সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৩
তিন
রাস্তার নাম বিশ্বসড়ক। এ রাস্তা ধরে সারা বিশ্বে পৌঁছানো যায়, রূপসা থেকে হুলারহাটের দূরত্ব ঘন্টা আড়াই-তিনের পথ। মোকছেদ সেখানে যাচ্ছে দিন তিন-চারেকের জন্য। সে কারণে যে সব অনুষঙ্গের উদ্ভব হলো তাতে মনে হচ্ছে সে যাচ্ছে যেন সুদূর মক্কায় হজ করতে। তা ভাব-ভালোবাসা থাকলে মানুষের এ-রকম হয়। এ তো আর শহরনগরের এস্থান ওস্থানে যাওয়া নয়। এসব মানুষজনেদের রকম-সকম আলাদা। এর স্থান-মাহাত্ম্যও আলাদা। এইসব কোড অব কন্ডাক্টে আধুনিক নাগরিকদের যাওয়া বড় ঝকমারি। এর হিসেব বুঝতে গেলে শহর নগরের আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার আলখাল্লাটাকে সেখানে খুলে রেখে আসতে হবে। এ সব কথা মোকছেদ বা হারুনের সঙ্গে কিংবা এই ফেরেস্তাদের সঙ্গে বলা যায় না। বলা যায় না এজন্যে যে তারা আদৌ এ সব হিসেব বোঝে না। তারা তাদের প্রবাহে চলে। সে প্রবাহে যে মেশে সে তাদের পড়শি, যে বাইরে থেকে ঢুঁষোয় তাকে তারা বলে পরবাসীয়া।
এখন রূপসা পেরিয়ে মোকছেদ বলে– ভাইজান, মুই আর এখন হোডেলআলা নাই। মোর পরিচয় এখন চরণদার। মুই এখন আপনেগো সবারি পথ দেখায়ে লইয়ে যাব মোকামে। মোর পেরানের মুর্শেদের দরবারে। তো একখান আর্জি আছে। বাসে যদি যাই খরচ কম, সময় বেশি। আার যদি একখানা ছোডোমোডো গাড়ি-ভাড়া করি তো সময় কম ভাড়া বেশি। বলি–মোকছেদ ভাই এতটা রাস্তা গাড়ি করে যাবার রেস্ত নেই, বাসেই বরং…। মোকছেদ বলে– আহাহা, অমন করে না, অমন করে না। কতাটা আগে শুনতি হয়। মোরা যে-কজনা আছি তাতে বাস ভাড়া যা লাগবে, গাড়িভাড়া করলি তারথে বড়জোর শ’দেড়েক ট্যাহা বেশি লাগতি পারে। বাসভাড়ার ট্যাহা আপনের হিসেবে তো আচেই, বাড়তি যা মোর। এতে আপনে আপত্তি করলি দোস্তি থাকে না। তথাপি অস্তস্তি প্রকাশ করায় মোকছেদ বলে– তালি আপনেরা রাস্তা দেখেন, মুই ফিরতি খেয়ায় হোডেলে সেধোই। আপনে বড় নাবুঝপানা করতিছেন। বুজুর্গ মুরুব্বি মানেন না। বলে সে উলটো হাঁটতে শুরু করে। বহু কষ্টে তাকে শান্ত করে ফিরিয়ে আনলে বলে, পেরথমেই কলাম মুই এহন চরণদার। রাস্তায় লামলি চরণদারের বাক্যি মান্যি করা ফরজ। নালি, বেপদ পথেঘাডে।
তার মানে মোকছেদ এখন আমার বুজুর্গ, মুরুব্বি?অবশ্য বয়েসের খাতিরে সে দাবি তার নসিকে জায়েজ। তা ছাড়ও হয়তো-বা, কারণ, তার মুখের কুঞ্চন, দাড়ির ছোপ আর চোখের অন্তর্ভেদী চাহনি অবশ্যই মুরুব্বিয়ানার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সব ছাড়িয়ে সেই চোখে লীলা করে জগৎজোড়া চাহনি। সে চাহনি যেন বলে– “আয় মানুষের বাচ্চারা সব আমার কাছে ভিড় করে আয়।” সে মানুষ মোকছেদ। সে সদাসর্বদা যেন ভাবের ঘোরেই আছে। তার রাগেও ক্রোধ নেই, আবার ভাবেও সম্পৃক্তি নেই। কিন্তু ওই চওড়া বুকখানা যে ভালবাসায় ভরা– এ সত্য বুঝতে কোনো মনোবিজ্ঞানের পাঠ নিতে হয় না।
গাড়ি জোগাড় হয়। ভাড়া তিনশো টাকা। বাসে গেলে দেড়শো টাকায় হয়ে যেত। মোকছেদ বলে, আপনের নজ্জা করে না? ছাওয়ালপানগুলিরে আনিছেন, বউমারে আনিছেন। কিনা, চল তোমাগের বাপদাদার ভিডে দেখায়ে আনব। তাতো আলেন, আস্যে পেথম ধাক্কা খাওয়ালেন মোকছেদ মেয়ার হোডেলি। মনিরা মোর দুগা মাছ ভাত প্যাট ভরি খাতি পালোনো। কলেন, বডারে পয়সাপাতির সোগা ফাঁক কইরে দিইয়েছে। আবার এহন, তাগেরে বাসি চাপায়ি বকরা বকরির পারা সওয়ার করাতি চান। আপনে ক্যামন আদমি? মুই পুছ করতি চাই, আপনে এগার বাপ না মাউসা?
