কাঞ্চন-মূল্য – ১৬
১৬
আমি বললাম—‘যাঃ, গেলেন ছেড়ে। সংসারটা তবু ধ’রে রেখেছিলেন কোন রকম ক’রে।
কথাটা স্বরূপ মণ্ডলের কানে যেন গেল না। ছিপটা রেখে দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে বসল, বললে—“উনি ভোরে বিদেয় হবেন, কাক-কোকিল ডাকার আগে বাবাঠাকুর একপহর রাত থাকতেই চম্পট। আমি রান্নাঘরের দাওয়ায় শুয়েছিলুম, আস্তে আস্তে ঠেলে তুলেই প্ৰেথম কথা—“চুপ।’
তারপর একবার চারদিক দেখে নিয়ে বললে—“আমি একটু যাচ্ছি বাইরে। তুই এই দুটো ট্যাকা চুপি চুপি নেত্যর হাতে দিয়ে দিবি, কাজে সব খরচ হয়ে গেল তো। বলবি একটা খুব জরুরি কাজ ছেল—শিগগিরই আবার ফিরে আসছি।’
—ফেরবার লোক বড়! শুনলেনই তো আগাগোড়া।
বেরুবার সময় ব্রেজঠাকরুনের মনের অবস্থা কি রকম থাকবে না থাকবে, আমি পূর্বদিক একটু ফরসা হতে না হ’তে কৈলীকে নিয়ে মাঠে চলে এলুম। এই আপনার নটা দশটা হবে-এই সময় একটু সকাল ক’রেই ফিরচি সিদিন, দূর থেকেই দেখি ব্রেজঠাকরুন গঙ্গাস্তান ক’রে সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর সেঁদুল। তাহলে ঢুকব বাড়িতে এত আগে, না, চ’লেই যাই মাঠে আবার-দোমনা হয়ে ভাবচি, এমন সময় দেখি ঘোষালমশাই লাঠি হাতে করে ঠুকঠুক ক’রে ইদিক পানেই আসচে। সেই বেশ, পরনে আটহাতি একটা ময়লা রাঙাপেড়ে ধুতি, গায়ে একটা তালি দেওয়া পিরাণ, চেহারাটা সম্পোতি অসুখে ভুগে আরও কাহিল হয়ে গেচে। খানিকটা দূরে থাকলে কি করতুম বলতে পারিনে, তবে একেবারে কাছে এসে পড়েছে, ‘শোন তো’ ব’লে হাত নেড়ে ডাকতে এগিয়ে গেলুম! জিগ্যেস করলে—‘তুই অনাদির রাখাল নয়?’
বললুম— ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘অনাদি করচে কি?
সটকেচে বললে আর এগোয় না, জানি তো বাড়ি ফিরেচে শুনে ট্যাকার তাগাদায় এয়েচে, আমি কিন্তু চেপে গেলুম দা’ঠাকুর। বুঝলেন না? বাবাঠাকুর পাল্যেচে, ব্রেজঠাকরুনের মেজাজটা নিশ্চয় ভালো নেই, তার ওপর সকাল সকাল ফিরলুমও গোরু নিয়ে—ভেবে দেখলুম প্রেথমে সাক্ষাতের ঝড়ঝাপটা য্যাতটা পরের ওপর দিয়ে যায় ত্যাতই কুশল; আর লোকটার ওপর রাগও ছেল,—স্রেফ চেপে গেলুম, বললুম—‘ভোরে নিজের কাজে বেরিয়ে গেছলুম! জানিনে তো। তা আপনি আসুন না।’
রশি কয়েক পথ ত্যাখনও, যেতে যেতে সুদোলে—‘তোর মা-ঠাকরুনের বাচ্ছরিক সারতে এয়েচে, না রে?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘শুনলুম নাকি খুব ঘটা করেছে?’
ত্যাখন আমার খেয়াল হোল কাল নেমন্তন্নয় তো ওনাকে দেখিনি, বাবাঠাকুর ইচ্ছে ক’রেই না বলুক, ট্যাকার তাগাদার ভয়ে, বা ভুলেই যাক, কথাটা খেয়াল হ’তে আমার মনটা যেন নেচে উঠল, বললুম—‘আজ্ঞে, তা শ’দেড়েক বামুন পাত পাড়লে বৈকি।’
এরপর ঘোষালমশাইয়ের আর কোন কথা নেই। দুজনে আমরা বাড়ির মধ্যে এসে সেঁদুলুম। ব্রেজঠাকরুন উঠোনে কাপড় মেলে দিয়ে কমণ্ডলু থেকে তুলসীগাছে জল ঢেলে ঘরে যাচ্ছেল, ঘুরে দেখে একটু চোখ কুঁচকে থমকে দাঁড়াল, জিগ্যেস করলে—‘কে?’
আমার ত্যাখন আবার অন্য ভয় সেঁদে গেচে, অতটা ভেবে দেখিনি আগে; মানে ঘোষাল মশাই সিদিনকার সেই পেয়ারা গাছ ভাঙা আর নাকীসুরে শাসিয়ে আসার রহস্যটা টের পেয়ে যায়নি তো? ব’লে দেবে না তো ব্রেজঠাকরুনকে? বেশ ভয় পেয়ে গেলুম দা’ঠাকুর, তাই উনি য্যাখন প্রশ্ন করলে—“কে?’ য্যাতটা পারলুম ভক্তি আর সমীহ করে, দুটো হাত জোড় করে ঘোষালমশাইয়ের দিকে দেখিয়ে বললুম— ‘ইনি হচ্চেন রাজু ঘোষালমশাই, সিচরণকমলেষু।’
ব্রেজঠাকরুন একবার কটমট করে ওনার মুখের দিকে চেয়ে তালির ওপর তালি মারা চটিজুতোর দিকে চোখ নামিয়ে দেখলে, আমাকেই সুদোলে’বুঝেচি; তা সিচরণকমলেষুর দরকারটা কি এখেনে?’
ঘোষালমশাই-ই উত্তুর দিলে, বললে—‘এয়েছিলুম একটু অনাদির সঙ্গে দেখা করতে; বাড়িতে নেই?’
উনি বললে—‘গাঁয়েও নেই, এ তল্লাটেও নেই। কোথায় আচে তাও জানিনে।’
‘কবে আসবে?’
‘কিচ্ছু জানিনে। আসবার আর দরকারটাই বা কি?’
ঘোষালমশাই একটু কি যেন ভাবলে। তারপর বললে— ‘আমরা সেই ছেলেবেলার বন্ধু কিনা।
ঠিক হেতুটা বলতে পারিনে দা’ঠাকুর, তবে এই রকম ধরনের লোক চুপ ক’রে ভাবলে আমি যেন আরও ভয় পেয়ে যাই—এখনও ছেলেবেলাকার বন্ধু বলতে আমি একটু খোসামোদের জন্যেই বললুম— ‘আর দিদিমণির শ্বশুরও হবেন তো দিনকতক বাদে।’
ব্রেজঠাকরুন ঘরে যাবার জন্যে ফিরেছেল, একেবারে বাঘের মতন ঘুরে দাঁড়াল, বললে- ‘তুই চুপ কর ছোঁড়া! খবরদার ছোট মুখে বড় কথা আনবিনে! শ্বশুল হবে!’
