সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ২
দুই
তারপর বাসদৌড়, রিকশাদৌড় করে সেই রূপসার ঘাট। রূপসা এক নদী। নামটা হয়তো কোনোকালে ছিল রূপসী নদী। এখন সবাই বলে রূপসা। রূপসী বললে একটু যেন দূর দূর, ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে হয়। তাই আটপৌরে করে নেওয়া হয়েছে রূপসা করে। কিন্তু আটপৌরে করলেই কি রূপসীর রূপ আর গতরে সবসময় কিছু হানি ঘটে? সে এখনও দিব্য যুবতী, দিব্য সুন্দরী, একটু মাজাভারী বটে, তবে তা কিছু ধর্তব্য না।
দু’পাশের রেন্ট্রি আর চম্বল মরদেরা তার মুখের উপর, বুকের উপর দিনমান আকুলি বিকুলি করে। রূপসাও তাদের ছায়া হৃদয়ে নিয়ে মনের সুখে বয়ে যায়। কিন্তু তাই বলে সে কারও দাসী বাঁদী নয়। সবার দিকেই তার নজর, সবার উপরেই তার ভাব-ভালবাসা। তা, সে যতক্ষণ স্বেচ্ছায় ততক্ষণই। হাজারও মানুষকে সে স্বেচ্ছায়ই স্থান দিয়েছে তার দেহে। তাদের কেউ বা মাছ মারে, কেউ-বা খেয়া পারাপারের কাণ্ডারি। তা মানুষের তো গুণের ঘাট নেই। সে করে বলাৎকার। সে এখন তার দেহের উপর নামিয়েছে বিরাট বিশাল লোহার শরীর, যার নাম বার্জ। দুনিয়ার গাড়ি-ঘোড়া-মানুষ পার হয় সেই বার্জে। তাও রূপসা কোনো প্রতিবাদ করে না।
এইখানে এসে এক আসল পাখি-ধরা আঁখির সন্ধান পাওয়া যায়। ছিড়িক-ছিড়িক করে বৃষ্টি নামতে সবাই আশ্রয় নিয়েছিলাম এক চালাঘরের নীচে। চালাঘরটি একটি হোটেল। নদীর গায়ে-গায়ে। বৃষ্টি জোর হতে হোটেল মালিক ডেকে বলেন, ভেতরে আইসে বসেন ভাই। ছাওয়ালপানেগো পানির ছাট লাগতিছে, ভিইজে যাবেনে। নাম মোকছেদ আলি। বলে ইণ্ডিয়াথে আলেন বুঝি? কনে যাবেন? সব শুনে বলে, সে তো মেলা দূর। খাওয়া-দাওয়া কইরে যান। রাস্তায় ভালো খাওয়ার জাগা নাই। বলেন তো দিতি কই। পরামর্শটা খারাপ না, আবার বৃষ্টিও ছাই ধরছে না। রাজি হতে মোকছেদ তার কর্মচারিদের হাঁকডাক করে। নদীর পারের হোটেল। তায় আবার এ দেশ ইলিশকুমারীর বাপের বাড়ি, নদী থেকে উঠে সোজা কড়াইয়ে। দেশটা অবশ্য আমার আর আমার গিন্নিরও বাপের বাড়ি। তাই সামনে সাজিয়ে রাখা নানা জাতের মাছের মধ্যে ইলিশই নজর কাড়ে আগে। আহা কী আকার, কী রূপ! বড় কাঁধ উঁচু পরাতের মধ্যে রাঙা টুকটুক ঝোলে ডুবসাঁতার কাটছেন রাজকন্যে। গিন্নির চোখে চোখ পড়তে সেখানে প্রথম প্রেমের আকুতি দেখি। ইলিশ ছাড়াও আছে আরও নানা জাতের মৎস্যকন্যারা। কিন্তু ইলিশ হলো প্রকৃতই রাজকন্যা। ওই ইলিশ যদি রূপসার প্যাডের ছাও না হয় তবে আমি বাঙালবাচ্চা, ভাটিকুমার নই।
মোকছেদ ধরে ফেলে। সে এতক্ষণ বোধ করি আমাকে আর আমার পত্নীকে নজর করছিল। বলে, ‘কী দেখতিছেন? উনি ওই ওখানদে উঠিছেন আর সোজা এখেনের রসুইয়ে আইসে সেধুয়েছেন, বাজার ঘুইরে আসেননি। বইসে পড়েন। আরে হেই সুমুন্দির পুতেরা–বাবুগো মায়েগো খাওনের জাগা করতি পার না?’
