৩৮ বিচউড স্ট্রিট – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
৩৮ বিচউড স্ট্রিট
‘ঝুম-ঝুম-ঝুম’—শব্দটা বাগানের একটা দিক থেকে অন্য দিকে এগিয়ে গেল। ধীরে পায়ে কেউ যেন বাগানের মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আওয়াজটা মৃদু কিন্তু স্পষ্ট। ভিজে ঘাসের উপর কারও যেন মৃদু সতর্ক পদক্ষেপ। একই সঙ্গে একটা ধাতব শব্দ। ‘ঝুম-ঝুম-ঝুম’, কলকাতায় এরকম আওয়াজ কখনওই আলাদা করে টের পেত না অভ্র। কিন্তু এখানে? এই নিথর নীরবতায় এই আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায়, বোঝা যায় প্রাণহীনেরও ভাষা আছে।
তিন সপ্তাহ হল অফিসের কাজে ওয়েলসে এসেছে অভ্র। বাড়ি ভাড়া নিয়েছে ছোট্ট পাহাড়ি শহর কার্লিয়নে। শহর না বলে গ্রাম বললেই ভালো হয়। কিন্তু এখানকার বাসিন্দারা কার্লিয়নকে শহর না বললে অপমানিত হয়। আর হবে না-ই বা কেন, দু-হাজার বছর আগে ইংল্যান্ডের বেশির ভাগ জায়গা যখন সভ্যতার স্পর্শ থেকে অনেক দূরে, তখন এই এখানে, ওয়েলস-এর ছোট্ট শহর কার্লিয়নেই আস্তানা গেড়েছিল রোমান সাম্রাজ্যের এক লিজিয়ন। প্রায় পাঁচ হাজার রোমান সেনা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে থাকত। তাই এখনও কার্লিয়নের নানান জায়গায় ছড়িয়ে আছে রোমান দুর্গ, সেনাদের থাকার জায়গা, রোমান বাথ, অ্যাম্ভিথিয়েটার।
আবার শব্দটা ফিরে আসছে। মনটাকে আবার বর্তমানে ফিরিয়ে আনল অভ্র। খুব মনোযোগ দিয়ে ফের শোনার চেষ্টা করল। কোনও জন্তুর হাঁটার আওয়াজ কি? আশেপাশে বেশ কিছু জংলা জায়গা আছে। বাড়িটা শহরের একদম প্রান্তে। এরপরই জঙ্গল শুরু। তাই এরকম কোনও জন্তুর উপস্থিতির সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ঠিক রাত সাড়ে ন’টাতেই প্রায় প্রতিদিন সে-শব্দ কেন ফিরে আসে সেটা অবশ্যই একটা প্রশ্ন। আর পাঁচ মিনিট বাদে কেন যে সে-শব্দ আবার হারিয়ে যায় তারও কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
প্রথম দুদিন এ-শব্দটা পাওয়ার পর অফিসের কোলিগ স্টিভ স্মিথকে একথাটা বলেছিল অভ্র। স্টিভ এখানকার লোক। এ ধরনের শব্দের সঙ্গে ওর পূর্ব পরিচিতি থাকতেও পারে।
ফোনে রেকর্ডিং করা শব্দটা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর প্রথমবার স্টিভ বলে উঠল, ‘হেজহগ।’ অর্থাৎ শজারু।
তারপর কী মনে হতে আবার শুনল। দ্বিতীয়বার শুনে মত পরিবর্তন করে ভুরু কুঁচকে বলে উঠল, ‘হুমম, কারও পোষা বেড়াল নয়তো? চেন বাঁধা। তবে…’
একটু থেমে স্টিভ ফের বলে উঠল, ‘কীসের সঙ্গে শব্দটা সবথেকে বেশি মেলে বলত? কোনও ভারী কিছু বা ডেডবডি চেনে বেঁধে ঘাসের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক সেইরকম।’ কথাটা শুনে অভ্র হেসেছিল, স্টিভ হাসেনি। বরং বলেছিল, ‘কার্লিয়নের বেশিরভাগ বাড়িই পুরোনো। রোমান শহরের উপর তৈরি।’ অভ্র বুঝেছিল স্টিভ মজা করছে। তবু বাড়িওয়ালা ডেভকে ফোন করেছিল। জেনেছিল বাড়িটার বয়স মাত্র দশ বছর। বাড়িটা আসলে ডেভের ছেলের। কিন্তু তৈরির পর থেকেই ডেভের ছেলে দেশের বাইরে থাকায় এখানে কেউ কখনও থাকেনি। বহুদিন পরে অভ্রই প্রথম ভাড়াটে। দশ বছর বেশ বড় সময়। তাই এই দশ বছরে বাড়ির বাগানে কোনও জন্তুর স্থায়ী আস্তানা গড়ার সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরের দিন সকালে বাগানটা বেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখেছিল অভ্র। বেশ কিছু পাখি, মৌমাছি, ভীমরুল, আর মাকড়সার বাইরে আর কারও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
