কাঞ্চন-মূল্য – ১১
১১
আমি কৌতুহলী হ’য়ে প্রশ্ন করবার আগেই স্বরূপ বললে—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, যা আন্দাজ করেচেন তাই, কলকাতা থেকে একেবারে সায়েব ডাক্তার সঙ্গে করে ছুটে এয়েচে দয়াল চাটুজ্জে; অনাচারী মানুষ, সামনে আসত না, তবে পিথিমিতে এক ঐ মাকেই তো চিনত।
সবাই বোঝালে, দয়াল চাটুজ্জের মায়ের অন্তর্জলী, গাঁ তো ভেঙে পড়েছে, সবাই বোঝালে—‘অমন অনথ কোরো না দয়াল, শ্মশান-বাসের রুগী বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে নেই, ছিষ্টির আদি থেকে এমন অনাচার কেউ করেনি-তাও আবার ফিরিঙ্গী ডাক্তার ডেকে- ঠাকরুনের ভোগ শেষ হ’য়েচে—সগ্গে তাঁর নিজের স্থানে যাচ্চেন-উপযুক্ত জ্যেষ্ঠ সন্তান, যাতে সুচরংকুলে যেতে পারেন তার ব্যবস্থা করো, পথ আগলে দাঁড়িও না এমন ক’রে…’
যা মাথাটি চিবিয়ে খেয়েচে ন্যায় শাস্তোরে, শুনচে কে কার কথা? বললে- ‘মায়ের সগগের কথা ভেবে আমি এখন তো নিজের সগো নষ্ট করতে পারি নে, ধ’রেছেল কেন এমন কু-সন্তান পেটে?’
শেষে আস্ফালন, সব রকম লোক ছিল তো।
—শ্মশানঘাট, সে হোল শিবের আড্ডা-ফিরিঙ্গীকে নামতে দেব না আমরা কোভি নেহি।’
গুলতনি যখন খুব বেড়ে উঠেচে, দয়াল চাটুজ্জে ঘুরে সায়েবের সঙ্গে কি কথা কইলে ইঞ্জিরিতে। কথাটা কি হোল ওনারাই জানে, তবে দয়াল চাটুজ্জে ঘুরে বললে- ‘সায়েব বলচে, শিবের ভূতপ্রেতদের নাম নিকে নিয়ে উনি জেলার মার্চিস্টরের কাচে দাখিল করবে, পুলিশে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবে আদালতে সরকারি রোজার কাচে।’
এই সময় সায়েবও পকেট থেকে একটা ছোট্ট খাতা আর একটা পেন্সিল টেনে বের ক’রে বাগিয়ে দাঁড়াল। দেখতে দেখতে শ্মশানঘাট পস্কের হয়ে গেল।
অমন যে মসনে, গমগম করচে, যেন রথের কোলাহল পড়ে গেচে, এক্কেবারে ঝিমিয়ে গেল।
প্রশ্ন করলাম—‘বেঁচে উঠলেন দয়াল চাটুজ্জের মা?’
‘উঠলেন না? তবে আর আপনাকে বললুম কি? ফিরে এসে আবার দশটি বছর রাজ্যসুখ ভোগ করলেন। গেলেন য্যাখন, ত্যাখন যারা হা-পিত্যেশ ক’রে ব’সেছিল তাদের অনেকেই গতায়ু।’
দিদিমণি মুখটুকু চুন ক’রে বললে—‘আহা, বেঁচে ফিরে এলেন, ভালোই হোল, নারে স্বরূপ?’
আমি চুপ ক’রেই রইলুম। কতটুকুই বা বয়েস ত্যাখন আমার বলুন দা’ঠাকুর, যে পেটে ‘না’ রয়েচে আর মুখে বলব ‘হ্যাঁ? তারপর দিন কৈলীকে বের ক’রে মাঠে নিয়ে যাব এইবার, ব্রেজঠাকরুন গনগনিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বলে—‘মুয়ে আগুন অমন আহিংকের। চারকুড়ি বয়েস-নজ্জা করল না আবার ঘাট থেকে বাড়িতে ফিরে আসতে?’
