সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১৮
আঠারো
অশ্বিনী মাস্টার কার্তিকদের এলাকার একমাত্র শিক্ষিত মানুষ। অকৃতদার, বৃদ্ধাবস্থা তখন। তখন অর্থে যখনকার কথা কাহিনী ছোমেদ কার্তিক বলছে। সময়ের হিসেবে তা বোধহয় ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা। মাস্টারের নিজস্ব বলতে কেউ কোনোকালে হয়তো ছিল, এখন নেই। এখন অর্থাৎ, তিনি তার গোবৎস এবং শিষ্যশাবকসহ একা। যৌবনে অগ্নিমন্ত্রের সমিধবাহী ছিলেন। একসময় তাঁর বোধে বিবেকে চৈতন্য ভিন্নকথার রন তোলে। মানসিকতার নানাবিধ আপাতবিরোধিতার জন্য পথ পরিবর্তন করেন এবং তখন থেকে পুঁথিপড়া আর এই অপবর্গী মানুষের সমস্যা, বিদেশিসৃষ্ট শাসনের চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় তাঁর। দলাদলির মধ্যে না গিয়ে শান্ত নির্বিরোধ জীবনযাপনে প্রয়াসী হন। কিন্তু সাধারণ মানুষের নিয়ত সাহচর্য তাকে একান্ত জ্ঞানতাপস হওয়ার চাইতে এক অনন্য সাধারণ সমাজমনস্ক মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠা দেয়। এই অঞ্চলের তাবৎ কৈবর্ত, তাঁতি, জোলা, নট্ট এবং অন্যান্য সাধারণ হিন্দু মুসলমান মানুষের সামাজিক সমস্যাকেই তিনি তাঁর নিজের সমস্যা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু একা মানুষ, কতটা সমাধানই বা তিনি করতে পারতেন। তাতে অবশ্য তিনি কখনও হতাশ বোধ করেননি। বলতেন, কিছু পারি বা না পারি, এ্যারগো দুভ্ভোগের ভাগী তো হইতে পারি। তাঁর যা বিষয়সম্পত্তি ছিল, তা নিয়ে তিনি অবশ্যই বিলাসী জীবনযাপন করতে পারতেন অক্লেশে, করেননি। তাঁর তাবৎ সম্পত্তি মৃত্যুর আগে সাধারণের স্বার্থে উৎসর্গ করে দিয়ে গিয়েছিলেন।
কার্তিক ছোমেদরা তাই এই কথকতা-কেসসা বলতে গিয়েও তাঁকে ভোলে না। তিনি প্রকৃতই অপবর্গী এইসব জনেদের কাছের মানুষ ছিলেন।
ছোমেদের শুরু করা জারির আসর কথকতার সীমা ছাড়িয়ে পরণকথা এবং তাকেও অতিক্রম করে জীবনকথায় এসে প্রবেশ করেছে। সে কারণেই অশ্বিনী মাস্টারের কথা এসে পড়ে। কার্তিক তার কথা শেষ করে বসে পড়তে, সাময়িক বিরতি এবং যথারীতি আশ কথা-পাশ কথা- আলাপ। কার্তিক নিয়ত নির্বন্ধমতো গাঁজার সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত। অশ্বিনী মাস্টারের নানান কথা সভাজনের মধ্যে ঘুরে ফিরে আলোচনা হতে থাকে। দৌলত সরস্বতীর বিয়ে সংক্রান্ত হাঙ্গামায় তাঁর মধ্যস্থতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আলোচনা করে সবাই।
কার্তিক ছোমেদের কথন-বিশ্বের স্বরূপ আলাদা। তা শ্রুতিতে রসময়, কিন্তু অক্ষর বিন্যাসে বা শব্দবন্ধে তাকে কদাচিৎ বাঁধা যায়। সেখানে তাদের উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্য বা ভাষায় আঞ্চলিক সুর বা টান লিখনে রূপ পায় না, শ্রুতিতেই তার স্ফূর্তি এবং মুক্তি।
