Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    মিহির সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প368 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৫

    পাঁচ

    আকাশেতখন এক টুকরো মেঘ নেই, চাঁদের ফালি কখন যে ডুবে গেছে কালীগঙ্গার প্রান্তে তার খেয়াল আমদের দু-জনের কারোরই ছিল না। আমরা ছিলাম এক ঘোরে এতক্ষণ। একজনের মনে এক প্রত্যাশা আছে যে মানুষ তার অনুভবের জগতে একদিন ফিরবে। অপরজনের যুক্তি কালীগঙ্গার গাঢ় অন্ধকারের অতলে সুলুকসন্ধান খোঁজে, সম্ভাবনার বিচার করে, দুজনের কেউ কারও পুরোটা বোঝে না। যুক্তি, অনুভবকে বা হৃদয়বৃত্তির পরম্পরাগত বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে পারে না। বোধহয়, এ এক দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার অভিশাপ, যা যুক্তিও বহন করছে এবং অনুভবও। অথবা সাদাসাপটা কথায়– নগর আর গ্রামের বিচ্ছেদ, যাপিত জীবনের অভ্যাসের, শিক্ষার অথবা সবকিছুরই। একের থেকে অন্যের বিচ্ছিন্নতা, কে সঠিক, কে বেঠিক, সে প্রশ্ন এই মুহূর্তে বড় নয়, হয়তো বা নিতান্ত আবশ্যকও নয়। আবশ্যক যা, তা হলো, কে শান্ত, কে অশান্ত, কে আশায় ভর করে আরও পথ চলতে পারবে, কে পারবে না। চলাটাই যেখানে একমাত্র অবলম্বন করার মতো গ্রাহ্য সত্য এখনও, সেখানে আশার বা বিশ্বাসের একটা সেতু যদি না থাকে, তবে এই কালীগঙ্গার মতো অতল অন্ধকারের মধ্য থেকে পথ চলা কি শুধুমাত্র কেঠো যুক্তির পৌনঃপুনিকতায় আদৌ সম্ভব?

    এ-কথা মোকছেদকে, সে যেভাবে বুঝবে, শুধোলে বলে– আমি কতি পারব না, মুর্শেদ জানলিও জানতি পারেন। তিনি মোগোরে যেমন কয়েন, মোরা তেমনি বিশ্বাসে চলার চেষ্টা করি। সবাই তো সব কতা বোঝে না। তিনি যা বোঝেন, মোরা তা বুঝি নে, তাই তিনি যা কয়েন মোরা তা করার চেষ্টা করি। তবে এ কতাও সইত্যি, যে এই চেষ্টা করতি করতি আবার মোরা একসময় অনেক কিছু বুইঝেও ফেলি। কিন্তু সে কতা বুঝোয়ে কতি পারিনে। তবে ভাইজান এ কতার মাইন্যতা দিতি হবে যে, মোর মুর্শেদ বা তেনার মতো মান্‌ষিরা, যাঁরা ফকিরি করেন পেরানের টানে, তারা মান্‌ষিরে সইত্যি ভালোবাসেন।

    রাত বেশ এগিয়েছে। কচা বা কালীগঙ্গা, যে নামেই ডাকি, সেই নদীর সবটাই এখন অন্ধকার। শুধু শব্দেই যা তার অস্তিত্ব। দূরের অলোকস্তম্ভের ইশারায়ও জল বা তার স্রোত এখন চাক্ষুষ নয়। অথচ সে আছে। আমাদের দুজনকে ঘিরে বড় রহস্যময় আবর্তে সে তো আছেই। তাকে দেখি আর না দেখি, তার ‘ছলোচ্ছল’ শব্দেই যেহেতু আমরা জাগর, তাই তার অস্তিত্বে সন্দেহ করা চলে না। এই গভীর মৌনে তার ছলোচ্ছল অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের এক যাদুকরী টানাপোড়েন। সেই টানাপোড়েন ভগ্ন হয়, অস্তিত্ব স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঙ্ময় হয়, যখন এই সুরের সাথে সুর মিলিয়ে একই লয়ে বেশ খানিকটা দূর থেকে ফকিরের আবির্ভাব, তাঁর দোতারায় দোরতং-এর যুগবলবন্দ্‌ সঙ্গী হয়, এবং সেই সুর ক্রমশ নিকটে এসে শব্দবন্ধে যুক্তি আর অনুভবের সেতুবন্ধ রচনা করে। শব্দ তখন যেন সুরকেও অতিক্রম করে এই শারদী আকাশে কালীগঙ্গার কুয়াশা মাখানো মনোলিথিক রহস্য ভেদ করে। দোরতং-এ এই কুয়াশায় শব্দ ভাসে তখন–

    আশাই প্রকৃত জীবন
    নিরাশাই মৃত্যুর কারণ
    বহু বর্ষ দেখেছি ভেবে
    আশার তেলে মেপে মেপে
    আশাই সর্ব মূলধন…।

    ফকির কি অনুভব করতে পেরেছিলেন মোকছেদ আর আমার মাঝে বিগত দিনের সব নিরাশার, বেদনার অর বিষণ্ণতার বিষয় নিয়ে বাক্যালাপ হচ্ছে? গানের বাণীতে কি তারই প্রতিধ্বনি? বাউল ফকিরেরা মনের কথা, গভীর কথা সদাই সুরে বলেন। গাইতে গাইতে কাছে এসে বসেন মোকছেদের মুর্শেদ ফকির সাব। দোতারা হাতের অভ্যাসে দোরতং দোরতং করে যায়। মুখের কথা গদ্য পদ্য, যা-ই হোক, সুরে বাঁধা থাকবেই, এমত মানস অভিজ্ঞান আছে আমার। বলেন,– ঠিক বুঝছি এইহানে আইয়া হুতাশ করতে আছেন। মায়েরা কেলান্ত, তারা সকলায় ঘুমাইয়া পড়ছে। কাজকাম শ্যাষ। ভাবলাম, দেহি, তেনারা কই? দেড় ঘন্টা সোমায় যে তিন ঘন্টায়ও শ্যাষ হয় না, সেয়া বুঝব ক্যামনে? তাই আইয়া পড়লাম।

    আমি বলি– গানটা শেষ করুন, বেশ লাগছে। ফকির দোতারায় ঝংকার দেন,

    আশা করে পরমপরে
    নতুন সুধয় ভরে
    তারই কারণে ফেরে
    হয় সবই ক্রমে সৃজন।।

    –বোঝলানি মোকছেদ, সাঁই কয়েন, আশায় সৃষ্টি, নৈরাশায় ধ্বংস, আশা ছাড়ইও না মোকছেদ, আশা মোগো মূলধন।

    ত্যাগিলে আশা-বাসনা
    তিলেক এ সৃষ্টি রবে না
    লালন সাঁই কয় দুদ্দু মরো না
    নিরাশায় সেধে মরণ।

    – তো আশাই মোগো মূলধন। তারে ছাড়ন যায় না। তারে যদি ছাড়ি– দোরতং দোরতং। তারে যদি ছাড় তো আর থাহে কী?– দোরতং দোরতং। বাজান আপনে কী কয়েন? আপনের পেরেস্তাবটা এট্টু শুনি। আমি বলি– ফকির সাব, মোকছেদ ভাই-এর কাছে যা শুনলাম, তারপরে আর কী আশা করব? তারপরেও কি আর কোনো আশা থকে? ফকির বলেন– থাকে। তিনি তাঁর বিশ্বাসে যেন স্থির নির্ভর। কেন থাকে জানেন?