বলছিলুম না?—একেবারে বেড়া আগুনে ঘিরে ফেলেচে দিদিমণিদের। এই একটা বিপদ–কি আশা করে ছেল, আর কি হয়ে পড়ল, তার ওপর পিঠোপিটি দোসরা এক বিপদ এসে উপস্থিত-আজ্ঞে সে আবার যা তার তুলনায় দয়াল চাটুজ্জের মায় পুনজ্জন্ম হ’য়ে ঘাট থেকে ফিরে আসা ঢের ভালো …রাজীব ঘোষাল আর ছাপাছাপি রাখলে না, বাবাঠাকুরকে সোজাসুজি জানিয়ে দিলে, মেয়েটিকে দিতে হবে পুত্রবধু ক’রে, নৈলে ভদ্রাসনটির মায়া ছাড়তে হবে, তিনি আর ওপিক্ষ্যে করতে পারবেন না।
কথাটা আমি স্বকন্নে শুনে এলুম দা’ঠাকুর। যদি জিগ্যেস করেন কেমন ক’রে তো গোড়া থেকে সবটুকু শুনতে হয়।
লখনা আমায় এসে ‘ওরে স্বরূপ, দয়ালঠাকুরের মা যেমন বাদ সাধলে তেমনি ইদিকে বোধহয় একটু মুখ তুলে চাইলেন মা কালী; ঘোষালমশাই অসুখে পড়েছে।’
জিগোলুম—‘টেসে যাবে?’
বললে—‘অত কিপটে, ওরা পাক্যে পাক্যে চিমড়ে হ’য়ে যায় তো, ট্যাসবেনি, তবে বিছেনা নিয়েচে, পেয়ারা গাছটা আর সেরকম করে আগলাতে পারে না। নুট হয়ে যাচ্চে; একবারটি যাস না, আমি সকালে গেছলুম।’
আর দেরি করতে আচে? বিকেলের কথা, আমি লখ্নার হাতে কৈলীটাকে ছেড়ে বেরিয়ে পড়লুম।
একটা খবরের মতন খবর তো, যেতে যেতেই মনে হোল একবার উদিক ঘুরে দিদিমণিকেও খবরটা দিয়ে আসি। চৌকাঠ থেকেই হাঁক দিলুম—‘ও দিদিমণি শোনসে – জবর – খবর, ঘোষালমশাই বুঝি টাসলো এবার।’
একটু বাড়িয়ে ওর নামে কি মুখরোচক ক’রেই বললুম দা’ঠাকুর, দিদিমণি রান্নাঘরে কি করছিল, বেরিয়ে এসে আমায় চুপ করতে ইশারা করে বড় ঘরটার দিকে আঙুল দেখালে। তারপর এগিয়ে এসে চাপা গলায় বললে— ‘বাবা র’য়েচে ঘরে শুয়ে, শরীরটে ভালো নয় তেমন। …কি হয়েচে একাদশী ঘোষালের র্যা?’
একটু ভরসা দিয়েই বললুম—‘শক্ত অসুখ, বোধহয় টেসে যাবে। আমি পেয়ারা তুলতে যাচ্ছি।’
দিদিমণি নাকটা সিঁটকে বললে—নেঃ, সবাই টাসচে অমনি, ঢের দেখলুম—তা কেপ্পনের গাছের পেয়ারা, খেলে পরমায়ু বেড়ে যায়, দুটো আনবি আমার জন্যেও।
তারপর উঠোনের মাঝখানে গিয়ে যাতে বেশ ভালো ক’রে আওয়াজটা ঘরের ভেতর বাবাঠাকুরের কানে যায় সেইভাবে বললে- ‘একটা বুড়ো মানুষ অসুখে পড়েছেন-এ নাকি ভালো খবর—ছিঃ, এরকম মনের ভাব রাখতে নেই স্বরূপ।…আহা, ভালো হয়ে উঠুন, হরির লুট দোব।’
—সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাঁতের পাঁচটা আঙুল মটমট ক’রে মটকে, মুখটা সিঁটকে চাইলে আমাব দিকে—মানে মলেই হরির লুট দেবে আর কি। তারপর চারটে পেয়ারা আনবার ইশারা ক’রে আবার ঘরে চলে গেল।
আমায় একটু আড়ালে ওপিক্ষ্যে করতে হোল দা’ঠাকুর। গিয়ে দেখি ঘোষালমশাই হুঁকো হাতে ক’রে বাইরেই রয়েছে ব’সে। তবে কাহিল শরীর তো, একটু পরেই আটহাতী কাপড়টুকু সামলে সুমলে একবার গলা বাড়িয়ে দেখে নিয়ে ঠুকঠুক ক’রে ভেতরে চলে গেল।
আর একটু নিশ্চিন্ত হয়ে নিয়ে আমিও চুপিসাড়ে গিয়ে গাছে উঠলুম।
ঠেসে খেয়ে বেশ বেছে বেছে দিদিমণির জন্যে কোঁচড় ভরচি, ইদিকে একটু বেশ গা ঢাকার মতনও হয়ে এসেচে, এমন সময় হঠাৎ নজর পড়ল বাবাঠাকুর খানিকটা দূরে ঠুকঠুক করে চলে আসচে; আমি তাড়াতাড়ি মগডালের দিকে একটু ঝোপ দেখে উঠে নুকিয়ে পড়লুম। ইদিকেই আসছেল বাবাঠাকুর, মাথাটা হেট ক’রে ক’রে চারিদিকে চাইতে চাইতে। পেয়ারাতলাটায় এসে একবার দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার বুকটা টিপটিপ করচে, গুরুবল, ওপর দিকে আর চাইলে না, চারিদিকটা একবার দেখে নিয়ে তারপর বেশ পা চালিয়ে এগিয়ে গিয়ে সদর দরজায় ঘা দিয়ে ডাকলে— ‘রাজু আচ?’
‘কে?’
না, ‘আমি অনাদি, দোরটা খোলো একবার।’
ওরা ভেতরে গিয়ে কপাট দিয়েচে, আমিও আস্তে আস্তে নেমে বাইরের রক দিয়ে গিয়ে ঘোষালমশাইয়ের ঘরের পেছনটিতে দাঁড়ালুম। ঘোষালমশাই বললে,—‘বোস ভাই, রও, জানলাটা দিয়ে দিই, সন্দে হয়ে এল। দেহটা ক’দিন থেকে ভালো যাচ্ছে না।
সুবিধেই হোল, আমি আরও এগিয়ে গিয়ে বন্ধ জানলার কাছটিতে কান পেতে দাঁড়ালুম। বাবাঠাকুর বললেন—‘তাই তো শুনে ছুটে এলুম। নিজের দেহও ভালো নয়। রাখাল ছোঁড়াটা মুখ শুকিয়ে এসে বললে—শুনলুম ঘোষালমশাইয়ের শরীরটা ভালো নয়। নেত্য বললে—তাহলে একবার দেখে আসবে বাবা?—সবারই একটা টান আচে তো তোমার ওপর। আমি বললুম—তুই বলবি তবে যাব?…তা আচ কেমন আজ?’
‘ভালো নয় ভাই। আর আমাদের থাকাথাকি, ডাক পড়েছে, এখন গেলেই হয়। তাই মনে করছিলুম একবার ডেকে পাঠাব তোমায়, তা এলে, ভালোই হোল।’
বাবাঠাকুর বললে—‘আসব না? সে কি কথা? আসব আসবই করছিলুম ক’দিন থেকে, তবে সে হোল…’
ঘোষালমশাই বললে—‘ থেমে গেলে যে হঠাৎ? কিছু দরকার ছেল?’
‘এই দেখ।…দরকার—অভাবের সংসার আর বন্ধু বলতে এক তোমাতেই গিয়ে ঠেকেচে—রিদয়ের কাণ্ডটা তো দেখচই। তা সে কথা পরে হবে’খন, আগে সেরে ওঠ তুমি।’
খানিকক্ষণ আর কোন কথা নেই। জানলার ফাঁক আচে, তবে ঘোষালমশাইয়ের ঘরে আলো তো পহর রাত্তির বাদ দিয়ে জ্বলে, মুখ দেখতে পাচ্ছি না কারুর, শুধু হুঁকোর ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দ হচ্চে। তারপর ঘোষালমশাই হুঁকোটা বাড়িয়ে দিয়ে বললে- ‘ন্যাও, ধরো। মানুষকে বাঁচতে বাঁচতেও কাজ করে খেতে হবে অনাদি, আবার মরতে মরতেও কাজ ক’রে খেতে হবে। গীতায় ভগবান সেই কথাই বলচেন তো। কবে সেরে উঠব তার ভরসায় তোমার কাজ আটকে রাখলে চলবে না তো। প্রেয়োজনটা ছেল কি ধরনের?”
