Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    মিহির সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প368 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ৪

    চার

    এবং একসময় মোকামে পৌঁছাই। মোকাম একটি সুদৃশ্য চৌচালা টিনের ঘর। যেমন নিম্নবঙ্গের বেশিরভাগ শহর, বন্দর, গ্রামে দেখা যায়। ভিত পাকা, লাল সিমেন্টে বাঁধানো। কাঠের দেয়াল, কঠের সিঁড়ি, কাঠের দোতলা। দোতলার আছে আবার একটি শোভন ঝুল বারান্দা– যাকে ব্যালকনি বলে। ঘরটির সামনের দিকের অংশে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। হোটেল। এখানে হোটেল মানেই থাকার ব্যবস্থা নয়। যে দোকানে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা অছে, তাই হোটেল। পিছন দিকে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। একপাশে ফকির সাহেবের নিজস্ব গেরস্থালি। দোতলায় বোধহয় তাঁদের শয়নস্থান।

    একপাশে একখানা ছোটো চৌকির উপর মাদুর পাতা। মাঝখানে একটি কাঠের হাতবাক্স সামনে রেখে ছোট্টখাট্টো মাপের এক মানুষ বসে আছেন। তাঁর সঙ্গে আমার মানসচিত্রের ফকিরের মিল খুবই সামান্য, শুধু একটি জিনিস ছাড়া। তাঁর চোখ। এত গভীর করুণাঘন চোখ আমি আার দেখিনি। চুল অবশ্য সাদা– দাড়িও, আলখাল্লাও পরা আছে। কিন্তু সব মিলিয়ে আমার মনের ছবিটির সঙ্গে চেহারার মিল নেই, শুধু মিল একটি বিষয়ে। তা তাঁর ওই মোহন চোখ, যা ভালোবাসা, করুণা আর আবাহনে বড়ই বাঙ্ময়। মোকছেদ আগে যায়। তাকে দেখে ফকির উঠে অসেন। উনিই যে মোকছেদের মুর্শেদ, ফকির সাহেব, একথা বলে দেওয়ার দরকার হয় না। তিনি মোকছেদকে আলিঙ্গনে বাঁধেন। বলেন– সাঁই তোমাগো ভালো রাখছেন তো? কোনো বালামুসিবৎ নাই তো? তোমার ফেরেস্তারা আছেন ভালো বেয়াকে। মোকছেদ বলে– ফেরেস্তা কবেন না ফকির ছাব। ওগুলো হতিছে এহেকডা আজরাইল। মোর ব্যবসাপত্তর পুরা ডুবোয়ে দেবার তাল করিছে। কাম কাজে মন নাই খালি বদামো করতিছে। ফকির বলেন– আহাহা এমন কও ক্যান? ওয়ারা তো পোলাপান। অরগো কি এহন কাম কাজ করার মতো বয়স? এহন তো ওরগোর খেলাধুলা আমোদ আল্লাদ করার ওমর। ইস্কুল মাদ্রাসায় তো পড়তে পারল না। সবই নছিব। তা এট্টু এডাওডা তো করবেই। তয় মোকছেদ ওরাই তোমার আখেরের চিরাগ। মোকছেদ বলে– চিরাগ না, জান্নামের আগুন কন। মোরে তো জ্বালায়ে পোড়ায়ে খালো, এখন এগুলার কী গতি করি তা ভাইবে উঠতি পারিনে। দেখতি দেখতি এহেকটার বয়স তো কম হল্য নি। তাতে কী? এট্টাও কি কোনো আাদব কায়দা শিখিছে? কিচ্ছু শেখেনি। ফকির সাহেব বলেন– শেখবে, শেখবে। এট্টু ওমর হউক। আর বেশি ধমক ধামক দিও না। কচি পেরান, আহা! কেডা তাগো বাপ, কেডা বা মা। ক্যারেও কি তারা চেনল? মোকছেদ কিন্তু আসলে ওদের সম্পর্কে যা বলে তা ফাঁকা আওয়াজ। সে নিজেই তাদের খামখেয়ালির বড় অংশীদার। তবে উপর উপর সে ভাব বোঝা যায় না। সেখানে সে বড় কড়া মুরুব্বি। কিন্তু ফেরেস্তারা তা জানে ভালোভাবেই। তাই মোকছেদের বকঝকা, গালমন্দ কিছু ধর্তব্য করে না। রাস্তায়, কথায় কথায় জানতে পেরেছিলাম এদের পরিচয়। মোকছেদ বলেছিল– মানষিরই ছাওয়াল, তবি এতিম। মোর তো কেউ নাই আর অরগোও বাপের খোঁজ নাই। মা গুলান থাকতিও না থাকারই সামিল। এরগো বাপ দরকার, আর মোর দরকার ছাওয়াল, তো ওই হয়ে গেল একরকম। তো যে যা কতি চায়, কয়ে যাউক পেরান ভইরে। মুই তা বালডার ল্যাহান জ্ঞেয়ান করি। যারা এ নিয়ে দশ কতা কয়, তারাই এগারে পয়দা করিছে। মুই খালি কুড়োয়ে বাড়ায়ে আইনে আইনে মোর হোডেলে ভরেলাম, তা ভাইজান আপনে কয়েন তো এরা যাবে কনে?

    মোকছেদ কি তাহলে সব দেহপসারিণীদের, অবাঞ্ছিত সন্তানদের নিয়ে তার এই হোটেলের সংসার পেতেছে নাকি? সে-কথা জিজ্ঞেস করা যায় না। কিন্তু মুখের ভাবে সে বুঝতে পেরেছিল মনের কৌতূহল। বলেছিল– যা ভাবতিছেন অতডা নয়। আবার তার থিকে কমও নয়। আসার পথে, কি রূপসা ঘাডে, কি বলেশ্বরের খেয়াঘাডে দেখতি পাননি এরিগেরি মানষির ছাও। ওই যারা ঘ্যানর ঘ্যান করতিছিল, আমারে ন্যান ছার। এট্ট্যা টাহা দেবেন ছার, সব মাল নাওয়ে উডাই দেব ছার। মোর ফেরেস্তারাও তারগো খান্‌দানের। এ খানদান পয়দা করি গেছেন মোগো খানছায়েবরা। যুইদ্দের ডামাডোলে যত মেইয়ে লোক তারা উডায়ে আনেলেন এয়ারা তাগের পুষিপোনা, খালি খানেগো দোষ কলি কী হবে, মোগোর আজাকার, আলবদর সমীন্দির পোয়েরাও কি কম পয়দা করিছে? তা এখন তেনারা যথাস্থানে ইমানদার হইয়ে বইসেছেন। মা গুলান সব বেবুশ্যের খাতায় নাম লিখোয়ে পেট গুজরান করে, আর এরা ভিক মাঙে, চুরি করে, ছ্যাচরামি করে। তো মোকছেদেরি আল্লায় য্যাতডুক দৌলত দিছেন সে তো ত্যাতডুকই করতি পারবে। বেয়াকেরে সে দেখবে ক্যামনে।

