সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১৪
চৌদ্দ
সপ্তমীর ভোরে যখন নাগারা টিকারা আর সানাইয়ের শব্দে ঘুম ভাঙে, তখন হঠাৎ ভ্রম হয়, বোধহয় শৈশবে আছি। কত দূরের স্মৃতি হঠাৎ জেগে ওঠে ঘুম ভাঙার সাথে সাথে। তারপর যখন ঘোর কাটে, তখন বুঝি, এ শৈশব নয়, প্রৌঢ়ত্বে শৈশবের স্বপ্ন। তখন বেদনা আর বিষণ্ণতা এসে ঘিরে ফেলে এই শরীর এবং মন। তখন নাগারা টিকারা আর সানাই-এর শব্দ ক্রমশ দূরবর্তী হতে থাকে, যেমন দূরে সেই শৈশব। যে শৈশবের বাদ্যধ্বনি আধাজাগরণে শুনছিলাম, তা ক্রমশ দূরবর্তী হয়ে বাস্তবের নাগারা টিকারার কোলাহল কানকে পীড়িত করে। সুর তাল কেটে যায়। এখন এই বাদ্য কোনোমতেই আমাকে পূজা-মণ্ডপের দিকে ছুট লাগাতে উত্তেজিত করে না, শৈশবে যা করত। এভাবেই শৈশব আমাকে নাড়া দিয়ে দূরে চলে যায়। একসময় বিষণ্ণতাই আমাকে ঠেলে নিয়ে যায় মণ্ডপের দিকে। যেন খোঁজ করতে চলেছি সেই অনুভবের যা জাগরণের সাথে সাথে আমাকে পরিত্যাগ করে জানিয়ে দিয়ে গেছে, তেহি নো দিবসা গতাঃ।
কাল গোঁসাইয়ের পরকীয়া বিষয়ক এবং পরে জামাই-এর বেএছলামি অসৈরণ আচরণ সংক্রান্ত মোকদ্দমা শেষ হয়েছে। আজ সপ্তমী। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। পূজামণ্ডপে গিয়ে বসে আছি। নাগারা, টিকারা, সানাই এখন আর বাজছে না। আমার কাছে সময় এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। মাথায় ব্যস্ততার মাছি গুনগুন করছে না। সময়ের বয়ে যাওয়াটা আদৌ মালুম হচ্ছে না। খানিকক্ষণ আগের বিষণ্ণতাও আর যেন নেই। স্নায়ুর উপর, কোনো অবশ্যকর্ম নির্ধারিত সময়ে করতে না পারার চাপ নেই। মগজ চিন্তাশূন্য। চোখ দুটি শুধু কাজ করে যাচ্ছে। ছবির পর ছবি দেখছি। স্পর্শেন্দ্রিয়ে নিচ্ছি এক জৈবিক অনুভব। মগজ নয়, হৃদয় শুধু মাঝে মাঝে জানান দিচ্ছে তার ব্যথা বা আনন্দের সংবেদন। এ এক অসামান্য বোধ। জীবনে এ অনুভব খুব বেশিবার আসে না। মনে হচ্ছে, মগজ, বুদ্ধি এসব চুলোয় যায় যাক। শুধু এই অনুভবটি থাকুক।
হঠাৎ নজরে পড়ে উপস্থিত তাবৎ কিছুকে তুচ্ছ করে একজন কে যেন দেবীর সামনে হাতজোড় করে বেশ ভক্তিযুক্ত হয়ে কী যেন বলছে। তার চোখদুটি বেশ ঢুলঢুলু এবং রক্তাভ। বোঝা যাচ্ছে সকালবেলায়ই বেশ খানিকটা গাঁজার ধোঁয়া মগজে সেঁধুয়েছেন তিনি। গাঁজাই এই নিম্নবঙ্গের অপবর্গীদের রাজা হওয়ার প্রধান অবলম্বন। ‘মদমাদী’-র প্রচলন সাম্প্রতিক। ‘মদমাদী’ আগেকার দিনে, শুধুমাত্র উচ্চবর্গীদেরই অবলম্বন ছিল। গাঁজা সব্বসাধারণের। সে যাকগে। কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলাম– ভক্তের প্রার্থনা। কারণ আবেদনটি বড়ই দীর্ঘস্থায়ী ছিল। যেটুকু শুনতে পেলাম, তাতেই আক্কেল গুড়ুম। ভক্ত পরম শ্রদ্ধাভরে দেবীকে বলছেন, হে মা ভগবতী, তুমি, দশভুজা, অসুরনিপাতিনী, শত্রুদলনকারিণী, ভক্তবৎসলা, অগতির গতি, অবলের বল। তোমার কৃপায় দুষ্টের দমন হয়, শিষ্টের পালন হয়। তুমি শক্তিস্বরূপা, আদ্যাশক্তি মহামায়া। এইরহম পুরোহিত গোঁসাইরা কয়। শাস্তরে নাহি এরহমই ল্যাহা আছে। এইসব কতা ছোডোকাল থিয়া হুইন্যা অহিতাছি, মাগো, এমনও হুনি, তুমি বিপদতারিণী, আপোদনাশিনী আরও কত কী! মুই আপড়া, আলেহা, যেয়া হুনছি, হেয়া কইলাম। কিন্তু মাগো, তোমারে এট্টা কতা জিগাই যহন মিলিটারিরা আইয়া, হেই মুক্তিযুইদ্ধের সোমায়, মোগো হোগার ফুডায় বন্দুকের নল ঢুকাইয়া চিরইয়া ফারইয়া শ্যাষ করতে আছেলে, তহন তুমি কোতায় আছেলা, চুৎমারানি? এহন যহন বেয়াক কিছু ঠাণ্ডা, তহন আবার গুষ্টি সুদ্দা, রাউয়ার মতো পূজা খাইতে আইছ? হত্য কমু মাগো, দোষ অফরাদ নিও না, তোমার মতন এমন বেলাহাজ মাইয়া মানুষ, আর এট্টাও দেহি নাই।
কিন্তু এ-সবে সূচনা। তখন কোনও রা-ও কাড়িনি। শুধু শুনে গেছি। দুপুরে আহার বিশ্রামের পর একটি ছায়াযুক্ত রেইনট্রির নীচে, আরাম কেদারাটি পেতে, নির্জনে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করছি, এমন সময় ভক্ত হাজির। সে সামনে এসে ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় বসে। আভূমি নত হয়ে পরম বিনয়ের একটি বৈষ্ণবী প্রণাম করে, এবং নিতান্ত অপরাধীর মতো বলে, মুই হুনছি আপনেরা আইছেন কইলকাতার থিহা। এট্টু কামে গেছিলাম, হে কারণ, সোমায়মতন দ্যাহা করতে পারি নাই। হে অপরাদটা ক্ষমা করইয়া দেবেন। তয়, এই যে আইয়া পড়ছি, এহন আর আপনের কোনো চিন্তা নাই। স্যাবক এহন থিহা অষ্ট পহর ছিচরণে হাজির থাকপে। আপনেগো বাড়ি আছেলে যেন কোথায়?
