কাঞ্চন-মূল্য – ২
২
গল্পস্রোতে চাই না বাধা দিতে, তবু এটা যেন বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেল, বললাম—“তা নয় স্বরূপ, কাকতালীয় ন্যায় হচ্ছে—ঐ কাকটা এসে বসল বলেই যে তালটা পড়ল এমন কথা নয়—ওটা আমাদের মনের ভুলও হতে পারে।
স্বরূপ আমার কথাটা হয় বুঝতে পারল না, না-হয় চেষ্টাই করল না বোঝবার, বলল—“তাই নয় স্বীকারই কর ভুলটা, তাও তো করতেন না। আর শুধু তো একটাই নয়, ঐরকম সব আরও অনেক। কেন হবে না, কি করে হবে,—এই ছিল মুখের বুলি। তাও যদি পুঁথির বিদ্যে পুঁথিতে থাকে তো গোল মিটে যায়; বাইরেও ঐ রকম কাণ্ড, লোকে বলত ঐ বিদকুটে শাস্তোর পড়েই। তাই নিয়ে মা-ঠাকরুনের সঙ্গে প্রায় লেগে যেত খিটিমিটি। হঠাৎ খেয়াল হোল–মেয়েকেও শাস্তোর পড়াব। মা-ঠাকরুন বলেন- ‘সে কি অলুক্ষণে কথা! মেয়েমানুষ সে শাস্তোর পড়বে কি গো।’ কেন পড়বে না?…ন্যাও, কোনদিন এরপর বলবে বেটাছেলে কেন ছেলে কোলে ক’রে হেঁসেলে ঢুকবে না। তা ছাড়া মেয়েমানুষ শাস্তোর পড়লে বিধবা হয় একথা তো শাস্তোরেই নেকা আচে, তোমার ঐ বিস্কুটে শাস্তোরেই না হয় নেই।…বাবাঠাকুর বলেন—“কেন, শাস্তোর না পড়ে হচ্ছে না বিধবা?…ত্যাখন ঠাকরুনকে চোখে আগুন দিয়ে বলতে হোল—‘তা’হলেই বোঝ, না পড়েও যখন হচ্ছে তখন পড়লে আর কি নিস্তার থাকবে?’…
এইরকম সব খিটিমিটি প্রায়ই লেগে থাকত দা’ঠাকুর। শুনতুম ও-শাস্তোরটা নাকি তক্কো করতেই শেখায় আর সব বাদ দিয়ে; তা যত তক্কো করতেই শেখাক, মেয়েছেলের মুখের সামনে তো এঁটে উঠতে পারবে না কেউ। কিন্তু জিদ,-মেয়েকেও শাস্তোর শেখাতে আরম্ভ করলেন, গোরুটাকেও কোনমতে ভিটে থেকে বিদেয় করলেন না। জিগ্যেস করবেন, কেন, গোরুটার আবার কি হোল?…হোল না?—ঐ তো বললুম ত্যাখন, সারাটা জীবন গেরস্তর দানাপানি খেয়ে গেল, বকনা দূরে থাক, একটা এঁড়ে বাছুর দিয়েও উবগার করলে না!…অভাবের সংসার, গায়ে লাগত, বলতেনও মা-ঠাকরুন। আবার সেই বেয়াড়া তক্কো…তোমরা কপাল-কপাল কর, তা ওর কপালে যদি বাছুর হওয়া নেকা না থাকে।…মা-ঠাকরুন বলেন—‘না নেকা থাকে অমন কপাল নিয়ে অন্যত্তর যাক।’…না, যার কপালে দুধ নেকা নেই তার ওখানেই তো ওকে থাকতে হবে।…মা-ঠাকরুন বলেন—“তা হবে বৈকি, সব কটা পোড়া কপাল একত্তর না হলে সংসারে এমন করে আগুন লাগবে কি করে?’…রাগ করেন, কান্নাকাটি করেন, যাকে যোগাতে হয় সেই তো বোঝে দা’ঠাকুর; কিন্তু ফল কিছু হয় না। ক্রমে মেয়েটিও ডাগর হয়ে উঠতে লাগল, সেদিকেও একটা কিছু বিহিত কর, তা কিছু নয়, ঐ গুটিকতক পোড়ো, ঐ শাস্তোর, আর ঐ তক্কো—খিটিমিটি বেড়েই যেতে লাগল সংসারে।
এরই মধ্যে একদিন বলা নেই কওয়া নেই সতীনক্ষ্মী চোখ বুজলেন। শুনুন আর নাই শুনুন তবু একটা বলবার লোক ছেল, মা-ঠাকরুন চলে যেতে একেবারে ঝাড়া হাত পা। আর হবি তো হ’ ঠিক এই সময়ে বিদ্যেসাগরী ঘোঁট্টাও গ্রামে আবার করে পাকিয়ে উঠল, এবার আরও ঘোরালো হয়ে।
আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনাদের একালে যেমন চরখা, হরিজন, ওর নাম কি ইংরেজ-তাড়াও, স্বরাজ-দেখছি তো একটার পর একটা—সেকালে তেমনি এক বিদ্যেসাগরী ঢেউ উঠেছিল দা’ঠাকুর—আর বিধবা থাকতে দেবে না দেশে। সে এক হুলুসস্থুলুস্ কাণ্ড। প্ৰেথম য্যাখন হাওয়াটা ওঠে—সে আরও আগেকার কথা, আমাদের জন্ম হয় নি ত্যাখনও। বাবা-কাকাদের মুখে শোনা, সারা দেশে সামাল সামাল রব উঠে গিয়েছিল নাকি। প্রেথমটা মিটি, তক্কাতক্কি, এই মসনেতেই কত কাণ্ড হয়ে গেল—এক পক্ষ বলে, শাস্তোরে এর বিধেন আছে তো আর এক পক্ষ বলে, কভি নেহি—এই নিয়ে কত টিকি ছেঁড়া-ছেঁড়ি, কত কেচ্ছা, কলকাতা থেকে বিদ্যেসাগরী দলের লোক নেকচার দিতে এসে কেউ ভাঙা হাত কেউ খোঁড়া ঠ্যাং নিয়ে ফিরে গেল। তারপর য্যাখন শোনা গেল, কোম্পানি আইন করে দিয়েছে, যেমন কেউ সতীসাধ্বী হতেও পারবে না তেমনি আবার বিধবা হয়ে থাকতেও পারবে না, ত্যাখন সামাল সামাল রব পড়ে গেল চারদিকে। এ হোল বাবা-কাকাদের আমলের কথা দা’ঠাকুর। ঘোলা জলে কিছু দেখা যায় না তো; এর পর ক্রেমেক য্যাখন থিতিয়ে এল ব্যাপারটা তখন সবাই টের পেলেনা, আইন সে রকম কিছু বলছে না, যার ইচ্ছে হয় সে দেবে বিয়ে, যার ইচ্ছে নয় সে দেবে না। তবে দিলে তার নালিশও নেই, ফরিয়াদও নেই, তেমনি আবার না দিলে কারুর গর্দানা যাবে না। যাতে কোর্ট নেই আদালত নেই, তা নিয়ে আর কতদিন মাথা ঘামাতে যাবে লোকে বলুন না কেন, সবারই কিছু-না-কিছু নিজের ধান্দা আছে তো,—হুজুগটা যেমন গনগনিয়ে উঠেছিল তেমনি আস্তে আস্তে আবার জুড়িয়ে গেল।
আবার চাড়া দিয়ে উঠল এই সময়টায়। বললুম না? আমার বয়েস এই ন’ কি দশ বছর। ভালো মন্দ কিছু বুঝিও না, ওনাদের কৈলীটাকে মাঠে নে যাই, সন্দেবেলায় গোয়ালে ঢুকিয়ে সাঁজাল দিয়ে দিই, দুপুর বেলা একমুঠো পেসাদ পাই। একদিন উঠোনের কাঁটালতলায় ভাত বেড়ে দিতে দিতে দিদিমণি বললে—“তোর ঠাকুমারা কখন যাবে র্যা?’…জিগ্যেস করলাম, ‘কোথায় গা দিদিমণি?’…..দিদিমণি একটু হাঁ করে চেয়ে রইল আমার দিকে—বেশ মনে আছে কিনা সিদিনের কথাটা, দিদিমণির আঁচলটা গাছকোমর করে জড়ানো, হাতে ডেলের খোরাটা, আমি জিগ্যেস করতেই হাঁ করে একটু যেন চেয়ে রইল, তারপর বললে— ‘কেন, তুই শুনিস নি?’…বললাম—‘কৈ না তো!…আর একটু কি ভাবলে, তারপর এক হাতা ডাল পাতের মাঝখানে ঢেলে দিয়ে বললে—‘তা’হলে কিছু নয়, উটকো খবর; তুই খেয়ে নে। ঠাকুমাকে ভালোবাসতুম, ওনার ভাব গতিক দেখে কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি, ঘুরে যেতে যেতে আবার ফিরে দাঁড়াল, বললে—‘উঠলি যে?’…বললুম—‘ঠাকুমাকে দেখতে যাচ্ছি।’—টানাটানা দুগ্গো-প্রিতিমের মতন চোখ দুটো ছেল দিদি-ঠাকরুনের, কথা বলতে বলতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঐরকম করে ভাবত; বললে—“তা যাবি; তোর ঠাকুমা তো এক্ষুণি পালাচ্চে না-আর পালাবেই বা কেন—বলচি একটা উটকো খবর—তবুও না হয় যাবি পেত্যয় না করিস আমার কথা তা ভাত কটা খেয়ে নে–বাড়া ভাত ফেলে গেলে যে অমঙ্গল হবে গেরস্তর।’ …ভোলাতেও জানত, পাঁচ কথায় ভুলে খাওয়া য্যাখন শেষ ক’রে এনেচি, ত্যাখন বললেন—‘হ্যাঁরে, তোকে কেউ কিছু বলেনি? গাঁয়ের যত বুড়ি সব যে গাঁ ছেড়ে তিখে পালাচ্চে।’ নকুলেও ছেল খুব, বলে খিলখিল করে হেসে উঠল। জিগ্যেস করলুম—‘কেন?’…’ও মা, নৈলে বিয়ে দিয়ে দেবে যে!—দেখো কাণ্ড! গাঁয়ে মহামারী ব্যাপার, আর ও-ছোঁড়া কিছু শোনেনি, এক বশিষ্ট মুনির কপিলে গাই পেয়েচে, খুলে নিয়ে যাচ্চে আর বেঁধে দিয়ে যাচ্চে, খালাস! …. বিধবাদের যে বিয়ে দেবে আবার, যারা বুড়ি তারা গাঁ ছেড়ে পালাচ্চে, যারা কম বয়সের তাদের আগলাবার জন্যে ভলেটিয়ারের দল গড়েচে সব! ছোঁড়া কিছু জানে না!’ …বললুম—‘তা ঠাকুমাকেও আগলাকে না।’…বললে—“তা বলগে যা না তোর ঠাকুমাকে। আর, পালিয়ে যাবেই বা কতদূর?’… কথা বলচে আর হেসে হেসে উঠচে, ওনার যেমন অব্যেস ছেল। আমি দা’ঠাকুর ভেবড়ে গেছি, কাকে বিধবা বলে কাকে সধবা বলে অতশত বুঝিও না তো, জিগ্যেস করে বসলুম—‘আর তোমার কি হবে?’…দিদিমণি একেবারে ডুকরে হেসে উঠল, বললে— ‘সবুর কর ছোঁড়া, আগে বিয়েই হোক, হই বিধবা, তারপর সে ভাবনা, কথায় বলে মুলে মাগ নেই উত্তুর শিওর। আর, ভাবনাটাই বা কিসের? দিব্যি বিদ্যেসাগরী দল পাত্র ঠিক করে নিয়ে আসবে, বাবা সম্পোদান করবে, খবরের কাগজে নাম ফটোক বেরিয়ে যাবে—মসনের অমুক ন্যায়রত্নের মেয়ে অমুক কলেজের অমুকের সঙ্গে বিধবা বিয়ে করেচে। ভয়টা কিসের? আমি তো হাঁ ক’রে বসে আচি ক’বে বিয়ে হবে আর ক’বে বিধবা হব।’
ওনার ঐরকম কথাবার্তা ছেল, মুখ কোন আগল ছেল না, লোকে বলত বাপের কাছে বাপের শাস্তোর পড়ে ঐরকম ধিঙ্গি হয়ে উঠচে। সত্যি মিথ্যে জানি না, তবে দিদিমণির ত্যাখন কতই বা বয়েস যে শাস্তোর পড়ে পাকা হয়ে উঠবে?—আমার চেয়ে বছর ছ’সাতেকের বড় ছেল, তার বেশি নয়। আসলে মনটা ছেল বড্ড খোলা আর তার সঙ্গে হাসি রোগ, তার জন্যে যদি ঠাকুর মশাইকেও টেনে আনতে হয় তো ছেড়ে কথা কইত না দিদিমণি। মনে যে সাতপাঁচ কিছু ছেল না কিনা। ইদিকে তেমনি মিষ্টি স্বভাব, আর তেমনি ধারাল বুদ্ধিও দা’ঠাকুর। সিদিনকার কথা ধরুন না। দিদিমণি টের পেয়েছেল; আমায় জিগ্যেস করতে আমি য্যাখন বললুম কিছুই শুনিনি, ত্যাখনই উনি ধরে নিয়েছেন ব্যাপারখানা কি দাঁড়িয়েচে। সেই জন্যেই আমার খাওয়া হয়ে গেলেও আমার এ গল্প সে গল্প ক’রে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলে। তারপর যখন বুঝলে উদিকে সব ঠিকঠাক—প্রায় আপনার গিয়ে য্যাখন সন্ধ্যে হয়ে এসেচে সেই সময় দিলে ছেড়ে আমায়। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঐ একটা কথাতেই দিদিমণি বাড়ির প্ল্যানটা আন্দাজ ক’রে নেছলো। কথাটা হচ্ছে, ঠাকুমা বুড়ি য্যাখন যাবেই, ও রকম আতঙ্ক নিয়ে তো গাঁয়ে টেকা যায় না, ত্যাখন আমায় জানিয়ে আর যাবার সময় কান্নাকাটি, হ্যাঙ্গামহুজ্জৎ করা কেন। তাই হোলও, বাড়ি গিয়ে টের পেলুম বুড়ি আরও একদল বুড়ির সঙ্গে দুপুরের পরই বিদেয় হয়েচে। আছড়ে পড়লুম উঠোনে। ত্যাখন আর কান্নাকাটি করেই বা কি হবে?—জোয়ারের গাঙে নৌকো ত্যাখন নাগালের বাইরে।
এর পরেই মসনে একেবারে তোলপাড় হয়ে গেল দা’ঠাকুর। যদি জিগ্যেস করেন একেবারে একরকম জুড়িয়ে গিয়ে আবার ঐ ঢো’টা মাথা চাড়া দিয়ে কেন উঠল, তো বলব বিদ্যেসাগর মশাই জ্যান্ত থেকে যা না করতে পারলেন মারা গিয়ে করলেন তার চার গুণ। তা’হলে আরও একটু পস্কের করে বলতে হয় কথাটা, একটু বোধ হয় আপনাদের একেলেদের গায়ে লাগবে, তা আর করা যাবে কি?…ঐ আপনাদের শোক-শোভা, দা’ঠাকুর, আমায়ও একবার টেনে নে’ গেছল। সে দুঃখের কাহিনী আগে একবার বলেচি আপনার কাছে। আমাদের সময়ে যদি কারুর কাল হোল তো তার জন্যে ঘাট হোল, ছেরাদ্দ হোল, জ্ঞাত-ভোজন হোল, নিশ্চিন্দি। তেমন তেমন জানিত লোক হোল, অবস্থাও আচে, তিলকাঞ্চন না ক’রে ষোড়শ করো, বেরষো করো, দান-সাগর করো; তারও ওপরে যেতে পার—দেশে দেশে জানাজানি করতে চাও, পণ্ডিত ডাকো, ঘটা করে বিদায় দাও, আপনি হৈ-হৈ উঠে যাবে’খন। আপনাদের একালের মতন শোক-শোভা ছেল না দা’ঠাকুর। আপনি বলবেন—কেন, একটা বড়লোক মারা গেল তার জন্যে যদি দলবেঁধে কান্নাকাটি করেই একটু তো মন্দ কথাটা কি? প্রেথমকে, কান্না তো সংকীর্তন নয় দা’ঠাকুর যে দলের মধ্যে গলা মিশিয়ে দিলে একটা সুর কোন রকম করে বেরিয়ে আসবেই। তাও না হয় গণ্ডায় এণ্ডা মিলিয়ে দিলে কে আর হিসেব রাখছে, কিন্তু কাঁদবে যে তার ফুরসত কোথায়? বিদ্যেসাগর মশাইয়ের শোক শোভার কথাই ধরুন না কেন। শোভার দিকটা হোল ভালোই একরকম। শিবতলায় মাঠটায় প্রকাণ্ড শামিয়ানা টাঙিয়ে ফুলপাতা, রঙিন কাগজের শেকল, পতাকা দিয়ে যা আসর খাড়া করলে তার কাছে যাত্রার আসর হার মানে। কিন্তু ঐ পজ্জন্তই। তারপর থেকেই আরম্ভ হোল ফ্যাসাদ। পয়লা তো কে উঁচু আসনটায় বসবে। কথাটা বোধ হয় শোভাপতি। ঐখানেই গলদটা বুঝুন; না হয় সাজিয়েছিস বিয়ের আসর করেই, কিন্তু আসলে তো ছেরাদ্দরই ব্যবস্থা, তা’হলে পতিটা এল কোথা থেকে বুঝিয়ে বল আমায়। পাপের প্রাশচিত্তির, ফ্যাসাদটা উঠলও ঐখান থেকেই। দুরকম দলই তো আচে মসনেতে, কেউ বলে বিয়ে হোক বিধবাদের, কেউ বলে কোভি নেহি; তা বিধবা-পাটির লোকে বললে আসনে বসবে তাদের লোক, সধবা পাটির লোক বললে, না, তাদের লোক। হকের দিক দিয়ে দেখতে গেলে অবিশ্যি বিধবা-পাটির কথাটাই লেহ্য, কেননা যাঁকে নিয়ে শোক তিনি তো তাদেরই লোক, কিন্তু সে আর শুনচে কে? আসল কথা সধবারা দলে ভারি, তারা চায় মিটিটাকে পণ্ড করতে, ঐ একটা কোট ধরে বসে রইল, আমাদের পেসিডেন্ট করো, না হয় দেখে নিচ্চি কি করে তোমরা শোক শোভা দাঁড় করাতে পার। ব্যাপার গুরুচরণ হয়ে দাঁড়াল।
