কাঞ্চন-মূল্য – ১৮
১৮
আমি হুঁকো থেকে মুখ তুলে প্রশ্ন করলুম— ‘এলেন শেষ পজ্জন্ত?’
স্বরূপ মণ্ডল বললে— ‘ঐ যে আপনাকে ত্যাখন বললুম না না এসে আর উপায় ছেল? রাজু ঘোষাল ঝানু লোক, নিজের ট্যাকা বেনো জলের মতন পরের সিন্দুকে ঢুকিয়ে পরের ট্যাকা বের করে এনে খেতে হয় তাকে, তাকে ফাঁকি দেবে এমন মানুষ তো জন্ম নেয় নে। সে তো ব’সে ছেল না, আর সেই যে সিদিন ব্রেজঠাকরুনকে মিষ্টি ক’রে শাসিয়ে গেল—সময় হলেই মেয়েকে আপনি গিয়ে ওর বাড়িতে উঠতে হবে, সে শাসানোর একটা অর্থ ছেল তো। চুপিসাড়ে কলকাঠি নাড়ছেল, যিদিন ওনাদের মন্দিরে সলাপরামর্শ হোল তার পরদিন নয়, তার পরদিন সকালে আদালত থেকে পেয়াদা এসে ট্যাঁটড়া পিটিয়ে গেল—‘ওমুকের ছেলে অমুক, পেশা পুরুতগিরি, সাকিন মসনে, মহাজনের বাকি ট্যাকার দায়িক বিধায় আজ থেকে এত দিন বাদে এই তারিখে জেলার আদালতে হাজির দ্যাও—ডিম্, ডিম্, ডিম্, ডিম্!’
সমস্ত দিন বাড়ি একেবারে নিঝুম। অন্য সময় হাজার বিপদ হোক দিদিমণি খেলে কি না খেলে ব্রেজঠাকরুন সে খবরটা একবার নেয়ই, সিদিন ঘুরেও দেখলে না। সেই যে শমনের নুটিস শুনে তক্তপোশে গিয়ে পড়ল, পড়েই রইল।
সন্দের একটু আগে উঠে এসে দিদিমণিকে ডেকে বললে —‘মনে করেছিলুম আইবুড়ো মেয়ের হাতের নেকা তা আর অন্য পুরুষের নজরে পড়ে কেন, দেখি য্যাদ্দিন পারি সামলে থাকতে-তা আর উপায় নেই। তেমনি, আবার গাঁয়ের রাজাই তো; নে আয় কাগজ কলম।’
চিঠিটা নিয়ে চৌধুরী বাড়ির দিকে যাচ্চি, দত্তদের পুকুর পেরিয়ে রাজু ঘোষালের বাড়ির দিকে যে পথটা গেচে, দেখি বাবাঠাকুর হনহন করে হেঁট মাথায় সেই পথ ধরে চলে আসচে। আশ্চয্যি তো; আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। কাছে এসে নজর পড়তেই সুদোলে— ‘স্বরূপ না? কোথায় চলেচিস?’ বললুম—‘ছ’আনি চৌধুরী বাড়ি। আপনি কোথায় ছিলে? আজ ট্যাডড়া দিয়ে গেল আদালত থেকে।’
না,—‘দিক। চৌধুরী বাড়ি কি করতে যাচ্ছিস এ সময়? মুঠোর মধ্যে কি তোর? দেখি।’ চিঠিটা মেলে ঠাহর করে দেখবার চেষ্টা করলে। অন্ধকার হয়ে এসেচে, পড়তে না পেরে সুদোলে—কে নিকেচে?
‘বললুম—দিদিমণি। নিকিয়েচে মাসিমা।’
‘কি নিকেচে?”
আমি দাঁড়িয়েই ছেলুম য্যাখন নেকাটা হয়। বললুম, নিকেচে—হঠাৎ এই রকম বিপদ, চৌধুরীমশাই শিগগির একটা যেন ব্যবস্তা করে; নিজে একবার এলেই ভালো। উনি আবার আজ রেতেই চলে যাচ্চে কিনা।’
‘তা হঠাৎ দেবনারাণকে যে?’
বললুম—‘উনি বলেছেল তেমন-তেমন কিছু হলে জানাতে।’
বাবাঠাকুরকে তো কতবার কতরকম দেখলুম। মা-ঠাকরুন গিয়ে ব্রেজঠাকরুন আসবার পর থেকে বিধবা-বিয়ের ভয়ে য্যাখন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্চে ত্যাখনও দেখেচি, ভূত মনে করে আঁতকে উঠেচি; সিদিন ওনার সঙ্গে দিদিমণির বিয়ে নিয়ে যে হঠাৎ দুর্ব্বাসা মুনির মত তেউড়ে-মেউড়ে উঠল সে-রূপও দেখেচি, আরও কতবার কতভাবে দেখেচি; কিন্তু এ-দিনে যে দেখলুম এ যেন একেবারে অন্যরকম। সন্দে হয়ে গেচে, একটা বড় ঝোপের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলুম আমরা, তাতেই বেশ অন্ধকারই বোধ হচ্ছিল, আগে অতটা লক্ষ্য করিনি, চোখ খানিকটে স’য়ে আসতে ভালো ক’রে নজর পড়ল। আর কিছু নয়, এদিকে খুব যেন শান্ত, শুধু অমন যে টানা চোখ ওনার, ভেতরে ঢুকে গিয়ে সাপের চোখের মতন জ্বলচে। বাইরের সঙ্গে এটুকু এত বেমানান যে মনে হয় এর চেয়ে চোখ বড় বড় করে হাত পা আছড়ানো, কি ভয়ে শিউরে থাকা সে যেন ঢের ভালো।
কথাও বেশি নয় সেরকম আঁকুপাঁকু ক’রে। তেমন-তেমন কিছু হ’লে চৌধুরীমশাই জানাতে বলেচে শুনে একটু চুপ করে থেকে সুদোলে—‘কবে বলেচে?’
আমি মুকিয়েই ছিলুম সবটুকু বলবার জন্যে, একটা জানাবার মতন কথা তো। বেশ ফলাও ক’রে বলতে যাব, বাবাঠাকুর বললে—‘চল্, সে আর শুনে কাজ নেই।’
সমস্ত পথটুকুতে আর কিছু জিগ্যেস করলে না। কিছু নয় তেমন, তবু ওনাকে যেন সিদিন আরও বেশি ক’রে ভয় করছেল, মনে হচ্চেল বাড়ি গিয়ে পড়তে পারলে যেন বাঁচি; আমিও কিছু আর বললুম না।
বাড়িতে য্যাখন ঢুকলুম, দিদিমণি বিলম্ব ক’রেই তুলসীতলায় পিদিম দিতে যাচ্ছেল, হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে চেয়ে রইল; প্রেণাম করতেও গেছে ভুলে, কিছু বলা দূরে থাক্। বাবাঠাকুরও যেন দেখেও দেখতে পেলে না, দাওয়ার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ডাকলে— ‘ব্রেজদিদি আচ?’
ব্রেজঠাকরুন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। একটু তো বারোধ গোছের হবেই, তারপর বললে—‘অনাদি নাকি? শুনেচ বোধ হয় নতুন সমিস্যে—ঘোষাল বাকি টাকার নালিশ ক’রে সমন জারি করিয়েচে।’
বাবাঠাকুর দাওয়ায় উঠতে উঠতে বললে—‘সমিস্যে সব না মিটিয়ে আমি বাড়ি ঢুকেচি?’
ব্রেজঠাকরুনের গলাটা একটু যেন কেঁপে উঠল, সুদোলে— ‘তা পারলে তুমি টাকাগুনো যোগাড় করতে অনাদি?’
