সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৬
ছয়
“বেরাম বেড়ে অগাধ পানি, তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে।” ফকিরের গানটি এখন চলমান ট্রলারে আমার মাথার মধ্যে যেন আরও বেশি সুরেলা এবং অর্থবহ মনে হচ্ছে। ফকির আরও গেয়েছিলেন নোনা জলে ভাসাইলি রে তোর সোনার বজ্রাখান। এ তরী জীর্ণ হবে কে সামলাবে, ডাকবে যেদিন হড়পা বান।
এখন যে নদী দিয়ে আমার সোনার বজরাখানা ভেসে চলেছে, অনেক রক্ত, অশ্রু, ঘামে তার জল তো নোনা বটেই। ফকিরের গানের দেহতত্ত্বাশ্রয়ী দর্শনের কথা বাদ দিলেও এই নদী, ট্রলার এবং আমার বর্তমান সত্ত্বাকে ঘিরে গানগুলির প্রতিটি কলি যেন অন্য অর্থে অর্থবহ হয়, অনুভূতিতে মোচড় লাগে।
হুলারহাট পেরিয়ে এসেছি। ড্ড্ড্ড্ আওয়াজ করে আমার সাধের বজরাখানা চলেছে সিদ্ধিগঞ্জের মোকামের শেষ ঘাটের দিকে। ট্রলারকে বজরা বলায় দোষ নেই। শব্দটির মধ্যে যতই বাঙালি বাবুয়ানির উনিশ শতকীয় নস্টালজিয়া থাকুক, তার ঔরসদাতা ইংরেজি বার্জ শব্দটি। কিন্তু হায়, বাংলাদেশে কি এখন আর একটিও বজরা আছে? তালুকদারদের নাতি-নাতকুড় থেকে শুরু করে ঢাকার নবাবজাদাদের আখরী আওলাদ্ তক্ কারোরই নেই। কিন্তু বার্জের অধিপত্য এখন বাংলাদেশে অসুমার। তা সে থাক্গে, যার নাম বজরা, সে-ই মোটরযুক্ত হলে বার্জ হয়। নামে কী আাসে যায়। তা সোনার বজরা আমার এখন নোনাজল কেটে পাড়ি দিচ্ছে কচানদীর বুক চিরে। কাল শরৎ, সময় ঊষা। কচার দু-পাশের দৃশ্য এবং সামনে নদী, আকাশ আর হালকা কুয়াশার আস্তরণে মাখামাখি দেখে কাব্যি করে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। তার মধ্যে দেখো, আবার বালার্ক বিচ্ছুরণের বর্ণালী। ঋক মন্ত্রের কবিরা হলে দিব্য বর্ণনা দিতেন– শারদী ঊষা, প্রভাতের অরুণ-কিরণে ভীতাত্রস্তা কুরবীর ন্যায় অপসৃয়মাণা। বৈদিক ভাষার গাম্ভীর্যে তা নিশ্চয় আরও কাব্যময় শোনাত। কচার দু-পাশে, বিস্তৃতি হেতু, নিকট নয়, তথাচ দৃশ্যমান বৃক্ষেরা আবাল্য পরিচিত, তাই ভালবাসার সামগ্রী। অসম্ভব সব স্বপ্ন তাদের পাতায় মাখানো রয়েছে। শিশিরের সাথে তা টুপটুপ করে খসে পড়ছে। সেইসব গাছেরা ফিসফিস করে এখন আমাকে ডেকে বলছে– কেডা যাও? নাওহান লাগাও ঘোর শেহড়ে। দুদণ্ড জিরাইয়া যাও। নদী এইসব স্বপ্নসম্ভব কথা পৌঁছে দেয় আমার কানে।
দশে ধম্মে বলে, এত আবেগ ভালো না। তা ভালো মন্দ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমরা চন্দ্রদ্বীপজ বাঙাল। আমাদের নৈসর্গিক পরিবেশ, বিশাল বিস্তার, দিঘি, নদী, খাল, পুকুর, ধানক্ষেত আমাদের যেমনটি করে তৈরি করেছে, আমরা তেমনটি হয়েছি। তারা আমাদের রক্তমাংস-হাড়মজ্জায় এইসব ঢুকিয়ে দিয়েছে। দু দিনের নাগরিকতায় তোড়ে আমাদের এই আহ্লাদের আবেগটুকু ভাসিয়ে দিতে পারি না।
