কাঞ্চন-মূল্য – ১২
১২
ইচ্ছে করচে জানলা ফুঁড়ে ঢুকে আঁচড়ে কামড়ে দিই শেষ করে, তা তো হবার উপায় নেই। হাত আলগা হয়ে পেয়ারাগুনো প’ড়ে যেতে খেয়াল হোল, তা হলে ঐদিকে সব্বনাশ ক’রে দিই—আর না কুড়িয়ে ছুটে গিয়ে গাছে উঠে—পেয়ারা তো আর তেমন চোখে পড়চে না-কোষ্টে পাকা-ডাসা, ডালপালা যা হাতের কাছে পেলুম মটামট ভেঙে যেতে লাগলুম।
‘এই রে, হনুমানে সব্বনাশ করলে! —দূর, দূর!’
ওনার ওঠার আগেই নাপ্যে পড়েছি, তারপর একটা দুষ্টু বুদ্ধিও যুগিয়ে গেল। দুম ক’রে নাপ্যে প’ড়ে জানলার একটু কাছাকাছি এসে সুরটা বেশ নাকী ক’রে নিয়ে বললাম— ভেঁবেচ হনুমান? আঁমি হঁচ্চি ছিঁরুর মাঁ, তোমার পাঁপে পেত্নী হঁয়ে আঁচি-আঁর পাঁপ বাঁড়িয়েচ কিঁ ঘাঁড় মটকেচি—সোঁয়ামী বলে ছেঁড়ে দোঁব নাঁ!’
—বুঝলেন না?—স্ত্রীর পাপে সোয়ামীর পাপ, সোয়ামীর পাপে স্ত্রীর, এ তো শাস্তোরের কথা দা’ঠাকুর, ওনার গীতাই তো এক শাস্তোর নয়। -শাসিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি যটা পেয়ারা হাতে ঠেকল কুড়িয়ে নিয়ে দুড়দাড় ছুট।
আজ্ঞে, বললুম বৈকি দিদিমণিকে, নুকুবার কথা তো নয়।
দিদিমণি পেয়ারা ক’টা আমার হাত থেকে নৌছল, একটা আমায় দিয়ে একটা নিজে চিবুতে লাগল চুপ ক’রে ব’সে। একটু পরে বললে—‘যাক্, মস্তবড় একটা দুর্ভাবনা গেল।’
একটু আশ্চয্যি হয়েই মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলুম – ‘তুমি রাজী বিয়ে করতে?’ বললে’আজ হ’লে কাল চাই না। আমি তো ভাবছিলুমই—একাদশী ঘোষাল কথাটা তুললে তারপর আর ইদিকে সাড়াশব্দ নেই কেন? তার ওপর আবার মাসিমা অমন নটবর নাগর ওর ছাওয়ালটাকেও দিলে ভড়কে, ভাবছিলুম, ‘তাহলে কপাল বুঝি আমার একেবারে ভাঙল। তা দেখচি, মনে আছে।’
কিন্তু চাপা দিলে কখনও থাকে চাপা দা’ঠাকুর? চুপ করে আবার একটু পরে পেয়ারা নিয়ে দাঁতে কুটছেল, আস্তে আস্তে চোখ চেপে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে লাগল। মুখে যা বললে তা সে ওনার মনের কথা নয় এটা তো জানতুমও, আমি বললুম—‘তুমি ভেবোনি দিদিমণি, আমি বুদ্ধি ক’রে খুব একটা বাগড়া দিয়ে এসেচি, আর ওগুতে হেম্মৎ করবে না।’
দিদিমণি চিবোনো বন্ধ ক’রে আমার মুখের পানে চাইলে। তখন পেত্নী সেজে শাসিয়ে দেবার কথাটাও দিলাম ব’লে।
তখন অল্প বয়েস, মনে হয়েছিল কীই না গুরুতর একটা কাণ্ড করেচি, কিন্তু এখন তো বুঝি কী ছেলেমানুষিই হয়েছেল। দিদিমণি এ-ধরনের কথায় কান্নার মধ্যেও উল্সে উল্সে হেসে উঠত, শোনার সঙ্গে সঙ্গেই; সেদিন কিন্তু কথাটা শোনবার পর ঠায় একটু চেয়ে রইল আমার মুখের পানে, তারপর ঠোটে একটু হাসি ফুটল, যেন এতক্ষণে অর্থটা একটু ধরতে পেরেচে, ‘দেখো, শত্রুর নেগেচে সব আমার পেছনে, দিলে বুঝি আবার ভেস্তে। তা কি বললি তুই; কি ক’রে বললি?’
সবটা আউড়ে গেলুম। দিদিমণির মুখের হাসিটুকু আর একটু পষ্ট হয়ে উঠল, বললে ‘আর একবার বল্ তো! কী কুট বুদ্ধি রে ছোঁড়াটার, একটা ঝানু বুড়োকে ভয় দেখিয়ে এল।’
সুখ্যেতই তো; বাড়িতে কেউ নেই, আমি উঠে দাঁড়িয়ে দু’পা পেছিয়ে এসে হেলে দুলে একবার বেশ একটু গলা ছেড়ে নাকীসুরেই দিলুম আরম্ভ করে। আদ্ধেকটা বলেচি, দিদিমণি ও মুখে কাপড় দিয়ে হাসতে নেগেচে, এমন সময় বাবাঠাকুর এসে বাড়িতে ঢুকল, একবার সুদু একটু যেন কেমন ধারা ক’রে আমার দিকে ঘাড়টা ফিরিয়ে চাইলে, তারপর উঠোন বেয়ে সোজা ঘরে গিয়ে উঠল।
তার পরদিন কৈলীকে নিয়ে সকালে মাঠের পানে যাচ্চি, একটু গাঁয়ের আড়ালে গিয়ে পড়তেই দেখি বাবাঠাকুর হনহন ক’রে এগিয়ে আসছে; মজাপুকুর পেরিয়ে বললে—‘একটু দাঁড়িয়ে যাবি স্বরূপ।’
কাছে এসে জিগ্যেস করলে–’তা’হলে কাল তুই-ই গেছলি রাজুর ওখানে—পেয়ারা গাছটা শেষ ক’রে দিয়ে এসেছিস?”
