কাঞ্চন-মূল্য – ৯
৯
স্বরূপ একটু চুপ করল। আমি বললাম- ‘তাহলে তোমার দিদিমণির ঘোষালদের দিকের ফাঁড়াটা একরকম ক’রে কাটল?’ ঘটনা যেমন এগুচ্ছে তাতে গল্পের পরিণতি সম্বন্ধে একটা অন্যরকম আশা ক’রেই কথাটা আমার বলা; স্বরূপ কিন্তু আমার মুখের পানে চেয়ে বললে- ‘বুঝলুম না তো দা’ঠাকুর। পর।’
বললাম— ‘বলছিলাম, আর তো ঘোষালের পো এদিকে মাড়াবে না—এরকম অভ্যত্থনার
—আজ্ঞে না, তা ওবিশ্যি মাড়ায় নি, একেবারে সেই বিয়ের রাত্তির ছাড়া।’
‘বিয়েটা তাহলে এই বাড়িতেই হোল শেষ পজ্জন্ত?’
‘আজ্ঞে জন্ম, মিতু, বিবাহ-এ তিনটে বিধেতা পুরুষ যার যেখানে নিকে দিয়েচে তা হ’তেই হবে কিনা। কিন্তু সেকথা রেখে এদিককার কথাটা আগে সেরে নিই দা’ঠাকুর।’
সংসার ইদিকে দিনদিনই অচল হয়ে আসচে। ওবিশ্যি সচ্ছল কোনকালেই ছেল না, তবে ঐ ষষ্ঠীপুজো, মাকালপুজো, মাঝেমধ্যিখানে এক-আধটা বিয়ে কি ছেরাদ্দ—এই ক’রে চ’লে যেত একরকম, তা সধবা-বিধবা নিয়ে যে দলাদলি ঢুকল গাঁয়ে, আর ঠাকুরমশাইয়েরও কী দুম্মতি হোল যে গয়ারামের সেই সাত পুরুষের ভাগনীর বিয়ে দিতে গেলেন—সেই থেকে সামান্যি আয়ের পথটুকুও বন্দো হয়ে আসতে নাগল তো। তারপর মা-ঠাকরুন মারা যেতে রাজু ঘোষালের কাছে কজ্জ হয়ে পড়ল, সেটা শোধবার জন্যে শিষ্যিবাড়ি ছুটতে হোল মাঝে মাঝে। তাতে যে শোধ হোল কজ্জ তা নয়, রাজু ঘোষাল আত্তিস্যি দেখিয়ে টাকা নিলে না, মাঝখান থেকে কয়েকবার যাওয়া-আসা ক’রে ও-আয়ের পথটুকুও একরকম বন্দো হয়ে গেল। তারপরেই এলেন ব্রেজঠাকরুন, বিয়ের ভয়ে বাবাঠাকুর ওদিকে একরকম ভিটে ছাড়াই হয়েছিলেন। ফিরে এসেও বাড়িতে একটু থিতু হয়ে বসবেন তবে তো নোকে ডাকবে, তা চোপোর দিন ভিটে ছেড়ে এর চণ্ডীমণ্ডপ তো ওর বৈঠকখানা ক’রে বেড়াচ্চেন, ভয়, পাগল মানুষ, গলায় আচমকা একটা মালা গলিয়ে দিয়েও যদি জাপটে ধরে বলে এই বিয়ে হয়ে গেল—একেই বিধবা-বিয়ে বলতে হবে—তা ত্যাখন তার তো আর কোনও ঝাড়ফুঁক নেই কিনা।
এই সব নানাকারণে সংসার অচল হয়েই এসেছিল যার জন্যে দিদিমণিকেও রাজু ঘোষালের কাছে কজ্জ চেয়ে চিঠি লিখতে হয়েছেল দা’ঠাকুর – আপনেকে বলেচি সে কথা, মনে থাকতে পারে।’
বললাম—‘হ্যাঁ, সেই ব্রেজঠাকরুনের কাছে চিঠিসুদ্ধ ধরা প’ড়ে গেলে তুমি, তিনিই কটা টাকা হাতে দিয়ে ফিরিয়ে দিলেন তোমায়’-
‘দশটি ট্যাকা; তাতে ঐ সংসার—যেটা খোঁজ সেটাই নেই—ক’দিন চলে দা’ঠাকুর? দেখতে দেখতে ফুট-কড়াই হয়ে গেল। তারপরেই ছিরু ঘোষালকে নিয়ে এই কাণ্ডটা হোল।
বোধ হয় দিন পাঁচেক পরের কথা দা’ঠাকুর, মাঠ থেকে ফিরতে সেদিন আমার একটু বিলম্ব হয়ে গেল। বাড়ি ঢুকে দেখি দিদিমণি দাওয়ার সিঁড়িটাতে চুপ ক’রে ব’সে আচে, সন্দে উতরে গেচে তবুও কোন ঘরে পিদিম পজ্জন্ত জ্বালেনি তখনও, তুলসীতলায়ও নয়। ওনার কথা কইবার লোকও তো আমি একলা, তাই বাইরে থেকে ঘুরে ফিরে এলে রোজই কিছু না কিছু নিয়ে আরম্ভ ক’রে দিত কথা, সেদিন কিন্তু কিচ্ছু নয়; এলুম, কৈলীকে গোয়ালে তুলতে গেলুম, একটি কথা নয়, সেইরকম চুপ ক’রে রইল ব’সে।
গোয়াল থেকে বেরিয়ে এসে বললুম—‘দে-কাঠিটা দাও, সাঁজাল দোব।’
বললে—‘হবে’খন; সাঁজাল দিয়ে তো সব হচ্চে; দুধে ভাসচে সবাই।’
একটু পরে একটু ধমকেই বললে—‘তুই এতক্ষণ ছিলি কোথায়?—একটা কাজ ক’রে উগার নেই গেরস্তর, শুধু এক বাঁজা গাই তাড়িয়ে বেড়ানো আর গো-গ্রাসে গেলা।…আসে কোথা থেকে?’
বাড়িতে আর কেউ নেই, থমথমে ভাব, কি বলব কি করব ভাবচি, ডাকলে—‘শোন্ এগিয়ে আয়।”
গিয়ে দাঁড়িয়েই আচি, হুঁশ নেই দিদিমণির, শেষকালে আমিই হার মেনে জিগ্যেস করলুম—‘কি বলবে গো দিদিমণি? কি ভাবছ অত?’
