দক্ষিণা এতই সামান্য যে চাষাভুষো থেকে শুরু করে ভিখারি কারো ট্যাঁকই হালকা হয় না।
ফলে, গঙ্গা সত্যিই অলৌকিক ক্ষমতাধারী হোক বা ভণ্ড, এরা সকলেই তাকে স্নেহের চোখে দেখে। সরাসরি তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া এ অঞ্চলের পুলিশের কম্ম নয়।
দিলীপবাবু আবার সামনের চেয়ারে এসে বসে পড়লেন। কপালের উপর হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘শুধু উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে…কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি নিজের চোখে দেখেছি। শুধু তাই নয়, গ্রামের অনেকেই দেখেছে।’
‘আপনারা ঠিক কী দেখেছিলেন বলুন তো?’ সায়ন মুখ তুলে প্রশ্ন করে।
‘যা দেখেছিলাম, মনে পড়লে গা-হাত-পা শিউরে ওঠে আমার। আমি ভিতু মানুষ নই সায়ন, দেব-দ্বীজেই ভক্তি আছে সামান্য। ভূতেপ্রেত ডাকিনী যোগিনীর তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সেদিন যা দেখেছিলাম তা চোখের ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই…’
দিলীপ দস্তিদারের সঙ্গে সায়নের সম্পর্ক ওর বাবার সূত্রে। সায়নের বাবা বিপ্লব মজুমদার ও দিলীপ দস্তিদার ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। দুজনেই একই কলেজে পড়াশুনা করেছেন। দিলীপ দস্তিদার ছিলেন তার থেকে এক বছরের সিনিয়র। বিপ্লব মজুমদার বরাবর পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। পড়াশুনা শেষ করে তিনি ওকালতিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। অন্যদিকে দিলীপ মাঝপথেই পড়াশুনা ছেড়ে তার গ্রাম মতিপুরে ফিরে যান। স্থানীয় জমিদার বংশের ছেলে, বাবার পয়সার অভাব ছিল না। তার উপর এলাকার হোমরাচোমরা বলে নাম ছিল। ফলে রাজনীতিতে উপরে উঠতে বেশি সময় লাগেনি দিলীপের।
মাঝের এতগুলো বছর কাছাকাছি না থাকলেও দুই বন্ধুর সম্পর্ক খারাপ হয়নি। টেলিফোনে যোগাযোগ রেখে গেছেন দুজনেই। যোগাযোগের কারণ যে শুধুই বন্ধুত্ব ছিল তা নয়, রাজনীতির খেলোয়াড় বলে নানা কারণে দুঁদে আইনবেত্তা বিপ্লব মজুমদারের পরামর্শের দরকার পড়ত দিলীপ দস্তিদারের। যে-কোনো ঝামেলায় পড়লে অম্লান বদনে বাল্যবন্ধুর স্মরণে হাজির হতেন তিনি।
ছোট থেকেই সায়ন দিলুজেঠুকে দেখে আসছে বাড়িতে আসা যাওয়া করতে। ভদ্রলোক ওদের বাড়িতে এলেই গ্রাম থেকে মিষ্টি, গুড় আর ফলমূল নিয়ে আসতেন। সায়নের লোকটাকে খুব একটা অপছন্দ কোনওদিনই ছিল না।
বছরদুয়েক হল সায়ন আইন পাশ করে বেরিয়েছে। বিস্তর পড়াশুনার খুব একটা ইচ্ছা নেই। ছোট থেকেই ও একটু কল্পনাপ্রবণ। ভাবের জগতে থাকতে ভালোবাসে। একসময় একটা গানের দলে যোগ দিয়েছিল। ক’দিনের মধ্যেই বুঝতে পারে সেখানে বাঁশিতে কম, গাঁজার ছিলিমে টান দেওয়া হয় বেশি। নেশাড়ুদের পাল্লায় পড়তে পড়তে কোনওরকমে বেরিয়ে আসে সায়ন।
তবে গাঁজার নেশা কাটিয়ে বেরিয়ে এলেও অন্য এক নেশা ততদিনে ধরেছে সায়নকে—মেটাল মিউজিক! আর সেই মেটাল মিউজিক থেকেই উইচক্রাফট আর ভুডুইজম নিয়ে বিস্তর লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল সায়ন। শেষে বাপের ধাতানি খেয়ে ল’টা পাশ করে। তবে পাশ করলেও কালো কোর্ট আর সাদা স্ট্যাম্প পেপারের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট জীবন যে তার জন্য নয়, সেটা বুঝতে সময় লাগেনি সায়ন মজুমদারের।
