কাঞ্চন-মূল্য – ৭
৭
আমি জিগ্যেস করলাম—‘আর কোন কথা জিগ্যেস করলে না?’
স্বরূপ বললে—‘আজ্ঞে না, রাম কি গঙ্গা—আর কোন কথাই নয়। সে সব কথা আর একদিন তুললে, তাও একেবারে যে হাঁড়ির খবর নেওয়া তা নয়।’
প্রশ্ন করলাম—‘কি ধরনের কথা?’
স্বরূপ বললে—দেখি, একটু পেসাদ পাই।’
হুঁকোটা কাৎ ক’রে দিতে কলকেটা তুলে নিয়ে কয়েক টান দিয়ে নিলে স্বরূপ, তারপর যথাপদ্ধতি বাঁ হাতে ডান হাতটা স্পর্শ করে সেটা বসিয়ে দিয়ে বললে- ‘সে আর এক দিনের কথা দা’ঠাকুর। ইতিমধ্যে বাবাঠাকুর বার দুই গেল ওনার ওখানে। কথাবার্তা কি হয় তা ভগবানই জানেন, তবে চৌধুরীমশাইয়ের বিধবা-বিবাহের কথাটা এমন রটে গেচে গাঁয়ে যে বাবাঠাকুরকে ডেকে তারই ব্যবস্থা হচ্চে ভেতরে এই ধরনের একটা কানাকানিও হ’তে লাগল। দিদিমণিও একদিন আমায় তাই বললে দা’ঠাকুর; বললে—‘বাবা দু’বার ছ’আনি তরফের বাড়ি গেল স্বরূপ, তা কি কথা হোল না হোল আমায় একটুও বললে না; মা মারা যাওয়া অবধি কোন কথাই তো ছাপিয়ে রাখে না আমার কাছ থেকে। তা আমার কাছে নুকোনো সোজা নয়, দেখিস আমি যা আন্দাজ করেচি তা যদি না ফলে তো কি বলেচি —-আমার আন্দাজ কখনও মিথ্যে হয় না।’
জিগ্যেস করলুম— ‘কি আন্দাজ করেছ তুমি?’
‘ছ’আনি ঠিক নিজের বিধবা বিয়ের ব্যবস্থা করচে ভেতরে ভেতরে; যদি ক’নেও নিয়ে এসে দেউড়িতে নুকিয়ে রেখে থাকে তো আশ্চয্য হব না।’
বললুম—‘ভালোই তো।
দিদিমণি একটু নাক সিঁটকেই বললে—‘চুপ কর ছোঁড়া। বলে, রাজায় রাজায় ঝগড়া, উলুখড়ের প্রাণ যায়। ছোটখাটো ব্যাপারেই দেখলি তো বাড়ি চড়াও হয়ে আগুন দিতে এল দল বেঁধে। নাচিয়ে দেয় সবাই, কৈ ত্যাখন তো কেউ পাশে এসে দাঁড়াল না। গাঁয়ের জমিদার! উঃ, রাজা ক’রে দেবে!’
বললুম—উনি ছেল না গাঁয়ে, সিদিনকে বললে না?—এই যে সিদিন এয়েচেল।’
একটু যেন চুপ করে রইল দিদিমণি, তারপর আবার সেইরকম ভাবেই বললে—‘থাকলেই সব করত! নে, ঢের দেখা আচে।’
তারপর যেমন কথার মাঝেই এক একবার হেসে ওঠে তো, সেইভাবে হেসে ব’লে উঠল—তা অনাদি ভশচায্যি কারুর দেখাশোনার তোয়াক্কাও করে না। যা কম্যান্ডার-ইনচি শালী আচে বাড়িতে, সমস্ত গাঁ সদ্যু উঠে আসুক না, একাই সবার মোয়াড়া নেবে!
আমার কিন্তু নোকটিকে বড় ভালো নেগেছিল, দা’ঠাকুর-ঐ চৌধুরী মশাইয়ের কথা বলচি। সিদিন অতক্ষণ ধ’রে অমন হেসে কথা কইলে—অতবড় মানুষটা — খানিকটা বত্তেও গিয়েছিলুম তো। দিদিমণির মেজাজটা ওরকম বিগড়ে রয়েচে ওনার ওপর, বেশ স্বস্তি পাচ্ছিলুম না, অথচ ওনার হয়ে দুটো কথা বলতেও পারচিনি, দিদিমণি হেসে উঠতে খানিকটে ভরসা পেয়ে বললুম–’না, তা এবার তেমন কিছু হলে ব’সে থাকবে না, রয়েচে তো এখেনে—খোঁজ নিচ্ছে।’
দিদিমণি একটু যেন তৎপর হয়েই জিগ্যেস করলে— ‘নেয় খোঁজ?’
তা কে জানে বলুন দা’ঠাকুর, খোঁজ নেয় কি না নেয়, বড়মানুষের কাণ্ড, আর তো ঘুরেও একদিন এল না ইদিকে; তবে দিদিমণির ও ভাবটা যেন গেচে দেখে আমার মনে হোল, একটা মিথ্যে কথাই জুড়ে দিলুম, বললুম- ‘তা নেয় না? এই তো আমারই বলেছেল সিদিন—মাঝে মাঝে খবর নিয়ে যাবি, কেমন থাকে না থাকে, তা… ‘
দিদিমণি আবার হেসে উঠল, বলে— ‘তা যা এক বশিষ্ট মুনির কামধেনু নিয়ে পড়েছি!’
তারপর তখুনি আবার ভারিক্কে হয়ে উঠে বললে—তা বড়নোকের সঙ্গে মেলা দহরম-মহরম ভালো নয়।…তবে নেহাত বলেচে, কোন সময় দায় খালাস হওয়া গোছের একবার না হয় হয়ে আসিস; নৈলে আবার ভাববে- দেখেচ, ন্যায়রত্ন মশায়ের রাখাল ছোঁড়াটারও কী দেমাক! একে দেমাকী ব’লে বাবার তো গাঁয়ে আচেই একটা বদনাম। তবে ঐ উড়ো উড়ো খবর একটা দিয়ে দিবি, যদি ওপর-পড়া হয়ে জিগ্যেস করে তো-আজ্ঞে হ্যাঁ, ভালোই সব, আপনার আশ্রিত, ভালো থাকবে না তো কি? -এইরকম। খবরদার, ঘরের কোন খবর দিবিনি—কি খায়, কেমন ক’রে চলে-খবরদার এসব নিয়ে একটি কথাও নয়!’
আবার হেসে উঠে বললে—‘তুই এক কাজ করিস না তার চেয়ে, মাসিমার কাহিনীটাই ব’লে যাস না, সেই তো একখানা মহাভারত, শুনে কুলিয়ে উঠতে পারবেন না রায়চৌধুরীর বাছা। খবরের কথাই যদি, তো অমন জবর খবর পাবেনই বা কোথায় আর সারা মসনেতে?’
