সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ২০
কুড়ি
ছোমেদের চিন্তনে যে আমরা আর তোমরার দ্বন্দ্ব আছে, তা খুব সামান্য কথা নয়। এ দ্বন্দ্ব শুধু শোষণ-বঞ্চিতের দ্বন্দ্ব নয়, জাতপাতের দ্বন্দ্ব নয়– এর সবগুলোই। কিন্তু সর্বোপরি আরেকটি বোধকরি তথাকথিত নাগরিক মডার্নিটির সাথে অপবর্গীর ভূমিগত অবস্থানের। এই দ্বন্দ্বটিই মূলত আমরা আর তোমরার পূর্বশর্ত। ছোমেদরা কখনই এই মডার্নিটিকে আপনার বলে গ্রহণ করতে পারে না। কিবা রাজনীতিগত কিবা সমাজনীতিগত কোনো সংস্কারই তাদের এই আপাতসনাতন অবস্থানে স্থায়ী দাগ কাটতে পারে না। ছোমেদেরা নিজস্ব কষ্টিপাথরে তা যাচাই করে নিতে চায়। তাদের যাচাই করার কষ্টিপাথরের কার্যকারিতা বিষয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু তার উপস্থিতি বিষয়ে সন্দেহ করলে অপবর্গীর ধরনধারণের কিছুই বোঝা যায় না। এখানে পরিবর্তনের গতি অতিমাত্রায় ধীর। এ যেন যুগ যুগ ধরে জড়ের প্রাণস্পন্দনে বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়ার ছন্দ। এ ছন্দের লয় অত্যন্ত মন্দাক্রান্তা।
ছোমেদ বলে যায়, সভাজন, আপনেরা বেয়াকেই হে সোমায়কার ক্যাচাল জানেন। তমো কই, য্যারা কিবা যুয়ান কিবা বুড়া, হ্যারা বেয়াকেই শহুরইয়া মানু। বেয়াকেই ভদ্দরলোক। হেনাগো জমিজাগা চাষবাস করি মোরা। হেনরা মোগো কয়েন, হালইয়া চাষা, ছোডোলোক, হ্যাগো, লগে কোনোকালে মোগো ওডা বওয়া নাই। এহন হেনরা যদি আচুক্কা আইয়া কয়েন, মোরা তোমরা বেয়াকেই ভাই ভাই, হে কতা নগ্দা নগ্দি বিশ্বাস যাই ক্যামনে? হ্যার মইদ্যে ফির দ্যাহেন, আবার দলাদলি। যুইদ্ধ যহন লাগলে, তহন মোরা গেরামে তো কিছু বোজতে পারি নায়। তহন একদল আয়, আইয়া এক কতা বোজায়। আরেক দল আইয়া বোজায় অইন্য কতা। বেয়াকের হাতেই বন্দুক। এইসব করতে করতে হ্যারগো লাগলে ক্যাচাল। তহন এ ওরে মারে, ও হ্যারে গুল্লি দে– হে এক হুলাস্থূলা কাণ্ড। মোরা একবার ভাবি, এয়া তো খুনাখুনি। আবার ভাবি, এইয়াই বোধায় মুক্তি যুদ্ধ। ক্যান, না যে আয় এহানে আর এইসব করে, হেই কয়, মুই মুক্তিযোদ্ধা।
কিন্তু যখন মিলিটারি এসে পড়ল, তখন আর কাউকে এখানে দেখা গেল না। তখন শুধু দৌড়, দৌড় আর দৌড়। ছোমেদ বলে, লৌড়। বলে, আরে লৌড় রে লৌড়। হে কতা কইতে গেলে এহনও পরনের কাপুর নষ্ট অয়। তখন সবাই আশ্রয় নিয়েছিল পেয়ারা বাগানে। উত্তরাঞ্চলের পেয়ারাবাগানকে সবার মনে হয়েছিল দুর্ভেদ্য। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। বিল অঞ্চল। বিলের মধ্যে আল বেঁধে পেয়ারা গাছের বাগিচা। সেই পেয়ারা বাগিচার ঘেরাটোপে যাদের সাজানো গেরস্থালি, তারা সব নমশূদ্র সম্প্রদায়ের। বর্ণহিন্দু সমাজে অবহেলিত এইসব ভূমিপুত্ররা, তাদের চৌহদ্দির বাইরে এখানের সব গ্রামগুলির পত্তন করেছে সে আজ বহুকাল। সুন্দর সাজানো গ্রাম সব, অসুমার কৃষিজ পণ্য উৎপাদনকারী। বড় স্বাস্থ্য সৌন্দর্য আর সম্পদে ভরা এইসব গ্রাম আটঘর, কুড়িআনা, ভীমরুলি, শতদলকাঠি– কত নাম।
এখানে এসে তখন আশ্রয় নিয়েছিল সবাই। ছোমেদ বলে, ছোডোলোক, ভদ্দরলোক, গরিব, বড় মানুষ তহন বেয়াকে এহানে আইয়া দলামোচা। যেনরা এতকাল মোগো নোমো শ্যাখ কইয়া তফাতে রাখতেন, মোগো হাইত্নায় মোত্তেও আইথেন না, হ্যারা আইয়া কয়েন, চাষিভাই, আইজ তোমার বাড়ি থাহুম। মুই ছোমেদ বয়াতি ভাবি, এতকাল তো আছেলাম, আলায় না বোলায় না মোর নাম সোয়াগি। অভাবের জ্বালায়, খিদার ঠেলায়, তোমাগো ডোয়ায় যাইয়া হোগা ঘষতাম, তহন তো এত পিরিত দেহি নাই ; আর এহন, তোমরা মোগো হাইতনায়, তয় তো কিছু এট্টা ব্যাফার অইছে।