হরি হরি। এতো দেখছি মুরুব্বির মুরুব্বি। এ-রকম ডাঁটিয়ালিতে আমার বাপ-জ্যাঠাও কোনোদিন আমাকে কিছু বলেনি। মেনে নিতে হয়। কেননা মানুষটা ভাবের ঘোরে বলছে। এখন আমার কাজ শুধু শুনে যাওয়া। উত্তর প্রত্যুত্তরে গেলে হয়তো আবার গাড়ি থামিয়ে বলবে, মুই তালি চলাম। আপনেরা খুশিমতো যায়েন গা। মুই মোর হোডেলের সোগায় সেধুই গে। তাই সাঁই মুর্শেদের নাম ইষ্ট করে চলতে থাকি আর মোকছেদের অমৃতবাক্য শুনি। তবে এ-কথা আমার মনে গুনগুনাচ্ছে, যেমন ছোটোবেলায় পালাকীর্তন শুনতে গিয়ে হতো যে, পালার নাম নিমাই সন্ন্যাস কি? না “আমার গোরাচাঁদের ভাব ভালো না, কী জানি কী করে ভয়ে মরি, আমার গোরাচাঁদের ভাব ভালো না।” তো এখন দেখছি এবং অবশ্যই আমার মনে গুনগুনাচ্ছে এই সুর, যে আমার এই চরণদারের ভাব ভালো না। এ যে কখন কী করবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।
গাড়ি চলছে এক অনবদ্য সড়কে, বিশ্বসড়ক। এরকম মসৃণ অ্যাস্ফাল্ট এবং এত বিস্তৃত রাস্তা এই উপমহাদেশের ভ্রমকদের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য। তার উপর গাড়িঘোড়ার কদাচিৎ প্রতিযোগিতা। আমাদের গাড়িটির (একটি জাপানি মিৎসুবিশি) চালক প্রায় কিশোর। যুবক বলতে মন চায় না, কারণ দাড়ির বিছান প্রথম বর্ষায় গজানো দুর্বা ঘাসের নিবিড় কোমলতা। রাস্তাটি নতুন। খানিক গিয়ে মূল রাস্তা যায় বাঁহাতি মঙ্গলা বন্দরের দিকে। আমাদের ডানহাতি রাস্তায় গতি। আমরা এখন বাগেরহাট জেলার মধ্য দিয়ে চলেছি।
মোকছেদ এতক্ষণে আশকথা-পাশকথা ছেড়ে গাড়ির চালককে নিয়ে পড়ে। জিজ্ঞেস করে, বাড়ি কোহানে? চালক, যার নাম হাফিজ, বলে– আশাশুনি, সাতক্ষীরের সন্নিকট। বাপে করে কী? বেলেক। সীমান্তবর্তী স্থান, সুতরাং বড় ব্যবসা বলতে বেলেক। হাফিজ বলে, হারামের বিজিনেস ওডা। তা ছাড়া ঝঞ্ঝাট মেলা। মুই বাজানেরে কলাম, মোরে একখানা গাড়ি কিনি দেন। ডেরাইভারিডা জানা আছে। কইরে কইম্মে খাতি পারব। তা তেনায় কলেন, হাইলে চাষার পো, জমি জিরেত যা আছে তা দেখ। লাঙ্গলের মুডি ধইরে চাষের কামে লাইমে পড়। যদি না পার তো বেলেকে লামো, তোমার পয়সা পরে খাবে। মুই কলাম, হালহালুডি মুই করব তো ভাইগুলান যাবে কনে? আর বেলেক মুই করব না, ইনসাল্লা। তো দ্যাহেন এহন গাড়ি চালাই। পরের গাড়ি। বাজানে একখান সেকেনহ্যান কিনি দেতে পারতেন। দেলেন না। কী আর করি। এহন পরের গাড়িতি খাটতি খাটতি জান জেরবার। কিন্তু পয়সার মুখ দেখতি পাই নে। যা পাই তা প্যাডে দিতিই শ্যাষ।
