সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১২
বারো
রাত এগাটোরায় বৃষ্টি নামে। দুর্গা প্রতিমার মণ্ডপটুকু ছাড়া কাছেপিঠে আর কোনো ছাউনি নেই। পূজা-অঙ্গন মূহূর্তে কাদা। সব আয়োজন লণ্ডভণ্ড করে, মানুষগুলোকে উত্যক্ত, ব্যতিব্যস্ত করল এ বৃষ্টি। ছোটাছুটি, হুড়োহুড়ি, চিৎকার কিন্তু বৃষ্টি নির্দয়।
কীর্তিপাশার বাজারের হরিসভার সরকারি বরাদ্দের টিন আছে। সবাই সুধীর গাইনকে পাঠায় সেখানে, টিন আনতে। টিন দিয়ে পুজোর আঙ্গিনায় ছাপড়া হবে, মানুষজন বসতে পারবে। তাছাড়া ধুনুচি নৃত্যের আসর একটু ছড়ানো হওয়া দরকার। সুধীর গাইন কীর্তন গায়। লোকটা মাতব্বর আছে। বাজারের হরিসভায় প্রায় তার ডাক পড়ে। দশজনে মানে তাকে। তাকেই পাঠানো হয় টিন আনতে। কিন্তু সে ফেরে খালিহাতে। হরিসভার কত্তারা টিন দেয় না। বলে, ওহানে টিন দেওন যাইবে না। ওহামে শ্যাখ, হিন্দু বেয়াকে একলগে খাওনদাওন করে, নাচে কোদে, ওরা মোরা ভালো ঠেহি না। আপাদমস্তক জবজবে ভিজে সুধীর অপমানে ফুলতে ফুলতে এসে বলে, হরিসভার টিনে মুই মুতি। আবার ডাহুক কোনোদিন মোরে কেত্তন গাইতে, হোগা দিয়ো গাইয়া আমু হ্যানে। সুধীর বিলক্ষণ চটেছে।
সবাই মিলে হোগলা চাটাই, কাপড়-চোপড় দিয়ে কোনো রকমে একটা চলনসই বন্দোবস্ত করে। উৎসব বাড়িতে বিশ্রামের প্রয়োজন কম, তাই যা রক্ষা। সবাই এক সময় পান-তামাক, গল্পগুজবে মন দেয়। বৃষ্টি কিন্তু ঝরতেই থাকে। মাঝে মাঝে গল্পগুজবের রেশ কেটে যায়। তখন শোনা যায় বৃষ্টির উদ্দেশ্যে খামার, চুৎমারাইন্যা বিষ্টি, বিষ্টির মায়রে–।
এইসব হুড়াঙ্গামার মধ্যে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টিনের চালার ঘর। তার উপর বৃষ্টির ধারাপাত ঘুমকে অসম্ভব নস্টালজিক এবং গাঢ় করেছিল। সারিসারি স্বপ্নেরা এসে দাঁড়িয়েছিল মগ্নচৈতন্যের অলিন্দে। সবই পারিপাশির্বকতার ফসল। কখন যেন ফুলের সাজি হাতে ষষ্ঠী বা সপ্তমীর ভোরে, পুজোয় কেনা নতুন ইজের আর সাটিনের জামা পরে, পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে ফুল তুলতে যাচ্ছি, কখনও-বা ঢাকের বাদ্য শুনে বাড়ির দরদালান ছেড়ে ছুটে চলেছি, পূজামণ্ডপ বা নাটমন্দিরের দিকে। কখনও যেন নাকাড়া টিকারা আর সানাইয়ের যুগলবন্দী শোনা যাচ্ছে, বাজাচ্ছে ফটিকনট্ট, বেঙা আর ফটিকের ছেলে অমিয়। রাত বোধহয় তখন আড়াইটে তিনটে হবে। সব স্বপ্ন ছত্রযান হয়ে যায় হই হট্টগোল আর কর্মচাঞ্চল্যে। টিন আইয়া পড়ছে, টিন আইয়া পড়ছে। ক্যালাগাছ লাগবে আষ্টডা, বাঁশ কাড গোডা ছয়। এ মুজিবর, আরে হেই ফলনার পো গেলি কই? হ্যাজাকডায় পাম দে। ডাক বেয়াকরে। বারান্দায় এসে দেখি, সে এক ধুন্ধুমার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। অন্তত জনাবিশেক মুশকো জোয়ান প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে, টিনের ছাপড়া বানাচ্ছে অঙ্গনে। দুর্গামণ্ডপে হ্যাজাক জ্বলছে। ঘর এবং মণ্ডপের মধ্যবর্তী অঙ্গনের বিস্তার সেই আলোতে আলোকিত। হ্যাজাকটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মণ্ডপের বারান্দায়, একটি আড়ার সাথে। গোটা দৃশ্যটি আমি দেখছি বাড়ির বারান্দা থেকে। বাড়িটি পূর্ব দীঘল। মণ্ডপটি পশ্চিম দীঘল। বাড়িটির অবস্থান কর্তারা খনার কহবত অনুসারেই করেছেন– পূবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ, উত্তরে গুয়া, দক্ষিণে ভুয়া। ইহা স্বাস্থ্যসম্মত। পূব-দক্ষিণ খোলা। খাও না কত অক্সিজেন খাবে। বসতবাটি আর মণ্ডপের মাঝখানে যে অঙ্গন তা ক্রীড়াভূমি। কখনও তা লাঠিখেলা, ছোরা খেলার রঙ্গস্থল, কখনও ধুনুচি নৃত্যের প্রাঙ্গণ, কখনও বা অঘ্রানি, পৌষালি ধান মাড়াইয়ের খোলা। আবার সম্বৎসরের যখনই দরকার হয়, জারি, সারি, মারফতি গুনাবিবির আসরও এখানেই বসে। বসে কীর্তন, রয়ানী বা মালসীর জলসা।
এখন আমি সেই পূর্ব দীঘলের বা সূর্য দীঘলের বারান্দায় বসে– পশ্চিম দীঘলী মণ্ডপের বিচ্ছুরিত আলোয় যে দৃশ্য দেখি, সে দৃশ্য বড়ই বর্ণাঢ্য এবং হ্যাঁ, অবশ্যই বড় কাঙিক্ষত ধন সে দৃশ্য। এ-কারণে হাজারবার, লক্ষবার কীটযোনি ভ্রমণও যদি বরাদ্দ থাকে তো থাকুক, হে অজ্ঞাত বিধাতা। আমি পুনঃ পুনঃ জন্মাব। আশ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করার জন্য আমি প্রস্তুত। দৃশ্যটি হ্যাজাকের আলো, পশ্চাদ্পটে সপরিবার দুর্গা– আধো আলো, আধো ছায়াতে। মণ্ডপকে এই আলোয় মনে হচ্ছে, রণক্ষেত্রের স্কন্ধাবার, যার মধ্যে রণক্লান্ত সৈনিকরা, কেউ বা হতচেতন, কেউ বা প্রহরায় অতন্দ্র। চৌকাঠ পেরিয়ে সেই সর্বার্থসাধক অঙ্গনের শুরু এবং সেই শুরু থেকে আমাদের সূর্যদীঘলের বিপরীত শুরু পর্যন্ত একটানা ঘনবর্ষণের ঘনবুনোট। তার মাঝখানে হ্যাজাকের আলোর রঙধনুর বর্ণালি বিচ্ছুরণ, “আমি অন্ধকারের হৃদয় ফাটা আলোক জ্বলো জ্বলো’ এরকম একটি কথামালায় একে এখন আমার বাঁধতে ইচ্ছে হচ্ছে।
এমন একটি নয়নরমণ চিত্র সামনে থাকলে, স্বভাবতই পৃথিবীকে তরুণী বলে মনে হয়। উপযুক্ত শাব্দিক দ্যোতনাযুক্ত সংলাপের জন্য কর্ণ মস্তিস্ক হৃদয় তাপিত থাকে। কিন্তু ইহা প্রত্যন্ত বঙ্গের চণ্ডভণ্ড অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানে দুর্বাসা সংলাপ যতটা সহজলভ্য, কর্ণসংলাপ ততটা কেন, আদৌ নয়। যে ভাষা সংলাপের বাহন, এখানে তা দুর্ভাষ্য, অবশ্য তা সর্ববঙ্গীয় অর্থে। চন্দ্রদ্বীপজরা যদি দুর্ভাষা পুত্র হয়– তবে অবশ্যই তা, তাদের সকায় নিরুত্তিয়া। সকায় নিরুত্তিয়া নিয়ে সবাই যদি জাঁক করতে পারে, চন্দ্রদ্বীপজরাই বা পারবে না কেন? অতএব সেই মহার্ঘ চিত্রময়তার মধ্য থেকে সংলাপ আসে–
এই ওরে ও খলইয়া, টিন কয়বান আইছে? কেউ প্রশ্ন করে, উত্তর পায় না, ফলত রাগে এবং পুনঃ জিজ্ঞাসা,খামারসহ–
চুৎমারানির পোয় হান্দছে যাইয়া কোন উন্দুরের অদে? ডাহি যে রাও কাড়ে না ক্যা?
উত্তর সাথে সাথে।– রাও কাড়মু কী? মোর যে হোগা ফাড্ইয়া লৌ জোল দিয়া লামছে, হেয়া নি দ্যাহে কোনো বান্দীর পোয়? তহন থিহা ক্যালাগাছ কাডতে আছি, আর আনতে আছি। কোন ল্যাংচুনির পোয় মেরে কান্ধদেতে আছ? অ্যাঁ?