সবার জীবনেই একটা লক্ষ্য থাকা উচিত, সঠিক লক্ষ্যই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের স্বাদ। তাই সায়ন ঠিক করেছে ও মিউজিক নিয়ে কাজ করবে। তবে বাবাকে কী করে ম্যানেজ করবে, সেই কথাই ভাবছিল সে নিজের ঘরে বসে বসে। এমন সময় সক্কাল-সক্কাল দিলু জেঠুর আগমন। প্রথমে অতটা কান দেয়নি সায়ন। তবে বাবার ডাকে সাড়া দিতেই হল।
‘বাবু রে, এদিকে আয় একবার—। দিলুদা তোর সঙ্গে একটু দেখা করতে চায়।’
‘আমার সঙ্গে! কেন?’ সায়ন ভিতরের ঘর থেকেই হাঁক পাড়ে।
‘একটু দরকার আছে তোর সঙ্গে…’
সায়ন ব্যাপারটা তেমন গায়ে মাখেনি। লোকটা রাজনীতি করে। আর এইসব রাজনৈতিক নেতাটেতারা নিজেদের ধান্দায় ঘুরে বেড়ায়। যতই ও এই লোকটাকে ছোটবেলা থেকে দেখে থাকুক না কেন, পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে কষ্ট হয়।
সায়ন না উঠতে শেষে দিলীপ দস্তিদার একরকম আগ বাড়িয়ে নিজেই ঢুকে পড়েন ওর ঘরে। লোকটার বক্তব্য একরকম নিমের পাচন খাওয়া মুখ করেই শুনতে শুরু করেছিল সায়ন। কিন্তু কিছুদূর শুনতেই তার শিরদাঁড়া টানটান হয়ে যায়। কপাল বেয়ে ঘামের ধারা গড়াতে থাকে।
টেবিলে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভদ্রলোক বললেন, ‘কথাটা তোমার বাবাকেই আগে বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও যা ব্যস্ত মানুষ! আর তাছাড়া সামনের মাসে ও নাকি দিল্লি যাচ্ছে শুনলাম, কোন এক সেলিব্রিটির কেসে নামকরা এক ব্যরিস্টারকে অ্যাসিস্ট করতে।’
‘ব্যাপারটা কী বলুন তো?’ সায়ন অনিচ্ছা সত্ত্বেও দায়সারা গলায় জিগ্যেস করে।
দিলীপ দস্তিদারের মুখে একটা কালো ছায়া নেমে আসে, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে, ‘বেশ কিছু দিন হল আমাদের গ্রামে একটা সমস্যা উপস্থিত হয়েছে। আপাতভাবে সেটা কারো চোখে পড়ছে না। আসলে ঘটনাগুলো এতটা সময় পরে পরে ঘটছে যে…’
‘সমস্যাটা কী?’
একটু নড়েচড়ে বসলেন দিলীপবাবু, ‘প্রায় প্রতিবছরই, বুঝলে? দু-একখানা করে সদ্যোজাত বাচ্চা আমাদের গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ইদানীং আমাদের আশপাশের গ্রাম থেকেও কয়েকটা খবর এসেছে আমার কানে।’
‘সদ্যোজাত বলতে?’
‘মানে, এই ধরো এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে। এ অবধি আমরা যা দেখেছি, তাতে গত দশ বছরে অন্তত ষোলটা বাচ্চা এইভাবে গায়েব হয়েছে…তাদের কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি…’
‘আপনাদের এতদিনে টনক নড়ল কেন?’
দিলীপবাবুর গলা এবার আরও সরু হয়ে যায়, ‘ওই যে বললাম, আমাদের গ্রামটা ছোট হলেও আশপাশের গ্রাম মিলিয়ে ধরলে বিশাল এলাকা। তার উপরে দশটা বছর তো আর কম নয়। এতদিন যে এসপি ছিলেন তিনি আগের মাসেই বদলি হয়ে নতুন ইন্সপেক্টর হয়ে এসেছেন। তিনিই পুরনো কেস ফাইল ঘেঁটেটেটে আবিষ্কার করেছেন।’
‘বটে…’ সায়ন জানলার দিকে দৃষ্টি রেখে বলে, ‘তো আপনি কী চাইছেন এখন?’
‘কাজটা কে করছে সেটাও বুঝতে পারছি আমি…’
সায়ন কাঁধ ঝাঁকায়, ‘তাহলে তো মিটেই গেল। আপনার হাতে প্রশাসন, এরেস্ট করে নিন!’
‘উঁহু, ব্যাপার অতটা সোজা নয়। তাছাড়া…’ দিলীপবাবুর মুখ দেখে মনে হল কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারছেন না তিনি। শেষে একবার ঢোঁক গিলে বললেন, ‘সমস্ত ব্যাপারটা পুলিশকে বোঝানো অসম্ভব!’