তারপরেই একেবারে সেই নিজমূর্তি! আর আমায় নয়, কোমরে দু’টো হাত দিয়ে সোজাসুজি ওনার দিকে চেয়েই—‘শ্বশুল হবে, সাধ হয়েচে না? তাই ভালোমানুষ পেয়ে হাতে ট্যাকা গুঁজে গুঁজে মাথার চুল পজ্জন্ত কিনে নেওয়া হয়েছে, না? ওরে আমার ছেলেবেলার বন্ধু! তা নিয়ে যা নিজের পুতবৌকে, ফেলে রেখেচিস কেন? নিয়ে যা- পেয়ারের বন্ধু পালিয়েচে, বেওয়ারিস ক’রে নিয়ে যা।…ইতোর! পাজি! পেটে না খেয়ে ট্যাকা জমিয়ে ট্যাকার গরম হয়েছে, না?—বামন হয়ে চাঁদে হাত। তা দাঁড়িয়ে রইলি কেন?—দিচ্চি বের ক’রে, যা নিয়ে —পারিস তো…’
আজ্ঞে, ক্ষ্যামতা বলতে হয় বৈকি, ঘোষালমশাইয়ের কথা বলচি, অত গালমন্দ, ফৈজত, তা একটি কথা নেই, উলটে মুখে একটু মিষ্টি হাসি। মাথা হেঁট ক’রে মুখে হাসিটি নিয়ে শুনছেল, শেষের দিকে সুদু সেটুকু একটু বাড়িয়ে বললে —‘হবে, হবে, উতলা হচ্চেন কেন? সময় হলে আপনিই যাবে।’
যেমন এয়েছেল, ঠুক ঠুক ক’রে আবার চলে গেল।
বাড়ির হাওয়া গরম, ভাবলুম-কাজ নেই; দিদিমণির কাছে দুটি ভাত আর একটু আগের দিনের বাসী তরকারি চেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি নাকেমুখে গুঁজে কৈলীকে নিয়ে সরে পড়লুম। ফিরলুমও সন্দের পর একেবারে, য্যাখন থির জানি ব্রেজঠাকরুন বাড়ি থাকবে না। উনি যে আমার জন্যেই ওঁত পেতে বসে আচে তা আর কি ক’রে জানব বলুন? আজ্ঞে হ্যাঁ, যেন পোড়ো মন্দিরের পাশে কোথাও নুকিয়েই ওপিক্ষ্যে করছেল, আমি পাশ দিয়ে আসচি, একেবারে যেন বাঘের মতন ছোঁ মেরে এসে আমার ডান হাতটা কক্কড়িয়ে ধরলে। একটু পেছন থেকেই, তায় আচমকা, আমি চেঁচিয়ে উঠতে যাব ঠোঁটের কাছে আঙুলটা এগিয়ে এনে বললে—‘চুপ, একেবারে চুপ। ইদিকে আয়, গোরু আপনি চলে যাবে।’
একটু হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে মন্দিরের পেছনটায় নিয়ে গেল। বললে—‘এক্কেবারে ঠিক ঠিক বলবি। তুই হারামজাদা বরাবর নুকোস, এবার আমি সব টের পেয়েছি। নেত্যকে তুই ট্যাকা এনে দিস, পরশু সন্ধ্যেয় দিচ্ছিলি, আমি স্বচক্ষে দেখেচি।’
আমি তো দেখলুম ও উঠোনে পা দিয়ে আবার আড়াল হয়ে গেল, আর নুকোই কি করে? হাঁ ক’রে মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। বেড়াল যেন ইঁদুর ধ’রেচে, একটা শক্ত ঝাঁকানি দিয়ে বললে—‘বল্ কে দিয়েচে; কে দেয়?’ সমস্ত কাহিনীটা শুনলে বোধ হয় বোঝে, কিন্তু ঐ যে কথায় বলে—আ বলতে দিলে না তো আতাউল্লো বলি কি করে? মুখ দিয়ে বের করতে যাব— ‘ছ’আনির চৌধুরীমশায়’—অদ্দেকও বেরোয়নি, একেবারে বেধড়ক মার—মুখে, বুকে, পিটে, পেটে–সে যেন ভাদ্দর মাসের তাল পড়ছে দা’ঠাকুর। আর শুধু—চুপ!—চুপ! চুপ! আজ তোকে আর জ্যান্ত রাখচিনে হারামজাদা, নচ্ছার!’
য্যাখন বোধ হয় নিজের হাত ব্যথা হয়ে গেচে, থেমে গিয়ে আমার কব্জিটা আরও শক্ত ক’রে ধ’রে বললে—চল্, আজ একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। সে হারামজাদার সঙ্গে একটা বোঝাপাড়া করব, নিয়ে চল্ কোথায় তার বাড়ি। গাঁয়ের মধ্যে দিয়ে নয়, বাইরে বাইরে দিয়ে নিয়ে যাবি।’
আর একটি কথা নয় পথের মধ্যে। কবারই মনে হোল, না হয় দেখি এবার, যদি শোনে, তা সমস্ত শরীর বেদনায় টনটন করচে, আর ভরসা হোল না ঘাঁটাতে দা’ঠাকুর। গাঁয়ের একেবারে অন্যদিকে তো, মাঠ দে ঘুরে য্যাখন দেউড়ির সামনে পৌঁছুলুম বেশ একটু রাত হয়ে গেচে। সিংদরজার ঘরে দারোয়ান পেতলের থালায় আটার তাল ঠাসছেল, আমি থমকে দাঁড়িয়েছি, ব্রেজঠাকরুন টেনে নিয়ে ফটক ঠেলে ভেতরে পা বাড়িয়েছে, খসখসে আওয়াজ হোল—‘কোন্ হ্যায়?’
ফাঁকা আওয়াজে তো ব্রেজঠাকরুনকে ঠেকানো যায় না, কিছু উত্তুর না দিয়ে আমায় হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে এগিয়েই যাচ্ছেল, আবার আওয়াজ—‘আরে কোন হ্যায়?’ সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আগলে দাঁড়াল।
ঘরের চুল্লীতে বোধ হয় ডাল সেদ্দ হ’চ্চে, তার আলোয় ব্রেজঠাকরুনের চোখ দুটো যেন বাঘের চোখের মতন জ্বলে উঠল; দশাসই শরীল, তার ওপর চুড়োটা মাথার মাঝখানে কলসীর কানার মতন উঁচু ক’রে বসিয়েছে, যেন আরও লম্বা দেখাচ্চে, দারোয়ানের দিকে এক পা এগিয়ে গেল; ডান পা’টা মাটিতে ঠুকে কোমরে দুটো হাত দিয়ে, মুখখানা ওর দিকে খানিকটা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বললে—এই দেখো কোন্ হ্যায়। কঞ্চিও নয়, প্যাকাটিও নয়, এমন একখানা লাশ পোড়া চোখমে নেই পড়তা হ্যায়, ভালো করকে দেখো।’
খানিকটা তো মুখে রা-ই সরল না দারোয়ানের। আজ্ঞে, এক পা সরেও গেল বৈকি, এ দিশ্য তো জীবনে এই প্রেথম; এগুলে তো আপনা থেকেই এক পা পেছিয়ে গেল, তারপর বললে—‘ভেতরমে যাওয়া মানা হ্যায়।’
না, ‘কার মানা হ্যায়?’