    মোকছেদ বলছিল সেই মাৎস্যন্যায়ের দিনগুলোর কদাচারের কথা। খানসেনারা আর রাজাকার আলবদরেরা তখন যে শুধু হত্যা আর লুণ্ঠন করেই ক্ষান্ত ছিল তা নয়, তারা বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে, ছাউনিতে এবং যত্রতত্র এক বীভৎস ভোগের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। নির্বিচারে ভোগ। এমনকী বাঙ্কারগুলোর ভেতরে পর্যন্ত মেয়েদের নিয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষে যখন এইসব বাঙ্কার সাফাই এবং সেনাছাউনি উচ্ছেদের কাজ শুরু হয়েছিল, তখন দলে দলে এইসব হতভাগিনীরা সেখান থেকে বানের জলের মতো বেরিয়ে এসেছিল। তারা অধিকাংশইছিল গর্ভবতী। এদের মধ্যে যারা তাদের স্বজনদের ফিরে পেয়েছিল, তাদের কেউ কেউ গর্ভপাত করিয়ে নিজের বৃত্তে ফিরে গিয়েছিল। তার বেশিরভাগই মধ্যবর্গী মোটামুটি স্বচ্ছল। আর যারা চাষি-মজদুর শ্রেণীর তারা তাদের ফেরার জায়গা খুঁজে নিতে পারেনি। তাদের স্বজনেরা বেশিরভাগই নিহত হয়েছিল নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে। হিন্দুরা ভারতে চলে গিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ আর ফেরেইনি। এক বিপুল সংখ্যক অনাথা মেয়ে গর্ভে খানসেনাদের, রাজাকার, আলবদরদের বীজ নিয়ে খোলা আকশের নীচে আশ্রয় হাতড়ে ফিরেছিল।

    ফকির সাহেব আমাদের সবার পরিচয় নেন মোকছেদের কাছে। আমাকে বুকে জড়িয়ে কুশলবার্তা করেন। মোকছেদ বলে, কড়ার কইরে আনিছি, আইজ মোর মুর্শেদের দরবারে অতিথ হতি হবে। আসলে বোঝলেন নি ফকির সাব, এনাগের ভাবডা মোর পেথমেই ভাল লাইগে গেল। কত লোক তো আসে যায়, সবার দিগিতো তাকায়ে দেখার ফুরসৎ পাইনে। আইজ হঠাৎ কইরে এনার চৌখি চৌখ পড়তে মনডা কলো– এ য্যান চেনা। তানার চৌখির ভাবডা দেখিছেন? ফকির বলেন– ভাব দ্যাখব রাইত ভর। এহন আগে বিবির ধারে মায়গো আমার গস্ত করি, নইলে আবার জান তো বেয়াকই… কী আর কমু। মোকছেদ বলে– সেকথা আর কতি লাগবে না। আপনে বরং ভাইজানের লগে বাতচিত করেন। মুই তানাদের হুজুরে হাজির করি। চল মণিরা। ফকির আমকে হাত দুটি ধরে বড় সমাদরে বসান। বলেন– মোকছেদ বড় ভালো পোলা, মোর নিজের কোনো আওলাদ নাই। এউক্কা পোলা আছেলে, সাঁই তারে নিজের ধারে লইয়া গেছেন। মোকছেদই মোর আওলাদ এহন। ওই যে ভেতরে গেল, এহন কত্‌খুনে বাইরে আয় দ্যাহেন। মনডা বড় ভালো ওর। তো যাউক হেকতা, এট্টু চা খায়েন। মুই ইদিগের কামডা চটপট সার্‌ইরা ফ্যালাই।

    বেলা ডুবুডুবু। ফকির সাহেব তার কাজেকামে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে দু-একটা মামুলি কথা বলছেন। আমরা যে এতগুলো মানুষ অনাহূত অতিথি হলাম তার জন্য কোনো উত্তেজনা দেখছি না তাঁর। মুখের ভাব দেখে বেশ বোঝা যায় তাঁর খুব আনন্দ হয়েছে। বাইরে হাটের ভিড় ক্রমশ কমে আসে। ব্যাপারীরা তাদের অবিক্রীত মাল নৌকায় তুলছে। কারুর বা নৌকা নোঙর তুলে চলতে শুরু করে। নদীর জলে শেষ সূর্যের লাল। অজস্র কচুরিপানার কাফেলা প্রবল স্রোতে সাগরের দিকে ছুটে চলেছে। মাঝে মঝে দু-একখানা যাত্রীবাহী লঞ্চ বা রকেট এসে নোঙ্গর করছে। মানুষজন উঠছে নামছে। হইচই হট্টগোল হচ্ছে। ফকিরের মোকাম থেকে সব দেখতে পাচ্ছি। ছোটো ছোটো মাছমারা ট্রলারগুলো দক্ষিণে সাগরের দিকে যাচ্ছে। ছোটো ডিঙিগুলোতে হাটুরেরা যে যার বাড়ি ফিরছে। আস্তে আস্তে ছইওলা নৌকাগুলোতে ডিব্‌রি বা হারিকেন জ্বালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে এক বিগত কালের স্বাদ, অনুভূতি পাচ্ছি। নদীর ধারের এই পরিবেশ আমার কাছে শাশ্বতপ্রায় ছবি। এর প্রতিটি রং, শব্দ, ছন্দ, ভাষা বা এর পুরো অবয়ব এবং আত্মাটিও যেন আমার একান্ত পরিচিত। মাঝের কয়েক বছরের নাগরিক বিচ্ছিন্নতা বাদ দিলে আমিও তো এর অংশ, অথবা সব মানুষই কি তাই নয়?

    মোকছেদ আসে বেশ খানিকক্ষণ পরে। মুখ দেখে বোঝা যায় সে ভিতরের ব্যবস্থা বেশ পাকপোক্তই করে এসেছে। সে ফকিরকে জানায় যে সবাইকে আম্মাজান অর্থাৎ ফকির সাহেবের জিম্মা করে দিয়েছে, আর কোনো চিন্তা নেই। বউমা এবং মেয়েরা এখন পাটি পেতে আরাম করতে করতে আম্মাজানের সাথি বাৎচিত করতিছেন। তালি ফকির সাব, আপনে ইদিগের কামকাজ গুটোয়ে মেহমানগের সাথি থোর আলাপ আলোচনা করতি থাকেন।মুই ভাইজানেরে লইয়ে এট্টু জেটির তরফ যাই। ঘন্টা দেড়েকের মতো এট্টু নদীর হাওয়া খাওয়ায়ে আনি। তারপর আপনার দরবারে বসবোনে।

    হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ি আমরা। কয়েক কদম এগোলেই লঞ্চঘাটের জেটি। এখন হাট একেবারেই ভাঙা। সবাই যে যার ঘরে ফিরে গেছে তাদের বাকি পসরা আর সওদা করা জিনিসপত্র নিয়ে। স্থায়ী দোকানে ঝাঁপ পড়ে গেছে ; দু-একটা দোকানে শুধু ইলেকট্রিক আলোর বাল্ব জ্বলছে। দূরের একটা আলোকবর্তিকা থেকে দিকনির্দেশকারী উজ্জ্বল সার্চলাইটের ঘূর্ণন দেখা যাচ্ছে। মাঝনদীতে এ ধরনের আলোকস্তম্ভ দেখলে মনে বড় অলৌকিক আশা জাগে। মনে হয় কেউ যেন কোথাও আছে, যে সীমাহীন অন্ধকার নদীর মধ্যেও পথ দেখায়।

