মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাগী চোখের স্বপ্ন
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তার আগে বাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশ একটা উপনিবেশে যতটা সম্ভব তার অনেকটা হয়ে গেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আশীর্বাদে কিছু লোক বিত্ত ও দাপটের মালিক হয়েছিল, সেই সুবাদে তাদের বংশধররা তো বটেই, বংশধরদের আশেপাশে আরও অনেকে জোতজমি করে, ব্যবসাবাণিজ্যে একটুআধটু হাত লাগিয়ে এবং চাকরিবাকরিতে ঢুকে কিংবা উকিলমোকতার হয়ে নিজেদের ছেলেপুলেকে লেখাপড়া করাবার সুযোগ করে নিয়েছে। আশু মুখুজ্যের কল্যাণে আরকিছু না-হোক, ছেলে কিংবা জামাই যেন গ্র্যাজুয়েট হয় এরকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করার সাহস তখন অর্জন করেছে এমনকী নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালিও। বাংলার ভদ্দরলোক রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার সাধকে সংকল্পে রূপ দেওয়ার তাগিদ বোধ করছে। রাষ্ট্রক্ষমতা না-পেলেও রাজ্য তো বলতে গেলে কংগ্রেসের দখলে, তারা রাজত্ব চালাচ্ছে মহাত্মা গান্ধির জ্যোতির্ময় যষ্টি-হাতে। ভদ্দরলোকদের ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে মালা পরানো শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ ও ক্ষুদিরামের পাশে ঝুলছেন মহাত্মা গান্ধি। ওদিকে স্টেটসম্যান পড়ে ইংরেজি ভাষার গৌরব রপ্ত করার সাধনা চলছে, পাশাপাশি চলছে ঠেসে বাংলা উপন্যাস পড়া। শ্রেষ্ঠ বাঙালি পুরুষ রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি তখন শীর্ষে, রবিঠাকুর তখন দেশবাসীর পরম শ্রদ্ধেয় ‘গুরুদেব’। কিন্তু তাঁর বই বিক্রি যত হয় তত গঠিত হয় না, ব্রাহ্মসমাজের বাইরে রবীন্দ্রনাথ প্রচলনের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। দেশের মানুষ তাঁকে নিয়ে যত গর্ব করে তাঁর কথায় কান দিতে কিন্তু তত উৎসাহ পায় না। তাদের চোখের সামনে এবং নয়নের মাঝখানে তখন গান্ধি মহারাজ। তাঁর চরণপ্রান্তে দেশবন্ধু। শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধি ও দেশবন্ধুর শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান বাংলার ঘরে ঘরে।
বাংলার মুসলমানের যে-ছোট অংশটি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কামরায় ঢোকার জন্য উকিঝুঁকি মারছে, কংগ্রেসের প্রভাব তাদের ওপরেও কম নয়। ইংরেজি পড়তে পড়তে তারা একই সঙ্গে দীন ইসলাম ও মহাত্মার ভক্ত হয়ে উঠেছে। তাদের দীন ও দীনের ওপর ভর করে উম্মাহ পরিচালনায় গান্ধির উৎসাহ প্রবল, খেলাফত কায়েমের জেহাদে তাদের সঙ্গে তিনিও শামিল হয়েছেন। আবার কামাল পাশা এসে যখন খেলাফতের পাছায় দুটো লাথি মারলেন তখন ঐ মুসলমানদেরই কামাল পাশার শক্তিতে মুগ্ধ হতে বাধল না; এমনকী খেলাফতরক্ষার জন্য দুদিন আগের উন্মাদনার কথা ভেবে তাদের আফশোস দেখা গেল না। পিরসাহেবের সঙ্গে গান্ধি ও দেশবন্ধুও বাংলার নতুন মধ্যবিত্ত মুসলমানদের ঘরে সমান ঠাঁই পেয়েছেন। পরে এঁদের সঙ্গে শরিক হলেন ফজলুল হক। আর নজরুল ইসলাম ছিলেন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্তের সঙ্গেই। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের উদ্বুদ্ধ করা, ধর্মবিশ্বাসে উত্তেজিত করা, সাম্যবাদের ধারণায় অনুপ্রাণিত করা, ভক্তিতে আচ্ছন্ন করা এবং নারী ও পুরুষের সঙ্গে যথাক্রমে পুরুষ ও নারীকে প্রেমে বিহ্বল ও বিরহে কাতর করা—এতোগুলো এলোমেলো দায়িত্ব তিনি বেশ কার্যকরভাবে পালন করে গেছেন।
বাংলা কথাসাহিত্যের সবচেয়ে ভালো মৌসুমও এটাই। রবীন্দ্রনাথের এবং বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলো লেখা হয়েছে, তাঁর উপন্যাস লেখাও চলেছে। শরৎচন্দ্রের বই একটা পর একটা বেরিয়ে সবাইকে অভিভূত করে দিচ্ছে, তাঁর সমাজসংস্কারের ভাবনাতেও মধ্যবিত্ত অস্থির। তা ক্ষুদিরাম, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, গান্ধি, দেশবন্ধু যাদের সমানভাবে বুঁদ করে রাখতে পারে, শরৎচন্দ্রের পায়ের এলোমেলো রেসে খুঁড়িয়ে চলতে তাদের বেগ পাবার কথা নয়। ধর্মশক্তি ও ধর্মসংস্কার, সমাজের প্রতি আনুগত্য ও আধুনিক শিক্ষালাভে উৎসাহ ও শিল্পসাহিত্যচর্চায় আগ্রহ—সর্বক্ষেত্রে উত্তেজনা বাংলার মধ্যবিত্তকে একটি হৃষ্টপুষ্ট শরীরে দাঁড় করিয়ে দেয়। তো এই শরীর কি পেটানো? আমাদের বাঙাল ভাষায় যাকে বলি ‘শিলানো গতর’, তা-ই? নাকি ফাঁপা। মধ্যবিত্তের বিকাশের সবচেয়ে প্রধান লক্ষণ যে-ব্যক্তির উত্থান তাকে কি কোথাও ঠাহর করা যাচ্ছে। বিচিত্র সব পরস্পরবিরোধী ও অসংগতিপূর্ণ সব বিশ্বাস, ভক্তি, সংস্কার, মূলবোধ, উত্তেজনা, প্রেরণা ও সংকল্পের নিরাপদ সহ-অবস্থানে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা একশোটা শার্লক হোমসেরও সাধ্যের বাইরে। গ্রাম থেকে শহরে আসার ফলে বড় পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ভাঙা টুকরোগুলোতে পুরনো বাড়িরই ভাঙাচোরা ছায়া, বর্ণ কী বংশ কী খানদান ছাড়িয়ে কেউ আর ব্যক্তি হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেননি। বাংলার মধ্যবিত্তের উত্থান যে-‘ব্যক্তি’টিকে পয়দা করল সে বেচারা প্রথম থেকেই রিকেটগ্রস্ত ও অসম্পূর্ণ।
এই মধ্যবিত্ত হল দেশবাসীর প্রতি উপনিবেশিক শক্তির দেওয়া উপহার। উপনিবেশের মানুষ একটু ছোটই হয়, তাকে খাটো করে রাখতে না পারলে শাসক টিকে থাকে কী করে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শক্তসমর্থ ‘ব্যক্তি’র অনুসন্ধান করেছিলেন, কিন্তু সমাজে যা নেই তার খোঁজ তিনি পাবেন কোথায়? নিজেদের অসাধারণ মেধা ও প্রতিভা এবং সংকল্প ও শ্রম দিয়ে হাতে গোনা যায় এমন কয়েকজন মানুষ কোনো-কোনো ক্ষেত্রে খুব উঁচুমাপের ব্যক্তিত্বে উন্নীত হন, কিন্তু এঁরা বড় হয়েছেন ব্যক্তির মাপকে ছাড়িয়ে, এঁদের দিয়ে মধ্যবিত্তের মানুষকে চিনতে যাওয়া কেবল অসমীচীন নয়, অসম্ভবও বটে।
তিরিশের দশক শুরু হতে-না-হতেই বাংলার মধ্যবিত্তের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসতে শুরু হল। বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা ধাক্কা দিল এখানেও, একটি মহাযুদ্ধের পর আরেকটি মহাযুদ্ধের যে-পাঁয়তারা চলছিল তার ঝাপটা লাগছিল এখানেও। ইউরোপের স্বাধীন ও সবল ব্যক্তি মুখ থুবড়ে পড়ে যুদ্ধের সঙ্গেই, ব্যক্তিস্বাধীনতা সেখানে পর্যবসিত হয়েছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে এবং তাকে ব্যক্তিসর্বস্বতায় অধঃপতিত করে ব্যক্তিকে একটি নিঃসঙ্গ কুতকুতে চোখওয়ালা ঘিনঘিনে শরীরে গুটিয়ে এনে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব যথোচিত সমারোহে সম্পন্ন করে। শুরু হয়েছিল বিপুল গর্জনে, শেষ হল কাতরাতে কাতরাতে। আর আমাদের এই উপনিবেশে মধ্যবিত্তের নাবালক ও বামন সন্তান শ্ৰীমান ব্যক্তিবাবু চলছিলেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, তার খোঁড়ানোকে দেখা হচ্ছিল নাচের মহড়া বলে। তা তিরিশের দশকে শ্রীমান আছাড় খেয়ে পড়েই গেলেন, তাঁর কাপড়চোপড় আর কিছুই রইল না, রোগাপটকা গতরটা উদোম হয়ে গেল।