না,—‘ঐ একটি উপায়ই ছেল নাকি ব্রেজদি?”
আমি ব্রেজঠাকরুনের দিকে দেখব কি দিদিমণির দিকে দেখব? দুজনেই যেন দুদিকে কাঠের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে আচে, দিদিমণির আঁচলের আড়ালে তুলসীতলার পিদিম
ব্রেজঠাকরুন সুদোলে—“তাহলে?”
না,—‘সব এক কথায় মিটে গেল, দিনও ঠিক ক’রে এলুম—দুই বেয়াইয়ে মিলে—এই মাসের সাতুই—আজ হোল তেসরা—ভাবচি তাহলে আর দিন কই? রাজু আবার ঘটা করেই দিতে চায় বিয়েটা, ঐ একটিই সন্তান তো।’
ব্রেজঠাকরুন থির হয়ে সমস্তটুকু শুনে গেল। তারপর ওনাকে আর কিছু নয়; দিদিমণি যে কাঠ হয়ে উঠোনে পিদিম আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছেল, সেই দিকে তাকিয়ে বললে—‘রকম দেখো মেয়ের! বাপ্ পুরো মাসটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অমন হিল্লে ক’রে এল, তাকে রেঁধে বেড়ে সামনে পাঁচ-ব্যানুন ভাত ধরে দিয়ে তোয়াজ করতে হবে না?’
তার পরদিন সকাল থেকেই বাড়িতে সাড়া পড়ে গেল। এর আগে শুধু একটু-আধটু মেরামত আর-দুটো ঘরে চুন ফেরানো হচ্ছিল,—যা নাকি অসম্পূন্নই রেখে বাবাঠাকুর বাড়ি ছেড়ে চলে গেছল—এদিনে আর তা নয়। একেবারেই ঢেলে সাজা। সময় নেই তাই, সকাল থেকেই একপাল রাজমিস্ত্রি ছুতোর আর ঘরামি এসে কাজে লেগে গেল—ইট, বাঁশ গোলপাতা, আরও সব সরঞ্জাম এসে জড়ো হতে লাগল। চারিদিকের দেওয়ালটা উঠবে, খিড়কির দিকে একটা পুরনো ঘর ভেঙে গিয়ে শুধু দেয়ালের খানিক খানিক দাঁড়িয়ে ছেল, সেটাও খাড়া হবে, আবার শোনা যাচ্চে সদর দরজার ওপর মাচা তুলে নাকি রসনচৌকিরও ব্যবস্থা হবে।
বাবাঠাকুর হুঁকো হাতে করে তদারক করে বেড়াচ্চে। অত এলাকেড়ে লোক তা রাতারাতি অমন কাজের কি ক’রে হয়ে উঠল যেন ঠাহর ক’রে ওঠা যায় না। মণ্ডলপাড়া থেকে বাবা আরও কয়েকজন এনেচে, চারিদিকে ঝোপঝাড় কেটে সাফ করচে—বাজার এনে ফেলচে।
ব্রেজঠাকরুনের মুখে একটি কথা নেই। একটা কথা বলিনি দা’ঠাকুর; এদানি আর সেই যে কথায় কথায় ঝগড়া সবার সঙ্গে সে ভাবটা অনেক কমে এসেছেল। ছেল, একেবারে যে গেচে তা কি করে বলব, সিদিন দেউড়ি যেতে ঐ কাণ্ডটা করলে চৌবেজীর সঙ্গে; চৌধুরীমশাই সামলে নিলে, তাই, নৈলে একটা হুলুস্থুলু কাণ্ড বাধবে বলেই তো গেছল; স্বভাব একেবারে যাবার নয় তো, তবু আজ-কাল ভাবটা অনেক অন্য রকম, হৈ-হৈ করার চেয়ে যেন ভাবেই বেশি মুখটা থমথমে হয়ে থাকে, কথা থাকে বন্ধ; হয়তো খেলেই না, কিম্বা যদি বসলই একবার তো ভাতেহাতে ক’রে উঠে পড়ল।
সেদিনও সকাল থেকে ঐ ভাব। রেঁধে-বেড়ে দিদিমণি য্যাখন ডাকতে এল, ঠায় ওর মুখের দিকে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ—যেন কা’কে দেখচে! তারপর ওবিশ্যি এল সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু ঐ নেতান্তই ভাতে-হাতে। দিদিমণি বললে—‘একেবারে যে কিছু দাঁতে কাটলে না মাসিমা
উঠতে উঠতে ঘুরে কি যেন একটা বলতে যাচ্ছেল, কিন্তু না বলে বেরিয়ে এল। তবে দিলে উত্তুরটা; বাবাঠাকুর উঠোনে দাঁড়িয়ে রাজ খাটাচ্ছেল, পাশ দিয়ে যেতে যেতে সেখান থেকে হেঁসেলে দিদিমণিকে উত্তরটা দিলে—‘খেতে যে তুই বলচিস নেত্য—তা বোনঝির এত ঘটা করে বিয়ে হচ্চে, খিদে জমাতে হবে না ভালো করে?’
আজ্ঞে বড় ক’রে বলবার জন্যেই তো উত্তুরটা উঠোন পজ্জন্ত নিয়ে এয়েচে, রাজমজুর, ছুতোর ঘরামি-যে যেখানে কাজ করছিল, একটু থমকে হাত বন্ধ করে মাথা তুললে। তখুনি ওবিশ্যি নিজের নিজের কাজে লাগল আবার। বাবাঠাকুর পেছন ফিরে তামাক খাচ্ছেল, ঘুরে- চাওয়া নয়, কিছু নয়, শুধু টানটা একটু ঘন-ঘন করে দিলে।
দিদিমণির কিন্তু একেবারে অন্যরকম ভাব দা’ঠাকুর। ঐ একটি মানুষ যে হাজার কিছু হোক, কখনও মুখভার করতে জানত না। এদানি কিন্তু অভাব-অনটন আর চারিদিকের দুশ্চিন্তেয় একেবারে মুষড়ে পড়েছেল তো, রাত্তিরে কথাটা হঠাৎ শুনে যাই হোক, সকাল থেকে কিন্তু যেন আমার সেই সাবেক মানুষ! সিদিন বাজার থেকে মাছটাছ আনিয়ে ভালো করে একটু রাঁধবার ব্যবস্থা করলে। আমায় রাখলে দাওয়ায় বসিয়ে, তারপর কুটনো কুটচে, কি বাটনা বাটচে, কি কড়ায় তরকারি নাড়চে, আমার সঙ্গে গল্প। বেছে বেছে সেই সব গল্প যাতে হাসির কথা আছে—ছিরু ঘোষালের স্বয়ম্বর হতে আসা; চৌধুরীমশাইয়ের শাড়ি প’রে বাঁশের ছাতা মাথায় দিয়ে ঘোড়ায় চ’ড়ে বাড়ি ফেরা, কি ব্রেজঠাকরুনকে নিয়েই কোন গল্প-হাসির কথা তুলতে চাইলে তার তো কোন অভাব ছেল না। তা এতদিন যেন চাপা ছেল, উনি একটা একটা ক’রে টেনে বের করে আনতে লাগল। এক একবার উঠোনে কে কি বলচে, কাজ করতে করতে, তারই হয়তো নকল ক’রে হেসে উঠল। কাউকেই তো বাদ দিত না, একবার বাবাঠাকুর যেই ঘরামিদের তাগাদা দিয়ে বলেচে— ‘করিনে তো করিনে, ঘরামিগিরি করলে এতক্ষণে তিনখানা চালা তুলে ফেলতুম’-উনি অমনি হাত গুটিয়ে নিয়ে চোখ পাকিয়ে মাথা নেড়ে বললে- ‘মেয়ের বিয়ে দিইনি তো দিইনি, য্যাখন দিলুম—একসঙ্গে তিনটে মাতাল এক ক’রে,—গেঁজেল, গুলিখোর আর চণ্ডুখোর!’ জোরে হাসবার তো জো নেই, মুখটা দরজার সামনে থেকে একটু টেনে নিয়ে চাপা গলায় খিলখিল করে হেসে উঠল। ঐ রকমই চলল, হাসিখুশি যেন উছলে উছলে উঠচে, উদিকে কিছু কাজ রইল তো চাপাচুপি দিয়ে গেল কোন রকমে, তারপর সেরে নিয়ে ঘুরে এসেই একটা কিছু ছুতো করে হাসিতে ভেঙে পড়ছে।
