সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১৬
ষোলো
এই মধ্যশরতে প্রান্ত সমতট বঙ্গের এই গ্রামগলির এক আশ্চর্য নৈশ শোভা হয়। শীতের শেষ মধ্যকাল পর্যন্ত একটা ঘন রহস্যময়তা মানুষের মনে কী গভীর এক মোহবিস্তার করে যেন। শুক্ল বা কৃষ্ণপক্ষ নির্বিশেষে, রাত্রির গভীরতা যত বাড়ে, এই শোভা যেন তার রহস্যময়তা বিস্তার করতে থাকে। শরতের শুরুটা এখানে বর্ষারই প্রলম্বিত অধ্যায়। রাঢ় বঙ্গের মতো প্রকৃতিরঙ্গ এখানে দ্রুত সাজ পালটায় না। মধ্যশরতে দু-চারদিন অসম্ভব হঠাৎ বর্ষণের পর, প্রকৃতি যেন সমতায় আসে। যেন-বা অসম্ভব কোনো অভিমানী মেয়ে দীর্ঘক্ষণ কাঁদাকাটা করে হঠাৎ শান্ততায় স্থায়ী হয়েছে। নদী নালা খালগুলো তখন হঠাৎ তাদের দজ্জালপনা শেষ করে সোজা পথে ধীরগতি হয়। ফুলে ফুঁসে একে ভাসিয়ে, তাকে ডুবিয়ে, লণ্ডভণ্ড করার বদবুদ্ধি তাদের আর তখন নেই। তখন তাদের আঁচলের পাড়গুলো কেমন যেন আত্মত্যাগে গৈরিক। তারণ অঞ্চলের ওই অংশটুকুর জল তখন বয়ে চলে গেছে। সেখানের ঘাসেরা সব বাদামি বা গৈরিক রঙে রিক্ততার সাজ ধরেছে। জলের এই চলে যাওয়াটাই নদীর আত্মত্যাগ। এরপর থেকেই প্রকৃতির রঙ বদল হতে থাকে।
রাতের আকাশ এ সময় গামর হয়ে ওঠা সদ্য যুবতীর চোখের মতো বড় রহস্যময় হয়। দীর্ঘ বর্ষণের পর নির্মল, শান্ত, গভীর এই আকাশের বুকে তখন নক্ষত্র বুটিদার নীল চান্দেরির প্রদর্শনী। যদি চাঁদ থাকে তো আরও মোহনীয়। জোছনায় সাদা চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রেইনট্রি, গরান, গেউয়া অথবা চম্বল শিরিষের প্রগাঢ় মহাসভা যেন এই নিঃশব্দ গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণে ভরপুর করে রাখে প্রকৃতিকে। রাত বাড়ে। তাদের প্রগাঢ়তাও বৃদ্ধি পায়। দূরে কোনো এক নিশাচর পাখির স্থান বদলের পাখার ঝটপট এবং কর্কশ চিৎকার। সন্দেহপ্রবণ কুকুরের অসহিষ্ণুতা এবং দূর থেকে তার প্রতিচিৎকার। পাশের জলাশয় কিংবা মাঠের জলে শোল, গজাল মাছের উল্লাস। অথবা জিওল পাতা বঁড়শিতে গেঁথে যাওয়া কোনো হতভাগ্য বোয়ালের প্রাণপণ হুটোপুটির শব্দ। গঞ্জ থেকে দেরিতে ফেরা কোনো গ্রামবাসীর আকুল উচ্চকণ্ঠে গান গেয়ে একা পথচলার একঘেয়েমি কাটানো–
ও সোনা বন্ধুরে–
আশ্বিন মাসে কত খুশিতে
ভাইধন আইতো নাইওর নিতে
ভরা গাঙে রঙিলা নাও বাইয়া–।
সে গানেও অবশ্যম্ভাবী নস্টালজিয়া। কোনো এক নাইওরী আহ্লাদী বোনের দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু সেই নাইওরীর গান এখন পুরুষকণ্ঠে আশ্রয় করে তাকে যেন অর্ধনারীশ্বর করে। এখানে মাটির উপাদানই যেন অর্ধনারীশ্বরত্বের বোধে তার সন্তানদের পূর্ণতা দেয়, বুদ্ধ করে এবং তা অবশ্যই অনুভবের ব্যাপারীদের কাছে এক মহৎ কাঙক্ষা। এভাবে সময় যত এগোয় শীতের হাওয়া একটু একটু করে তার কামড় বসাতে শুরু করে। তখন ধানকাটা সারা হয়। গেরস্থ চাষির উঠোনে ধানমাড়াই হয় সারা রাত। বাঁশের খুঁটির ডগায় কেরোসিন লম্ফ বা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে মুখবাঁধা বলদের লেজ ধরে ধানমাড়াই করে বারমাসিয়ারা। তাদের উৎসাহ জোগাতে, উজাগর রাখতে রাতভর জারি, সারি, মারফতি বা কেসসা শোনায় ছোমেদরা, উপরে শীতরাতের তারারা সাক্ষী থাকে। অনন্ত বিশ্বে এক নক্ষত্রজগৎ এই ছোমেদদের জারির দোহার হয় বা কেসসা, কথকতার শ্রোতা। মুখবাঁধা বলদেরা অনন্ত পরিক্রমায় রামপ্রসাদের গানের কলি হয়। সাথে বারমাসিয়া, ভাতুয়া, রাখাল, বাগাল, আধিয়ার এবং ছোমেদরাও।