    লঞ্চঘাটটির অঙ্গসৌষ্ঠব এবং আবেষ্টনীর বর্ণময়তা মানুষের বদান্যতার উপর নির্ভরশীল নয়। তার স্বভাবে সহজ সৌন্দর্য আছে। মানুষ শুধু তার নিজের সুবিধার জন্য একটি জেটি ভাসিয়ে রেখেছে সেখানে। তার আলোকসজ্জা ঘাটটিকে অবশ্য রমণীয়, মোহনীয় করেছে। মোকছেদ জিজ্ঞেস করে– কী করতি চান? এহানে বইসে আরাম করবেন, না এদিগি উদিগি ঘোরাঘুরি করবেন? অন্ধকার রাস্তায় ঘোরাঘুরির ইচ্ছে আদৌ নেই আমার। তা ছাড়া ভোর-রাত থেকে এই দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দিয়ে এসে এখন আর ঘোরার কথা ভাবতেও পারছি না। নদীর এই জলজ হাওয়া, তার অনুপম সৌন্দর্য, অপার বিশালতা, আর প্রায় অলৌকিক রহস্যময়তা এইসব আমার মতো মানুষের ভাগ্যে কদাচিৎ জোটে। তাই এই নির্জন জেটির একটি একান্ত স্থানে বসে পড়ে মোকছেদকে বলি, ভাইজান, এ জায়গা ছেড়ে আমি এখন বেহেস্তে যেতেও রাজি নই। মোকছেদ ধরতাই দেয়, বলে– হায় হায়, এই না হলি মোর মুর্শেদের দরবারে আসে? বড় ভালো বড় ভালো। আসেন তালি এইখানেই একটু সোগা ঠেকায়ি বইসে থাকি। দ্যাড় ঘন্টার ছুটি লয়ে আলাম। এট্টু বাতচিত কইরে দোস্তালি ঘোনো করি। মাবুদ যেদিন মুখ তুইলে চায়েন, সেই দিনই সুজন মেলে।

    এখন মোকছেদের কাছে এই একান্তে আমার অপার জিজ্ঞাসা। জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা মোকছেদ ভাই আপনি যে, এই, আমাদের জানেন না, চেনেন না, হঠাৎ একেবারে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, আর আপনার মুর্শেদের দরবারে হাজির করলেন, এর অর্থটা কী? সে মানুষটারও তো একটা সুবিধে অসুবিধের ব্যাপার থাকতে পারে। এতগুলো মানুষ আমরা, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ এসে… কী? না– আমরা তোমার অতিথি। এর কোনো মানে হয়? মোকছেদ বলে, মোরা ফকিরি। মোগোদের রকমসকম এরকমই। কিন্তু মুই জিগাই– আপনে তো আর ফকির দরবেশ, আউল, বাউল না যে যেখানে সেখানে, চল মন ভাইসে পড়ি বইলে ভাইসে পড়বেন। তাছাড়া দ্যাখেন, আপনের লগে বিবিবাচ্ছা রইয়েছেন, তাগোর ভালোমন্দ ভাবতি হয়, আপনেও তো সেইসব কোনো কিছু না ভাইবে, চল মন মোকামের পথে, বইলে ভাইসে পড়লেন, এ্যারই বা অর্থ কী? বেপদ আপদ, বিদেশ বিভুঁই কিছুই ভাবলেন না। বলি– আমাকে তো কথাই বলতে দিলেন না। প্রায় জবরদস্তি ধরে নিয়ে এসে মোকামে হাজির করলেন, ভাবনা যে একেবারে হয়নি তা আপনি জানলেন কী করে? মোকছেদ বলে, জানলাম চোখির ভাবে। মোর মুর্শেদের কতায় আপনার চৌখ ফাউকালো, অমনি চেনলাম যে এ তো মোগোরই আথালের। তা যা হওয়ার তা হইয়েছে। আইজগা তো এহানে থাকন লাগবে। তো মুই কতিঠি এহন বিশ্রাম কইরে নেন, রাস্তার ধকল তো কম যায়নি।

    দুজনে বসে থাকি সেই কচা বলেশ্বর ঘটে, যার নাম কালীগঙ্গাও বটে। এরকম এক প্রায়-দিগন্ত বারিধি-নদীর কিনারের মৌনে এসে বোধহয় মানুষ তার তাবৎ লব্ধজ্ঞান, ইতিহাসচেতনা, সমাজবিকাশের অগ্রগতির অহংকার সব হরিয়ে ফেলে। তখন বোধহয় তার চেতনায় এক অনন্ত নিঃশব্দ কল্লোলই শুধু থাকে। সে কল্লোল এক অমোঘ স্বেচ্ছাচারী, তা প্রবাহ এবং নিথর, তাকে কোনো ইতিহাস, প্রাক-ইতিহাস, অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনো গজকাঠিতে মাপা যায় না। সে তখন শুধুমাত্র এক ধারণা অথবা ধারণাও নয় সে যেন এক মহাশরীরী শূন্য যা স্রোতস্বতী আবার নিশ্চলও বা। আমাদের এখন সেই মহাশরীরী শূন্যে নিমজ্জনদশা।

    আকাশে মেঘ যেটুকু আছে তা একান্ত শারদী নিয়মরক্ষা। পঞ্চমীর চাঁদ আছে একফালি, আর অছে তারারা। একসময়ে এরাই সেই মহাশরীরী অনন্ত শূন্যে সীমায় প্রতীক হয়। মোকছেদ আর আমি জেগে উঠি কালের পল অনুপল বিপলের হিসাবে বাঁধা রোজনামচায়।

    একসময় মোকছেদ বলে– এই নদী মোগোর বেয়াক সুখ-দুঃখের কতাজানে। কত যে লহু আর লাশ এনার বুকে ভাইসে গেছে তার আর ইয়ত্তা কি, আর খালি এ নদীর কতাই বা বলি ক্যান। এ দ্যাশে তো নদী খালের কমি কিছু নাই। সব নদী খালেরই একই বেত্তান্ত। আমি বলি– আপনাদের ওদিকে নদী খালে বোধহয় কিছু কম লাশ ভেসেছে। সে সময় তো আমরা শুধু ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, এ-সব জায়গয় খবরই বেশি শুনতাম। অবশ্য কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ এসব জায়গার খবরও খুব লেখা হতো কাগজে। যশোর, খুলনার কথা তেমন শুনিনি। সত্যিই একাত্তর সালের সেই দিনগুলিতে কী যে খারাপ লাগত…

    মোকছেদ বলে– খুলনা, যশোরের কথা যা শুনিছেন তা তো খালি যুইদ্দের খবর। বডার সন্নিকট। ভারত আর পাকিস্তানিদের যুইদ্দের কতাই সে কারণ বড় খবর। আর লাশ ভাসার খবর কি কেউ তহন ল্যাখত, না ক’ত? মুই বলতিছি যখনও ভারত যুইদ্দে লাইম্যে পড়েনি, তহনকার কতা। তহন তো একদিগি মুক্তিসেনা আর একদিগি খানসেনা আর রাজাকার আলবদর।

    আসলে, যখন পর্যন্ত ভারত যুদ্ধে নামেনি তখন এদেশে যে কী ঘটেছে তার সঠিক বিবরণ এ দেশ বা ও দেশের কোনো নথিতে রাখা নেই। কেউ বলে খানসেনারা আর আলবদর রাজাকারেরা মিলে তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে খুন করেছে। কেউ আবার এ-কথাও বলে যে, একাত্তরের সাধারণ নির্বাচনের পর বাঙালি ‘জয় বাংলা’ পন্থীরাই প্রথম মারণযজ্ঞ শুরু করে অবাঙালি, একদা উদ্বাস্তু বিহারী মুসলমানদের হত্যার মাধ্যমে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আছে, পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা বাঙালি হত্যা তথা খেদানোর আগেই অবাঙালি বেশ কিছু মুসলমানকে কোনো কোনো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকে আসতে দেখা গেছে প্রাণের দায়ে। আবার এদিক থেকেও তাড়া খেয়ে ওদিকে ফিরে যেতে। তাদের এদিকে আদৌ আশ্রয় দেওয়া হয়নি তখন, যেমন পরবর্তী পর্যায়ে বাঙালি উদ্বাস্তুদের দেওয়া হয়েছিল। পাঠক, তখন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ঘোষিত হয়নি, কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হয়েছিল। তখন মানবতার ধ্বজাবাহীরা কেউই কিন্তু সেইসব উদ্বাস্তুর রক্ষাকল্পে এগিয়ে আসেননি। কিন্তু সে বিষয়ে বিশদ হওয়ার স্থান এ আলেখ্য নয়। যে-কথা বলছিলাম– ভারত যুদ্ধে নামার অগে এদেশে, অর্থাৎ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের উপর কী যে ঘটেছিল তার হিসাব কেউই সঠিক রাখেনি। কারণ, যাঁরা হিসেব সঠিকভাবে রাখতে পারতেন, সেই বুদ্ধিজীবীরা তো তখন এ পারে।