ওবিশ্যি মুখ ফুটে বললুম না, হাসি জিনিসটাই ছোঁয়াচে তো, হাসচিও,তবে আমার একেবারে ভালো লাগচে না দা’ঠাকুর। বুঝলেন না কথাটা?—বিয়ে হবেই, তবু দিদিমণির যদি মত না থাকত, যেমন নুকিয়ে হাসচে সেই রকম নুকিয়েই যদি খানিকটা কান্নাকাটি করত তো তাতে তবু যেন খানিকটা স্বস্তি পাওয়া যেত; এ যেন রাজী হয়েই যাচ্চে, তাও খুব খুশি হয়েই রাজী হচ্চে। য্যাতই সময় যাচ্চে মনটা আমার ত্যাতই ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়ছে। তা ওপরের হাসি দিয়ে ভেতরটাকে তো বেশিক্ষণ চাপা দিয়ে রাখা যায় না। দিদিমণির নজরও বড় সুক্ষু, দুপুর বেলা বাড়িটা খালি, মিস্ত্রি-মজুর সবাই খেতে গেচে, বাবাঠাকুরও আহার ক’রে ঘরে, আমি একলা কাঁটালগাছটার তলায় ব’সে ছিলুম, দিদিমণি হেঁসেলের পাট সেরে থালা বাটিগুলো নিয়ে খিড়কির পুকুরের দিকে যাচ্ছেল, বললে- ‘এখানে একলাটি বসে কেনরে স্বরূপ? আয়, খিড়কির ঘাটে আমায় একটু দাঁড়াবি আয়?’
খিড়কিটা একেবারে নিজ্জন। যেতে দিদিমণি একবার আড়চোখে চাইলে আমার দিকে, তারপর আর একটু এগিয়ে সুদোলে—‘তোর মনটা অত ভার-ভার কেন রে? সকালে থেকেই দেখচি?’
ঐ একটু উসকে দেওয়া দরকার ছেল। দিদিমণি হাসির দিকে নিয়ে যাবার জন্যেই ঠাট্টা করে আরম্ভ ক’রেছেল—‘ঠাকুমাবুড়ির বিধবা-বিয়ে দিচ্চে, না, তোদের নতুন জামাইবাবু আবার কোন স্বয়ম্বর সভায় যাচ্চে?’—আমার চোখটা ডবডবিয়ে এল, তারপর আর সামলাতে না পেরে দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠলুম!
দিদিমণি দাঁড়িয়ে পড়ল, ডানহাতে এঁটো থালার গোছা, এগিয়ে এসে বাঁ হাতটা আমার কাঁধে দিয়ে বললে—‘দেখো, কোথাও কিছু নেই, ছোঁড়া কেঁদে ভাসিয়ে দিলে!
আমি আরও ফুলে ফুলে কেঁদে উঠলুম, বললুম—‘তোমার বিয়ে ঠিক করেচে বাবাঠাকুর। বললে——তা করুক না। আমায় তার জন্যে একটুও ভাবতে দেখচিস? আমার তো বরং আরও ফূর্তি হচ্চে মনে। সেই আলাদিনের পিদিমের গল্প শুনিস নি? তোকে বলব’খন–সেইরকম কেমন রাতারাতি বাড়ি ঘর দোর চড়চড় করে উঠে যাচ্ছে, তাও কার, না, এক হাড়কেপ্পনের টাকায়, ফূর্তির চোটে তো আমি কি করব ভেবে ঠিক করতে পারচি না! তুই উলটে কেঁদে আকুল, কাঁদবার কি আচে?’
আমার চোখদুটো আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিলে, বললে— ‘আয়, ঘাটে আয়।’
আমি নারকোল গুঁড়ির সবচেয়ে নিচের রানাটায় বসলুম, দিদিমণি বাসনগুলো মাজতে লাগল।
কান্নাটা হঠাৎ যেমন এয়েছেল, তেমনি হঠাৎ গেচে চলে। দিদিমণি বাসন মাজচে, কোন কথা নেই, শুধু দেখচি মুখটা ক্রেমেই যেন শক্ত হয়ে উঠচে, তাইতেই—বাসনগুলো যে মাজচে তাতে এক একবার যেন বেশি ক’রে চাপ গিয়ে পড়ছে। তারপর একসম মুখটা তুলে বললে—‘বাবা ঠিক করেচে…যেমন বললে না কাল? দুই বেয়ায়ে মিলে দিনও ধায্য হয়ে গেচে।…ব্যস্ তবে আর কি, বিয়ে হয়ে গেল অমনি।… আমি সতীলক্ষ্মী মায়ের মেয়ে রে, আমায় নিয়ে যাবে জোর ক’রে। তুই লক্ষণ চিনিস না স্বরূপ, তাই কেঁদে কুল পাচ্ছিস না, আমার সব নখদর্পণে। …
মাসিমার মুখটা দেখেচিস?…কালবোশেখীর পূর্বলক্ষণ রে!…ঘরে আগুন দিতে আসে নি গাঁ সুদ্যু? কেমন মাটি চেটে স’রে পড়তে হোয়েছিল। আবার সেই ঘরে আগুন দিতে চায়! কুটোর মতন কোথায় উড়ে যাবে দেখিস না?’
বাসনগুলো গুছিয়ে নিয়ে বললে—চল, ওঠ।’
চুপ করেই এলুম আমরা। মিস্ত্রি-ঘরামিরা আসতে আরম্ভ করচে। উঠোনের বাইরে থেকে শুনলুম….মিস্ত্রি বড়াই করচে—‘ঠাকুরমশাই বলে’ মিস্ত্রি, পারবে কিনা। যোগান পেলে আমি এই সময়ের মধ্যে সাতমহল বাড়ি হাঁকিয়ে দিতে পারি, এ তো তুশ্চু!’
দিদিমণি চোখ টিপে চাপা গলায় বললে—“ তোমায় হাঁকিয়ে দেওয়ার লোক ঐ তক্তপোশে শুয়ে শুয়ে শুনচে! ভুলে গেচো?’
চাপা গলায় একটু খিলখিল করে হেসে উঠল।
ঐ হাসির জেরই আবার চলল সমস্ত দিন, তারপর অত যে হাসি—ক’দিনের পর যেন ছলছলিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, মনে হোল আবার যেন চিরতরেই মুখে গেল মিলিয়ে।
সন্দের একটু আগের কথা। বাবাঠাকুর চটি জোড়াটা পায়ে দিয়ে নিয়ে পিরানটা চড়িয়ে বাবাকে ডেকে বললে—‘বীরু, আমি এবার একটু বেরুব, কাজ তো একরকম নয়, তোমরা খানিকটে সামলে-সুমলে তবে যাবে।’
বেরুতে যাবে, ব্রেজঠাকরুন গায়ের কাপড় সামলাতে সামলাতে বেরিয়ে এল, গলা তুলে বললে—‘একটু দাঁড়িয়ে যাও অনাদি। পিছু ডাকলুম, তা যা হচ্চে তার চেয়ে অমঙ্গল আর কি হবে?’
