সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৯
নয়
ঘাটে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে পুজোবাড়িতে হইচই। রাজাবাড়ির নসু, নাসির যার নাম, সে তার দলবল নিয়ে হাজির। সৈয়দ আলি চাচা, ‘বাজান আছো তো ভালো বেয়াকে’, বলার সাথে সাথেই সে তার উলঝ্ন প্রকাশ করে। আরে ধুরও, বুড়াধুরাগো এহানে ডাকছে কেডা? অ্যাঁ? সরো দেহি। আয়েন দুলাভাই আয়েন। আমি এদের দুলাভাই, অর্থাৎ জামাইবাবু। কম কথা নয়। সে বলে, আগে ঘরে ঢোকোন নাই। পিরতিমাহান দেহন লাগে বুড়া শিবরে শ্যাবা দেওন লাগে। এডা নিয়ম। পূজা গোন্ডার বাড়ি। এবার মোরা এক নম্বর গুণরাজ দিয়া পিরতিমা গড়াইছি। আগে হেহানে হেবা দেন, পরে বাকিসব। গুণরাজ অর্থে মৃৎশিল্পী, যিনি প্রতিমা গড়েছেন।
সুতরাং আগের কাজ আগে। পিরতিমা দর্শন করতে গিয়ে দেখি, সপরিবারে দুর্গা তো আছেনই, আরও দুজন কারা যেন কাঠামোর নীচে দাঁড়িয়ে। তার একজন এক মিনসে পুরুষ, অপরজন এক মহিলা মাগি। মিনসেটি চুনোট করা ধুতি, পিরান এবং কাঁধের ওপর থেকে ঝোলানো উত্তরীয় ইত্যাদি বেশে সজ্জিত। মাথায় ঘনকৃষ্ণ কোঁকড়ানো চুলের বাবরি, পাকানো কার্তিকী গোঁফ, চোখে বেশ একটি তেরছা পরকিয়া ভাবের চাউনি নিয়ে বিপরীতে দাঁড়ানো মহিলা মাগির দিকে তাকিয়ে। মাগি মহিলার মাথায় দিঘল ঘোমটা, পরণে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। ঘোমটার আড়াল থেকে তার ঢলঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি, অবনী বহিয়া যায়। সব মিলিয়ে একটি জমাট রহস্য। দুটি অবয়বকেই যেন পরিচিত লাগল।
কিন্তু সে গল্প বলার আগে নসুর পরিচয়টা একটু সবিস্তারে দেওয়া দরকার। নসু বা নাসির রাজাবাড়ির পোলা। তার থেকেও তার বড় পরিচয় হলো সে ভাবীর দেওর। ভাবী, আমাদের নুরুদার স্ত্রী। নুরুদা, রাজাবাড়ির জ্যৈষ্ঠ পুত্র। এরা মুসলমান, কিন্তু রাজা উপাধি কেন, একথা বাল্যে কৌতূহলবশত জানার ইচ্ছে হয়েছিল। তখন এখানের বাজারে ছিলেন আমাদের সব পুরাণকথার কথাকার বিহারী কর্মকার। তিনি তাঁর কামারশালার হাপরটি টানতে টানতে পুরাকথা বলতেন। তাঁর কাছে গেলে তিনি জানিয়েছিলেন যে, অরা আসলেই রাজা। এর আগে অরা মোছলমান আছেলে না। পরে অইছে। রাজা উপাধিটি তদবধি রয়েই গেছে। তোমার বড় অইলে পড়বা হ্যানে, বইথে ল্যাহা আছে না–
যশোর নগর ধাম প্রতাপাদিত্য নাম
মহারাজা বঙ্গজকায়স্থ।
হেই পেরতাপাদিত্যের, কী রহম যেন লতায় পাতায় বংশধর এ্যারা। খুব উচা বংশ। নুরুর বাপ শুক্কুর রাজারবাপের ঠার্হুদা এছলাম ধম্ম নেলে– তদবধি এ্যারা মোছলমান।