নুকুবার চেষ্টাই তো করব, বললুম—“কৈ, না; কিছু জানিনে তো?”
জিগোলে—‘তাহলে ঐ পেত্নীর কথা কার কাছে শুনলি? নেত্যকে যে বলছিলি…’
লখ্নার নাম ধ’রে দোব কিনা ভাবছি, বললে— ‘পেয়ারাও তো নিয়ে এসেচিস বাড়িতে।’
এত সাবুদ, আর ধরে রাখতে পারব কেন মকদ্দমা? বললুম— ‘আর যাব না।’
ও নিয়ে আর কিছু বললে না; জিগ্যেস করলে—“কি কথা হচ্ছিল বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছিলি, না?’
বললুম— ‘না তো, বরাবর পেয়ারা গাছে ছিলুম।’
বললে—তাহলে পেত্নী সেজে অমন ক’রে শাসিয়ে দিতে গেছলি কেন রাজুকে?”
চুপ করে থাকতে হোল। বাবাঠাকুর কিন্তু ও নিয়ে আর বিশেষ কিছু বললে না, এখন তো বুঝি, দুটো কাজই ওনার মনের মতন হয়েছেল, সুদু বললে—‘খবরদার, ওদিকে আর যাবি নে, একটা মানী লোক।’
তারপর একটু চুপ ক’রে থেকে একবার চারিদিকটা চেয়ে নিয়ে আরও একটু এগিয়ে এল, আমার কাঁধে হাত দিয়ে একটু গলা খাটো ক’রে বললে—“হ্যাঁরে, তুই ওখানে যা যা শুনেচিস সব নেত্যকেও বলেচিস নাকি? ঠিক ক’রে বলবি, অন্যায়গুনো করেচিস, কিছু বললুম না, নুকুলে কিন্তু আর রেহাই নেই।’
বললুম—‘বলেচি।’
‘বিয়ের কথা পজ্জন্ত?
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
ত্যাতক্ষণে একটু বুদ্ধিও খুলেচে, জুড়ে দিলুম—‘না শুনে ছাড়লেন না; বিয়ের কথা কিনা।
জিগোলেন—‘তা কি বললে নেতা?’
বেশ দাঁওয়ের ওপরই মনে পড়ে গেল; বললুম –’বললেন- আজ হ’লে কাল চাই না।’ জিগোলেন—‘বললে তাই?’
বললুম— ‘এই আপনার পা ছুঁয়ে বলচি, মিথ্যে কইচি না।’
‘আর কিছু বলে?’
সেই কোন্ বছরখানেক আগে শোনা কথাটাও মনে পড়ে গেল, ভয়ের জায়গায় উল্টে বেশ খাতির জমে আসচে দেখে বললুম—‘বলছেল, কত্তার সঙ্গে হলেই ভালো হোত, একেবারে বাড়ির গিন্নীটি হয়ে ঢুকতে পারতুম; তা এই বা মন্দ কি?’
‘বললে তাই?’
বললুম— ‘এই আপনার পা ছুঁয়ে বলচি, মিথ্যে কইচি না। বাবাঠাকুর হাতটা ধরে ফেলল, বললে—‘থাক, থাক, আর পা ছুঁতে হবে না।’
বেশ খানিকক্ষণ আর কোন কথা নেই। বাবাঠাকুর ঠায় একদিকে চেয়ে চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেন আরও একটু কিন্তু হয়ে মুখটা আমার দিকে নামিয়ে নিয়ে এল, বললে—‘হ্যাঁরে স্বরূপ, তুই মেয়েটার কাছে কাছে থাকিস্ খুব-তোকে বড্ড ভালোও বাসে- সব কথা বলেও মন খুলে—আচ্ছা, ইয়ে—ওর খুব ইচ্ছে বিয়েটা এবার তাড়াতাড়ি হয়ে যাক, নয়?’
ঐ কথাটাই আবার বললুম—‘আজ্ঞে, তাই তো বলেন—আজ হ’লে কাল চাই না।’
বাবাঠাকুরের মুখটা ক্রেমেই যেন কি রকম হয়ে আসছেল, বললেন—‘হবে, তাই হবে; হুঁ….আর কিছু বলে নাকি?’