কার্তিক বলে, ভাইগণ, বন্ধুগণ, মুইও এহন বড় কেলান্ত। আর লাখ কতার এক কতা কই, মুই ছোমেদের ল্যাহান পারি না। ও হালার জিবের ডগায় মা সরেস্বতী পিড়ি পাতইয়া বইয়া আছেন। ওর জেব্বা (জিভ) লড়লেই মা সরেস্বতীর পিড়ি লড়ইয়া যায়। তহন ও যে কী কয়, কী বানায়, হেয়া ও নিজেও জানে না। যেমন দ্যাহেন, মুই যে এতক্ষুণ কইলাম, মোর জিবে কইলম একবারও এক লাইন পয়ার বা লাচারি আইলে না। এহন দ্যাখফেন হ্যানে, হে হালায় উড্ইয়া দাঁড়াইলেই ঘোনো বইস্যার জলের তোড়ের ল্যাহান ক্যামন সব শোলোক বাইর অইবে হ্যানে। মোর কতা ক্যারোরই বেশিক্ষুণ ভাল লাগে না। হে কারণ মুই ছোমেদ ভাইরে কই, তুমি পুনরায় আরাম্ব করো আর কতা শ্যাষ করো।
তাই ছোমেদ উঠে আবার দাঁড়ায়। বলে– কতা হত্য। কার্তিক এতক্ষুণ যা কইলে, হ্যার মইদ্যে পরণকতার হাড়গোড় আছে ঠিকোই, রক্তমাংস নাই। কতার মইদ্যে যে রসকস মাইনসেরে ভুলাইয়া রাহে, ডুবাইয়া যাহে, হ্যারেই কই মুই রক্তমাংস। আর অইন্যভাবে কইলে কমু, কতা অইলে নৌকা, মোরা য্যারে কই নাও। আইজ রাইতে হেই নাওয়ে মোগো ভাসাভাসি। আবার দ্যাহেন এই যে ‘কতা’, হেই কতা অইলে মোগো শরীল। মোগো এই শরীলের শ্যাষ পরিণামও ‘কতা’ই। তয় অনুমতি করেন, উপস্থিত পঞ্চজনা, য্যারা এহানে আছেন, তেনাগো আদাব আরজ জানাইয়া মুই পুনরায় আসর আরাম্ব করি।
ছোমেদ অসাধারণ ঋজুতায় শরীর টানটান রাখে। কাল যেন এখন তার শরীর মানস চৌহদ্দির বাইরে নিতান্ত নিমিত্তের মতো অপেক্ষমান। তার সাথে কোথায় যেন একটা গভীর অন্তর্গত মিল পাই সেই কচা, কালীগঙ্গার কিনারে ফকির সাহেবের। কিন্তু ভাষায় তা প্রকাশ করা আমার সাধ্যাতীত। বরং ছোমেদকে তার বাচনবিশ্বে মুক্তি দেওয়া ঢের ভাল। তার জবানে সে বরং বলুক। ছোমেদ বলে–
ভাইগণ বন্ধুগণ কতা দিলাম সার,
কতার নৌকোয় চড়ইয়া মোরা রাত্তির করমু পার
কতা নিত্য, কতা সত্য শরীল কতাময়
কান পাতলে শুনি বিক্ষ নদী কতা কয়।
জীয়ন্তে কতাই ধন, কতাই দৌলত
কতায়ই হায়াত বাড়ে, কতায় মৌয়াত।
কতার পরম তত্ত্ব যে জানিতে পারে
সেই জোন চিরজীবী এ ভবসংসারে।
হে কারণ জানাই, শোনো বেয়াকে, য্যারা আছ পেরাণের ভাই, কতা ছাড়া এ সংসারে আর গতি নাই। বেয়াক কিছুই কতা দিয়া ছিষ্টি। এমন যে আল্লাহ তায়ালা হ্যারেও তো কতা দিয়া বানাইছি মোরা, নাকি, কী কয়েন? নাইলে কেডা হ্যারে কোতায় দ্যাখছে? য্যানরা দ্যাখছেন, তেনরা তো কতা দিয়াই মোগো হুনাইয়া চিনাইয়া গেছেন। দ্যাহেন, আইজ মোগো দৌলত নাই। হ্যার কব্বরের তলায় হাড় কহান আছে কিনা হ্যাও সন্দ। তমো আইজ ছোমেদ কার্তিকের কতায়, কতা শরীল ক্যামন মোগো হাসাইতে আছে, কান্দাইতে আছে। তো, কতা থাউক, মোরা দৌলতের কতা কই হোনেন।