চিন্তায় বাধা এল। ডাইনিং রুমের বদ্ধ কাচের দরজার বাইরে শব্দটা থেমে গেছে। অভ্রর ষষ্ঠেন্দ্রিয় স্পষ্ট বলে উঠল কাচের উলটো দিকে নিশ্চিত কেউ আছে। বাইরে এমনিতেই ঘন কুয়াশা। তার মধ্যে বাগানের দিকে দেওয়ালে লাগানো একমাত্র আলোতে কুয়াশার উপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই বোঝার উপায় নেই। কিছু দূরে বাগানে গার্ডেন চেয়ার-টেবিল রাখা। সে টেবিলের অর্ধেকটা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে ডাইনিং রুমের অস্পষ্ট আলো। তারপরে প্রায় নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। দরজার কাচের গায়ে নাক ঠেকিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল অভ্র। নাহ, আলোকিত অংশে অন্তত কেউ নেই। জীবিত বা মৃত।
হঠাৎ ওর মনে হল, ভয় না পেয়ে বাইরে একবার যাওয়া উচিত। রহস্যের সমাধান অবিলম্বে হওয়া দরকার। পাশের রান্নাঘর দিয়ে বাগানে যাওয়ার যে দরজাটা আছে সে দিকে এগোল অভ্র। কিন্তু দরজার কাছে এসেই শিহরন হল অভ্রর। দরজাটা আধখোলা। ঠান্ডা বাতাস হানা দিয়েছে সে-দরজা দিয়ে। কিন্তু এ-দরজা তো বন্ধই ছিল! সকালে একবার বাগানে গিয়েছিল অভ্র, আর যদ্দূর মনে পড়ে ফিরে বন্ধও করে দিয়েছিল।
বাইরের বাগানে বেরিয়ে এল অভ্র। মেঘ যেন হঠাৎ হানা দিয়েছে বাগানে। দু-হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মেঘে ঢাকা আকাশে তারারা-ও উধাও। তবু তার মধ্যেই অভ্র টর্চ জ্বেলে এগিয়ে গেল শব্দটাকে লক্ষ্য করে। হাত পাঁচেক এগোতেই হঠাৎ হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় অভ্রর। বাগানের মধ্যে ওর থেকে ঠিক তিন হাত দূরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। বয়স বড় জোর সাত-আট হবে। ক’টা চোখ। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখটা কেমন যেন গম্ভীর। ধবধবে ফরসা রং। এতটাই ফরসা যে মনে হয় যেন রক্ত শূন্যতায় ভুগছে। কুয়াশা ভেদ করে পেনসিল ব্যাটারি টর্চের আলো মেয়েটার উপর গিয়ে পড়েছে। তার আবছা আলোতে মেয়েটার ফ্রকের রং মনে হল গোলাপি। অভ্র কিছু বলার আগেই মেয়েটা ছুট দিল। বাগানের অন্য দিকে আর তার প্রায় পর পরই বাইরে একটা গাড়ির জোরে ব্রেক কষার আওয়াজ পেল অভ্র।
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বাগানের ওই একই দিকে ছুটে গেল অভ্র। আগে খেয়াল করেনি, বাগানের পিছন দিকে কাঁটাঝোঁপের বেড়ার মধ্যে একটা ছোট ফাঁক আছে। নির্ঘাত তার মধ্যে দিয়েই মেয়েটা রাস্তায় পালিয়ে গেছে। ওখান থেকে অভ্রর বেরোনোর উপায় নেই। ও বাগান থেকে ফিরে এসে বাড়ির মধ্যে দিয়ে গিয়ে সামনের দরজা খুলে রাস্তায় বেরিয়ে এল। পাশের রাস্তায় গাড়ির ব্রেক কষার আওয়াজটা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। মেয়েটার কিছু হল না তো?
