সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১০
দশ
কথা অনেক। তাই এক কথা বলতে হাজার কথা, তাদের কুচোকাচা নিয়ে এসে ভিড় করে। ‘পিরতিমা’ বিষয়ে বলতে গিয়ে, তাই ভাবীর প্রসঙ্গ এসে গেল। তার থেকে নিবারণ কাকা, জয়নাব চাচি, বংশবৃত্তান্ত, কত কী। তা সে আসবেই। বাঙালরা এমনিতেই বেশি কথা কয়, তো চন্দ্রদ্বীপ-পুত্রদের আরও বেশি কওয়ার জন্মগত হক। মূল কথায় ফেরা যাক। ভাবীর দেওর নসু বলেছিল, দুলাভাই, পিরতিমাহান দেহন লাগে। এট্টু মনোযোগ দিয়া দ্যাখফেন। তা যে দুটি অবয়ব দেবী গোষ্ঠীর বাইরে কাঠামোর নীচে অবস্থানকারী, বুঝলাম, নসুর বিশেষ নির্দেশনা তাদের বিষয়ে। জানতে চাই, নসুভাই, এরা কারা? নসু বলে, ভাল করইয়া দ্যাহেন, চেনেন কিনা। আগেই বলেছি, চেনা চেনা মুখ। ও হরি, এ যে দেখি গোঁসাই আর দুলার বউ। গোঁসাইকে চিনি বাল্যাবধি। দীর্ঘ দেহ, ছিপছিপে চেহারা, মাথায় কার্তিকী বাবরি। অবয়বটি দেখলাম তার চেহারার সাথে সঙ্গতি রেখে দিব্যি হয়েছে। নসু যে বলেছে, পিরতিমা এবার বাহারইয়া অইছে, তা কিছু মিথ্যে নয়। দুলার বউকেও দেখেছি তার বিয়ের পর থেকে। ছোট্টোখাট্টো। ঢলঢল। চোখের ভাব– আরও চাই যে আরও চাই যে, আরও যে চাই। কারণ দুলার চাকরি বাইরে। মাসে ছ-মাসে সে একবার বাড়ি আসে। দুলার ধর্মপত্নী সে হিসেবে প্রোষিতভর্ত্তৃকা। ভারতচন্দ্র বলেছেন,
অমল চন্দন চূয়া গরল তাম্বুল গুয়া
কোকিল বিবশ করে অতি
বিধবার মতো বেশ অস্থিচর্ম অবশেষ
তাপে কাম পোড়ায় বসতি।
কিন্তু যে-কথা আগে বলেছি, আবার বলি, দুলার বউ আদৌ অস্থিচর্মসার নয়। সে ঢলঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি অবনী বহিয়া যায়। মূর্তিতে দেখি, এক মিন্সে পুরুষ চুনট করা ধুতি পরণে, মাথায় কুঞ্চিত কেশের বাবরি, চুমড়ানো গোঁফ, আর এক (মাগি মহিলা) মাথায় দীঘল ঘোমটা, পরণে লালপাড়ের সাদা কোড়া শাড়ি এবং একটি বেশ ডব্কা ভাব। মিন্সের চোখে পরকীয়ার তির্যক। সব মিলিয়ে রহস্যটি নসিকে জমজমাট। রামকেষ্টের কহবৎ মনে পড়ল–
মুখ হল্সা ভেতর বুঁদে দীঘল ঘোমটা নারী
আর, পানা পুকুরের ঠাণ্ডাজল
বড়ই মন্দকারী।
তা দুলার বউ মন্দকারী কী উপকারী সে তত্ত্বে যাব না। কেননা, কাল নিরবধি পৃথ্বিশ্চ বিপুলা। যা একের ক্ষেত্রে মন্দকারী, অন্যের ক্ষেত্রে উপকারী হতে দোষ নেই।
নসু খুব বাধ্য ছাওয়ালের মতো জানালে, দুলাভাই, আফনে, মুরুব্বি মহাজন মানুষ, তয় পূজা গোণ্ডার দিন, পোলামানেরা এট্টু আচাইল কুচাইল করবেই। আফনেরে বেশি কমু কী! আফনে বুঝদিল মানুষ তয়– তার ভণিতায় উত্যক্ত হয়ে মূল কথাটি জানতে চাই। কিন্তু নসু চন্দ্রদ্বীপ-বঙ্গের উপযুক্ত সুসন্তান। সে সংক্ষেপে থাকে না। বলে, আসলে, এয়া আফনের চণ্ডীদাস-রজকিনীরই গপ্পো। একোই কেচ্ছার কথা। নসু কিছুতেই মোদ্দা কথায় আসছে না। এ সময়ে গুণরাজ এসে হাজির। গুণরাজ অর্থে প্রতিমা গড়ার কারিগর। এখানে সবে বলে গুণরাজ। গুণরাজ এসে দু-এক কথা কুশলাদি প্রশ্ন করে। নিজ পরিচয় প্রদান করে। বলে, জামাইবাবু, এবার পিরতিমা গড়াইছি মুই। তয়, যদি