    মানুষ ভজনের কথা জানাই তোরে,
    যাহাতে অমর হবি যম-যাতনা যাবে দূরে।
    নরনারী নির্বিকার হয়ে,
    দোঁহাকে জানিবে দোঁহে
    জীবনের অকৈতবগৃহে
    আত্মতত্ত্বের খবর করে।

    এই হইল বাজান, আমাগো, পরমতত্ত্ব বেদ, আগম, নিগম, কোরাণ পুরাণ যাই কন, এই তত্ত্বরে মোরা ফকির, বাউল, আউলেরা পরমতত্ত্ব মানি, এর বেশি মোরা না জানি, না মানি। হেয়া, বাওন, পণ্ডিত, মোল্লা মৌলারা যাই কউক হেথে মোগো মুথ্‌মাডা।

    যাহাতে সৃজন বর্ধন
    যোগে তাহা করবি গ্রহণ
    দীর্ঘ পরমায়ুর কারণ
    জনম তার মরণের দ্বারে…

    – বাজান, ছিরজন বরধনে যদি আপনে থাহেন তয়ই আপনে বাঁচলেন, নাইলে মরণ। মুই কই, বাঁচতেই যদি হয় ‘তো’ ছিরজন বরধনে বাঁচাই ভালো। ফকির যেন এক গাঢ় জীবনরসে জারিত করতে চান আমাদের। কিন্তু স্মৃতি যে বড় গভীর চোরাবালি আর সেখানে যে আমার মতো এবং মোকছেদের মতোও মানুষেরা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানেই ডোবে তার জবাব কি ফকিরের কাছে আছে? হয়তো আছে। তাতেই-বা কী? বয়স একটা ব্যাপার, ‘কাল’ যাকে বলে। শুধুমাত্র জৈবিক ধর্মেই নয়, ‘সৃজন বর্ধনের’, সব ধর্মেই বয়স বা কাল কি একটা প্রবল নিয়ামক নয়? সে কথা যখন ফকিরকে বলি, কাল যে আমাদের জীর্ণ করে তার কী? ফকির বলেন–

    এ দেহকে নিত্য ভেবে
    আত্মবস্তু খুঁজে নেবে
    লালন বলেছে তবে
    জানবি মেয়েরে ধরে।

    তার মানে কী? কিন্তু তিনি আর মানের ধার ঘেঁষেন না এখন। নিতান্ত গেরস্থ গলায় বলেন– বাজান, গান, তত্ত্ব কিছু পলাইয়া যাইবে না। কিন্তু খাবার কইলম ঠাণ্ডা অইয়া যাইবে। লয়েন দুইমুঠ খাইয়া অবার হ্যানে টুং টাং করমু।

    ভাত নিয়ে বসে আছেন ফকিরের বিবি, দেখেই মালুম ফকিরের যোগ্যা সহধর্মিনী, নাকি ফকিরই তাঁর যোগ্য সহধর্মাচারী। সাদাসাপটা বাঙালি মহিলা। বোরখা টোরখার বালাই নেই, কথায় মালুম বেশ সুরসিকা। দীর্ঘক্ষণ আক্ষেপ বিক্ষেপের কথায় বিধ্বস্ত স্নায়ু তাঁর সরস বচনে আরাম পায়। ঘরে ঢুকতেই কানে আসে তাঁর অনুযোগ। বলেন– কই বোলে যে বিবি বাচ্চা খাইলে কি খাইলে না, শুইলে কি শুইলে না হে খোঁজ নাই, এ জামাই ক্যামন মানুষ?– জামাই? তার মানে সম্পর্ক পাতানো হয়ে গেছে? গিন্নি দেশ ছেড়েছেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর, তাও বিবাহজনিত কারণে। তাই তাঁর ঘাঁতঘোৎ ভালো জানা আছে। নিশ্চয়ই এ মহিলাকে তিনি এতক্ষণে খালাম্মা গোছের কিছু একটা ডেকে তাঁর নাইওরি ন্যাওটামি শুরু করে দিয়েছেন। বলি– জামাই বলে যে মেয়েকে আদরে নিলেন, সে ঠিক আছে, জামাই-আদরটা ছেলে-আদরের চাইতে বেশিই হয়। কিন্তু আমিও তো এদেশেরই ছেলে। ফকির বিবি বলেন– তা হউক গিয়া। মাইয়ারে মোর ভালোই লাগছে। আপনেরে জামাই কমু। আমি বলি– তা বলুন, কিন্তু জানেন তো, কথায় বলে যম, জামাই, ভাগ্না, তিন নয় আপনা। আমি কিন্তু তা হলে আপনজন হলাম না। পরের ছেলে করেই রাখলেন আমাকে।– ফকির বিবি এবারে কাৎ। বলেন– আউয়া আউয়া, ছেই, ছেই। মুই নি হে কতা কই? ফকিরে কিছু কয়না ক্যান, না অয় একখান ফরমাইস গাইয়াই দিউক ; জানে তো বেয়াক।

    এখানকার বলার ধরনটি এমনই। ভাববাচ্যের ব্যবহার স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বাক্যালাপে অসম্ভব বেশি। এই হুলারহাট স্থানটি বরিশাল জেলার অন্তর্ভুক্ত, তার পশ্চিম সীমান্তে প্রায়। এখানে মোকছেদের বাচনভঙ্গি চলে না। ফকির আর ফকির বিবি, দুজনেই ভাষার ব্যবহারে তুখোড় চান্দ্রদ্বীপি। কিন্তু যখন গানের কথায় কথা, তখন তার মধ্যে কোনো উচ্চারণভ্রষ্টতা পাওয়া যাবে না। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। কিন্তু সে যা হোক তা হোক, ফকির কিন্তু অসম্ভব বিবিবৎসল। বিবির কথা শুনে বলেন– মোগো সাধনতত্ত্বে এনাদের কয় পিকিতি। মোরা আর যা খুশি করি না করি, পিকিতির আদেশ মান্যতা করি, তা উনি যহন আদেশ করলেন ফরমাইস গাইতে, আর হাতেও যন্তর যহন বিরাজ করতে আছেন, গাইতে দোষ কী?

    আহা –
    মধুর দিল দরিয়ায় যে জন ডুবেছে
    ও সেনা জবর খবর পেয়েছে,
    পর্বতের উপরে গঙ্গা
    জলের ভিতর ডাঙ্গা
    ডুবে দেখ না, একবার ডুবে দেখ না,
    ডুবলে ডাঙ্গা পাই
    উঠলে ভেসে যাই,
    বিষয়-তরঙ্গ সদাই বহিছেরে,
    মাকড়সার আঁশে হস্তি বাঁধা
    লোহার তারে চেউটি ছেঁদা
    কখন যায় ছিঁড়ে।
    একি অসম্ভব
    কাজকর্ম সব
    যে জন ডুবেছে সে জন জেনেছে।।