গাড়ি ছোটে বাগেরহাটের দিকে, মোকছেদ নানা স্থানের নাম, গাছপালা, ইতিহাসকথা ইত্যাদি বলে যায়। বলে, এই যি বাগেরহাট বুঝলেন, এহানে আপনি পাবেন খাঞ্জা খাঁয়ের দিঘি। সেই দিঘিতে নাকি এখনও দুই দুইডা কুমির আছে। মানুষ কয়, সে দুডা পির ছায়েবের পোষা কুমির। তানার মাজার আছে, কত মানুষ, শয়ে হাজারে দেখতি যায় যেসব। ষাইট গম্বুজের নাম শুনিছেন? সেই ষাইট গম্বুজও এখানেই। সে মেলা পুরানা জমানায় সব বেত্তান্ত আছে, চলেন যাতি যাতি কবোনে।
রাস্তা দীর্ঘ, কিন্তু ক্লান্তিকর নয়। গাড়িটিও বেশ খোলামেলা, ছড়িয়ে বসা যায়। ভোর থেকে দৌড়বাজি করে সবারই ক্লান্তি ছিল। মোকছেদের সরাইখানার ভুরিভোজের পর এমন আরামের গাড়িতে চড়ে প্রায় সবাই ঘুমে ঢুলে পড়েছে। মোকছেদ আর আমিই শুধু কথায় মশগুল। হাফিজ কখনও তার বাজানের অবিবেচনার কথা বলছে, কখনও বা মোকছেদের কথায় ধরতাই দিচ্ছে। মোকছেদ যদিও খুলনা-যশোরের টানে কথা বলছে, কিন্তু তার বাক্যবিন্যাসে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার খুবই কম। শুধুমাত্র ক্রিয়াপদের ভিন্নতা ছাড়া বস্তুত তার ভাষায় আঞ্চলিকতা কিছুই নেই। আমি খুলনা-যশোরের অবিকৃত ভাষায় মোকছেদকে কথা বলতে অনুরোধ করলে, সে হেসে কুটিপাটি। বলে– বুঝতি পারবেন? তালি কই। কিন্তু মুই যে এতক্ষণ কথা কলাম তাও তো যশুরে কথা। বললাম– না এ-রকম তো আমিও বলতে পারি। আপনি আপনার গাঁয়ের গল্প করুন, সেখানে যেমনভাবে নিজেরা কথা বলেন সেভাবে। হাফিজ বলে ওঠে– বুঝিছি, ভাইজানে খাতি নাতি বেলা গেল শুতি পারলাম না– এইসব বাত শুনতি চাচ্ছেন। মোকছেদ তাকে ডাটে, বলে– তুই ব্যাডা থাম। খুলনেয়ে বজ্জাত। যশোরের কথার মাহাত্ম্যি তুই বুঝবি ক্যামনে গুয়োডা? ধমক খেয়ে হাফেজ চুপ। আসলে তার মনেও কিছু রগড়ের ছোঁয়া লেগেছে। তাই মিটমিটি হাসছে। মোকছেদ বলে– তালি কই শোনেন, মোর গাঁয়ের গল্প গাঁয়ের ভাষাই কই।
মোগোর গাঁয়ের নাম স্বরপুর। চিত্রা নদীর নাম শুনিছেন তো, সেই নদীর পারে মোগোর গাঁ। এহন যেখানে মোর হোডেল–সেখানদে এসতি যেতি পাঁচ ঘন্টার পথ। সেখেনে সারা খুণ্ডি যাওয়া আসা এহন আর কত্তি পারিনে। সালে দোসালে এক-আধবার যাই। নিজির কতি বকরাডাও নাই তো যেয়ি করব কী? গাঁডা আগে ভালোই ছিল, পাকিস্তানি আমলেও হিন্দুরা এখানদে যায়নি। হিন্দু মোসলমানে মিলামিশ ভালো ছিল। গোল বাদালে কতগুলো আজাকার বাদরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আজাকার দলের ভেমোডা আট কইরে দেলো কি? না, হিন্দু গুয়োরা মোছলমানদের পোঙ্গায় বাঁশ দিতি চায়। এসব মুক্তিযোদ্ধারা আসলে হেঁদুগের দালাল। দীনের ভাইয়েরা। কালেদিনে তোমরা দেখতি পাবা, ক্যামনে এই মুক্তিসেনারা হেঁদুগের লইয়ে মোচলমানের বউ বিডিগোরে বেইজ্জতি করে। তাই মুই কতিছি, স্বরপুর গাঁয়ের পাড়া পত্তিবেশী যারা নুন না থাকলি, হেঁদুগের কাচে নুন চেইয়ে আনচ, ত্যাল পলাডা, ত্যাল পলাডাই আনচ, ঘরের ছেলেডা কাসতি লাগল বইলে গুড় চায়ে আনচ, তারা এবার সাবধান হও। ক্যানটনমেন্টি সিপাই ফৌজ সব খবর আকতিছে– কেডা কী কর। হেঁদুগের মোরা বডার পার করব, তারপর দেখতি হবে কেডা কেডা মুক্তিযুদ্ধ মাড়াচ্ছে।
