কাঞ্চন-মূল্য – ১০
১০
একটু চুপ করল স্বরূপ; এবার কলকের দিকে লক্ষ্যও নেই, মনটা যেন কোথায় চলে গেছে! আমিই হুঁকোটা কাৎ ক’রে বললাম— ‘দু’টান না হয় দিয়ে নেবে?”
‘তা দিন’—বলে কলকেটা তুলে নিলে। কয়েকবার টানতে এবার চোখ দুটো যেন একটু চকচক করে উঠল, হুঁকোর মাথায় বসিয়ে দিয়ে বললে- ‘এবারেরটা বড্ড কড়া দিয়েচে পীতাম্বর, আমার চোখেই জল বের করে ছাড়লে।…হ্যাঁ, কোনখেনটায় যেন বলছিলুম?’
বললাম—‘তোমার দিদিমণিকে জানিয়ে দিলে, মাদুলিটা বাড়িতেই আচে, ব্রেজঠাকরুন নিজে কাছে রেখে টাকাটা দিয়েছেন।’
‘হ্যাঁ, সেই সঙ্গে বলেচে ফুরিয়ে গেলে আরও দেবে। ব্রেজঠাকরুন সব নিয়ে ট্যাকা পনেরর কথা বলেছেল, আমি ওটাকে পঁচিশ ট্যাকা করে দিলুম, মনে করলুম খানিকটা বাড়িয়ে বললে বুকে একটু বল পাবে’খন দিদিমণি। বললুম পঁচিশটা ট্যাকা দেবে বলেছে।’
দিনকতক চলল। লুচির থালায় লাথি মারা থেকে দিদিমণি আরও সাবধান হয়ে গেছে, দু’দিনের খরচটা টেনেবুনে তিনদিন পজ্জন্ত নে যায়, তাতেও হাত খালি হয়ে গেলে আমি ব্রেজঠাকরুনের কাছ থেকে ট্যাকা এনে দিই, দুঃখের সংসার চলে যায় একরকম ক’রে; কিন্তু এইসময় হঠাৎ যেন চারিদিক থেকে বেড়া আগুনে ঘেরে ফেললে।
আজ্ঞে বেড়া আগুন বৈকি। গা নাড়া দিয়ে কিছুই করছেল না বাবাঠাকুর—সংসার যে কি ক’রে চলচে ঘুরেও একবারটি জিগ্যেস করে না, তবু উরই মধ্যে দুদিন অন্তর, পাঁচদিন অন্তর এর ব্রতটুকু ওর পাব্বনটুকু সেরে আলোচালটা কলাটা যা কিছু পাচ্ছেল, অভাবের সংসারে হপ্তার মধ্যে দু’টো দিনেরও তাতে একটু সুসার হচ্ছিল, তা সেটুকু তো বন্ধ হয়ে গেলই, তার সঙ্গে একটা বড় আশায় ছাই পড়ল।
দয়াল চাটুজ্জে ত্যাখন গাঁয়ে সব চেয়ে বড় লোক। অবিশ্যি রায়চৌধুরীদের বোলবোলাও কোথায় পাবে?—তারা হোল গাঁয়ের রাজা, তবে সবাই বলত নগত ট্যাকার দিক দিয়ে রায়চৌধুরীদের দশ-আনি-ছ’আনি দুটো ঘরকেই কিনে নিতে পারে। সেই দয়াল চাটুজ্জের মা শয্যে নিলে! বয়েস চারকুড়ি পেরিয়ে গেচে, অসুখটাও কি যেন শক্ত অসুখ, এটা বেশ বোঝা গেল যে আর নয়, বুড়ির ভোগ শেষ হয়েচে, এবার খরচের খাতায় উঠল।
নিজে ত্যাখন জন্মাইনি তো, দেখব কোথা থেকে, শোনা কথা, দয়াল চাটুজ্জে নাকি গোড়ায় ছেল বাবাঠাকুরের ছাত্র। গরিবের ছেলে, ইংরিজি ইস্কুলে দেবার ক্ষ্যামতা নেই, বাপ হরমাধব ছেলেকে বাবাঠাকুরের টোলেই পাঠিয়ে দিলে। চৌকশ ছেলে, কিন্তু আগেই বলেচি বিপদ হচ্ছে বাবাঠাকুরের বিদ্যেটা ন্যায়ের নামে যতরকম অন্যায় তো, ছাত্র যত চৌকশ হবে ততই ভয়ের কথা। এটা কেন হবে না? এতে কি দোষ আচে? ওতে কি ফায়দা? —কোথায় দু’পাতা শিখবে, না, উল্ট উৎপত্তি হয়ে পড়ে। কি থেকে কি হোল, অতটা ভেতরের কথা জানিনে দা’ঠাকুর,—তবে খানিক বড় হয়ে উঠলে বাড়িতে বনিবনাও না হওয়ার জন্যেই হোক বা কারুর খপ্পরে পড়েই হোক, দয়াল চাটুজ্জে একদিন কাউকে বলা নয়, হঠাৎ অন্তদ্ধান হোল। আর সব ছেলেও তো পড়েচে বাবাঠাকুরের কাছে, তবে দয়াল চাটুজ্জে যেমন চৌকশ, ন্যায় পড়ে সেই পরিমাণেই বিগড়েচে তো, হরমাধবও বললেন— ‘বেটা যেমন কুলাঙ্গার হয়ে উঠছেল, ও আপদ গেছে।’