ভক্তি ও বিশ্বাসে সংস্কার ও মূল্যবোধ, সাধ ও সংকল্প এবং উত্তেজনা ও প্রেরণার জবরজং উর্দি তুলে নাবালক ও বামন এবং পঙ্গু ও রুগ্ণ ঐ ব্যক্তিটিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজটি হাতে নিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ছিল খুঁটিয়ে দেখার ধাত, রক্তের ভেতর তাঁর বিশ্লেষণ করার প্রবণতা। ভক্তিভাব থেকে তিনি মুক্ত একেবারে প্রথম থেকে। ভক্তি ও বিশ্বাস তাঁর কাছে সমার্থক নয়, সংস্কারকে তিনি মূল্যবোধের মর্যাদা দেন না এবং প্রশ্রয় ও ভালোবাসাকে তিনি আলাদা করতে জানেন। তাই বাংলার গ্রাম মানে প্রকৃতির রূপে আত্মহারা ভূখণ্ড নয়, গ্রামের মানুষ মানে সহজসরল উদারহৃদয় এবং প্রেম ও করুণায় টইটম্বুর অবোধ জনগোষ্ঠী নয়। একজন তরুণ ডাক্তারের সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন, ডাক্তারিবিদ্যা আয়ত্ত করে লোকটি নিজের গ্রামে ফিরে গিয়েছিল। তার মূর্খ দেশবাসী, শূদ্র দেশবাসী ভাইদের সেবা করার নিয়ত তার ছিল কি না তিনি আমাদের বলেননি, তবে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে ঐ তরুণ বেশ মেলামেশা করে, তাদের চিকিৎসা করে এবং নিজের সচ্ছল ও অসচ্ছল, অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত আত্মীয়স্বজনকে স্বাস্থ্যরক্ষার সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চলার তাগাদা দেয়। কিন্তু উপনিবেশের প্রধান শহরটিতে তার কয়েক বছরের শিক্ষালাভ, নিজের পেশা রপ্ত করার জন্য বিজ্ঞান পাঠ, পেশার বাইরেও অন্যান্য বিষয়ে তার পড়াশোনার অভ্যাস, শহরে থাকতে শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত বন্ধুদের সঙ্গে মেলাশো—সব মিলিয়ে তাকে এমন একটি প্রাণীতে পরিণত করেছে যে ঐ গ্রামে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে। শিক্ষা ও বিবেচনাবোধ এবং সর্বোপরি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য জন্মজন্মান্তরের ভক্তিভাব থেকে তাকে রেহাই দিয়েছে; কিন্তু মানুষের গদগদ ভক্তি এবং ভক্তি পাওয়ার লালসা যে মানুষকে স্বেচ্ছামৃত্যুর দিকে পর্যন্ত ঠেলে দিতে পারে তা-ই দেখে সে একেবারে অসহায় বোধ করে। গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনযাপনকে সনাতনী আদর্শের অব্যাহত ধারা বলে মেনে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব, আবার এখানে বাস করে এর মধ্যে গতিসঞ্চারের সুপ্ত ইচ্ছাও তার নেতিয়ে পড়ে। গ্রামে থেকে এবং মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেও তাকে থাকতে হয় বাইরের লোক হয়ে। লোকটি মধ্যবিত্ত একজন ‘ব্যক্তি’, তার নিজের পছন্দ-অপছন্দ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা খারাপলাগা সবই আছে। এই নিস্তেজ সমাজে বিলীন হয়ে যাওয়া তার স্বভাবে নেই। কিন্তু সে হল উপনিবেশের ব্যক্তি, সমাজে থেকেও নিজেকে নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠা করা তো দূরের কথা, নিজেকে আলাদাভাবে অনুভব করাও তার আয়ত্তের বাইরে। দিন যায়, স্বাতন্ত্রের বদলে নিজের বিচ্ছিন্নতা তার কাছে প্রকট হতে থাকে। বাপের সঙ্গে পর্যন্ত আত্মীয়তা ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে দূরত্ব। বাপের অপত্যস্নেহ চাপা পড়ে ঐ ঘোরতর বৈষয়িক বুড়োটির ক্ষুদ্রতা, লোভ আর লালসার নিচে। তার কিছুই করা হয় না। গেঁয়ো একটি মেয়ের জন্য নিজের দুর্বলতা বুঝতে বুঝতে মেয়েটির মন থেকে সে হারিয়ে যায়। গোটা পরিবেশ দিনদিন ভোঁতা থেকে ভোঁতাতর হতে থাকে, এই অবস্থায় সে নিজেও পরিণত হয় একটি সংকুচিত জীবে। ভয়াবহ রকমের বিচ্ছিন্নতায় তার ক্রমাগত ক্ষয় উপন্যাসটির পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে, লোকটিকে ঝেড়ে ফেললেই যেন পাঠক বাঁচে। কিন্তু ঝরে পড়ার মতো অলীক মানুষ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গড়েন না। গপ্পো বয়ান করার লেখক তো তিনি ননই, এমনকী চরিত্রসৃষ্টিও তাঁর কোনো কাজ নয়। মানুষের দিকে তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, ইচ্ছে হোক চাই না-ই হোক তার মধ্যে নিজের অনিবার্য ক্ষয় না -দেখে পাঠকের আর উপায় থাকে না।
উপন্যাসের সঙ্গে পাঠক একাত্ম বোধ করবেন, এটাই তো নিয়ম। সচ্চরিত্র, সাহসী বীরপুরুষ, উন্নতশির, আত্মত্যাগী —এঁদের তো কথাই নেই, এমনি নিরীহ ভালোমানুষ, গেরস্থ-টাইপের প্রেমিক, দেবদাস মার্কা ছিঁচকাঁদুনে বা অপদার্থ বেকার হলেও চলে, এমনকী বদমাইশ, লম্পট, নিষ্ঠুর, দাণ্ডাবাজ বা আলবদর কী শিবসেনা হলেও কোনো-না-কোনো জায়গায় লেখকের প্রশ্রয়ে চরিত্র একটুখানি হলেও ভালোবাসা দাবি করে এবং পাঠক তার ভেতর নিজেকে দেখে কিংবা দেখতে চায়। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পর্বের লেখার লোকজন পাঠকের দুর্বলতাকেই উসকে তোলে, তাদের মতো হওয়ার জন্য তাকে হাতছানি দেয় না। বরং পাঠককে তারা বড় ঝামেলায় ফেলে, নিজের অনেক ভেতরে চোখ ফেলতে বাধ্য হয়ে সে দেখে তার মধ্যে কী শোচনীয়, কী ভয়াবহ রকমের ধস নেমেছে। প্যাথলজির রিপোর্ট হাতে নিয়ে ল্যাবরেটরির দরজায় সে দাঁড়িয়ে থাকে, চলার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে, তার নাদুসনুদুস গতরটা তাকে এতদিন কী প্রতারণাই না করে এসেছে। অনুবীক্ষণ যন্ত্র তার যে রোগ শনাক্ত করেছে তার চিকিৎসা কেউ জানে না। চোখের সামনে তার ঘনঘোট অন্ধকার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন গভীর কোনো খাদের কিনারে, নিচের দিকে তাকালে অনিবার্য-পতনের ভয় তার দাঁড়িয়ে থাকার বলটুকু পর্যন্ত শুষে নেয়।