এইসব দৃশ্যদেখে, এই গন্ধ মেখেই তো আমরা ডাঙরটি হয়েছি। আর এই বিশাল বিস্তার শস্যক্ষেতের প্রান্ত আকাশের সাথে নির্লজ্জ ঢলাঢলিতে মেলামেশা করে বলেই না আমাদের কবি সাহিত্যিকেরা তা নিয়ে আদিরস কাব্যি করেন।
ভুলা অর্থাৎ কাশঝাড়ে, বা হোগলা, পাইত্রার ঝোপে যখন বাতাস আউলঝাউল করে– তখন আমাদের আউল, বাউল, দরবেশে ফকিরেরাও গান বান্ধেন ধোঁয়াটে ভাষায়, য্যাতে এ্যাও হয় অও হয়। যেমন, এই গানহান। শুইন্যা লয়েন, শুইন্যা লয়েন, মোর দেহান্তের পর এইসব আর ক্যাও শুনাইবে না।
–আয় আহা আহা আহারে
নিদয়া যৈবন বিদি ক্যানো দিলা আমারে
(আহা) নিষ্করুণ ভাদ্দর-আশ্বিন মাস বড় ভারী
খালের চরে নদীর চরে মেন্উয়া মাছের সারি।
আহা মেন্উয়া মাছের সারি।
মেনী চায় মেন্উয়ার দিকে মেনীর পরাণ কান্দে।
তাই না দেইখ্যা মেন্উয়া দ্যাহ গভীর গত্তে হান্দে।
আহারে নিদয়া বিদি পরাণ জ্বলাইয়া যায়
হদের মইদ্যে মেন্উয়া খালি ফাক্কুৎ ফাক্কুৎ চায়।
হোগলা বনে হুলাহুলি করে পুবাল বাও
পিরিত করবা যদি মেন্উয়া হদের বাইরে আও।
পুবালিয়া বাও জানে হোগলা ভুলার রীত।
তুমি ক্যান জান না মেন্উয়া মেনীরও পিরিত।
আয় আহা আহা আহারে।
এখন এইসব পদবন্ধ বা শব্দের যদি টীকা দিতে হয়, তবে তা বড় পণ্ডিতি কাঁটায় কন্টকিত হবে। আমি পণ্ডিত নই। আমি এখন কালীগঙ্গায় ভাসমান এক কাষ্ঠবাঙাল, যে বহুকাল কইলকাতায় প্রবাসী থেকে, কপালজোরে আপন সিদ্ধিগঞ্জের মোকামের পথে। দ্যাশের পথ য্যারে কয়। আবার আমার এ দ্যাশ, যে সে দ্যাশ নয়। এ্যার নাম বরিশাল, বাকেরগঞ্জ, বাকলা, চন্দ্রদ্বীপ। এককালে এ্যার একটা রাজধানীও ছিল। কউক দেহি অইন্য কোনো জেলার পুঙ্গির ভাই কেউ, হ্যাগোও এমন আল্হে? আমাদের চন্দ্রদ্বীপের প্রথম রাজধানী ছিল কচুয়া, অতঃপর মাধবপাশা। এখন কইলকাতায় গিয়ে যদি আমরা সেখানকার হালুম হলুম কথা শিখে তাবৎ সাহিত্যাদি পাঠ তথা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি, তবে আমার এই উপভাষাটির তথা তন্নিহিত শব্দাবলীর প্রয়োগবিধির টীকাটিপ্পনী কেন দিতে হবে, তা আমার বোধগম্য নয়। ইংরেজি, ফরাসি, রুশ ইত্যাকার ভাষায় রচিত সাহিত্যে যখন সেখানকার লোকভাষা প্রযুক্ত হয়, তখন কি তাঁরা টীকাটিপ্পনি দিয়ে দেন? টমাস হার্ডির কথাই যদি ধরা যায়, তো জিজ্ঞেস করি, কেউ কি ওই দেশের দক্ষিণ সমুদ্রতটের অপভাষার টীকা জেনে উক্ত লেখকের রচনা পাঠ করেন? তবে?