মোকছেদ বেশ চোটপাটের হোটেল মালিক। হোটেলের ঠাঁটবাট কিছু নেই। তবে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। উপরে টালির চালা, পাশে দরমার বেড়া। লম্বা বেঞ্চি, একটা উঁচু একটা নীচু। নীচুটায় বসো, উপরটায় খাও। বেশ সাদা-সাপটা ব্যাপার। খেতে খেতে গল্প হয় মোকছেদের সঙ্গে। সেই বলে বেশি। আমরা খাওয়ায় এত ব্যস্ত যে, দু-একটা হুঁ হাঁ করা ছাড়া বেশি কথা বলার ফুরসৎ পাই না। মোকছেদ জিজ্ঞেস করে, আপনারা কি আসলে এপারের না ওপারের? জানালাম, আমাদের এখন আর এপার ওপার বলে কিছু নেই। এখন শুধু ভেসে যাওয়াই সার। এ-রকম ভাসা ভাসা জবাব দেবার কারণ হয়তো আছে, কিন্তু তা কি মোকছেদকে বলা উচিত হলো? সে আমাদের খিদের সময় মুখে অন্ন দিল। কিন্তু সে জবর ধরতাই দেয় কথাটির। বলে, কী কলেন, কী কলেন? ভাসাই সার। এপার ওপার নাই। আহা! মুইও তো এরহমডা ভাবি। বড় নিয্যস সত্য কতা ভাইজান। মোর গো আর এপার ওপার কী? ভাসাই সার।
সামনে রূপসার খেয়া পারবার। সেখানে মানুষেরা ভেসে আসে, ভেসে যায়। কিনারায় মোকছেদের হোটেল। যতসব ভাসিমানুষ সেখানে দু-দণ্ড বিশ্রাম নেয়। মোকছেদের সরাইখানার ইলিশ-ভাত খায়। বাতচিত করে। আবার কমনেকার মানুষ কমনে ভাইসে যায়। কথার যে কত ধারায় গতি। কথা নাকি শতধারায় বয়–এমন কহবত আছে সংসারে। আনমনা বলে ফেলেছি এক কথা। মোকছেদ আলি তাকে ‘দর্শন’ করে। এ-কথা আমার জীবনে এক সত্য, আবার যারা পারাবারের নিত্য চরণদার তাদের জীবনে আর এক। যে যেমন পারো অর্থ করে নাও। আর যারা কাণ্ডারি, তারা কেন বাদ যায়? সেখানেও দেখ, এক বিশেষ অর্থে পারাপার অর্থ প্রযুক্ত হয়। তবে মোকছেদের সঙ্গে বাতচিতে এক লাভ হয়। ভোর থেকে যে হুজ্জুত গেছে, তার তেতো ভাগটা খোলসা করে না বলতে পারার বেত্তান্ত। তা খোলসা মানুষ হয় ক্যামনে? সবাই তো কী এপার, কী ওপার–খালি কাজে ব্যস্ত। এদের যেন কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কী অনাছিষ্টি। এই কাগজ দাও রে, এই পাসপোর্ট দাও রে। এই বাক্স খোলো রে। এইসব। আরে বাবা সুজন দুর্জন বোঝো, তারপর খোলাখুলিকরো। মোকছেদ বলে, ভাইজান, এট্টা কইরা ইলিশের মুড়োখাওয়া লাগে। মুই জানি বডারে সুমুন্দির পোয়েরা পকেট উল্ডোয়ে কাড়িছে। তো মুই মোকছেদ আলি, মোর খ্যাতে এহনও অজন্মা হয়নি। খামারেও আগুন লাগেনি, মায়েগো, বিডিগো চখি ইলিশের মুড়ো খাওনের আন্দাজ পাতিছি, মুই তেনাগো দুইডা মুড়ো খাওয়াবোনে। মানা শোনবো না। পয়সা না দিতি পারেন দেবেন না। ও রূপসা মোরে পোষায় দেবেনে। আরে এই বলদার পোয়েরা ওহানে গল্প মারতিছ। গাহেক ভুখা উডি যায়। তোমরা আমার বিজিনেস ডুবোয়ে দেবা? আজরাইলের ছাওয়াল। দে সব পাতে এট্টা কইরে ইলিশের মুড়ো দে।
মোকছেদ নাগাড়ে বকে। এ এক রগড়ের ভ্রমণ বটে। ভ্রমণে মানুষ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। নদীনালা, রাস্তাঘাট, পাহাড়, সাগর কত কী দেখে। এ ভ্রমণে নদীনালা, পথঘাট দেখছি বটে, দেখছি শহর, নগর হাটবাজারও। পাহাড়, সাগর অবশ্য পথে পড়েনি, তবে মানুষ পাচ্ছি মনমতো। আর মোকছেদ তার সেরা।
রূপসা ঘাটের পারাপারে আয়োজনটি বেশ রইসি। বিরাট ঘাট। মূল রাস্তা থেকে সরাসরি নদীর বুকে যাওয়া যায় এমন একটি জেটি রাস্তার সমান তলে। তার সঙ্গে এসে লাগে বার্জ, এ ছাড়া আছে শয়ে শয়ে ডিঙি নৌকা–যদি কেউ স্পেশাল পার হতে চায়। বার্জে পার হলে পয়সা লাগে না। এপারে খুলনা, ওপারে বাগেরহাট জেলা। বাগেরহাট আগে খুলনা জেলাতেই ছিল, এখন নতুন জেলা। গাড়িঘোড়ার জন্য বার্জ সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে এপারের মূল রাস্তার সঙ্গে ওপারের। ওপারের রাস্তা নদীর পার থেকে খানিক গিয়ে দুভাগে দু-দিকে যায়। একদিকে মঙ্গলা বন্দর, অন্যদিকে বাগেরহাট, পিরোজপুর, হুলার হাট, ঝালকাঠি, বরিশাল হয়ে ঢাকা।
মোকছেদ বলে, আর দু’খানা কইরে ইলিশ খাতি হবে। না না না, কোনো বাত শোনবো না। কোরাল মছের এবার খন্দ কোম। ফেরার সময় এ পথ ধইরে যদি যান, তালি দাওয়াত দেলাম, কোরাল মাছের ঝাল খাওয়াবোনে। এখানের নদীতে কোরাল মানে ভেটকি, আর চিতল বেশ পেল্লায় আকারের হয়। আর বড় মাছের মধ্যে থাকে বোয়াল। রুই, কাতলা বড় একটা দেখা যায় না। বাহারি ছোটো মাছ আছে মেলা– ট্যাংরা, পাবদা, পোমা আর পারশে ; চিংড়ি এখন আর সাধারণের খাদ্য নয়। বিদেশি মুদ্রা ঘরে আনে, তাই বাজারে তার দর্শন মেলে না। এমনিতে মাছের বাজার বেশ চড়া, অবশ্য অন্য জিনিসেরও। মোকছেদের কথায় তার খেদ। সে বলে– দেখেন আইজ দশ বছর হয়েলো মোর নুরে ধলা ছোপ ধরতি লাগিছে। বয়স ‘ক’ কুড়ি হবে কতি পারব না। কত যে দেখলাম তার আর শ্যাষ কী। ইংরাজ, পাকিস্তানি আর অহন বাঙালি। এই ঘাডে মোর