‘চৌধুরীমোশায়ের।’
‘তা যেতে মানা হ্যায় তো ডেকে নিয়ে আয় তোর চৌধুরীমোশায়কে।’
‘উ আসবে না।’
‘তা হ’লে আমায়ই যেতে হবে।’ বলে ব্রেজঠাকরুন আবার এক পা এগিয়ে গেল।
দারোয়ান আবার একবার পেছিয়ে বললে—‘কোখোনো নয়।’ দু’তরফই ক্রেমে গরম হয়ে উঠছে তো। ব্রেজঠাকরুন আর এক পা এগিয়ে গেল, সুদোলে –’রুকবেটা কে? তার একবার দেখা পেলে হোত যে!’
না,–’হামি রুকবে, এই দেখো। ঐ রুটিকা আটাও দেখো ভালো করে কেমোন খোরাক আচে, দেখে নাও।’
এক পা পেছিয়ে বুকটা ফুলিয়ে ঘাড়টা একটু পেছনে দিকে ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়েচে, লহমার মধ্যে দা’ঠাকুর, অমন তরস্ত শিকারী-বেড়ালকেও দেখিনি-ঐ লাশ তো, তা যেন একটি লাফ দিয়ে ব্রেজঠাকরুন পাশের খুবড়িটায় সেঁদে গেল; আর একটি লাফ, তারপর সেই প্রায় সেরখানেক আটার তাল তাক ক’রে সজোরে একেবারে দারোয়ানের নাকের মাঝখানে। তালের ঘায়ে আর তাল রাখতে হোল না, বুঝে সাবধান হবার আর সময় তো পায় নি, ‘খুন হুয়া!” ব’লে একেবারে ডিগবাজি খেয়ে উল্টে পড়ল ভুঁয়ের ওপর।
একেবারে হৈ-চৈ প’ড়ে গেল। সিংদরজার পরেই খানিকটা বাদ দিয়ে আমলাদের বাড়ি, তারপর একটা বড় উঠোন, তারপরেই দেউড়ি; ‘ক্যা হুয়া? ক্যা হুয়া?’–বলে সবাই ছুটে এল। দারোয়ান ত্যাতক্ষণে ঝেড়েঝুড়ে উঠে ঘর থেকে পেতল বাঁধানো লাঠিটাও এনে বাগিয়ে ধরে দাঁড়িয়েচে, বলচে—‘এবার চ’লে এসো কেমোন মর্দানা-আওরাত আচে!”
ভিড়ে যেমন হয়ে থাকে দা’ঠাকুর, সবাই জানতে চাইচে ব্যাপারখানা কি, অথচ কেউ ধৈয্য ধরে শুনতে চায় না; ভিড় বাড়তে লাগল আর সঙ্গে সঙ্গে শুধু হৈ-চৈটা বেড়ে যেতে লাগল, তার মধ্যে ব্রেজঠাকরুনের গলা সবার গলা ছাপিয়ে উঠচে—‘রুকবি! এখন দেখেচিস কি তুই মর্দানা-আওরাতের? তোদের কটাকে তো আমি তোর আটার তালের সঙ্গে গুলে খেয়ে ফেলব, তোদের বাবুকে ডাক্, সেই ইতরটাকে, গাঁয়ের সব্বনাশ ক’রে, গেরস্তদের সব্বনাশ ক’রে যে দেউড়িতে তোদের মতন কুকুর বেঁধে দোরে খিল এঁটে বসে আছে। ডাক্, কেমন ক’রে রোখে একবার দেখি!’
ওবিশ্যি, কে কার কথা শুনচে?—তবু উরই মধ্যে কয়েকজন যে একটু ঠাণ্ডা করবার চেষ্টা করছেল, দেউড়ির মধ্যেই মনিবের এরকম অভ্যত্থনা শুনে তো আর নিজেদেরও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে না। তা দেখলুম—দা’ঠাকুর, উদিকে ঐ পনের-বিশজন, তাদের সামনে ডাকগাড়ির ইঞ্জিনের মতন দারোয়ান ইস্টিম ছাড়চে—ইদিকে ঐ একলা অবলা নারী—আমি একটা শিশু, সঙ্গ দোব কি, বাঁশপাতার মতন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁপেই ফুরসত নেই—তা দেখলুম, ঐ একা অবলা সরলা বিহ্বলা নারী সমানে সবার মোহড়া নিয়ে গেল। দুপক্ষই গরম হয়ে উঠেচে, ওনারা বাবুকে টেনে কথা বলতে য্যাতই বারণ করচে, য্যাতই হুমকি দেখাচ্চে, ব্রেজঠাকরুন কোথা থেকে, কোথা থেকে বাছা বাছা অভ্যর্থনা এনে ওদের বাবুর মাথায় জড়ো করচে-আজ্ঞে, য্যাখন এইরকম চরম অবস্থা, সেই সময় চৌধুরীমশায় এসে ভিড়ের পেছনে দাঁড়াল, গলা চড়িয়ে সুদোলে—‘কেয়া হুয়া হ্যায় চৌবে?’
ওনার আওয়াজ উঠতেই প্রেথমটা সব থির, ঠাণ্ডা, যেন ঢাকের চামড়াটা এমুড়ো-ওমুড়ো ফেঁসে গেচে, তারপরেই সবাই এগিয়ে মনিবকে ব্যাপারখানা বুঝোতে যাবে, উনি হাত তুলে কথা কইতে বারণ ক’রে এগিয়ে এল। প্রেথমটা ব্রেজঠাকরুনও চুপ ক’রে গেছল; এর আগে দেখে নি, তা রূপ—যেন আকাশ থেকে দেবদূত এসে সামনে দাঁড়িয়েচে; অবাক্ই হয়ে গেছল প্রেথমটা, তারপর লোকটা খোদ চৌধুরীমশাই টের পেয়ে— ‘তুমিই সেই নাটের গুরু, না? এই যে, আস্তেজ্ঞে হোক’–বলে মাথুরের গৌরচন্দ্রিকা আরম্ভ করবে, চৌধুরীমশাই কোথায় আগুন হয়ে উঠবে, না, নরম সুরেই সুদোলে—‘আপনি কে? কি চান বলুন?’
মিথ্যে বড়াই করলে তো চলবে না দা’ঠাকুর, দেখচি এইবার কাঠে কাঠে ঠোকাঠুকি, আগুন ছিটকে বেরুবে, আমি একটু আড়াল হয়েই দাঁড়িয়েছিলাম, ওঁর আওয়াজ শুনে ভরসা পেয়ে একটু বেরিয়ে আসতেই আমায় দেখতে পেলে চৌধুরীমশাই, সুদোলে’তুই পণ্ডিত মশাইয়ের নফর নয়?’
বললুম— ‘আজ্ঞে, হ্যাঁ; আর উনি হ’চ্ছেন ওনার …
শালী বলতে গিয়ে কথাটা মুখে আটকে গেছে, চৌধুরীমশাই বললে— ‘বুঝেছি।…তা আপনি এখেনে কেন? ভেতরে চলুন।’
ব্রেজঠাকরুন বললে—‘গোরু মেরে জুতো দান। দেউড়িতে দারোয়ান ঠেকিয়ে দিয়ে—এখেনে কেন?’