আজাকার ভেমোডো, কী যেন ওডার নাম, হোসেন আলি না কি, সেডা এট্টা চোঙ লয়ে সারা গাঁও ঘুইরে ঘুইরে এইসব কলো। এসব কথা শুইনে শুইনে গাঁয়ের সব হেঁদুগের অবস্থা চমৎকারা। তারা বলে, বাপ-দাদার কাছে শুনেলাম, য্যাকন বগগিরা আয়েলো তকন পেল্যেছি বাদারে। য্যাকন নীলবাদরে সোনার বাংলা ছারেখারে দেচ্ছেল ত্যাকনও মোরা একসাতে লড়িচি তাদের সাতে। এই স্বরপুর গেরামেই কত কাণ্ড হয়েছে। মোরা হেঁদু মোছলমান রায়ত পেরজারা একলগে লড়িছি। আইজ মুক্তিযুদ্দডাও তো মোদের এক লগেই লড়তি হতিছে, তালি মোগো নছিবি এ আবার কী ফ্যাকড়া? এই আজাকার সুমুন্দিরা মোদের স্বরপুর থেকে বেছাপ্পর করতি চায় জোর জেরাবতী, হায় হায়! মোরা এহন কী করি, কনে যাই? এহন তো দ্যাশে বন নাই, বাদাড় নাই, কোথায় পলায়ি যাব গো?
ভাবতে পারিনি মোকছেদের গাঁয়ের গল্প এদিকে মোড় নেবে। এখানে প্রকৃতই অস্বস্তিহতে থকে। কারণ, ধর্মকর্ম মানি বা না মানি, করি বা না করি, জন্মসূত্রে হিন্দু বটে এবং মোকছেদও মুসলমান অবশ্য। যদিও যে পরিচয় তার এতক্ষণে পেয়েছি তাতে তাকে শরিয়তি মোছলমান বলা যাবে না, কারণ তার সাঁই, মুর্শেদ ফকিরিতে দিল বাঁধা আছে। তবুও জাত্যংশে মোছলমান তো বটে, তারই মুখ থেকে এ-রকম একটি বর্ণনা, যা রাজনীতির আপাত আবর্তটুকু বাদ দিলে প্রায় সাম্প্রদায়িক উস্কানি বিষয়ে একটি নিটোল বিবৃতি বিশেষ, তা এভাবে শুনব আশা করিনি। অবশ্যই আমার এই আশা না করাটা একধরনের নাগরিক অহমিকা বা আধুনিকতাগর্বী-মনোভাবের লক্ষণ। যেন মোকছেদদের সাম্প্রদায়িককতার ঊর্ধ্বে উঠে এইসব বিচার-বিশ্লেষণের অধিকার নেই। যেন-বা তারা কোনো বৃহৎ বা মহৎ চিন্তা করতে পারে না, যেন ও-সব আমরা যারা নাগরিক, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদেরই তা একচ্ছত্র অধিকার। এ-রকম চিন্তায় আত্মগ্লানি হয়। বলি, মোকছেদ ভাই এ গল্প থাকুক। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। আপনার রাজাকাররা হয়তো তখন অন্যায় করেছে। এ-রকম অন্যায় তো ও-দেশে এ-দেশে অনেকেই করেছে এবং করছে। ও-সব বলে তো কিছু ফয়দা নেই। আপনি বরং সাধারণ মানুষের সাধারণ কথা বলুন। গল্পগাছায় মজা বেশি।
মোকছেদ বলে, গল্পগাছায় মজা বেশি! আহাহা! কী কতাই কলেন। যেন এ-সব কতা গপ্পকতা না, এ-সব সাধারণ মানষির কতা না। বেয়াদপি মাপ করবেন তো কই। এই যে মুক্তিযুদ্দ, তাতে মলো কেডা? পেরথম খেপের বেকায়দা ধুমধারাক্কিতে কিছু মানামানেরা মরিছে, তা ঠিক। কিন্তু যেয়ারে মরিছে কারা? সাধরাণ মনিষ্যিতো?– আমি বলি, হ্যাঁ তা ঠিক, তবে সে সব আর শুনতে মন চায় না। বড় উতলা লাগে। এতকাল পর দেশে এলাম। এই সুন্দর দৃশ্য দেখছি, আপনাদের সঙ্গে বাতচিত হচ্ছে, বড় ভালো লাগছে। এর মধ্যে খুনখারাপি, শত্রুতার গল্প যেন খাপ খায় না। যারা গেছে তারা তো আর ফিরবে না। বরং যারা আছে তাদের কথা, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কথা বলি বা পুরোনো দিনের কথা নিয়ে আলোচনা করি।
মোকছেদ বলে, তা করা যায়। তবি আপনি কতি পারেন, এইসব খুনখারাপি, ভিডে ছেইরে যাওয়ার গল্পকতা ছাড়া অন্য কোনো কতা কিসসা মোগোর আছে? মুই হিন্দু-মোছলমান বুঝি না। বাঙালির আর কোনো কতা কোনো যুগে দেখতি পান? মুই জানিনে। মোরে এ কতা কেডা কবে। বাঙালির গেরস্তালিতে কবে কেডা খেদানি ছাড়া সুস্থ হইয়ে ভাত খেতি পারিছে? বাজানের কাছে শুনেলাম, এককাল বগ্গিরা খেদায়েছে, তার আগেও কেউ কেউ লিচ্চয় খেদায়েলো, সাহেব রাংরেজগার যুগে তেনারা নীল লয়ে খেদায়েছে, পাকিস্তানিরা আইসে হেঁদুগো খেদালো, আবার ওপার থেকে হেঁদুরা খেদালো ন্যেড়েগো, তো তারপর বাঙালি, অবাঙালি, আজাকার, মুক্তিসেনা, খানসেনা এ ওকে খ্যাদায়, সে তারে গুল্লি মাইরে শ্যাষ করে– সে এক অনাছিষ্টি কাণ্ড। তালি কয়েন মোগোর খেদানি ছাড়া আর কী গপ্প আছে যা কাউরে জাঁক করি কতি পারি!
মোকছেদের আফশোস এক ঐতিহাসিক আফশোস। এ-কথাতো মিথ্যা নয়, বাঙালি কবেই-বা সুস্থে গেরস্থালি পাততে পেরেছে? মোকছেদের পরম্পরাগত অভিজ্ঞতায় সে না হয় শুধু বর্গী, নীলকর, সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি বিষয়গুলো জানে। কিন্তু বাঙালির উদ্বাস্তুতা তো আরও অনেক অনেক যুগ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। হয়তো-বা যখন তার জাতি হিসেব বাঙালিত্ব অর্জিত হয়নি, তখন থেকেই সে উদ্বাস্তুজীবনের অভিজ্ঞতা অঙ্গে ধারণ করে বসে আছে। এর সূত্রপাত তো আর্য-অনার্য সংঘাতের যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল। অষ্ট্রিক বংশীয় মানুষেরা গাঙ্গেয় উপত্যকায় কৃষিভিত্তিক যে সমাজ গঠন করেছিল তা থেকে তাদের উদ্বাস্তু করতে শুরু করে তো আর্যরাই। তারাই তো তাদের আবাদিকৃত জমি ইত্যাদি দখল করে তাদের খেদাতে শুরু করে। তারাই তো বাঙালির আদিপুরুষ। তারপর তুর্কী আক্রমণ…। তখন তো বাঙালিরা জাতির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। তখনও সে উদ্বাস্তু। তো এই হলো বাঙালির বিধিলিপি। সুতরাং মোকছেদ কিছু অন্যায় বলেনি। তবে আমার কিনা দীর্ঘকাল বাদে উজানে ফেরা, তাই একটু ফুরফুরানিভাবে গল্পসল্প চেয়েছিলাম। একটু হালকা হাওয়ায় গাড়িতে চলতে চলতে হাসি-মশকরাসহ মোকামে যাবার বাঞ্ছা ছিল মনে।