ভাবী অর্থাৎ নুরুদার, স্ত্রী, এ দিগরে আমাদের ছোটোবেলার প্রথম নতুন বউ। অতএব বাল্যাবধি ভাব-ভালোবাসা। ভাবীর মতো সুন্দরী বউ দেশগাঁয়ে দশটা মেলে না। তদুপরি সাতিশয় সুরসিকা। সে একবারের কথা মনে আছে। ভাবী থাকেন গঞ্জের বাড়িতে। সেখানে তার গেরস্থালি রাজ্যপাট। রাজ্যপাট বলতে দু-তিনখানা টিনের চালার বাড়ি ভাড়া দেওয়া। তার একখানায় এক বাল্যসখীর সংসার। গ্রাম সুবাদে ননদ-ভাজ, গঞ্জে বাড়িউলি ভাড়াটে। সেবারে বাল্যসখীর গেরস্থালিতে উঠেছিলাম সপরিবার। সখী আবার বিবাহসূত্রে বড় কুটুমও, দ্যাশের ভাষায় কয় জেঠ্ইয়নি। তাঁরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই পেশায় শিক্ষক। একটি কন্যা। ভারী ছটফটে মেয়ে। এতগুলো পরদেশি মানুষ দেখে তার ভারী আহ্লাদ। ভাষার উচ্চারণগত ভিন্নতার জন্য পরদেশি কন্যাদের কিঞ্চিৎ অসুবিধে। ফলে একটি সুন্দর রগড় জমে ওঠে। কিন্তু সখীকন্যা চটজলদি পশ্চিমবঙ্গীয় উচ্চারণরীতি আয়ত্ত করে নেয়। অপিনিহিতি অভিশ্রুতির গোলকধাঁধা পেরিয়ে গেলেও শব্দ চয়নে তার কিছু স্বাধিকার মেনে নিতেই হয়। সে খোঁজ করাকে ‘বিচরিয়ে’ টোকামারাকে ‘টোক্কামারা’ বলে। যখন তার পিঠ চুলকোনোর দরকার হয়, সে পরদেশি ছোদ্দিভাইকে বলে– ছোদ্দিভাই, আমার পিঠ্টা এটু খাউজিয়ে দেও তো। এ নিয়ে হাসাহাসি হলে, সে আদৌ অপ্রতিভ হয় না। বলে, হাসার কী হয়েছে? আমরা ওরহমই বলি। ভাষার ব্যাপারে তার পিতার কালাপাহাড়ি অসামান্য। তিনি সর্বদাই চান্দ্রদ্বীপী প্রাকৃতের অত্যন্ত বিকৃত উচ্চারণে তার যাবতীয় বার্তালাপ করেন। যেমন আমরা তার বাসায় গেলে তার আপ্যায়নটি ছিল এ-রকম।– আইছ? আয়ো। মোরা তো ভাবলাম আইলা না বোধায়। চিডি অবইশ্য পাইতেছিলাম। তয় কইলকাতার মাইনসেগো তো কতার হোগামুড়া নাই। যদি কয় যামু পশ্চিমে, যায় দক্ষিণে। হে কারণ ভাবলাম, যাউক শত্তুরে পরে পরে। না আইলেই ভালো। খরচ খরচাডা বাচইয়া যাইবে হ্যানে। তয় আইছ যহন ভালোই অইছে। নাইলে বাড়ির জোনে হ্যানে গাইল খামার দেতে।
কথা বলেন এক নিঃশ্বাসে। পরদেশি কন্যারা বলে, মেসোবাবা তুমি একটু ভালো করে কথা বলো না? আমার বুঝি না কিছু। তারা মেসোকে মেসোবাবা বলে ডাকে। রগুড়ে মানুষ। বলেন, আর মেসোডুক রাহু ক্যান মাগো? ওই ডুক বাদ দিলেই তো অয়। পরদেশি ললনা ঝাম্টা মারেন, ইঃ সখ কত। আহ্লাদ। তখন মেসো বাবার কপট বিস্ময়। ক্যান, হেথে দোষ কী? অরা তো বড়মা, ছোডোমা, মণিমা, সোনামা কইয়া তোমাগো বেয়াক্রে বোলায়। মোগো বেলায় খালি বাবা, জেডা, কাকা, মাউসা ক্যান? বড়বাবা ছোডোবাবা, সোনাবাবা এইসব ডাকতে পারে না? আর, তুমি আর তোমার ছোড়দি তো মোগো একোই হৌরের মাইয়া। ফারাক্ডা কী?