তব্ে মেন্উয়া সম্পর্কে কথঞ্চিৎ কথকতা না করলে নাগরিক শীলিত পাঠকচিত্তে কিছু উলঝন পয়দা হতে পারে। কথকতার প্রাক্কালে একটি বরিশালি কহবৎ কহি। “হায়রে মেন্উয়া হায়, আর যাবানি রামঠাহুরের নায়। রাম ঠাহুরের নায়তে মেন্উয়া কত কষ্ট পাবি, গড়াইতে গড়াইতে মেন্উয়া খালে পড়ইয়া যাবি।” তা একহবতে মেন্উয়া, প্রায় তামাম বাঙালি সমাজের প্রতিভূ। বাঙালিরা যখনই কোনো রাম ঠাহুরের নাওতে গিয়ে উঠেছে, ততবারই তারা খালে পড়েছে। অবশেষে খাল বা নদীর চড়াই তাদের একমাত্র আশ্রয় হয়েছে, তা যেমন মেন্উয়াদের, তেমনই বাঙালিদের। বিশেষত চন্দ্রদ্বীপ-পুত্রদের তো বটেই।
মেন্উয়া একপ্রকার উভচর। ক্ষুদ্রাকৃতি। সামনে দুখানা হাত আছে। যখন খালের চরায় তারা হাত দুটি জোড় করে গর্তের সামনে বসে থাকে– বড় অসহায় লাগে তাদের। বড় ভিতু সম্প্রদায়ের প্রাণী এরা। সামান্যতম শব্দ বা চাঞ্চল্যে এরা জলের উপর দিয়ে ছর্ ছর্ ছর্ করে ছুটতে থাকে। ভারী ভালো লাগে তখন। এ কারণেই কি মানুষেরা তাদের মারে না বা খায়ও না। মেন্উয়া শব্দটি যে মীন শব্দটি থেকে এসেছে, অথবা মেন্উয়া শব্দটিই যে মীন শব্দটির জনক –এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। শব্দাবলী, বড় চতুরতায় অসংস্কৃত থেকে সংস্কৃতে বা অনার্যত্ব থেকে আর্যত্বে বিকশিত। আমাদের আইনপ্রণেতা মনু, বৈবস্বত না সাবর্ণিক বলা মুশকিল, যে নারায়ণ-রূপী মেন্উয়ারই সাক্ষাৎ প্রলয়ের প্রাক্কালে পেয়েছিলেন, এ-কথা চন্দ্রদ্বীপের ল্যাংডা ছাওয়ালডা পর্যন্ত জানে। হযরত নূহর কেচ্ছাও তো এ বিষয়ে অজানা নয়, অজানা নয় গিলগামেশ বৃত্তান্ত। বিশ্বাস না হয়, এইসব পুরাণের কিস্সার কথা বরিশালের কহবতের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন।
ট্রলার, থুক্কুরি, বজরাখানা, কখন যেন কচা ছাড়িয়ে কালীগঙ্গায় পড়েছে। চলেছে তা কিনার ঘেঁষে। সকালের রোদ্দুরে, চড়ায় মেন্উয়াদের দৌড়োদৌড়ি দেখছি। এর মধ্যে মেনী কারা? মেন্উয়াই-বা কারা? বুঝতে পারছি না তো? ওরা কি একে অন্যকে পিরিত করার জন্য ডাকছে? কিন্তু একদল যেমন হুড়োহুড়ি করে গর্তে সেঁধুচ্ছে, ততে মনে হচ্ছে, ওরাই মেন্উয়া, কারণ ওদের ভয়বোধ প্রবল। তবে ও ভয়বোধ যে শুধুমাত্র ট্রলারের শব্দে এমত বোধ হচ্ছে না। এর পেছনে অন্য কারণও আছে বলে সন্দ। ঢং, পিরিত করতে এত শরমের কী আছে?