এতটা হোত না দা’ঠাকুর, এসময় আরও একটা ব্যাপার হয়ে গেল কিনা, তাইতে গুলতনিটা আরও গেল বেড়ে; গাঁয়ের জমিদার রায়চৌধুরীদের দশ-আনী আর ছ-আনী দুই তরফে ভাগাভাগি হয়ে গেল। ছোট তরফের দেবনারায়ণ ছিলেন বড় তরফের নিশিকান্ত রায়চৌধুরীর ভাইপো। গোড়ায় শুনেচি খুড়োর খুব অনুগত ছিলেন, অত অনুগত নাকি ছেলেরাও ছেল না, তারপর কলকেতায় কলেজে পড়তে গিয়ে তানার মাথা নাকি বিগড়ে যায়। য্যাখনকার কথা হচ্ছে ত্যাখন সুদু তো বিদ্যেসাগরী হ্যাঙ্গামাই ছেল না, তার সঙ্গে ছেল বেহ্মো সমাজ, ওদিকে আবার কিষ্টান পাদ্রিদের কাণ্ড, ছেলে ঘরে মুখ্যু হয়ে থাক্, তবু কেউ কলকেতায় তালিম নিতে পাঠাত না দা’ঠাকুর। নিশিকান্ত দেখলেন—ছেলেটা ভালো, সাতচড়ে কথা কয় না, ঘুরেই না হয় আসুক না, অষ্টমফষ্টম কাটিয়ে যদি মানুষ হয়ে ফেরে তো বংশের নাম বেরিয়ে যাবে; আবার জমিদার-জমিদার ঘরেও তো রেষারেষি রয়েচে—ওদিকে পালেরা, দক্ষিণ পাড়ার চৌধুরীরা। ছেলে কিন্তু শোনা যেতে লাগল বিগড়ুতে আরম্ভ করেচে। ঠিক সে ধরনের বিগড়ুনি নয় তখনও, তবে নাকি সমাজে যায় মাঝে মাঝে, বক্তিমে করে, এই রকম সব কাণ্ড। দু’একবার ডেকে নিয়ে এসে কাঁড়কে দিলেন, এই রকম শুনি। তাতেও নাকি য্যাখন ফল হোল না ত্যাখন বললেন, ‘তুমি পড়াশোনা ছেড়ে বাড়িতে এসে বোস’। ফল আরও উল্টো হোল দা’ঠাকুর, —সেই কথায় বলে না? কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ট্যাস-ট্যাস; সেই ট্যাস-ট্যাস করে উঠল বাঁশ। ত্যাখন তিন বছর কেটে গেচে কলেজে, পেকে উঠেচে, ভাইপো ঘাড় ফিরিয়ে দাঁড়ালেন—আর একটা বছর বাকি আছে, ওটুকু না সেরে তিনি ফিরবেন না ঘরে। ল্যাও ঠ্যালা! কি করতে গেলেন আর কি হয়ে গেল! নিশিকান্ত ত্যাখন আর এক বুদ্ধি ঠাওরালেন, বললেন- তুমি নিজের জমিদারি এবার দেখেশুনে নিতে আরম্ভ করো এসে, আমার বয়েস হয়ে আসচে, আমি আর কতদিন? দেবনারায়ণ উত্তুর করলেন, আমার জমিদারিতে লোভ নেই।… সিংহিই তো, আর করেচেনও তো অনেক কিছু ভাইপোর জন্যে, নিশিকান্ত তখন আগুন হয়ে উঠলেন, বললেন—‘তা হলে তুমি তোমার হিস্যে নিয়ে তফাত হও; নষ্ট করো, রাখো, আমার কিছু বলবার নেই।’
হয়তো ভেবেছিলেন দা’ঠাকুর যে, সম্পত্তির ওপর বসলে ওসব নেশা কেটে যাবে, কিন্তু আবার ফল হোল উল্টো। কলকাতা ছেড়ে দেবনারায়ণ অবিশ্যি দেশে এসে আলাদা হয়ে বসলেন, কিন্তু ভাঙন য্যাখন হয়ে গেল ত্যাখন আর কিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় রইল না। এ তো আর আমার আপনার লড়াই নয় দা’ঠাকুর, সিংহি-সিংহিতে লড়চে। একবার আলাদা য্যাখন হয়ে গেলেন, ত্যাখন আর খুড়ো-ভাইপোর কোন খাতির রইল না, উনি যান উত্তুরে তো ইনি যান দক্ষিণে। ছবি তো হ’ ঠিক এই সময়টিতে ঐ শোক-শোভার বখেড়া উঠল গ্রামে। দেবনারায়ণ বললেন বিধবাদের বিয়ে দিতে হবে, শোক-শোভা করো তোমরা, আমি আচি পেছনে। খুড়ো বললেন, কোভ্ ভি নেহি, নিশিকান্ত রায়চৌধুরী এখনও বেঁচে, মসনে গ্রামে এ অনাচার ঢুকতে পাবে না। শোনা কথা দা’ঠাকুর, দেবনারায়ণ নাকি এই সময় শিবমন্দিরে গিয়ে শপথও করেন, বিধবা ভেন্ন কোন সধবাকে বিয়ে করবেন না তিনি। অবিশ্যি শোনা কথা, তবে, যেমন যেমন দেখলুম পরে, অবিশ্বাসও তো করতে পারিনে। অবিশ্যি খুড়ো ভাইপো দুজনেই রইলেন আড়ালে, সেখান থেকেই ওসকানি দিতে লাগলেন, বাইরে বাইরে একটা আবার কি-যে বলে ইয়ে আচে তো, সদ্যসদ্য প্রেথক হয়েছেন, কাটা ঘায়ের দাগ যায় নি এখনও। নিজেরা আড়ালে থেকে ওসকানি দিয়ে যেতে লাগলেন, ব্যাপারটা উঠল সামান্য কথা নিয়েই—শোক-শোভায় বিধবাদের কেউ পেসিডেন্ট হবে, না সধবাদের।
মসনের মাটিতে অনেক কিছুই দেখলুম দা’ঠাকুর, বয়েস তো কম হোল না, তার মধ্যে ঐ শোক-শোভাও অনেক দেখেছি পরে, একটাতে পেসিডেন্ট করে আপনার এই নফরকেও বস্যে দেছল সিদিনে, কিন্তু সে যা এক শোক-শোভা দেখেছিলুম, তেমনটি কৈ আর তো দেখলুম না। মা রণচণ্ডী যেন নিজে এসে অবতীন্না হলেন। সারা গাঁ সরগম, বিকেল না হ’তেই গোরুটাকে গৈলে তুলে আমি গিয়ে শিবডাঙার ঝাঁকড়া ছাতিম গাছটার ওপর বসে রইলুম—ব্যাপার দেখে বাবা ওদিকে মাড়াতে বারণ করে দেছল কিনা। সেখানেও গাছের ওপরও বিধবা-পার্টি আর সধবা-পার্টি, অবিশ্যি আলাদা আলাদা ডেলে। গোবরা, রাখাল, জটে, হ্যাংলা—সব আমাদেই সেথো—এরা সব সধবা, আগে থাকতে ওপর ডালে গিয়ে বসেচে, নিচের ডালে আমি আর লখনা। লখ্নার বাবা-মা কেউ ছেল না দা’ঠাকুর; মেসোর কাছে থাকত; মাসিটা ছেল বড্ড দজ্জাল, তাই লোচন বিধবাদের দলে হয়ে নিচের ডেলে বসে ছেল; আমি আসতে আমাকেও নিলে টেনে।
—বললুম না?—মা রণচণ্ডী যেন নিজেই অবতীন্না হলেন, বললেন, বটে! কর্ কত শোক করবি। আমরা যে যার পাটি নিয়ে গুচ্যেগাচ্যে বসেছি এমন সময় পেসিডেন্টরা এল। পশ্চিম দিক থেকে ঢুকল বিধবা-পার্টির পেসিডেন্ট, নিবারণ ঘটক, সঙ্গে তার নিজের দল আর তাদের ঘেরে দেবনারায়ণের নেটেল সব। আসরের উত্তুর দিকে একটা চৌকি পাতা, তার ওপর ফরাস গালচে, পেসিডেন্টের বসবার জন্যে। দলবল নিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় দক্ষিণ দিক থেকে সধবা পার্টির পেসিডেন্ট তার লোক-লস্কর নিয়ে উপস্থিত। এদের পেসিডেন্ট আবার আগে থাকতেই মালা টালা দিয়ে গোঁসাই ঠাকুরটি ক’রে সাজানো। কে একজন গলা তুলে সওয়াল করলে…’ওখানে উঠে বসতে যায় কে?’…একজন জবাব দিলে –’ঘটক মশাই। পেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন।’…’নেমে আসুন ভালো চান তো, এ শোভার পেসিডেন্ট হচ্ছেন আমাদের সিদু মল্লিক মশাই!’…কোভ ভি নেহি।’…’আলবৎ।’ ব্যস্, কথার মধ্যে এই কটি দা’ঠাকুর, তারপরেই আরম্ভ হয়ে গেল। ইট, পাটকেল, লাঠি, কিল, চড়, চটি খড়ম-ঐ যে বললুম সে যেন রাজসূয় ব্যাপার একেবারে—দেখতে দেখতে কত লাশ পড়ে গেল, কেউ গ্যাঙাচ্চে, কেউ কেউ দাঁতকপাটি লেগেচে, কারুর হাত গেল, কারুর ঠ্যাং। তবু কি থামতে চায়?— ‘মার বিধবা-পার্টিদের:’
‘কাট্ সধবাদের!’ পালাতে যায় তো তাড়া করে পেড়ে ফ্যালে, আসরের শোক-শোভা বনবাদাড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তারপর গ্রামে। সমস্ত গ্রামে মড়াকান্না উঠে গেল। শোকের আর কসুর রইল না দা’ঠাকুর।
কিন্তু ঐ যা বললুম—সে নিজের নিজের মধ্যেই, কেউ ফুরসত পেলে কোথায় যে যাঁর জন্যে শোক করবার এত আয়োজন তানার কথা ভাববে। ঘটক মশাইয়ের এমন অবস্থা যে সেই চৌকিতে ক’রে তাঁকে বাড়ি নিয়ে যেতে হোল; সবাই বললে, আর কেন, সোজাসুজি ঘাটে নিয়ে গিয়ে অন্তর্ভুলি করাই ভালো। সিদু মল্লিককেও গালচেয় শুইয়ে ধরাধরি ক’রেই ট্যাঙ্যে নিয়ে গেল সবাই। ইদিকে সধবা ডালে আরও ছেলে উঠে ডাল ভেঙে মড়মড়িয়ে পড়ল আমাদের ঘাড়ের ওপর, তারপর সধবা বিধবা সবসদ্যু তালগোল পাক্যে মাটিতে। এই দেখুন না বাঁ হাত এখনও ব্যাঁকা, দেড় মাস হুগলি হাসপাতালে পড়ে।”
আমি বললাম—“যাক, খানিকটা বদরক্ত বেরিয়ে গিয়ে গুলতানিটা ঠাণ্ডা হল…”
স্বরূপ আমার হুঁকোর ওপর থেকেই কলকেটা তুলে নিয়ে টান দিতে দিতেই মুখটা একটু কুঁচকে হাসলে, তারপর আমার কলকেটা বসিয়ে ধুঁয়ো ছেড়ে বললে—“অপরাধ নেবেন না দা’ঠাকুর, এ কালের ব্যাপার তো নয়, এ যা সময়ের কথা বলচি আপনাকে ত্যাখন এত অল্পে রক্ত ঠাণ্ডা তো হোত না। গুলতনিটা কমল,—একেবারে যে কমল না তা কি করে বলি? কিন্তু সে আর কদিন?—ঐ যে কটা দিন চাঁইগুলো হাত পা মাথা নিয়ে বিছেনায় রইল পড়ে—মিলিয়ে সিলিয়ে ধরুন এই দিন দশ, কি জোর দিন পনের,—তারপরেই আবার যে-কে সেই। যে-কে সেই বা বলি কি করে? এর পরে যা হোল, তা শোক শোভার মতন অমন জমজমে না-হোক তাতে ওলট-পালট তো কম হোল না গ্রামে, আর তাইতেই তো আমাদের অনাদি ঠাকুর মশাই ডুবলেন।
মানে, একবার সামনা-সামনি এইরকম একটা বড় গোছের মোকাবিলা হয়ে যাবার পর এদের জিদ ধরে গেল অরা মিটিন নয়, নেচার নয়, একেবারে বিধবা বিয়ে দিতে হবে গাঁয়ের মাঝখানে ব’সে। কিন্তু সমিস্যে হোল মেয়ে পাওয়া যায় কোথায়? এদের পার্টিটা এমনিই ওদের চেয়ে ছোট, তার ওপর বেশির ভাগই ছেলেছোকরা নিয়ে। তাদের আপন বলতে যে সব বিধবা তারা হয় বোন কিম্বা মাসি, কিম্বা পিসি এইরকম; উদিকে কত্তারা প্রায়ই সব সধবা দলের, সোতোরাং জুত হয় না। অন্য উপায় করতেও কসুর করলে না, মাথা তো সবার গরম হয়ে উঠেছে ত্যাখন। গুপী চাটুজ্জের ছেলে যদুপতির নতুন বিয়ে হয়েছিল, সে একখানা চিঠি লিখে বালিশের তলায় গুঁজে রেখে আফিম খেয়ে বসল—কী, না—আমি দেশের ভালোর জন্যে নিজের স্ব-ইচ্ছেয় চললুম—আমার ছেরাদ্দ শান্তি ঢুকে গেলেই যেন দেশের কল্যাণে আমার বউয়ের বিধবা-বিবাহ দিয়ে দেওয়া হয়।…আরে এটুকু ভেবে দেখলিনি, তুই চোখ বুজলে তোর বৌয়ের ওপর একতিয়ার রইল কোথায়? নতুন ঘর করতে এয়েছেল বৌটা, ফল এই হোল বাপে-শ্বশুরে যোগসাজোস ক’রে তাকে এখান থেকে সরিয়ে নিলে। এর ওপর বাপে-শ্বশুরে যোগসাজোস করেই শ্বশুর মিচিমিচি রটিয়ে দিলে তারা সমাজে নাম নিকিয়ে বেম্মোর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবে। ভালো হয়ে যদুপতি এমন বিলাল্লা হয়ে গেল—না বাপের বাড়ি ঠাঁই পায়, না শ্বশুরবাড়ি-তার দুর্দশা দেখে আর আপ্তহত্যের দিকে কেউ গেল না। বাকি রইল বাইরে থেকে বিধবা বিয়ে ক’রে এনে গাঁয়ে তোলা। তাও হোতে পারত কিন্তু কেউ এগুল না। কথা হচ্ছে সে তো আর নিজের স্ব-ইচ্ছেয় ধীরেসুস্তে আপনি গুলে খাওয়া নয় দা’ঠাকুর, সধবারা এমন নেটেলের ব্যবস্তা ক’রে রেখেচে যে একটি হাড় আস্ত নিয়ে গাঁয়ে ঢুকতে দেবে না, সাজিয়ে চিঠি নিকে যাওয়ার কথা তো বাদই দিন।
তবুও দিলে বিয়ে ক’খানা। ওদের দলে মাঝে মাঝে বুদ্ধি যোগাত বুড়ো গয়ারাম। পালেদের জমিদারি-সেরেস্তায় মুহুরির কাজ করত, আর কি যে বলে, একজন ঝানু লোক—সত্যি মিথ্যে ভগবান জানেন দা’ঠাকুর, তবে শুনেছি এই ডামাডোলের সময় তিনি নাকি দু’দিকেই উসকুনি দিয়ে বেশ দু’পয়সা ক’রে নেছল। গয়ারাম বললেন—কেন, বিধবা বিয়ে দেবে তো বোষ্টমপাড়া রয়েছে তো।…ক’দিনের মধ্যে হু হু করে কটা হয়েও গেল, তারপর ঘটা দেখে বিয়ে করবার জন্যে চারিদিক থেকে বোষ্টম-বোষ্টমীদের এরকম ভিড় পড়ে গেল দা’ঠাকুর যে শেষ পজ্জন্ত আর সামাল দিয়ে উঠতে পারলে না এরা। খরচও আছে তো। তা ভিন্ন পুরোপুরি বিয়ে তো নয়, কণ্ঠিবদল—সে যেন দুধের সোয়াদ ঘোলে মেটানো, শেষ পজ্জন্ত এদের কারুর বোষ্টম বিধবা বিয়ের আর গা রইল না। যারা হাঁক ডাক শুনে বাইরে থেকে কণ্ঠিবদলের জন্যে ছুটে এয়েছিল, শাপমণ্যি দিতে দিতে ফিরে গেল।