দিদিমণি আবার একচোট ঝেঁঝে উঠল, বললে—‘ভাবচি ঐ পোড়াকপালীর কথা, ঐ রাক্কুসীর, নিজেরটা খেয়ে ব’সে আচে কোন্ কালে, আমার যাও একটা আশা-ভরসা ছেল তাও শেষ করলে এসে?’
‘কে গা? কি শেষ করলে?’
‘কেন, ঐ মাসিমা-নাম করতেও ইচ্ছে করে না। গেঁজেল হোক, গুলিখোর হোক, তবুও তো ছেল একটা আশা, তা–’
থাকতে তো পারত না বেশিক্ষণ মুখভার করে, একেবারে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল, বললে—‘ক’ঘা চেলা কাঠের বাড়ি পড়েছেল সেদিন ছিরের ঘাড়ে রে?—তুই তো ছিলি কাছে দাঁড়িয়ে।’
বললুম—‘ঘোড়াটা আর জুত ক’রে হাঁকড়াতে দিলে কোথায়? চার-পা তুলে পালাল কিনা।’
‘তুই চুপ কর্ ছোঁড়া, মস্ত দোষ ক’রেচে ঘোড়াটা! বাসন ব’য়ে ব’য়ে তার উদিকে কড়া পড়ে গেচে, পিঠে নরম মখমলের পোশাকগুনোর রগড়ানি, সে বেচারি ভাবচে তবে বুঝি আমার অশ্ব-জন্ম ঘুচে গেল, এমন সময় আচমকা একখানি আস্ত চেলাকাঠ! কেষ্টোর জীব, কতটুকুই বা প্রাণ? ছিপটিটা-আসটা খেয়ে এসেচে, সেইটুকুর সঙ্গে পরিচয়, সেইটুকুই জানে—এ যেন একেবারে বাজ পড়ল আকাশ চিরে-ও ছোঁড়া আবার বলে—চার পা তুলে পালাল, জুত ক’রে হাঁকড়াতে দিলে কোথায়?…নাঃ, কাজ কি পালিয়ে? -তার তো জান্ না!…অত করে বললুম, তা তুই হতভাগা যে গেলিনি খুঁজতে—ভূতের ভয়—নৈলে গেলে কিছু একটা যেতই পাওয়া, নিদেন মাথার পটাও বড় সাধ ছিল ঘরে টাঙিয়ে রাখতুম বিসজ্জনের প্রিতিমার সাজের মতন করে…’
বলে আর দুলে দুলে হাসে, বলে আর দুলে দুলে হাসে, তারপর একসময় চোখমুখ মুচে নিয়ে বললে—‘মরণ! কত দেখলুম এই বয়সে, আর কতই না দেখতে হবে!’
সঙ্গে সঙ্গেই পিঠের দিক থেকে আঁচলটা ঘুরিয়ে নিয়ে এসে একটা গেরো খুলতে খুলতে বললে— ‘আর একটু এগিয়ে আয়, একটা খুব নুকুনো কথা আচে, কাক্ষেও বলবিনি?’
গেরো থেকে একটা ছোট্ট সোনার মাদুলি বের করে একবার দেখে নিলে, তারপর মুঠোটা চেপে চোখ বুজে চুপ ক’রে ব’সে রইল। একটু পরে দু’চোখ বেয়ে দরদর ক’রে য্যামন জল গড়িয়ে পড়েচে, তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে চোখ দুটো মুচে বললে- ‘সাধ ক’রে কি পোড়াকপালী বলতে ইচ্ছে হয়?-দেখ না, একাদশী ঘোষালের পথটা খোলা ছেল, সিদিন এনেও দিলি দশটা টাকা, তা এই কাণ্ডটা ক’রে বন্ধ করলে তো সে পথটা। ব’সে বসে গেলোন, আর গাঁ সদ্যু লোকের সঙ্গে ঝগড়া ফরিয়াদ। মরুকগে, আর ভাবতেও পারি না। ঘরে এক মুঠোও চাল নেই স্বরূপ, রাত পোয়ালে কাল যে কি হবে ভেবে কূল পাচ্চি না। তুই এক কাজ কর, এই মাদুলিটা বাঁধা দিয়ে…যাবিই বা কোথায়? এ পথ তো বন্ধ…
বললুম—‘নবীন স্যাকরার দোকান দেখব না হয়?
দিদিমণি যেন ব’ত্তে গেল; এক এক সময় হয় তো ওরকম, খুব যেটা সোজা কথা সেইটেই খেয়ালে আসে না; বত্তে গেল যেন দিদিমণি, বললে—‘তাই কর, হ্যাঁ সোনাই য্যাখন, ত্যাখন স্যাকরার দোকানেই যাওয়া ভালো; কিন্তু বলবি কি? ছেলেমানুষের হাতে সোনা দেখলে সন্দো করবে তো?