এই রুগন্ ব্যক্তিটি কিন্তু স্বয়ম্ভূ নয়, কিংবা বহু পূর্বপুরুষের রক্তের স্রোতে এইসব রোগ তার শরীরে উজান বয়ে আসেনি। বর্ণে, ধর্মে ও শ্রেণীতে ছেঁড়া এবং স্টেটসম্যান, রামকৃষ্ণ, ক্ষুদিরাম, মহাত্মা, দেশবন্ধু, সুভাষ বোস, নজরুল ইসলামের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে তৃপ্ত মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে পরিচালিত সমাজব্যবস্থা হল এই ‘ব্যক্তি’র পৃষ্ঠপোষক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পর্বের রচনায় ব্যক্তির গভীর ভেতরকার রোগ শনাক্ত হতে থাকে তাদের লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে। এর একটি হল অসুস্থ যৌনতা। এখানে তাঁকে ফ্রয়েডের তত্ত্বে প্রভাবিত বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা তখন থেকেই লক্ষ করা যায়। মানুষের যে-জীবনস্পৃহা ও মরণপ্রবণতাকে আদিমকাল থেকে মানুষকে সমন্বয় ও সংঘাতের ভেতর পরিচালিত করে বলে ফ্রয়েড বিবেচনা করেন তা কিন্তু শ্রেণীনিরপেক্ষ, সমাজকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কহীন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকজন কোনো-না-কোনোভাবে নিজ নিজ শ্রেণীগত অবস্থানের শিকার। হাজার বছর ধরে যেসব মূল্যবোধকে গৌরব দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে সমাজে, তারও লাভ-লোকসান হিসাব আছে, তাও শ্রেণীনিরপেক্ষ নয়। যাকে আমরা বিবেক বলে মহিমান্বিত করি, নিম্নমধ্যবিত্ত একজন ভদ্দরলোক তাকেও ব্যবহার করে একেকজনের কাছে একেকরকম করে। গণেশ, কুবের ও ধনঞ্জয় – পদ্মানদীতে মাছ ধরার এই ছোট দলের তিনজনেই কিন্তু গরিব, নিম্নবিত্তের শ্রমজীবী মানুষ। মাছ ধরার নৌকাটির মালিক বলে ধনঞ্জয়ের অবস্থানটা একটু উঁচুতে, তামাক সাজানো হলে হুঁকোতে প্রথম টানটি দেবে সে-ই এবং সুযোগ পেলেই সে কুবের ও গণেশকে ঠকায়। গণেশ লোকটা বেশ বোকা, কুবেরের চেয়েও তার আর্থিক অবস্থা খারাপ, সুতরাং কুবের তাকে অবহেলা করে। যে-লোকটি কুবেরের কাছ থেকে আড়ালে দুটো ইলিশ মাছ হাতিয়ে নিয়ে ‘কাইল দিমু’ বলে দাম না দিয়েই কেটে পড়ে, সেও কিন্তু উচ্চবিত্ত নয়, তবে কুবেরের তুলনায় সচ্ছল এবং সর্বোপরি একজন ভদ্দরলোক তো বটেই। এখানে শোষণের বুনুনিটা বেশ বোঝা যায়। গণেশ যদি বোকা না হয়ে একটু চালাকচতুর হতো তাহলেও কুবের কোনো-না-কোনোভাবে তাকে অবহেলা করতই। ধরা যাক, ধনঞ্জয় মহাপুরুষ। তা হলেও নৌকার মালিক হওয়ার জন্যই কুবের ও গণেশকে না-ঠকিয়ে তার আর উপায় নেই, তার ঐ একটুখানি আর্থিক সঙ্গতিই তাকে ওদের ঠকাবার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সস্তা মাছ ছাড়া আরকিছু হাতাবার ক্ষমতা ঐ নিম্ন মধ্যবিত্তের লোকটির জীবনেও হবে না এবং এই দায়িত্বপালনে তার টার্গেট সবসময়েই নিম্নবিত্তের শ্রমজীবী মানুষ। মেজবাবুর মতো গরিবের বন্ধু দেশের নিরন্ন মানুষকে উদ্ধারের মতলব আজও ছাড়েননি; রংবেরঙের জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয় এমনকী সমাজতান্ত্রিক পোশাক শরীরে চড়িয়ে তাঁরা এখন একটির পর একটি ভোটের বিপ্লব করেই চলেছেন। আরেকটি গল্পে পরিবারে রোজগেরে ছেলেটির প্রতি সবার উপচে ওঠা-স্নেহ কি একেবারে আকস্মিক? বিপত্নীক বেকার জ্যাঠামশায়ের চাকরি জোগাড় হয়েছে শুনে সমস্ত বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক দুধ জোগাড় করতে বেরোয় অনেক রাত্রে, দুধ না-হলে জ্যাঠামশায়ের আফিমের মৌতাত জমবে না। যাকে মূল্যবোধ বলি তা তো বটেই, এমনকী মানুষের প্রবৃত্তি পর্যন্ত সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে ওঠানামা করে, সমাজকাঠামো অনুসারে তার ভাংচুর হয়। একটি উপন্যাসে একই পরিবারের একটি ভাগ উচ্চবিত্ত এবং আরেকটি ভাগ নিম্নমধ্যবিত্তের পর্যায়ে পড়ায় তাদের জীবনযাপন থেকে শুরু করে মানসিক গঠন পর্যন্ত আলাদা। কোনো অংশকেই গৌরব দেওয়ার বা ধিক্কার দেওয়ার প্রবণতা নেই, নির্বিকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সময় কোনো রাজনৈতিক দর্শনে আস্থা না থাকা সত্ত্বেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রের প্রবণতা, মূল্যবোধ, প্রবৃত্তি, বিকার প্রভৃতি বিশ্লেষণে তাদের শ্রেণীগত রুগ্ণতার দিকে তাঁর ইঙ্গিত স্পষ্ট। এই সময়ের লেখায় মানুষের যৌনতা কিন্তু মোটেই সুস্থ নয়। যৌনস্পৃহার আদিম বলিষ্ঠ প্রকৃতি এখানে অনুপস্থিত। কাম এখানে জীবনচালিকা শক্তি নয়, চরিত্রের যৌনতা অসুস্থ। তাঁর রণ মানুষ, ক্লিষ্ট মানুষ বাঁচার উত্তেজনা বুঝতে যৌনতার ঝাঁঝ পেতে চায়। কামকে সুস্থভাবে, স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করার শক্তি থেকে তারা বঞ্চিত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে-চরিত্রটিকে খুব কামুক বলে ঠাহর করা হয় সে লোকটিও কিন্তু একটির পর একটি মেয়েকে আকর্ষণ করে, অথচ সুস্থ জীবনযাপনের মধ্যে কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের কামনায় কারও সঙ্গে কামকে গভীরভাবে কী তীব্রভাবে অনুভব করার তাগিদ তার শরীরে কী স্বভাবে কোথাও নেই। তার যৌনতা কিংবা কাম হল ব্যারাম, ঠিক করে বললে কঠিন ব্যারামের উপসর্গ।
মানুষের অনেক ভেতরে খানাতল্লাশি চালিয়ে অন্ধকার ও ঝাপসা মনোজগতের যে-সুষ্ঠু পরিচয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুঁজে বার করেছেন বাংলা কথাসাহিত্যে এখন পর্যন্ত তা তুলনাহীন। কিন্তু অবচেতনের প্রলাপ নোট করার কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেননি, মানুষকে সম্পূর্ণ করে চিনতে গিয়ে তার আবেগের বিকার, বুদ্ধির অপচয় এবং শক্তির ক্ষয়কে পর্যবেক্ষণ করেছেন নানা দিক থেকে। এর প্রকাশ নির্মোহ ও নির্বিকার, কিন্তু নির্লিপ্ত কিংবা নিরপেক্ষ শিল্পী তিনি কখনেই ছিলেন না। রোগের শনাক্তকরণেই তাঁর ক্ষোভের এই প্রকাশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সামাজিক অনাচার এর প্রেক্ষাপট, অনাচারটি সমাজব্যবস্থার ফল।
রোগের যিনি শনাক্তকরণ করেন তিনিই অনুভব করেন যে এর প্রতিষেধক দরকার। মার্কসবাদী হওয়ার অনেক আগে থেকেই রোগনিরাময়ের উপায় তিনি খুঁজছিলেন। অন্যান্য মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে ফ্রয়েডের তত্ত্ব ও কৌশল সম্বন্ধে গভীর কৌতূহল তাঁর ছিল, কিন্তু এতে তাঁর আস্থার কোনো প্রকাশ কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় নেই। রুগ্ন ও বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির অবদমিত কাম, তার স্বপ্ন, অপূর্ণ কামনা ও চাপা সাধকে বিশেষ পদ্ধতিতে টেনে বার করে তাকে সাময়িকভাবে আরাম দেওয়া যায়। অথবা পূর্বপুরুষের ভয়, আতঙ্ক, স্বপ্ন, অপমান, গ্লানি কিংবা বেদনাকে রোগের কারণ বলে নির্ণয় করলেও রোগীর নিজের দায়ভাগের মোচন হতে পারে। কিন্তু এতে আরোগ্য কোথায়? সমাজের যে-ব্যবস্থা রোগের শেকড়কে লালন করে তাকে উপড়ে ফেলবে কে? উপনিবেশের জন্মপঙ্গু ‘ব্যক্তি’ ভুগছে সায়েবদের ব্যক্তিসর্বস্বতার ব্যারামে। এখানে কেবল রোগ বা বিকারটির দিকে সমস্ত মনোযোগ দেওয়ায় মানুষের সামগ্রিক চেহারাটিই উপেক্ষিত হয়। এই চিকিৎসা তাই কাজ করে আফিমের মতো। এতে চিকিৎসার প্রতি আকর্ষণই রোগীর দিনদিন তীব্র হতে থাকে, আরোগ্যের সংকল্প তো দূরের কথা, সুস্থ হওয়ার ইচ্ছা পর্যন্ত লোপ পায়। একটি উপন্যাসে উচ্চবিত্ত পরিবারের বিষাদগ্রস্ত এক মহিলাকে দেখি মনোবিজ্ঞানীদের লেখার নিয়মিত পাঠে তাঁর রোগের উপশম তো হচ্ছেই না, বরং জটিলতা বেড়েই চলেছে। ব্যক্তিকে দেখতে দেখতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বোঝেন যে তার ওপর অনেক দিনের অনেক মানুষের অনেক সংস্কার ও অনেক প্রথার চাপ কী একট! এই চাপটিকে তিনি পাঠককে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে ছাড়েন। এইসব প্রথা ও সংস্কার লালিত হয় কড়া বিন্যাসের ভেতর, বিন্যাসটির উৎস দেখতে গেলে সমাজ ও সমাজব্যবস্থার প্রকৃতি তাঁর চোখে উন্মোচিত হয়।