ব্যাপারটা ক্রেমেই জুড়িয়ে আসছিল দা’ঠাকুর, হুজুগই তো, কিছু একটা না পেলে কতদিন আর চাড়া দিয়ে রাখা যায় বলুন না। জুড়িয়েই আসছিল, আবার ঐ গয়ারামই এক ঝোঁক চাগিয়ে তুললে। গঙ্গারামের বাড়িতে গয়ারাম নিজে আর তার পরিবার, আর তিনকুলে আপন বলতে কেউ ছেল না বলেই লোকে জানত। হঠাৎ জমিদারি-সেরেস্তার একটা কি কাজে কলকাতায় গিয়ে একটি সতের-আঠার বছরের মেয়েকে নিয়ে এসে ভরসন্দের সময় তিনজন মিলে মড়াকান্না তুলে দিলে বাড়িতে। পাড়ার মেয়ে-মদ্দ সবাই ছুটে এল—ব্যাপারখানা কি? -না, আমার এই বোঝি, কপাল ভেঙেছে, এখন কলকাতার বিদ্যেসাগরীরা চারিদিক থেকে চেপে ধরেচে আবার বিয়ে দাও; জাত কুল নিয়ে পালিয়ে এলুম মসনেতে। সাধু সাধু রব পড়ে গেল দা’ঠাকুর, ব্যাপারটা জুড়িয়ে আসছিল কিনা। দিনকতক আবার সধবার দলই গয়ারামকে নিয়ে মেতে উঠল। তা উঠুক, ক্ষেতি নেই, কিন্তু মাস যেতে না যেতে ব্যাপার আবার অন্যরকম হয়ে উঠল। বোনঝি যা এনেচে গয়ারাম, তার ধারা যেন কিরকম কিরকম। প্রেথমটা একটু চাপাচাপি রইল, তারপর ক্রেমেই অতিষ্ট হয়ে উঠল পাড়ার সবাই। গয়ারামকে নিয়ে অত যে মাতামাতি তা থামতে চায় না কেন—বিশেষ ছেলে-ছোকরাদের মহলে, বোনঝির চালচলনে এর রহস্যটা য্যাখন প্রকাশ পেয়ে গেল, ত্যাখন সধবার দলেরও যারা মাতব্বর,—পালেদের বিশ্বম্ভর পাল, চৌধুরীদের মাখনবাবু, ইদিক আপনার দেবনারায়ণের খুড়ো নিশিকান্ত, সবাই চিন্তিত হয়ে উঠলেন এ কন্টক গ্রাম থেকে তুলে ফেলা যায় কি ক’রে। শুধু যে গ্রামের হাওয়া বিগড়ে যাচ্ছে তাই তো নয়, বিধবা পাটির দলিলও যে পাকা হচ্ছে দিন দিন। শেষকালে একদিন গভীর রেতে, গ্রাম যখন নিষুতি, নিশিকান্ত চুপি চুপি গয়ারামকে ডেকে পাঠালেন নিজের বাড়িতে, বললেন—‘গয়া, যা হয়েচে হয়েচে, এখন তোমার বোনঝিটিকে বিদেয় করতে হবে গ্রাম থেকে।’ গয়ারাম একেবারে পা জড়িয়ে কেঁদে পড়ে বলল—‘বাপ-মা মরা মেয়ে হুজুর, উদিকে শ্বশুরবাড়িতে থাকলে ঐ বিদ্যোসাগরী হ্যাঙ্গাম—আপনাদের ছিচরণে এনে ফেলেচি, এখন আপনারা পায়ে ঠেললে ও যায় কোথায়?’…না, “ও তো দেখচি পা ছেড়ে মাথায় উঠে বসেচে, গ্রাম রসাতলে যায়। একটা মেয়ে এসে টলমলিয়ে দিয়েচে; করতেই হবে বিদায়। খুঁজে পেতে দেখলে দূর সম্পর্কের আত্মীয় অমন ঢের পাওয়া যাবে, তুমি কারুর ওখানে করো ব্যবস্তা, না হয় একটা মাসোহারা করে দেওয়া যাবে।’ গয়ারাম ত্যাখন একেবারে পা দুটো জড়িয়ে কেঁদে পড়ল—‘বাপ-মা-মরা মেয়ে, আপন বলতে এই এক মামা টিমটিম করচি, বুড়ো বয়সে এ অধম্ম আর করাবেন না হুজুর -নিজের মামাই যার আপন হোল না তাকে অন্যে আর কে দেখবে? মাঝখান থেকে হুজুরের ট্যাকাগুনো বরবাদ হবে—অল্প বয়েস, মেয়েটাও যাবে ভেসে। স্ত্রীলোকের আপন বলতে ইদিকে বাপ খুড়ো, উদিক সোয়ামী, তা সবই তো খেয়ে বসেচে পোড়াকপালী, আচে বলতে বুড়োহাবড়া এই এক মামা, তা আমাকে দিয়ে বুড়ো বয়সে এ আর অধম্ম করাবেন না হুজুর।’
অনেক ধস্তাধস্তি, বোঝানো, য্যাখন কিছুতেই কিছু হোল না ত্যাখন ঐ নিশিকান্তকেই বলতে হোল— ‘তাহলে তুমি ওকে বিধবা বিয়ে দিয়েই বিদায় করো; এ অনাচারের চেয়ে সে বরং ভালো’…আজ্ঞে হ্যাঁ, দা’ঠাকুর, এমন অবস্থাটা দাঁড় করালে গয়ারামের সাতপুরুষের কোথাকার কে ঐ বোনঝি যে সধবা পাটির একেবারে যে চাঁই তাঁর মুখ দিয়েও বের করতে হোল—গয়ারাম তুমি বিধবা বিয়ে দিয়ে বিদায় করো কন্টক, সবার হাড় জুড়ুক।
কিন্তু সে তো অমনি হয় না দা’ঠাকুর। একজন কুলীন কায়েত, তার বংশে একটা দাগ লেগে যাচ্চে।…কত ঠিক জানি না, নিষুতি রেতে ছাতের ওপরে গিয়ে কথাবার্তা তো-তবে মোটা ট্যাকা কবলাতে হোল নিশিকান্তকে
এরাও দিলে বৈ কি ট্যাকা, মাঝে বিধবা-পাটির এরা।…আপনি যে হাঁ করে চেয়ে রইলেন দা’ঠাকুর,—কেন, গয়ারাম যে কি রকম খেলোয়াড় তা আপনাকে আগেই বলিনি? এ দিকেও তলেতলে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্চেল-এদের কাছ থেকেও দিব্যি ভারি রকম একটা হাতালে। বাঃ, গাঁয়ের মধ্যে এই প্রেথম বিধবা বিয়ে-নিকেও না কণ্ঠি বদলও নয়, পুরুত ডেকে অগ্নি সাক্ষী করে বিয়ে, সে তো মাংনায় হয় না।…আজ্ঞে হ্যাঁ, গাঁয়ের মধ্যেই হোল বৈকি। প্ৰেথমে ঠিক হয়েছিল একটা পাত্তোর ঠিক ক’রে বাইরে কোথাও গিয়ে বোনঝিকে তার গলায় লটকে দেবে গয়ারাম। বিধবা-পার্টির এরা জিদ করে বসল—না, গাঁয়েই দিতে হবে বিয়ে। বাইরের বোনঝি বাইরেই চ’লে গেল চুপিসাড়ে তো মসনের লাভটা কি হোল? এ যেন খানিকটা ব্রেথা তড়পাতড়পি নাপানাপি করে যে জলের মাছ আবার সেই জলেই গিয়ে ঢুকল। খানিকটা হুঁ-না, হুঁ-না করে শেষ পজ্জন্ত রাজী হোল গয়ারাম, মানে, ও আর রাজী হবে কি, রাজী তো হয়েই রয়েচে—দু’ দিকেই কথা চালিয়ে যাচ্ছেল তো, নিশিকান্তকে রাজী করালে—একটা রফা গোছের হোল-ঢাক-ঢোল কিছু হবে না, অন্ততঃ বিয়ের রেতে নয়, চুপিসাড়ে বর আসবে, চুপিসাড়ে বিয়ে, চুপিসাড়ে বর-কনে বিদেয়—তারপর যাদের গরজ তারা বুঝুক গিয়ে। গয়ারাম বললে সেও বিয়েটুকু দিয়ে বর-কনের সঙ্গেই তিখি করতে বেরিয়ে যাবে পরিবারকে নিয়ে, একটা যে মহাপাতক হোল বংশে সেটা তো পুষে রাখাও ঠিক নয়। ও খরচটাও বাগিয়ে নিলে খুড়ো ভাইপো দুজনের কাছ থেকেই। কথাটা বুঝলেন না দা’ঠাকুর? মোকা বুঝে কোথাকার কোন্ গলি থেকে একটা উটকো মেয়েকে তুলে নিয়ে এসে দুদিকে ভুজুংভাজং দিয়ে নিজের ট্যাক তো ভারী করে নিলে, কিন্তু এর পর দিন কতক গা-ঢাকা না দিলে, আর একটা যে বিধবা হয় বাড়িতে সদ্য সদ্য—সধবা-পার্টির এরা গয়ারামকে তো আর আস্ত রাখবে না, একে এই হার, তার ওপর আবার যে ছোঁড়াগুলো বিগড়ে ছিল তাদের ঐ বোনঝির শোক—হাড় একদিকে মাস একদিকে করে ছাড়বে না?
আগুন কখনও ছাইচাপা থাকে দা’ঠাকুর?… বিয়ে হোল অমাবস্যের রাত্তিরে, বর ক’নেও অন্ধকারে অন্ধকারে নিব্বিঘ্নে বিদায় হোল, গয়ারামও গুছিয়েগাছিয়ে নিয়ে দোরে তালা ঝুলিয়ে পরিবার নিয়ে পড়ল বেরিয়ে তাদের সঙ্গে। পরদিন সকাল থেকেই কিন্তু মসনে একেবারে সরগরম হয়ে উঠল। যে-সব সধবা পাটির ছেলের দল ইদিকে গয়ারামের নেওটো হয়ে পড়েছেল—সকাল সন্ধ্যে একটা-না-একটা ছুতো নিয়ে এসে ধন্না দিয়ে পড়ে থাকত, তারা উঁকিঝুঁকি মেরে কাউকে না দেখতে পেয়ে মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্চে, এমন সময় বিধবা-পাটির দল জলুস ক’রে ঢাকঢোল নিয়ে বেরুল। কথাটা প্রকাশ হয়ে পড়তে তখুনি তখুনি যে একটা বেধে গেল তাইতে সধবাদের এরাই ধাক্কাটা খেলে বেশি, তোড়জোড় করা তো ছেল না। তখন আবার মসনেতে নতুন করে সাজসাজ পড়ে গেল।
ঠিক স্মরণ হচ্চে না দা’ঠাকুর, সেই কোন যুগের কথা তো, তবে বেশি দিন নয়, বিয়ে হয়ে যাবার দিন চারেক পরের কথা—মাঠ থেকে কৈলীকে নে এসেচি, গোয়ালে তুলে সেঁজেল দিয়ে ঘরে আসব, এমন সময় একটা শব্দ শুনে ঘুরে দেখি একপাল সধবা পাটি হৈ-হৈ করতে করতে এদিক পানে ছুটে আসছে—‘মারো! কাটো! আগুন লাগাও!’ ছেলেমানুষই তো ত্যাখন, আমি প্রেথমটা ছুটে পালাতে যাচ্ছেলাম, তারপর আমাদের পাড়ার দিক থেকে ক’জনকে দৌড়ে আসতে দেখে আবার ফিরে এসে এনাদের উঠোনে দাঁড়ালাম। ব্যাপার আর কিছু নয়, ওরা টের পেয়েচে গয়ারামের বোনঝির বিধবা বিয়ে দিয়েচেন অনাদি ঠাকুর, তাই তানার ঘর দোর জ্বালিয়ে নিম্মুল করতে ছুটে এয়েচে সবাই। টের পেয়েছেল ওরা আগেই, তবে আজ সন্ধ্যেয় যে দল বেঁধে ছুটে এল তার কারণ দুখানা গ্রাম বাদ দিয়ে বারুইপাড়ায় একটা বড় বিদ্যেসাগরী মিটিন ছেল, আর মসনের যত বিধবা-পাটির লোক ঝেঁটিয়ে চলে গেছল তাইতে। ওরা এসেই আরম্ভ ক’রে দিত; কিন্তু ঐ আমাদের মণ্ডলপাড়ার জনকয়েক পৌঁছে গেছল তাইতে একটু থতমত খেয়ে গেল। এরা দোর আগলে দাঁড়েচে, ওরা হল্লা করচে, বচসা করচে, দিদিমণি ঘরের ভেতর ছেল, বেইরে এসে আমায় দেখে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটু কি ভাবলে। ওঁর ঐ এক আশ্চয্যি দেখেছিলুম দা’ঠাকুর, কিছু হোক, আপনি আমি চোখে অন্ধকার দেখচি, দিদিমণি কিন্তু এতটুকু ঘাবড়াতো না! একটু কি ভেবে আমায় হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে ঘরের মধ্যে চলে গেল, বললে— ‘তুই এক কাজ কর স্বরূপ’… আবার চোখ ঘুরিয়ে কি ভাবছেল, আমি বললুম—তুমি বললুম—তুমি আগে পালাও দিদিমণি, ওরা আগুন দেবে বলচে ঘরে।’ দিদিমণি যেন ঘেন্নায় তাচ্ছিল্যে ঠোঁট দুটো কুঁচকে মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিলে বললে—“নেঃ, দিলেই হোল আগুন! জানি সবাইকে। বরং দেখ না আমিই নিজের কাপড়ে আগুন ধরিয়ে সবগুনোর হাতে হাতকড়ি দেওয়াচ্চি তার আগে।’…বাহাদুর মেয়ে, একটু হেসেও উঠল দা’ঠাকুর-ঐ অবোস্তার মধ্যে—তারপর বললে, ‘তুই এক কাজ কর শিগগির, বাবা বোসেদের বাড়ি নক্ষ্মীপুজোর শেতল দিতে গেচেন, তাঁকে বারণ করে দিবি যেন না আসেন এখন, আর এই চিঠিখানা নিয়ে একেবারে জমিদার বাড়ি ছোট তরফের কত্তার নিজের হাতে দিবি। ছুটে যা খিড়কি দিয়ে।’
একটা ছোট্ট চিরকুটে দু’লাইন কি নিকেচে, ত্যাতক্ষণে আমাদের পাড়া থেকে আরও জনকয়েক ঢুকল খিড়কি দিয়ে। দিদিমণি চিরকুটটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললে— ‘ছুটে যাবি, আর দেখ, বাবাকে বলবি কখনও যেন না আসেন এখন–বলবি মণ্ডলপাড়া থেকে সবাই লাঠি-সড়কি নিয়ে এসে পড়ছে, আজ সধবাদের এত বিধবা হবে যে উনি একা মানুষ বিয়ে দিয়ে উঠতে পারবেন না।’…আজ্ঞে হাঁ, আবার চাপা গলায় খিলখিল করে হাসি; আমার ভয় লেগে ছেল ওঁর কথা শুনে, জিগ্যেস করলুম—‘তুমি পুড়ে মরবে না তো দিদিমণি?’…দিদিমণি আমায় একটু ঠেলে দিয়ে বললে—“তুই যা আগে, ছোট্, পোড়ার আগেই জ্বালিয়ে খাসনি স্বরূপ।’
বেশ গুলতনি বেড়ে উঠেচে দা ঠাকুর। মণ্ডলপাড়ার এরা সব দোর আগলে, ওদেরও দল ক্রেমেই বেড়ে উঠচে, খিড়কি থেকে বেরুবার সময় একবার ঘুরে দেখলুম—দাওয়ার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে দিদিমণি উঠোনের দিকে মুখ ক’রে দাঁড়াল। যেন কিছুই নয়, জগন্নাথের চানযাত্রা দেখতে এয়েচে নোকে, ও-ও দাঁড়িয়ে দেখচে।
আমি খিড়কির পুকুরের ধারদে ধারদে বেরিয়ে পড়ে বেশ খানিকটা গেচি, এবার বোসপাড়ায় ঢুকব, এমন সময় পড়বি তো পড় একেবারে রাজীব ঘোষালের ছেলে ছিরু ঘোষালের সামনে। অষ্টপহর নেশায় চুর হয়ে থাকত তো, ঝোঁকের ওপর মাথা নিচু ক’রে হনহন করে চলে আসছেল, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে জবাফুলের মতন টকটকে চোখ দুটো তুলে জড়ানে গলায় জিগ্যেস করলে–’যাস্ কোথা?”