    মোকছেদ বলে– ভাইজান, খুলনা যশোরেও অনেক লহু, অনেক লাশ ভাইসেছে তার নদী খালির বুক দে। ঢাকা শহর মোগার রাজধানী। বড় বড় লেখনদার, কাগজওয়ালা আর নেতারা সেহানে থাকেন। তানাদের খবর সারা জাহানের মানষি জানতি পারে। আার বাকি জায়গার মানষির খবর কজনা রাখে? যুইদ্দ যখন লাগল, তখন না আপনেরা আর সব জাগার খবরাখবর জানতি লাগলেন। কিন্তু সে সে খবরও কি সব আসল খবর? না, তার বারো আনা জাল। যদি কন– তুমি ক্যামনে জান? তো কই, মোরাও তো তখন ভারতের রেডিয়ো শুইনে ফাউকাতাম। সে খবরের সাথি ঝিকরগাছা, যশোর, ক্যান্টনমেন্ট কিংবা নাভারণের ঘটনার কিছু কিঞ্চিৎ মিল থাকতিও পরে, সঠিক কতি পারব না, তবি মোগার স্বরপুর, আশাশুনি ঝিনেদা বা এই যেখান দে আপনি আয়েলেন সেই রূপসা পারের কোনো ঘটনার কোনো মিলই পাতাম না। তখনই মোরা ভাবতে বসতাম, এ জাহানের কোনো মানষি কি কোনোদিন মোগার এইসব মানষিদের কতা জানতি পারবে না? রেডিয়োতে খালি শুনি যুইদ্দির খবর। কী? না, অমুক জায়গায় দশজন খানসেনা মুক্তিসেনার হাতে নিহত, আর দুইজন মুক্তিসেনা শাহাদাৎ বরণ কইরেছে। দশজোনে দুই জন? তালি তো যুইদ্দ খতম। এরকম ভয়ঙ্কর যুইদ্দ হলি কোন পাডা মুক্তিসেনার সাথে লড়ে?

    জিজ্ঞেস করি– মোকছেদ ভাই, তাহলে মুক্তিসেনারা ওদের কিছুই করতে পারেনি? এ দেশের এত তাজা তাজা ছেলেরা প্রাণ দিল, তারা কি ওদের কিছুই করতে পারল না?

    মোকছেদ বলে– ব্যাপারডা আপনেরে যে ক্যামনে বোঝাব, বুঝতি পারতিছি না। মুই তো তেমন লেখনদার পড়নদার মানুষ না, মোগার দেখন দষ্টব্য ভিন্নাচার। একতা কতি গেলি বিষাদসিন্দু রামায়ণ সাতকাণ্ড কতি অয়। আপনে বরং কয়ডি কাণ্ড শোনেন।

    মোকছেদের সীমাবদ্ধতা শুধুমাত্র শিক্ষাদীক্ষাজনিত সমস্যা নয়। সেখানে অন্য জটিল এবং ভয়ঙ্কর সমস্যাও আছে। মোকছেদের শিক্ষাদীক্ষা যত সাধারণই হোক, তার সে জ্ঞান খুবই প্রখর। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আমরা, এপারের বাঙালি যতটা উচ্ছ্বসিত, আমার বাংলাদেশের সাধারণ অসাধারণ মানুষেরা সবাই প্রায় সেইরকমই। কিন্তু একেবারে সাধারণ যারা, অর্থাৎ যারা মোকছেদের তুল্য মানুষ তাদের কিছু অন্য বিচার আছে। সে বিচার নিয়ে প্রগল্‌ভ প্রাবন্ধিকতা করার চাইতে বোধ করি মোকছেদের ‘কয়ডি কাণ্ড’-র কথা তার মুখ থেকেই শোনা ভালো।

    মোকছেদ বলে– আপনে তো মোর হোডেলডা দেখিছেন। রূপসার পারে মোর হোডেলের ল্যাহান আরও কত হোডেল রইয়েছে। তো যখন জয় বাংলা ভোডে জিতল, তখন পেরায় পেত্যহ তানাদের দেখতি পেতাম। তেনারা দশজন বিশজন একসাথে আসতেন। নানান বিষয় নিয়ে কতাকতি কত্তেন, মোকছেদ ভাই দ্যাশডা এবার মোগার বাঙালিগের। কও জয় বাংলা। মোরা কতাম জয় বাংলা। তানারা কত– দ্যাখো মোকছেদ ভাই, অহন থিকি মোরা আর পচ্ছিমেগো মানিনে। ওরা মোগার লহু চোষে। তোমার হোডেলি কোনো পচ্ছিমিরে খাওন দেবা না, বুঝিছ। মোরা কতাম, বুঝিছি। তারা কত– জয় বাংলা। মোকছেদ ভাই মোগার দলের।

    তা একদিনি শোনলাম ঢাকায় কীসব গোলমাল হইয়েছে, আর শ্যাখ সাহেব এক আজীব গরম গরম বাত কইয়ে ফ্যালেছেন। তো সে-কারণ সৈন্যরা খেইপে গিয়ে নড়াই লাগায়ে দিয়েছে। তখন তেনারা কলেন– মোরাও নড়ব। এইসব যখন হতিছে, তখন জনাকয়েক মেলেটারি একদিন একটা জিপে চইড়ে আস্যে লামল এই খেয়াঘাডে। তো এই দেইখে জয় বাংলার ছাওয়ালরা জাক্কৈর দেল– জয় বাংলা। ভাইজান কব কী, এই জাক্কৈর শুইনে খানেরা বন্দুক তাগ কইরে লামল জিপথে, আর ছাওয়ালগো তহন যে দৌড়, তার আর কী কব। তারা সব রূপসার নদীতে পইড়ে ভাইগে পড়ল। খানেরা আইসে মোরে জিগায়– উও লোগ কোথায় রওতা হায়? মুই কলাম– মুই নাই জানতা, খানা খাতে আয়েল, আপলোগকে দেইখে অমন করল। মোর কোনো কসুর নাই হুজুর, মুই হোডেল কইরে খাতা হায়। তো এই কথা শুইনে তেনারা মোর সোগায় বন্দুকের নলডা লাগায়ে কলেন– আউর যদি ও লোগ আয়েগা, তোমারা গাড় মে গুল্লি করেগা। তো তদবধি জয় বাংলা ছাওয়ালদের আর দ্যখতি পালাম না এহানে।

    মোকছেদ এভাবে আমাকে সব ‘কাণ্ড’ বলতে থাকে। আমি ধরতে পারছিলাম না সে মুক্তিসেনাদের প্রতি সহানুভূতিশীল না বিরূপ। অথবা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বিষয়ে তার কোনো ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল কিনা। এতক্ষণ সে যা বলল, তা এতই নৈর্ব্যক্তিক যে এ-বিষয়ে কোনো ধারণাই করা সম্ভব নয়।