‘বেশ, তাহলে আমাকে বোঝান।’ সায়ন বিরক্তি মেশানো গলায় বলে।
দিলীপ দস্তিদার একটু পিছিয়ে বসেন, তারপর বড় করে একটা দম নিয়ে বলেন, ‘আমার যদ্দুর মনে হয়, গঙ্গা…যাকে বলে…একটা ডাইনি…’
দিলীপ দস্তিদারের সেদিনের একটা কথাও বিশ্বাস করেনি সায়ন। এরা রাজনীতির লোক। কথায় কথায় রং চড়িয়ে মিথ্যে কথা বলাই এদের রুটিরুজি। তবে ডাইনি আর উইচক্রাফট নিয়ে এককালে নিজের কিছু আগ্রহ ছিল বলে গ্রামে আসতে রাজি হয়েছে সে। অনেকদিন থেকে ঘ্যানঘ্যান করছেন ভদ্রলোক। তাছাড়া এর আগে সেভাবে গ্রামে এসে থাকা হয়নি ওর কোনওদিন। আর আগামী একমাস বাবাও কলকাতার বাইরে থাকবে। তাই এই ফাঁকে ঘুরে এলে মন্দ হয় না।
বাবা কলেজে পড়ার সময় নাকি দু-একবার এখানে এসেছিল। বাবার কাছে শুনে মনে মনে গ্রামের যে ছবিটা এঁকেছিল সায়ন, তা আজ আর নেই। পাকাপোক্ত বাড়িঘর গজিয়ে গ্রামের আমেজমাখা একটা আধা মফস্বল মতো জায়গাটা।
দিলীপ দস্তিদারের বসার ঘরেই আড্ডা হচ্ছিল সকাল থেকে।
‘আপনারা ঠিক কী দেখেছিলেন বলুন তো?’ সায়নের প্রশ্নটার উত্তর যেন মাথার ভিতরে সাজিয়েই রেখেছিলেন ভদ্রলোক। চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করেন এবার।
‘সেদিন একটা কাজে শহরে যাওয়ার ছিল, কিন্তু যাওয়া হয়নি। বিকেলের বাস ফেল করেছিলাম। আমি এই ঘরেই ঘুমাই। সেদিন বেশ রাত অব্দিই জেগেছিলাম, কিছুতেই ঘুম আসছিল না। মনে হয়, বাতের ব্যথাটা বেড়েছিল।
বিছানায় শুয়ে ছিলাম। বাইরে জোরে হাওয়া দিচ্ছিল। শনশনে হাওয়ার সঙ্গে ঝিঁঝির ডাক ভেসে আসছিল। মাথার কাছে দক্ষিণের জানলাটা খোলা। হাওয়ায় কেমন জোলো, স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। উঠে ভাবছি জানলাটা বন্ধ করে দেব। কিন্তু বড্ড আলিস্যি লাগছিল। মনটা জানলার দিক থেকে সরিয়ে পাশ ফিরে শুতে যাচ্ছি এমন সময় বাইরে থেকে মনে হল একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছে।
প্রথমে অতটা গা করিনি। পাঁচিলের ওপারেই গোবিন্দদের বাড়ি। ওদের বড় বউয়ের মেয়ে হয়েছে মাসখানেক আগেই। সেই হয়তো কাঁদছে। কিন্তু পরে খেয়াল করলাম, আওয়াজ যতটা জোরে আসার কথা তার চেয়ে ঢের বেশি জোরে শোনা যাচ্ছে যেন। এত জোরে তো আওয়াজ আসার কথা নয়!
মন বলল, আওয়াজটা বাড়ির ভিতর থেকে আসছে না, আসছে বাইরে থেকে। তাজ্জব ব্যাপার! এত রাতে কোলের বাচ্চা নিয়ে কে বাড়ি থেকে বেরোবে?
হাওয়ায় বুঝি অশুভ একটা সংকেত মিশে ছিল সেদিন। বাচ্চাটার কান্না শুনে মনে হল, সে মাকে দেখে নয়, কোনও বিপদে পড়ে কাঁদছে। আমি আর বিছানায় পড়ে থাকতে পারলাম না। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লাম। জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখালাম। পাঁচিলের গায়ে ওই জায়গাটা খানিকটা ভাঙা পড়েছে। ফলে বাইরেটা দেখতে অসুবিধা হয় না।
চাঁদের আলো ছিল সেদিন।
দেখলাম, গোবিন্দদের বাড়ির উঠোন পেরিয়ে একটা মেয়েমানুষের ছায়া যেন দ্রুত সরে যাচ্ছে! আর সেই ছায়ার কোলেই পুঁটুলি করে ধরা আছে একটা বাচ্চা!