এইসব হই-হট্টগোলের মধ্যে ভাবী এসে পড়েছিলেন। স্কুলজীবন ছাড়ার পর এই প্রথম দেখা। ভাবী গ্রাম সুবাদে আমার শালাবউ। অসাধারণ সুন্দরী, রগুড়ে আর স্বজনবৎসলা। বয়সের দাগ পড়েনি। একটু স্থূলতা এসেছে শরীরে, তবে তা মানানসই।
ভাবী এসেই আবহাওয়া পালটে দিয়েছিলেন সেবার। বেশ মনে আছে। মাস্টারনি দিদির উপর আদেশ জারি, ছোড়দি, তোমার আইজ ছুট্টি। খাওন লওন মোর ঘরে। তুমি বইয়া তোমার বুইন-বোনাইর লগে গপ্পো কর। মুই পাহে যামু। নিবারণকাকারে খবর দেও, আইয়া এট্টু গান-বাজনা হাসমশকরা করুক। এহন এ্যারগো এট্টু চা খাওয়ান লাগে। আরে, ওওও সালিমা, ছেমড়ি, গেলি কই? চায়ের জল চড়া, মুই আইতে আছি। ভাবী তড়বড় করে সব নির্দেশ দেয়। এক কোণে বসেছিলাম। ভাবীর চোখ আমার উপর পড়তে একটু জড়সড় হয়ে বললাম, ভাবী কেমন আছ? বহুকাল পর দেখা। বলতে না বলতে ভাবী খল্বল, পেরোজন নাই, পেরোজন নাই। কেবা ভাবী, কেবা বইন, কেবা আছে আপন জইন, মুই তো পাইছি মোর কলিজার ধন। কেবা আছ কেবা নাই। হেথে মোর কাফাড়াই, মুই আছি বুকে লইয়া অমূল্য রতন। মোরা এহন কেডা? বাইর বাড়ির বাথ্উয়াডা। কও ছোড়দি? আমি বলি, ভাবী, এই তো গেলবারও এসেছি। তা তুমি বাপের বাড়ি না কোথায় যেন গিয়েছিলে, তাই দেখা হয়নি। ভাবীর ধমকে কথা বলার উপায় থাকে না। খরখর করে ওঠে তার শাণিত জিভ, ও সাতজন্মে একবার বাপের বাড়ি গেছি, হ্যার খোডা কত? ক্যান দুইদিন অপেক্ষা করতে পারলা না? মুই কি জন্মের শোধ গেছেলাম না, তোমাগো ভাইজানে মোরে তালাক দেছেলে? বলি, আহা ষাট ষাট, তালাক দেবে কেন? তা হলে তো এ বয়সে আর নিকাও হবে না, বা নুরুভাইয়ের একজন নতুনও জুটবে না। সে ভারী ঝকমারি হবে। তুমি আমাদের লক্ষ্মীবউ, আমরা তোমার কত সুখ্যাত করি। ভাবীর পুনঃধমক, চোপ, নিমকহারাম, বেইমান, মোগো আহ্লাদইয়া বুইনডারে লইয়া হেই যে গেলে, আর কোনো তত্ত্বালাস নি রাহে।
অভিযোগ মিথ্যে না। কিন্তু উপায়-বা কী। এ বদনাম আমদের পুরুষদের ক্ষেত্রে চিরন্তনী। আর এ তো এ-দেশ ও-দেশের ব্যাপার। ব্যবধান দুস্তর। যাতায়াতের সুযোগ আরও দুস্তর। ভাবীকে সে কথা বুঝিয়ে বলতে ভাবী গলে জল। বলে, বুঝি তো বেয়াক, তমো মনডা পোড়ে। কী যে আছেলে আর কী যে অইলে, হেয়া যহন ভাবি তহন আর কিছু ভালো লাগে না ভাই। তো, ছ্যাক্ দেও এ আপ্যাচ্লা। খাওন দাওন কইলম আইজ ও ঘরে, একথাডা কইয়া দেলাম। এহানে খালি গপ্পোগুজব। ছোড়দি যদি বেতাল করে, অশান্তি হইবে কইলম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী খাওয়াবে ঠিক