আধো আলো, আধো আঁধারে– বৃষ্টির ঝমঝমানির মধ্যে এই সংলাপ ভাবা যায় না। আমি পূর্বদীঘলের বারান্দায় অন্ধকারে, সামনে আলো। বারান্দায় এক কোণ থেকে একটি কচি কণ্ঠ ভেসে আসে– কাকিমায় গ্যালেন কই? কাকিমায় অর্থে রায়গিন্নি। কাকিমায় বিনিদ্রা। ঘরের ভেতরের থেকে তাই উত্তর আসে– কেডা, ডাহ কেডা? কী অইছে? ইহা চান্দ্রদ্বীপী সংলাপের বৈশিষ্ট্য। সংলাপ সংক্ষেপে হয় না। তাই উত্তরে অনেক জবাব একসাথে, মুই কাকিমা। মুই ছবুর, ছবুর মোল্লা। আপনেগো রুস্তোম মোল্লার পোলা। কিত্তিপাশার বাজারে বইয়া জামাই মেম্বারে কইলে, ছবুর তুই মীরাকাডি যা। মীরাকাডি মসজিদে টিন আছে, মোর কতা কইয়া যাইয়া লইয়ায়। হরিসভার মাতব্বরেরা টিন দেলে না। হে লাংচুরিন পোয়রা বইয়া খালি বন্দেজ করে। মুই নাওহান লইয়া গেলাম, টিন উডাইলাম, আর আইলাম। দূর তো কোম না, এট্টু দেরি অইয়া গেছে। কাকিমা শুধোন, ও ছবুর, তোরা কতজন আইছ? বইয়া পর। আমি খাওন দিতাছি। অতঃপর একটি বৃহৎ পাত্রে ভাত, অপর দুই পাত্রে মাংস এবং ডাল নিয়ে কাকিমার বারান্দায় আগমন। পেছনে তাঁর সর্বক্ষণের সাথী বুঁচি। কেডা কেডা খাবা আয়ো। বইয়া পড়। রাইত আর বাকি নাই। কোণ থেকে ছবুর আলোয় আসে। কাকিমা তাকে দেখেন এবং– আহারে, তুই দেহি একছের ভিজইয়া গেছ। ও বুঁচি, মাগো, তুই অরে একখান গামছা আর লোঙ্গি আনইয়া দে দেহি। ছ্যামরাডা তো একছের ভিজইয়া গেছে। অর হ্যানে জ্বর অইবে, বলে কাকিমা নিজেই তা আনতে চলে যান।
ছবুর এবং তার সাথীরা খেতে বসে। তাদের দায়িত্ব শেষ। তারা এই ঘোর দুর্যোগে বহুদূরের গ্রামের মসজিদ থেকে টিন এনে দিয়েছে। এখন এখানে যারা আছ, তারা ছাপড়া বানাও, কলাগাছের খাম্বা (খুঁটি) কাটো, বাঁশ আনো, অঙ্গনের কাদা মাটি পরিষ্কার করে, ছাই, বালি, সুরকি ফেলে তাকে শুকনো কর, যাতে পোলপানেগো নাচন কোদনে কোনো অসুবিধে না হয়। এবং সেখানে জনবল যথেষ্ট। তারা সে কাজে লেগে গেছে। বৃষ্টির তোড় অগ্রাহ্য করে, খামারের উদ্দীপক সঞ্জীবনী সহযোগে, তারা কর্তব্য কর্ম করছে। ছবুর এবং তার সাক্ষীরা খাচ্ছে, গল্প করছে। আমি এককোণে একটি চেয়ার আশ্রয় করে সিগ্রেট ফুঁকছি। সাত পাঁচ ভাবছি।
আমি এখানকারই ভূমিপুত্র। কিন্তু সে নেহাৎই জন্মসূত্রে। এখন তো আর সে দাবি নেই। এখন তো আমি বিদেশি। কিন্তু এই মানুষগুলোর বিচারে বা চৈতন্যে, সেরকম কোনো আভাসও নেই। তারা শুধু জানে– আমি এ বাড়ির জামাই, দুলা। আমার বাড়ি এখান থেকে কোশ দুই দূরের অমুক গ্রামে। আমি কইলকাত্তায় থাকি। এরা কইলকাত্তা বলতে তামাম হিন্দুস্থান বোঝে। সে এক মস্ত শহর। যারা বরিশাল, ঢাকা বা অনুরূপ শহর সম্পর্কে খানিকটা ওয়াকিবহাল, তারা ভাবে কইলকাত্তা বা ইণ্ডিয়া, সেরকমই একটা ব্যাপার। সেখানে বড় বড় বাড়ি আছে, পাকা রাস্তা আছে, সেই রাস্তায় মোটরগাড়ি, রিক্সা এইসব চলে। সেখানে কল টিপলে জল, বোতাম টিপলে আলো। সেখান ছাইছাতা বেয়াক কিছু পয়সা দিয়া কেনতে অয়– এইসব। আবার এরকমও ভাবে যে, সেখানকার মাইনসেরা নিত্য তিরিশ দিন খালি মাজইয়া ঘষইয়া, সাজইয়া গুজইয়া থাহে। হ্যারগো প্যাকের (পাঁকের) মইদ্যে পাও দেওন লাগে না। হ্যারগো কোনো দুঃক নাই, খালি সুহে থাহে।
ছবুরের এক সাগরেদ শুধোয়, ছবুর ভাই, এই যেন মসজিদের টিনের ব্যবস্থা জামাই মেম্বারে করলে, হেতে মোরগো গুণা অইবে নাতো?
ক্যান গুণা অইবে ক্যান?
ব, এডা হিন্দুগো পূজা না? হেহানে শ্যাহে গো আল্লার টিন লাগাইছে, আল্লায় যদি কোদে?
কোদে যদি তয় কুদুক–।
আউয়া আউয়া ছিয়া ছিয়া। তুমি কও কি ছবুর-ভাই, তুমি না মোল্লা বাড়ির পোলা?
হেথে কোন বালডা ছেড়া গেছে?
আল্লায় যদি কোদে হেলে তো ক্যামৎ, হেলে মোরা যামু কই? সে গভীর সংকটে ভোগে। ছবুর দেখা যায় বেশ ক্রান্তদর্শী। সে বলে যামু? তোর নানার হোগার মইদ্যে যাইয়্যা ঢুকমু হ্যানে, অইছে? এরপর আর সংলাপ হয় না। কিন্তু তাতে সমস্যা মেটে না। মেটার কথাও নয়।
ছবুর তা বোঝে। তাই পাল্টা প্রশ্ন করে সমস্যাটা একটু লঘু করার চেষ্টা করে। বলে, তয় কি এতগুলো মানুষ হারারাত্তির পেহার ভোগবে? পেহার অর্থে ক্লেশ।
মানুষের দুঃখ কষ্টই অতঃপর বিচার্য হয়, এবং প্রথম প্রশ্নকর্তা বিজ্ঞের মতো মাংসের হাড় চিবোতে চিবোতে রায় দেয়– কতাও হত্য। মাইন্সের তো হেলে সাইদ্যের পেহার অইবে। কামডা হেলে বালোই অইছে, কী কও ন্যাভাই? ন্যাভাই বা বড় ভাইয়ের তখন উত্তর দেবার মতো অবস্থা নয়। সে শুধু শিরোশ্চালনে সায় দেয়। তার মুখ ভর্তি তখন হিন্দুগো পূজার না-পাক পাডার গোস্তো।
এভাবেই রাত শেষ হয়। সকালের আলো চোখেমুখে পড়তেই মালুম হয়, আকাশ নীলাজ নীল, এর নাম শরৎ। দক্ষিণ জানালায় চোখ পড়তে গোটা শৈশব চঞ্চল শালিখের মতো নাচতে নাচতে, ভিজে পায়ে এসে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। জানালার পুরো ফ্রেমটি জুড়ে একটি স্থলপদ্ম গাছ আপাদমস্তক বনবালা। মন বড় সুখে বিস্তার পায়। পূর্বদীঘলে দেবীর কিরীট ছয়ে, সূর্যের সপ্তরশি। প্রত্যেকটি রশিকেই পৃথক পৃথক বর্ণে মহার্ঘ চিত্রময় দেখি। এ সময়, একটিই শব্দ বা ধ্বনি, প্রাণ, মন, হৃদয়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা শোভন, ‘আহা’! এর অধিক যারা বলে, তারা হয় বাতুল নয় বাচাল। চন্দ্রদ্বীপজরাও এই ধ্রুপদীক্ষণে নির্বিকল্প ভাবসমাধিতে আচ্ছন্ন থাকে। যতক্ষণ সম্ভব ছিল, এই মহিমায় ডুবে। এক সময় স্বাভাবিক ভাবেই কলকোলাহলময় সংসার। আবহমণ্ডলে শব্দদূষণ। নৈমিত্তিকতার প্রবাহ। কর্ম। কর্মের শব্দ। লালনের চেতাবনি মনে পাক খায় ‘যেদিন নিঃশব্দ শব্দেরে খাবে’। কিন্তু সে যেদিন খাবে, সেদিন খাবে। আমিও এখন সশব্দতাই চাইছি। আমার চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে, জাগো শব্দ, জাগো শব্দ। এ শব্দ তো নাগরিক শব্দ নয় যে কর্ণ ঝালাপালা হবে। এই শব্দপ্রবাহ চিরন্তনী, তাই এই শব্দের দূষণও অনিরুদ্ধ। কিন্তু এ প্রকৃতির জষ্ঠরজাত, তাই এ দূষণে ক্লেদ নেই। জীবন এ দূষণকে, অক্লেশে আত্মস্থ করে।
