তাজমহল – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
তাজমহল
নাহ, লোকটার পছন্দ ছিল বলতে হবে।
—কার বিশ্বজিৎদা?
—খুররম শিয়াউদ্দিন মহম্মদের।
—সে আবার কে?
—আরে গাধা, শাহজাহানের কথা বলছি। শাহজাহানেরই আরেক নাম খুররম। রুচি না থাকলে ও জিনিস বানানো যায়!
—তুমি কি তাজমহলের কথা বলছ?
—না, সল্টলেক স্টেডিয়ামের কথা বলছি।
—অন্য কিছুও তো হতে পারে।
—থাম তো। মুখে-মুখে তর্ক করিস না। একটু থেমে বিশ্বজিৎদা ফের বলে ওঠে,—তাজমহলের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনাই চলে না। মুখে শোনা, আর চোখে দেখার মধ্যে অনেক ফারাক। সামনে দাঁড়ালেই কেমন যেন শিহরণ হয়।
—সে কী! আগ্রা গিয়েছিলে না কি!
—হ্যাঁ, আগের সপ্তাহে দিল্লি গিয়েছিলাম। টুক করে আগ্রা ঘুরে এসেছি। আগ্রা বলতে অবশ্য শুধুই তাজমহল। সেদিন আবার পূর্ণিমা ছিল। পূর্ণিমার আলোয় তাজমহলকে যা লাগছিল না—কী বলব! কোনও বিশেষণই যথেষ্ট নয়। রাত বাড়ছিল, আর সাদা শ্বেতপাথরের রংও বদলাচ্ছিল। বিকেলের দিকে যা ছিল ধবধবে সাদা, সন্ধে হতেই তা রং বদলে সোনালি হয়ে গেল। দেখতে দেখতে চার-পাঁচ ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল টেরই পেলাম না।
—দুশো বছর হয়ে গেল, তবু তাজমহলের মতো আরেকটা সৌধ তৈরি হল না! সাগ্নিক বলে ওঠে।
—অ্যাই দুশো কীরে! সাড়ে তিনশো বছর হয়ে গেছে। ১৬৫৪ কাজ শেষ হয়। ইতিহাসের জ্ঞান তো একেবারে জিরো দেখছি। বিশ্বজিৎদা ধমকে বলে ওঠে।
—১৬৩২-এ কাজ শুরু হয়েছিল। প্রায় কুড়ি হাজার শ্রমিক মিলে—। মিলন জ্ঞান জাহির করতে গিয়ে থেমে যায়। অনিলিখাদি।
অনিলিখাদি ঘরে ঢোকে। আমাদের শনিবারের আসরে অনিলিখাদি এখন কলকাতার শীতের মতো অনিয়মিত হয়ে এসেছে। কাজের জন্য মাঝেমধ্যেই বিদেশে যায়। শেষ দেখা মিলেছিল দেড়মাস আগে। ছোবড়ার দাঁত বার করা সোফাটায় বসেই বলে উঠল,—কী বিশ্বজিৎ, তাজমহলের ওপরে ওদের আবার কী বলছিলে?
অপ্রস্তুত বিশ্বজিৎদা কিছু বলে ওঠার আগেই অনিলিখাদি শুরু করে,—তা মিলন, কারা যেন তাজমহল করেছিল?
—কেন, ওই যে বললাম না, কুড়ি হাজার শ্রমিক। ওদেরকে তাজমহলের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে আনা হয়েছিল।
অনিলিখাদি মৃদু হেসে বলে ওঠে,—পুরো ধারণাটাই ভুল। ঐতিহাসিক ভুল। তাজমহলে এমন অনেক কিছু আছে যেটা তখনকার লোকেদের পক্ষে করা সম্ভব ছিল না।
—আনবিলিভেবল অনিলিখা, তুমি তো দেখছি এবার ভারতের ইতিহাসই পালটে দেবে! বিশ্বজিৎদা উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে।
—আমাকে বলতে দাও। তাজমহলে পারসি, অটোমান, ভারতীয় আর ইসলামিক স্থাপত্যের মিশ্রণ দেখা যায়। তবে মূলত পিয়েত্রা দ্যুরা স্টাইল ব্যবহার করা হয়েছে, যা তার আগে বা পরে কখনও ব্যবহার করা হয়নি। ওই সময়ের অন্য সব স্থাপত্যে ব্যবহার করা হয়েছে লাল বেলেপাথর। তাজমহলে ব্যবহার করা হয়েছে রাজস্থানের মাকরানা শ্বেতপাথর। আঠাশ ধরনের মূল্যবান পাথর নানান দেশ থেকে আনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সুদূর দেশ থেকে এসব পাথর আনা কি তখন সম্ভব ছিল? সেখানেই শেষ নয়। এসব নানান সাইজের আর রঙের পাথর দিয়ে নিখুঁতভাবে জ্যামিতিক আকারে সাজানো হয়েছে। তিন সেন্টিমিটার জায়গার মধ্যে পঞ্চাশটার মতো ছোট-ছোট পাথর এমনভাবে বসানো আছে যে প্রত্যেকটার মধ্যে গ্যাপ একদম এক। এক মিলিমিটারের এক-দশমাংশ অবধি কোনও ভুল নেই।
—তা তুমি কী বলতে চাইছ?