আর খোঁজ নেই দয়াল চাটুজ্জের-গুজব রটে মাঝে মাঝে, কেউ বলে বেম্মো হয়ে গেছে, কেউ বলে কেরেস্তান হয়ে মেম বিয়ে করেচে, নানান রকম গুজব, কিন্তু সঠিক অবস্থাটা কি তা টের পাওয়া যায় না। তারপর একেবারে ঠিক পনেরটি বছর বাদ দিয়ে দয়াল চাটুজ্জে বাড়ি এসে উঠল।
হঠাৎ বাপের কাল্ হয়েচে শুনে পনের বছর পরে বাড়ি এয়েচে দয়াল চাটুজ্জে। চেনা যায় না, এই দশাসই চেহারা, সায়েবদের মতন টকটক করচে রং; ক্রেমে শোনা গেল দানসাগর ছেরাদ্দ করবে বাপের। প্রেথমটা গুজব, তারপর সত্যি আয়োজন-উপচারে মসনে গ্রাম একেবারে সরগরম হয়ে উঠল। ক্রেমে আরও সব কথা বেরিয়ে পড়ল, দয়াল চাটুজ্জে কলকাতার এক বড় হৌসের মুৎসুদ্দি, কানাঘুষোতে এও বেরিয়ে পড়ল যে তিনি বাপকে নাকি ট্যাকাও পাটোছেল- কয়েকবারই, তা প্রেত্যেকবারই হরমাধব ঠাকুর ফেরত দেন।…কেন রে বাপু?—ছেলে রোজগার করচে, আর সে সব পুরনো কথা কেন? না, কেউ বলে বেম্মো বিয়ে করেচে, কেউ বলে বিধবা বিয়ে করেছে, কেউ আবার বলে বিয়ে-থা কিচ্ছু নয়, এক নাকি য়িহুদীর খপ্পরে পড়েছে- ট্যাকাকড়িও নাকি তারই। সত্যি মিথ্যে ভগবান জানেন দা’ঠাকুর, তবে বাপের ছেরাদ্দ যা করলে দয়াল চাটুজ্জে তাতে রায়চৌধুরীদের মাথা হেঁট করে দিলে।
তারপর আবার দেখা নেই। তবে বাড়ির সঙ্গে এর পর থেকে একটা যোগাযোগ থেকে গেল, তা সে ভালোরকমই। একরকম কুঁড়েই ছেল, চক মেলানো বাড়ি হোল। বিয়ের কেচ্ছা যাই হোক, নিজের ছেলেমেয়ে নেই, ভাইয়ের ছেলেগুলিকে মানুষ করলে, তাও বেশ ভালো করেই। দুটি মেয়ে, বেশ ঘটা করেই বিয়ে দিলে; তবে সব কিছুই বাইরে বাইরে থেকেই, বিশ বছরের মধ্যে ঐ বিয়ের দুটি দিন মাত্র এসেছেল মসনেতে, ব্যস্।
তারপর বিশ বছর পরে আবার এই মায়ের কাল হবার সময় এল। বাপের ছেরাদ্দ বাবাঠাকুরকে দিয়েই করিয়েছেল, উনিই হচ্চে গুরু, আর যেমন-তেমন গুরু নয়, ওঁরই শাস্ত্ৰ সেই ন্যায়, তাই থেকে অন্যায় আর তাই থেকে ট্যাকা। সোতোরাং মায়ের ছেরাদ্দ যে উনিই করবে তাতে তো আর কারুর সন্দো রইল না, রিদয় ভটায্যি ছোঁ মেরে নেওয়ার জন্যে য্যাতই ঘোঁট পাকিয়ে বেড়াক না কেন। চাটুজ্জে গিন্নি—অর্থাৎ কিনা দয়াল চাটুজ্জের ভাদ্দরবৌ বাবাঠাকুরকে ডাকিয়ে পাঠালেন ক’দিন। বুঝলেন না?—ত্যাখনকার দিনে মিত্যুটাকে লোকে এ ভাবে দেখত না তো। বুড়ো মানুষ, সময় হয়েছে, যাবে, তার আর হয়েছে কি? এখন তো ভবযন্ত্রণা জুড়োলেই ভালো—এই ছেল মনের ভাবটা সবার, তা সে ছেলে-মেয়ে-বৌ, যেই হোক। উদিকে চিকিৎসে-সস্তেন হতে থাকল, আহা, বেঁচে থাক মানুষটো, ইদিকে দানসাগরে কি কি করতে হবে তারও হিসেব চলুক। ওনার উদিকে পিদিম নিবে আসচে, ইদিকে দান-ধ্যান-খরচপত্রের কথাবার্তায় গাঁ আবার সরগরম হ’য়ে উঠল। এখন চাটুজ্জে বাড়ির তো আরও নামডাক, বাপের ছেরাদ্দর চেয়ে মায়ের ছেরাদ্দটা তো আরও ফলাও করে করতে হবে দয়াল চাটুজ্জেকে