বেলা বাড়ে। যে চেয়ারটিতে বসে, এইসব কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম, সেখানেই বসে আছি। এখানে সময় বড় শ্লথ। গোটা পরিবেশই একটি অসামান্য শ্লথতায় যেন। অথবা নাগরিক অতি দ্রুততার জীবন থেকে হঠাৎ এমন স্থানে এসে পড়লে, এমনই বোধহয় হয়, হয়তো। চারদিকে ঘিরে আছে অনন্ত স্বজন। তারা জরায়ুজ, উদ্ভিজ্জ এবং অণ্ডজও। এর মধ্যে মেহগনি, চম্বল, সেগুন ইত্যাকার উদ্ভিদরা অধিকন্তু, ঠিক যেন স্বজন নয়। স্বজন উদ্ভিদের তো সীমা সংখ্যা নেই, তারা আছে পায়ে পায়ে, গায়ে গায়ে, প্রাণে মনে, স্পর্শে অনন্ত। তারা কারোর আমন্ত্রণের অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু অতিথি বালকতরুরাও এক্ষণে মহীরূপ। এরা নবাগত। ওই যাদের কথা বললাম মেহগিনি ইত্যাদি। কারণ তাতে পয়সা আছে। ঘরের ছেলে রেইনট্রি সেও তো একদিন সাগরপার থেকেই এসেছল। নতুবা ওই নাম কেন? দ্যাশের মাইনসেরা অবশ্য একে শিশু, শিরিষ নানান নামে পরিচয় দেয়। কিন্তু তাও তো ঐতিহ্যে আড়াই-তিনশো বছরের কৌলিন্য পেয়ে এক্ষণে ঘরের ছেলে। তার পাতা বৃষ্টি নির্ঝরের সাথেই তুলনীয় বলে, ভূমিপুত্ররা তাকে বলে, রেন্ডি। এ বৃক্ষ আদৌ শিরিষ নয়। শিশু তো নয়ই। তবে খাপ খেয়ে গেছে এ-দেশের মাটির জরায়ুতে, একথা বলতে হবে। নদীর কিনারে, খালপারে পুঁতে দিলে, আর কথা নেই। মদ্দা ছাওয়ালের ল্যাহান তরতরইয়া বাড়ে।
এই আবেষ্টনে যখন ভোর সকালের পূর্ণাভায় কলাপ মেলে অঙ্গনকে প্রতিভাত করে, তখন সেখানে দেখা যায় একটি জমায়েত। ভোর থেকে তা গুটি গুটি দানা বাঁধছিল। এখন পূর্ণ কলেবর পেয়েছে। সুতরাং একসময়, সেই জমায়েত থেকে আহ্বান আসে, এই অলস কেদারায় শায়িত মনুষ্যের প্রতি, দুলাভাইয়ের একবার এদিকে আওন লাগে। এক অসামান্য, অর্ধপ্রস্ফুটিত স্থলপদ্মের মতো কিশোর-ভাষে আফনেরে মোণ্ডপের হাইত্নায় বোলায়। তখন অলস এলায়িত মনুষ্য গাত্রোত্থান করে এবং মণ্ডপের হাতার উদ্দেশ্যে যায়। তার পিছনে পিছনে চা-বরদার।
গিয়ে দেখি সারারাত্রির সংগ্রামে বিজয়ী, বর্তমানে জয়স্কন্ধাবারে শায়িত এবং অর্ধশায়িত সৈনিকেরা সবাই জীবিত এবং অক্ষত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে তারা বিজয়ী। কিন্তু কী এক অনিবার্য কারণে সেখানে এক বিচারসভার আহ্বান করা হয়েছে। সে প্রায় মার্শাল কোর্টের সমতুল্য। দূত পাঠানো হয়েছে, গতরাতের মসজিদের টিন আনয়নের জন্য নির্দেশদাতা জামাই মেম্বারের উদ্দেশ্যে। চা উপস্থিত হলে জনতা উল্লাসে ধ্বনি দেয়। রাজবাড়ির নসু, যার পরিচয় আগেই দেয়া হয়েছে যে, সে ভাবীর দেওর, একখানা চেয়ার এনে আমাকে আপ্যায়ন করে। বলে, বয়েন দুলাভাই বয়েন। কাইল রাতে ঘুমটুম ভালো অইছেলে তো। যা পেহার।
বাস্তবিক পক্ষে, বলতে গেলে, গতরাতের ‘পেহার’ আমার জন্য কোনো ক্লেশ সৃষ্টি করেনি। আমি তো দিব্যি ছিলাম। শুধু ঘুম খানিকটা বিঘ্নিত হয়েছিল। তা পার্বণের বাড়িতে অবশ্যই হতে পারে। ক্লেশ বা ‘পেহার’ যাদের হয়েছিল, এখন তারাই জিজ্ঞেস করছে আমার কোনো ক্লেশ হয়েছিল কিনা। এ কথার কীই-বা জবাব হয়।
জামাই মেম্বার ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার। বেঁটেখাটো। থুতনিতে সাদা দু-গাছা নূর। মাথায় মুছুল্লিছাট চুল। পরনে সাদা কলিদার পাঞ্জাবি এবং চেকলুঙ্গি। সাদামাটা চাষি চেহারার মানুষ। চোখেমুখে সরল সোজা চাষিভাব– যেন জগৎ সংসার ওইভাবেই বুঝে এবং চিনে নেবে সে। তবে গ্রামীণ স্বভাবজ প্যাজ পয়জার নেই। তাকে নিয়ে আসে বেলায়েৎ। সবাই এই লোকটিকে ডাকে জামাই বলে। কিন্তু সে যে ঠিক কার জামাই তা বোঝা যায় না। এখন, এই সকালে জামাই ‘আইডলি’ অর্থাৎ আসশ্যাওড়ার ঠাল মানে ডালের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে আসে। নিতান্ত উদাসীন ভাব। মাঝে মাঝে দাঁতন ঘষে, আর পিচ ফ্যালে। তার আগমনের সাথে সাথে মণ্ডপের জমায়েতে ‘জাক্কৈর’ পড়ে, জামাই মেম্বার জিন্দাবাদ। সবাই তাকে খাতির করে বসায়। ওরে চা দে, নাস্তা আন। মেম্বারে আইছে। আয়েন মেম্বার আয়েন। আছেন তো বালো? মাইয়ার খবর কী কয়েন। এরকম একরাশ প্রশ্ন চারদিক থেকে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। জামাই নিরুত্তর। সুর্মা মাখানো ছোট্ট ছোট্ট চোখে জামাই সন্দিগ্ধ তাকায়। জমায়েতের ছোকরাদের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করে। মুখের ভাবে খুব একটা প্রসন্নতা মালুম হয় না।
ছেলেরা প্রথমে তার সুখ্যাত শুরু করে। দশটা গেরামের মইদ্যে, দুলাভাই, মোগো জামাইর মতো মানু পাইবেন না। একতা আপনেরে মোরা লেইক্যা দেতে পারি। দ্যাখলে অইবে কি ঐডু, শেহর বাহর পৌঁছাইছে মক্কা তামাইত। এই তো এবার আবার মেম্বর অইছে, তয় না মোরা বোলাই জামাই মেম্বর কইয়া। কত বড় সোম্মান, হেডানি ভাবছেন। জামাই চুপচাপ দাঁতন করে চলেছে। মাঝে মাঝে পিচ পিচ করে থুথু ফেলছে। সামনে চায়ের কাপ দেওয়া হয়েছিল ইশারায় ‘না’ বলে সরিয়ে নেবার ইঙ্গিত জানাতে সবাই হই হই করে ওঠে, ক্যান, চা খাবা না ক্যান? পূজা গোণ্ডার বাড়ি ব্যান্ইয়াকালে আইছ, চা খাবা না, এডা ক্যামন? একজন বলে, মুখ ধোয় নায়, হ্যারলইগ্যা বোধায়। নসুর হাতে পূজা বাড়ির সব খরচখরচার ভার। সে ম্যানেজার। সে বলে, চা না খাইলে দুই ট্যাহা নগদ। দিনকাল মাহেঙ্গা। চা মাগনা পাওন যায় না। জামাই তার দিকে ক্রুদ্ধ তাকায়। বেলায়েৎ বলে, আইথে নি চায়। যাইগা দেহি, একজোন এদিক আরেকজন ওদিক। পোলাডা উডানে প্যাহের (পাঁকের) মইদ্যে হোগা ঘষে। বোজলাম কিছু এট্টা অইছে। কইলাম যে তোমারে বেয়াকে পূজার মোণ্ডোপে বোলায়, লও যাই। হে কতা হুইন্যা মাইয়ার দেহি হোগা লাড়া দিয়া ওশ্যায় আর এ হালায় উডইয়া হ্যাডা দেলে মোর লগে। হারা রাস্তা মুহে কোনো রাও নাই, খালি ওই আইডলির ঠাল ঘষতে আছে তো ঘষতেই আছে। ও চ্যাডের মাতা মুহের থিহা লামায়ই না।
জামাই বেলায়েতের দিকে ক্রুদ্ধ তাকায়। কিন্তু মুখে কথা নেই। তখন মুজিবর শুরু করে, আসলে দোষ মোগো। দুলাভাই, হোনেন যেন খেয়াল করইয়া। এ মানুডা ভালো। মোরাই হ্যার হোগাডা মারছি। যদি জিগায়েন ক্যামনে, তো কই, মোরা যে হেরে মেম্বর বানাইছি, এয়া হে চায় নায়। নসু বলে, চায় নায় তো, অইছে ক্যালায়? আর অইছেই যহন তহন খেতিডা অইছে কী?