যা ভেবেছিল তাই। বাড়ির গা দিয়ে যে-রাস্তাটা চলে গেছে তার ঠিক মাঝখানে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার চালক গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেল অভ্র। গায়ে কালো স্যুট, অভিজাত চেহারা, লালচে সোনালি চুল। অভ্রকে দেখেই লোকটা উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘এই এক্ষুনি একটা বাচ্চা মেয়ে হঠাৎ করে গাড়ির সামনে এসে পড়েছিল। ভাগ্যিস সময় মতো ব্রেক কষেছিলাম।’
‘হ্যাঁ, আমিও তাই ব্রেকের আওয়াজটা শুনেই দেখতে এলাম। কোথায় গেল মেয়েটা?’
‘হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি। যেমন হঠাৎ করে এসেছিল, তেমনই হঠাৎ করে কোথায় আবার চলে গেল দৌড়ে।’
এবার অভ্রর দিকে হাত বাড়িয়ে লোকটা বলে উঠল, ‘আমার নাম রব। রবার্ট ব্রাইট। এখানেই এক মাইল দূরে থাকি। তা আপনি কি এখানে নতুন? আগে দেখিনি তো!’
‘হ্যাঁ, আমি এখানে তিন সপ্তাহ মতো এসেছি। ইন্ডিয়া থেকে। এখন বছরখানেক থাকব।’
‘গুড। খুব ভালো। এটা ছোট জায়গা। আগে আমিও এখানেই থাকতাম। এখন একমাইল দূরে চলে গেছি। আজ চলি, পরে আবার কথা হবে।’
লোকটা গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল। হঠাৎ উলটো দিকে ফুটপাথ থেকে আসা একটা লোককে দেখে হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পিটার!’
রাস্তার উলটো দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা পিটারের দিকে তাকাল অভ্র। পিটারকে দেখে প্রথমেই অভ্রর যে কথাটা মাথায় এল তা হল গল্পে পড়া ভ্যাম্পায়ারের কথা। সাড়ে ছ’ফুটের মতো হাইট হবে। রোগা, মাথায় বড় একটা টুপি। খাড়া নাকটা সামনের দিকে একটু বাঁধানো। লম্বাটে মুখের উপর দুটো চোখ যেন দুটো গর্তে খোদাই করে বসানো হয়েছে। লোকটা এগিয়ে এসে রবার্টের সাথে করমর্দন করে বলে উঠল, ‘কেমন আছ রবার্ট? এত রাতে এখানে?’
‘আর বলো না। ফিরতে একটু রাত হয়ে গেল আজ। হঠাৎ করে একটা বছর সাতেকের মেয়ে গাড়ির সামনে চলে এসেছিল। আরেকটু হলেই—’
‘ও শেলী! বুঝতে পেরেছি, ভারী দুষ্টু মেয়ে। মাঝেমধ্যেই এরকম করে। মজা করে হঠাৎ হঠাৎ করে গাড়ির সামনে দিয়ে দাঁড়ায়। ভয়ডর ওর একদম নেই।’
‘তা তুমি চেনো নাকি?’