    – বিবি মধুর দিলদরিয়ায় ডুব দেও। জবর খবর পাবা। ফকির বলে যান, তহন দ্যাখবা, কেবা আপন কেবা পর। এ জেবন তোমার উত্তমে উত্তম, অধমে অধম– (দোরতং),– কিবা মাইয়া কিবা জামাই– আসল তত্ত্ব কী কওছেন দেহি? আসল তত্ত্ব মানুষতত্ত্ব (দোরতং, দোরতং) যে হয় পতি সেই অপত্য। (দোরতং, দোরতং) আসল তত্ত্ব মানুষতত্ত্ব, যে হয় পতি সেই অপত্য, খ্যাপা আলম বলে ভাব নিত্য, সেই মানুষ মহাজনে ; (দোরতং দোরতং) তোর কাজ কি খ্যাপা, হেথায় হোথায় অজানা সন্ধানে?– তো হেই মানুষতত্ত্ব জানবা ক্যাম্‌নে? না, তোমারে হ্যার লাইগা দিল্‌ দরিয়ায় ডুব দেওন লাগবে। (দোরতং) আমার লালন সাঁই আবার কী কয়েন হোনো হে কতা–

    যে স্তনের দুগ্ধ শিশুতে খায়
    জোঁকে মুখ দিলে শুধু রক্ত পায়
    (সে যে) উত্তমে উত্তম, অধমে অধম
    লালন বলে, যে যেমন সে তেমন পেয়েছে
    মধুর দিল্‌ দরিয়ায় যে জন ডুবেছে–।

    এহন তুমি মাইয়ারে পাইলা, না জামাইরে পাইলা, হেয়া বুঝ করইয়া দ্যাহ। হক কতাই, পাইলেই অইল। একজনেরে পাইলে হক্কলরেই পাবা।

    ফকির বিবি বলেন– বোঝেন এবার, কেডা কী বোঝবেন? তানার কতার লব্জ এই। কী যে কইতে চায় বুজইয়া পাই না। ফকির বলেন– হেও তো জানে অনেক কিছু। কউক না নিজের ফরমাইস, মানা করছে কেডা? তো ফকির বিবি কম যান না। বলেন– আছেই তো কওয়ার, থাক্‌পে না ক্যান? মোরা মেইয়ে বল্‌ইয়া কি ফ্যালনা? বলে অসামান্য উঁচু পর্দায় গান ধরেন, আর আশ্চর্য ফকিরের আঙুল।–দোতারার তার যেন তাঁর আঙুলের ক্রীতদাস, সাথে সাথে দোরতং-এর পরদা বিবির কণ্ঠ ছুঁয়ে ঝংকারে গ্রীবা আকাশে তোলে। বিবি গান ধরেন অন্তরা থেকে–

    মেয়ে সামান্য ধন নয়
    জগৎ করছে আলোময়
    কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ
    আছে মেয়ের পায়।
    মেয়ে ছাড়া ভজন করারে
    তা হবে না কোন যোগে
    ভজন সাধন করবি রে মন কোন রাগে?

    – ফকির উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। খাবারদাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। তা যাক্‌গে, চুলোয় যাক সব। সে দিকে কারোরই এখন খেয়াল নেই। মোকছেদ একপাশে কাঠের দেয়ালে হেলান দিয়ে, তার চোখে জল, কেন কে জানে? ফকির এবার দাঁড়িয়ে। বেঁটেখাটো মানুষটি। দেহের আন্দাজে দাড়ি, আলখাল্লা, মাথার চুল একটু বড় মাপেরই, তাই তাঁকে যেন এখন আমার সেই মনের ফকিরের মাপেই পাই। এমনিতে সুদর্শন মানুষ। বাল্বের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। আবছাও নয়। একটু সামান্য আঁধারি ভাব আছে। ফকির দাঁড়ানো অবস্থায়, তাঁর দোতারা নিয়ে, এখন এক অপরূপ সিল্যুয়েট। বিবিকে তারিফ করার জন্যই যেন তাঁর উঠে দাঁড়ানো। বিবিও এখন উৎসাহে যেন প্রকৃতই তাঁর পিকিতি। তাঁর কণ্ঠ রীতিমতো শিক্ষিত কণ্ঠ। অপূর্ব সুর আর গায়কি। ফকিরি গানের যাদু যাঁরাজানেন, তাঁরা বুঝবেন। এখানে সব দ্বন্দ্ব সব ধন্দ নিরাকারে বিলীন হয়ে যায়। বিবি গানটি ধরেছিলেন অন্তরায় সে বোধহয় ফকিরের কথার ধরতাই-এর কারণে। এখন তিনি সঞ্চারীতে এসে কোমল হন,

    ভজন সাধন করবি রে মন কোন রাগে
    আগে মেয়ের অনুগত হও গে,
    জগৎজোড়া মেয়ের বেড়ারে
    কেবল এক পতি সাঁইজি জাগে।।

    এর মধ্যে পণ্ডিত এবং তত্ত্বতালাসী, চোখে পিচুটিওয়ালারা হয়তো বৈষ্ণব রসতত্ত্ব, কালতত্ত্ব বা অনেক তত্ত্বদর্শন আবিষ্কার করবেন। কিন্তু আমি এখন শুধু ফকির আর ফকির বিবির রসমাহাত্ম্যই উপভোগ করছি–আর কিছুই নয়। বিবি যেন এক চিরন্তনী ম্যাট্রিয়ার্ক। মহাকালীর মতোই যেন তিনি দুপায়ে সব সৃষ্টিকে মাড়িয়ে পরবর্তী অন্তরায় সুরের চাবুক হানেন। ফকিরের দোতারাও একটি চমৎকার ঝংকার তুলে তার অনুগামী হয়–

    যদি রুপোর টাকা পায়
    জীবে কপালে ছোঁয়ায়
    কত রজত কাঞ্চন সোনারূপা
    পতি দিচ্ছে মেয়ের পায়
    মেয়ে এমন ধন, নাহি চিনে রে জীব
    পড়বে পাপের ভোগে।

    বিবি লালনের প্রত্যুত্তরে পাঞ্জ সাঁই-এর ধরতাইয়ে গাইছেন। এবং সন্দেহ কী, নিজের বিশিষ্টতা বজায় রেখেছেন। অবার এ যেন মোকছেদ আর আমার সারা সন্ধ্যাকালের আক্ষেপ-বিক্ষেপের ধারা ধরেই বয়ে চলেছে। কিন্তু এ-রকম হয়ও তো। বিশেষত এ স্থানে সবই অনুভবের খেলা। তাই তো দেখছি। আর অনুভব তো কখনও যুক্তির ধারায় বয় না– তার শতধারা। কথা হচ্ছিল সব তত্ত্বের সেরা মানুষতত্ত্ব নিয়ে। মধুর দিল দরিয়ায় ডুব দেওয়া নিয়ে। তা এখন বইছে আরেক ধারায়। মানুষের যে মানুষী, পুরুষের যে প্রকৃতি, তার উপর লাঞ্ছনার, অন্যায়-অত্যাচারের প্রসঙ্গে এখন সে ধারা সুরে সুরধনী হলো। বিবি বড় বাস্তববাদী। তাই ফকিরের তত্ত্ব দর্শন ছেড়ে সংসারের দুর্ভোগের বাস্তবতায় তিনি সুরেলা হন।

    মেয়ে মেরো না রে ভাই
    মারলে গুরু মারা হয়
    মেয়ের আহ্লাদিনী নাম
    রেখেছেন চৈতন্য গোঁসাই।

    ফকির অবশ্য তাঁর ভাবের ঘোরে দোরতং দোরতং করেই যাচ্ছেন, বিবি আবার গলা চড়ান। তাঁর চিকন কণ্ঠ রাতের নৈঃশব্দ্যে দোতারার সাথে মিশে এক অপূর্ব রিন্‌রিন্‌ শব্দ ঝঙ্কার তোলে–

