কাঞ্চন-মূল্য – ৮
৮
গোটাকতক কষে টান দিয়ে কলকেটা আবার বসিয়ে দিয়ে বললে— ‘তবে সে সব ভোলবার কথাও নয়, গেঁথে ব’সে আচে মনে।…’
দুটো দিন পরের কথা। এ দুটো দিন ব্রেজঠাকরুন ক্রেমাগতই আমায় তাগাদা করচে, সে এমন যে বুঝচি কোঁদলের নাড়ি কোঁ-কোঁ করচে, তবুও এক একবার যেন সন্দো ধরে যেত, সত্যি দিদিমণি যেমন বললে,—য্যাত দেরি হবে ত্যাতই টান হবে ইদিকে, তাই হোল নাকি শেষ পজ্জন্ত? আমায় দিদিমণি যেমন যেমন শিখিয়ে দেয় তেমনি তেমনি ক’রে বলি—ঘোষালের পোর মাথা ধরেচে তো, বলচে সকালে আসবে, তো আজ বিকালে নিশ্চয়; ব্রেজঠাকরুন আনচান করে বেড়ায়, বলে—“কৈ রে স্বরূপ, আসে না যে?…কৈ, এল না তো আজও? আবার একবার যাবি—বলবি তিনি আর ধৈর্য্য ধরে থাকতে পাচ্ছেন না যে।’
দিদিমণি বলে—‘দেখছিল তো দময়ন্তীর অবস্থাটা? এইবার দেখবি পালা কিরকম জমে!’
এই ক’রে দুটো দিন কেটে গেল দা’ঠাকুর। তারপর তিন দিনের দিন রসের নাগর এসে উপস্থিত হলেন। দিদিমণিই তো অন্তরীক্ষ থেকে কলকাঠি নাড়চে সব, আমায় যেমন যেমন বলচে তেমনি তেমনি ক’রে দুদিকে বলচি, ব্রেজঠাকরুনকে বললুম— ‘আজ নিশ্চয় আসবে বলেচে, তবে কখন আসবে তা বললে না, গুলিখোরের মেজাজ, অত খেঁচকে জিগ্যেস করতেও ভরসা হোল না আমার।’
কথাটা আমায় দিদিমণি যা বুঝিয়ে বললে দা’ঠাকুর; বললে- ‘বুঝচিস না স্বরূপ? অন্যদিন বলিস সকালে আসবে কি দুপুরে আসবে কি বিকেলে আসবে, মাসিমা সেই সময়টুকুই ওপিক্ষে ক’রে থাকে, এ কখন আসবে তার ঠিক নেই, সকাল থেকেই ওপিক্ষ্যে করতে করতে মাথায় আরও আগুন ধ’রে থাকবে’খন। ঐ ক’রে বলবি, যেমন বলে দিচ্চি।’
তা সত্যিই দা’ঠাকুর, অন্য দিন অন্য সময়টা একটু একথা-ওকথা নিয়েও থাকে, হোল তো দুটো সংসারের কথাই—সেই যিদিন ট্যাকা কটা বের ক’রে দিলে সিদিন থেকে ভেতরকার কথাও তো জেনেচে; কিছু না পেলে তো বাবাঠাকুরের সঙ্গে বিয়ে নিয়েই দুটো ফষ্টি-নষ্টি করলে; উনি ভালোমানুষ, সত্যিই তো আতঙ্ক ধরে গেছে কোন্ দিন কি ক’রে বসে—অন্যদিন থাকে এইরকম দুটো একথা সেকথা নিয়ে, তা সিদিন আর কিছু নয়—আমি য্যাখন কৈলীকে নিয়ে এলুম, একটু সকাল ক’রেই এলুম সিদিন, দেখি মুখটা থমথম করচে—সেই সকাল থেকে গরম রক্ত ঠেলে মাথায় উঠচে তো ক্ৰেমাগত। আমি এলুম তাও একটা কথা নয় এখনও এল না কেন, কি বিত্তান্ত। কিছু নয়; একবার শুধু আড়চোখে চেয়ে দেখলে, তারপর আবার যেমনকার তেমনি।
গৈলে গিয়ে গোরুটাকে বাঁধচি, দিদিমণি পা টিপে টিপে এল, ফিসফিস করে জিগ্যেস করলে— ‘আসবে তো রে?’
বললুম—হ্যাঁ, এসে পড়ল বলে।’
‘তুই গিয়েছিলি বিকেলে?’