একবার নয় দা’ঠাকুর, কয়েকবারই গেলাম এরপর ওঁদের দক্ষিণপাড়ার দিকে। প্রতিদিনই লখনার হাতে গোরুটা ছেড়ে চলে যাই; দেউড়ির ইদিক-উদিক ঘুরে বেড়াই, কিন্তু ভেতরে যেতে সাহস হবে কেন? এখেনে একলা, ডেকে অত কথা কইলে, সে এক দেবনারাণ, ওখানে দেউড়িতে পশ্চিমে দারোয়ান, যখনই দেখা হয় পেতলবাঁধা লাঠি নিয়ে সিং-দরজায় বসে আচে, না হয় সিদ্ধি ঘুঁটচে, না হয় আটার তাল ঠাসচে; আস্তাবলে গাড়িঘোড়া, কানে কলম গুঁজে মুনসী-পাটোয়ারিরা যাওয়া-আসা করচে, সেখানে একবারেই অন্য দেবনারাণ তো। তারপর নজরেও তো পড়ে না, বাড়ির কোথায় আচে, কি করচে; নজরে পড়ে না ব’লে মনে হচ্চে যেন আরও কত না পেল্লায় মানুষটা, ঘেঁষব কোন্ সাহসে? আর কোন্ দিক দিয়েই বা ঘেঁষব বলুন না, ঐ তো শুনলেন! যাই, ঘুরেফিরে বেড়াই, গোরু গৈলে তোলবার সময় হ’লে ফিরে আসি, কিছুই হয় না।
একদিন দিদিমণি জিগ্যেসও করলে—‘তুই ছ’আনির দেউড়ির দিকে গিয়েছিলি নাকি রে স্বরূপ?’
বললুম— ‘কৈ আর গেলুম?’
দিদিমণি বললে—‘বলছিলুম কাজ নেই গিয়ে না হয়। কি হবে কতকগুলো মিচে কথা বলে—ভালো আচে, সুখে আচে, হ্যানো ত্যানো? তারপর জমিদার মানুষ, যদি জেরা করে বের ক’রে নিলে, অভাবের সংসার তো সে বড় নজ্জার কথা।’
কি ভেবে বললে কথাটা দিদিমণি তা বলতে পারি নে, তবে আমার তখন কেমন একটা ঝোঁক ধরে গেছে, প্রিতিদিনই যাই একবার ক’রে। ওবিশ্যি দেউড়ি পেরিয়ে দেখা করবার খেয়ালটা প্রেথম দিনই কেটে গেচে—ঐ যদি পথে-ঘাটে কোনরকমে দেখা হয়ে যায়, সিদিন যেমন হয়েছেল,—তারপর ডেকে জিগ্যেস করে দুটো কথা। ছেলেমানুষের মন, কেমন যে একটা লোভ ধরিয়ে দিয়েছেল সিদিন, যেন টেনে টেনে নিয়ে যেত। দু’দিন যায়, দশদিন যায়, কিছুই হয় না, তারপর একদিন আমার মাথায় হঠাৎ একটা খেয়াল উঠল, আর বলতে নেই, তাইতেই যেন মোনোস্কামনা পুন্ন করে দিলেন ঠাকুর।
ঠাকুরটি ওবিশ্যি ঐ নতুন দেউলের ঠাকুর, আপনার গিয়ে বিভীষণ। বুঝলেন না কথাটা? —ওলাওঠা হলে রক্ষেকালী; মায়ের দয়া হ’লে শেতলা; বাঁজা, ছেলেপুলে হচ্ছে না, ত্যাখন গিয়ে মা ষষ্ঠী; তাহলে বিধবা-বিয়ের চাঁইদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে না, ত্যাখন বিধবা-বিয়ের ঠাকুরের কাছে মাথা-মুড় খুঁড়তে হবে না? দেওড়ির বাইরে একটা বড় পুষ্করিণী, তার ওপরই দেউড়ির উল্টো দিকে মন্দিরটা। রোজ একবার ক’রে মাথা ঠেকিয়ে আসতে লাগলুম—একবার দেখা করিয়ে দাও ঠাকুর।
যিদিনকার কথা সিদিন একটু সন্দে হয়ে গেচে, প্রেণামটা সেরে সিঁড়ি দে নামচি, ঘোড়ায় চ’ড়ে চৌধুরীমশাই উপস্থিত। আজ একটা সাদা ঘোড়া। এর পরেও দেখেচি, ঘোড়ায় চড়ে বেরুলে তানার সঙ্গে লোক থাকত না। তালিম দেওয়া ওয়েলার ঘোড়া, লাগামটা কাঁধে জড়িয়ে নেবে আসতে থির হয়ে যেখানকার সেখানে দাঁড়িয়ে রইল।
উনি জুতো জোড়া খুলে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবে, মুখপাতেই আমায় দেখতে পেলে। প্রেথমেই একটা খটকা নেগে থাকবে নিশ্চয়; বুঝলেন না? -এসব মন্দিরে আর আমাদের মতন ছেলেছোকরার যাতায়াত থাকবার কথা নয় তো। তাইতেই যেন ঠাহর ক’রে দেখলে একটু, তারপর জিগ্যেস করলে–’তোকে যেন কোথায় দেখেচি এর আগে?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, সিদিন ঠাকুরমশায়ের বাড়ি যেতে।’
একটু হেসে বললে—‘ও! সেই পণ্ডিতমশাইয়ের নফর! তা—দাঁড়া, যাবিনি।’
প্রণাম ক’রে এসে জিগ্যেস করলে—‘সিদিন তোর নামটা কি বললি যেন?’ বললুম—‘স্বরূপ।’
‘হ্যাঁ, স্বরূপই তো বললি। তা তুই হঠাৎ এ মন্দিরে যে?—এতদূর থেকে?
মোটেই হচ্ছেল না, তারপর হোল দেখা তো একেবারে খাস জায়গায়-মস্ত বড় একটা সৈভাগ্যি তো, আমি বললুম—‘রোজ আসি পেন্নাম করতে।’
‘কেন? বিয়ে হয়েচে?’
আমাদের তো সেই ছেলেবেলায় এ কাজটা সেরে রাখে, সেকালে আরও ছেলেবেলায় সেরে রাখত, বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, তা হয়ে গেচে।’
‘তবে? এ তো বিধবা-বিয়ের ঠাকুর। তুই করবি নাকি—অন্য একটা দেখে?’
কি করব না করব সে পরের কথা, ত্যাখন তো মন যোগাবার দিকেই ঝোঁক, এমন সুযোগটা হাতে এসে পড়েছে, বললুম –’থাকলে করতুম একটা।’
‘থাকবে না কেন? সে ভার আমার। তাহ’লে কিন্তু যেটা রয়েচে তার কি হবে?”
