সংশয়ের পক্ষে
বিষাদসিন্ধু থেকে জমিদার দর্পণ কী গো-জীবন কী আত্মজীবনীমূলক চারটে বই-মীর মশাররফ হোসেনের সব লেখাতেই ঔপন্যাসিকের ধাবমান চেহারা প্রায়ই লক্ষ করি। এমনকী তাঁর পঙ্গু পদ্যগুলোতে পর্যন্ত সামাজিক মানুষকে ঘটনার মধ্যে রেখে দেখার প্রবণতা চাপা থাকে না। কিন্তু এই চেহারা সবসময় অস্পষ্ট, আবার একটুখানি দেখা দিয়েই অনির্দিষ্ট ও সংজ্ঞাবহির্ভূত রচনার কোথায় যে উধাও হয় তার আর পাত্তা পাওয়া যায় না। সামস্তবিরোধী মনোভাবও তিনি ধারণ করেন। সামস্তবোধযুক্ত চেতনা উপন্যাস লেখার একটি প্রধান শর্ত। সামন্তব্যবস্থার প্রতি একজন ঔপন্যাসিক সমর্থন জানাতে পারেন, ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত-প্রভুদের জন্য সহানভূতি একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি ঔপন্যাসিকের লেখায় খুব স্পষ্ট। কিন্তু এই সমর্থন বা সহানুভূতি আসে ঐ ব্যবস্থার কাঠামোতে তৈরি সমাজ বা সমাজের অন্তর্গত ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মধ্যে। এই পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণ সামস্তচেতনাসম্পন্ন কোনো লেখকের পক্ষে জায়ত্ত করা অসম্ভব। সকলের বাধ্যতামূলক অরণ্যবাস দাবি করে কেউ আন্দোলন করতে চাইলে তাঁকে লোকালয়েই থাকতে হয়, টারজান বনজঙ্গলের গুণকীর্তন করে বই লিখতে পারে না; যে-বিষয় নিয়েই উপন্যাস লেখা হোক-না, লেখককে সামস্তচেতনামুক্ত হতেই হবে। সামন্তব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর উপন্যাসের উদ্ভব এবং মধ্যযুগীয় এই ব্যবস্থাজাত মানসিকতা এই নতুন মাধ্যমটির সঙ্গে একেবারে খাপ খায় না।
একটি উপন্যাস না-লিখলেও মধুসূদন দত্তের লেখায় এই সামস্ত আভিজাত্যমুক্ত চেতনা বাংলা ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় জাগরণ সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ, ব্যক্তির সমস্যা ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং সমস্যা কাটাবার ইচ্ছা থাকলে ব্যক্তি নিজেই মাথা তুলে দাঁড়াবে, ধর্মের কাছে নতজানু হবে না—এই বোধের অধিকারী তাঁর সমকালে তিনি একাই। নিষিদ্ধ মাংস খেয়ে, মিল-ভলতেয়ার মুখস্থ করার পর সনাতন ভারতবর্ষের আত্মার গভীর গোপন শীসের চারদিকে ভগবানের আলোকচ্ছটা দেখার গদগদ ভক্তিভাব মধুসূদনের ছিল না। এই গদগদ ভক্তিকে ঝেড়ে ফেলা উপন্যাসরচনার একটি প্রধান শর্ত। সামস্তসমাজ এই ভক্তিকে পোষে, সামন্তচেতনা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সঙ্গে ভক্তি থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। যথেচ্ছভাবে টাকাপয়সা ওড়াবার ব্যাপারে তাঁর সম্বন্ধে মুখরোচক গালগল্পগুলো যদি বিশ্বাসও করি, তবু মধুসূদনের শিল্পকর্মে সেই সামস্তরুচি কোথাও প্রতিফলিত হযনি। বড়লোকের বাচ্চা হাজার হারামিপনা করুক, শত-শত বৎসর ধরে শিরা-উপশিরায় বয়ে-আসা নীলরক্ত তার আত্মার গভীর ভেতরে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে যার জন্য সে শেষ পর্যন্ত পাঠকের সহানুভূতি কী ভালোবাসা আকর্ষণ করবে—এই ধরনের মনোভাব মধুসূদনের কাছে একেবারে পাত্তা পায়নি। প্রতিভা, মেধা ও শিল্পবোধের দিক থেকে মধুসূদনের সঙ্গে মীর মশাররফ হোসেনের কোনো তুলনা চলে না। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে এঁরা সমগোত্রীয়, সামস্ত আভিজাত্য দুজনের কারও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে না। জমিদার দর্পণ নাটকে জমিদার হারওয়ান আলী তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে যেসব কীর্তিকলাপ করে তাকে কোনোভাবেই বড়লোকের প্রতিগ্যাল সনের খেয়ালেপনা বলে প্রশয় দেওয়া যায় না। তার আপাতনিরীহ ভাই এবং মৃত বাপটাও কোনো মহৎহৃদয় উদারচিত্ত সিংহপুরুষ ছিল না। জমিদাররা বংশপরম্পরায় এইসব কর্মকাণ্ড করে আসছে, এসব দোষ তাদের রক্তের মধ্যে। মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক বই কয়টির দুটিতে জমিদারদের আভিজাত্যের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। বাইরে খুব পরহেজগার, পর্দানশীন মুসলমান খানদানি সামস্ত পরিবারগুলোর ভেতরকার খ্যামটা নাচ ও নানা ধরনের ইতরামোর এরকম চিত্র মীর মশাররফের পর কোনো লেখকের মধ্যে পাইনি।
এসব কি ঔপন্যাসিকের লক্ষণ নয়? অন্য মাধ্যমের শিল্পেও উপন্যাসের লক্ষণ দেখা যেতে পারে, শেকসপিয়রের নাটকে কি বারবার উপন্যাসের চরিত্রবিকাশ ঘটে না? কিন্তু মীর মশাররফ হোসেন শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক নন, তাঁর কোনো রচনাই উপন্যাসের মর্যাদা পায় না এবং মনে হয় উপন্যাস লেখার চেষ্টা না করাটা তাঁর পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে। তাঁর প্রতিটি রচনার উৎস ব্যক্তিগত আবেগ। বিষাদসিন্ধুতে এই আবেগ হল ‘ভক্তি’। তবে বক্তিকে কল্পনার সাহায্যে সর্বজনীন রূপ দেওয়া গেছে। এই বইয়ের চরিত্রসমূহের কার্যকলাপ ঘটে গেছে চোদ্দশো বছর আগে, কোনো চরিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় বা যোগাযোগ হয়নি। তাই বহুদূর থেকে এঁদের প্রতি ভক্তি অনুভব করা এবং এই অনুভূতিকে শিল্পোত্তীর্ণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। বিষাদসিন্ধুকে উপন্যাসে রূপান্তরিত করা অসম্ভব, কারণ যে-ভক্তি এই রচনার উৎস, চরিত্র-বিশ্লেষণের জন্য তা রীতিমতো বিঘ্ন।
আর মশাররফ হোসেনের অন্যান্য বইতে যাদের নিয়ে তিনি লেখেন তাদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত রাগ বা অনুরাগই প্রধান হয়ে ওঠে। এইসব লোক তাঁর নেতিয়ে-পড়া-ভালোবাসার পাত্র, কখনো-বা তাঁর ঈর্ষা ও রাগের শিকার। শেষ পর্যন্ত তাদের কাজকর্ম সব আসে তাদের প্রেম বা বদমাইশির উদাহরণ হিসেবে।