দৌলতও সরেস্বতীরে লইয়া মোগো লগে গেলে হই পেয়ারাবাগান। বেয়াক মনুষ্য তহন আশ্চয় লইছে হেইহানে। তহন হত্যই কোনো ভ্যাদাভ্যাদ নাই। কেডা নোমো, কেডা শ্যাখ, কেবা বাবু আর কেবা বিবি। তহন মেলেটারির দাপটে বেয়াকে কাবু। তহন বিলের জোল ধরইয়া, গানবোট ঢোহে গুল্লি ছিডাইতে ছিডাইতে। আর ক্যালা গাছের ল্যাহান মানুষগুলান পড়ইয়া থাহে যতক্ষুণ না হেই আজরাইলের দল ফিরইয়া যায়। কার্তিক ভাই, এট্টু সুর দেও, কান্দুম। আহা, ভাইগণ, বন্ধুগণ, এ কতা তো মোরা এহানে য্যারা আছি, বেয়াকের কতা। এ্যার মইদ্যে তো কোনো পরণকতা নাই। আইজ মোরা হেইসব দিন পার অইয়া আইছি। য্যারা মরছে, হ্যারা তো মরছে। আইজ মোরা আবার তেহার পাব্বনে জোমায়েত। হ্যারা তো আর আইব না। সব তেহার পরব ঘুরইয়া ফিরইয়া আয়, কিন্তু মরা মানুষ তো আর আয় না। হ্যার লইগ্যা এট্টু স্মরণ করি হ্যারগো কতা, আয়েন মোরা বেয়াকে হ্যারগো লইগ্যা এট্টু কান্দি–
আয় আহা নিদারুণ দিন (ধ্রুবপদ)
উনইশশো একাত্তৈরে সালে বষ্যাকালে
কিবা যে দুদ্দৈব আইল মোগো কপালে।
মোরা গরিব গুরবা যত মানুষ অতি দীনহীন
আয় আয় আয় আহা নিদারুণ দিন।
অসম্ভব বীভৎস এক বর্ণনায় ছোমেদের কথন বাঁক নেয় এখন। সহ্য করা যায় না। সমবেত শ্রোতাসাধারণ, সবাই সেদিনের ভুক্তভোগী মনুষ্য। বিশ্বাসী না হলেও বলতে হয় দৈব তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। নচেৎ তাদের বেঁচে থাকার তো কোনো কারণ ছিল না। ছোমেদের কথার এবং কার্তিকের সানাইয়ের আকুতিতে সবাই এখন কাঁদে। গাথকও, গ্রাহকও। ছোমেদ গেয়ে যায়–
আয় আহা নিদারুণ দিন।
উফার থিহা পানি পড়ে মাথায় নাই টিন
আয় আহা নিদারুণ দিন।
নিজের ঘর নিজের বাড়ি কোতায় রইল পড়ইয়া
কোতায় রইল ভাই বেরাদার দ্যাশান্তরী অইয়া।
ছাওয়াল কান্দে মাও মাও স্তিরি কান্দে পতি
কোতায় আছে আল্লা মাবুদ অগতির গতি।
লাশের উফার লাশ পড়ে খুনের উফার খুন
আসমানেতে উড়ইয়া বেড়ায় হাভাতইয়া হকুন।
ঘর পোড়ে, গোরু পোড়ে, পোড়ে মোগো হিয়া
মায়ের কোলে গ্যাদা পোড়ে দগ্ধিয়া দগ্ধিয়া।
আছিল নিদালু কইন্যা দুলারে জড়াইয়া
তাগোও মারিল দুশমন গুল্লি বারুদ দিয়া।
পানিতে মারিল দুশমন, জঙ্গলে মারিল।
মসজিদে মন্দিরে দুশমন বেইজ্জত করিল।
আমির গরিব চাষি মজুর বান্দা মনিব।
বেয়াকের করিল বধ এমনও নসিব।
মুই ছোমেদ আলি বয়াতি, আপনেগোর ধারে হাচা কই, মুই য্যান একদিন পেত্যক্ষ দ্যাখলাম, আল্লায় মাইনসের রূপ ধরইয়া, এই আজরাইলেগো বিন্তি করইয়া কইতে আছেন, ওরে তোরা থাম, মুই আল্লা, তেগো মানুষ খুন করতে মানা হরি। মুই য্যান্ দ্যাখলাম হ্যারা হে কতা হোনলে না। গুল্লি দিয়া আল্লারেই মারইয়া ফ্যালাইলে।
ছোমেদ বয়াতি চোখের জলে দাড়ি ভেজায়। শ্রোতাসাধারণ তার প্রকৃত দোহারিদেয় এখন এবং তাও চোখের জলেই। বৃদ্ধ শিল্পী। এই অশ্রুতপূর্ব মারণযজ্ঞ বর্ণনা করতে গিয়ে যেন পূর্বাপর সামঞ্জস্য হারিয়ে ফেলে, খেই ধরতে পারে না। সে হয়তো শোনাতে চেয়েছিল একটি নিটোলকরুণ প্রেমগাথার কথকতা। কিন্তু ঘটনাক্রমে, প্রসঙ্গ থেকে অনেক দূরে চলে এসে, সে এক বিস্তৃত আখ্যানে হারিয়ে ফেলে নিজেকে। সেই নিদারুণ দিনের স্মৃতিতে সে ভীষণভাবে স্পর্শিত হয়, এলোমেলো হয়ে যায়। তখন যেন সে আর, এমনকী শিল্পের শর্তও রক্ষা করতে পারে না। বাস্তবকে কথকতার শিল্পায়নে বাঁধতে গেলে এ সমস্যা বোধকরি এসেই যায়।
সে কাঁদে। সে কান্না শুধু স্বজন হারানোর কান্না নয়। সে কান্না যেন মানুষের মনুষ্যত্ব হারানোর বেদনায়ই সমধিক বিধুর। এবং তারই ধ্রুবপদ ‘আয় আহা নিদারুণও দিন’। এই তো লোকশিল্পীর জীবনবোধ! এই তো তার শিল্পচেতনার ভিত্তিভূমি। তার কাছে কোনো পক্ষপাত প্রশ্রয় পায় না। সে হত্যাকে, মনুষ্যত্বের অবমাননাকে প্রকৃতই ঘৃণা করে। ছোমেদ ক্রমশ আত্মস্থ হয়, পুনরায় তার কথকতার ভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে। ছন্দেই সে স্বচ্ছন্দ, ছন্দেই তাই শুরু করে সে–
ভাইগণ, বন্ধুগণ, ক্যামনে হই বিস্মরণ
মানুষ হইয়া এ্যারা মানুষেরে মারে
মায়ের প্যাডে জন্ম যার মায়ের উপার ব্যাভিচার
এমনকাম সেই মানুষ ক্যামতে করতে পারে?