পুনরায় আসর বসে। আশ কথা, পাশ কথা। পান তামাক। মাঝে মধ্যে খিস্তি-খামারের চুটকুলা। পুরোনো দিনের কথা। পুজোর সময় জমিদারবাড়ির কীর্তি কাহিনী। এখানের জমিদার বলতে কীর্তিপাশার বড় হিস্যা, ছোটো হিস্যা। সেসব কবে শেষ হয়ে গেছে, মিটে গেছে। তবু নানান কিংবদন্তি, নানান রোমন্থন। ছোমেদের জারি গাওয়ার কথা– এইসব আলোচনা চলে। গাঁজার কটু গন্ধ আর ভারী ধোঁয়ায় আসর আচ্ছন্ন হয়। কার্তিক একসময় বলে ওঠে, জামাইবাবু, ছোমেদইয়া কইলম মোরে চ্যাতায়। জারি সারিতে সানাই ভালো হোনায় না। হেকতা বল্দাডাও জানে। মোহনবাঁশি অইলে জোমে ভাল। ও হালায় কয়, না, তুই সানাই বাজা। মোর আফত্য নাই, যদি কয়েন বাজামু হ্যানে। তয় হেয়া যদি কাউয়ার ডাহের ল্যাহান হোনায়, মোরে মন্দ কইতে পারবেন না।
ছোমেদ বলে, তোর মোহনবাঁশি অয় না। তুই যেডা পার না, হেডা বাজাও ক্যা? এতক্ষণ যে বাজাইলি, মোর যে কী অসবিদা হইছে, হেডাও তুই বোজো নায়? তুই যেটা পার, হেইডা কর। সানাই বাজা।
কার্তিক ক্ষুব্ধ। কিন্তু, কী কারণে জানি না, কথা বাড়ায় না। বেশ, তুই যা কবি হেইয়াই অইবে। বলে সানাইয়ে ফুঁ দেয় এবং সে ফুঁ নিঃসন্দেহে চমৎকার। সাথে ঢোল, কাঁসি আবহ তোলে। ছোমেদ বসে বসেই আরম্ভ করে–
উপস্থিত সভাজোন হোনেন দিয়া মন
আহা হোনেন দিয়া মন।
কাত্তিক ভাইয়ের কতা মুই করি নিবেদন
আহা–
জারি সারি মারফতি কেত্তন রয়ানি
আহা–
কাত্তিক ভাইয়ের সানাই ছাড়া হালে পাই না পানি
আহা–
কিন্তু হ্যার মতিগতি বাশরি বাদনে –
আহা–
কাত্তিক্ইয়া জালিক দাস জানে সব্বজনে
আহা–
জাইত ব্যাবসায় মোন নাই এডা ওডা করে
আহা–
বেয়ানে দুফরে রাইতে গাঁজা খাইয়া ওড়ে
আহা–
হ্যার আছে এউক্কা স্তিরি হ্যারে ডাহে মাগি
আহা–
কারণ বেকারণে করে কাইজ্যা রাগারাগি।
আহা–
আসোলে দুই জোনে আছে ঘোনো মহব্বত
আহা–
কোন্দাকুন্দি করইয়া হ্যাষে দ্যায় নাকে খত্
আহা–
হ্যারগো না আছেলে কোনও আপন পোলাপান
আহা–
হেই দুঃকে দুই জোন পাগলের ল্যাহান।
আহা–
দৌলত নামেতে মোগো ছেল এক ভাই
আহা–
আহা হে দুঃকের কতা মুই কাহারে জানাই।
আহা–
হ্যার বিবি সরেস্বতী, হ্যারগো এক পোলা।
আহা–
দৌলতইয়া আচুক্কা মরে হ্যার অইছেলে ঝোলা।
আহা–
হেই পোলা ক্যাহে লইয়া কাত্তিকার ইস্তিরি।
আহা–
পাছা লাড়া দিয়া বেড়ায় এ্যার বাড়ি ওর বাড়ি।
আহা–
কয় বোলে যে এই পোলাহান আমার প্যাডের ছাও
আহা–
য্যারা য্যারা সন্দ কর, হ্যারা দেইখ্যা যাও
আহা–
এবারের জারিতে মুই হ্যারগো কতা কই
আহা–
মুই কইলম কার্তিক ভাইয়ের দেল্-এর আধখান হই
আহা–
ছোমেদ বস্তুতই এক কাহিনী আশ্রয় করে। সে কাহিনী বা কিসসার জন্য সে প্রচলিত ধারায় কারবালার কাহিনী, নমরূদ বাদশা বা সোহ্রাব রোস্তমের গল্পে না গিয়ে, নিজেদের জীবন সংঘট্টের অনুপুঙ্খকে আশ্রয় করে। বলে– ভাইগণ, বন্ধুগণ, হোনেন আমার পেরবচন, মুই কই এ পোলাডা মনুষ্যের ছাও। দৌলতইয়া জন্ম দেলে, কাত্ত্িকইয়া লইলে কোলে, হ্যার ইস্তিরি কয়, পোলা মোর দুদ খাও। তয় দ্যাহেন, আপনেরা এ হানে য্যারা জ্ঞানী, গুণি এলেমদার মানুষ আছেন, বিচার কইর্যা কতা কইবেন, এহন হে পোলার মা বাপ কেডা।
আহা মুই ছোমেদ আলি কই
অর নাম কানাই।
আহা–
বাজা মাগির কোলে দ্যাহ চান্দের রোশনাই
আহা–
একদিগে ভাঙেন আল্লায়
আর দিগে গড়েন
আহা–
য্যার বাচনের কতা, বাচেন
য্যার মরণের মরেন।
আহা–
আর সরেস্বতী?