—এরকম শিল্পকর্ম রোবোটিক্সের সাহায্য ছাড়া অসম্ভব।
—রোবোটিক্স। তখনকার দিনে রোবোটিক্স! বিশ্বজিৎদা উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করতে-করতে বলে,—ইতিহাস এরা যেটুকু জানত, সেটুকুও ভুলে যাবে।
—চোখে না দেখলে আমিও ওটা বিশ্বাস করতাম না।
দুর্গেশের আনা চায়ের ট্রে থেকে এক কাপ তুলে নিয়ে অনিলিখাদি আবার বলতে শুরু করে। অনিলিখাদির পরবর্তী দেড়ঘণ্টার বিবরণ হুবহু তুলে ধরার চেষ্টা করছি। ঠিক না ভুল সে বিচারের দায়িত্ব তোমাদের ওপরেই ছেড়ে দিলাম।
দুই
তোরা তো জানিসই গত দেড়বছর ধরে আমাকে মাঝেমধ্যে ডাবলিন যেতে হচ্ছে। ডাবলিন, আয়ার্ল্যান্ডের রাজধানী। ডাবলিনের উত্তর দিকে সোর্ডস বলে একটা জায়গা আছে। দমদম যেমন কলকাতার মধ্যে চলে এসেছে, সোর্ডসও সেরকম বলা যায় ডাবলিনের মধ্যেই। ডাবলিনে গেলেই সোর্ডসের লাইব্রেরি আমার প্রিয় জায়গা। ছুটির দিনগুলো ওখানেই কাটাতাম।
আয়ার্ল্যান্ডে একটা রীতি আছে। বেশিরভাগ বই প্রকাশ হয় লেখকের স্থানীয় লাইব্রেরিতে। কিছুদিন আগে থেকে চারদিকে পোস্টার পড়ে যায়। প্রকাশের দিনে উৎসাহী সব পাঠকরা লাইব্রেরির একটা অংশে জড়ো হয়। তাদের সামনে লেখক সামান্য দু-চার কথা বলে বইয়ের উদঘাটন করেন। তা হঠাৎ একদিন পোস্টার দেখলাম ব্রায়ান ওয়াইল্ড-এর নতুন বই ‘হোয়েন টাইমট্রাভেল ইজ পসিবল’ প্রকাশিত হবে। লেখককে না চিনলেও টপিকটা খুব ইন্টারেস্টিং। বই প্রকাশের দিন লাইব্রেরিতে হাজির হলাম। অন্যদিনের থেকে ভিড় বেশ বেশি। অবশ্য তাদের মধ্যে বুড়ো-বুড়ি আর বাচ্চাই বেশি।
ঠিক সময়মতো প্রফেসর ব্রায়ান এসে ওনার জন্য রাখা চেয়ারে বসলেন। ছোটখাটো চেহারা। টাকমাথা। চোখে চশমা। পাকা দাড়ি। খুব উজ্জ্বল চোখ। বয়স ষাটের আশেপাশে হবে। লাইব্রেরির তরফ থেকে একজন প্রফেসর ব্রায়ানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিলেন। শুনলাম ট্রিনিটি কলেজের এই প্রফেসারের বেশ কিছু মৌলিক গবেষণা আছে। বই যদিও এই প্রথম।
প্রফেসার মোড়ক কেটে বইটা বার করে তুলে ধরলেন। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা তুলে বাকি আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে বলে উঠলেন—টাইমট্রাভেল ইজ পসিবল।
পরবর্তী আধঘণ্টায় যা বললেন তা আমারই বোধগম্য হল না, তো অন্যদের মাথায় কী ঢুকল জানি না! হোয়াইটহোল-ব্ল্যাকহোলকে জুড়লে কীভাবে বহুকোটি আলোকবর্ষ দূরের দুই ব্রহ্মাণ্ড কাছে চলে আসতে পারে, কীভাবে এই ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করা যেতে পারে, কীভাবে এদের সাময়িকভাবে তৈরি করা যেতে পারে—এসব নানান তথ্য দিয়ে গেলেন। যেটা বুঝলাম তা হল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে যাতায়াত করতে পারলে আমরা সময়ের আগে বা পরে যেতে পারব।
বই প্রকাশের অনুষ্ঠানের পরে এগিয়ে গিয়ে প্রফেসর ব্রায়ানের সঙ্গে কথা বললাম। এ বিষয়ে যে আমার দারুণ আগ্রহ আছে তা জানিয়ে ওনার সই করা একটা বই নিয়ে নিলাম।
এর পরে আরও কয়েকদিন ওনার সঙ্গে লাইব্রেরিতে, রাস্তায় দেখা হয়েছে। দেখা হলেই গবেষণা কীভাবে এগোচ্ছে—কী সমস্যা হচ্ছে এসব নিয়ে দু-চার কথা বলে যান। তা একদিন দেখি ঝড়ের বেগে সোর্ডস রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছেন, চোখ-মুখ উত্তেজিত। তিন-চারবার ডাকার পর ঘাড় ঘোরালেন। কথায় কথায় বললেন ওনার টিম নাকি সৌরজগতের খুব কাছে একটা ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন। তার মাধ্যমে নাকি টাইমট্রাভেল সম্ভব।
—তা অসুবিধেটা কী?