—আওয়াজটা নরম হয়েচে একটু, তবে ভেতরের ঝালটা তো যায় নি; চৌধুরীমশাই বললে—‘আপনাকে তো জানে না, তা আমি ওদের সবার হয়ে মাপ চাইচি, আসুন আপনি ভেতরে।’
দারোয়ান থেকে নিয়ে সবাইকে বলে দিলে— ‘ইনি এলে সঙ্গে ক’রে দেউড়িতে পৌঁছে দেবে, চিনে রাখো। চলুন আপনি।’
—আর কি ভুলতে পারি যে কষ্ট করে মনে রাখতে হবে? এবার থেকে তো বাদশা আকবরের মতন কুর্নিশ করতে করতে পৌঁছে দেবে। ওরা সবাই মাথা হেঁট করে চলে গেল। ব্রেজঠাকরুন পা বাড়িয়ে আবার একবার ফিরে চৌবেজীর দিকে চেয়ে বললে—“ঐ আটার মতন তালগোল পাকিয়ে তোকে ছুঁড়ে দোব, কালনেমীমামার মতন দুম ক’রে সেই বাড়ির মাঝখানে গিয়ে পড়বি।’
চৌধুরীমশাই বললে—‘চলে আসুন আপনি।’
আর কোন কথা হোল না। দেউড়ির ভেতর গিয়ে এ-ঘর ও-বারান্দা ঘুরে শেষের দিকে একটি নিরিবিলি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করলে—‘একেও সরে যেতে বলব?’
‘কেন, সরাবার কি আচে? আমি তো সিংদরজায় সবার সামনে দাঁড়িতে বলতুম, সবাই চিনত তোমায়…ঐ ছোঁড়াটার হাতে ট্যাকা দিয়েছিলে কেন? ট্যাকা দ্যাও কেন অমন করে?”
বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার কোমরে দুটো হাত দিয়ে দাঁড়িয়েচে, আওয়াজটাও আবার খনখনে হয়ে উঠেচে, চৌধুরীমশাই যেন আকাশ থেকে পড়ল, বললে—‘ট্যাকা দিই? সে কি কথা!
ব্রেজঠাকরুনের গলাটা এমন খনখন করে উঠল, সমস্ত দেউড়িটা কেঁপে উঠল, বললে—‘দিয়েচ! পরশুই দিয়েচ। আবার ন্যাকা সাজা হচ্চে! একটা গরিব ব্রাহ্মণ—তারও সব্বনাশ তুমিই করেচ বিধবা বিয়ের হুজুগে টেনে তার রুজি নষ্ট ক’রে, তারপর সোমত্ত মেয়ে দেখে…’
চৌধুরীমশাই একেবারে হাত জোড় করে দাঁড়াল, বললে—‘চুপ করুন—আমি বুঝেছি, ব্যাগ্যতা করচি, আপনি আর ও কথা মুখে আনবেন না! বলচি সব।’
খানিকক্ষণ আর কথা নেই। চৌধুরীমশাই চুপ ক’রে রয়েচে যেন কোথায় কিভাবে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারচে না। অপমানে লজ্জায় মুখটা রাঙা হয়ে উঠেচে, যেন কোন রকমে চেপে রয়েচে নিজেকে, তারপর আস্তে আস্তে বললে—হ্যাঁ, আমি পাঁচটা ট্যাকা ওর হাতে পরশু দিয়েছিলুম—স্বরূপ নাম না?—কিন্তু আপনি যে সেই ট্যাকার কথা বলচেন তা ধরতে পারিনি, তা ও আপনাকে বলেনি সে ট্যাকা কিসের জন্যে?’
আমার দিকেও চাইলে। সারা গা বেদনায় টনটন করচে, আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতে যাচ্ছিলুম—বিনি দোষেই নিয্যাতনটা তো গেল- ব্রেজঠাকরুন ক’ষে এক দাবড়ানি দিয়ে উঠল—‘চুপ কর ছোঁড়া, নৈলে ভালো ক’রে কাঁদিয়ে দোব! আবার মান কাড়া হচ্চে!’
বললুম—‘আপনি দিলে কৈ ত্যাখন বলতে যে বলব?’
না,—দিলে কৈ বলতে!…সাবিত্রীর ব্রেতকথা শোনাবেন কিনা, ফুল হাতে নিয়ে হাতজোড় ক’রে ব’সতে হবে তবে বলবেন উনি। তা বল কি বানিয়ে-ছানিয়ে রেখেছিলি তোরা।’
চৌধুরীমশাই বললে—আমিই বলচি; বানিয়ে থাকি আমিই বানিয়েছিলুম তো। গোড়াতেই বলে রাখি, যা বলতে যাচ্ছি সেটা নুকুবার জন্যেই ট্যাকা দিই ওকে আমি। আপনাদের ধমক- ধামকে তো ব’লে দিতে পারে ছেলেমানুষ, তাই জিগ্যেস করছিলুম….’
‘তাহলে আচে তো নুকোচুরির ব্যাপার একটা?’—ব’লে ব্রেজঠাকরুন আবার গরম হয়ে উঠতে যাচ্ছেল, চৌধুরীমশাই বললে—‘দয়া ক’রে একটু থির হয়ে শুনতে হবে আপনাকে, তাহলেই বুঝবেন যে যা-অবস্থায় পড়েছিলুম, কথাটা যাতে না রটে তার জন্যে ছেলেমানুষকে ঘুষ দিয়ে কিছু অন্যায় করিনি; যে-কোন মানুষই মুখ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করত।’
আগাগোড়া একটি একটি ক’রে ব’লে গেল—শিকার ক’রে ফেরার পথে ঝড়বৃষ্টির দাপটে ভাঙা মন্দিরে ঢুকে পড়া থেকে শুরু করে অসুখের ভয়ে ভিজে কাপড় পালটাবার জন্যে আমায় কাপড় নিয়ে আসতে বলা—আমার ভুল করে শাড়ি নিয়ে আসা—তাই প’রে ছাতা নিয়ে ঘোড়ার পিঠে ব’সে চলে আসা ওনার—সব একটি একটি ক’রে বলে গেল। মাঝে মাঝে আড়চোখ তুলে একবার যেন মনে হচ্চে ব্রেজঠাকরুনের ঠোঁটের এ-কোণ ও-কোণ যেন একটু কুঁচকে কুঁচকে উঠচে। একটু যদি হেসে ফেলে তো বাঁচি, তা হাসতে তো শেখেনি, আগাগোড়া মুখটা থমথমে ক’রেই শুনে গেল। শেষ হলে চৌধুরীমশাই বললে—‘ব্যাপারখানা হচ্চে এই; বানিয়ে বলার মতন মনে হচ্ছে আপনার?’
ব্রেজঠাকরুন অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবছেল; তা যাই কেন ভাবুক না, মুখের ভাব অনেকটা নরম হয়ে এসেচে, বললে—‘হয় না কি এরকম? সেই বেদ-পুরাণের সময় থেকে হয়ে আসচে, সে সব তো মিছে কথা নয়। তবে বলবে কেউ তবে তো বুঝব।’
জো বুঝে আমি ঠোঁট ফুলিয়ে বললুম—‘আগে থাকতেই আপনি মারতে শুরু করে দিলে যে!’