আব্বাজানে হোটে খুলি বয়েলেন সে আইজ ঢের সাল আগে, ব্রিটিশ আমলের কতা। এমনকী পঁচিশ বছর আগেও এক ট্যাহায় মাছ, ভাত, ডাইল খালি অপনের মনডা খানজা খায়ের ল্যাহান ম্যাজাজে ফুলি উঠত। আর এহন দ্যাহেন। কথা মিথ্যা নয়। কী অসম্ভব আক্রা সব জিনিস। সস্তা মাছ-ভাতের দেশ, এখন হোটেলে খেতে বসলে মনের মধ্যে হিসাবের কুবাতাস বয়।
মোকছেদ বলে, মাছ নাই নদীতে। ওই যে ওপারে আপনাগো ফারাক্কা ব্যারেজ না কি এক বাঁশ পদ্মার সোগায় ঢুকোয়েছে সে-কারণ এপারের নদী খালের পুটকি শুগোয়ে আমসী। ‘তো’ মুই বুঝিনে। বষ্যাকালে যে এত পানির হুলুস্থুলু হয়, মোরগো মুরুব্বিরা তা ধইরে রাখতি পারেন না? সে কতা আর কী বলব। বলতি গেলি হাজার কতা আইসে পড়ে। আসলে বুঝিছেন, ওই বাঁশখান আপনের ভাগাভাগির বাঁশ। সুমুন্দির পোয়েরা ওই যে একখানা মাগগে ঢুকোয়ে রাখিছে তার আর চারা নাই। মোকছেদ দেশ ভাগাভাগির প্রসঙ্গ তোলে। তার ধারণা এই ভাগাভাগির জন্যই মানুষের এত অভাব। জিনিসপত্রের এত দাম। তাছাড়া এই ভাগাভাগির জন্যই মানুষের নিয়ত খারাপ হয়ে গেছে। এখন তারা ছাওয়ালপানদের চারডি প্যাট ভইরে খ্যাতি দেওনের কতাও ভাবতি পারে না। মোকছেদ আবার মুখর হয়ে ওঠে, এই তো দ্যাহেন আপনার বিবি-ছাওয়ালপানেরা পেরাণ ভইরে চারডি মাছভাত খাতি লেইগেছে, আর আপনের দেলে হিসেবের বদ হাওয়া তুফান তুইলেছে। সে আপনি যাই কয়েন মুই আপনের চৌখির ভাব দেইখে আন্দাজ করিছি। বেয়াদপি মাপ করবেন, কিন্তু মোকছেদের চোখ এড়ানো এত সোজা না। লজ্জা গেলেও মানুষটার অন্তর্দৃষ্টির তারিফ না করে পারি না। পকেটে গোনাগুন্তি পয়সা। সীমান্তের সুজনেরা কথায় ভালবাসার বাড়াবাড়ি জানালেও পারানির কড়ি হিসাবে তাদের ঘাটের দাবি আনা-আনা মিটিয়ে নিয়েছে। এখন সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম তক পৌঁছানোর রেস্ত যা আছে তাতে আর যাই হোক এ-রকম লাল সুরুয়াওয়ালা ম্যাগনাম মাপের সব ইলিশ মৎস্যখণ্ডসহ গুচ্ছের খাওয়ার কথা ভাবা যায় না। তাই হিসেবের বদ হাওয়ার খুব একটা দোষ নেই। এ-সব কথা খুব খোলাখুলিই মোকছেদকে বলি। সে জানতে চায়, কারা এমনি জালিমি করে, ওপারে না এপারে। জানাই, এপার থেকে যারা যায় তাদের ওপারে দণ্ড দিতে হয়, আর ওপার থেকে যারা আসে তদের এপারে। মোকছেদ বলে–হায় আল্লাহ, এ যে গুয়ের এ পিঠ আর ও পিঠ। তালি যে লোকে বলে, এপারের চেইয়ে ওপার ভালো? আমি বলি, কেন বলে জানি না, তবে আমার ধারণা এপারও যা ওপারও তা। সাধারণ গরিব যাত্রীদের হয়রান করতে ওস্তাদ যেমন এপারের ধুরন্ধরেরা তেমনি ওপারের। এপারে দেখলাম, এরা এদিগের লোকেদের উপরও হুজ্জুত করে, ওদিক থেকে যারা আসে তাদের উপরেও। ওপারে সাহস পায় না ততটা, তাই করে কম। একেবারে করে না, তা নয়। লোক বুঝে করে। মোকছেদ বলে, তালিও মুই অ্যারে ‘গু’ই কব। সবডাই গু। মোকছেদ যে ব্যাপারটিকে ‘গু’ বলে বাতিল করে, রাষ্ট্রপ্রধানরা তা পারে না। ফলে, অযোধ্যায় রাম-বাবরি খেউর হয়। একদল লোক রামর্মাকা ইট নিয়ে অযোধ্যার পানে ছোটে, তারপর এক বিষধর মানুষ, মানুষেরই অধিকারের নামে এক রথ বানায়, তার নাম দেয় রামরথ। সেই রথ যে যে মাটি ছুঁয়ে যায়, সেই সেই স্থানে রক্ত জমাট বাঁধে, মুণ্ডু গড়ায়। রামভক্ত রহিমভক্ত মানুষের মুণ্ডু তখন বিশ্ববিবেকে চৈতন্য খোঁজে। কিন্তু চৈতন্যও তো একদিন এইরকম এক রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে নষ্ট হয়েছিল। তাই চৈতন্য আসে না মানুষের। কিংবা আসেও, কেননা, মোকছেদ তো আমাদের আদর করে মাছ-ভাত খাওয়ায়। সুখ-দুঃখের কথা কয়। আর পরম মাহেঙ্গার দিনেও নস্টালজিয়ার দৌরাত্ম্যে সে একশো পঁচাত্তর টাকার রফা করে একশো পঁচিশ টাকায়। বলে, পঞ্চাশ ট্যাহা পান তামুকের খরচা, যে নেয় তার সাত পুরুষের দোজখ্। ফিরতি পথে দাওয়াইত, কোরাল মাছের ঝাল, রাই দিয়া পারশে, বোয়ালের টক ঝোল– না আলি জান্নামের পোকা হতি হবে নে। মেজ্বান বুঝিছেন ভাইজান? মেজ্বান।
পান তামাক খেতে খেতে বাতচিত হয় আরও। মোকছেদ পথঘাটের সাট বলে দেয়। বলে– বহুকাল দেশছাড়া, এট্টু সাবধানে যাইবেন। বলদা বেইমানের কমিনি আছে রাস্তায়। তয় ডরের কিছু নাই। বেলাবেলি পৌঁেছাবেন হুলারহাড। ওহানে ফকির ছাহেব আছেন। আইজ হেনার অতিথ হয়ি রাইতটা কাডায়ে কাইল ফজরে বাড়ির পথ ধরবেন। তাড়াহুড়ার কিছু নাই। ফকির ছাব মানুষডা বড় ইমানদার। গান যা করেন তার জবাব নাই। ফকির সাহেব সম্পর্কে কৌতূহলী হই। তিনি কেমন মানুষ যাঁর কাছে হঠাৎ গিয়ে অতিথ হওয়া যায়, যিনি দারুণ গান করেন। মোকছেদের কাছে জানতে চাই তার খবর। মোকছেদ বলে– মুই তেনার কাছে হরবকত যাই। তেনায় মোর মুর্শেদ। তেনার কাছে যাতি মোর বড় ভাল লাগে। মোগোর এই ফকিরি মুর্শেদি তত্ত্বতালাশ যেনারা জানেন তেনারাই খালি জানতি পারেন যে মোগোর কারবার দিল দরিয়ার তুফানে নাচনের কারবার। আহা! ভাইজান, আপনে মোর মুর্শেদের দরবারে একবার হুজুরে হাজির হয়েন– মোর এই আর্জি।
যেন হঠাৎ অন্যমানুষ হয়ে যায় মোকছেদ। এইসব ফকির, মুর্শেদ, আউলি, বাউলি ‘কোড অব কন্ডাক্ট’-এ হঠাৎ ঢোকা যায় না। ঢুকতে গেলে বাধা থাকে অসুমার। নাগরিক জীবনধারায় যারা অভ্যস্ত, তারা সবকিছু বুদ্ধি-যুক্তির রাস্তায় ফয়সালা করতে চান। এখানে সে-সব হবার নয়, তা আমার জানা আছে। জানা আছে এজন্যে যে আমার ভ্রমণের যিনি ছিলেন শুরুয়াতের মুর্শেদ সেই কালকূট– একসময় হাত ধরে আউল বাউল ফকির মুর্শেদ কত্তাভজা আর হরিবোলা সবার দরজায় নিয়ে গেছেন। তাই আমি তত্ত্ব জানি বা না জানি এদের খানিক চিনি। এরা আধুনিকতা, নাগরিকতার যাবতীয় করণ, কারণ, বুদ্ধি যুক্তির উপর তাদের নিজস্ব ডিকনস্ট্রাকশান জারি করে, দাপটে নিজ নিজ কোড অব কন্ডাক্ট-এর ধারা বজায় রেখে চলেছে। সেখানে তাদের না আছে কোনো বিদ্রোহ, না কোনো সমঝোতা। সেখানে আধুনিকতা-নাগরিকতার প্রবেশ-প্রস্থানে তারা নিতান্ত উদাসীন, আবাহনও নেই, বিসর্জনও নেই। সেখানে তাদের মন্ত্র একটাই– ‘বুঝ লোক যে জান সন্ধান’। তারা মানুষ ভজে, মানুষ পূজে, মানুষ করে আরাধন। তারা মনের মানুষ খুঁজে বেড়ায় দিবানিশি অনুক্ষণ।
এরকমই আভাস পাই মোকছেদের মুর্শেদ বর্ণনে। এ-বিষয়ে তার উৎসাহ অপার। বলে, একটু দরকার পইরে গেল। নালি, আপনার পাছু ধইরে আমার মুর্শেদের দরবারে দেহতরী লাগাতেম। এ-সব কী শব্দ! কী কথা! মোকছেদের যে কথার পদবন্ধও পালটে গেল। সে দেহতরী, মুর্শেদের দরবার এসব বলছে। এ-সব কী? আমারও পুরোনো নেশা চাগার দেয়। আমার মুর্শেদ এখন কথাশরীর পেয়েছেন। তাঁর কথা স্মরণ হয়। স্মরণ হয় কত ফকির আউল বাউলের সঙ্গকথা। মোকছেদকে বলি–মোকছেদ ভাই দরকারটা কি খুব জরুরি, সাগরেদদের কাউকে তার দায় গস্ত করে একটা রাত না হয় হুলারহাটে হুজুরে হাজির হলেন–বলতেই মোকছেদ চঞ্চল। বলে, মুই ও ত সেকতা ভাবেলাম। আসলে এই হোটেল বুঝিছেন, এ হলো গিয়ে আপনার বিষয় ‘গু’। লালন সাঁই বলিছেন– এই গু ছাড়ায়ে মোকামে যাওয়া সহজ কথা নয়। আর দেখতিছেন না, মোর এই সাগরেদ ফেরেস্তাদের, সব ব্যাডা অকম্মার তালুকদার। মুই গেলাম, অর তেনাগো সোগা উব্বুত, লিঙ্গ কাইত। হোটেলের মাগগি বাবলা কাডার ডাল উল্ডো কইরে ঢুকোয়ে, মোরে রূপসার চড়ায় অকাল দফন করবেন তেনারা। তয় খাড়য়েন। একজন ইমানদার নজরদার মানুষ আছে মোর। সোনা মেঞা নাম, দেখি বাড়ি আছেন কিনা। তেনারে পালি আমার সমস্যা মেডবেনে। তালি ড্যাং ড্যাং কইরে গিয়ে হাজির হব হুজুরে, আপনার সোগায় সোগায়। দেখবেন কী সেই মানুষ! যেন জিব্রাইল আলায়সাল্লাম নাইমে আলেন বেহেস্তের থানে। আপনেরা তালি একটু আরাম করেন। মুই এই যালাম আর আলাম। মোকছেদ হড়বড় করে তার ক্যাশবাক্স বন্ধ করে। কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে হুঙ্কার ছোঁড়ে– এই যে ভালমানষির ব্যাডারা, কানখাড়া কইরে মোকছেদ মেঞার কতাকয়খানা শুইনে রাহেন। মোকছেদ মিঞা দু-দিনের মতো চলল তার মুর্শেদের দরবারে। এহন আপনেরা তার বিষয় ‘গু’ লইয়ে লারাঘাটা করেন। সোনামেঞার হেফাজতে থাকল এসব। তানায় মানুষ ভালো, মোকছেদেরি জানে মারবেন না, আপনারাও দয়াধম্ম কইরে তার মাগগে বয়ড়া বাঁশ ঢুকোবেন না যেন। আাপনেরা ত রাখলি রাখতি পারেন, মারলি মারতি পারেন। আগুনে মারতি পারেন, পানিতে মারতি পারেন, চাইকি হোডেলডা বেইচে দিয়ে এহেকজনে দু-তিনগা বিবি লইয়ে সুখে ছাপ্পর খাডে উইডে বাদশাগিরি করতি পারেন। মোকছেদ নাগাড়ে বলে যায়। আমাদের সঙ্গী করে নিয়ে সে তার মুর্শেদকে দেখাবে, এ আহ্লাদে সে টগবগ করছে। তার কথাগুলি আপাত ব্যঙ্গ হলেও এইসব ছেলেছোকরাদের প্রতি তার স্নেহ যে অসুমার, তা গোপন থাকে না। সে যখন এসব কথা বলে তখন তার কর্মচারী বালখিল্যরা মিটিমিটি হাসে। তাদের সবারই বয়স দশ থেকে ষোলোর মধ্যে। একমাত্র পাচক ছাড়া। তার বয়স মোকছেদের কাছাকাছি। নাম হারুন মিঞা। সে বলে– বাজে প্যাঁচাল পাড়তিছ ক্যান। মুর্শেদের নাম যখন উঠিছে তখনই তো মোগোর হিসাব কিতাব শ্যাষ। তখনই বুঝিছি– পাখি কখন জানি উইড়ে যায়। তবে এ কতাডা কলাম মিঞা, এ ভূতের ব্যাগার মুই আর বেশিদিন পারব না। তুমি অন্য খানসামা খোঁজো। তোমার আইজ এ মুর্শেদ, কাইল সে ফকির– তো এতই যদি মুর্শেদ ফকিরতি রস, তালি এসব হোটেল মোটেল ছাইড়ে কোপনি ধ্বজা সম্বল করলিই তো জেবন সার্থক হয়। মোকছেদ এবার নরম হাসে। বলে, তার আর বাকি কী? বিবি যবেথে মাডি লয়েছেন, তবেথে মোর ফকিরির বাকিডা কী? খোদায় তো পুষিপোনা, গুড়াগ্যাদাও কিছু দেয় নায়। থাকার মদ্যি আছি মুই