সে বুদ্ধিটাও যুগিয়ে গেল মন্দ নয়। বললুম না ত্যাখন?—মাঝে মাঝে একটু আধটু যেত জুগিয়ে, বললুম—‘বলব না হয় ছিরু ঘোষাল পাঠিয়েচে, শুনেচি মাঝে মাঝে ঐরকম ক’রে এটা-ওটা বেচে, বাঁধা রেখে নেয় ট্যাকা এখান ওখান থেকে। গুলিখোরকে জিগ্যেস করতেও যাবে না।
দিদিমণি কি ভেবে একটু চেয়ে রইল আমার দিকে, ফিচলেমি বুদ্ধি দেখেই হোক বা যে জন্যেই হোক, একটু যেন হাসি ফুটে উঠল মুখে, বললে—‘তবে তাই বলিস। আহা, আবার মায়াও হয় রে, অমন মারটা খেলে। গুলি খাচ্চে, তাতেও কত উবগার হচ্চে মানুষের। বেশ তুই ঐ কথাই বলিস। কি জানি কত দেবে, যা দেয়-চার টাকা, পাঁচ টাকা, তুই তাই থেকে অমনি সের পাঁচেক চাল নিয়ে নিবি। আর সেরখানেক ডাল; গামছাটা নিয়ে যা।’
মাদুলিটা আমার হাতে দিয়ে ‘দেখি একবার’–বলে আবার চেয়ে নিলে। দু’তিনবার বুকে কপালে ঠেকাতেই আবার দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর ক’রে জল গড়িয়ে পড়ল। মুচে নিয়ে বললে—‘মার হাতের মাদুলি রে স্বরূপ, সোনাদানার মধ্যে ঐটুকুই ছেল। পারলুম না ধ’রে রাখতে। এমন হ’য়েচে, সে-কথা ভাববারও ফুরসত নেই, ভাবনা শুধু এর পরে কি করব।’
বলতে বলতেই আবার মনটা উতলে উঠেচে; ‘কোথায় গেল বল্ দিকিন সব আমার ঘাড়ে ছেড়েছুড়ে?’ ব’লে দু’হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে আবার হুহু ক’রে কেঁদে উঠল।
মাদুলিটা নিয়ে বেরিয়ে এলুম বটে, মনটা কিন্তু আমারও বড্ড খারাপ হয়ে রইল দা’ঠাকুর। একে তো দিদিমণির ঐরকম ক’রে ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না, তার ওপর মা-ঠাকরুণ আমায়ও বড্ড ভালোবাসত, ছেলেবেলার মনই তো কেমন যেন মনে হতে লাগল তানার গায়ের ঐ সোনাদানাটুকু ঘর থেকে বের ক’রে দিয়ে আমিও যেন একটা মস্তবড় খেলাপ কাজ করতে যাচ্চি। কি করে সামলানো যায় রাতটুকু তাই ভাবতে ভাবতে যাচ্চি, হঠাৎ ব্রেজঠাকরুনের কথা মনে পড়ে গেল, তিনি তো মানাই করে দেছল। দিদিমণি কোথাও পাঠালে তানাকে আগে না জানিয়ে যেন না যাই। ইদিকে উপরোউপরি কয়েকটা ব্যাপার যে ঘটল তাতে কেমন একটা বিশ্বাসও দাঁড়িয়ে গেছল, হাজার নুকুতে যাই উনি শেষ পজ্জন্ত কোন না কোন উপায়ে টের পেয়ে যাবেই কথাটা, ত্যাখন, ঐ তো দুদিন আগেই চ্যালা কাঠের দাপটটা দেখলুম দা’ঠাকুর, টাটকা রয়েচে মনে…সাতপাঁচ ভেবে ওনাকেই গিয়ে সব বলা ঠিক করলুম। কিন্তু ব্রেজঠাকরুনকে পাওয়া যায় কোথায়? বাড়িতে তো নেই। ভাবলুম চৌমাথাটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, যে রাস্তা দিয়েই ফিরুক, দেখা হবেই। বেশিক্ষণ দাঁড়াতেও হোল না, দেখি লখনা আরও দু’তিনজন ছেলের সঙ্গে মণ্ডলপাড়ার দিক থেকে হনহন করে এগিয়ে আসচে, আমায় জিগ্যেস করলে— ‘তুই যাবি নি? দাঁড়িয়ে কি করচিস এখেনে?’
জিগোলুম—‘কোথায়?’
‘বোসেদের বাড়ি কথকতা হ’চ্চে যে বিকেল থেকে। দক্ষযজ্ঞের পালা।’
তাহলে তো ব্রেজঠাকরুন নিাৎ সেইখেনে, বললুম—‘চ, সঙ্গী খুঁজছিলুম, অন্ধকার হয়ে এসেচে তো।’
গিয়ে দেখি পালার ত্যাখন প্রায় মাঝামাঝি, একেবারে মোক্ষম জায়গাটা। সতীর দেহত্যাগ হয়ে গেছে, শিব এয়েচেন তাঁর ভূতপ্রেতের দল নিয়ে, তুমুল ঝগড়া নেগে গেচে দু’পক্ষে! এর পরেই শিবের তাণ্ডব শুরু হবে। চুঁচড়োর রঘু ভশ্চায্যি, নাম-করা কথক, খুব রসিয়ে ঝগড়াটা জমিয়েচেন, দেখি বামুন-কায়েতের মেয়েরা যেদিকটা বসে তার প্রায় মাঝখানটিতে এতখানি জায়গা নিয়ে দিব্যি আসনপিঁড়ি হয়ে ব’সে ব্রেজঠাকরুন মালা জপতে জপতে একেবারে তদ্গত হয়ে শুনে যাচ্চে-ক্ষণে হাসি ক্ষণে অন্য ভাব; মানে কথকঠাকুর যেমন যেমন উদিকে পালা গেয়ে যাচ্চেন আর কি। পালাটা তো হয়েচেও একেবারে মনের মতন, জ্ঞানগম্যি নেই যে কোথায় ব’সে আচি, কি করচি, কে আড়চোখে চেয়ে চেয়ে কাণ্ডখানা দেখচে, কে ব্যাজার হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্চে।
সে যাই হোক, পাওয়া তো গেল তানাকে, এখন ভাবনা, কথাটা বলা যায় কি ক’রে। সে তো এখনকার মতন মরা-হাজা মসনে নয় দা’ঠাকুর, একটা যাত্রা কি কথকতা হোলে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। কথকতায় আবার মেয়ের ভিড়ই বেশি, সেই ভিড়ের একেবারে মধ্যিখানে, কথকঠাকুর থেকে মাত্র হাত কয়েক তফাতে ব’সে আচেন ব্রেজঠাকরুন, কথাটা তানাকে ডেকে বলতে হবে তো, তা প্রেথম সমিস্যে, ডাকা যায় কি করে? আসরে একটা শোরগোল তুললে তো চলবে না—মেরে এক্ষুণি ছাতু ক’রে দেবে।
এদিকে দেরিও তো হয়ে যাচ্চে, ভেবে ভেবে এক মতলব খাড়া করলুম দা’ঠাকুর। একেবারে ধার দে ধার দে একটু একটু ক’রে এগিয়ে মেয়েরা যেদিকটা ব’সে আচে সেদিকটায় চলে গিয়ে একেবারে ধারে যিনি ব’সে ছেল তাঁকে ডেকে গলা খাটো করে বললুম আপনার সামনের ঐ ওনাকে একবার ডেকে দেবেন? ডেকে দিতে তিনি য্যাখন ফিরে চাইলে, বললুম—আপনাকে নয়, সামনের ঐ ওনাকে; আবার তিনি য্যাখন ফিরে চাইলেন ত্যাখন বললুম—আপনাকে নয়, আরও এগিয়ে ঐ ওনাকে। এই ক’রে ক’রে ভিড়ের য্যাখন প্রায় আধাআধি পজ্জন্ত এগিয়েচি, যেখেনটায় দাঁড়িয়েছিলুম তার পাশেই একজন হৈ-হৈ করে উঠল—‘দেখ তো, কোথাকার এক অখদ্যে এসে জুটল, শুনতে দেবে না পালাটা, ত্যাখন থেকে যাকেই ডেকে দাও—আপনাকে নয়, ওনাকে—আপনাকে নয়, ওনাকে—তুই চাস্ কাকে ভেঙে বল, নয় তো বেরো এখেন থেকে।’ উনি চেঁচিয়ে উঠতে আরও সবাই যোগ দিলে, উদ্দেশ্যটা য্যাতই ভালো হোক, সবাই জ্বালাতন হয়ে উঠেচে তো। ভেবেছিলুম শোরগোল হতে দেব না, চুপি চুপি কাজ সেরে নোব, তা চারিদিক থেকে এমন শোরগোল উঠল যে কথকতা বন্ধ করে দিতে হোল ভগ্চায্যি মশাইকে। যাই হোক কাজ হোল, ব্রেজঠাকরুন ঘুরে চাইতেই আমার ওপর নজর পড়ল। সেই বাজখেয়ে গলায় জিগ্যেস করলে, ‘তুই এখেনে কি করচিস রে ছোঁড়া? কাকে চাস্?’