—কস্ট। টাইমট্রাভেল টেস্ট করতে গেলে অনেক-অনেক টাকার দরকার। বলে প্রফেসর আর দাঁড়ালেন না।
তিন
এরপরে বহুদিন আর প্রফেসার ব্রায়ানের সঙ্গে কোনও দেখাসাক্ষাৎ নেই। এর মধ্যে আমি বেশ কয়েকবার আয়ার্ল্যান্ড আসা-যাওয়া করেছি। একদিন কৌতূহলবশত লাইব্রেরিয়ানকেও ওনার কথা জিগ্যেস করলাম। ওরা ওনার লাইব্রেরি কার্ড কম্পিউটারে দেখে বলল উনি নাকি গত তিনমাস লাইব্রেরিতে আসেননি। ওনার নেওয়া কয়েকটা বই ফেরত দেওয়ার দিন বহুদিন হল পেরিয়ে গেছে, অথচ ওনার কোনও পাত্তা নেই।
বয়স্ক লোক। শরীর খারাপ হল না তো! লাইব্রেরি থেকে ওনার বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেল। ১৬, ক্লনটার্ফ রোড, ম্যালহাইড। ম্যালহাইড জায়গাটা সমুদ্রের ধারে। অভিজাত এলাকা।
পরের রবিবার খুঁজে-খুঁজে গেলাম প্রফেসারের বাড়িতে। বিচ থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটা। নীচু পাঁচিল। গেট খুলে ঢুকলে ঘাসের লম্বা লন। বেশ কয়েকটা নানান আকারের ঝাউগাছ। ঘাসগুলো অযত্নে অনেক বড় হয়ে উঠেছে। গাছগুলোও অনেকদিন ছাঁটা হয়নি। একতলা বাড়ি। টালির ছাদ। বাড়ির দরজার পাশে কলিংবেল। অনেকবার টিপেও সাড়াশব্দ পেলাম না। এবার দরজার গায়ে লেটার বক্সের দিকে চোখ পড়ল। বেশ কয়েকটা চিঠি ফাঁকেই আটকে গেছে। হাত ঢুকিয়েই বুঝতে পারলাম একগাদা চিঠিপত্রে মুখটা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রফেসর নিশ্চয়ই বেশ কিছুদিন বাড়িতে নেই।
পাশের বাড়িতে একজন বৃদ্ধ ঢুকছিলেন। তাঁকে প্রফেসার ব্রায়ানের কথা জিগ্যেস করলাম। বললেন, উনি নাকি দীর্ঘদিনের জন্য আফ্রিকায় বেড়াতে গেছেন। কবে ফিরবেন কেউ জানে না।
এরপরে আমি আমার চাকরির ব্যাপারে এত ব্যস্ত ছিলাম যে প্রফেসার ব্রায়ানের কথা ভাবার আর সময় পাইনি। সেদিন ছিল শনিবার। শীত পুরোদমে পড়ে গেছে। একগাদা গরম পোশাক পরে গ্র্যাফটন স্ট্রিট দিয়ে হাঁটছি। গ্র্যাফটন স্ট্রিট ডাবলিনের সবথেকে নামকরা কয়েকটা রাস্তার মধ্যে পড়ে। এখানে গাড়ি ঢোকা নিষেধ। শুধু পথচারীদের জন্য লাল ইটের রাস্তা। ডাবলিনের সবথেকে নামিদামি দোকানগুলো এই রাস্তায়। হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ কী খেয়াল হল, ‘ওয়্যারস জুয়েলার্স’ বলে একটা ঘড়ির দোকানে ঢুকলাম। দোকানের ভেতরে বেশ ভিড়। রোলেক্সের নানান মডেলের ঘড়ি দেখছি, হঠাৎ শুনি পাশের কাউন্টারে পরিচিত গলা। প্রফেসার ব্রায়ান। সঙ্গে আরেক বৃদ্ধ। দুজনে মিলে ঘড়ি দেখছেন।
আমি ব্রায়ানের সঙ্গে কথা বলার জন্য এগোচ্ছি, হঠাৎ চোখ পড়ল প্রফেসার ব্রায়ানের সঙ্গীর ওপর। ভদ্রলোক পকেট থেকে অদ্ভুত স্বচ্ছ এক ইঞ্চি লম্বা একটা কার্ড বের করে একঝলক কী যেন দেখে নিয়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন। খানিকবাদে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেউ দেখছে কি না দেখে নিয়ে ওই কার্ডটা পকেট থেকে বের করে হাতের তালুতে নিলেন। আমার যেন মনে হল কার্ডটা হাতের তালুর সঙ্গে মিশে গেল। আমি সামনের কাচের মধ্যে পুরো ঘটনাটা দেখতে পেলাম। ওই ভদ্রলোক টেরও পেলেন না।