সভাজন পঞ্চজন, আছেন যারা মহাজন
ছোমেদ মেঞার বাখোয়াজি শুনিবার তরে
মানুষই মানুষরে মারে, মানুষই মানুষরে ধরে
মানুষ ভাসায়, মানুষ ডোবায়, মানুষই সব করে।
মানুষের কতা মুই কত কব আর
মানুষ অইল জগতে এ্যাক আশ্চয্য ব্যাফার।
আয় আহা নিদারুণও দিন…
শব্দ নিয়ে আশ্চর্য লোফালুফি করে বৃদ্ধ। কখন যে সে গদ্য থেকে পদ্যে যাবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ছন্দের মধ্যে যে কোনো বৈচিত্র্য আছে, তা নয়। কিন্তু এরকম তাৎক্ষণিকভাবে, এত দ্রুত পদবন্ধন, কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এবং বিষয়বস্তুর প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা, এক অনন্যসাধারণ ক্ষমতা। অসম্ভব সাবলীল গতি তার। যখন পদ্যে সে প্রকাশিত, তখন মনে হয় পদ্যেই তার স্ফূর্তি বেশি। আবার যখন গদ্যে কথকতার বিন্যাস, সেখানেও সে সমান সাবলীল এবং স্বচ্ছ, সহজ। ভাষার আঞ্চলিকতার অপরিচয়তা সেখানে রসগ্রাহীর বিশেষ কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। যদিও বর্তমান শ্রোতা রসগ্রাহীরা ছন্দেই অধিক সহজ, কথকতার গদ্যও তারা যে সমানভাবে সওদা করে, তাও তো দেখছি। এখানে গদ্যপদ্যে ভাগাভাগি নেই, বিসংবাদও নেই। রসোপলব্ধিই একমাত্র অন্বিষ্ট। ‘আয় আহা নিদারুণ দিন’। এই ধ্রুবপদ দিয়ে ছোমেদ বয়াতি এখনও বেঁধে রেখেছে এই আসর। আমার মনে হচ্ছে, শুধু এই আসর নয়, যেন সমগ্র মানবসত্তাকে সে বাঁধতে চাইছে এই কটি শব্দবন্ধের মধ্যে। যেন সমগ্র মানবসমাজই এই নিদারুণ দিনের আবর্তে পড়ে হাহাকার করছে। মানবাত্মার মৃত্যুতে যেন চরাচর কম্পিত। শব্দ এবং বাক্যবন্ধটুকুই শুধু আমি এখানে উপস্থিত করতে পারি। যা পারি না, বা কেউই হয়তো পারবে না, তা হচ্ছে, ছোমেদের আকুতি যা একমাত্র পরিবেশনা এবং সুরেই লভ্য, আর তা, অবশ্যই লোকসংস্কৃতির এই বিশেষ ধারার নির্যাস। তা শুধুমাত্র শ্রবণেই ধরা পড়ে, আলেখ্যে নয়।
ছোমেদ তার সেই আকুতি ধরে রেখেছে। খানসেনাদের অকথ্য বর্বরতার কথা সে সবিস্তারে ব্যাখ্যায়। সে তার তর্জনী তুলে ধরে রাজাকার আলবদর, সমস্ত সাম্প্রদায়িকতাবাদী এবং এমনকী মুক্তিসেনা নামধারীদের দিকেও
উপস্থিত আছেন যারা শোনেন সকলে।
কিবা বিচার করমু মুই আসল নকলে।।
খানরা কয় কাটকাট রাজাকার কয় ধর।
মুক্তিরা কয় তুই ব্যাডা পাকিস্তানি চর।।
মোরা যত মরাধরা গরিব লক্ষ্মীছাড়া।
পানিতে জোঙ্গোলে ঘুরি কান্ধে বাসি মড়া।।
সামনে যাই ঘারুম ঘারুম, পিছনে যাই কোপ।
সহাল থিহা সয়ন্দ্যা বিচ্রাই কোথায় ঝাড় ঝোপ।।
দিবসে উদবাগ করে রাজাকার খান সেনা।।
সয়ন্দ্যা ব্যালা মুক্তি কয়, সোনাদানা দে না।।
খানেরা কয়, তোর ঘরে আছে মুক্তি ফৌজ।
মুক্তিরা কয়, কওছেন দেহি, রাজকারের খোজ।।
ছোমেদ আলি কাইন্দা কয়, হোনো দেহি বাপ।
সামনা সামনি অইয়া ক্যান দ্যাহাওনা পেরতাপ।।
উস্তানি কুস্তানি কিল বেয়াকে কিলায়।
গরিব গুর্বা লক্ষ্মীছাড়া, জানে মরইয়া যায়।।
আয় আহা নিদারুণও দিন।
ভাইরা আমার। উপস্থিত মা বুইনেরা। মোর কতা হুনইয়া আপনেরা দোষ ধরবেন না। মুই য্যামন বুজি, ত্যামন কই। আপড়া, আলেহা, হাইল্যা চাষার ব্যাডা হাইল্যা চাষা মুই। বড় মাছ ছোডো মাছেরে ধরইয়া খায়, চ্যালাপুডি, কর্কিনা, মলণ্ডি বা গড়ই চ্যাং, এ্যারগোরে গিলইয়া খায় শৌল, গজাল, বোয়ালেরা। আবার দ্যাহেন, হ্যারগো গেলে তিমি, যে কিনা সমুদ্দুরে থাহে। তিমিরে কেউ গেলতে পারে কিনা জানি না, তয় পরণকতায় কয়, তিমিরে গেলে তিমিঙ্গিলা। তয় এয়া অইলে মাছেগো নিয়ম। জন্তু জানোয়ারগো নিয়ম তো এ রহমই। মাইন্সেরা বড়থে ছোডোগো এ রহম খায় না ঠিকই, তয় এক্কারে ছাড়ইয়াও দে না। হ্যারা খায় অইন্য কিসিমে। বড় মাইনসেরা ছোডোগো খায় জিয়াইয়া। ক্যান, না হ্যারগো বুদ্ধি আছে। যেমন মোরা জিওইল মাছ খাই, পাতিলের জলে জিয়াইয়া। তয় এয়া তো একরহম হিসাবের মইদ্যেই পড়ে। এয়া যুগ যুগ ধরইয়া চলইয়া আইতাছে। কিন্তু মানুষ যহন জানোয়ারের ল্যাহান খাওন ধরে, তহন তো হে নিজেরেও খায়। এই সোমায়ের খাওন য্যান নিজেরে নিজের খাওন। যদি জিগায়েন হেয়া কেমন? তো কই–
আব্বায় ভাবে পোলায় বুজি বেইসলামি করে।
পোলায় ভাবে আব্বায় ক্যান ডাকল রাজাকারে।।
বিবি ভাবে মিঞা সায়েব পাকিস্তানির দলে।