কেউ নিশ্চয়ই চুরি করে পালাচ্ছে বাচ্চাটাকে। আমি আর দাঁড়িয়ে না থেকে তড়িঘড়ি গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ছুটে ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে উঠোনের পেছনের দিকটায় উঁকি দিয়ে প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না। কেবল এটুকু বুঝলাম ওদের ঘর লাগোয়া নারকেল গাছটার তলায় কী যেন নড়ে নড়ে উঠছে। বাচ্চার আওয়াজটা হঠাৎ করেই থেমে গেছে।
হাতে টর্চ নিয়ে বেড়িয়েছিলাম। সেটা জ্বালিয়ে আলোটা সামনে ফেললাম আমি, আর দেখলাম…
দেখলাম একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো দেখতে প্রাণী। মানুষের মতো মুখ আছে বটে কিন্তু সে মুখে পিশাচের ভাবই বেশি, মাথার আশপাশ দিয়ে খয়েরি কোঁকড়া কোঁকড়া চুল নেমেছে। সেটা চার হাতপায়ে ঝুঁকে পড়েছে একটা বাচ্চার শরীরের উপর। সে যে কী বীভৎস দৃশ্য! সমস্ত শরীরের চামড়া ভীষণরকম কুঁচকানো…চোখ নয়, যেন চামড়ার উপরে এক ইঞ্চি করে চিরে দিয়েছে কেউ। তার ভেতর কেবল সাদা রঙ দেখা যাচ্ছে। নাকের নিচ থেকে রক্তে ভরে আছে মুখটা…শিশুটার নরম মাংস আর রক্ত ছাড়িয়ে খাচ্ছে সে…’
দিলীপবাবু একটু থামলেন। ঢোঁক গিললেন। সায়ন বুঝল সেদিনের স্মৃতি মনে করে আজও ভেতরে ভেতরে সিটিয়ে আছেন তিনি।
‘তারপর কী করলেন?’
‘আমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। ও দৃশ্য দেখে আর কিছু করার কথা মাথায় ছিল না আমার। আমাকে দেখেই হাসতে শুরু করেছিল ডাইনিটা! আকাশটাও বুঝি কেঁপে উঠছিল সেই হাসির শব্দে…আমি এক ছুটে পালিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়েছিলাম। সারারাত বন্ধ জানলাটার দিকে তাকিয়ে একদিকের দেওয়ালে পিঠ রেখে কাটিয়ে দিয়েছিলাম…’
‘হুম…’ সায়ন একটা পায়ের উপরে আর একটা পা তুলে বসল, ‘বাচ্চাটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি?’
‘না, এমনকী তার একফোঁটা রক্ত অবধি নয়। ও ডাইনি বাচ্চার শরীরের কিছুই ছাড়ে না…’
‘গ্রামের বাকি যারা দেখেছে বললেন, তারাও কি এমনই কিছু দেখেছে?’
‘জায়গা আলাদা, ঘটনা আলাদা, কিন্তু দৃশ্য ওই এক…তুমি জিগ্যেস করলেই বুঝতে পারবে।’
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। বাইরে সকালের আলো ঝলমল করছে। দিলীপবাবুর ঘরের জানলাটা এখনও খোলা। সেটা দিয়ে বাইরে একটা বাড়ির উঠোন দেখা যাচ্ছে। আপাতত সেদিকে তাকালে সেদিন রাতে এমন কিছু ঘটেছিল বলে বিশ্বাসই হয় না।
দিলীপ দস্তিদারের চেহারাটা খানিক গোলগালই বলা চলে। সারাক্ষণ একটা ঢোলা পাজামা আর ফতুয়া পরে থাকেন। চেহারার তুলনায় গলার আওয়াজ ফিনফিনে। পঞ্চাশের কোটায় বয়স। স্বাভাবিক ভাবেই কপাল প্রশস্ত হয়ে এসেছে। গায়ের রঙ তামাটে। চেহারায় একটা চাপা দম্ভ আছে।
‘কিন্তু ওই প্রাণীটা, আই মিন, ডাইনিটাই যে গঙ্গা সেটা আপনি জানলেন কী করে?’ সায়ন বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার প্রশ্ন করে।
মুচকি হাসলেন ভদ্রলোক, চেয়ারের হাতলে একবার হাতের তালু চাপড়ে বললেন, ‘সেটাই তো কথা, তুমি আজ হোক বা কাল গঙ্গাকে দেখলেই দেখবে ওর গলায় তিনটে লম্বা চেরা দাগ আছে…’
‘সেগুলো কি প্রাণীটার গলাতেও ছিল?’
‘হ্যাঁ, শুধু আমি না, সবাই দেখেছে, সবাই একই কথা বলেছে…তাছাড়া…’
‘কী হল থামলেন কেন?’