আমি ত্যাখন বাড়ির কত্তার সঙ্গে সমভাবে কথা কইচি, কতটা জানি, কতটা খোঁজ রাখি দেখাতে হবে না? আবার সেই বছরখানেক আগে শোনা কথাগুনো এনে ফেললুম—ওবিশ্যি ছেলেমানুষ সে-সব কথার তখন তো অত বুঝি না, একটা বাহাদুরী নিতে হবে তাই বলা; বললুম—নৈলে বিয়েই করবে না বলছেল—কলকেতায় চ’লে গিয়ে বেম্মজ্ঞানী হয়ে ইস্কুলে মাস্টারি করবে; আজকাল এমনও তো হচ্চে।’
একটু হকচকিয়ে গেল বৈকি বাবাঠাকুর; তারপর মুখের ভাবটা যেন আরও এলিয়ে এল, একটু কেমন ধারা হেসে বললে—“তাও বলে নাকি? হুঁ! তা অত করতে হবে না।’
একটা সংস্কেত ছড়াও আওড়ালে, কতকটা যেন নিজের মনেই। যোস্যো যাদ্দিশী―ক’রে শুরু ছড়াটা, উনি পেরায় বলত, এক আধবার দিদিমণিরও মুখেও শুনেচি—সংস্কেতটা বাপের কাছে উদিকে খানিকটে পড়েছেল তো—একবার অর্থও বলে দেছল আমায়—অর্থাৎ কিনা—যার যেমন সাধ তার হয়ও সেইরকম। ঠাকুরমশাই ছড়াটা কতকটা যেন নিজের মনে আউড়ে একটু হাসলে, তারপর আমার দিকে চেয়ে বললে—‘তোর সঙ্গে এই যে কথা সব হোল—এসব গিয়ে বলবি নি তো? বলিস নে তো কখনও?’
বললুম— ‘এজ্ঞে তা কখনও বলি?”
‘না, বলবিনে কখনও? বরং ও যদি কিছু বলে-টলে তো জানিয়ে দিবি আমায়।
একটু চোখ তুলে কি ভাবলে, মুখের ভাবটা সেইরকম যেন কেমন কেমন, দেখলে কষ্ট হয়—মা-ঠাকরুন গেল, তাতেও ঠিক এ-ধরনের মুখের ভাব দেখিনি দা’ঠাকুর,—চোখ তুলে কি একটু ভাবলে, তারপর আবার আমার দিকে দিষ্টি নামিয়ে বললে- ‘শুনলি তো, জানিয়ে দিবি আমায়—তেমন কিছু যদি বলে। বুঝলি না—মেয়ে—ও তো শ্বশুরবাড়ি গেলেই পর, তুই রাখাল হোস, যাই হোস, যেমন এখেনকার তেমনি এখেনকারই রইলি তো।…একবার কলকেটা দিতে হয় দা’ঠাকুর।
কয়েকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে স্বরূপ বললে—‘এই আগুন সাক্ষী দা’ঠাকুর—হাতেই রয়েচেন—কী প্রাণ দিয়েই যে দিদিমণিকে ভালোবাসতুম, ব’লে বুঝিয়ে উঠতে পারি নে। বাবাঠাকুরকেও তাই। কিন্তু সিদিন উনি ঐটুকু আত্তিস্য দেখিয়ে দুটো কথা জিগ্যেস করতে বাহাদুরি নেবার জন্যে কি আবোল-তাবোল যে ব’কে গেলুম, ওনাকে শক্ত আঘাত তো দিলুমই আর দিদিমণির যে কী ক্ষেতি করলুম তা ভাবতে এখনও দেহমন যেন ঝিমিয়ে আসে। বুঝলেন না?—সোমত্ত মেয়ে, তার কাছে বিয়েটাই এত বড় হয়ে উঠল যে আর বাদ-বিচার তো নেই-ই, না হ’লে কুল ছেড়ে বেম্মো পজ্জন্ত হয়ে যাবে; বাপ আর কেউ নয়। অথচ দিদিমণি যে কত খাঁটি-নকুলে মানুষ, ওপরে যাই বলুক, মনের কথাটা যে কী তা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। ফল এতে যা হয় তাই হোল। ওবিশ্যি বাবাঠাকুর কথা দিয়ে এয়েচে, তবু ফিরে এসে ভেবেচিন্তে আবার হয়তো দেখতো, বাড়িটা বেচে ফেলা পজ্জন্ত একটা রাস্তা খোলা ছেল তো—কি হোত না হোত বলা যায় না, কিন্তু আমার কথা শোনা ইস্তক উনি যেন মেয়ের ওপর অভিমানেই আর কিছু ভেবে দেখতে চাইলে না। বোশেখ মাসের শেষের দিকের কথা, জষ্টি মাসে জ্যেষ্ঠ ছেলের বিয়ে হবে না, গ্রাম সুদ্যু সবাই জেনে গেল, আষাঢ়ের গোড়াতেই রাজীব ঘোষালের ছেলের সঙ্গে অনাদি ভচায্যির মেয়ের বিয়ে হবে। বাড়িতেও তার তোড়জোড় প’ড়ে গেল।
ব্রেজঠাকরুন বাড়ি ছেল না দা’ঠাকুর। ত্রিবেণীতে গঙ্গাস্তানের যোগ ছেল একটা, সঙ্গী, পেয়ে উনি দুদিন আগে বেরিয়ে গেছল, তারপর সেখেন থেকে খড়দা, কালীঘাট, তারকেশ্বর আরও কি কি তীথি সেরে একেবারে হপ্তাখানেক পরে মসনেতে ফিরল। ত্যাখনকার দিনে তো আর এরকম রেল-জাহাজের ব্যবস্থা ছেল না, নৌকো আর হন্টন, বেরুলেই এইরকম দেরি হয়ে যেত। ব্রেজঠাকরুন ফিরল য্যাখন একটু বেলা পড়ে এয়েচে। বাবাঠাকুর কাঁটালতলাটায় একটা জলচৌকির ওপর বসে কাজীপাড়ার সত্য খলিফাকে দিয়ে বাড়ি মেরামত করাচ্ছেল -আজ্ঞে হ্যাঁ, আর দেরি নেই, ট্যাকা আনতেও আর বাধা নেই, বাড়িটা বেশ ভালো ক’রেই ঝালিয়ে নিচ্ছিল বাবাঠাকুর–দিদিমণিও মোকা বুঝে চাপ দিয়ে, চারদিক’কার দেয়ালটুকু উঠিয়ে নিয়েচে—ব্রেজঠাকরুন য্যাখন তীখি সেরে উঠোনে পদাপ্পন করলে, ত্যাখন প্রায় সব ফিনিস, মেরামতের কাজ সেরে চুনকামে হাত পড়েছে। তীথি সেরে মনটা বেশ তাজা রয়েচে, ব্রেজঠাকরুন উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একবার হাসিমুখে চারিদিকটা দেখে নিলে, বললে—‘বাঃ, এ যে দেখচি হাতে হাতে তীখির ফল!’