সমাজভাবনা কথাসাহিত্যের একটি প্রধান শর্ত। সমাজের যে-কোনো রদবদল যাঁদের চোখে বিষ, সমাজ নিয়ে উদ্বেগ কিন্তু তাঁদেরও কোনো অংশে কম নয়। বাংলা উপন্যাসের শুরুতে বিধবাবিবাহ যাঁর কাছে মূর্খের তৎপরতা এবং তরুণী বিধবা প্রেমে পড়লে মেয়েটিকে গুলি করে না-মারা পর্যন্ত যাঁর শক্ত কলমটা ক্ষান্ত হয় না কিংবা আরও কিছুদিন পর সুন্দরী বিধবার ক্ষুরধার জিভে সামাজিক নীতির বিরুদ্ধে লম্বাচওড়া বাণী হাঁকিয়ে তারপর তাকে গৌরব দিতে ঐ জিভেই ফের হবিষ্যি ছাড়া যিনি আরকিছু তুলে দেন না, বড়ভাইয়ের পর জন্মগ্রহণে ছোটভাইয়ের আক্ষেপের কিছু নেই—এই অজুহাতে বর্ণভেদের প্রতি যিনি নিজের প্রশ্রয়ের কথা ঘোষণা করেন — সমাজের কাঠামোয় যাতে এতটুকু চিড় না-ধরে সেজন্য তাঁরা বড়ই উদগ্রীব। সুতরাং, সমাজভাবনা তাঁদের কোনো অংশে কম নয়, এটি না-থাকলে অত বড় বড় লেখক হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হতো না।
সমাজভাবনা তো বটে, সেই সময়ের রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমকালীন লেখকদের অনেকেই জড়িত ছিলেন। তাঁদের সাহিত্যকর্মেও সমসাময়িক রাজনীতির পরিচয় বরং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনায় বেশিই এসেছে। বাংলা ভাষার কয়েকটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লিখিত হয়েছে ঐ সময়েই, তার কোনো কোনোটিতে নির্যাতিত রাজনৈতিক কর্মীর দেশপ্রেম ও ত্যাগের মহিমা প্রকাশিত হয়েছে লেখকের অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে। এর পাশাপাশি বাংলার নিম্নবিত্ত চাষির জীবন, পুরনো সমাজের ভাঙন, মূল্যবোধের ক্ষয় প্রভৃতির যথাযথ চেহারাও লেখকের দৃষ্টি এড়ায়নি। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়োজিত ত্যাগী পুরুষের মহিমা মানুষকে মুগ্ধ করলেও এইসব ত্যাগ দেশবাসীর রাজনৈতিক চেতনা, সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও জীবনবোধে কী প্রভাব ফেলল কিংবা এসবে আদৌ কোনো সাড়া পড়ল কি না তার পরিচয় অনুপস্থিত। একজন খুবই বড় মাপের শিল্পীর লেখায় নিম্নমধ্যবিত্তের দারিদ্র্য প্রকাশিত হয় সমস্ত গ্লানি নিয়ে। কিন্তু এই দারিদ্র্য লেখকের নিজের এবং ঐ দরিদ্র লোকদেরও মোলায়েম ভালোবাসায় স্নিগ্ধ, পাঠক গরিব হওয়ার ধিক্কার ধরতেই পারেন না। এই যে দেশপ্রেমের দীপ্তি, আত্মত্যাগের তেজ এবং দারিদ্র্যের তাপ— এর কোনোটাই এই সমাজের নয়, এ সবই অন্য কোনো নক্ষত্র থেকে ধার করা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই জানতেন, সেই নক্ষত্র যদি আদৌ কখনো থেকেও থাকে তো তার মৃত্যু হয়েছে অনেক আগে, মৃত নক্ষত্রের আলোতে তিনি পথ চলতে চাননি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমসাময়িক বড় লেখকদের সবারই সমকালীন রাজনীতিতে আস্থা ছিল, মধ্যবিত্তের মধ্যে পরস্পরবিরোধী ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার বা আদর্শ বলে বিবেচিত সংস্কারের সহাবস্থানে তাঁরা অস্বস্তি বোধ করেননি, জগাখিচুড়ি কিছু ধারণাকে রাজনৈতিক আদর্শের মর্যাদা দেওয়ার আরামদায়ক রেওয়াজকে তাঁরা মেনে নেন উদ্দীপনার সঙ্গে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ব্যক্তির সামাজিক প্রেক্ষাপট যেভাবে তৈরি করেন তাতেই সমকালীন রাজনীতির প্রতি তাঁর প্রত্যাখ্যান স্পষ্ট। একটি উপন্যাসে বড়লোকের ভালো ছেলে চরিত্রটি নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের জেদি ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন তরুণীকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিচলিত হয়ে যায়। রাস্তায় বেরিয়ে একটি মিটিং হচ্ছে দেখে সে সেখানে ঢুকে পড়ে। রাজনৈতিক সভাটির মঞ্চে বসে-থাকা-বক্তাদের একজনকে সে চেনে, লোকটি পাকা ধান্দাবাজ। বক্তাদের ভাষণে তাদের ভণ্ডামি বুঝতে পেরে ছেলেটি ক্ষিপ্ত হয়ে মঞ্চে উঠে পড়ে এবং নিজেই চিৎকার করে কথা বলতে শুরু করে। সভায় হাজির সবাইকে সে ধিক্কার দেয় এই বলে যে, তারা সব ন্যাকা, নিষ্ক্রিয় এবং স্বার্থপর। শ্রোতারা তার কথায় মজা পেয়ে গেছে, বিক্ষুব্ধ তরুণকে আরও বলার জন্য তারা উৎসাহিত করে। অবস্থাটা সভার উদ্যোক্তাদের জন্য কেবল বিব্রতকর নয়, বিপজ্জনকও বটে, মিটিং তো পশু হতে যাচ্ছে। এখন মঞ্চ থেকে তাকে নামাবে কে? তাদের এই বিপদ কাটে মঞ্চেরই এক নেতার ফন্দিতে। নেতা উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করার ভঙ্গিতে বিক্ষুদ্ধ তরুণকে ভাষণ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানায়। এবার তরুণ কিন্তু বিব্রত বোধ করে, সে আর কিছু বলতে পারে না। আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে পড়তেই বিদ্রোহী তরুণের বিস্ফোরণ চুপসে জল। সে চুপচাপ বসে পড়ে। মানুষের ক্ষোভ ও ক্রোধের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ চাপা দেওয়াই হল নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মূল লক্ষ্য। আন্দোলন আর সংগ্রামের পরিণতি গড়ায় আপোস পর্যন্ত। সে-সময়ের রাজনীতির সারমর্ম শেষ পর্যন্ত আপোস এবং সেই অপোসে সাড়া দেওয়া মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধাতে নেই। সাহিত্যচর্চার প্রথম পর্বে যার দিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেন সেই লোকটি ঔপনিবেশিক শাসনে বামন, বর্ণপ্রথার চোখ-রাঙানিতে জড়সড়, শ্রেণীশোষণে ক্লিষ্ট এবং আপোসকরা রাজনীতিতে সন্তুষ্ট ও কাতর। শ্রীশ্রীকালীমাতার পদপ্রান্তে উত্তপ্ত মুক্ত লুটিয়ে সায়েব মেরে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার প্রতিজ্ঞায় এরা উত্তেজিত, আবার সায়েবদের হাতে বেদম প্যাদানি খেয়ে অহিংসার বাণীতেও এরা মুগ্ধ। উল্লেখযোগ্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশটি কখনো মধ্যযুগীয় ধর্মীয় শাসন প্রবর্তনের জোশে মাতোয়ারা আবার কখনো সায়েবি কায়দায় জীবনযাপন করেও ধর্মের নাম করে নিজেদের আলাদা রাজনীতি তৈরি করতে তৎপর। মধ্যবিত্ত তখন রংবেরঙের ফন্দিকে আদর্শের জোব্বা পরাতে লিপ্ত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় সমাজজীবনের খুঁটিনাটি খুব বেশি নেই। কিন্তু ব্যক্তিটির দিকে নজর দিলেই তার স্রষ্টা সমাজ, সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির প্রকৃতি, স্বভাব ও পরিচয় গোপন থাকে না।
আমি যেন টের পাই
আমি যেন দেখে যেতে পারি
তোমালের কঠিন অসুখে
তোমরা ঔষধপত্র পেয়েছিলে কিনা ঠিকঠাক
অনন্ত নক্ষত্র দূরে খেলা করে
করে হতবাক।
এলেছি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়
.