মুই আসোলেই আলেহা আপড়া। তমো এট্টা কতা কই। দৌলতের লগে মুইও মাঝে মইদ্যে অশ্বিনী মাস্টারের ধারে যাইতাম। ম্যালা কতা কইতেন হেনায় মোগোর ধারে। এট্টা কতা কইতেন, ইতিয়াস। বেয়াক কতা বোজতাম না, তয়, এডা বোজতাম যে ইতিয়াস অইলে হেই কতা, যে কতা আগে ঘডনা অইয়া গেছে। তয়, কওয়া অইয়া গেলেই তো আর হ্যার বেয়াক কিছু শ্যাষ অইয়া যায় না। বাপের কতা পোলার মনে থাহে, কহনও হেয়া কওনও লাগে। মোগো দৌলতও এহন হেই রহম ইতিয়াস। বড় মাইনসেগো, ভদ্দরলোকেগো ইতিয়াস কেতাবে ল্যাহা থাহে, মোগো ইতিয়াস থাহে না। হেয়া থাহে মোর মতো আলেহা আভোদা আপড়াগো কলিজায়। যহন এই রহম কোনো আসর গাহক পাই, তহন হেই কলিজা কচলাইয়া মোরা দৌলতেগো লইয়া জারি গাই, পরণকতা কই, কেস্সা বানাই। মোগো ইতিয়াস এয়াই। এ্যার মইদ্যে কিছু মিছু বাক্তাল্লা, বাখোয়াজি যে থাহে না হেয়া কমু না, তয় মোগো ইতিয়াস জানতে অইলে, হেইসব ছান্ইয়া ঘাড্ইয়া জানোন লাগবে। তয়, ভাইগণ, বন্ধুগণ, মুই এহন আপনেগো এট্টু ইতিহাস কমু। হে ইতিয়াস, আমাগো ইতিয়াস, দৌলত হেই ইতয়াসেরই একজোন। আপনেরা এট্টু মন লাগাইয়া হোনেন, এরা তো কেউ লেইখ্যা রাহে নায় হ্যার লইগ্যা, কইলজা কচলাইয়া হেই ইতিয়াসটুকু আপনেগো হোনাই। হোনেন আপনেরা।
রাত এখন তার দ্বিতীয়ার্ধ ঢলে পড়ছে। চারদিক নিস্তব্ধ। অতিদূরের যে ঢাক বা ঢোলকের শব্দ কিছুক্ষণ আগেও পাওয়া যাচ্ছিল। এখন তাও স্তব্ধ। এখন শুধু মাঝে মাঝে, এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে ঝোরাখালের ধারে যে প্রাচীন মঠবাড়িটি আছে সেই মঠবাড়ির মঠটিকে সম্পূর্ণ আবৃত করে একটি অশ্বত্থ বহুকাল ধরে তার দখলদারি কায়েম রেখেছে, যার কয়েক গজ দূরে একটি আরও অতি প্রাচীন কূপ রয়েছে, যে কূপের কিংবদন্তি অতলস্পর্শী, অর্থাৎ যার থই নেই। এবং কিংবদন্তি বলে যে, সেই কূপ এবং মঠের নির্মাতা রাজা সত্রাজিৎ, যাঁর কোনো অন্য হদিশ নেই, সেই অশ্বত্থ থেকে একটি দুটি বা কটি জানা নেই, পেঁচার চিৎকার শোনা যাচ্ছে শুধু, আর সেই মাঠপাড়ের উচিচংড়ের ঐকতান। দূরে কদম্বলেবু গাছটার, বাতাবি গাছটার বা ডোউয়া গাছটার সর্বাঙ্গ বেষ্টনী জোনাকির মহোল্লাস দীপাবলীও সেই সাথে বেশ অনুপম অনুষঙ্গ হয়েছে। জানি না সত্রাজিৎ নামে কোনো রাজার এখানে কোনো দিন, আমার এই আজকের রাতের মতো, কোনো অনুভব হয়েছিল কিনা। যদি না হয়ে থাকে তা তাদের দুর্ভাগ্য বলেই আমার এখন মনে হচ্ছে। আমি এখন সেই সব রাজাদের চাইতে আদৌ কোনো কম রাজা নই।
আকাশে তারারা জ্বলছে যেন অনন্ত দোহার মণ্ডলী। তারা সবাই ছোমেদ কার্তিকের আনুগত্য করছে। আমি শিকড়ে পৌঁছে মাটির রসের সন্ধান পেয়ে গেছি, আর একটু একটু করে, তারিয়ে তারিয়ে সেই রস পান করছি, যেন তা অতি দামি, পুরাতন মদ। আমার দেহ মন এখন সম্পূর্ণ, সেই মদে প্রশান্তি পাচ্ছে এখন আমার চৈতন্য।