মুজিবর চুক চুক আওয়াজ করে, বলে, হেয়া তুমি বোঝবা না। জামাই মোগো সচ্চরিত্তির মানু। হ্যারনি ওসব ছল্লিবল্লি পোষায়। দ্যাহনা, চেয়ারা হান, আল্লা, নবী আর মোমেন ভাইগো ছাড়া কিচ্ছু বোজে?
নসু বলে, তয় যে ওই যাউক, হেকতা কমু না। বেলায়েৎ বলে, না কবানা। হেকতা এহন আর মোগো কওন উচিত? জামাই হ্যার লাইগ্যা জইরমানা তো দেছেওই।
খলিল ঠাহুর এ-সময়ে রাশিকৃত মুড়ি, বাতাসা, নারকোলের নাড়ু ইত্যাদি একখানা কাঠের বড় বারকোশ সাজিয়ে আনে। বলে, এই অইল আউজগার নাশতা। য্যার খাইতে হয় খাও, না খাইতে অয়, খাল পারে যাইয়া হোগা মারাও, আর কিছু পাওন যাইবে না।
জমায়েত যেন তখন মুহূর্তে একটি একক শরীর যার অসংখ্য হাত এবং মুখ। খানিকক্ষণ মুড়ির মচমচ। জামাই চুপ তখনও। দাঁতন ফেলে দিয়েছে সে। খাওয়া চলছে জমায়েতের। কী ভেবে জামাই উঠে পড়ে। টিউবয়েলের কাছে যায়। ধীরেসুস্থে মুখ ধোয়। কাঁধের গামছা দিয়ে হাতমুখ মোছে। জমায়েতের কাছে ফিরে এসে যথাস্থানে বসে। এর, ওর তার দিকে তাকায় এবং প্রথম বারের মতো মুখ খোলে, খলইয়া, মোর লইগ্যা চা লইয়ায়।
–একবারে আনমু। এহন চাইরউগা হুড়ম্ সান্দাও। মুখ দেইখ্যা বোজতে পারছি কাইল রাইতে মাইয়ায় খাওন দেনায়। জামাই কথা বাড়ায় না। বারকোশ থেকে মুড়ি তুলে অন্যমনস্কভাবে খেতে থাকে মুঠোমুঠো। তখন আবার জমায়েত তার সুখ্যাত শুরু করে।– কয় বোলে মেম্বারি মুই পারমু না। ছল্লিবল্লি মোর ভাল লাগে না। মিছা কইলে, আাল্লায় য্যান হোগায় খাজুর গাছ হান্দায়–জামাই মোগো আসলেই ভালো। ইউনিয়নের পয়সাপাতি মারে না। খালি, ওই যে নসুবাই কইলে, কিন্তু না, হে কতা কমু না। হেয়া জামাই নিজের ইচ্ছায় করে নায়। নসু বলে, হ, নিজের ইচ্ছায় করে নায়– বেয়াকে হ্যার হাতায় করাইছে। তোগো গতিক, মন লয় কবে কইয়া ফ্যালাবি, ওই যে হ্যার পোলাউগ্যা অইছে হেয়াও নিজের ইচ্ছায় অয় নায়, যাউক, সক্কালবেলা, আকতা কুকতা কমু না। কিন্তু জিগাই, ও হালার পো হালায় কতা কয় না ক্যা? ওডার অইছে কী? খলিল বলে, মাইয়ায় বোদায় দেছে বেনইয়া কালে মুড়ইয়া পিছা দিয়া আচ্ছামতন। বেলায়েৎ বলে, দেতে পারে, যা অবোস্তা দ্যাখলাম যাইয়া। মন লয়, মুই যাওনের আগে, কিছু কারবালার যুইদ্ধ অইয়া গেছে।
নসু এদের সর্দার। সে বেলায়েৎকে জিজ্ঞেস করে, তুই অত ফয়জোরে হেহানে গেছিলি ক্যা? বেলায়েৎ জানায় যে সে গতরাত্রের মসজিদের টিন সংক্রান্ত ব্যাপারে কিছুটা উল্টোপাল্টা আঁচ করেছিল। তাই সকালে গিয়ে জামাই-এর খবর নেয়াটা প্রয়োজন বোধ করে। বলে, জানেনই তো, মোগো মাইয়ায় মোল্লাগো বেডি। তো, যাইয়া দ্যাখলাম, মাইয়ার মুখখান সতীশইয়া কামারের তাফালডার ল্যাহান। খালি ফুলকি ছেড়ে। “তুই হেয়া দেখলি?” নসু শুধোয়। ‘তয় কই কি? মন লয়, হেইয়ার লইগ্যাই একডাহে উডইয়া আইলে।’ নসু এবার একটু ঘন হয়ে বসে জামাই-এর কাছে। শুধোয়, জামাই, হাস্যকাব্য যাউক, হয়ত্যো কও, অইছে কী? এবার জামাই মুখ খোলে পুরোপুরি। বলে, না হেয়া কিছু না। গাইল খামার দেলে, পিছা পুছা মারলে, বুজি, মাগিরা ওহরম হরেই। তোমাগো ধারে মোর নিবেদন, এহন তোমরা কেউ হাসকাইব্য করইও না। পাও ধরি হাত ধরি। কতাটা এট্টু বুজইয়া দেহ। মাগি কাইল বেনইয়া রাইত থিহা যা আরাম্ব করছে, হেয়া খুব খারাপ কতা।
জমায়েত এখন আবার একটি একক। সেই একক শরীরটি এখন একটিই প্রশ্নে সশব্দ।–মুহের মইদ্যে য্যান্ নানাজানের হোলডা ঢুকাইয়া বইয়া রইছ। কোনো কতা কও না, রাও কাড়ো না। যা অইছে কইয়া ফ্যালাও।
কমু আর কোন চ্যাটটা। মাগি মোরে শাসায় আর উফাল মারে। কয়, আফনে হিন্দুগো মোণ্ডোপে টিন দিলেন ক্যালায়? হ্যারগো হরিসভার টিন হ্যারা দেলে না, আফনে মসজিদের টিন দিয়া দেলেন– তো মুই কই, ক্যা, দিছি তো হেথে তোর হোগা ফাডে ক্যান? হেহানে তো মোরগো পোলাপানরাই নাচে কোদে। তো, হে চুৎমারানী কয়, এয়া য়িন্দুয়ানী। এয়া নাপাক্। কয় বোলে, এতে দীনের বাইগো দেলে ব্যাতা লাগে। তো মুই কই, ব্যাতা লাগে মলম লাগা। বোজো নসু বাই, মাগি মোরে না-পাক শেহায়। দীনের বাই শেহায়। ক্যাডায় য্যান্ হ্যারে শেহাইছে, এয়া য়িন্দুস্থানী, এয়া নাপাক্। হে মাগি আরও কইছে, বোজজো। কয় বলে যে, এয়া যে মেম্বারে করলে, হেয়া তো য়িন্দুগো ভোডের লালচে।। এইসব কারণে মোর মনডা ব্যাজার অইয়া গেলে। কওছেন দেহি, এয়া ক্যামন কতা?
এ সব কথা অবশ্যই খুব খারাপ কথা। কিন্তু তারও তো অনেক শিকড়বাকড় থাকে। জামাই মানুষটা বড় সরল। সহজসিধে ধর্মকর্ম এবং গেরস্থালিতে তার বিষয়আশয়। ঘোরপ্যাঁচ যেখানে থাকবার তা তো থাকেই। নসু সে ঘোরপ্যাঁচের সন্ধান জানে। সে সব নিবিষ্ট হয়ে শোনে, কিন্তু রায় দেয় নিষ্ঠুরের মতো। বলে, কথাডা মাইয়ায় খুব এট্টু মিত্যা কয় নায়। তুমি মুছল্লি মানু, য়িন্দুগো দুগ্গা পূজার ছাপড়া বানাইতে, দেলাইবা ক্যালায় হে টিন? মোরা যদি দেতাম, হ্যার, এট্টা অত্থ থাকতে। তুমি মুছল্লি, মোল্লাবাড়ির জামাই, তুমি দেলা ক্যালায়?
বোঝা যাচ্ছিল না, নসু রগড় করছে, না সত্যি সত্যি জামাইকে এ সব বলছে। তবে জামাই এসবে খুবই যে চিন্তিত, তা বোঝা যায়। বলে, তয় তুমি কইতে চাও, মাগি যেয়া কয়, হেয়া ঠিক? নসু বলে, কইলাম তো। হে খুব এট্টা মিত্যা কয় নায়। জামাই এবার প্রকৃত রাগে, বলে, তোরগো ধারে আই, তোরগো শলাপরামর্শ লই। হ্যার লইগ্যা তোরা হোগা হাতে পাও, না? তয় হুইননা রাখ, তোরগো যদি বিচার অয়, তয়, জামাই তোগো কতা বাল দিয়াও মোছপে না হে কতা কইয়া দিলাম, হ। জামাই এখন আর কোনো রাখঢাক রাখে না। সে ভয়ানক ক্ষুব্ধ। বলে, হিন্দুগো ভোডে তোগো মেম্বরিতে মুই মুতি। বোজ্ঝো, মুতি মুই। মুই মুছল্লি থাহি, যা থাহি দেলে ছাফ্। কোনো প্যাজ পয়জার নাই। মাইনসের অসোবিধা অইবে বুজইয়া এট্টা কাম করলাম। এহন বেয়াকে আরাম্ব করছ মোরে টালাইতে। বুজঝি মোর যা বোজার। তোরা বেয়াকে মোর মাগির দলে। হে চুৎমারানি, তোগো হাউর পাইয়াই বাড়ছে। হে যে এহন মোরে ওঠতে বইতে পাছা লাড়াদে, হেয়া তোগো সুবাদে। নাইলে হে এত বাড়তে পারে?