মুখ নিচু ক’রে চেয়ে আচে। একে অত হিসাব করে কথা বলবার বয়েস নয়, তার ওপর দুদিক থেকে খুশি করবার জন্যে মনটা মেতে উঠেচে তখন—বললুম—‘সেও না হয় বিধবা-বিয়ে করবে’খন।’
হো হো করে হেসে উঠল চৌধুরীমশাই। বললে—‘আয়, চল তুই আমার সঙ্গে।’
গাঁয়ের দিকটা বাদ দিয়ে আমরা মাঠের পথ ধরলুম; উনি ঘোড়ার ওপর, আমি খানিকটে ব্যবধান রেখে পাশে পাশে চলেচি, আজ্ঞে, ঘোড়া নয় তো, একখানি চাঁট ঝাড়লে ঐ দিকে সদ্য বিধবাবিয়ের ব্যবস্থা তো? এগুতে খানিকটে একথা ও কথা হয়ে যাবার পর উনিই আমাদের বাড়ির কথাটা পাড়লে, ব্রেজঠাকরুনের কথা। ‘তোদের সেই যে ব্রেজঠাকরুনের নাম বললি না, সেই পণ্ডিতমশাইয়ের শালী—তানার খবর কি?’
বললুম— ‘ভালোই।’
‘ঝগড়াঝাঁটি?—সেইরকম জোর চলচে তো?’
বললুম—‘আজ্ঞে না, ওরা সেই যে প্রেথম দিন নমুনাটা দেখলে তারপর আর কেউ ঘেঁষল না তো। তারপর মেয়ের মেয়েয় অবিশ্যি বাধতো, উনি য্যাখন গঙ্গাস্নান করতে যেত-রাখালের মা, দামোদর ঠাকুরের পিসি, সৈরভী বাগদিনী—এদের সাথে, তা এরা তো এঁটে উঠতে পারল না, রিজাইন দেচে সব।’
একটু যেন সামলে আমার দিকে চেয়ে, জিগ্যেস করলে—‘তাহলে এখন ঘরে ঘরেই? —পণ্ডিতমশাই তো আবার ভালোমানুষ…’
কথাটা শেষ না ক’রেই লাগামটা হঠাৎ টেনে ঘোড়াটাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ওপর দিকে চেয়ে কি যেন একটু ভাবলে, তারপর বললে—‘এদিকে তো ঝগড়াটে বললি, কাজের দিকে কেমন বল দিকিন? আচ্ছা, আগে যা জিগ্যেস করছিলুম তারই উত্তুরটা দে-বাড়ির নোকের সঙ্গে ব্যাভারটা কি রকম? —বাইরে তো ঐরকম ঝগড়াটে।’
বললুম—‘খুব ভালো—বাবাঠাকুরকে, দিদিমণিকে খুব ভালবাসে।’
একটু হেসে বললে—‘বাবাঠাকুরকে তো বিয়েই করবে বলেচে।… দিদিমণি হোল? …’
বললুম—‘বাবাঠাকুরের মেয়ে, সেই সিদিন যিনি আপনাকে দেখতে অমন করে ছুট্টে বেরিয়ে এল না?’
মন যুগিয়ে কথা বলাই তো দা’ঠাকুর, দিদিমণি যে সিদিন অবরুদ্ধ হয়ে প’ড়ে আমায় খালি মারতে বাকি রাখলে, সেটা না বলে একটু উল্টে দিয়েই বললুম—যেন কতই না কেতাত্ত হয়ে গেছল। একটু চুপ করে ভেবে বললে- ‘ও! ঠাকুরমশায়ের মেয়ে? আবার কার কাচে যেন—শুনছিলুম, নিজের একটি বিধবা ভাসুরঝি না কাকে নিয়ে এয়েচে বিয়ে দেবার জন্যে।’
বললুম—‘না, আর কাউকে আনে নি তো। একাই এয়েচে।’
‘ও, তাহলে ওটি ঠাকুরমশাইয়ের মেয়ে ছেল?’
বললুম—‘হ্যাঁ, নেত্যঠাকরুন।’
দিদিমণিকে বড়ই ভালোবাসতুম তো দা’ঠাকুর। কি কি বলেছিলুম এখন ঠিক ঠিক মনে নেই, তবে নামের সঙ্গে আরও কিছু কিছু গুণের কথাও জুড়ে দিয়েছিলুম—আপনার থেকেই য্যাখন কথাটা উঠল—কত কাজের, কত হাসিখুশি—এই ধরনের কথা সব। গাঁয়ের রাজা তায় এই পক্ষেরই—য্যাতটা শুনে রাখে ভালো নয়?-এই আর কি। আমি বলে যাচ্চি, উনি শুনছেল কি শুনছেল না ভগবানই জানেন, হঠাৎ বললে-তোদের ব্রেজঠাকরুনের কথা যা জিগ্যেস করছিলুম। বাড়ির লোকেদের না হয় ভালোবাসে—তারা তো নিজেরই, চাকর বাকর এদের সাথে কিরকম ব্যাভার? কে কে তোরা আচিস অপণ্ডিতমশাইয়ের বাড়ি? ধর্ বাড়ি? ধর্, যদি কারুর বাড়ি গিয়ে ওঠে ব্রেজঠাকরুন তো নোক-নস্করের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারবে?’
আসল কথাটা অনেক পরে টের পাই দা’ঠাকুর; আপনার গিয়ে য্যাখন সব মিটেমাটে গেল—তার অনেক পরে। আসল কথাটা ছেল, চৌধুরীমশাইয়ের সংসার উদিকে অচল হয়ে পড়েছেল। উনি য্যাখন খুড়োর থেকে প্রেথক হয় ত্যাখন ওনার এক পিসিও ওনার তরফে চ’লে আসেন। খুব ডাঁটো মেয়েমানুষ, উনিই অন্দরমহলটা চালাতেন, ভাইপো ইদিকে নিজের খেয়ালখুশি নিয়ে থাকত। ছিলেন ঐদিকে অনেকদিন। কেউ বলে ভাইপোর টানেই উদিক থেকে চলে এসেছিলেন ভাইকে ছেড়ে, কেউ আবার বলে, ভাইবোনে পরামর্শ ক’রেই ভেন্ন হবার ব্যবস্থাটা করেন, যদি সঙ্গে থেকে ভাইপোর মতিগতিটা বদলাতে পারেন শেষ অবধি। আর কাঁচা বয়েস ভাইপোর, একজন মাথার ওপর থাকাও দরকার তো। তিনি ছেল এতদিন, তারপর ইদিকে এসে কি হয় না হয় ভগবান জানেন, তিনি ভাইয়ের বাড়িও ফিরে গেল না, ভাইপোর বাড়িও রইল না, একেবারে গিয়ে কাশীবাসী হ’ল।
পিসি কাশীবাসী হ’তে ইদিককার ব্যবস্থা সব যেন ওলটপালট হয়ে গেল; চাকর- ঠাকুর-খানসামা নিয়ে তো আর অন্দরমহল চলে না। ওখানে একজন বেশ ডাঁটো স্ত্রীলোক দরকার যে কড়াহাতে রাশ ধ’রে চারিদিকটা গুছিয়ে গাছিয়ে রাখবে। দেখলে ব্রেজঠাকরুন কড়া মেয়েমানুষ, ইদিকে বামুনের ঘরের বিধবা, তাই খতিয়ে দেখছিল যদি এনে ইন্-চার্জ ক’রে রাখা যায় দেউড়ির মধ্যে। ভেতরকার কথাটা এই যা পরে টের পেলাম। ত্যাখন সদ্য সদ্য কিন্তু আমার অন্যরকম মনে হোল। বিধবা বিয়ের খদ্দের তো, তাতে চাঁই, ভাবলুম হয় না হয় নিজেই বোধ হয় বিয়ে করতে চাইচে। বাবাঠাকুরের ঘাড় থেকে যদি নামিয়ে দিতে পারি, সে এক মস্তবড় কাজ হয় তো, আমি একেবারে লেগে পড়লুম। বললুম—‘তাদের সঙ্গে ব্যাভার আরও ভালো। চাকরবাকরের মধ্যে আচি আমি, বাবা, অর্জুন দাস, নাজেরপাড়ার মনোহর কাকা—আরও অনেকের নাম ক’রে দিয়েছিলুম দা’ঠাকুর, যারা বাবাঠাকুরের একটুও অনুগত ছেল, কাজ-কর্মে এসে কখনও দাঁড়িয়েচে, পোঁটলাটা মাথায় করে শিষ্যিবাড়ি গেচে; সাত-আটজনের নাম করে দিলুম একেবারে। এর পরেও যা কথা হোল তাতে ভুলটা তো ভাঙলই না, বরং আরও জেঁকে ব’সে গেল মনে। চৌধুরীমশাই সবটুকু শুনে মনে হোল যেন একটু হাসলে। সন্দো আমার, তবে সত্যিও হ’তে পারে দা’ঠাকুর। ঠাকুরমশায়ের অবস্থাটা মোটামুটি জানা আছে, একেবারে – চাকর-বাকরে জাজ্জ্বল্যমান সংসার করে যে দাঁড় করালুম—একটা দশবছরের চ্যাংড়া—তা জমিদার ঘরের ছেলে হয়ে তিনি তার ভাঁওতায় ভোলে কি করে? মিথ্যে সন্দো নয়, হেসেই থাকবে, তবে তারপরেও যা কথা হোল তাতে ত্যাখনকার মতন আমার সন্দোটা লেগেই রইল কিনা!
