সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ২২
বাইশ
অষ্টমীর সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত হয় যে রাত দশটা পর্যন্ত ধুনুচি নাচ হবে। ধুনুচি নাচ না হলে ছোটোদের প্রতি খুবই অবিচার করা হবে। তারপর খাওয়াদাওয়া সেরে ছোমেদের আসর বসবে এবং চলবে রাতভর।
ঢাক, ঢোল, কাঁসি, সানাই বাজতে থাকে। দুজন করে যুবক জ্বলন্ত ধুনুচি হাতে তালে তালে নাচে। ছোটো ছোটো ছেলেরা, হিন্দু মুসলমান সবাই, আনন্দ করে, নাচে, হুড়োহুড়ি করে। হ্যাজাকের আলোয় চারদিক ঝলমল করে। দলে দলে মানুষ আসছে, যাচ্ছে, প্রসাদ নিচ্ছে। মণ্ডপে পাতা বেঞ্চিতে বসে নাচ দেখছে। এরই মধ্যে আবার প্রতিযোগিতা হয়। মুসলমান কাহারদের নাচের সাথে নমশূদ্রদের একটি দলের। এক যুবক শুধু ঢোল এবং সাথে কাঁসি নিয়ে চমৎকার বাজনার আয়োজন করে। তার সেই বাজনার তালে নাচ দেখায় দূর গ্রামান্তরের আরেক যুবক। সুঠাম দেহ। গায়ে স্যাণ্ডো গেঞ্জি। কালো কোঁদা চেহারা। ভারী বলিষ্ঠ নাচের ভঙ্গি তার। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি বেশ উপভোগ্য হয়। এর সবকিছুই আমার পরিচিত এবং আবাল্য আকাঙক্ষার বিষয়। তাই আপ্লুত লাগছে। কিন্তু উৎকীর্ণ হয়ে আছি কখন আসর বসবে, তার জন্য।
ছোমেদের এই কথকতা, যা জারিগানের নামে শুরু হয়েছিল, তা এক, দুই বা অনন্তরাত্রির আসরেও শেষ হবার নয়। এরকম জারি বা কথকতা আমার অভিজ্ঞতায় নতুন। জারি, কথকতা বা অনুরূপ লোকসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আমার কাছে কিছু অভিনব বিষয় নয়। কিন্তু ছোমেদ যা শুরু করেছে তার সাথে পরম্পরাগত ঐতিহ্যের যেন কোনো মিল নেই, আবার আছেও। ছোমেদ এক অসাধারণ ব্যাপ্তিতে এই মাধ্যমটি ব্যবহার করছে। বুঝতে পারছি না, এ কি সে সজ্ঞানেইকরছে, না কাকতলীয়! কিন্তু যেভাবেই হোক না কেন, তার চারণভূমির বিস্তৃতি বিশাল। জানি না, আরও কতদূর, ব্যাপ্তিতে সে বিচরণ করবে। কোথায়ই বা সাময়িক ছেদ টানবে তার আসরের, অথবা আদৌ কোনো ছেদ বা ইতি সে ঘটাবে কিনা। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তার ভ্রমণ– এত সহজ এবং আড়ম্বরহীন যে তাকে শিল্প হিসেবেও যেন মেনে নিতে মন চায় না, কিন্তু তার কোনো না কোনো বাঁকে তা অস্বীকারও তো করতে পারি না, কারণ সেখানে যে মন আহা আহা করে নিবিড় রসসম্ভোগে মগ্ন হয়ে পড়ে। জানি না, এ আমার একান্ত ব্যক্তিগত নস্টালজিয়ার প্রকোপ, অথবা তার শিল্পসৃষ্টির মহত্ত্ব। কিন্তু দৌলত-সরস্বতীর পরিণতির কথা তো জানতে হবে। আরতি শেষ হতে আবার গণভোজ। গল্পগুজব, পানতামাক। আসর পাতা। আবহ সৃষ্টিকারীরা চাটাইয়ের চারপাশে বসে। ঢোল, কাঁসি, সানাই। কনসার্ট। একসময় ছোমেদ তার প্রাচীন শরীরটি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতে ধুলিমুঠি নিয়ে দিগবন্দনা, করণ-কারণ সব করে। বিড়বিড় করে মন্ত্রের মতো দোহার বন্দনা করে, দাড়ি কণ্ডুয়ন করে ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় ফিরিয়ে কী সব করে এবং ভাবে গভীর হয়ে কাহিনীর পরবর্তী প্রস্তাবনা করে–
উডানে কচুরও বোন ডোয়ায় ঘোরে সাপ।
ছাইচে শিয়ালও ঘোরে কিবা পরিতাপ।।
এই ঘর গেরস্থালির মালিক ছিল কেবা।
কেবা চিল কচিকাচা ছাওয়ালেরও বাবা।।
কেবা ছিল মা মাসি দাদা কিবা দিদি।
কারও বা আছিল এ ঘর রিদয়েরও নিদি।।
কারও শাপে এই ঘর গেল ছারেখারে।
বিনা দোষে ক্যানো তারা ভাসিল পাথারে।।
উপস্থিত ভাইগণ, বন্দুরা, মা, বুইন য্যারা আছেন, এট্টু চিন্তা করইয়া কয়েন যে, মানুষ যহন হ্যার বাপদাদার ভিডায় এ্যামন দিশ্য দ্যাহে, হ্যার মনের অবস্থাডা কী অয়? মোরা যহন বাড়ি ঘর দ্যাখতে গেলাম, যাইয়া এই দিশ্য দ্যাখলাম। মোগো কপালের ল্যাহাপড়া, এইরহমই। মোরা ভিডায় থাকলেও তো এই দিশ্যই দ্যাখতে অয়, নাকি কয়েন। ঝড় বইন্যা, দেওই, পানি– এ্যার থিহাতো মোগো উদ্ধার নাই। এহন বাড়তি যেডা অইছে হেডা খালি এইগুলার লগে মেলেটারি, রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধাগো গুতা গাদানি। এইসব মিলাইয়া এট্টা আচুক্কা বাড়তি হুলুস্থুলু। নাইলে দ্যাহেন, মোগো জন্ম থিহা তো দ্যাখছি –
ঝড় অহে পানি আহে
আহে বইন্যা খরা।
ডোয়ায় পাশে কিলবিলায় সাপ
ঘরে বাসা মড়া।
মাতার উপার খ্যারের ছাউনি
পেত্থম গোত্তায় যায়।
চৌহির নীচে গরিব গুর্বা
খামার দিই আল্লায়।
আল্লামাবুদ নিব্বইংশার পুত
আল্লা খান্কির ছাও
তোমার কেরপায় হ্যারা খায় গোস
মোরা খুদের জাউ।