আহা–
সরেস্বতীর দুঃক কতা মুই ক্যারে কই।
আহা–
হে যেন উদ্লা নাও মাতায় নাই ছই।
আহা–
হে ছই উড়ইয়া গেছে অকালের ঝড়ে
আহা–
হে কতা স্মরণ করইয়া বিক্ষের পাতা পড়ে।
আহা–
তেল ছাড়া হুগ্না চুল যেন শোন লুড়া
আহা–
গায়ে ওডে চামখড়ি কাচা বয়সে বুড়া
আহা–
কিন্তু এই সরস্বতী একদিন কী ছিল! আর আজই বা তার কী অবস্থা। ছোমেদ, কার্তিককে বলে, কাত্তিক, ভাই, তুমিও কও। তুমি তো বেয়াক কতার থইলদ্দার। বেয়াকই জান। তুমি কও। কার্তিক বলে, না তুমিই কইতে আছ। তোমার ধরতাই ভাল অইছে। এয়া অবইশ্য মোরগো কতা, কিন্তু তুমি যেমন কইতে আছ, মনে হইতাছে যেন্ গপ্পকতা কইতে আছ। তুমি কও, মুই সোমায় মতো ধরমু হ্যানে। কার্তিক গাঁজাল মাজাল হলেও তার ‘হুঁস-পইদ্য’ ভাল। এবং অতঃপর ছোমেদ এক অপরূপ জবরদস্ত কথকতা, নাকি কেস্সাই বলব, তাতে অবগাহন করে। আর করায়ও না কি? তা এখন এক কিংবদন্তিও বটে। কিংবদন্তি কেননা, এইসব মনুষ্যজনেরা, এতদ্দেশে কবে দেখেছে, হিন্দুর মেয়ে মুসলমান ছেলের ঘরে? কিংবা মুসলমান ছেলে আর হিন্দু মেয়ের সন্তান অন্য এক হিন্দু মায়ের কোলে মানুষ হয়, আর তার নাম হয় কানাই। শাস্তরে বলে, না বিইয়ে কানাইয়ের মা। কার্তিকের ইস্তিরিয় য্যান্ তাই। এখানকার সাধারণ কহবতে সে বাজা মাগি। ছাওয়াল পান হয়নি।
পোলা নাই, মাইয়া নাই, নাই ছাচে কড়া
ঘরে বাইরে দুইজোন হ্যারা আটকুড়া।
এ কথা গাও গেরামে কে না বলে? বিশেষ, এসব ক্ষেত্রে মেয়েমানুষদের মতো অকরুণ নিষ্ঠুর আর কেই বা হতে পারে। কার্তিকের ইস্তিরির এরকম বদনাম ছিল। সে বড় দুঃখের দিন গেছে তাদের। প্রতি ঋতু আবর্তের প্রাক্কালে কার্তিক স্ত্রীর সেই আকুল কান্নার উথাল-পাথাল দেখেছে। স্বাভাবিকভাবে এই নিম্নবর্গীয় মানুষদের, যেহেতু বিবাহাদি তাদের বাল্যবয়সে, কন্যাদের ঋতুকালের আগেই হয়ে থাকে, সন্তান আসে বিয়ের অন্তত বছর তিন-চার পরে। কারণ বিবাহকালে তারা ঋতুপূর্বা। সেকারণে এইসব বালিকাবধূদের একটি দ্বিতীয় বিবাহ, গ্রামীণ সমজে অবশ্য করণীয় দেখা যেত। কোনো এক নৈশনিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ শোনা যেত অমুক বাড়ি থেকে হুলুধ্বনি বা জোকারের শব্দ। এসব সময় আরশি-পড়শি যারা, তারা ধরেই নিত, অমুক বাড়ির মেয়ের অথবা ছেলের বউয়ের ঋতুকাল উপস্থিত হয়েছে। বিবাহোত্তর ঋতুকালে দ্বিতীয় বিবাহের আয়োজনকে বলে ফলবিয়া। ঋতুপূর্ব বিবাহে ফলের কথা কি কেউ ভাবে? তো সেই ফলবিয়াকে কেন্দ্র করে নানান লোকাচার, অভিচার পালন করে এই অপবর্গী নারীরা। তখন ঋতুমতী কন্যাকে পঞ্চগব্য খাওয়ানো, সূর্যার্ঘ্য দেওয়া, আরও নানান অভিচারে প্রথম স্বামী-সহবাসের জন্য প্রস্তুত করা হতো। এর নাম ফলবিয়া। ঋতুপূর্ব বিবাহ যেন ঠিক বিবাহই নয়। সেক্ষেত্রে কন্যা সন্তানধারণের উপযুক্ত নয়। সূর্য কৃষিসম্পদের, উৎপাদনের মূলাধার। তার কৃপায় রোদ্দুর, তার কৃপায় মেঘ এবং তারই কৃপায় বিষ্টি। তাই