জিগোলো—‘সবাইয়ের সঙ্গে তাহলে ভালো ব্যাভার বললি? বয়েস আমার মতনই বললি না সিদিনকে?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ।…বরং একটু কমই হবে।’
—কথাটা বুঝলেন না দা’ঠাকুর? কনের মুখ দেখতে তো সেই শুভদিষ্টির সময়, ত্যাতক্ষণ ব্রেজঠাকরুন তো সাতপাকে জড়িয়ে ফেলেচে মাকড়শার জালের মতন। আরও খানিকটা লোভ দেখিয়ে দিয়ে বললুম—‘আজ্ঞে, বরং দু’এক বছর কমই হবে।’
‘শরীর কেমন?’
একটু বিলম্ব হোল উত্তর দিতে; মাথায় কেষ্টচুড়ো বাঁধা সেই দশাসই লাশখানা তো মনে জেঁকে রয়েছে; অল্প একটু বিলম্ব হ’ল, তারপর বললুম— ‘খুব সুন্দর।’
যেরকম কথা চলছিল তাতে শরীলের অর্থ তো বিয়ের শরীল? বললুম—‘খুব সুন্দর।’ বললে—জিগ্যেস করছিলুম—খাটতে-খুটতে পারে কেমন? গায়ে শক্তি আছে?’ একটু তো উত্তুরটায় গোলমাল হয়ে গেছে, ভুলটা ভালো ক’রে সুদরে নেওয়ার জন্য আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—“তা বেশ পালোয়ান।’
এবার একটু জোরেই হেসে উঠল দা’ঠাকুর; কত আর চাপতে পারে নোক ক’ন্ না?
খানিকটে আবার চুপ করেই এগিয়ে চললুম আমরা। উনি কি চিন্তা করচে, আমি ভাবচি, এটুকু আবার কি করে সামলে নেওয়া যায়। খানিকটে গিয়ে উনি আবার আমার দিকে চেয়ে বললে—‘থাক, তুই এক কাজ করবি,—পণ্ডিতমশাইকে একবার পাঠিয়ে দিবি আমার কাচে, পারবি তো?’
বললুম—‘আজ্ঞে, তা পারব না কেন?…তবে তিনি কি যাবে…?’
উনি ঘোড়াটা আবার থামিয়ে ফেলে আমার দিকে ফিরে চাইলে, জিগ্যেস করলে-
‘আসবেন না? আসবেন না কেন?
কেন ও ধরণের কথাগুলো ফস্ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে দা’ঠাকুর, আপনারা নেকাপড়া জানা নোক আপনারা হয়তো বলতে পারবেন। আমরা মুখ্যু মানুষ, অতশত তো বুঝিনে। হয়তো মনে হল, ঠাকুরমশাইয়ের একটু নিন্দে শুনলে উনি খুশি হবে, হয়তো অন্য কিছু—মোদ্দা কথা, আমার সেই দিদিমণির কথাটা অকস্মাৎ মনে পড়ে গেল, মুখ দিয়ে ফস্ ক’রে বেরিয়ে গেল—‘উনি আবার একটু দেমাকে কিনা।’
চুপ ক’রে একভাবে দাঁড়িয়ে রইল চৌধুরীমশাই। বেশ খানিকটে দা’ঠাকুর, ঠায় আমার দিকে চেয়ে, তবে মনটা যেন অন্যদিকে, তারপর আস্তে আস্তে বললে—‘উনি একটু দেমাকী, না?’
বললুম—‘আজ্ঞে, হ্যাঁ।’
আরও একটু ভাবলে, তারপর বললে— ‘তাহলে ব’লে কাজ নেই তাঁকে, আমিই আসব’খন একদিন।…এখন আচেন কি? সিদিন তো ছিলেন না।’ ..
আহ্লাদে আমার বুকটা তখন ধড়াস ধড়াস করচে দা’ঠাকুর, নিয়ে তো যাই একবার। বললুম— ‘আজ তিনি বেরুবেন না বলেছিলেন।’
মাঠে মাঠে আমাদের পাড়ার দিকেই এসে পড়েছিলুম, উনি একবার চাইলেও চোখ তুলে, তারপর বললে— ‘আজ আর থাক্ অন্য একদিন আসব তখন।’
চৌধুরীমশাই ফিরে যেতে আমি মাঠ ছেড়ে পাড়ার মধ্যে সেঁদিয়ে পড়লুম। ভাবতে ভাবতে যাচ্চি দক্ষিণপাড়ায় তো যেতে বারণ ক’রে দেছল দিদিমণি, তাহলে বিলম্বের জন্যে জবাবদিহিটা কি দোব, এমন সময় পড়বি তো পড় একেবারে ছিরু ঘোষালের সামনে। বোধ হয় নিধু সাঁবুইয়ের আড্ডা থেকে আসছেল, সঙ্গে জ’টে পান আর নিধু সাঁবুইয়ের ভাই বিন্দাবন। ছিরু ঘোষাল অতটা খেয়াল করেনি, সদ্য আড্ডা থেকে বেরিয়েচে, বোধ হয় চোখ বুজেই চলছেল, তবে জটে দেখে ফেললে, বললে- ‘শালা মণ্ডলের পো না? ইদিকে আয় তো, চেহারাটা একবার দেখি।’
পালাতে পারতুম, নেশায় সবার পা টলচে তো, কিন্তু কেমন সাহস হোল না, শুনি সাপের সামনে পাখিটাখি পড়লেও নাকি ঐরকমটা হয়ে যায় দা’ঠাকুর; দাঁড়িয়ে পড়লুম। তিনজনে এগিয়ে এল, ও আসে আগে, তার পেছনে ছিরু, তার পেছনে বিন্দাবন।
জ’টেই বললে—‘দাঁড়া তোর চেহারাটা একবার দেখি; কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছিলি এতদিন—এই বছর খানেক ধ’রে?’