পরের কথাগুলো বলার সময় ভদ্রলোকের গলার স্বর আর একটু কঠিন হয়ে ওঠে, ‘এ গ্রামে সবাই জানে গঙ্গা স্বাভাবিক মানুষ নয়। কারো সঙ্গে মেলামেশা নেই। ছোট থেকে এই গ্রামেই আছে, কিন্তু নিজের চোখে ওকে দেখেছে বলতে গুটিকয়েকজন…’
‘সেকি! তাহলে চিকিৎসা করে কী করে?’
‘একটা মেয়ে আছে। ওর কম্পাউন্ডার গোছের। সে-ই বাইরে থেকে দেখে রোগীদের বিদায় করে দেয়। একান্ত দরকার না হলে গঙ্গার দেখা পাওয়া যায় না।’
সায়নের কৌতূহলটা বেড়ে ওঠে। সে সামনে ঝুঁকে পড়ে বলে, ‘আচ্ছা, গঙ্গা যে ওষুধপত্র দেয়—এতে কাজ দেয়? মানে, লোকজন যে এত ভিড় করছে, তার কিছু তো একটা ফল আছে নিশ্চয়ই?’
দিলীপবাবু দুদিকে মাথা নাড়েন, ‘থাকলেও থাকতে পারে। ভালো সেজে থাকার জন্য একটা মুখোশ তো দরকার হয়। কম্পাউন্ডার মেয়েটি শিক্ষিত। তাকে কোথা থেকে জোগাড় করেছিল জানি না, কিন্তু তার কথাবার্তায় একটা আপাত ভালোমানুষি আছে। তার ফাঁদেই পা দেয় সবাই। দুজন মিলে এই ধান্দা চালায়।’
‘এই গঙ্গাদের ফ্যামিলি কতদিন হল আছে এখানে?’
‘সে ভারি অদ্ভুত ব্যাপার, বুঝলে? খানিক গোলমেলেও। মস্ত ইতিহাস, কতটা সত্যি আর কতটা জল তা অবশ্যও বলতে পারব না।’
‘আপনি বলুন না!’ সায়ন উৎকণ্ঠিত গলায় বলে।
দিলীপ দস্তিদারের কপালে ভাঁজ পড়ে, ‘দেড়শ বছর আগের কথা, বুঝলে? তখন জমিদারি আমল। আমার দাদুর দাদুর বাবা সতীনাথ দস্তিদার তখন জমিদার এ অঞ্চলের। তার মস্ত এক প্রাসাদ ছিল গ্রামের মাঝে। বিরাট অবস্থা। ঠিক এইসময়ে সতীনাথের ছেলে পড়ল এক মারণ অসুখে। দিনে দিনে কে যেন তার গা থেকে রক্ত শুষে নিতে লাগল। সে সময়ে জমিদার উপযুক্ত ওয়ারিস না রেখে গেলেই ব্রিটিশ গভর্মেন্ট সম্পত্তি সব হস্তগত করে নিত। একে পুত্রশোক, তার উপর যোগ হল সর্বস্বান্ত হবার ভয়। সতীনাথের খাওয়া ঘুম সব উধাও হল। বাড়িতে কান্নার রোল উঠল।
এইসময়ে জমিদারবাড়িতে উপস্থিত হল এক বছর চল্লিশেকের চাষা। নাম কালীপদ। সে বলল তার বউ নাকি কিছু গোপন মন্ত্রতন্ত্র জানে। তিনিই মন্ত্রবলে জমিদারের ছেলের অসুখ সারিয়ে দিতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আসন্ন বিপদের সম্ভবনা থেকে শুরু করে খরা, বন্যা, বজ্রপাত অবধি সবকিছুর পূর্বাভাষ নাকি দিতে পারবে তার বউ। বদলে তাকে কেবল দুটো জিনিস দিতে হবে। এক, এ গ্রামে থাকার জন্য তাদের একটা দোতলা বাড়ি তৈরি করে দিতে হবে। আর দুই, ওরা আগে যে গ্রামে থাকত সে গ্রামের লোকেরা নাকি ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল ওর বউকে। ওরা কোনরকমে পালিয়ে এসেছে। তাদের হাত থেকে ওদের রক্ষা করতে হবে।
জমিদার তখন দিশাহারা। বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় নেই। অগত্যা তাই করলেন। দুদিন অন্তর কালিপদর বউ একহাত ঘোমটা দিয়ে সতীনাথের ছেলেকে দেখতে আসত। হাতে একটা থলে গোছের কী যেন থাকত। সে ঘরে ঢোকার আগে ঘর ফাঁকা করে দেওয়ার কড়া নিয়ম ছিল। এই বিশ্বাসে কাজ দিল ম্যাজিকের মতো। ছেলে সেরে উঠল, জমিদারি ফুলে ফলে ভরে উঠল। আগের গ্রাম থেকে ডাইনির খোঁজে কেউ এল না অবশ্য। এলেও তাকে ফিরিয়েই দিতেন জমিদারমশাই। কালিপদর খাতির হল দেখার মতো।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান! খাতির কালিপদর হল কেন? কাজ তো করল তার বউ…’
‘সেখানেই গ্যাঁড়াকল! কালিপদর বউয়ের মুখ কেউ দেখেনি। সে যতদিন বেঁচেছিল বাইরে বেরোলে ওই ঘোমটা দিয়েই থাকত।’
‘বাপ রে! তারপর?’