মোকছেদ খেদ করে বলে– তা দেখেন সে সব খেদানি-টেদানি তো যা হইয়েছে তা হইয়েছে। কিন্তু হেঁদু মোছলমানের হিসেবডা তো এহনও মেডলোনা। এডা কবে মেডবে কতি পারেন? মুই জানি আপনে কতি পারবেন না। কেউই এ কতার জবার দিতি পারে না। কত মানষেরেই না এ কতাডা শুধোলাম। সবাই কয়– মোরা যদ্দিন নিজির মাগ্গে বাঁশ সেঁধোয়ে মজা করা না ছাড়তি পারব, তদ্দিন এডা মেডবেনা। শুনিচি আপনেগের ওপারেও এমনি ধারা। তো সে কতা কতি পারব না। নিজের চক্কি যা দেকিনি, তা কব ক্যামনে। তবি ঝা দুই চাইর জন ছিটকে ছাটকে আইসে পড়ে, তাদের মুখি শুনি। আর এখানেরডা তো সচক্ষি পেত্যয় করি। ঝা আপসোস, হায় মাবুদ, মোকছেদেরি আর কত যন্তরনা দেবা। আর যন্তরনা মোর মুর্শেদ ফকির সাহেবের। তেনার যে কী তকলিফ, আহা সে বাত মুই কারে বলব। সে কতা উডলি তিনি খালি ধারায় বইয়ে যান, যেন্ তেনার সব্ব অঙ্গে আছুর পানি। চলেন, দ্যাকবেন নিজির চউক্কি। তখন তেনায় খালি লালন সাঁই পাঞ্জু সাঁইয়ের গান করতি থাকেন আর কাঁদতি কাঁদতি বুক ভাসায়ে, দাড়ি ভাসায়ে কেমন যে করেন, যে তা না দেইখেছে সে বুঝতি পারবে না। কতা ওই এট্টা কি? না মানুষ মানুষরি মারতে সুখ পায় ক্যান? মানুষ মানুষরি মারে ক্যান? সে এ্যাকি আন্যিরি ভিডে ছাড়া কইরে কী লাভডা করে?
মোকছেদের কাছে তার মুর্শেদের কথা যতই শুনছি ততই সেই মানুষটিকে দেখার এক গাঢ় আকুলতা আমাকে অধৈর্য করছে। মনে মনে একটি ছবি আঁকাও হয়ে গেছে সেই ফকির সাহেবের। তাঁর মাথায় দীঘল শুভ্র কেশ, আবক্ষ শ্বেতশ্মশ্রু, চোখে অনন্ত করুণা, হাতে দোতারা এবং মুখে স্নিগ্ধ হাসি। জানি না বাস্তবে তিনি এ-রকমটিই হবেন কিনা। মনে মনে ছবি দেখি। সেই ফকির যেন বহুকাল আগের শোনা একটি গানের ছবি, সে গান এক বাউল আমায় শুনিয়েছিল জয়দেবের মেলায়, কেঁদুলিতে। তার নাম ছিল সুধীর দাস। সে গেয়েছিল–
কোথা হতে ফকির এল…
ও তার আকাশজোড়ামাথা।
আবার সেই ফকিরটা মইরলে পরে
কব্বর দিবি কোথা রে…।
মনফকিরা মনেরি কথা
ও সাঁইজি তা জানে রে…
এ-রকম কিছু কথায়। তখন ফকিরের এক ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যার আকার আয়তন এই ভূমণ্ডল ছাড়িয়ে অনেক ব্যাপ্ত, অনেক উঁচু। সে যখন মরে, তখন তো তাকে কবর দেবার মতো জায়গা পাওয়া যায় না, সে যেন মনফকির, মনফকিরকে কি কবর দেওয়া যায়? মোকছেদ আর তার মুর্শেদের সমস্যাটাও বোধহয় মনফকিরকে কবর দিতে না পারার সমস্যা। তার ভাষায়, “হায় ঝা তকলিফ”। সত্যিই তকলিফ, কেননা, মনুষ্যত্বকে কেই-বা কবর দিতে পারে, মনফকিরাকে নিয়ে এরকমই সংকটে ভোগে বুঝি বা মোকছেদ আর তার মুর্শেদ ফকির সাহেব। এ ভ্রমণ, এ যাত্রা আমার উজানে। এর সুর, তাল, লয়, মান সবই যেন উজানের রাগিনীর ধরতাইয়ে চলছে। নতুবা মোকছেদই বা অচানক জুটবে কেন? আর তার একজন মুর্শেদই বা থাকবে কেন?
এখন চলতে চলতে আর একজনের গাওয়া একটা গান মাথার মধ্যে উথাল-পাথাল করে। তিনিও তাঁর ফকিরকে কবর দিতে পারেননি। তার মনফকিরের লাশ আমরণ কাঁধে নিয়ে চলতে হয়েছিল তাকে। নিজে একসময় ছাই হয়ে গেছেন, কিন্তু মনফকিরের লাশ তুলে দিয়ে গেছেন উত্তরাধিকারীর কাঁধে। এ লাশ দফন করার উপায় নেই, স্থানও নেই, তাই দায় বর্তায়, একে জিয়াবার। উত্তরাধিকারের দায় ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া যেন এই লাশকে জিয়ানো যায়, যদি না পারো, পরের প্রজন্মের কাঁধে চাপিয়ে নিজে সরে পড়ো। এরকমই চলুক। তা সেই মানুষ তার মুর্শেদের কাছে বুঝি বা কী এক আপ্ত বাক্য পেয়েছিলেন। তাঁর সেই মুর্শেদ তাঁকে বলেছিলেন, যা তোর ভাবনা দূর হই গেল। এখন থিকা আর ভাবনা থাকল না তোর। কিন্তু ভাবনা তাঁকে ছাড়েনি। তিনি তাই তাঁর মুর্শেদকে সারা জীবন শুনিয়ে গেয়ে গেছেন তাঁর গান। ‘আমার ভাবনার কিন্তু দূর হইল না, শুনেন গো মুরশিদ,’ –সে গান কৈফিয়ত তলবের।
কিন্তু এ ভাবনা দূর কি কখনও হয়? হয়, যদি ওই ‘ফকিরা’ যার আকাশজোড়া মাথা, তাকে কবর দেওয়া যায় তবেই। কিন্তু তাঁকে না কবর দেওয়া যায়, না ভাবনা দূর হয়।
রাস্তা বড় মসৃণ। বিস্তীর্ণ গাঢ় সবুজের মধ্যে এ-রকম কালো চকচকে একটানা চওড়া একখানা রাস্তা, এ বড় শোভা। দু-পাশে ‘গেরস্থালি’ আর অতিথি গাছ। গেরস্থালি গাছেদের মধ্যে এখন রেইনট্রিকে অবশ্য ধরা যায়, কারণ তার বংশপরিচয় যাই হোক, দুশো বছরের ভূমিপুত্র হিসাবে তাকে গেরস্থ বলা অন্যায় নয়। সে যেন এ ভূমিতে বেশ আয়েশ পেয়েছে। যেন বা তার চোদ্দোপুরষের বাস্তুভিটে এটি। সন্ধিৎসুরা হয়তো এ বিষয় তত্ত্ব জ্ঞাতব্য জানাতে পারবেন। তবে রেইন ট্রি নামটি বিদেশি হলেও তার এই মাটিতেও বাড়ন, চাড়ন, বিস্তৃতি এবং প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য অসামান্য বংশবিস্তার, তাকে আর বিদেশি রাখেনি। সে এখন ভূমিপুত্রই। তবে তার পছন্দের বাসভূমি নদী আর খালের কূল। সেখানে সে তার প্রতিচ্ছবি নদী-খালের জলে দেখতে বড় ভালোবাসে। আর ভালোবাসে বলেই সেখানে সে বড় সহজ বিস্তারে নান্দনিক। এ ছাড়া এখন বিদেশি অতিথিপ্রায় বৃক্ষরা, যাদের এই রাস্তার পাশে দেখতে পাচ্ছি, তাদের পরিচয় মোকছেদ আমাকে বলে দেয়। তাদের আমি চিনিও না, জানিও না– আমি যখন দেশ ছাড়ি তখনও তারা এদেশে আসেনি। মোকছেদ বলে, ওনারা হলেন চম্বল, মেহগিনি আর সেগুন। এ ছাড়া যারা আছেন তাদের কতা মুইও কতি পারব না। তবি দেখতি খারাপ না। দিব্য একটা মরদ মরদ ভাব আছে।
বাগেরহাট শহরকে একপাশে রেখে আমরা পৌঁছোই এক নদীর কিনারে। এখানেই গাড়ি আমাদের ছেড়ে দেয়। খেয়া পার হতে হয় ছোট্ট ডিঙিতে। এই নদীর নাম বোধহয় দামুদা। বলেশ্বর আর কচা নদীকে যুক্ত করে এই নদী। নদী পেরিয়ে অটোতে আসি বলেশ্বরের খেয়াঘাটে। এ জায়গাটা পিরোজপুরের নিম্নভাগ। এখান থেকে বলেশ্বর আরও কিছুটা এগিয়ে কচা নদীর সঙ্গে মেশে এবং সোজা দক্ষিণে গিয়ে হরিণঘাটা নাম নিয়ে সাগরে পড়ে। খেয়া পেরিয়ে আবার অটো। এবার অটো পিরোজপুর শহরের মধ্যে দিয়ে আমাদের সোজা নিয়ে যায় হুলারহাট বন্দরে। হুলারহাট যে-নদীর পারে তাকেই কচা নদী বলা হয়। কচা নদী হলো কিছুটা কাউখালি নদী আর কিছুটা কালীগঙ্গার মিশে যাওয়া প্রবাহ। কালীগঙ্গার আঁতুরঘর হচ্ছে কোটালিপাড়া আর স্বরূপকাঠির বিল। এর যেমন বিশাল বিস্তার, তেমনি এর গভীরতা। এই কচাই পিরোজপুরের নীচের দিকে গিয়ে বলেশ্বরে মিশেছে।