দিদিমণি নেমে এসে পা ধুয়ে দিয়ে পেন্নাম করলে। বাবাঠাকুরের ভুল হয়ে গেছল- শালীকে দেখলে তো আর জ্ঞানগম্যি থাকত না, তায় আবার আচমকা এসে পড়েছে, একটু কাঁচুমাচু হয়ে বললে—“হ্যাঁ দিদি, তোমার বোনের বাচ্ছরিকটা এসে পড়ল—বাড়িটুকু একটু ঝালিয়ে নিই…’
পেন্নামটুকু সেরে নিতে যাচ্ছেল, ব্রেজঠাকরুন দু’পা পিছিয়ে গিয়ে আরও একটু হেসে বললে—‘থাক, থাক্, এবার কার কাকে পেন্নাম করতে হয় তাই দেখো! বোনের বাচ্ছরিকের জন্যে তো আমার ভাবনার অন্ত নেই। হাতে হাতে তীখির ফলের কথা বলচি, আমার বিয়ের ফুল এতদিনে বুঝি আবার ফুটল—যার জন্যে এখেনে আসা… কৈগো, নেত্য, কোথায় গেলি?’
হাঁ করতেই দিদিমণি টের পেয়েছেল ঠাট্টাটা কোন্ দিকে এগুচ্চে। হাত থেকে পোঁটলাটা নিয়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়েছেল, ‘এই পুজোর ফুলগুনোও রেখে দে মা’—বলতে বলতে ব্রেজঠাকরুন উঠোন বেয়ে ঘরের দিকে চ’লে গেল।
একে ব্রেজঠাকরুন, তায় তিনদিন গাঁয়ের মুখ দেখেনি, ভালো ক’রে জিরোলও না, হাতে মুখে একটু জল দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দিদিমণি বললে—‘একটু কিছু মুখে দিয়ে গেলে না মাসিমা?’
বললে—‘এই এলুম বলে; না, খাব সেই একেবারে রাত্তিরে।’
উঠোন দিয়ে যেতে যেতে বললে— ‘না হয় উপোস ক’রেই থেকে যাই না, তোর বাবা এমন উজ্জুগি হয়ে লেগেছে, সদ্যসদ্যই হয়ে যাক, আর দেরি কেন?…কি গো অনাদি?’—বলে একবার হেসে বাবাঠাকুরের দিকে ঘুরে চেয়ে নিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। দিদিমণি আমায় চাপা … গলায় বললে— ‘দাঁড়া, কোঁদলের নাড়ি কোঁ-কোঁ করচে, ঘুরে ফিরে ভালো ক’রে খোলসা হয়ে আসুক, খাবে যে জায়গা কোথায়?’
আমি বড় ঘরের চৌকাঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আচি, দিদিমণি পোঁটলার জিনিসগুনো গোছগাছ ক’রে রাখছেল, আর ঐ রকম গল্প করছেল। শেষ হ’লে হাতে একটু তারকেশ্বরের ওলা আর এক গেলাস জল নিয়ে বেরিয়ে এসে বললে—“বাবা, এই একটু পেসাদ মুখে দেবে?’
কিন্তু কোথায় বাবা? দিদিমণি একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর সত্য খলিফাকে জিগ্যেস করলে’বাবা কমনে গেল দেখেচ সত্য কাকা?’
সত্য খলিফা একমনে দেয়ালের কার্নিসে চুনবালি ধরাচ্ছেল, ঘুরে দেখে একটু আশ্চয্যি হয়ে বললে—‘তাই তো, নেই দেখচি? ভাবছিলুম—কথাটা জিগ্যেস করলুম, উত্তুর নেই কেন!’