ভেতরে চলে গিয়ে আবার মিনিট দুয়েকের মধ্যেই বেরিয়ে এল। কাঁধে একটা গামছা জড়ানো পুঁটুলি! মনে হোল তাতে ওনার থান কাপড় আর গরদের কাপড়টা রয়েচে। হাতে কমণ্ডলু আর তার মুখেই জল খাওয়ার পেঁপে ঘটিটা বসানো।
গটগট ক’রে নেমে এসে বাবাঠাকুরের সামনাসামনি হয়ে গেচে। দিদিমণি পাশের ঘরটায় ছেল, দেখি চৌকাঠের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েচে, টানাটানা চোখ দুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসচে।
ব্রেজঠাকরুন সামনাসামনি হয়ে দাঁড়িয়ে বললে- ‘আমি চললুম।’
কিছুক্ষ্যাণ তো কোন কথাই যোগাল না বাবাঠাকুরের, তারপর আমতা আমতা করে সুদোলে’চললে—তা কোথায়?”
না,—‘তুমি কাজে যাচ্চ, বাড়ি আচে, ফিরবে! আমার কাজ ফুরিয়েচে, বাড়ি নেই, যেদিকে দু’চক্ষু যায় চক্ষুম।’
আবার খানিকক্ষণ কথা যোগায় না। তারপর বাবাঠাকুর বললে—‘তুমিই এক আপন জন। আছ নেত্যর, ওর বিয়ে—দুদিন বাদেই…’
ব্রেজঠাকরুনের চোখ দুটো জ্বলে উঠল যেন। আস্তেই কথা কইছিল, তবে এবার আওয়াজ চাপতে গিয়ে গলাটা যেন করাতের মতন কর্-কর্ ক’রে উঠল—আপন জন! এক আপন জন সব্বনাশ করচে আর এক আপন জনের দাঁড়িয়ে তামাসা না দেখলে জুত হবে কেন!…থাক, এবার থেকে আর তো কেউ নয়, ওকথায় থাকি কেন?…আমি আপন জন হয়েই একদিন এসেছিলুম অনাদি, আজ কিন্তু পর হয়ে যাচ্চি। আর, পর হয়ে যাচ্চি বলেই গেরস্তকে জানিয়ে তার সামনে হয়েই যাওয়া ভালো। এই আমার দুখানি বস্ত্রো, এই কমণ্ডলু আর জল খাবার ঘটি। আপন করার মধ্যে করেছিলুম মেয়েটাকে—মা-মাসি আলাদা নয় তো; তা এই বাপ রইল। তার চেয়ে আপন তো কেউ নেই।’
একবার ঘুরে চারিদিকে চাইলে, বাবাকে দেখতে পেয়ে বললে—‘একটা গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করতে পার তো এসো সঙ্গে, নয়তো ব্রেজবামনীর পা-গাড়ি আচে।’
সবাই পাথরের মূত্তির মতন দাঁড়িয়ে, তার ভেতর দিয়ে উনি হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল।
বাবা গেল পেছনে পেছনে। তারপর খানিক হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে বাবাঠাকুরও বেরিয়ে যেতে আমি দাওয়ায় উঠে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। দিদিমণি তক্তপোশের ওপর লুটিয়ে পড়েছিল, আমি কাছে গিয়ে ডাকতেই একবার একটু ঘাড় বেঁকিয়ে দেখে নিয়ে কেঁদে উঠল- ‘ওরে স্বরূপ, এতদিনে আমার কপাল সত্যিই ভাঙল। যার ভরসায় আমার এত গুমোর-এতদিন আগলে রাখলে, মনে করেছিলুম শেষ অবধি রাখবে—আমার পোড়া কপাল পুড়িয়ে পায়ে ঠেলে চলে গেল রে স্বরূপ।’
তাই বলেছিলুম না?—ক’দিন অন্ধকারের পর ঐ যে একটা দিনের জন্যে মুখে একটু আলো ফুটেছিল—পুরো একটা দিনই বা কোথায়?—তা সে যেন দিদিমণি নেভার আগে একটু দপ ক’রে জ্বলে উঠেছিল। এর পর শুধুই চোখের জল, শুধুই চোখের জল; বিছানা করচে,… কি সলতে পাকাচ্চে, কি হেঁসেলে রয়েচে—এক ভাব; একদিকে মুখ ফিরিয়ে চেয়ে থাকে, তারপর দরদর করে চোখের জল নামে। আজ্ঞে না, মুখে কথা নেই কিছু—একটু হয়তো ‘উঃ!’ কি ‘মাগো!’…যেন শ্রাবণের ধারা, হাঁক নেই, ডাক নেই শুধু আকাশ যেন অনবরত গ’লে গ’লে পড়ছে।
চোখ দুটি ফুলে গেচে, ইদিকে যেন দুটি রাঙা জবা। বাপের চোখে পড়ল বৈকি, বাড়িতেই তো রয়েচে, তবে বাপ যেন নুকিয়ে, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্চে। বোঝবার লোকও নয়, আর বোঝাবে যে তার মুখই বা কোথায় বলুন?
সেদিন বাকিটুকু ঐভাবেই কাটল। মাঝে বার দুই দেখলুম মা-ঠাকরুনের পায়ের সেই আলতা-ছাপের সামনে কুলুঙ্গিতে কপাল চেপে দাঁড়িয়ে আচে।
বিকেল থেকে দিদিমণির ভাবটা যেন আবার গেল বদলে। চোখে জল নেই, বোশেখের শুকনো পুকুরে যেমন রোদ্দুর ঠিকরে পড়ে না?—কতকটা যেন সেইরকম। য্যাতই পহর এগুচ্চে মুখটা ত্যাতই যেন শক্ত হয়ে উঠচে। কাছে বসে আছি, একটা যদি কিছু বলে, তা একেবারে কিচ্ছু নয়। অনেকদিন থেকে ফুরসত হলেই একটু একটু করে বাবাঠাকুরের জন্যে একটা ক্যাথা সেলাই করেছেল—প্রায় শেষ হয়ে এসেচে, সেইটে নিয়েই বসেছিল—ফোঁড় তুলচে আর মাঝে মাঝে কোনওদিকে কি মনে ক’রে একদিষ্টে চেয়ে রয়েচে—একবার আমায় বললে—তাক থেকে সূতোর বাণ্ডিলটা নিয়ে আয় তো স্বরূপ।’
সুতো নিয়ে ঘর থেকে একটু হন্তদন্ত হয়েই বেরিয়ে এলুম, সেই কুলুঙ্গিটে খালি, জিগ্যেস করলুম- ‘মা-ঠাকরুনের পায়ের সেই আলতা ছাপটা নেই দিদিমণি!’