ঐ একটা নোক যাকে যমের মত ভয় করতুম, বললুম—‘ঠাকুরমশাইয়ের বাড়িতে ওরা আগুন দিতে এয়েচে।’…না, ‘তোর বাবার কি তাতে? ওরা না দিলে আমি দিতুম। তুই যাস্ কোথায়?’…বললুম—‘সবাইকে পুড়িয়ে মারবে বলচে, দিদিমণিকেও’…না, ‘ওরা না মারলে আমি মারতুম, জিগ্যেস করচি তোর বাবার কি? তুই যাস্ কোথায়?’ বললুম—“দিদিমণি বললে ঠাকুরমশাইকে খবর দিতে—বোসদের বাড়ি শেতল দিতে গেচে তিনি।’ দাঁড়িয়ে মাথাটা একটু দোলালে, বললে—“তোর দিদিমণিকে বলবি—ছিরু তারিফ করছিল;অমন বাপকে ডেকে পুড়িয়ে ফেলাই ভালো। তোর মুঠোয় কি? – পয়সা? বের কর্।’
চিঠির কথাটা নুকোবারই ইচ্ছে ছেল দা’ঠাকুর, তা আর হোল না, পয়সা থাকলে কেড়ে নেয়, এগিয়ে এসে এক হাতে কান আর এক হাতে মুঠোটা ধরলে, হাতটা আলগা হয়ে গেল। চিরকুটটা খুলে পড়ে চোখদুটো পাকিয়ে পাকিয়ে একটু হাসলে, বললে- ‘ও! চিঠি যাচ্চে দ্যাবা শালার কাচে, আর তুই শালা হয়েচিস হংসদূত? হুঁ, বুঝেচি! নলদময়ন্তীর পালা গাওয়া চলচে। …টাকে পয়সা আছে?’…. বললুম ‘না, সত্যি নেই, এই দেখুন।
ঝেড়েঝুড়ে দেখিয়ে দিয়ে কাঁদ কাঁদ হয়ে বললুম—‘দিন চিঠিটা, দিদিমণি শিগগির দিয়ে আসতে বলেচে। আর ঠাকুরমশাইকেও আসতে বারণ করে দিতে বলেচে। ডাকে নি।’
কানটা ছেড়ে টলতে টলতে একটা বিরেশী সিক্কার চড় তুলে বললে— ‘একটি চড়ে আর উঠে জল খেতে হবে না। যেমন এসেচিস ফিরে যাবি, খবরদার! আর শোন, তোর দিদিমণিকে বলবিছিরু ঘোষাল বলচে তলে-তলে এ সব চিঠি-পত্তোর চলবে না; আগে ছিরু মরে ও একচোট বিধবা হোক, তারপর বরঞ্চ বাপকে বলে বিধবা বিয়ে করিয়ে নেবে দ্যাবা শালার সঙ্গে—ছিরু শালা দেখতে আসবে না। যা।’
আমি তো পালাতে পারলেই বাঁচি, ঘুরে খানিকটা এয়েচি, আবার ডাকলে—‘এই শোন্।’ …এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াতে বললে—‘কি বলবি?’…বললাম –’আপনি যেমন যেমন বললে ঠিক সেই রকমই বলব।’ না,–’এই এক চড়ে মুণ্ডু উত্তুর থেকে দক্ষিণে করে দেব।… ঐ সব কথা বলে? বলবি ঘোষাল মশাইয়ের ছেলে আমায় ফেরত দিয়ে আপনিই গেল, বললে—তুই ছেলেমানুষ, দরকারী কাজ, এক পহোর লাগিয়ে দিবি, ত্যাতক্ষণ ওরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তার চেয়ে আমিই যাচ্ছি, ঠাকুরমশাইকে বলে দিয়ে জমিদারবাড়ি চলে যাব।….কি বলবি?’
ও যেমন ব’লে যাচ্ছেল আমি সঙ্গে সঙ্গে মুখস্ত ক’রে যাচ্ছেলাম দা’ঠাকুর, একটি একটি করে ব’লে গেলাম। কানটা ধরে শুনছেল; ছেড়ে দিয়ে আবার সেইরকম চড় দেখিয়ে বললে- ‘যদি একটি অক্ষর ভুল করিস কি আগেরটার সঙ্গে পরেরটা তালগোল পাকিয়ে ফেলিস তো তোর ন্যাজা এক ঠাঁই মুড়ো এক ঠাঁই করব।…তোর দিদিমণি আমার কথা কিছু বলে?”
এই দেখুন, আপনাকে আসল কথাটাই বলা হয়নি দা’ঠাকুর। বয়েস হয়ে গেল বিস্তর আর তেমন বেশ গুচিয়ে মনে থাকে না সব। আসল কথা না শুনলে বুঝবেন কেমন করে যে এত যে ব’লে গেল ঘোষাল মশাইয়ের ছেলে তার তাৎপয্যটা কি। নাঃ, মসনের অনেক কাহিনী দা’ঠাকুর, ইচ্ছে তো হয় ভক্তিমতী হয়ে বসে শোনবার লোক পেলে শোনাই, তা ইদিকে বয়েস যে….”
আমি বললাম—“তা হোক না একটু আগু পিছু, ক্ষেতি কি এমন? ব্যাপারখানা কি?”
“ব্যাপারখানা গুরুচরণ দা’ঠাকুর। তা’হলে ছেলেকে ছেড়ে বাপ থেকেই আরম্ভ করতে হয়। রাজীব ঘোষাল ছেল একেবারে যাকে বলে ট্যাকার কুমীর। এদিকে আবার তেমনি ছেল জাটকেপ্পন। রোগা ডিগডিগে এতটুকু মানুষটি, ডান হাতে গোটাকতক তামার মাদুলি, হুঁকো হাতে ক’রে বাইরে পেয়ারা তলাটিতে উবু হয়ে বসে তামাক খেত আর কাশত। গাছটাও ছেল বারমেসে, কোষ্টে থেকে নিয়ে ডাঁসা, আধ পাকা, পাকা—সব রকম পেয়ারা লেগে থাকত গাছে, একটু যে উঠে যাবে তার উপায়টি ছেল না। ছেলেদের নোলা দা’ঠাকুর, আবার পেয়ারা ফলটায় লোভ সব চেয়ে বেশি, আমরা সবাই দূর থেকে উঁকি-ঝুঁকি মেরে আসতুম আর বলতুম—বেশ হয়েছে, শালার বামুনকে সাপে ছুঁচো গেলা ক’রে রেখেচে; থাক্ আগলে ব’সে যক্ষীর মতন।’ …যেটা আক্রোশের মাথায় মুখ দিয়ে বেরুত সেইটেই বললুম দা’ঠাকুর, এ-পোড়া জিভে কম পাপটা করেচে? লোভও হবে তারই আবার গালও পাড়বে সেই!
ইদিকে এই, উদিকে খরচের খাতায় আঁচড়টি পড়তে পেত না। নিজে, পরিবার আর এক বিধবা পিসি। তা তিনি একদিন ট্যাকাকড়ি যা ছেলো সব রেখে সজ্ঞানে মারা গেল; তার মানে পরমায়ু থাকতে থাকতেই আর কি, ভাইপোর কপালজোের তো কম নয়। নিজের তো বিঘতখানেকের শরীর, পক্ষীর আহারেই চলে যায়, ঘোষালগিন্নি কিন্তু ছিলেন একটু আড়েবহরে, তবে একা, ছেলেপিলে যা হোত বাঁচত না। রাজীব ঘোষাল বেপরোয়া ছেল-থাকবি থাক, যাবি যা, আমার বয়েটা গেল, ভাবটা যেন এইরকম। ঘোষালগিন্নি করতেন চেষ্টা-চরিত্রি কি ক’রে একটি সন্তানের মা হন,-এ ঠাকুরের মানত, তো ও-ঠাকুরের দোর ধরা—করতেন, মায়েরই প্রাণ তো—কিন্তু সোয়ামীর কাছ থেকে তার খরচটা তো ঠিক মতন আদায় হোত না। কাজেই ঠাকুরেরা এলে দিতেন, তানাদের পোষাবে তবে তো দা’ঠাকুর, দোষ দেবেন কি ক’রে? একটা হেতুড়ে ডাক্তারকেও দুটো পয়সা বিজিট কম দিলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, আর তানারা তো দেবতাই, ভেবে দেখুন না কেন। শেষকালে ঘোষালগিন্নি পজ্জন্ত য্যাখন দুত্তোর বলে গা ঢেলে দিয়েচেন, এই ত্যাখন কি করে এই ছেলেটি গেল টেঁকে।
তা টেকেও গেল তো একেবারে বেচে বেচে তেমনিটি। ঐ তো কথাবার্তার নমুনো শুনলেন, এদিকে গ্যাজা গুলি চরোশ-কোনটা বাদ নেই। ওরও দোষ দিই না, দা’ঠাকুর, ও একটু গোড়াতেই ভুল করে বসেছিল। আগেকার যারা তারা জন্মাত, তারপর গতিক-গাতাক দেখে সরে পড়ত, কেউ দু’মাসে, কেউ এক বছরে, কেউ দু’বছরে, আড়াই বছর কেউ ডিঙোয় নি। ছিরু ঘোষাল বেশ টেঁকে রইল, হয়তো ভাবলে-যাঃ, দিব্যি খালি আসর তো, খেয়েই যাই না যত্ন-আত্তিটা বাপমায়ের। ইদিকে কিন্তু একবার ঘুরেও দেখলে না ছেলেটাকে ঘোষালমশাই যত্ন-আত্তি মানে খরচ তো। লোকেরা বললে—‘অন্তত একটু নেকাপড়ার দিকেও দ্যাও রাজীব, যেটা জমাচ্চ এত কষ্ট করে না খেয়ে দেয়ে সেটা আবার রক্ষে করা চাইতো।’ হচ্চে হবে, হচ্চে-হবে ক’রে বয়েসই বেড়ে যেতে লাগল, ঘোষালমশাই আর গা করলে না। কেপ্পনও সব রকম আচে দা’ঠাকুর, তা একেবারে জাটকেপ্পন, হয়তো ভাবলে ছেলেটা বেঁচে গিয়েই একটা খরচের ধাক্কায় ফেললে, আবার এর ওপর নেকাপড়ার ফ্যাসাদ করতে গেলে তো দেউলে ক’রে মারবে। হ্যাঁ, দিচ্চি পাঠশালায়, পাঠাচ্চি টোলে—এই ক’রতে ক’রতে বয়েস বেড়ে গেল। প্রেথমে চুরুট বাড্ড্সাই, তারপর গ্যাজা, তারপর গুলি, চরোশ—এক এক ক’রে এদিক্কোর- পাঠশালায় টক্-টক্ করে ধাপে ধাপে উঠে যেতে লাগল। এমনি ক’রে পাঠশালার পর ইস্কুল, তারপর কালেজ, ঘোষালমশায়ের ছেলে একেবারে লায়েক হয়ে বেরিয়ে এল। বাড়ির সঙ্গে সম্বন্ধ দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়া নিয়ে, তারপরই সমস্ত দিন টোটো-কোম্পানি; এর আড্ডায় ঢুকে দুটো গ্যাজায় দম দিয়ে বেরিয়ে এল, ওর আড্ডায় ঢুকে গুলিতে টানল। আর কোনও সাধু-সন্নেসী যদি গাঁয়ে এসে ধুনী জ্বাললে তো ছিরু ঘোষালকে আর পায় কে? সবাইকে ঠেলেঠুলে একেবারে পাশটিতে জায়গা করে নিত; মানে, সেই কোন এতটুকু বয়েস থেকে হাত পাকাচ্চে, গ্যাজায় ওর মতন এসপার্ট আর তো কেউ ছেল না মসনেতে।
এই ক’রে সুখে-দুঃখে চলে যাচ্চেল দা’ঠাকুর, উদিকে ছেলে তার গ্যাঁজার নেশা নে’ পড়ে আচে, ইদিকে বাপ তার ট্যাকার নেশা নে’, এমন সময় বলা নেই কওয়া নেই ঘোষালগিন্নি দুম্ ক’রে একদিন চক্ষু বুজে বসলেন। ঘোষালমশাই এতদিন একটা হিসেবই একটানা রেখে যাচ্চেল-বছরে কখানা শাড়ি যাচ্চে, কটা ব্রত, কটা পাব্বন, এবার অন্য হিসেবের ধাক্কায় গেলেন পড়ে। এক মুঠো রান্না ভাত দুবেলা খেতে তো হবে। ইদিকে নেই নেই করেও খুঁটিনাটিও কাজ অনেক, কিন্তু ঘর সামলাতে গেলে তো পেয়ারা গাছ সামলানো যায় না। অবিশ্যি পেয়ারা গাছের কথা না হয় এমনিই বলছি, কিন্তু ফলাও বন্ধকী কারবার, উদিকে দেখতে গেলে সেটা তো যায়। কি হবে কি হবে ক’রে ছেলের কথা মনে পড়ল দা’ঠাকুর। এমনি তো কোনও কাজে এল না, মরে গেলে যে এক গণ্ডুষ জল দেবে, তাও এমন গ্যাঁজাটেপা হাত, মুখেই দেওয়া যাবে না হয়তো। কিন্তু বিয়ে দিলে একটা বৌ তো ঘরে এনে তুলতে পারে, তাতে সংসারটা তো সামলে যায়।
পারে তো, কিন্তু ও গুণধরের হাতে দেবে কে মেয়ে?—আগে সে হুঁশটা তো তেমন হয়নি। মসনের কথা বাদ দিন, আশেপাশের আর দশ-বারোখানো যা গ্রাম—-সব্বাই জানে বাপ কেপ্পন, ছেলে নেশাখোর, এখানে মেয়ে দেওয়ার চেয়ে তারা হাত পা বেঁধে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেবে না কেন? বাইরেও ঘটক লাগালে ঘোষালমশাই—কথাবার্তা এগোয়ও খানিকটা ক’রে, তারপর যারা একবার চক্ষু-কন্নের বিবাদ ভঞ্জন ক’রে যায় তারা আর ফিরে চায় না।
এই ক’রে য্যাখন বছর খানেক গেচে, ইদিকে আর এক কাণ্ড। ভচায্যিগিন্নি, মানে অনাদি ঠাকুরের পরিবার, বলা নেই কওয়া নেই একদিন সোয়ামীর পায়ে মাথা রেখে চক্ষু বুজলেন। এঁরও তো ভোগান্তিটা কম হোল না, সোয়ামী না হয় কেপ্পনই নয়, কিন্তু ন্যায়ের ধকোল সামলাতে সামলাতে জীবনটাতে আর তো কিছু রইল না সতীনক্ষ্মীর।
যাক, কাল পূর্ণ হয়েছেল, গেল, মানুষের তো হাত নেই তাতে; ভাবনা হোল এখন তাঁর কাজটুকু কি করে সম্পন্ন হয়। কিছু না করলেও তিলকাঞ্চন ক’রে দ্বাদশটি বামুন তো খাইয়ে দিতে হবে, তাই বা হয় কোথা থেকে? -ইদিকে তো এবেলা কোনরকমে কাটল তো সঙ্গে সঙ্গে ওবেলার ভাবনা এসে পড়ল। কারুর কাছে তো হাত পাততে জানতেন না, বরং নিজের হকের পাওনাই ছেড়ে এয়েচেন বরাবর, মহা এক দুশ্চিন্তেয় পড়ে গেলেন। একদিন বললেনও দিদিমণিকে; বললে—‘হ্যাঁ মা নেত্য, কি করি বল দিকিন, ইদিকে দিন তো এগিয়ে এল, শেষকালে ঐ একাদশী ঘোষালের কাচে গিয়েই দাঁড়াতে হবে? ও তো খালি হাতে কানাকড়িও দেবার পাত্তোর নয়, ইদিকে ভরসা তো এই ভদ্রাসনটুকু।’
দিদিমণিকে সংসারের কথা কখনও বলতেন না দা’ঠাকুর। আদাড়ে ন্যায়শাস্তোর নিয়ে কিসব কথা হোত দুজনে মাঝে মাঝে, কানে গেছে, তবে কিছু বুঝিনি; মা-ঠাকরুন যাবার পর আর তো কেউ ছেল না, মেয়েকে ব’লেই মনের বোঝাটা নামালেন একটু।
তা উত্তুরও দিলেন দিদিমণি। আপনাকে বললুম না?—যেমন দুগ্গোপ্রিতিমের মতন চেহারা তেমনি বুদ্ধিও ছিল যেন ক্ষুরের ধার; বললেন—‘আমার মা ছিলেন সতীনক্ষ্মী পুণ্যবতী বাবা, কোন উপায় না থাকে তুমি বাড়ি বাঁধা দিয়েই তাঁর কাজটুকু ভালো করে করো। তাঁর পায়ের ধুলো যে বাড়িতে পড়েছে সে বাড়ি পেটে পোরে কোনও কুচক্রীর সাদ্যি নেই এমন।’
আজ্ঞে, যেতেও তো হোল না কষ্ট ক’রে। যিদিনকে এই কথাটা হোল, তার পরের দিনই দুপুরবেলা—আমি কাঁটালতলায় খেতে বসেচি, এমন সময় অন্য কেউ নয়, একেবারে ঘোষালমশাই সশরীলে এসে উপস্থিত। সেই গায়ে ময়লা পিরেন, পায়ে সাতটা তালি মারা চটি, ছাতাটারও কোটে তালি আর কোটে আসল বোঝবার উপায় নেই—চৌকাঠ ডিঙিয়ে উঠোনে পা দিয়ে ডাকলেন—“কৈ গো ন্যায়রত্ন, বাড়ি আচ নাকি?’
একে পেয়ারাতলা ছেড়ে বেরোন না কোথাও, তায় কালই ওনার কথা হয়েচে, ঠাকুরমশাই বোধ হয় পুঁতি নিকছিলেন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন।
‘হঠাৎ ঘোষাল যে! পথ ভুলে নাকি?’—এক বয়সীই তো, ঐরকমই কথাবার্তা হোত দুজনে।
ঘোষালমশাই বললেন—আসা তো উচিত ছেল একবার, ওরকম সব্বনাশটা হয়ে গেল—উচিত ছেল তো আসা, তা দেহই আর বয় না, নিত্যি একটা না একটা কিছু নেগেই রয়েচে। আজ দক্ষিণপাড়ায় পুরুষোত্তমের বাড়ি ওর মায়ের বাচ্ছরিক ছেল না! সেই নেমন্তন্ন সেরে ফিরছিলুম, ভাবলুম একটু ঘুরে না হয় ন্যায়রত্নের বাড়িটা হ’য়েই যাই।’
আমি কাঁটালতলা থেকে দেখচি, ঠাকুরমশাই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েচেন, মেঘ না চাইতেই জল, ভাবছিলেনই এইবার একবার যাবেন, নিজেই এসে উপস্থিত; তাড়াতাড়ি মাদুরটা বের ক’রে বললেন— ‘তা এয়েচই য্যাখন, একটু জিরিয়ে যাও, তামাক সাজাই রয়েচে।’
‘তা য্যাখন বলচ…আর রোদের তাতও হয়েছে এক!’