জমিদার দর্পণ-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। লর্ড কর্নওয়ালিসের কল্যাণে খুদে রাজা হয়ে বসা সামন্ত-প্রভুদের কীর্তিকলাপ এভাবে তুলে ধরার জন্য মশাররফ হোসেনকে সামস্তবিরোধী আন্দোলনের একজন পুরোধা বলে অভিনন্দিত করা উচিত। কিন্তু এখানে হায়ওয়ান আলী এবং তার চেলাচামুণ্ডারা সব চূড়ান্ত বদমাইশির নমুনা দেখিয়েই ডুব দেয়, সম্পূর্ণ জলজ্যান্ত মানুষ আর হয় না, এমনকী একটি সমগ্র বদমাইশও হতে পারে না।
ওদিকে জাত্মজীবনীমূলক লেখা যে কখনো পাওয়া গেছে সেখানেও যে-বিশ্লেষণধর্মিতার সাহায্যে ব্যক্তিগত বিরাগ বা অনুরাগ সর্বজনীন শিল্পের রূপ পায় তার শোচনীয় অভাব দেখতে পাই। অথচ ভালো আত্মজীবনী মানে কেবল নিজের শত্রুদের নিয়ে পরচর্চা করা নয়। কিন্তু লেখকের গুণকীর্তির দীর্ঘ সার্টিফিকেট কী দুঃখবেদনার প্যানপ্যানানি কান্নাকে ভালো আত্মজীবনী বলে না। সম্রাট বাবর কী নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবী ক্রপটকীন কী গ্রিক লেখক কাজানজাকিস— এঁদের আত্মজীবনীমূলক রচনা বিশ্ব-সাহিত্যের মর্যাদা পায় এইজন্য যে এঁরা নিজেদের বিশ্লেষণ করতে করতে এমন একটি উঁচু নৈর্ব্যক্তিকতা অর্জন করেন যে মনে হয় অন্য কারও সম্বন্ধে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে চলেছেন। উপন্যাসের জন্য এটা আরও অপরিহার্য। লেখকের যে-কোনো অভিজ্ঞতায় বিশ্লেষণ এমন হয়ে ওঠে যে লেখক শেষ পর্যন্ত কখনো বুক চিতিয়ে সামনে এসে দাঁড়ান না। একটা অনুভূতি বোধ হ আর শব্দমালার অস্ত্র দিয়ে একটা ধাক্কা দিলাম না, কবির এই অধিকার থেকে ঔপন্যাসিক বঞ্চিত।
নিজের পাপবিবৃত, প্রবীণ ও বিরলকেশ পণ্ডিতের কোনো তরুণের ছটফট করা যন্ত্রণা থেকে ফুটে ওঠা কবিতার সম্পাদনা করার ধৃষ্টতাকে একজন কবি ডব্লু. বি. ইয়েটস’ all coughin ink’ বলে বাতিল করে দিতে পারেন। কিংবা গলিতদন্ত, অজর, অক্ষর, চোখে অক্ষম পিঁচুটি বন্ধ্যা অধ্যাপক ক্ষুধাপ্রেম আগুনের সেঁক কামনা-করা, হাওরের ঢেউয়ে লুটোপুটি খাওয়া কচিদের ওপর শাসন করতে এলে একজন জীবনানন্দ দাশ তাকে ‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা’ বলে প্রত্যাখ্যান করে দিতে পারেন। কিন্তু এই সমালোকটিকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে হলে এত তাড়াতাড়ি তাঁকে বাতিল করে দেওয়া চলে না। সৃজনক্ষমতাহীন ছিদ্রান্বেষী এই অধ্যাপকের সব কথাও ঔপন্যাসিককে শুনতে হবে মনোযোগ দিয়ে। তাঁর সঙ্গে মিশতে হবে ঠিক তাঁর মতো করে। তাঁর আত্মরক্ষার দায়িত্ব ঔপন্যাসিকের ওপরেও বর্তাবে বইকী! হ্যাঁ, সেই সমালোচক মনে করেন যে তরুণ-কবিদের স্বেচ্ছাচারের ফলে কবিতার পবিত্র অঙ্গন ক্লেদাক্ত হবে; হ্যাঁ, সে মনে করে যে ভাষার সুদীর্ঘকালের কাঠামো বজায় রাখার জন্য তাঁকে একটু কঠিন না-হয়ে উপায় নেই।