বলতে, সে খুব আহ্লাদে প্লুত হয়। বলে, তয় হেইয়া কয়েন। মুই চিনমু না? মুই হে বাড়ি ছোডো ব্যালাৎ থিহা যাই। ও বাড়ির কত্তাগো কত গান হুনাইছি। শ্যাম বৈরাগী আর হ্যার বৈষ্ণবীর লগে তো কত্তোবার গেছি। বাড়ির ছোডোকত্তায় মোর গানের খুব সুখ্যাত করতেন, কেত্তন শোনতে বড় ভালবাসতেন। মুই যদি বেনইয়া কালেও যাইতাম ছোডোকত্তায় হারাদিন খালি কেত্তন হোনতেন। খাওয়াইয়া লওয়াইয়া সয়েন্ধাকালে কইতেন, কাত্তিক, এবার বাড়ি যাও। আপনে দ্যাখছেন শ্যাম বৈরাগীরে? বিকনার শ্যাম বৈরাগী?
স্মৃতি সততই বিষণ্ণতার। শ্যাম বৈরাগীকে এখানে আমার বয়েসের সবাই দেখেছে। তাকে না দেখার কোনো উপায় ছিল না আমাদের। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে, যখন সবে পাঠশালায় যেতে শুরু করেছি, রাস্তাঘাট দোকান বাজার বা বাড়িতে কোথাও না কোথাও শ্যাম বৈরাগী আর তার বৈষ্ণবী লক্ষ্মীমণিকে প্রায়শই দেখতাম। আগে আগে একতারা হাতে শ্যাম, পিছে কাঁথার ঝোলা কাঁধে, লালপাড়, মলিন সাদা শাড়ি, হাতে করতাল লক্ষ্মীমণি। শ্যামদাসের কাঁধেও কাঁথার ঝুলি। এই প্রৌঢ়কালেও সেই ছবি অম্লান। তারা কাঁহা কাঁহা মুল্লুক ঘুরত মাধুকরীর জন্য। দুটি গান প্রায় সব জায়গাতেই তারা গাইত পরপর। হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে। আর, অকলঙ্ক নামে কলঙ্ক রটিবে, দয়াময় বলে কেউ ডাকিবে না। এরপর যদি গৃহস্থ বা শ্রোতা কেউ অন্য গানের ফরমায়েস করত, তবেই শ্যামদাস তার ঝাঁপি খুলত। বলত, ওই গান দুইডা, বাবা, মোগো ভিক্ষার গান। হে কারণ সদাসর্বদা ওই দুইডাই গাই। অন্য গান একান্ত নিরালায় গাই। মুই গাই, বৈষ্ণবী হোনে। হে গায়েন, মুই হুনি। বেয়াক গান কেডা আর মোন দিয়া হোনে, কয়েন।
কার্তিক যাঁকে ছোডোকত্তা বলল, তিনি বাউল, বোষ্টম, বৈষ্ণবীদের খুব কদর করতেন। ভালবাসতেন তাদের গান শুনতে। এখন মনে পড়ছে, তাদের সাথে কার্তিক নামে একটি ছেলে মাঝে মাঝে আসত। সে ছিল সুন্দর, ছিপছিপে চেহারা, টানাটানা চোখ আর একমাথা কোঁকড়া চুলওয়ালা এক উঠতি যুবা। গায়ের রঙ ঘোর। ভারী সুন্দর লাগত তাকে। তার গলা ছিল অসাধারণ সুরেলা এবং চড়া। এখন বুঝতে পারি সেই যুবাই এই আজকের কার্তিক। বাস্তব সর্বদাই কল্পনাকে অতিক্রম করে।
মনে পড়ে, শ্যামদাস যখন মারা যায়, তখন লক্ষ্মীমণি একা আসত ভিক্ষে করতে। দরজায় দাঁড়িয়ে শুধু খঞ্জনি বাজিয়ে গাইত। তার একতারা ছিঁড়ে গেছে। শ্যামদাস নেই। সে গাইত
কত ভালবেসেছিলাম গো বন্ধু
আপোন ভাবিয়া
কে জানিত চইলা যাবা বন্ধু
হৃদয় ভাঙ্গিয়া
এখন ভাঙ্গা হৃদয় কলসির কানা
তার সাথে কার লেনা দেনা
বন্ধু, পইড়া আছি পথের পাশে
তোমারে হারাইয়া
বন্ধু আপনা ভাবিয়া।
গাওয়ার সময় তার দু চোখ দিয়ে ধারায় জল পড়ত। এখন সেসব স্মৃতি মনে আসে। কখনও এই কার্তিক, শুনেছিলাম সে নাকি শ্যামদাসের জামাই ছিল, শাশুড়ির সাথে আসত। পরে আর তাকে দেখিনি। সে গাইত
দিনের মালিক–
দিন ফিরাইয়া দ্যাও
মরি দুর্দ্দিনের জ্বালায়–
ছয় ব্যাঘ্র আমায় ধরইয়া খায়।
যখন থাকি গৃহবাসে
ব্যাঘ্রেরা মোরে ঘিরইয়া বসে
খালি পথে লামলে
পরান শাস্তি পায়–
মরি দুর্দ্দিনের জ্বালায়।
ছোটকত্তা বলতেন, ওর গলায় জাদু আছে। বিশাল দরদালানের এক প্রান্তে, সিঁড়ির উপরে বসে গাইত কার্তিক। ছোটকর্তা বসে থাকতেন, বারান্দায় একটি চৌকির উপর। একের পর এক ফরমায়েস মতো গান গেয়ে যেত কার্তিক। সে জানত, আজ আর কোথাও তাকে মাধুকরীতে যেতে হবে না।
বৈরাগীরা কোনো জাত নয়। সম্প্রদায়। এখানকার কতগুলো গ্রামে তাদের বসতি ছিল। তাদের সংস্কৃতি, যাপিত জীবন, ঠিক বর্ণহিন্দুদের রীতি অনুযায়ী ছিল না। তারা গৃহস্থ নয়, একথা বলা যায় না। কিন্তু বৈরাগী কেন নাম, এ চিন্তা মাথায় ছিল। অপবর্গী মানুষেরা নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মোকাবিলা করে করে যখন তার ব্রাহ্মণ্য বিধিব্যবস্থার সাথে কিছুতেই পেরে উঠত না, তখনই বোধহয় তারা বাউল বৈরাগী হতো। ব্রাহ্মণ্য অত্যাচারে এই অপবর্গীরা এক সময় বৌদ্ধ, ক্রমান্বয়ে সহজিয়া এবং সেই রাস্তা ধরেই বাউল, আউল, বৈরাগী কিংবা সর্বশেষ অবলম্বন ইসলাম। কিন্তু তাও কি রেহাই আছে। ব্রাহ্মণ্যবাদের ছোঁয়াচ সেখানেও কোনো না কোনো অর্থে আছে বলেই না সেখানে দরবেশ, ফকির, সাহেবধনী ইত্যাকার অজস্র ধারা জন্মায়। তাই বলছিলাম বৈরাগীরা কোনো জাত নয়। সমাজ কাউকে বানায় বৈরাগী, কেউ বাউল, আউল অথবা কেউ দরবেশ বা ফকির। সমাজবিধি আর মনের টানাপোড়েনে এইসব সম্প্রদায়। কার্তিক জাতিগতভাবে জেলে। কিন্তু এভাবেই সে বৈরাগী। স্থান, সমস্যা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী একেক এলাকায় একেক নাম। নচেৎ দেখা যায় সবার মধ্যেই বৌদ্ধগন্ধ আছে। আর এ-কথা বলার অপেক্ষা থাকে না যে, বৌদ্ধ গন্ধ থাকার মানেই হচ্ছে ব্রাহ্মণ্য উৎপীড়নের ফল।
এখন আমার সামনে যে লোকটি, তাকে দেখে আমি ভাবি, সে কি সেদিনের সেই কার্তিক? সে তো ছিল এক সুঠাম, চিকন, অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী। এর চোখ দুটি যদিও গাঁজার ধোঁয়ায় ঘোলাটে বিবর্ণ, কিন্তু ভাব দেখে মনে হচ্ছে সেই-ই।
এখন সে বলে, এবার চেনলেন তো? যাউক আর কোনো উদ্বাগ নাই। এহন মোরা আত্মীয়। তয় আছেন তো ভালো?