নাইলে ক্যান তার ভাই ভাসে বাউকাডির খালে।।
এইমতো বেয়াকেই মনে নানান সন্দ।
ছোমেদ আলি বলে, এ এক মস্ত বড় ধন্দ।।
তো, এইমত বেয়াকে তহন নিজেগো মাংস নিজেরা খাইতে আরাম্ব করলে।
ছোমেদরা তকন পেয়ারা বাগান থেকেও উৎখাত। যারা মারা পড়ল, তারা তো বেঁচে গেল। যারা মরতে পারল না, তারা যে যেখানে পারল, ঝোপজঙ্গলে লুকিয়ে থাকল। আটঘর বলে এক গ্রামে ছিল তখন ছোমেদরা। মিলিটারি তখন ওদিকে আর যায় না। তাদের ধারণা, ওদিকে সব শেষ। ওদিকে আর যাওয়ার দরকার নেই। ছোমেদ বলে, তয় বোজজেননি, মানুষ অইলে ছৈলা গাছের ঝার। হ্যারগো কি মারয়া কাডইয়া শ্যাষ করণ যায়। কোনো না কোনোহানে য্যান এট্টু শেহরবাহর থাইক্যাই যায়। হেইহান দিয়া আবার গজাইয়া ওডে। মানুষ আর ছৈলা গাছের এই অইলে চরিত্তির। ছোমেদ আলি মরবে, মরবে কার্তিকইয়া খল্ইয়া চুৎমারানির পোয়ও। কিন্তু ভাইগণ, বন্ধুগণ, যদি হোনেন মোর বচন। কিরা কাড্ইয়া কইতে পারি দেবজ্ঞের ল্যাহান। এক মরে আর অয়, মাইন্সের নাম পরিচয়, চিরদিন থাইক্যা যাইবে, যদ্দিন এ জাহান। জাহান যদি শ্যাষ অয়, বেয়াক কিছু পাইবে লয়, হে অবস্তা কেবা জানে, কেবা কইবে মোরে। কেবা দ্যাখছে, হেইরূপ, ছিষ্টি যহন অন্ধকূপ, ছিষ্টি যহন দ্যাহার লইগ্যা কেবা তহন বাচ্ইয়া থাকতে পারে। ছোমেদ আলির এই কতা বেয়াকেই মাতাব্যাতা, বেয়াকেই জানার লইগ্যা, মাতা কুডইয়া মরে। তয় মাতা কুডইয়া মরলেই তো আর জানোন যায় না। কিন্তু হে কতা থাউক, যা জানি না, হেয়া জানি না। আসল কতা অইলে, জাহান যদি থাকে, মানুষ থাকপে। জাহান যদি থাকে, মানুষ থাকপে। জাহান থাকতে হ্যার মরণ নাই।
এভাবেই তারা বেঁচে ছিল, যেমন ছিল আরও অনেকে। মেয়ে পুরুষ, যুবা বৃদ্ধ। ছোমেদ বলে, বোজজেন নি আপনেরা, তহনও কইলম মাইন্সের পোলা মাইয়া হওন বন্দো অয় নায়। কী করে বন্ধ হবে? ছোমেদ আবার একবার গতি পরিবর্তন করে তার কথকতার। বলে, তয় হোনেন কই, বেয়াদপি মাফ করবেন–
শাস্তরে কয় কামরিপু পরিত্যাজ্য হয়।
ছোমেদ আলি জিগায় হেলে ছিষ্টি ক্যামনে রয়।।
ছিষ্টিতত্ত্ব যেবা জানেন, জানবেন এই কতা।
কামভাবের থিকা ছিষ্টি হইল যথাতথা।।
যে মনুষ্য কাম ত্যাগইয়া জঙ্গলেতে রয়।
ক্যামনে হইবে তার বংশপরিচয়।।
তবে কাম লইয়া য্যারা করে হুড়াহুড়ি।
য্যাদের কাছে বিচার নাই বুড়ি কিবা ছুড়ি।।
তারগো কতা এই স্থানে করি না বিচার।
ছোমেদ আলি নিন্দা করে বেয়াক অনাচার।।
যুয়ানে যোবতি চায়, যোবতি যায় যুবা।
ছোমেদ আলি জিগায়, নাইলে সুখও আছে কিবা।।
যুয়ান যোবতী যদি আল্লা আল্লা হরে।
পোলা মাইয়া ক্যামনে অয় সংসারও ভিতরে।।
যদি নাই অইল দ্যাশে কোনও ছাওয়াল পান।
ক্যামোনে থাকিবে বল আল্লার ছিষ্টিখান।।
হে কারণ বলি শোন যত আছে ভাই।
সবার সেরা কামভাব, তাহার সেরা নাই।।
বেয়াকেই কয়, এই কামভাব নাহি খুব খারাপ। মুই হেয়া মানি না। মাইন্সের মনে যহন কামভাব জাগে তহনই তো হে বেয়াক কিছু সুন্দার দ্যাখতে থাহে। এই মোরা, হালইয়া চাষারা ধান বুনি, ক্ষ্যাত করি, পুহইর কাডি। বাগবাগিচা, গেরস্থালি, হাউসের ঘরবাড়ি যা যা করি, হেয়া বেয়াকেই তো এই কামভাব থিহা, নাকি কয়েন? এডুক না থাকলে কোনো ছিরি বিদ্দি অইতে মোগো? হায়াৎ মৌয়াত বিদির বিদান। মুই কই, মনুষ্যের এই কামভাবটুকই হ্যার হায়াৎ। খারাপ অত্থে নেবে না কেউ মোর কতা। এট্টু ভাবইয়া দ্যাহেন। দ্যাহেন, একজন চাষা যখন রোওয়া রোয়, নরম মাডির মইদ্যে হাত ঢুহাইয়া রোওয়া পোতে, তহনও কইলম হ্যার মোনের মইদ্যে এই কামভাবটুকুই থাহে। হে তহন এই মাডিরে মোনে করে হ্যার পরিবারের শরীল। হে তহন মাডিরে সোয়াগ আল্লাদ করে। আবার যহন হেই রোওয়া, কিংবা ডোয়ার পাশের কদু কুমড়ার ডগাগুলান চালে ওডোনের লইগ্যা লকলকাইতে থাহে, তহন মনে অয় য্যান এগুলা নিজেরই পোলামাইয়া, নতুন হাটতে শেখছে, এই ওডে এই পড়ে। ক্যামন এট্টা ভাব তহন অয় মোনের মইদ্যে, ভাবইয়া দ্যাহেন, এই ভাবটুকুই কইলম কামভাব। এ্যার য্যারা ‘সু’ দ্যাহে হ্যারগো ধারে ‘সু’ আর য্যারা ‘কু’ দ্যাহে ‘কু’। তয়, মুই কই এই অল আপনেগো ছিষ্টিতত্ত্ব।
ছোমেদ বিষয়ান্তর ছেড়ে আবার মূল ভূমিতে। সেই আটঘরে তখন তাদের বসতি। ওই সব গ্রামে তখন আর বসতি বিশেষ নেই। সেখানে তারা একখানা লম্বা ঘর বানায়, দোচালা। বাঁশের খুঁটি নারকেল পাতার ছাউনি আর বেড়া। মোরা তো চিরডা কাল এরহম ঘরেই থাহি। মোগো ঘর তো আদপেই কাচা বাঁশের। হেই যে লালন সাই-এর গানে কইছে না–
ও মোন রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশের
একদিন খাঁচা যাবে খসে
লালন কেঁদে কয়–
হেই বেত্তান্ত। তো মোগো এই খাচা তো নিত্যখসে। হেয়া মোরা ধত্তইব্য করি না।
ভাইগণ, বন্ধুগণ, আপরেনা বেয়াকেই জানেন, ধলা ফক্কক্কইয়া ছাফছ্ুরত মাইনসেরা, য্যাগো তালেব এলেম ম্যালা, য্যারা ইসকুল, কলেজ মাদ্রাছায় এলেম পাইছেন, হ্যারগো মইদ্যে অনেক মোগো এই হালইয়া চাষা, কামলা, কলেখাডা মাইনসেগো লইগ্যা ম্যালা কিছু করতে চায়েন। এই যে মুক্তিযুইদ্ধ, হ্যার লইগ্যা যেসব শহরইয়া মানুষ জান কবুল করতে আছেন, হ্যারগো মোরা মাইন্যতা করি। হ্যারা অইন্য মানুষ, অনেক বড় কেসেমের মানুষ হ্যারা। হ্যারা হামনে খাড়ইলে আসমানে মাতা ঠেহে এ্যাত্তো বড় মানুষ হ্যারা। ছোমেদ আলি হ্যারগো কদমবুসি হরে।
কিন্তু তবু ছোমেদ বলে, যে, তাদের সাথে ছোমেদদের তফাৎ অনেক। ছোমেদ আলিরা তাদের লড়াই লড়ে এক কায়দায়, এরা লড়ে অন্য কায়দায়। দুয়ের মধ্যে ফারাক দুস্তর। তাদের একই সাথে দু রকম লড়তে হয়। একদিকে তারা শত্রুকে মারতে থাকে, অন্যদিকে ঘরগেরস্থালি, চাষাবাদ, যা যা ধ্বংস হয়, তার পুনর্নিমাণে যত্নশীল হতে হয় তাদের। ছোমেদ বলে, মোগো যে যুইদ্ধ, আপনেরা জানেন, হেডা তো একদিন, দুই দিন, দশ দিনের হুলুস্থূলু না। এই যুইদ্ধ, মোগো বাপদাদা, পরদাদা, চৈদ্দ পুরুষের হাজার হাজার বছরের যুইদ্ধ। হেয়া তো আর শ্যাষঅয় না। হেই যুইদ্ধই তো মোগোর আসল মুক্তিযুইদ্ধ। হে যুইদ্দে মোরা নারা লাগাই, কি? না, তুই মোর ঘর পোড়াবি, পোড়া। মুই আবার বানামু। আবার পোড়াবি? আবার বানামু। এই মতন পোড়তে পোড়তে আর বানাইতে বানাইতে মোগো চৈদ্দপুরুষ যুইদ্ধ চালাইয়া আইছে। মোরা জানি এ্যার শ্যাষ নাই। যদ্দিন বাচি তদ্দিনই যুইদ্দ। মরার সময় পোলা মাইয়ারে কইয়া যাই, শোন, এই অইলে মোগো বাচন। তয় এয়া মোগো অইব্যাসে আইয়া গেছে। এ্যার মইদ্যে কোনো নতুন কতা নাই।
সে যা হোক তা হোক, ছোমেদ আবার দৌলতের কথায় ফেরে। বলে, দৌলতের তহন নত্তুন বয়সের কাল। ঘরে যোবতি নারী উথাল পাথাল। হে খ্যানে ওডে খ্যানে বয়, খ্যানে হুইয়া রয়। আচুককা ফাউকায় মাইয়ার মনে বড় ভয়। ভয় তো অইবেই। কয়েন কী আফনেরা, ভয় অইবে না? নতুন যৈবনকাল, য্যামন হে যোবতী, তেমন দৌলতইয়া যুবা। হ্যারগো তহন হওয়ার কতা– কীসের চিন্তা কীসের কী, আয় সখী মুই গা ঘষি। তো হেয়া না, উল্ডা এইসব ক্যাঞ্জাল, মাইয়ার মনে খালি তরাস। আহা, মোর এই সুখটুকু বুজি গ্যালে। এ য্যান, আফনেগো কী কমু, মশানে বাসরঘর।
আর দৌলত? আহা। দৌলতের গুণের কতা কী বলিব আর। এমনও গুণেরও ছাওয়াল সংসারের সার। ঘর দ্যাহে বাইর দ্যাহে কেবা কোতায় আছে। য্যার নাই কেউ, দৌলত হ্যারও পাছে পাছে। ঘুরইয়া ফিরইয়া করে তালাস হ্যারা খাইল কিবা। অথবা উপাসইয়া থাইক্যা কান্দে রাত্রি দিবা। দৌলতের ছিল এরকম বিবেচনা। নতুন বিয়ে, নতুন সংসার। কিন্তু সে তা নিয়ে মত্ত হলো না। মত্ত হবার সুযোগ প্রথমে না থাকলেও, তখন ছিল। তখন যুদ্ধ আর ও দিগরে ছিল না। মিলিটারি, রাজাকার তখন ওদিকে আর যায় না। ছোমেদরা সবাই তখন এক জায়গায়। যা জোটে, তাই খেয়ে, কোনো রকমে দিন কাটানো। না খাওয়া বা আধপেটা খাওয়া তাদের কোনো সমস্যা নয়। এতে তারা ভয় পায় না বা মনও খারাপ করে না। এ তো আবহমান অভ্যেস। পুরুষ যারা, তারা মাছ ধরে। এদিক ওদিক কোথাও বেচে চাল নুন আনে। মেয়েরা শাকপাতা, কলা, কচু জোগাড় করে। সব সিদ্ধ করে তাদের খাওয়া। নুন বড় আক্রা। তাই নারকোল গাছের ডগা পুড়িয়ে নুন বানায় তারা। তাই দিয়ে খায়। সে লম্বা ঘরখানা তারা বানিয়েছিল, তার ‘ডোয়ার’ চারপাশ দিয়ে, চালের উপর লাউ, কুমড়া, শিম, বরবটি আর পুঁইয়ের লতা উঠিয়ে দিল মেয়েরাই। ঘরখানাকে দূর থেকে তাই শনাক্ত করা শক্ত। মনে হয় যেন জংলা ঝোপ একটা, বেশ বড়সড়। চারদিকে বিচে কলার ঝাড়। সামনের উঠোনের দুই পাশে “ধানী পায়েলইয়া আর বোম্বাই মরিচের” একটি মনোরম সফল আয়োজন। ছোমেদ বলে, মানুষের খাওনের লইগ্যা এর অধিক আর কী পেরোজন, কয়েন?