সূর্যার্ঘ্য। ক্ষেত্র প্রস্তুতকল্পে সূর্যের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে এখানে নানা ধরনের প্রাচীন লোকাচার। কার্তিকের স্ত্রীর ফলাবিয়াডা জমকে ঠাটে হয়েছিল। সাধারণ লোকাচার ছাড়াও, তার শাশুড়ি লক্ষ্মীমাসি তাদের বৈরাগী সম্প্রদায়ের আচরিত নানান অভিচারে কন্যাকে তৈরি করেছিল। কিন্তু পরপর তিন বছরেও কোনো সম্ভাবনা যখন দেখা গেল না, তখনই সবাই তাকে বাজা মাগি আখ্যা দিল। কার্তিকের সমস্যা কিনা, এ বিচার গ্রামীণ মণ্ডলে কারোরই চিন্তায় থাকত না সেসব দিনে। কিন্তু দৌলত তাদের আটকুড়া বাজা নাম ঘুচিয়েছিল। এই কথকতা বা কিংবদন্তি যে চারজন মনুষ্যকে নিয়ে, তার একজনই শুধু প্রয়াত, বাকি সব জীবিত। জীবিত মানুষকে নিয়ে কথকতা, কিংবদন্তি কে কবে শুনেছে? ছোমেদ কিন্তু এখন তাই করছে। সে তার কথকতায় আবার সেই কিংবদন্তিরইএক চরিত্রকে সাক্ষী মানে, সে কার্তিক, যে জন্ম না দিয়ে কানাইয়ের বাপ।
মুজিবর বলে যে ছেলেটি এখন মণ্ডপীর কাজ করছে, সে বলে, বয়াতি নিজেও তো পেরায় হে রহমই। মোগো কাকিমায় হ্যার নাহি মা! কাকারে কবে জানি বাপ ডাকছেলে, হেই সুবাদে এহানে আইয়া ভাগেরডা চায়। সকাল সয়েন্দা গোস্তো ভাত, ভালডা মোন্দডা খায়, মাতব্বীর মারে, আর কাকিমার ধারে দেউলা করে। এমন ভাব দ্যাহায় যেন, হে কাকিমার প্যাডের পোলা।
এমত বাক্যে ছোমেদ চটে। কিন্তু কটূক্তি করে না। যেহেতু আসরে। আসরের মর্যাদা একটা ব্যাপার। যা বলার বলতে হবে গানে বা কথকতায়। ভব্যসব্য হয়ে। সে বলে, হাস কর, কাব্য কর, ঠাট্টা বুটকরি, যেয়ারে পস্তাবা ভাইগণ, ভাঙবে জারিজুরি। কত জন মা অয়, কত জন বাপ, ক্যার আশীব্বাদে তোমার ঘোচে মনোস্তাপ। এই কতা সত্য করইয়া, কও দেহি ভাই। সভ্যপঞ্চজনে মুই আদাব জানাই। ভাইগণ, বন্দুগণ, য্যারা হাচা কও, যেবা মিছা কও, দোষঘাড য্যার য্যার নিজের। মুই ছোমেদ বয়াতি এছলামে শরিক। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জাকাত, খয়রাত, রোজা কিছু করি বা না করি, দেলে কইলম ছাফ। য্যারে ডাকছি বাপ, আর য্যারে ডাকছি মা। হ্যারগো কতা ছাড়া মুই অইন্য জানি না। ভাইগণ, বন্দুগণ, সরেস্বতী আর দৌলতের কেসসা কইতে বইয়া দেহি, হ্যারগো পোলা কানাইর লগে, মোর কপালের ল্যাহা য্যান এ্যাক। তমো কই–
তোরা কও কী, কও কী, কও কীরে ভাই
তোরা কও কী?
আমার মায়ের মতন, মা জননী জন্মে দেহি নাই।
তোরা কও কি!
গভ্ভে ধরলে মা অয়– এ পাডা পাডা কতা
আহা–
শাস্তরে কয়, মানুষজনের পঞ্চজনা মাতা।
আহা–
আর পিতা আছেন সপ্তজন হোনেন দিয়া মন।
আহা–
পঞ্চমাতা সপ্তপিতা শাস্ত্রের বচন
আহা–
পেসব করলেই যদি মাতা হওয়া যায়
ক্যামন করইয়া দুগ্গা ঠাইরন কাত্তিকের মা অয়?
আহা–
আবার দ্যাহ যশোমতী ছিরিকিষ্ণের মা–
আহা–
কবে বিয়াইলে মাগি, কেউ তো জানে না।
আহা–
আবার দেহ ঈশা নবী মরিয়মের পুত
আহা–
ইউসুফ অইল পিতা, এ কেমন অদ্ভুত!
আহা–
তাই বলি, পিতা মাতার তালাস কেন কর?
আহা–
যেযেয়ারে পালে পোষে হ্যার কথা ধর।
আহা–
এরকম এক ব্যাখ্যায় ছোমেদ ব্যাখ্যাত হতে চায়। সভাজন, এখানে বিতণ্ডা তোলে না। তারা এই বিষয়টি মেনেই নেয়। কিন্তু দৌলত, সরেস্বতীর কেস্সা, যা এখন কিংবদন্তি, তা শোনার মোহ তারা ছাড়তে পারে না। এ গল্পকথা তাদের অভিজ্ঞতায় আছে, হাজার বার আলোচিতও হয়তো বা, তবু ছোমেদের কথকতায় এর এক অধিক মাত্রা যুক্ত হয়। ছোমেদ ভাই, আরও কও–এমত রব ওঠে। আর সে বলে যায়–
ভাইগণ, বন্দুগণ, হোনেন আমার পেরবচন
ক্যামন করইয়া সরেস্বতী দৌলতের বউ অয়।
সরেস্বতী জালাইয়ার ছাও–ভরাগাঙ্গে আছৈয়া নাও
তরতরাইয়া নদীর সোতায় কেমন ভসাইয়া যায়।
হে ভাসে, ভাসে আর ভাসে। ছোমেদ এক উঠতিবয়সি যুবতীর ধরনধারণের কথা বলে যায় তারপর। সরস্বতী নাকি নাইতে বক্সী বাড়ির ঘাটে যায়। চারদিকে নারকেল, সুপারি, আম জাম আর চালতা হিজলের নিবিড়তা। মাঝে ঘাট। বক্সীরা এখন আর এ দেশে নেই। যেমন অনেকেই তাঁদের মতো দেশছাড়া। সবাই বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে হিন্দুস্তানে। এ ঘাটে একদিন বক্সীদের মেয়েরা নাইত। বেশ ঘেরাটোপি আব্রুওলা পুকুর। কাকচক্ষু জল, যে জলে আকাশ তার নিজের মুখ দ্যাখে। যুবতী মেয়েদের নাইতে সময় লাগে ঢের। তারা গায়ে মাথায় সাবান ঘষে, পোড়েল বা ধুঁধুলের খোসা দিয়ে গা ঘষে, ময়লা তোলে। ঘাটের সিঁড়িতে পা ঘষে। পায়ের গোড়ালি ঘষে। তারা তখন উদলা বেঁহুশ, কেননা এ দিগরে কেউ বড় একটা আসে না। এখন বক্সীদের মেয়েরা পরদেশি। তারা কোথায় নায়, তা কি এখানের কেউ জানে? তারা হয়তো বা কোনও এঁদো গলির টালির ঘরে, আব্রু ছাড়া রাস্তায় সরকারি কলের জলে হয়তো এখন তাদের নাওয়া, যা লক্ষ লোভীর লক্ষ চোখের চেটে খাওয়া দৃষ্টির সামনে উদলা। কিন্তু এসব কথা থাক। এ কারুর একক দুর্বিপাক নয়।
এখন যারা এই গাঁয়ে আছে, তাদের মেয়েরাও আসে নাইতে এখানে। তারাও একই প্রকারে নায়। ছোমেদ কথকতায় বলে, সরেস্বতীও আয় এহানেই নাওনের লইগ্যা। আইয়া ঘাড্লার উপার বয়। অনেকক্ষণ তামাইত খালি বইয়াই থাহে। কিছু করে না। খালি পুহইরের পানিতে নিজের মুখখান দ্যাহে। দ্যাহে আর দ্যাহে। দ্যাখথে দ্যাখথে মাইয়ায় বেব্ভুল। হ্যার যে বুক উদলা, আচলডা খসইয়া পইড়য়া গেছে, হে বোধও থাহে না তহন হ্যার। হে খালি পানির মইদ্যে দ্যাহে, কী যে দ্যাহে। আহা!
আরও একজন নাকি দ্যাখে। সে দ্যাখে জঙ্গলের আড়াল থেকে। সে হলো দৌলত। ছোমেদের কথকতায় তার পরিচয়টিও পাই। সে এক জোয়ান। ছোমেদ বলে, ভাইগণ, বন্ধুগণ, এক যুয়ান দ্যাহে এক যুয়ানীরে। তয়, ভাইগণ, বন্দুগণ, শোনেন সব্বজন, এ দ্যাহনের রীতিনীতি অতি ভিন্নাচার। এ দ্যাহন কানুর দ্যাহন রাধিকার অবগাহন, এ দ্যাহন মজনুর চৌক্কে লইলীর বাহার। ফরহাদ শিরীরে দ্যাহে, দ্যাহে কল্পনায় মোহে, হে দ্যাহনে কোনো কিছু নাই কুআচার।
ছোমেদের বর্ণনায় নির্গলিতার্থ বোঝা কঠিন নয়। সে প্রেমের দেখা আর লোভের দেখার মধ্যে তারতম্য আনে। কিন্তু এও বলে যে, লায়লা মজনু, শিরি ফরহাদ বা রাধা কৃষ্ণ, তাদের সাথে দৌলত সরস্বতীর তফাৎ আছে। তারা হেরে গিয়েছিল। বিচ্ছেদে তাদের আকাঙক্ষা মাথুর হয়েছে। এক্ষেত্রে কিন্তু দৌলত সরস্বতী মিলনে বিধুর হয়েছিল। তারা পরস্পর পরস্পরকে পেয়েছিল, যা অন্যেরা পায়নি। দৌলত সরস্বতীকে জিতে নিয়েছিল। সে এক মোক্ষম প্রশ্ন তুলেছিল, বড় মৌল প্রশ্ন সেটা। সে বলেছিল, সরস্বতী জালইয়ার মেয়ে আর সে নিকিরির ছেলে, তাদের উভয়ের পেশাই এক। তারা মাছমারা। আর অশ্বিনী মাস্টার তো বলেই ছিলেন, তারা মূলত একই জাত। খালি কালেচক্রে ধর্মটা ভিন্ন হয়েছে। তবে সে তাকে পাবে না কেন? কথা অকাট্য। ছোমেদ এখন কেস্সার গভীরে যায়। সে বলে, তয় হোনেন, হই কেস্সা।–