একই সঙ্গে চলে তরুণ কবিদের উচ্চকণ্ঠ দাবি : ভাষার কাঠামো রক্ষার চেয়ে অনেক বেশি দরকার ভাষাকে সবল ও সজীব রাখা, কবিতা মানুষকে পবিত্র করে না, কবিতার কাজ মানুষকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করা। ঔপন্যাসিকের সমর্থন যার প্রতিই থাক, তাঁর ব্যবহার সকলের সঙ্গে সমান। সকলের ভেতরে ঢুকে তাদের অন্তর্গত বাণীকে ধরে আনবেন তিনি। ঔপন্যাসিকের ওপর লেখা ডব্লু. এইচ. অডেনের কবিতা নকল করে বলি, তিনি ‘among just be just among filthy filthy too’। ঔপন্যাসিকের নিজের ব্যক্তিত্ব আপাতদৃষ্টিতে শিথিল, কারণ সবাইকে তিনি তাদের মতো করে দেখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাঁকে শক্ত থাকতে হয়। তাঁর এই আপাতশিথিল ব্যক্তিত্বে তিনি ধারণ করেন সবাইকে, সকলের দুঃখ-বেদনা বহন করতে হয় তাঁকে। এর মধ্যেও তাঁর নিজের বক্তব্য আছে, এবং সেই বক্তব্য রচনার সর্বত্র ছড়ানো রয়েছে, চরিত্রের পরতের পর পরত উদ্ঘাটনে, কাহিনীর ক্রমবিকাশের মধ্যে তাঁর নিজের কথা এমনভাবে বলা হয় যে তিনি যেন কিছুই জানেন না, চরিত্র ও কাহিনীর এই বিকাশই তাঁকে এরকম সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করেছে।
এজন্য মানুষকে তিনি দেখেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ভক্তিগদগদ হলে এই কর্মটি করা অসম্ভব। ভক্তি গদগদভাব মানুষের বিশ্লেষণের পথে প্রচণ্ড বাধা। তাই নিরঙ্কুশ ভক্তির দাপটে কী ঈশ্বরের সামনে কী তার প্রতিনিধি কী সামন্ত-প্রভুর সামনে মানুষকে যখন সদাসর্বদা নতজানু হয়ে লেজ নাড়তে হতো সেই সময় উপন্যাস লিখিত হতে পারেনি।
তাই ঔপন্যাসিকের প্রধান অবলম্বন, হল তাঁর সংশয়। সংশয়ের তাড়াতেই লেখক প্রত্যেকের ভেতরে ঢোকেন তাকে তদন্ত করার জন্য, এই সংশয়ের তাড়ায় তাঁকে আখ্যানের চেয়ে বেশি তাড়া করে ভেতরের মনোজগৎ, এবং তাঁর সমাজ —-কারণ তা-ই তাঁকে সাহায্য করে মানুষের বিশ্লেষণে। সামন্তবিরোধী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রথম গদ্যকার মীর মশাররফ হোসেন এই বিশ্লেষণক্ষমতা অর্জন করতে পারেননি। এই সামন্তবিরোধিতা তাঁর এসেছে প্রধানত ব্যক্তিগত ক্রোধ থেকে, ফলে এই মনোভাব তাঁকে সমান্তচেতনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারেনি। জমিদার দর্পণ-এর আবু মোল্লা প্রতিরোধের সংকল্প নেওয়া তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত করে উঠতে পারে না। যার ওপর চটা তার মূর্তি উদ্ঘাটন করেই তিনি ছুটি নেন, চরিত্র তাই রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠে না, কাঁচামাটির পুতুল হয়ে ভেঙে পড়ে।
একটি মানুষ সম্বন্ধে তিনি প্রথমেই যে সিদ্ধান্ত নেন সেটাই ফাইনাল এবং ফাইনালে পৌঁছবার জন্য তাঁর দারুণ তাড়াহুড়া, পরতের পর পরত উন্মোচন করার ধৈর্য তাঁর নেই। আসলে ধৈর্যচ্যুতির কথাটা ভুল বললাম। তাঁর নিজের কোনো সংশয় নেই, যে-সংশয়ের তাড়ায় তিনি চরিত্রের ভেতর অনুসন্ধানের কাজ চালাতে পারেন।