এই এক শিষ্টাচারের ধরণ এখানকার জনেদের। অনেকক্ষণ আলাপ আলোচনা হলো, চেনাশোনা আছে কি নেই, তার তোয়াক্কা নেই, যদি দেখা গেল, যে কোনো এক অতীত যোগাযোগ ছিল, ব্যাস, আর কোনো কথা নেই, অমনি, আছেন তো ভাল? অথবা তয় তো মোরা আত্মীয়।
তা হলে এই কার্তিকই সেই কার্তিক! আমাদের কার্তিক, যার গান শুনে ছোটোকর্তা ব্যাকুল হতেন। যে শ্যামদাসের জামাই, যে গাইত–
দিনের মালিক, দিন ফিরাইয়া দাও–। তার মধ্যে যদিও সেদিনের সেই কিশলয় ভাবটি নেই, তবু তাতে একটি বেশ আত্মীয়তার ভাব মাখানো। তার মাথায় কুঞ্চিত কেশ এখনও আছে এবং তা তার ঘাড় অবধিই প্রলম্বিত। পরনে মালকোঁচা ধুতি, গলায় তুলসীর মালা। কিন্তু এখন যে আরও কিছু দেখি, তার হাতে ছিলিম, কাঁধে থলে এবং চোখে শ্মশান-বৈরাগ্য। থলের আয়তনে বোধ হয়, তার ভেতর তার তাবৎ পারানির কড়ি। সে তখন আত্মপরিচয়ে বিস্তারিত হয়। বলে, বাবু, মুইই হেই কার্তিক। জাতে জালইয়া কৈবত্ত। সম্প্রদায়ে বৈরাগী, বত্তমান পেশা কহনও হালুডি, কহনও মাছমারা, আবার কহনও বা বাজনদারি। রয়ানি, গুণাবিবি, কেত্তন, রূপভান বা জারি সারি বেয়াকতাথে আছি। সানাই মোর হাউসের বাজনা। তয় কেলারিওনেট কয়েন, মোহনবাঁশি, কয়েন, ঢাক খোল কোনোডার তিরুডি পাইবেন না। নেশা গাঁজা, এই যে দ্যাহেন চিলইম্ ইনি মোর পাশপোট, আর এই সানাইহান মোর ভিসা। এনাগো দৌলতে মোর বেয়াকখানে গতায়াত। মোরে আটকাবার কেউ নাই। মোর না লাগে টিকিট, না পাশপোট ভিসা। যেই যেহানে আটকাউক, এনাগো দৌলতে মুই ছাড়া পামুই। এমনকী পুলিশ দারোগারাও মোরে কিছু কয় না।
পরিচয়ে বুঝলাম, লোকটি গুণী। কিছু কিছু লোক থাকে, যারা নিজের পরিচয় দিতে কিছুমাত্র বিলম্ব করে না। প্রথম পরিচয়েই সবটুকু উজাড় করে বলে দেয়। কার্তিকের দেখলাম, সেই স্বভাবটি। সে জানালে, বাবু, ভগবতীর ধারে এট্টু দুঃখ করতে আছেলাম। আসলে মনে রাগও আছেলে ম্যালা। হ্যার লইগ্যা গাইল খামারও এট্টু দিছি, হোনছেন বোদায়। তয়, ওয়া মোগো কতার লব্জ, ওয়া মোরা দিই। রাগ ঝাল অইলে, এট্টু খামার টামার না দেলে মোগো জুইত অয় না। তয়, মায় হেথে কিছু মনে করে না। অন্তয্যামী, জানে তো বেয়াক। আর কতাও কি মিত্যা? এ্যাদ্দিন অইয়া গেলে, তমোও কি, মিলিটারি লাংচুনির পোয়গো হেই হাউয়া ভাঙ্গা গুতা ভোলতে পারছি। হে কারণ মায়রে জিগাইলাম, মা জননী, তোমার এতই যহন ত্যাজ, তো হেয়া, হে সময় আছেলে কোতায়, হে কতা কওছেন দেহি, ভ্যানামারানি। তো, জামাইবাবু, হে মাতারিনির কোনো কইলজা আছে। ভ্যানা অর্থাৎ বিন্নাঘাস বা খড়।
কার্তিকের কথা কইবার রকমটি ভালো। রেই্নট্রি গাছটি বেশ বিশাল। শারদী অপরাহ্নে তার তলায় বসে বেশ মৌজ পাচ্ছিলাম। কার্তিক বলে যাচ্ছে তার কার্তিকাহিনী। পঞ্চমীর সন্ধ্যায় এসেছে সে। খলিল ঠাহুর নাকি তাকে “নেমন্তনা” দিয়ে নিয়ে এসেছে। এখানে নিমন্ত্রণকে এরা সবাই সম্মানার্থে নেমন্তনা বলে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে আসতে গিয়ে, কার্তিক নাকি দুটো “সাইদ্যের” ভুল করে বসেছে। সে বললে, জামাইবাবু, খল্ইয়া হালারপো হালায় এমন জাক্কৈর পাক্কৈর লাগাইলে যে তহন তহনই হ্যার লগে না বাইর অইয়া আইলে য্যান হ্যার প্যাডের পোলা গাব্লা যাইবে। গাব্লা যাওয়া অর্থে কাচা যাওয়া, অর্থাৎ মিসক্যারেজ হওয়া। তয় হেই হুড়াহুড়িতে মুই দুইডা আসল কাম বেস্মরণ গেছি। পোঞ্চোমির রাত্তিরে খাওনদাওনের পর, খালধারে যাইয়া যহন গাঁজার পেত্থম টানডা মারলাম, তহন মনে পড়লে, কইয়া জালহান পাতাইয়া আইছি পুব পুহইরের ব্যাড়ে। আর আওনের সোমায়, মোর মাগি গেছেলে খালে। হ্যারে কিছু কইয়া আই নায়। মাগিরে যে কইয়া আই নায়, হেয়া কিছু না, ওরহম অয়। পাঁচ দিন, দশ দিন বাড়ি না ফেরা, হেয়া হে ধত্তব্য করে না। জানে, আইবে হ্যানে। কিন্তু, জামাইবাবু, কইয়া জালে যে মাছগুলান আটকাইয়া রইছে, হেগুলার গতি কী অয়?