এহানে য্যারা য্যারা আছেন, মা বইন, বাপ ভাই, হিন্দু, শ্যাখ– আসলে তো মোরা বেয়াকেই মাছমারা জালইয়া নিকিরি। মাছমারারা বেয়াকেই গরিব। তো হেমতে মোরা তো জাতএকই। ধম্ম আলাদা। তয়, মুই সরেস্বতীর পামু না ক্যান, এই কতা কইয়া দৌলত খামি দেলে।– খামি বলতে জিদ ধরা। তো হে কতা পরে কমু হ্যানে। এহন মাইয়ার নাওনের কতা কই হোনেন।
সরেস্বতীও হাবান মাহে। আর পানি ছাউলায়।
ছাউলায় অর্থে জল ঘাটে। ছোমেদ বলে যায়, ‘আর পানির লগে কতা কয় হে। পানির লগে। তো, ওয়া যুয়ানীরা করে এই বয়সে। আবার গুণগুণ করাইয়া গীতও গায়। গায়–
আইজও যদি নাআ আসিলা বন্দুউ
আ আর কবে দেবে দ্যাখাআ।
আমি ফুলও তুলিলাম –
মালাও গাথিলাম
পরিলাম কুঙ্কুমের ল্যাখা গো বন্দুউ
আর কবে দেবে দ্যাখাআআ।
আমি তো যুবতী নারী
আর কত সইতে পারি–
দিহিন ও রাতি কাটাই একা গো বন্দুউ,
আর কবে দেবে দ্যাখাআ।
এইসব গান গায় কন্যা, গুনগুন করে, একা ঘাটের পৈঠায় বসে। একদিন শব্দ শোনে সে, শুকনো পাতার মচমচ। ভাবে শেয়াল কুকুর কিছু হবে। মনের ধন্দ কাটে না। শব্দ শুনে তাই চমকায়। মানুষ না তো! এবং সাত জলদি, ভিজে কাপড়জামা গায়ে জড়ায়। কিন্তু সে কাপড় তো তাকে আরও প্রস্ফুটিত করে। প্রখর তাপের জন্যে যে যুবতী এক সময় নিশ্চিন্তে নির্মোক হয়েছিল, সহসা যদি সে তার মসৃণ ত্বকে, গ্রীবাসন্ধিতে বা উত্তুঙ্গ স্তনশীর্ষে একজোড়া সতৃষ্ণ চোখের চাওয়ার অনুভবে বিদ্ধ হয়ে ত্বরিতগতি সিক্তবস্ত্র হয়, তবে সে দৃষ্টির উৎস তার গোচর না হলেও, অনুভবে তার যে চকিত ভাবটি গড়ে ওঠে, সে বড় মনোরম। আর সেই দৃষ্টি যে তাকে আনন্দবিধুরও করে না– সে কথাই বা কী করে বলা যায়? তাই ছোমেদ ব্যাখ্যায় – মাইয়া মাইন্সেরা এডা বোজতে পারে। কেউ যদি যুত্তোবোন্দে হ্যারে নজর করে, হেয়া হে ট্যার পায় হারা গায়। সরেস্বতীও পায়। এ সোমায় তো ক্যারো ইদিকে আওয়ার কতা না!
সত্যিই, গ্রামের সবাই জানে, এ সময় এখানে মেয়েরা নাইতে আসে। তাই কেউ এদিকে আসে না। তবে এ শব্দ কীসের। একা পুরুষ্টযৌবন মেয়ে ঘাটে বসে সাবান মাখে। ঘালি গা। এ দৃশ্য পুরুষদের দেখা ‘গুনাহ্’। ছোমেদ বলে, এয়া য্যামন গুনা আবার দেহন দষ্টব্যে হেডা অলয্যে কামও, তয় মোগো দৌলতইয়ার তো তহন হে হুস পইদ্য নাই। হে হালায় তহন পীরিতের জ্বালায় বেতাবুদ।
ছোমেদের বক্তব্যে যা বুঝি, তা এক অসামান্য প্রেমাবেগের বর্ণন। সে প্রেমে প্রেমিকাকে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখায় কোনো গুনাহ্ থাকার কথা নয়। ছোমেদ বলে যায় আবিষ্টের মতো। শ্রোতাজন শোনে পরণকথা শোনার মুগ্ধতায়। কথক এবং শ্রোতা উভয়পক্ষই যেন ভর হওয়া বা দশায় পড়া মানুষের মতো। অথবা দৌলতের সেই মহিম প্রেমাবেগ কি সবাইকেই আশ্রয় করে? ছোমেদ বলে যায়– সরেস্বতী হাবান মাহে আর পানি ছাউলায়। ধীরে সুস্তে নায় মাইয়ায়। আর পানির লগে কতা কয়। হ, পানির লগে। পানির লগে কতা? আপনেরা হয়তো ভাবতে আছেন, বুড়ইয়া বলদা, ছোমেদইয়া হালায় কয় কী? পানির লগে নি কেউ কতা কইতে পারে। ওয়া বয়স্থা যুয়ানীরা পারে। হ্যারা এরহম কতাও কয়, আবার গুনগুন করইয়া গীতও গায়। হে গীত য্যারা হোনছে, হ্যারা জানে ওই যুয়ানীরমনের ব্যাতাডা কী? তয় একখান হেইরহম গান ফরমাই হোনেন–