    ও যার দরশনে দুঃখ হরে রে
    ও তার চরণে শরণ নিগে।।
    বলে হীরু চাঁদ আমার, মেয়েমনোহর
    যার আকর্ষণে জগৎপতি করল রাধার দাস স্বীকার
    তুই ধরবি যদি গুরু চরণ রে
    পাঞ্জ মেয়ের চরণ ধর আগে।

    এ এক ভিন্ন জগৎ। শুরুতে বলেছিলাম, এদের বিষয় আমার কিছু কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা আছে। এখন দেখছি বিশেষ কিছুই নেই। বিশাল এই দেশ। বিচিত্র সব মানুষ আর সম্প্রদায়– বিচিত্র রকম তাদের জীবনযাপন পদ্ধতি, সাধন-ভজন, ভাব-আলাপন। কত বিচিত্রভাবেই না তার ব্যাখ্যা, কত বিচিত্র পথে না গতি। গান শেষ হলে ফকির আর ফকির বিবি দুজনে খানিকক্ষণ দুজনের দু-হাত ধরে মুখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকেন, যেন দুজন দুজনের ভাব মোক্ষণে প্রজ্ঞাপারমিতা। তাঁদের উভয়ের চোখেই প্রগাঢ় প্রেম এবং করুণা। এ যেন এক অনুপম চিত্র, যা রক্ত-মাংসে রূপ পেয়েছে আমার চোখের সামনে ; যা হয়তো কোনো এক ভিক্ষু শিল্পীর তুলিতে আঁকা হয়েছিল অন্যভাবে, কোনো গুম্ফার দেয়ালে, অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার একটি বিশেষ রূপকল্প, যা কালচক্রযানের গতিপথের এই পর্যায়ে এসে, যুগনদ্ধ থেকে এমত মুদ্রায় সঞ্চারী হয়েছে।

    সামনে সুভোজ্য স্থালী, পরিমণ্ডলে এই মুদ্রাযুক্ত সিল্যুয়েট আর দুই ভিন্ন কোটীর মানুষ মোকছেদ আর আমি। মোকছেদের চোখ অবিরল ধারায় প্রবাহিত। আমি আমার সব নাগরিক যুক্তি, বুদ্ধি, অহংকার যেন দু-হাতে তুলে কালীগঙ্গার জলে অঞ্জলি দিতে প্রার্থী।

    বেহুলার বিয়ের ভোজে নাকি সাহু বেনে বত্রিশ রকমের মাছের ব্যবস্থা করেছিলেন। সবজির ব্যবস্থা কী কী হয়েছিল, মনসামঙ্গলে কোনো কবি তার বর্ণনা দেননি। তবে লখিন্দরের জন্মের কিছুদিন আগে সনকার ‘সাধ ভক্ষণ’ উৎসবে ধাই (দাই) এরা নাকি নানাবিধ শাক তুলতে গিয়েছিল “মাছউয়া রাঙার বিলে”। রয়ানি গানের পয়ার কথাকারদের মুখে বাল্যে তার খবর শুনেছি, যে শাক তুলতে তুলতে বিভোর শাক-তুলুনিদের, “উব্বুর হইয়া শাক তোলার” সময় নাকি খোঁপা চিলে নিয়ে গিয়েছিল, তারা তা টের পায়নি। সেও প্রায় বত্রিশ কি চৌষট্টি রকমের শাক হবে সঠিক মনে নেই। এখানে অবশ্য ততটা হয়নি, যদিও বিবি আমাদের বেহুলা লখিন্দর গোছের কিছু একটা বলেছিল বটে। ফকির নিজে বা তাঁর বিবি আমিশাষী নন। কিন্তু মেহমান মানুষ ঘরে, তাও আবার কর্মে গতিকে মেয়ে জামাই। ফকিরই হোন আর গোঁসাই-ই হোন, জাতে তো বাঙাল। সুতরাং বিবির আদেশে কিঞ্চিৎ ‘আঁইশে’র ব্যবস্থা অবশ্য করতে হয়েছে। আর এখন, এই ঋতুতে বলেশ্বর, কালীগঙ্গা, কচা সবাই-ই তো ‘আঁইশের’ আঁশটে গন্ধে বাজার ছয়লাপ করে দিয়েছে। সে আঁশটে গন্ধ অবশ্যই ইলিশের। আঁইশ বলতে পাঠক মাছের আঁশ বুঝতে পারেন, আবার আমিষও, আমরা চন্দ্রদ্বীপজরা উভয় অর্থেই শব্দটিকে ব্যবহার করি। আসলেও এটি উভয় অর্থেই অর্থবান। তা ভোজের ব্যবস্থায় তার সামূহিক আয়োজন, বাকি নানান সবজি। বরবটির শাক যে খাওয়া যায়, এবং নারকোল কোড়া সহযোগে ভর্জিত সেই শাক যে এমন অনুপম তা আগে জানা ছিল না। জানা ছিল না, পুঁই মেটুলি দিয়ে এমন চমৎকার রঙিন চ্চ্চড়ি হতে পারে। পাঠক, ‘শাপল’ বলে এক ধরনের উদ্ভিদ আছে যার কন্দ ওলের মতো, কিন্তু তা ওল নয়, সে বস্তুটি ভোজ্য নয়। চান্দ্রদ্বীপি ওদন সংস্কৃতিতে সেই শাপলের অবিকশত কিংবা স্বল্পবিকশিত পাতাসহ ডাঁটি যে কী অসম্ভব স্বাদু ব্যঞ্জনায় ব্যঞ্জক হয়েছে, তা যাঁরা একটু সাহস করে চেখে না দেখেছেন তাঁদের লিখে বোঝানো যাবে না। কিন্তু এ-রকম একের পর এক পদ বিন্যাসের ব্যাখ্যা করে ফকির বিবির সুখ্যাত করতে শুরু করলে আমাদের মূল বিষয় থেকে বহুদূরে সরে যেতে হবে। গোদা কথায় ব্যাপারটা মিটোই, বড় গেরস্থ-ভোজের আয়োজন করেছিলেন তিনি। বড় তৃপ্তির ভোজ।

    খাওয়াদাওয়ার পর কিছুক্ষণ আশ-গল্প পাশ-গল্প। মোকছেদ উশ্‌খুশ্‌ করে বলে– যাদের বিশ্রাম পেরোজন, তারা তো শুইয়ে পড়িছেন, নিদ্রা গ্যাছেন। মোগার গতি কী হয়? ফকির জিজ্ঞেস করেন– তোমার পরস্তাব কী? মোকছেদ বলে– রাইত ফস্‌সা হলি পাখি উইরে যাবেনে। ভোর হবে, আর সাত পাঁচ ভাইবে সব পাখিরই মন ডুইবে যাবে গুয়ে গোবরে, গায়ে বদ হাওয়া লাগবে– আর পাখি কবে মুই আকাশে ওড়ব। তো মুই কতি চাই, নীচের দোকানঘর তো ফাঁকা। এখনে তেনারা ঘুমোচ্ছেন ঘুমোন, মোরা নীচে যেয়ে এট্টু গান বাত্তালাপ করলি অয় না? ভাইজান না অয় কাইল নয়ে যাতি যাতি ঘুমোয়ে পুষোয়ে নেবেন। এখানে আমার মতামতের ধার কেউ ধারবে বলে মনে হয় না। তাই চুপচাপ থাকি। ফকির বিবি বলেন– পরস্তাবটা সাধু, তয় জামাই নি কেলান্ত, হ্যার অহন রাইত জাগার ইচ্ছা আছে কিনা হেডা জিগাও। আমাকে অগত্যা বলতে হয়– না না, আমি ঠিক আছি। ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট। এরা তো জাগতেই চান, জাগতেই ভালবাসেন। ঘুম–? সে একসময় ঘুমোলেই হলো। রাতেই ঘুমোতে হবে এমন কোনো কথা আছে? ঘুমোবার রাত তো অনেক আসবে। কিন্তু সেই রাতেরা কি এমন সুজন-যোগ দেখতে পাবে? সেই সব রাতে মানুষ তো শুধু ঘুমোবেই। আর রাতেরা তাদের ঘুমন্ত মুখগুলোই শুধু দেখবে। আজ না হয় এই সুজন-যোগে এই রাতও আহ্লাদিত হোক। এই হচ্ছে তাদের কথনভঙ্গি। এর উপর যে কথা কয় সে তো নেহাৎ আহাম্মক। সুতরাং, চল সবাই যাই দোকানঘরে।