তো কাইল বাড়ি গেলাম বেন্ইয়াকালে। যাইয়া পেত্থমেই জালহান উডাইয়া দেহি কই মাছ পড়ছে আষ্টডা। জামাইবাবু, কমু কী– য্যারে কয় হিদ্লা পড়া কই, যে কই মাছ দিয়া, ত্যাল কই রান্দে।– হিদলা অর্থে শ্যাত্লা বা শ্যাওলা পড়া, যার বুকটা লাল এবং যে মাছ তেল কই রান্নার জন্য নির্দিষ্ট। কার্তিক বলে চলে, মাছ কউগ্যা লইয়া গেলাম বাড়ি। মনে হাউস, মাগি মাছগুলান দিয়ে ত্যাল কই রান্দবে। যাইয়া দেহি, বোজজেননি জামাইবাবু, দেহি, মাগি মোর চিত্তার অইয়া ঘুমায়। ব্যালা বাজে তহন বারোডা। উড্ইয়া কয়, যে চুলায় আছেলা, হেই চুলায় যাইয়া খাও। মুই তোমার কই মাছের গুষ্টির হোগা মারি। ভাবছেলাম, যাইয়া মাগিরে কমু, রান্ধ কই মাছের ঝাল। আইডমতো দুগ্গা ভাত খাই। হেয়া দ্যাহেন, মাগি মোরে এই কতা কয়।
বললাম, কার্তিক, সে তো তোমার কথা, কিন্তু তারও তো রাগের কারণ আছে। তুমি আসার সময় তাকে একটু বলেও আসনি। সে রাগবে না? কার্তিক বলে, আরে ধুরও, এয়া কি আইজকে নতুন, না হে চুৎমারানি মোরে চেনে না! মুই গাঁজাল মাজাল মানুষ। রয়ানি, কেত্তন, এ-গান ও-গান লইয়া কহন কৈত্থিয়া কোতায় যাই, হ্যার নামে নাই হুদা। হুদা অর্থে উদ্দেশ। বলি, তা যদি একটু গুছিয়ে-টুছিয়ে চল, তো সেও খানিক স্বস্তি পায়। কার্তিক সংক্ষেপে বলে, না হেয়া মোর অয় না। মোর খাস্ইয়তটাই এরহম। কোনো হান দিয়া ডাক আইলে, মোর থাহে না কোনো দিশা হইদ্য। আর হেয়া যদি রয়ানি, কেত্তনের গাওনা অয়, মোর ঠ্যাং দুহান লাফাইতে থাহে। হোগার মইদ্যে ক্যামন য্যানো ঘাউয়াইতে থাহে, টেকথে দেনা একছের।
বলি, তা তো হলো, কিন্তু সেদিন কাজইয়া মিটল কীভাবে? কার্তিক একগাল হেসে বলে, হেয়া আর কী কমু, হোনেন তয়। হ্যারে ত্যাজ দেইখ্যা, মোর মাথায় ওডলে সাইদ্যের রাগ। আরে, মুই মানুডা দুফরইয়া কালে, রোদ্দুরে তাতইয়া পুড়ইয়া আইছি। কোতায় মোরে ভাত জল দিবি, এট্টু বাসাত করবি, হেয়া না। হে আরম্ভ করলে ঢপের কেত্তন। তো, জামাইবাবু, মিত্যা কমু না, আপনে মুরুব্বি মহাজন মানু। মাগিরে চুলের মুটকি ধরইয়া মারলাম দুইডা মুহি। মুহি অর্থে থাব্ড়া। বলি, তুমি, বউকে থাব্ড়া মারিলে? সে বলে, ওয়া কিছু না। ওয়া মোরা মারি। হে যাউক। তো, মুহিটুহি খাইয়া মাগি সুস্থ অইলে। হ্যারপর রান্ধলেকই মাছের ঝাল আর ভাত। খাইলাম হেয়া আইডমতন। জামাইবাবু, মাগি রান্ধে য্যানো অমের্ত্ত। কইলাম, তুইও বইয়া পড়, বেলা গেছে। পেরথমে তো বইথে চায় না। হ্যাষে মুই নলাডা ধরইয়া কইলাম, মাগি ববি তো বয়, খাবি তো খা। আর যদি বেশি বেয়াদপি কর হেলে বাশ দিয়া, হোগা দইয়া মুখ্দ্যা হান্দাইয়া দিমু বেয়াক। তয় মাগি খাইলে। তয় একতা কমু, মায় রান্দে য্যামন ত্যামন, বুইনে রান্দে পানি। ওই আবাগীর হাতের রান্দন, য্যানো চিনির পানাখানি। তো, এ অইলে হেই বেত্তান্ত। খাইয়া লইয়া মেজাজটা মোর ঠাণ্ডা অইলে। মাগিরে ডাইক্যা কইলাম–মোরে মাপ কর। তুই মোর পেরাণের পেরাণ, কইলজার আদখান। কোনো আচাইল কুচাইল করিস্না। মুই যাই। ভাদ্দশরার দিন আমু হ্যানে। তয় মাগি মোরে ছাড়লে।
কার্তিকের রকমসকমটি খুব ধীর স্থির। এত ধীরস্থির যে সময়ও যেন তার গায়ের সথে লেপটে থাকে। এগোতে পারে না। একমাত্র যাঁরা গাঁজার রসে রসিক, তাঁরা ছাড়া কেউই সময়কে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখতে পারেন না। শুকনো গাঁজা, তার আবার রস। না, গাঁজারও রস আছে বইকি। নিজের না থাকুক, যারা খায়, তাদের অভ্যন্তরে বিলক্ষণ রসক্ষরণের ক্ষমতা তার আছে। সেখানে সে রসের ভিয়েন করে। তবে সে ক্ষমতা যে গাঁজা খায় তার, না গাঁজার– এ-এক বিতর্ক। বোধকরি যে খায় তারই। আর কার্তিকের দেখা যাচ্ছে, এ ক্ষমতাটি বেশ ভালোই আছে। সে সময়কে ঝুলিয়ে রাখে তার গাঁজার সরঞ্জাম বিন্যাসের কৃৎকৌশলে। প্রক্রিয়াটি ধ্রুপদী অঙ্গের। ধ্রুপদী শিল্পনৈপুণ্য ছাড়া এমত ঋদ্ধি সম্ভব নয়। একটু ব্যাখ্যা করে কই।