‘হ্যাঁ, চিনব না! ও তো আমাদের ওখানেই থাকে। তুমি আগে দেখোনি সেটাই আশ্চর্য লাগছে।’ রবার্টকে উদ্দেশ্য করে পিটার বলল।
এতক্ষণে অভ্র বলে উঠল, ‘মেয়েটা মাঝে মধ্যে আমার বাড়ির বাগানেও ঢুকে পড়ে। আমি অবশ্য আজই প্রথম দেখলাম। কিন্তু আগে ওর পায়ের আওয়াজ পেয়েছি।’
‘তা আপনি।’ অভ্রকে যেন এতক্ষণে খেয়াল করল পিটার।
‘এই কয়েক সপ্তাহ হল এখানে এসেছি।’ বলে বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখোল অভ্র।
পিটার যেন একটু চমকে উঠল—
‘৩৮ বিচউড স্ট্রিট!’ তারপর মাথার টুপিটা খুলে হাতে নিয়ে দীর্ঘশাস ফেলে ফের বলে উঠল, ‘নিশ্চয়ই এ জায়গাটা আপনার খুব ভালো লাগছে। ভারী সুন্দর জায়গা। আমাদেরও পছন্দের।’ বলে হঠাৎ করে থেমে গেল পিটার।
এতক্ষণে মনের কথাটা বলেই ফেলল অভ্র, ‘জানেন, এই ক’দিন রোজ এ সময়ে আমার বাড়ির বাগানে বিশেষ একটা আওয়াজ হত। ভাবতাম কীসের আওয়াজ! আজকে আওয়াজটা পেয়ে বেরিয়ে দেখি বাগানের মধ্যে মেয়েটা, মানে আপনাদের এই শেলী। কেন রোজ আমার বাগানে ঢুকত কে জানে?’
‘ও ওরকমই। তাছাড়া এখানেই থাকত তো!’
‘এখানে থাকত মানে?’
‘না, মানে এখানকারই মেয়ে তো। তাই মাঝে মধ্যে ঢুকে পড়ে।’
একটু থেমে পিটার বলে উঠল, ‘তা যাই হোক। মোস্ট ওয়েলকাম টু কার্লিয়ন। ভালো থাকবেন আর ওরকম আওয়াজ টাওয়াজে ঘাবড়াবেন না। আমি আসি।’
বলে অভ্র আর রবার্টকে বিদায় জানিয়ে যেদিকে যাচ্ছিল, তড়বড় করে সেদিকে আবার হাঁটতে শুরু করল।
রবার্টও গাড়িতে উঠেই গাড়ি স্টার্ট করল। ওর গাড়িটা চলতে শুরু করার পর পরই প্রায় একশো মিটার দূরত্বে রাস্তার ফুটপাতের উপর আবার মেয়েটাকে দেখতে পেল অভ্র। কুয়াশাটা একটু কেটে যাওয়ায় দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। মেঘের চাদর সরিয়ে আকাশটাও যেন একটু জেগে উঠেছে তারার চোখে চোখ রেখে।
মেয়েটা যেন ওর জন্যই অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু কি বলতে চায়? অভ্র ওর দিকে এগিয়ে গেল। আর একটু এগোতে মেয়েটার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পেল অভ্র। মুখটা ভারী সুন্দর। বড় বড় চোখের পাতা। আর সে চোখের দৃষ্টি সোজা অভ্রর উপর।
মেয়েটার কি বাবা-মা কেউ নেই? এত রাতে এভাবে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অভ্র আরেকটু কাছে যেতেই মেয়েটা হাত তুলে দূরের দিকে দেখাল। পাহাড়ি রাস্তা বাঁক বেয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে কার্লিয়ন শহরের কেন্দ্রের দিকে। ওদিকেই ওর আঙুলের লক্ষ্য। অভ্রকে কি কিছু দেখাতে চায়?