    ফকিরের বক্ষে ঝোলানো দোতারা দোরতং-এ জাগরী হয়। আমরা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নীচে হোটেলঘরে আসি। মোকছেদ চেয়ার টেবিল সরিয়ে একটি বড় মাদুর পাতে। আামরা বসি, ফকির দাঁড়িয়ে দোরতং করেন। মোকছেদ বলে– মুর্শেদ, অনেক ইদিক উদিক কতা হইয়েছে, গানও ধরেন সেইমতো ধারায় বইয়েছে। মুই কতি চাই এট্টা দেহতত্ত্ব হউক। মা, আপনে এট্টু মুর্শেদের সাথি ধরেন। ফকির আমাকে বলেন– বাজান, মোর এই আওলাদটি বড় মাতৃভক্ত, মা না গাইলে তার মন ভরে না। তয় বিবি (দোরতং দোরতং দোরতং) তুমিই ধর, তুমিই তো দেহতত্ত্বের সারাৎসার মালকিন, (দোরতং দোরতং)। ফকির বিবির কোনো কুণ্ঠা নেই। গান যেন তাঁর ঠোঁটের ডগায় এসে অপেক্ষা করছে, ওদিকে ফকিরের আঙ্গুল দোতারার তারদের একটুও বিশ্রাম দিচ্ছে না। ফকির বিবি ধরেন–

    পাখি কখন জানি উড়ে যায়
    বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়
    পাখি কখন জানি উড়ে যায়।।
    খাচা আড়া পড়ল বসে
    পাখি আর দাঁড়াবে কীসে
    এখন আমি ভাবি বসে
    সদা চমক্‌-জরা ব’চ্ছেগায়।

    দোরতং দোরতং। বাজান, ফকির বলেন, এই হইল আপনের দেহতত্ত্ব। যদি ভাবেন, এ কঠিন তত্ত্ব, তাইলে কঠিন, আবার সহজ ভাবলে সহজ। তয়, মোরা এরে সহজভাবেই নি। কাউয়া ক্যাচ্‌ক্যাচি করইয়া এ্যার মইদ্যে কাউতাল বাজাই না। এবার ফকির দোরতং-এর সাথে নিজেই গলা খোলেন সঞ্চারীতে।

    কার-বা খাঁচা কেবা পাখি
    কারে আপন কারে-বা পর দেখি,
    কার জন্যে-বা ঝুরে আঁখি
    পাখি আমারে মজাতে চায়।।

    আবার দ্যাহেন বাজান, এ-সব তত্ত্বের মূল বুইজয়াও, ভাবি, পাখি যদি নাই মজায়, তাইলে আর মজাই-বা কী? এ ভবলীলায় তাইলে আর কীই বা থাহে, আর কী লইয়াই-বা আছি। রস কই? তাই সাঁই কইছেন, বিবি গাও–

    আগে যদি যেত জানা
    জংলা কভু পোষ মানে না
    ওর সঙ্গে প্রেম করতাম না
    এখন আর না দেখি উপায়

    – এহন আর উপায় নাই, এই পেরেম, এই পিরিত, এত জন্ম থিহা। এয়া কাডামু ক্যামনে? অ্যাঁ?

    যে দিন সাধের পাখি যাবে উড়ে
    খালি খাঁচা রবে পড়ে
    সেদিন সঙ্গে সাথী কেউ থাকবে না
    ফকির লালন কেঁদে কয়।।

    বাজান, বেয়াকেই জানে, একদিন এই সাদের পাখি উড়ইয়া যাইবে। তমোনি মোরা খাঁচার কতা ভোলতে পারি? খাঁচা আর পাখির টানাটানি লইয়াই মোগো দ্যাহতত্ত্ব। মোকছেদ, তুমিও বাজান, অত ভাইবও না। কার-বা খাঁচা, কেবা পাখি, কারে আপন, কারে-বা পর দেখি এইডা হইল তোমার নিয্যাস সত্য কথা। বুঝি, বেয়াকের মনেই নানান কষ্ট, তমো মানইয়া লইতে হইবেই, করবা কী কও? জীবজন্মে এই উথালপাথাল তো থাকপেই।

    মোকছেদ বলে– মুর্শেদ, মুই কিছু অইন্য কতা কব। দ্যাহতত্ত্বের গানে আপনে যা কলেন, তার উপার মোগার নিজইস্য কোনো দোষ ঘাট নাই। জীবধম্মে শরীল বাঁচে বাড়ে, লয় পায়, এর কোনো ব্যত্যয় নি আছে? সেই তো আপনের সহজ দ্যাহধম্ম। কিন্তু মোগার কুবুদ্ধির জন্যি, যেসব আপদ জঞ্জাল মোরা আইন্যে ফেলি, তার কতা আপনে কী কবেন? এই যে সকালি ভাইজানের লগে মোর কতা হচ্ছেল, হিন্দু-মোছলমানের কাজিয়া লইয়ে। জাতপাতের হাজার ঝক্‌মারি, এ্যারে কাডো, তারে মারো, অর ভিডেয় ঘুঘু চরাও– এ সবির তত্ত্ব-কতা কী?

    ফকির স্বভাবসিদ্ধ নিরুত্তাপ হাসেন। বলেন– বাজান, এ্যার তত্ত্ব-কতাও সাঁই কইয়ে গেছেন। এহন মোরা যদি তা না শুনি তয় আর তার ঔষধ কী? রোগ আছে, তার ঔষধ আছে, অথচ রোগী কয় মুই ঔষধ খাব না, এ রহম হইলে রোগ সারবে ক্যামনে?