এরকম যখন তাদের যাপিত সময় তখন একদিন বর্ষান্ত সন্ধ্যায় পুরুষেরা যারা চালের খোঁজে গিয়েছিল, তখনও ফেরেনি। চালের সংগ্রহে তখন তাদের যেতে হতো দূর দূর স্থানে, অত্যন্ত গোপন, সতর্ক পদক্ষেপে। সেদিন ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল।
বর্ষা তখন শেষ। খাল, বিল, নদী, নালার জলে তখন সাগরে ফেরার ব্যস্ততা। মাছের খন্দ ভালো। খন্দ অর্থে ফসলপ্রাপ্তি। মাছ নিয়ে অষ্ট, ছোমেদ, ফণী, কার্তিক আর দৌলত গিয়েছিল কীর্তিপাশার বাজারের দিকে। মনে ইচ্ছে, মাছ বেচবে, চাল ডাল কিনবে, আর দেখে আসবে ওখানকার অবস্থা। কীর্তিপাশার বাজার, এতদঞ্চলের মুখ্য স্থান। প্রবেশপথও। শহর-গঞ্জ থেকে শত্রু-মিত্র যারাই আসুক এই পথেই আসতে হবে তাদের। বহু পুরোনো কাল থেকে এই রকমই চলে আসছে। পুরোনো কাল বলতে সেই কীর্তিপাশার বাবুদের আমল থেকে– যাঁরা ঝালকাঠির গঞ্জের সাথে কীর্তিপাশার এই রাস্তার যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। এছাড়া, এ অঞ্চলে ঢুকতে হলে একটিই পথ, সেটি জলপথ। তা অত্যন্ত ঘুর-পথে পাড়ি দিতে হয়। মিলিটারিরা সেই পথেই এসেছিল। এছাড়া এদিকে ঢোকার আর কোনো পথ নেই। অন্য দিক দিয়ে আছে। এটা পশ্চিম দিক ঘুরে এখানে ঢোকার রাস্তা। গঞ্জ থেকে আরেকটি পথ পুব দিকের বাসন্ডার খাল ধরে, বাউকাঠির গঞ্জের ছোটো খাল বেয়ে এখানে পৌঁছায়। হার্মাদেরা সে সময় সে রাস্তাও ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন ওইসব রাস্তা আর খুব নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় এ কারণে যে স্বাভাবিকভাবে পোড় খেয়ে যে ভূমিপ্রেমিক গেরিলাবাহিনী স্থানীয় ভূমিপুত্রদের মধ্য থেকে গড়ে উঠেছে, তারা এতদিনে নিজস্ব ঐতিহ্যগত রণকৌশল, স্ব স্ব অঞ্চলের সীমান্ত রক্ষা বিষয়ে কিছু সম্মুখব্যূহ রচনা করতে সক্ষম হয়েছে।
তা সে যে কারণেই হোক, কীর্তিপাশার বাজারের অবস্থা তারা কিছু খারাপ দেখেনি সেদিন।বাজারে পুরোনো অনেক বন্ধুজন, আত্মবান্ধবদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল তাদের। বড় আনন্দ হয়েছিল। কেননা, তারা জেনেছিল, অন্তত এরা তো বেঁচে আছে। বাজার তখনও দগ্ধ। বড় বড় দোকানগুলোর পোড়া খুঁটি, দুমড়ানো টিন, অর্ধদগ্ধ তৈজস, জামাকাপড় তখনও পরিষ্কার করে ব্যাপারীরা বাজার সাজায়নি। সাজাতে ভরসাও পায়নি। তখনও এই বাজার যেন গেরিলা বাজার। এই বসছে এই নেই। কেন? না, হঠাৎ নাকি ড্ড্ড্ড্ শব্দ শোনা গেছে। যে শব্দ গানাবোটের শব্দ। যে শব্দের ধ্বনি বেয়ে মেশিনগানের ট্ট্ট্ট্ শব্দ এবং সীসের ছিটে মানুষকে ঝাঁঝরা করতে আসে। মানুষ অবস্থার দাস। অবস্থা যখন এরকম, মানুষকে এ রকম তো হতেই হবে। তাই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
যখন তারা গ্রামে পৌঁছোয় তখনও অন্ধকার পুরো নামেনি। ছোটো একটি খালের ধার দিয়ে রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে আসছিল তারা। সেই খাল আবার পুবদিকে গিয়ে বড় খালে পড়েছে, যে খালের কথা আগেই বলেছি, বাসন্ডার খাল, যা গঞ্জ পর্যন্ত গিয়ে অবশেষে সুগন্ধায় লীন।
বাড়ির কাছাকাছি যখন তারা পৌঁছোয় তখন দৌলত হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলে, খাড়অ। কীসের য্যান দাপাদাপি হোনতে পাইতাছি। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে তারা শব্দের উৎস বুঝে নেয়। ইশারায় দৌলত দেখায় ওই দিকে, অর্থাৎ রাস্তা থেকে ডান দিকে যে ঝোপ, সেখান থেকেই শব্দটা আসছে। ছোমেদ বলে, মোরা তহন পাও টেপতে টেপতে হেদিক গেলাম। যাইয়া দেহি, এট্টা পানির কলসি গইড় খায়। দেইখ্যা বোজলাম, মোগো ওহানের কোনো মাইয়া লোক আছে এহানে। এট্টু দাপাদাপির আওয়াজও য্যানো পাইলাম।