চুপচাপই গেল আবার, বাবাঠাকুরের হুঁকোর শব্দটা আরও ঘন ঘন হয়ে উঠল।
আমি কান খাড়া ক’রে রয়েচি দাঁড়িয়ে।
আজ্ঞে না, বাবাঠাকুর বের করতেই পারলে না কথাটা মুখ দিয়ে। শেষে ঘোষালমশাই বললে—‘তাহলে আমিই বলি? দেখো, তোমার ভাবনা তুমি মনে করো একাই ভাবচ। বলি, এদিককার দিনকে দিনের খরচটা না হয় চলে যাচ্চে, কিন্তু তার মধ্যে আবার একটা দমকা খরচ এসে পড়লে সেটা সামলাতে পারা যায় কি? কেউই পারে না, তা তোমার তো সত্যিই টানাটানির সংসার। কেমন, এর মধ্যে গিন্নির বাচ্ছরিক ছেরাদ্দটা এসে যেতে পড়ে যাওনি একটু আতান্তরে?’
আপনি ভাবচেন, ভেলকি; কিন্তু ভেল্কির কিছু নেই এর মধ্যে দা’ঠাকুর। আজকাল আপনাদের কবে ঝড়, কবে বিষ্টি সব ঐ রেডিও না কি তাইতে ব’লে দিচ্চে না, পথ দিয়ে যেতে যেতে কখনও কখনও শুনি তো—তা সেইরকম গ্রামের কোথায় কি হচ্চে, কার কবে ট্যাকার দরকার হবে, কতো ট্যাকার—সে সমস্ত রাজু ঘোষালের নখদপ্পনে থাকত। ভেলকির কিচ্ছু নেই এতে।’
হুঁকোর ভড়ভড়ানিটা বন্ধ হয়ে গেচে, মনে হোল বাবাঠাকুর যেন উঠে এগিয়ে এসে এক হাতে ঘোষালমশাইয়ের একটা হাত চেপে ধরলে, কাতর স্বরে বললে —‘সব তো জানই ভাই, আর লজ্জা দ্যাও কেন? একটা ওবিশ্যি করণীয় কাজ, কিন্তু কী আতান্তরে যে পড়েচি। কোথায় যাব, কে বুঝবে অবস্থাটা? জিগ্যেস করবে তোমার কাছেই আসি নি কেন? আর এসে দাঁড়াবার মুখ নেই ভাই, বিস্তর জমে গেচে, একটি পয়সা দিতে পারি নি এখনও…’
ঘোষালমশাই যেন মুখিয়েই ছেল, কি ক’রে তোলে কথাটা, বললে—‘কথা রেখে কথা বলি—ঐ জমবার কথাটায় মনে পড়ে গেল কিনা—নোকে একটা বদনাম দেয়ই তো ট্যাকা জমিয়ে যাচ্চি। তুমিও নিশ্চয় ভাবো রাজু ছেলেবেলাকার বন্ধু, আমার জমচে ঋণ—তাও আবার উরিই কাছে, আর ও দিব্যি পায়ের ওপর পা দিয়ে আসল জমিয়ে যাচ্চে। জমিয়েচি দু’পয়সা, তোমার কাছে অস্বীকার করতে গেলুম কেন—যদিও পায়ের ওপর পা দিয়ে নয়—পেটে না খেয়ে এই আটহাতী কাপড় প’রে…’
বাবাঠাকুর বললে—‘খরচ নেই জমিয়ে যাচ্চ এ কথা কি আমি ভাবতে পারি ভাই! লোকের কথায় কান দেও কেন?’