বললুম— ‘আপনেকে।
‘কেন?’
‘ডেকে পাঠিয়েচে।’
একটা হৈ-হৈ তো চলচেই দা’ঠাকুর, কথাটা ঠিক মতন পৌঁছুল না ওনার কানে, জিগ্যেস করলে—‘কে পাইলেচে?’
অবস্থাটা যে এরকম দাঁড়াবে তা তো আর জানা ছেল না যে উত্তর ঠিক করা থাকবে তবু পালাবার কথায় ওরই মধ্যে একটু মাথা খাটিয়ে বেশ চেঁচিয়ে ব’লে দিলুম—‘কৈলীটা।’
আর কোথায় আছে।—তবে রে অলপ্পেয়ে।’—ব’লে এক হাতে মালাটা মুঠিয়ে ধ’রে সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হনহন করে এগিয়ে আসতে লাগল, কার ঘাড়ে পা পড়েছে, কার মাথায়, হুঁশ নেই। ‘তবে রে অলপ্পেয়ে। একটা বাঁজা গাই,—আজ পজ্জন্ত একটা এঁড়ে বাছুর পজ্জন্ত দিয়ে উবগার নেই গেরস্তর- পালিয়েচে না আপদ বিদেয় হয়েচে—তার জন্যে নোকে বসে দুটো ভালোমন্দ কথা শুনবে একটু, তা…’
আজ্ঞে, যে গর্জন, সব কথা তো মনেও নেই; ভিড় ঠেলে যেমন পালাবার উপায়ও ছেল না, তেমনি একেবারে চোখের পলক না ফেলতে ফেলতে এসে আমার চুলটা মুঠিয়ে ধরলে।
গোলমাল যা উঠেচে দা’ঠাকুর, দক্ষযজ্ঞ তো তার কাছে শিশু। কি হোত কোথায় দাঁড়াত কিছুই বলা যায় না, তবে আমার মাথায় হঠাৎ যে বুদ্ধিগুনো যুগিয়ে যেত, তাতে যেমন বিপদ ডেকে আনত তেমনি আবার সামলেও নিত এক প্রকারে। ঐ শোরগোল চারিদিকে, ইদিকে দু’একজন ছাড়িয়ে দিতে উঠেও দাঁড়িয়েচে একটা ছেলে খুন হয় দেখে, তারই মধ্যে আমার কি খেয়াল হোল, কাপড়ের খুঁটে মাদুলিটা যে বাঁধা ছিল, কিছু না বলে গেরো সদ্যু সেটা আস্তে আস্তে ওনার হাতে তুলে দিলুম।
সঙ্গে সঙ্গে ব্রেজঠাকরুন জল হয়ে গেল। বুঝলেন না দা’ঠাকুর, আমি হয়তো অতটা ভেবে করিনি-অনেক দিনের কথা, ঠিক মনে নেই, কিন্তু ওনার মনে হতেই হবে কিনা যে গেরোর মধ্যে আবার সেই চিঠি; একেবারে জল হয়ে গেল। চুল যে মুঠিয়ে ধরেছিল, হাতটা আলগা হয়ে গেল, বললে— ‘চল, আয়।’ বাইরে যেতে যেতে সবাইকে যেন একটু জানান দিয়ে বললে— ‘তা হয় বৈকি ভাবনা, মাঠ ডিঙিয়েই উদিকে কসাইপাড়া তো।… আয় চলে শিগগির!
একেবারে অনেকখানি দূরে সরে এসে একটা গাছতলায় একটু অন্ধকার দেখে দাঁড়াল, জিগ্যেস করলে—‘আবার চিঠি? কার কাছে?”
রাগে নয়, যেন ভয়ে একটু একটু কাঁপচে। বললুম—‘চিঠি নয়, মাদুলি।’
একটু যেন শিউরে উঠল, জিগ্যেস করলে— ‘মাদুলি। কিসের? কে দিলে? কার কাচে নিয়ে যাচ্ছিস?’
কতদিনের কথা, তবু এখনও যেন দেখতে পাচ্চি দা’ঠাকুর, মুঠোতে গেরোটা যে ধ’রে আচে, হাত যেন আরও বেশি করে কাঁপচে। ত্যাখন না বুঝি এখন তো বুজচি —মাদুলি আবার গুণ করা তুক্ করার ব্যাপার তো। আমি সব কথা একটি একটি ক’রে বলে গেলুম!
শুনে খানিকক্ষণ একেবারে চুপ ক’রে সামনের দিকে চেয়ে থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কাঁপুনিটা একেবারে গিয়ে যেন একটা পাথরের মূর্তি। খানিকক্ষণ পরে ‘হুঁ’—ক’রে একটা টানা শব্দ হোল সুদু, তারপর জিগ্যেস করলে—‘ঘরে একেবারে চাল নেই?’
বললুম—‘তাই তো বললে দিদিমণি।’
‘সে টাকাটা ফুরিয়ে গেচে নিশ্চয়? নিশ্চয় গেচে।…আচ্ছা, আমায় তো বলেটলে না, তুই জানিস কি?—অনাদি, মানে তোর বাবাঠাকুর—সে কিছু এনে টেনে দেয় না আজকাল?’
বললুম— ‘তানার আর রোজগার নেই তো, বিধবাদের দলের নোক তো।’
ব্রেজঠাকরুন হঠাৎ চটে উঠল—‘আর সে কি করে? সেই জমিদারের ঘরের কুপুত্তুর, নাচিয়ে দিলে, এখন দেখে না কেন?’