দিদিমণি হাসির চোটে পেটটা টিপে ধ’রে ছুটে এসে চৌকির ওপর লুটিয়ে পড়ল; কি হোল জিগোতে বললে- পালিয়েচে! ঠিক পালিয়েছে! মানুষটা সব বোঝে, শুধু মাসির ঠাট্টাটা বোঝে না…ওর ভয়, পাগল-ছাগল মানুষ, কখন কি মতিচ্ছন্ন হবে, দেবে বুঝি ধরে বেঁধে মালাটা গলিয়ে! আহা, দিব্যি ছিল সাতদিন রে—এইবার দেখ না—ভূত সাজবে, বেহ্মদত্তি সাজবে—বনেবাদাড়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবে…’
—বলে আর হাসিতে লুটিয়ে পড়ে, বাড়িতে দুটো জন খাটচে, খোলসা হয়ে হাসতেও তো পাচ্চে না।
ব্রেজঠাকরুন ফিরল সন্দের পর। ঘোষের পুকুর পজ্জন্ত ওনার সাড়া পাওয়া গেল, গরমকাল, গা ধুতে একপাল সব জুটেছে তো। তারপরেই ঠাণ্ডা, এল য্যাখন আর সে ব্রেজঠাকরুনই নয়। অমন হাসি-হাসি ভাব নিয়ে বেরিয়ে গেছল, য্যাখন ঢুকল, মুখটা একেবারে তোলো হাঁড়ি। আমি থেকে গেছলাম, মনটা ভালো আচে, তীখির গল্প বলবে, শুনব, তা একটি কথা নয়। দিদিমণি আমার দিকে আড়ে দেখে নিয়ে চোখটা একটু টিপে দিলে-অর্থাৎ কিনা, গতিক সুবিধে নয়। তাড়াতাড়ি আন্নিকের জায়গা করে দিলে, মটকার থানটা প’রে ব্রেজঠাকরুন ব’সে পড়ল। আজ্ঞে না, মাঝে-মধ্যিখানে–না রাম, না গঙ্গা, একটি কথা নয় আর। খানিকটে পেসাদ নিয়ে আমি বাড়ি চলে এলুম। পরের দিন হুলুস্থুলু কাণ্ড—একেবারে রাস্তা থেকেই।
একটু সকাল-সকালই আসচি সিদিন, একটা ধুকপুকুনি নেগে রয়েচে তো; মজাপুকুরটা ঘুরতেই দেখি সত্য খলিফা প্রাণপণে ছুটে আসচে, লুঙ্গিটা টেনে তোলা, হাতে চুনকামের কুঁচিটা কয়েক হাত পেছনেই ওর ছেলে মনছুর—যে যোগান দিচ্ছিল-হাতে চুনের গোলার হাঁড়িটা, ওবিশ্যি আধখানা—তা ফেলে দে হাঁড়িটা, তুইও হাতের কুঁচিটা ফেলে দে, কিন্তু কি বইচে না বইচে সাড় তো নেই—পড়ি তো মরি করে ছুটেচে দুজনে। ‘কি গো সত্য চাচা। কি ব্যাপার?’—তা জিগ্যেস করতে হ’ল না, একটু রাস্তার বাঁকটা ছাড়াতেই দেখি ব্রেজঠাকরুন গনগনিয়ে ছুটে আসচে, যেন মা অগ্নিশম্মা। হাতে সেইরকম একখানা চ্যালা কাঠ, মাথার চুড়োটা গেছে খুলে, চোখ দুটো জ্বলচে, মুখে কথা নেই।
তখুনি অবিশ্যি ফুটল কথা, তাইতে রহস্যটা পস্কের হোল কতকটা। অনেকখানি খেদিয়ে এনেচে, আর স্তীলোকই তো, তায় ভারী শরীল, দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর দুলে দুলে সেই ভাঙা কাঁশি—‘আয় না, আয়! পালালি কেন বাপব্যাটায়? তোদের পীরের দিব্যি আর। ঢের ট্যাকা দেখেচিস, রোজগার করে নে যা কিছু, পালালি কেন অমন ক’রে?…তবিল হালকা ক’রে দিয়ে যা খানিকটে…’
ঐ আপসানির মুখেই আবার ঘুরল, ত্যাতক্ষণে ওরা দুজনে তো গাজীপাড়া পৌঁছে গেচে। ত্যাখন কিন্তু আসল আপসানিটা আরম্ভ হোল, বুঝতেও পারলুম রহস্যটা—‘এলা যদি কোন রকমে হাঁড়ি চড়লো তো ওব্লা কি হবে যার ঠিক নেই—ধারে ধারে ভিটেমাটি চাঁটি হ’তে যাচ্চে-তার কিনা ঘটা ক’রে চুনবালি ফেরানো বাড়িতে—দেয়াল ঘুরিয়ে পর্দা তোলা!…বলি, রৈল পর্দা?-বংশে যা কেউ করেনি কখনও তাই যে করতে ব’সেচ-মেয়েবেচা আর কাকে বলে? তাও দান করবার য্যাখন মুরোদ নেই, বেচতেই হবে, না হয় একটু দেখেশুনেই বেচি—ঐ সোনার প্রিতিমে একটা অখদ্যে গেঁজেলের হাতে তুলে দিয়ে ঘটা ক’রে বাড়ির চুন ফেরাতে নজ্জা করচে না…’
শোনবার লোক নেই—আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবাঠাকুর আবার গাঁ ছেড়ে দিলে কিনা, এ কালবৈশিখীর ঝড়ের সামনে শুকনো পাতা একটা, পারবে কেন থাকতে?-তা উনি না থাক, গাঁয়ে লোক তো রয়েছে—ব্রেজঠাকরুন চান করতেই বেরিয়েছেল, গাঁ-ময় কেচ্ছা ছড়াতে ছড়াতে গঙ্গার ঘাটের দিকে চলে গেল।