এয়া তো মোরগো নিত্য তিরিশ দিনের লাচারি। তো হেয়া যাউক। মোরা মোরগো বাড়ি ঘরের অবস্তা এরহমই দ্যাখলাম তহন।
বেয়াকে মিলইয়া তহন যুক্তি করলাম যে, এহানে যহন আর রাজাকার, মুক্তিযোদ্দা, খানসেনা কেউ নাই তহন মোগো বাড়িঘরে আবার মোরাই থাহি। ফের যদি আয়, তহন না হয় আবার পলামু হ্যানে। বাড়িঘরগুলার অবস্থা তহন বেয়াকে মিলইয়া ঠিকঠাক করলাম। যে য্যার বাড়িতে আইয়া ওডলামও। জোঙ্গোল মোঙ্গল সাফ ছুতরা করইয়া, সাপ, উন্দুর, শিয়াল মারইয়া ধরইয়া, চাল চোল ছাইয়া আবার গুছাইয়া বইলাম। জাল জোল সারাইলাম। চাই, বুচনই, হোচা, ছাবি বেয়াক মেরামত করইয়া আবার মাছ ধরার কামে লাগলাম। ছিডাফোডা জমি জিরাত যা আছেলে, হাল বলদ নাই, তমো কোদাল কোপাইয়া হেথে চাষবাস যদ্দুর সম্ভব করলাম। বন্দুগণ, যে কতা আগে একবার কইছি, ফের কই। মোগো এই মুক্তিযুইদ্দডার খবর কইলম শহরগঞ্জের মাইনসেরা রাহে না। তো, না রাহে না রাহুক, মোগো তো এয়া করন লাগবেই। মোরা জানি, মোগো বাপ-দাদা, পরদাদায় এইসব কাম করইয়া গ্যাছে, এ কাম থামতে পারে না। এ কাম থামলে তো সংসার চলে না। মোগোও এয়া করইয়া যাইতে অইবে। হে কারণ, জালিক দাস জাল বাইবে, হালিকদাস হাল চইবে– থামন নাই। আবার শাস্তরেও আছে–
যদি থাহে নদীতে পানি হেই পানিতে মাছ।
ও নিকিরির পো, হোগার কাফুর তুলইয়া নাচ।।
মোরা য্যারা জালিকদাস বা নিকিরি, মোগো তো ওই এক কাম। যা সুগন্দ্যা, হ্যার প্যাডের মইদ্যে মোগোর আহার জোমা করইয়া রাইখ্যা দেছেন। হাইল্যা, জিওলি, নিকিরি গো উপার সুগন্দ্যা মায়ের কেরপা দিষ্টি বরাবইর। মোর হ্যার ছাওয়াল না! এই যত নদী নালা, খাল বিল দ্যাহেন, এ্যারা ক্যারা? এ্যারা বেয়াকে মা সুগন্দ্যার পুষি পোনা না? তো মোগো খাওনের অভাব অইবে ক্যালায়? মোগো খাওনের যে অভাব, হ্যার লইগ্যা তো মায় দায়ী না। দায়ী অইলে হ্যারা, য্যারা কাড়ইয়া কুড়ইয়া বেয়াক লইয়া যায়।
এইসময় একদিন, পৌষ মাসের পয়লা কি দোসরা হবে, একদল যুবক, সবাই-ই বড়ঘরের সন্তান, এল কীর্তিপাশার বাজারে। তারা শুধু ধ্বনি দেয়– জয়বাংলা, মুজিবর রহমান জিন্দাবাদ। কী ব্যাপার? না, পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে গেছে। হিন্দুস্তান এখন আমাদের বন্ধু, আমরা সবাই স্বাধীন। এই বাংলা এখন থেকে সোনার বাংলা হবে। শেখ সাহেব, এখনও পাকিস্তানে আটক আছেন। তিনি শিগগিরই মুক্তি পেয়ে আসছেন। তিনি এলেই সব সোনার হয়ে যাবে। সে এক হইহই কাণ্ড, রইরই ব্যাপার। পোড়াবাজারে আবার নতুন ছাউনি উঠল। বাজার নতুন করে চালু হলো কীর্তিপাশায়। মানুষজন। মুক্তিফৌজের দফতর, অস্ত্র। ইস্কুল কলেজ চালু। ছাত্ররা উত্তেজিত। বাম, ডান, রাজনীতির ঝঞ্ঝা, অস্ত্র। ঝালকাঠির বন্দরের নতুন বিন্যাস। মুক্তিফৌজের দফতর, অস্ত্র। সন্ধ্যায় রাজাকার সন্দেহে ধৃতদের বিচার, নদীতীরে মারণোৎসব। অপরাধীর তালিকাভুক্তদের পরিবার থেকে মেয়ে সংগ্রহ, ভোগ, উল্লাস, হত্যা, লুণ্ঠন, মাৎস্যন্যায়। এই পরিবস্থা চলল বেশ কিছু দিন।
ছোমেদ বলে, এই সব চললে বেশ কিছুদিন। তো, মোরা ভাবি, ভাল যা, তয় এ মুক্তি যুইদ্দে মোগো কোন মুথমাডা অইলে। খালি গুল্লি খাওয়া আর খেদানির দাপট কিছুদিন থামলে। মোরা যে য্যার কামে গেলাম। আবার মাছধরা, জালবোনা, খ্যাতে কাম শুরু অইলে। কিন্তু কেরমশো দ্যাখলাম, আর চলে না। নদীখালে মাছ নাই। অনেকদিন তামাইতই নাই। পুহইর ডোয়া বেয়াক বুজইয়া গেছে। ক্যান? না, নতুন তো কিছু কেউ করে না। হারাদিন জাল খেওয়াইলে, প্যাডের ভাত যোগার হওন শক্ত।
মোগো কলমীকান্দরের জালইয়া, নিকিরিগো অবস্থা তহন সাইদ্যের খারাপ। বাজারে জিনিসপত্তরের দাম তো চড়চড় করইয়া বাড়ইয়া যাইতেই থাকলে, এদিগে মোগো আয় উশুল নাই এক পয়সার।
এর মধ্যে আবার শুরু হলো এক নতুন ঝঞ্ঝাট। যেসব মুক্তিযোদ্ধারা গোলমালের মধ্যে এদিক ওদিক ছিটকে পড়েছিল, ক্রমশ তারা এসে জুটল গ্রামে। তখন তাদের প্রতাপ কত। সবার হাতে বন্দুক। গালে দাড়ি, মাথায় লম্বা চুল। সবাই বলে, দেশ স্বাধীন করেছি আমরাই। আমরাই আসল মুক্তিবাহিনী। তখন তারা শুধু রাজাকার আর আলবদরের খোঁজ করে। খোঁজ করে কারা পাকিস্তানি খানসেনাদের মদত করেছিল। যাকে সন্দেহ করে, তাকেই মারে, খালে ভাসিয়ে দেয়। দেশে তখন আরেক অরাজকতা। তখন মুজিববাহিনী, সর্বহারা পার্টি, এ পার্টি ও পার্টি কত যে দল, তাঁর শেষ নেই। সবার হাতেই বন্দুক। সবাই মুক্তিবাহিনীর লোক। স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রায় পরপরই এইসব আরম্ভ হলো। এক দিকে অভাব, মন্দা। অন্যদিকে এই মাৎস্যন্যায়। এক দিকে অনটন, রোগশোক, অন্য দিকে মারামারি কাটাকাটি। রাত দুপুরে রাইফেল হাতে তারা আসে। দশ বিশ পঁচিশ জন এসে খাবার ফরমায়েস করে। বাড়ির হাঁস, মুরগি, ছাগল সব শেষ। যাদের অবস্থা একটু ভাল, তাদের কাছে দাবি করে টাকাপয়সা। টাকা দেও, নতুবা শেষ। কেননা, তুমি তাহলে পাকিস্তানি কোলাবোরেটর অথবা রাজাকার।
ছোমেদ বলে, তয় এসব মোগো খুব বেশিদিন সইজ্য করন লাগে নায়। নিজেরা নিজেরা মাইরপিঠ করইয়া হ্যারা ধ্বংস অইলে। আর মোরা তো দিন আনি দিন খাই, মোগো পিডাও, গুল্লি দেও, আর হোগার মইদ্যে চোতরা পাতা ঘষইয়া দিয়া উব্বুত করইয়া রাহ, মোগো আছে কোন বালডা। হে কারণ মোরা বাচইয়া গেলাম।
এই সময়ে একদিন দৌলত আর ফণী বলে, মোরা বুরজুগ আলির টলারে মাছ ধরতে যামু সাগরে আবার। এ চুৎমারানি নদী খালের র্যাত গ্যাছে মরইয়া। এ্যারগো গায়ে কুবাসাত লাগছে। তোমরা কেডা যাবা কও। অষ্ট কইলে, হে যাইবে। ঝালকাডির গঞ্জে থাহে বুরজগ আলি সাইদার, হ্যার টলার যায় সাগরে। য্যারা যায়, হ্যারা ভাল রোজগার পাতি করইয়া আয়। দিন কতক থাহে বেশ ভাল। কিন্তু য্যারা যায়, হ্যারা বেয়াকে তো ফেরে না। এ কারণ, মোগো মাগিরা একছের পছন্দ করে না যে মোরা সাগরে যাই। সাগরে যাওনের কতা ওডলেই হ্যারা এমন কুওইল দেতে আরাম্ব করে যে হেয়া আর থামে না। তহন হ্যারাগো হুস পইদ্য থাহে না কিছু। ছোমেদ আলি এখন সেই কথা বলে, যে-কথা হাজার বছরের কথা তাদের। সেই সাগরে যাওয়া। সাগরে যাওয়ার বৃত্তান্ত বড় প্রাচীন, বিশেষত এদের ক্ষেত্রে, গোটা বাঙালি জাতির ক্ষেত্রেও। কিন্তু সাগরে যাওয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য বাঙালির জীবনে এক সময়ে লোপ পেয়েছে। নানা কারণে বাঙালি বণিকেরা দ্বীপজগৎ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ঘরকুনো বদনাম কুড়িয়েছে। কিন্তু ধীবর কৈবর্তদের সাগরে যাওয়া বন্ধ হয়নি। কমেছে, তবু ধারা এখনও বজায় আছে। কমেছে কারণ, উপযুক্ত সাঁইদার নেই, নৌকোর অনটন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, মাছশিকারের উপকরণ এবং জাহাজ ইত্যাদির দৌলতে বিত্তশালী মানুষদের একচেটিয়া দাপট, ধীবরদের পেশায় উপর তাদের দখলদারি– এইসব কারণে ছোমেদদেরও সাগরে মাছ শিকার বন্ধ। তবু দু-একজন সুযোগ করে কোনো সাঁইদারের ট্রলারে যায় সাগরে।
সাগরের অনিশ্চিত জীবন এবং সে কারণে উৎকণ্ঠাও ধীবর-রমণীদের অতি প্রাচীন বিষাদ। এর সাথে গড়ে উঠেছে হাজার লোকাচার, সংস্কার। ছোমেদ এখন তাই নিয়ে কথকতায় সরব হয়। বলে–
উপস্থিত মাইন্যমান, গুণীজনা, বিচক্ষণ য্যারা আছেন– এই ছোমেদ আলির মুহে আপনেরা হুইন্যা লয়েন হেই কতা মোরগো। মোরগো মাতারিরা যহন কান্দে, তহন কইলম সুর করইয়া কান্দে। যহন ঝগড়া করে তহনও সুর করইয়া। কতার লগে কতা মিলাইয়া, হ্যারা এইসব করে। হেয়া শোনলে হয়তো আপনেগো হাস পাইবে, কিন্তু হ্যারগো ধারে এডা এট্টা দুঃখের ব্যাপার। হ্যারা এইরহম করে, আবার হেয়ার লগে লগে নাচেও। যহন মোগো সাগরে যাওনের কতা ওডে, তহন পাড়ায় কান্দনের রোলে টেহা দায়। হেই কান্দন যদি কেউ কান পাতইয়া এট্টু হোনেন, হোনবেন, কীসব দুঃকের কতার গান তহন হ্যার মইদ্যের থিহা বাইর অয়। তহন হ্যারা কান্দে–
আহা তুমি তো হেই চলইয়া যাবা
আহারে মোর গ্যাদার বাবারে –
কোতায় থাকবা কিবা খাবা
ক্যারে করবা আল্লাদ রে।
আহা তোমার আল্লাদের ধন
শিরি শিরি বাছাধন
হাপুর দিয়া বেড়ায় উডানে
আহা, মুই মাগি সোয়াগিনী,
নিত্য ফেলাই চৌক্কের পানি
মোরও সুখ নাই কোনওহানে।
তয় ভাইগণ, বন্ধুগণ শুনইয়া লয়েন মোর বচন এ মাগিগো চৌহের পানি, এই আছে এই নাই। যহন হ্যারা কুওইল দ্যায়, তহন যদি জালইয়ার পোয় ক্যাচাইল কিছু হরইয়া বয়– তহন কইলম মাতারিরা, করবে হ্যারে ফাতরা চিরা, মাইনসে এ্যারে স্তিচরিত্তির কয়।– আপনেরা মোরে মাপ করবেন। এগুলো বেয়াকই মোগো দুঃকের কতা। তমো কই, যহন দুঃক তহন দুঃক। এহন তো আমোদ আল্লাদে বইছি, এহন হেইয়া লইয়াই রস করমু। মোরগো তো রসকাব্য করনের লইগ্যাও দুঃক, ক্যান? না, যে দুঃক শ্যাষ অইয়া গেছে, এহন আর শোকতাপ দেনা, হ্যারে লইয়া হাসকাব্য, রসকাব্য করমু না ক্যালায়? দুঃক যহন দুয়ারডার ধারে আড্উয়া দিয়া খামি মারইয়া বয়, তহন না হ্যার ত্যাজ। হে যহন পরন কতা অইয়া যায়, তহন হ্যারে মোরা বালডার ল্যাহানও জ্ঞেয়ান করি না। মোগো পুরা তল্লাট ঘুরইয়া আইলেও তো সুখয্যারে কয় হ্যার ছিডাফোডার দ্যাহাও পাইবেন না। কারণ, ও মেঞায় উদিকের রাস্তা চেনেনই না। হে কারণ, হেনারে লইয়া হাস্যকাব্য করণের মোগো কোনো উপায় নাই।