—ওটা আচমকা; আবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমি চুপ করেই আচি, জিগ্যেস করলে—‘আচ্ছা বলদিকিন, আমি যে আচি, ব’সে ব’সে গিলচি, খোরাকটাও তো কম নয়, তা নেত্য কিছু বলে না?’
বললুম—‘বলে তো।’
‘কি বলে?’
যা বলে তা তো আর বলা যায় না, বাবাঠাকুরের অবস্থাটা ভেবে একটু বানিয়ে মানানসই ক’রেই বলে দিলুম—‘বলে মাসিমা এসে বাবাকে বেশ সায়েস্তা করে রেখেচে। নৈলে আরও যে কি করত।’
অন্ধকার, তবু যেন মনে হোল একটু হাসলে। জিগ্যেস করলে– ‘অনাদি কিছু বলে শুনেচিস?’
বললুম—‘হ্যাঁ, উনিও বলে।’
‘কি?’
‘বলে, বিয়ে করতে হয় তো ব্রেজোর মতন বিধবাকেই।’
একেবারে খিলখিলিয়ে যে হেসে উঠল তা যেন এখন পজ্জন্ত কানে নেগে রয়েচে দা’ঠাকুর, মুখে হাসি বলে তো বস্তু ছেলই না। একেবারে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল, বললে— ‘দেখেচ নষ্টামি ছোঁড়ার, বানিয়ে বানিয়ে বলতে নেগেচে।’
তখুনি আবার অন্যরকম হয়ে গেল, বললে—‘মরুকগে, শোন; তুই সেই চৌমাথাটায় দাঁড়িয়ে থাকবি। আমি এনে দিচ্চি গোটাকতক ট্যাকা, বলবি এই দিলে নবীন স্যাকরা। আর দাঁড়া; উদিকে তো হট্টগোল বাধিয়ে দিয়ে এলি বোসেদের বাড়িতে, নেত্য পাবেই টের, যদি জিগ্যেস করে মাসিমাকে ডাকতে গেছলি কেন? -কি বলবি তখন?’
নিজেও বোধ হয় ভাবছেল, তার আগেই আমি বললুম—‘বলব’খনি-দক্ষযজ্ঞের পালা হচ্ছিল, ঐ দিক দিয়েই আসছিলুম তো, ভূতের ভয়ে আপনাকে ডেকে নিলুম।’
ব্রেজঠাকরুন আবার যেন একটু হাসলে, বললে—‘বেশ, তাই বলিস, ফিচলেমিতে ছোঁড়া বুড়োদের নাক কাটে। বেশ তাই বলিস।’
আঁচল থেকে মাদুলিটা খুলে নিজের আঁচলে বেঁধে নিলে, বললে- ‘চল’।
পাঁচটি ট্যাকা এনে হাতে দিলে। বললে—‘যেমন যেমন বললুম ঠিক তেমন তেমন করে বলবি। আর এদিককার কথা যেন একেবারে না টের পায়;—তোকে আস্ত পুঁতে ফেলব তা’হলে। যা, আমি একটু হয়ে আসি। দুটো শাস্তোরের কথা শুনবে নোকে, তা শুধু বিঘ্নির উপর বিঘ্নি।’
খানিকটা এসে কি মনে হ’তে ঘাড়টা ফিরিয়ে দেখি উনিও কয়েক পা গিয়ে দাঁড়িয়ে প’ড়ে কি যেন ভাবলে; ডাকলে—‘শোন্ তো একটা কথা।’ নিজেও এগিয়ে এল।
জিগোলে—‘মাদুলিটা বাঁধা দিতে বলেছিল, না বেচতে?”
বললুম—‘বেচতে।’
—আমার সেই বুদ্ধির নামে দুর্বুদ্ধি এসে পড়ত না মাঝে মাঝে-এ হোল তাই। দিদিমণি বাঁধা দিতেই বলেছেল। ব্রেজঠাকরুন মানুষটা কত উঁচুদরের ত্যাখনও তত ভালো ক’রে জানিনে তো, ভাবলুম সোনাটুকু কি মতলবে হাতিয়ে নিলে, দেবে কি না দেবে, তার চেয়ে, য্যাখন জিগ্যেসই করচে, বরং বেচার নাম করেই একেবারে যতটা পারি হাতিয়ে নিই। বললুম—‘বেচে ফেলতেই বলে দিয়েচে দিদিমণি।’
জিগোলে’কতয়?’
বললুম—‘একশ ট্যাকায়।’
ব্রেজঠাকুরন একটু থির হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল। এমনি চোখ দুটো কড়া ছেল তো, থির হয়ে চাইলে আরও কড়া দেখাতো, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে—‘হুঁ। একশ ট্যাকায় বেচে ফেলতে বলেচে? একশ ট্যাকার ঐ সোনা?”
আমি ভড়কে গিয়ে বললুম’ বললে —পাঁচ টাকা দিলেও বেচে দিস।’
ব্রেজঠাকরুন আবার মাথাটা দোলালে, এক পা এগিয়ে এসে বললে—‘ছোঁড়া আবার আমার সঙ্গে দমবাজি খেলচে। বলেচে-একশ ট্যাকা, তা পাঁচ ট্যাকা হ’লেও বেচে দিস।…আমি বলব কি বলেচে?’
আমি হাঁ করে মুখের দিকে চেয়ে রইলুম।
‘মায়ের হাতের সোনা, বেচতে সে কখনও বলে নি। ঠিক কিনা?
আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েই রইলুম, দিলে বুঝি বসিয়ে ঘা’কতক। কি ভেবে কিন্তু ও নিয়ে আর কিছু বললে না। একটু যেন ভাবলে, তারপর নরম হয়েই বললে— ‘তুই কিন্তু বেচার কথাই বলিস, বলবি স্যাকরা বললে—ওটুকু সোনা, বাঁধা রেখে তো অত দেওয়া যায় না, বরং তুই রেখে যা, বাকিটা পরে নিয়ে যাস।’
বললুম—‘দিদিমণি যদি জিগোয় কত পজ্জন্ত দেবে বলেচে।’
কি ভেবে আমার মুখের পানেই চেয়ে আবার মাথা দোলালে একটু; অন্ধকার, তবু মনে হোল যেন একটু একটু হাসচে, তারপর চোখ তুলে একটু যেন ভেবে নিয়ে বললে—‘তা—বলিস বললে সোনাটুকু ভালো মনে হচ্চে, ট্যাকা পনের পজ্জন্ত হয়তো দিতে পারব। তবে সময় মন্দা, একেবারে অতগুনো দিতে পারবে না। তারপর, যার জন্যে তোকে ডাকলুম- যেমন যেমন নেত্যর হাত খালি হয়ে আসবে, তোকে বলবে, তুই আমার কাছ থেকে নিয়ে দিয়ে আসবি। বুঝলি?”