প্রথমে সে বেশ আড়ম্বর করে বসার জায়গাটি ঝেড়ে পুছে সাফসুতরো করে। কাঁধ থেকে ঝোলাটি নামায়। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেটি তার পাশে রাখে। তারপর খানিকক্ষণ বার্তালাপ। মাঝে মাঝে ঝোলা থেকে কখনও কল্কে, কখনও একটি মাটির গোলক, কখনও বা খানিকটা নারকেলের ছিবড়ে– এ সব বেরোতে থাকে। এ-সব কাজগুলো সে অসামান্য ঔদাসীন্যে করে, যেন এর সাথে এই ব্যবহারিক জগতের কোনো ছন্দ নেই এবং থাকার কথাও নয়। তারপর কথা। কথা এবং নারিকেল ছিবড়ের তন্তুবিন্যাস। আবার হয়তো অমুক তমুক কোনো কাহিনী। কাহিনী কথন এবং নারিকেল তন্তুর কন্দুকাকার প্রাপ্ত হওন। এইসব। এ-সময়ে কেউ যদি তাকে নিতান্ত প্রয়োজনেও ডাকে, সে বড় বিরক্ত হয় এবং কাজের সময় ‘দিক্’ করার জন্য তাকে “তুই চুক্কর, হালার পো হালার গুষ্টি” এমত বাক্যে খামার দেয়। তার এই সমুদয় কর্মটি একটি ছন্দোগত প্রয়াস, কিংবা সাধনা বললেও বেশি বলা হয় না। যে কোনো চিন্তাশীল দর্শক শ্রোতার কাছে এ-এক চতুর্মাত্রিক চিত্রের দ্যোতনা নিয়ে প্রকাশ পায়। সে তখন যেন এক নিপুণ চিত্রকারিগর কিংবা ভাস্কর, এমনও বলা যায়। এর সাথে সাথে আবার কথা, মানে কথকতা, কিন্তু হাত সচল। নারিকেল তন্তু ততক্ষণে কন্দুকাকার প্রাপ্ত হয়ে একপাশে আত্মাহুতির অপেক্ষায়।
এইসব কৃৎকর্মের পর, কার্তিক বলবে, তয়, জামাইবাবু, আইজ্ঞা দ্যান, মুই এট্টু বাবার নাম লই। এ বিনয় এই চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলে, নিতান্ত বাপকে নল্চে আড়াল করে ছেলের তামাক খাওয়া। ছেলে এখানে বাপের সামনে “তামুক” খায় না। কেন? না, হেডা এট্টা ‘অসৈরণ’ আচরণ। তাই সে “এট্টু হোগা ঘুরাইয়া বইয়া” খায়। আগুনটা বাপের চোখে পড়া ‘বেলাহাজী’।
কার্তিক, দেখা যাচ্ছে, অসামান্য কথা-কারিগর। ‘কতায় কতায়’ সে ‘ইস্তিরির’ সাথে তার আত্মিক যোগটির আভাস দেয়। সেটি যে বেশ ‘ঘোনো’, সে-ভাব অপ্রকট থাকে না। বলে, বাবু মিথ্যা কমু না। মাগি মোর মানুডা ভালো। দোষের মইদ্যে এট্টু খরখরইয়া। কতায় কয়, যদি দ্যাহ খরখরইয়া চোপা, এক পাও না বাড়াও বাপা। তয় মোর কইলম, নিয়ম উল্ডা। আলুনি মাইয়া মাইনসের মুই দক পাই না। ওই যে একপদ আছে না, রাও নাই, শব্দ নাই, আহালডার ধারে খালি ঘডর ঘডর আর বচ্ছরান্তে পোলা মাইয়া বিয়ানো,–হেয়া মোর পছন্দ না। হ্যারগো না আছে ঢক্পদ, না আছে কোনো আইড গাইড। ওয়া মোর চলবে না। মোর ইস্তিরিহান, জামাইবাবু, য্যামন দ্যাখতে, হ্যামন হ্যার ত্যাজ। আমি জানতি চাই– কীরকম কীরকম? সে কি খুব মারকুটে নাকি? সে বলে, ওই যে কইলাম, বাড়ি যাইয়া রহম সহম দেইক্যা মুহি মারছি গোডা দুই, তো, আপনে কি ভাবছেন খালি মুই-ই মারছি? না, হ্যায়ও ছাড়ে নায়। হ্যায়ও মোরে চুলের মুটকি ধরইয়া কিলায়েছে পছন্দ মতন। কিলাকিলি যখন শ্যাষ, তহনই তো যাইয়া রান্ধলে।
আমি কার্তিককে বোধহয় অসম্ভব ভালোবেসে ফেলেছি। অসামান্য মানুষ। বীজমানুষ বললে ভুল হয় না। জিজ্ঞেস করি, তোমরা এরকম কর? ভালো লাগে? সে বলে, হ। কয় বোলে ভাল লাগে। কতায় কয়, হাচা কতা কমু ল্যাংডা অইয়া যামু। মোগো দ্যাহেন, চাইরদারে বেয়াক লেপা পোছা। মোর ওই মাগিই যা। আর ওই মাগির মুই যেডুক। ভগবান মাইন্সেরে কত পোলাপান দে, মোগো দে নায়। মোরা ঘরে বাইরে দুই জোন। হ্যার লইগ্যা, গুঁতাগুতি করি, চুলাচুলি করি, আর যাই করি, দুই জোনে দুই জোনারে ভালোতো পাই পেরানের থিহা বেশি।
কথায় কথায় ছিলিম সাজানো শেষ। কল্কেটি নির্দিষ্ট মুদ্রায় ধরে শূন্যের উপর কাকে যেন নিবেদন করে সে। চোখ দুটি বোজা। মুখে ধ্বনি, জয়বাবা ত্রিনাথ, জয়বাবা বুড়ানাথ, জয়বাবা ভোলানাথ ইত্যাদি। ধ্বনি বাবার জন্যে, না সাগরেদদের জন্য বোঝা ভার। কেননা, ধ্বনি শুনে বাবা আসেন না, আসে সাগরেদরা। পেসাদ পাওয়ার জন্য। কার্তিক বলে, দ্যাহেন জামাইবাবু, দ্যাহেন, চুৎমারানির পোয়গো ভক্তিডা একবার দ্যাহেন। এত্ক্ষুণ যে মুই ভাড়উয়ার পোয় আছি না মরছি, খাইছি, না খাই নায়, হেয়ারনি কেউ তালাস লইছে? এহন দ্যাহেন, বেয়াক হালারপো হালার গুষ্টিরা আইয়া এক্কেরে আহ্লাদে হোগাভুত অইয়া বইয়া পড়ছে। য্যান্ মুই, কার্তিক্ইয়া, হ্যারগো, হালাবউর দেওর।