প্রফেসার ব্রায়ান আমাকে দেখে প্রথমে চিনতে পারলেন না। তারপরে লাইব্রেরির কথা বলতে খেয়াল করতে পারলেন। জানালেন আফ্রিকা থেকে কয়েকদিন আগে ফিরে এসেছেন। ওই বাড়িতেই আছেন। কিন্তু সঙ্গের ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আলাপ করালেন না। আমিও কার্ড হাতে মিশে যাওয়ার অদ্ভুত ব্যাপারটার কোনও উল্লেখ করলাম না। ওনারা কুড়ি হাজার ইউরো দিয়ে একটা রোলেক্স ঘড়ি কিনে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি নিজেও ঘড়ি দেখছিলাম। যদিও অত দামের নয়। কাচের কাউন্টারের ওপর হাত রাখতে হঠাৎ মনে হল কাচের একটা জায়গা খুব গরম। আশপাশের জায়গা থেকে অনেক বেশি গরম। খেয়াল হল প্রফেসারের সঙ্গী ভদ্রলোক ঠিক ওই জায়গায় হাত রেখেছিলেন। কেন জানি না কীরকম একটা রহস্যের গন্ধ পেলাম। মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করে ফেললাম যে ওনাদের পিছু নেব। কোথায় যান দেখব। ‘ওয়্যারস’ থেকে বেরিয়ে এলাম।
গ্র্যাফটন স্ট্রিটের ভিড়ে কাউকে খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত। দেশ-বিদেশের ট্যুরিস্টের ভিড়। রাস্তায় এক জায়গায় একজন ব্যানজো বাজাচ্ছিল। তাকে ঘিরে অনেক লোকের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই একঝলক দেখা পেলাম প্রফেসর ব্রায়ানের। খানিকবাদে বাজনা থামাতে ওনারা সেন্ট স্টিফেন্স গার্ডেনের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। গ্র্যাফটন স্ট্রিটের শেষপ্রান্তে দৃষ্টিনন্দন স্টিফেন্স গ্রিন শপিং কমপ্লেক্স। তার পাশেই ওনাদের গাড়ি পার্ক করা ছিল। গাড়ি নিয়ে ওনারা ও’কোনেল স্ট্রিটের দিকে রওনা দিলেন।
আমার গাড়ি গ্র্যাফটন স্ট্রিটের অন্যদিকে রাখা। তাই একটা ট্যাক্সি ধরলাম। ও’কোনেল স্ট্রিট, ন্যাসাও স্ট্রিট ধরে ওদের গাড়ি ফিনিক্স পার্কের দিকে এগিয়ে চলল। ওদিকটা আমার বিশেষ চেনা নয়। আমার ট্যাক্সি শুধু এ-রাস্তা ও-রাস্তা হয়ে ওই গাড়ির পিছন পিছন চলল।
প্রায় একঘণ্টা পরে গাড়িটা একটা জর্জিয়ান স্টাইলের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বড়-বড় কাচের জানলা। লাল ইটের বাড়ি। জানলার ওপরে আর্চ।
আমার ট্যাক্সিটা এমন একটা জায়গায় দাঁড় করালাম যাতে ওনাদের চোখে না পড়ে। ভাড়া মিটিয়ে বাড়িটার দিকে এগোলাম। ওনারা ইতিমধ্যেই বাড়িতে ঢুকে গিয়েছিলেন। বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে কী করব ভাবছি। হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। প্রফেসর ব্রায়ান বেরিয়ে এসে বললেন,—এসো অনিলিখা, তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। শুধু-শুধু খরচ করে ট্যাক্সিতে এলে। আমাদের সঙ্গেই আসতে পারতে।
খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও আমি সামলে নিয়ে বললাম,—আপনার সঙ্গে আরেকটু কথা বলার সুযোগ ছাড়তে পারলাম না।
—আর মি: রুপেলের সঙ্গে? মুচকি হেসে ব্রায়ান আমাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। ঢুকেই বাঁ-দিকে বড় ড্রয়িংরুম। সেখানে ঢুকেই ‘ওয়্যারস’-এর সেই ভদ্রলোকের দেখা পেলাম। লেদারের সোফায় বসে একটা ছোট বই-এর সাইজের ল্যাপটপে কীসব কাজ করছেন।
ভদ্রলোকের বয়স ব্রায়ানের মতোই হবে। মাথায় পাকা চুল। চোখ-মুখ তীক্ষ্ণ, কিন্তু মুখটা ভাবলেশহীন। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করলেন। প্রফেসার ব্রায়ান ফায়ার প্লেসটা জ্বেলে দিয়ে আমার আর রুপেলের জন্য সামান্য রেড ওয়াইন নিয়ে এসে সোফায় বসলেন।
—মি: রুপেলকে দেখে কি মনে হয় যে ওনার বয়স ১৪০?
—একশো চল্লিশ! ওনার বয়স সত্তরের বেশি বলে তো মনে হয় না! একশো চল্লিশ কী করে হবে? সবথেকে বেশি বয়সি জীবিত যিনি আছেন তাঁরই বয়স তো একশো দশ।
ব্রায়ান হেসে উঠলেন,—মি: রুপেল কিন্তু তোমার থেকে বয়সে অনেক ছোট।
মি: ব্রায়ান আমার সঙ্গে সমানে হেঁয়ালি করছেন দেখে অবাক হলাম। বললাম,—মি: রুপেলের বয়স তাহলে কত?
—যে দুটো কথা বললাম, দুটোই ঠিক। ওনার জন্ম ২৫২৫ সালে।
আমার হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ইতিমধ্যে মি: রুপেল একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। ডান হাত দিয়ে বাঁ-হাতের মধ্যমা ছুঁয়ে বলে উঠলেন,—লুক।
সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম আমাদের প্রত্যেকের বসার পজিশন আর ঘরের আসবাব পরিবর্তিত হয়ে গেল।
মি: ব্রায়ান বলে উঠলেন,—এক্ষুনি রূপেল যেটা দেখাল সেটা ভার্চুয়াল রিয়ালিটির নিপুণ উদাহরণ। একটা পরিবর্তিত ছবি আমাদের অনুভূতি কেন্দ্রগুলোর ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হল। ওরা আজকাল এভাবে হাসপাতালে বাড়ির পরিবেশ তৈরি করে। বাড়িতে নকল অতিথিদের ডেকে এনে এভাবে আড্ডা মারে। বিজ্ঞান যে কত এগিয়ে গেছে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
অবিশ্বাসী চোখে মি: রুপেলের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ব্রায়ান ফের বলে উঠলেন,—বলেছিলাম না টাইমট্রাভেল একদিন সম্ভব হবে। তা রুপেল, কবে তোমরা টাইমট্রাভেল প্রথম আয়ত্ত করলে? তোমার ল্যাঙ্গোয়েজ ট্রানস্লেটার ব্যবহার করে আমাদের সমসাময়িক ইংরেজিতে বলো। বলে আমার দিক ফিরে ফের বলে উঠলেন,—ওদের ভাষা এখন অনেক সংক্ষিপ্ত ও সাংকেতিক হয়ে গেছে। ওদের ইংরেজি কিছুই বোধগম্য হবে না।
মি: রুপেল সহজবোধ্য ইংরেজিতে আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলেন,—২৫২০ সালে টাইমট্রাভেলের পরীক্ষা প্রথম সফল হয়। একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী টাইমট্রাভেলের জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেন তার পনেরো বছর পরে। ওই যন্ত্রের সাহায্যে দুজনের টিম দশবছর অতীতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেই বিপত্তি। তাঁদের যাত্রা সফল হয়। কিন্তু অতীত থেকে তাঁরা যখন ফিরে আসেন, তখন তাঁদের কল্যাণে বর্তমানই গেছে পালটে। এরপর টাইমট্রাভেল নিয়ে ফের নানারকম গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষা চলে। ২৫৫০ সালে এ সমস্যার সমাধান হয়। ফের চালু হল টাইমট্রাভেল।
—তা সমস্যা সমাধান হল কী করে?
—মূল সমস্যা ছিল অতীতে গিয়ে কোনও কিছু পরিবর্তন করে দিলে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু, সেখানে আর ফেরা যায় না।
—তাই এই যে আপনি রোলেক্স ঘড়ি কিনলেন, তার জন্যও তো ভবিষ্যৎ পরিবর্তিত হয়ে গেল। তাই না!
—না, অত সহজে সবকিছু পালটে যায় না। তবে হ্যাঁ, আমি যদি ঘড়ি চুরির দায়ে ধরা পড়তাম, তাহলে হয়তো যেখান থেকে এসেছি সেখানে ফিরতে পারতাম না। তবে অতীতে গিয়ে যাতে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন না ঘটাই, তার জন্য একটা যন্ত্র আবিষ্কার হয়। আজকাল টাইমট্রাভেলে কেউ গেলে তার হাতে বাধ্যতামূলকভাবে ওই যন্ত্র লাগিয়ে দেওয়া হয়। বলে রুপেল হাত থেকে একটা কার্ড বের করে আনলেন। এই কার্ডটাই আমি দোকানে দেখেছি।
ফের বলে ওঠেন,—দেখে মনে হবে সামান্য কার্ড, কিন্তু এর মধ্যেই মানবসভ্যতার যাবতীয় ইতিহাস, খুঁটিনাটি তথ্য ঢোকানো আছে। যখনই এই কার্ড দেখে যে টাইমট্রাভেলের জন্য নথিভুক্ত ইতিহাস পালটে যাচ্ছে, তখনই কারেকটিভ অ্যাকশন নেয়। ইতিহাস যাতে না পালটে যায়। তা না হলে ফিরে দেখা যাবে বর্তমানই পালটে গেছে।
এবার মি: ব্রায়ান বলে ওঠেন,—মি: রুপেল কিন্তু বিজ্ঞানী নন। উনি নামকরা ঐতিহাসিক। ওনার যাত্রার উদ্দেশ্য ইতিহাসকে যাচাই করে ঠিকভাবে রেকর্ড করা। আর সে উদ্দেশ্যেই উনি অতীতের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন। ওই তথ্যই ঢুকে যাবে ওই কার্ডের পরবর্তী আপগ্রেডে। এর আগে উনি নীরোর রোমে গিয়েছিলেন। এখানে আসার উদ্দেশ্য আমার সঙ্গে দেখা করা। আমার বইতে লেখা সূত্রের ওপরেই টাইমট্রাভেলের গবেষণা সফল হয়।
—প্রফেসর ব্রায়ানকে আমাদের সময়ে সবাই চেনে। পাঁচশো বছর আগে উনি যে এসব ভেবেছিলেন তা ভাবাই যায় না।
খানিক থেমে মি: রুপেল ফের বলে ওঠেন,—এই গবেষণার প্রথম বড় পদক্ষেপ মি: ব্রায়ানের পার্টিকল অ্যাকসিলেটারের সূত্র। তবে তাতে অনেক পদ্ধতিগত সমস্যা ছিল যার জন্য পাঁচশো বছর তার প্রয়োগ করা হয়নি।
এবার আমি আর প্রশ্ন না করে পারি না,—টাইমমেশিন ঠিক কীরকম হয় তা নিয়ে আমার খুব কৌতূহল আছে। টাইমমেশিন মানেই তো মহাকাশযান। তা অত বড় জিনিস তো আর বাড়িতে রাখা সম্ভব নয়।
—কে বলল সম্ভব নয়? যদি বলি এ বাড়িতেই রাখা আছে! বলে মি: রুপেল ঘরের কোণের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। ছোট একটা ৬ বাই ৬ ফুটের কাচের ঘর। মধ্যে তিনটে সিট। অত্যন্ত ছোট-ছোট যন্ত্রপাতি, প্যানেল, সুইচ।
—এটা এখন গ্যারেজে রাখা আছে। একধরনের পার্টিকল অ্যাকসিলেটার। এর সাহায্যে আমরা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল তৈরি করে তার মাধ্যমে অতীতে বা ভবিষ্যতে যাতায়াত করি। ন্যাচারাল ব্ল্যাকহোলের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে মি: রুপেল ফের বলে উঠলেন, —তা তুমি কি এতে যেতে চাও? অতীতে যেতে পারো। তবে একটাই শর্ত। তোমার ভূমিকা হবে শুধু দর্শকের।
—অবশ্যই, আমি সব শর্ত মানতে রাজি।
—তা তুমিই বলো কোথায় কোন বছরে যেতে চাও?
—আগ্রা, ১৬৫৩ সাল।
—সেখানে কী আছে?
—তাজমহল। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা স্থাপত্যের মধ্যে একটা। ১৬৫৩ সালে তাজমহল তৈরি প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল।
—তা এত কিছু থাকতে হঠাৎ তাজমহল?
—তাজমহলের শিল্পকর্ম স্থাপত্য ছোটবেলা থেকেই আমাকে খুব আকর্ষণ করে। তা ছাড়া, মুঘল সাম্রাজ্যের ওই সময়ের হাল-হকিকতও দেখা যাবে। আর ইতিহাসে দেখার মধ্যে তো যুদ্ধ-বিগ্রহ। ওসবের মধ্যে গিয়ে টেনশন বাড়িয়ে কী লাভ!
—ঠিক বলেছ। এমনিতেই তাজমহলে যাওয়া আমার এজেন্ডার মধ্যে ছিল। একজন ভারতীয়কে সঙ্গী পাব আশা করিনি। ধর্মের জন্য, রাজনৈতিক কারণে আমাদের ইতিহাস এত বিকৃত হয়ে গেছে যে ঠিক কী ছিল তা জানতেই আমার আসা। অতীতকে সঠিকভাবে না ধরে রাখতে পারলে কী করে বুঝতে পারব যে আমরা অতীতকে পরিবর্তন করে ফেলছি না!
—তাহলে আর কী! কালই যাওয়া যাক। শুভস্য শীঘ্রম। ব্রায়ান বলে উঠলেন।
চার
পরের দিন অবশ্য যাওয়া হয়নি। পুরোদিন যাওয়ার প্রস্তুতিতেই কেটে গেল। মুঘল আমলের পোশাক জোগাড় করতে হয়েছে। ল্যাঙ্গোয়েজ ট্রানস্লেটর লাগিয়ে তৎকালীন পারসি ভাষা একটু প্র্যাকটিস করতে হয়েছে। এর মাঝে মি: রুপেল কী একটা যন্ত্র আমার মাথায় লাগিয়ে দিলেন। বললেন, ইতিহাস-জ্ঞান হবে। যন্ত্রটা একমিনিট পরে খুলে নেওয়া হল। তখনই মনে হল আমি ওই সময়ের জীবনযাত্রা, তাজমহল, শাহজাহান, তৎকালীন লোকাচার-সুফি চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে অনেক ওয়াকিবহাল হয়ে গেছি। যেমন দিল্লির তৎকালীন নাম ছিল শাহজাহানাবাদ। শাহজাহান শাহজাহানাবাদকে রাজধানী ঘোষণা করেন ১৬৪৮ সালে। তাজমহলের মূল স্থপতি ছিলেন পারসি স্থপতি ইসা খান এফেন্দির ছাত্র ওস্তাদ আহমেদ লাহোরী। বুঝলাম, এরকম বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য আমার মাথায় পুরে দেওয়া হয়েছে।
মি: রুপেল দেখি বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন,—আর্জুমান্দ বায়ুকোম। মুমতাজের আসল নাম।
পরদিন সকাল ন’টায় আমরা যাত্রা শুরু করলাম। সুইচ অন করার সঙ্গে-সঙ্গেই মনে হল অকল্পনীয় গতিতে কোথায় ছুটে চলেছি। তারপরেই আর কিছু মনে নেই—জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।
যখন জ্ঞান ফিরল, সারা গায়ে ব্যথা। টাইমমেশিনের মধ্যেই একটা ধানখেতের মধ্যে এসে পড়েছি। ভোর হচ্ছে। টাইমমেশিন থেকে বেরিয়ে এলাম।
—তুমি ১৬৫৩-তে এসে গেছ অনিলিখা। মাথার ওপরের এই আকাশ, এই ধানখেত, দূরে যে মাটির বাড়ি দেখছ—সব ১৬৫৩-র। আমরা ঠিক একঘণ্টা এখানে থাকব।
—যন্ত্রটার কী হবে?
—ওটা নিয়ে চিন্তা কোরো না। ওটা গিরগিটির মতো রং পরিবর্তন করে ধানখেতের মধ্যে মিশে যাবে। চলো, তাজমহলের দিকে এগোনো যাক।
মিনিট পাঁচেক হাঁটার পরে ধানখেত ছেড়ে মাটির রাস্তায় উঠলাম। চারদিকে ফাঁকা মাঠ। দূরে দূরে দু-একটা মাটির বাড়ি। আরও মিনিটপাঁচেক হাঁটার পরে একজন চাষির সঙ্গে দেখা হল। আমরা মুমতাজের সমাধিক্ষেত্র কোথায় তৈরি হচ্ছে বলতে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল। চারক্রোশ পথ আধঘণ্টা লাগবে। টাইমমেশিনে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ দিতে সামান্য ভুল হয়েছিল নিশ্চয়।
ভাগ্য ভালো খানিকবাদে একটা ঘোড়ার গাড়ি দেখতে পেলাম। ওটা নাকি কোন এক খানাজাদের গাড়ি। খানাজাদ বলতে সরকারি কর্মচারী বোঝায়। ভাড়া পেলে আমাদের নিয়ে যেতে রাজি। বুঝলাম দুর্নীতি তখন থেকেই ছিল। সরকারি গাড়ি ভাড়ায় খাটাচ্ছে। আমরা কিছু বলার আগেই বিশুদ্ধ পারসিতে বলে উঠল,—তাজমহল তো?
ও কী করে বুঝল জিগ্যেস করতে দৃপ্তভাবে বলে উঠল,—সব ট্যুরিস্ট তো ওখানেই যায়।
মি: রুপেল অযাচিতভাবে আমাদের পরিচয় জানালেন। আমরা নাকি মুঘল সম্রাটের আমন্ত্রিত ফ্রেঞ্চ জুয়েলার ট্যাভারনিয়ার-এর বন্ধু। বলে ট্যাভারনিয়ার-এর গুণকীর্তন শুরু করলেন। বুঝলাম মি: রুপেল ওনার সদ্যলব্ধ ইতিহাসের জ্ঞান জাহির করছেন।
আমিও খানিকক্ষণের মধ্যে পারসি ভাষায় কোচোয়ানের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলাম। পাঁচশো বছর আগের কারুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তো আর বারবার আসে না। তা কথাপ্রসঙ্গে জানলাম সম্রাট কান্দাহার নিয়ে যুদ্ধে খুব ব্যস্ত। ওদিকে আহমেদনগরে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। বাংলার পোর্তুগিজরা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মনসবদারের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে হানা দিচ্ছে। সমর্থ লোক দেখলেই সেনাদলে ভরতি করে নিচ্ছে। চাষবাসের অবস্থা তাই খুব খারাপ। ওদিকে আবার সম্রাটের নানারকম শখ। লালকেল্লা, আগ্রাদুর্গ, জুম্মা মসজিদ—তৈরি করতে, যুদ্ধ-বিগ্রহের খরচ চালাতে গিয়ে রাজকোষ ফাঁকা হয়ে গেছে। তাই নানান ধরনের ট্যাক্স বসানো হয়েছে।
এসব কথার মধ্যে দেখি উলটোদিকের রাস্তা দিয়ে অনেকগুলো ঘোড়সওয়ারি আসছে। সামনের ঘোড়ায় সুসজ্জিত এক সৈনিক। অবাক হলাম আমাদের দেখে বিন্দুমাত্র কৌতূহল প্রকাশ করল না। চলে যাওয়ার পরে কোচোয়ান আলিমর্দন খান বলে উঠল,—এখানকার ফৌজদার। এখানকার সরকারের প্রধান।
বলতেই ‘আইন-ই-আকবরি’-র কথা খেয়াল হল। অনেকগুলো গ্রাম মিলে মহল আর অনেকগুলো মহল মিলে সরকার। ফৌজদার তাই বড়রকমের সরকারি পোস্ট। এখানকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট।
ব্রায়ান বলে উঠলেন, —তা আমাদের খেয়াল করেনি? আমাদের দেখে তো বিদেশি মনে হওয়া উচিত।
আলিমর্দন বলে উঠল,—আপনাদের দেখে ট্যুরিস্ট ভেবেছেন।
—ট্যুরিস্ট?