    আমি জিজ্ঞেস করি– আচ্ছা, ওইসব ছেলেরা কোনো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কখনও ওদের সঙ্গে লড়াই করছে এরকমটা আপনি দ্যাখেননি? মোকছেদ বলে– নড়াই কতি যা বোঝায় তা দেখিনি। তবি, আজাকার আলবদরদের ধইরে মারতি দেখিছি। স্বরপুরে, মোর চাচাত ভাই আবদুল গনি, ঘটনার শুরুতে একদিন ওখেনের বাজারে বেমক্কা কয়েল– মুই পাকিস্তানি সাপোটার। তো তার দিন তিনেক পরে এক রাত্তিরি জনাদশেক মুক্তিসেনা আস্যে তারে ডাকল। মুই তহন স্বরপুরেই থাকি। হোডেল তহন নাই। সে কতা পরে কবো নে, ক্যান নাই। তো তারা আইস্যে গনিরে ঘর থনে উডোনে নামায়ল। কলো, মোগার বিচারে তোমার মিত্যুদণ্ড হইয়েছে। তুমি আজাকার, তুমি বাজারে খাড়ায়ি কয়েছ তুমি পাকিস্তানিগো সাপোটার। কী? কয়েছো কিনা? গনির তহন বাহ্য পেচ্ছাপ বাইর অইয়ে গেছে। তবো কোনোমতে সে কলো– মুই ব্যাপরডা বুঝতি পারিনি… ওকতা কলি যে দোষ অয়, মুই জানিনে। সে কলো, মোরাতো গ্যাদাকালথে পাকিস্তান জিন্দাবাদ কয়ে আসতিছি। ভাইজান, গনি ছাওয়ালডা খারাপ ছিল না। বুঝ কম ছিল। কিন্তু সে কতা তেনারা শোনলেন না। কলেন– দ্যাশের শত্তুরেগো, বাইচে থাকার অধিকার নাই। বইলে, গুল্লি। গনি মরল। কিন্তু সে কোনোদিন কারুরই এট্টা চড়ও চোপারও মারেনি– একথা তো মুই জানি।

    আমি মোকছেদকে বললাম– দেখুন মোকছেদ ভাই, একটা দেশে যখন এ রকম কোনো রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে তখন কিছু ভুলভ্রান্তি হয়। এ ঘটনাটা দুঃখের, কিন্তু সেটা ভুলক্রমেই হয়েছে। মোকছেদ বলে– না, আরও কতা এর মধ্যে থাকে। কিন্তু সে বড় কুচাইল কতা। বিষয় ‘গু’র কতাডা মোরা, ফকিরিরা এ্যামনে বলিনে। গনির মিত্যুর মইদ্যেও বিষয় ‘গু’ ছিল। মুক্তিসেনাদের হাতে খানসেনা আর কডা মরিছে? মরিছে তো বেশি আজাকার আর আলবদর। আর তার মধ্যি এই বিষয় ‘গু’র মিত্যুই ভাইজান যিয়াদা। কোথাও জমি, কোথাও দোকান পসার, কোথাও-বা অন্য ব্যবসা বাণিজ্য। আবার মেইয়েলোক নিয়ে কাজিয়াও যে ছিল না তাই-বা কই ক্যামনে?

    বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ-সব কথা নিয়ে কেই-বা ভেবেছি আমরা। মানুষের এ-সব তুচ্ছ স্বার্থের কথা, বিরোধের কথা বৃহৎ রাষ্ট্রবিপ্লবের সময় বেশিরভাগেরই চিন্তায় থাকে না। তবে যাদের থাকে তারা এ সুযোগের বড় নিষ্করুণ ব্যবহার করে।

    মোকছেদকে জিজ্ঞেস করি– আচ্ছা মোকছেদ ভাই, এই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হলো, এত লোক জীবন দিল, কত ঘরছাড়া হলো, কত মেয়ের ইজ্জত গেল– আপনি এ ব্যপারে কী বলবেন? এর জন্য কে দায়ী? কার অন্যায়ের খেসারত এই রক্তপাত? মনুষ্যত্বের অমর্যাদা? মোকছেদ বলে– আপনে কী কয়েন হেডা শুনি। বলি– পাকিস্তানিরা যে এদেশের উপর অন্যায় অত্যাচার করেছে তা তো মিথ্যে নয়। তারা তো নির্বিচারে খুন, ধর্ষণ, লুঠতরাজ করেছে। তাই তাদের দায়ই তো বেশি। মোকছেদ বলে– আপনি যে অত্যাচারের কতা কলেন তা তো কিছু নতুন নয়। এ তো রোজ নিত্য ঘটতিই আছে। খালি পাকিস্তানিদের বললিই হবে? আইজ যদি এ দ্যাশে হয়, কাইল অয় ও দ্যাশে। পরশু আবার অন্য দ্যাশে হয়। এ জাহানে কোথায় কোনদিন এইসব ঘটনা ঘটে না? কতি পারেন? মোর মুর্শেদ কয়েন–মানুষ রতনরে যতন কত্তি হয়। সবের সেরা রতন হচ্ছি মানুষ। তা ভাইজান, এ ভবসংসারে তো খালি দেখতি পাই মানষির অযতনই বেশি। মোরা কেই যা মানষির মান্যতা করি? আর কেই বা তারে যতন করি। কারে বা দোষ দেব, কারে বা দায়ী করব। কোনো কিছুই ঠিকঠাক বুঝি উঠতি পারিনে আর। সে কারণ ভাইজান, মন উতলা হলি মুর্শেদের কাছে আইসে দু-চারখানা গান শুনি সাঁইয়েদের।

    মোকছেদ কি আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়? সে যে ‘কয়ডি কাণ্ড’ বলার ওয়াদা করেছিল, গণি হত্যা তার একটি। কিন্তু তা যত মর্মান্তিক-ই হোক, আমার ধারণা সেটা একটা হুজুগের ব্যাপার, অথবা মোকছেদ যেমন বলছে, তার ভিতর বিষয় সংক্রান্ত প্রতিযোগিতা বা শত্রুতাও ছিল,– সে যা হোক, আমি তার কাছ থেকে আরও কিছু জানতে চাই। অত বড় একটা ব্যাপার একটু তলিয়ে না বুঝলে চলে না। বস্তুত আমার বয়সী মানুষদের জীবৎকালে এ ঘটনাটি সবচেয়ে বড় মাপের ঘটনা, এ-রকমই আমাদের ধারণা, কিন্তু মোকছেদ যেন তাকে আদৌ মহত্ত্বপূর্ণ মনে করে না। এখানেই আমার মধ্যে একটা সংশয় গড়ে ওঠে যা প্রকৃতই অস্বস্তিকর। তাকে খোলাখুলিই আমার সংশয়ের কথা, বিশ্বাসের কথা বলি। জাতীয় মুক্তি আন্দোলন বা সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙক্ষা রূপায়ণের ব্যাপক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, শ্রেণীদ্বন্দ্ব, শোষণ ইত্যাকার যাবতীয় প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করি। কিন্তু মোকছেদকে যেন তার কোনো যুক্তিই স্পর্শ করে না এবং আশ্চর্য, মোকছেদ যখন তার অনুভব আমাকে বলে, বা কোনো ঘটনার উল্লেখ করে, তা যেন আমার অধিগত যুক্তির ঘেরাটোপের বাইরে দিয়েই যায়। আমার যুক্তি, আধুনিক ধ্যান-ধারণা, শিক্ষাগত অহম্মন্যতাকে যেন তা নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে যায়। আমি যদি যুক্তির সাহায্যে কথা বলি, সে বলে তার অনুভবের ভাবে। ফলে প্রতিপদে আমার যুক্তিকে একঘেয়ে মনে হয় নিজের কাছেই। তাই আমি একসময় আমার ঘেরাটোপের বাইরে গিয়ে শুধু তার কথার শ্রোতা নেই। প্রশ্ন-প্রতিবাদে তাকে ব্যস্ত করি না। আমি অনুভব করার চেষ্টা করি তার মুর্শেদের সেই গানের কলি, যা মোকছেদ কথায় বলেছে আমাকে–