ধীবর-রমণীদের এরকমই ধরণধারণ। তারা এই কাঁদে এই ফোঁসে। যে-বছর ফণী দৌলতকে নিয়ে প্রথম সাগরে যায়, তখনও দৌলত সরস্বতীকে বিয়ে করেনি। স্বাধীনতাও আসেনি, তখন ফণীর স্তিরি নাকি এরকম উথালপাথাল করেছিল। ছোমেদ বলে, ফণীদার বউরে মোরা ডাকতাম ভালবউদি। ঠাণ্ডা ম্যাজাকের মাইয়া মানু। তো হে দ্যাখলাম ওইদিন এ্যামন কুওইল পাড়তে আরম্ব করলে যে চেনাই যায় না। পেরথমে তো হে চ্যাতলে য্যান হুড়ুমের খোলার তপ্ত বালিতে চাউল পড়ছে, হেই রহম। মুহে খামারের আংডা ছেটতে লাগলে। অত যে ঠাণ্ডা মাইয়া, তহন হ্যারে দ্যাখলে হেয়া কেউ বিশ্বাস যাইতে না। পেরথমে আরম্ভ করলে খামরাইতে–ওরে ও অতি সারইয়া, ওরে ও ও ঝোলাসোগা, ও মড়া, ও রে, তুই কি হেহানে রাড়ি রাইখ্যা আইছ? তুই সাগরে যাওনের লইগ্যা অত ফাউকাইলি কিয়া? তুই হেহান দিয়া ক-পয়সা আনবি? তোর আসল কতাডা কী, হেয়া ক। তুই যাবি কিয়া, তোর কি মরার পাখ গজাইছে? তুই মরবি, তোরে শীত্লায় নেবে, কলেরায় নেবে, তোর চোক্ষে ছানি পড়বে। কুরু কুষ্টি, বাতোব্যাদি অইবে তোর। তুই বিষখালিতে ডুবইয়া মরবি। ওরে ও ভাড়উয়া, তুই হেই মরার দ্যাশে কোন লাং করানির দফনা দেইখ্যা আইছ? এইসব শকাশব্দ কয়, আর ফোসে। এই রহম করতে করতে, এক সোমায় কুওইল পাড়তে আরম্ভ করলে। তহন আর খামরায় না, তহন খালি খ্যাদ–
আহারে মোর পেরানের ধন রে
বড় গাঙ্গে বড় ভয়
কাঙ্গট কুমইর কত রয় রে
সেইহানে যাওয়ার তোহোমার কিবা পেরোজন–।
আবার এ্যারাই মইদ্যে পুরুষরে ঘুষ কউবলাইতে লাগলে–
সাদের পতিগো তুমি যাইও না সাগরে
ধান কুডুম চিড়া কুডুম
পয়সা পামু ম্যালা
ঘরে বইয়া খ্যালবা তুমি
প্রেম পিরিতের খ্যালা।
সাজইয়া গুজইয়া থাকপা তুমি
ধবধবইয়া কাফুরে
হেসব ছাড়ইয়া ভাসপা ক্যালায়
অকূল পাথারে–
পানপতি গো তুমি যাইও না সাগরে।
তো এয়া হ্যারগো নিয়ম। এয়া হ্যারা করবেই। তয় এয়া লইয়া ভাবলে তো আমাগো চলে না। ধান চিড়া কুডইয়াই যদি ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং ফ্যালাইয়া পেরেম পিরিতের খ্যালা করণ যাইতে তো মোরাই দ্যাশের রাজা অইতাম, আর শীতের রাইতে ভিক্টোরিয়ার ল্যাহান ক্যাতা মুড়ি দিয়া ভিড়মিডা দিয়া হুড়ুম খাইতাম।
এবার যখন সাগরে যাবার কথা উঠল, সবাই ঠিক করল, আগে মেয়েদের সাথে একটা বৈঠক করতে হবে। সেদিন ছিল ভাদ্রমাসের অষ্টমী। জন্মাষ্টমী। জেলে কৈবর্ত পাড়ায় এই দিন উৎসব হয়, কীর্তন গান হয়, পালাকীর্তন। সবাই জমায়েত হয়েছিল সেদিন ফণীদাসের বাড়ির বারান্দায়। একে জন্মাষ্টমী, তার উপর সাগরে যাবার কথা হয়েছে। কীর্তন একটু ভালভাবে হওয়া দরকার। সে কারণে সুধীর গাইনকে ডাকা হয়েছে। সে তার দলবল নিয়ে এসেছে। লোকটা পালাকীর্তন গায় ভাল। সবাই কীর্তন শুরু হওয়ার আগেই সুধীর গাইনকে বারণ করে দিয়েছিল যেন সে মাথুর, নিমাই সন্ন্যাস বা অক্রুর সংবাদ পালা না গায়। কারণ, তা হলে মেয়েদের কান্না আর থামবে না। কিন্তু সুধীর সেদিন প্রথমেই একটি দেহতত্ত্বের গান ধরে–
সাদের পাখি উইরে যাবে একদিন
ভাবি নাই মনে।
ও পাখি ছিল সোনার খাচায়
পাখি আপনি বাইচে আমায় বাচায়
আবার কখন হাসায় কখন কান্দায়
সুদিন বিষম দিনে, একদিন
ভাবি নাই মনে।
ছোমেদ বলে, তো এহন দ্যাহেন আপনেরা, এইগান হুনইয়াই মাতারিরা হেসকি দিয়া কুওইল দে। ক্যান? না হ্যারা তো শুনইয়া ফ্যালাইছে যে হ্যারগো সাদের পাখিরা উড়ইয়া যাওনের মতলব করতাছে। সুধীর হালায় জানইয়া বুজইয়াই গানডা ধরলে। আবার তার পরেই দ্যাহেন, কেত্তনের ব্যাখ্যাতা করতে যাইয়া চুৎমারানির পোয়, আরাম্ব করলে কী? না–
যিদিন মাদোব মথুরাপুর গ্যালেন, হিদিন রাদিকা তার বসনভূষণ, অঙ্গের আভরণ খুলইয়া ফ্যালাইয়া–যোগিনীর ব্যাশ ধারণ করলেন। মুই কই, বউয়ার পো, তোর মাদোবের এহন মথুরাপুরীতেই বা যাওনের ঠেহাডা কী, আর রাদিকারই বা ওসব খোলনের দরকার কী। তুই হালার পো হালা রাদার ঢলানইয়া কেত্তন গাইতে পার না। এসব না করইয়া তুই তো গাইথে পারতি নৌকাবিলাসের রঙ্গরস।
কী? না, আহা, কার্তিক ভাই এবার তুমি মোহন বাশিডা ধরো। ঢোল আস্তে,–
ছোটো এ তরণী
পরের ঘরণী
তোমার অবলা জাতি।
একে একে পার করিতে সবারে
অনেক হইবে রাতি।
অথবা, তোর তো কলঙ্কভজনের পদও না জানা থাহার কতা না–
আহা এই পথে নিতি
কর গতাগতি
নুপূরের ধ্বনি শুনি–।
কর রাধা সঙ্গে বাস।
আমারে নৈরাশ
আমি বঞ্চি একাকিনী।
– হেয়া না করইয়া তুই ভ্যাটকাইয়া পড়লি মাথুর গাইতে। মাতারিয়া কুওইল দিবে না তয়?