বললুম— ‘বছর খানেক তো হয়নি এখনও…
দেখা না করতে পারার কারণও বানিয়ে ব’লতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু তা শুনচেটা কে? কানটায় বেশ একটা নাড়া দিয়ে বললে— ‘দোষ ক’রে আবার মুখের ওপর চোপরা—এক বছর তো হয়নি এখনও!…শালাকে বলা হোল পাত্তোরের রূপের কথা কন্যেকে বলে সদ্য সদ্য এসে রিপোট দিবি—তা এক বছর সম্পূণ্য না হলে ওঁর সময় হবে না!’
সেদিন ছিরুই একটু নরম ছেল। নেশার তারতম্যে মেজাজ একটু উঁচু নিচু থাকত তো, -ভগবানের ওটুকু দয়া না হ’লে, যে মারা পড়তে হোত দা’ঠাকুর; সেদিন ছিরুই যেন একটু বেশি বেশি ঝিমিয়ে ছেল, ওর হাতটা টেনে নেবার চেষ্টা ক’রে বললে—‘মেরে কাজ নেই, দূত আবার অবোধ্য তো; বছরখানেকের অর্থটা ওকে বুঝিয়ে বল্ না—এই একটা লোক সেই থেকে যে হা-পিত্যেশ ক’রে ব’সে রয়েচে—দিন যায় তো ক্ষ্যাণ যায় না—বছরখানেক আর কাকে বলে?’
জ’টে বললে—‘ঐ শোন্, শুনলি? একজন সসেমিরে হয়ে রয়েছে, পলককে মনে হচ্চে বছর, ও শালা আর বার হয় না। স্বয়ংবরটা হয়ে গেছে?’
বললুম—‘না, হয়নি এখনও।’
‘কবে দিন ফেলেচে?’
ভেবে বলবার জো নেই তো দা’ঠাকুর, মুখে মুখে উত্তুর যুগিয়ে যেতে হবে, মা-ঠাকরুনের বাচ্ছরিক ছেরাদ্দর কথাটা ক’দিন থেকে হচ্ছিল বাড়িতে—খানিকটে খরচের ব্যাপারটা তো?—ওই দিনটেই জিভের ডগায় এসে গেল, বললুম ‘চৌটো কাত্তিক।’
বলেই জিভ কেটেছি, ওবিশ্যি সেটা অন্ধকারে আর ওরা দেখতে পেলে না। মানে, আশ্বিন শেষ হয়ে এল, আগমনীর শানাই বাজতে শুরু হয়েছে, চৌটো কাত্তিক হলে আর দিন কোথায়? ভয়ে কাঠ হয়ে রয়েচি দা’ঠাকুর, এখুনি নেশা ছুটে গিয়ে বুঝি একটা কাণ্ড বাধায় – নিঃশ্বেস বন্দ করে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি, ওরা তিনজনেই একটু দাঁড়িয়ে ঢুললে, যেন হিসেব করচে মাথা থির করে, তারপর জ’টে বিন্দাবনকে জিগ্যেস করলে— ‘কউই কাত্তিক বললে?’
বললুম—‘চৌটো।’
‘চৌটো কি বললি?’
বললুম—‘চৌটো কাত্তিক।’
জিগ্যেস করলে–’আজ কউই বোশেখ?’
কথাটা বুঝলেন না দা’ঠাকুর? কখন দিন গিয়ে রাত হচ্চে, কখন রাত গিয়ে দিন হচ্চে হুঁশই নেই, ওরা আবার আশ্বিন থেকে কাত্তিকের হিসেব রাখবে! ভয়ে যে নিঃশেষটা বুকে আটকে ছেল আমার, ফোঁস্ ক’রে বেরিয়ে গিয়ে বুকটা হালকা হল দা’ঠাকুর। আর ও-ভুল করি? য্যাতটা পারি পেছিয়ে দিয়ে বললুম—‘পয়লা। আজ হোল পয়লা বোশেক।’ আবার তিনজনেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলতে লাগল, ছিরু বললে—‘হোল হিসেব তোদের? দু’শালাই একেবারে শুভঙ্করী জুটেচে। -বোশেখ থেকে কাত্তিক এগার মাস হোল না? মণ্ডলের পো কি বলিস?—পাঠশালায় পড়িস তো।’
আমি বললুম— ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক এগার মাস।’
গুলিখোরেরা আবার হার মানতে চায় না তো, বিন্দাবন বললে—‘বোষ্টোম মতে আবার দশ মাসও হয় তো; আমি সেই কথা ভাবছিলুম।’
জ’টে বললে—‘তাই ভেবে দেখছিলুম–বোষ্টোম মতে দশ মাসই হোক, কি শাক্ত মতে এগার মাসই হোক, হাতে দিন আচে এখনও তাহলে…তুই ছিরুর কথা বলেছিলি ক’নেকে?
বললুম- ‘আজ্ঞে হ্যাঁ’
‘কি বললি?’
বললুম—‘নাক এইরকম, চোখ এইরকম, ঠোঁট এইরকম, গলা এইরকম, বুক এইরকম, কোমর এইরকম।’
আবার পরখ করাও আচে তো, জ’টে জিগ্যেস করলে–’কোমর কি রকম বললি?’
ওসব তো রপ্ত থাকত; বললুম— ‘শিবের ডমরুর মতন।’
‘শুনে কি বললে?’
সিদিনকে আপনাকে বললুম না দা’ঠাকুর- আমার পুঁজি তো ঐ যাত্রা-অপেরা। শ্রীকৃষ্ণের রূপের কথা শুনে রুক্মিণীর অবস্থাও দেখেচি, রাধিকের অবস্থাও দেখেচি। বললুম—‘প্রেথমটা শুনে মুচ্ছো গেল—শেষ হ’তে না হতেই।’
জ’টে জিগ্যেস করলে— ‘তারপর?’
‘তারপর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে, কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ছিরু ঘোষাল, ছিরু ঘোষাল বলতে আবার চৈতন্য হোল।’
জ’টে মাথা নেড়ে বললে—‘হুঁ।’ আবার জিগ্যেস করলে—‘তারপর?’