‘আর কী, যেমন চলার চলছিল। একসময়ে জমিদারি হাতছাড়া হল। সময় বদলে গেল, ইংরেজ শাসনে কালিপদর সেই দাপট আর ছিল না। তার এক ছেলে হয়েছিল বুঝি। সেই সংসারের হাল ধরল। তারপর তার ছেলে, তার ছেলে এমন করে…’
‘শেষে গঙ্গা?’ হাতের তালুতে মাথা রাখে সায়ন, ‘মানে গঙ্গার ফ্যামিলিতেও উইচক্রাফটের একটা ইতিহাস আছে, বেশ, তো ইনি বিয়ে-থা কিছু করেননি?’
দুদিকে মাথা নাড়ান দিলীপ দস্তিদার, ‘নাঃ, বললাম না, লোকজনের সঙ্গেই তেমন একটা মেশে না! নয় নয় করে বয়সও তো প্রায় পঞ্চাশ ছুঁতে চলল। ও আর হবে বলে মনে হয় না। পিতৃপুরুষের বাড়িখানা বুকে করে আগলে রেখেছে, ওটা ছাড়া আর অন্য টাকাপয়সা কিছু আছে বলে তো মনে হয় না।’
সায়ন চেয়ার থেকে উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দূরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিড়বিড় করল, ‘মানে, যা দাঁড়াচ্ছে তা হল— একা মহিলা, এই ধরুন পঞ্চাশের আশেপাশে বয়স। উইচক্রাফটের হিস্ট্রি আছে ফ্যামিলিতে, জড়িবুটির চিকিৎসা জানেন। সাতেপাঁচে থাকেন না। ডাইনি হওয়ার যোগ্য প্রোফাইল বটে!’ কথাটা বলে পেছন ঘুরে তাকাল সে, ‘আপনি আমায় ঠিক কী করতে বলছেন বলুন তো?’
এবার বেশ জোরেই হেসে উঠলেন দস্তিদার, ‘তোমাকে আমি কিছু করতে বলিনি বাবা। কোনওদিন তো তোমার দিলুজেঠু কোথায় থাকে দেখোইনি। তোমার তেমন আগ্রহ নেই বুঝতেই পারি। ভাবলাম এই অছিলায় যদি একবার ঘুরে যাও…’
এগিয়ে এসে ওর কাঁধে একটা হাত রাখে দিলুজেঠু, ‘আসলে আমি গেছিলাম তোমার বাবার কাছে কিছু পরামর্শ চাইতে। ও বলল ডাইনি-টাইনি নিয়ে তোমার নাকি আগ্রহ আছে। তাই আর কী…’
কথাগুলো বলে কয়েক সেকেন্ডের একটা বিরতি নিলেন যেন ভদ্রলোক, বিমর্ষ গলায় বললেন, ‘কোলের সন্তান হারিয়ে গোবিন্দদের বড় বউ দু-দুবার গলায় দড়ি দিতে গেছিল। আমরা গ্রামের লোকেরা কোনওরকমে তাকে শান্ত করে রেখেছি…তুমি তো আইন জানো, ডাইনি-টাইনি নিয়েও তো শুনলাম অনেক পড়াশুনা করেছ। দেখো, যদি কিছু করা যায়…আমরা তো আমাদের মতো চেষ্টা করছি…’
‘গঙ্গার এগেন্সটে এতদিনে কোনও প্রমাণই হাতে আসেনি আপনাদের?’
দুদিকে মাথা নাড়েন ভদ্রলোক, ‘ওর বাড়িটা সার্চ করা দরকার আগে। কিন্তু সেটা করা একটু মুশকিলের। দেখে এলে তো রোজ কত লাইন পড়ে। আশপাশের অন্তত তিনটে গ্রামের লোক আসে ওর কাছে। দুম করে ওর বাড়িতে পুলিশ গেলে…আমাকেও তো জনসমর্থনের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হয়, নাকি?’
