কাঞ্চন-মূল্য – ৪
৪
নাতি তামাক সেজে এনেছিল, স্বরূপ হাতটা বাড়িয়ে বললে—‘আমায়ই দে আগে, দা’ঠাকুর পারবে না ধরাতে; খাস ফৌজদুরি বালাখানার জিনিস তো।’
কয়েকটা টান দিয়েই কলকেটা আমার হুঁকোর মাথায় বসিয়ে দিয়ে বললে— ‘সে আর কত বলব দা’ঠাকুর—, সেদিনকার পালা তো ঐ ক’রে শেষ হোল। তার পরদিন সকাল সকাল গোরুটরু বেঁধে দিদিমণির সঙ্গে আরও খানিকটা সলা-পরামর্শ করে, বেশ গা-ঢাকা হ’তে নিশ্চিন্দি হয়ে মিত্তিরদের মজাপুকুরের ঘাটে গিয়ে উপস্থিত হলুম। ওটা তো কেউ সরে না, দিব্যি নিরিবিলি, দেখি শুধু একা বাবাঠাকুর শানের ওপর চুপটি ক’রে ব’সে আচে। জিগোলে—‘কি রে, যেমন যেমন বলে দিয়েছিলুম বলেচিস তো?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, খুব কান্নাকাটি করলে দু’জনে, এখন দিদিমণি অনেকটা সামলেচে।’
বাবাঠাকুর পিরাণের পকেট থেকে আরো পাঁচটা ট্যাকা বের ক’রে আমার হাতে দিলে, বললে—‘যেমন-তেমন করে সেরে নিতে বলবি ছেরাদ্দটা, বারোটার স্থানে পাঁচটি বামন খাইয়েই; সত্যি সত্যি তো মরি নি যে প্রেতলোকে ব্যাঘাত হবে।
ট্যাকা কটা হাতে নিয়ে বললুম— ‘কিন্তু একটি ছেরাদ্দর খরচে তো হবে না। ওবিশ্যি এটা চুকে গেলে ও খরচটা পরে দিলেও হবে।
এখনও যেন দেখতে পাচ্চি চোখের সামনে, বাবাঠাকুর একেবারে অবাক হয়ে মুখের দিকে চেয়ে রইল, একটু সাড় হলে জিগ্যেস করলে — ‘কেন রে, একটা ছেরাদ্দর খরচ মানে?’
বললুম—সেই কথাই তো বলতে যাচ্ছিলুম। দিদিমণি তো সামলেচে, বললে—যাই হোক বাবা বুদ্ধি করে আমার হিল্লেটা করে গেছে; কিন্তু মাসিমাকে তো আটকে রাখা যাচ্ছে না, তিনি বললে তার জন্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে এয়েচি, এখানে পেলুম না, অপঘাতে মরে পেত্নী হয়ে সেখানে গিয়ে বিধবা-বিয়ে করব তাকে। কাল পাড়ায় পাঁচজনে এসে ধরে-টরে রেখেছিল, আজ যে কী হয় কেউ বলতে পারচে না।’
সেয়ানা মেয়ে দিদিঠাকরুন, সে কত আর বলব আপনাকে?—ঐ ব’লেক’য়ে তো চলে এলুম, আবার কাল আসব বলে, ঠাকুরমশাইও গুম হয়ে ঘাটে রইল বসে, তারপর বেশি দেরি নয়, ঘণ্টাখানেক পরে সদরদোরে কড়া নাড়ার শব্দ। দরজাটাতে ইচ্ছে করেই খিল দে রেখেছেল দিদিমণি, দুষ্টু তো? যা যা হবে আগে থাকতে বলেও রেখেছেল আমায়। খিল এঁটে দাওয়ায় বসে রান্না করচে, আমি সিঁড়িতে বসে, উদিকে ব্রেজঠাকরুন ঘরের মধ্যে জপ করচেন। কড়া নেড়েই যাচ্চে, এদিকে হাঁটু দুটোয় মুখ গুঁজে হেসে নুটপুট খেয়ে পড়চে দিদিমণি। কড়ানাড়ায় যখন হোল না, বাবাঠাকুর হাঁক পাড়লে— ‘আমি গো নেত্য! কপাট খুলে দে!’
সব মহলা দেওয়াই ছেল, আমি উঠেচি, দিদিমণি একটু চাপা গলাতেই শুনিয়ে শুনিয়ে বললে— ‘খবরদার খুলবি নি স্বরূপ, নিশিতে ডাকচে! তিনবার ডাকুক আগে।’
ইদিকে চাপা হাসিতে নুটিয়ে নুটিয়ে পড়চে। বাবাঠাকুর তিনবারের জায়গায় একেবারে গড়িয়ে এতখানিটে বলে গেল—‘ওরে নেত্য, খোল দোরটা মা…শুনচিস? আমি এয়েচি, অ নেত্য-আমি রে, তোর বাবা! স্বরূপ খোল দোরটা শিগগির।’
ঘর থেকে ব্রেজঠাকরুনও ধমক দে উঠল—- তোরা কানের মাথা খেয়েচিস? বাইরে অনাদি যে ডাকাতপড়া করছে উদিকে?’