বললুম—‘হ্যাঁ।’
‘যেমন যেমন বলেছিলুম সব ঠিক আচে তো?’
বললুম— ‘একটু বেশি করেই ঠিক আচে দিদিমণি, তুমি তো বলে দেছলে ক’নের ইচ্ছে একটু কামিয়ে-কুমিয়ে ভালো ক’রে সেজে-গুজে আসে, তা ওরা একেবারে রাজবেশের ব্যবস্থা করেচে। মনে হোল যেন সিদিনে যাত্রায় ভৈরবদাস রাজা শিখিধ্বজের পাটে সেটা পরেছেল।’
দিদিমণি দুহাতে মুখটা ঢেকে হাসির চোটে একেবারে উলটে পড়বার দাখিল, চোখ দুটো বের করে মাথা নেড়ে জিগোলে’সত্যি নাকি? তাহলে দেখ আরও নতুন কি কি করে; করবেই এই বলে দিলুম। সত্যি যাত্রার সাজ?’
বললুম—‘হাঁ সত্যি, আমার সামনেই তো জ’টে পোঁটলাটা নিয়ে এল, আমায় শাসালেও —দুটো ট্যাকা ভাড়া লাগল, পাঁচটা ট্যাকা জামিনও ধরে রাখলে নুটু অধিকারী, যদি গচ্চা যায় তো তুই আচিস কি আমি আছি।’
দিদিমণি বললে—‘মুয়ে আগুন, সাথপর! কোথায় দুটো ট্যাকা খরচ হয়েচে তাতেই সারা, আর উদিকে একটা অবলা- সরলা-বিলাবালা যে হা-পিত্যেশ ক’রে…
চাপা হাসিতে মুখটা সিঁদুরবর্ণ হয়ে উঠেচে, মুচে নিয়ে বাইরের দিকে চোখ পড়তেই শিউরে উঠে বললে- ‘ওরে স্বরূপ, সব্বনাশ, উদিকে ক’নে যে বিবাগী হয়ে বেরিয়ে চলল।’
ঘুরে দেখি, সত্যি! ব্রেজঠাকরুন এতক্ষণ উঠোনে দশ-আনি তরফের পিঁজরের বাঘটার মতন পায়চারি করছিল, হঠাৎ কি মনে হয়ে হনহন ক’রে সদর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্চে। দু’জনেই আমরা নিঃসাড় হয়ে গেচি, রাগী মানুষ, ক্ষেপে গেল নাকি?—এমন সময় দেখি আবার সেই রকম ক’রে ফিরে আসচে। দাওয়ায় দড়ির আলনায় গামছা টাঙানো ছেল, কাঁধে ফেলে নিলে, তারপর আবার হনহন ক’রে বেরিয়ে গেল।’
বাড়িতে আর কেউ নেই। অন্যদিন বাবাঠাকুর হয় থাকে না হয় বেরোয়; দিদিমণি জানে ছিরু ঘোষাল আসবে না, আর কিছু বলে না; আজ তানাকে ইচ্ছে করেই একটা জিনিস কেনবার নাম ক’রে তিনখানা গাঁ পেরিয়ে বাতাসপুরের হাটে পাঠিয়ে দেছল। খালি বাড়ি পেয়ে দুলে দুলে হাসতে নাগল দিদিমণি, বলে—‘মাথায় আগুন ধ’রে গেচে রে স্বরূপ, আর পারলে না। পারে কখনও?—চলল ঘোষপুকুরে ডুব দিতে —আহা, তা দিয়ে আসুক গোটাকতক, নৈলে ক্ষেপে যাবে যে! আজ আবার সমস্ত দিন একেবারে মুখ খোলেনি—ঐ মানুষ! আহা, দিয়ে আসুক। আমি শুধু ভাবচি—আগুন যদি নিভেই গেল তো এত মেহনত ক’রে আমার শুধু ভস্মে ঘি ঢালাই যে সার হোল! ‘
বললুম—“না হয় গিয়ে বলি-নেয়ে কাজ নেই এখন, ও এক্ষুণি এসে পড়বে।’
দিদিমণি হাসিতে একেবারে ভেঙে পড়ল, বলে—‘দেখো, কার মরণ কার ঘাড়ে এসে পড়ে। ও-ছোঁড়ারও মতিচ্ছন্ন ধরেচে, ঐ মানুষকে এখন পিছু ডাকতে যাবে!…চিবিয়ে গিলে ফেলবে একেবারে, চিহ্নও রাখবে না।’
খালি বাড়ি, সকাল থেকে চেপে চেপে রেখেচে হাসি – আজ সারাদিন ব্রেজঠাকরুন একবারও নড়েনি তো—বিনিয়ে বিনিয়ে বলচে আর ডুকরে ডুকরে হেসে উঠচে, এমন সময় হঠাৎ এক বিপরীত কাণ্ড দা’ঠাকুর, পেল্লায় এক আওয়াজ—‘স্বরূপে!!’
ভাঙা কাঁশিই,ও আর ভুল হবার জো নেই তো। দিদিমণির দিকে চেয়ে দেখি সেও যেন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেচে, চাপা গলায় জিগ্যেস করলে–’হঠাৎ কি হোল রে আবার!’
কি বলব ভাবচি এমন সময় ব্রেজঠাকরুন একেবারে গনগনিয়ে চৌকাঠ ডিঙিয়ে আবার ডাক দিলে— ‘স্বরূপে! বলি কোথায় গেলি!’
এবার আর সে আওয়াজ নয়, একেবারে নরম, তবে গৈলে থেকে দেখচি চাপা রাগে সমস্ত শরীলটা কাঁপচে। দিদিমণি ত্যাতক্ষণে সামলে নিয়েচে, বেশিক্ষণ কোনও ধাঁধায় প’ড়ে থাকবার মেয়ে ছেল না তো; ফিসফিস ক’রে বললে— ‘নিগ্যাৎ এসে গেচে গুলিখোরটা, রাজবেশ তো, তাই ধোঁকা লেগে গেচে, তুই ঘাবড়াস নে।’
‘কি গা মাসিমা?’—–বলে আমি হাতের জাবনা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলুম।
বললে—‘এগিয়ে আয়।’
কাছে যেতে বাঁহাতে কড়কড়িয়ে আমার একটা কব্জি চেপে ধরে বললে—‘চল্ বাইরে আমার সঙ্গে।’
হিড়হিড় ক’রে টানতে টানতে সদর দরজা থেকে বেশ খানিকটে দূরে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল, সেইরকম চাপা গলায়ই জিগ্যেস করলে—‘মাদার গাছটার নিচে অন্ধকারে ঝোপের মধ্যে কে ও লোকটা?”
এতক্ষণ ঘাবড়াইনি দা’ঠাকুর জানি তো কি হ’তে চলেচে, এখন আবার অন্ধকার, আর মাদার তলার ঝোপের কথায় একটু যেন খটকা নেগে গেল, ব’লে বসলুম— ‘জানিনে তো।’
বুঝলেন না?—কথা ছেল বেশ একটু গা-ঢাকা গোছের হ’লেই ছিরু ঘোষাল সেজেগুজে একেবারে সদরে উপস্থিত হয়ে আমার নাম ধরে ডাকবে। গুলিখোর, না হয় অতটা তাল রাখতে পারেনি, বাইরে এসে ব’সে আছে কোথাও গুটিসুটি মেরে—দিদিমণি যেমন বললে-রাজবেশ দেখে ধোঁকা নেগে গেচে ব্রেজঠাকরুনের। এ একেবারে অতখানি তফাতে মিত্তিরদের পোড়োবাড়ির মাদার তলায়, ঝোপের মধ্যে—আমি বেশ একটু ধাঁধায় পড়ে বলে বসলুম- ‘জানিনে তো।’
‘জানিস, তুই অনেক কিছুই জানিস হারামজাদা, তোর কোনও গুণে ঘাট নেই….দাঁড়া এইবার বাপের সুপুত্তুর হয়ে বলবি।’
দিদিমণি ইচ্ছে করেই খানচারেক আধপোড়া চ্যালা কাঠ ইদিকে উদিকে ছড়িয়ে রেখেছেল, যাতে প্রয়োজনের সময় না খুঁজতে হয় ওনাকে; আমায় টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে একখানা তুলে নিলে, তারপর মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে বললে—‘এইবার বলবি। বল্ কে ও, আর কার কাছে তুই চিঠি নে যাস নেত্যর? জমিদারের ঘরের ছেলে- যেন মনে হোল ঘোড়ায় চড়ে; বল শিগগির, নয় তো দিলুম এই বসিয়ে।’
আজ্ঞে হ্যাঁ, গুলিখোর কটা মাথা একত্তর হয়েছে তো? ত্যাখন বললুম না? ভালো ক’রে সাজতে হবে তা নুটু অধিকারীর ওখেন থেকে যাত্রার সাজ ভাড়া করেছে, তাতেও মন ওঠেনি- রাজা, সে যাবে হেঁটে! স্বয়ম্বরের জন্যে মন ভেজাতে যাচ্চে না!
ব্রেজঠাকরুন বুঝি ইদিকে দিলে পোড়া কাঠটা মাথায় বসিয়ে নিজেদের কুবুদ্ধি নিজেদেরই ঘাড়ে এসে পড়ল বুঝি, এমন সময় স্বয়ং রাজা শিখিধ্বজ ঘোড়ায় চড়ে আসরেতে অধিষ্ঠান হলেন—পায়ে জরিদার নাগরা, তার ওপর মখমলের ইজের, তার ওপর সলমা চুমকি বসানো আলখাল্লা একটা, মাথায় বকের পালক গোঁজা পগ্গ। চ্যালাখানা ওঠাতে দেখে দিদিমণি ছুটে বেরিয়ে আসছেল বাড়ি থেকে, চৌকাঠের ওপর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ছিরু ঘোষাল একলা নয়, জ’টে সঙ্গে আচে। সঙ্গে থাকা মানে -নটবর পালের হেটুরে ঘোড়া—এক হাট থেকে অন্য হাটে বাসনকোসনের ঝাঁকা ব’য়ে নে যায়, রাজ-রাজড়া বইবার অব্যেস নেই তো, নড়তে চাইবে কেন?—জ’টে খানিকটে ক’রে পেছন দিক থেকে ঠেলে দিচ্চে, আবার চারটে পা পুঁতে দাঁড়িয়ে পড়চে। বাসন ব’য়ে ইহকালটা কাটালে, রাজ্যভার সইবে কেন দা’ঠাকুর?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ত্যাতক্ষণে ব্রেজঠাকরুনের হাতে চ্যালা কাঠটা আলগা হয়ে গেছে বৈকি, দূর থেকে অন্ধকারে ঘোড়া দেখেছেল তো ঘোড়া দেখেছেল একটা, তো সে যে এ-হ্যান চিজ তা তো জানত না; একেবারে নির্ব্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। উদিকে ওনারা ঐরকম ঝাঁপতালের ঝোঁকে ঝোঁকে এগিয়ে আসতে থাক্।
যদি বলেন নোক দেখে ওদের হুঁশ হোল না কেন তো গুলিখোরদের মনমেজাজের একটু সন্ধান রাখতে হয় দা’ঠাকুর, আমার ঘাঁটা আচে কিনা খানিকটে। ওদের মাথায় একটা কথা যে সেঁদিয়ে যায় তাই নিয়েই থাকে পড়ে;–স্বয়ম্বরে যেতে হবে তো স্বয়ম্বরে যেতে হবে-তারপর পিথিমীর কোথায় কি হচ্চে না-হচ্চে সে হুঁশ তো থাকবে না কিনা। ছিরে নটবরের হেটুরেটার ওপর বুঁদ হয়ে ব’সে আচে, পড়বার ভয় নেই, একটু পা বাড়ালেই মাটি, আর জ’টে যাচ্চে ল্যাজ মোড়া দিয়ে ধাপে ধাপে চালিয়ে। তারপর খটকা হ’তে হ’তে ত্যাতক্ষণে আরও এগিয়েও তো এয়েচে খানিকটে, আমায় চিনতেও তো পেরেচে; ওখান থেকেই জিগ্যেস করলে, জ’টেই জিগ্যেস করলে–’মণ্ডলের পো না?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এই যে।’
আরও দুটো ঠেলায় কাছে এসে পড়ল। ওই জিগ্যেস করলে—‘এগিয়ে নিয়ে যেতে এয়েচিস?’
আমি একবার ব্রেজঠাকরুনের দিকে চাইলুম, একেবারে যেন বাকরোধ হয়ে দাঁড়িয়ে আচে। ত্যাতক্ষণে ওনার সন্দোটাও মিটে গেছে যে আর কেউ নয়, তবে এ-দিশ্য যে দেখতে হবে ভাবতে পারে নি তো, একেবারে কাঠের পুতুলটি হয়ে দাঁড়িয়ে আচে। একবার উরি মধ্যে উদিকে চেয়ে দিদিমণি সেইরকম ঠায় চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁতে নখ খুঁটচে; এই ধরুন না কেন শ’খানেক গজ দূরে।
ওরা দুজনে একটু ঝিমিয়ে নিলে, মেহনত হয়েছে তো; আর পৌঁছেও গেচে ভালোয় ভালোয়; নিশ্চিন্দি। একটু ঝিমিয়ে নিয়ে ছিরু জিগ্যেস করলে–’তা সঙ্গে কে ও?’