জামাই এবার বেশ গরম। নাগারে খামার দিতে দিতে সে উঠে পড়ে, বলে, মুই আর তোগো মইদ্যে নাই। আইজ থিহা মুই জুদা। তোগো মেম্বারির ক্যাতায় আগুন, তোগো লগে মুই আর কোনো দিন কতাই কমু না। আর হুনইয়া রাখ, ও মাগিরে মুই তালাক দিমু, দিমুই দিমু। তালাক দিয়া মুই মক্কা যামু পোলারে লইয়া। জামাই প্রায় ঝড়ের বেগে ‘লৌড়’ দেয়। জমায়েতের যুবজন, জনা তিন-চারেক তার পেছন পেছন ছোটে। জামাই ছোটে, তারাও ছোটে। শেষ তক, জামাই ধৃত। তারা জামাইকে প্রায় তুলে নিয়ে আসে আকাশে ভাসিয়ে। জামাই ছটফট করে আর কোদে, আর বলে, মোরে ছাড়াইয়া দে। মুই এহনই যাইয়া মাগিরে তালাক দিমু। তালাক তালাক বাইন তালাক দিয়া হ্যার বাফের বাড়ি খ্যাদাইয়া দিমু। বলেজামাই আবার ওঠার উপক্রম করে। এবার নসু তাকে হাত ধরে আদর করে শান্ত করার উপক্রম করে। বলে, ওরহম করে না। ঠাণ্ডা হও। বয়স অইছে। বেশি কোদলে যদি এট্টা ভালমন্দ ঘডইয়া যায়, পোলাডারে দ্যাখফে কেডা। ম্যালা রাগ দ্যাহাইছ, এবার ছ্যাক্ দেও। মুই দুই-চাইরউগা জবান কই, হোনো। জামাই বসে। বলে, কী কবি ক।
নসু তখন জামাইকে নিয়ে এক মারাত্মক প্রহসন রচনা করে। এই প্রহসনের সংলাপ সাতিশয় ডিপ্লোম্যাটিক। রঙ্গরসের মধ্যে এমত গুরুতর সমস্যার বিশ্লেষণ আগে কখনও দেখিনি। নসু বলে, জামাই কামডা ঠিক হয় নাই।
কোন কামডা?
এই মসজিদের টিন দুগ্গা মোণ্ডোপের লইগ্যা ব্যবস্থা করলা– হেই কতা কই।
ক্যান বেঠিকটা কী অইছে?
বেঠিকটা অইছে এই যে হরিসভার টিনও কইলম গরমেন্টে দেছে।
হ্যারা তো হে টিন দেলে না।
তুমি তো হেহানে আছেলা, ক্যান দেলে না হেকতা হ্যারগো জিগাইছ?
মুই ক্যামনে জিগাই, হেয়া য়িন্দুগো ব্যাফার। হ্যারা যদি নিজেগো মইদ্যে মিলমিশ না রাহে…
হেথে তোমার বাফের কী? না যদি রাহে, হোগা মারবে। হেথে তোমার কী কওয়ার আছে? হ্যারা য়িন্দু, মোরা শ্যাখ। গরমেন্ট চায় য়িন্দুরা য়িন্দু থাউক, শ্যাহেরা শ্যাখ। এহন তুমি যে কামডা করলা হ্যার অত্থডা কী অইলে, জান?
এয়ার অত্থ অইলে এই, মুই কাজইয়া ঝঞ্ঝাট চাই না।
না এয়ার অত্থ হইলে তুমি য়িন্দুমোছলমান সোমজ্ঞেওয়ান কর। তুমি ভাবছ, মসজিদের টিন দুগ্গা পূজায় দ্যাওন যায়।
দিলে কী অয়?
আঃ হাঃ হেডা এট্টা বেইসালামি কাম না?
তয় যে পেত্থম কইলি যে মুই য়িন্দুগো ভোডের লোভে–
মোল্লা মুছল্লীরা তো হেইয়াই কইবে। সামনে ইউনিয়ন কাউন্সিলের এলেকশান। আবার দ্যাহ মোছলমানেরা পুতলা পূজা, বুত্পরস্তি গুণা মানে। এই কামডায় হ্যারগো দেলে ব্যাতা লাগবে না?
জামাই এবার বেশ ভড়কায়। নসুকে তোয়াজ করে বলে, দ্যাখ, মুই বোগ্দা ছোগ্দা মানু, ভাল ভাবইয়া কামডা করছি। ভাবছেলাম মানষেগো পেহার অইবে, হ্যার লইগ্যা। হেয়ার যে এত অত্থ অইবে, তহন বোজঝে কেডা? নসু ঝাঁঝি মেরে বলে আরে ধুত্তুরিন্ইয়া, বলদাডা খালি তহন থিহা মাইনসের মাইনসের করতে আছে। মাইনসের কতা কয় কেডা? অ্যাঁ? মোরা কইতে আছি য়িন্দুগো কতা আর মোছলমানেগো কতা। যত্ত উদ্বাগ।
জামাইর মুখখানা এখন দেখার মতো। নসুকে সে যেন প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চায়। বলে, ও নসু ভাই, তুমি মোরে বাচাবা না? মুই পোলাপান মানু, কী করতে কী করইয়া ফ্যালইছি। এহন তোমরা মোরে বেপদের মদ্যে ফ্যালাইয়া সরইয়া যাবা?
তুই পোলাপান মানু? ওরে ও চুৎমারানির পো তোর যে দাড়ি মোছ বেয়াক পাকছে– হেয়া দেহ না, নাকি?
বেশ তয় কও, মুই এছাড়া কী করতে পারতাম? মুই তো এহানের মেম্বার। মোর এট্টা দায়িত্ব আল্হে না।
হেয়া তো আল্হে। কিন্তু তোমার উচিত আছেলে, হরিসভার ভক্তেগো এট্টু বুঝাইয়া বাজাইয়া কায়দা করা। তুমি পাডার আড়ইয়া বিচি হেয়া পারবা ক্যান?
তমোও যদি না দেতে?
এবার নসু একটু ভাবিত হয়। সত্যিই তো, তার পরেও তো না দিতে পারে, তখন কী কর্তব্য? কিন্তু কোনো বিষয় নিয়ে বেশি ভাবাভাবি তার পছন্দ নয়। সে স্বভাব-রগুড়ে মানুষ। যে রগড়টি জামাইকে নিয়ে সকাল থেকে চলছে তার আমেজটি সে নষ্ট করতে চায় না। এখন যে সমস্যাটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সে ব্যাপারে তার ভাবনা আছে, তবে সে উপযুক্ত সময়ে ভাবা যাবে। এখন জামাইকে বোধ করি সে আরেকটু খেলাতে চায়। বলে, হেয়া যাউক, মুছুল্লিরা যদি কোদেই, হেয়ার ব্যবস্তা কী করন যায় দেখমু হ্যানে। কিন্তু জামাই, তোমার ব্যাফারডা কী, এট্টু কবা?
কীয়ের ব্যাফার আবার?
না, কই বোলে তুমি ভাবছডা কী? তুমি সহালডার ব্যালা এমন চ্যাৎলা ক্যা?
চ্যাতুম না তয়, তোরা চ্যাতাইলি, আপ্যাচলা প্যানা লইয়া।
না, কই বোলে, এ দ্যাশটা ক্যারগো হেয়া জান।
ক্যান, মোগো।
মোগো ক্যান? য়িন্দুগো না মোছলমানগো? জামাইয়ের আবার ধন্দ। এ আবার কিতা, এয়া তো জামাই ভাবে নায়। দ্যাশটা দ্যাশের মাইনসেগো, এটাই তার বরাবরের ধারণা। সে বলেও তাই। নসু পুনরায় বিরক্ত। সে খামার দেয়, তুমি জান বাল্ডা। দ্যাশটা আগে আছেলে মোছলমানেগো, একাত্তইর সালে অইছেলে বাঙ্গালিগো, আবার এহন অইছে বাংলাদেশিগো। আগে য়িন্দুরা এট্টু বেশি বাঙ্গালি আছেলে, এহন মেয়ারা। বোজঝো? জামাই ঘাড় নেড়ে জানায় সে বুঝেছে।– তয় হেলে বুজইয়া দ্যাহ দ্যাশটা আসলে মোছলমানেগোই। হেইয়ার লইগ্যা কই মোছলমানগো লগে ফ্যাসাদ করইও না। বেয়াকে তোমারে মালাউন কইবে।
তয় এডা য়িন্দুগো দ্যাশ না, ও নসু ভাই?
না, হ্যারা দ্যাহ না, খায় দায় পাখিটি বনের দিগে আখিটি। থাহে এহানে, খায় এহানে, ভাবে হিন্দুস্তানের কতা।
হেয়া তো মোগো ডরে, মোরা যদি মারইয়া ফ্যালাই।
তুই কয়ডা মারছ?
মুই, মারমু ক্যালায়? মোর হ্যারা খেতিডা করছে কী?
এ্যাই, এ্যার লইগ্যাই কই, তুই য়িন্দুগো দলে। তুই মোমেন ভাইগো দলে না। তোর খাসইয়ৎ খারাপ, স্বভাব-চরিত্তির ভাল না। তুমি মদমাদী খাও, য়িন্দুগো পূজায় নাচো কোদো, তোমারে মোল্লা মুছল্লিরা এবার কী করে দ্যাহ। এক নিঃশ্বাসে নসু হইহই করে এই সব অভিযোগ করে যায়। জামাই প্রথমে হতবাক, অতঃপর পুনঃক্ষিপ্ত। তার সম্পর্কে নসু যা বলল, তার কোনোটাই সে স্বীকার করে না। প্রচণ্ড ক্রোধে কাঁপতে থাকে সে। বলে, মুই মদ খাই কইবে কোন হুয়ারের পোয়। হ্যার মা মাসির ফলনতা হরি।
চেৎইওনা জামাই, চেৎইও না, ঠাণ্ডা হও। নাইলে কপালে দুঃক আছে, হেয়া কইলাম হ। এবার খলিল ঠাহুর তাকে নিয়ে পড়ে। বলে, মদ তুমি খাও নায়?
কইছে কেডা, অ্যাঁ? কইছে কোন লাংচুনির পোয়?
খাও নায়?
না।
খাও নায়, ভাবইয়া কও।
কইলাম তো না।
বুড়ারে ডাকমু?
তোগো য্যারে মন লয় ডাক।
বুড়া বলতে একজন অশীতিপর, কি তারও অধিক বয়স্কা বৃদ্ধা। রায়বাড়ির হাতার মধ্যেই তার কুটির। সেখনে সে তার ছেলের বউকে নিয়ে থাকে। ছেলে দূরস্থানে কোথাও চাকরি করে। এই ছেলের বউ আর গোঁসাইকে নিয়েই গত দিনের পিরতিমা বিষয়ক রঙ্গরস হয়ে গেছে। সে যা হোক, বৃদ্ধার এই কুটিরটি পুজো পার্বণে স্মরণাতীত কাল থেকে ভাটিখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মদমাদী ওখানেই সংরক্ষিত থাকে। যার যখন পিপাসা পায়, ওখানে গিয়েই তার নিবৃত্তি করে। সেখানে সাকী বৃদ্ধার পুত্রবধূ, প্রোষিতভর্ত্তৃকা তথা যুবতী বিধায় মধুপায়ীদের পিপাসাও একটু ঘন ঘনই পায়।
বৃদ্ধা রায়বাড়ির কোনো এক শরিকের ভিটেয়, তাঁরা যখন দেশ ত্যাগ করে হিন্দুস্থানে আসেন, তখন থেকে স্থায়ী হয়েছিল। বৃদ্ধার বয়স যে ঠিক এখন কত, তা সে নিজেও জানে না। শরীরটি বয়সের ভারে ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। দাঁতে মিশিটি এবং হাসিটি সদাসর্বদা বিদ্যমান। রায়বাড়ির গেরস্থালির তাবৎ খুঁটিনাটি তার নখদর্পণে এবং ফলত এটা সেটা হামেশাই তার দ্বারা হাতসাফাই হয়। রায়গিন্নি দেখেও দেখেন না। না দেখার কারণও সম্যক। এ-কথা এ বাড়ির কে না জানে যে, যদি কোনো জিনিসের হঠাৎ প্রয়োজন হয়, বুড়ি সেই জিনিসটি যথাযথ এনে হাজির করবে, যেমনটি তার নির্ধারিত নিয়মে, নির্ধারিত স্থানে পাওয়ার কথা। রায়বাড়ির আত্মজনেদের বেশিরভাগ দেশত্যাগী, তাই স্বজনাভাব। সেখানে, মানে এখানে, এখন যে গেরস্থালিটি বর্তমান, তা সর্বজনীন গেরস্থালি যেন। চাকর পাট, মুনিষ মাহিন্দর, রাখাল হাইল্যা, এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। নিজস্ব বলতে জনা সাতেক, তারাও সর্বক্ষণের গৃহবাসী, গ্রামবাসী নন। চাকরি সূত্রে শহরে নগরে বাস। পালপার্বণে বাড়ি। তবুও সে গেরস্থালি, কী আশ্চর্য, এখনও অসাধারণ উজাগর। এখনও, সে গেরস্থালি, রাতের শেষ প্রহরেও জেগে থেকে অন্নথালা নিয়ে, সামনের দলুজে জলে ভেজা গ্রাম্য তরুণকে আপ্যায়ন করে। এ এক অসামান্য অভিজ্ঞতায় প্রত্যাগমন। প্রত্যাগমন কথাটি এজন্যে যে এক জীবনে, হয়তো সে প্রায় বিগত স্মৃতি কৈশোরের, আমি তো এই অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ছিলাম। তখন এই অভিজ্ঞতা শ্বাস প্রশ্বাসের মতো সহজ ছিল বলে এর মর্ম বুঝতে পারিনি। আজ এই দীর্ঘ নাগরিক প্রবাসের পর যখন এই আচরণ দেখছি, তখন মনে হচ্ছে, আহা! জীবন কত সমৃদ্ধ হতে পারে। জীবন একদিন কতই না মানবিক বোধে সমৃদ্ধ এবং বুদ্ধ ছিল। এবং তাই নিয়ে এখন আক্ষেপ।
এখন ওই রায়বাড়ির গেরস্থালিটি জমি নির্ভর। সর্বোপরি, প্রাচীনা হলেও রায়গিন্নি এখনও বেঁচে আছেন। তাই যে যে নিয়ম প্রাচীনেরা করে গেছেন, দোল দুগ্গোছব, পারণ পার্বণে, তার কোনোটিরই বাদ যাবার উপায় নেই। রায়মশাই ছিলেন ডাকাবুকো সামন্ত। জমি জিরেত, মামলা মোকদ্দমা, লাঠিবাজি, সড়কিবাজি সবেতেই তাঁর প্রচণ্ড পৌরুষ ছিল। চন্দ্রদ্বীপের এই প্রত্যন্ত গাঁয়ে তাঁর নিরঙ্কুশ প্রতাপ ছিল। সে যা হোক, যে বুড়ির কথা নিয়ে এই বাঁক ফেরা, তার কথাই বলি। বুড়ি রায়েদের জৌলুস দেখেছে। তাই সে কখনও এদের বিরোধিতা করে না। রায়মশাইও এই অনাথা বিধবাকে, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, ভিটেমাটির থেকে কোনো দিন উচ্ছেদ করার কথা ভাবেননি। যদিও এ ব্যাপারে তাঁর সাতিশয় এলেম ছিল। বহু মানুষকে শুধু জমির প্রয়োজনে, একরাত্তিরের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মিথ এ অঞ্চলে অনেকেরই জানা। বৃদ্ধা এ-কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। কিন্তু গ্রাম্য ঈর্ষা বিদ্বেষের গতিপ্রকৃতি একটু ভিন্নতর। কৃতজ্ঞতা সত্ত্বেও কিছু দ্বেষ সে পোষণ করত, যার প্রকাশরূপটিও ছিল ভিন্ন ধরনের। যেমন, বৃদ্ধা সুযোগ পেলেই রায়বাড়ির এটা ওটা চুরি করত। অপহৃত বস্তুগুলো কিন্তু প্রায়শই তার প্রয়োজনে লাগত না। কিন্তু যেহেতু তা অসংরক্ষিত অবস্থায় থাকত, বুড়ি তা হাতসাফাই করত। এ এক রহস্য। তবে মনে হয়, এর মধ্যে কিছু মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা কাজ করত। যার কার্যকারণ প্রবল ও দুর্বলের সম্পর্কের মধ্যে নিহিত। বুড়ি নিশ্চয়ই যথাসময়ে উদ্দিষ্ট বস্তুসমূহ উপস্থিত করে, নিজের সামাজিক বা ব্যক্তিক উপযোগিতা প্রমাণ করতে চাইত। মনস্তত্ত্বের কথা থাক, রগড়ের কথা বলি। বুড়ি রাতে ঘুমোতো খুব কম। গ্রাম গাঁয়ে চোরের উপদ্রব একটু বেশিই থাকে। সে তাদের আনাগোনা, চলাচল টের পেত এবং খুব সহজভাবে তাদের উদ্দেশ্যে বার্তালাপ করত। বলত, ও চোর, এহানে মোর বাড়ির ছাইচে ঘোরেন ক্যান? এহানে পাইবেন কোন মুথমাডা। মোর তো থাহার মধ্যে, উডানে আছে তালগাছটা আর ঘরে আছে বালগাছটা। তো, হেয়ার নেবেন কী? রায়গো ঘরে যায়েন, হ্যারা সাম্রাজ্য খায়। হেহানে খাডালে ধন, ওশ্যায় ধন। হ্যারা হাগলেও সোনা।
বুড়িকে কে ডাকতে যাবে, এই নিয়ে একটু রহট্। তাকে ডাকলেই সে যে আসবে এমন নয়। কারণ, আইজগাইলগো পোলাপানেরা বেয়াক অসোব্য, একছের বেলাহাজ। লগু-গুরু জ্ঞেয়ান নাই। তবে যদি কালুভাই যায়, তবে হে আইথে পারে। কালুভাই রায়মশাইয়ের কনিষ্ঠ পুত্র। সেই রায়বাড়ির ঘর গেরস্থালি দ্যাহে, চাকরপাট, মুনিষ মাহিন্দর খাটায় এবং নিজেও তাদের মতো একজন হয়ে থাকতেই ভালোবাসে। পড়াশোনা কলেজের মাঝামাঝি। কিন্তু হেয়া হ্যার ভালো লাগে না। পড়ইয়া অইবে কোন কাফা? চেহারাখানা ওথেলো-দ্য-মুর চুলসহ। স্থান কাল ভাষা এবং চরিত্র অনুযায়ী তার দেহকাণ্ড এবং বর্ণ। এই হচ্ছে কালুভাই। লুঙ্গিতে “মাল-কাছুডি” মেরে সে বলে, মুই তয় যাই, বুড়িরে লইয়া আই। জামাই ক্রোধে বেতাবুদ। সে বলে, যা, কোন বুড়া চুৎমারানিরে লইয়া আবি আয়। মুই ডরাই না। জামাই ভাবতে পারছে না, এরা তাকে নিয়ে কী করতে চায়। মদমাদী, চরিত্তর খারাপ? এও কি কখনও সম্ভব?
