সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৭
সাত
কিন্তু আহা! কী শোভা ধরয়ে জলধর, স্বর্ণ, বর্ণ শত্রু ধনু, রতনে খচিত তনু চূড়াঃ শিরোপর। আকাশগঙ্গায় সাদা পাল তুলে যাচ্ছেন ওরা কারা? কিন্তু কী দূরদৃষ্ট, দেরি করে জন্মগ্রহণ করার ঝক্মারি! সেই যদি জন্মালাম, উনিশ শতকের শেষার্ধে কিংবা বিশের প্রথমার্ধে জন্মালে এমন কী কোরান নাপাক হতো? এ কারণেই শাস্ত্রবাক্য, যাঁরা অল্প বয়সে জন্মান তাঁরাই মহাপুরুষ হন। রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, মাইকেল, রবি ঠাকুর– এঁয়ারা হগ্গলেই কী সুন্দর অল্প বয়সে জন্মে দেশে দশের কাছে কেমন সুখ্যাত পাচ্ছেন। কবে সবাই মরে হেজে সাধনোচিত ধামে প্রয়াণ করেছেন, তাও কী তালেবরী ভঙ্গিতে পাথরের গতরটি নিয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে এখনও নীরবে বাণী বিতরণ করছেন। যদিও পাখপাখালির নিষ্ঠীবন, কিন্তু সে কথা থাক, ওরা নেহাতই অল্পশিক্ষিত।
কিন্তু অল্পবয়সে জন্মালেই তো হলো না। এই আজকের সকালে আমার মনের ভাবটি যেমন, তেমন একটি ভাব নিয়ে জন্মতে হতো। সেটি কোথায় পেতাম? সে ভাবনাও আদৌ তুচ্ছ নয় বলেই আফশোস সেকালে এ কালের মনটি নিয়ে কেন জন্মালাম না। এর পেছনে বিধাতাপুরুষের একচোখোমি আছে। তবে তাঁরা, বিশেষ করে রবি ঠাকুর সেকালে জন্মে এমন ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান নিয়ে কাব্য করে গেছেন, যে তারপর ও লাইনে যে যায়, সে বেলাহাজ। সৈয়দ চাচার বুলিতে রাম-পন্টক। কিন্তু কবি সাহিত্যিকদের সাথে পাঁঠাদের বিষয়বুদ্ধির যতই মিল থাকুক, এখনও পর্যন্ত এ খবর পাওয়া যায়নি যে কোনো পাঁঠা ছবি লিখেছে বা ছড়া এঁকেছে। বেলাহাজ কথাটি বলছি এ কারণে যে এদানী এঁয়াদের বড় সংখ্যাবৃদ্ধি হয়েছে। তবে আমরা চন্দ্রদ্বীপ-সন্তান। আমরা কদাপি বেলাহাজ নই, পন্টক তো নই-ই।
বজরা বলে ড্ড্ড্ড্। প্রান্তিক বৃক্ষ আত্মজনেরা বলছেন–রররর। বলছেন, খাড়অ, দণ্ড দুই জিরাইয়া যা। নাও হান বান্দ্ মোর শেহড়ে। যাবি যেন কই? বলি– যাব সিদ্ধিগঞ্জের মোকামে। বৃক্ষ বলে– ধীরে সুস্থে যা, দৌড়াইস্ না। বৃক্ষের কথা শুনে ট্রলার তার শেকড়ের কাছে নামিয়ে দেয়। বৃক্ষ পাতা খসিয়ে সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়, আর বলে, তোরা বেয়াকে সুখে থাক। বেয়াক মানুষ সুখী হউক। বেয়াকের ভালো হউক। বালামুসিবৎ দূর হউক।
এখান থেকে ক্যারায়া অর্থাৎ ভাড়া করতে হবে একটি পছন্দমতো ডিঙ্গি। ছই-অলা। তারপর মাঝি জানতে চাইবে– যাইবেন যেন কই? আমাকে তখন পথের নিশানা বলতে হবে– গাবখানের খাল ডানহাতি রেখে, বাঁ হাতি কীর্তিপাশার খাল ধরে সোজা, বাঁ কিনারে গ্রাম পড়বে শশীদ অশ্বত্থ কাঠি, বেউখির। ডান কিনারে সারেঙ্গল পাক মহর, গলুইয়াখোলা, রণমতি, বাউলকান্দা এবং আরও কতসব। সে-সব পেরিয়ে আমার শেষ ঘাট সিদ্ধিগঞ্জে পৌঁছোব।