করলে, ভাবী? ‘খাওয়ামু? খাওয়ামু– থোড় ছেচ্কি থোরের বড়া, চাইলতার অম্বল’– ছোড়দি– বউ বউ, তুই থামবি? ভাবী বলে, থামলাম। ভাবীর মুখ বড় পাতলা। চন্দ্রদ্বীপললনা। কোনো ভাষা বা শব্দকে অশ্লীল বোধে ত্যাগ করেন না। সুরসিকা যারা, তারা শ্লীলাশ্লীল বিষয়ে ছুঁৎমার্গী হলে রসবর্ষণে হানি ঘটে। গাছকোমর বেঁধে ভাবী যান রান্নাঘরে। যাওয়ার আগে একবার বলে যান, কই বোলে যে এই নেমকহারাম, একবার য্যান যুইতোবোন্দে (চুপিচুপি) পাকঘরে যাইও। বউ যদি কোদে, মুই সামলামু হ্যানে। কতা আছে ম্যালা। বলে সবেগে প্রস্থান।
তখন রঙ্গস্থলে প্রবেশ নিবারণকাকার। নিবারণকাকা, কর্মকার সম্প্রদায়ের মানুষ। আমাদের বাল্য-কৈশোরের এক অসম্ভব আকর্ষণ। ছড়াকাটা, হাসিঠাট্টা আর রগুড়ে গান বাঁধতে তাঁর জুড়ি ছিল না সে-সব দিনে। ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন, কই, ক্যারা বলে আইছে? কতায় কয়–
উব্বুত অইয়া জলে ভাসে হেডা বাসিমড়া
আর দ্যাশ ছাড়ইয়া বিদ্যাশে থাহে য্যারা লক্ষ্মীছাড়া।
এহন য্যারা একবার এ-দ্যাশ ছাড়ইয়া ও-দ্যাশে যাইয়া উড়াইয়া বইছে, হ্যাগো মোরা বাসিমড়া, লক্ষ্মীছাড়াই কমু। হ্যারা আর এহানে আয় কিয়া? পাকঘর থেকে ভাবী টের পায়। খলবল করে ওঠে, ক্যান? দ্যাশটা ক্যারো বাফের? নিবারণকাকা মুখে ভয়ের ভঙ্গি করে বলে ওঠেন, ও, বোজতে পারি নায়। ওহানে আবার বিশল্যাকরণী আছে। তয় এয়াও কই, ও রাজাবাড়ির বউ, হলুদইয়া গাছের টলুদইয়া পক্ষী, হৌরেগো লগে এট্টু ভইব্য সইব্য অইয়া কতা ক। নাইলে দিমু খ্যাদাইয়া বাড়ির থিহা।
ভাবী আর নিবারণকাকার সম্পর্কটা বেশ মজার। দুজনেরই মুখ পাতলা। ভাবীর বাপ নেই। নিবারণকাকার মেয়ে নেই। দুজনে তাই দিব্য এক বাপ-মেয়ের সম্পর্ক পাতিয়ে বসেছেন। কাকা ভোজনরসিক। ভাবী রাঁধেন অমৃত। মাঝে মধ্যে পাকঘরে ডেকে ভালোটা মন্দটা খেতে দেয় ভাবী। বুড়া তখন ভারী বাধ্য। নিবারণকাকার হুমকিকে আদৌ গ্রাহ্য করে না ভাবী। পাকঘর থেকে তাই আওয়াজ দেয়, ইঃ খায় কত। খেদাইয়া দেবে। হেলে কইলম অসবিদা অইবে আপনেরই বেশি, হে কতা কইয়া দেলাম হ। নিবারণকাকা বলেন, এঃ ছেমড়ি খ্যাপছে। হে খ্যাপলে আবার মোর ঢালা লোস্কান। যাই দেহি– বলে পাকঘরে ঢোকেন। পাশপাশি ঘর রান্নাঘর। আওয়াজ শোনা যায়। নিবারণকাকার গলায় তোয়াজি রেওয়াজ, কই, ভালো মন্দ কিছু অইতে আছে নাহি? আইজ আবার মোর প্যাটটা এট্টু নরম অইছে।
নরম অইছে তো খাওন বন্দো।
আহা তুই কও কী? অতিথ অইভ্যাগত আইছে, সাত পাচ পদ রানবি, আর মুই খামু না?
ক্যান্, খেদাইয়া দেবেন বোলে?