এবার শুধু আমার দিকে চাইলে, কিছু বললে না। চৌধুরীমশাই বললে ——বললুম তো ট্যাকাটা ঐ জন্যেই দেওয়া, ওপর-পড়া হয়ে তাই ছেলেমানুষ আর বলেনি। আপনাকেও সেই কথা। ওবিশ্যি আপনাকে তো ঘুষ দেওয়া চলে না, তবে মিনতি ক’রে বলচি প্রকাশ করবেন না, অবস্থা-গতিকে খুব লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলুম তো। অন্ধকার ঝড়-তুফানের রাত্রি, তাই দেখ তার হতে হয় নি।…আপনাকেও কি বলি?-তবে আপনি ঐরকম একটা কথা ভেবে ছুটে এলেন…’
চুপ ক’রেই শুনছেল ব্রেজঠাকরুন, অন্যমনস্ক হয়ে আবার কি যেন একটা ভাবচে তো, ঘাড়টা তুলে একটু কড়া চোখেই বললে’আসতে হয় বাপু, গরিবের ঘরে সোমত্ত মেয়ে, একটু ইদিক-উদিক মনে হ’লেই আসতে হয় ছুটে। তুমি কি বুঝবে?”
উনি বললে’না হয় বলবেন মস্তবড় বড়লোক আমি; কিন্তু ভদ্রসন্তান তো?…’
—একটা ভালোমানুষের স্বভাবচরিত্রে অপবাদ তো দা’ঠাকুর, চৌধুরীমশাই একটু রাগ করেই হোক বা দুঃখ করেই হোক বলে থাকবে কথাটা, ব্রেজঠাকরুন একেবারে চ’টে উঠল, বললে—‘বড় যে ব’লে যাচ্চ চুপ ক’রে থাকতে দেখে। ভদ্রসন্তান, তা করচ না একটা গরিব লোকের সব্বনাশ? নাচিয়ে দিলে তো বিধবা-বিয়ে করিয়ে। তুমি বড়লোক, ভদ্রসন্তান, তোমার নাগাল পায় না লোকে, কিন্তু ঐ গরিব ভদ্রসন্তান রুজি হারিয়ে একঘরে হয়ে মারা যেতে বসেচে, দেনার দায়ে মাথার চুল বিক্রি হয়ে রয়েচে, ঘরে সোমত্ত আইবুড়ো মেয়ে, পৈতৃক ভদ্রাসনটি খাতকের হাতে গেল ব’লে—কি করচ বড়লোক ভদ্রসন্তান শুনি? কি করেচ?’
চৌধুরীমশাই যেন একটু কাতর হয়ে পড়ল। বললে—“কৈ, পণ্ডিতমশাই আমায় তো কিছুই বলেন নি এর। অ্যাকে তো ডেকে পাঠালেও পাঁচবার যাব যাব করে একবার যদি আসেন, এদিকে কয়েক মাস থেকে তো তাও নয়, তারপর কখনও বলেন নি তো এসব কথা আমায়। অবস্থাটা মোটামুটি খারাপ, আমার দ্বারা কিছু হ’তে পারে কিনা জিগ্যেস করেচি—যেমন লোক, খুব সম্ভপ্পনে তুলতে হয় কথা ওনার কাছে, তা কিছু বলেন নি তো কখনও।’
ব্রেজঠাকরুন বললে ‘তা’লেই ভদ্রসন্তানে ভদ্রসন্তানে তফাতটা বোঝ, একজন গাছে তুলে মই কেড়ে নিয়ে তামাসা দেখচে, আর একজনের মুখে নালিস-ফরিয়েদের কিছু নেই। বোঝ তফাত।’
আরও কাতর হয়ে উঠেচে চৌধুরীমশাই; বললে—‘কি করতে পারি বলুন? আমি তো থাকিও না সব সময় এখেনে; এমনি হাত তুলে দিতে গেলে উনি নেবার মানুষ নয়। পণ্ডিতমশাইকে কত যে শ্রদ্ধাভক্তি করি বলতে পারি না; কিন্তু কিছু না নিলে করি কি?’
‘কোন একটা ব্যবস্থা ক’রে দ্যাও, সত্যিই যদি ভক্তি থাকে পণ্ডিতমশাইয়ের ওপর। টোল করে দিতে পার,—পূজুরী ক’রে দেওয়া যায় নিত্য-সেবার জন্যে। মন্দির আছে তো?’
‘মন্দির…তা…’–ব’লে একটু চুপ করে ভাবতে লাগল চৌধুরীমশাই, যেন কত মন্দিরই না রয়েচে, কোল্টাতে বসাবে হিসেব ক’রে দেখচে। একবার মনে হোল উরই মধ্যে একটু যেন কাতর ভাবেই আমার দিকে চেয়ে নিলে। বুঝলেন না দা’ঠাকুর? মন্দির বলতে তো সেই এক বিভীষণের মন্দির, তানার নিত্যি সেবার কথা তো মুখে আনতে পারে না ব্রেজঠাকরুনের সামনে, আমিও মুখ ফসকে বলে ফেলি এটাও চায় না—একটু চুপ ক’রে থেকে, কথাটা যাতে ফাঁস না করে ফেলি সেইজন্যে একটু কাতরভাবে আমার দিকে চেয়ে নিয়ে, বললে- ‘মন্দির—এই সিদিন আলাদা হলুম, করা তো হয়নি বিশেষ—-উনি যদি থাকতে চান পূজুরী হয়ে তো না হয় একটা তুলে দিই তাড়াতাড়ি। এর মধ্যে আমার দ্বারা যদি কিছু কাজ হয়, ওঁকে যদি পাঠিয়ে দেন, না হয় ভালো করে সব জিগ্যেস করি। না হয়, বলেন নিজেই একদিন আমি অতবড় একজন পণ্ডিতের বাড়ি, মানী-লোক, উনিই বা বাড়ি ব’য়ে কষ্ট করে আসবেন কেন?’
আজ্ঞে, একেবারে নতুন ধরনের কথা সব তো, তাও কে, না, গাঁয়ের রাজা বাবাঠাকুরকে একেবারে তালগাছে চড়িয়ে দিচ্চে, এতে তো আর রাগ থাকতে পারে না। তবে আবার কি জানেন? —রাগী মানুষ, তার গা থেকে রাগ সরে গেলেও নেহাত হালকা ঠেকে, অস্বস্তি বোধ হয়, সেই জন্যেই যেন ব্রেজঠাকরুন হঠাৎ গাঝাড়া দিয়ে উঠল; মিষ্টি ক’রে তো কথা বলতে শেখেনি, একটু ঠেস দিয়েই বললে—“বেশ, বেশ, অনেক বড় কথা তো শুনলুম, এখন যাই। পণ্ডিতমশাই রাজা হবে এবার।’
একেবারেই হনহন করে চলতে আরম্ভ করেছিল, চৌধুরীমশাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললে— ‘সেকি, হেঁটে যাবেন আপনি! ডুলি পালকি বের করচে, এক্ষুণি।’
‘কোই হ্যায়?’—বলে একটা হাঁকও দিলে।
ব্রেজঠাকরুন বললে—“রক্ষে করো, রাতদুপুরে, জমিদারবাড়ি থেকে ডুলি বেয়ারার কাঁধে চড়ে যাচ্ছি অমনি।…চল রে ছোঁড়া।’
অনেক বললে, শুনলে না। চৌধুরীমশাই নিজে সঙ্গে ক’রে সিংদরজা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে এল। সঙ্গে লোক দিতে চাইলে, তাতেও রাজী নয়, নিজেই খানিকটা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে চায়, তাও নয়।
কোন কথাও নয় আর। শুধু বাবু আসচে দেখে দারোয়ান যে আবার বেরিয়ে এসে সেলাম করে দাঁড়াল, তার দিকে চেয়ে একটু শাসিয়ে দিলে—‘মনে করছিস যে মাগী চলল, আর ফিরবে না, তা তোর সঙ্গে বোঝাপড়া হয়নি আমার এখনও!’