ছোমেদ আবার বিষয়ান্তরে পা বাড়িয়েছে। কিন্তু এবারে অবাক হলাম অন্য কারণে। তার উচ্চারণ, পদাবলীর ক্ষেত্রে এসে আমূল বদলে গেল কী করে। তার স্বরচিত গান বা কথকতার ভাষা সম্পূর্ণ আঞ্চলিক। সেখানে সে সহজ, কারণ তা তার নিজস্ব। কিন্তু কীর্তনে এসে সে যেভাবে উচ্চারণশুদ্ধি প্রয়োগ করে তাতে মনে হয়, তার রচনাও বোধ হয় সে এ ভাষায় বলতে পারবে একটু চেষ্টা করলে। কিন্তু তার প্রয়োজনই বা কী!
ছোমেদ কীর্তনের রসে এবার মেতেছে। সে এখন তাই নিয়ে নাড়াচাড়া করে। বলে, ভাইগণ বন্দুগণ, কেত্তনের কথা যহন এই পরণকতার মইদ্যে ঢুইক্যা পড়ছে, তহন আরেট্টু না কইলে তো পেরান ঠাণ্ডা অয় না। কেত্তন, আপনেরা জানেন বড় মিডা জিনিস। মোর বড় দুঃখ যে, এমন মিডা বস্তুডা হিন্দুরা পাইয়া গেলে। তয়, মোর ওস্তাদ বরকত বয়াতি কইতেন, ছোমেদ কেত্তনডা হিন্দুগো একলাগো না। ওথে কইলম শ্যাহেগোও ভাগ আছে। মুই জিগাইছেলাম, হেয়া কেমন? তো হেনায় মোরে ম্যালা তত্ত্ব কইতেছেলেন। কইছেলেন, ইরান দ্যাশের সুফিরা নাহি এই রহম সুরে আল্লার রহমৎ গায়েন। হ্যারগো ধারেই নাহি এই কেত্তনের কায়দা এ দ্যাশিরা শেখছে। জানি না, তয়, মোর ওস্তাদের এলেম আছেলে ম্যালা। হেনায় অনেক বড় পড়উয়া মানু আছেলেন। ছোমেদ এবংবিধ যাবতীয় চর্চায় বড় স্ফূর্তি পায়। স্বভাবশিল্পী মানুষ। বলে, সুধীররে গাইল দিলাম, হে কত্য হত্য। তয়, হেও তো পাগোল। হেও তো বোজে। ও যে ওরহম গাইলে, হেয়া খালি ফকরামি না। ওয়া তো হ্যার মাতায় আইবেই। আর, কয়েন, একজন গাথক যদি ওই সোমায় ওই গানই না গাইতে পারে, তয় হে গাহেকগো কান্দাইবে কহন, ক্যামনেই বা কান্দাইবে? গাথক গাইবে আর গাহেক কান্দবে না, এডা কইলম এট্টা অসৈরণ কতা। আর সুধীররে তো মোয়া ডাহি পাগলা দাদু কইয়া। ক্যান? না মানুডা আসলেই পাগলা। হে যহন হ্যার গলার নলিডা ফলাইয়া নিমাই সন্ন্যাস গায়, কেউ কি না কাঁদইয়া পারে?
ছোমেদ এরপর চলে যায় এ অঞ্চলের প্রবাদ প্রতিম কীর্তনীয়া সূর্য দাসের প্রসঙ্গে। সূর্য দাস এ দিগরে কীর্তনের বিশেষত পদাবলী কীর্তনের বীজপুরুষ। এই নিয়ে, অর্থাৎ সুধীরকে নিয়ে, তিন পুরুষে তার আধিপত্য। সূর্য দাস, স্বয়ং পদ বাঁধতেন। তাঁর শিষ্য ধলুমশায়, কালুমশায়, সাথে অসাধারণ খোলঞ্চী– শিবদাস। ধলুমশায়ের ধারে সাগরেদি করেছে সুধীর গাইন। সূর্য দাস গাইতেন কলঙ্কভঞ্জন। আহা– ছোমেদ বলে, তয় শোনেন এট্টু হেই পদ। ছিরিমতীর স্বভাব চারত্তির লইয়া, হ্যার হাউরি, নোন্দে হ্যারে সন্দ করে, পাড়ায় বহস করে। কয়, ও তো কলঙ্কিনী। হ্যারগো কতা হুনইয়া ঘোষপাড়ায় বেয়াকেরই খালি ঘুজঘুজ আর ফুসফুস। কী? না, কানাইর লগে ছিরিমতীর পিরিত অইছে। এইসব কতা লইয়া কানাকানি করে হ্যারা। আর সুইজ্য দাস, আহা আল্লায় য্যান হ্যার রূহুরে আরাম দেন– হেনায় কয়েন,
কানা আর কানি মিলে
বসে বসে করে কানাকানি।
বলে ওই যায় শ্যাম কলঙ্কিনী
বসে বসে করে কানাকানি।– তহন,
ছিরিমতী হ্যার সইগো কয়, সই লো– সই, মুই এহন কী করুম ক। ওরে তোরা মোরে কইয়া দে, মুই এহন কী করুম– ক্যার ধারে যামু,–মুই তো একছের ভাল ঠেহি না,
আমি আঁখি যদি মুদে থাকি
হৃদয়ে গোবিন্দ দেখি
নয়ন মেলিয়া দেখি শ্যাম
সই রে– নয়ন মেলিয়া দেখি শ্যাম।
আবার কানাইর লগে যহন দ্যাহা অয় যমুনার ধারে, তহন হ্যার ধারে নালিশ করে ছেমরি। হে যে কত নালিশ, কয়–
বঁধু কী কব বিশেষ
আঙ্গিনা বিদেশ
না ছাড়ি কুসুমবাস।
সদা বাঘিনীর পাশে
বসত হামারি
না ছাড়ি দীরঘ শ্বাস।
এয়া গাইথেন সুইজ্য দাস। আহা, কী মানুষ আছিলেন। দীঘল দ্যাহ, গলায় তুলসীর মালা, পরনে কোড়া ধুতি, কপালে চন্দন আর একখান হলুদইয়া রঙের উত্তরী কান্ধের উপার। আসরে যহন দাড়াইতেন য্যানো একখান পবিত্র ভাব।
ধলুমশায় হেনার চেলা আছেলেন। হেনায় যহন মহাজন, তহন আবার মোরা কেত্তনের অইন্য ঢং পাইলাম। হেনায় নিজে ইচ্ছা মতন পদ বান্ধথে পারতেন না। তয়, ব্যাখ্যাতা করতেন সুন্দার। আর হেনার গলায় য্যান মিশ্রির দানার ল্যাহান সুর বাজতে। বড় আরাম পাইতাম দেলে। হোনায় গাইতেন মাথুর, আহা, মাথুরের হে কী মাহাইত্য। হেনায় পেরথমে ব্যাখ্যাতা করতেন, মাদোবের চোট্টামির,– যা এহন পাগলা দাদু করে। পাগলা দাদুর ভাষায়ই কই। কতা গুলান একোই, তয় ধলুমশায় এট্টু শব্দ করইয়া কইতেন। পাগলা দাদুর নিজেরও কিনা দুগ্গা স্তিরি, হে কারণ, হ্যার এই কওনডুক খুব ভাল। আসলে এই কতার কওনদার যে ধলু মশায়, হে বেত্তান্ত মোগো জানা। পাগলা দাদু এহন কয়–
মাদোব কাইল রাত্তিরে রাদার কুঞ্জে যায়েন নায়। হারারাত্তির চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে হেনায় লীলাখ্যালা করইয়া, ব্যানইয়া কালে, রাদার ধারে ভালমানুষি করতে আইছেন। কয়েন, তোমারে ছাড়া মুই আর ক্যারেও জানি না। মোর আর কেউ নাই, কিছু নাই। কিন্তু রাদা অতিশয় সুচতুরা। হে খালি খুডইয়া খুডইয়া হ্যার হারা গা দ্যাহে। আর গায়ের গোন্দো শোহে। হ্যাষে কয়,
নয়নের কাজল
বয়ানে লেগেছে–
কালোর উপরে কালো–
প্রভাতে উঠিয়া, ওমুখ দেখিনু–
দিনও যাবে আজি ভাল।
কিন্তু তারপর আরও দ্যাখে। বিপথগামী দয়িতের সর্বাঙ্গে যে আরও নানান অভিজ্ঞান, কী উপায়ে সে তা গোপন করে! তাই সর্বশেষ সিদ্ধান্তে রাধা এক চূড়ান্ত মন্তব্য করে, বলে–
অধরেরি তাম্বুল
বদনে লেগেছে
ঘুমে ঢুলু ঢুলু আঁখি–।
বঁধু আমা পানে চাও
ফিরিয়া দাঁড়াও
বারেক তোমারে দেখি
তো রাধা তাকে দ্যাখে। দেখে তার সন্দেহ গাঢ় হয় এবং বলে–
নয়নের কাজল বয়ানে লেগেছে
মলিন হয়েছে দেহ
বঁধু কোন রসবতী পিয়ে সুধানিধি
নিঙারি লয়েছে সেহ।
উপস্থিত মা, বুইনেরা, ছোডো বড় সগলার কাছে মোর আদাব আরজ, অফরাদ মাফ করবেন। এ সগল কতা, খুবোই অসোব্য কতা কিন্তু হেয়া যহন মোগোর মইদ্যে অয় তহন। ছিরিকিষ্ণ রাদা, লায়লী মজনু, শিরি ফরহাদ বা মোগো দৌলত সরেস্বতীর ব্যাপার কইলম আলাদা। হ্যারগো পিরিত করনে দোষ নাই। তয়, মুই ছোমেদ বয়াতি কই এট্টা কতা। ছিরিকিষ্ণডার স্বভাব কইলম আসলেই মালউয়ার স্বভাব। মুই কই, তুই যদি রাদারেই চাও, তয় চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে যাইয়া রাত্তিরে শোও কিয়া। এ ছেমরি যে হারারাত্তির তোর লইগ্যা বইয়া রইছে, হ্যার দেলে তুমি দুঃক দেলা ক্যালায়? তোমার যদি একে না মন ওডে তো, শয়ে হাজারেও ওডবে না। কিন্তু সুদীর ভাই, মোগো পাগলাদাদু কয় অইন্য কতা। হে কয়, তোমরা বোজবা না। চন্দ্রাবলী না থাকলে রাদিকার মহিমা বোজোন যায় না। এয়া তো আর মাইনসের পিরিতি না, এয়া অইলে গিয়া পুরুষ পিরকতির লীলার তত্ত্ব। এইসব বুজবাজ দিয়া, পাগলাদাদুও এঔক্কা চন্দ্রাবলী লইয়া আইছে, এহন আপনেরা দ্যাহেন যাইয়া নিত্য তিরিশ দিন হেই রাদিকা আর চন্দ্রাবলীর চুলাচুলি। মুই ছোমেদ বয়াতি কই, তোর পুরুষ পিরকিতির লীলাখ্যালার ক্যাতায় আগুন। মোরাগো বুজ সোজা, মোরা ব্যাডা মাগি মিলইয়া ঘর সামলাই, বাইর সামলাই। হেথেই মোগো হোগা শুগাইয়া আমসি, হ্যার উপার যদি আবার লীলাখ্যালা লইয়া ভাবতে অয়, হেলে তো অইছে। আসলে মোগো অতসব পোষায় না।
তবে কীর্তন ব্যাপারটিও একটি জব্বর ব্যাপার বলে মনে হয় ছোমেদের। সে মুসলমানের ছেলে, যদিও তার ওস্তাদ তাকে বলেছেন যে, এ ব্যাপারে মুসলমানদেরও কিছু ভাগ আছে, তথাপি, ব্যাপারটি তো এখন হিন্দুদের। বলে, এই যে, মুই ব্যাডা, মোছলমানের ছাও, মুইও কি পারলাম সামলাইতে। কইতে আছেলাম জালইয়া মাগিগো খামার বিলাপের কতা, আইয়া পড়লে জন্মাষ্টমী, হ্যার হাথ, সুধীর গাইনের কেত্তন, হ্যাষে কতকতা, এয়া ছোমেদ বয়াতির দোষ না, এয়া আপনেগোর ওই রসের দোষ। কেত্তন অইলে রসের কারবার। আর হেই রসের দোষই অইলে, খালি আশপাশ দিয়া ঘোরা, আসল কতায় এট্টু লাড়া দেওয়া।
এই য্যান কমু কমু কমুনা, এরহম এট্টা ভাব। সুধীর ভাই এহানে থাকলে হয়তো, বেশ কায়দা করয়া করইতে পারতে, যে–
মাদোব যহন মথুরাপুরীতে– হে রহম কইতে মোর সুবিধা অয় না। বরং হিদিনের কতা, শলাপরামশ্স, এট্টু হোজাহুজিই কই। আপনেরা হোনেন। ছোমেদ আবার মূল বিষয়ে ফেরে।
ছোমেদের বিষয় এবং বিষয়ান্তর বড় রহস্যময়। এক তো, কখন বিষয়ান্তরে পা বাড়াবে তা বোঝা দুষ্কর, আবার সেই বিষয়ান্তরে যখন শ্রোতা বা রসগ্রাহীরা মগ্ন, একাত্ম, তখন দুম করে সে মূল বিষয়ে প্রবেশ করে এক আপাত ছন্দপতন ঘটিয়ে শ্রোতা, রসগ্রাহীকে বেশ একটু নাচিয়ে দেয়। এই দীর্ঘক্ষণের কথকতা শ্রবণে, আমার বিশ্বাস যে, সে এ কাজটি বেশ সজ্ঞানেই করে। তা করুক। কিন্তু শ্রোতাদেরও তো রক্তমাংসের, স্নায়ুশিরার শরীর। ধকল পড়ে খুব। অথচ, এও বুঝি, নাগরিক শিল্পে যদি এত উল্লম্ফন সওয়া যায়, এখানে কেন নয়। এরাই বা কী দোষ করেছে।
ছোমেদ কয়, ভাইগণ, বন্দুগণ, হেই জন্মাষ্টমীর দিন, সুধীর ভাইর্ কেওন যহন শ্যাষ, বাতাসা হরির লুট যহন দেওয়া অইয়া গেছে, মানুষজোন যে য্যার বাড়ি গ্যাছে, তহন, মোরা মাত্তর জোনাকয় হেহানে। রাইত তহন দুফইর, মোরা যে ক-জন মুক্তিযুইদ্দের সোমায় থিহা একলগে আছি, হেই গুটের ক-জন, মাগিমদ্দ, জালইয়া নিকিরিরা ফণীদাসের বাড়ির হাইতনায় বইয়া এট্টু নিজেগো মইদ্যে নিজেগো কতা কইতাছি। সাগরে যাওনের মতলব উডাইছে ফণী আর দৌলত। দৌলত আর অষ্ট আছেলে ফণীদাসের চামউয়া উহুন। হ্যারা ফণীরে গুরু মানতে। আপনেগো আগেই কইছি, হেই সব দিনে, ফণীদায় আছেলে এট্টা মানুষের ল্যাহান মানুষ। পাশশো মানষের মইদ্য দিয়া হাডইয়া গেলে চেনা যাইতে হ্যারে। য্যামন, উচা, তেমন দেহহান। চক্ষু দুইডা কুখ্খার ল্যাহান রাঙা। মাতায় পিঠ তামাইত বাবরি, হাত দুহান দুপাশে যহন ঝোলতে, মনে অইতে হেয়া যেন আডু ছাড়াইয়া লামছে। আর হ্যার ম্যাজজি মর্জিও হেইরহম। এক কতার মানুষ। বউরে, মোগো, ভালবউদেরে হে ডাকতে, কুওইল মারানি কইয়া। ক্যান? না হেতো, কতায় কতায় কুওইল দে। মোগো ভালবউদি, ছোট্টখাট্টো পোকছাও মানু, অত্তবড়, ফণীদায়ের লগে হে একছের বেখাপ। আর ফণীদায় হ্যারে কতায় কতায় ধাবডায় খালি, আর কয়, তুই মাগি থাম, তুই মাতারি কামে যা। এই রহম চোডে পাডে হে মাতারি অস্থির। আবার ফণীদায় কিন্তু হ্যারে ডরতেও। ক্যান? না, চেহারা যাই হউক, চোপাহান সাইদ্যের খরখরইয়া। খামরাইতে আরাম্ব করলে ফণীদার ল্যাহান ডাহাতইয়া মানুডারও বুক কাঁপতে। এ্যামনে তো চ্যাততে না। ঠাণ্ডা মানুষ। চ্যাতলে আর কতা নাই। তহন কইলম ফণীদায় চুপ। তহন আর রাও কাড়তে না।
দৌলত প্রথম সেই বৈঠকে সাগরে যাওয়ার প্রস্তাবটা তোলে। সে খুব ধীর, শান্তভাবে, সবার অবস্থা বিচার করেই কথাটা উত্থাপন করে। বলে, ভালবউদি, তুমি মোগো বেয়াকের গুরুজন। মায়ের ল্যাহান। মোরা বেয়াকে এ্যদ্দিন একলগে আছেলাম, য্যান এ্যাক পরিবার, হেয়াও তোমার শাসনে। এহন, কায্য গতিকে যদিও জুদা আছি, কিন্তু মনে মনে বেয়াকেই তোমারে জেষ্ঠ মান্যতা করি। ফণীদায়, মোগো মুরুব্বি, ওস্তাদ। মোগো সাগরে যাওন বিদিলিপি। কুওইল দিয়া হেয়া খণ্ডান যায় না। তুমিও হে কতা জানো। যাইতে মোগো অইবেই। নাইলে, দ্যাখথেই পাইতাছ, প্যাডের বাত জোডান মুশকিল। য্যারা এহানে থাকপে, হ্যারা তোমার তত্ত্বতালাশে থাকপে। কেউ যদি বেয়াদপি করে, তুমি যা শাস্তি দেবা বেয়াকের মানতে অইবে। মুই কই, তুমি অনুমতি কর, মোরা যাই।
এই কথা দৌলত বললে সরস্বতী চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভালবউদি, ওই যে ‘পোকছাও বউ’ সে তাকে জড়িয়ে ধরে, ধীর নম্র গলায় বলে, চুপ কর। কান্দইয়া কাডইয়া কুমঙ্গল ডাহিস না। হ্যারা যহন ঠিক করছে সাগরে যাইবে, হ্যারগো মোরা আটকাইতে পারমু না। আর জানইয়া রাখ, এয়া জালইয়া, নিকিরির বউগো অদেষ্টের ল্যাহা। যদ্দিন মাছমারণ আছে, তদ্দিন এয়াও থাকপে। নদীখালে মাছ নাই। সাগরে যাওন লাগবেই। আটকাবি ক্যামনে? আর এ কতাও মোগো থিহা অধিক কেডা জানে যে য্যারা যায়, হেরা বেয়াকে ফিরইয়াও আয় না। সাগরে যে মহামীন আছে, হে মীন জালইয়ার পাণভোমরা খোজে। যহন কায়দায় পায় তহন ছাড়ে না। তুমি য্যারে মারো, হে তোমারে মারবে, একতা মোর দিদি হাউরি কইতেন।
তার দিদিশাশুড়ি কলত এক মহামীনের পরণকতা। সেই মহামীন নাকি সাগরে, নদীতে,পুকুরে বা বাড়ির পাশের ডোবায় নানা রূপে বিরাজ করে। কখনও সে সাপ, কখনও তুফান, কখনও বা কাঙ্গট কুমির হয়ে দেখা দেয়। সে এদের বিধবা করতে চায় এবং করেও। তখন এরা কুওইল দেয়–
ভাঙ্গো আমার হাতের কঙ্গন গো
ও মোর সিথির সিন্দুর মোছো গো
ও মোর পড়শি দিদি গো।
আহা মাছ মারিতে গেল পুরুষ গো