মোকছেদ বলে, ভাইজান, আইস্যে পড়লাম, মোর মুর্শেদের মোকামে আইসে পড়িছি শ্যাষ ম্যাষ। নাইমে পড়েন, নাইমে পড়েন সবাই। বলতে বলতে ঝপাঝপ মালপত্র নামিয়ে প্রায় সবই নিজের কাঁধে, ঘাড়ে, চাপিয়ে আমার মেয়েদের হাঁক দেন– চলো মণিরা, পা চালায়ে যাতি হবেনে এট্টু। এই থোড়াডা রাস্তা। বউমা এট্টু কষ্ট করেন। আইজ আবার হাডের দিন পইড়ে গেল। বড় ভিড়। ফকির সাহেবের হোডেল আবার নদীর কিনারি। এট্টু হাটতি লাগবেনে। অর্থাৎ বোঝা গেল ফকির সাহেবেরও বিষয় ‘গু’ হোটেলজাত। জানতে চাই– মোকছেদ ভাই, আপনার মুর্শেদও কি হোটেল ব্যবসা করেন নাকি? মোকছেদ দেড় হাত জিভ কাটে। বলে– ছিয়া ছিয়া, কী যে কন্, ব্যবসা কতি আছে? স্যাবা কতি পারেন না। মোর ফকির ব্যবসা করেন না, মানষির স্যাবা করেন। তা নয় করেন, কিন্তু নদীর পরে বাস, ভাবনা বারো মাস। তা যারা নদীর পারাপার করেন তানারা নিজির পয়সায় নিজিরা খায়েন। আর মোর ফকিররিও খাওয়ান। চলেন নিজ চক্ষি দেখলি বুঝতে পারবেন, ব্যবসা কারে কয় আর স্যাবার অত্থ কী?
মোকছেদের পেছন পেছন হাঁটতে থাকি, চোখ থাকে হাটের পণ্যসম্ভারের দিকে। এ দৃশ্য বহুকাল দেখিনি। নিম্নবঙ্গের হাট যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন তারা বর্ণাঢ্যতা। থরে থরে সাজানো সব পণ্য। তাছাড়া এ স্থান শুধু হাট নয়, এ যে বন্দর। এখান থেকে সব পণ্য কাঁহা কাঁহা মুলুকে যায়। তাই নানান পণ্যের পর্বতপ্রমাণ সম্ভার সাজয়ে বসেছে চাষি, ব্যবসায়ী, মহাজনেরা। নারকেল, সুপুরি, লঙ্কা, ধনে, হলুদ আরও কত সব মশলা। আছে আখ, তামাক, কলা, কচু (মান) এইসব পণ্য। আছে গোলপাতা, হোগোল, মধু, গুড় এইসব। বেশিরভাগ পণ্য হয়তো মোটা দাগের কিন্তু তার চাহিদা সাধারণ্যে বড় ব্যাপক। বলদের হাট, গোরুর হাট একপাশে রয়েছে। সেখানে চাষিরা যারা বেচছে তারা ম্লান মুখ, যারা কিনছে তারা হর্ষিত। ফড়েরা চাষিদের ঠকাবার ফিকির করছে। চাষিরা রেগে মুখ খিস্তি করছে। এরকম একটা জমজমাট হাটের মধ্যে দিয়ে আমরা যাই। এক ব্যাপক বাণিজ্যের জগতের মধ্যে আমরা কয়েকজন যেন নিতান্ত বেহাটুরে। আমরা যাচ্ছি ফকির সাহেবের দহ্লিজে। সেখানে সেবা আছে, ব্যবসা নেই।
মোকছেদ হাঁক দেয়– পা চালায়ি চলেন দিনি, হাট পরে দ্যাখ্বেননে। হাট কিছু ফুরোয়ে যাতিছে না। ফকির সাব যদি এদিগি উদিগি সটকে পরেন তো হয়লো। মোকছেদ যখন চরণদার, তার কথার মান্যতা অবশ্য দিতে হবে। জয় মুর্শেদ, তুমি মোকামে থেকো বাবা, না হলে তো চরণদার উন্মত্ত হবেন। যা উত্তেজনা তার, যেন আল্লার দরবারে সশরীরে হাজির করাচ্ছেন।