—উড়ুনিতে নুচিমণ্ডার একটা বেশ বড় ছাঁদা, মাদুরের এক পাশে রেখে ব’সতে ব’সতে বললেন— ‘তা আচ কি রকম? গিন্নী তো আমার মতনই হাড়ির হাল ক’রে গেলেন, তাই কাকে যেন বলছিলুম—অনাদিকে বলব আর কেন, এবার পাত্তাড়ি গুটিয়ে দু’জনে বিন্দাবনে গিয়ে বসা যাক।’
ঠাকুরমশাই তো কথাটা তোলবার জন্যে মুকিয়েই ছিলেন, বললেন—‘তোমার যেন কথাটা দুঃখ করেই বলা, কিন্তু আমার তো ভাই এখন ঐ একটিই পথ। তাই তো ভাবছিলুম—ঘোষালের কাছে না হয় যাই একবার।’
হুঁকোটা নিয়ে এয়েচেন, সেটা হাতে নিয়ে ঘোষালমশাই বললেন—‘তা ঘোষাল তো বাড়ি বয়েই এয়েচে, কিছু বলতে নাকি?’
আমি কাঁটালতলা থেকে দেখচি, ঠাকুরমশাইয়ের মুখটা যেন কিরকম হ’য়ে গেচে। ত্যাখন ছেলেবেলায় অত বুঝতুম না, এখন তো বুঝি—কথাটা হচ্চে, কর্জও তো একটা চাওয়াই, কথা রাখবে কি না রাখবে, মুখটা যেন কেমনধারা হয়ে গেচে, ওরই মধ্যে আমতা আমতা ক’রে বললেন— ‘বললুম—মানে তোমার তো অজানা কিছু নেই ভাই—দিন চলা ভার, তার ওপর গিন্নী এই কাণ্ডটি ক’রে বসলেন, একটা খরচ তো?-হয় কোথা থেকে? তাই ভাবছিলুম, ঘোষালের কাছে বাড়িটা রেখে একেবারে বেশি ক’রে কিছু ট্যাকা নি, এ কাজটাও সারি মেয়ের বিয়েও দিই। তারপর একটা পেট, পারি তো রোজগার করে সুধে দোব, না পারি-ঐ তুমি যা বললে লোটাকম্বল নিয়ে বিন্দাবন।’
ঘোষালমশাই চুপটি ক’রে হুঁকো টানচে আর শুনচে, যাই বলুক সব জেনেশুনে এই জন্যেই তো আসা। যেন আকাশ থেকে পড়ল, বললে— ‘মেয়ের বিয়ে! তোমার তো সেই এতটুকু একটি মেয়ে দেখেছিলুম—একালে গৌরীদান করবে নাকি?’
ঠাকুরমশাই বললেন—‘তুমি সেই কবে দেখেচ, চিরকালই কি এইটুকু থাকবে ভাই? এখন চোখ তুলে চাওয়া যায় না মেয়ের দিকে। গিন্নী ঐ চিন্তা নিয়েই গেচেন, এখন একলা আমার ঘাড়ে।…তাই তো বলছিলাম, অরক্ষণীয়া কন্যে, কাজটা হয়ে গেলে একটা পাত্র দেখে তাড়াতাড়ি কোনরকমের বিদেয় ক’রে নিঃঝঞ্ঝাট হই।’
ঘোষালমশাই সেই যে হাঁ ক’রে আচে, সে ভাবটা যেন আর কাটতে চায় না, বললে–‘তুমি কি বলচ অনাদি? এতটুকু দেখেচি, তাও তো এই সিদিন, এর মধ্যে একেবারে অরক্ষণীয়া… বিশ্বেস করতে হবে আমায় তাই?’
ঠাকুরমশাই একটু হেসে বললে—‘মেয়েদের বাড় তো—মিচে বলব কেন?—এই তো হাতে পাঁজি মঙ্গলবার, দেখেই যাও না- তোমার কাছে পাঁচরকম মানুষের গতায়াত আছে—একটু খেয়ালও তো রাখতে পার? চক্ষুকন্নের বিবাদ ভঞ্জন করেই নাও না ভাই।’
দিদিমণিকে ডাক দিলেন—কৈ গো নেতা, তোর জ্যেঠামশাই এল বাড়ি বয়ে—কত বড় ভাগ্যি-একটা প্রণাম করে যা।’
উঠোনের একদিকে রান্নাঘর, কাঁটাল গাছটার সামনা-সামনি; বড় ঘরের দাওয়া থেকে নজরে পড়ে না। দিদিমণি এতক্ষণ সেখান থেকে আমার দিকে চেয়ে ওনাদের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে মাথা নেড়ে নিজের চুলের মুঠি ধরে রঙ্গ করছিল—আবার বড্ড নকুলেও ছেল তো-অরক্ষণীয়া কন্যে, তাকে চুলের মুঠি ধ’রে বিদেয় করতে হবে না?—রঙ্গ করছেল, ডাক পড়তে একেবারে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, তারপর সঙ্গে সঙ্গেই হাত নেড়ে, ঠোঁট নেড়ে আমায় ইশেরায় জানাতে লাগল—-কোন মতেই বেরুবে না ওর সামনে। ঠাকুরমশাই আর একবার ডাকলে, তারপর সাড়া না পেয়ে আমায় জিগ্যেস করতে আমি বলতে যাচ্চি আসবে না, এমন সময় আমায় ঘুষি দেখিয়ে চুপ করতে ইশেরা ক’রে হাতদুটো ধুয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। একেবারে শান্ত-শিষ্ট নক্ষ্মী মেয়েটি, ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না, টিপিটিপি দাওয়ার ওপর উঠে গিয়ে দুজনের পায়ের ধুলো নিয়ে পেন্নাম করলে। আমি কাঁটালতলা থেকে দেখচি দা’ঠাকুর, ঘোষাল-বুড়ো চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আপাদমস্তক দেখলে দিদিমণিকে, তারপর হুঁকো টানতে টানতে মাথা নেড়ে বললে, ‘হ্যাঁ, তা হয়েচে ডাগরটি—তবু তুমি যেমন বলছ তেমন কিছু নয়।’
দিদিমণি তো আড়ষ্ট হয়ে গেচে একেবারে, চলে আসছেল, আবার ডাকলে। যেমন মেয়ে দেখবার সময় হাত টিপে টিপে আঙুল টিপে টিপে দেখে না সেই রকম ক’রে দেখলে খানিকটা, তারপর বললে—‘বেশ, যাও এবার।’
ঠাকুরমশাইকে বললে—‘তুমি বললে না একটু দেখে রাখতে, পাত্তোর-টাত্তোর যদি পড়ে চোখে কোনও, তাই একটু ভালো করেই দেখে রাখলুম।’
দিদিমণি রান্নাগরে চলে গেল দা’ঠাকুর। আবার কি নতুন রঙ্গ করে দেখতে গিয়ে দেখি চৌকাঠের গায়ে ঠেস দিয়ে চুপটি ক’রে দাঁড়িয়ে আচে। সে মানুষই নয় আর; আমার দিকে একবার নজর পড়ল, কিন্তু যেন দেখেও দেখতে পেলে না।
এদিকে ঘুরে দেখি এনারা দুজনেও চুপ ক’রে বসে, ঘোষালমশাই ভুড়ুক ভুড়ুক করে তামাক টানচেন। ছেলেবেলার কথা, অত বুঝি না তো দা’ঠাকুর ত্যাখন, ভাবচি হঠাৎ এমন কি হোল, ঘোষালমশাই-ই কথা কইলে, বললে—‘তোমার সেই কথাটা ভাবচি আর হাসি পাচ্চে ন্যায়রত্ন, তোমার মুখ দে’ বেরুল কি করে?—একটা বদনাম বের ক’রে দিয়েচে আমার শত্তুরের তো অভাব নেই—তবুও, হ্যাঁ, দিনকাল যা পড়েছে, কিছু একটা না রেখে টাকা বের করে দেওয়া বিপজ্জনক—ভালমানষী করতে গিয়ে ডুবচেও তো অনেক, তা ব’লে তোমার গোটাকতক ট্যাকা দরকার পড়েচে তা এই পৈত্তিক ভিটেটুকু বাঁধা রেখে নেবে? -আমার কাছ থেকে?-চামার তো নই।
এতক্ষণ যে মুখে গেরাস তুলি নি সে অন্য কারণে, এবার তো একেবারে থ’ হয়ে গেলাম দা’ঠাকুর। ভাতের আসনে যে ব’সে আচি সে হুঁশ নেই। দিদিমণির মুখের দিকে চেয়ে দেখি সেই রকম চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে আচে।
ওদিকেও চুপচাপ, তারপর ঠাকুরমশাই-ই কথা কইলেন, বললেন—এ তোমার উপযুক্ত কথাই হয়েচে রাজু, কিন্তু কি জান?—অভাবের সংসার, তবুও যদি একটা কিছু গচ্ছিত রাখা থাকে তো নিজেরই একটা তাগিদ থাকে যে ওর মধ্যে থেকে বাঁচিয়ে-সাঁচিয়ে—কিছু কিছু ক’রে দিয়ে যেতে হবে। তা বাড়িটুকু ছাড়া আর কিছু তো নেই, তাই বলছিলুম এইটুকু রেখেই নিই তোমার কাছে ট্যাকাটা।’
ঘোষালমশাই বললে’নিজের তাগিদ! বেশ, তা হ’লে এক কাজ করো, একটা হাতচিটে দাও। তোমার পৈত্তিক ভিটে আমি বন্ধক রাখতে বলতে পারব না; তাহ’লে তুমি বরং অন্যত্র দেখো। বাড়ি বন্ধক রাখচ, ট্যাকা অনেক জায়গায়ই পাবে।’
এদিকে ফিরে দেখি দিদিমণি সেই রকম নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে আছে; শুধু চোখের চাওনিটা এমন যে চোখোচোখি হবার ভয়ে আমি মুখটা ঘুরিয়ে নিলুম।
সন্ধ্যেয় গোরু নিয়ে য্যাখন ফিরলুম, দিদিমণি বাড়িতে একাই ছেল; পৈঠের ওপর চুপটি ক’রে বসে ছেল, এই সময় সন্ধ্যের পাট সব সারতে থাকে, কিছু হয় নি দেখে জিগ্যেস করতে বললে— ‘মর ছোঁড়া। আমি কি আর তোদের বাড়ির দাসীবাদী নাকি যে পাট করতে যাব? আমি এখন…”
নকুলে তো, ঘাড়টা দুলিয়ে হেসে উঠল, আমায় বললে—‘তুই বশিষ্টের কপিলেকে বেঁধে আয়, আমি মানুষটা কি হতে চললুম একবার শোন সে—আমার পেট ফুলচে, ব’লে খালাস হই।’
এসে ব’সতে বললে—‘ঠিক মিলিয়ে দেখিস, মিথ্যে হয় তো আমার নামে একটা কুকুর পুষে রাখিস। তাই তো বলি, ঘোষাল বুড়ো, পেয়ারাতলাটি ছেড়ে একদণ্ড নড়লে যার ভাত হজম হয় না, সে হঠাৎ বাড়ি ব’য়ে অত দরদ দেখাতে আসে কেন!”
জিগ্যেস করলুম—‘কেন গা দিদিমণি?’
বললে—‘আ মর ছোঁড়া! যেমন মনিব তেমনি চাকর, সব বুঝিয়ে বলো তবে বুঝবেন। ক’নে দেখতে এয়েছেল, দেখ না এইবার কোন্ দিন গিয়ে ঘোষালবাড়িতে জাঁকিয়ে বসি—ছেলের জন্যে চারিদিকে কি রকম ঘটক ছুটিয়ে দিয়েচে জানিস না? খোঁজ পেয়েচে বাবার ট্যাকার দরকার, ছুটে এয়েচে। এমন সুবিধেটা হাতছাড়া করে?’
বললুম— ‘সে তো গ্যাঁজা খায়।’
বললে—‘তুই আর খুঁড়িস নি স্বরূপ, গ্যাঁজাখোরই জুটুক আমার কপালে একটা। আমার ভয় ডাগর মেয়ে দেখে বুড়ো নিজে না হামড়ে পড়ে ছেলেকে ঠেলে।
বললুম—‘নিজে বিয়ে করবে?’
‘করবে না যেন! মিনসেদের তুই চিনিস ভারি! কেন, সিদিনে নীরদ ঘটকের মেয়ে পার্বতীকে ভাইপোর জন্যে দেখতে এসে তার জ্যেঠা নিজে বিয়ে ক’রে নিয়ে গেল না ড্যাংডেঙিয়ে?’
একটু চুপ ক’রে থেকে বললে—“দেখ না, বাবা হাত-চিটে দিয়ে ট্যাকা আনতে গেচে, এক্ষুনি ফিরে এলেই টের পাওয়া যাবে—ঘোষালগিন্নী হয়ে ঢুকব কি ঘোষালবৌ হয়ে। যদি জিগ্যেস করিস-তোমার ইচ্ছেটা কি তো আমি বলব-ভেবে দেখলুম যেন একেবার গিন্নী হ’য়েই ঢুকি, তোর ইচ্ছেটা কি রে স্বরূপ?’
আমি যেন কি রকম হয়ে গেছি দা’ঠাকুর। উদিকে বুড়ো, ইদিকে গেঁজেল, কোনটাই তো পছন্দ নয়, কি বলব ঠাহর করতে না পেরে ব’লে বসলুম—‘গিয়ে একটা ভালো দেখে দুধেল গাই পুষো দিদিমণি, আমি চরাব।’
দিদিমণি একেবারে খিলখিল ক’রে হেসে উঠল, বললে’আমি মরচি নিজের জ্বালায়, আর ও ছোঁড়া একটা বাঁজা গাই চরিয়ে চরিয়ে হা’ক্লান্ত হয়ে…’
—সবটা শেষ করতেও পারলে না, হাতের আঁজলায় মুখ ঢেকে হুহু ক’রে কেঁদে উঠল। বেশ মনে আচে সিদিনকার কথাগুনো দা’ঠাকুর; দিদিমণি অনেকক্ষণ ধ’রে কাঁদলে ব’সে ব’সে। সন্ধ্যে যখন উতরে গেচে একটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ মুছে বসল। একটু যেন অপ্রস্তুত হ’য়ে গেছে তো?—চোখ দুটো মুছে বললে— ‘মার জন্যে হঠাৎ মনটা বড় উথলে উঠেছিল রে… কোথায় যে যায় মানুষ ম’লে—একেবারে যেন ভুলে ব’সে থাকে।
আবার আস্তে আস্তে দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সেটাও থেমে গেলে চোখ দুটো য্যাখন মুচে নিলে, জিগ্যেস করলুম—‘তুমি ঠাকুরমশাইকে তা’হলে যেতে দিলে কেন দিদিমণি ট্যাকা আনতে ওখান থেকে?’
‘কেন?’—–ব’লে দিদিমণি আমার মুখের দিকে ঘুরে চাইল। তারপর ওর মুখটা কি রকম যেন শক্ত হয়ে উঠল, বললে—“দিন না বিয়ে, একগাছা দড়ির মামলা তো, তা আর জুটবে না?’ ত্যাখন তো আর ওসব বুঝিনে দা’ঠাকুর, কতকটা খুশি হয়েই ব’লে বসলুম—‘বেঁধে রাখবে ওদের?’