    আমি জানতে চাই, কী সে ঔষধ যা এমন একটি প্রাণঘাতী রোগের জন্য সাঁই বন্দোবস্ত করেছেন? ফকির বলেন– সাঁই-এর বেয়াক কতাই তো গান। বলে আবার দোরতং। তালি মোকছেদ দেহতত্ত্ব ছাড়াইয়া মোর কইলম জাইত-তত্ত্বের গীত গাওন লাগে। (দোরতং দোরতং)। বাজান জাইত-তত্ত্ব বড় বিচিত্তির খেলা। বড় জাইত ছোটো জাইতরে মাইরা ধইয়া কেন যে সুখ পায় হেয়া জানি না। (দোরতং)। এহন হেই মাইর বেশি দ্যাখন যায় হিন্দু মোছলমানের দাঙ্গা ফ্যাসাদে। (দোরতং)। এট্টা সোমায় হেডা অইত উচা জাত, নীচা জাতের মইধ্যে। তো অনেক কাল চললে হেই ফ্যাসাদ। নীচা জাতের মানুষগুলো একবার এধম্মে যায় অবার ওধম্মে। ধম্ম ছাড়া তো চলে না। (দোরতং)। এহন এক সোমায় এছলাম অইল এ দ্যাশে। নীচারা দ্যাখলে এছলামে বেয়াক ভাই ভাই। উচা নীচার কতা নাই। তো হ্যারা এছলামে শরিক অয়। কিন্তু তোমার কি উচা নীচা ভেদ যায়? (দোরতং এবং গদ্যেই সুর) না– যায় না–। ক্যান, যায় না ক্যান? (দোরতং দোরতং)– আহা (গানে) ক্যারো আছে এ বারামখানা, কারও বা রাস্তা বিছানা, … আ, আবার (দোরতং দোরতং) কারও নাই কোনো ঠিকানা…. আ (দোরতং) শুধু ঘোরে ভূমণ্ডলে।– আহা (দোরতং) কেবা জানে মানুষ তোমার কী আছে কখন কপালে।

    ফকির তার কথনে ইসলামের মধ্যেও যে অসাম্যের প্রসার এই দেশে পরবর্তীকালে ঘটেছে তার ব্যাপক এক বর্ণনা দেন। শুধু তো হিন্দু নয়, যারা ফকির, আউল, বাউল, দরবেশ, যারা কত্তাভজা, আলাভোলা মানুষ, তাদের উপর শরীয়তের বা ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের ধারকদের অত্যাচার উৎপীড়ন এ-সবের কথা ফকির বেশ বেদনার সাথেই বলেন। হিন্দুরা, বিশেষত যারা তাদের মধ্যে উঁচু জাত, তারা তো এ বিষয়ে নির্মম বহুকাল থেকেই, ইসলামেও যে এই অসহিষ্ণুতা উচ্চ-নীচের ভেদ এসে যাবে, তা কি এই নীচু জাতের লোকেরা ভেবেছিল?– না, হ্যারা, তা ভাবে নায়। ফকির বলেন– (দোরতং) হ্যারা ভাবছেল, হ্যারগো দুঃকের দিন শ্যাষ। এহন আর কেউ হ্যারগো টালাইবে না। কিন্তু না তা হয়নি। ব্রাহ্মণ্য জাতপাত, উঁচু নীচু ভেদাভেদের আগুন, বিভেদের বৈদিক আগুন বলে যাকে এক কবি বর্ণনা করেছেন, এসে নষ্ট করেছিল সে আকাঙক্ষার স্বর্গ। শাস্ত্রাচার আর হৃদয়াচারে বিরোধ বাধলে, দেখা যায়, শাস্ত্রাচারীরা শস্ত্রাচারী হতে আদৌ দ্বিধা করে না। ফকির, আউল, বাউলদের এ-বিষয়ে সম্যক অভিজ্ঞতা আছে।

    ফকির এখন, তাঁর সাই-এর গানের মাধ্যমে সে বিষয়ে তত্ত্ব বলার জন্য কথন শেষ করে গানে যেতে রীতিমতো অধৈর্য। তাঁর হাত দোতারায় দোরতং-এর ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। তিনি শুরু করেন–

    জেতের বড়াই কী?
    ইহকাল পরকালে জেতে করে কী?
    আমার মন বলে অগ্নি জ্বেলে দিই জেতের মুখী।।
    এক জেতের বোঝা লয়ে–
    চিরকাল কাটালাম মানী মানুষ হইয়ে
    এখন, মানের গৌরব কুলের গৌরব
    ধন্দ বাজি সব দেখি।

    –বাজান, দ্যাখেন, জাইত নানান কেসেমের অয়। এক এক ধম্মে এক এক জাইত। লোকাচার, দেশাচার, ভাষা আর কাম কাজ্যে আর আর জাইত। আবার এট্টু উচা দিকে চাইলে, ভারতবাসী, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি– এইসব জাইত। কিন্তু কেউ কি কয় যে, সব চাইতে বড় জাইত আছে মানুষ জাইত। কয়, তয় মানে না। তহন দ্যাহা যায় জার্মান, রুশি, ফরাসি, ইংরাজ একজন আর একজনের উপর মাতব্বরি দেখাইতে চায় আর বন্দুক বাগায়। কয়, আয় কেডা বড় দেখ? কিন্তু সাঁই কয়েন আরেক কতা।

    লোকে পেটের জ্বালায় দেশান্তরী হয়

    হিন্দু মুসলমানের বোঝা মাথায় করে বয়,

    কার-বা জাতি কেবা দেখে

    ঘরে এলে চিহ্ন কী?

    জেতের বড়াই কী?

    ঘরে এলে চিহ্ন মা, বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, এক কথায়– সংসার। ফকির বলেন, মোরাও তো সংসারই কই। সংসার কই, মানুষরতন কই। সেহানে ধম্ম, ভাষা, দ্যাশ, বাওন, মোল্লা, শ্যাখ, ছৈয়দ, মোগল, পাঠান, আনছারি, নিকিরি, সুফি, ফকির বেয়াকের পরিচয়ই এক। ফকিরের এই তত্ত্বটিকে অবশ্যই বেসিক প্রেমিস বলতে হয়। এর থেকেই সবকিছুর উদ্ভব। কারণ, আসল তত্ত্ব ফকির জানেন, অন্ন দেয় কে? অন্নদান তত্ত্ব, সব তত্ত্বের সার। জাত কি অন্ন দেয়? ফকির বলেন– দোরতং দোরতং না আ আ।

    জেতে অন্ন নাহি দিবে
    রোগে না ছাড়িবে
    পাপ করিলে কোম্পানি সব জাত
    ধরে লয়ে যাবে
    মৃত্যু হলে যাবে চলে
    জেতের উপায় হবে কী?
    জেতের বড়াই কী?

    বাজান, নিত্য পেত্যুষে, ওই যে সামনে আছেন কালীগঙ্গা, মোরাএহানে তারে কচা কই, তানার সাথে ভেট মোলাকাত করতে যাই। তিনি নিত্য তিরিশ দিন কইতে থাহেন কইতেই থাহেন। ভোর সবেরে আদা রোশনি আদা আন্দারে তেনার লগে মোর অনেক বাৎচিত অয়। তেনার উপার মুই কত মাইনষের মুখ ভাসইয়া যাইতে দেহি। এই যে মোর দাড়িতে ধলা রং। এইয়া দ্যাখতে দ্যাখতেই তো অইছে। তো নদী কয়– ফকির দ্যাহ কী? মোর তহন আর জবান চলে না। কত বড় এই বেম্ভাণ্ড। মুই? কতটুক? মানুষ-বা কতটুক? ওই যে তেনার বুকের উপর দিয়া হাজার লক্ষ ট্যাপ্পোনা (কচুরিপানা) ভাসইয়া যায়, তেনার কি হ্যার কোনো খবর আছে? না ওই যে বুজগুরিগুলা (বুদ্বুদ) ওঠতে আছে তেনার সোরোতের মইধ্যে, হ্যার, কোনো হিসাবনিকাশের খাতা আছে তেনার অন্দর কোডায়? তহন কাজে কাজেই সাঁইয়ের গান গাইতে অয়–

    মন ডাক আল্লা বলে
    কুলের গৌরব ফেলে
    অকূলের কূল মালেক আল্লা
    তাইরি লেহ চিনে
    পাঞ্জ বলে যত করলাম
    সকলেই ফাঁকিজুঁকি
    জেতের বড়াই কী?