সেই বেড়া আগুন আরও গনগনে হয়ে ফিরে এল। সাত দিন’দেখা নেই বাবাঠাকুরের। বয়েস হিসেবে আমার অত বোঝবার কথা নয় তবে পোড় খেয়ে খেয়ে বুদ্ধিটা আবার খোলে তো—বেশ টের পাচ্চি উনি এবার আখেরের জন্য ঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হোল। বুঝলেন না? অন্যবার তবু মেয়ের ওপর টান থাকে, এবার তো সেখেনেও মন ভেঙেছে, আর তাহলে কিসের বাড়ি কিসের ঘর? লক্ষণে তাই প্রেকাশও পেলে। অন্যবার যাবার আগে দিদিমণির হাতে যাই ক’রে পারুক কিছু দিয়ে যেত; এবার বরং হাতে ভালোরকমই কিছু ছেল, বাড়ি মেরামত আর বিয়ের যোগাড়-যন্ত্রের জন্যে ঘোষালমশাইয়ের কাছ থেকে বেশ মোটারকম কিছু এনেছেল তো, —তা একটি পয়সা দিয়ে গেল না দিদিমণির হাতে, অভিমানটা খুবই হয়েছে তো। তিনটে দিনের চালডালটা ছেল বাড়িতে; একটা মানুষ নেই, দিদিমণি ওটাকে টেনেবুনে পাঁচটা দিন পজ্জন্ত চালালে, টেনেবুনে মানে দুটো সন্দে অসুখের নাম ক’রে উপোসও দিলে। বলবেন—কেন, ব্রেজঠাকরুন তো এদানি খোঁজটোজ রাখত একটু সংসারের, সে টের পেলে না? -কিছু ব্যবস্থা করলে না?…আজ্ঞে টের কি পাচ্ছিল না, তবে ব্যবস্থা কেন কিছু করছিল না, জেনেও যেন না-জানার ভান করে কেন কাটিয়ে যাচ্ছেল সেটা পরে টের পেলুম।
পাঁচটা দিন কেটে গেচে, সকালবেলা কৈলীকে নিয়ে বেরুব, দিদিমণি টুকে দিলে— ‘স্বরূপ ব’সে যা, একটা সলা-পরামর্শ আচে।’
আর কিছু না ব’লে ভাঁড়ারঘরের মধ্যে চলে গেছল। আমিও এগিয়ে গিয়ে দোরের কাছে দাঁড়াতে চালের আর ডেলের তিজেল দুটো এক এক ক’রে উবুড় করে ধ’রে দুটো করে টোকা মেরে টনটন শব্দ ক’রে বললে— ‘মা-লক্ষ্মী একেবারে কামড়ে ধ’রে রয়েচে, উপুড় করলেও পড়ে না।’
এসে চৌকাঠের ওপর বসল। বসতে তো নেই, আমি বললুম—‘নেমে বোস দিদিমণি, চৌকাঠে বসলে ঋণ হয়।’
বললে—মর ছোঁড়া, সেই জন্যেই তো আরও বসব চেপে, কিন্তু দিচ্চে কে ঋণ?…ওরে, হয়েচে। ঋণের কথায় মনে পড়ে গেল!’
রহস্যটা তো জেনে গেচে, একটু সেই নকুলে হাসি হেসে বললে—‘দেখ ভুলেই গেছলুম —তুই একবার সেই নবীন স্যাকরার কাছে যা না, কত দেবে বলেছেল মাদুলিটার জন্যে? পঁচিশ ট্যাকা না?”
ব্রেজঠাকরুন বলেছেল পনের, আমিই দিদিঠাকরুনের ভরসা বাড়াবার জন্যে সেটাকে পঁচিশ ক’রে দিই, বললুম, ‘তাই যেন মনে হচ্চে।’
বললে—‘তার মধ্যে তিন খেপে দশটা ট্যাকা এনে দিয়েচিস তুই, বাকি থাকে পনের। তবে তো আমি বড় লোক রে!’
মিইয়ে থাকতে তো জানতই না, তার ওপর হঠাৎ একটা উপায় হওয়ায় ফূর্তি হয়েচে, দাঁড়িয়ে উঠে বললে—‘এই নে তোর চৌকাঠ ছাড়লুম, আমি আর এখন খাতক নয় তো, উলটে মহাজন। তুইও মহাজনের পেয়াদার মত একটা লাঠি হাতে ক’রে যা—এইরকম ক’রে বলবি…’
নকল ক’রে পেয়াদার মতন বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে হেসে ফেললে। তারপরই নরম হয়ে বললে—‘না রে, খুব ময্যেদা রেখে কথা বলবি, অমন মাসি আর হয় না। পোড়াকপালী যেমন জ্বালায় তেমনি সামলাতেও ওই। নিজের বাপ, তার তো ঐ ছিরি! কিন্তু তাকে পাবি কোথায় বলদিকিন?-একটু নিরিবিলিতে পাওয়া চাই তো।’
একটু ভেবে বললুম—‘ছিরু ঘোষাল আবার মিত্তিরদের মজাপুকুরের ধারে আসবে বলেচে বলে না হয় ডেকে নিয়ে যাব?”
দিদিমণি একটু হাসির সঙ্গে চোখ দু’টো বড় ক’রে নিয়ে বললে—‘ছোঁড়ার বুকের পাটা কম নয় তো! যা না, আস্ত পুঁতে রেখে আসবে ঐ মজাপুকুরে। দাঁড়া, হয়েচে, আমি তেলটা মেখে নিই তাড়াতাড়ি, মাসিমা নেয়ে এলেই আমি ঘোষপুকুরে চলে যাব। তুই সব বলবি। অবিশ্যি হাঁড়িতে একটাও চাল নেই ওকথা আর বলবি নি—এক নিজে উটকে দেখতে চায় সে আলাদা কথা, তুই তো আর বাধা দিতে পারবি নি?’