আরে ধুরও ছেমড়ি, ওয়া তো কতার কথা। দে, চা দে।
আগে ওহানে দিই। ওহানেই লয়েন। একলগে হ্যানে বেয়াকে খামু। ভাবী চা নিয়ে আসেন পেছনে পেছনে নিবারণকাকা কাপ পিরিচ নিয়ে তাকে মদত দেন। বলতে বলতে আসেন, হেয়া তোমরা যাই কও, মাইয়াডা মোর সোনার টুকরা। পড়ছে অবইশ্য এট্টা আভোদার হাতে। আর এডার মাডাও অইছে এট্টা নিমূহা ছান্দি। বোদ ভাইষ্য কিছুনাই। ভাবী ধমক দেয়। চুপ করলেন নাকি। খালি পরনিন্দা। নিবারণ কাকা বিস্ময়ে হতবাক– পরনিন্দা? পর কেডা, অ্যাঁ? তোর মায় মোর পর?
পর না তো কী?
ঠিক আছে, এডা আশ্বিন মাস, কার্তিকেও শুভকাজ নাই, অগগেরানে নিহাডা সারইয়া ফ্যালাই, তহন দেহিস কেডা পর আর কেডা আফন।
কাকিরে কইছেন?
আরে যুর, বেয়াক কতা, বেয়াকরে নি কওন যায়? আর হে মাতারির ধার ধারে কেডা?
ধারতে তো অইবেই। এই বয়সে রাধিকা আর চন্দ্রাবলী, এই দুইহান গোছ এক লগে হোগায় লওয়া কি সামাইন্য কতা?
ধুর ছেমরি, হৌরের লগে অসৌইব্য কতা কয়– যা– পাকঘরে যা।
এইসব হাসি-মশকরায় সকালটি দিব্য জমে উঠেছিল। এমন সময় মুঈনুদ্দিন চাচা ঘরে ঢোকেন। নিবারণকাকাকে দেখে তাঁর ভ্রূকুঞ্চিত হয়। তাঁকে না শুনিয়ে নিবারণ কাকা ফিসফিস করে বলেন, অইছে কাম, ও বউ ঘোমডা দে। পিরছায়েব আইয়া পড়ছেন। এহন বেয়াক রঙ্গ মশকরার সোগায় শিবডি,অর্থাৎ ছিপি। ক্যারো য্যানো এহন কোনো হান দিয়া শোয়াস বা উল্ডা শোয়াস না বাইর অয়। এহন বেয়াকে, আল্লা আল্লা ঠাহুর ঠাহুর হরো। এহন আর হাস্যকাব্য পরিহাসকাব্য চলবে না। বেয়াকে এহন গম্ভীর অও। গম্ভীর।
মুঈনুদ্দিন চাচাও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেন, ও হারামজাদা মালাউন এহানে চায় কী, ওডা এখান আইছে ক্যান? তয় বোধায়, মোর নামে কিছু আচাইল কুচাইল কয়। ভাবী বলে, চাচা, কাকায় আফনের খুব সুখ্যাত করতে আছেলেন। কইতে আছেলেন, এমন ঈমানদার মানুষ, এ দিগরে আর নাই। হে মরলে, এদিক পুরা কানা। মুঈনুদ্দিন চাচা বলেন, কি, মুই ওর আগে মরমু? ওই কামারইয়ারে চিতায় না উডাইয়া যদি মুই কব্বরে যাই, তো হে কব্বর মোর না-পাক। হালার মালাউন। নিবারণ কাকা কথাটা শুনে ফেলেছেন। বলেন, হুঃ চিতায় উডাইবে মোরে এই মেলেচ্ছ। মোর য্যান্ জাত জন্ম নাই। তোর কব্বরে মাডি দিমু আমি। শ্যাহের আগুন মুহে লইয়া যে মরে, হে বলদা। ততক্ষণে ঝগড়া প্রকাশ্য। মুঈনুদ্দিন চাচা বলেন, তোরে আগুন দেতে আইবে কেডা, অ্যাঁ? তোর মুই ছাড়া আছেডা কেডা? ভাবী বলে, লাগ্ লাগ, লাগ্ ভেলকি লাগ্। এ সময় মুঈনুদ্দিন চাচার বিবি, জয়নাব চাচি এসে নিবারণ কাকাকে ইশারায় ডেকে বলেন, দেওরে এট্টু এদিকে আয়েন, কতা আছে। নিবারণ কাকা সসম্ভ্রমে তাঁর অনুগমনকরেন। মঈনুদ্দিন চাচা ফোকলা হেসে বলেন, অইচে, বেয়াক বেক্রম শ্যাষ। য্যামন কুত্তা, হ্যার তেমনি মুগইর। যা, এহন যাইয়া মাগিগো ফাইফরমাইস খাট। হালা মালাউন! সম্পর্কটা এমনই। ভারী সুখবোধ করি।