মুই ক্যামনে ঘাডে যাই
মোর লাজে মাতা কাডা যায়
সুন্দর নাগর বুজি বইয়া রইছে নায়।
আহা আইস নাগর বইস নাগর।
পৈডারও উপরে
আহা তোমাআরে দেখিয়া আমার
বুক ধক্ধক্ করে।
আহা– পৈডায় বইইয়া নাগর–
নাগর ঠারেঠোরে চায়
মোর একূল ভাস্ইয়া যায়
মোর ওকূল ভাস্ইয়া যায়
মোর দুকূল ভাস্ইয়া যায় রে–
মুই ক্যামনে ঘাডে যাই–
তো সরেস্বতীর মনে বিত্তান্তডাও এ্যাই রহম। হ্যার একূল ভাসইয়া যায়, ওকূলও ভাসইয়া যায়। আর এ রহম সোমায় হে যদি রোজ রোজ পাতার মচমচানি হোনে, হে কী করবে? হ্যারও তো এট্টা লোহুমাসের শরীল। হেয়াতেও তো ওই পাতার মচমচানি ম্যাকম্যাকি পয়দা করতে পারে। পারে কিনা কয়েন আপনেরা দশজোনে। যদি না পারে, তয় তো সরেস্বতী, সরেস্বতীই না। হে তো হেইলে মাইয়ামানুই না। তো, হে হোনে পাতার মচমচানি।
সরস্বতী প্রথম প্রথম এই শব্দ শেয়াল কুকুরের শব্দ বলে ভেবেছিল। তারপর একদিন ভাবে, মানুষ না তো? আজনা আশঙ্কায় তরতরিয়ে সে নেমে গিয়েছিল জলে, সিঁড়ির শেষ ধাপে। গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে। ছোমেদ সেই ভীত, হরিণী-প্রেক্ষণার ছবিটি বর্ণনা করে। সে বর্ণনা হয়তো অধুনা নাগরিক জনের রুচিতে হাতুড়ি মারবে, কিন্তু অষ্টাদশ শতকের ধারায় আমরা সে বর্ণনা অক্লেশে দিতে পারি, যা আমাদের সম্ভবত নিজস্ব ধারা।
ছোমেদ বড় আলগোছে, দরদ দিয়ে চিত্রকল্পটি তৈরি করে। তার ভাষা, এই চিত্রের উপযোগী, নম্র-কম্র-শব্দ-পদ না থাকায়, মুখের এবং হাতপায়ের সাধ্যে আব্রহ্ম-স্তম্ব সংবেদ্য মুদ্রায় তার মানসচিত্র উপস্থিত করে সে। ভাষায় শুধু প্রকাশ পায়– ‘ভাইগণ বন্দুগণ, মুই আলেহা, আপড়া, যেয়া ভাবি হেয়া কইতে পারি না, আর যেয়া কই, হেয়া মোর কতা না যেন। তো হেয়া যাউক। হুগনা পাতার খচমচানিতে মাইয়ায় বড় আউলায়। হ্যার বড়ো তরাস অয়, ভয় অয় মনে। তো, ভাইগণ, বন্দুগণ, এ কতা তো চণ্ডীদাসও কইয়া গ্যাছেন–
আকুলও অইল মোর
বেয়াকুলও মোন–
তো হে রহম তো মুই কইতে পারমু না। মুই আলেহা, আপড়া, বোদ ভাইস্য কিছু নাই। তয়, মাইয়ায় কইলম বড় আউলায়, হে জিগায়, কেডা ওহানে?
তখন দৌলত বেরিয়ে আসে। এসে বলে, উডইও না। মোর কোনো দুষ্ট বুদ্ধি নাই। মুই দিওয়ানা। মুই আইজ কইলম মজনু।
এইস্থানে লায়লা মজনু, শিরী ফরহাদ বা রাধা কৃষ্ণ চিরন্তন প্রেমিক-প্রেমিকা। এই আপড়া, আলেহা, মানুষজনেরা সবাই বহুকালাবধি এই কাহিনী শুনে, একে যেন কবে সংস্কারে গ্রহণ করেছে। কিন্তু এসব কথা গদ্যে বলা যায় না। কেননা, ছোমেদ তো এখন শুধু সেই ঘটনাটা বলে না, সে ঘটনা এখন কিংবদন্তি হয়ে “পরণকতার” মাত্রার ধ্রুপদী হয়েছে। সে বলে, এ কতা মুই গানে কমু। হোনেন বেয়াকে, দৌলত কী কয়, হে কয়–
আহা মুই অতি আবাগা যুয়ান।
আহা বিদি অতি নিরদয়ও
মোর বদিল পরান।
তুমি যদি ডরো কয়ন্যা
মোর মাতা খাও।
তোমার লইগ্যা কয়ন্যা আমার
এই যোয়ানীর নাও।
এই নায় চড়িয়া তুমি
পরণকতার দ্যাশে
তরতরাইয়া ভাস্ইয়া যাবা
অজানা উদ্দেইশে।
দৌলত বলে, তুমি যদি আমাকে ভয় পাও, অবিশ্বাস কর, আমি বিষ খাব, পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব বা গলায় দড়ি দেব। ছোমেদ বলে, সরেস্বতী দৌলতেরে চেনে আগেই। চেনবে না ক্যান? পাশাপাশি গেরাম– ওই গানে কয় না–
আমার বাড়ি বন্দুর বাড়ি
মইদ্যে সুরও নদী
সেই নদী ক্যামনে অইল
অকূল জলদি।– তো
সরেস্বতী জিগায়, তুমি এহানে আও ক্যান?– না মোর পরাণডা পোড়ে। কয়ন্যা কয়– ক্যান? পরাণডা তোমার পোড়ে ক্যান?