    – বাজান, মোরা গরিবগুর্বা মানুষ, মোগো সাঁইও গরিবগুর্বার সাঁই। মোরা নি আল্লার নাম লইতে পারি? আল্লা অইলেন বড় মাইনষেগো, তিনি তেনাদের বারামখানার শোভা। মোরা ফকির, আউল বাউলরা যে আল্লা বা হরি বা কেষ্ণরে ডাহি, তেনায় তো ওই বড় কেসেমের বারামখানার আল্লা কিষ্ণ না। তেনায় অইলেন ওই যে গীত আগে শোনলেন– মানুষ ভজনের কতা জানাই তোরে। মোগো আল্লা অইলেন মানুষ। মোগো সাঁইও মানুষ। তারও দ্যাহধম্ম আছে। লালন সাঁই কইছেন, এই মানুষে মানুষ আছে। হ বাজান, মানুষ, এই মানুষেই তো আছে। নাইলে আর কোথায় থাক্‌পে? এই মানুষ– কইতে মোরা মনের মানুষ প্রাণের মানুষ এই সবই বুঝাইতে চাই। দশে ধম্মে নানান অত্থ করে, মোরা হুনি। তো হেয়া করুক। কিন্তু মোরা কইলম মাইনষের মইদ্যেই সাঁইরে তালাশ করি, আর সাঁইয়ের মইদ্যেও মানুষ। আমাগো তত্ত্ব তলাশের গোড়ার কতাই অইলে মানুষ। মোরা–অংবং, অউম বুজি না, জাইত বুজি না, জন্ম বুজি না। অনচারী দুরাচারী বুজি না। মোরা খালি মানুষই বিচ্‌রাই। সমাজে যারগো চোর,ডাহাইত, গুণ্ডা, বদমাইশ কয়– মোরা হ্যার গুনাহ লইয়া বাতচিত করি না। মোরা খালি হ্যার মইদ্যের মানুষটুক লইয়া এট্টু গান গাই। এয়ার বেশি, বাজান, মোগো ধারে আাপনে কিছু পাইবেন না। হেই গান শুনইয়া যদি হ্যারা বদ কাম ছাড়ইয় দে তো উত্তম। আর যদি না ছাড়ে, মোরা খালি হ্যার মানুষটুকু লইয়াই লারমুচারুমু। এ কতা কমু না– তুমি খারাপ, তোমার লগে আমার দুশমনি। না, হে কতা কওয়ার হক্‌ কোনো ফকিরের নাই।

    ফকির বলে যান তাঁর তত্ত্বের কথা। এইসব কথায় কথা মিলিয়ে কথাকারিগরেরা অনেক কথাই গড়েছেন। সেসব শুনেছি, পড়েছি, কিন্তু খুব যে একটা বুঝেছি তা বলতে পারব না। এই আল্লা, যাকে ফকিরেরা গানে অনুধ্যান করেন, যে আল্লাহ্‌তায়ালা নন– সে তত্ত্ব বুঝে ওঠা খুব সহজ কথা নয়। এখানেই আউল, বাউল, ফকির, দরবেশদের নিজস্ব কোড অব কন্ডাক্ট কাজ করে। সেই কোড অব কন্ডাক্টের বাইরের লোকেরা যতই কেননা এলিটিস্ট কৌলীন্যে পোক্ত হোন, চট্‌জলদি ঢুকতে পারবেন না সেখানে। যেন এক অঘোষিত বিধিনিষেধের প্রাচীর সেখানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবার বলছি আল্লা আল্লাহ্‌তায়ালা নন। ইনি হচ্ছেন, মনের মানুষ, অটল মানুষ বা অধর মানুষ। লালন সাঁই আবার তার নাম দিয়েছেন অচিন পাখি, তা ছাড়া কত সাঁই তাঁকে কতই-না নামে ডেকেছেন বা ডাকেন। তিনি লোকাতীত নন, সাধারণ্যে বিদ্যমান, সদা দৃশ্যমান। তবু তাঁকে খুঁজে পাওয়া দায়।

    ফকির বলেন– বোজজেন নি বাজান। হেই মাইনষের রূপ অইল আপনের বন্দুর রূপ, হে রূপ যে একবার দ্যাখছে, হে ভোলবে না কোনো দিনও। হে রূপ দ্যাখতে আছে কইতে মানা। ক্যান? না কইবেন ক্যামনে? কোনো কিছুর লগে তো হ্যার তুলনা দেওন্‌ যায় না, হ্যার লইগ্যাই তো মোর পেরানের সাঁই পাঞ্জ শাহ্‌ কইছেন (দোরতং)–

    আহা, যে দ্যাখছে বন্দুর রূপ সে আর ভুলবে না
    সে রূপ দ্যাখতে আছে কইতে মানা
    সে রূপের না মিলে তুলনা।
    দর্পণে যে রূপ দেখেছে
    তার মনের আঁধার ঘুচে গেছে
    রূপে নয়ন দিয়ে আছে
    দূরে গেছে পারের ভাবনা

    তো এরহম য্যার অইছে তার আর ভাবনা নাই। হে আর কিছু জানেও না বোঝেও না। হে তো (দোরতং)–

    সদাই থকে রূপ ধিয়ানে
    দেবদেবী সে মানবে ক্যানে
    মন দিয়েছে শ্রীচরণে
    গুরু ভিন্ন অন্য রূপ মানে না।।

    হে তহন হইল গিয়া, আপনের, ভাবসাগের ভাবের মানুষ, হে তহন বইসে আছে ভাব ধরে। সে তখন না জানে জাত, না জানে পাত, না জানে অন্য কোনো জগতের নাথ। ক্যান? না–

    তার সাধ্য সাধন গোপীর সনে
    ভজে গুরু বর্তমানে
    প্রাপ্তি হয় তার নিত্য স্থানে
    অধীন পাঞ্জর মনের ঘোর গেল না।।

    গোপী কারে কই? সাধ্য সাধন গোপীর সনে– হে গোপী কেডা? বিন্দাবনের গোপী? না বাজান, হে গোপী আপনে, হে গোপী মোর মোকছেদ, তামাম মানুষ হেই গোপী। মোগো য্যাত সাইদ্য সাদন, বেয়াক এই গোপীর লগেই।

    তবু ফকির যেমন ব্যাখ্যান, সেই সাধ্য সাধন নিয়েই কি থাকা যায় সবসময়? না, তা যায় না। যদি যেত তা হলে তো হয়েই যেত। তা হলে তো ভাবের মানুষের সাথে ভাবসাগরে সাঁতার কেটেই দিন চলে যেত। কিন্তু জাতপাত জন্ম ত্যাগ করলেও তাদের হাত থেকে কি ছাড়া পাওয়া যায়? তুমি জাত ছাড়লেও জাত তো তোমায় ছাড়বে না। সে তোমার মধ্যে সব সময়েই ভাগাভাগির কাটারিখানা উঁচিয়ে বসে আছে, সেখানে সর্বদাই দুইটি ভাগ থাকে। তার থেকে তো রেহাই নেই। কাপনি, ধ্বজা, মালা, তসবীহ নিলেই কি সে ছাড়ে? ফকিরের ভাব সাধনা যে রাগে হয়, সেখানে ভাগ থাকলে চলে না। আমির, গরিব, ছোটোলোক, বড়লোক, হিন্দু-মুসলমান এ সব ভাগের জন্য ফকিরের ফকিরি মার খায়। ফকির তাই পাঞ্জ শাহের আক্ষেপ গান করেন–

    ফকিরি করবি খ্যাপা কোন রাগে?
    আছে হিন্দু মুছলমান দুই ভাগে
    থাকে ভেস্তের আশায় মোমিনগণ
    হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন
    ভেস্ত স্বর্গ ফাটক সমান
    কার বা তা ভাল লাগে?

    বাজান, এও এক বিষয় ‘গু’। ফকিরের মনে ভেস্ত সগ্‌গের হাউসও গু-গোবরে ঘাটাঘাটির সোমান। খালি একই চিজ আছে সংসারে, যা লইয়া হ্যার কারবার, তা অইলে মানুষ,– মানুষরতন, এ্যার বেশি রতন, ধন, দৌলত আর তো কিছু হ্যার পেরোজন নাই। এই সাত রাজার ধন এক মাণিক্য,–এ্যারে লইয়াই মোর লালন– লালন শাহ, পাঞ্জ– পাঞ্জশাহ, রাজা।

    রাত শেষ। ফকির গলা থেকে দোতারাটি নামিয়ে রাখেন। এখনও বেশ অন্ধকার। ফকির বলেন– চলেন বাজান ঘাটে গিয়া বসি। ঘাটে বসইয়া কচারে দেহি। দ্যাখবেন, বেয়াক তত্ত্ব তালাশ হে আপনেরে কইয়া দেবে হ্যানে। তয়, ওহানে কিন্তু মোগো কতা কওন চলবে না, মোরা কতা কইলে হের কতা শোনোন যাইবে না।

    তখন তিন মানুষের এক গহন তীর্থযাত্রার উদ্যোগ হয়। মোকছেদ বলে– মায়েরে ডাকতি হবে না? মোর মায়ে যাবে না? ফকির হেসে বলেন– ডাকবা ডাকো, রোজই তো যায় মোর লগে, দুইজনে যাইয়া বইয়া থাহি, আর কচার কতা শুনি। মোকছেদ অন্দরে যায়। ফকির বিবিও জেগেই ছিলেন। প্রায় সাথে সাথেই এসে পড়েন। এখন তীর্থযাত্রী চারজন। ঘাটে যেতে মিনিট দশ বারোর পথ। হোটেলের বাইরে পা দিতেই কালীগঙ্গার সেই আলোকস্তম্ভ চোখে পড়ে। ফকির বলেন– মোগো কচার চক্ষু। চার দিকেই এখন অন্ধকার। শুধু তার মাঝখানে ওই আলোকস্তম্ভটি ঘুরে ঘুরে নদীর উপর তার রোশনি ফেলে যাচ্ছে। আকাশে এখনও নক্ষত্র। পূর্বে সামান্য আভা, পথ জনহীন। যেখানে সারা দিনমান হাজার লোকেরা কলোচ্ছ্বাস, সেখানে এই নির্জনতা বড় বিষণ্ণতা আনে। চলতে চলতে ফকির বলেন– বাজান, মোগো ফকিরোগো, আগম নিগম, কোরান পুরাণ নাই। এই যা দ্যাখলেন, এই মোগো জীবনযাপন ধম্মাধম্ম। যা আছে, হেইয়া লইয়াই মোগো কারবার। যা আছে কি নাই কেউ জানে না, তা লইয়া হুড়াহুড়ি করইয়া কী লাভ কয়েন?

    ঘাটে এসে সবাই জেটির উপর বসি। সামনে কালীগঙ্গা। পূর্বমুখী আমরা, ডাইনে দূরে আলোকস্তম্ভ, বাঁয়ে নদীর আঁতুরঘরের রাস্তা ঘন অন্ধকারে সম্পূর্ণই দৃষ্টির আড়াল, অথচ তার অস্তিত্বের ঘোষণা, আমাদের সামনে সামান্য উজ্জ্বল আলোয় দ্রুত ধাবমান কচুরিপানার অনন্ত মিছিলে সম্যক প্রতিভাত। আবার আলোকস্তম্ভের পর থেকে নদীর গতিপথ সেই একই দুর্ভেদ্য অজ্ঞেয় অন্ধকারে ঢাকা। আমরা শুধুমাত্র সামনের সামান্য উজ্জ্বল অংশের মিছিলটুকু দেখি, বাকিটা অনুমানে বুঝতে চাই। যেটুকু দেখি সেইটুকুই অনুভব– সেটুকুই কার্যকারণের সূত্র এবং যুক্তি সিদ্ধন্তের একমাত্র উপকরণ। সেখানে যাঁরা অনুভবের গ্রাহক তাঁরা তাঁদেরতত্ত্ব গড়েন এবং তা গানে, কথায়, ভাবের আদান-প্রদানে বিশ্বাসের জগতে স্থাপন করেন। আর যাঁরা যুক্তি, তর্ক এবং কার্যকারণে তাকে ধরতে চান, তাঁর নেতি নেতি বলে হুতাশ করেন। এখন এই নদীর বিশাল বিস্তারকে অনুভবে ধরব, কী কার্যকারণে– বুঝি না। বস্তুত এখন এই প্রদোষ-সময়ে, যখন সমগ্র চরাচর সুপ্ত, কোনো কোলাহল নেই, কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, তখন যেন অনুভবই তীব্র হয়ে ওঠে। মন বিচার করতে চায় না, বিশ্বাস করতে চায়। সে বিশ্বাস কীসের উপর বিশ্বাস, জানি না, তবে তা যুক্তি বা ন্যায়সূত্রের জটিলতায় না গিয়ে সাধারণের, সহজ বিশ্বাসের সরল পথেই যেন বেশি সাবলীল। তখন এই ফকিরদেরই মতো বলতে সাধ হয়– মানুষরতন, কর তারে যতন– যাহা তোমার প্রাণে চায়।

    কচুরিপানা এক আশ্চর্য উদ্ভিদ। অমর, শেষ নেই তার। কালীগঙ্গা বা কচার আঁতুরঘরে কত যে জন্ম হয় তাদের, তার শেষ নেই। ভেসে যাওয়া অনন্ত কচুরিপানার স্তূপে এই আলো-আঁধারিতে যেন ভেসে যায় অনন্ত মুখ। সে মুখ মানুষ-মানুষীর। তার মধ্যে যেমন বকুলের মুখ দেখি, তেমনি তার ধর্ষকের মুখ। যেমন সশস্ত্রের মুখ, তেমনি নিরস্ত্রের, সেই স্রোতে ভাসমান। আমাদের চারিদিকের অন্ধকার পরিমণ্ডল ক্রমশ আলোয় উদ্ভাস পেতে থাকে। সেই আলো-আঁধারিতে নিজেদেরকেও একসময় যেন ভেসে যাওয়া কচুরিপানা বলে বোধ হয়। একসময় আমাদের সেই মৌন প্রেক্ষণের নিথরতা ভগ্ন হয়। তখন সূর্য উঠতে থাকে। কচার পূর্বদিগন্ত লাল। দোতরাং-এ ফকির আবার বাঙ্ময় হন–

    বেরাম বেড়ে অগাধ পানি
    তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে…

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
    Next Article বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    Related Articles

    মিহির সেনগুপ্ত

    বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

    January 20, 2026
    মিহির সেনগুপ্ত

    বিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত

    November 12, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }