দিন প্রতিদিন – ৩০
৩০
রাত দুটো।
নিউজ চ্যানেল চলছে। রেকর্ডেড প্রোগ্রাম দেখাচ্ছে।
টিভিতে ডিপার্টমেন্টের বদনাম হচ্ছে। তিলজলা থানার ওসি নীল বাগচী চা খাচ্ছিল। একজন বেশ চিৎকার করছেন। নীলের খারাপ লাগে না। সে মজা পায়। ভালো কথা শুনলেই বরং অবাক লাগে।
দরজা ঠেলে অরিত্র ঢুকল, ‘আমি বেশ কিছুক্ষণ বাইরে বসে আছি। একটু আর্জেন্ট ছিল।’
নীল বলল, ‘ওহ, হ্যাঁ, আমাকে বলেছিল। এক্সট্রিমলি সরি। বসুন প্লিজ।’
অরিত্রকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। সে বলল, ‘আমি একটা বিপদে পড়ে এসেছি স্যার। আমার ওয়াইফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্লু বেঙ্গল হোটেলে পার্টি ছিল। ওখানে যাবার পর থেকে ফোনে পাইনি। হোটেলে পৌঁছনোর পর দেখা গেল যে পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল, সেটায় যায়নি। সিসিটিভি দেখতে চাওয়ায় জানা গেল ক্যামেরা খারাপ আছে। আমি কী করব?’
নীল বলল, ‘মিসিং ডায়েরি করুন। ডিটেলস দিয়ে যান। আমি দেখছি কী করা যায়।’
অরিত্র বলল, ‘হোটেল বলছে সিসিটিভি খারাপ। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। একটা কিছু করে জানা যায় না? জোর করে? ওরা মিথ্যে বলতে পারে তো?’
নীল জলের গ্লাস এগিয়ে দিল, ‘আপনি বসুন। জল খান। একটু শান্ত হন। আমি দেখছি।’
অরিত্র বলল, ‘বসতে পারছি না। শান্ত হব কী করে বলুন তো? কাদের না কাদের পাল্লায় পড়েছে, কেউ যদি কিছু করে ফেলে?’
নীল বলল, ‘প্লিজ বসুন।’
অরিত্র বসল। একবারে গ্লাসের পুরো জল শেষ করে বলল, ‘কতগুলো ইরেসপন্সিবল লোক। আমি বার বার বলেছিলাম যেও না। কে শুনবে কথা? এবার কী হবে?’
নীল বলল, ‘শুরু থেকে বলুন। আপনার ওয়াইফের নাম কী?’
অরিত্র বলল, ‘এণাক্ষী। মায়ের শপথ সিরিয়ালে ছিল। সিরিয়াল দেখলে অনেকেই চিনতে পারবে। আমার সঙ্গে কয়েকদিন ধরে মনোমালিন্য চলছে। আমি একরকম রাগ করেই ওকে বলেছিলাম সংসার থেকে চলে গেলে আমার কোনও সমস্যা নেই। ও ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে হোটেলে গেছিল পার্টিতে জয়েন করতে। আমার পরে অনুতাপ হয়। আমি ওকে খুঁজতে হোটেলে গিয়ে দেখি একজন অরগানাইজারকে ও ওর ব্যাগটা দিয়ে দেয়। তারপর ওর পার্টিতে ঢোকার কথা ছিল। কিন্তু আর ঢোকেনি বা ওকে কেউ দেখেনি। আমি যখন হোটেলে গিয়ে বললাম আমাকে সিসিটিভি দেখাতে, বলছে ক্যামেরা খারাপ।’
নীল বলল, ‘ছবি দেখান।’
অরিত্র ফোন বের করে নীলকে ছবি দেখাল। নীল ছবি দেখেই বলল, ‘এইতো, এনাকে তো আমি চিনি। আমার স্ত্রী সিরিয়াল দেখেন। ও যখন দেখে আমিও দেখেছি। ইনি নিখোঁজ?’
অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ।’
নীল বেল বাজাল। কনস্টেবল আলম এল। অরিত্র বলল, ‘ওর কাছ থেকে ডিটেলস নিয়ে একটা মিসিং ডায়েরি করান।’
অরিত্র বলল, ‘আর কিছু করার নেই?’
নীল বলল, ‘আপনি ছবিটা আমাকে হোয়াটস অ্যাপ করুন।’
অরিত্র বলল, ‘আর হোটেল?’
নীল চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেটা ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা আগে ডায়েরিটা করুন। তারপর যাব।’
অরিত্র বলল, ‘ঠিক আছে।’
নীল ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে দিল।
মিসিং ডায়েরি করার পরে নীল অরিত্রকে বলল, ‘চলুন। যাওয়া যাক।’
রাতের কলকাতা। রাস্তা একবারে ফাঁকা। নীল বলল, ‘আপনি ফোন করতে পারতেন। এতটা এলেন কেন?’
অরিত্র বলল, ‘আমার মাথা কাজ করছে না। আমি কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। এত রাতে…বুঝতে পারছেন তো?’
নীল বলল, ‘পার্টি কি এখনও চলছে?’
অরিত্র বলল, ‘না মনে হয়। তখনই অনেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সুবীরের থাকার কথা। বলেছিল দেখছে।’
হোটেলের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াল। সুবীর বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। অরিত্র ডাকল, ‘সুবীর।’
সুবীর এগিয়ে এল। চিন্তিতমুখে বলল, ‘কোনও খবর পেলে?’
অরিত্র মাথা নাড়ল, ‘না। কিচ্ছু পাইনি।’
নীল বলল, ‘আপনার কাছে ব্যাগ দিয়ে গেছিলেন?’
সুবীর বলল, ‘হ্যাঁ।’
নীল বলল, ‘চলুন দেখি।’
রিসেপশনে পৌঁছে নীল রিসেপশনিস্টকে বলল, ‘সিসিটিভি কবে থেকে খারাপ?’
রিসেপশনিস্ট অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বুঝল অরিত্র নীলকে নিয়ে এসেছে। বলল, ‘দু-দিন হয়ে গেল। আমরা টেকনিশিয়ানকে খবর দিয়েছি। কাল অ্যাটেন্ড করবে বলেছে।’
নীল বলল, ‘ব্যাপারটার কিন্তু ইনভেস্টিগেশন হবে। আপনি জড়িত থাকলে ফাঁসবেন। আপনি ঠিক বলছেন তো?’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমাদের সিস্টেম লগে সব লেখা থাকে।’
নীল বলল, ‘লগ দেখান।’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘আপনি এপারে চলে আসুন স্যার। সিস্টেমেই আপডেট হয়েছে দেখাচ্ছি। লগ দেখলেই বুঝতে পারবেন এখানে কোনওরকম ম্যানিপুলেশন করা অসম্ভব।’
নীল বলল, ‘আরেকটা পার্টি হচ্ছিল কাদের?’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘প্রাইভেট পার্টি।’
নীল বলল, ‘ডিটেলস দিন।’
অরিত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছে। তার হঠাৎ করে খুব অসুস্থ লাগতে শুরু করেছে…
৩১
মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল সুখেন। দুপুর দেড়টা বাজে।
চা খেতে ইচ্ছে করছিল। এই সময় ভাত খাবার কথা। দিনের বেলায় চা খেয়েই কাটিয়ে দেয় সে।
চা খেলে খিদে চাপা দেওয়া যায়। নইলে কে আবার দুপুরে ঝুপড়িতে গিয়ে রান্না চাপাতে যাবে?
বিল্লু জোর পায়ে দোকানের দিকে আসছে। রাস্তার ওপার থেকেই ডাক ছাড়ল, ‘এই সুখেন, এদিকে আয়।’
সুখেন বলল, ‘কী হয়েছে?’
বিল্লু বলল, ‘আয় না।’
সুখেন দু’দিক দেখে রাস্তা পেরোল। বিল্লু বলল, ‘শমিতা ডাকছে।’
সুখেন বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
বিল্লু মুখ টিপে হাসল, ‘চল দেখতে পাবি কী হয়েছে।’
সুখেন বিরক্ত হল, ‘দূর, কী হয়েছে বলবি তো। এখানে রাখঢাকের কী আছে? আমি কি তোর কুটুম নাকি?’
বিল্লু বলল, ‘তুই একটা লোক নিয়ে এসেছিলি না?’
সুখেন বলল, ‘আমি নিয়ে যাইনি। লোকটা শমিতার খোঁজ করছিল।’
বিল্লু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ বে। সে মাল কী করেছে জানিস?’
সুখেন দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘কী করেছে?’
বিল্লু বলল, ‘পারুলের পায়ে হাতুড়ি মেরে দিয়েছে।’
সুখেন স্তম্ভিত হয়ে বলল, ‘সে কি? চল চল।’
দৌড়তে শুরু করল সুখেন। বর্ষার সময় বর্ষা না হয়ে রোদ থাকলে বিচ্ছিরি গরম পড়ে যায়। দৌড়তে-দৌড়তেই সুখেন বুঝতে পারছিল কাহিল হয়ে গেছে। শমিতার ঘরের সামনে গিয়ে সে কাশতে শুরু করল। দরজা খোলাই ছিল।
বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখল দিব্যেন্দুকে বারান্দায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। দিব্যেন্দু গম্ভীর মুখে মেঝেয় বসে আছে। পারুল চিৎকার করছে, ‘ওরে বাবা রে, মারে, মরে যাব!’
শমিতা তাকে দেখে ছুটে এল, ‘কীরে, ইচ্ছে করে এই পয়মালটাকে নিয়ে এসেছিলি নাকি?’
সুখেন দেখল দিব্যেন্দু টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। সে দিব্যেন্দুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ‘এটা কী হল দাদা?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি মেয়েটার মধ্যে আমার বউকে খুঁজছিলাম। আমার বউ পালিয়েছে রাতে। ওকে হাতুড়ি দিয়ে মারতাম, একেও মেরেছি।’
শমিতার হাতে ঝাঁটা ছিল। সে মনে হয় এর আগেও দিব্যেন্দুকে দু-চার বাড়ি দিয়েছে। এ কথাটা শুনে ঝাঁটা পেটা শুরু করে দিল। দিব্যেন্দু নির্বিকারভাবে বসে বসে মার খেতে লাগল।
সুখেন হাত তুলল, ‘মারতে হবে না। আমার মনে হয় একে পার্টির ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। লোকটা পাগল। ছিট আছে।’
দিব্যেন্দু জ্বলে উঠল, ‘তোর বাবার ছিট আছে শুয়োরের বাচ্চা।’
শমিতা আঙুল তুলল দিব্যেন্দুর দিকে, ‘শোন, আমি এখনও কাউকে বলিনি। যদি বলি না, তোর কপালে দুঃখ আছে। আমাদের মেয়েটাকে মেরেছিস তুই। এখানকার লোক জানতে পারলে তোর কপালে বিরাট দুঃখ আছে। ডাকবো দেখবি?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘ডাকো। আমার আর কী? বউ পালিয়েছে। মারলে মারবে।’
শমিতা কাঁদো কাঁদো মুখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করব?’
সুখেন বলল, ‘আমার মনে হয় বউ পালিয়ে গেছে বলে লোকটার কোনও সমস্যা হয়েছে। বসিয়ে রাখ এখন। না না, তা না, এটাকে ঘরে আটকে রাখা যাক। এই চল তো।’ দিব্যেন্দুর হাত ধরে টানল সুখেন। দিব্যেন্দু বাধা দিল না। সুখেনের সঙ্গে হাঁটতে থাকল। একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে দিব্যেন্দুকে বাইরে থেকে আটকে দিল সে।
শমিতা কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘এক একটা এসে জোটেও। পারুলকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’
সুখেন বলল, ‘আমিই নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু একে কী করবি?’
শমিতা বলল, ‘টাকা পয়সা কী আছে দেখি। থাকলে ছেড়ে দেব। নইলে পার্টির লোকেদের হাতে দিয়ে দেব। জেলের হাওয়া খেয়ে আসুক।’
সুখেন বলল, ‘এসেই মেরে দিল?’
শমিতা বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ঢোকালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি পারুল চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। আমি ভাবলাম গাঁতিয়ে লাগাচ্ছে। পারুলের চিৎকার দেখি থামেই না। তারপর দরজা খুলে পারুল বেরিয়ে এল।’
সুখেন বলল, ‘বাকি মেয়েগুলো কোথায়?’
শমিতা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘ওরা বেরিয়েছে।’
সুখেন অবাক হয়ে বলল, ‘সবাই?’
শমিতা বলল, ‘হ্যাঁ।’
সুখেন পারুলের দিকে তাকালো, ‘চল রে। তোকে নেয়নি কেউ, তোর কপালই খারাপ যা দেখছি।’
শমিতা হাত তুলল, ‘থাক। তোকে যেতে হবে না। আমি দেখছি কী করা যায়।’
৩২
‘আপনাকে একটা ভিডিও দেখাব রুমা। দেখবেন?’
খেয়ে ওঠার পর কখন যে ঘুম চলে এসেছিল, বুঝতে পারেনি রুমা। ঘুম ভেঙে দেখল সে একটা সোফায় বসে আছে। তার সামনে একজন ভদ্রলোক পায়চারি করছেন।
সে বলল, ‘আপনি কে?’
লোকটা হাসল, ‘ভুলে গেলেন? আমিই আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলাম তো।’
রুমা বলল, ‘ওহ্। আপনি? আপনাকেই আমি ফোন করেছিলাম? আপনিই নিয়ে এসেছিলেন?’
লোকটা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। আমিই এনেছিলাম।’
রুমা বলল, ‘আচ্ছা আমার সঙ্গে যাকে এনেছিলেন, তার কী হল? সে বাড়ি যেতে চাইছিল যে?’
লোকটা হাসিমুখেই বলল, ‘আমরা দেখছি ব্যাপারটা। কী করা যায়, ঠিক করা হবে।’
রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘মানে? কী করা হবে?’
লোকটা বলল, ‘সেটা পরে আপনি জানতে পারবেন। তার আগে যেটা বলছিলাম, ভিডিও দেখবেন? অলমোস্ট রিসেন্ট ভিডিও।’
রুমা বলল, ‘দেখান।’
লোকটা একটা ট্যাব তার দিকে এগিয়ে দিল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দিব্যেন্দু একটা ঘরে ঢুকে আচমকা একটা মেয়ের পায়ে হাতুড়ি মেরে দিয়েছে। রুমা শিউরে উঠল। আরেকটু হলেই তার হাত থেকে ট্যাবটা পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনও মতে বলল, ‘এটা কোথায়?’
লোকটা বলল, ‘রেড লাইট এরিয়ায়। ইনিই আপনার হাজব্যান্ড তো?’
রুমা দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিল। কোনমতে বলল, ‘হ্যাঁ।’
লোকটা বলল, ‘বুঝতে পারছি কোন নরক থেকে আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে। এবার বাকি জীবনটা আপনি কী চান, তা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।’
রুমা বলল, ‘কী চাই মানে?’
লোকটা বলল, ‘আমাদের জীবন এক একটা সময় এমন একটা জায়গায় চলে যায়, যেখান থেকে আমরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারি না। আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি না, বেঁচে থেকে আমাদের কী লাভ।’
রুমা মাথা নিচু করল, ‘হ্যাঁ, আমার সব সময় মনে হতো, মরে গেলেই ভালো হতো।’
লোকটা বলল, ‘আপনি কিন্তু মরে যাননি। আপনি বেঁচে আছেন। আপনি একটা নতুন জীবন পেয়েছেন। প্রতিদিনের নরক যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে গেছেন। আপনি নিশ্চয়ই সেই জীবনে আর ফিরে যেতে চান না?’
রুমা মাথা নাড়ল, ‘চাই না।’
লোকটা বলল, ‘আপনি আপনার বাবার বাড়ি ফিরতে চান?’
রুমা বলল, ‘আমার সে রাস্তা বন্ধ। ওরা কিছুতেই আর আমাকে ফেরত নেবে না। আমার থেকে ভালো কেউ জানে না সেটা।’
লোকটা বলল, ‘আমি আপনাকে একটা অফার দেব রুমা। আপনি যদি চান, কাজটা করবেন না, আমি জোর করব না। কিন্তু আপনার মতো মেয়েরা, যারা জীবনে এতটা সহ্য করে এসেছে, তারা অনেক কাজ করতে পারে। এমন কাজ করতে পারে, যেটা কেউ ভাবতেও পারবে না।’
রুমা বিহ্বল চোখে তাকাল, ‘আমি যে কিছু জানি না। আমি কী করে কোনও কাজ করব?’
লোকটা বলল, ‘জানবেন। একদিনে কিছু হবে না। তার জন্য সময় লাগবে। আমরা আপনাকে তৈরি করব।’
রুমা বলল, ‘কী কাজ?’
লোকটা তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘সেটা এখনই বলব না। আপনার ট্রেনিং শুরু হবে কাল থেকে। দেখুন, আপনি কীভাবে সেটা গ্রহণ করেন। তারপর আমরা আরেকবার কথা বলব না হয়। ঠিক আছে?’
রুমা বলল, ‘ট্রেনিং হবে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমাকে কি আমার শরীর বেচতে হবে?’
লোকটা বলল, ‘শরীর? শরীর কী? এতদিন তুমি কী করেছ শরীর দিয়ে?’
লোকটার যেন একটা অদ্ভুত সম্মোহিনী ক্ষমতা আছে। লোকটা যেন তার মাথায় ঢুকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে যেন। আপনি থেকে তুমিতে চলে গেছে, রুমা বুঝতেও পারল না।
রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তা বলে…’
লোকটা বলল, ‘তোমার কাছে যা আছে, তা সবার কাছে থাকে না। তুমি নিজেই জানো না, তুমি কী করতে পারো। আমরা কেউই জানি না। তুমি আমার কথা শুনে চলো, শুনে দেখ আমি যা বলছি। শুনবে?’
রুমা মাথা নাড়ল, ‘শুনব। আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমার আর কিছু করারও নেই।’
লোকটা এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত দিল, ‘আমি জানি তুমি পারবে। তোমাকে পারতেই হবে।’
রুমা বলল, ‘আমাকে মেরে ফেলবে না তো কেউ?’
লোকটা হাসল, ‘আমরা সবাই একদিন মরে যাই রুমা। তার আগে বেঁচে থাকার মতো বাঁচা দরকার। তাই না?’
৩৩
‘টাকা ভালো না খারাপ?’
‘জানি না। ভালোই হবে। টাকা ছাড়া তো কিছু হয় না।’
‘আর অতিরিক্ত টাকা?’
‘সেটা একটা কথা। আমাদের পাড়ায় একটা বাড়ি ছিল। রোজ সকালে উঠে সে বাড়িতে খেলতে যেতাম। চার-পাঁচটা ভাই। একটা উনুন ছিল। রান্না হচ্ছে। সকালে ডাল আর রুটি করত। আমাকেও দিত। দেখতাম সবাই মিলে খাচ্ছে। সাদামাটা খাবার, তাই কী ভালো লাগত খেতে। দিনে দিনে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। রান্নাঘর আলাদা হয়ে গেল। সবাই আলাদা থাকে। সবার টাকা আছে। ভালো আছে কি তারা?’
দুটো লোক কথা বলছে নুরুলের চায়ের দোকানে। পূর্ণ চুপ করে বসে আছে। তার পকেটে এক তাড়া দু’হাজার টাকার নোট। এত টাকা সে কোনও কালে একসঙ্গে দেখেনি। কী করবে এই টাকাটা নিয়ে বুঝতে পারছে না।
আকাশ কালো করেই আছে। একটু আগে ঝির ঝির বৃষ্টি হয়েছে। এখন বন্ধ আছে। আবার শুরু হবে হয়তো।
টাকাটা পাবার পর থেকে বাপিদার ফোনের ভয়টাও কমেছে তার। টাকার জন্যই তো বাপিদার বাড়িতে থাকতে গেছিল সে। সেই টাকাটাই পেয়ে গেলে আর চিন্তার কী আছে?
উদাস মুখে বিড়ি ধরাল সে। লোক দুটো চলে গেলে নুরুল বলল, ‘কীরে পুন্ন, টাকা দিবি না? তোর অনেক বাকি হয়ে আছে রে।’
পূর্ণ বলল, ‘কত বাকি? হিসেব করেছিস?’
নুরুল ডায়েরি বের করল। চোখ ছোট ছোট করে সেদিকে দেখে বলল, ‘দেড়শো টাকা।’
নুরুল ভালো মানুষ। কোনও দিন টাকার জন্য চা দেওয়া বন্ধ করেনি। পূর্ণ বলল, ‘আজকেই দিয়ে দেব বন্ধু। তুই ভালো বন্ধু। আমার দুঃখের দিনে আমাকে খাইয়েছিস। কত দিন না খেয়ে ছিলাম, তুই ডিম টোস্ট করে খাইয়েছিস। তোকে টাকা না দিয়ে কোথায় যাব রে ভাই?’
নুরুল খুশি হল, ‘কী হয়েছে রে তোর? এত ভালো ভালো কথা বলছিস কেন?’
পূর্ণ উঠে নুরুলের কাছে গিয়ে বলল, ‘টাকা পেয়েছি ভাই। কোত্থেকে পেয়েছি, জিগ্যেস করিস না। তবে পেয়েছি। সমস্যা হল, টাকাগুলো দু’হাজারের নোটে আছে। পালটাবো কী করে?’
নুরুল চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাপির বাড়িতে?’
পূর্ণ মাথা উপর নিচ করল।
নুরুল বলল, ‘লোকের টাকা। চোর অপবাদ দেবে যে?’
পূর্ণ বলল, ‘সারারাত ভেবেছি। কত লোকের অগাধ টাকা। আর আমাদের মতো লোকের কিছু নেই। যাদের অগাধ টাকা, তাদের থেকে একটু নিলে তারা কি দেখতে পাবে? সব তো নেবো না। একটু নেবো। তুই তোর মতো করে দোকান দাঁড় করাবি। আমায় খাওয়াবি। আমার তো বউ নেই। সংসার নেই। আমাকে একটু খাওয়াতে পারবি না সারাজীবন? দেখ না, টাকাগুলো যদি কিছু করা যায়?’
নুরুল বলল, ‘কত টাকা?’
পূর্ণ বলল, ‘দু’লাখ।’
নুরুল হেসে ফেলল, ‘দু’লাখ? ওতে আজকালকার দিনে কিছু হয় নাকি? তুইও একটা পাগল। দিয়ে দিস। আমার ব্যাঙ্কেই ঢুকিয়ে দিয়ে আসব। তারপর তোকে পাঁচশোর নোট দিয়ে দেব না হয়।’
পূর্ণ চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সে কী রে ভাই? দু’লাখ টাকায় কিছু হয় না?’
নুরুল বলল, ‘এই যে দোকানটা দিয়েছি, এর জন্য পার্টির লোকেদের মাসে সাত হাজার টাকা করে দিতে হয়। বুঝতে পারিস? সাত হাজার টাকা। মাসে সাত হাজার। বছরে চুরাশি হাজার টাকা। তার উপর আছে বাজার সমিতির বিশ্বকর্মা পুজো, কালি পুজো, দুর্গা পুজোর চাঁদা। আরও কত চাঁদা আছে। শেতলা পুজো হবে, গণেশ পুজো হবে, একটার পর একটা কিছু না কিছু চলতেই থাকবে। বছরে এক লাখ টাকা তো তোলা দিতেই চলে যায়। আর দু’লাখ। ধুস।’
পূর্ণ বলল, ‘টাকার কোনও দাম নেই?’
নুরুল বলল, ‘নেই। সত্যি নেই। দু’লাখে সারাজীবন চলবে না। হ্যাঁ, তুই একলা মানুষ। সাত-আট বছর রোগ-ভোগ না থাকলে খাবার টাকা উঠবে। এটুকুই।’
পূর্ণ পকেট থেকে নোটের তাড়া বের করে নুরুলের হাতে দিয়ে বলল, ‘রাখ তবে। এটা দিয়ে যা করার করতে হবে।’
নুরুল সন্তর্পণে চারদিকে তাকিয়ে টাকাগুলো তাড়াতাড়ি নিজের বাক্সে রাখল। তারপর একটা নোট বের করে দেখে নিয়ে বলল, ‘টাকাটা জাল মনে হচ্ছে রে।’
পূর্ণ চমকে উঠল, ‘সে কী?’
৩৪
একটা মাছি ঘুর ঘুর করছে চোখের সামনে। দিব্যেন্দুর অস্বস্তি হচ্ছে। মাছিটা ঘুরে ঘুরে আসছে। চোখের নীচে ব্যথা করছে। প্রবল ব্যথা। মাথাটা ঘোরাচ্ছে।
সুখেন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়ি টানছে। দিব্যেন্দুর জ্ঞান ফিরেছে দেখে বলল, ‘ভাই কি পুরো মেন্টাল? না হাফ?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’
সুখেন বলল, ‘আমি তো জানি এ পাড়ায় লোকে লাগাতে আসে। হাতুড়ি মারতে আসে, তা তো প্রথম দেখলাম। সমস্যা কী জীবনে?’
দিব্যেন্দু লাল চোখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। কী বলবে বুঝতে পারল না। রাত হয়েছে। মোড়ের মাথায় অনেকেরই আনাগোনা বেড়েছে। সুখেনের যেতে ইচ্ছে করছিল না। এরকম চিজ রোজ রোজ আসে না। একে পুরোপুরি মাপতে না পারলে পরে নিজেকেই দোষারোপ করতে হবে।
সুখেন বলল, ‘তোমার কপাল ভালো। বেঁচে থাকাটাই এ যুগে চ্যালেঞ্জ। তুমি বেঁচে আছ, এত কিছু করে, হালকা ক্যাল্যানি খেয়ে, এর থেকে ভালো তো আর কিছু হতে পারে না। বাড়িতে কে কে আছে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘কেউ নেই। বউ ছিল। পালিয়েছে।’
সুখেন বলল, ‘বউকে এভাবে ক্যালাতে?’
দিব্যেন্দু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ।’
সুখেন পকেট থেকে টুথপিক বের করে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, ‘তুমি লিজেন্ড আদমি আছ। বউকে মনে পড়ছিল বলে পারুলকে হাতুড়ি মেরে দিয়েছ। আমার মনে হচ্ছে তোমার মগজের সব স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে। ঠিক মনে হচ্ছে তো মামা?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বাড়ি যাব।’
সুখেন বলল, ‘সে তো যাবে। এখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। রাতটা কাটিয়ে যেও। যা খেয়েছ, একা একা তো ফিরতে পারবে না। চল দেখি, আমার ঝুপড়িতে।’ দিব্যেন্দু কোনওমতে উঠতে গিয়ে পড়ে গেল। সুখেন তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে দিব্যেন্দুকে ধরল, ‘এখন একজনের কাঁধে চল। আরেকটু হলে চারজনের কাঁধে যেতে হতো।’
দিব্যেন্দু যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে সুখেনের ঝুপড়িতে ঢুকল। সুখেন বলল, ‘কার্ডবোর্ডের উপর শুয়ে পড়।’
মেঝেতে কার্ডবোর্ড পাতা ছিল। দিব্যেন্দু তার উপরে শুয়ে পড়ল। সুখেন বলল, ‘ভাত বসাচ্ছি। খেয়ে নাও কোনমতে। কাল সকালে দেখা যাবে কী করব।’
দিব্যেন্দু উল্টে শুয়ে আছে। সুখেন চাল চাপাল। বলল, ‘তোমার পকেটে যে টাকা ছিল, ওরা সব নিয়ে নিয়েছে। ভালো লোকের ঘরে গিয়ে পাঙ্গা নিয়েছ। শমিতা হল এখানকার ডন। আর তুমি তার ঘরের মেয়ের পায়েই মেরে দিয়েছো। এর থেকে ট্রেনের সামনে গিয়ে ঝাঁপ দিতে। কম ঝামেলায় হয়ে যেত।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সবাই মিলে আটকে দিল।’
সুখেন বড় বড় চোখ করে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বটে? বউয়ের দুঃখে এত কষ্ট হচ্ছে?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘একবার সামনে পাই, মাথায় ইট মেরে মেরে শেষ করব! কত বড় সাহস! বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে! কোন নাগরের সঙ্গে পালিয়েছে কে জানে। যখন খুঁজে পাবো, দুটোকে একসঙ্গে মারব।’
দিব্যেন্দু এমনভাবে কথা বলছে, যেন কোনও বিষাক্ত সাপ ফোঁস ফোঁস করছে। সুখেন শিস দিয়ে উঠল, ‘বাঃ গুরু, তোমার হবে। তুমি হেবি ভিলেন হবে।’
দিব্যেন্দু নিজের মনে বলে চলল, ‘শালি পালিয়ে গেল। ভেবেছে পালিয়ে বাঁচতে পারবে। দাঁড়া না, আমি তোকে ঠিক খুঁজে বের করব। তারপর কীভাবে বিষ ঝাড়ব, তুই নিজে দেখতে পাবি।’
সুখেনের ফোন বাজছিল। সুখেন দেখল শমিতা ফোন করছে। সে ফোন নিয়ে বাইরে গেল। শমিতা থমথমে গলায় বলল, ‘মালটাকে তুই নাকি নিয়ে গেছিস?’
সুখেন বলল, ‘কেন?’
শমিতা বলল, ‘কোথায় নিয়ে গেছিস?’
সুখেন অম্লানবদনে মিথ্যে বলে দিল, ‘ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে এলাম তো। কেন?’
শমিতা চিৎকার করে উঠল, ‘উফ্, আমাকে জিগ্যেস করবি না?’
সুখেন বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
শমিতা বলল, ‘মালটাকে খুঁজতে লোক পাঠিয়েছে।’
সুখেন বলল, ‘কে পাঠিয়েছে?’
শমিতা বলল, ‘সেটা তুই জেনে কী করবি? কোথাকার ঠিকানা বলেছিল?’
সুখেন বলল, ‘মানিকতলা শুনলাম।’
ফোন কেটে গেল। সুখেন ঘরের ভেতরে ঢুকে বলল, ‘তোমার তো হেবি ডিমান্ড গুরু। খোঁজে লোকও চলে এসেছে।’
দিব্যেন্দু সুখেনের কথার পাত্তাও দিল না। নিজের মনে বিড়বিড় করে যেতে লাগল।
দিন প্রতিদিন – ৩৫
৩৫
‘জাল নোট! জার্মানিতে থেকে বাপি জাল নোটের কারবার করে নাকি রে?’ হতভম্ব গলায় বলল নুরুল।
পূর্ণর মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল। সে বলল, ‘আমি জানি না। কেমন কপাল আমার। ভাবলাম কদিন একটু শান্তিতে থাকতে পারব, তাও গেল।’
নুরুল বলল, ‘তুই সব টাকা যেমন ছিল, তেমন রেখে দে। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করে তো লাভ নেই। খামোখা বদনামের ভাগীদার হবিই বা কেন?’
পূর্ণ মাথা নাড়ল, ‘ঠিকই বলেছিস। দিয়ে আসি।’
নুরুলের থেকে টাকাগুলো নিয়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে চুপ করে বসল পূর্ণ। চায়ের খদ্দের এসে গেছে। নুরুল ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পূর্ণ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল।
নুরুল ডাকল, ‘এই পুন্ন, চা খেয়ে যা আরেক কাপ। আমি খাওয়াচ্ছি।’
পূর্ণ ম্লান মুখে তাকাল। নুরুল বলল, ‘আয় আয়। বোস।’
পূর্ণ চুপ করে বসে চা হাতে নিয়ে বসল। এলাকা জমজমাট। মেলা হবে। মাঠে বাঁশ পড়ছে। গাড়ি আসছে। ঘোর বর্ষায় মেলা চলবে। ভিড় করে আসবে লোকে। কাঁদায় আছাড়ি পিছাড়ি খাবে। তবু লোকের মেলা দেখার পুরকিই আলাদা।
খদ্দের চলে গেলে নুরুল বলল, ‘টাকাগুলো ঘরে রেখে দিয়েছিল কেন রে?’
পূর্ণ বলল, ‘কে জানে। কী করতে রেখেছে।’
বাক্সর মতো আরও কী সব দেখেছে, কিছু বলল না পূর্ণ।
নুরুল বলল, ‘কাউকে বলার দরকার নেই। শুধু তুই ফাঁসিস না।’
পূর্ণ বলল, ‘কাজ ছেড়ে দেব। এখানে কাজ করব না।’
নুরুল বলল, ‘তা কেন? কে খাওয়াবে তোকে? মাস গেলে কিছু টাকা তো পাবি।’
পূর্ণ বলল, ‘সেগুলো জাল হয় যদি?’
নুরুল বলল, ‘হবে না। আমার মনে হয় না সেগুলো জাল হবে।’
মন মরা হয়ে কিছুক্ষণ বসে চা শেষ করে পূর্ণ উঠে পড়ল।
এলাকায় টোটো গিজগিজ করছে। আগে রিক্সা চলত। ভ্যান চলত। এখন টোটো চলে। প্রথমদিকে টোটো ভাড়া এত ছিল না। ইদানীং প্রচুর বেড়ে গেছে। তার সঙ্গে টোটোচালকদের রোয়াবও বেড়েছে।
পূর্ণ একজনকে জিগ্যেস করল, কত নেবে। বলে সত্তর টাকা। আগে কুড়ি টাকা নিত। সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। নুরুল ঠিকই বলছিল। দু’লাখ টাকায় কিছু হয় না। এক দিকে ভালোই হয়েছে।
ফোন রিং হচ্ছে। বাপিদা ফোন করছে। ধরল সে, ‘বল।’
বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরার লোক বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি কোথায়?’
পূর্ণ বলল, ‘বাজারে এসেছিলাম। যাচ্ছি। কুড়ি মিনিট পরে আসতে বল।’
বাপিদা রেগে গেল, ‘তোমাকে না বলেছিলাম, বাড়ি ফাঁকা রাখবে না। কেন আমাদের ওখানে সব্জিওয়ালা যায় না?’
পূর্ণ উত্তর দিল না। চুপ করে রইল।
বাপিদা বলল, ‘কী হল? চুপ করে আছ কেন?’
পূর্ণ বলল, ‘খুব গরম পড়েছে। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি তো। চলে যাচ্ছি।’
বাপিদা বলল, ‘যাও। আর মই টইগুলো দেখে নিও। এবারে যেন ভেঙে না পড়ে। আমি না থাকলে কিছুই হয় না দেখছি।’
পূর্ণ বলল, ‘দেখব দেখব। চিন্তা কোরো না। দরকার হলে আমি মই ধরে রাখব। চিন্তার কোনও কারণ নেই।’
বাপিদা বলল, ‘আজকের মধ্যে সব কাজ যেন হয়ে যায়। আর ঠাকুরঘরেও একটা ক্যামেরা লাগাতে বলবে। ঠিক আছে?’
পূর্ণ থমকে গেল, ‘ঠাকুরঘরে?’
বাপিদা বলল, ‘হ্যাঁ। বাথরুম ছাড়া সব ঘরেই লাগানো থাক। আমি তাহলে এখান থেকে সব দেখে রাখতে পারব। তুমিও যখন ইচ্ছে বাজার যেতে পারবে। চিন্তার কিছু থাকবে না।’
পূর্ণ বলল, ‘ঠিক আছে। বলে দেব।’ ফোন কেটে দিল বাপিদা।
পকেটে টাকাগুলো যেন মরে পড়ে আছে। অথচ বাজার যাবার পথে তার পকেট কেমন গরম মনে হচ্ছিল। বুকটাও উত্তেজনায় জোরে জোরে ধুকপুক করছিল। ব্যাজার মুখে পূর্ণ হাঁটতে থাকল।
৩৬
‘লগ ঠিকই আছে। এদের ক্যামেরা খারাপ।’
চিন্তিত মুখে বলল নীল।
অরিত্র বলল, ‘তাহলে কী হবে?’
নীল বলল, ‘আমি আপনার স্ত্রীর ফোনটা ট্রেস করতে দিয়েছি। দেখা যাক, কিছু পাওয়া যায় নাকি। তার আগে আপনি বলুন, ওর আচরণে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?’
অরিত্র নীলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে তো বলেছি ওর সিরিয়াল করা নিয়ে একটা ঝামেলা চলছিল।’
নীল বলল, ‘বলেছেন?’
অরিত্র বলল, ‘বলিনি? জানি না, মনে করতে পারছি না। তাহলে এখন বলি, ওর এই সিরিয়াল করা, রাত করে বাড়ি ফেরা, লেট নাইট পার্টি করা, এসব নিয়ে আমার আপত্তি আমি জানিয়েছিলাম। রাগ করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু তা বলে এত তাড়াতাড়ি ব্যাগ রেখে কোথাও চলে যাওয়ার মেয়ে ও নয়। আমি নিশ্চিত এণাক্ষী কোনও সমস্যায় পড়েছে।’
নীল মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে, সেকেন্ড ব্যাঙ্কোয়েটের প্রাইভেট পার্টির আরও ডিটেলস আমি বের করার চেষ্টা করছি। যেখানে যেখানে যা যা জানানোর, আমি তাও জানিয়ে দিচ্ছি। আপনি বাড়ি চলে যান। রেস্ট করুন। এখানে সেখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়ে তো কোনও লাভ হবে না, তাই না?’
অরিত্র অন্য দিকে তাকাল। বলল, ‘বুঝতে পারছি সবটাই। কিন্তু ওর কোনও ক্ষতি হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ও খানিকটা ঝোঁকের মাথাতেই…’
নীল অরিত্রর কাঁধে হাত রাখল, ‘আরে এরকম তো হয়। আমারও হয়। স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া তো করবেই। তাছাড়া, ব্যাপারটা তো এমন না যে আপনি ওয়াইফকে বাড়িতে খুন করে এসে এখানে একটা সিন তৈরি করছেন। সুবীরবাবু আপনার ওয়াইফকে দেখেছে। তাই আপনি সেদিক থেকে সেফ।’
অরিত্র চমকে নীলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানে! এ আবার কী কথা বলছেন?’
নীল বলল, ‘এরকম ভাবে রিয়্যাক্ট করার কিছু হয়নি। তদন্তে নামলে সবদিক যাচাই করে দেখতে হয়। সবার আগে আপনার সব রকম অভিযোগ থেকে ফ্রি হওয়া দরকার। আপনারা যেখানে থাকেন, সেখানের এন্ট্রান্স বা এক্সিটে সিসিটিভি আছে তো?’
অরিত্র বলল, ‘আছে। তা বলে আপনি আমাকেই…’
নীল বলল, ‘ঠিক আছে। ওই ফুটেজ এটা প্রমাণ করে দেবে যে স্ত্রীর নিখোঁজে আপনার ডিরেক্ট কোনও হাত নেই। দ্যাটস ফাইন। ওর কোনও শত্রু? কারো সঙ্গে ঝামেলা?’
অরিত্র বলল, ‘না। আমার অন্তত জানা নেই। তবে লাস্ট কয়েক মাসে ওর অনেক নতুন লোকজনের সঙ্গে পরিচিতি হয়। তারা কে কী করেছে, তাদের সঙ্গে কী রিলেশন ছিল, কী কথা হতো, আমি কিচ্ছু জানি না।’
নীল বলল, ‘দু-তিন দিন সময় দিন, এর মধ্যে না ফিরলে সব জেনে যাব আমরা। আপনাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি বাড়ি যান। উনি যদি বাড়ি চলে আসেন, আমাকে জানাবেন, নাম্বারটা নিয়ে নিন।’
নীল নাম্বার বলল। অরিত্র কাঁপা কাঁপা হাতে নাম্বার সেভ করে নিল।
নীল অরিত্রকে দেখে বলল, ‘শুনুন, আমার মনে হয় না এত রাতে এই টেন্সড অবস্থায় আপনার ড্রাইভ করে যাওয়া ঠিক হবে। আপনার গাড়ি তো থানাতেই থাকল, আপনাকে বরং আমি নামিয়ে দিয়ে আসি। কাল গাড়িটা নিয়ে যাবেন।’
অরিত্র আপত্তি করল, ‘না অফিসার, তার দরকার নেই।’
নীল বলল, ‘দরকার আছে। আপনি বেশ আন্সটেবল হয়ে গেছেন। বেশি চিন্তা করে ফেলছেন। অত ভাবার কিছু হয়নি। চলুন।’
অরিত্রকে একপ্রকার জোর করেই নীল জিপে তুলল। গাড়ি স্টার্ট হতেই বলল, ‘আপনাদের স্বামী-স্ত্রী মনোমালিন্য হচ্ছিল, সে কথা এই শুটিং পার্টিরা জানে?’
অরিত্র বলল, ‘জানে। হয়তো জানে না। আমি ঠিক বলতে পারব না। অনেক মেয়ের বাড়িতেই ঝামেলা হয়। লাইনটা তো সুবিধার না।’
নীল বলল, ‘এরকম ধারণা কেন হল আপনার?’
অরিত্র বলল, ‘অন্য লোক এসে আপনার বউয়ের হাত ধরবে, তার কোমরে হাত রেখে নাচবে, সবসময় ভালো লাগে আপনার? আমি অত উদার হতে পারিনি, কী করব?’
নীল হেসে ফেলল।
৩৭
রুমা খাটে শুয়ে টিভি দেখছে। কী যে আরাম লাগছে! এসি চলছে। ঘরটা ঠান্ডা হয়ে আছে। ঘরের ভেতর কত কিছু আছে। টি ব্যাগ আছে, চিনি আছে, দুধ আছে, কফি আছে। গরম জল করার ইলেকট্রিক কেটলি আছে। দিব্যেন্দু একবার এরকম টি ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। তাকে গরম জল করে দিতে বলত। নিজে চা বানিয়ে খেত। রুমার ইচ্ছে করত টি ব্যাগের চা খেতে, লজ্জায় বলতে পারেনি কখনও। তাছাড়া বললে যদি আজেবাজে কথা বলত, কিংবা গায়ে হাত তুলত! ‘শখ? শখ হয়েছে? শখ বের করে দেব, জুতোর তলায় থাকবি হারামজাদি!’
আরাম লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে দিনের পর দিন সে শুয়ে থাকে। একটা সময় সে সারাদিন শিউরে উঠত। সর্বক্ষণ মনে হতো, এই বোধহয় দিব্যেন্দু এসে গায়ে হাত দেবে। রুমা একবার স্টেশনে চলে গেছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে স্টেশনে বসে থাকার পর বাড়ি ফিরে এসেছিল। মনে হয়েছিল, কোথায় যাবে? তার কোথাও যাবার তো নেই।
বেল বাজল। উঠে দরজা খুলল রুমা। এণাক্ষী ফ্যাকাসে মুখে তার ঘরে ঢুকল।
রুমা বলল, ‘কী হয়েছে?’
এণাক্ষী বলল, ‘এটা সুবিধার জায়গা মনে হচ্ছে না। আমি কিছুতেই অরিত্রকে ফোনে পাচ্ছি না। এরা ভালো লোক না।’
রুমা বলল, ‘আপনি বসুন। এরকম অস্থির হয়ে যাবেন না।’
এণাক্ষী বলল, ‘বসব? বসব মানে? এখানে আমাকে আটকে রাখবে আর আমি বসে থাকব?’
রুমা বলল, ‘তাহলে কী করবেন? কিছু কি করার আছে?’
এণাক্ষী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ওদের দলে আছেন, তাই না?’
রুমা বলল, ‘আমি নিজেই জানি না, কার দলে আছি। কিন্তু এখানে আমি ভালো আছি। আমি বাড়ি যাব না।’
এণাক্ষী বলল, ‘আমি কী করব? আমাকে বাড়ি যেতে হবে।’
রুমা বলল, ‘আপনি দেখুন না কী হয়। আমার তো ভয়ের কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না।’
রুমের দরজা খুলে দুজন মহিলা ঢুকল। এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে বলা হয়েছিল নিজের রুমে থাকতে। আপনি বেরিয়েছেন কেন?’
এণাক্ষী রেগে গেল, ‘কেন? আমি কি জেলখানায় আছি?’
দুজন মহিলার কেউ আর কোনও কথা বলল না। একজন এগিয়ে এসে এণাক্ষীর হাত ধরে টান মারল। এণাক্ষী আর্তনাদ করে উঠল, ‘এ কী? এসব কী অসভ্যতা হচ্ছে?’
রুমা বলল, ‘ওকে ছাড়ুন। ধরে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’
দুজনের কেউই উত্তর দিল না। এণাক্ষীকে টেনে ঘর থেকে নিয়ে রুমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। রুমার ফোন বেজে উঠল।
রুমা সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’
‘তুমি ভেতর থেকে রুম লক করে রাখো। যে কেউ তোমার রুমে ঢুকে পড়লে সেটা কি তোমার নিরাপত্তার জন্য ভালো হবে?’
রুমা বলল, ‘কিন্তু উনি তো আমার ক্ষতি করতে আসেননি?’
‘সেটা তুমি জানো? কেউ কি জানে কার কী উদ্দেশ্য? কতক্ষণের আলাপ তোমাদের?’
রুমা চুপ করে রইল।
‘রুম লক করে দাও। এখনই। আর আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে। কাল থেকে তোমার স্পেশাল ট্রেনিং আছে।’
‘কী ট্রেনিং?’ রুমা আগ্রহী কণ্ঠে জিগ্যেস করল।
উত্তর এল না। ফোন কেটে গেল।
রুমা উঠে দরজা বন্ধ করল। সে ঠিক করেছে, এরা যেই হোক, যেমন লোকই হোক, যা বলবে, সে তাই মেনে চলবে।
টিভি বন্ধ করে দিল সে। চোখ বুজল।
বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল এর আগে। এখন আর ঘুম এল না। এপাশ ওপাশ করতে লাগল। আবার টিভি চালাল। একটাই চ্যানেল চলছে। বাংলা সিরিয়াল হয়ে চলেছে। কিছুক্ষণ সে আগ্রহ নিয়ে দেখল।
উঠে চা বানিয়ে খেল। জানলার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। একটা দোকান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দোকানের নামটা যে ভাষায় লেখা, সেটা চিনতে পারল না।
৩৮
এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রুমা।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল ঘরের মধ্যে কারো অস্তিত্ব আছে। রুমার স্পষ্ট মনে পড়ল সে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করেছিল। অবশ্য ঘরে ছিটকিনি নেই। তার রুমের চাবি অন্য কারো কাছে থাকলে সে ঘরে ঢুকতে পারবে।
রুমা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘কে?’
কেউ কোনও সাড়া দিল না। রুমা উঠে বসল। খাট থেকে নামতে যেতেই কেউ তার মুখে হাত দিল। রুমা ছাড়াতে চেষ্টা করল, পারল না।
তাকে জড়িয়ে ধরে খাটে শুইয়ে দিল।
রুমা অশক্ত নয়। দিব্যেন্দুর মার খেয়ে খেয়ে তার সহ্যক্ষমতা এতদিনে বেশ ভালোই হয়ে গেছে। খাটে পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সে সরে গেল।
রুমা চিৎকার করল, ‘কে?’
তাড়াতাড়ি হাতড়ে সুইচগুলো খুঁজতে যাচ্ছিল, এমন সময় আরেকজন এসে তাকে খাটে ফেলে হাত-পা বেঁধে দিল। রুমা চিৎকার করায় তার মুখে কাপড় দিয়ে দিল।
আলো জ্বলে উঠল। রুমা দেখল সকালের লোকটা আর ডাইনিং হলের ম্যাডাম দাঁড়িয়ে আছেন। ম্যাডাম রুমার মুখের কাপড় সরিয়ে দিল। রুমা আর্তনাদ করে উঠল, ‘এগুলো কী?’
লোকটা রুমার হাতের দড়ি খুলে দিতে দিতে বলল, ‘অসহায় লাগছিল না? মনে হচ্ছিল না সব শেষ হয়ে যাচ্ছে?’
রুমা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছিল। বলল, ‘এগুলো কী ধরনের অসভ্যতা?’
লোকটা বলল, ‘অসভ্যতা না। এটা পার্ট অফ ট্রেনিং।’
রুমা বলল, ‘কীসের ট্রেনিং?’
লোকটা বলল, ‘সব সময় সচেতন থাকার। যেকোনও সময় আঘাত আসতে পারে। প্রস্তুত না থাকলে কী হতে পারতো?’
রুমা বলল, ‘তা বলে এভাবে? কী করতে হবে আমাকে যে এরকম সচেতন থাকতে হবে?’
লোকটা সোফায় বসে বলল, ‘আমাদের হয়ে কাজ করতে হবে। করবে?’
রুমার বুকের ধুকপুকুনি কমছিল না। বলল, ‘কী এমন কাজ যাতে রাতে ঘরে লোক ঢুকে যাবে?’
লোকটা পায়ের উপর পা রেখে বলল, ‘তোমাকে যে কাজ করতে হবে, সে কাজকে বলা হয় হানি ট্র্যাপ। হানি ট্র্যাপের নাম শুনেছ?’
রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘মানে?’
লোকটা বলল, ‘বাঘ মারার জন্য হরিণকে বেঁধে রাখা হয়। বাঘ সেই হরিণের গন্ধ পেয়ে তাকে মারতে আসে। শিকারি অপেক্ষা করে মাচায়। শিকারির কাজ হয় বাঘকে ওই সময়ে মেরে ফেলা। তোমাকে হরিণ হতে হবে।’
রুমা বড় বড় চোখ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটা বলল, ‘বাঘের আঁচড়ে হরিণ আহত হয়, মরেও যেতে পারে। কিন্তু সে মরে গিয়ে একটা গোটা গ্রাম বা শহরকে বাঁচিয়ে দিয়ে যায়। কাজে প্রচুর রিস্ক। কিন্তু সফল হতে পারলে তার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তুমি সুন্দরী, তোমার অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা আছে। তোমার হাজব্যান্ড তোমাকে প্রচুর যন্ত্রণা দিয়েছে। আমরা সুযোগ দিচ্ছি। তুমি কি এ সুযোগ নিতে প্রস্তুত?’
রুমা মাথা নিচু করল। কয়েক সেকেন্ড পর মাথা তুলে বলল, ‘তার মানে আমাকে শরীর বেচতে হবে। তাই তো?’
লোকটা মাথা নাড়ল, ‘শরীরকে শরীরের মতো দেখলে তাই মানে দাঁড়ায় বইকি। তুমি যার সঙ্গে সংসার করছিলে, সেখানেও কি একরকম শরীর বেচতে হয়নি?’
রুমা বলল, ‘এই জন্যই আমাকে এত দয়া করে নিয়ে এসেছিলেন, খেতে দিয়েছিলেন, এত ভালোভাবে রেখেছেন, তাই তো?’
লোকটা বলল, ‘খানিকটা তাই। আবার খানিকটা না। তোমাকে আমি অপশন দেব।’
রুমা কৌতূহলী হল, ‘কী অপশন?’
লোকটা বলল, ‘তোমাকে আমরা একটা হোমে পুনর্বাসন দিতে পারি। সারাদিন ওখানে হাতের কাজ করবে, একটা নিশ্চিন্ত জীবন পাবে। নিজের মতো করে থাকতে পারবে। অথবা, আরেকটা জীবন দিতে পারি, যেখানে তুমি নিজের জীবনের বিনিময়ে অসংখ্য মানুষের কাজে আসতে পারবে।’
রুমা বলল, ‘আমি হোমে যাব। এই কাজ করব না। এভাবে একেকজন এসে শরীর নিয়ে জ্ঞান দেবে, আমি শুনব না। কিছুতেই না।’
লোকটা হাসি মুখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল সকালেই তোমাকে একটা ভালো সরকারি হোমে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ভালো থেকো রুমা।’
রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলেন? কোনও জোর করলেন না?’
লোকটা বলল, ‘কাজটা জোরের নয়। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোমাকে এই কাজে নামাব না।’
রুমা বলল, ‘আর ওই মহিলাকে? যাকে আটকে রেখে দিয়েছেন?’
লোকটা বলল, ‘বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এতক্ষণে রওনা হয়ে গেছেন।’
রুমা বলল, ‘বিশ্বাস করছি না। এখন আমার আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।’
লোকটা উঠে দাঁড়াল, ‘তুমি হোমে যেতে চাইছ রুমা। আমার কথায় বিশ্বাস কর আর না কর, তাতে কিছু যায় এসে না। ভালো থেকো। আমি আসি।’
ম্যাডামকে নিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। রুমা হতভম্ব হয়ে বসে রইল।
৩৯
ভাত খেয়ে দিব্যেন্দু কার্ড বোর্ডের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এত ক্লান্ত ছিল, একবারও ঘুম ভাঙেনি।
সুখেন ডেকে দিল, ‘ওঠো। মামা ওঠো। ঘুমিয়ে থাকলে হবে না। পালাও।’
দিব্যেন্দু ধড়মড় করে উঠে বসল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
সুখেন বলল, ‘এখানকার লোকজন তোমায় খুঁজছে মানে খবর আছে। এখন ভোর হচ্ছে। এখানে রাত শুরু হবে। এরা এখন ঘুমোবে। তুমি কেটে পড়। নইলে তোমায় কোথায় নিয়ে কী চুলকে দেবে কেউ জানে না। লুকা সাঁতরাকে তো চেনো না।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘লুকা সাঁতরা কে?’
সুখেন বলল, ‘আছে একজন। চুলকানি পাবলিক। ঠিক ঠাক চুলকে দিলে সারাজীবন পৃথিবীর সব চুলকানির মলম লাগালেও সে ব্যথা কমবে না। চল। তুমি ঢ্যামনা হতে পারো, কিন্তু চোখের সামনে একটা লোকের মার গাঁড়া যাবে, সেটা আমি দেখতে পারব না। চল চল।’
দিব্যেন্দুকে টানতে টানতে ঝুপড়ি থেকে বের করল সুখেন। দিব্যেন্দু ক্ষীণ গলায় বলল, ‘আমার হাগা পেয়েছে।’
সুখেন বলল, ‘উফ! কী ঝামেলা! যাও, ওই রাস্তার হাই ড্রেনে গিয়ে ঝেড়ে আসো। কেউ নেই এখন। যাও যাও।’
দিব্যেন্দু কাতর চোখে তাকাল। সুখেন বলল, ‘কিছু করার নেই, আমরাও এভাবেই করি। সব ইতর লোক এখানে। যাও মামা।’
সুখেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানতে লাগল।
দিব্যেন্দু মিনিট পাঁচেক পরে ধুঁকতে ধুঁকতে এল। সুখেন বলল, ‘হাত ধুয়েছ?’
দিব্যেন্দু বলল, ‘সাবান কোথায়?’
সুখেন বলল, ‘ফাইভ স্টারে এয়েচো মামা? মাটিতে হাত মুছে কলে হাত ধোও।’
দিব্যেন্দু সুখেনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তাই করল। সুখেন বলল, ‘আজিব চিজ মাইরি একটা। হাতুড়ি মেরে বেড়ায়। চল।’
সুখেন হাঁটতে শুরু করল। দিব্যেন্দু সুখেনের পেছন পেছন হাঁটছিল। কিছুক্ষণ পরে বড় রাস্তায় উঠে সুখেন সন্তর্পণে চারদিকে তাকাল। বলল, ‘নাহ্। ঠিক আছে। এস। বাস স্ট্যান্ডে বোস। বাস এলে চলে যাবে।’
দিব্যেন্দু বাস স্ট্যান্ডে বসল। সুখেন বলল, ‘চলে যেতে পারবে তো?’
দিব্যেন্দু বিড় বিড় করে বলল, ‘টাকা নেই। সব নিয়ে নিয়েছে।’
সুখেন বিরক্ত মুখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা টাটা সুমো এসে দাঁড়াল। সুখেন সুমোটার দিকে তাকিয়েই, ‘মাড়িয়েছে’ বলে তেড়ে দৌড় মারল। দিব্যেন্দু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল। গাড়ির দিকে তাকাল। দুজন ষণ্ডা লোক গাড়ি থেকে নেমে কলার ধরে কুকুরের মতো করে দিব্যেন্দুকে গাড়িতে তুলল। দিব্যেন্দু চিঁচিঁ করে বলল, ‘ছেড়ে দাও আমাকে। আমি কিছু করিনি। ছেড়ে দাও।’
সুখেন দৌড়ে খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। গাড়ির ভেতর থেকে একজন চিৎকার করল, ‘তুই কাল ঢপ মারলি তো? তোকে দাদা বুঝে নেবে।’
সুখেন কান ধরল। গাড়ি স্টার্ট দিল। দিব্যেন্দু চিৎকার করল, ‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? পুলিশ! পুলিশ।’
মাথায় একটা গাট্টা পড়ল তার, ‘চিল্লাবি না। চিল্লালে মটকা গরম হয়ে যায়। তোকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘কোথায়? কিডনি বেচবেন? চোখ বেচবেন? আমার কিডনি ঠিক নেই, বিশ্বাস করুন। দিনে অনেকবার হিসি পায়।’
গাড়ির ভেতরে সব লোক হো হো করে হেসে উঠল। একজন তার গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘সোনা আমার, মানিক আমার। তোমায় কেন বেচবো? তোমার বিচি খুলে নিয়ে আমরা মারবেল খেলব। একদম চিন্তা কোরো না সোনা। তোমাকে তোমার মামা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’
দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার মামা-মামি সব মরে গেছে। মাইরি বলছি, বিশ্বাস করুন।’
গাড়ির ভেতর সবাই জোরে জোরে হাসতে শুরু করল।
কেউ কেউ দিব্যেন্দুর চুল টানতে লাগল, কেউ আবার গাল টিপে দিল। কেউ হঠাৎ করে দিব্যেন্দুর গালে চুমু খেল। দিব্যেন্দু চিৎকার করতে লাগল, ‘এটা ভালো হচ্ছে না কিন্তু। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?’
একজন বলল, ‘গরিলা দিয়ে তোমায় মাড়াবো বাওয়া।’
দিব্যেন্দু ভয়ে সিঁটিয়ে গাড়ির মধ্যে বসে রইল।