‘আমার যতদূর মনে হয়, এটা সিরিয়াল কিলিং-এর কেস। মহিলা যদি ডাইনি হয়েও থাকেন তবে সেটা মানসিক সমস্যা থেকে আসছে। ওর সঙ্গে একবার আলাপ জমাতে পারলে ভালো হত…’
‘ওটি হওয়া মুশকিল। বললাম না, একেবারে মুখ দেখানো বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ওই সঙ্গের মেয়েটিকে মাঝে মধ্যে হাটে বাজারে দেখি। তার থেকে কিছু জানলেও জানা যেতে পারে।’
‘তাকে কিছু জিগ্যেস করেননি আপনারা?’
‘ফল হয়নি কিছু। মেয়েটি গঙ্গাকে যক্ষের মতো আগলে রাখে। তাছাড়া শুধু পেটে বিদ্যে আছে বলেই নয়, সে মাথায় ভালো বুদ্ধি ধরে। কথা বলা গেলেও পেট থেকে গোপন কথা বের করা সহজ হবে না।’
এতক্ষণে এই ডাইনির ব্যাপারটা বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে সায়নের কাছে। কাল সারাদিনের জার্নিতে শরীরটাও ক্লান্ত হয়ে আছে এখনও। তাছাড়া রাতে ভালো করে ঘুম হয়নি। নতুন জায়গাতে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগে সায়নের। সে আর কথা না বাড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়ে। দিলু জেঠুও কোথায় যেন বের হয়ে যান।
দিলুজেঠুর স্ত্রী কলকাতায় থাকেন, মেয়েকে নিয়ে। জেঠু গ্রামের বাড়িতে একাই থাকেন। মাঝেমধ্যে একটি কাজের মেয়ে এসে ঘরদোর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়, আর একটি রান্নার লোক আছে। সে একটু আগেই রান্না করে বাড়ি চলে গেছে।
সায়নের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে জবরদস্ত। বাড়ির দোতলাটা একেবারেই ফাঁকা। সেখানেই একটা বড়সড় ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ওকে। সামান্য আসবাব আছে ঘরে। কাল পৌঁছে কিছুতেই হাত দিতে ইচ্ছে করেনি সায়নের। একটু আগেই ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বের করে আলনায় গুছিয়ে রেখেছে সায়ন। আয়না ছাড়া ঘরে আছে একটা বড় খাট, একটা পড়াশোনা করার টেবিল আর একটা চেয়ার।
তবে এ ঘরে সব থেকে মজার জিনিস হল জানলাটা। বিরাট খোলা জানলা। গ্রিলটিলের বালাই নেই। ভিতর থেকে একটা কাচের পাল্লা দেওয়া আছে কেবল। খোলা জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে গ্রামের অনেকটা অংশ চোখে পড়ে।
দিলুজেঠুর বাড়িটা একটু নিরিবিলি আর ফাঁকা জায়গায়। আশেপাশে খুব বেশি বাড়িঘর নেই। সামনেই একটা বাচ্চাদের স্কুল। তার ছাদটা বেশ বড়। স্কুলের পাঁচিলে সর্বশিক্ষা অভিযানের বোর্ড ঝুলছে।
সমস্ত দুপুরটা সায়ন বিছানায় শুয়ে বাইরের দিকে চেয়েই কাটিয়ে দেবে বলে ভেবেছে। এখানে আসার পর থেকে বাবার সঙ্গে দুবার কথা হয়েছে। ডাইনির ব্যাপারটা বাবাকে বলতে খানিক হাসাহাসিও করেছে দুজনে মিলে। বাবা পরশু দিল্লি রওনা দেবে। বাবা ফিরে আসার আগেই কলকাতা পৌঁছে যাবে সায়ন।
ছোট থেকে বাবার সঙ্গে একেবারেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল না সায়নের। কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর থেকেই রাশভারি ধমক দেওয়া বাবা সায়নের বন্ধু হয়ে যায়। কে জানে, বোধহয় একই কারণে পাওয়া দুঃখ হয়ত দুটো মানুষকে খুব সহজে বন্ধু বানিয়ে ফেলে।
বিকেলে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল সায়ন। বোধহয় ক্লান্ত ছিল বলেই জুড়ে এসেছিল চোখের পাতাদুটো। ঘুম ভাঙতেই দেখল বিকেল নেমে গেছে। যে মেয়েটা ঘরের কাজ করে তার সঙ্গে একটা বাচ্চা মেয়ে আসে। সকালেও দেখেছিল। ভারি মিষ্টি গড়ন মেয়েটার। বয়স সাত-আটের বেশি হবে না। সে হাতে চা নিয়ে দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। সায়ন হাতের ইশারায় ডাকতে পায়ে-পায়ে জড়িয়ে কোনওরকমে ভিতরে এসে চা’টা টুলের উপরে রাখল সে।
সায়ন চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে জিগ্যেস করে, ‘নাম কী রে তোর?’
‘কুসুম…’ কথাটা বলেই জিভ কেটে কপাল চাপড়ায় মেয়েটা।
সায়ন ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করে, ‘কী হল রে?’