—দিদিমণির ঐরকম ছেল, এই এক ভাব, সঙ্গে সঙ্গেই পালটে অন্যরকম, আবার খিলখিল ক’রে হেসে উঠল, বললে—ছোঁড়া এক গোরু বাঁধাই চিনেচে; ওঠ, দূর হ’,—আমার রাজ্যির পাট প’ড়ে রয়েচে।…আর শোন্ স্বরূপ, যা সব বললুম তার একটি কথা কারুর কানে যাবে না, তা’ হ’লে মার কাজে তোর ঐ বাঁজা কলেকে দান করিয়ে দিয়ে তোর এ-বাড়ি আসা বন্দ করব একেবারে।’
ঠিকই ধরেছেল দা’ঠাকুর,—বললুম না আপনাকে?-বুদ্ধি নয় তো, ক্ষুরের ধার, ঘোষালমশাইয়ের অভিসন্দিটা ধরেছেল ঠিকই। অবিশ্যি ঘোষালমশাই চাপা লোক, প্রেথমটা জানতে দিলে না, চেপেই রাখলে কথাটা, মাঠাকরুণের কাজটা বেশ ভালো ক’রেই হয়ে গেল। তা হবে না?—কি রকম পুণ্যবতী ছেলো তিনি। ইদিকে কিন্তু যে ট্যাকাটা নে’ এসেছিল ঠাকুরমশাই সেগুলি খরচ হয়ে তার ওপর আরও কিছু ঋণই হয়ে গেল। কুচ পরোয়া নেই, হাতচিটে বদলে ঘোষালমশাই ও-ট্যাকাটাও দিয়ে দিলে। ইদিক থেকে নিশ্চিন্দি হয়ে ঠাকুরমশাইয়ের ত্যাখন উদিক’কার ভাবনা ঢুকল-বেহুঁশ খরচ ক’রে ফেলেচে, এখন পরিশোধ করে কি ক’রে। বর্ষার গোড়ায় মাঠাকরুণ মারা যান, বর্ষাটা কেটে গেল, ঠাকুরমশাই শিষ্যিবাড়ি বেরিয়ে পড়লেন—ব্যবস্থা হোল রেতে ও-পাড়ার বামুনপিসি আর আমার বাবা শোবে। দিদিমণিকে ভালোবাসতুম তো…আজ্ঞে হ্যাঁ, মার অধিক ক’রে ভালোবাসতুম, সেইরকম ছেলও তো—তা আমিও এ ক’টা দিন আর বাড়ি যেতুম না। ঐখানেই রাত্তিরেও একমুঠো খেয়ে ওইখানেই শুয়ে থাকতুম।
পাপ মুখে বলতে নেই দা’ঠাকুর, মাসখানেক শিষ্যিবাড়ির ঘি দুধ খেয়ে ঐ রকম ডিগডিগে শরীল তো, তার ওপর ঐ দুজ্জয় শোকটা গেল—তা পাপমুখে বলতে নেই, দিব্যি গোলগালটি হয়ে ফিরলেন ঠাকুরমশাই। কখনও তো বেরুতেন না বড় একটা, শিষ্যিদের ভক্তিটুকু আভাঙা ছেল, বিদেয়ও নিয়ে এলেন মন্দ নয়। একটা ঋণ ঘাড়ের ওপর রয়েচে, সেইজন্যেই ঘুরে আসাও তো, ঘোষালমশাইকে কিন্তু য্যাখন দিতে গেলেন, সুদে আসলে মিলিয়ে খানিকটা হালকা হবার জন্যে, ঘোষালমশাই মিষ্টি কথা ব’লে, আত্তিস্য দেখিয়ে ফিরিয়ে দিলেন। ঐ ছেল ওনার পদ্ধতি–তাগাদা তো করতই না, ট্যাকা দিতে গেলেও পারতপক্ষে নিত না-হচ্চে, হবে, এ কি পরের হাতে আচে? দরকার হলেই চেয়ে নোব—এই ক’রে ফিরিয়ে দিত। ঋণ চায় যারা অমনি অভাবী তারাই তো? — খরচই হয়ে যেত, তারপর সুদে আসলে য্যাখন বেশ মোটারকম জমে উঠেছে, খাতকের সাদ্যির বাইরে, সেই সময় বাড়ি, গয়নাপত্তর, কি বাসন-কোসন যাই কিছু বন্ধকী আচে বোয়ালমাচের মতন হাঁটুকু ক’রে আস্তে আস্তে পেটে পুরে বসে থাকত। ঠাকুরমশাইয়ের বেলাও তাই হোল, তবে এখেনে তো মতলবটা অন্যরকম ছেল, পদ্ধতিটাও বদলে দিলে। অভাবেরই সংসার তো? —য্যাখন বুঝলে ট্যাকা যা এনেছেল এতদিনে খরচ হয়ে গিয়ে থাকবে—ঠাকুরমশাইকে ডেকে—আর কিছু নয়, শুধু হিসেবটা একবার বুঝিয়ে দিলে—‘জেনে রাখা ভালো ভাই, কোন দিন বলবে-ট্যাকাটা এত জমে গেল, ঘোষাল আপন লোক হয়েও জানিয়ে দিলে না একবার। তা তোমার ভাবতে হবে না কিচ্ছু, আমি জানি আমার ট্যাকা আমার বাক্সতেই আছে…’
জিগ্যেস করবেন—“তা তুমি এসব শুনলে কোথা থেকে?’…আমি শুনতুম দিদিমণির কাছ থেকে। মা-ঠাকরুণ যাবার পর সংসারের সুখদুঃখের কথা দিদিমণিকেই তো বলতেন সব, দিদিমণি য্যাখন ঠাকুরমশাই থাকত না, আমায় বলত। বললে—‘বাবার মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেচে, এখনও ঘোষাল-বুড়ো ভেতরের কথাটা বলেনি খুলে, কিন্তু এইবার বললে ব’লে, আর দেরি নেই,—মিলিয়ে যা তুই।’
খড়দার দৈবজ্ঞিঠাকরুনের মতন একবার মুখ দিয়ে যা বের করত, যেতেই হবে কিনা ফলে; পরের দিন নয়, তার পরের দিন আমি গোরুটাকে জাবনা দিচ্চি, তারিণী ঘটকী এসে উপস্থিত। উঠোনে সেঁদুতে সেঁদুতেই মুখে একটু গুল ফেলে দিয়ে বললে—‘বলি হ্যাঁগা ঠাকুরমশাই, মেয়ে তোমার, আর ইদিকে আমার যে গঞ্জনা শুনতে শুনতে পথ চলা দায় হয়ে উঠল।—বলি, তা আমি কি করব? যার মেয়ে তার চাড় নেই…না, তোমা হেন ঘী থাকতে, গাঁয়ের মধ্যে একটা গরিব বামুনের মেয়ের ব্যবস্থা হয় না… ‘
এর পরই-যেমন গাঁক-গাঁক করতে করতে সেঁদ্যে ছেল, ঠাকুরমশায়ের কাছে এসে একেবারে নামিয়ে দিলে গলা। গোয়ালঘরটা একেবারে পাশেই, তাই কানে গেল আমার — ‘ বলি আমার সলা শুনবে? ঐ ঘোষাল-বুড়োকে ধরো না- অমন কাত্তিকের মতন ছেলে–রেখেচে অমনি ক’রে তাই বাউন্ডুলের মতন ঘুরে বেড়াচ্চে-সংসারে টান এলে ঐ ছেলে দেখবে হীরের টুকরো…আর ট্যাকার ওপর ব’সে থাকবে তোমার মেয়ে দ্যাখো…যদি বল রাজী হবে না বুড়ো…ন্যাও, ঢের ঢের দেখেচি : তারিণী ঘী এর মধ্যে পড়লে রাজী হবে না আবার! ঘাড় ধরিয়ে রাজী করাব…আর ট্যাকাও তো নিয়েচ কিছু শুনলাম—তা কেপ্পনের ট্যাকা আবার ফিরিয়ে দিতে হবে নাকি? গেচি আর কি! তারিণী ঘী এখনও বেঁচে।’
—এই ধরনের কত কথা; তবে একতরফা। ঠাকুরমশাই ঠোঁট দুটি পজ্জন্ত খুললে না একবার, যেন পাথর হয়ে গেছে।
ও চলে গেলে আমি উঠোনের উদিকে রান্নাঘরের দিকে গিয়ে দিদিমণিকে ডেকে কথাগুলো বলব, ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাপা গলায় বললে— ‘দেখলি তো? যেমন যেমন বলেচি, যাচ্চে মিলে, না, যাচ্চে না?’
জিগ্যেস করলুম— ‘তুমি শুনেচ?’
বললে—‘না, শুনব কেন? তারিণী ঘটকী বাড়ি ব’য়ে এল, আর আমি নিশ্চিন্দি হয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছিলুম!…হায় হায়, কোথায় ভাবছিলুম একেবারে গিন্নী হয়ে সেঁদুব, সে গুড়ে বালি পড়ল রে স্বরূপ! তা হোক গে, কি বল? বুড়ো আর ক’দিন, তার পরেই তো সেই গিন্নী, এ বরং সধবা গিন্নী—আর ঐ রকম কাত্তিকের মত সোয়ামী!’
—চোখ দুটো বড় ক’রে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে চাপা গলায় হেসে উঠল।
‘কাত্তিক এত গ্যাঁজা খেতে শিখলে কোথায় বল দিকিন, বাপের ছিলিমে, না? আর হ্যাঁরে স্বরূপ, কাত্তিকের ময়ূর গেল কোথায়? গ্যাঁজার গন্ধে বুঝি দেশ ছেড়ে পালিয়েচে?’
এক একটা কথা বলে আর ডুকরে ডুকরে হেসে ওঠে। শেষে হাসি থামিয়ে একটু চুপ ক’রে রইল, আবার ঠোঁট দুটো কুঁচকে উঠল, ঘেন্নায় মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে বললে- ‘হাত ধুয়ে বসে
বললে—‘হাত থাকুক। সতীলক্ষ্মী মায়ের মেয়ে আমি, উঠলুম গিয়ে ঐ বাড়িতে। বাবা না বোঝে, ঢের উপায় আচে।’
কথাটা ক্ৰমে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। তারিণী ঘটকী আরও ক’দিন এল ঠাকুরমশাইয়ের কাছে, কিন্তু কোন কথাই পায় না, তারপর একদিন ঘোষালমশাই নিজেই কথাটা পাড়লে।
একজন ভালো শিষ্যির পিত্তি-ছেরাদ্দে মোটা বিদেয় পেয়েছেন ঠাকুরমশাই, উদিককোর ট্যাকা সব খরচ হয়ে গেচে, আর যেতেও পারে না, এইটে পেয়ে দিয়ে আসতে গেছল, ঘোষালমশাই কথাটা তুললে—অবিশ্যি অন্যভাবে, ঝানু লোক তো। বললে— ‘তারিণী ঘী বলছেল তোমার মেয়েটিকে নাকি এবার পাত্রস্থ করতে চাও-নাকি আমার ছিরুর কথা বলেচ-তা আপত্তি নেই, একটি ডাগর মেয়েই আনতে চাই ঘরে-তোমারটি হ’লে তা মন্দ কি?—তা আমার ছেলের ময্যেদা না করতে পারে, এটা-ওটা কিছু নিজের মেয়েকেও তো দিতে ইচ্ছে হয়, তুমি ও-ট্যাকা ফিরিয়ে নে যাও, সাদ-আহ্লাদ যা মেটাবার মিটিও; পরে যা হয় হবে।’
ভালো মানুষ, সুদু শাস্তোরের তক্কো উঠলে মুখে খৈ ফোটে, তার মূল্যই বা কি বলুন? একটি কথা বলতে পারলেন না ঠাকুরমশাই। সকালবেলা গেছলেন, এসে আর মুখে জল দিলেন না সিদিন, বিছানায় পড়ে রইলেন।
ঘোষালমশাই খবর রাখে সবই, সুতো আলগা দিয়ে দিলে; মাছ গেঁথেচে, যাবে কোথায়?. প্রেথম ঝোঁকটা এই ক’রে কাটল দা’ঠাকুর, দিন যায় তো ক্ষ্যাণ যায় না, তারপরে ক্রেমেই ব্যাপারটুকু গা-সওয়া হয়ে এল; বাপ-মেয়ে দুজনেই বুঝলে উপায় নেই।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই। সুদে আসলে ত্যাখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েচে, বাড়ি বেচলেও আর সোদ হবার উপায় নেই। এর ওপর মা-ঠাকরুনের বাচ্ছরিক এসে পড়াতে বরং আবার গিয়ে নতুন চিঠি দিয়ে নিতেই হোল আর কিছু ট্যাকা।
‘দিদিমণির বয়েসও যাচ্চে বেড়ে, সতের ছেল তো আঠার হোল, আঠার ছেল তো উনিশ; ভালোমানুষের শত্রুরই তো বেশি, ঘোট পাকিয়ে উঠতে নাগল পাড়ায়। একটা কিছু করতেই হোত, ইতিমধ্যে বড় ঘোটের মধ্যে ছোট ঘোট গেল তলিয়ে; বিদ্যেসাগরমশাই মারা গেলেন। আবার সেই কবেকার বিধবা বিয়ে, তার ওপর শোক শোভা মিটি; কার ডাগর মেয়ে আচে সেকথা ভুলে কোথায় বিধবা আছে, এ-হিড়িক থেকে কি করে বাঁচাতে হবে সেই কথা নিয়ে পড়ল লোকে—ইদিকে লাঠিবাজির চোটে কত সধবা বুঝি রাতারাতি বিধবা হয়ে যায়—-ধূর্ত লোকেরাও বেশ কিছু ক’রে নিল—গয়ারাম তার কোন্ তিন কুলের বোনঝিকে ধরে নে এসে বিধবা-বিয়ে দিয়ে দু’পক্ষ থেকে মোটা ট্যাকা নিয়ে আবার রাতারাতি গলির বোনঝিকে গলিতে পৌঁছে দিতে গেল—সধবা পাটির লোকেরা পুরুতগিরি করবার জন্যে ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি ঘেরে হুলুস্থুলুস কাণ্ড করে তুললে, সারা মসনেয় হৈ-হৈ রৈ-রৈ। হ্যাঁ, কোন্খেনট্যয় বলছিলুম আপনাকে দা’ঠাকুর?—আর মনেও থাকে না গুচিয়ে …দেখি তো, কিছু আচে, না টেনেই সারা হচ্চেন সুদু?”
হুঁকোটা একটু বেঁকিয়ে ধরতে স্বরূপ নলচের মাথা থেকে তুলে নিলে কলকেটা, বললাম, —“তুমি বলছিলে ওরা ঘরে আগুন লাগাবে বলে ভয় দেখাতে তোমার দিদিমণি তোমায় জমিদারবাড়িতে ছুটিয়ে দিলে—পথে ছিরু ঘোষালের খপ্পরে পড়েছ, জিগ্যেস করলে–দিদিমণি তার কথা কিছু বলে?”
স্বরূপ যথাশক্তি টান দিচ্চিল কলকেটা, ক্ষান্ত হয়ে একটু হেসে বললে—“তার ওপর বামুন হলেন আবার নিজেই, আগুন তো…কিচ্ছু নেই, ছাই হয়ে গেছে।”
নাতনীকে ডেকে আবার কলকেটা সেজে আনতে ব’লে আরম্ভ করলে-
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, ছিরু আমায় শাস্যে দিলে-খবরদার একটি কথা ইদিক-উদিক হয় তো তোর ল্যাজা একঠাঁই মুড়ো একঠাই করব।’—তারপর জিগ্যেস করলে—“তোর দিদিমণি আমার কথা কিছু বলে?”
দিদিমণি বলত-নুড়ো জ্বেলে মুখে আগুন ধরিয়ে দেবে, বাপ-বেটা দুজনকারই—হবু সোয়ামী ব’লে তো এতটুকু ভক্তি-ছেদ্দা করত না। তার কারণ ছেল যে দা’ঠাকুর, নৈলে দিদিমণি তো ছেল যেমন সতীনক্ষ্মী মা, তেমনি তার সতীনক্ষ্মী মেয়ে। ভক্তি-ছেদ্দা যে ছেল না তার হেতু হচ্চে—ও-বাড়িতে পা দেবে না এ তো ঠিক করেই ছেল। আমায় বলত না? –য্যাখন বিয়ের কথা এক একবার বেশি চাগিয়ে উঠত, সেইরকম নাক সিঁটকে বলত— ‘ইস্, গেলুম। হাত ধুয়ে ব’সে থাকুক বাপ-বেটায়। আর কিছু না পারি, পালাব, তার হয়েচেটা কি?-আজকাল তো স্বাধীন জেনানাও হচ্চে, সব—কলকাতায়, হুগলীতেও আছে—হিদুরাও নেকাপড়া শিকে মাস্টারনী হচ্চে, ডাক্তারনী হচ্চে, আরও কত কি হচ্চেনা হয় বেম্মোই হয়ে যাব—বাবা বলেন ওরাও তো হিন্দু, না হয় একটু ট্যারা হিন্দু…বাবা না বোঝে, পালাব—নিজে রোজগার করব, নিজে থাকব…মাড়ালুম আমি ঐ কেপ্পন আর গাঁজাখোরদের চৌকাঠ!… তোকে কিছু জিগ্যেস করে নাকি—গেঁজেলটা?’
বলি—“হ্যাঁ, করে তো। তুমি কি বলো, কি করো, কি খাও—এই সব।’
‘তা বলবি’–বলে—মুখে নুড়ো জ্বেলে দোব, আর, কি খাই?…’
—সেই নকুলে হাসিটা আস্তে আস্তে ফুটে ওঠে দিদিমণির মুখে দা’ঠাকুর, বলে—বলবি, কিছু খায় না, কুম্ভকন্নের মতন এখন ছ’মাস উপোস দিচ্চে, ছ’মাস পরে বাপ-বেটার মুণ্ডু কচকচিয়ে চিবোবে একেবারে।’
বলে আর হেসে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু যা বলছিলুম—ছিরু ঘোষালকে একেবারে যমের মতন ভয় করতুম দা’ঠাকুর, এসব কথা কি আর বের করতে পারি মুখ দিয়ে? য্যাখন জিগ্যেস করলে-দিদিমণি ওর কথা কিছু বলে কিনা, বানিয়ে বানিয়ে এতখানি ক’রে বললুম দা’ঠাকুর-সেকেলে যাত্রাটাও তো খুব হোত, তা রাধা কেষ্টকে দেখতে না পেলে যা বলত, ঊষা অনুরুদ্ধকে দেখতে না পেয়ে যা বলত, উত্তরা অভিমন্যুকে দেখতে না পেয়ে যা বলত- খানিকটা এর খানিকটা ওর মিলিয়ে একটু ইনিয়ে বিনিয়ে বললুম। দাঁড়ালেই নেশার ঝোঁকে ছিরু ঘোষালের মাথাটা অল্প-অল্প দুলত, অষ্টমপহরী ছেল তো, একটু মিঠে মিঠে হাসতে হাসতে সবটুকু শুনলে, তারপর কানটা নেড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বললে—‘শালা মণ্ডলের পো যাত্রার মাথুর গাইচে। তা যাঃ, বলবি আসচে তার কেষ্ট, হেদুতে হবে না। আমি শ্বশুরমশায় আর ন্যাবা শালাকে খবর দিতে চল্লুম, তুই দেরি ক’রে ফেলবি।’
গ্যাঁজাখোরের মরণ, যাবে যে কত তা জানি, কোনও আড্ডায় সেঁদো ব’সে থাকবে। তবু উদিকে যাবার ঐ একটি রাস্তা, তার ওপর মনটাও পড়ে রয়েচে দিদিমণিদের দিকে, ফিরেই এলুম। ফিরে এসে দেখি ব্যাপার আরও গুরুচরণ, লোক আরও জড়ো হয়েচে দু-দিকেই, তবে সধবা পার্টির লোকই বেশি, নেটেলও দুদিকে, তবে তার মধ্যে মণ্ডলপাড়ায়ই বেশি, সেই জন্যেই এখনও নাগেনি, তবে যা কাণ্ড, নাগল ব’লে এবারে।
দিদিমণি দাওয়ার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে সেই একভাবে বাইরের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আচে, আমায় দেখে জিগ্যেস করলে—‘গেছলি?’…সব শুনে চুপ ক’রে রইল, শুধু চোখ দুটো আরও জ্বলে জ্বলে উঠল।
এমন সময় দেখি ঠাকুরমশাই খিড়কির দরজায় মণ্ডলপাড়ার ভিড় ঠেলে উপস্থিত। দিদিমণির নজর পড়তেই, চেঁচিয়ে উঠল—তুমি এলে কেন? ওরা পুড়িয়ে মারবে বলচে।’
সঙ্গে সঙ্গেই এতক্ষণের রাগ আর আক্রোশটা বেরিয়ে পড়ে, বাঁ হাতে চোখের ওপর আঁচলটা চেপে হুহু ক’রে কেঁদে উঠল। ঠাকুরমশাই ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, ‘তুই বাইরে দাঁড়িয়ে!’