বললুম—‘তারপর একেবারে অন্নজল ত্যাগ করেচে।’
ঝাঁ ক’রে নেশার হাতের একটা চাপড় বসিয়ে দিলে, তার ঝনঝনাটি যেন এখন পর্যন্ত কানে নেগে রয়েচে দা’ঠাকুর। আওয়াজের চোটে ওদের দুজনের নেশাও একেবারে চটে গেচে। ছিরু জিগ্যেস করলে—‘কি হোল?’
জ’টে বললে— ‘শালা মণ্ডলের পো, ভাঁওতা দেবার আর জায়গা পেলে না?…উদিকে মাথুর ধ’রেছেল—রূপের বর্ণনা শুনে শীরাধিকের মতন মুচ্ছো গেচে, কানে আমার নাম দিতে চৈতন্য হোল…শুনেই যাচ্ছি দেখি কত বড় দৌড়।—তারপর এই যে এক বছর অন্নজল ত্যাগ ক’রে জ্যান্ত রয়েচে বলচিস —বলি স্বয়ম্বরের ক’নে, না, রাবণের ভাই বিভীষণ রে শালা?’
এগুনে বললুম না দা’ঠাকুর?—সবার মেজাজ সমান থাকত না, নেশার ব্যাপার তো, কারুর কম লাগল, একটু ঝিমিয়ে রইল; সিদিন ছিরুই একটু বেশি এলিয়ে পড়েছে, বললে- ‘থাক, মারধোর করে কাজ নেই আমি দেখচি।’ জ’টেকে সরিয়ে একটু এগিয়ে এসে বললে- ‘তা ইদিকে যেমন গুচিয়ে বললি—মাথুরই গাস বা যাই করিস, উদিকে সেইরকম গুচিয়ে বলতে পারবি?’
বললুম— ‘পারব।’
‘ওবিশ্যি একেবারে অচৈতন্য হবার কথা বলবিনে—বাড়াবাড়ি হয় তো, খেলিও তো একটা চড় তার জন্যে।—আর রাধিকের মত শীকৃষ্ণ তো হোতও না অচৈতন্য—ওকথা বলবিনি, তবে বিরহে অন্নজল ত্যাগ করেচে ওটুকু বলতে পারিস। মনে থাকবে তো?’
বললুম—‘থাকবে।’
‘তারপর যদি জিগ্যেস ক’রে বসে – অন্নজল ত্যাগ করেচে তো বেঁচে আচে কি ক’রে?- শুনলি তো সে বিভীষণই পারত।’
শোনা কথা মনে পড়ে গেল, গুলিখোরেরা নাকি মিষ্টি খেতে বড় ভালোবাসে, বললুম- ‘সন্দেশ রসগোল্লা খেয়ে।
জ’টে আবার চড় তুলেচে, ও আড়াল করে দাঁড়াল দা’ঠাকুর, বললে—‘অদর্শনে অন্নজল ত্যাগ ক’রে সন্দেশ রসগোল্লা সাঁটাচ্চে-সে-পাত্তোরের ওপর কখনও মন বসে? আবোল- তাবোল বকচিস কেন?’
মিষ্টি কথায় একটু সাহসও তো হয় দা’ঠাকুর, বললুম—‘তা হলে ও কথা না হয় তুলব না, শীকৃষ্ণও তো উপোস দিতেন না।’
নেশাটা জমে আসচে আবার খিঁচড়ে যাচ্চে, বিন্দাবন মুখটা ব্যাজার করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলছেল, বললে—‘তার চেয়ে ও ফ্যাসাদের কথা বাদই দিক না। দেখচিস জেরায় যখন টেঁকছে না!’
তাহলে তো আমিও বাঁচি, পরিত্রাণ পাই, ফিকরির পর ফিকরি বের করে যে রকম জ্বালাতন করে তুলেচে, একটা দশ বছরের ছেলে কত সামলাবে বলুন না। একটা বুদ্ধিও যুগিয়ে গেল, বললুম— ‘আর স্বয়ম্বর সভা থেকে বেরিয়েই একচোট নড়াইয়ের পালা তো, অন্নজল ত্যাগ ক’রে থাকলে চলবে কেন?’
ছিরু পিঠে একটু হাত বুলিয়ে বললে— ‘এই তো, কে বলে মোড়লের পোর বুদ্ধি নেই? এইরকম ক’রে গুছিয়ে-সুছিয়ে সব বলবি। তারপর এসে রিপোর্ট দিবি। যা।’
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লুম ওদের মধ্যে থেকে দা’ঠাকুর। একটু এগিয়ে এসে ছুট দিতে যাব, জ’টে ডাকলে—‘এই, শোন!’
ঐ যে বললুম—ডাকলে আর সামর্থ থাকে না, আস্তে আস্তে আবার ফিরে এলুম।
জ’টে বললে—‘আবোল-তাবোল বকে ভুলিয়ে দিলে তো আসল কথাটা? তোকে যে সেবারে বলেছিনু দেখাশোনার একটা ব্যবস্থা করতে ক’নেকে বলে—নৈলে লব্ হবে না দুজনে। তা তুলেছিলি সে কথা?’
না বলবার তো জো নেই, বললুম—‘তুলেছিলুম বৈকি!’
‘তা কি বললে?’
কানটা তো ত্যাখনও ঝনঝন ক’রচে, আমি আর মেলা বাড়াবাড়ির দিকে গেলুম না, একটা মাঝামাঝি ঠাহর ক’রে নিয়ে বললুম—‘নজ্জায় ঘাড় কাত ক’রে রইল।’
ভগবানের দয়া, এক একটা দিব্যি উতরেও যেত, জ’টে একটু মুচকে হাসলে, ছিরুকে বললে—‘শুনলি তো? নজ্জা; প্রায় কাছিয়ে এল।’
ছিরু বললে—‘বকশিশ কর মণ্ডলের পোকে।’
নিজেই পকেটে হাত দিয়ে পাইপয়সা মনে করেই হোক বা যে ক’রেই হোক, একটা দো-আনি বের করে বললে—‘এই নে, নেগে থাকবি। থাকবি তো?’
‘হ্যাঁ, তা থাকব বৈকি’–বলে আমি মুঠোটা বন্দ করে তাড়াতাড়ি সটকাবার রাস্তা দেখচি, জ’টে বললে— ‘দাঁড়া তো দেখি, দো-আনি দিলে কি আট-আনি দিলে।’
ছিরুকে একটু আড়াল করেই দাঁড়াল। আমি মুঠোটা খুলতে দো-আনিটা তুলে নিয়ে বললে— ‘আট-আনিই তো; তা খোলা মনে যা দিয়েচে দিয়েচে, যা, ওরকম ক’রে ধরিসনি, প’ড়ে যেতে পারে।’
খালি মুঠোটা খুব শক্ত ক’রে এঁটে আমি হনহন করে এগিয়ে গেলুম।
কানটা ঝনঝন করচে ত্যাখনও, তবু বিলম্বের জন্যে দিদিমণিকে কি বলব, সে ভাবনাটা আর রইল না। বরং জবর খবর, কানের শোক ভুলে, আপনার গিয়ে দো-আনির শোকও ভুলে পা চালিয়েই গিয়ে উপস্থিত হলুম।
দিদিমণি এদিককার পাট শেষ ক’রে হেঁসেলের দিকে যাচ্ছেল, দাওয়ায় ব’সে সব শুনলে। বললে—‘একবার দেখা করবার জন্যে নাল গড়াচ্ছে মুখে, না?’