ব্রেজঠাকরুন ত্যাখনও ঠায় একভাবে দাঁড়িয়ে। দেখে যাচ্ছে! আমি ওনার মুখের দিকে চেয়ে কোন উত্তুর না পেয়ে কি বলব ভাবচি, ছিরু জটেকে পরামর্শ করলে— ‘জিগ্যেস কর্ তো ক’নের সহচরী কিনা।’
রাজা, সে আবার সোজাসুজি মেলা কথা কইতে পারে না তো যার-তার সঙ্গে, তাই যেন মন্ত্রীকে আদেশ করা হোল। এই ত্যাখন গিয়ে যেন সাড় হোল ব্রেজঠাকরুনের। কি উত্তুরটা দেব ভেবে ওনার দিকে চেয়েচি, ব্রেজঠাকরুন নিজেই মাথা নেড়ে নেড়ে বললে —হ্যাঁ সহচরীই, তা রাজকুমারীকে এই নিয়ে আসি, নিরিবিলিতে তো বাড়ির মধ্যে সুবিধে হবে না; এই নিয়ে এলুম বলে, ত্যাতক্ষণ আপনি একটু ধৈর্য্য ধ’রে থাকো।’ বলতে বলতে গটগট ক’রে চলে গেল বাড়ির দিকে; একবার পেছন ফিরে দেখলুম–দিদিমণি যে চৌকাঠের ওপর দাঁড়িয়ে আচে, ভ্রূক্ষেপও নেই, একটি কথা জিগ্যেস করলে না তানাকে, হনহন ক’রে পাশ দিয়ে ভেতরে চলে গেল।
ওবিশ্যি চেষ্টা করেছেল কথাগুনো মিষ্টি করেই বলতে, তবে চোপোর দিনের রাগ শরীলটাতে জমানো রয়েচে, কতটা আর মিষ্টি করতে পারবে ক’না। ছিরু পিটপিট ক’রে একটু সামনে চেয়ে দেখলে, তারপর বললে—‘জ’টে পেছনে আছিস তো?…কি রকম বুঝচিস?”
জ’টে বললে—“তা সে-কথা ঠিক-বাড়ির চেয়ে কুঞ্জই ভালো। আমি তাহলে না হয় একটু তফাত হয়ে দাঁড়াইগে ত্যাতক্ষণ?’
‘সে কথা বলচিনে; সহচরীর মেজাজটা একটু তিরিক্ষি ব’লে মনে হোল না যেন? চেহারাটাও তো বেশ মোলায়েম ব’লে বোধ হ’ল না।…মণ্ডলের পো, তুই তো ব’লতে পারিস।’
সত্যি কথা বলতে কি, আমারও ত্যাতক্ষণে ভয় ঢুকে গেচে দা’ঠাকুর। এতক্ষণ যে ভেবে- ছিলুম দিব্যি একটা নকল দেখব ঘরে বসে, তা নকল তো আর থাকবে না ব্যাপারটা। যে ভাবে গেল বাড়ির মধ্যে, কি নিয়ে আসবে, কি করবে কে জানে? ভাবলুম পাপ সরিয়েই দিই না হয়।’ বললুম— ‘এমনি তো খুব ঠাণ্ডা মেজাজ, তবে একটু ক্ষ্যাপাটে, এক এক সময় সেইটে চাগিয়ে ওঠে।’
ভয়ের সামনে তো নেশা নয় দা’ঠাকুর; দুজনেই ঘুম-ঘুম চোখ দুটো চাড়া দিয়ে চাইলে আমার দিকে, ছিরু জিগ্যেস করলে — ‘চাগিয়ে ওঠে! কৈ, বলিস নি তো সে কথা।’
বললুম—ঠিকই ছেল তো; তা আপনাদের বিলম্ব হতে ক’নে ঝালটা সহচরীর ওপরই ঝাড়লে কিনা এতক্ষণ ধ’রে।’
ছিরু জ’টের পানে চেয়ে বেশ ব্যাজার হয়ে বললে—‘তোকে বললুম ত্যাখন, আর ছিলিম সাজবার দরকার নেই ওখেনে গিয়ে। মিত্তিরদের পোড়ো ভিটেতেই দেরি হয়ে গেল তো; ঐ শোন, কি বলে এখন।’