‘মেয়েটা লাজুক গলায় মিনমিন করে বলে, ‘মা বিস্কুট দিতে বলেছিল, খেয়ে ফেলেছি। জেঠু ক্রিম বিস্কুট খেলে বকে আমাকে…’
সায়নের হাসি পেয়ে যায়। তাও মুখ গম্ভীর রেখে বলে, ‘যাঃ কী হবে তাহলে?’
কুসুম আরও সংকুচিত হয়ে বলে, ‘তুমি জেঠুকে বলে দেবে না তো? আমি এক্ষুনি বিস্কুট নিয়ে আসছি—।’
সায়ন বোঝে মেয়েটা এই মুহূর্তে লজ্জা পেলেও ভিতরে ভিতরে ভারি মিশুক। ও মাটিতে পড়ে থাকা ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে বলে, ‘দাঁড়া, দেখি কিছু ব্যবস্থা করা যায় কিনা।’
কাল ট্রেনে আসার সময় একটা ক্রিম বিস্কুটের প্যাকেট কিনেছিল সায়ন। সেটার কথা ভুলে গিয়ে আর খাওয়া হয়নি। ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেটটা বের করে কুসুমের হাতে তুলে দেয় সায়ন। তারপর ওর নাকটা আঙুল দিয়ে একবার নেড়ে দিয়ে বলে, ‘হাফ তোর, হাফ আমার…পার্টনারশিপ, রাজি?’
মেয়েটা ভারি খুশি হয়। এতক্ষণে তার একটু আগের লাজুক ভাবটা কেটে গেছে। বিছানার উপর ধুলোমাখা পা তুলে বসে সে প্যাকেট ছিঁড়ে বিস্কুট খেতে শুরু করে। সায়ন হেসে ওর মাথার চুলে একবার আঙুল বুলিয়ে দেয়, ‘আর কী খেতে ভালো লাগে তোর?’
‘আপেল, আমি আপেল খেতে খুব ভালোবাসি। সবসময় আপেল খাই…’ কুসুম দ্রুত উত্তর দেয়।
সায়ন চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ রে, তোদের গ্রামে নাকি ডাইনি এসেছে, তুই দেখেছিস তাকে?’
প্রশ্নটায় তেমন গুরুত্ব দেয় না কুসুম, তেমনই একমনে বিস্কুট ভেঙে খেতে খেতে বলে, ‘আমি দেখিনি, মণি দেখেছে।’
‘মণি কে?’
‘নিশিখুড়োর নাতি, মণিকান্ত। আমার সঙ্গে ইশকুলে পড়ে তো—।’
সায়ন বোঝে কুসুমকে আর প্রশ্ন করে লাভ হবে না। মোট তিনটে বিস্কুট আর প্লেটে করে কিছুটা চা খেয়ে, কাল আবার এসে বিস্কুট খাবে এবং সে কথা জেঠুকে বলা যাবে না—এইরকম একটা চুক্তি করে সে চলে যায়।
রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে সায়ন। কিন্তু ঘুম আসে না। এমনিতেই এত তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস নেই। তার উপরে দুপুরের দিকে অসময়ে কিছুটা ঘুম হয়ে গেছে। অগত্যা আলো জ্বালিয়ে বই পড়ার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ, কিন্তু মন বসে না তাতে। শেষে আলো নিভিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে বালিশে মাথা দেয়। ইন্টারনেটে এটা সেটা ঘাঁটতে শুরু করে।
ডানদিকের বড় জানলাটা খোলা। সেটা দিয়ে ফিনেফিনে একটা হাওয়া আসছে। ঝিঁঝি ডেকে চলেছে একটানা। আপাতত জানলার কাচ সরানো। দূরে অন্ধকারে ডুবে থাকা দিগন্তে হাওয়ায় দুলন্ত নারকেল আর তালগাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে একবার চোখ ফিরিয়ে আবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতে যাচ্ছিল সায়ন, হঠাৎ একটা ব্যাপার খেয়াল হয় ওর। আবার মাথাটা জানলার দিকে ঘুরে গেল।
এতক্ষণ ও খেয়াল করেনি কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ থেকেই একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে ওর। রাতে একা শুলে দূর থেকে কেউ চেয়ে থাকলে যেমন বিশ্রী অস্বস্তি হয়, ঠিক সেইরকম। শুধু মনে হচ্ছে, জানলার বাইরে থেকে ওই অন্ধকারে শরীর ডুবিয়ে কেউ চেয়ে আছে ওর দিকে। একটানা…চোখের পাতা পড়ছে না তার!
অস্বস্তিটা চেয়েও সরাতে পারে না সায়ন। কেউ দেখে চলেছে ওকে…এক মনে দেখে চলেছে!