—বাবু সঙ্গে রয়েচে, উত্তুর তো দিতে পারে না, খুব ঝুঁকে একটা সেলাম করলে চৌবেজী।
চৌধুরীমশাই সিংদরজা থেকেও একটু এগিয়ে গেল। ফেরবার সময় বললে—‘কৈ, একটা কথারও তো জবাব দিয়ে গেলেন না—পণ্ডিতমশায়কে ডেকে দেবেন কিনা, কি আমায়ই আসতে বলেন একদিন—আমার দ্বারা যদি কোন কাজ হয়..’
ব্রেজঠাকরুন মুখ না ঘুরিয়েই বললে— ‘বড় বড় কথা সব তো শুনে যাচ্চি।’
প্রেথম দিকটা কোন কথাই হোল না দা’ঠাকুর, শুধু গোড়ায় দেউড়ি ছেড়ে খানিকটে এসে বললে—‘একটু পা চালিয়ে চল স্বরূপে, মেয়েটা একলা রয়েচে।’
আর খানিক এগিয়ে এসে বললে— ‘এলো সে রোজগার করবার জন্যে! —মানী লোক এখন ঘর ছেড়ে শিষ্যিবাড়ি ধন্না দিয়ে বেড়াচ্চেন, রাজবাড়িতে ঠাকুরসেবা নিয়ে থাকবেন?-সে যে মস্তবড় অপমানের কথা!’
আর কোন কথা নেই। বুঝচি, ঠাকুরমশায়ের কাণ্ডটা মাথার মধ্যে ঘুরছে, রোজগারের একটা মস্ত বড় সুযোগ হয়ে যাচ্চে তো। আর অনেকক্ষণই কোন কথা নেই। জমিদার পাড়া ছেড়ে আমরা মাঠে পড়লুম। টানা মাঠ, হুহু করচে হাওয়া। জমিদার-বাড়িতে গরম বোধ হচ্ছেল, অতটা হুজ্জোতও তো গেল; খোলা হাওয়ায় শরীলটা যেন জুড়িয়ে গেল। আমরা মাঠে মাঠে গিয়ে একেবারে পোড়া মন্দিরের কাছাকাছি উঠব, অনেকখানি গিয়ে ব্রেজঠাকরুন বললে—‘তা লোক তেমন খারাপ কৈ রে স্ব’রূপে? দিব্যি তো কথাবাত্রা। কৈ, দেমাকে নয় তো, ওদিকেও যেমন মনে হচ্ছিল…’
স্বভাবচরিত্রের কথা নিশ্চয়ই, পোড় খেয়ে খেয়ে তখন কতক কতক তো বুঝি। চুপ করেই গেল একটু, তারপর আবার হঠাৎ জিগ্যেস করলে—ত হ্যাঁরে স্বরূপে, ঠিক করে বলবি, সব তো শুনলিই স্বকন্নে,—যা যা বললে সব ঠিক?’
বললুম—‘না তো।’
হনহন করে যাচ্ছিলুম দু’জনে ব্রেজঠাকরুন থমকে একেবারে ঘুরে দাঁড়াল; খানিকটা আমার দিকে চেয়ে থেকে বললে—‘কে গা এ-ছোঁড়া! এত মার খাচ্চে এত অপদস্ত হচ্চে তবুও কথা নুকুবার অব্যেস গেল না! ঠিক কথাটা তাহলে কি? মিনসে এক ডাঁই যে মিচে কথা ব’লে গেল।’
বললুম—‘ওনাকেও তো বলি নি।’
‘ন্যাও!’—ব’লে ব্রেজঠাকরুন পাশের ক্ষেতের আলটার ওপর যেন হাল ছেড়ে দিয়ে ব’সে পড়ল। বললে—‘ছোঁড়া মস্ত বাজীকর তো। দেখতে এতটুকু ইদিকে দুনিয়াসুদ্যু লোককে ভুলের চরকিতে পাক খাইয়ে মারছে।..তা আসল কথাটা কি? বলিসি নি কেন ওকে?’
বললুম—‘দিদিমণি বলতে মানা ক’রে দেছল।’
বললে—‘মাথা গুলিয়ে দিলে! তোর দিদিমণিও তাহলে সব জানত? তবে যে শুনলুম নুকিয়ে এনে দিছলি কাপড়!’
বললুম—চৌধুরীমশাই বলতে মানা ক’রে দেছল।’
ব্রেজঠাকরুন উঠে পড়ল; ‘ছেলের নিকুচি করেচে।’-বলে ঘাড়টা ধরে আবার নিজের পায়ের কাছে বসালে, বললে—ঠিক ক’রে বল কি কি জানিস, আমায় ধাঁধায় ফেলে পার পাবি নে। যদি টের পাই একটু ইদিক-উদিক করচিস্, এই আলের ওপর আছড়ে তোকে শেষ ক’রে যাব। এর থেকে ও, ওর থেকে এ, যেন তাঁতিপাড়ায় মাকু চালাচ্চে ছোঁড়া। পুঁতে ফেলব একেবারে!’
বলব না কেন দা’ঠাকুর? কার কথা কার কাছে প্রেকাশ করতে গিয়ে কি ফ্যাসাদে পড়ব তাই হঠাৎ ওপর-পড়া হয়ে কিছু বলতে যেতুম না বড় একটা, তা আপনি য্যাখন জিগ্যেস করচ, বলব না কেন? সিদিন যা যা হয়েছেল—সই শ্বশুলবাড়ি যাচ্চে, তাকে দেখতে যাবে বলে দিদিমণির আমায় সকাল সকাল মাঠ থেকে ফিরতে বলা-ঝড়-তুফান—কৈলীকে খুঁজতে বেরিয়ে পোড়ো মন্দিরে চৌধুরীমশায়ের সঙ্গে দেখা-কাপড় ছাড়াবার জন্যে ওনাকে বাড়িতে নিয়ে আসব, ঝড়-তুফানের জন্যে দিদিমণির ফিরে আসা—উপায় না দেখে নুকিয়ে কাপড় এনে দেওয়ার কথা—নুকিয়ে আনা তো যায় না, দিদিমণিকে চৌধুরীমশাইয়ের কথা না বলে, বানিয়ে ছিরু ঘোষালের নাম ক’রে কাপড় না থাকায় শাড়ি এনে দেওয়া—সব একটি একটি ক’রে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে গেলুম। এর পর চৌধুরীমশাই কি করে শাড়ি পরে ছাতা মাথায় দিয়ে ঘোড়ায় ক’রে চলে এল, নজ্জার কথা নুকুবার জন্যে ট্যাকা পঠিয়ে দিলে, উনি তো সব তানার মুখেই শুনেচে।
ঘাড়টা টিপেই শুনছেল ব্রেজঠাকরুন, তবে হাতটা আস্তে আস্তে আলগা হয়ে এয়েচে, দেখছে তো নিদুষী; শেষ হয়ে গেলে সুদোলে—‘এই তো, না, আরও আচে, নুকুচ্চিস?’