তারপর আর কিছু না বলে সোজা ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল। অভ্রও মেয়েটার পিছু পিছু এগিয়ে চলল। মেঘ আর কুয়াশার দাপট একটু কমলেও এখনও রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার দু-ধারে লাগানো বাতিস্তম্ভের আলোগুলো এই ভারী কুয়াশার মধ্যে নিজেরাই লুকোচুরি খেলছে। তাদের হলদেটে তুলির ছোঁওয়ায় আশপাশ রঙিন হলেও দশ মিটারের বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাস্তায় গাড়ি চলাচল প্রায় নেই বললেই চলে। কিছু রাতজাগা পাখির ডাক মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ অভ্র লক্ষ করল মেয়েটা একটু আগে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটা লোকের সঙ্গে কথা বলছে। রাস্তার ধারে পাথর বসানো একটা বসার জায়গা। সেখানে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছে। মাথায় হ্যাট, হাতে সাদা লাঠি। লম্বা কালো কোট। চওড়া সাদা গোঁফ, সেরকমই দেখার মতো সাদা দাড়ি। তার সঙ্গে কিছু কথা বলে অভ্র কাছে এসে পৌঁছনোর আগেই আবার হাঁটতে শুরু করল।
অভ্র বৃদ্ধের কাছে যেতেই বৃদ্ধ খকখক করে কেশে উঠল। ঠোঁটের কোণে একটু হাসি এনে বলে উঠল, ‘৩৮ বিচউড স্ট্রিট?’
অবাক হয়ে অভ্র বলল, ‘কী করে জানলেন যে আমি ওখানে থাকি?’ মেয়েটা বলল।
লোকটা আবার খানিকক্ষণ খকখক করে কেশে বলে উঠল, ‘সবাই ওই বাড়ির কথা জানে। দ্যাটস দ্য বেস্ট হাউস অফ দ্য ব্লক।’ সবার পছন্দের। আমার নাম হল সাইমন ব্যানেট। এখানকার পুরোনো লোক।
‘সাইমন ব্যানেট! নামটা শুনেছি মনে হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, শুনবে না! আমি এখানকার মেয়র ছিলাম। এখানকার স্কুল, হাসপাতাল সবই আমার নামে। তা কার্লিয়ন কীরকম লাগছে?’
‘ভালো। বেশ সুন্দর জায়গা। খুব পুরোনো শহর।’
‘হ্যাঁ, সত্যিই খুব পুরোনো শহর। তাই এখানকার বাসিন্দারাও আমার মতোই পুরোনো। বহু বছর কেটে গেছে, কিন্তু শহরের মোহ আমরা কেউ কাটাতে পারিনি। আমরা সবাই যে যার জায়গা আঁকড়ে পড়ে থাকি।’ লোকটা এরপর অন্যমনস্ক ভাবে বিড়বিড় করে কীসব বলতে লাগল।
অভ্র আর না দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল। ও খেয়াল করেছিল—মেয়েটা একটু এগিয়ে ওর জন্যই যেন অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে। অভ্রকে এগিয়ে আসতে দেখে আবার হাঁটতে শুরু করল। খানিকবাদে বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকের একটা রাস্তা ধরে এগোতে থাকল। এ রাস্তাটার দু-ধারে কোনও বাড়ি নেই। ঝোপ-ঝাড়-গাছ। হাঁটার আর সাইকেলের সরু রাস্তা। অভ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেয়েটার পিছু পিছু এগোতে থাকল। খানিকবাদে ডানদিকে নীচু পাঁচিল ঘেরা একটা জায়গার সামনে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। ভেতরে ঢোকার গেট খোলাই ছিল। চার্চ লাগোয়া বড় কবরখানা। মেয়েটা নির্ভীকভাবে তার ভেতরে ঢুকে গেল। চারদিকে কবরগুলোর উপর লাগানো কিছু ক্রস। কিছু চৌকো শেপের। কিছু কিছু খুব পুরোনো। কিছু নতুন গ্রানাইট পাথরের। অস্পষ্ট আলোতে দূর থেকে নাম পড়া যাচ্ছে না। একটা পাথরের ফলকের সামনে এগিয়ে গেল অভ্র। পাথরের উপর মৃতের নাম। সঙ্গে আছে জন্ম-মৃত্যুর তারিখ। কবরখানার মধ্যে দিয়ে সরু পা হাঁটা পথ চলে গেছে। মেয়েটা সে পথ ধরে হাঁটছে। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট গাছ। তার মধ্যে ছড়ানোছেটানো নানান সাইজের পাথরের ফলক।
সেইরকমই একটা ফলকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটা। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তাতে লেখা ‘ইন দ্য মেমারি অব শেলী ভার্গিস। জন্ম ২ অক্টোবর, ১৮৭০, মৃত্যু ১৯ মার্চ, ১৮৭৭। এবার ঘুরে তাকাল অভ্রর দিকে। তারপর একগাল হেসে প্রথমবার কথা বলে উঠল, ‘আই অ্যাম শেলী। শেলী ভার্গিস। এখানেই এখন আমি থাকি। আগে থাকতাম ৩৮ বিচউড স্ট্রিটে। তোমার বাড়িতে।’ মেয়েটা হাসিতে শৈশবের উচ্ছ্বাস!