ব্যক্তির রোগনির্ণয় করেছিলেন বলেই রোগনিরাময়ের পথ অনুসন্ধানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎকণ্ঠা সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে গভীর ও তীব্র। রোগ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার বিলাসিতা তাঁর ছিল না, মানুষের রুগণ অন্তর্লোকে খানাতল্লাশির কাজটি তিনি করেছিলেন ক্ষোভ ও উদ্বেগ নিয়ে। প্রথম থেকেই তাঁর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে যে, ব্যক্তি হল সমাজের তৈরি এবং তার রুপূর্ণতা ও ক্ষয়ের উৎস হল সমাজ। এই অসুস্থ ব্যক্তিটির সুস্থ হয়ে মানুষ হওয়ার জন্য সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন যে সবচেয়ে জরুরি, এই কথাটি সোজাসুজি না বললেও এই অনিবার্য প্রতিষেধক সম্বন্ধে প্রথম থেকেই তিনি সচেতন। সৎ, অকপট ও নির্মোহ বিশ্লেষণের সাহায্যে মানুষকে তার যথার্থ অবস্থান সম্পর্কে অনুভব করানো ঔপন্যাসিকের কাজ, কিন্তু বড়মাপের শিল্পী তার মুক্তির জন্য উৎকণ্ঠিত না হয়ে পারেন না। জীবনের ব্যাখ্যার সঙ্গে এর পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন কার্ল মার্কস, এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব তাঁর দর্শনে তারও স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। তাই মার্কসবাদী হওয়াটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি তাঁর উটকো কোনো সিদ্ধান্ত নয়। পরবর্তী পর্বের লেখার সঙ্গে প্রথম পর্বের লেখার পার্থক্য থাকলেও কোনো বিরোধ কিন্তু নেই। বরং বলা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম পর্বের অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শেষ পর্বের রচনায়।
চল্লিশের দশকের শুরুতে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। মার্কসবাদী সংগঠন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক ও ছাত্রদের মধ্যে তাৎপর্যময় প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়, কলকারখানা ও রেলওয়ে শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে শামিল হয়। সামন্ত শোষণকে সম্পূর্ণ উৎখাত করার আয়োজন না-থাকলেও তাকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ হল তেভাগা আন্দোলন। কংগ্রেসের গদগদ ভক্তিভাবের আড়ালে তাদের পুঁজিবাদ -তোষণ দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হতে থাকে। কংগ্রেসের প্রধানের পদ থেকে সুভাষচন্দ্র বসুকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য গান্ধির চক্রান্ত দলের হাজার হাজার কর্মীর অনুমোদন পায়নি। গান্ধির কর্মকাণ্ড কংগ্রেসের বহু কর্মীর কাছে তাঁর মাহাত্ম্য ঘুচিয়ে দেয়। এমনকী পূর্ব বাংলার নিভৃত গ্রাম থেকে কংগ্রেসের সমর্থক ও কর্মীগণ গান্ধিকে ইংরেজের বন্ধু, মন্ত্রী-উজিরদের প্রভু প্রভৃতি বিশেষণে চিহ্নিত করে মুদ্রিত লিফলেট প্রচার করে। কংগ্রেসের ভেতরকার এই অসন্তোষের কারণ যা-ই হোক, সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সামন্ত-দাপট ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধ ক্ষোভসঞ্চারে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা খাটো করে দেখা যায় না। প্রতিক্রিয়াশীল দল মুসলিম লীগেও ইংরেজের পদলেহী সামন্ত-প্রভু, নবাব, নবাবজাদা, খানবাহাদুর, খানসাহেব প্রভৃতির বিরুদ্ধে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী শক্তিসঞ্চয় করতে থাকে। মুসলমান ছাত্র ও তরুণদের মধ্যে এই গোষ্ঠী যথেষ্ট সাড়া জাগায়। এইসব প্রতিষ্ঠানে সামন্ত-দাপট ও সামন্ত-সংস্কারকে অগ্রাহ্য করার মনোভাব গড়ে উঠেছিল কমিউনিষ্টদের তৎপরতার ফলেই।
এই দশকে বাংলা কবিতায় সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রকাশ করার আয়োজন চলে। বাংলা কথাসাহিত্যে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী ঢুকেছিল তিরিশের দশকে, চল্লিশে এসে তারা তাদের ওপর আরোপিত মধ্যবিত্তসুলভ ভাবাবেগ ঝেড়ে ফেলার জন্য সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাইল। সমাজতন্ত্রের আদর্শ ব্যাখ্যা করে অনেক বই লেখা হতে লাগল, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনেক শিক্ষিত তরুণ বাঙালির কাছে বিবেচিত হল আদর্শ রাষ্ট্র হিসাবে। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, আমাদের দেশেও বিপ্লবের মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত সাম্যবাদী সমাজের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সমাজতন্ত্রের ঘোরতর বিরোধী অনেকে শ্রেণীসংগ্রামের সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হলেন।
তরল ভাবাবেগ পরিচালিত এবং পশ্চাৎমুখী সংস্কার ও উদ্ভট ধারণার দ্বারা পরিচালিত মধ্যবিত্তের ওপর ক্ষুব্ধ, বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এই পরিবর্তনের আভাস নিশ্চয়ই প্রেরণাদায়ক। এই সময় সাহিত্যচর্চায় তিনি মানুষের এমন শক্তির অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন যা দিয়ে ব্যক্তির রুগ্ণতা নিরাময়ের লক্ষ্যে সামাজিক ব্যাধি নাশ করা সম্ভব। তাঁর এই পর্বের লেখায় নতুন উদ্যোগটি পাঠকের চোখ এড়ায় না। কিন্তু মূল প্রবণতার পরিবর্তন ঘটে না। তাঁর রচনা আগের মতোই এগিয়ে চলে মানুষের স্বভাব ও প্রবণতা এবং ঘটনা ও প্রতিক্রিয়ার বিশ্লেষণ করতে করতে। তবে এখানে এই বিশ্লেষণ পরিচালিত হল সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ের জন্য মানুষের শক্তির অনুসন্ধানে।
এই শক্তি সবচেয়ে বেশি ধারণ করে নিম্নবিত্তের শ্রমজীবী মানুষ। উপনিবেশের ব্যক্তিবাদের বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে তারা মুক্ত, তারা ব্যক্তিতে পর্যবসিত হয়নি, হাজার দুর্বলতা নিয়েও তারা মানুষই রয়ে গেছে এবং মানুষ মানেই অনেক মানুষ, ঐক্যবদ্ধ মানুষ। সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতাও তাদের একটু বেশি। এর একটা কারণ এই যে, অনেকের সঙ্গে মিলতে হলে একান্ত নিজের কিছু ছাড়তে হয়; ছাড়ার মতো জিনিস তাদের নেই বলে নিরাপত্তার পিছুটানে পদেপদে তাদের থমকে দাঁড়াতে হয় না। তবে শুধু এজন্য নয় কিন্তু। পেশার সঙ্গে তারা অনেক ঘনিষ্ঠ, এই ঘনিষ্ঠতার ফলে একই পেশার অন্য মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার তাগিদ তাদের বেশি। তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশও তার পেশার মধ্যেই, এজন্য তাকে নিভৃতে যেতে হয় না, তার জমি কিংবা যন্ত্রই তার গভীর আবেগপ্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্পে দেখি, সুতার অভাবে তাঁতিরা যখন বেকার ও নিরন্ন, হতাশ ও বিক্ষুব্ধ, তখন এক মধ্যরাতে গ্রামের নীরবতা চিরে বেজে ওঠে তাঁত চালাবার খটখট আওয়াজ। নিজের কাজ করতে না-পারার হাতে-পায়ে খিল ধরার দশা হয়েছে, শুধু শরীরের জড়তা নয়, কর্মহীনতার মানসিক চাপ কাটাতেই সুতা ছাড়াই সে তাঁত চালাতে বসেছে। শ্রমজীবীর কাজের মধ্যেই তার প্রেরণাকে তুলে ধরে তার শক্তির দিকেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে যা খেয়াল করি তা হল এই যে, সূতা লোপাটকারী বিত্তবানদের বিরুদ্ধে গ্রামের সব তাঁতির সমবেত ক্রোধই তার সৃজনশীলতার প্রধান প্রেরণা।
কিন্তু মধ্যবিত্তের বেলায় কী হবে? শোষণের প্রক্রিয়ায় সচেতনভাবে হোক আর ইচ্ছানিরপেক্ষভাবেই হোক, মধ্যবিত্তের একটা ভূমিকা থাকেই। অবচেতনভাবে এই ভূমিকা পালন করতে করতে সৃষ্টিশীলতার শক্তি তার লোপ পায়। তার মেধা প্রয়োগ করতে হয় সমাজে বা পরিবারে নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে, এজন্য তাকে নিত্যনতুন ফন্দি আঁটতে হয়। তার বুদ্ধি মানেই ফন্দি, তার উদ্দেশ্যের প্রতিশব্দ হল মতলব। ফন্দিপটু আর মতলববাজ লোক ব্যক্তির কোটর থেকে বেরিয়ে আর মানুষ হতে পারে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরের মধ্যবিত্ত চরিত্রগুলো ফন্দিচর্চা ছেড়ে বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের অধঃপতিত অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করে, সমাজকে বোঝে এবং এর পরিবর্তনের জন্য তাদের মাথাব্যথাও প্রবল। এই শ্রেণীর অনেক তরুণকে দেখি যারা নিজের পরিবার ও শ্রেণীর ‘মূল্যবোধ’ ও ‘নীতি’তে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। প্রথম পর্বের মধ্যবিত্ত চরিত্রের দমবদ্ধ হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা এখানে এসে পরিণত হয়েছে অনাস্থা ও বিরক্তিতে। কারও কারও ভেতর এই অবস্থা উঠে এসেছে ক্রোধে। এখন এই ক্রোধকে সমাজ ব্যবস্থা পালটাবার সংকল্পে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা তাদের কতটা?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পর্বের একটি উপন্যাসে প্রতিষ্ঠিত, সচ্ছল ও প্রতিপত্তিশালী পরিবারের একটি তরুণ ঐ ধরনের লোকের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। মাতৃহীন এই ছেলেটি মধ্যবিত্ত পরিবারিক জীবনে মোটেই স্বস্তি পায় না, ভালোবাসার নামে তরল ভাবালুতা এবং স্নেহের বন্ধনের নামে পুরুষমানুষকে চিরশিশু করে রাখার প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে সে প্রত্যাখ্যান করে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের চেয়ে সে বরং আরাম পায় একেবারে নিম্নবিত্ত অস্পৃশ্যদের অকপট ও বেপরোয়া আড্ডায়। এদিকে দেশের পরাধীনতাও তার কাছে অসহ্য, সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য সে উদগ্রীব। কিন্তু ঐ দল তার ওপর আস্থা রাখতে পারে না। দলের শক্ত শৃঙ্খলায় বাঁধা পড়তে তার অনিচ্ছা এর আপাতকারণ হলেও সন্ত্রাসবাদীদের স্যাঁতসেঁতে সনাতন ভারতীয়ত্ব, উদ্ভট ভারতীয় রহস্যময়তার প্রতি ঘিনঘিনে ভক্তিভাব প্রভৃতির প্রতি ঐ তরুণের ঘৃণাই তার সঙ্গে তার সহ-অবস্থানের প্রধান বাধা। অস্পৃশ্য নিম্নবিত্তের মদের আসরে তার আড্ডা দেওয়া কিংবা নিষিদ্ধ এলাকায় তার আসা-যাওয়া ভক্তিরসে টইটম্বুর সন্ত্রাসবাদীদের শুচিবায়ু স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না।
কিন্তু তারপর? এই সাহসী ও সংস্কারমুক্ত ছেলেটি কি শেষ পর্যন্ত নিজের কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে পারল? তার সাহস, বেপরোয়া স্বভাব, প্রতিষ্ঠিত সংস্কারকে অবহেলা করা—এসবের উৎস হল তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। মধ্যবিত্তের পঙ্গু কিংবা স্বাভাবিক পরিণতিই তাকে এই স্বাতন্ত্র্যবোধ উপহার দিয়েছে, যেখান থেকে এই আলো সে ধার করেছে তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে কোন সাহসে? তাকে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে হয় পারিবারিক রক্তের স্রোতে; অসুস্থ হয়ে সুন্দরী মামির সেবা নিয়ে নিজের অজান্তেই সে সেবা করে মামির অবদমিত কামনাকে।
চরিত্রে শক্তি এবং স্বভাবে সামঞ্জস্য পাই বরং তার চাষি-বন্ধুর মধ্যে। ভদ্দরলোকের ছেলেদের সঙ্গে স্কুলে পড়েও তার জাতের স্বভাব সে হারায়নি। মধ্যবিত্তের ঘোরতর ব্যক্তিবাদ থেকে সে আজন্ম যুক্ত। যেসব স্যাঁতসেঁতে আবেগ ঝেড়ে ফেলতে মধ্যবিত্তের বিদ্রোহী সন্তানকে মুণ্ডু ঝাঁকাতে হয়, সেগুলো তাকে মোটে স্পর্শই করেনি। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য তার নেই, তার আছে গোঁয়ার্তুমি। এই গোঁয়ার্তুমি তাকে তার সমাজের আর দশজন থেকে বিচ্ছিন্ন তো করেই না; বরং তাদের দূর্বলতা ও অসঙ্গতি চিহ্নিত করতে তাকে সাহায্য করে। তার একান্ত নিজের স্বার্থ আর পারিবারিক স্বার্থ আর তার সমাজের স্বার্থে কোনো ফারাক নেই, কোথাও রুখে দাঁড়ালে সে নিজের স্বার্থেই দাঁড়াবে, ঐ স্বার্থ ও তার নিজের সমাজের স্বার্থ অভিন্ন। তার শক্তির প্রকাশে, এমনকী সম্ভাবনাতেও রাজনীতিসচেতন মধ্যবিত্ত ভদ্দরলোকের চেয়ে সম্পূর্ণ মানুষ হিসাবে তার আসন অনেক পোক্ত। কিন্তু এই যোগ্যতা দিয়ে গোটা দেশের সমাজ -পরিচালনা কী সেটা ভাঙার দায়িত্ব কি সে পায়? কিংবা সেই দায়িত্ব তার আসছে এমন কোনো আভাস কি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠককে দিতে পারেন?