‘আমি যাব না, নড়ব না, পোড়াক ওরা আমায়’…ব’লে আঁচলটা ছেড়ে খুঁটিটা কক্কড়িয়ে জাপটে ধরে রইল দিদিমণি। তারপর একটা কাণ্ড হোল দা’ঠাকুর। ঠাকুরমশাই এয়েচে দেখে সধবা পার্টিরা আরও হৈ-হৈ ক’রে উঠেচে, এমন সময় হঠাৎ উদিক থেকে এক মড়াকান্না, –’হরো রে, কোথায় গেলি রে!’
—আজ্ঞে হ্যাঁ, সে কী গলা দা’ঠাকুর! অত তো হৈ-হৈ, কান পাতা যায় না, তবু ছাপিয়ে উঠেচে গলা একেবারে,—মথুরাসা’র যাত্রার দলের একবুক-মেডেল-ঝোলানো জুড়ির দল হার মেনে যায়।— ‘হরো রে! কোথায় গেলি রে!!’
দাওয়ার পৈঠে থেকে দেখি রাস্তাটা যেখেনে জগমোহনের উঁচু ভিটের ওপর উঠেচে সেখেনে একটা ছৈ-ওলা গোরুর গাড়ি, উঁচুর দিকে উঠতে হচ্চে, ব’লে গাড়োয়ান গোরুদুটোর ল্যাজমলা দিয়ে পিঠে বাড়ি হাঁকড়াচ্চে, আর ছৈয়ের ভেতর ঐ চিৎকার— ‘হরো রে। কোথায় গেলি রে!! আমি কি দেখতে এনু রে!’—হ’রো মা-ঠাকরুনের নাম ছেল কি না।
দেখতে এয়েচে অথচ মনে হোল যেন চোখ বুজে রয়েচে দা’ঠাকুর। নৈলে, কানের কাছে নিজের কান্নার যা জয়ঢাক পিটুচ্ছিস্ তাতে হৈ-চৈটা না হয় নাই শুনতে পেলি, কিন্তু ভিড়টা কি জমেচে তা তো চোখে পড়তেই হয়।…আর হ্যাঁ, গাড়িটা আর একটু এগুতে দেখলুমও কিনা, ছৈয়ের ভেতর বুকে হাত দুটো চেপে একটা স্ত্রীলোক যেন দুলে দুলে আপন মনে কান্না টেনে যাচ্চে, সামনে কোথায় কি হচ্চে তার হুঁশ নেই একেবারেই।
ঠাকুরমশাই দাওয়ার ওপর ছেল, গলা বাড়িয়ে কি যেন অবধারণ ক’রে দেখছেল, ব’লে উঠল—‘সব্বনাশের ওপর সব্বনাশ, আমাদের ব্রেজো যে! ও কেন এই বিপদের মধ্যে আসতে গেল?’
কে ব্রোজো, কি বিত্তান্ত আর কিছু না ব’লে হন হন ক’রে নেমে যাচ্চেন এমন সময় উদিকে কান্নাও হঠাৎ থেমে গেল, আর তার পরেই গাড়ি থেকে একখানি লাশ যা ভুঁয়ে দাখিল হ’লেন—গুরুজন, পাপমুখে বলতে নেই—এতক্ষণে টের পাওয়া গেল অত বাড়ি খেয়েও গোরু দুটো চড়াইয়ের মুখে জুত করতে পারছেল না কেন! যেমন খাড়াই, তেমনি বহর, চুলটা টেনে মাথার মাঝখানে বিড়ের মতন ক’রে বসানো, গলায় মনে হোল যেন একগাছা তুলসীর মালা দু’ফেরতা দিয়ে আঁটসাঁট ক’রে জড়ানো হয়েচে। পরণে একটা ময়লা গরদের খান।
আজ্ঞে না, কান্না আর একেবারেই নাই। তা ওটা আমি মোটেই ধরি না দা’ঠাকুর, স্ত্রীলোকেরা ওনারা হচ্ছে শক্তির অংশ, আমি নয়, শাস্তোরেই এ কথা ধ’রে ব’লে দিয়েচে। পুরুষে একবার কান্না আরম্ভ ক’রে চোখের জলটুকু খরচ না হয়ে পড়া পজ্জন্ত থামতে পারে না, ঝগড়া করতে নামলেও একটা হেস্তনেস্ত ক’রে ফেলতেই হবে তাকে। ওনাদের কিন্তু তা নয়, কান্নাই বলুন, কলহই বলুন, আর যা-ই বলুন – য্যাখন যেটুকু দরকার ত্যাখনকার মতন সেটুকু সেরে নিয়ে আবার ধামা চাপা দিয়ে খুলো; আবার য্যাখন ফুরসত হোল, ধামাটি তুলে শুরু করে দিলে…বরং দেখবেন পুরুষদের বেলা য্যাতই এগুবে, ত্যাতই যেন ঝিমিয়ে আসবে, এনাদের বেলা কিন্তু য্যাতই ঐরকম ইস্টিশনে ইস্টিশনে এগুবে ত্যাতই হবে জোরালো। আপনি মিলিয়ে দেখবেন, পুরুষেরা বাসী পাস্তা বরদাস্ত করতে পারে না, অথচ সেই বাসী পাত্তা মেয়েদের পাতে দেখুন, নুনে-ঝালে গড়গড়ে ক’রে নিয়ে খোরার পর খোরা সাবাড় করে যাচ্ছে। ঝগড়া ফরিয়াদের বেলাও ঠিক ঐ রকম, য্যাত বাসী, ত্যাত ঝাঁঝ, ত্যাত জোরালো;—শাস্তোরে যে বলেচে শক্তির অংশ তা কি একটা না বুঝেসুঝেই বলেচে দা’ঠাকুর?—আপনাকে আমাকে বলে না কেন?
গাড়ি থেকে নেমেই তিনি ভিড়ের দিকে চেয়ে একটু যেন থ’ হয়ে দাঁড়াল। ভিড়ও ত্যাতক্ষণে থ’ হয়ে গেচে দা’ঠাকুর, এ দিশ্যো আখচারই তো পথে-ঘাটে চোখে পড়ে না, থ হয়ে ঘুরে দেখচে, উনি হনহন করে এগিয়ে এল।
‘বলি কাণ্ডখানা কি?-বাড়ি যেন মায়েশের রথতলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাঠিঠ্যাঙা! ….কাণ্ডখানা কি?… অনাদি কোথায়? বলি অ অনাদি। কোথায় গো! ব্ৰেজো এলুম।’
—বাজখেয়ে গলা, যেন খনখন ক’রে বাজচে দা’ঠাকুর।
ঠাকুরমশাইকে মণ্ডলপাড়ার ওরা ত্যাখনও উঠোনে আটকে রেখেচে—উনি বলচেন, ‘ছেড়ে দে, ব্রোজোদিকে নিয়ে আসি’–তা দেয় কি ক’রে ছেড়ে দা’ঠাকুর? বাইরে সবই সধবা-পাটির লোক তো। শেষে মণ্ডলপাড়ার কজনই ওনাকে ভেতরে নিয়ে আসবার জন্যে বেরিয়ে গেল, আর যেই যাওয়া আর সঙ্গে সঙ্গে ঠেলাঠেলি গুঁতোগুঁতি হয়ে আবার গোলমালটা চাগিয়ে উঠল।
ত্যাতক্ষণে ভিড় ঠেলে উনিও উদিক থেকে একেবারে মাঝখানটিতে উপস্থিত। ‘বলি, মতলবখানা কি?—যেন কাজিয়া করবার জন্যে জুটেছিস মনে হচ্চে সব!’
একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছেন, আচমকা নজর পড়তেই তারা পেছন দিয়ে চাপ দিয়ে একেবারে হাত-তিন-চার স’রে দাঁড়াল দা’ঠাকুর—দূরে থেকে চেঁচাচ্ছিল তো চেঁচাচ্ছিল—মেয়েছেলের এমন দাপট হবে ভাবতে পারে নি তো। চক্ষু কপালে তুলে একেবারে হাত তিন-চার পেছিয়ে য্যাখন দাঁড়াল, মাঝখানে বেশ খনিকটা জায়গা পস্কের হয়ে গেল, —যাত্রার আসরটি। আমি মণ্ডলপাড়ায় ওদের সঙ্গে বাইরে চলে এসে আসরের এক দিকটিতে দাঁড়িয়ে আছি, ওরা ওদিকে ঠাকুরমশাইকে ত্যাখনও ভেতরে আটকে রেখেচে, ইনি আর একটা হুঙ্কার ছাড়লে~’বলি হয়েচেটা কি? বল্, সব বোবা মেরে গেলি কেন?”
আচমকা সাক্ষাৎ হওয়ার প্রথম ভয়টা তো কেটেও গেচে ত্যাতক্ষণে, উরিই মধ্যে দু’একজন এক পা দু’পা করে এগিয়ে এল, বললে—‘উনি গাঁয়ে বিধবা বিয়ে করিয়েচেন।’
আমি সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আচি মুখের দিকে চেয়ে, লক্ষ্য করলুম উনি যেন কি একটু ভাবলে, তারপর জিগ্যেস করলে— ‘করেচেন বললি, না, করিয়েচেন বললি।’
‘এজ্ঞে, করিয়েচেন–পুরুত হয়ে।’
‘দুভ্ভাবনা গেল। আমি বলি বুঝি নিজে করেচে।…আমি নিজে বিধবা-বিয়ে করতে এলুম কিনা; ঐ মানুষকেই…’ — ঘুরে ঘুরে যার মুখের দিকেই চাই দা’ঠাকুর, হাঁ একেবারে।…তার আর বিধবা-পার্টি সধবা-পাটি নেই, ওতোর-পাড়া দক্ষিণ-পাড়া কি বদ্যিপাড়া নেই—যার পানেই চান না কেন, একগঙ্গা হাঁ ক’রে ওনার পানে তাকিয়ে আচে। তারপর আবার সেই বাজখেয়ে গলায় এক পেল্লায় ধমক দা’ঠাকুর —“দাঁড়িয়ে সব দেখছিস কি?—যারা রুকবি তোয়ের হোগে, ঐ করতে এয়েচি, পেত্যয় হচ্চে না—না? যা সব তোয়ের হোগে; পুরুতকে দিনটা দেখিয়েই ট্যাডরা পিটিয়ে দিচ্চি-রেজোবামনী তার বোনায়ের সঙ্গে বিধবা বিয়ে করতে যাচ্ছে-যে মদ্দ হবে এসে বাগড়া দিক্।
আজ্ঞে, কি হোল, কোথা দিয়ে হোল বুঝতে পারা গেল না, তবে দেখতে দেখতে জায়গাটা সাফ!… “কৈ গো?–বাঃ, বেশ তো, বরই ক’নে হয়ে ঘোমটা টেনে রইল, তবে কার ভরসায় আসা?’—বলতে বলতে দরজার দিকে এগুতে গোলমাল থেমে গেচে দেখে ওরা দরজাও দিলে খুলে। উনিও ধামাটা তুলে নিলে দা’ঠাকুর, সেই যে কান্নাটা চাপা দে’ রেখেছেল— ‘ওরে হরো রে! কোথায় গেলি রে! কি দেখতে এনু রে!’—বলে আবার সেইরকম ডাক ছেড়ে কানতে কানতে চৌকাঠ ডিঙিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল। ঠাকুরমশাই এগিয়ে গিয়ে পায়ের ধুলো নিয়ে বললে—‘দিদি যে! কি সৌভাগ্যি!’
নাতনী কলকেটা সেজে নিয়ে এলে স্বরূপ নিজেই তার হাত থেকে নিয়ে নিলে, বললে– “দে,ধরিয়েই দিই দা’ঠাকুরকে, একেবারে দা-কাটা কিনা, তানার মেহানভটা বেঁচে যাবে।”
বেশ পুরো দমে কয়েকটা টান দিয়ে আমার হুঁকোর মাথায় কলকেটা বসিয়ে দিতে দিতে হেসে বললে—“বললুম না ত্যাখন—বামুন যে আবার নিজেই আগুন, পেসাদের ভরসায় থাকলে সুদু আংরাটুকু জোটে।
কি যে বলছিলুম—হ্যাঁ, ঠাকুরমশাই পায়ের ধুলো মাথায় দিয়ে বললে ‘দিদি যে, কি সৈভাগ্যি আজ আমার! কার মুখ দেখে উঠেছি!’
তা ত্যাখন ত্যাখন যে সৈভাগ্যিই এটুকু তো মানতেই হয় দা’ঠাকুর, কী কাণ্ডটাই না হ’তে যাচ্ছেল। কিছু নয় তো ভিটেয় খানকতক লাশ তো লুটিয়ে পড়তই, তার ওপর কেউ যদি একটা নুড়ো জ্বেলে চালের ওপর ফেলে দিতে পারলে তো আর কথা নেই—তা উনি এসে তো এক কথায় দিলে সামলে। ত্যাখনকার ত্যাখন তো সৈভাগ্যিই, কিন্তু তারপর থেকেই তো গ্রামে আর কান পাতা যায় না—হাটে মাঠে ঘাটে যেখানেই যাও ঐ এক কথা—ন্যায়রত্নমশাই এবার নিজেই বিধবা বিয়ে করবে—আর ওনাকে কষ্ট করে ট্যাডড়া পেটাতে হ’ল না—-নোক একত্তর তো বড় কম হয় নি সিদিন, মুখে মুখে সারা মসনেয় রটে গেল কথাটা—ক’নে স্বয়ম্বরা হয়ে বিয়ে করতে এয়েচে।
আপনি মিলিয়ে দেখেচেন কিনা জানিনে দা’ঠাকুর, তবে আমার দেখা—যা এই রকম নোকদের মুখে মুখে রটে তা কক্ষনোও একরকম ক’রে রটে না। জিনিসটে সেই এক, কিন্তু যারা মেহনত করে রটায় তাদের আবার নিজের নিজের পছন্দ আচে তো। এই হ’ল এক। তারপর দেখুন, সবাই তো—এক জায়গা থেকে একভাবে দেখেও নি জিনিসটা—কাজেই ঐকেনে একটা মস্ত বড় প্রভেদ হয়ে গেল। এই হোল দুই। তেসরা এখন অনেকে আবার আচে যারা ছেল অথচ গোলমালে কিছু দেখে নি। তা দেখেনি ব’লে তো রটাতে ছাড়বে না দা’ঠাকুর, কাজেই এদের খানিকটা এর কাচে শোনা খানিকটা ওর কাচে শোনা এই নিয়ে নিজের নিজের পছন্দ মতন একটা দাঁড় করাতে হয়। বাকি থাকে যারা একবারে ও তল্লাটেই ছেল না। তা গ্রামের মধ্যে অত বড় একটা কাণ্ড হয়ে গেল, চারিদিককার নোক ভেঙে পড়েচে আর আমি ঘরে খিল দিয়ে গুড়ুক টানছিলুম—এ কথা তো লজ্জার মাথা খেয়ে কেউ স্বীকার করতে পারে না দা’ঠাকুর —বরং এদের আবার সাজিয়ে-গুজিয়ে এমন কিছু দাঁড় করাতে হয়—-যা সুদু কারুর সঙ্গে মিলবে না তাই নয়, আবার সবার ওপর দিয়ে যাবে।
ব্রেজঠাকরুনের ব্যাপারটাও এই রকম দাঁড়াল। যাকে দু’চোখ মেলে ঠিকমতন দেখা বলে—ধীরে সুস্তে—সেরকম করে আর কে দেখতে পেলে বলুন না? হৈ-চৈয়ের মধ্যে হঠাৎ একটা মড়াকান্না—একটু সব যেন চমক লেগে থেমে গেল—তারপরেই মণ্ডলপাড়ার ওরা সব উঠোন থেকে বেরিয়ে আসতেই হৈ-চৈটা আবার চাগিয়ে উঠেচে, এমন সময় ভিড়ের একবারে মাঝখান ঐ এক মূর্তি—কে গা তুমি? কোথা থেকে অবতীন্না হলে।’ না, ‘স্বয়ম্বরা-হ’তে এয়েচি।’ কেউ তো আর চোখ মেলে দেখবারও ফুরসত পেলে না শাপ কি ব্যাঙ।
য্যাখন রটল ত্যাখন কথাটা রটলও সেইভাবে দা’ঠাকুর। কেউ বললে খাণ্ডাৎ; কেউ বললে ডাকিনী, হাতে খাঁড়া ছেল তাই দিয়ে খেদিয়ে দিলে সবাইকে; কেউ বললে, তা নয়, স্বয়ম্বরা যে হবে সে তো গাড়ির মধ্যে ব’সে, পরমা সুন্দরী ষোড়ুশী,–নোক সরে যেতে তাকে নাব্যে নে’গেল যে দেখলুম। কেউ আবার রটালে—ষোড়ুশীই বলো, আর ডাকিনীই বলো—সে ঐ নিজে—আসলে কামরূপের ভৈরবী-ক্ষ্যাণে এ-রূপ ধরচে, ক্ষ্যাণে ও-রূপ।
এরই মধ্যে আবার যার যেরকমটি মনে ধরে, বেছে নিলে দা’ঠাকুর। তাই হয় কিনা; দশ ব্যানুন ভাত আপনার পাতে সাজ্যে দিলে, তা আপনার যেটা রুচবে সেইটের দিকেই তো ঝুঁকবেন আপনি। তারপর দিন সকালবেলা গোরু নিয়ে আমি মাঠের পানে যাচ্চি-নেহাত সকালও নয়; এক পহোর সূয্যি উঠে গেচে—ছিরু ঘোষালের সঙ্গে দেখা। ‘এই যে, শালা মণ্ডলের পো, কাল থেকে সারা মসনে খুঁজে বেড়াচ্চি, ছেলি কোথায়?”