দিদিমণি ওনাকে ব’লে বেরিয়ে গেছে, উনিও উঠোনে ভিজে কাপড় মেলে দিয়ে তুলসীর ঝারিতে কমণ্ডলু থেকে গঙ্গাজলটুকু ঢেলে দাওয়ায় উঠেছে, আমি তুললুম কথাটা। ‘আমি জানিনে, ভালো ক’রে ঘরে চুন ফেরাতে বলগে যা’—বলে ভেতরে চলে গেল। দিদিমণি দুটো ফল আর একটু তারকেশ্বরের ওলা রেখে গিয়েছিল, খেয়ে একঘটি জল খেয়ে বেরিয়ে এল। আমারই ভুল হয়েছেল; পেটটা ঠাণ্ডা হতে মেজাজটা নরম হয়েছে একটু—আর সব দেখেশুনে তত কড়া মেজাজ ছেলও না তো ইদিকে—বলল—‘ট্যাকা চেয়েচে, তা-তো চাইবেই। আহা দুধের মেয়ে, নিয্যাতনটা দেখো না। তা হ্যাঁরে, নবীন স্যাকরা যে মাসি, সে-কথা বলিস নি তো?”
বললুম—‘আজ্ঞে, তা কখনও বলি?’
‘খবরদার বলবি নে। পুঁতে ফেলব।…টাকা চেয়েচে, আবার, না? মুশকিল হয়েচে। ঝোঁকের মাথায় পড়ে গেলুম—তীথিতে না বেরুলেই হোত, গেল তো কতকগুনো ট্যাকা বেরিয়ে। কত দেব বলেছিলুম?’
ভুলে গেছে তালের মাথায় তাড়াতাড়ি বলে দিলুম—‘পঁচিশ ট্যাকা।’
ব্রেজঠাকরুন চোক পাকিয়ে বললে—‘পনেরো!… ছোঁড়া আবার দালালি করে। যা দিই তা থেকে সরিয়ে রাখিস নে তো?”
বললুম–’না, এই পা ছুঁয়ে দিব্যি করচি।’
সামলেও তো নিতে হবে? বললুম—‘না, আমি বলছিলুম দিদিমণি বলছেল পঁচিশ ট্যাকা দাম হবে মাদুলিটার। নবীন স্যাকরাকে বলবি।
ব্রেজঠাকরুন বললে—‘তুইও বলবি—নবীন বললে পাঁচ ট্যাকাও দাম হবে না; না হয় ট্যাকা দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাও তোমাদের জিনিস।…শোন্, কাজের কথায় আয়! দশ ট্যাকা নিয়ে গেচিস তিন খেপে, আর পাঁচটা পাবি যা বলেছিলুম।’
তারপরেই চুপ ক’রে রইল; একটু পরে বললে— ‘তাই বা দিই কোত্থেকে?…চালডাল সব বাড়ন্ত?’
বললুম—‘একটি দানা নেই হাঁড়িতে।’
ব্রেজঠাকরুন আবার একটু খিঁচিয়েই উঠল, একটু কড়া চোখে চেয়ে বললে—‘ভালো দালাল পেয়েচে তো ছোঁড়াকে! কমিয়ে বলতে জানে না—ত্যাখন বললে পঁচিশ চেয়েছে, এখন বলে একটা দানা পজ্জন্ত নেই।’
সব্বদাই তো একটা না একটা নিয়ে মনের ওপর চাপ রয়েচে দা’ঠাকুর; বেশ আচি, বেশ আচি, এক এক সময় হঠাৎ মনটা উৎলে উঠত, আর সামলাতে পারতুম না। আমি দু’হাতে মুখ ঢেকে একেবারে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলুম, বললুম—‘আপনি দেখো না গিয়ে না হয়-হাঁড়ি উলটে দেখালে আমায় দিদিমণি-আমি মিচে বলব কেন?—দুদিন উপোস ক’রে ছেল—কাঁদে ব’সে ব’সে-বলে উপোস করলেও যদি মরণ হয়…’
কতক সত্যি কতক তার সঙ্গে বানিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে ব’লে যাচ্চি কান্নার সঙ্গে সঙ্গে, ব্রেজঠাকরুন এসে আমার পিঠে হাত দিয়ে টেনে নিলে, বললে—‘চুপ কর স্বরূপ, বুঝি না কি?—সব বুঝি। আমি অভাগীই বা কি বল্ না? ভেয়ের ঝি-গিরি ক’রে পেট চালাচ্ছিলুম—ছোট ভেয়ের-বাক্যিযন্ত্রণা আর সহ্যি করতে না পেরে পালিয়ে এলুম—ভাবলুম তারা গরিব হোক, লোক ভালো, তা এয়েচি পজ্জন্ত এখানেও দিন দিন যেন শুকিয়ে যাচ্চে সব। একটা যেন বোঝা হয়ে রয়েছি, বুঝি না কি?…তার ওপর পোড়া ভগমান এক মেজাজ দিয়েচে; কিন্তু করি কি? ধুলে তো কয়লার স্বভাব বদলাবে না। তারপর এই দেখ না; তীখি করতে বেরিয়ে মনে করলুম একবার ভেয়ের ওখান থেকে হয়ে আসি—হিসেব করে দেখলে শ’দেড়েক ট্যাকা রয়েচে ওদের কাচে, সময়ে সময়ে চেয়ে নিয়েছেল—মনে করলুম দেখি, যদি পাই, এখন যাদের ঘাড়ে চেপে রয়েছি, তাদের উবগার হবে-তা একটি পয়সা উপুড় হস্ত করলে?—স্রেফ ন্যাকা সেজে বসল বউ-গরিব বাপ মা, ন’বছরে বিয়ে দিয়ে দেছ’ল একটা হলদে শাড়ি পরিয়ে—বিয়ে নয় তো, সংসারে একটা খাবার মুখ কমানো—বছর না ঘুরতে কপাল ভাঙল—একটা সোনাদানা তো আর গায়ে উঠতে পেলে না যে…’