বললুম—‘তাই তো বললে।’
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল, মাঝে মাঝে চোখদুটো শুধু একটু একটু ঘোরায়। কথা কয় না, ইদিকে আমার দেরিও হয়ে যাচ্চে, জিগ্যেস করলুম –’কি ভাবচ গা দিদিমণি?’
বলে উঠল—‘মর ছোঁড়া, কোথাকার এক মাসি এসে বর কেড়ে নিলে, তায় অমন বর, স্বয়ম্বর সভায় রাজরাজড়াদের ছেড়ে গলায় মালা দিতে হয়-আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করচে, ও ছোঁড়া বলে, কি ভাবচ!…তোকে সিদিনকে কি বললে র্যা—ভশ্চায্যির মেয়েটা বড় ফিচেল —তাকে চাই না?’
বললুম—‘তাই তো বললে।’
আবার চুপ ক’রে ভাবতে নাগল; কখনও মুখটা শক্ত হয়ে উঠচে, কখনও আবার একটু যেন হাসির মতনও ঠেলে উঠচে ঠোঁটের কোণে, তারপর এক সময় বললে—‘ফিচলেমির এখনও কী দেখেচেন বাছাধন! এইবার দেখবেন। তুই যা, আমি প্ল্যানটা ত্যাতক্ষণ পাকা ক’রে ফেলি; কাল শুনবি’খন।
আমি উঠতেই বললে—‘তুই এসব কথা আর কাউকে বলিস নি তো?’, বললুম—‘তা কখনও বলি?’
‘খবরদার। আচ্ছা যা এখন।’
বেরিয়ে খানিকটা এয়েচি, ব্রেজঠাকরুনের সঙ্গে দেখা। আজকাল ঝগড়াটা আর সেরকম একটানা নেই তো,সকালে চান করতে বেরিয়ে য্যাতটুকু পারলে সেরে নেয়, তারপর যদি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বারতিনেক হোল তো খুব হোল। তা ঝগড়া না থাকলেও বিড়বিড়িনিটা নেগেই থাকে মুখে, গনি ওস্তাদের পথ চলতে চলতে মিহি গলায় সা-রে-গা-মা ভাঁজার মতন; মানে, গলাটাকে হামেশা তাজা রাখা চাই তো। সেই বিড়বিড় ক’রতে করতে আসছেল, আমায় দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল—‘এই যে, তোকেই খুঁজছিলুম, আজকে ফিরতে এত দেরি হোল কেন রে ছোঁড়া?…আবার চিঠি নিয়ে গিয়েছিলি নিশ্চয়। খবরদার মিথ্যে বলবি নি!’
বললুম— ‘না, সত্যি বলচি, চিঠি নিয়ে যাই নি সেখেনে।’
‘আর কোথাও?’
বললুম— ‘না, আর কোথাও না।’
‘পা ছুঁয়ে দিব্যি কর আমার।’
দিব্যি করলুম, জিগ্যেস করলে— ‘তবে এত দেরি হোল কিসের জন্যে?’
এ তো আর চৌধুরীমশাই নয়, কি ছিরু ঘোষাল নয় যে বানিয়ে একটা ব’লে দিলেই হল, ব্রেজঠাকরুন খুঁজে পেতে খতিয়ে দেখবে, তারপর আমার দশা যা হবার তা তো হবেই। আসল কথাটাই বলতে হলো দা’ঠাকুর, বললুম –’সেই ঘোষাল মশাইয়ের ছেলে ছিরু ঘোষাল রাস্তায় আটকে ছেল–দিদিমণির সঙ্গে যার বিয়ের কথা হচ্চে না? সেই ছিরু ঘোষাল।’
‘তা তোকে রাস্তায় আটকাতে গেল কেন?…কোন চিঠিটিঠি দিয়েছিল বুঝি নেত্যকে, দিয়ে এলি? ঠিক ঠিক বলবি। টের পেয়েচি নুকিয়েছিস কি জ্যান্ত পুঁতে ফেলব আমি—আর আমার নাম ব্ৰেজো বামনী, টের আমি পাবই।’
বললুম—‘ঠিক ঠিক বলচি, কোন চিঠি দেয় নি, নেকাপড়াও তো জানে না।’
‘ওসব বুঝি নে; পা ছুঁয়ে দিব্যি কর আবার।’
দিব্যি করলুম। জিগ্যেস করলে—‘তবে আটকে ছেল কেন?”
বললুম— ‘আপনাকে দেখতে চায় একবারটি।’
‘আমায় দেখতে চায়!!…তার মানে?’
‘আপনাকে বিয়ে করতে চায়।’
‘আমায় বিয়ে করতে চায়!!’ —আশ্চয্য হয়ে যেন এক হাত আরও লম্বা হয়ে উঠল, বললে—‘কি বললি ফিরে বল দিকিন -আমায় বিয়ে করতে চায় কি রে!’
বললুম— ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনেকেই পছন্দ বললে।’
‘এত পচন্দ হবার হেতুটা?’
আমি যে ওনারে রূপসী ষোড়শী ক’রে দাঁড় করিয়েচি ওদিকে, বলেচি স্বয়ম্বরা হ’তে এয়েচে, সে সব তো আর বলা যায় না, গাঁয়ে যা ঢেউ উটেচে সেই কথাই তুলে বললুম- ‘বিধবা-বিয়ে করতে চায়, ঐতেই যশ তো এখন, আর আপনি বাবাঠাকুরকে বিধবা-বিয়ে করবে বলে এয়েচে।’
‘তাই নেত্যকে ছেড়ে আমায়ই বিয়ে করবে?…কোথায় থাকে সে, চল এক্ষুনি নিয়ে চল আমায় তার কাছে, তার সাতপুরুষদের নতুন করে বিয়ে গিয়ে দিচ্চি আমি; চল্!’
একে ব্রেজঠাকরুন, তায় সবাই পিষ্টভঙ্গ দিতে কলহের তেমন জুত হয় না আজকাল, একটার গন্ধ পেয়ে একেবারে যেন উলসে উঠল! আমার হাতটা শক্ত ক’রে হিড়হিড় করে টেনেই নিয়ে যাচ্ছেল, খানিকটা গিয়ে বললে—‘আচ্ছা, থাক্ এখন, বাইরে জুতও হবে না তেমন।…কি বললে-তোকে, এসে সাক্ষাৎ করতে চায়? কথাবার্তা ঠিক করতে চায়?’
বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আর বললে-দেখা সাক্ষাৎ না হ’লে তো লব্ হবে না।’
‘সে জিনিসটে আবার কি?—লব?’
বললুম- ‘ঐ যে নল-দয়মন্তীর মাঝে আগে হ’য়েছেল, তারপর বিয়ে হোল তো?’