কিন্তু ছোমেদ এখন যে সময়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষায় তার কথনকে প্রবাহিত করে সে বড় কঠিন সময়। এই সেই সময় যখন কোনো শ্রেণী তার শ্রেণীতে আবদ্ধ নয়। কোনো জাত নয় তার জাতে। তখন বাংলাদেশে মুক্তি আন্দোলন চলছে। অন্তত পত্রকারদের কথনে, রাষ্ট্রনায়কদের ভাষণে, আমরা তাই জেনেছি। তবে সেখানে আমরা এই অপবর্গী মানুষদের মৃতদেহের হিসেব ছাড়া আর কিছুই পাইনি। তখন শুনেছিলাম, এই মুক্তিযজ্ঞে নাকি সব শ্রেণীর লোক ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই অপবর্গী কথকতায় সে রকম কোনো চিত্র তো পাচ্ছি না, ভুক্তভোগী তারা অবশ্য হয়েছিল। প্রাণ দেওয়া-নেওয়া বিষয়ে একটা কথাই বলা যায়, অজ্ঞানের বলি আর সজ্ঞানের প্রতিহিংসা। তাকে কোনোভাবেই বিপ্লব বা মুক্তিযুদ্ধ বলা যায় কিনা জানি না।
এই কাহিনীতে ছোমেদ সেই বিষয়েই সোচ্চার। যেন আর পাঁচটা দুর্যোগের মতোই, খরা, বন্যা, দুর্ভিক্ষ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতোই, এই মুক্তিযুদ্ধও একটা-বা। ওতেও তারা মরে, এতেও। নচেৎ মরার লোকের তো বড় অভাব। বাবুরা ভদ্দরলোকেরা তো কদাচিৎ মরে। তবে যখন মরে, তখন বড় শোরগোল হয়, সবাই বুঝতে পারে– কেউ একটা মরেছে। অপবর্গীদের মৃত্যু অহরহ, তাই, তার একটা খবরও হয় না।
সেই সময়, ছোমেদ, কার্তিক, দৌলত, অষ্ট, সরস্বতী সবাই, আরও অনেকের সাথে এক জায়গায় ছিল। সে রকমই থাকার কথা। পাশাপাশি গ্রামের মানুষ। এ গ্রাম হিন্দু তো ও গ্রাম মুসলমান। যে গ্রামে নিকিরি, তার পাশের গ্রামে অবশ্যই জেলেরা। ইতিহাস তো এরকমই তাদের সাজিয়ে রেখেছে। তাই বিপদে যখন ‘গুঠবন্ধন’ তখন তাদের খাওয়া-দাওয়া এক, ভাবনাচিন্তা এক। তাছাড়া তো উপায় নেই।
ছোমেদ বলে, ভাইগণ, বন্দুগণ, সাদীনতা যুইদ্ধের সোমায়ের কতা কই, হোনেন, আপনেরা তো বেয়াকে জানেন যে, হে একদিন গেছে। তহন দীনের ভাইরা দীনের ভাইগো গুল্লি দে। মোছলমান হিন্দুরে কাডে, আবার মোছলমানেগোও কাডে। এহানে উপস্থিত হিন্দু মোছলমান, য্যারা য্যারা আছেন, সগলার কাছে মোর এই নিবেদন, মানুষ অইয়া থাহ সদাসব্বজন। মানুষ অইয়া যদি মানুষেরে কাডো, জানোযারের চৌক্কে তুমি অইয়া যাবা খাডো। যেবা আছো হিন্দু আর যেবা মুসলমান সগলায়ই ছোমেদ আলির কালিজার সোমান। মারামারি কাডাকাডি ভাইগণ, আমার অনেক করছি, আর থাউক। য্যার য্যার ধম্ম করতে ইচ্ছা অয় কর, মানা করি না। তয় ধম্মের নামে আর জবাই কর্ইও না। মেলেটারির গুতায় যদি ছোমেদ বয়াতির এট্টুও আক্কেল খুলইয়া থাহে, তয়, হেডা অইলে এই যে, য্যার হাতে যহন খ্যামতা, হে তহন নানান অছিলা করইয়া মোগো মারবে। হিন্দু, মোছলমান বলইয়া কোনো রেয়াৎ করবে না। খালি যে মারবে হেয়া না, মোগো হাতায় এ পাপ করাইবেও। লঙ্কায় যে যায় হেই অয় রাবণ।