—অভাবের সংসার, একেবারে সবটা হাতে দিতে চায় না আর কি। বললুম—‘বুঝেছি’।
আবার শাসিয়ে দিলে—‘ঠিক যেমন যেমন বললুম করবি। আর যদি দেখি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েচে তো তোর হাড় একদিকে মাস একদিকে করব। দেখলি তো সিদিন ঘোষালের পোর অবস্থাটা?…যা! ‘
ঠিক মনে পড়চে না দা’ঠাকুর সেই রাত্তিরের কথাই, কি দু’-একদিন বাদের, তবে সামনে একাদশীরই হোক কি অন্য কিছুর হোক একটা উপোস ছেল। অভাবে প’ড়ে যেমনটি ইচ্ছে – করতে পারত না, তবে মনটা খুবই দরাজ ছেল দিদিমণির। সামনে উপোস, হাতে দুটো পয়সা এয়েচে, একটু ভালো ক’রেই ব্রেজঠাকরুনের রেতের ব্যবস্থাটুকু করলে দিদিমণি। পরোটা না করে লুচি করলে; অন্যদিন দুধ থাকে শুধু, বেশি দুধ আনিয়ে বেশ করে ঘন ক্ষীর করে দিলে, তার সঙ্গে বেশি ক’রে ভালো ফলপাকুড়; আমায় সন্দেশ আনতে দেছল, রসময় টাটকা মনাহরা করচে দেখে আমি তারই পোর্টাক নিয়ে এলুম। কতকটা ভয় রয়েচে মনে, বেশ একটু বেশি প’ড়ে গেল তো, কিন্তু দিদিমণি খুশিই হোল। বললে— ‘বেশ করেচিস স্বরূপ বৃদ্ধি করে এনে। সাধ কি হয় না ভালোমন্দ একটা পাতে দিতে? —-নিজের মাসিই তো—তা এমন পোড়াকপাল, দেখ না।..বেশ করেচিস বুদ্ধি খাটিয়ে এনে। বাবাকেও একটু দোব’খন শেষ পাতে।’
বেশ মনে আছে দিনটি। একটা দুর্ভাবনা কেটে গেচে, দিদিমণির মনটা খুব খুশি। বাড়িতে কেউ নেই। ঠাকুরমশাই তো শালীর ভয়ে থাকতই কম, উনিও কোথায় কথকতা শুনতে গেচে—বোশেখ মাস, এর বাড়ি কিম্বা ওর বাড়ি রোজই তো নেগে আছে। আমায় আটকে রেখে দিদিমণি, আয়োজনের মধ্যে ঘোরাঘুরি করচে, কি ব’সে ফলপাকুড়ই কাটছে, আমার সঙ্গে গল্প করছে
‘তুইও আজ থেকে যা স্বরূপ, বাবার জন্যে একটা ভালো তরকারি করব মনে করেচি, সইয়ের কাছ থেকে জেনে এলুম সিদিন—কলকাতায় নতুন চলচে, শ্বশুরবাড়ি থেকে শিখে এয়েচে সই।…বাপকে একটু পাত সাজিয়ে দিতে কার না ইচ্ছে করে বল স্বরূপ, কিন্তু যা কপাল ক’রে এয়েচি।…বলবি একটু খরচ পড়ে যাবে, অভাবের সংসার। নঃ, মা ওপর থেকে দেখচেন, চালিয়েই দেবেন, অন্যায় তো কিছু করচিনে….
য্যাখন নুচি-টুচি ভেজে ওনার ব্যবস্থাটুকু সেরে আঁস হেঁসেলের দিকে এয়েচে, ব্রেজঠাকরুনও এসে পড়ল। দিদিমণি জিগ্যেস করলে — ‘আজ যেন বড় তাড়াতাড়ি ফিরলে মাসিমা? ভালো হচ্চে না কথকতা?’
বললে—‘হচ্চে তো দিব্যি। চলে এলুম, রাত জাগলে উপোসটা বড্ড নাগে। তোর হয়েচে তো, দে ধরে যা একটু দিবি, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়িগে’।
আমায় দেখে জিগোলে—‘তুই বাড়ি গেলিনি?’
দিদিমণিই বললে—‘বাবাও নেই, ওকে আটকে রাখলুম।’
‘গেচেন কোথায়? গাঁয়ে বিধবাদের হিল্লে করতে? ইদিকে নিজেদের হিল্লে কে করে তার ঠিক আচে?’
কথাটা বোধ হয় মুখ দিয়ে অসাবধানে বের হয়ে গিয়ে থাকবে সেই জন্যেই দাওয়া থেকে ঘুরে আমায় ইশারায় জিগ্যেস করলে কথাটা বলিনি তো? আমিও ইশারায় জানালুম—না। উনি ঘরের মধ্যে চলে গেল।
একটু পরে বেরিয়ে এসে বললে— ‘তা ছেলেমানুষ, আটকে রাখলি তো এখেনেই দুটি দিয়ে দিস, খেয়ে শুয়ে থাকবে’খন; খানিকটা পথ তো।’
এক একটা দিন হঠাৎ আসে না দা’ঠাকুর—যেন সব ভালো, সবাই ভালো, যেন ভালো করতে গিয়ে আর আশা মেটে না—সে দিনটা ছেল সেই রকম। আমি রান্নাঘরের কপাটের কাছটিতে বসে, দিদিমণি ভেতরে বসে থালা রেকাবি সাজাচ্ছেল, বললে- তাই না হয় থাকবে’খন মাসিমা।’
নকুলে মানুষ তো, একটা কিছু পেলেই হোল, একটু হেসে, চোখ নাচিয়ে মাথা দুলিয়ে আমায় চাপা গলায় বললে— ‘নেত্য পোড়ারমুখীর তো সে আক্কেল নেই! ‘
একটু থেমে বললে—‘ভালো হোল, আজ মনটাও ভালো আছে বুড়ির। তুই এক কাজ করবি স্বরূপ।’
জিগোলাম—‘কি?’