একটু নুকিয়ে রেখেচি বৈকি ত্যাখনও দা’ঠাকুর, বোধ হয় সেটা টের পেয়েছেল। প্রেথম তো—চৌধুরীমশাই যে ওনাকে সব বললে তার মধ্যে শাড়ি পড়ার পর আমরা বসে যে গল্প করলুম দু’জনে ঝড়-বিষ্টির মধ্যে, যাতে কিনা দিদিমণির কথাও খানিকটা এসে পড়ল—সেটা কি ভেবে উনি তো একেবারে বাদ দিয়ে গেছল। তাই আমিও বলাটা ঠিক হবে কি হবে না ভাবছিলুম, ব্রেজঠাকরুন জিগ্যেস করতে আর চেপে রাখতে ভরসা করলুম না। কিছু ছাড়ল কিনা মনে করবার ভাবটা দেখিয়ে শেষে ওটুকুও ব’লে দিলুম-চৌধুরীমশাই শাড়িটা জড়িয়ে বললে—দিব্যি গরম—তারপর মেয়েদের ভালো ভালো জিনিস ব্যাভার করার কথা, তারপর সেই ধ্রুবর উপাখ্যান—আমি যে বললুম দিদিমণি ধ্রুবর মা সুনীতির মত চৌধুরীমশাইকে নিজের শাড়ি দিলে—সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে গেলুম দা’ঠাকুর।
ব্রেজঠাকরুন একটু মুখটা ঘুরিয়ে শুনে যাচ্ছেল, এবার যেন অন্যমনস্ক হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল, বেশ খানিকক্ষণ, কি যেন ভাবচে, তারপর যেন হঠাৎ সাড় হয়ে জিগ্যেস করলে—‘তোর দিদিমণি তাহলে জানে ছিরু ঘোষালকে নিয়েই যত কাণ্ড!’
এটা তো আরও নুকুতে চাচ্ছিলুম দা’ঠাকুর, তা আর তো সাহস হয় না, সামলে নিয়ে বললুম’না, সেই কথাই এবার বলতে যাচ্ছিলুম কিনা—চৌধুরীমশাই ঘোড়ায় চড়ে চ’লে গেলে ত্যাখন আমি দিদিমণিকে আসল কথাটা বললুম কিনা, ভাবলুম—আর নুকিয়ে অধম্ম করি কেন? উনি চলে তো গেল, আর ভয়টা কিসের?”
একটু তো সন্দো হোলই ব্রেজঠাকরুনের, কটমটিয়ে চাইলে একটু আমার দিকে, বললে- ‘নেত্যও জানে তাহলে? কি বললে?”
সব বলে গেলুম দা’ঠাকুর। এবারেও সেইরকম একটু মুখ ঘুরিয়ে সব শুনে গেল। অত হাসির কথা-দিদিমণি হেসে লুটপুট খেয়ে গেছল, তা একবার একটু মুখ কোঁচকাল না। আমি ভেবেছিলাম—শাড়ি ভুলে যাওয়ার কথাটা চেপেই যাব—একটা ছেঁড়া নীলাম্বরী তো। এবার কিন্তু অন্যরকম ব্যাপার হোল দা’ঠাকুর। এখানটা বড্ড নাকি হাসির কথা—দিদিমণি হেসে একেবারে লুটপুট খেয়ে যাচ্চেঐখেনটায় এসে ওনারও ঠোঁটেরই কোণ কয়েকবার কুঁচকে কুঁচকে উঠল, এবার বেশ একটু পষ্ট করেই যেন। তাইতে আমার—যার মুখে কখনও হাসি দেখিনি তার মুখে হাসি দেখলে হয় না?—আমি যেন আহ্লাদে গলে গিয়ে দিদিমণির পা ছুঁয়ে দিব্যি করার কথা ভুলে বলে বসলুম— ‘আর সেই ছেঁড়া নীলাম্বরী, এত আরাম লাগল যে ফিরিয়েও তো দিলে না…
ব্রেজঠাকরুনের হাসি হাসি মুখটা সঙ্গে সঙ্গে শক্ত কঠিন হয়ে উঠল, চোখ দুটো উঠল জ্বলে, বললে—‘ফিরিয়ে দেয় নি! ফিরিয়ে দেয় নি কি রে?’
উঠে দাঁড়াল দা’ঠাকুর, দেউড়ির পানে হাত বাড়িয়ে বললে—“চল্, এক্ষুণি চল্। গেরস্ত ঘরের মেয়ের শাড়ি, কারে প’ড়ে না হয় দরকার হয়েছেল—তা ফিরিয়ে দেয় নি কি? চল, চল হারামজাদা, আগে বলিস্ নি কেন?…’
আমি একটু রস করে বলেছিলুম, হাসিটা যাতে ওনার বেড়ে যায়, উল্টো ফল দেখে একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলুম। ‘ভুলে গেচে নিশ্চয়’–কিন্তু সেকথা আর মুখ দিয়ে বের করতে পারলুম না তো, আবার ওনার হাতের ঠেলা খেতে খেতে মাঠ ভেঙে এগিয়ে চললুম দেউড়ির দিকে।
বললুম না দা’ঠাকুর?—ক্ষ্যাণে রুষ্ট ক্ষ্যাণে তুষ্ট—মেজাজ কখন যে কি হয় বুঝতে তো পারা যেত না। সেদিন যেন যাচ্ছে আরও গোলমেলে হয়ে, একটি কথা কইলে না সমস্ত পথটা, তবে একটা জিনিস দেখচি—ঘাড়টা যে কামচে ধরেছিল, শেষের দিকে হাতটা যেন আলগা হয়ে আসতে লাগল, অমন যে আমায় ঠেলতে ঠেলতে হনহনিয়ে চলা, সেটাও ক্রমে নরম হয়ে এয়েচে, তারপর য্যাখন পেরায় এসে পড়েছি, অন্ধকারে সিংদরজাটা আবছা-আবছা দেখা যাচ্চে, ব্রেজঠাকরুন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বললে —চল্, ফের্, বড় রাত হোয়ে গেচে।’
সবচেয়ে আশ্চয্যি লাগল দা’ঠাকুর গলার আওয়াজটা, ওনার গলায় অত নরম আওয়াজ আর কখনও শুনেচি ব’লে মনেই পড়ে না। ফেরবার সময় আগাগোড়া আমার সঙ্গে গল্প করতে করতেই এল—অবিশ্যি মাঝে-মধ্যিখানে এক-একবার যে চুপ ক’রে না যাচ্ছিল এমন নয়, একটানা গল্প করতেই করতেই এল। বললে—‘একটু পা চালিয়ে চল্ স্বরূপে। তোরও নিগ্রহ, উদিকে মেয়েটা যে একলা বাড়িতে কি করে রয়েছে।’
ভাবছেল, একটু গিয়ে আবার বললে—‘রাগ না, চণ্ডাল রে! অথচ দেখলুম তো—লোক তো ত্যামন খারাপ নয়?’