সরস্বতীর মনে এখন আর ভয় নাই। কেন নেই, সেকথা ছোমেদ বিস্তার করে জানায়। বলে ভাইগণ, বন্দুগণ, এ কথাডা জানইয়া রাহেন, কোনো যুয়ানী যদি বোজে যে অমুক যুয়ান হ্যারে ভাল পায়, ভালবাসে, তয় হে হ্যারে ডরায় না। ক্যান? যে ভালবাসে, য্যার মনে পীরিত জন্ম লইছে, হে তো কোনো ক্ষেতি করতে পারবে না। সরস্বেতীই হেই রহমই বোজ্জেলে। হ্যার লইগ্যা হে জিগায়, তোমার পরাণডা পোড়ে ক্যান? ভাইগণ, বন্দুগণ, এরহমই অয়। যহন পীরিত অয়, তহন একজোনের লইগ্যা অইন্যা জোনের পেরাণডা পোড়ে। দৌলত বলে, তা জানি না। তবে পোড়ে। এই হলো শুরু। ছোমেদ আবার গানে ফেরে। গানে সে দৌলতের জবানি গায়–
তুমি কতা দ্যাও কতা দ্যাও মোর পরাণ পোড়ে।
আহা–
কতা দ্যাও।
কতা যদি না দেও কয়ন্যা ডুবিব সাগরে।
আহ কতা দেও।
জাইতেতে নিকিরি মুই জিওলির ছাও।
আহা–
একোই গাঙে ভাসে মোগো মাছমারা নাও।
আহা–
তোমার বাফের আমার বাফের একোই সাইদার
আহা–
একোই নাওয়ে ভাসইয়া হ্যারা ভবনদী পার।
আহা–
বুরজুগ আলি সাইদার হ্যার নাওয়ে কাম।
আহা–
বাপ দাদা চৈদ্দ গুষ্টির একোই পরিণাম
আহা–
কহন থিহা জানি মোরা মোছলমানের ছাও
আহা–
তোরা হিন্দুরও গুষ্টি তোগো ভিন্ন ভাও
আহা–
মুই না জানিলাম কিছু ক্যান এত ল্যাডা?
আহা–
নিকিরির ছাওয়ালও তো জালিয়ার ব্যাডা।
আহা–
হেকতা হয়ত্য যদি মুই হক্ চাই
আহা–
সরেস্বতী রাজি অইলে বাজুকও সানাই
আহা–
তো দৌলত পেরথম খ্যাপেই আসল কতাডা কইয়া ফ্যালাইলে। মোগো মইদ্যে তো এ রহমই। মোরা ধানাইপানাই বুজি না। যা কওনের হেয়া পেরথম চোডে কইয়্যা ফ্যালাই। হে কইলে, সরেস্বতী মুই তোরে পেরানের থিহা বেশি পিরিত করি। মুই তোরে পামু না ক্যান? সরস্বতী বলে–
আহা, একে তো যৈবন কাল তাহে মুই নারী
আছৈয়া নাওয়ারে মতো কত ভাসতে পারি!
তুমি যদি আইলা বন্দু, তুমি হইলা ছই,
গোণেতে ভাসাও নাও, মনের কতা কই।
তয় দ্যাহেন, শাস্তরে কয়– মিঞা বিবি রাজি, তে ক্যা করেগা কাজী? সরেস্বতীর মনেও ফুল ফোটছে। ফুল যদি ফোডে তো হ্যার বাস যাইবে কই? দৌলত হেই ফুলের বাস পাইলে তহন একদিন–
ফুলও ফুটিল আহা বাহাসো ছাড়িল
ফুলের বাসে দৌলতিয়ার আহাশা জাগিল।
আহাশা জাগিতে দৌলত মনে মনে হাসে,
কয়ন্যারে লইয়া দৌলত মইদ্য গাঙে ভাসে।
আসমানেতে পুন্নচন্দ্র ঝল্মলিয়া ওডে
সরেস্বতী দৌলতের বিয়ার ফুল ফোডে।
তয় ভাইগণ, বন্দুগণ কহি আমি পেরবচন, আইজ যাহা দ্যাখতে আছ হেয়া ফুল ফুলানি। কাইল আইবে ঝাপ্পুর ঝুপ্পুর, পিডে পড়বে ঘাপ্পুর ঘুপ্পুর, ট্যার পাবা সোনার চান্দ গোপাল গাদানি।
রাত গভীর হয়েছে। শ্রোতারা অতন্দ্র। ছোমেদ বলে, কার্তিক ভাই, তুমি তো বেয়াকই জান। মুই বড় কেলান্ত। তুমি এনাগো ধারে দৌলত সরেস্বতীর কেস্সাডা এট্টু কও। মুই এট্টু জিরাই।