দিদিমণি ‘সে কি রে!!’—ব’লে কপালে চোখ তুলে শিউরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ওনার ডান হাতটা বুকের ওপর পড়ে ‘ছ্যাঁৎ’ ক’রে একটা শব্দ হোল, কাগজে হাত পড়লে যেমন হয়। একটা নিঃশ্বেস ফেলে শাড়ির ভেতরে কাগজটা চেপে ধরে বললে—’এই তো রয়েচে। বাবাঃ, এমন ভয় পাইয়ে দিছল।’
তারপর আর একবার মাত্র কথা। একটু পরে ক্যাথাটা গুটিয়ে-সুটিয়ে নিয়ে ওঠবার সময় আবার বুকের ওপর হাতটা চেপে ধ’রে বললে— ‘আমায় হিঁচড়ে ঐ বাড়িতে টেনে নিয়ে যাবে! অনেক উপায় আচে।’
তার পরদিন সকাল থেকেই বিয়ে বাড়ি গমগম করতে লাগল। এইবার হুঁকোটা একটু কাত করতে হবে দা’ঠাকুর।
কলকেটা নিয়ে একবার আকাশের দিকে চোখ তুলে বললে—‘দুপুর যে ইদিকে গড়িয়ে যায়।
বললাম— ‘যাক না, সূয্যিঠাকুরকে তো পাট্টা লিখে দিইনি স্বরূপ; রোজই তাঁর আঙুলের ইশারায় চলতে হবে?’
স্বরূপ ধোঁয়া মুখে ক’রে একটু হাসলে, বললে—‘আমারই কি হুঁশ থাকে দা’ঠাকুর দিদিমণির কথা আরম্ভ করলে? তবে আজকাল নেহাত নাকি ডেলি-প্যাসেঞ্জারের যুগ —নিত্যি তো দেখচি—ঐ সামনের রাস্তা দিয়ে মানুষের সে যেন স্রোত বয়ে যাচ্ছে—ন’টা তেইশেরটা বেরিয়ে গেল, দশটা তেরোরটা এসে গেল—এই মুখের বুলি…তাইতেই কেমন একটা ধোঁকা গেঁথে ব’সে গেচে মনে-তা’লে বুঝি শুধু সময়েরই দাম আচে, আর কিছুরই দাম নেই…নৈলে দিদিমণির কথা?—একটা ফিকির বের ক’রে হুঁকো হাতে দিয়ে বসিয়ে দিন না স্বরূপ মণ্ডলকে আপনাদের…যে রামায়ণের কাহিনী ব’লে যাব—চাকা কখন উঠল কখন ডুবল, আমারই কি সে হুঁশ থাকবে?”
টানের ফাঁকে ফাঁকে মন্তব্যটুকু ক’রে স্বরূপ কলকেটা আবার হুঁকোর মাথায় বসিয়ে দিলে। চোখ দুটো একটু চিকচিক করে উঠছিল, কাপড়ের খুঁটে মুছে দিয়ে একটু অপ্রতিভ গোছের হয়ে গিয়ে বললে- ‘ থাকো আজকাল জিনিসটে সত্যিই বড্ড কড়া দিতে আরম্ভ করেচে।… হ্যাঁ, কি যেন বলছিলুম?”
বললুম— ‘পরদিন সকাল থেকে বিয়ে-বাড়ির শোরগোল….’
বললে—হ্যাঁ।…তা আপনি হয়তো বলবেন—ছেলের বাড়ি বাপ আর ছেলে, মেয়ের বাড়ি বাপ আর মেয়ে,—একটা মানুষ যে একাই একশ হয়ে খানিকটা আসর মাতিয়ে রাখতে পারত, বেগতিক দেখে সেও পড়ল সরে; এ ফাঁকা মশানে শোরগোলটা তাহ’লে তুললে কে?…তুললে সমস্ত মসনে গাঁ-খানা যেন ভেঙে পড়ে। যদি বলেন তাই বা কেমন ক’রে হয় তো একটু বিস্তার ক’রে বুঝিয়ে বলতে হয়—
আপনি অতটা মিলিয়ে দেখেচেন কিনা জানিনে দা’ঠাকুর, তবে আমি তো এই চারকুড়ি বয়েসে অনেক দেখলুম—যুধিষ্ঠির-ঠাকুর যেমন জীবনে মাত্তোর একবার ‘ইতিগজ’ বলেছিলেন—তেমনি যতবড় কেপ্পনই হোক না কেন, সমস্ত জীবনে একটা দমকা খরচ সে করবেই। অমন কুলীন পণ্ডিতের মেয়ে ঘরে আনচে, ইদিকে ঐ তো ছেলে,—রাজু ঘোষাল হাত একেবারে খুলে দেছল। এর ওপর আবার দুটো দল রেষারেষি ক’রে এসে দাঁড়িয়েচে কিনা, সমস্ত গাঁ যেন ভেঙে পড়ল এসে আমাদের বাড়িতে। যদি বলেন দুটো দল মাথাফাটাফাটি করতে পারে, একজোট হয়ে একটা কাজে নামবে কি ক’রে, তো একটু তলিয়ে দেখলেই হদিসটা যাবেন পেয়ে। বাবাঠাকুর বিধবা-পাটির চাঁই একজন-ট্যাকার জোর নেই, তবে উনিই বিধান দিয়ে এক সময় চালিয়েচেন তো, আর সেই গয়ারামের সাতপুরুষের বোনঝির বিয়েটা তো উনিই দিলেন— তানার কন্যের বিয়ে, ওরা সবাই আপন জেনেই এসে পড়ল; উদিকে সধবা পাটির রিদয় ভচায্যির জয়-জয়কার-বাবাঠাকুরকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিলে তো—সে বাড়িতে চুপ ক’রে ব’সে থাকতে পারে?-দলবল দিলে পাঠিয়ে, নিজে বরের সঙ্গে পুরুত হয়ে আসবে ড্যাংডেঙিয়ে। মোদ্দা কথা খাতিরের চোটে এ-ওর হাত থেকে কাজ কেড়ে নিয়েই যেন দু’টো পাটির লোক—মেয়ে-মদ্দ—দিদিমণির বিয়ের যোগাড়ে মেতে গেল। উদিকে ভেন, ইদিকে রান্নার যোগাড়, একদল গিয়ে আসর খাড়া করতে গেল, মেয়েরা নিয়ে পড়ল বিয়ের ব্যবস্তা। উদিকে সদরে পোড়ো জমিটার সামনে ম্যারাপ ক’রে রসন-চৌকির ব্যবস্তা করা হয়েচে, তারাও সেই ভোর থেকে তাদের কালোয়াতি ভাঁজতে আরম্ভ করে দিয়েচে; সমস্ত বাড়িটা গমগম করতে লাগল। প্রেথম রাত্তিরে লগ্ন, যথাসময়ে আলোবাদ্যি ক’রে বরযাত্রী এসে আসরে দাখিল হোল। এক গাঁ,—সবাই-ই বরের ঘরের মাসি, ক’নের ঘরের পিসি তো, বেশ বড় দলই হয়েচে, তবে একেবারে বরের কাছাকাছি হয়ে রয়েচে ঘোষের আর সাঁবুয়ের আড্ডার যত গুলিখোর; ওদেরই তো দিন আজ। একেবারে পাশ ঘেঁষে রয়েচে জ’টে, ঐ হোল রাজপুত্তুরের সঙ্গে কোটালপুত্তুর তো। আজ আড্ডাধারীদের মেল-ডে, সবাইকে পুরো দম দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েচে, সমস্ত দলটি মাথা নিচু করে ঢুলচে।