ডিঙ্গির মধ্যে পাতা আছে হোগলার চাটাই। মাথায় দেওয়ার জন্য মাঝির ছেঁড়া ক্যাতার বিছানা গোল করে জড়ানো আছে। ছই-এর মধ্যে ঢুকে হোগা উপ্পুত অইয়া মুড়াডা অর্থাৎ মাথাটা নাওয়ের গলুইয়ের বাইরে বার করে দুই পারের দৃশ্য দেখতে দেখতে চল। তখন বুঝতে পারবে, কাব্য করতে না পারার দুঃখ কত। সাধে কি আর রবি ঠাকুরকে খামার দিতে মন চায়। কেমন এই আজকের সকালের ছবিটি আগেভাগে কথায় গেয়ে গেঁথে রেখেছেন,
শরতের আলোতে
সুন্দর আসে
ধরণীর আঁখি যে শিশিরে ভাসে।
আমারও তো সে-রকমই বলতে গাইছে ইচ্ছে হচ্ছে। তা সে তো বলা গাওয়া যায়ই, আর সেজন্যই তো তিনি এ সব সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়ে গেছেন। কিন্তু তা আমার বলা হলো কোথায়? তবে রবি ঠাকুরও এমন কিছু অরিজিনেল নন। ভদ্দরলোক মানুষ, স্বীকারও করে গেছেন সে কথা। ওই যে বলেছেন না–
আমি যা বলিতে চাই হল বলা
ওই শিশিরে শিশিরে অশ্রুগলা।
এখন সামনের দুর্বাঘাসে, ধানের গর্ভমোচার সুডৌল গতরটিতে যে অশ্রু গলার বর্ণালী দেখছি তাই-ই তো তিনি তুলে এনে মালাগুলো গেঁথেছেন। এ আর এমন কী! তবে হ্যাঁ, মালা গাঁথতে যে সুতোগাছা দরকার, তা কিন্তু ওঁয়ার নিজের। আর যে চোখ দিয়ে রংটি পছন্দ করেছেন সে চোখদুটিও তাঁরই। এখন আর কোনো তাড়াহুড়ো নেই। ড্ড্ড্ড্ আওয়াজ নেই। একটি ধ্বনিই এখন সরব, বাকি সব নীরব। সে ধ্বনিটি জলের সাথে বহিত্রের লীলাধ্বনি। এ ধ্বনির পরম্পরা আমার চন্দ্রদ্বীপ-রক্তে অতি প্রাচীন। বহিত্র এবং জলের এই যুগলবন্দির ছলোচ্ছল সুর এবং তাল, এই ভূমিতে আমার প্রথম বীজপুরুষের প্রতিষ্ঠিত, তাই ধ্রুপদী।
মানুষ নাকি যা চায়, তা কদাচ পায়। আমি কিন্তু আজকের এই সকালটিতে যা চেয়েছিলাম, তা পেয়ে গেলাম ওই বহিত্র আর জলের খপাৎ খপ্, খপাৎ খপ্ সুর ও তালের মধ্যে। আর তার সাথে শরৎকুমারীর অনুপম ছবিখানি।
কিন্তু এইসব আয়োজনের মধ্যেও মনের চোরা ঘুলঘুলিতে অদৃশ্য মাকড়সা তার জাল বুনছে ঠিক। আজ ষষ্ঠী। পুজোর বোধনের সকাল। ফেলে আসা দিনগুলোতে ফেরার যে বাসনা অজান্তে মনের মধ্যে ক্রিয়াশীল, তা বাস্তবের আঘাতে মুহূর্তেই ধূলিস্যাৎ হবে জানি। কেননা সেই দিনগুলো তো আজ আর সেদিনের সব উপকরণ সাজিয়ে বসে নেই। এতক্ষণ যা দেখেছি তা শুধু বহিঃপ্রকৃতির লীলারঙ্গ। এখন স্ব-ভূমিতে একদা ফেলে যাওয়া হাট-বাজার, বাড়িঘর, সেইসব মানুষজন, গ্রাম এবং সেই পরিবেশ– তা আর পাব কি? মানুষ কি তার ফেলে আসা দিনগুলোতে কখনও ফিরতে পারে? এক সময় মোকামের ঘাটে তরী ভেড়ে। তীরে দাঁড়িয়ে সব স্বজনেরা। তারই মধ্য থেকে এক বেতস শরীর বৃদ্ধ, ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে এসে নৌকোর গলুইয়ের ফাঁক থেকে আমার মাথাটা বুকে জড়িয়ে আকুতি জানান, বাজান, এতকাল পর আইলা? আছ তো ভালো বেয়াকে?