হাত থামিয়ে একটু ভাবলে, তারপর বললে—‘সাধ তো হয়, তবে সাধ্যিতে কুলোয় কই?… তা হোক, যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন, একটা দিন বৈ তো নয়; তুই এক কাজ কর স্বরূপ, ছুটে রসময়ের দোকান থেকে গোটা দুই ছ্যানাবড়াও নে আয়।’
আঁচলেই বাঁধা ছিল পয়সা, আমি নিয়ে ছুটলুম।
তারপর ফিরে এসেই এক বিপরীত কাণ্ড একেবারে। ঘরের দাওয়ায় ঠাঁই করে লুচি মেঠাইয়ের থালাটা ধরে দিয়ে ব্রেজঠাকরুনকে ডেকে ফল আর ক্ষীরটা আনতে রান্নাঘরে গেচে, উনি এসে আসনে বসতে গিয়ে আবার একেবারে সিদে হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, খানিকটা চেয়ে রইল থালাটার দিকে, তারপর খুব রাগলে যেমন নরম গলায় আরম্ভ করত, ডাকলে—নেত্য, ইদিকে আয়।’
খোরাকী মানুষের ভালো খাওয়া দেখাটাও তো একটা তামাসা, কাঁটাল গাছের আড়াল হয়ে দেখব বলে দাঁড়িয়েচি, দিদিমণি ফলের রেকাবি আর ক্ষীরের বাটিটা হাতে ক’রে বেরিয়ে এল।
‘একি কাণ্ড? লুচি, মণ্ডা, ছ্যানাবড়া। -বলি কাণ্ডটা কি? তোর হাতে আবার ও কি?’
তখনও নরম সুরেই। আমি গাছের আড়াল থেকে কিন্তু দেখচি, সুর নরম হলেও একটু একটু কাপচে ব্রেজঠাকরুন। দিদিমণি উঠোন থেকে বোধ হয় সেটা টের পায়নি, বললে—‘দুখানা করলুম মাসিমা, একাদশীর পিঠোপিঠি উপোসটা এসে পড়ল…।’
একেবারে ফেটে পড়ল ব্রেজঠাকরুন ‘তাই রাজভোগের ব্যবস্থা হয়েচে। সরা, দূর কর সামনে থেকে! বলি মতলবখানা কি? পয়সা ধরচে না, না, চাস না যে মাসি এখানে থাকে? মস্ত বড় রোজগেরে বাপের মেয়ে, না? পয়সা রাখতে জায়গা নেই। যার এলা হোল তো ওব্লা কি ক’রে চলবে তার ঠিক নেই, তার কিনা এই দরাজ হাত!নুচি, মণ্ডা, ছ্যানাবড়া—বাটিতে নিশ্চয় কাশী থেকে রাবড়ি মালাই আমদানি হয়েছে। সরা, ওঠা বলচি! ‘
পর্দায় পর্দায় উঠচে গলা, কে বলবে এই মানুষ একটু আগে ঐরকম ছেল। দিদিমণির মুখের ওপর দাওয়ার আলোটা গিয়ে পড়েচে, কি রকম হয়ে গিয়ে সে মাটির পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে আছে, দেখলে চোখ ফেটে জল আসে। তবু শক্ত মেয়ে, কি হয়তো বলতে যাচ্ছিল, ব্রেজঠাকরুন আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠল—‘বলি, সরালি এই উপহাস্যির রাজভোগ।’
দিদিমণি কতকটা যেন মরিয়া হয়েই এগিয়ে গেল, পৈঠেয় উঠে কাতর হয়ে বললে- ‘করে ফেলিচি মাসিমা মেয়ে, ভুল করেচি,—খেয়ে নাও।’
আরও গলা সপ্তমে উঠল ব্রেজঠাকরুনের; শুধু তাই নয়, হাজার রাগুক, ঝগড়া করুক, একটা যাকে বলে বেচাল কথা কখনও মুখ দিয়ে বেরুত না দা’ঠাকুর, সিদিন দেখলুম মনে যা কিছু ওর গলদ ছেল—সন্দোই বলুন যাই বলুন, সব এল। ঘুরে দিদিমণির মুখোমুখি হয়ে একেবারে গলা ফাটিয়ে আরম্ভ করলে—বলি, কাল বাদে পরশু কি খেতে দিবি, একমুঠো ভাতও জুটবে না যে! নিজেদেরও জুটবে না তো মাসিকে সোহাগ ক’রে খাওয়াবি কোথা থেকে?…তা নয়, চাস না আর মাসি থাকে এখানে।…উঠতি বয়েস, বাপের নিজের কাপড়ের ঠিক নেই, কোথা থেকে এক মাসি-আপদ এসে আগলে রয়েচে তো—মনঃপুত হচ্চে না—তা ভেবেচিস এই উপহাস্যিতেই মাসি ভড়কে পালাবে—নিজের যেমন খেয়াল তেমনি ক’রে যাবি…’
একেবারে চরম গালাগাল তো দা’ঠাকুর —ত্যাখন বুঝতুম না, এখন তো বুঝি,—দিদিমণি—‘ও মাসিমা!’ বলে পায়ে আছড়ে পড়তে যাচ্ছেল, তার আগেই—‘সরালি নি? তবে এই দেখ’—বলে থালায় একটা লাথি মেরে লুচি-মোণ্ডাগুনো ছড়িয়ে দিদিমণিকে একরকম ডিঙিয়েই পৈঠে বেয়ে নেমে সদর রাস্তা দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।
কি একটা যেন ওলট-পালট হয়ে গেল, একটা খণ্ড-প্রেলয়ই। দিদিমণি ঠাঁইয়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে রয়েচে, কাঁটালগাছ ছেড়ে যে এগিয়ে যাব তার ক্ষ্যামতা নেই গায়ে। কতক্ষণ যে এই ভাবে কাটল জানি না, তারপর—দিদিমণি চুপ করেই পড়ে ছেল, নিশ্চয় কাঁদছেল——ও মাগো!’—বলে একবার ডেকে উঠতেই আমি যেন টলতে টলতে পাশে গিয়ে বসলুম, ডাকলুম—‘দিদিমণি!’
‘ওরে স্বরূপ, এ কি হোল!’—ব’লে দিদিমণি একেবারে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। অত কাঁদতে ওকে আর কোন দিন দেখি নি, বড্ড অপরুদ্ধ হয়ে গেছে, আর কথাগুনো তো একেবারে আঁতে ঘা দিয়ে। ছেলেমানুষ, বোঝাতেও জানি না, পিঠে হাত দিয়ে যেটুকু মনে হচ্চে বলচি, কিন্তু সে কি কানে যায়?—সিদিন ওনার মুখে বার বার একটি কথা- ‘ওরে স্বরূপ, আমি জানি, আমার এবার হাড়ির হাল হবে-সতীলক্ষ্মী মায়ের হাতের সোনা যখনই নিজের হাতে ঘর থেকে বের করে দিয়েচি তখনই জেনেচি কপাল ভাঙল আমার—নৈলে মায়ের বোন মাসি, সে এমন কথাও বলতে পারলে?’