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া বড় রগড় আর জমজমাটে হয়। অসাধারণ সব পদাবলী, আর ভালোবাসা, আর নস্টালজিয়ার মিশ্রণে স্বাদ, গন্ধ, অনুভূতি এবং গোষ্ঠীসুখের সম্ভোগ। সর্বোপরি, ভাবীর খাদ্যোৎসর্গ এককথায় অমের্ত। খাওয়াদাওয়া শেষ হতে জয়নাব চাচি এসেছিলেন এক আর্জি নিয়ে। এসে বললেন, জামাই, তুমি আর মাইয়ায় এট্টু চল দেহি। দুইডা পেরাণের কতা কই। এতক্ষুণ তো এ্যারগো হাউস রসের সোমায় দিলাম। মোরও তো কিছু আছে। চাচির সাথে তাঁর অন্দরমহলে ঢুকি। সেখানে অন্য ব্যবস্থা। চাচি নাকি শিশুবয়সে আমার সহধর্মিনীকে কোলেপিঠে মানুষ করেছিলেন। তাঁর নিজের কোনো সন্তানাদি নেই। নিবারণ কাকার অসুমার সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছেন চাচি। বলেন, এ মাইয়া ক্যার? বাপে ট্যাহে করইয়া আন্ইয়া রাইত দুফইরে ডাইক্যা কইতে, মঈনু বউরে ক, মাইয়ায় হ্যার লগে ছাড়া ঘুমাইতে চায় না। তো হেই উডইয়া, মাইয়ারে লইয়া ঘুম পাড়াই। এখন দেখি মেয়েও জয়নাব চাচির কাছে সোনাসোনা হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চাচি বলেন, জামাই, তোমার চাচার আর নিবারণ কাকার কাজইয়া, ধর্তব্য করইও না। ওয়া হ্যারগো নিত্যতিরিশ দিনের ব্যাফার। আবার হ্যারগো, ভাব-ভালোবাসাও আছে ম্যালা। একজনে কইলম, আরেক জোনেরে ছাড়া থাকতে পারে না। এই যে ঝগড়া, কাইল বেন্ইয়া কালেই দ্যাখফা হ্যানে, দুইজোনে, দুই হাতনায় বইয়া কাউয়ারে খুদ খাওয়ায়। এ্যার কাউয়া মোছলমান, হ্যার কাউয়া হিন্দু। আবার হেইয়া লইয়াও ঝগড়া। হ্যারপর দ্যাখফানে, এইসব ঝগড়া কাজইয়ার পর দুইজোনে এক লগে বাজারে। মাছের বাজারে যাইয়া দুইজোনা একপাট্টি। তহন ঝগড়া মাছউয়াগো লগে। কী? না, মাছের দাম এ্যাতো ক্যা, অ্যাঁ? এ্যারগো কইলম যত ভাব, তত ঝগড়া।
জিজ্ঞেস করেছিলাম, চাচি, ঝগড়াটা কীসের? দুজনেই বেশ মানুষ। চাচি বলেছিলেন, ঝগড়ার কারণ আছে। দেওরে খালি কইলকাতা, কইলকাতা হরে। কয় মুই তোগো লগে থাহুম ক্যান? মোর ভাইস্তারা আছে কইলকাতায়। হ্যারা মোরে রাজার ল্যাহান রাখফে। মুই যামু গিয়া। তো তোমার চাচায় কয়, যাবি তো যা। তয় তুই একলা যাবি। পোলা মাইয়াগো যাইতে দিমু না। তো জামাই, মুই কই, মোরে তো আল্লায় ছাচে কড়া দেনায়। দেওরের গুড়াগাড়াগুলা মোরে বোলায় বড় আম্মা। হ্যার তো ছয়ছউগ্যা গুড়াগাড়া। হ্যারগো মানুষ করছে কেডা? মুই না থাকলে তো বেয়াক গুলান মরতে। তোমাগো কাকি তো বিয়াইয়া খালাস। নিত্যভোগা অতসী। তো হ্যারগো মানুষ করছি তো মুই। তোমাগো চাচায় হেয়া বোঝে। মানুষটার বুঝ ভালো। বোঝে দেওরেও– মিত্যা কমু না। কিন্তু ওই যে একজন মরে হিন্দুয়ানি লইয়া, আরেক জোন কোদে শরিয়তি লইয়া। আবার একজোন আরেক জোনেরে ছাড়া থাকতেও পারে না। বয়স তো অইছে। আর হেয়া ছাড়া, একোই গুষ্ঠিরই তো মানুষ, রক্তের টান যাইবে কই? পারবে ক্যামনে?