নজিবর রহমান বা কাজী ইমদাদুল হকের প্রধান সম্পদ ভক্তিসর্বস্বতা। আদর্শ নারী ও আদর্শ পুরুষ তৈরির জন্য তাঁরা উদ্গ্রীব, মানুষের সামগ্রিক চেহারার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন তাঁরা। তাঁদের উপন্যাসে কোনো জ্যান্ত মানুষ নেই, ভালো কাজের কিছু নমুনা আছে মাত্র। সকল প্রকার সংশয় ও সন্দেহের বাইরে থাকেন তাঁরা, মানুষের ভেতরের পরিচয় উদ্ঘাটন করার চেষ্টার তাই কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু বড় ও মহৎ কোনো উপলব্ধিতে পৌঁছতে হলেও সংশয়ের পথ ধরেই উঠতে হয়। এই সংশয়ের তাড়নায় মানুষের ভেতর খোঁড়াখুঁড়ি করা এবং নিস্পৃহভাবে তাকে তুলে ধরার প্রবণতাসম্পন্ন বাংলার মুসলমান লেখকের জন্য আমাদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। উপন্যাস রচনার জন্য সামন্তবোধযুক্ত নগরচেতনা অপরিহার্য, এই চেতনা না-থাকলে গ্রামের কী অরণ্যের জীবনযাপন নিয়েও উপন্যাস লেখা যায় না। এই চেতনা বিচ্ছিন্নভাবে কারও মধ্যে আসে না, সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি এর দ্বারা রঞ্জিত হয়। বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকেই। কিন্তু তা সীমাবদ্ধ ছিল কেবল কয়েকটি পরিবার বা ব্যক্তির মধ্যে, একটি মধ্যবিত্তসমাজ গড়ে উঠতে তখনও ঢের দেরি। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের যে-নগরচেতনা থেকে সংশয়ের জন্ম হয় তার কোনো লক্ষণই তখন দেখা যায়নি। তাই ঔপন্যাসিক আর আসেন না। নজরুল ইসলামের মতো কবির আবির্ভাব ঘটে এই শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছর পার না-হতেই। ইয়াকুব আলী চৌধুরীর হাতে অপূর্ব কাব্যময় গদ্য রচিত হয়। আলাউদ্দিন খা সংগীতে ভারতজোড়া খ্যাতি লাভ করেন। গান গেয়ে বাংলা জয় করেন আব্বাসউদ্দিন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ মানবলাঞ্ছনার দলিলে পরিণত হয় জয়নুল আবেদীনের ছবিতে। নৃত্যকলায় বুলবুল চৌধুরী যে মৌলিক সৃজনশীলতার পরিচয় দিলেন, তাঁর অকালমৃত্যু হয়েছে আজ সাতাশ বছর, এর মধ্যে এই ক্ষেত্রে এখানে কেউ তাঁর ত্রিসীমানায় যেতে পারলেন না। সবাই আসে। কমিউনিস্ট পার্টির গঠনকালে বিশিষ্ট নেতৃত্বের আসন লাভ করেন মুজাফ্ফর আহমদ। আবুল হাশেমের নেতৃত্বে তরুণকর্মীদের তৎপরতার ফলে বুর্জোয়া রাজনীতিতে নিম্নমধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠা হয়। তিরিশের দশকের শেষভাগে ও চল্লিশের শুরুতে এইসব পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আসেন না কেবল একজন। তিনি ঔপন্যাসিক। তবে সমস্ত পরিবর্তন তাঁর আবির্ভাবের পথ প্রস্তুত করে। তিরিশের দশকের অর্থনৈতিক মন্দা, চল্লিশের যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনযাপনে স্বাচ্ছন্দ্যের বিঘ্ন ঘটায়। সবকিছু সহজ ও সরল—এই বোধ আর টেকে না। যে-টানাপোড়েনের শুরু হয় তাতেই জেগে ওঠে সংশয়। এইভাবে আবির্ভাব হয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর।