—তাজমহলের তো টাকার অভাবে তৈরিই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নানান দেশ থেকে যেসব শ্রমিক, কারিগর, শিল্পীরা এসেছিল—তারাও ফেরত চলে গিয়েছিল। মূল সমাধি গড়ার কাজ অবশ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর মাকরানা মার্বেল আর আরও সব দামি পাথর কিনতে গিয়ে রাজকোষ প্রায় ফাঁকা। বছরদশেক কাজ বন্ধ ছিল। তারপর ট্যুরিস্ট আসতে শুরু করল। আপনাদের মতো দেখতে। ধীরেসুস্থে হাঁটে—মিনমিন করে কথা বলে। গায়ে জোর নেই। প্রথমেই সবাই এসে জিগ্যেস করত ‘তাজমহল কোথায়’? খুব সুন্দর পারসিতে কথা বলে ওরা। আমরা অত ভালো বলি না। তা তাজমহল তো তখন প্রায় ফাঁকা মাঠ! তারপর ওরাই খরচ করে ওদের যন্ত্র দিয়ে কাজ শুরু করল। কোন মুলুক থেকে ওসব যন্ত্র আমদানি করে কে জানে? সেসব আজব যন্ত্র। এখন আবার কাজ ভালোই এগোচ্ছে। শেষ হলে দেখার মতো জিনিস হবে। সম্রাট অবশ্য ফরমান দিয়েছেন ট্যুরিস্টদের সঙ্গে কাজের বাইরে একদম মেলামেশা না করতে।
মি: রুপেলকে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বলতে শুনলাম,—ও মাই গড! আর মিনিটখানেকের মধ্যেই আমরা তাজমহলের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। দূরে তাজমহলের গম্বুজে সোনার কাজ চলছে। কোমাৎসু কোম্পানির এক্সক্যাভেটর তার বিশাল-বিশাল রোবোটিক্স হাত বাড়িয়ে মাটি খুঁড়ছে। মাকড়সার মতো দেখতে কয়েকটা রোবট মিনারগুলোর গা বেয়ে উঠে পাথর পালিশ করছে। কিছু রোবট আবার চারদিকের বাগানের জন্য মাটি উঁচু করার কাজ করছে। আমাদেরই মতো অনেক লোক হাতের তালুর সাইজের ওয়্যারলেস ল্যাপটপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মি: রুপেল বললেন ওগুলো দিয়েই সব রোবট নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে সবাই যে ওদের মতো তা কিন্তু নয়। বেশ কিছু লোককে দেখলেই বোঝা যায় যে তারা ওই সময়ের। আলিমর্দনের মতো পোশাক-আশাক, চেহারা। একজন সুসজ্জিত দাঁড়িওয়ালা রাজবেশী লোককে দেখে ব্রায়ান বলে উঠলেন,—শাহজাহান?
আলিমর্দন হেসে বলে উঠল,—সম্রাট এভাবে এখানে আসবেন? উনি হলেন পারস্যের হস্তলিপি বিশারদ আমানত খান। সব লেখা খোদাইয়ের কাজ উনিই দেখছেন।
বুঝলাম বিশেষ কিছু কাজে এখানকার লোকেরা নিযুক্ত আছে। আর ট্যুরিস্টরা হল টাইমট্রাভেল করে ভবিষ্যৎ থেকে আসা লোকজন। তাজমহল দেখতে এসে আটকে পড়েছে। তাজমহলের কাজ শেষ না করে বেরোতে পারছে না। অতীতকে ঠিক মতো না তৈরি করতে পারলে ওদের আর ফেরা সম্ভব হবে না। কারণ ওদের গায়ে লাগানো কার্ড ফিরে যাওয়া অ্যালাউ করবে না। কার্ডের হিসেবে তাজমহল আছে সত্যিকারে যদিও নেই।
আমরা বেশিক্ষণ থাকিনি। ঠিক একঘণ্টা বাদেই ফিরে এসেছিলাম ২০০৬-এ। আসার পরে মি: রুপেল বলেছিলেন,—তাজমহলের কথা একইরকম রেখে দেব। অতীতের তো একটা ভিত্তি থাকতে হবে।
খানিকক্ষণ থেমে অনিলিখাদি ফের বলে উঠল,—ভালোই করেছ বিশ্বজিৎ, তাজমহল দেখে এসেছ। তোরাও তাড়াতাড়ি দেখে আসিস। বলা যায় না, কালকে যদি ওরা অন্যরকম কিছু করার কথা ভাবে।
বিশ্বজিৎদা খুকখুক করে কেশে মুচকি হেসে বলে ওঠে,— অনিলিখা, আজ তোমার চালে সামান্য ভুল হয়ে গেছে। গল্পটায় একটা বড় মিসটেক করে বসে আছ। আচ্ছা, সবাই ভবিষ্যৎ থেকে গিয়ে আটকে পড়ে গেল যাতে নথিবদ্ধ ইতিহাস পরিবর্তিত না হয়ে যায়। অথচ তোমরা গেলে ড্যাংড্যাং করে, আবার বহাল তবিয়তে ফিরে এলে। তোমারও তো তাজমহল তৈরিতে হাত লাগানো উচিত ছিল। বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে বিশ্বজিতদা ফের বলে উঠল,—তাজমহল কে করেছে? দ্য লেডি আর্কিটেক্ট অনিলিখা।
অনিলিখাদি সপ্রতিভভাবে উত্তর দিল,—বুদ্ধিমান কাউকে যে এতটা বুঝিয়ে বলা দরকার, জানা ছিল না! আচ্ছা, যারা ইতিহাস লিখতে যায়, তারা কি কখনও ওরকম কার্ড নিয়ে ট্রাভেল করে! মি: রুপেল তো ইতিহাস রচনা করতে গিয়েছিলেন, নিশ্চিত না হয়ে উনি কি এমনভাবে ট্রাভেল করবেন যাতে উনি নিজেই আটকে যান! আর তাজমহল? আমিই বলেছিলাম তাজমহলের বর্ণনাটা হুবহু একইরকম রেখে দিতে।
সেদিক থেকে বিশ্বজিৎ তুমি ভুল বলোনি। আমি একরকমভাবে তাজমহলের আর্কিটেক্ট।