‘ও রস হয়েচে!’—দাঁড়িয়ে মাথাটা দুলিয়ে দুলিয়ে কয়েকবারই বললে কথাটা দা’ঠাকুর, তারপর একটু চুপ দিয়ে আবার বললে—‘তা রস আমি ভালো ক’রে ভেঙে দিচ্চি।…তুই বলবি – ব্রেজঠাকরুন রাজী হয়েচে। আর বলবি তানার আর তর সইচে না, কাল বিকেলেই ডেকেচে আপনাকে, কথাবার্তা পাকা হবে, লব্ না কি বললি তাও হবে ভালো ক’রে।
আমার তো ত্যাখন মনে হচ্চে হাওয়ায় উড়ে যাই; এত ফুৰ্তি তো আর কখনও হয়নি দা’ঠাকুর। হোক গিয়ে রাত; ত্যাখনই ছুটলুম ঘোষালের পো’কে খুঁজে বের করতে—প্রেথমে গেলুম লোটন ঘোষের আড্ডায়; নেই। ভাবলুম তা হলে বোধ হয় আবার সাঁবুইয়ের আড্ডাতেই গেচে ফিরে; সেখানেও নেই। বাড়িয়ে গিয়েও দেখলুম না; একটু মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরে গেলুম।
বেশ একটু রাত হয়ে গিয়েছেল তো, পরের দিন গোরু খুলতে আসতে একটু বিলম্ব হয়ে গেল, ত্যাতক্ষণ ব্রেজঠাকরুন উদিকে গলার চোটে কাক-চিল তাড়াতে তাড়াতে চান ক’রতে বেরিয়ে গেছে।
ভালোই হোল, দিদিমণিকে বলবার জন্যেই তো জিভটা চুলকুচ্ছিল আমার, উনি থাকলে তো আর সদ্য সদ্য হোত না বলা। দিদিমণি সবটা আগাগোড়া শুনে গেল, য্যাতই শুনচে, চোখ দু’টো বড় হয়ে উঠচে; আর মুখে একটা ওবরে হাসি নেগে থাকত না কোন নকলের কথা হ’লে?—সেই হাসিটা পষ্ট হয়ে উঠচে; শেষ হলে বললে—‘মিলিয়ে দেখ রে স্বরূপ-কথায় বলে না যে ধম্মের কল বাতাসে নড়ে, তা এই মিলিয়ে দেখ,—কাল তোকে বললুম না ঘোষালের কুপুত্তুরের শখটা ভালো করে মেটাবার জন্যে একটা মতলব বের করচি তা এই ধরণের একটা মতলব ঠাহর করেছিলুম ভেবে ভেবে—ঠিক করেছিলুম তুই গিয়ে বলবি মাসিমা রাজী হয়েচে, দেখা করে লব্ করবে, শুধু মাসিমার কাছে কি করে কথাটা তোলা যায় সেইটেই মাথায় আসছেল না, তা দেখ ভগবান আপনিই কেমন ব্যবস্থা করে দিলেন। উঃ, আমার তো আহ্লাদে নাচতে ইচ্ছে করচে। কিন্তু বিকেলবেলা তো হবে না।’
জিগ্যেস করলুম—‘কেন গা দিদিমণি? বিকেলই তো ভালো।’
দিদিমণি একটু ধমক দিয়ে উঠল, বললে—‘সব কথায় কেন, কেন করিসনে —জবাব দেওয়া যায় না ছেলেমানুষকে-ঘোষালের কুপুত্তুর কি বিকেলবেলা আসতে রাজী হবে নাকি? মাসিমা তো ব’লে দিলে—সবারই তো একটা নজ্জা-আবরু আচে।…না হয় বাপে তল্লাস নেয় না, তাই নিজেই কোমর বেঁধে নামতে হচ্চে বেচারিকে। বিকেল নয়, একটু বেশ গা-ঢাকা হলে। তা ভেন্ন, কালও হবে না।’ –
ছটফট তো আমিও করছিলুম দা’ঠাকুর, বললুম –’কেন, কাল তো দিব্যি হোত সদ্য সদ্য।’ পচন্দ করতে আসচে, তাকে একটু তোড়জোড় ক’রে আসতে হবে না। তা ছাড়া নোলকপরা একটা টেপিপুঁটি নয়, স্বয়ম্বরের কনে, তার নিজের পচন্দ-অপচন্দ নেই? সে যদি নাক সিঁটকে বসে তো ত্যাখন বেচারির কপালে আবার তো এই খেঁদি-বুচি অধমতারণ নেত্যকালী। কালও হবে না, পাত্তোরকে দুদিন সময় দিতে হবে, ক’নের তর সইচে না তো শুকুক দু’টো দিন, তাতে বরং টানটা আরও বাড়বে। পথ চেয়ে দুটো দিন ভেতর-বার করুক, এমনি হয় না।”
আমার একটু আশঙ্কাই হচ্ছেল দা’ঠাকুর, বললুম—‘দেরি হলে আবার আটা কমে যাবে না তো?’
দিদিমণি আবার ধমক দিয়ে উঠল, বললে—‘তুই আর বকাস নি তো যা বুঝিস নে তা নিয়ে। এ কাঁটালের আটা, গেলেই হোল কমে। তোকে যেমন বলচি ছিরে ঘোষালকে তেমন গিয়ে বলবি। হ্যাঁ মাসিমাকে ওবিশ্যি বলবি-ও কাল বিকেলেই আসবে। নে, শোন্ হাতে একটা ফুল নিয়ে, শুভ কাজ
ত্যাখন আর বলতে পারলে না। বাবাঠাকুর একটু হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল সদর দিয়ে, বললে—নেত্য কোথায় গেলি গো? তাড়াতাড়ি দুটি ভাতে-ভাত নামিয়ে দে তো মা, এক ফ্যাসাদ হয়েছে, এক্ষুণি বেরুতে হবে-বরাত য্যাখন মন্দ হয়…’
ঘরে বসে আমার সঙ্গে কথা কইছেল দিদিমণি, খিলখিল করে হেসে চাপা গলায় বললে—‘ঐ আর এক মানুষ—সব্বদাই তাড়াহুড়ো, সর্ব্বদাই ফ্যাসাদ!…তোমার বরাত মন্দর এখনও হয়েচে কি? একটা যা’হক জুটছেল বুড়ো বয়েসে তাও হাতছাড়া হয় বুঝি! ‘
হাসি সামলে মুখটা মুছে নিয়ে ওনাকে বললে—‘হয়ে যাবে’খন বাবা, তুমি ত্যাতক্ষণ চান আহ্নিকটা সেরে নাও তো।’
আমায় বললে—‘তুই যা, দুপুরে ত্যাখন বলব’খন, একটু ভেবেও নিই ত্যাতক্ষণ; যা ঠাহর করেছিলুম তার থেকে আবার একটু আলাদা হয়ে গেল তো।’
…এ’বার কাৎ করুন হুঁকোটা একটু দা’ঠাকুর, সেই কবেকার কথা মনে ক’রে ক’রে বলা তো, বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া মাঝে মাঝে না দিলে চলে না।’