কথাও মিথ্যে নয়। কার্তিক এতক্ষণ ধরে আমার সাথে গল্পগাছা করছে। কেউ তখন ইদিক পানে আসেনি। আশপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দু-একজনের মুখে কিছু স-ইঙ্গিত হাসিও দেখেছি। ভাবখানা এরকম, ক্যামন একখান বাঁশ দুলাভাইর সোগায় দিলাম। আমার অবশ্য তাকে বাঁশ বলে মনে হয়নি। তার সাহচর্য বড় উপভোগ্যই বোধ হচ্ছিল। এখন কিন্তু সেইসব রগড়কারীরা এসে ‘পেসাদ’ প্রত্যাশী কার্তিকের কাছে।
সময় এখানে বড়ই ধীরস্থির, এ-কথা আগেই বলেছি। এই শ্লথতা আমার অপরিচিত নয়। মাঝের কিছুকালের নগরজীবনের কারণে একটু খেইহারা হয়েছি বই তো নয়। কিন্তু তা রস সম্ভোগে ব্যাঘাত ঘটায়নি। খলিল বলে, দুলাভাই, ও হালার কতা হোনবেন না। মোরা অর ধারে এতক্ষুণ যে আই নায়, হ্যার এট্টা সোমাচার আছে। ও গাজামারানির পোয় রাগ অইছে। এ্যারা হ্যার কিছু জানে না, মুই জানি। তয় মুই এতক্ষুণে কই নায় ক্যান? না, ডরে। ও যা মানু, যুদি একবার চ্যাতে, হেলে ঢাক, ঢোল, সানাই বেয়াক লইয়া হ্যানে রওনা দেবে। হ্যার লইগ্যা ভাবলাম, রাগডা এট্টু পড়ুক। তহন হ্যানে বেয়াকে মিড্মাড করইয়া ফ্যালামু।
একটি সমবেত আলোড়ন ওঠে আশেপাশে। কার্তিকইয়া রাগ অইছে ক্যান, অ্যাঁ? হে এট্টা মাইন্য গইন্য অতিথ মানুষ। মোগো এক কথায় কাইল দুই শো ট্যাহারগাজা লইয়া আইছে। এহানের ঢাকঢোল বেয়াক হ্যার, কোন হোগামারানির পোয় হ্যারে চ্যাতাইছে, অ্যাঁ? খলিল কিছু ভেঙে বলে না। কার্তিককে শুধোই। কী ব্যাপার কার্তিক ভাই, তুমি রাগ করেছ?
– হ। সে যথেষ্ট গম্ভীর এখন, লঘুতার নামগন্ধও তার চোখে মুখে নেই। মুশকিল, আবার বিচার আচার শুরু হবে নাকি। সে খানিকক্ষণ বাদে নিজেই বলে যে ‘কেলারিওনেটইয়া’ অর্থাৎ ক্লারিওনেটওয়ালা নাকি বলেছে যে কার্তিক সানাইয়ের স-ও জানে না। এর থেকে অসম্মানের আর কী থাকতে পারে। সে বলে, দ্যাহেন জামাইবাবু, মুই উডানি, মাসকি, বিয়া, অন্নপেরাশন থিহা রয়ানি, মালসি, কেত্তন, জারিসারি, মারফতি বেয়াকতাতে আইজ তিরিশ বছরের উফার বাজাইতে আছি। তুই ব্যাডা কাইলগো পোলা, তুই মোরে সানাই শেহাও। তোরে ঠ্যাংগে এহনও লোম ওডে নায়। হে কারণ, মুই রাগ অইছি, কইয়া দিছি মুই আর বাজামু না। এ-এক বিপদ, এমন একজন গুণী লোকের বাজনা না শুনলে তো সব আনন্দ মাটি।
অতএব উপস্থিত যবন মালাউন সবাই মহা উত্তেজিত। ডাক কেলারিওনেটইয়ারে। ও হালার পো হালায় ভাবছেডা কী? লইয়ায় হারামজাদারে। সবাই তখন ক্লারিওনেট শিল্পীকে প্রায় পাঁজা-কোলা করে এনে কার্তিকের পায়ের কাছে বসিয়ে দেয়। সে ব্যাপারটি বোঝে এবং সামান্যতম সময়ও নষ্ট না করে দুহাতে কার্তিকের পা জড়িয়ে ধরে বলে, মোরে খ্যামা করইয়া দ্যাও। তুমি মোর গুরু। মুই বাজনার বালও জানি না।কার্তিক স্বভাবে আশুতোষ। সে বরাভয় মুদ্রায় তাকে আশ্বস্ত করে। বলে, রোজ বেয়ানে উডইয়া, পুব দিগে মুখ করইয়া খাড়বি। আর গরম গরম আধপোয়া ঘাডি ঘি খাবি। এক বছর যদি এরহম করতে পার তয় গিয়া কেলারিওনেট বাজানের দোম পাবি। এয়া শাস্তরের কতা, ফাইজলামি না। আর গাজা যুদি খাও ইষ্টনাম লইয়া হ্যারে শোধন করইয়া খাবি। এই কইয়া দেলাম, কতাডা মনে রাহিস। এহন যা বেয়াকে কামে যা।
সবাই চলে যেতে কার্তিক আবার পূর্বভাবে ফিরে আসে। আবার সেই আগের প্রক্রিয়ায় গাঁজা সাজানো হয়। গল্প চলতে থাকে। কার্তিক দেখছি খলিলের খুব গুণগ্রাহী। বলে, এইগুলোর মইদ্যে, বোজজেন নি, খলিল ঠাহুর অইল এট্টা মাইন্সের ল্যাহান মানুষ। বাহিগুলান বাহুত্রা। জিগ্যেস করি, খলিল তো মুসলমান, ওকে সবাই ঠাকুর বলে কেন?
ও হেয়া বুজি জানেন না। হে বড় রগড়ের কতা।
কীরকম, কীরকম?