এই প্রশ্ন তাঁর শেষ পর্বের গোটা শিল্পকর্ম সম্বন্ধেই করা যায়। প্রথম পর্বের মতো এখানেও তাঁর সব লেখাই পরিকল্পনাপ্রসূত। যান্ত্রিক কিংবা ছককাটা গল্প নয়, কিন্তু স্কিম ধরে কাজ করার অভ্যাস তাঁর শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ঘটনা কী কাহিনীতে প্রধান গুরুত্ব না-দিয়েও এবং চরিত্রসৃষ্টির দিকে বিশেষ মনোযোগ না থাকলেও গভীর বোধ ও তীব্র অনুভূতির কারণে তাঁর লেখা কখনোই শিথিল নয়, পরিণতি যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু, দ্বিতীয় পর্বের লেখায় তাঁর উপলব্ধি ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে কাহিনীর ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও সামঞ্জস্য অখণ্ড স্রোতোধারায় প্রবাহিত হয় না। প্রায়ই কাহিনীকে উপচে ওঠে তাঁর সিদ্ধান্ত, চরিত্রের বুদ্ধি সমাজের স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। প্রথম পর্বের রচনায় সমাজব্যবস্থার রাক্ষুসে হাঁয়ের ভেতর রুগ্ণ ও হাঁসফাঁসকরা ব্যক্তিকে দেখে বিচলিত পাঠককে তিনি পরের পর্বের রচনায় ঐ সমাজভাঙার স্বপ্ন কিন্তু দেখাতে পারেন না। বিচ্ছিন্ন মানুষ যেমন তার সমস্ত ক্ষুদ্রতা ও গ্লানি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেছে, ভাগ্য পরিবর্তনের সংকল্পে উদ্বুদ্ধ মানুষ কিন্তু তার মাথা তুলে দাঁড়াবার প্রেরণা সেভাবে পায় না।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা হলে কী করতে পারতেন? সাহিত্যের পণ্ডিত সমালোচকদের জন্য এর জবাব দেওয়া সোজা, কারণ শিল্পীর দায়িত্ববোধ ও তাগিদ থেকে তাঁরা মুক্ত এবং সাধারণ পাঠকের বুদ্ধি-বিবেচনাকে তাঁরা আমল দেন না। তাঁদের রেডিমেড রায় হল : মার্কসবাদকে গ্রহণ না করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের অন্ধকার ভেতরটা অনুসন্ধানে নিয়োজিত থাকলেই ভালো করতেন। তো, এতে কী হতো? ব্যক্তির ক্ষয় ও রোগনির্ণয়ের ক্ষমতা বাড়তে বাড়তে রূপ নিত বিশেষজ্ঞের দক্ষতায় এবং এই দক্ষতা তাঁকে বঞ্চিত করত মানুষকে সামগ্রিকভাবে দেখার শক্তি থেকে। দক্ষ বিশেষজ্ঞ হওয়ার দশা থেকে তিনি রক্ষা পেয়েছেন শিল্পী হিসাবে গভীর অন্তর্দৃষ্টির বলে। অন্তর্দৃষ্টি কোনো অলৌকিক উপহার নয়, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি সৃষ্টির প্রধান উপাদান হল ক্রোধ। প্রথম পর্বের শিল্পচর্চাতেও তিনি নিরপেক্ষ নন, মানুষকে গভীরভাবে ও ব্যাপকভাবে খুঁড়তে খুঁড়তেই তাঁর ক্ষোভ দানা বাঁধে ক্রোধে। সমাজব্যবস্থাকে মানুষের রোগের কারণ জেনে তাঁর ক্রোধ বর্ষিত হয় ঐ ব্যবস্থার ওপর। ব্যবস্থাটির বিনাশের সংকল্প থেকেই তিনি মার্কসবাদ গ্রহণ করেন। এর সঙ্গে তাঁর প্রথম পর্বের শিল্পচর্চার বিরোধ কোথায়? মানুষের প্রতিরোধের শক্তিকে তিনি পাঠককে অনুভব করাতে পারলেন না কেন? তা হলে কি বলতে হবে যে, মার্কসবাদ তাঁর স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায়নি? অনেকদিন থেকেই তা-ই বলা হচ্ছে বটে। কিন্তু, তাঁর প্রথম পর্বের রচনাতেও মধ্যবিত্ত-সংস্কার, ক্ষুদ্রতা, ভক্তিভাব ও শোচনীয় সীমাবদ্ধতাকে খুলে ফেলার বিশ্লেষণও তো মার্কসবাদী প্রবণতাই। এভাবে দেখতে দেখতে পরিবর্তনের তাগিদ বোধ করলে মার্কসবাদী হওয়া ছাড়া তিনি আর কী করতে পারেন?
মার্কসবাদ গ্রহণের পর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর যা করতে পারতেন তা হল এই : তাঁর সমকালীন ও পরবর্তী অনেক বামপন্থি লেখকের মতো ইচ্ছাপূরণের গল্পো ফাঁদা। জঙ্গি মজুরদের দিয়ে মালিককে ঘায়েল করে গোটা কয়েক লাল সূর্য উঠিয়ে তিনি নিরাপদে বিপ্লবের জয়ধ্বনি করতেন। দেশে বিক্ষোভ থাকলেও রাজনীতিতে প্রতিরোধের সংকল্প গভীর ও ব্যাপক না-হলে সাহিত্যে তার রঙিন ছবি আঁকা ভাঁওতা দেওয়া ছাড়া আর কী? এই ভাঁওতাবাজি হল বিপ্লববিরোধী তৎপরতা। বিপ্লবের মাধ্যমে সভ্যতার ফসলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে মার্কসবাদ। এই দর্শনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তা হলে তাঁর শিল্পকর্মে পাঠককে সেই তাপ দিতে পারলেন না কেন যা বিপ্লবের স্বপ্নকে ইন্ধন জোগায়?
ঐ আগুনের তাপ বোঝার প্রধান শর্ত হল সমাজে সেই রাজনীতির আঁচ থাকা। এই আঁচের প্রধান উৎস হল রাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক দল থাকে বুর্জোয়াব্যবস্থার ভেতরেই। কিন্তু বুর্জোয়াব্যবস্থাকে উৎখাত করাই এর লক্ষ্য। এই দল সামাজিক সংস্কারের জন্য আন্দোলন করে না; সমাজকাঠামোর বিলোপসাধন করে নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে অভিন্ন আর্থিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রায় নিয়ে সবাইকে পরিপূর্ণ মানুষের মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কসবাদী দর্শনের সৃজনশীল প্রয়োগ ঘটায়। মার্কসবাদকে কেবল তত্ত্ব হিসাবে নিলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে বিষয়টিকে প্রাঞ্জল করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। কিন্তু মার্কসবাদ তাঁর কাছে বিদ্যাচর্চার বিষয় নয়; এটি তাঁর কাছে মানুষের দুরারোগ্য রোগনিরাময়ের উপায়, মানুষের মানুষ হওয়ার হাতিয়ার। উপন্যাসে কোনো দর্শন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, চরিত্র ও কাহিনী এবং মানুষের জীবন ও তার বিশ্লেষণেই তার বিকাশ ঘটে। সমকালীন রাজনীতিতে সেই দর্শনের চর্চা এমনভাবে থাকে যাতে তা সামাজিক স্বভাবের অন্তর্গত হয়।
রাজনীতির নেতৃত্ব মধ্যবিত্তের হাতে, রাজনীতিতে নিয়োজিত কিংবা রাজনীতি চেতন মধ্যবিত্তের সবাই যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হবে এরও কোনো মানে নেই। কিংবা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মধ্যবিত্ত কর্মী কী নেতা যে বাড়িঘর ছেড়ে বস্তিতে গিয়ে ঠাঁই নেবে অথবা তারা সব গরিব দেখে দেখে বিয়ে করবে— একথা ভাবা হাস্যকার। কিন্তু এই রাজনীতির চর্চা মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশে নতুন ভাবনা তৈরি করবে এবং সংস্কৃতিতে এর প্রভাব ফেলবে। এর লক্ষণ তো দেখা গিয়েছিল। কমুনিস্টদের তৎপরতাই তো প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠন কংগ্রেস, এমনকী মুসলিম লীগের ছোট অংশের মধ্যে হলেও একটুখানি তোলপাড় তুলেছিল। কিন্তু সেটা টিকল কোথায়? ব্যাপক সামাজিক প্রভাব ফেলার আগেই সেটা একেবারে মিইয়ে গেল।
ছাত্রদের যে-অংশটি সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল তারা বড় হয়ে কর্মজীবনে ঢুকতে-না-ঢুকতে রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তেভাগার চাষিদের রক্ত কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতার মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পরিণত হল গোলাপি আভার মিষ্টি উত্তেজনায়। ওদিকে কংগ্রেসের সামন্তদাস আপোসকামী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রধান শক্তি সুভাষচন্দ্র বসু সাম্রাজ্যবাদ ঠেকাতে চলে গেলেন ফ্যাসিবাদের ঢালের আড়ালে। কংগ্রেসের প্রগতিশীল অংশের নেতা বলে পরিচিত তখন জওয়াহরলাল নেহরু। ভারতীয় রাজনীতির হ্যামলেট এলাহাবাদের এই রাজপুত্র সমাজতন্ত্রের আবেগে মাতোয়ারা, আবার যথাসমেয় গান্ধির সামন্ত চরণপ্রান্তে নতমুণ্ডু। তাঁর সমাজবাদের বুলিতে কমিউনিস্টরা অভিভূত। ওদিকে ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার নাম করে ইংরেজবিরোধিতা স্থগিত রাখার জন্য কমিউনিস্টদের সিদ্ধান্ত কি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য? সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের প্রধান শত্রুকে রেয়াত দেওয়া কি আন্তর্জাতিকতাবাদের বিলাসিতা ভোগ করা নয়। এই বিলাসিতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পোষায় না। তাঁর উপন্যাসের একটি চরিত্র কমিউনিস্টদের ঐ মনোভাবকে ধিক্কার দেয় ‘রুশপনা’ বলে। যে-রাজনীতির সঙ্গে তিনি জড়িত, তারই প্রবক্তাদের সম্বন্ধে তাঁর এই ধারণা থাকলে ঐ রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ উপন্যাসের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ হয় কীভাবে?
১৯৩৪ সালে লন্ডন প্রবাসী ভারতীয় লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা যে-প্রগতিশীল সংগঠন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঐ দশকের শেষে এবং চল্লিশের দশকে এই দেশে তার বিকাশ ঘটতে থাকে। ঐ সংগঠনের কার্যক্রম এখন পর্যন্ত আমাদের প্রশংসা পেয়ে আসছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী শিল্পী ও লেখকদের এই সংগঠন গোটা দেশজুড়ে উদ্দীপনামূলক নাটক ও সংগীতচর্চার যে-ব্যাপক আয়োজন করে এখন পর্যন্ত তা অতুলনীয়। কিন্তু, কিছুদিনের মধ্যেই তার সাফল্য স্নান হয়ে আসে এবং মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিতেও তার প্রভাব প্রায় মুছে যায়। প্রগতি লেখক সংঘের সশ্রদ্ধ উল্লেখ এবং সংস্কৃতিক্ষেত্রে তার প্রভাব কিন্তু সমার্থক নয়। ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার সঙ্গে সমাজবাদের প্রতিষ্ঠার বক্তব্যও তাঁদের শিল্পচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার কারণে সেখানে ঠাঁই দিতে হয়েছে অনেককে, ফলে ছাড়ও কম দিতে হয়নি। দেখতে দেখতে শ্রেণীসংগ্রামকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠল কেবলই ভালো সমাজগড়ার নিরাপদ বাসনা। সেখানে কে না ছিলেন? গান্ধির অহিংস ও হিংস্র অনুসারী, তাঁর হিংসুটে বিরোধী লোকজন, মুসলিম লীগের অপেক্ষাকৃত উদার অংশের সঙ্গে জুটেছিলেন ঐ সংগঠনের জেহাদি ও তৌহিদি সমর্থকগণ। এটা তখনকার কমিউনিস্ট নেতৃত্বের মনোভাবেরই প্রতিফলন। জওয়াহরলালের প্রকৃতিতে সমাজবাদের উপাদান পাওয়া, পাকিস্তান দাবিতে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা আবিষ্কার করা—সব কি ঘোরতর স্ববিরোধিতা নয়? ওটাও ভালো, এটাও ভালো, ‘সস্তা ভালো, দামিও ভালো, তুমিও ভালো, আমিও ভালো’ — সবাইকে ভালো ভাবার জন্য হন্যে হয়ে ওঠে যারা তাদের জন্য ‘সবার চাইতে ভালো পাউরুটি আর ঝোলাগুড় এই সহাবস্থানের ইচ্ছার উৎস হল দায়িত্বকে ঝামেলা ভেবে তাই এড়াবার প্রবণতা। এইসব মিষ্টি মিষ্টি ভালোবাসার কারণ হল সমাজতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেও বিপ্লবের ধাক্কা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার লোভ।
ফল কী হয়েছে? জওয়াহরলালকে সমাজবাদী বলে যারা পুলকিত তাঁর কাছে তারা জিনজার গ্রুপের বেশি দাম পায় না। আদার একটুখানি ঝাঁঝ ছড়ানো ছাড়া কমিউনিষ্টরা আরকিছু করতে পারে বলে তিনি গণ্য করেন না। সবাইকে একদেহে লীন করার কমিউনিস্টদের উদ্যোগে সবচেয়ে ক্ষতি হল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের। এবং প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কমিউনিস্টদের শ্রমিক আন্দোলন ও তেভাগা অন্য দলগুলোর ভেতরেও প্রগতিশীল ভাবনার আলো ফেলতে শুরু করেছিল, সেই ভাবনা ক্রমেই পিছিয়ে যেতে শুরু করল। মুসলিম লীগের মতো সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও যে একটি অংশ সামন্ত-প্রভুদের কোণঠাসা করার আয়োজন করেছিলেন, চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি এসে তাঁদের সমস্ত শ্রমের ফল ভোগ করতে লাগলেন বিত্তবান প্রায়-বুর্জোয়া নেতারা এবং আরও কিছুদিন যেতে না-যেতেই সবাইকে উৎখাত করে দল কবজা করে ফেলে সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তিতে নিয়োজিত সামন্ত-প্রভুরা। মুসলমান তরুণ বুদ্ধিজীবীদের যাঁরা সমাজবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন তাঁদের অনেকেই পাকিস্তান দাবিকে সমর্থন করতে লাগলেন। পাকিস্তান হওয়ার কয়েক বছর আগেই ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ গঠিত হল, এঁদের সাহিত্যচর্চা অবশ্যই বাংলা ভাষায়, কিন্তু নিজেদের ঐতিহ্যভাবনার এঁরা বিভ্রান্ত। প্রতিভাবান মুসলমান কবি ইসলামি ঐতিহ্যের অনুসন্ধানে টু মারলেন মধ্যপ্রাচ্যের পুরাণে যার চরিত্রের অনেকেই অমুসলমান। নিজেদের মুসলমান-পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য এঁদের উৎসাহ কখনো কখনো উন্মাদনার ধার ঘেঁষে গেছে। এমন মুসলমান কলেজ-শিক্ষকের কথা শুনেছি যিনি তাঁর প্রিয় ছাত্রের মার্কসবাদে আস্থা কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে না-পেরে শেষ পর্যন্ত মিনতি করেন ‘কমিউনিস্ট যখন হবেই তো মুসলমান কমিউনিস্ট হয়ো’।
কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক আন্দোলন স্তিমিত হতে-না-হতে কংগ্রেসের সনাতন ভারতীয়ত্ব ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সাম্প্রদায়িকতা হিন্দু মধ্যবিত্তকে এতটাই আচ্ছন্ন করে যে, দেশভাগের সময় বাংলাকে অখণ্ড রাখার দুর্বল উদ্যোগটিকে তারা রোধ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে। বাংলার বুদ্ধিজীবীদের কেউ-কেউ পর্যবসিত হলেন শুধুই হিন্দুতে, মুসলমান বাঙালির সঙ্গে বসবাস করা তাঁদের রুচিতে বাধল। পাকিস্তান-বিরোধিতা করতে গিয়ে মুসলমানদের জীবনযাপন, তাদের পারিবারিক প্রথা, মুসলমান নাম প্রভৃতি নিয়ে এমন সব ঠাট্টাবিদ্রূপ করতে লাগলেন যেখানে ন্যূনতম রুচির পরিচয় নেই। জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার দীর্ঘকাল ধরে একই জাতির একটি প্রধান সম্প্রদায় সম্বন্ধে যে-ইতর মনোভাবের সৃষ্টি করেছিল তা থেকে হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্ত রেহাই পায় কী করে? এর পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় দৈনিক আজাদ বাংলার মুসলমানদের মধ্যে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দেওয়া, পশ্চাৎপদ মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে এই জনপ্রিয় পত্রিকার ভূমিকা অসাধারণ। এত করেও নজরুল ইসলামকে হটানো গেল না। মুসলমান মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে তখন জিন্নাহ্ ও নজরুলের উদ্ভট সহ অবস্থান।
মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি এই অবস্থায় কোন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে? হিন্দুদের বিশুদ্ধ হিন্দু এবং মুসলমানদের সাচ্চা মুসলমান থাকার উসকানি দিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলেন গান্ধি। তাঁর ভক্ত এবং শত্রু সবাই তাঁর এই আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁর দ্বিতীয় পর্বের উপন্যাস লিখছেন, বিশেষ করে শেষের দিকে, দেশ জুড়ে তখন শুধু হিন্দু আর শুধু মুসলমান, মানুষ পাওয়া ভার। তখন সুস্থ থাকতে পারেন কেবল কমিউনিস্টরা; সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা, দেশবাসীর কাছে প্রকৃত শত্রুকে শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দায়িত্ব পালন করার কথা তো তাঁদের। অথচ সাম্প্রদায়িকতার মোকাবেলা করতে তাঁরা হাঁক ছাড়লেন, ‘গান্ধি-জিন্নাহ্ এক হও’। তাঁরা ঐক্য চাইলেন দুটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির। গান্ধি-জিন্নাহ্র ঐক্যে মানুষের লাভ কী? এই দুটোই তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের লেজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। নিজের সংগঠনের এই ‘দাবি’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিবেচনা করেন আবদার বলে এবং ঐ সময়ের পটভূমিতে লেখা একটি উপন্যাসে কমিউনিস্ট কর্মীর মুখ দিয়ে নিজের কথা জানান, গান্ধি ও জিন্নাহ্র ঐক্য চেয়ে তাঁরা জনসাধারণের স্বার্থ নষ্ট করেছেন।
অথচ দল থেকে তিনি বেরিয়ে আসেননি, এমনকী কমিউনিস্ট পার্টির জন্য মনের টান জীবনের শেষ পর্যন্ত অনুভব করেছেন। প্রবল দারিদ্র্যে জীবনযাপন করলেন, সপরিবারে কষ্ট করলেন, মৃত্যু হল প্রায় বিনা চিকিৎসায়। নিজের শরীরের ওপর যতভাবে সম্ভব অত্যাচার চালিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যেও চোখে পড়ে তাঁর অসাধারণ দায়িত্ববোধ। বড়লোক ভাইদের ওপর নির্ভর না-করে বৃদ্ধ পিতাকে রেখেছেন নিজের সঙ্গে। কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ না-করাটাও তাঁর দায়িত্ববোধেরই আরেকটি প্রকাশ। দলের নীতি নির্ধারণ করার অবস্থান তাঁর কখনোই ছিল না, আশা করেছিলেন যে এদের দিয়েই সমাজের পরিবর্তনসাধন সম্ভব হবে। এই আশাটুকু না-থাকলে তাঁকে আগেই আত্মহত্যা করতে হতো।
অন্যদিকে, এই দল মধ্যবিত্তের ভেতর স্বপ্ন ও সংকল্প সৃষ্টি না করে বরং মধ্যবিত্তের সংস্কারে পরিচালিত হয়েছে। কংগ্রেসে ও মুসলিম লীগের মধ্যে ঐক্য কামনা করে তাঁরা চরম মূর্খতার পরিচয় দেন। শ্রেণীসংগ্রামের লক্ষ্য তাঁদের বিবেচনায় না-থাকার ফলেই এরকম উদ্ভট কথা তাঁদের মনে হয়েছে।
সাম্প্রদায়িকতার কথা যদি ছেড়েই দিই তো মধ্যবিত্তের মানসিকতাটি তখন কোন পর্যায়ে? যারা অসাম্প্রদায়িক তারাই-বা কোন মনোবৃত্তির অধিকারী? কোটি কোটি চাষির প্রাণান্ত শ্রমের ফসলে মধ্যবিত্তের মুখের গ্রাস জোটে। ঐ ভাত খেয়ে তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যায়, পড়তে পড়তে কেউ-কেউ মার্কসবাদীও হয়। কিন্তু ঐ চাষা থাকে না-খেয়ে, তার ছেলের অক্ষরজ্ঞান হয় না, অন্ন খুঁজতে শহরে এসে বস্তিতে বাঁচে কুকুর বিড়ালের মতো। এ নিয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বুকের ছোট্টো কোনো কোণেও অপরাধবোধের একটুখানি কাঁটাও তো বেঁধে না। স্তালিনের হাতে ফ্যাসিবাদের পতন হওয়ায় সভ্যতার বিপর্যয় রোধ হল। খুব ভালো, সবাই খুশি। কিন্তু ফ্যাসিবাদের প্রাচীনতম ও ইতরতম চেহারা ভারতীয় বর্ণপ্রথায় তো চিড় ধরে না। বিয়েতে পণ নেওয়া অব্যাহত থাকে, তরুণী-বিধবার বৈধব্যের আগুনকে আলো বলে ঠাহর করার অভ্যাস চল্লিশের দশকেও লোপ পায়নি।
প্রথম পর্বের রচনায় সেই সময়ের রাজনীতি, সামাজিক অনাচার, আদর্শের ছলে বিচিত্র সব সংস্কারের উদ্ভট সহ অবস্থান সামনে না এনেও এসবের শিকার রুগ্ণ ব্যক্তিটিকে যথামাত্রায় তুলে ধরেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের ক্ষয়কে উন্মোচন করে পাঠককে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই ক্ষয়ের নিরাময়ের সংকল্প খুঁজতে গেলেন যেখানে সেখানে তখনও ঐ অবক্ষয় অব্যাহত রয়েছে। বিদেশি শাসনের অবসান ঘটছে, সেখানে বিপুল ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। শ্রমজীবী লড়াইতে নেমেছে, লড়াইয়ের নেতৃত্ব যাদের হাতে তারা ঐ হাতই মেলাতে চায় ভক্তিবাদীদের সঙ্গে। যুদ্ধে ফ্যাসিবাদীরা হেরে গেছে, কিন্তু দেশের বিশাল সমাজে ফ্যাসিবাদের কদর্য রূপের চর্চায় বিরতি পড়েনি। দুর্ভিক্ষে মুনাফা লোটে যারা, ক্ষমতায় আসে তারাই। নতুন রাজনীতির রোগা ধারাটি মধ্যবিত্তের যে-পরিবর্তনটুকু এনেছে সেখানেও নতুন ধরনের উদ্ভট সহ-অবস্থান।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্ন যদি কোথাও থাকে তো তা পাওয়া যায় কেবল নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর জীবনে। উচ্চবিত্ত ও নানা কিসিমের মধ্যবিত্তের লাথিঝাঁটা খেয়ে তাদের খাওয়াপরার সংস্থান করে এবং নিজেরা না-খেয়ে, উচ্চবর্ণের কাছে জানোয়ারের অধম হয়ে থেকে এবং দফায় দফায় ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েও তারা যে বাঁচে এবং বাঁচার জন্য আরও অনেকের জন্ম দেয়, তা কেবল বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছার বলেই সম্ভব হচ্ছে। এরাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রদ্ধার পাত্র, এরা তাঁর উপন্যাসের বিষয়ও হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন-রূপায়ণের কাজে নিয়োজিত রয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারের রাজনৈতিক কর্মী। এই কর্মীও শ্রমজীবীর কাছে অনেক শেখে, প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করার শক্তি পায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত কোটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ন্যূনতম সাংস্কৃতিক পরিবেশ সে পায় না। যে-সংস্কৃতির ভেতর সে বড় হয়েছে সেটাকে অস্বীকার করতে করতেই তো তার শক্তির অনেকটা নষ্ট হয়। বিভ্রম কাটাতে, ধোঁয়ারি সারাতে যার সময় যায়, স্বপ্ন দেখবে সে কখন? আর সেই স্বপ্ন ও রূপায়ণ তো আরও অসম্ভব কাজ।
উপন্যাস কাজ করে ঘোরতর বর্তমানের ভেতর। আদিম মানুষের সঙ্গে হিংস্র জানোয়ারের লড়াই নিয়ে গল্প লিখলেও লেখককে দাঁড়াতে হয় বর্তমানের এবড়োথেবড়ো ডাঙায়। রূপকথা, কেচ্ছা, ফ্যান্টাসি তো উপন্যাসে থাকতেই পারে, অনেকের লেখায় বেশ অনেকটা জুড়েই থাকে; কিন্তু এগুলো ব্যবহৃত হয় বর্তমানকে তাৎপর্যময় করার লক্ষ্যে। যে-মধ্যবিত্ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নকে মানুষের স্বপ্নে রূপায়ণের দায়িত্ব নেয় সেই লোকটির আবেগ স্বতঃস্ফূর্ত, সততায় ফাঁক নেই এবং তার নিষ্ঠা নিরঙ্কুশ। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ায় তার অপরাধবোধ দিনদিন প্রকট হয়, এর সঙ্গে মেশে ক্ষোভ ও বেদনা, এগুলোকে সে গড়ে তোলে ক্রোধে। তার সংস্কৃতির মান উন্নত বলেই সে নতুন পথের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু তখন গোটা সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বোধ একেবারেই অন্যরকম। তাকে এগুতে হয় পদেপদে বিশ্লেষণ করতে করতে। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে হয় স্বয়ং লেখককে। লেখক তার হাত না ধরলে তো সে পড়ে যাবে। চরিত্র তাই রক্তশূন্যতায় ভোগে, তার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ আর হয় না, পাঠকের সঙ্গে লেখকের যোগাযোগ হয় শিথিল।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্ন তাই শেষ পর্যন্ত সামাজিক সংকল্প হয়ে ফোটে না। এই কথাটি চেপে গেলে বাংলা কথাসাহিত্যের সবচেয়ে তাৎপর্যময় শিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের খুব বড় মাপটিকেও অস্বীকার করা হয়।