আজ্ঞে, ঐ অধিই, আর শেষ করতে পারলে না, প্রায় বছরখানেক হ’তে চলল এয়েচে ব্রেজঠাকরুন, কাঁদতে দেখিনি কখনও, সেই প্রেথম দেখলুম, আমায় চেপে ধ’রে এক হাতে আঁচলে মুখ চেপে সে-কান্না আর থামতে চায় না। দিদিমণি নেয়ে এল; এদানি একলা বেশিক্ষণ বাইরে থাকত না তো। চৌকাঠ ডিঙিয়ে উঠোনে পা দিতেই আমাদের দেখে আবার খপ ক’রে বেরিয়ে আড়াল হয়ে গেল। আমি ইদিকে বেজায় অস্বস্তিতে পড়ে গেচি। ছেলেমানুষ, এমন অবস্থায় এমন মানুষকে কি ব’লে সান্ত্বনা দিতে হয় জানিনে, অথচ ছেলেমানুষ বলেই সান্ত্বনাটা যাতে খুব হালকা ধরনের না হয়ে যায় সেদিকটাও নজর রাখতে হবে, অনেক ঠাউরে ঠাউরে বললুম—‘চুপ করো মাসিমা। কপাল ভেঙেচে, তেমনি আবার আজকাল তার ব্যবস্থাও তো করে দিয়েচেন বাবা তারকনাথ—দিব্যি বিধবা-বিয়েও তো হ’চ্চে চারিদিকে—‘
আমার তো ঐ রোগ ছেল দা’ঠাকুর, একটা মানুষ কেঁদে একটু হালকা করবে বুকটা তা বাহাদুরি করতে গিয়ে ঐরকম পণ্ড ক’রে দিতুম সব। ব্রেজঠাকরুন একটুখানি সামলে থাকবার চেষ্টা করলে, তারপর আঁচলের মধ্যেই চাপা হাসির একটু শব্দ উঠল। বললে—‘কথা শোনো ড্যাকরার, মরা মানুষকে হাসিয়ে ছাড়ে।’
আঁচলটা সরিয়ে কিন্তু আর একেবারেই চাপতে পারলে না হাসি। কি একটা বলতে চায়, তা য্যাতবারই মুখ খোলে ডুকরে ডুকরে হেসে ওঠে, তারপর—‘কি গেরো গা!” বলে অনেকক্ষণ পরে সামলে নিয়ে একটু চুপ করে থেকে বললে—‘শোন, তুই তো জানিসই সব কথা সংসারের, ইদিককার কথাও শুনলি, আমার হাত একেবারে খালি হয়ে এয়েচে, ছিলও না . তো কিছু, না, সোয়ামী, না পুত; শ্বশুরের ভিটে বিক্রি হয়ে যেতে, ভাসুর দয়াধম্ম ক’রে কিছু দেছল হাতে তুলে—ঐ একটি নোক ছেল মানুষের মতন—তা ভালো মানুষ তো কপালে ঢেঁকবে না!…’
আবার আঁচল তুলে চোখ মুছলে। কি বলতে কি ব’লে আবার বে-মোকা হাসিয়ে দোব, আমি জিভ কামড়ে চুপ করে রয়েছি, নিজেই আবার ঠাণ্ডা হয়ে বললে—‘মরুককে, কাকেই বা যে শোনাচ্চি…তোকে যা বলছিলুম, হাত একেবারেই খালি হয়ে এয়েচে—তবুও টেনেটুনে পঁচিশটে ট্যাকাই দোব—বলবি, নবীন স্যাকরা বলেচে পঁচিশটে ট্যাকাই দোব, তবে বাজার মন্দা, একসঙ্গে পারবে না, একটা দুটো যেমন পারে দিয়ে যাবে। বুঝলি নে? হাতে থাকলেই খরচ ক’রে ফেলবে—-এইরকম এক আধটা ক’রে দিলে টেনে খরচ না ক’রে উপায় থাকবে না।…তারপর হরোর বাচ্ছরিকটা এসে পড়ল, কিছু নয়, কিছু নয় করেও গোটা চার-পাঁচ ট্যাকা যাবে বেরিয়ে। আর ঐ এক বেয়াক্কেলে মানুষ দেখ না, সংসারটা পাগল সোয়ামী আর একটা অপোগণ্ড মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে কেমন দিব্যি স’রে পড়ল, হয়তো ভাবলে, কেন, অমন শাঁসালো দিদি তো র’য়েচে। পোড়াকপাল!’
আবার চোখটা মুছতে মুছতে ঘরের মধ্যে গিয়ে দুটো ট্যাকা নিয়ে এসে আমার হাতে দিলে, বললে—‘যেমন’ যেমন বললুম, বলবি, নবীন স্যাকরার নাম ক’রে। আর ইদিককার কথা উদিক, উদিককার কথা এদিক করবি নে। করিস?”
বললুম—‘আমার কি দরকার ক’ন না।’
‘না, তুই করিস, এই তো বললি তোর দিদিমণি কাঁদছেল, বলছিল মরণ হয় না। তা আমায় কাঁদতে দেখেচিস?’
কটমট ক’রে মুখের পানে চেয়ে রইল, বললুম— ‘আপনি তো বরং প্রাণ খুলে হাসছিলে।’
বললে—‘হাঁসি, কাঁদি আমার অভিরুচি, তুই পাঁচকান করতে যাবিনে, পুঁতে ফেলব। যা, তাড়াতাড়ি ঘুরে আয় বাইরে থেকে—যেন নবীন স্যাকরার ওখান থেকে আসচিস।’