এইসব কতগুলান যে মুই কইতে আছি, বুজি, হেয়ার মইদ্যে আপনেরা কোনো সোয়াদ পাইতে আছেন না। তয়, এ কতাও হাচা জানবেন যে, বেয়াক জিনিসের সোয়াদ মিডা অয় না। তিতা, চুহা, কষ্ট্যা, লোনা, মিডা কড়উয়া এই ছয় রহমের সোয়াদে য্যামন খাইদ্য, কতার সোয়াদও হে রহমই। আবার সাদীনতা যুইদ্ধের সোয়াদও মোগো ধারে হে রহমই আছেলে। তয়, মোরা এ দ্যাশে য্যামন আগে খাই তিতা, হ্যাষে মিডা, যুইদ্ধের সোমায় আগে মিডা আছেলে, হ্যাষে কেরমশো তিতা, আর হে তিতার জ্যান শ্যাষ নাই। যদি জিগায়েন, হেয়া কেমন? তো কই, কার্তিক ভাই, এট্টু সুরও লাগাও। হুগ্না কতা কইতে কইতে ওড থিহা হোগা তামাইত হুগাইয়া ঘষি। সুরের জমজম দিয়া এট্টু জবজবইয়া করি।
বাঙাল-বঙ্গীয়রা, অধিকক্ষণ গদ্যে কথা কইতে পারে না। আগেই বলেছি, তাদের শোক তাপ, সুখ, অসুখ, মিলন, বিচ্ছেদ, সবই ছন্দে হয়। ছোমেদ তাই, সুর-ছন্দ খোঁজে। সে জাতে জারিয়াল, কবিয়াল। তার তো পুরো হক্ ছন্দে-সুরে কওয়ার। আমি ভাবি, পারবে কেন? বাঙালির বিজ্ঞানসাধনাও যে পয়ারে রচিত। তার বিকাশের ধরণটিই যেন পয়ারে বিধৃত হয়ে আছে। সে কেমন? না ধরুন, শুভঙ্কর, ভাস্করাচার্য বা লীলাবতী, পাটিগণিত সূত্র কেন পয়ারে বাঁধে? বাঁধে এ কারণে, নচেৎ বাঙাল-বঙ্গীয়রা কিছুই মগজে নেয় না। যেমন, আগে বলেছি, আমাদের রসু, রসইয়ার বাপ, তাকে বর্ণপরিচয় শিখিয়েছিল পয়ারে বা কোনো এক ছন্দে। ছন্দ ছাড়া বাঙালি নেই, বাঙাল তো নেই-ই। শুভঙ্কর বলেন,
কুড়োবা কুড়োবা কুড়োবা লিজ্জে।
কাঠায় কুড়োবা, কাঠায় লিজ্জে।।
কাঠায় কাঠায় ধুল পরিমাণ।
বিশ ধুলে হয় কাঠার প্রমাণ।।
ধুল বাকি থাকে যদি কাঠা নিলে পরে।
ষোলো দিয়ে পুরে তারে তত গণ্ডা ধরে।।
অর্থাৎ, পয়ারে না কইলে, মোরা অঙ্ক করমু না, হ। এহন কেডা মোরে অঙ্ক শেহাবি শেহা– এমত বাক্য বলবে চন্দ্রদ্বীপজ ছাওয়ালেরা। প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর বিকাশের একটি নিজস্ব ধরন থাকে। বাঙালির, কিংবা বাঙাল-বাঙালির ধরণটি এই। কী আর করা যাবে! আবার লীলাবতী যখন অঙ্ক শেখান, সেও তো পয়ারে। কী? না–
একদিন চারি বুড়ি আহারে বসিয়া
বয়স গণনা কর হাসিয়া হাসিয়া
অতঃপরের শ্লোকবদ্ধ পদ, যাঁরা জানেন, তাঁদের কাছে সবিনয়ে অনুরোধ, একটু খোলসা করে বলুন তো ভাই, পয়ারের জন্য অঙ্কটা খুব সোজা বোধ হয়েছিল কি? কিন্তু বাঙালিরা এরকমই স্বভাবের, বরাবর।
সে কারণে, ছোমেদ, তার গতি নেয় পয়ারে। বলে, তয় হোনেন, হে সোমায়ের কতা।