    মানুষরতন, কর তারে যতন
    যাহা তোমার প্রাণে চায়…

    গানটি শোনা ছিল অন্যত্র। কিন্তু অনুভবে ছিল না। মোকছেদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাকে অনুভবে ধরার চেষ্টা করি। মোকছেদ বলে– ভাইজান, এসব কতা কতি ভালো লাগে না। অথচ দ্যাখেন ঘুইরে ফিইরে মোগার ওই কতাতেই আসতি হয়। সেই যে আপনেরে কলাম জয় বাংলা ছাওয়াল কডি রূপসার জলে ঝাঁপ দেল, আর মেলেটারিরা মোর গোয়ায় বন্দুকের নল ঠেকায়ি শাসায়ে গেল, সেই হল্য শুরু। তারপর থেইকে দেখি রোজই কেউ না কেউ আসে। ক্রেমে ক্রেমে গণ্ডগোল বাড়তিই থাকল। আইজ এখানে দুইজন, কাইল সেখানে পাঁচজন, এ মত কত মানষি যে গুলি খেইয়ে মরল, তার কোনো হিসেব নাই। এর মধ্যি আবার মেলেটারিগো মেইয়েলোক চাই। হাতি বন্দুক, অসুবিধা কিছু নাই। ছোডোলোক বড়লোক যার যেমন পছন্দ তিন চাইর জনে বন্দুক হাতে ঢুইকে গেল। বাইরে জিপগাড়ি আছে। মেইয়ে পছন্দ কর জিপে তোল, লইয়ে যাও, তারপর কেডা ফেরল, কেডা মরল সে খবর কেডা রাখে। বলতে বলতে মোকছেদের চোখ থেকে জল ঝরে অঝোরে। কাঁধ থেকে গামছা নিয়ে মুখ-চোখ মুছে সে আবার বলতে থাকে–মোর ফকিরে গায়–

    মেয়ে সামান্য ধন নয়, জগৎ করছে আলোময়,
    কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ আছে মেয়ের পায়।

    –তো সেই মেইয়ের এই অবস্থা। মোর হোডেলে যারা খাতি আসত তাদের মুখিই শোনতাম এ-সব খবর। একদিন একজন আধপাগলাপারা মানুষ, মাথায় ঝাডাকাডা চুল, মুখি না-কামান্যে দাড়ি কদ্দিনের কতি পারব না, গলায় তুলসির মালা, দেখি বইস্যে আছেন হোডেলের সামনে। সকাল থেইকে বইসে ছিলেন। ভাবেলাম, পাগল বা ভিক্ষুক হবে। দুফরেও দেখি সেই বইসেই আছেন। তখন হোডেলের খাওনদাওন শ্যাষ। কম্মচারিরা খাতি যাবে, মুই খাব। তো তারে দেইখে মনডা যেন কেমন কইরে ওডল। কাছে যায়ি জিগালাম–ভাত খাবা? তিনি কলেন– মোর বকুল খেইয়েছে? মুই শুদোই, বকুল কেডা? তো সে কলো– ক্যান? তারে নাকি মিলিটারিরা এই হোডেলে আইনে রাখিছে? ভাইজান, ওই মানুষডা বকুলের বাপ। তার বাড়ি ছিল, ওই যেখানথে মোরা রূপসার খেয়া পেরোলাম, সেই বাসরাস্তার ধারে। ওডা বাগেরহাডের এলাকা। বোঝলাম সব বেত্তান্ত। মানুষডার হাত ধইরে ভিতরে আইনে বওয়ালাম। কলাম– ভাই, কতা পরে হবেনে, তুমি আগে চাইরডি খাও দিনি। সে কলো– বকুল, খাবে না? ওর মায় মরা তক মোরা তো এক লগে খাই। ও বাইরে না দিলি, মোর খাওন অয় না। আইজ তিনদিন ওরে লইয়ে গেল, মোরও খাওন নাই, ওরও।– আপনে জানেন? বকুল বাইচে আছে? ও ভাই, তারে এহানে রাইখেছে? সবাই যে কলো। মোকছেদ বলেছিল, সেও জানত না, বকুল বেঁচেছিল কিনা বা তার কী গতি হয়েছিল। সে শুধু লোকটিকে চারটি ভাত খাইয়ে খেয়া নৌকায় তুলে দিয়ে বলেছিল– ভাই, মোর জান নিয়াও যদি কেউ বকুলারি আইনে দিতি পারত, খোদা কসম, মোর জানডা এমন কিছু মাগগি না। মোর বউ নাই, ঝি নাই, গুড়াগ্যাদা কেউ নাই। মুখ থাকলাম কি মরলাম তায়ে কোন বালডা? কিন্তু তুমি ভাই মোর এহানি আর আইওনা, মোর হোডেলি ওসব কারবার হয় না। খোদা কসম।

    কিন্তু মোকছেদের সে অহংকার ঘুচে গিয়েছিল। তার বিশ্বাস ছিল যেখানে যাই ঘটুক, তার হোটেলে সে না-পাক কিছু ঘটতে দেবে না। সে শুনেছিল, এইসব মেয়েদের নিয়ে খানসেনারা বা রাজাকার আলবদর বাহিনীর এ-রকম সব হোটেলেই এসে ফুর্তি করে। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তার হোটেলে এ-ধরনের ঘটনা ঘটার আগে তার লাশ পড়বে, তবেই এ-সব ঘটবে। এখন সে বলে– ভাইজান, কসম খাওয়ার সময় জানতি পারি নাই, আপনা জান কত নেমকহারাম। সাঁই মোর অহংকারের মাগগি আছোলা একখান বাঁশ সেঁধুয়ে বুঝোয়ে দেলেন, ওরে মোকছেদ

    ভেইবে দ্যাখ, ঝকমারি এই দুনিয়াদারি।

    –এ কথাডা যে কলাম এডা মোর মুর্শেদের গানে শুনিছিলাম। সত্যই এ দুনিয়াদারি বড় ঝকমারি। ক্যান? না ‘তোর পিছে পিছে ফিরছে শমন, কোন দিন হাতে দেয় যে দড়ি’। যখন শমন আইসে হাতে দড়ি বাঁধবে, তখন তুমি কেমন করবা, তুমি জান না মন। তাই বড়াই কইরে কতা কওয়া বেআক্কেলেপনা, ওডা কইরো না– মোর মুর্শেদ কয় এই মতন। দ্যাকেন তার তিনদিন পর মোর সাঁই মোরে ছ্যাঁচলেন। মুই ছ্যাঁচলাম। কারে? মোর সাঁইয়েরে? না, নিজিরি। ক্যামনে ছ্যাঁচলাম তাই কই।

    সন্দ্যাকালে চাইরজন মেলেটারি আর তিনজন আজাকার তিনডা মেইয়েরে কোনহান থে জানিনে উডায়ে লইয়ে আলো। দুইখান জিপ। কোনহান দে যেন আবার এট্টা খাসি বেশ বড়সড় সেডাও উডায়েই আনিছে মনে লয়। আইসে লামল মোর হোডেলির সামনায়। একজন রাজাকার খাসিডারে টানতে আন্যে কলো– এডারে কাইডে, ভাল কইরে বানাও। মোরা আইজ এহানে ফুর্তি করব। মোর যে রসুইকার হারুন মিঞারে দ্যাখলেন, সে তখন সবে এইয়েছে। সে কলো, রাইদে-বাইরে দিতি কন দেবোনে। তয় মোরা খাসি এহানে কাডি নে। আপনেরা কাইডে কুইডে দেন। আর এট্টা কতা, ফুর্তিটুর্তি যা করনের, অইন্য জাগায় করলি ভালো হয়। সে যে কথাগুলো কলো, তা খুব অন্যায় না। তবি রাজাকারেগো হাতে আছে অস্তর। তারা কলো– মরতি চাও না বাঁচতি চাও? হারুন মিঞা আর কথা বাড়াল না। ভাইজান, সে রাত্তিরি মোর হোডেলি দোজখ্‌ নাইমে আয়েলো।