তয় হোনেন, মা-য় (অর্থাৎ রায়গিন্নি) তো এগন বুড়া অইছে। য্যাদ্দিন হাতরথ আছেলে, তহন হেনায় দশহাতে ভগবতী। কোনো দিগে কোনো ডিরুডি দ্যাহে নায় কেউ। দুইশো আড়াইশো মাইন্সের রান্ধন এক হাতে রান্ধইয়া খাওয়াইতেন। এহন কি হেয়া পারেন? এহন পোলার বউরা আইছে, হে তো দ্যাহেন এহেক জোন পোকছাও। দশ নম্বরি ড্যাগ আহালের থিহা লামাইতে হ্যারেগো মাজা বেক্কুরা (বেঁকা)। এইসব দেইখ্যা পোলারা কইলে, অইছে বাওন কাশি যাওন, খল্ইয়া তুই দ্যাখ, কিছু করণ যায় কিনা। মানুষগুলান পূজা-গোণ্ডার দিন, না খাইয়া থাকপে? তো হেই অইলে আরাম্ব।
আমি এবার ধন্দে। মুসলমানের ছেলে, যাকে বলে যবনপুত্র। সে হিন্দু বাড়ির বলির পাঁঠার মাংস রাঁধবে, বিনা পিঁয়াজে, হিং দিয়ে। সবাই সার বেঁধে বসে তা খাবে আর তারিফ করবে, এ বড় বিস্ময়। কার্তিক বলে, জামাইবাবু, মিত্যা কমু না, খল্ইয়া বলির পাডাডা প্যাজছাড়া যা রান্দে, হেয়া, কোনো চুৎমারানির পো বাওনের খ্যাম্তা নাই যে ওই সোয়াদে বানায়। মাথারিগো কতা গো তো ছাড়ইয়াই দেলাম। এর উপর সার্টিফিকেট হয় না। এসব সংবাদে আমার হিসেবে গণ্ডগোল হয়। জিজ্ঞেস করি, কার্তিক, এ নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না?
–সোমোস্যা? সোমোস্যা কীয়ের? ও আপনে কইতে আছন, খল্ইয়া মুসলমান, হ্যার লইগ্যা? না এহন আর অয় না। পেরথম পেরথম অইতে। তহন দুইচাইর জোন, বুড়া ধুরা, এই য্যামন মোগো গোসাই আশন, হ্যারা প্যাখ্না ধরছেলে। তহন খল্ইয়া কয়, হোনো বেয়াকে, এই পূজার কয়দিন শয়ে-শয়ে মানুষ আইতাছে, খাইতাছে, হ্যার কোনো সোমায় অসোমায় নাই। মোগো মায় এহন আর পারে না। হ্যার বয়স অইছে। বউগুলো ইট্টুহানে ইট্টুহানে পোকছাও। এহন থিহা এই খল্ইয়া যা পারে করবে। মুই ঠাহুর থাহি আর শ্যাখ থাহি, মুইই রান্দুম। য্যার খাইতে অয় খাবা, না খাইতে অয় সোগা মারাও যাইয়া। তো হেইর থিহা হে মোরগো খল্ইয়া ঠাহুর।
কথা নেহাৎ মিথ্যে নয়। দেখছি তো। পুজো উপলক্ষে কাঁহা কাঁহা মুল্লুক থেকে লোক আসছে তো আসছেই। গ্রামের প্রতিবেশী হিন্দু মুসলমান যাঁরা আছেন তাঁরা তো বটেই, পুরুষানুক্রমে যাদের লাঠি ল্যাজার জোরে রায়েদের প্রতাপ, সেই পাইক, বরকন্দাজ, নগ্দী, কাহার, ভাত্উয়া, বারমাস্যা, রাখাল হাল্ইয়া, ধোপা নাপিত, প্রত্যেকেরই তো বংশধরেরা নেহাৎ কম নয়। আছে আইশ্যজোন, পইশ্যজোন, আছে থানার দারোগাসায়েব আর তাঁর ‘কাচা খাউগ্যা’ ‘কনেষ্ঠবল’ ধুরন্ধরেরা। আছে স্বম্বচ্ছরের ক্যারায়া নাওয়ের মাঝিরা। আর আছে যারা পরবাইস্যা। পরবাইস্যা? হ্যাঁ, ওই যারা “খরার সোমায়” অর্থাৎ শীতের শেষে মাটি কাটতে আসে দক্ষিণ অঞ্চল থেকে, তারা।
মনে পড়ে বাল্যকৈশোরের সামাজিক আচার-বিচারের কথা। তখন এই চন্দ্রদ্বীপ পরগণার প্রত্যন্ত গ্রামে যবনপুত্রদের পাকশাল দূরঅস্ত, ‘হাইত্না’ বা ‘ডোয়ার’ অর্থাৎ আঙ্গিনার উপরে ওঠারও অধিকার ছিল না। এমনকী পাকিস্তান বা, যেমন বলা হতো তখন, পাক্ইস্তান, যখন জবরদস্ত জঙ্গী রাষ্ট্র এবং তথাকার হিন্দুরা যখন নিতান্ত দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, তখনও দেখেছি, শ্যাহেরা, উডানে উবা আডু অইয়া বয়’। যদি কখনও কেউ কাঞ্চন কৌলিন্যে ‘হাইত্না’ অর্থাৎ বারান্দা বা বসার ঘর অবধি প্রবেশাধিকার পেত,–তো সে চলে যাবার সাথে সাথেই গোময়াদির সংস্কারে, সেইসব স্থানকে পূতকরণ অবশ্য কর্তব্য ছিল। কেননা হিন্দু গৃহস্থগণ, চিরকাল একটি প্রবাদবাক্যে বিশ্বস্ত থাকতে অভ্যস্ত ছিল। সে প্রবাদবাক্যটি এমত
শ্যাহের লগে করবা দোস্তি
মুগইর রাখপা মইদ্যস্তি
যদি শ্যাখ রোহে
মুগইর মারবা কোহে।
দুটি শব্দের নির্গলিতার্থ বিশদ না হলে, পাঠক, এ পাথারে থই পাবেন না। ‘রোহে’ অর্থে ‘রোখে’ বা ক্রুদ্ধ হয় এবং ‘কাহে’ অর্থে কাঁখে বা কাঁকালে। ‘মুগইর’ কথাটির তত্ত্বপ্রকাশ করতে গিয়ে পাঠকের স্বাভাবিক পাণ্ডিত্যের প্রতি কটাক্ষ করতে চাই না।
এসব শুদ্ধাচার কিন্তু আপৎকালে শিথিল। তখন শাস্ত্রবাক্যে আঁতুড়ে নিয়মো নাস্তি। অতি শৈশবের একটি ঘটনা মনে পড়ে। বাড়িতে একজন বোবা মুনিষ ছিল– জাত্যাংশে মুসলমান। তার নাম বোবা। আমরা সবাই তাকে ডাকতাম বোবা বলেই। সে থাকত গোয়ালঘরে, কাজ-কাম করত ‘বাইর বাড়িতে’ এবং খেত ‘ছাইচ’-এ বসে। ছাইচ মানে ‘আদার’ অর্থাৎ ওশ্যা ঘরের পিছাড়া। সে থাক গে। এই বোবা একদিন বুঝতে ভুল করে ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়েছিল। আরে ডাকাতি! বাড়িশুদ্ধ চাকর বাওন অতিথ অইব্যাগত সবাই চিক্কৈর দিয়া এক হুলুস্থুলু কাণ্ড। বোবাকে এই মারে তো ওই মারে। ‘হালার পো হালা, শ্যাহের গুষ্টি শ্যাখ, তোর এ্যাত্তোবড় সাহস, ঠাহুর ঘরে ঢোহো। জাইত্মান কিছু থাকলে না হালাগো দ্যাশে থাইক্যা। কিন্তু যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সেই বোবা তখন তার নিজস্ব ঘোরটোপের আড়ালে, সেখানে তার বোবা আত্মজনেরা চারপাশে ব্যূহ রচনা করে তাকে অভয় দিচ্ছে। তাদের কারুর নাম লালী, কেউ সুশীলা, কেউ-বা মধুমঙ্গল বা কুন্দ। তাদের মধ্যে বোবা বেতসের মতো কাঁপছে। সে আর সেদিন খেল না ঠিকই, তবে সেদিনের আহার বন্ধ করা হয়েছিল শাস্তি হিসেবে। সে কিন্তু মধুমঙ্গল, কুন্দ ইত্যাদিদের আহারদানে বিরত থাকেনি।
এর কিছুকাল পরে এক ভিন্নতর ঘটনায় এই বোবাই প্রায় বাপের ঠাকুর হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল।
এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় শুয়েছিলাম বাবার খাটে। বাবা কাছারিবাড়ির বৈঠকখানায় কোনো কাজে ব্যস্ত। কী জন্যে, যেন পালঙ্ক থেকে নামতে গিয়ে দেখলাম– বাবার খড়মজোড়া সাধারণত যেখানে থাকে, সেখানেই রয়েছে। ভেতর-বাড়িতে যখন থাকতেন তখন পালঙ্কের উপরেই বসে থাকতেন। খড়মজোড়া পালঙ্কের নীচে মাঝামাঝি স্থানে থাকত। এখন বাবা বৈঠকখানায় এবং খড়ম বাড়িতে, এমত একটি ঘটনায় যে এ্যাম্বিগুইটির সৃষ্টি হলো, তা আমার জ্বারোত্তপ্ত মাথায়ও যথেষ্ট ভীতির সঞ্চার করল। নেই ভীতি দ্বিগুণ মাত্রা পায় যখন দেখা যায় যে খড়ম আদৌ খড়ম নয়। ইহ রজ্জুতে সর্পভ্রম। সামান্য পাদস্পর্শে খড়ম সফণা সর্প হয়ে দৃশ্যমান হয়, আর তা আক্ষরিক অর্থে। এরপরের চিত্রটি যে রকম হওয়া উচিত, সেরকমই। অর্থাৎ, এ অধম কর্তৃক আর্তচিৎকারসহ তার সর্ম্পূণ দেহকাণ্ডটি পালঙ্কের প্রত্যন্ত গর্ভে কণ্ডুয়নকরণ, সর্প কর্তৃক ফোঁস ফোঁস করণ, ঘরের দুই দিকের দরজার কাছে আতঙ্কিতা মা ঠাকুমা, জেঠিমা এবং বিধবা পিসিমাদের হাইহুইকরণ, সর্পের নটু নড়নচড়ন এবং শুধুমাত্র দোলন। এইসব চিত্রময়তার মধ্যে সম্প্রতি বৃদ্ধা, বালবিধবা, পিত-পিসিমাতার অসামান্য চান্দ্রদ্বীপি উচ্চারণে আস্তীকস্য মুণের্মাতা, ভগিনী বাসুকীস্তথা ইত্যাদি মন্ত্রের জাড্যাপহ উচ্চারণে আবৃত্তি, আর বাইরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সেই বোবার ল্যাজা অর্থাৎ সড়কি হাতে এগোনো-পেছোনো। বয়স যখন বিচার বিবেচনা করার স্তরে তখন বুঝেছি, অস্ত্র হতে থাকা সত্ত্বেও বোবার অত এগোনো-পেছোনো কেন। নিশ্চয় সে তখন তার অভিজ্ঞতা মোতাবেক, এক ধর্মসংকটে পতিত। সে যবনপুত্র। তার অন্দরে প্রবেশ নিষেধ। ইদানীং যে ঘটনা ঘটে গেছে, তারপর কোনোক্রমেই সে ভরসা পাচ্ছে না যে সর্পসংহারের জন্যেও অন্তত, যবনপুত্র হিন্দুর ঘরে প্রবেশ করতে পারে। ওদিকে মা, জেঠি, পিসি ইত্যাদিরা বলে যাচ্ছেন, ওরে ব্যাডা, তুই ঘরে ঢোক। ঢুইক্যা আগে সাপটারে মার, পোলাডা বাচুক। কিন্তু বোবারা সাধারণত বধির হয় বলে, সে এর কিছুই শুনতে পায় না। সে শুধু পরম্পরাগত প্রভুভক্তিপরায়ণতায় দ্বার রক্ষা করে যায়। তার চোখ এখন সর্পের দিকে নিবদ্ধ। ল্যাজার ফলাখানা হ্যারিকেনের আলায় ঝিলিক দিচ্ছে। বোবা হয়তো ভাবছে, এই যে হাপ, হালারহাপ, হে যদি বাবুর পোলারে ডংশায়, তয় হের করণীয় কী? হেকি চৌকাঠ পার অইবে, না বাইরের থিহাই হাপের গুষ্টির ফলনাতা হরবে।
কিন্তু চূড়ান্ত নির্দেশের অধিকারী যারা তারা তো তখন কাছারিবাড়িতে। তাই বোবা তার অস্ত্র লক্ষ্যে স্থির রেখে দোদুল্যমান থাকে। এমত সময় ছোটোবাবু আসেন এবং ঘটনার আকস্মিকতায়, স্নায়ুদৌর্বল্যে তোতলাতে থাকেন। বোবা তখন একমাত্র উদ্ধারকর্তা মসিহ্। তিনি বাইরে থেকে বোবাকে এক ধাক্কায় ভিতরে ঠেলে দেন। সে অবশ্য তার ল্যাজার যথোচিত প্রয়োগে সর্পকে পঞ্চত্ব পাওয়ায়।
কিন্তু তার দুই চোখে সেদিন যে অপার বিস্ময় দেখেছিলাম, তা আজও ভুলিনি। সে বোধ হয় ভাবছিল, হিন্দুগো ঘরে তয় ঢোহন যায়, যহন হেহানে হাপ ঢোহে।