আরেট্টু আউগগাইয়া দেহি, জোঙ্গোলের মইদ্যে এট্টু ফাহা জাগা। এউক্কা কাউফ্লা গাছের লগে দুইডা রাইফেল আড়উয়া আউরি। মোরা তহন যুইত্তোবোন্দে, জোঙ্গোলের আড়ালে খাড়ইয়া পড়ছি। যা বোজার তো বুজইয়া গেছি। মোরা এ্যামনভাবে খাড়ইছি যে মোগো দ্যাহন যায় না, কিন্তু মোরা বেয়াক দ্যাখথে পাই। ফাহা জাগাডায় দেহি, এক জোন মোগো সরেস্বতীরে ঠাসইয়া ধরইয়া রইছে, আরেক জোন হ্যারে বলাৎকার করণের উয্যোগ করতাছে। দুইডাই রাজাকার। তহন আমগো আর চিন্তা করণের মতো সোমায় নাই। দৌলত আর অষ্ট দুইজোনে এ অর দিগে একবার চাইলে। কী য্যান ইশারা করলে। আচুক্কা দেহি, রাইফেল দুইডা অষ্টর দুই অতে, আর রাজাকার হালারা দৌলতের ক্যাৎকুলিতে। সরেস্বতী কাপুর চুপুর ঠিক করে আর জাইত সাপের ল্যাহান ফোসায়।
সে এক অসাধারণ দৃশ্য। তখন দৌলত সেই দুই আজরাইলকে বগলে চাপ দেয় আর বলে, ফণীদা, তোমার লগে দাওয়ান আছে না? ফণী বলে– হ। তয় এই দুই সাউয়ামারানির পোরগো চ্যাট দুইডা কাডো। উপস্থিত য্যারা আছেন, মোর অসোইব্য শব্দ মাফ করবেন। মোর ধারে একথা জানাবার জইন্য শব্দ নাই, হ্যার লইগ্যা এমন কই। কিন্তু ধনী এট্টুও চিন্তা করলে না। য্যামন দৌলত কইছে, হ্যামন হে দাওহান দিয়া হ্যারগো যন্তর দুইডা কচকচ করইয়া কাডলে। তহন অষ্ট কয়, এত ঝামেলার পেরোজন কী? এই দুইডার হোগার ফুডায় রাইফেলের নল দুইডা ঠেহাইয়া ঘোড়াডা এট্টু টানইয়া দি, যাউক ল্যাডা। দৌলত কয়, না, এ্যারা অনেক মানুষ মারছে। অনেক মাইয়া লোকের ইজ্জত নষ্ট করছে। এ্যারগো অত সোজায় মারণ উচিত না। আবার গুল্লির আওয়াজ পাইয়া, না জানি কোন চুৎমারানির পোয়রা এ দিগে আইয়া পড়ে। সাবধানের মাইর নাই। মরতে তো অইবেই এ্যাগো। মুই কই পিডাইয়া মারি। এট্টু বুঝুক মরতে ক্যামন লাগে।
রাজাকার দুজন তখন আধমরা। হয়তো তাদের মনে কোনো বিচিত্র বিকৃত স্মৃতি ক্রীড়া করছিল। অথবা, আশু মৃত্যুর সম্ভাবনায় এরকম কিছুই ভাবছিল না তারা, এমনও হতে পারে। তাদের মাথায় আদৌ কোনো বোধ কাজ করছিল কিনা, কে জানে? অষ্ট আর দৌলত তখন তাদের রাইফেলের কুন্দা দিয়ে এমন মার শুরু করেছিল যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা তাকিয়ে দেখাও সম্ভব নয়। অনেক পুরোনো রাগ। তারপর বউয়ের ইজ্জত। মার খেতে খেতে দুটোই এক সময়ে মরে গেল। ছোমেদ বলে, অনেক দিনের রাগ, সুযোগ পাইয়া ছাড়ে কেডা কয়েন? তো, হে কারণ এই দুইডা মরলে। তহন, মোগো চিন্তা, এ্যারা আইলে ক্যামনে? নিশ্চয়ই, আশেপাশে নাও আছে। এ্যামনে তো আওয়া সম্ভব না।
তখন অন্ধকার। খাল পাড়ে গিয়ে তল্লাস করে তারা অনেক কষ্টে আবিষ্কার করে যে, একটা ছৈলাগাছের ঝোপে বাঁধা আছে একখানা ডিঙি। বোঝা গেল, সরস্বতী জল দিতে এসেছিল ঘাটে। এরাও এদিকে এসে পড়েছিল শিকারের খোঁজে, যদি কিছু পাওয়া যায়, কিছু লুটপাট করা যায়। সরস্বতীকে দেখে, তাদের আর ধৈর্য মানেনি। তারা মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়েই তাকে কব্জা করে। তাছাড়া মনে ভরসা আছে, হাতে তো রাইফেল আছেই।
এখন সমস্যা হলো, লাশ দুটো, প্রথমে তারা ভাবে খালের চরায় পুঁতে ফেলবে। কেউ বা ভাসিয়ে দেয়ার কথা বলে। দৌলতের চেহারার দিকে তখন তাকানো যায় না। সে কী ভয়ঙ্কর চোহারা তার। তার যেন রাগ তখনও যায়নি। সরস্বতীকে ধরে বসে আছে সে তখনও। আর বিড়বিড় করে কী যে বলছে, সেই জানে। সে একবার সরস্বতীর মাথায় হাত বুলোয়, আর সান্ত্বনা দেয়। এই যে দুটো মানুষ খুন হলো, তাতে তাদের কারোর মনে যেন কোনো খেদ নেই। খুন দেখতে দেখতে তখন এমনই একটা অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া এ তো শত্রু নিপাত। তখন অষ্ট বলে, দৌলত ভাই, ওডো, এগুলার এট্টা ব্যবস্থানি করন লাগে। তখন ঠিক হলো দৌলত আর অষ্ট এ দুটোকে নৌকোয় তুলে বড় খালে ভাসিয়ে দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরবে। রাইফেল দুটোও তাদের সাথে থাকবে। লাশ আছে বন্দুক নেই, সে এক নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তার থেকে যা চুৎমারানির পোয়রা, তোগো বন্দুক লইয়া দোজখে যা। দৌলত বলে, ফণীদা, তুমি, ছোমেদ ভাই আর কার্তিকদায় সরেস্বতীরে লইয়া বাড়ি যাও। মোরা এইগুলার গতি করি। তয় দিনকাল তো ভাল না। যদি মোরা না ফিরি, খোঁজ করতে যাইও না। সরেস্বতীরে দেইখ্য তোমরা। যদি ফেরতে পারি রাইত অইবে ম্যালা। রাস্তা অনেক।