আমার সিদিনের মনের কথা কি ক’রে বলি দা’ঠাকুর? আঁই-টাই করচে বইকি, একটু একলা হলেই মনে হচ্ছে যেন ডাক ছেড়ে কাঁদি। তবে ছেলেমানুষেরই মন তো, বাড়িতে এ ধরনের কাজ কখনও হয়নি, খাটতেও হচ্চে, খানিকটা মেতেও রয়েচি। দিদিমণিকে দেখতে ইচ্ছে করচে বড্ড; নতুন যে ঘরটা উঠেচে খিড়কির দিকে তাইতেই রয়েছে, কিন্তু মেয়েদের ভিড় ঠেলে উদিকে যেতে পাচ্চিনে তো। তবুও একবার কাটিয়ে-কুটিয়ে কোনরকমে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলুম একটু। দিদিমণিকে মেয়েরা সাজাচ্ছেল, কি বোধ হয় একটা ঠাট্টা করচে, দিদিমণিও হেসে কি উত্তর দিয়েচে, ঠিক সেই সময়টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছি আমি। একটা খুব চোট খেলুম বৈকি দা’ঠাকুর,—সেই কঠিন শক্ত মুখ—সেই চোখে আগুন ঠিকরে বেরুচ্চে, আশা করেছিলুম তো তাই দেখব।…আবার এও মনে হচ্চেনা, এই ভালো—বাজনাবাদ্যি আলোভোজ, বিয়ে হোল, দিদিমণি এইরকম হাসিমুখে শ্বশুলবাড়ি গেল, আমিও গেলুম বাড়ির নফর—এই তো বেশ।
সময় হ’তে বাবাঠাকুর এসে সভার আদেশ নিয়ে বর উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। খিড়কির একেবারে উলটো দিকে চাঁদোয়া তুলে বিয়ের জায়গা করা হয়েছে। বর গিয়ে আসনে বসল। একটা দেখবার মতন বিয়ে তো, সবাই যেন ভেঙে পড়ল। ইদিকে রিদয় ভচায্যি টিকির গোছাটা একবার খুলে ভালো করে ঝেড়ে নিয়ে ফুলসদ্যু গেরো দিয়ে মন্ত্র পড়াতে আরম্ভ করলে।
সিদিন আবার খুব ফলাও করে বিয়ে দেবে তো, পেটে য্যাত বিদ্যে আচে দেখিয়ে—এটা আনো, ওটা দাও, সেটা নেই কেন? এই করো, এই বলো—এতখানি বিস্তার ক’রে ইদিককার সব শেষ করে হাত-পা গুটিয়ে বসল, বললে—“নাও, এবার সম্পোদান, কনেকে নিয়ে এসে বরের সামনে বসাও।’
‘ক’নে নিয়ে এসো, ক’নে নিয়ে এসো’—বলে একটা রব উঠল। কয়েকজন ছুটলও, তারপরেই হঠাৎ একটু যেন চুপচাপ; তারপরেই আবার রব উঠল— ‘ক’নে নেই, ক’নে কোথায় গেল?…বিয়ের ক’নে গেল কোথায়?’
তারপরেই—খোঁজ! খোঁজ!…কাজের বাড়ি, একেবারে যেন তোলপাড় হয়ে গেল। রাজু ঘোষাল প্রেথমটা বোধ হয় ভয় পেয়েই গিয়ে থাকবে, কিন্তু রিদয় ভচায্যির মতন মানুষও তো আচে, আর রিদয় হারটাও তো খেলে খুব বড় রকমেরই দা’ঠাকুর—একটা ঘোঁট পাকিয়ে তুলল–বিয়ের কনে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘাবড়েই গেছল রাজু ঘোষাল, ক’নে কিছু ক’রে বসে থাকলেও—ওই তো দায়িক; এখন রিদয় ভচায্যির কাছে জোর পেয়ে ওর সঙ্গে গলা মিশিয়ে দিলে—‘ক’নে হাজির করো!…অনাদি, আমার কাছে কারচুপি চলবে না-ডুব মেরে এক কারচুপি করতে গিয়ে দেখলে তো, ল্যাজ মুখে ক’রে আপনি এসে উপস্থিত হ’তে হোল। চলবে না—বর ঐ পিঁড়ির উপর বসে রইল, ক’নে হাজির করো—নয়তো আমি থানা-পুলিশ করব—কোম্পানির রাজত্ব, হাতে হাতকড়ি দেওয়াব আমি!
চেঁচামেচি করবার মানুষ নয়, ভেতরে ভেতরে কলকাটি টিপেই কাজ সারে, সিদিন কিন্তু আর সামলে রাখতে পারচে না নিজেকে
বাবাঠাকুর তো একেবারে পাগলের মতন হয়ে গেচে। তিনি তো জানে দিদিমণি কি ধরনের মেয়ে ছেল—কী কান্নাকাটিটাই করেচে, তারপর অমন গুম হয়ে যাওয়ার অর্থটা কি। একবার ছুটে এর কাছে যাচ্ছে, একবার ওর কাছে যাচ্ছে—কি করবে যেন হদিস পাচ্চে না; তারপর রাজু ঘোষালকে চেঁচামিচি করতে দেখে ছুটে এসে তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলে—‘ভাই তুমি রক্ষে করো—ভাই তুমি অপবাদ দিও না, কি হয়েচে—সে যে মনে মনে কি ঠাউরে রেখেছেল আমি দিব্যচক্ষে এখন দেখতে পাচ্চি—বীরু মণ্ডলকে খিড়কির পুকুর ছাঁকাতে বলেচি—এখুনি টের পাবে ভাই কারচুপি করিনি আমি—মাথায় কারচুপি এলে আজ আমার এ দশা হোত না…’
কি কে শুনচে বলুন? নাচাবার লোকই তো বেশি, বিপদের মুখে ভেবেচিন্তে একটা রাস্তা বের করবে এমন লোক তো কম। জনে জনে হ’তে হ’তে ব্যাপারটা দলের মধ্যে গিয়ে পড়ে আরও ঘোরালো হয়ে উঠল। কথা-কাটাকাটি, ঠাট্টা-বিদ্রূপ। থানায় যাচ্ছে ব’লে রাজু ঘোষাল ছেলেকে পিঁড়ি কামড়ে পড়ে থাকতে বলতে উদিক থেকে একজন উত্তুর করলে—‘স্বচ্ছন্দে যান, যা বর বসিয়েচেন, বিয়ে হলেও ওকে চোপর রাত তোলা যেত না।
তা সে কথাও সত্যি দা’ঠাকুর; এত চারিদিকে হৈচৈ-ছিরু ঘোষালের যেন সাড় নেই। সিদিন যেন নেশায় আরও বুঁদ; এক একবার মাথা তোলার চেষ্টা ক’রে পিটপিট করে চাইচে, তারপর আরও দুমড়ে যেন পিঁড়ির সঙ্গে মিশিয়ে যাচ্চে; উঠবে কি, ওকে টেনে তোলাই ভার।
বাবা ভিড় ঠেলে এসে বাবাঠাকুরকে বললে-খিড়কির পুকুরে লাশ পাওয়া গেল না, যাচ্চে ঘোষপুকুরটা টানাতে। ভিড় ঠেলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবে, রাজু ঘোষালও আর এক চোট হুমকি দিয়ে, ছিরুকে বসে থাকতে ব’লে একটা দল সঙ্গে ক’রে থানা-পুলিশ করতে বেরিয়ে যাবে, এমন সময় কখন ঢুকেচে, কিভাবে ঢুকেচে ভগবানই জানেন, যেন ব্রেজঠাকরুন স্বয়ং সেই গোলমালের মধ্যিখানে এসে দাঁড়াল!
আজ্ঞে হ্যাঁ, ‘যেন’ বলচি তার হেতু হচ্চে; বিশ্বাস করা তো শক্ত-রামী নয়, ক্ষেমী নয়, একেবারে সাক্ষাৎ ব্রেজঠাকরুন। আকাশ থেকে পড়ল নাকি! সেইরকম মাথার চুলটা মাঝখানে চুড়ো ক’রে বাঁধা, পরনে গরদের শাড়ি; কোমরে দুটো হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সুদেল—“এ কি, বিয়ে দেখতে এলুম, তা বিয়ে কোথায়? এত গোল কিসের?’