ইনিয়ে-বিনিয়ে একথা বলে ওকথা বলে, তারপর ঘুরে ফিরে আবার ঐ মাদুলির কথা—‘মায়ের হাতের সোনা ঘরের বার করেচি—তুই দেখ দাঁড়িয়ে আমার প্রাশ্চিত্তিরটা স্বরূপ- নৈলে যার জন্যে বের করা তার মুখেই ঐ মোক্ষম গাল! আরও আচে বাকি—তুই দাঁড়িয়ে দেখ আমার পাপের প্রাশ্চিত্তির…’
সেই প্রেথম ব্রেজঠাকরুনের শাসন লঙ্ঘন করলুম দা’ঠাকুর।’ আমি একটু চকিত ভাবেই স্বরূপের দিকে চাইলাম।
স্বরূপ বললে—‘আজ্ঞে হ্যাঁ। শাসনেরই ভয় তো—পুঁতে ফেলবে পাঁকে; কিন্তু সে ভয় কতক্ষণ থাকে? এদিকে মনটা উৎলে উৎলে উঠছে, রাত হয়ে চলেচে, বাবাঠাকুরের দেখা নেই, ব্রেজঠাকরুনই বা কোথায় গেল—দিদিমণির কান্না মনে হয় সারারাত আর থামবে না। ছেলেমানুষ, কোন উপায় দেখচি না, বেশ মনে পড়ছে, কান্নার এক একটা ঢেউ এসে যেন বুকের পাঁজরা চেপে চেপে ধরচে। সামলে সামলে শেষকালে আর পারলুম না, ঘুরে ফিরে একবার যখন আবার দিদিমণি মাদুলির কথা তুলেচে, আমি কান্নার মুখেই বলে উঠলুম— ‘ও দিদিমণি, তুমি চুপ করো, সোনা ঘরেই আচে।…ফেলুক গে পুঁতে আমায়!’
তারপর দিদিমণির এই অবস্থা, উদিকে ব্রেজঠাকরুন আসলে কত ভালো—তার সঙ্গে বোধ হয় নুচি-মণ্ডাগুনোর ঐ দশা—এইসব একসঙ্গে কি রকম তাল-গোল পাক্যে গিয়ে আমিও দু’হাতে মুখ চেপে হুহু ক’রে কেঁদে উঠলুম।
ত্যাখন আমারই পালা, খুব আশ্চর্যির কথাও তো, দিদিমণি চুপ করে গেল। উঠেও ব’সেচে, তবে প্রেথমটা যেন বিশ্বাস করতে পারলে না; তারপর একটু থেমে ধরা গলায় জিগোলে—‘কি যেন বললি স্বরূপ…কোথায় মাদুলিটা তা হলে?… ট্যাকা পেলি কোথায়?’
প্রেথমটা তো কান্নার বেগ সামলাতেই গেল। দিদিমণি কোলের কাছে টেনে নিয়ে অনেক ক’রে ভোলাতে লাগল, আর ভোলাচ্চে বলেই আমি যেন সামলাতে পাচ্ছি না নিজেকে। তারপর একটু সুস্থির হয়ে সেদিনকার সন্দের তাবৎ কথা সব বলে গেলুম; বলি, আর সামলাই’মাসিমা যেন টের না পায় দিদিমণি, তা হলেই আমায় খিড়কির পুকুরের পাঁকে পুঁতে ফেলবে বলেচে।’
দু’জনেই সামলে-সুমলে উঠে বসেচি, আমি বলে যাচ্চি, দিদিমণি চুপ করে শুনে যাচ্চে; চোখের জল শুকিয়ে গেচে, মুখটাও পরিষ্কার হয়ে এসেচে, কান্নার পাটই যেন উঠে গেল। তারপর আবার চোখের পাতা চেপে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল দিদিমণির। চুপ ক’রে বসেই রইল, তারপর হঠাৎ—‘উঃ, এমন মানুষকেও!’…শেষ করতেও পারলে না, তাড়াতাড়ি আঁচলটা তুলে নিয়ে মুখে চেপে ধরে আবার কান্না; তবে কথা নেই আর, নিঃশব্দেই কেঁদে যেতে লাগল।
খানিকক্ষণ একভাবে কাটল, তারপর ওনার কান্না থামবার জন্যেই হোক, কি ব্রেজঠাকরুনের ওপর দরদেই হোক, কিম্বা সংসারের একটা ব্যবস্থা হিসেবেই হোক—এখন আর ঠিক মতন মনে পড়চে না—আমার মাথায় একটা বুদ্ধি যুগিয়ে গেল, আস্তে আস্তে ডাকলুম—‘দিদিমণি।’
সঙ্গে সঙ্গেই যে উত্তর পাওয়া গেল এমন নয়। দিদিমণি একটু সামলে নিয়ে জিগোলে, ‘কি র্যা?’
আঁচলটা মুখে চাপাই রয়েচে ত্যাখনো।
বললুম—‘বলছিলুম, তুমি এবার না হয় একটু উজ্জ্বগি হবে?’
‘কিসের উজ্জ্বগি?’
‘ওনাদের বিয়ের। বাবাঠাকুর পাল্যে পাল্যে বেড়াচ্চে-মাসিমা ইদিকে এত ভালো…’
দিদিমণি আঁচলের মধ্যে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো একেবারে, তারপরেই আঁচল সরিয়ে আমার পিঠে এক বিরেশি সিক্কার কিল— ‘ বেরোবেরো হতভাগা আমার সামনে থেকে! কী-পাপ জুটেচে—হাসবার সময় হাসতে দেবে না—কাঁদবার সময় কাঁদতে দেবে না—বলে নিজে উজ্জুগি হয়ে বাপের বিয়ে দ্যাও—বিধবা মাসির সঙ্গে—বেরো হতভাগা!…’
অন্য লোকের বেলা—যত হাসি তত কান্না, ওর ছেলো একবারে যত কান্না তত হাসি; -হীরে-পান্নায় কী অদ্ভুত মানুষই যে দেখেছিলুম সেই এক, অমনটি কই আর দেখলুম না তো দা’ঠাকুর।