সংশয়সমৃদ্ধ চিত্তে তিনি সামস্তদেহের একটি প্রধান রোগজীবাণু পিরবাদ নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করলেন। বাংলাদেশের প্রথম ঔপন্যাসিক তিনি, আধুনিক নগরচেতনা নিয়ে তিনি যা দেখেন তারই মূল অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হন। ভক্তিগদগদ চিত্তে তিনি চিড় ধরালেন, এই চিড় আজ ফাটলে পরিণত হচ্ছে। সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিকে রেখে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উত্থাপন করেন তিনি। সংশয় বাড়ে, ভক্তি ভেঙে যায় এবং এইভাবে উপন্যাস মানুষের সমাবেশে সবল ও সজীব হয়ে ওঠে।
উপন্যাস কি তা হলে শেষ পর্যন্ত মানুষের দ্বন্দ্ব আর সংঘাতের কুরুক্ষেত্র হয়েই টিকে থাকবে? হ্যাঁ, তা-ই। সংশয়ই মানুষকে ধাপে ধাপে নিয়ে যেতে পারে বড় ও গভীর কোনো উপলব্ধির দিকে। সংশয়সমৃদ্ধ একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের গহন ভেতরের অন্ধকার ঘরের দ্বন্দ্ব দেখার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারেন যে অন্যায় কোনো সামাজিক নিয়ম মানুষের রোগ ও স্খলনের মূল কারণ। তখন তার প্রতিকারের জন্য যে-পথ তিনি খোঁজেন তাও দ্বন্দ্বমুখর, সেটাও একটানা সরলরেখা নয়, সংশয় ও সংঘাতের জৈবিক প্রক্রিয়া সেখানেও সচল।
দস্তয়েভস্কি মানবপ্রকৃতির গভীরে একটি অখণ্ড ঐকতান উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দস্তয়েভস্কির এই উপলব্ধি আমাদের শতাব্দীর মহত্তম মানব আইনষ্টাইনকে বিশেষভাবে অবিভূত করে। শুনেছি, আইনস্টাইন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল দ্বন্দ্ব ও এলোমেলা গতিপ্রকৃতির মূলে একটি চূড়ান্ত শৃঙ্খলা দেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়েছিলেন। আইনস্টাইন তাঁর গবেষণা পরিচালনা করেন প্রকৃতির সেই চূড়ান্ত শৃঙ্খলাটিকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করার জন্য। কিন্তু দস্তয়েভস্কির সাধনা সম্পূর্ণ আলাদা। দস্তয়েভস্কির মানবপ্রকৃতির অনন্ত ঐকতান কিন্তু মানুষের টান-পোড়েন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও বৈপরীত্বের স্বাভাবিক মোহানা। দস্তয়েভস্কি এই ঐকতান দেখতে পান, কিন্তু সেজন্য মানুষের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কিছুমাত্র গৌণ হয়ে যায় না। বরং, সংশয়ের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে মানুষের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত দেখতে না-পারলে মানবাত্মার এই মহৎ ঐকতান উপলব্ধি করা শিশুর ইচ্ছাবিলাস হয়ে থাকে। এই ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হওয়া মানেই মানুষের সামগ্রিক রূপ দেখা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া। ঔপন্যাসিকের কি তাই পোষায়?