‘না, খরচ আমি টেনে করি বই কি। তবে তুমি মিষ্টি ক’রে বলচ, তার কারণ কেন করি তার হেতুটা তুমি য্যাত জান আর কেউ তো তেমন ক’রে জানে না। তাই অন্যের যেমন গা করকর করে-ঘোষাল একটির ওপর একটি ট্যাকা রেখে জমিয়ে যাচ্ছে, তোমার তেমন করবার কথা নয় তো। ও ট্যাকা যেমন আমি গেলে আমার ছেলের, তেমনি আবার তোমার…’
বুকটা আমার ধড়াস ধড়াস করচে দা’ঠাকুর, কিন্তু কথাটা না শেষ ক’রেই ঘোষালমশাই ব’লে উঠল— ‘ও কি, উঠে পড়লে যে!”
ঘরে অন্ধকার বেশ জমে উঠেচে, তার মধ্যেই জানলার ছেঁদা দিয়ে দেখলুম একটা ছায়ার মতন বাবাঠাকুর হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠেছে। মুখটা দেখতে পাচ্চি না, তবে কথা তো শুনচি, আমতা আমতা করে বললে—‘উঠচি—মানে—দেহটা হঠাৎ যেন—শরীরটের তো জুত নেই ক’দিন থেকে…’
এর পর থেকেই কথার মধ্যে সেই গলাগলির ভাবটা গেল তো। ঘোষালমশাই বললে- ‘না, বোস, অনাদি; বসলেই শরীর ঠিক হয়ে যাবে, ওটা কিছু নয়।’
গলার আওয়াজটাও বেশ ভারী, কতকটা হুকুমের টোনেই ঘোষালমশাই বললে কথাটা। বুঝলুম বসেই পড়ল বাবাঠাকুর।
এর পরে যে চুপচাপ তা যেন আর শেষ হ’তে চায় না। শুধু ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দ, বাবাঠাকুর নিশ্চয় ওঠবার সময় হুঁকোটা ঘোষালমশাইয়ের দিকেই বাড়িয়ে ধরেছেল, তিনিই টেনে যাচ্চে। আমি পেয়ারা চিবানো বন্ধ ক’রে দাঁড়িয়ে আচি।
শেষকালে আবার উনিই আরম্ভ করলে, বললে- ‘কথাটা মুখ দিয়ে বেরুবার আগেই তুমি উঠে পড়লে অনাদি, তবে বুঝেচ নিশ্চয়। আর টালমাটাল নয়, এবার তোমায় একটা ঠিক ক’রে ফেলতে হবে।’
ইদিকে কোন কথা নেই। ঘোষালমশাই বলেই চলল—‘দিতে চাও মেয়ের বিয়ে-হ্যাঁ ছিরুর সঙ্গেই—তাও ব’লে দাও, না দিতে চাও তাও ব’লে দাও পষ্ট করে। আমার শরীর ঠিক নেই-এবার ধাক্কাটা বেশ দিয়েচে—আমি আর ছেলের বিয়েটা না দিয়ে পাচ্ছি না। ছেলে যে আমার হীরের টুকরো এ কথা বলচি নে, তবে বয়েসকাল, আমার ঐ এক ছেলে, একটু আস্কারা পাচ্চেই, এ-সময়টা একটু অমন হবেই; আবার একটা বাঁধন হোক, ঐ ছেলেই অন্য রকম হয়ে যাবে। না, তুমি একেবারে তোয়ের হীরের টুকরোই পাও কোথাও, বেশ তো আমায় বলে দাও পষ্ট ক’রে, নিজের পথ দেখি…’
বাবাঠাকুর বললে—‘দুটো দিন আরও সময় দাও; এদিকে একেবারে মাথার ঠিক নেই ভাই।’
‘সময় আর দিতে পারব না অনাদি; দেখচো তো আমার নিজের সময় ফুরিয়ে এয়েচে। আরও একটা কথা আচে অনাদি, না বলে পারছি না। বৌ ক’রে যদি আনতেই হয় তো আর আমি ঐ বেপরদা বাড়িতে ফেলে রাখতে পারব না। কথা উঠতে আরম্ভ হয়েচে এরই মধ্যে…’