একটু থেমে দূরের আরেকটা নতুন পাথরের ফলকের দিকে নির্দেশ করে বলে উঠল, ‘ওটা পিটারের, তার পাশেরটা রবার্টের। আর ওই, ওই যে বড় ফলকটা দেখছ না, ওটা সাইমনের। সাইমন বলে ও নাকি খুব বিখ্যাত লোক ছিল।’
অভ্র পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। মেয়েটার দেখানো দিকে তাকাতেই শুধু পাথর নয়, তাদের পাশে দাঁড়ানো লোকগুলোকেও দেখতে পেল। এদের তিনজনের সঙ্গেই ওর খানিক আগেই আলাপ হয়েছে। পিটার, রবার্ট আর সাইমন। সাইমনের মুখটা গম্ভীর। লম্বা সাদা দাড়ি আর গোঁফ। দূর থেকেই স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। কিন্তু বেশিক্ষণ না, আবার সব অস্পষ্ট হয়ে গেল অভ্রর চোখের সামনে।
পুলিশের কাছে খবরটা পেয়ে বাড়িওয়ালা ডেভ-এর খুব অবাকই লেগেছিল। এত রাতে ভাড়াটে ছেলেটা বাড়ির থেকে একমাইল দূরে কবরখানায় কী করছিল? আর তাও আবার ঠিক সেই জায়গাতে যেখানে ওই চারজনকে নতুন করে কবর দেওয়া হয়েছে! দশ বছর আগে বাড়িটা তৈরির সময় এই কবরগুলো সরানো হয়েছিল শহরের কেন্দ্রের মূল কবরখানায়, অবশ্যই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে। ঠিক ওইখানে! ছেলেটা ওদের সন্ধান পেল কী করে? কার্লিয়নে যারা থাকে তাদের হৃদয় এত দুর্বল হলে চলে না। কবরখানার মাঝখানে যেতেও হবে, আবার তারপরে ভয়ে হার্ট অ্যাটাকও হবে—এটা কি মেনে নেওয়া যায়? কোনওভাবেই না। সবাই জানে কার্লিয়ন ছেড়ে কেউই যেতে চায় না। কিন্তু তা বলে নতুন কেউ কি আর আসবে না এ শহরে? নতুন কোনও ভাড়াটে কি আর রাখা যাবে না?
জীবনে অনেক রহস্য থাকে, অনেক প্রশ্ন থাকে। সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাওয়াটা কি এতই জরুরি? ডেভ যে বাড়িতে থাকে তা ৩৮ বিচউড স্ট্রিট থেকে দু-ব্লক দূরে। কিন্তু রাত সওয়া ন’টা বাজলেই রোজ ওর পোষা মোটা কালো বেড়ালটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও চলে যায়। ডেভ যদ্দূর জানে বেড়ালটা ওই সময়ে ৩৮ বিচউডেই যায়। আবার খানিক বাদে ফিরেও আসে। ডেভ কি কখনও জানতে গেছে কেন বেড়ালটা রোজ ওই সময়ে ওখানেই যায়?