আর মোর এই বাদশাজাদারা। তা তানাদের যা ভাব চরিত্তির, তাতে মোর এই হোডেলের তো কেয়ামত নজদিগ, তোমার কী? তুমি তো কারিগর মানুষ। এহানে কাম ফতে তো হাজার লোক আছে যারা তোমার সোগায় তালের পাখার বাতাস করতি করতি লয়ে যাবেনে। এ কথায় হারুন মিঞার গোসসা হয়। সে বলে– মানসি যে তোমারি নড়াইলে খচ্চর কয় তা কিছু মিথ্যে নয়। নড়াইলে মানুষ খুলনেয় আইসে নালি ব্যবসা কত্তি পারে। তোমারে মুই কহন কলাম যে, মোর দশ জাগায় কাম করবার হাউস আছে। খাস কতা, মোরে এহন আর তোমার পোষাচ্ছে না। মোকছেদ আরও নরম। বলে, এবারডার মতো মাফ কইরে দেও ভাই। এই নাক মলা, এই কান মলা। আসলে ভাইজানের লগে কতা কতি কতি পেরানডা যেন ফকির ছাহেবের লাইগে উফাল দেলে। তালি মুই সোনা মেঞারে ডাকি? হারুন মিঞা জল। বলে– ডাক। তবি এট্টা কতা কই, কতিছ দুইদিন, মুই জানি এক হপ্তা। কিন্তু এবার চাইর দিনের বেশি ছুটি পাবা না। পাঁচ দিনের দিন ফয়জরে যদি আইসে দেখি তুমি হোডেলের তাবলে বওয়া নাই তো হারুন মিঞাও আর এখানে নাই, জানবা। এবার আস, সোনামেঞারে তোমার আর খবর করতি হবে না। বাসের সময় চইলে যায়। বাবুগো তকলিফ হবেনে, আসো যায়ি। খোদা হাফেজ।
ব্যাস, তখন মোকছেদের উফাল দেখবার মতো। বলে– সাঁই, মোর হারুন ভাইরি দোয়া কর। সাঁই তারে হাজার সাল হায়াত দেও, ঘর ভরতি যোবতি বিবি দেও। বালবাচ্চায় ভইরে উঠুক তার দৌলতখানা। আর মোর এই এতিম ছাওয়ালপানগুলা, যারা মোর এই হোডেলের পয়মন্ত ফেরেস্তা, তারগো সুবুদ্ধি দেও। তারা যেন চোরছ্যাঁচর বদমাইস না অয়। তালি মুই এবার চলি? মোর দেলের ধুকপুকানিরা তোমরা বেয়াকে হারুন ভাই আর সোনামেঞার নিজামতে আপনা আপনি বেরাদরি বজায় রাইখে সহি সলামত থাকপা। বেইমানি, মোনাফেকি, বেতামিজি, বেয়াদপি করবা না। এবার বেয়াকে মোর আর্জিতে একবার জাক্কৈর দেও– কবুল। সবাই বলে–কবুল। মোকছেদ বলে– কও বাপধনেরা, মোরা বেয়াকে এক। সবাই বলল–এক। মোকছেদ বলে– কও এই হোডেল মোগার বেয়াকের রুডিরুজির জোগানদার। এর ক্ষতি মোরা করব না। সবাই বলে– করব না। তখন মোকছেদ স্বগত বলে– সাঁই, তোমার আশ্ছয়ে আমার এই কলিজার টুকরাগুলান রাইখে গেলাম। এ্যাগোর বালা মুসিবত দূর করো। এরা যেন সুখে থাকে, সুস্থ থাকে, এরগো যেন কোনো বেভ্রাট না হয়। এরা যেন তোমার বারামখানার বান্দা হইয়ে দিন গুজরান করতি পারে।