ও, ওমোর কলিজারও ধন গো
আহা আ– দিদি গো।
কিন্তু সেই মহামীন রেয়াৎ করে না। ফণীদার বউ বলেছিল, হ্যার লইগ্যা কই, কান্দিস না। ও রহম মুই অনেক কান্দছি। অনেক খামড়াইছি। পরে দ্যাখলাম, ওয়া করইয়া লাভ নাই। খালি মানুষগুলারে কষ্ট দেওয়া। এ জ্বালা মাছমারাগো জন্মজ্বালা, এয়া সইতেই অইবে।
কিন্তু এতসব কথা বলে বুঝ দেবার পরও ভালবউদি সেই কাঁদতেই থাকে। ছোমেদকে বলে, ছোমেদ ভাই, এ্যারা যহন যাইতে আছে, তুমিও তো যাবাই। তুমি মোগো মইদ্যে সব্বজেষ্ঠ। তুমি কত দ্যাখচ, কত হোনছ। কিন্তু তুমি কি কিছু নিদান দেতে পার না, য্যাতে এ্যারগো যাওন বন্দ অয়।– ছোমেদ তো পারেনি। সে এখন বলে, উপস্থিত ভাই বুইনেরা আমার, আপনেরা তো এহন দ্যাখতে আছেন, এই যে ছোমেদ বয়াতি, আপনেগো সামনে কইতে আছে, নাচতে আছে, গাইতে আছে। হ্যার নূরে ধলাছোপ বেশি, কালা নাই কইলেই অয়। তো, হ্যার বয়স এহন তিনকুড়ি তেরো। যহনকার কথা কইতে আছি, তহনও মোর বয়স এট্টা খুব কোম না। কিন্তু আপনেরা কয়েন এরহম এট্টা সোমোস্যা, যেডা জাইল্যা নিকিরিগো হাজার বচ্ছরের সোমেস্যা, হ্যার নিদান, আভোদা আলেহা ছোমেদ আলি দে কী করইয়া?
এই এলাকা, যার কথা তার বাপদাদা, পরদাদার সে কাছে শুনেছে যে, এর নাম নাকি একসময় ছিল পরগণা সেলিমাবাদ। এখানে নাকি জেলে, নিকিরিরাই ছিল আদি বাসিন্দা। ঝালো মালোর কথা যে রয়ানি গানে শোনা যায়, তারাও জেলেই ছিল। আর তাদের নামেই এই এলেকার মূলস্থানের নাম নাকি ঝালকাঠি।
কিন্তু জালিকদের যারা চাষেবাসে মন দিল, তারা হলো হালিক। ক্যান? না, যারা হালে আছে, অর্থাৎ চাষে আছে, তারা হালিক। তারা হলো উঁচু জাত। ক্রমশ তারা কায়স্থ হয়। এরকম বলে গেছেন ছোমেদের পরদাদারা। ছোমেদ বলে, হালিকরা বাচইয়া গ্যালে, হ্যারগো জমি জোডলে হ্যার লইগ্যা। জালিক বা জালইয়াগ্যে মরণ থাকলে হেই সাগরেই।
সে যা হোক, ভালবউদির কথায় ছোমেদ কিছু নিদান দিতে পারেনি। জেলে, নিকিরিদের তো সাগরে যেতে হবেই। তা তারা বুরজুগ সাঁইদার ট্রলারে যাক কিংবা অন্য কারুর ট্রলারে। ছোমেদ বলেছিল, ভালবউদি, মুই জারি গাই, কেসসা কই, পরণকতা হোনাই, মোর কতা হুনইয়া কী অইবে। তোমরা যেডা ভাল বোজো হেডা কও, মুই কোনো নিদান জানি না।
তখন উঠল একটা শোরগোল। সরস্বতী বলে, সাগরে যাবা, হেয়া ঠিক আছে। তয় বুরজুগ তো মুক্তিযুইদ্দের সোমায় রাজাকারেগো দলে আছেলে হোনছেলাম। হ্যার টলারে যাবা ক্যান? এয়া লইয়া আবার ওডবে হ্যানে নানান কতা। দৌলত বলে, দ্যাহ মোরা তো বেয়াকরেই দ্যাখলাম, রাজাকার, খানসেনা, মুক্তিসেনা। এ্যারগো মইদ্যে তফাৎ কী হেয়ানি কেউ কইতে পার?– তখন এ ওর দিকে, সে তার দিকে তাকায়। কারোর মুখেই কোনো জবাব নেই। একসময় তো এরাও সবাই মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ছিল। রাজাকার তারাও মেরেছে। তবুও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জন্য কী করল। হাতে ক্ষমতা পেয়ে তারা কি কিছুমাত্র অন্য আচরণ করল। আসলে এরা সবাই ক্ষমতা চায়, ক্ষমতার ভাগীদারকে কেউই রেয়াৎ করে না। দৌলত বলে, পীরছায়েবগো মতন এ্যারাও তহনই আয়, যহন মোগো খাওনদাওনের এট্টু বন্দেজ থাহে। হেউডুক খাইয়া লইয়া এ্যারা যায় গিয়া। আর এ্যারে ভাবে রাজাকার, অরে আলবদর, এইসব ক্যাচাল লইয়া খুনখারাবি করে। এহন যহন খাওন জোডে না, মোগো তো কামে রোজগারে যাইতেই অইবে, য্যার ধারে কাম পামু, হ্যার ধারেই যামু মোরা। পিরিত করতে তো আর যাইতে আছি না। আরেট্টা কতা, বুরজুগ কইলম রাজাকারেগো ল্যাহান মানুষ মারে নায় বা ক্যারোর খানসেনাগো হাতে ধরাইয়াও দে নায়। হে খালি কইতে, পাকিস্তানই মোগো ভাল। মোরা মোছলমান, মোছলমানেগো লইগ্যা পাকিস্তান কায়েম অইছে। এ কারণে কেউ যদি হ্যারে মারে, হেডা মুই ভাল কই না।
অষ্ট বলে, যুইদ্দের সোমায় মোগো ধারে যেসব মুক্তিসেনারা আইছেলে, হ্যারগো মইদ্যে তমো কিছু বাল পোলাপান আছেলে। এ গুলান তো, লোম ফ্যালাবার যোইগ্যতা নাই সিন্নি খাওয়ার গোসাই। এগুলান খালি নিজেরা ধান্দা করে। তো, ও সব ভাবইয়া মোগো লাভ নাই কিছু। মোগো রাস্তা মোগোই দ্যাহন লাগবে। সাগরেই যামু।