আমি বললুম— ‘হ্যাঁ, রাগ নেই শরীলে একেবারে।
এবার কি ভেবে ঐটুকুতেই হেসে ফেললে, বললে—‘আমার মতন চণ্ডাল নয়, না? সত্যিই রাগটা বড্ড হয়ে পড়েছিল। অথচ ভুল ভেন্ন তো আর কিছু নয়, শাল-দোশালায় সিন্দুক ভরা, ওর নাকি একটা ছেঁড়া নীলাম্বরী নুকিয়ে না রাখলে চলবে না!…তবে শোন্ তুই এ-কথা কাউকে বলবিনে। যদি জিগ্যেস করিস কেন গা মাসিমা, তো রাজা মানুষে ঝড়ে-বিষ্টিতে অত হেনস্তা হয়েছে, এ কথাও যেমন কাউকে বলবার নয়, তেমনি একটা ছেঁড়া শাড়ি ফিরিয়ে দেয়নি, ভুলে গেচে, এ কথাও তো পাঁচকানে করা যায় না। না, খবরদার, এই বলা রইল, কারুর সামনে এসব কথা তুলবি নে; কোন কথাই নয়। তুলিস নে তো—মাঠে গোরু চরাতে গিয়ে কি, তোদের বাড়িতেই, কি কোনখানেই?’
বললুম— ‘আমার কি গরজ, বলুন না।’
‘বলবিনে। টের পেলে পুঁতে ফেলব।’
আরও খানিকটা এগিয়ে এসে বললে—চল, মাঠ ছেড়ে গাঁয়ের পথে উঠে পড়ি। ভারি তো ভয় আমার গেঁয়ের লোককে। মুয়ে আগুন। কোনখানটা এলুম বল দিকিন?’
বললুম—‘ঘোষপুকুরের সন্নিকটে।’
‘উঠে পড়। মেয়েটা একলা রয়েছে। বড্ড ভালো মেয়েটা রে, এমন বোনঝি আর হতে নেই। তা অমন সোনার প্রিতিমে, অদেষ্ট দেখো না!’
আমিও বললুম—‘দিদিমণিও বলে—এমন মাসিমা আর হয় না।’
‘বলে নাকি?’ বলে একটু হাসলে, বললে—‘সবই করলে মাসিমা, উল্টে একটা বোঝা।’
একটু চুপ ক’রে থেকে আমরা ঘোষপুকুরের ঘাটের সামনে এসে পড়েছি, ব্রেজঠাকরুন আবার দাঁড়িয়ে পড়ল, হঠাৎ আবার ভাবটা বদলে গেচে, তবে এবার আর সে রকম রাগ নয়; আমার কাঁধে আলগা করে হাতটা রেখে বললে—“হ্যাঁরে স্বরূপে, সব তো শুনলুম, সব বললুম, তা একটা কথা তো জিগ্যেস করাই হয়নি তোকে,—শাড়ি যে ফেরত এল না একটা, তা নেত্য তো টের পেলে, নুকিয়ে তো নে যাস নে তুই, ওই দিয়েছিল, তা একটা শাড়ি যে কম এল, কিছু বললে না?’
রাগলেও একটা বানিয়ে বলতুম দা’ঠাকুর, সে ক্ষ্যামতাটুকু তো ছেল, আবার যদি দেখতুম সেইরকম হাসি হাসি মুখে বলচে তাহলেও মন যুগিয়ে একটা বানিয়ে বলতুম, ওঁর দৃষ্টিতে কিন্তু না রাগ না হাসি। আমার মুখের ওপর চোখ নামিয়ে থিরভাবে দাঁড়িয়ে আচে, আমি ভেতরের মতলবটা ধরতে না পেরে দিদিমণি যা যা ক’রে ছেল শাড়ি না আসার কথা শুনে, সব খুঁটিয়ে বলে গেলুম—সেই যে শুনেই আগে হতভম্ব হয়ে যাওয়া—তারপর চাপা রাগ—তারপর শাড়ির জন্যে চিঠি লেখার কথা বলতে এগিয়ে এসে আমায় ঠাসঠাস ক’রে চড়িয়ে দেওয়া—তারপর এসব কথা কোনখানে তুলতে বারণ করে দেওয়া। ব্রেজঠাকরুন একভাবে শুনে যাচ্চে, আমার কাঁধে হাতটা নরম হয়ে এয়েচে, তারপর সব বলে দিদিমণি যে আমায় চৌধুরীমশাইয়ের ছায়া মাড়াতে বারণ ক’রে দেছল, সেটুকু ব’লে দিদিমণির সেই মা-ঠাকরুনের আলতার ছাপের কাছে মাথা ঠেকিয়ে কান্নার কথা বলচি, ওনারও চোখ দুটো জলে ভরে এল, আঁচলটা তুলে মুছে নিয়ে বললে—“হরোর পেটের মেয়ে…হরো আমার সতী-লক্ষ্মী বোন ছেল রে।—একেবারে সাক্ষাৎ সতী-লক্ষ্মী।…চল্ ঘাটে নেমে হাত-পা ধুয়ে নিই।
মন্দিরের কাছটায় এসে হঠাৎ কি মনে হতে বললে—‘একটু দাঁড়া।’ আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলুম, উনি গিয়ে মন্দিরের চাতালে মাথা ঠেকিয়ে গলায় আঁচল জড়িয়ে বেশ খানিকক্ষণ ধরে গড় করলে। ওপর-পড়া হয়ে কিছু জিগ্যেস করতে তো ভরসা হোত না, তবে মনটা সিদিন নাকি বড্ড ভালো ছেল, ফিরে এলে সুদোলুম— ‘মন্দিরে তো ঠাকুর নেই মাসিমা, গড় করলে যে?’
বললে—মর ছোঁড়া, পাপের শরীল, ঠাকুর থাকলে নাকি যাই?…হ্যাঁ, এইবার গিয়ে বাড়ি এসে পড়লুম, যা যা হোল কাউকে বলবিনি।’
তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে আমার মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললে—“হ্যাঁরে, সবাইকেই বলচিস তার কথা কাউকে বলবি নে, পা ছুঁয়ে দিব্যিও করতে দেরি হয় না—তারপর তো দেখচি এর কথা ওকে বলচিস, ওর কথা একে বলচিস…’
বললুম—‘শুধু আপনারটা কাউকে বলিনি’-
ব্রেজঠাকরুন সেইরকম মুখের দিকে চেয়েই মাথা নাড়লে, বললে—‘বুঝেচি—পিঁড়ি তুমি কার পিঁড়ি?…না, যে য্যাখন চেপে বসে আমি তারই পিঁড়ি….তা বলগে, ভারি পরোয়া করি আমি কারুর! খাই দাই গাজন গেয়ে বেড়াই। দেখলুম লোক সে রকম নয়, তাই, নইলে খোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিতুম, গাঁয়ের রাজা ব’লে ছাড়তুম না।