অতএব কালুভাই যায় বুড়িকে আনতে। সে যায় এবং অনতিবিলম্বে ফিরে আসে। তার কাঁধে একটি পুটুলি। পুঁটলিটি আর কিছু নয়, বুড়ি। বুড়িকে সে কাঁধ থেকে মাটিতে নামিয়ে, “আড়উয়া” কোলে তোলে, এবং জমায়েতের চারদিক ঘুরে প্রচণ্ড আবর্তে পাক খায়। বুড়ি পরিত্রাহী চিৎকার করে, শ্লেষ্মা-জড়িত কণ্ঠে, ওরে মোরে ছাড়। মুই মরইয়া যামু কইলম, ওরে মোরে ছাড়ইয়া দে। ইত্যাদি শব্দে, বুড়ি ছটফট করে। কালু ভাই এক সময়, তার “পাক্লাড়া” থামিয়ে ভূমিতে স্থাপন করে বুড়িকে। বুড়ি স্বস্তিতে ফোক্লা হাসে। বলে, ক’ মোরে আনলি ক্যা এহানে? মোর কী করন লাগবে। কালু ভাই বলে, বুড়ি তোমারে ক্যান আনছি, হেয়া পরে কমু হ্যানে। হ্যার আগে, তুমি কও, তুমি কি গাছের পাতা খাইয়া অমর অইছ।
ক্যান হেয়া হুনইয়া তোর কী অইবে?
না, মোগো ভাই বুইনগো যে কজন পোলামাইয়া অইছে, হেই গ্যাদাগেদিগো এট্টু হেই পাতা খাওয়ামু।
বুড়ি রঙ্গে সামিল হয়। বলে– না হেয়া কমু না।
ক্যান কবা না ক্যান?
কমু, যহন তোর বিয়া অইবে, পোলামাইয়া অইবে, হ্যারা মোর কোল ভরইয়া হ্যাগবে মোতপে তহন। এহন কমু না। ও কালু ভাই, তুমি কবে বিয়া করবা? বুড়ির ফোকলা রূপ এখন এক অসাধারণ দৃশ্য।
কালুভাই বুড়িকে আবার শূন্যে তুলে ‘পাক্লাড়া’ দেয়। বুড়ি চিৎকার করে ভয়ে, ওরে ও দৈত্যডা, ও অসুরডা, তুই কি মোরে মারইয়া ফ্যালাইতে চাও? কালু ভাই বলে, ছিয়াছিয়া, না। তোমারে মারবে কেডা? মুই খালি এট্টু তোমারে যোমের দক্ষিণ দুয়ারডা কদ্দুর হেইয়া দ্যাহাইতে আছেলাম। বলে, আাবার তাকে ভুঁয়ে রাখে। বুড়ি পুনরায় প্রশ্ন করে ও কালু ভাই, করবা না বিয়াডা, মুই এট্টু দেইখ্যা যাইতাম। সোমায় তো মোর আর নাই।
ক্যান যাবা কই?
কিয়া মোর কি মরণ নাই?
না। থাকলে তো কবে মরতা।
তয় তুই বিয়া করবি না?
কয়ডা করমু, এট্টাতো আছেওই।
কোতায়, কোতায় আছে, ও কালু ভাই?
ক্যান তুমিই তো আছ।
বুড়ি এবার দুই মাড়ি বিকীর্ণ করে আহ্লাদে গলে পড়ে। বলে, হু, হেয়া তো আছিওই, তয় এই বুড়ি ধুরি তোর মনে লাগবে?
লাগবে না তয় কি এহন নতুন এউক্কা টোহাইতে যামু?
সভাস্থলের কারুরই কোনো ব্যস্ততা নেই, তাড়া নেই। যে বিষয়ে এতক্ষণের বিচার আচার, তা নিয়েও যেন কেউ এখন আর ভাবিত নয়। তখন সেটা বিষয় ছিল, এখন এটা। যখন যেটা তখন সেটা, এরকম এক জীবনচর্যায় এদের যেন একটা স্বাভাবিক যাপন প্রবণতা থাকে। কিন্তু তা সর্বসাধারণের জন্যে। যে ব্যক্তি বর্তমান বিচার বিশ্লেষণের যূপকাষ্ঠে, তার গতি কী? তার গতি ত্রিশঙ্কু। জামাই কিন্তু আদৌ তার সংকটের কথা ভুলছে না। ঘটনার স্রোতে একসময় এরকম মনে হয়েছিল যে যুবজন তার কথা ভুলেই গেছে। কারণ তারা নতুন রগড় পেয়েছে। কিন্তু দেখা গেল, তা আদৌ নয়। বুড়ির অনুষঙ্গ নেহাৎ রিলিফের কাজ। মূল বিষয়টি দলনেতার মস্তিষ্কে ধরা আছে। তার প্রমাণ পাওয়া গেল, যখন নসু সবাইকে ধমক লাগাল, তখন। সে এখন সাতিশয় ভারিক্কি। সে বলে, এ্যাই এ্যাই বলদারা, এডা এট্টা সালিশি মজালিসির দরবার, না বিয়ার সোমন্দের প্যাচাল, অ্যাঁ? তোরা এমন অভোদা ক্যা? কামের সোমায় হাসকাব্য আরাম্ব করছ? সবাই তখন, সমস্বরে, হু হু কতাডা হ্যাচাই কইছে নসু ভাই, বেয়াকে চুক্কর, চুক্কর। জামাইর মামলাডা আগে অইয়া যাউক, হ্যাষে হ্যানে বুড়ির বিয়া দিমু। এইসব কলরবে সভা সরগরম। বুড়িকে মাটিতে নামানো হলে, সে জানতে চায়, মোরে এহান আনছ ক্যা?
তোমারে কয়ডা কতা জিগামু, ঠিকঠাক উত্তার দেবা, নসু বলে।
কী কতা?
কতাডা অইছে, এই যে জামাই, জামাইরে তুমি চেন?
চিনি না তয়?
মানুডা ক্যামন?
খারাপ না তয়–
তয় কী?
এট্টু বোগ্দা আছে।
হেয়া থাউক। জিগাই, কাইল সয়ন্ধ্যাকালে হেকি তোমার ঘরে পানি খাইছেলে?
খাইতে পারে, হেয়াকি মোর মনে আছে?
বুজ করইয়া কও। এই ধর, যহন তুমি ছাগলগুলোর ঘরে ঢুকাইতে আছেলা, তহন তোমার ধারে পানি চাইছেলে হে?
চাইছেলে বোদায়।
হেয়ার আগে এই বেলায়েৎইয়া তোমার ওহানে বইয়া মদমাদী খাইছেলে?
হেয়া তো তোরা যহন খুশি যাও।
আরে ধ্যাত্তারইনা। যা জিগাই হেইয়ার জবাব দেও।
হে যে গেলেসটার মদ খাইছেলে, জামাইরে কি হেই গেলেসেই পানি খাইতে দেছেলা?
গেলেস কি মোর ঘরে আষ্টডা যে এহেক জোনারে এহেকটায় খাওয়ামু।
গেলেসের তলায় কি এট্টুও মদ আছেলে দ্যাখলা?
মুই অত ঠাহর পাই চৌক্কে?
গেলেসটা তুমি ধুইয়া থানি পানি দিলা, না এমনেই দেছ?
না মিত্যা কমু না, না ধুই নায়।
তাইলে তো অইয়াই গেল। কেস পোক্ত। জামাই মদ খাইছে।
জামাই দেখল, কেস ক্রমশ খারাপের দিকেই যাচ্ছে। জল সে গত সন্ধ্যায় অবশ্যই সেখানে খেয়েছে। তা নির্জলা জলই ছিল। বুড়ি গ্লাস ধোয়নি, কেননা গ্লাসটা উপুড় করা ছিল। এ তার মনে আছে। কিন্তু অভিজ্ঞতায় সে জানে এ-কথা কাউকেই সে এখন বিশ্বাস করাতে পারবে না। পুরো আকাট নিতান্ত বোগ্দা হলেও সে বুঝতে পারে। রাগে গা জ্বলে তার। কিন্তু করার কীই-বা আছে? অপরাধ সর্বাংশে প্রতিপন্ন, প্রমাণিত। তাই মুখ বন্ধ করার প্রচলিত পথ নেয় সে। তা জরিমানা। বলে বুজছি, বুজছি। মোর হোগা মারইয়া আরও কিছু পয়সাপাতি নেওনের ধান্দা তোগো। হেয়া নিবি নে। তয় এই সব আচালইয়্যা কতা গুলান লইয়া মোরে অত টলাইস না। মোর আর ভাল লাগে না।
কিন্তু এ আত্মসমর্পণে নসু খুশি নয়। বিকেলে খরচখরচা আছে। জামাইকে যখন জালে জড়ানো গেছে, তখন টাকা পাওয়া যাবেই। কিন্তু আরেকটু খেলতে ক্ষতি কী? সে বলে, হেয়া ট্যাহা তো দেবাই। দেবা না? এহন ঠেকছ, দিতে তো অইবেই। তয় মোরা তো এ্যামনে নিমু না হে ট্যাহা। চরিত্তিরের কতাডা ওঠছে, হেডা তো পেরমাণ অওন লাগে। নাইলে দুলাভাই হ্যানে কইবে এডা জবোরদোস্তি। জামাই আবার কোদে। সে তার চরিত্র সংক্রান্ত কোনো শ্লথতারই হদিশ পায় না। কিন্তু এদের সে চেনে। এদের মহিমা বোঝা ভার। এরা কোন কথা থেকে কোন কথায় যাবে। কীভাবে তাকে দোষী করবে, তা জামাইয়ের পক্ষে আন্দাজ করা কঠিন। অতএব হাল ছেড়ে বসে থাকে সে। নসু পুনরায় জেরা শুরু করে, জামাই, পরশু দিন দুফারে তুমি কোতায় গেছেলা?