জিগায়েন, মোর গুরু কেডা, কমু, মোর গুরু দুইজন। মোর হৌরে আর মোর স্তিরি। যদি কয়েন, হেয়া কেমন? তো কই, মোর কোনো এলেম আছেলে না। মোর এই এলেম ডুক পাইছি মোর হৌরের ধারে। তো হে ম্যালা কতা। হ্যার সাগরেদি করতে যাইয়াই, তেনার মাইয়ার লগে মোর বিয়া। তো হৌরে যহন মরলে– তহন তেনায় কইয়া গেছেলেন, ঘড়ু, ঘড়ু মোর ডাকনাম। তোমার কইলম হাত পাকে নায়। মাইয়ার ধারে এট্টু তালিম নিও। গুণরাজ ধরতাইতেই তার চান্দ্রদ্বীপি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ মূলকথায় প্রবেশের আগে বার-কথার আগানবাগান পরিক্রমা। আমার মাথায় তখন দুই অতিরিক্ত প্রতিমার ধন্দ। তাই জানতে চাই, কিন্তু গুণরাজ, এরা কারা? গুণরাজ এবার দেড় হাত জিভ কাটে। বলে, এঃ। আপনের চৌক পড়ছে ওদিকে? কমু কী জামাইবাবু, আইজ কাইলগার পোলাপানগুলা অইছে সাইদ্যের অসোব্য। লঘুগুরু কোনো জ্ঞেয়ান নাই। মুই ওডা করতে চাই নায়। তো এই আজরাইলগুলা হে কথা হোনলে তো। হ্যারা কইলে, গুণরাজ, এবার পূজার কইলম জামাইবাবু আশন আইবে। এমন কিছু অইবে, য্যাতে, জামাইবাবুর নজর পড়ে। পুরস্কার পাবা। ওঃ কী দুর্দৈব। আসল বিষয়টাতে পৌঁছোনোই যাচ্ছে না। সবাই শুধু আশকথা পাশকথা বলে কৌতূহল বাড়াচ্ছে। এইসব বাখোয়াজি শেষ হতে রহস্যের জট খোলে। গোঁসাই-এর খাস্ইতের দোষ বিষয়ে আমার কৈশোরিক অনুসন্ধিৎসা ছিল। জ্ঞান ছিল না। এবার এই পরিবেশে এসে বুঝলাম, এ বিষয়ে গুরুমুখী পরম্পরা বিদ্যেই আসল কথা। গোঁসাই-এর উঠিতে কিশোরী, বসিতে কিশোরী ভাবটি এককালে আমাদেরও নিয়ত আলোচনার বিষয় ছিল। কিন্তু সে যাক। বার্ধক্যে পৌঁছেও গোঁসাই তাঁর ‘ভজনা’ ছাড়েননি সেটাই ঘটনার প্রকাশে বোঝা গেল।
উপস্থিত হিন্দু এবং যবন যুবকেরা একবাক্যে জানাল– জামাইবাবু, ও হালায় বাওনের জাতও না। তয় যদি জিগায়েন, হ্যারে তোমরা ডাহ কিয়া– তো কই, গাইন গাও কি? না, ঠেকছি এহন করমু কী? দ্যাশে তো বাওন কইতে ওই হালায় একলা। স্বভাবচরিত্তির যাই হউক, দুই-চাইরডা অংবং হরলে মোগো কামডা মেডে। গুণরাজ এবারে ব্যাখ্যাত হয়, জামাইবাবু, ওই শাস্তরে কয়, মায় মরে ঝি ঝি করইয়া, আর ঝি মরে লাং লাং করইয়া, হে কতা মিত্যা না। ওই হালার বাওনা, রোজ এ বাড়ি গোঁসাই স্যাবা করে। পালা-পাব্বনে বেয়াক পূজা আশ্চয় হেই করে, ধান পায় হ্যার লইগ্যা তিন বুধা। আর হেয়া ছাড়া পূজার এডাওডা তো পায়ই। দ্যাহেন হে চুৎমারানির পোয়ের কারবার। হ্যার নজর খাল মাগিগো দিগে। পাশের বাড়ির দুলারে তো চেনেন? হ্যার বৌগ্গা দ্যাখতে হোনতে য্যান লক্ষ্মী ঠাইরেন। দুলা বাইরে চাকরি করে। বাড়ি অয় ন-মাস ছ-মাসে একদিন। এহন গোঁসাই যদি হে মাথারির লগে ফষ্টিনষ্টি করে, হেডা এট্টা আচাইল না? য্যামন হে মাথারি, ত্যামন এই হালার বাওন। খালি ঘুজঘুজ আর ফুসফুস। এ্যার মইধ্যে একদিন নাহি বাওনা হ্যার আচল ধরইয়া টানছেলে। হে কারণ, ছ্যামরারা মোরে কইলে, গুণরাজ এ্যার এট্টা বিহিত করেন। তো মুই এই করছি। এহন, আপনের যা বিচার।