একই গোষ্ঠীর মানুষ, রক্তের টান! এ সব কথায় একটু নড়ে চড়ে বসি। সে আবার কী? নিবারণ কাকা আর মুঈনুদ্দিন চাচা কি একই গুষ্টির মানুষ নাকি। ছোটোবেলা থেকে জানি এঁদের, কিন্তু একথা তো কখনও শুনিনি। চাচি বলেন, ও হেয়া বুজি তোমরা জানো না? তোমাগো বাবায় আশন জানতে। এই তো মাত্তর চাইর পুরুষ অগে হ্যারা আছেলে একোই বাড়ির মানুষ। এ্যারা এছলামে শরিক অইলে, তোমাগো নিবারণকাকার পরদাদায় অইলে না। হেই তো বিসম্বাদ। জমি জাগার পরচা দ্যাহ, সব ট্যার পাবা হ্যানে।
চাচি বলেন, কিন্তু বাজান, মুই কই, দেওরে যদি হিন্দুস্থান যায়েন, তো দুইদিনও বাচপেন না। মুইতো এ্যারগো রগ চিনি। কেউ কেউরে ছাড়া থাকতে পারবে না। এই তো গেছেলে, কাফুরইয়া পট্টির ননী দত্তর বাফে। ছয় মাস কাডে নায়, খবর আইলে– হে মরছে। এহন দেওররে যুদি মুই ছাড়ি, হে বাচপে, কও?
এ এক অসম্ভব অভিজ্ঞতা। দেশভাগ, দেশত্যাগ, অগণিত মানুষের উঞ্ছজীবন, নানান কথা মনে আসে। শৈশবে যখন দেশ ছাড়িনি, যতদিন ছিলাম, দেখেছি, আমাদের খালের ঘাটে কত নৌকা এসে লাগত। একে দুইয়ে গ্রামের বর্ধিষ্ণু পরিবারগুলো সবাই হিন্দুস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করত। যাবার সময় চোখের জলে বুক ভিজিয়ে নৌকোয় উঠত সবাই। ঘাটের পাশে একটা বিশাল রেইনট্রি ছিল। সে যেন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সেই বৃক্ষের এমন মহিমান্যতা ছিল যে, যারা জন্মের মতো দেশ ছেড়ে চলে যেত, তারা আভূমি নত হয়ে প্রণাম করত তাকে। কেন করত জানি না। হয়তো বলত– আমরা চলে যাচ্ছি, ক্ষমা করো আমাদের। এই বৃক্ষ যেন ওখানকার তাবৎ মনুষ্যকুলের আদিম বীজপুরুষের প্রতিভূ।
জয়নাব চাচি তার মেয়ের মাথায় হাত বোলান। বলেন, তুমি বাজান দেওররে এট্টু বুজাইয়া যাও। মোরে তো আম্মা ডাকতে কেউ নাই। এতগুলান পোলাপান মানুষ করলাম, মোর কবরে মাডি দেওনের লইগ্যা কেউ থাকপে না। দেওরে যদি যায়েন, হেলেতো যে যা কউক পোলাপান গুলারেও লইয়া যাইবে। তই মুই কী লইয়া থাহুম। হেঁচকি তুলে কাঁদেন চাচি। তাঁর কোলের মধ্যে মাথা রেখে তাঁর মাইয়ায় তখন ‘দেউলা’ করে।