খুঁজবে কি, এই বোধ হয় সমস্ত রাত কাট্যে লোচন ঘোষের গুলির আড্ডা থেকে বেরুল। পা টলচে, চোখ দুটো ঢুলঢুল করচে। আজ আবার একা নয়, সঙ্গে আরও দু’জন।…হ্যাঁ ও কথাটা আপনাকে বলা হয় নি দা’ঠাকুর-দিদিমণির সঙ্গে বিয়ে দেবার মতলব খাড়া করা থেকে ঘোষালমশাই ছেলের দিকে একটু নজর দেছল। কেপ্পন, কত আর করবে, তবে উরিই মধ্যে একটু মুঠো আলগা করেছেল—দুটো পিরাণ, দুখানা আস্ত কাপড়, কিছু হাতখরচও, পায়ে একজোড়া জুতো,—এই ধরনের একটু-আধটু—একেবারে যেরকম বেলাল্লা হয়ে বেড়ায়। ফল হোল, উরিই মধ্যে ছিরু ঘোষাল একটি ছোটখাটো কাপ্তেন হয়ে দাঁড়াল; দুটো পয়সা খরচ করতে পারে কাজেই ঘেরে-ঘুরেই থাকে কয়েকজন তাকে। অবিশ্যি নেশাখোরের হাতে পয়সা আর কতক্ষণ?—তবে নিজের কদর বুঝে মোচড় দিতেও শিখেছেল ছিরু ইদিকে। বুঝলেন না?—ঘোষালমশাই উদিকে অনেকগুলি ট্যাকা ঢেলেচে তো—তা ভেতরকার মতলব তো ন্যায়রত্নমশাইয়ের মেয়েটিকে ঘরে নে’ আসা গো নৈলে আসলের ওপর আসল আর সুদের ওপর সুদ, তস্য সুদ—-এতে যে ট্যাকাটা জমে উঠেছে—বাড়িখানা বিক্রি করলে যে তার অদ্দেকও উসুল হবে না। এ তত্ত্বটা য্যাখন বুঝলে ছেলে, মাঝে মাঝে মোচড় দিতেও লাগল—‘পালিয়ে যাব’, ‘বেম্মো হয়ে যাব’, তা মোচড় দিয়েও শুকনো কাঠ থেকে কতটুকু আর রস বেরুবে বলুন না। তবুও অভাবের মধ্যে যা দুফোঁটা বেরুত তাই দিয়ে নিজের কাপ্তেনিটা বজায় রেখে যাচ্ছেল ছেলে। বেশি নয়, তবু খানিকটে পসার দাঁড় করিয়ে ফেলেছেল। এখন যখনই দেখুন, বেশি না হয় জন দুত্তিন ঘেরে-ঘুরে আচেই তাকে।
আমায় দেখতে পেয়ে জিগ্যেস করলে- ‘কাল থেকে সারা মসনে খুঁজে বেড়াচ্চি, তা ছেলি কোথায় তুই?’
পয়সা-কড়ি যা থাকত নেড়ে নেবার জন্যেই আটকাত, দিদিমণির কাচে একটা পয়সা পেয়েছিলুম, সেইটেই ট্যাক থেকে বের ক’রে দিয়ে খালাস হ’তে যাচ্ছিলুম, এগিয়ে এসে বাঁ হাতে কানটা ধরে বললে—‘শালা মণ্ডলের পো ছিরে ঘোষালকে পয়সার গরমাই দেখাচ্চে! বের করবে তো একটা আধলা কি সিকি পয়সা!… দে বেটাকে একটা দো-আনি বের ক’রে, পয়সা কাকে বলে দেখুক।’
সঙ্গে ছেল সাতকড়ি পালের ছেলে জ’টে, আর তার ভাইপো ছিদাম। জ’টে একটু একটু ঢুলছিল, একটা আধলা বের ক’রে অনেকক্ষণ ধরে হাতের তেলোয় রেখে দেখলে, তারপর আমার দিকে ছুঁড়ে ফেলে বললে—‘দো-আনি কেন, একটা সিকিই নে যা। লোক চিনে কথা কইবি, খবরদার!’
ছিরু ঘোষাল কানটা নেড়ে দিয়ে ডান হাতে একটা চড় বাগিয়ে বললে—‘হ্যাঁ, লোক চিনে কথা কইবি। যা জিগ্যেস করি বলে যা একেবারে ঠিক ঠিক, একটু এদিক ওদিক হয়েচে কি, এই এক চড়ে মুণ্ডু উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দোব। মনে থাকবে তো?’
বললুম— ‘থাকবে।’
‘কাল তোর দিদিমণির বাড়িতে কে এয়েচে?’
বললুম—‘দিদিমণির মাসিমা… :
ঠাস্ ক’রে একটা চড় বসিয়ে দিলে, তবে হাতে রেখে, একেবারে ঘায়েল করলে তো কাজ আদায় হবে না, বললে—‘বেটা গোড়াতেই মিথ্যে!—শুনচি সে ইদিকে এয়েচে স্বয়ম্বরা হতে…বলে কিনা মাসিমা!’
খামোকা চড়ের শব্দটা হ’তে জ’টে পাল চমকে উঠল, গুলির নেশা পাতলা নেশা তো, বললে—‘আহা, মারধোর ক’রে কি হবে? এই আমি বুঝিয়ে বলচি—ঠিক ঠিক যা চাইচে বল না বাবা, বল্ লক্ষ্মীটি; ঐ তো ধ’রে ফেললে। স্বয়ম্বরা হ’তে এয়েচে, তাকে বলবি ওমুকের জ্যাঠাই কি ওমুকের মাসি, তারপর কোনদিন বলবি ওমুকের আই-মা তো ওমুকের ঠাকুমা-মানুষের একটা কাণ্ডজ্ঞান আচে তো? বিশ্বাস করে কি ক’রে বল্ না?…দময়ন্তী কার মাসি ছেল? ওর নাম কি, দ্রুপদী কার পিসি ছেল? একটা কথা বলে দিলেই তো হবে না; একটু ভেবেচিন্তে বলতে হয়।’
ছিরু ঘোষাল জিগ্যেস করলে’দেখতে কি রকম?’
সত্যি কথা বলে থাপ্পড় খেয়ে আর আমি ওধার দিয়ে গেলুম না দা’ঠাকুর, তাছাড়া সামনেই থাকুন কিম্বা দু’কোশ দূরেই থাকুন, ব্রেজঠাকরুনকেও খারাপ বলতে কেমন যেন সাহসেও কুলুল না, তবু একেবারে নয়কে হয় তো করা যায় না দা’ঠাকুর, মুখ দিয়ে বেরুবে কেন? বললুম—‘মন্দ নয়।’ আবার চড় উঁচিয়েছিল, না মেরে কানটা মুচড়ে দিয়ে বললে—‘মন্দ নয়! শালা মস্ত বড় সমঝদার, রেখে-ঢেকে ক্ষ্যামা ঘেন্না ক’রে বললেন–মন্দ নয়—ওঁর নজরে লাগে নি কিনা, অপ্সরা চাই।’
জ’টে পাল মাথায় হাত বুলিয়ে বললে— ‘ ঝেড়ে কাশ না বাবা, নুকিয়ে তো ফল নেই। কি রকম শক্ত ঘানি দেখছিসই তো; যা চাইচে বলে যা। ও খোঁজ না নিয়েই জিগ্যেস করচে? আচ্ছা আমিই জিগ্যেস করচি—তোর দিদিমণির চেয়ে সরেস কি নিরেস?’
বললুম— ‘সরেস।’
‘পথে আয়।…নাও এবার তুমিই জিগ্যেস করো। বলবে বৈকি বলবে; মণ্ডলের পো তেমন ছেলে নয়।’
ছিরু ঘোষালই জিগ্যেস করলে—‘স্বয়ম্বরা হতে এয়েচে?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘কি ধরনের স্বয়ম্বরা?’
আমি আবার জ’টে পালের দিকে চাইলুম, সে বললে—‘তার আবার রকমফের আচে তো। এক, ঢাক পিটিয়ে লোক ডেকে সভা ক’রে মালা হাতে নিয়ে ঢুকল, যাকে পছন্দ হোল মালাটা পরিয়ে দিলে; আর এক এখানে ওখানে কোনখানে দুজনে চোখাচোখি হয়ে গেল ঠিকঠাক হয়ে রইল, তারপর সভা হোক চাই না হোক, সেই এক কথা—বাকি সবাই আপসাতে আপসাতে চ’লে গেল, যার সঙ্গে মনের মিল সে গিয়ে ছাদনা তলায় ঠেলে উঠল।…এ কি করবে ঠিক করেছে?’
এমনি উত্তরটা দেওয়া শক্ত হোত দা’ঠাকুর, ভবে ঐ ‘ঢাক পিটিয়ে’ কথাটা কেমন যেন কানে খট্ করে লাগল, তাইতেই বুঝে গেলুম ওরা কি চায়, বললুম—‘না’ তানার যাকে পচন্দ হবে তাকেই বিয়ে করবে বলেচে।’
‘আমায় পচন্দ হবে?
একটা কথা মনে হ’তে আমি তাড়াতাড়ি ব’লে দিলুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, তা খুব হবে।…আপনি দিদিমণিকে ছেড়ে দেবেন?’
বললে—“তুই তো বললি তোর দিদিমণির চেয়ে এই বরং সরেস। আর ভশ্চায্যির মেয়েটা ভারি ফিচেলও। যেমনি ফিচেল তেমনি আবার দেমাকে।…তা আমায় যে এর পছন্দ হবে কি ক’রে জানলি তুই?’
দিদিমণি নিষ্কিতি পাবে ভেবে আমি বলেছিলুম দা’ঠাকুর, এদিকে পছন্দর তো ঐ রূপে কাত্তিক গুণে গণপতি, আমি আবার ঘাবড়ে গিয়ে জ’টে পালের দিকে চাইলুম।
জ’টে পিটপিট করে চেয়ে বললে- ‘নাঃ, শালা হাঁ-করা দিলেই চটিয়ে সকালের নেশাটুকু। তোকে যে কাল থেকে গোরু খোঁজা করচে তার একটা কারণ আচে তো, না অমনি? তুই গিয়ে তানাকে—বলবি রোজই তো, দেখচিস, আরও ভালো করে দেখে নে-মুখ, চোখ, নাক ভুরু, কপাল, চুল,—সব ভালো ক’রে দেখে নে, বলবি, বেশ ভালো ক’রে দেখে নে।’
ছিরু ঘোষাল আমার দিকে আধবোজা চোখে চেয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে টলতে লাগল দা’ঠাকুর, আমি ভয়ে ভয়ে অনেকক্ষণ ধরে একদিষ্টে চেয়ে দেখতে লাগলুম। সে এক ফ্যাসাদ দা’ঠাকুর, নেশাখোরের মরণ, ওরা তো বোধহয় ভুলেও গেছে কি জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা, চোখ ফেরায় না, তিনজনেই রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢুলচে, ইদিকে আমিও নড়তে পারচি না, ঠায় মুখের দিকে আচি চেয়ে। ঐ দিকটা আবার একটেরে একটু, মাঠের পানে তো, রাস্তা দিয়ে যদি একটা লোক যায় তো জিগ্যেস করতে পারে, তোদের ব্যাপার কি, এভাবে সব কাঠের পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে কেন?-তা কেউ নেই রাস্তায়—ইদিকে পহোর কেটে যাচ্ছে।
অনেকক্ষণ থেকে থেকে ছিরু কথা কইলে। গুলিখোরের মরণ, মাথায় যেটা সেঁস্তে গেচে সেটা তো তুলতে পারে না, বললে- ‘আমি খোদ পাত্তোর, নজ্জায় কিছু বলতে পারচি না, জটে তুই জিগ্যেস কর না শালা মণ্ডলের পো’কে, কেমন দেখলে কি বৃত্তান্ত।’
জ’টে পাল নেশাটাকে আগলে আগলে রাখছেল, আবার চমক ভেঙে পিটপিট ক’রে খানিক চেয়ে রইল আমার দিকে, তারপর জিগ্যেস করলে— ‘দেখলি খুঁটিয়ে পাত্তোরকে?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘গিয়ে বলতে পারবি গুচিয়ে?”
বললুম— ‘পারব।’
‘একটু লমুনো ছাড়, দেখি কি রকম বলবি।’
আমি তো আর নিকিয়ে পড়িয়ে মানুষ নয় দা’ঠাকুর, পুঁজি এ যাত্রা-অপেরা-কথকতায় যেটুকু শোনা। য্যাতটা মনে পড়ল-এর কতকটা ওর কতকটা নিয়ে খানিকটা তরতর ক’রে বলে গেলুম।—ছিরু ঘোষাল শুনে গিয়ে বললে—‘শালা রুক্মিণীহরণের দূতীর পাট আউড়ে গেল। ….তা বলিস যেমন তোর প্রাণ চায়; তবে য্যাখন একা একা থাকবে ত্যাখনই বলবি; মনে থাকবে?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, থাকবে।
‘আর ও কি বলে আমায় এসে বলবি।…আর এসা করে গুচিয়ে বলবি যে তার যেন মনে হয়…’
—নেশার ঝোঁকে সব কথা তো ওদের ঠিক মাথায় আসে না দা’ঠাকুর, রগদুটো টিপে ধ’রে ভাবচে, আমিই জুগিয়ে দিলুম—তাড়াতাড়ি নিস্কিতি পেতে হবে তো—বললুম— ‘মনে হবে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি—শীরাধিকের যেমন মনে হোত কেষ্টর রূপের কথা শুনে।’
পিটপিট ক’রে মুখের দিকে চেয়ে একটু হাসলে, আদর ক’রে কানটা একটু টেনে দিয়ে জ’টে পালকে বললে’শালাকে আর একটা দো-আনি বকশিশ কর।’
জ’টে পিরাণের পকেটে হাত ঢুকিয়ে খালি হাতটাই বের করলে। তারপর আমার হাতের ওপর মুঠোটা খুলে বললে—‘দো-আনি কেন, আর একটা সিকিই নে। দেখে নে ভালো ক’রে, ঠিক আচে তো?’
আমি খালি হাতের তেলোর দিকে চেয়ে বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক আচে।
‘যা নেমে প’ড়গে; দু’হাত এক হয়ে গেলে ত্যাখন জোড়া ট্যাকা পাবি; যা।’
আমি খানিকটে এগিয়ে গেচি, ছিরু ঘোষাল আবার ডাকলে— ‘এই শুনে যা।’
কাঁটালের আটা তো, ছেড়েও ছাড়ে না; আমি ফিরে এসে দাঁড়াতে বললে—‘শালা মণ্ডলের পো সিকি জোড়া ট্যাকে ক’রে ছুটল!…বলবি তো সব গুচিয়ে, তারপর সে য্যাখন দেখতে চাইবে? লব্ যে হবে, একবার দেখবে তবে তো। তা দেখাটা হবে কোথায় দু’জনের?’
ব’লে ফেললুম’জোড়া-বকুলতলায়।’
গ্যাঁজা টেপা হাতে একটা চড় যা উঁচিয়ে ছেল যদি ঝাড়তে পারত তো আজ আর এখানে ব’সে আপনাকে গল্প শোনাতে হোত না দা’ঠাকুর। তা ওর দোষ দেবোই বা কেমন ক’রে বলুন- জোড়া বকুলতলা সে হোল সরস্বতী নদীর তীরে মসনের শ্মশান। তা আমায়ই বা কেমন ক’রে দুষবেন বলুন না? আমার যা কিছু পুঁজি তা তো ঐ যাত্রা অপেরা থেকে, তা কদমতলা কি তমালতলা তো আর খুঁজে পেলুম না গাঁয়ে, অত ভাববারও সময় ছেল না, আমার মুখ দে খপ্ ক’রে বেরিয়ে গেল—জোড়া-বকুলতলা। সেই চোয়াড়ে হাতের একটি চড়ে সাবড়ে ফেলেছেন, জ’টে হাতটা ধ’রে ফেলে ফাঁড়াটা কাট্যে দিলে, উদিকে তারও মাগ্যির নেশাটুকু বরবাদ হয়ে যাচ্চে কিনা; বললে— ‘দেখা তোমাদের কোথায় হবে না হয় সেই ঠিক ক’রে বলে পাঠাবে’খন। স্বয়ম্বরা হ’তে যাচ্চে আর ওটুকু পারবে না? ওকে বরং ছেড়ে দ্যাও; তাড়াতাড়ি গিয়ে পড়ুক; কন্যে যেমন সুন্দরী শোনা যাচ্ছে, আরও যারা আচে, বসে থাকবে না তো।’