জ’টেও বেশ চাঙ্গা হয়ে গেচে দা’ঠাকুর, আর তকের দিকে না গিয়ে বললে—তা’হলে ঘুরিয়ে নে না হয় ঘোড়ার মুখটা।’ আমায় চোখ রাঙিয়ে বললে—‘বলে দিবি ওদের বিলম্ব দেখে আমাদের মেজাজও বিগড়ে গেল; এই ফিরে চললুম রাগ ক’রে।’
ত্যাতক্ষণে ব্রেজঠাকরুনও বেরিয়েচে উদিকে। বেরিয়ে একেবারে নিজ মূত্তি! —ঘোড়ার মুখ ফেরালে কেন রে স্বরূপ? আগলে রাখবি।’
আগলাবার দরকার নেই কষ্ট ক’রে, আরবী ঘোড়া নিজের চারিদিকে চারটে পা পুঁতে দাঁড়িয়ে গেল, ঠেলাও মানে না, ধমকও মানে না।—ওবিশ্যি আমার অনুমান, তবে ব্রেজঠাকরুন বোধ হয় কাটারিই আনতে গেছল, তা দিদিমণি তো যাতে হাতিয়ার সব সরিয়ে রেখেছেল বুদ্ধি করে, না পেয়ে একখানা আস্ত চ্যালাকাঠই টেনে নিয়েচে, একেবারে অগ্নিশম্মা হয়ে ছুটে আসতে আসতে বললে—‘সবুর কর, এই নিয়ে আসচি কন্যেকে!’
জ’টে একবার পেছনে দেখে নিয়ে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে দিলে ছুট ঘোড়া ঠেলা ছেড়ে। একটু আছাড়ও খেলে, তবে খানিকটে গিয়ে; সেখান থেকেই চেঁচিয়ে বললে—‘ঘোড়া ছেড়ে পাল্যে আয় ছিরে, অন্যদিন হবে।’
তা ছিরুরই কি অসাধ দা’ঠাকুর? ছাড়তে পারলে তো বাঁচে; কিন্তু গুলিখোরের লিকলিকে কাঠামো, তার ওপর মাথা থেকে পা পজ্জন্ত ভারি ঝলমলে সাজগোজ, কোথায় জিনের সঙ্গে জড়িয়ে গেচে কি দড়ির সঙ্গে আটকে গেচে, একবারটি চেষ্টা ক’রে দেখে ঘোড়ার গলাটা জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
দাঁড়িয়ে চোরের মারটাই খেতে হোত দা’ঠাকুর–দিদিমণি পরে বললে কিনা—পোড়া এক হাসি হয়েচে স্বরূপ—খুন হয়ে যাচ্চে একটা লোক, তা হুঁশ নেই যে ছুটে গিয়ে ধরি’–আপনাকে বলব কি, দাঁড়িয়ে চোরের মারটাই খেতো, তবে গুরুবল, একখানা বাড়ির পর দ্বিতীয় বাড়ি যা হাঁকড়ালে ব্রেজঠাকরুন সেটা ছিরেকে না লেগে নটবরের ঘোড়ার পিঠের একেবারে মাঝখানে। আর কথা আচে?—অমন যে বেয়াড়া ত্যাদোড় ঘোড়া ধমক মানে না, মিষ্টি কথায় কান দেয় না—একেবারে তীরের মতন ছুটল সামনে—মাঠ দে যাচ্ছি, কি পথ দে, কি মিত্তিরদের পোড়ো ভিটের আগাছার জঙ্গল ফুঁড়ে, জ্ঞানগম্যি নেই।…আজ্ঞে না, ছিরু ঘোষালকেও পড়তে দেখলুম না, আঁকড়ে ধরেচে যেন মিশে রয়েচে ঘোড়াটার গায়ে; প্রাণভয় বড় ভয় তো দা’ঠাকুর-মিথ্যে কেন বলতে যাব, যতক্ষণ দেখতে পাওয়া গেল পড়তে দেখিনি-তারপর ওরই বা কি হোল, জামিনে ভাড়া-করা শিখিধ্বজের আলখাল্লারই বা কি হোল সে তো আর দেখতে পেলুম না কেউ।’