একটু থতমত খেয়ে গেলই তো সবাই, তারপর বাবাঠাকুর এগিয়ে এসে ওনার দুটো হাত জাপটে ধ’রলে–’ব্রেজদি এয়েচ?..নেতাকে পাওয়া যাচ্ছে না—খিড়কির পুকুরে জাল ফেলিয়েছিলুম—বীরু এইবার ঘোষপুকুরে যাচ্চে নেত্যকে আমার পাওয়া যাচ্চে না ব্রেজদি। —এই আধঘণ্টা আগে পজ্জন্ত বিয়ের কনে সেজে বসে ছেল নতুন ঘর আলো করে!’
ব্রেজঠাকরুন হাঁ ক’রে শুনছেল, শুনচে আর শিউরে উঠচে, বললে—‘সে কি। তার বিয়ে-পাওয়া যাচ্চে না মানে? বরকে তা’হলে চোপোর রাত এমনি হাঁ-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে নাকি?
সবাই যেন একটু থ মেরে গেল দা’ঠাকুর। য্যাতই আঁতকে শিউরে উঠুক, তা একটা সহজ মানুষ, শুনচে বিয়ের ক’নে নিরুদ্দেশ, তার জন্যে পুকুরে জাল টানা হচ্চে-সে কিনা সে ভাবনা না ভেবে বলে— ‘বর হা-পিত্যেশ করে বসে থাকবে নাকি?
বাবাঠাকুর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আচে। বিপদের ওপর বিপদ তো। এই মানুষই কাল ওধি বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল দিদিমণিকে—দেখে একটা ভরসা হয়েছেল—অন্তত কান্নার একটা সঙ্গী পাওয়া গেছল তো এই নিবান্ধব পুরীতে-তা ফিরে এল একেবারে বদ্ধ পাগল! কি বলবে বুঝতে না পেরে হাঁ করে রয়েছে ওনার মুখের দিকে চেয়ে, উনিই বললে—তা জিগ্যেস করো না, অন্য ক’নে হ’লে বরের মন উঠবে?’
আজ্ঞে, পাগলের কথায় কান দেবে কি আবার গুলতনটা ঠেলে উঠল। রাজু ঘোষাল দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেল থানার দিকে, ছিরুকে আর একবার গ্যাট হয়ে চেপে ব’সে থাকতে ব’লে। বাবা ছুটল ঘোষপুকুরে জাল টানতে। বাবাঠাকুরও বোধ হয় তারই সঙ্গে যাবে, ব্রেজঠাকরুন তাকে খপ ক’রে ধ’রে ফেললে; টেনে নিজেই বরের আসনের কাছে এগিয়ে বরের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললে— ‘বলি কি—ও কন্যে তো কলা দেখিয়ে চ’লে গেল—অন্য কন্যে হ’লে হবে?…এই আমায়?—দেখোই না একবার চোখ তুলে, পুরুতও ধরে এনেচি… সেজেগুজে আসি…’
পাগলের মুখে মজার কথা, একটা হাসির গুলতন উঠছেল—ঠিক এই সময়টিতে উদিক থেকে ওঁরাও এসে হাজির হলেন আর কি। বেশি লোক নয়, পাইক বরকন্দাজে জন পাঁচেক, তবে সঙ্গে এবার অন্যজন; কোঁচার ওপর কালো চাপকান, মাথায় সেকেলের পটুপি। দুজন পাইক’কত্তা কোথায়?…কত্তা কোথায়?”বলে ভিড় চিরতে চিরতে ওনাকে এগিয়ে নিয়ে এল। আজ্ঞে, ব্রেজঠাকরুন তো তোয়েরই ছেল, ত্যাতক্ষণে ঘুরে এগিয়ে দাঁড়িয়েচে। ইদিকে অমন হট্টগোলের বাড়ি, তা একেবারে নিস্তব্ধ—একটা যদি ছুঁচ্ ফেলেন তো তার শব্দটি পজ্জন্ত কানে আসবে। বুঝলেন না দা’ঠাকুর?—আদালতের একটা শমন ঝুলছেলই—ফেরার আসামী হাজির-তার ওপর আবার রাজু ঘোষাল থানায় ছুটেচে—সেপাই দারোগা দেখেই সবার মাথা : গেচে গুলিয়ে…’
আমি নিঃশ্বাস রোধ করে শুনছিলাম, কিন্তু আর উৎকণ্ঠা চাপতে না পেরে প্রশ্ন করলাম- ‘দারোগাই এল শেষ পর্যন্ত? ওরা বুঝি তাই?’
স্বরূপ ঠিক আমার কথার উত্তর না দিয়ে একটু হাসলে, বললে—“ব্যাপারটা বুঝলেন না? চৌধুরীবাড়ির রেওয়াজই যে ঐ-নেতান্ত সমানে-সমানে হোলে উপায় থাকে না, নয় তো অব্যবস্থায় যদি একটু উঁচু-নিচু হোলো তো ঘরে মেয়ে এনেই বিয়ে করা চৌধুরীবাড়ির সাবেক রেওয়াজ তো। তা নায়েবমশাই ওনাদের দুজনের পায়ের ধুলো নিয়ে সেই কথাই বললে কিনা—’
‘উনি তাহলে নায়েব?’—উৎকণ্ঠাটুকু ছিলই; একটু ফের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রশ্নটা করলাম।
স্বরূপ আবার একটু হাসলে, বললে—‘চৌধুরী বাড়ির ছেলে বিয়ে করচে; তার মধ্যে দারোগা এসে দাঁড়াবে, আর সে দারোগা আবার ঘাড়ে মুণ্ডু নিয়ে ফিরে যাবে, দা’ঠাকুর? হাসালেন যে!…তা নায়েব মশায় সেই কথাই বললে কি না—বাবাঠাকুর আর মাসিমার পায়ের ধুলো নিয়ে হাতজোড় ক’রে বললে—ছোট কত্তার অমত ছেল না, এখানেই আসতেন বিয়ে করতে, তবে বড় কত্তা—ওনার কাকার বিশেষ ইচ্ছে—বংশের একটা পুরনো পদ্ধতি, ঘরে মেয়ে নিয়ে এসে বিয়ে করা—উনিই আমায় ডেকে বললেন-নায়েমশায়, হবু বেয়াইমশায়কে গিয়ে বুঝিয়ে বলুন…..
প্রশ্ন করলাম—‘কাকা—মানে, দশ-আনি তরফের সেই নিশিকান্তও ভাইপোর বিয়েতে রইলেন তাহলে?’
স্বরূপ আবার হাসলে, এবার বোধ হয় আমার বুদ্ধির খর্বতা লক্ষ্য করেই বললে—‘বরকত্তা তাহ’লে হ’চ্চে কে বলুন? তা ভেন্ন আপনি যে একটা কথা হিসেবের মধ্যে আনচেন না, খুড়ো-ভাইপো প্রেথক হয়েছেল বিধবা-বিয়ে নিয়ে, তা ভাইপো তো বিধবা বিয়ে করচে না, তা’হলে আর তার সঙ্গে আড়াআড়িটা কি নিয়ে? নায়েবমশায়কে দিয়েই ব্যবস্থাটা ক’রে পাঠিয়েছেল ওনারা। শুধু বিয়েটা ঐখেনে হবে; বিয়ের খাওয়া-দাওয়া যেমন হচ্চে—এইখেনেই; তারপর বিয়ে ক’রে বাসর ঘর করতেও বর-কনে এইখেনেই আসবে—বাবাঠাকুরের আবার এ-খেদটুকু না মনে থাকে যে আমি গরিব, জামাই হোল রাজা, আমার ময্যেদার দিকটা একেবারেই দেখলে না। সদ্যু বিয়েটা ঐখেনে হবে। ভিড় নয়, এদিকে যেমন আয়োজন হচ্চে হোক, নেমন্তন্নর দল যেমন জুটছে জুটুক, দুটো দেউড়ি থেকে তিনখানা জুড়িগাড়ি আর খান দুই পালকি এয়েছিল, তাইতেই যা আঁটল, বাবাঠাকুরের সঙ্গে জনাকতক গাঁয়ের বাছা বাছা মাতব্বর, উদিকের জুড়িতেও ব্রেজঠাকরুনের সঙ্গে কয়েকজন গিন্নী বান্নী স্ত্রীলোক,–এই নিয়ে নায়েবমশায় রওয়ানা হয়ে গেল। বাজে লোকও যে একেবারে না গেছল এমন নয় দা’ঠাকুর—একটা ছোঁড়া বাড়ির বাঁজা গোরুটাকে চরাত, তা ক’নে নাকি বিশেষ ক’রে ব’লে দিয়েচে কেউ আসুক না আসুক, তাকে যেন নিশ্চয়…’
গলাটা হঠাৎ ধ’রে এল স্বরূপের, এবার ভালো ক’রেই কাপড়ের খুঁটে চোখ দুটো মুছে নিতে হোল, ভালো ক’রে সামলে নেওয়ার জন্যে কলকেটাও তুলে নিয়ে গোটাকতক টান দিতে হোল, তারপর একবার গলা পরিষ্কার ক’রে নিয়ে আবার বেশ সহজ ভাবেই আরম্ভ করলে- ‘তারপর সেই একেবারে গোড়াতেই আপনাকে যা বলছিলুম-স্মরণে আছে বোধ হয় — সেই যে বিয়ের ক’নে এসে বললে—‘ঘাটের মড়ারা এতগুনো একত্তোর হয়েচে আর এটুকু কারুর মাথায় এল না যে…’
আমি হেসে বললুম—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বলেছিলে বটে, স্রেফ ভুলেই গেছলাম—তা ব্যাপারটা আবার…’
‘বিয়ে সেরে বাজনা-বাদ্যি ক’রে বর-কনে এসে দাখিল হোল। বরকত্তা নিশিকান্ত চৌধুরীমশাই ওনাদের পৌঁছে দিয়ে মিষ্টিমুখ করে চ’লে গেল। খুব ঘটা করেই ব্যবস্থাটা তো হয়েছেল, তার ওপর আরও ফেঁপে উঠেচে—ওদিকে বাসরের দিকে মেয়েদের জটলা, ইদিকে বিয়ে হয়ে গেচে, খাওয়ানোর হিড়িক-কে কাকে দেখে ঠিক নেই, এমন সময় বাবা উঠোনের ওদিক থেকে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল— ‘ঠাকরুনদিদি কোথায়?’– ব্রেজঠাকরুনকে ঠাকরুনদিদি বলত তো—“ঠাকরুনদিদি কোথায়? একটা বিয়ে সামলালেন, এখন এটা সামলাবে কে? — হ্যাঙ্গামা ক’রে এয়েছেন—বর উদিকে কনের জন্যে ব’সে আচে, পিঁড়ে ছেড়ে কোনমতেই উঠবে না।
হুল্লোড়ের বাড়ি তামাসা দেখবার লোকও তো কম নয়। একটা ভিড় উদিকে আবার চাপ বেঁধে উঠল, ইঁদুরের মতন গ’লে গ’লে গিয়ে একেবারে সামনে ঠেলে উঠলুম।
আজ্ঞে, সেই ছিরু ঘোষালের দল। ব্রেজঠাকরুন আবার লোভ দেখিয়ে গেছল তো নিজেই ক’নে হবে-গুলিখোরের মরণ, সিদিন আবার বিয়ের আহ্লাদে ডবল ডোজে চালিয়েছে—কে কনে কিরকম ক’নে সে হুঁশটা তো নেই—বিয়ে না ক’রে উঠবে না এই কোট ধ’রে আসর সাজিয়ে দলবল নিয়ে ব’সে আছে। আজ্ঞে, সাজানো আসরই বৈকি—রিদয় ভশ্চায্যি ওবিশ্যি কখন কোন্ ফাঁকতালে স’রে পড়েচে—তবে বিয়ের সরঞ্জামগুনো সব তো রয়েচেই, তারই চারিদিকে ঘেরেঘুরে বসেছে সবাই -পুরুতের আসনে উবুড় হয়ে বসে আছে জ’টে, একজন মালা নিয়ে রেডি হয়ে আছে—-গুলিখোরের মরণ তো, মাথায় একবার যা সেঁদিয়ে গেছে তার – তো আর নড়ন-চড়ন নেই–বললে পেত্যয় যাবেন না, স্তী-আচার করবে ব’লে জনকয়েক মাথায় কাপড় টেনেও শাঁক হাতে ক’রে আচে ব’সে শুধু ক’নে আনতে যা দেরি।
বাবার ডাকে ভিড় ঠেলে ঠেলে এল ক’নে—আজ্ঞে হ্যাঁ, ঐ ব্রেজঠাকরুন। দুটো কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখল খানিকক্ষণ দিশ্যটা—কিন্তু কাজের বাড়ি, দাঁড়িয়ে তামাসা দেখলেই তো চলবে না। আর এ ছেরাদ্দ গুটিয়েও তো না ফেল্লে নয়—ত্যাখন উনি বর পুরুতের কাছে গলাটা এগিয়ে নিয়ে এসে বললে—‘বলি ঘাটের মড়ারা, এতগুনো একত্তোর হয়েচ, আর একটু কারুর মাথায় সেঁদুল না? – সোনা নেই, তার জায়গায় কাঞ্চন-মূল্য দিয়ে বড় বড় কাজ সারা হয়ে যাচ্ছে—ক’নে নেই, তা হয়েচে কি? মূল্যটা ধরে নিয়ে মন্তর পড়ে মালাবদল করে নেও না, তোমাদের মুয়ে আগুন।
সে বাজখেয়ে গলা, তাও কোলাহলের ওপর তুলে বলতে হচ্ছে, অন্য কেউ হ’লে নেশাই তো ছুটে যাওয়ার কথা। ছিরু ঘোষাল চোখ খুলে একবার পিটপিট করে চাইলে, ডাকলে- ‘জটে!’
উত্তুর নেই। আবার ডাকলে, উত্তুর নেই। তেসরা ডাকে জ’টে একটু খিঁচিয়েই উঠে জড়ানে গলায় বললে—“শালা কোথায় ভক্তি ক’রে পুরুতমশাই ব’লে ডাকবে, না, জটে! জ’টে।…বেশ তো দিচ্চে বিধান—মোটা ক’রে মূল্যই চেয়ে নে না, গোল চুকে যায়—-খাওয়ানো দাওয়ানো, বাজনাবাদ্যি তো যথাবিধি হচ্চেই ঐদিকে।’
আজ্ঞে, তাই বলছিলুম—‘কনে না থাকলে তার ব্যবস্তা যে না আছে এমন কথা মসনের লোকে মানবে কেন?…উদিকে দুপুর যে গড়িয়ে গেল দা’ঠাকুর, দিন পেসাদটা একটু পেয়ে নিই।’