বিষয় বড় জটিল। এর বিচার যদি আমাকে করতে হয় তো শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকতে হবে। নসু বলে, দুলাভাই, আল্লার কিরা, বিচারডা ঠিকঠাক না অইলে কইলোম বোনাই বলইয়া রেয়াৎ করমু না। ও হালায় খালি পাশ্শো ট্যাহা দেছে। পূজা কইলম চাইর দিন। পোলাপানেগো খরচাপাতি মেলা। আপ্তবাক্য আছে বুঝ লোক যে জানো সন্ধান। দেশ ছেড়েছি তিরিশ বছর আগে। তখন ছাওয়ালপানদের রীতকরণ ছিল আলাদা। কারণ তখন আমরাই ছিলাম ছাওয়ালপান। এখন কালের দেবতা আমাদের ‘হাবড়া’ করেছে– অর্থাৎ বুড়ো হাবড়া। এতকাল বাদে এসে দেখেছি, এখনকার ছাওয়ালপানরা সব ‘অসৈরণ কতা কয়, সব্বসমক্কে’। আমরা বাল্যকালে এমন ছিলাম না। কারণ, আমাদের কত্তারা ছিলেন জবরদস্ত গার্জেন। বেয়াদপি অসভ্যতা বরদাস্ত করতেন না। এদের বেলায় নানাবিধ কারণে সেই গার্জেনগিরি করা কত্তাদের পক্ষে নিতান্ত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তার উপর, বিগত মুক্তিযুদ্ধের নানান অনুষঙ্গ। কী দার্শনিক, কী শস্ত্রগত, যাপিত জীবনের উপর তার অবশ্যম্ভাবী প্রভাব পড়েছে বইকি।
সে যা হবার হয়েছে। এখন উপস্থিত যুবজনের বাখোয়াজিতে বুঝি যে, গোঁসাইকে তাঁর অপকর্মের জন্য পাঁচশত টাকা ইতিমধ্যে দণ্ড দিতে হয়েছে। কিন্তু, যুবজন অর্থাৎ ছ্যামড়ারা তাতে তৃপ্ত নয়। অপরাধ বেশ গম্ভীর, অতএব দুলাভাইয়ের বিচারে যেন আরও শ’পাচেক নিদেনপক্ষে উশুল হয়, এমত আভাস তাদের আর্জি বা শাসানিতে প্রকট। কিন্তু কী এক সূক্ষ্ম কৌশলে যে তারা দুলাভাইকে বিচারকের আসনে বসাল, তা ধরতেই পারলাম না। এখন দুলাভাইয়ের সাধ্য নেই, আসন থেকে সট্কে পড়ার। পরন্তু গোঁসাইআবার আদপেই গরিব ব্রাহ্মণ নয়। তাঁর দণ্ড দেয়ার ক্ষমতা এবং ইচ্ছে দুই-ই প্রকট। কেননা, তিনি নিজেও এই “পূজা গোণ্ডার দিনে এডা ওডা খায়েন।” এডাওডা অর্থে মদমাদী। জনান্তিকে জানাই, মদের স্ত্রীলিঙ্গে যে ‘মাদী’ শব্দটি নিষ্পন্ন হতে পারে, সেই ভাষাতত্ত্ব অধম এই প্রথম শিখল। কিন্তু তত্ত্ব থাক। যেখানে আসামি দণ্ডিত হবার জন্য আগ্রহী এবং দণ্ডমূল্য সব্বসাধারণের আনন্দার্থে ব্যয়িত হবার অপেক্ষায়, সেখানে বিচারকের কোনো “মুছিবত” নাই। যথাসময়ে তাই সেখানে গোঁসাই আসেন এবং বিচারে আরও পাঁচশত বাংলা মুদ্রা জরিমানা ধার্য হয়, আর তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে তা দিয়েও দেন। তবে এ-ক্ষেত্রে তাঁর আর্জি, এইসব খরচাপাতির ভাগ মুইও জেন এট্টু পাই। অর্থাৎ মদমাদীর ভাগ।
বিষয়টি গোটাটাই রগড়। রগড় এ জন্যেই যে ‘দুলা’ বাড়িতে নেই এবং তার প্রোষিতভর্ত্তৃকার অবস্থা নিতান্তই–
কন্টকে গাঢ়ি কমলসম পদতল
মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপী
গাগরিবারি ঢারি করি পিছল
চলতছি অঙ্গুলি চাপি।
মাধব তুয়া অভিসারক লাগি–
ইত্যাদি। কিন্তু ভিন্ন পরিবস্থায় পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন হতো। তবে যে ব্যাপারটিতে যথোপযুক্ত প্রীতি ঘটল, তা হলো, এবম্বিধ গুরু সমস্যায় তামাম চান্দ্রদ্বীপি অপবর্গকুল বেবাক নিরুত্তাপ। আহা! সর্বক্ষেত্রে যদি এমনটিই নিরুত্তাপ বৈরাগ্য থাকত!