নুকুবার কথা তো নয়, ত্যাখনকার দিনে ছেলেমেয়ে বৌ-নাতনী এদেরই যখন এইরকম ভাবওবিশ্যি তেমন বুড়োবুড়ি হয়ে ম’লে—ত্যাখন অন্যেরা আর কত মিচে চোখের জল ফেলবে ক’ন? আমাদের বাড়িতেও উঠল বৈকি কথা, তবে য্যাতটা হয় চেপে। দিদিমণি একদিন বললে—‘এবার ওদিককার দেয়ালটুকুও তুলে দিতে হবে স্বরূপ—দেখিস, আমি নোবই তুলিয়ে বাবাকে দিয়ে।’
–ট্যাকা কোথা থেকে আসচে, সে-সব কিছু নয়।
একদিন ব্রেজঠাকরুন মনের কথাটা একটু স্পষ্ট করেই প্রেকাশ ক’রে ফেললে—‘শুনে রাখ নেতা, আমারও আর বেশিদিন নেই–ঢের হোল, আর কি?-তা জিনিসপত্র যা সব বাড়িতে এসে উঠবে—সব খেয়ে বেচে দিবি নে—দানসাগরের বরাত ক’রে আসিনি তবে গেলে যেটুকু কাজ করবি আমার তিলকাঞ্চন, ষোড়শ! যাই করিস, যেন একটু ভালো ক’রে হয়।’
কি জিনিস, কোথা থেকে আসবে, সে-সব কিছু নয়।
একদিন কি একটা কথার মাথায় বাবাঠাকুর তো রাজীব ঘোষালকে গাল পেড়েই উঠল—ওবিশ্যি বাড়িতে, শুধু আমি আর দিদিমণি রয়েচি; বললে—‘আমি যেন রেজো শালার ভয়েই গেলুম, মুখের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দোব ও-কটা ট্যাকা এবার।’
কোথায় পাবে ট্যাকা, কি বিত্তান্ত, সে-সব কিছু নয়।
এইরকম য্যাখন অবস্থা, এইবার দয়াল চাটুজ্জের মায়ের ছেরাদ্দ কে কোন্ দিকটা গুচিয়ে নেবে গাঁয়ে ঘরে ঘরে তার জল্পনা-কল্পনা চলচে, বুড়িকে অন্তর্জলী করবার জন্যে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়েচে, দু’দিন কেটেও গেচে সেখানে—অবস্থা যখন এইরকম দা’ঠাকুর, সেই সময় হঠাৎ বৈকালের দিকে কলকাতা থেকে নৌকো ক’রে দয়াল চাটুজ্জে এসে হাজির। তানার কাছে লোক গেছল, তবে মুৎসুদ্দির কাজ, তিনি ক’দিনের জন্যে বাইরে চলে গেছল, সেইদিন হঠাৎ এসে উপস্থিত। গাঁয়ে এসে গেচে, গঙ্গার তীর ঘেঁষেই আসছেল, ফেরি ঘাটে গিয়ে উঠবে, শ্মশানঘাটের সামনে এসে পড়তেই বিধু মুকুজ্জে হেঁকে বললে—এই ঘাটেই ভিড়োতে বলো নৌকো, আর এগুতে হবে না।
বিধু মুকুজ্জে হোল ওনার ছোটবেলাকার মিতে; দয়াল চাটুজ্জে নৌকোর ভেতর ব’সে ছেল, বেরিয়ে এল।
‘ব্যাপার কি? মা আচেন কি রকম?’
না, ‘থাকার কথা আর জিগ্যেস করতে আচে? উপযুক্ত সন্তান। এখন তো যাবার পালা গো। তা ঠিক সময়েই এসে গেচ, অন্তর্জলী করবার ব্যবস্থা হচ্ছে। পুণ্যিবতী তো, ঠিক সময়েই টেনে নিয়ে এয়েচেন। নেমে পড়ো।’ কথাবার্তা হচ্চে, মাঝি নৌকোর গলুই ভিড়ুচ্চে ঘাটে, এমন সময় একজন সায়েব হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল…’