গেছেলাম মোর বড় ভায়রার বাড়ি, গোবিন্দল।
তোমার বড় ভায়রায় মরছে আইজ তিন বচ্ছর, হেহানে তোমার ঘোনো ঘোনো যাওনের হেতু?
বঃ। হ্যারগো দ্যাহাশোনা করাডা মোর কত্তব্য না?
তোমার বুইনে মরলে ও বচ্ছর। হ্যার পোলাপানগুলো যে গোল্লায় যায় হেয়ার খবর কয়বার লইছ?
হেয়া, কী করমু, হে হালায়তো আবার এট্টা বিয়া করছে।
হেই সৎ মা-মাগি ওই পোলাপানের কী ছিদ্দাৎ করতে আছে হেয়া দ্যাখতে গ্যাছ কোনোদিন?
মিত্যা কমু না, যাই নায়।
ওরে চুৎমারানির পো। তুমি নিজের বইনের পোলাপানগো খবর লওয়ার সোমায় পাও না। আর হালির ভালমোন্দের চিন্তায় তোমার ঘুম অয়না, না? তুমি তহন কত্তব্য মারাও, কত্তব্যমারানির পো। অ্যাঁ? তোর বউ জানে যে, তুই হেহানে ঘোনো ঘোনো যাও?
ঘোনো ঘোনো কোতায়? যাই তো মাসে এক-আধ দিন। আর গেলেও অইছে কী?
না অইছে আর কী? অইছে পিরিত। চুৎমারানির পো– তুমি হালির লগে পিরিত করো, আর কও, হেথে অইছে কী? তুমি ডুব হাতোর দিয়া পানি খাও, হালির লগে ঢলাঢলি কর, আর কও, হেতে অইছে কী? তোর যে চুল দাড়ি বাল বেয়াক হাদা, হে খেয়াল নি আছে! আর কও তোর চরিত্তির বালো? তখন জামাই নিতান্ত বেসামাল হয়ে হুতাশ করে। বলে– এই তোরা কও কী? এ্যাঁ তোরা এয়াসব কী কও? এয়াতো খুব অভইব্য কতা। মোরে ওয়া কইস না। মুই ইমানদার মানু।
ইমানদার মানু, লাংচুনির পো, খাড়অ, মোরা মাইয়ার দারে এইসব বেয়াক কতা কমু। তুমি ভাবছডা কী, অ্যাঁ। এ্যার লইগ্যাই তুমি মাইয়ারে তালাক দেয়ার চাও, না? এসব শুনে জামাই মরমে মরে যায়। সে ‘মাইয়াকে’ তালাক দেয়ার কথা বলেছে বটে, কিন্তু তার কারণ আদৌ এসব ছিল না। এ, ওরা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, হায় আল্লাহ্।
জামাইয়ের অবস্থা দেখে আমারও খুব মায়া হয়। তার হয়ে নসুকে আমিই সুপারিশ করি, নসু ভাই, জামাইকে এবার রেহাই দাও। বেচারা সকালবেলা থেকে অনেক যন্ত্রণা পেয়েছে। এবার ছাড়ো। নসু বলে, দুলাভাই, এডা এট্টা সালিশি বিচারের দরবার। মুই খালি উকিলের কামডা করলাম। বিচারডা করবেন আফনে। জেল জইরমানা যা অয়, ভাবইয়া চিন্তইয়া রায় দেন। তয় বিহালে কইলম খরচা পত্তর ম্যালা। পূজা গোণ্ডার দিন। আর এ হালার সম্পত্তি খাইবে কেডা। জমি আছে পোনারো কুড়া, পোলা মোডে এট্টা। হেয়া ছাড়া হৌরের সম্পত্তির ভাগ পাইবে আধা। হে হালার খালি দুইডা মাইয়া। পাশশো ট্যাহার কোম জইরমানা হিসাব মতো অয়না। আমি বলি, নসু, পাঁচশো টাকা তো ও আগেই নাকি দিয়েছে, তোমরাই তো বলছিলে–। নসু বিরক্তি দেখায়, বলে, ধুরও আফনেও যেমন, হে পাশশো টাহার গতি তো পরশুদিনই করইয়া ফ্যালাইছে পোলাপানেরা। মদমাদী খাইছে, মুতইয়া ফ্যালাইছে, গেছে ল্যাডা। আর অফরাদ তো এট্টা না। হেডাও দ্যাখবেন। মদ খাওয়া, বেওয়া হালির লগে, মানলাম হে ছেমড়ি দ্যাখতে হোনতে মোগো মাইয়ার থিহা এট্টু ডগমাইগ্যা, হ্যার লগে পিরিত করা, এয়া কি কোম অন্যায়? আর মসজিদের টিনের যে হোগা মারইয়া রাখছে, হে ক্যাচাল ছাড়াইতেও তো মোগো এট্টা পেহার আছে। ট্যাহা পাশশোই লাগবে।
জামাই এখন চুপচাপ। নখ দিয়ে মাটিতে আঁক কেটে যাচ্ছে। বললাম– জামাই, এখন বাড়ি যাও। বিবির সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদ কোরো না। বিকেলে এসো। নসু বলে, আর ট্যাহা? জামাই তার দিকে তাকিয়ে করুণভাবে বলে, তোরা মোরে লইয়া টালাও, হাসকাব্য, মশকরা কর, হেয়া কিছু না। তয় মদমাদী খাওন, আর ওই যে সব অসোব্য কতা কইলি, ওয়া আর কইস না। টাহা মুই তোগো দিমু, মোর কইলজাডায় আইজ তোরা সাইদ্যের ব্যাতা দিলি। নসু তাও হরে না। বলে, এইডুক এট্টু কী কইলাম না কইলাম, হেথে তোমার কইলজায় ব্যাতা লাগলে? কোনহানে লাগছে কও, তোমার হালিরে ডাহি। হে আইয়া হ্যানে হাত বুলাইয়া দেবে। ওঃ এরা সত্যিই ভারি নিষ্ঠুর। জামাই বোধহয় এবার কেঁদেই ফেলবে। কিন্তু নসু নাছোড়। সে আবার তাকে নিয়ে পড়ে। তবে এবার পরিস্থিতি কিছু শান্ত ভদ্র। জামাই-এর গায়ে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে সে খুব নির্দোষ ভঙ্গিতে বলে, আচ্ছা জামাই, এক আধদিন মদ খাইলে, কী অয়?
গুণা অয়।
আর হালির লগে পিরিত করলে? বুজইয়া কবা কইলম।
হেয়া এট্টা অসৈরণ কাম, না-পাক্ কাম, হেয়া ক্যাওর করা উচিত?
হালির বুইনের লগে পিরিত করলে যদি গুণা না অয়, তো হ্যার বুইনের লগে করলে অইবে ক্যান? বুজাইয়া কও।
মোর এসব কতা কইতে ভাল লাগে না।
তুমি এট্টা বলদা। একই হৌরের তো মাইয়া। দোষটা কী কবা তো।
মুই জানি না, যাঃ। বলে জামাই এবার উঠে পড়ে। সবাই যথারীতি আবার হাত ধরে তাকে বসায়। এবার খলিল বলে, ছাড় ওসব আউল কতা ফাউল কতা ছাড়। আসল কতাডা হোনো। তোমার হালির বয়স তো বেশি না। পোলামাইয়াও নাই। তোমার হৌরেও তো হেই কবে মরইয়া গোড়ের তলায় ভ্যাটকাইয়া রইছে। মোরা কই কি, হালিরে আবার বিয়া দেও। পাত্তর রেডি আছে। না দেলে কইলম পাচ জোনে পাচ কতা কইবে। আর হেয়া কইবে কইলম তোমারেই। মোরা যা কইলাম করলাম, হেয়া ঠাট্টা বুটকিরি। কথাডা কইলম মোরা বুজইয়া হুনইয়াই উডাইলাম। মাইনসে কইলম এইসব কয়।
কী কয়?
কয় বোলে যে, জামাই যে হালিডার বিয়া নিকা দিতে আছে না, হ্যার কারণ হে নিজেই হালিরে ভোগদখল করতে চায়। হৌরের সম্পত্তিডাও পুরা দখল করতে চায়। এহন কও দেবা বিয়া?
দেহি মাগির লগে কতা কইয়া।
আইজই কইও। বিহালেই পাহাপাহি বেয়াক ঠিক অইবে হ্যানে। পাত্তরও একজন আছে, খারাপ না। তোমার হালির ঘরের ছাইচে কিছুদিন ধইরা হে বৌয়ার পোয়ও ঘুর ঘুর করতে আছে। তয়, এহন বেয়াকে, ওডো। ব্যালা অইছে অনেক। কামে যাও। বৈকালে এহানেই আবার আবা বেয়াকে। দুলাভাই ওডেন।