দৌলত আর অষ্ট ফেরে মাঝরাত্তিরে। ততক্ষণে সরস্বতীকে নিয়ে সবার কী উদ্বেগ। সে কেবল বলে, তোমরা অরে যাইতে দিলা ক্যান? মোর বুজি কপাল পোড়ল, দু দুইডা মানু খুন অইছে। অরা তো হ্যারে ছাড়বে না। তারা যত বলে যে, না, অষ্ট সাথে গেছে, কোনো ভয় নেই। সে বলে, হ্যাগো গুল্লি দেবে দুশমনে। এইসব গণ্ডগোলে যখন দৌলত আর অষ্ট পৌঁছায় তখন আর এক দৃশ্য। সরস্বতী তখন লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে দৌলতকে জড়িয়ে ধরে গায়ে মাথায় হাত বুলোয় আর বলে, ওরে ডাহাইত, তুই গেলি ক্যান? তুই মোরে ছাড়ইয়া আর কহনও যাবি না, কতা দে। ছোমেদ বলে, ভাইগণ, বন্ধুগণ, এ অইলে আফনেগো, ওই য্যারে কয় নত্তুন বয়সের পীরিত। আর কিচ্ছু না। ছোডোকালে শোনছেলাম এট্টা গান। হেডা এহন মনে পড়ে। গানডাআছেলে, দ্যাহা না হইল শ্যাম, মোর নত্তুন বয়সের কালে। এ্যার লইগ্যা নাকি কেডা য্যান আফশোস করইয়া মরছেলে। কিন্তু দ্যাহেন, দৌলত আর সরেস্বতীর দ্যাহা কইলম একছের সোমায় মতই অইছেলে। দুই জোনেরই তহন নত্তুন বয়সের কাল। য্যামন দৌলতের রূপ, তেমন রূপ সরেস্বতীর। কার্তিক যে কইলে, যে দ্যাখলে মনে লয় শিব দুগ্গা, হে কতা কিছু মিত্যা না।
মোরা দ্যাহেন যা কিছু সুন্দার দেহি, হেয়া বেয়াক শিব দুগগার লগে মেলাই। ক্যান? না হেয়ার থিহা সুন্দার আর কিছু তো মোরা জানি না। তয় এ শিব বুড়া না। মোগো হাইল্যা চাষাগো শিব বুড়া অয় না– হ্যার বয়স য্যাতই হউক। মোগো মাইয়ারা শিবরাত্তির জাগে, শিবের ল্যাহান পতি পাওনের লইগ্যা। ক্যান? না, হ্যার থিহা কেউ বউরে বেশি ভাল পায় নায়। এ কারণ শিবের থিহা ভাল জামাই মোরা কোনো দিন ভাবতে পারি না। মোগো হাইল্যা চাষাগো ঘরে হগল জামাই-ই দেহন দষ্টব্যে বুড়া, আসলে বুড়া না। শিবের ল্যাহানই মোগো কোনো বয়স নাই। মোরা বয়সের বাইরে।
কিন্তু দৌলত তা নয়। সে ছিল যেন মাটি ফুঁড়ে ওঠা বিচে কলাগাছটার মতন। কী তার বুক, কী হাত পায়ের বলিষ্ঠ গড়ন আর কী তেজ-মাখানো শরীর। তার পাশে অন্য সবাইকে যেন নেংটি ইঁদুর বলে মনে হতো। তেমনি সরস্বতী। ছোমেদ আবার সরস হয়। বলে, হোনেন তয়–
বষ্যাকালে নদী য্যামন আকুলি পাকুলি।
এই কইন্যার যৈবন ত্যামন ভাসায়অ দুকুলি।।
টানা টানা চোক্কু মাইয়ার দীঘল মাতার চুল।
আলিয়া ঢলিয়া পড়ে য্যানো কাশের ফুল।।
মুষ্টিতে ধরন যায় পাতলা মাজাখান।
বুকের দিগে চাইলে ওড়ে পুরুষের পরান।।
আল্লাদ্ইয়া ভাবের মাইয়া যহন হাডইয়া যায়।
বকুল ফুলের ঘেরান যেন বাসাতে ছড়ায়।।
এই অইলে মোগো সরেস্বতী তহন। সে সোমায় এ্যারগো বেয়াকেরই বয়সের কাল। মুইই খালি আছেলাম আদ্ বুড়াডা। তমোও কি মোর মনে এট্টু হিংসাভাব আছেলে না? মিত্যা কমু না, দৌলতেরে মোন লয় তহন হিংসা অইতে গাছ গাছালিরও, মানুষ তো কুরবানির জানোয়ার। তয় এইসব হিংসা ভাবটাব বেয়াক মনে মনে। মোরা জানতাম যে কী রূপে, কী গুণে মোরা হ্যার একগাছ বালেরও তুইল্য না।
তো হেদিন রাইতে মোরা কেউই ঘুমাইলাম না। সরেস্বতীরে শান্ত করইয়া, খাওয়াইয়া লওয়াইয়া ঘুমাইতে কইলাম। হ্যার উফার দিয়া ধকল গেছে সাইদ্যের। হ্যারপর মোরা বইলাম বন্দেজ করতে। যে ঘডনা ঘডছে, হ্যারপর এহানে আর থাহন উচিত না। ঠিক অইলে পরদিনই খোঁজ লমু, নিজেগো বাড়িঘরদুয়ারগুলো ঠিক আছে কিনা। থাকলে, কী অবস্তা, হেয়ানে যাইয়া এহন থাহা যায় কিনা। এহানের ঘর দুয়ার থাকপে। পেরোজন মতো আওন যাইবে। আর আল্লায় যদি দিন ফেরায়, মোগো একদল এইহানেই থাইক্যা যামু, বাহিরা যে য্যার বাড়ি। এই বাড়ি মোগো বেয়াকের ভবিষ্যতের আশ্ছয়।
সপ্তমীর রাত শেষ হয়ে গেল, ছোমেদের কথকতা শেষ হলো না। শ্রোতাসাধারণ জানাল, সেদিন, অর্থাৎ অষ্টমীর রাতে বাকিটা হবে। দিনের ব্যস্ততায় এ আসর হয় না। ছোমেদ বলে, এ ব্যাপারে তার কোনো ‘আফত্য’ নাই। কার্তিক তার সানাইটা থলেতে ভরতে ভরতে শুধু বলে, খল্ইয়া চুৎমারানির পোয় গ্যাছে কই? হে হালায় কি মোরে এক ছিলোম গাজা বানাইয়াও দেবে না?