    মোকছেদ তারপর যে বর্ণনা দেয় তা লেখা যায় না। কারণ প্রত্যেকেরই মা, বোন, কন্যা, স্ত্রী ইত্যাদি বিষয়ে নিজস্ব মূল্যবোধ থাকে। এমনকী যারা সামাজিক কারণে পণ্যা তাদের বিষয়েও মানুষ হয়তো বা একটা জায়গায় থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু মোকছেদ যা শোনায় তা সে-সবের বাইরে। সে-রাত্রে খানেরা, উপস্থিত হোটেল মালিক বা কর্মচারী, কাউকে তোয়াক্কা না করে, তাদের কোনোরকম সামাজিক বা মানবিক মর্যাদা না দিয়ে সর্বসমক্ষে ওই মেয়েদের ভোগ করেছিল। বিকৃতির যতরকম নমুনা জানা যায় তার কোনোটাই তারা বাদ দেয়নি। একসময় অর্ধমৃত সেই মেয়েদের রাজাকারদের হাতে তুলে দিয়ে তারা বলেছিল– আভি তুমলোগ লে যাও, যো করনা হ্যায় কর লেও। লেকিন হিয়া নেহি। হামলোগ আভি আরাম করেগা। বলে তারা মোকছেদের রাতের বিশ্রামকক্ষে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছিল। খানাপিনা, সম্ভোগ সব একই সঙ্গে চলেছিল। রাজাকার তিনজন মেয়েদের নিয়ে নদীর তীরে কোথাও চলে গিয়েছিল। তাদের উপর নির্দেশ ছিল মৌজ হোনেকা বাদ, তারা যেন এসে রাতভর পাহারায় থাকে। হোটেলের মালিক বা কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে কোনো অসহযোগিতা করেনি। তাই তাদের উপর তারা কোনো ঝামেলা করেনি। হোটেলের একপাশে বেড়া ঘেঁষে রাইফেলগুলো আর দুটো বড় ব্যাগ রাখা ছিল। সে দুটো এবং রাইফেলগুলো তারা ঘরের মধ্যে নিয়ে যেতে অবশ্য ভোলেনি।

    মোকছেদ বলেছিল– ভাইজান, মানষি মানষিরে এত অপছেদ্দা কত্তি পারে এমনডা আগে দেখি নাই। মাইয়েলোকগুলার কথা কব কী, তারা তো তখন মুর্দা। তাদের কোনো হুঁশ পইদ্য নাই। তারা যে উলঙ্গ সে বোধও তাদের তহন ছিল না। কিন্তু মোগার তো ছিল। ভাইজান, এরকম অপছেদ্দাও মেয়েমানষিরে কোনো আদমজাত করতি পারে। মোগার মনে হচ্ছেলো যে, ওই মেইয়েরা, মোরা, আর ওই যে খাসিডারে এরা কাইডে খালো, এর মধ্যি কোনো ফারাক নাই। আঃ ভাইজান, সেই মেইয়ে কডির কতা ভাবলি যে কী কষ্ট মোর বুকডার মধ্যি মোচড়ায় তা আপনেরে বুঝোয়ে কতি পারব না। তাগের চোখির মধ্যি কোনো ভাব ছিল না, মেয়েমানষির চোখি যে ভাব থাকলি তারে মোরা মা কই, বুইন কই, ইস্তিরি কিংবা কইন্যা কই– তাদের চক্ষিতি তার লেশমাত্তর ছিল না। গায়ে বস্তর নেই, সেজন্যি, তাদের হায়া নেই। মুই তাদের চোখের দিগি একবারই তাকায়েলাম আর পারিনি ভাইজান।

    মোকছেদের মুর্শেদ তাকে শিখিয়েছেন, মানুষ রতন, কর তারে যতন, অথবা– মেয়ে সামান্য ধন নয়, জগৎ করেছে আলোময়, কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ আছে মেয়ের পায়। সে অবশ্য এই অনাচার সহ্য করেনি। বড় ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ সেদিন নিয়েছিল সে আর হারুন মিঞা। খানেরা যখন মোকছেদের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর রাজাকাররা মেয়েদের জিপে তুলে নিয়ে দূরে অন্য কোথাও ভোগ করতে চলে গিয়েছিল, তখন সে হোটেলের কর্মচারীদের ছুটি দেয়। ভয়ে তারাও সিঁটিয়ে ছিল। তাই ছুটি হতেই যে যার ঘরে চলে গিয়েছিল। মোকছেদ আর হারুন মিঞা তখন তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। হারুন মিঞা খুব চাপা আর হুঁশিয়ার মানুষ। রূপসা ঘাটে গিয়ে সে আগে দেখে নেয়, সেখানে কোনো ডিঙি বাঁধা আছে কিনা। রাতের বেলা খেয়া শেষ হলে অনেক ডিঙি ঘাটে বাঁধা থাকে। তারপর সে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে দেখে নেয় খানেরা ঘুমোচ্ছে কিনা। অপরিমিত পানভোজনে, সম্ভোগে ক্লান্ত তিন খানই তখন অচৈতন্য। হারুন মিঞা তখন অসীম সাহসে বেড়ার ফোকর দিয়ে কায়দা করে ঘরের দরজা খোলে, রাইফেল এবং ব্যাগগুলো ঘরের দরজার কাছে সাজায়। ক্যানেস্তারা টিনে হোটেলের প্রয়োজনের জন্য অনেকটা কেরোসিন রাখা ছিল। সে সবটা কোরোসিন ওই ব্যাগগুলো, রাইফেল আর কাঠের বেড়ার উপর ঢালে। একটা লুঙ্গিকে দলা পাকিয়ে সেটাও ভিজিয়ে নেয় কেরোসিন তেলে। অত্যন্ত দ্রুততায়, কিন্তু নিপুণভাবে সে এই কাজগুলো করে। তার এইসব কাজকর্মের সময় মোকছেদ হোটেলের সামনে পাহারায় থাকে। কিন্তু রাজাকারদের ফিরতে তখন অনেক দেরি, বা তারা আদৌ ফিরত কিনা তারও নিশ্চয়তা ছিল না।