বাবাঠাকুর যেন কাতর হয়ে বলে উঠল—‘রাজু—এ কী বলচ।’
‘বেশ; বলব না। বিষয়ী লোক আমরা—মিষ্টি তেঁতো সব রকম কথাই মুখ দে বের করতে হয় প্রয়োজন মত। তা বলব না। তবে মনস্থির করে ফেলতে হবে তোমায়, হ্যাঁ-না যা হয় একটা কথা পষ্ট ক’রে ব’লে যেতে হবে আজ।’
আবার চুপচাপ, শুধু ভুড়ুক ভুডুক শব্দ, তারপর আবার উনিই বললে—‘আরও মনস্থির ক’রে ফেলতে বলচি -পাত্রী আমার এই সময় একটি হাতে আচে, নীরদার মেয়েটি। ভালোই, তবে নীরো বিধবা মানুষ, পয়সা চায়। কথাটা নুকুনো, তবু তোমায় বললুম। তা পয়সা চায়, দোব। তবে ঘর থেকে বের করে তো দোব না, সেই জন্যে তোমায় ডেকে পাঠাব মনে করেছিলুম—তা অধম্ম তো করি নি কারুর সঙ্গে, ভগবান নিজেই তোমায় পাঠিয়ে দিলেন। একটু বলো মন খোলসা করে।’
কথা না ক’য়ে উপায় তো আর নেই, বাবাঠাকুর আবার সেইরকম কাতরে বললে- ‘আর দু’টো দিন সময় দাও আমায় রাজু।’
‘পারব না ভাই, একটা দিনও নয়, ঐ তো বললুম-আমার নিজের সময়ই আর নেই। তা বেশ, তুমি ভেঙেই দাও না সম্বন্ধটা, চুকে যাক ল্যাঠা। তাহলে কিন্তু ঐ যা বললুম—ঘর থেকে ট্যাকা বের ক’রে আমি মেয়ে কিনে নিয়ে আসতে পারব না—মানে, যেখেনে যেখেনে ট্যাকা প’ড়ে আচে, বিশেষ ক’রে যেখানে ডোববার ভয় আচে সেখান থেকে ট্যাকা তুলে নিয়ে আমায় কাজটুকু সারতে হবে। তোমায় দোমনা দেখচি, তুমি না হয় ট্যাকাই শোধ ক’রে দ্যাও, তারপর কী করে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবে, কবে দেবে সে-ভাবনা তো আর আমার রইল না।—থাকতে দিচ্চ না তো তুমি।’
বাবাঠাকুরের গলা যেন শুকিয়ে এয়েচে, খসখসে একটা আওয়াজ হোল —‘রাজু —ভাই। একটা দিন।’
‘একটা কেন, দুটো দিনই দিচ্চি তোমায়। কিন্তু সে ঐ ট্যাকাটা দিয়ে যাবার; সুদে আসলে কত হোল এক্ষুণি বলে দিচ্চি খাতাটা দেখে।’
‘ট্যাকা কোথা থেকে দোব? এত শিগগির? ভদ্রাসনটুকু বেচাবে ভাই, পথে বসাবে?’
‘মাথায় তুলে রাখতে চাইচি তো অনাদি, তুমি শুনবে না, করি কি? শক্ত ক’রে তুললে তো তুমিই—হয়তো আদালতেই দেবে ঠেলে…দু’দিন পরেও যদি দেখি গা করচ না…
বাবাঠাকুরের সেই খসখসে আওয়াজ ‘ঘরটা বড় গুমোট—একটু বাইরে থেকে হয়ে এসেই বলচি রাজু—এই তোমার রক থেকেই—বিশ্বাস না করো, দাঁড়াও এসে বাইরে বরং…’
জীবন-মরণের সমিস্যে, না বলে উপায় নেই—কথাগুনোক যেন জোর ক’রে ঠেলে ঠেলে বের ক’রে দিলে বাবাঠাকুর। বললে বটে, কিন্তু উঠল না; খানিকটা গুম্ হয়ে ব’সে থাকার পর মোক্ষম কথাটুকুই ব’লে দিলে—‘কোন্ চুলোয় আর শান্তি পাব? বেশ, দিলুম কথা।’