    এইসব হয়ে গেলে মোকছেদ আর হারুন মিঞা একটা বড় থলেতে দুই-তিন দিনের মতো খাবার-দাবার যা হোটেলে ছিল ভরতি করে নেয়। তারপর দুইজনে নীরবে হোটেল ত্যাগ করে বাইরে এসে দাঁড়ায়। মোকছেদ হারুন মিঞাকে জিজ্ঞেস করেছিল– কাম সাইরে ভাগব কনে? হারুন মিঞা বলেছিল, ডিঙি দেইখে রাখিছি। রূপসা ধইরে দক্ষিণে নাইমে যাব। তারপর আশাশুনির খাল ধইরে স্বরপুর– যশোর, তারপর অবস্থা বুইঝে ব্যবস্থা, দরকার পড়লি ইছামতী পার হয়ি হিন্দুস্তানে যাইয়ে ঘাপ মারব, ওখানে মোর বড় খালার বাড়ি আছে, হিঙ্গলগঞ্জি। এখন মোকছেদ বলে, হারুন মিঞার পেলান পোষ্কার। তো বাইরে খাড়ায়ে সে খালি কলো, আল্লাহ, ভাইবেছিলাম যে, মানষির ওপর মানষি যহন অন্যায় অইত্যাচার করে, তহন তোমার গজব নাইমে আসবেই। তা যখন নামল না, তখন মোগার হাতিই তোমার গজব নামুক– এই বল্যে সে তার সেই কেরোসিন ভেজানো লুঙ্গিখানায় দেশলাই জ্বাইলে ছুইড়ে দেল সেই ব্যাগগুলোর ওপর। মুই জিগালাম– ব্যাগগুলো দেইখেছ? কী আচে ওতে? হারুন মিঞা কলো– হাতবোমা আর গেরেনেড। বইলে হাত ধইরে কলো– ছোডো। মোরা ছুড লাগালাম। ছুড্‌ত্‌ি ছুড্‌তি, ছুড্‌তি যাইয়ে ডিঙিতে চইরে বসলাম। হারুন মিঞা কলো– লাইগেছে, আগুন, জাগা মতো গিইয়েছে। – খোলো ডিঙি। তো ডিঙি খুইলে ভাইসে পড়লাম মোরা স্বরপুরের পথে। খানিক দূর দুজনে জোর বইঠা চালিয়ে আসার পর পেছনে তাকিয়ে দেখতে পেয়েছিল একটা বড় আলোর ঝলকানি আর সেই সঙ্গে কানে তালা লাগানো আওয়াজ। হারুন মিঞা বলেছিল– বুঝিছেন মোকছেদ ভাই, ওই যে আওয়াজ শুনতিছেন, ওগুলা হাতবোমার আওয়াজ। গেরেনেডেরও হতি পারে। সাউয়োমারানির পোয়রা এবারে বুঝুক ফুর্তি করতি কত মজা। এবং তারপর দুজন স্রোতের অনুকূলে ডিঙি নিয়ে তীব্র গতিতে ভেসে গিয়েছিল। না, এ-ব্যাপারে কেউ তাদের শনাক্ত করতে পারেনি। তারা স্বরপুরে নির্বিঘ্নে পৌঁছেছিল। তখন ডামাডোলের বাজার। কয়েকদিন সেখানে থেকে তারা চলে গিয়েছিল সুন্দরবনের পথ ধরে ঘুরে হিঙ্গলগঞ্জে, হারুন মিঞার বড় খালার বাড়িতে। তার কিছুদিন পরেই ভারত যুদ্ধে নেমে পড়ে। তারপর তারা ফিরে এসেছিল বাংলাদেশে যুদ্ধ শেষ হবার পর।

    কাহিনী শেষ করে মোকছেদ বলে– ভাইজান, তহনও দেলে এ বিশ্বাসডা ছিল। কী? না পাকিস্তানিরা মানুষ খারাপ, তাই এরকম কুকম্ম করিছে। আর এ কতাও ভাবলাম– এই সব কুকম্ম করল বইলেই তারগো আল্লায় জয় দেলে না। বাঙালিরা তো আল্লার কুদরৎ পায়েলো। কিন্তু ভাইজান, মোকছেদ মেয়ার আক্কেল পাকা হওয়ার জন্যি আল্লার আরও কিছু দেখাবার ছিল। দ্যাশ স্বাদীন হবার পর তাও বুঝতি পারলাম। আর এ কতাডাও জানতি পারলাম সব মান্‌ষিই জানোয়ার হতি পারে, কিবা খানসেনা, কী রাজাকার আলবদর, কী মুক্তিসেনা। মুখি ভালো ভালো ‘নাড়া’ লাগলেই যে মানষিরি মানুষ ‘রতন’ বলেই যতন করবে– তা না। দেখতি হবে তার হাতি বন্দুক আছে না নেই।

    তখন মোকছেদ খুলনার খালিসপুরের কথা, ঝালকাঠি বন্দরের কথা আরও নানান জায়গার কথা বলেছিল। বলেছিল, খালিসপুরের কতা আপনেরা জানতি পারেননি। জানবেন ক্যামনে? সে কতা তো কাগজি লেখেনি। খালিসপুরি বসত ছিল, আপনাগোর ওখানথে যে বিহারী মোছলমানরা আয়েলো তাগের। যেমন আপনেরা এখানদে গেছেলেন, সে রহম উদ্বাস্তু। তাদের অনেকেই রাজাকার আলবদর হয়েলো একদা মিথ্যা না, কিন্তু ভাইজান, ঠাণ্ডা মাতায় দশ হাজার মানষিরে খতম করাও কি মান্‌ষির কাজ? আর তাগের মেইয়েলোকেদেরও ওই আগে য্যামন কলাম তেমন যে করা হয়নি, তা তো না। তাও তো এই মোকছেদের দেখতি হইয়েছে। মুই আর হারুন মিঞা যে কামডা করেলাম, সবাই কবে, সেডা নেয্য হইয়েছে। কিন্তু মোর মন কয়, যে না সেডাও বোধ হয় ঠিক কাম করি নাই মোরা। সাঁইয়ের বিচার নিজের হাতে নিয়েলাম মোরা, সাঁই-এর বিচার সূক্ষ্ম বিচার। মোর মতো বলদা মান্‌ষির সাইদ্য কি তা বোঝা? আসলে, কী যে উচিত আর কী যে উচিত না তা মুই বুঝি না। কেডাই-বা বোঝে তাও জানি না। জানলি তারে যায়ে জিগাতাম। তাই কতিছিলাম কারে দোষপো, আর কারে যে ভালো বলব তা জানি নে। দোষতি হলিও মান্‌ষিরে দোষতি হয়। আর গুণ কতি চালিও মান্‌ষির গুণ কতি হয়। কী করব কন্‌?

    অনেকক্ষণ ধরে মোকছেদের এই কাহিনী শুনতে শুনতে কোন অতলে তলিয়ে গিয়েছিলাম জানি না। সামনে নদী, রূপসার মতো এই নদীর জলেও সেদিন অনেক লাশ ভেসেছে, অনেক রক্ত মিশেছে এ জলে। তবু অত্যাচারীর নিজস্ব গ্রেনেড বারুদে আগুন দিয়ে উড়িয়ে দেওয়াটাও মন মেনে নিতে পারে না। তার সাঁই-এর বিচারে যা হবার তা হলেই মোকছেদ অন্তরে স্বস্তি পেত। তার কথায় মনে হয়, তার সাঁই যেন সময়, মহাকাল। মহাকালের বিচারের সূক্ষ্মতা মানুষ তার তাৎক্ষণিক ক্রুদ্ধ প্রতিশোধের মাধ্যমে লাভ করতে পারে না, তার বুঝ এরকম। তাছাড়া ওই যে সে বলল– দোষতি হলিও মানষিরে দোষতি হয়, আর গুণ কতি চালিও মান্‌ষির গুণ কতি হয়। এও তার কাছে এক মস্ত ধাঁধা। আর অন্যদের মতো তারা তো বাঙালি-অবাঙালি, হিন্দু-মুসলমান, খানসেনা-মুক্তিসেনায় তফাৎ করতে পারে না। তার মুর্শেদ যে তাকে শিখিয়েছে, মানুষ হচ্ছে মানুষরতন। তাকে যতন করতে হয়। “মানুষ রতন–কর তারে যতন ; যাহা তোমার প্রাণে চায়।”–তালি ভাইজান ওকামডা মোর ঠিক অয় নায়– না কী কন্‌– মোকছেদ শুধোয় কোনো উত্তরের প্রত্যাশা না করেই।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
    Next Article বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    Related Articles

    মিহির সেনগুপ্ত

    বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

    January 20, 2026
    মিহির সেনগুপ্ত

    বিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত

    November 12, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }