Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    মিহির সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প368 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১৫

    পনেরো

    সপ্তমীর সন্ধ্যা। শারদী সপ্তমীর আকাশ হালকা কুয়াশা এবং ক্ষীণ জ্যোৎস্না নিয়ে এই দক্ষিণ-পূর্বপ্রান্ত বঙ্গে ঠিক একই রঙ-রূপে রূপবতী, যেমন আমার উন্মেষকালে দেখেছি। কোনো তফাৎ নেই। তফাৎ শুধু একটাই। সেই মানুষেরা আজ আর নেই। থাকার কথাও নয়। তবে যা হওয়ার কথা ছিল, তাও তো হয়নি। এখন যা দেখি, তা শুধু সেদিনের কঙ্কাল। প্রাকৃতিক পরিবেশে আড়ম্বরটি ঠিকই আছে, শুধু জনবসতির বিচারে গোটা ব্যাপারটির চেহারা যেন বিগত দিনের কঙ্কাল। মানুষ নেই, নিয়ম আছে। সেই নিয়মটুকু নিংড়ে, অবশিষ্ট মানুষের কায়ক্লেশে উত্তাপ গ্রহণের প্রচেষ্টা। সেই নিয়েই তাদের বাঁচা, উৎসব করা।

    এখানে এখন যে সব মানুষজনেদের বাস, পৃথিবীতে তাদের আর কোনো যাবার স্থান নেই। যাদের ছিল, তারা সব চলে গেছে। প্রথমে গেছে হিন্দুরা। দাঙ্গায়। দাঙ্গার ভয়ে। রুটি রুজির প্রয়োজনে। ভাগ্য ফেরাবার তাগিদে। তারপর শিক্ষিত মুসলমানজনেরা চলে গেছে নগরে, শহরে, ক্রমশ বহির্বিশ্বে, কুয়েত, সৌদি আরব, আবু ধাবিতে। এভাবে এইসব গ্রাম ক্রমশ লক্ষ্মীছাড়া হয়েছে। শ্মশান হয়েছে। সুন্দর বাগান আগাছায় ভরে গেছে। জঙ্গল বেড়েছে। বাগানের নারকেল সুপারির সুন্দর আবেষ্টনীগুলো ধ্বংস হয়েছে। পুকুরগুলোর ঘাটে ফাটল ধরেছে, পানায় ভরে গেছে। সেই পানা পচে পচে এক সময়ে পুকুরগুলো বুজে গেছে। শুধু যারা জমির সাথে নিয়ত সন্নন্ধ, তারাই আছে। কিন্তু তারা পুকুর, বাগান, নদী, খালের সৌন্দর্য বোঝে না বা বুঝলেও তার সংস্কার করার সাধ্য রাখে না। তারা সহজ বোধে জমির উপযোগিতা জানে। সে কারণে পুকুর, খাল, নদীর বুজে যাওয়া স্থলকে ধানক্ষেত করে। বাগানের নারকেল সুপারির গাছগুলোকে বা আম জাম লিচুর বাগিচাকে কেটে সাফ করে ধান ফলাবার প্রযত্ন করে। ধান তাতে ফলে না তত, শুধু আম জাম লিচুর বাগিচা হারিয়ে যায়। এখন এখানে যেদিকে তাকাই শুধু ধানের ক্ষেত। কিন্তু অভাব ঘোচে না, মানুষ বড় অভাবী এখানে। বড় রুগ্ন আর ক্লিষ্ট সবাই। তবুও এই শারদী উৎসব তাদেরকে উজ্জীবিত করে। তারা উৎসবে সামিল হয়, উজাগর হয়।

    সকাল থেকে যা যা দেখা হলো, তা সেই একদার নিয়মের অনুসরণে কিছু কৃত্য। তার সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু সমসাময়িক ফাজলামো। সে যাই হোক, সবটাই খুব উপভোগ্য হয়েছে। এটুকুও থাকুক অন্তত, এও তো কম নয়। তা ছাড়া নতুন তো কিছু দেখছি না। তা যখন নেই, তখন এটুকু অন্তত থাকুক। কিছু-না থেকে তা তো ভালো। এ-রকম একটা বুঝ দেওয়া মনকে।

    এইসব ভাবছি। এমন সময় একটা রব ওঠে– ছোমেদ বয়াতি আইছে। ছোমেদ্‌ইয়া আইয়া পড়ছে। ছোমেদকে আমি বাল্যাবিধি চিনি। তখন দিনকাল অন্য রকম ছিল। তখন পুজোর সময় যাত্রা, থিয়েটার, লাঠিখেলা, ছোরাখেলা এইসব হতো। পুজো শেষ হলো, জারি সারি মারফতি গুণাবিবির হরেক অনুষ্ঠানে রাতগুলি ভরে উঠত এখানের এইসব গাঁও গেরস্থালিতে। ছোমেদ সেসব দিনে আমাদের কাছে বড় আাকর্ষণীয় মানুষ ছিল। সে যেমন জারি সারি গাইতে পারত, তেমনি তার দক্ষতা ছিল কীর্তন, রয়ানি, পরণকথা, কথকতায়।

    সে সব দিনে ছোমেদ আসত উৎসবের শুরুতে। শারদী উৎসবের শেষে যখন আত্মীয় বান্ধবেরা বিদায় নিত। যখন দূর শহর নগর থেকে আসা সবাই ফিরে যেত তাদের কর্মস্থলে, যখন আমাদের শিশুবয়সের মনখারাপগুলো হেমন্তের বিষণ্ণ আকাশ থেকে নেমে আসা কুয়াশার পর্দায় সেঁটে থাকত, তখন ছোমেদ তার জারিসারি পরণকথার ঝাঁপি খুলে সেই অসম্ভব বিবর্ণ সময়কে উজ্জ্বল করে রাখত।

    ছোমেদ ছিল নিকিরি অর্থাৎ মাছমারা, সামান্য চাষবাসও ছিল তার। কিন্তু মাছ ধরা বা চাষের কাজে তার কোনো দক্ষতা ছিল না। মাঠে চাষের কাজের সময়, ধান কাটার মরশুমে বা ধান মাড়াইয়ের খাটাখাটনিতে যে-সব মানুষ ব্যস্ত থাকত, তারা ছোমেদকে ডাকত অন্য প্রয়োজনে। ছোমেদ তাদের তার কথকতা, গান বা পরণকথায় উজ্জীবিত রাখত। প্রতিদানে তারা ছোমেদের কাজগুলো করে দিত। আবার সাঁইদারের ট্রলার বা বড় নৌকোয় নদী বা সাগরে যে সব মাছমারারা যেত সেখানে ছোমেদের একই ভূমিকা থাকত। এ জন্যে সাঁইদার নিজেই তাকে বহাল করত অর্থের বিনিময়ে। কেননা, এ-সব কাজে ছোমেদের ভূমিকা খুবই জরুরি। অন্যথায় জেলে বা নিকিরিরা এই নিরন্তর বোবা পরিশ্রমের উদ্যম হারিয়ে ফেলে। সাগরের নোনা জলে দিনের পর দিন একঘেয়ে খাটুনির বৈচিত্র্যহীনতার, আনন্দহীনতার বিবর্ণতা যখন সেই দুখী মানুষগুলোকে গ্রাস করত, যখন প্রিয়জনদের বিচ্ছেদ তাদের অসহ্য হয়ে উঠত, তখন এই ছোমেদরা অশ্লীল গান, কেস্‌সা ইত্যাদি দিয়ে তাদের বিরসতা কাটাত, তাদের বিষণ্ণতা দূর করত। শীতের মরসুমে ফসল মাড়াইয়ের দিনগুলোতে প্রয়োজন হতো ছোমেদের মতো বয়াতিদের। তাদের কাজ শুধু শব্দ বয়ন করে গান, কথা এবং কেসসার এক উষ্ণ জৈবপ্রায় শরীর বুনোট করা, যে শরীর মুখবাঁধা বলদের পিছনে পিছনে পরিক্রমারত মুনিষ মহিন্দরদের সনাতন শ্রমকৈবল্যে প্রায় যৌনসুখানুভূতির অঙ্গীকার এনে দিত।

    ছোমেদ বয়াতি এসেছে, এ সংবাদ আমার কাছে এক অপূর্ব সমাচারের মতো শিহরণ জাগায়। ছোটোবেলার সেই ছোমেদভাই। যে কোনো অবস্থায়, যে-কোনো পরিস্থিতিতে, মুখে মুখে যে শব্দবন্ধ, কবিতা, কথা তৈরি করে যাদুর ভেল্কি দেখাতে পারে, যে মানুষকে চূড়ান্ত নৈরাশ থেকে, বিবর্ণ জীবনযাত্রার কুৎসিত একঘেয়েমি থেকে, ধ্বংসের বিভীষিকা বা দারিদ্র্যের ক্ষীয়মাণতা থেকে মানবিক হৃদয়বৃত্তের বলয়ে স্থাপনা করতে পারে, কিংবা যে তার নিজস্ব মণ্ডলের সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির রক্তচক্ষু এবং অত্যাচারকে তুচ্ছ করে, ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির প্রসারণে নিজেকে অতন্দ্র রাখতে পারে, সেই ছোমেদ ভাই এসেছে। এটা আমার কাছে এক বিশেষ প্রাপ্তি। যেমন আগে বলেছি, এখানে বার বার আমার এই আসা যেন কোনো এক নিবন্ধ, সে আমার তো না এসে কোনো উপায় নেই। বা এ কি কোনো সন্ধানে আসা, সে সন্ধান কি ছোমেদ ভাইকেই? ছোমেদ ভাই কি আমার শিকড়? সে কি আমার বাবা? পরবাসী, নির্বাসিত দেশবিভাজনে নিক্ষিপ্ত আমি কি আমার বাবা অর্থাৎ পিতা বা শেকড়ের খোঁজেই এখানে আসি?

    কিন্তু সে কি? সে তো বাস্তবে একজন অশিক্ষিত শ্লীলাশ্লীলবোধশূন্য এক কথা-কারিগর। আমি একজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, নগরজীবনে মার্জিত রুচির এক নাগরিক। আমার সাথে তার যোগ কোথায়? সম্পর্ক কী? এই ছোমেদ তো পৌষালি ধান মাড়াইয়ের খোলায়, আধো আলো, আধো অন্ধকারে, মাথায় ছেঁড়া গামছা জড়িয়ে কোনো এক ক্রমচক্রমাণ মুনিষের পিছনে ঘুরে ঘুরে এই গান গায়

    আহা তোমার বিবি হুইয়া আছে
    ক্যাতা মুড়া দিয়া
    আহা তুমি সোনার চান্দো
    কেন মর ঘুরঘুরাইয়া।
    আহা ধান পান যা হইবে
    সে সবও মালিকের
    হেসগল অন্ন কি তোমার
    বালও বাচ্চার মুখের।
    আহা মুহাবান্দা বলদ ঘোরে।
    পেটবান্দা তুই
    তোরও কাম রোওন চওন
    মালিকেরও ভুই।
    তুই চইবি তুই রুইবি
    তোরও হাতে দাওয়া
    তমো তোমার জোটবে না তো
    নেত্য দুই মুইঠ খাওয়া।
    তোমার বিবি হুইয়া আছে
    এ্যাহেলা ক্যাৎরাইয়া
    মালিকেরও বিবি ফাউকায়
    বিছানাতে হুইয়া।

    সে এমন এক উচ্চারণে, এমন সুরে এ গান গায় যে মালিকের বাড়ির উঠোনে, মাড়াইয়ের খোলান হলেও, তারা এর বিন্দু বিসর্গ বুঝতে পারে না। তাদের কানে শুধু সুরটুকু পৌঁছে তাদের ঘুম গাঢ় করে। এ গান শুনতে হয় তাদের সাথে বসে। সে গাইবে

    আহা, তোমার বিবির প্যাডে যদি
    অইন্য ক্যারো পোনা
    ঘাপটি মারয়া বইয়া থাহে
    ক্যামনে তা জানা।
    হেই পোনা পোষে তুমি
    সরলিত মন
    আহা তোমার জীবন কান্দইয়া মরে
    তোমারও যৈবন।
    আহারে মুরুব্বির পোয়রা
    আছ আডে সাডে
    ক্যামনে উঠিয়া শোবা
    মাহিন্দরের খাডে।
    মাহিন্দারের হুদা নাই
    কোথায় কাডে রাইত
    মলন্তি গো খাডতে অইবে
    বেয়ানও তামাইত।
    ইতিমধ্যে তার খাডে
    কেবা করে নীলা
    ছোমেদ আলি কয় সে জোন
    নিদয়া রঙিলা।
    নিদয়া রঙিলার কতা
    কত কব আর
    মাহিন্দারের খাডে হুইয়া
    রসেরও ভাতার।

    এই হলো ছোমেদ বয়াতি। বড় দুঃখের, বড় লজ্জার কথা, নৈরাশার গাথা সে বানায় এ-রকম। কিন্তু যাদের এ সমস্যা, সেই মুনিষ মাহিন্দারেরাই শোনে এ সব গান।

    সেই ছোমেদ এসেছে। সে এখন খালপাড়ের কলঘরে কার্তিকের সাথে বসে বার্তালাপ করছে। কার্তিক অবশ্যই গাঁজায় দম দিয়ে তার কথা শুনছে। কলঘর বলতে ধানভানা মেশিনের ঘর। খালপাড়ে একটি সুদৃশ্য রেইনট্রির নীচে একখানি দোচালা ঘর। সেখানে ধানভানা কল বসানো হয়েছে। মানুষেরা যারা চাষে আছে, তারা সেখানে এসে তাদের ধান ভানিয়ে নেয়। এখানে এখন বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। হুঁশিয়ার জোতদার মহাজনেরা তাই একটি মোটর আর হাস্কিং মেশিন বসিয়ে তার ফয়দা উঠাচ্ছে। সেখানেই এখন ছোমেদ আর কার্তিক তাদের বিশ্রম্ভ-আলাপে মশগুল, এমন শুনলাম।

    পূজামণ্ডপের ভিড় এড়িয়ে সেদিকে এগোই। আকাশে ন্যাংটো ছেলের মতো এক ফালি চাঁদ। চারদিকে দেশি-বিদেশি নানান গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তার আলো এসে পড়েছে মেঠো রাস্তায়। রাস্তার দু-পাশে ধানক্ষেতে এখনও জল আছে। মাঝে মাঝে চ্যাং শোল মাছের গুপগাপ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে সেখান থেকে– আবছা চাঁদের আলোয় ধানগাছের গায়ে বসা পোকা ধরে খাচ্ছে তারা মনে হয়। রাস্তার কিনারা আর জলের শুরুতে বড় বড় ঘাসের বনে উচিচংড়ের একটানা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মণ্ডপবাড়ির ঢাকের বাজনা এখন বেশ খানিকটা দূরের এবং সে-কারণে মিঠে। দূরে সামনের খাল বেয়ে যে ডিঙিগুলো যাচ্ছে, বৈঠার ঠকাস্‌ঠক্‌ শব্দে তা মালুম হচ্ছে। গঞ্জফেরত মানুষেরা ঘরে ফিরছে। বাঁ হাতি পুকুরটার একপাশে বাঁশঝাড়। তার ঘন আঁকশিগুলোর মধ্যে জোনাকিরা জ্বলছে নিবছে। আরেক পাড়ের কোথাও যেন একটা কাগুজিলেবুর গাছে ফুল ফুটেছে। গন্ধ পাচ্ছি। বাঁশঝাড়ের কিনার ঘেঁষে একটা কালোকুষ্ঠি অন্ধকার, বেশ লম্বা মতন। অনুমানে বুঝি এটা একটা গাব গাছ। পুকুরটার যেদিকে খালের সাথে যোগ সেই ‘জান’ বা প্রণালীর উপর ঝুঁকে আছে এক সপুষ্প হিজল। এই সামান্য জোছনায়ও তার আভাস পাই। সবকিছুই কীরকম যেন আত্মীয়ের মতো মনে হয়। মনে হয়, এরা সবাই এক্ষুণি কথা বলে উঠবে। জানতে চাইবে, আছ তো ভালো? কোথায় আছেলা এ্যাদ্দিন?

    পথ শেষ হয় খালের ধারে। তারপর আবার শুরু হয় আড়বেঁকা হয়ে দুদিকে খালের পাড় ধরে। আমার গতি খালপাড় অবধিই। গাঁজার কটুগন্ধ আর ছিলিমের জ্বলন দেখে নিশানা হয় মনুষ্যের। অইখানে, অইখানেই আছে ছোমেদ আর কার্তিক।

    গাছের আবেষ্টনী ছাড়িয়ে চাঁদ এখন আকাশে পুরো উলঙ্গ শিশু। খালের জলে শেষ জোয়ার লেগেছে দিনের। সেই উচ্ছ্বাসে কিনারায় ছোটো বড় ঝোপে আলোড়ন। দূরে দূরে আবছা আলোয় রেইনট্রি চম্বল আর বট অশ্বত্থের মনোলিথিক গাম্ভীর্য। পাশে বতী হয়ে ওঠা ধানক্ষেত। সেই ক্ষেতকে বেষ্টন করে অনেক তফাতে দাঁড়িয়ে নারকেল আর সুপারির সন্নিবদ্ধ প্রহরা। কলঘর থেকে খালের তীর ধরে একটু ‘নাবালে’ একটি বিস্তীর্ণ ছৈলা গাছের গেরস্থালি। এ-সময়ে পৃথিবীকে প্রকৃতই যেন এক ‘মায়াবী নদীর পারের দেশ’ বলে মনে হয়। এই অন্তরঙ্গ মৌনে বসে আছে অপবর্গী বৃক্ষপ্রায় মানুষ। যেন অধুনার চক্রব্যূহে বিগত কালের সওদাগর। তাদের ভাষা, আচরণ, সংস্কৃতি যদি বা পরম্পরাগত, হঠাৎ নগর থেকে ছিটকে আসা আমার সাথে যেন কোনো যোগসূত্রই নেই। আাবার যেন আছেও বা। কেননা এই শিকড়েই তো আমার অস্তিত্ব। তাই তাদের সওদাগরির, বে-মুনাফার বেসাতির ‘গাহেক’ বা গ্রাহক আমিও নই কি? দুজনে বসে কথা হচ্ছে। একে ঠিক কথা হওয়া বলে কিনা জানি না। এ যেন বিলম্বিত লয়ে ধ্রুপদী আলাপ। তালের হদিশ পেতে হলে কান চাই তুখোর। কেননা, লয় এত বিলম্বিত যে এক চাঁটি থেকে অন্য চাঁটিতে পৌঁছনোর মধ্যে শ্রোতারা অনায়াসে বাইরে গিয়ে চা, সিগারেট, হিসি তিনটেই সেরে আসতে পারেন। এ আলাপের তরিকা আলাদা, যে জানে সে জানে।

    খালের ধারে একটি সমবয়সি রেইনট্রির নিবিড় জঙঘার উপর আয়েস করে বসে তাদের আলাপ, খালের গতি, কচুরিপানার ভেসে যাওয়া, ও-পারের আলোআঁধারি এবং তাবৎ পারিপাশর্ব সম্ভোগ করি। অতীতের সাথে বর্তমানকে মেলানোও এক সমস্যা। এ-সমস্যা একান্তই আমার। আমার নাগরিক বোধে অতীত-বর্তমানের বিভাজন বড় প্রকট। ছোমেদ কার্তিকের এ-সমস্যা নেই। এদের বার্তালাপের সুবাদে তা বুঝি। তারা আছে এক নিরন্তর বহমানতায়। সে বহমানতা কালচক্রযানের আপাতদৃশ্য গতি এবং অন্তরঙ্গীয় স্থিরতায় ধ্রুব। একসময় আমার সত্ত্বার এক অনির্বচনীয় রূপান্তর ঘটতে থাকে। আমিও এক কালহীন চেতনার গূহ্যবহতায় অংশী হয়ে তাদের কাছাকাছি পৌঁছে যাই। সেখানে পৌঁছানোর আর্তি নিয়েই কি আমার এতকালের চরণদারি? সেই নিঝুম আলোছায়াতে দুই স্বপ্নসম্ভব সওদাগর যেন জেগে উঠে নড়েচড়ে বসে। একজনের জিজ্ঞাসা এই চরাচরের রহস্যময় কুয়াশা ফুঁড়ে বাঙ্ময় হয়– “কেডা ওহানে?” সাড়া দিলে এক ছায়া উঠে আসে, বলে, “ভাইডি? হুনছি তুমি, তোমরা আইছ, আছ তো ভাল বেয়াকে? আহা, কতদিন পর”। এবং এভাবে ছায়া মূর্তি পায়। প্রশ্নের গাঢ়তায় বুঝি ছোমেদের মনে আছে আমাকে। নচেৎ তুমি করে কথা বলা এস্থলে রীতি নয়। এ নেহাতই আত্মীয়তার ব্যাপার। যারা জানে তারা জানে। তখন সেই জীর্ণ প্রাচীর শরীর তার বেতস লতার মতো হাতে এ-শরীরকে আলিঙ্গন করে। তখন জলের শব্দ অতিদূর থেকে ক্রমশ কাছে কলরোলে বাঙ্ময় হয়। চাঁদ ও তারার দ্যুতি আনন্দিত প্রভায় আমাদের অভিষেক করে। তখন একজন ডাকে, তার কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ, ছোমেদ ভাই। এবং অপর জন উত্তর দেয়, ভাইডি! এবং তখন সেই গেঁজেল কার্তিক অভিমানে ফোঁসে, বলে, বোজো, পীরিতখান বোজো। কই বোলে হারা হকাল এত কতা। এহন মুই কেউ না? অ্যাঁ? মুই কি বাইর বাড়ির বাথ্‌উয়াডা? না কান্দা ভাঙ্গা মাড্‌ইয়া পাতিলডা, যে এখপাশে পড়াইয়া থাহুম? তখন তিনে মিলে এক নিবিড়তা হয়। সেখানে সেই নিসর্গের মৌনে বিগত কাল এসে বর্তমানকে আশ্রয় করে। দূর থেকে ঢাক, সানাই, ক্ল্যারিওনেট আর কাঁসির ঐকতান সেই মেদুরতাকে আরও মেদুর, আরও মোহময় এবং আরও সংবেদ্য করে তোলে। এবং এভাবে অনেক সময় পার হয়। একসময় কার্তিক বলে ওঠে, ছোমেদ, তয় তুই আইজ জারি গা। আইজ মোগো বড় আল্লাদের দিন। তুই আইজ আসর বওয়া, পরণকতা ক। জারিটারি এট্টু গা।

    ছোমেদ বাস্তব হয়, বলে, “ধুরও, সাজ নাই, পালং নাই, কয় হেমরি তোর ফুল সইয্য। দোহার দাহার নাই, অইব্যাস নাই, ক্যামনে এহন কতা বানাই, জারি গাই?” কার্তিক বলে, আরে হালার পো হালার গুষ্টি, জারিকতার আবার অইব্যাস কী? আসরে দাড়াবি, যা যা করণকারণ আছে করবি, হ্যাষে কবি, বন্দি দোহাই দোহার। অম্নে দেখফি তোর চাইর পাশে দোহারেরা বইয়া গেছে। আর ঢোল, সানাই, কাঁসি তো আছেই।

    ছোমেদ বলে, পরণকতা কই না, জারি গাই না আইজ ম্যালা দিন। এহন আর পারিও না। প্যাডের চিন্তা করমু না জারি গামু? তয় ভাইডি আইছে। আইজ তো গাওন কওন লাগে। কার্তিক বলে, মুইওতো হেই কতাহ কই। তুই সেনা মোড়াইতে আছ কেছউয়াডার ল্যাহান। তয় খল্‌ইয়ারে ডাহি?

    ডাক।

    খলিল আসে। এসেই কার্তিককে আদেশ করে, এই হালার পুত গাজা বানা।

    বানানইয়াই আছে– টান।

    খলিল কষে গাঁজার টান দেয়। কার্তিক জানায় আজ ছোমেদের আসর বসবে। খলিল যেন সব বন্দোবস্ত করে রাখে। গোঁসাই এর ‘আল্‌তি শ্যাষ হওন মাত্তরই’ ছোমেদ আসর বওয়াইবে। তুই হোগলা চাডাই মাডাই যা আছে, হেগুলা লাছ। পোলাপানেগো লগে কতা কইয়া দ্যাখ কেডা কেডা দোহার গাইতে পারবে। জারি গান কইলম দোহার ছাড়া গাওন যায় না। অন্দের য্যামন লাডি, বয়াতির হেই রহম দোহার। নাইলে জুইতই পাইবে না, বোজ্‌লেন নি জামাইবাবু, জারিগানের কতা তো খাড়ইয়া খাড়ইয়া বানাইতে অয়। দোহার না ধরলে, পরের কতা বানান যায়? না কি কও ছোমেদ ভাই, ভুল কইলাম? ছোমেদ বলে, কতা হাচা। যে কামের যে পইদ্য। বড় বড় গাছগুলা কাডনের সোমায় য্যামন কাছি বান্দ্‌ইয়া জুয়ানেরা টানে আর খামারের জাক্কৈর দে, দ্যাহনায় ভাইডি, ওই যে–

    মারো জোরে– হেইও
    আরও টানো– হেইও
    ফলনা গাছের– হেইও
    হোগার মইদ্যে– হেইও
    বান্দো কাছি– হেইও
    প্যাডের পোলা– হেইও
    বাইর অয়না ক্যান্‌– হেইও
    ফলনা গাছের– হেইও
    মা-মাসিরে– হেইও।

    বোজ্জনি, ভাইডি, ওই ‘হেইও’ ডুক না জাক্কৈর পারলে গাছও লড়বে না, আর পরের কতাও মুহে আইবে না। জারিগানেরও হেইরহম। খলিল বলে, তয় ছোমেদ ভাই, তুমি রেডি হও, মুই উদিগে ব্যবস্তা করি।

    হঃ কর। আর হোন, তুই কইলম নজদিগে থাইস। মুই, কইলম তোরে ছাড়া জুইত পামু না।

    হঃ। থাকমু হ্যানে। তোমার হেয়া কওন আসবে না।– খলিল চলে যায়। ছোমেদ এই অবসরে তার বয়াতি জীবনকথা, নানা অভিজ্ঞতার কথা বলে। কবে সে এ বাড়িতে গাঁটছড়া বেঁধেছে। রায়কত্তাকে বাবা ডেকে সে এ-বাড়িরই একজন হয়ে গেছে, সেইসব কাহিনী শোনায়। জারির নামে সে বেশ উত্তেজিত। বলে– বোজজোনি ভাইডি, তহন মোর বয়স বাইশ-তেইশ। হেবার পূজার পরপরই দলবল লইয়া জারির আসর বওয়াইলাম এই খালধারে। রায় মশায় উপস্থিত আছেলেন আসরে। হেবার ভাইডি যে রহম জারি গাইছেলাম, হে রহম আর গাই নায় কোনো দিন।

    তখনকার দিনে রায়কত্তা ছিলেন এক কিংবদন্তির পুরুষ। ভয়ানক, ডাকাবুকো, ডাঙ্কাবাজ বলে যাকে এখানকার লোকেরা। মাপে ছোটো হলেও চোটেপাটে সামন্ত। পাইক, কাহার নগ্‌দী নিয়ে বেশ একটি হার্মাদ বাহিনী ছিল তাঁর। যে যুগের যে রীতি। নিজের তালুক মুলুক জমিজিরেত শাসনে রাখার সাথে সাথে আশেপাশের শ’ দু’-শ একরের ফসল কাটিয়ে গোলায় তোলা সেসব দিনে তাঁর কাছে কিছু সমস্যা ছিল না। অনুষঙ্গ হিসেবে, ঘরে আগুন বা দু-চারটা খুনখারাবি সম্বচ্ছরের নিয়মের ব্যাপার ছিল। অবাক কাণ্ড এহেন রায়কত্তারও জারিসারিতে প্রীতি ছিল।

    ছোমেদের জারি শুনে তিনি তাকে ডেকে পাঠান। তখন পাকিস্তানি আমল। কিন্তু হলে কী হবে। রায়কত্তার এলেকায় তিনিই রাজা। ছোমেদ বলে, ভাইডি, মোর তো তহন কইলজা হুগাইয়া আমসি। জারি গাইতে বইয়া কী গাইতে কী গাইছি। এহন যদি হেসব লইয়া কিছু তিরুডি ধরেন তো মুই গেছি।

    জিগাইলেন, এ জারি শেখছ কোতায়?

    মুই কই, ওস্তাদ আব্দুল গনি বয়াতির জারি হুন্‌ইয়া।

    আব্দুল গনির মতো বয়াতি এই জারি গায়?

    হ, কেতাবও আছে।

    কেতাব? জারির আবার কেতাব কী? জারি তো আসরে মুহে মুহে বানতে অয়।

    কেতাবও আচে আইগ্যা।

    এয়া তো হিন্দু খ্যাদানইয়া জারি।

    তহন ভাইডি, কমু কী, মোর, সাইদ্যের বাইঝ্য পাইয়া গেলে। ডরে মোর মুহে আর কোনো কতা বাহির অয় না। মুই হেদিন গাইছেলাম নবীর কলেমার জারি। ঢাহার থিহা কেতাব আনাইয়া শিখছি। তহন বুজি নায় যে হ্যার মইদ্যে ম্যালা ভেজাল। রায়কত্তায় ধরেছেন ঠিকোই।

    –কীরকম?

    তখন ছোমেদ এক সাংঘাতিক তথ্য বলে। সে বলে, দ্যাহ ভাইডি, ল্যাংডা কাল থিহা জানইয়া আইছি, জারি, সারি, মারফতি এয়া বেয়াক গরিব মাইন্‌সের গান। দুঃকের কেচ্ছা। এয়া হোনলে মাইন্‌সের দিল মাইন্‌সের লইগ্যা টাডায়। কিন্তু যে কেতাবের জারির কতা কইলাম, হেতে হাচাই উল্ডাপাল্ডা কতা আছেলে। তহনকার দিনের বদমাইসরা এইসব খারাপ কতা, হিংসার কাত জারিগানের মইদ্যে ঢুহাইয়া মোরগো ল্যাহান আপড়উয়া আলেহা মাইন্‌সেগো মইদ্যে হেয়া পেরচার করছে। য্যারা রায়ট ফ্যাসাদ করছে, এডা হ্যারগো কাম।

    বিষয়টি জানা ছিল না। জারিসারি মারফতি লোকশিল্পের এক মহান ঐতিহ্য। সেখানে কী কূটকৌশলে দাঙ্গাকর্মীরা অনুপ্রবেশ করল জানতে ইচ্ছে হলো। ছোমেদ এ-বিষয়ে বেশ এলেমদার। তার কাছে শুনে বিষয়টি বুঝলাম।

    ছোমেদ সংক্ষেপে নবী কলেমার জারির গল্পটি বলে। হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণের আগে কোথায় কার ঘরে জন্মগ্রহণ করবেন– এবং কীভাবে তিনি ধর্ম প্রচার করবেন, উল্লিখিত জারিগানটিতে তাই বিধৃত হয়েছে। ছোমেদ বলে, ভাইডি, মোরগো নবী একজন পেকাণ্ড মানুষ আছেলেন। কত হ্যার গুণ, কত দয়ামায়া। তো দ্যাহ, হেই নবীরে লইয়া জারির কেতাব ল্যাখছে কী? না:–

    পানজামাতে আদম পয়দা
    কইরাছেন মোকবুল।
    স্যাও মুকিতে না বলে
    আল্লাহু রসুল।
    না ফড়ে নবীর কলেমা
    না ফড়ে কোরআন।
    তত পূজা আনহিক যত
    করে হিন্দুয়ান।
    আল্লা বলে দোস্‌তো তুমি
    দুনিয়াতে যাও।
    দশ দুনিয়ার মইদ্যে দোসতো
    পয়দা যাইয়া হও।
    সব কাফের মারো জবদো করো
    তোড়ে হিন্দুয়ানি,
    গরে গরে শুনাও দোসতো
    কলেমার ধ্বনি।

    মুই এই জারি গাইছেলাম হেদিন। রায়কত্তায় যখন কইলেন যে এয়া হিন্দু খেদাবার জারি, আসল জারি না, তহনই ধন্দে পড়লাম। হেয়া কেমন? আসলে জারি গান যে বয়াতিরা গায়, হেয়া এট্টা ঘোরের মইধ্যে গায়। তহন বয়াতির খেয়াল পইদ্য থাহেনা। হে হুশ্‌ইয়ার থাহে না। হেকারণ, ল্যাহা, জারি গাইতে নাই। ক্যান্‌? না, মোরা যখন জারি গাই, তহন খালি তাল ছন্দের কতা মাতায় আহে। পদ যা বানাই হেয়া তো য্যামন য্যামন চিন্তার ভাবের মানুষ মোরা, হেইরহম সব কতা কেসসা বানাই। হেয়া যদি আগে অইন্য মাইনসে উল্ডা চিন্তা করইয়া বানাইয়া রাহে, আপড়া আলেহা মোরা হেয়া ঠাহর করতে পারি না।

    ছোমেদের কথা বুঝতে আমার অসুবিধে হয় না। ভোলেভালা এইসব শিল্পীর অন্যমনস্কতার সুযোগ গ্রহণ করে, লিখিত জারি প্রচার করা হয়েছিল একসময়। মূল জারিগানে সাম্প্রদায়িক কোনো প্ররোচনার নজির কোনো দিন দেখিনি। ছোমেদের উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, কী মারাত্মক প্রক্রিয়ায় লোকশিল্পের মধ্যে এই প্রক্ষিপ্ত কেসসা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ অপবর্গী মানুষের মনকে বিষাক্ত করা হয়েছে।

    এ-দেশে যেসব মুসলমান বয়াতিরা জারিসারি গান নিয়ে আছেন, তারা সবাই নিম্নবর্গের এবং হ্যাঁ, মুসলমান হয়েও নিম্নবর্ণের। এদের পূর্বপুরুষেরা সবাই নিম্নবর্গীয় এবং ধর্মে হিন্দু, যারা একদা বিপদনাশিনী, আপদনাশনী, আকুলাই, নিরাকুলাই ইত্যাকার অজস্র লৌকিক দেবীদের আরাধনা করত। ইসলাম কায়েম হবার পর যুগ যুগ গত হয়েছে, তবু সেই লোকায়ত দেবীরা তাদের ধমনীতে বহমান। সত্যাসত্য, বিশ্বাস-অবিশ্বাস এখানে আলোচ্য নয়। আলোচ্য হচ্ছে ঐতিহ্যগত ধারা। পৌত্তলিকতা যত নিন্দনীয়ই হোক তার শেকড় খুব গভীরেই আছে। এর থেকে কট্টর ব্রহ্মবাদী, বা নিরাকারী মুসলমান কেউই মুক্ত হননি সঠিকভাবে। এমনকী আরব ভূখণ্ডেরও নয়। যদি হতেন, তাহলে কাবার মসজিদের প্রয়োজন থাকত না বা আল্লাহর অপর নাম খোদা হতো না। এ-কথা সবাই জানেন ‘খোদা’ একজন ইরানীয় দেবতা বিশেষ। কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত হবার প্রয়োজন নেই। লাভ তো নেই-ই।

    আমি ছোমেদের সূত্র ধরে আমার দেশের কথাই বলি। প্রক্ষিপ্ততা যে কীভাবে এসেছে, তার প্রমাণ ছোমেদের এই উদ্ধৃতিটি। ছোমেদ বলে, দ্যাহ, মোরা যহন ছোডোবেলায় জারি গাইতে শুরু করতাম, হিন্দু, মোছলমান, বেয়াকের ঠাহুর, আল্লা বন্দনা করার আগে, মোগো দেশি ঠাইরেনগো বন্দনা করইয়া লইতাম। ক্যান? না, মোরা জন্মকাল থিহা জানি যে, হেনারা বেয়াকে কাচা খাউগ্যা। এহনও নীল পূজার রাইতে, খোলায় কৈতোর বলি দেওয়ার সোমায় যে ঢাক বাজে হেয়ার বোল মনে কর। হে বাজনায় কী কয়? কয়–

    ধর ধর কালিকা মা
    জেতা থুইয়া মড়া খা।

    তো, এই যে বদমাইসে নবি কলেমার জারিতে এইসব উল্ডাপাল্ডা ল্যাখছে, হেও কইলম, বিপদতারিণীর আশ্চয় লইতে ভোলে নায়। তয় হোনো, হ্যার বন্দনার কায়দাডুক কই–

    মাগো দোরি পদে বিপদনাশিনী,
    এ্যা গো মা মা
    দোরি পদে বিপদনাশিনী।
    তুমি যারে করো দয়া
    কী ভাবনা তার
    নিজো গুণে করো দয়া
    আমি অবোধ কুমার।
    আমি পইড়াছি মা ভবসাগরে।
    যা করো– মা এইবার
    কালের ভয়ে কাঁপে কলেবর
    দিবসরজনী।
    মাগো, দোরি পদে
    বিপদনাশিনী,
    অ্যাগো মা মা
    দোরি পদে বিপদনাশিনী।
    পহেলা মোর আল্লার নামটি
    নিতে করলাম শুরু।
    অনাথের নাথ গো আল্লা
    দোওয়া করবেন গুরু।

    তো দ্যাহ ভাইডি, ব্যাডা কোনহানে আইয়া আল্লার নাম নেতে শুরু করলে। আবার কয়–

    পহেলা মোর আল্লার নামটি

    নিতে করলাম শুরু।

    সত্যি! চারখানা স্তবকে যে বয়াতি ‘বিপদনাশিনীর’ পদে মাথা কোটে, সে পঞ্চম স্তবকে গিয়ে কী করে বলে, ‘পহেলা মোর আল্লার নামটি নিতে করলাম শুরু?’ তো, এ্যার মইদ্যেই গণ্ডগোল, বোজলা কিনা ভাইডি, ছোমেদ বলে। বলে, কলমীকান্দরের আশ্বিনীমাস্টের, যে তোমাগোও পড়াইছে, হ্যার কতা নি মনে আছে তোমার? বলি, আছে না? আহা! তুমি বল কি?

    হেনায় কইতেন। ছোমেদ, তোরা কইলম বেয়াকে জিওলীর ছাও। তোরা অইলি এই দ্যাশের আদি বাসিন্দা। তোগো মইদ্যে, ক্যাও ক্যাও ইস্‌লামে শরীক অইছে, আবার ক্যাও ক্যাও হিন্দুই আছে। তোরা বোচন নিজেরা নিজেরা মাইরপিট কর। ভাইডি, এহন, এই কার্তিকইয়া হালারা তো, বিপদনাশিনী, মঙ্গলচণ্ডী আকুলাই, নিরাকুলাই, আপদনাশিনী, সর্ব্বমঙ্গলা’র বত্ত পূজা করে। মোগো মাগিরা, যুইত্তোবোন্দে হেই বত্তো পূজায় চাউলডা কলাডা, এডা ওডা দে। কী করমু কও? মনে তো ডর থাহেই। হে কারণ, বন্দনা করার সোমায় বেয়াক্‌রে তুষ্ট করণ আবইশ্যক। করিও মোরা হেই রহম। আর কও তুমি, এডা এট্টা অইব্যাসও তো। নাকি?

    অভ্যেস তো বটেই। তত্ত্বে যাবার প্রয়োজন কী? যা অভ্যাস তা অভ্যাস। অভ্যাস এক সময় ঐতিহ্য হয়। ঐতিহ্য বহুকাল বেঁচে থাকে। এদেরও আছে। ছোমেদ বলে, হে কতা থাউক, আইজ কইলম মুই আসলেই জারি গামু। জারি যেমন গাওয়া উচিত, হে রহম। অর্থাৎ ছোমেদ আজ সভায় দাঁড়িয়ে গান বানিয়ে গাইবে। সে যা কিছু নিয়েই হোক না কেন।

    জারিগান মূলত কারবালার করুণ কাহিনীর উপরই রচিত। কিন্তু ক্রমশ এর পরিধির বিস্তৃতি ঘটে। পির পয়গম্বর থেকে সাধু দরবেশ এবং ক্রমান্বয়ে সামাজিক সমস্যা, প্রেমকাহিনী ইত্যাকার কোনো বিষয়কেই সে ত্যাগ করেনি। আজকে তা বাঙালির যাবতীয় কর্মকাণ্ডের উপরই যেন আরোপিত।

    ছোমেদ বলে, বোজজো, ভাইডি, রায়কত্তায়, তহন কয় কি, কয় বলে যে, জারি গাবি যহন, নিজের মোন পছন্দো গাবি। কেডা কী ল্যাখছে, হেয়া গাওনে তোর কাম কী? অর কইলেন, তোর কী চাই ক! গান যা গাইছ তো গাইছ। তবু, তোর গাহকী মোর ভাল লাগছে। তুই মোর ধারে কী চাও হেয়া ক’।–তহন ভাইডি, মোর মাতার মইদ্যে ক্যারউয়া পোহা। বাপে মরছে। রাইখ্যা যায় নায় বালগাছও। খাওনইয়া মানুষ ঘরে আষ্ট জোন। জমি মোডে দ্যাড় কুড়া। হেথে যেডুক ধান পান অয়, মাস দুই তিন চলে কোনো মতে, হ্যার পর ফালডা। কইলাম, আপনে মোর ধর্মবাপ, জ্ঞেয়ানচক্ষু দেছেন। এহন প্যাডের ভাত দেন। মোর খাওন জোডে না, মোরে এক কানি জমি দেন। তহন বাবায় কইলে, এহন যাইয়া গান গা, কাইল বেয়ানে আইস দিমু।

    তদবধি ছোমেদ তার পুত্র। সারা জীবন যে সে নির্ভাবনায় জারি গাইতে পারছে, সে কার দৌলতে? বাবার না?– ছোমেদ বলে, এহন বুড়া কালে বাজছে এট্টা ফ্যাকড়া। ছেটেলমেন্ট না কী যেন বালের গোলমাল, ট্যাহা লাগবে এক হাজার। হেইর লইগ্যা ভাইগো ধারে আইছি। ভাইডি তুমিও এট্টু কইয়া দিও।

    কার্তিক বলে, হেকতা তুই জারিতেই কইস। এহন কইলে হেয়া ভাল হোনাইবে না গানের মইদ্যে যহন কবি হ্যার এট্টা ভাব থাকপে হ্যানে। ওই কতায় কয়না, গাইন গাও কী, না ঠেক্‌ছি এহন করমু কী? তুমি এহন ঠেহা, তোমার যা কওয়ার হেয়া গানেই কও।

    কার্তিকের কথায় আমার নাগরিক চিত্তে তত্ত্বচিন্তন জাগে। বাঙালি কেন আবহমানকাল ছন্দে তার যাবতীয় অভিজ্ঞা রাখে। বোধকরি এ তার প্রকৃতিজ পরম্পরা। প্রকৃতির শুরু থেকে ব্যক্তি মানুষের স্তর পর্যন্ত অভিজ্ঞা আহরণের পরম্পরা বাঙালি চরিত্রে বড় প্রকট। হয়তো সব গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেই এ তত্ত্ব পাওয়া যাবে, তবে এখানে তা বড় তপ্ত তপ্ত অর্থাৎ টাটকা। বাঙালি সবকিছুই সুরে ছন্দে বলতে বড় ভালবাসে। তার স্বভাবে গদ্যভাব কম। অপবর্গী জীবনে এই স্বভাব আরও বিস্তৃত। সে সুখে, দুঃখে, রোগে সন্তাপে, সব অবস্থাতেই সুরে ছন্দে তার ভাব প্রকাশ করে থাকে। এ-স্বভাব সে জন্মসূত্রে প্রকৃতির কাছ থেকেই পেয়েছে। আর এই চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চলে অসুমার জলের কল্লোল এই ভূমিপুত্রদের করেছে আরও ছন্দপাগল, সুরপাগল।

    খলিল আয়োজনের ত্রুটি রাখেনি। মণ্ডপের সামনে জারির আসরের স্থান করা হয়েছে। ছোমেদ বলেছিল, মোরে জাগা দেওন লাগবে আড হাত আশে, আড হাত পাশে, আড হাত আড়ে, আড হাত ব্যাড়ে। গানের লগে কইলম নাচন কোদন আছে।– খলিল বয়াতির নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। খোলা উঠোনে হোগলার চাটাই পেতে আসর করা হয়েছে। চার ধারে শ্রোতা-দর্শকদের বসার স্থান। ঢুলি, কাঁসিদার এবং সানাই নিয়ে কার্তিকচন্দ্র আসরে বসে গেছে। খানিকক্ষণ শুধু যন্ত্রবাদ্য চলে। এটা আসর জমাবার জন্য শুরুয়াতের খেল। যাকে ‘কনসাট’ বলে।

    তখন একসময় সেই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে, অপবর্গী ছোমেদ বয়াতি উঠে দাঁড়ায়। আমার কাছে তখন শহর নগর আধুনিকতা যেন রাহুগ্রস্ত সূর্যের মতো মসীলিপ্ত মনে হতে থাকে। মধ্যাহ্নে গ্রহণ-গ্রস্ত-দিনের মতো নেমে আসে এক প্রচ্ছায়া। কিন্তু তবু যেন থাকে এক অনির্বচনীয় জ্যোতি, যা সেই মহিম্ন প্রচ্ছায়াকেও প্রকাশিত রাখে। তখন এক বিগত যুগ বর্তমান হয়, পরম্পরা পরম্পরায় বিধৃত হয়, তখন শুধু কিংবদন্তিই একমাত্র অবলম্বন হয়ে আধুনিকতা অনাধুনিকতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে অস্তিত্বকে সরলবর্গীয় করে।

    তখন এই গ্রাম তার নিরবধি অস্তিত্বে ভাস্বর হয়ে মানুষকে বড় শরীরী, বড় আকাঙক্ষা-নিবিড় করে তোলে। এক বেতস শরীর বৃদ্ধ বুভুক্ষু মানুষ আবহমান এক সংস্কৃতিকে এক গণমুখী দ্যোতনায় মূর্ত করে তোলে। সেই হোগলার চাটাইয়ের উপর সপ্তসপ্ততি ছোমেদের শরীর, জারিগানের মুদ্রায় তার দেহকে নম্র, কম্র করে এক মহামন্ত্র উচ্চারণ করে, যা বন্দনা, প্রার্থনা বা উপাসনার জন্য কোনো দেশের মানুষ কোনো দিন উচ্চারণ করেনি। সে মন্ত্র ছোমেদ এক অসামান্য দার্ঢ্যে উচ্চারণ করে। সে আসরের সুরুয়াৎ করে সেই মন্ত্রে–

    বন্দি দোহাই দোহার
    অনাদি অনন্ত কালান্ত কালে
    বন্দি, দোহাই দোহার।

    এই বন্দনা যেন অনাদি অনন্ত কালান্ত কাল ধরেই চলেছে। সে কার বন্দনা? সে বন্দনা অনন্ত মানুষেরই বন্দনা। যে মানুষ এখন দোহার। এই বিশ্বমহোৎসবের মহাসংগীতে যেন অনন্ত দোহাররা বসে আছে, এ যেন তাদেরই বন্দনা। তারপর সেই ব্যাপ্তি যেন ক্রমশ নির্বিশেষ থেকে বিশেষে এসে এই লোকাশিল্পে গেরস্থ হয়। ছোমেদ, তার সাধারণী বন্দনা গায়–

    পুবেতে বন্দনা করি দেব দিব্য জ্যোতি
    বন্দি দোহাই দোহার।
    যাহার কেরপায় হয় বিক্ষ বনস্পতি
    বন্দি…
    পচিচমে বন্দনা করি মক্কা মদীনা
    বন্দি…
    নবীর দিওয়ানা মুই কান্দি নবী বিনা।
    বন্দি…
    উত্তরে কৈলাস বন্দি মানসসরোবর
    বন্দি…
    যেইখানে বিরজেন ভোলা মহেশ্বর
    বন্দি…
    দক্ষিণে সাগর বন্দি আকুল পাথার
    বন্দি…
    যে সাগরে ভাসল আমার বেউলা লক্ষীন্দর
    বন্দি…
    মরা পতি জীয়াইল বেহুলা সুন্দরী
    বন্দি…
    সাগরে ভাসাইল তার মান্দাসেরো তরী
    বন্দি…
    সেই তরী পোছে যাইয়া স্বরগেরও পুর
    বন্দি…
    স্বগ্‌গে যাইয়া নাচে মাইয়ায় চরণে নূপুর।
    বন্দি…

    ছোমেদ এই বন্দনা গাইছে তার চোখে মুখে এখন কোনো ভাব নেই। যেন সম্পূর্ণ অন্যমনস্ক। মাঝে মাঝে সে উবু হয়ে খানিকটা ধুলো হাতে নিচ্ছে মুঠো করে আর চারিদিকে ছড়াচ্ছে। সে যেন মন্ত্র পড়ছে। বোঝা যায়, এই বন্দনা গানও এক্ষুনি সে রচনা করে গাইছে। কিন্তু পদ নির্মাণের জন্য তার কিছুমাত্র প্রস্তুতি-সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে না। সে গেয়ে যায়–

    সরেস্বতী বন্দিলাম মুই অতঃপর
    বন্দি…
    যাহার দৌলতে বানাই বাক্য পরস্পর।
    বন্দি…
    আসো মাগো কণ্ঠে বসো করি নিবেদন,
    বন্দি…
    ভালমন্দ পাচ কতা করিব কেত্তন।
    বন্দি…
    এইখানে যত কতা করি আমি গান
    বন্দি…
    মানে রাইখ্যেন সে সগলা আল্লা নবীর দান
    বন্দি…
    তয় আল্লা নবী বন্দি আমি মোমেন মোছলমান
    বন্দি…
    ভালমন্দ কইবেন ভাই আপনেগো বিধান
    বন্দি…
    আপড়া আলেহা মুই, তালেব এলেম নাই
    বন্দি…
    ক্ষমাহা আসবে মোরে লামায় দুলাভাই।
    বন্দি…
    ভুল-তিরুডি বেয়াক টুহুন মোর পরমাদ
    বন্দি…
    গুণ কিছু দ্যাহেন যদি পঞ্চের আশীব্বাদ
    বন্দি দোহাই দোহার।

    এরকম একটি দীর্ঘ বন্দনা গান ছোমেদ করে। জারির এটাই তরিকা। তবে এতক্ষণের ভাইডি, জারির কল্যাণে ‘দুলাভাই’ অর্থাৎ জামাইবাবু হওয়ায় কুচিন্তা জাগে। ছোমেদ সম্ভবত আমাকে একহাত নেবে।

    দোহারের অনুদান ভাল এবং ছোমেদকে দেখে মনে হচ্ছে, সে খুশি। দোহারের ব্যাপারে তার একটা দুশ্চিন্তা ছিল। দোহারেরা সুন্দরভাবেই মূল সুর বজায় রাখছে এবং জারির পরের পদের জন্য ছোমেদকে উসকে দিচ্ছে। সুর যদিও প্রায় একমাত্রিক ধাঁচের কিন্তু গতি ভালো। বেশ বেগবান। এই বেগের সাথে দোহারেরা অসামান্য সংগতি বজায় রাখে, যা, যেন-বা গ্রীক কোরাসের আঙ্গিকের মতো এই কথকতা অভিনয়ধর্মী সাংগীতিক মাধ্যমটিকে একাধারে শাসনে রাখে, আবার বেগবান গতিতে মুক্তি দেয়। দোহার যে মূলতই কোরাসের চরিত্রে চরিত্রবান, এ মতো বলব না, তবে তার ভূমিকা, এই শৈল্পিক উপস্থাপনায়, কোরাসের ধ্রুপদী আয়োজনের মতোই গম্ভীর।

    বন্দনাশেষে ছোমেদ বলে, ভাইডি, গানে কইলাম, মুই মোমেন মোছলমান। কিন্তু মুই কি মোমেন মোছলমান? হেয়া তো না। মোছলমানেগো মইদ্যেও কইলম জাইত আছে। আশরাফ, আতরাফ আছে। হ্যারগোও চাইর জাইত– শ্যাখ, সৈয়দ, মোগল, পাঠান। হিন্দুগো যেমন। এই চাইর জাইতের খেলা কইলম শ্যাহেগোও আছে। মোরা অইলাম আনছার, জোলা, নিকিরি। মোরা জাইতের বাইরে। শ্যাখ সৈয়দ, মোগল, পাঠানের লগে মোগো বিয়াসাদি অয় না। হ্যারা পুতুল পূজা, বুতপরস্তির মইদ্যে নাই। হ্যারা পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। জাকাত, খয়রাত মানে, কব্বর মাজারে দোয়া দরুদ পাঠ করে। মোরা নি কিছু করি? তয় মুই ক্যামনে মোমেন মোছলমান অই। মুই তো, পাচ ওয়াক্ত দূরঅস্ত, রোজ কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, নিজেই জানি না। রোজাডা অবশ্যই রাহি। তয় হেয়া হারা বচ্ছর। খালি রমজানের মাসে না। যদি জিগাও ক্যামনে? তো কই। রোজা রাখমুনা, খামু কী? ধান, মান, কলা, কচু জমিতেযেডুক অয়, হেয়া তো পাচ ছ মাসের খোরাইক। হ্যার পর তো রোজাই রোজা।

    কঠিন নিয়ম-শাসনে বাঁধা তাদের ধর্মীয় জীবন। কিন্তু সবাই কি তা পালন করতে পারে? ছোমেদ তার নিজের মতো করে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে। বলে, বোজজো ভাইডি, হযরতে যে রোজার নিয়মডা করলে হেয়া মোন লয় মোগো এই অভাবের লইগ্যা। য্যাগো নিত্য অভাব, খাওন জোডেনা, হ্যারগো রোজা রাহন সাইদ্যের ফরজ। অইন্য সোমায়, জোডলে খাইলা, না জোডলে হুতাশ। রোজার মাসে কোনো হুতাশ নাই। তহন হেডা নিয়ম। তহন উপাস করলেই ছওয়াব। তয় হেনায় যে ক্যান রাত্তিরের খাওনডাও বন্দো করলেন না, হেডা বুজি না। হেডা যদি করতেন, তয় আর কোনো উদ্বাগ থাকতে না।

    তবে একথা অন্নহীনের কথা। যাদের অন্ন আছে, তাদের ব্যাপারস্যাপার স্বতন্ত্র। তখন তাদের কাছে রোজা মানে উৎসব, যে উৎসবের চূড়ান্ত ঈদের দিন। এক মাস এই রোজার জন্যেই যেন তাদের খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। দিনে খায় না ঠিকই, তবে রাত শুরু হতে না হতে, আরে ডাকাতি-খাওয়াই খাওয়া! আর সে খাওয়া নিত্যি তিরিশ দিনের আটপৌরে খাওয়া থোরি। তখন এফতার করে গেরেফতার। সারা দিন খাওয়া নেই, তাই এফতারে অর্থাৎ হিন্দু মতে বললে, পারণে ফলফলাদি বিধেয়। আর ইসলাম যেহেতু খেজুরের দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, এতদ্দেশেও তিনি, অর্থাৎ খেজুর, একটি ফল। তাই প্রথমে তার সৎকার। অতঃপর তরমুজ, খরমুজ এবং তাবৎ ফল ফলাদির উত্তম ব্যবহার। এ শুধু এফতার। তারপর গোটা রাত পড়ে আছে, খেয়ে যাও খেয়ে যাও। কিন্তু সাবধান। গরিব গুর্বাদের কথা ভেবে একটু জাকাত খয়রাত কোরো, নচেৎ রোজায় ছওয়াব নেই। আর একটা কথা, সেটা এদেশি হিন্দুমতে, ‘ডাকে পাখি না ছাড়ে বাসা, তার নাম ছিরি ঊষা’। ঊষাগমের পূর্বে যেন খাওয়া সমাপ্ত হয়।

    একটা সময় ছিল যখন, ঊষাগমের খবর মোমেনরা নিজেরাই রাখতেন। এখন না-পাক্‌ জমানা। আদমি আওরৎ বেবাক বেহুঁশ। তাই শহর বল, গ্রাম বল আর গঞ্জ বল মসজিদ থেকে হুঁশিয়ারি আসে মাইকে, দীনের ভাইয়েরা যেন ভুল বেভ্রম না করেন। মাইক জানান দেয়, এবার আপনেরা রাইতের আখরিখানা খাইয়ে লয়েন। এট্টু পরেই ফজরের আজান শোনবেন। ঘুমাইবেন না, নামাজ ঘুম হইতে ভালো। অবশ্য ভালো, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কেননা, নাস্তিকেরাও জানে, নামাজ উত্তম ব্যায়াম।

    কিন্তু কথা তা নয়, কথা হচ্ছে, এই নিশিযাপনের খাই-খরচা। আরে ডাকাতি! এ খরচা শুধু আমিরদেরই পোষায়। ছোমেদদের পোষাবে কেন? তাই আফশোস, আহা, যদি রাইতটাও রোজা থাহার ব্যবস্থা থাকতে। তবে নৈশাচারী এ ভোজন সবার করাতেই হবে এ বিধান নেই। যাদের জোটে না, তারা বেহেস্তে গিয়ে তো অসুমার খাদ্য পানীয় পাবেই। এ গ্যারান্টি শরীয়তে আঠারো আনা দেওয়া আছে।

    ছোমেদ এখন তার সব কথাই বলে কথকতার ঢঙে। বলে, বোজজোনি, এছলামে নাচোন কোদন, গান বাজনা, হাসমসকরা, বাজনাবাদ্য, বেয়াক না-পাক্‌। এ রহম ফতওয়া দেছেন মোল্লারা। তয় মুই জিগাই, ওই যে মোগো ‘আজান’, হেয়াতে অমন সুন্দার সুর ক্যান? এমাম হাসান যহন কারবালার যুইদ্দে গেছেলেন, তহন বাইদ্য বাজজেলে ক্যান? আর বড় বড় ওস্তাদেরা, য্যারা মস্ত বড় তালেব এলেমওলা, হ্যারা বেয়াকে মোছলমান ক্যান? বিসমিল্লাহ সানাই বাজায়েন ক্যান? এরহম আরও, ভাইডি, কত কওন যায়, কিন্তু হোনবে কেডা?

    এ কথার উত্তর আমার জানা নেই। ধর্ম মানুষের খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। তার উপর আঘাত হানার বিন্দুমাত্র সাহস বা প্রবৃত্তি আমার নেই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না কোনো ধর্ম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে সংহত করার জন্য সৃষ্ট হয়েছে। বিশেষত যা সুন্দর কল্যাণকর, তার উচ্ছেদ কোনো ধর্ম চাইতেই পরে না। তবে যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেন, তাদের অনুশাসন, অনেক কিছুই স্তব্ধ করতে চায়, আর মানুষ তখনই অসহায় হয়ে পড়ে। মানবধর্ম বর্জন করে তখনই সে দানব হয়ে ওঠে।

    ছোমেদ বলে, দ্যাহ ভাইডি, মোর ল্যাহান মোছলমান য্যারা, হ্যাগো এইথেই হাউস বেশি। এই তো, এহনই দ্যাখফা হ্যানে, এই যে মুই বুড়ইয়া বলদা ছোমেদ বয়াতি, গান আরাম্ব করলে, মোর কোনো হুস পইদ্য থাকপে না। মোর এই হুগনা পাছাহান লাড়া দিয়া গানের লগে নাচমু হ্যানে। মোল্লা মৌলারা এ্যারেই না-পাক কাম কয়। তমো নি মোরা হেয়া ছাড়তে পারি? ছোমেদ আবার নিজের মতো দার্শনিকও হয়। বলে, শাস্তরে কয়, আল্লাহ মালিক, বেয়াক কাম করায় আল্লায়। কয়, আল্লাহর ইচ্ছা না অইলে একগাছ বালও ছেড়তে পারে না। হে কতা যদি হাচা অয়, তয় মোর যে এই আচাইল কুচাইল, হেয়া করায় কেডা? হ্যার যদি এয়া না পছন্দ অয়, তয় করায় ক্যা?

    ছোমেদের কথা যতই যুক্তিপুর্ণ মনে হোক না কেন, ইসলামী কট্টর দর্শনের সাথে তার সংগতি কম। সেখানে সোহহং তত্ত্ব বলেও এক তত্ত্ব আছে, কিন্তু তা মূলধারার সাথে বিরোধিতায় কন্টকিত। ছোমেদ সহজিয়া, সুফী ভাববাদীদের উত্তরসূরী, তাই তার যুক্তিতে সে এরকম ব্যাখ্যা উপস্থিত করে। মূলধারায়, সব আদমজাত, সেই পরম প্রাজ্ঞ, পরম ক্ষমতাশালী, লা-শরিকের দাসানুদাস। তাঁর প্রেরিত ঐশীগ্রন্থের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে হবে, চলতে হবে সেই গ্রন্থের প্রদর্শিত পথে, নচেৎ ভয়ঙ্কর জাহান্নামের নীল আগুনের মধ্যে তাদের নিক্ষেপ করা হবে। ছোমেদ আদপেই মোমেন নয়।

    সে যা হবার তা হবে। ছোমেদ গান না গেয়ে থাকতে পারে না। তার উপায় নেই। বাল্যাবধি অভ্যাস। বলে, ভাইডি, ল্যাংডা বয়স থিহা, মুই জারি সারি মারফতি রয়ানি এইসব লইয়া আছি। এইসব গানের কতা ওড্‌লেই মোর হোগার মইদ্যে ঘাউয়ায়, টেকথে দে না একছের। আর তুমি কও মোরগো দ্যাশে, রয়ানি গানে যে লাংচুনির পোয়ের পেরান না টাডায়, যে চৌক্কের পানি না ফেলায়, হেডা কি মনুষ্য? তয় কার্তিক বা এটু বাশিডা ধর। ঢোল আস্তে বাজবে। কইবোলে, মালীর পোলায় যহন বেউলার লইগ্যা, কলার মাঞ্জুস বানায়, হে সোময় যে হ্যার বিলাপ। কি? আহা,

    হস্তেরা কঙ্কণ ধর
    কলার মাঞ্জুসো গড়ো
    পতি লইয়া ভাসিব সাগরে।
    ওরে ও বাপ মালির ছেইলারে
    দ্যাখনা চেয়ে, আমার কি ধন আছে
    কী ধন দিব তোরে।

    এ গান যহন গাই, যহনই হুনি, মোর পেরানডার মইদ্যে তহন মোচড়ায়। তহন ভাবি, আহা, মোগো মকবুলইয়ারে যহন সাপে কাডলে, হে যহন মরলে, হ্যার বউডারও তো এরহমই ভাসতে ইচ্ছা অইছেলে। মোগো গেরাম দ্যাশে, এরহম কত বেউলা হারা জেবন বিলাপ করে। তয় হোনো, কতা যহন ওডলেই, আর গানে যহন বইছি, তহন গানেই কই–

    আহা শোনেন শোনেন সভাজন
    শোনেন দিয়া মোওওন।
    আহা শোনেন দিয়া মোন।
    বেউলাগো দুঃকের কতা করিব বর্ণন।
    আহা শোনেন দিয়া মোন।
    বেউলাগো দুঃকের কতা কত কব আর
    আহা কত কব আর
    অকালে মরিল বিষে গুণের ভাতার
    আহা গুণের ভাতার।

    ছোমেদ উপস্থিত মতো কথা বানিয়ে গান শুরু করে। জারির এটাই রীতি। যদিও এ গান জারির বিষয় নয়।

    গরীবের ছাওয়াল পান ঘরে নাই দানা
    আহা ঘরে নাই দানা।
    অন্ন জোগাইতে জলে জঙ্গলে দে হানা
    আহা জঙ্গলে দে হানা।
    আষাঢ় মাসে নয়া জলে মাছ কিলবিল করে।
    আহা মাছ কিলবিল করে।
    কত মৎস্য উড্‌ইয়া আসে কোলারও উপরে
    আহা কোলার উপরে।
    কই, চ্যাং, শিং, আর বোয়ালো চিতল,
    আহা বেয়ালো চিতল।
    তার মাঝে কেলি করে বিষধর খল
    আহা বিষধর খল।
    বাইন মাছ ভাবিয়া যেবা তারে মারে টেডা।
    আহা তারে মারে টেডা।
    মনসা ডাকিয়া কয় তোরে বাচায় কেডা
    আহা তোরে বাচায় কেডা?
    বিনা দোষে মার মোরে তুই মাইনসের ছাও
    আহা তুই মাইনসের ছাও।
    তয় ঢালইয়া দেলাম কাল বিষ যমের বাড়ি যাও
    আহা যমের বাড়ি যাও।
    এই মত মরে মোগো কত লক্ষীন্দর।
    আহ কত লক্ষীন্দর।
    যুবতী বেউলারা ভাসে সংসারসাগর
    আহা সংসারসাগর।

    পাশের গাঁ বাউলকান্দায় ছিল মকবুলের ঘর গেরস্থালি। দুই ছেলে আর বউকে নিয়ে তার সংসার। নিজের ভিটেটুকু, জমির পরিমাণ এখানকার কহবতে নডাক ছডাক, অর্থাৎ সামান্য এক আধ বিঘে। বর্গা আছে পাঁচ বিঘে। সকাল থেকে সন্ধে সে খাটতে পারত দৈত্য সিসিফাসের মতো। ফুটবল খেলত অসাধারণ। দশজনের ফাইফরমাস, বিপদে-আপদে বুক দিয়ে কাজ করতে সে। সেই মকবুল গিয়েছিল আষাঢ় মাসে নয়াজলে মাছ কাটতে কোলায়, অর্থাৎ মাঠে। মাঠে তখনও লাঙল পড়েনি। আশপাশের নদী নালা, খাল বিলের বাড়তি জল উঠে আসে এসময় দীর্ঘ নিদাঘতপ্ত মাঠের তেষ্টা মেটাতে। ঠাঠা রোদ্দুরে যে মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল, তরা হা-মুখ রসধারায় পূর্ণ করে বৃষ্টি এবং খালবিল, নদীনালার জল।তখন নানা জাতের মাছেরাও উঠে আসে সেখানে। মাছ, ব্যাঙ, সাপ, আরও কত জলচর পোকা– নতুন জলে তখন তাদের লীলাখেলা। সাপেরা আসে মাছের, পোকার লোভে। তারা হয়তো এতদিন ওই হা-মুখ ফাটলের মধ্যেই তাদের গেরস্থালি পেতে বসেছিল। মানুষও এসময়ই মাছের উৎসাহ আতিশয্যের অন্যমনস্কতার সুযোগ নেয়। এক বিচারে, এ সময়ে সাপের সাথে মানুষের যেন এক স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সে তখন দা, কোঁচ, ট্যাডা এইসব মারণাস্ত্র নিয়ে মাছের উপর চড়াও হয়। মকবুলও এই শিকার সন্ধানে গিয়েছিল।

    ছোমেদ সেই করুণ ঘটনার কথা এখন আসরে দাঁড়িয়ে বলে। তার কথন-মাধুর্যে বিষয়টি বাস্তবতার চৌহদ্দি পেরিয়ে কখন যে শিল্প হয়ে উঠে শ্রোতাসাধারণকে উৎকীর্ণ করে তোলে, তার হদিশ আমিও পাই না। ছোমেদ তার কথকতার রাস্তায় এগিয়ে চলে, নাকি কথার বুনোট করে সে!

    মানুষ যেমন মাছের প্রাণ নেয়, তা প্রাণ নেবার জন্যেও ওত পেতে থাকে তার মরণ। সে মরণ সাপ। এখানে সাপেরা বড় সংখ্যাগুরু। মকবুল বাইনমাছ বা মাগুর মাছ বোধে যাকে কোঁচে বিদ্ধ করে সে আসলে তার নিয়তি কালকেউটে বা অনুরূপ কেউ। সেও পোকা আর মাছের লোভে সন্তরণশীল, ইতস্তত বা। সে কোঁচে বিদ্ধ হলেও কীভাবে যেন ছাড়িয়ে নিয়েছিল নিজেকে অথবা সে বিদ্ধই হয়নি শুধু আঘাতই পেয়েছিল। কিন্তু ক্রুদ্ধ সর্প মারণ ছোবল হেনেছিল মকবুলের পায়ে। মাছ মারতে বেতাবুদ মকবুল খেয়াল করেনি। বস্তুত সে সাপটাকে আদৌ সাপ বলে ভাবেই নি। একটা মাছ কোঁচে পড়েনি, এমন ভেবেছিল সে। কিন্তু সাপ তার ক্রোধ ঢেলে সরে পড়েছিল। পায়ের কাছে খানিকটা জ্বালা জ্বালা, ব্যথা ব্যথা এবং চুলকানির অনুভূতি নিশ্চয় হয়েছিল তার। কিন্তু মাঠের নয়া জলে পোকামাকড়, লতাপাতা গাছ তো কতই থাকে, এরকম ভেবেছিল সে। ঘরে ফিরে যখন হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসেছিল, তখন বিষ তার নির্ধারিত ক্রিয়া শুরু করেছে। সব সাপের বিষ একইভাবে কাজ করে না। বলিষ্ঠ শরীর তাই, বিষ আচ্ছন্নতা আনতে পারেনি তখনও। খেতে বসে মকবুল হঠাৎ বলে উঠেছিল নাকি, ও বউ মুখ ক্যান সব আন্দার দেহি? বাতিডা য্যান ক্যামন নিবা নিবা ঠেহি। ছোমেদ বলে, বোজজেন নি, হ্যার তহন মনে অইতে আছেলে, চাইর দিকে ঘুরঘুট্টি আন্দার, আর লম্ফডা য্যান হেই আন্দারের মইদ্যে পেরান পোনে চেষ্টা করইয়া যাইতে আছে জ্বলইয়া থাহার লইগ্যা। বিষে দেহ, চৈতন্য আচ্ছন্ন হলে নাকি এমনই হয়। বউ বলেছিল কী যে কয়েন পাগলের ল্যাহান, এই তো লেম। আফনে ভাত খায়েন। মকবুল বলেছিল, বউ পোলারা কই? হ্যারগো তো দেহি না। বউ বলেছে, কী যে রগড় করেন, হ্যারা তো আপনের ধারে বইয়া খাইতে আছে। আপনের অইছে কী? রগড় করেন ক্যান? গাজামাজা খাইছেন নাহি কিছু?

    হায়রে রগড়! মকবুল ততক্ষণে বুঝে গিয়েছিল। সে তখন দুলছে, টলছে। অথবা গোটা পৃথিবীই তার নীচে টলমল করতে শুরু করেছে। বিষ তখন পুরোপুরি তার মস্তিষ্ক অধিকার করেছে। থালার উপরে হড়হড় করে বমি করে সেখানেই ঢলে পড়েছে সে। সে শুধু বলতে পেরেছিল–বউ, বউ রে মোরে সাপে খাইছে– মুই বোজতে পারি নায়। তারপর আর কোনো কথা সে বলতে পারেনি। এই ঘটনাটি বলে, ছোমেদ আবার গান ধরেছিল। রয়ানির গান–

    যার পতি সর্পে খায়
    সে কেমনে নিদ্রা যায়
    নারীজাতির রাখিলা অপযশ গো।
    ও মোর প্রিয়ে গো
    প্রাণেরই বেহুলা।

    না, ভাইগণ বন্ধুগণ, মকবুলইয়া এরহম করইয়া তহন গান গাইতে পারে নায়। পারবে ক্যামনে? তহন হ্যার বিষে অঙ্গ জরজর। এয়া এহন মুই হ্যার অইয়া গাই আর কই। কই বলে যে হ্যার মাথারি ভাবতে আছেলে, মকবুল বোধায় রগড় করতে আছে। আহা! হে কারণেই কই নারী জাতির রাখিলা অপযশ! তয় এ কতাও হাচা, হে মাগিই বা বোঝবে ক্যামনে? আচুক্‌কা মরণ আইলে, যে মরে, না হে বোজে, না হ্যার পরিজোনেরা। হায়রে মানুষ, হায়রে হ্যার নসিব!

    সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলী এই গান এবং কথকতায় ভীষণ ক্ষুব্ধ। কার্তিক বলে, এডা তুমি করলা কী? আইজ পূজাগোন্ডার দিন। পেরথম পূজা। বেয়াকে আইছে আমোদ আল্লাদ, হাসমশকরা করতে, আর তুমি জুড়ইয়া বইলা রয়ানির ভাসানের আসর?

    ছোমেদ বড় অপ্রস্তুত হয়। বলে, হ, ঠিকই কইছ। এটা এট্টা আভেদার ল্যাহান কাম অইছে। কিন্তু, কাত্তিক ভাই, ক্যান জানি না, ভাইডিরে আর বুইনেরে দেইখ্যা মোর য্যান মোনে অইলে, মোর বেউলা বুইনে মরা লক্ষীন্দররে ফিরাইয়া আনছে মড়ার দ্যাশ থিহা। তুই ক, কত্তোদিন পর দ্যাখলাম হ্যাগো। এহন তে অবইশ্য দুলাভাই কওন লাগে, তমো মুই ভাইডিই কমু। মোর য্যান মোনে অইলে, মরা লক্ষীন্দর জীয়াইয়া লইয়া আইছে মোর বুইনে। আর প্যাডের মইদ্যে তো জানই, রয়ানি আর ভাসান সদাসব্বোদা কচলায়। হেই কচলানিও ওডলে, আর মুই গাইয়া দিলাম। কার্তিক বলে, কতা অইছেলে, জারি গাবা। দোহার বন্দনা করলা জারির, আর গাইলা বেউলার বিলাপ? একথায় ছোমেদ খ্যাপে। বলে, তুই জানো মোর বালডা। আউল, বাউল, কেত্তন, জারি এহগল গানের মইদ্যে বেয়াক কতা কওন যায়, বেয়াক গান গাওয়া যায়। জারি গানের পইদ্য তো আছেলে খালি কারবালার তত্ত্ব গাওয়ার। এহন মোরা তো হ্যার মইদ্যে খতনামা, নমরূদ বাশ্বা, আদম, চাচা ভাতিজা, লক্ষমতি শাজালাল, সোহরাব রোস্তম আরও কত কী কেচ্ছার জারি গাই। তোরা যে জারি হোনো, হেয়া কি জারি? হেয়া জারির নামে ধান্দা। জারি আইজ গামু জুইত করইয়া, হোনতে অয় হুনবি, না হোনতে হয়, হোগা মারা যাইয়া। কিন্তু বিস্ময়ের কাণ্ড এই যে, ছোমেদ মুহূর্তে তার মেজাজ পরিবর্তন করে ফেলে। বেহুলার বিলাপ এবং তাবৎ নিম্নবঙ্গের বেহুলা লখিন্দর অনুষঙ্গকে সে ঝটকায় অতীতের কোনো কুঠরিতে অবরুদ্ধ করে, এক লহমায় সে উৎসবের বাস্তবতায় নেমে আসে। এদিক ওদিক তাকিয়ে সে যেন কাকে খোঁজ করে। জিজ্ঞেস করে, খল্‌ইয়া কই? মোর খলিল গ্যালে কই? খলিল তখন সেখানে নেই। সে গেছে ঠাহুরগিরি করতে, পাকঘরে। ছোমেদ তখন এই নিয়ে গান তোলে– সে ঢং চিরায়ত জারির–

    আহা আহারে আহারে
    আহা আহারে–২
    (দোহার) আহা আহারে আহারে।
    ওরে খল্‌ইয়া হারামজাদা তুই গেলি কই?
    আহা আহারে আহারে।
    বিক্ষেতে উডাইয়া দিয়া কাড়ইয়া নিলি মই
    আহা…
    মুই এহন কী গান গামু পঞ্চজোনার ধারে।
    আহা…
    তয় কেউ, গোডা দশেক ট্যাহা দেলে গান বাইর অইতে পারে।
    আহা…
    হেই ট্যাহা দেলেন যদি মোর দুলা ভাই–
    আহা…
    পরম আল্লাদে মুই তার গুণও গাই–
    আহা…
    তয় যদি দিলেন ট্যাহা হত্য করইয়া কই।
    আহা…
    এহন থিহা ছোমেদ মেঞার মুহে ফোটবে খই।
    আহা…

    ছোমেদ বলেছিল, কার্তিকও, যে এখানে খলিলই নাকি একটা মানুষের মতো মানুষ। সে এবং কার্তিকই নাকি তাল দিয়ে তাকে আসরে বসিয়েছিল। কিন্তু তার ঠাকুরগিরির প্রয়োজনে সে কখন যেন পাকশালায় স্থায়ী। তাই ছোমেদ অসহায় বোধ করছে। একটি দোহার, ঠিক এই নাবাল বঙ্গের নয়, তার বাড়ি ময়মনসিং, সে বলে, ক্যান, খইল্যা ছাড়া আর কেউ নাই? কত্তো, কুহা গ্যাদা এইখানে আছে, তারা কি কিছু না? অ্যাঁ? কিন্তু এখানের কেউ কি জানে, কোথায় ময়মনসিং আর কোথায় ঢাকা। তাই সে আখ্যা পায় ঢাহাইয়া– অর্থাৎ ঢাকার মানুষ। সে জারি সারির রসিক এবং উত্তম দোহার, তার মতো দুরুস্ত দোহার পেলে যে কোনো বয়াতির মুখে কথা– ছন্দ আসে আষাঢ়ইয়া বিষ্টির ল্যাহান। তাকে পেয়ে ছোমেদের বড় আহ্লাদ হয়। এবং সে খলিলের অনুপস্থিতিজনিত অফরাদ ক্ষমা করে। তার চোখেমুখে এখন অপূর্ব অভিনয়, দ্যোতনা, ভাব, কৌতুক এবং সাংগীতিক আনন্দ। সে তার প্রাচীন দেহটি নিয়ে এখন দোহারদের মধ্যে দাঁড়িয়ে। সভাস্থ সবাই তার তুখোড় অভিনয়, গান আর নাচে মুগ্ধ। তার গানের সঙ্গে সঙ্গে কথকতাও চলে অবিরাম, তা কখন সুরে, কখনও বা পরণকথার ঢঙে।

    এক গান শেষ তো অন্য গান শুরু। মাঝখানটি সে ভরাট করে কথকতার জামদানি বুনোটে। সে কথকতা কোনো নৈতিক প্রবচনে বা ধর্মীয় উপদেশে ভারী নয়। ছোমেদ গ্রাহক চেনে। সে জানে তার শিল্পের গ্রাহকেরা সবাই নৈমিত্তিক জীবনবৃত্তের আবর্তে আবর্তিত আনন্দকাতর মনুষ্য। যাদের বলে অপবর্গী। অপবর্গীদের জীবনেআনন্দ কদাচিৎ আসে। তাই, যখন সে আসে, তখন তাকে তারা আনুপূর্ব সম্ভোগ করতে উন্মুখ থাকে। তবে এই জীবনবৃত্তের সব গল্প, সব কথকতাই এদের এই জীবনচর্যার পাঁচপেঁচি গল্প। এর মাঝে মাঝে ঢুলিদার কাঁসিদার আর সানাইওলা মৃদু আবহ বজায় রাখে, যার বোল কি ঢোলে এরকম বাজে, ধাক্‌ ধাক্‌ তিন্‌না, ধাকা তিন্‌না, ধাক্‌ ধাক্‌ তিন্‌না ধাকা তিন্‌না। জানি না এরকম কোনো শাস্ত্রীয় বোল আছে কিনা। তবে বাঙাল বঙ্গীয়দের তাল লয় মনের কিসিম আলাদা রকম আছে। তাই নিশ্চয় করে কিছু বলতে পারব না। পেত্যয় না হয়, রাজ্যেশ্বর মিত্রের লেখা পড়ুন। উনি বেশক্‌ খবরাখবর রাখেন এবং দশে ধম্মের জ্ঞাতার্থে জানলে জানান। তবে কথা হচ্ছে, কথকতার মধ্যে ঢোল কাঁসির ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ বড় মিষ্ট। কথকতার সময় নাচ চলে ঢিমে তালে। আবার কখনও সময়বুঝে তা হয় উদ্দণ্ড। তখন ঢোল কাঁসির আওয়াজ চড়া পর্দায় ওঠে এবং বয়াতি প্রবল উচ্ছ্বাসে পাক খায়। তারপর আবার দমে ফিরে কিছু কথা কথকতা– পরণকথা, এবং সেই সাথে দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি আদাব আরজ।

    সামনে মৃন্ময়ী দুর্গা সপরিবারে। আবহমান বঙ্গীয় অপবর্গীদের জীবনে সে বড় মহত্ত্বপূর্ণ বিষয়। এ নিয়ে অসুমার গানের জগৎ।

    শ্রোতারা বলে, বয়াতি, সামনে মা জননী ভগবতী। বচ্ছরে তাইনে একবার আয়েন বাপের বাড়ি। হ্যারে লইয়া যদি কিছু না গাও তো, হ্যার ‘কোদ’ অইবে না? খল্‌ইয়া মল্‌ইয়া লইয়া গান হুনহইয়া মোগো ফয়দাডা কী? ছোমেদ, বলে, এছলামে এ্যারগো বুতপরস্তি কয়, পুতুলপূজা কয়। কোরান শরীফে কইছেন, এ্যারা না পারে নিজের ভাল করতে, না অইন্যের। তয় মুই কিনা বয়াতি। আল্লায় মোরে দুন্‌ইয়ার বেয়াক কিছুর উফার দখলদারি দিছেন। বেয়াক কিছু লইয়া গান গাওনের হক আছে মোর। ক্যান? না, মুই বয়াতি। যে যা কউক এতে মোগো গুণাহ্‌ অয় না। তয় কই, সভায় আছ সব্বজন, বলি আমি এ বচন, ক্ষ্যামা করইয়া দেও মোর নাচনকোদন। মুই মোছোলমানের পো, গান গাই হিন্দুগো, সগলায় হোনেন ভাই ভক্তিযুক্ত মন। এবং ছোমেদ দুর্গা সম্বন্ধীয় জারি বিন্যাসে উদ্যোগী হয়। এবং একথা সত্য এ জারি কেউ কোনোদিনও আগে রচেনি বা গায়নি। সে গায়–

    হিন্দুগো মা জননী ত্রিনয়নী দেখিতে সুন্দর।
    বা দিগে বসেছেন তাহার পুত্র লম্বোদর
    (দোহার) আহা পুত্র লম্বোদর।
    পুত্র লম্বাশুড়া
    পুত্র লম্বা শুড়া পেটটি ভুড়া
    গায়ের বন্ন লাল–
    মাইন্‌সের ধড়ে হাতির মাতা
    এ কেমন জোঞ্জাল।
    তয় হোনো বলি–
    তয় হোনো বলি এ ঘোর কলি
    মামুর নজর কালা।
    ভাগিনারে দ্যাখতে আইলে মহাদেবের হালা
    হালায় শনৈশ্চর
    হালায় শনৈশ্চর গুপ্তচর
    যাহাতে পানে চায়–
    ধড় ফ্যালাইয়া মুণ্ডু তাহার মাডিতে গইড়ায়
    আহা–
    গণশার হেই দশা
    গণশার হেই দশা শনির দশা
    মণ্ডু খস্‌ইয়া পড়ে?
    হাতির মাতা আন্‌ইয়া তখন জোড়া লাগায় ধরে
    আহা–
    এইমত কহিলাম গণশারই কতা
    য্যার প্যাডের মইদ্যে নাড়িভুড়ি
    বুদ্ধিভরা মাতা।
    আহা বুদ্ধিভরা মাতা।

    শ্রোতা-সাধারণ ছোমেদকে থামতে দেয় না। সমস্বরে সকলে দাবি জানায়, কাত্তিক, লক্ষ্মী, সরেস্বতী, বেয়াকের কতা কওন লাগবে। অসুরইয়া হালারে বাদ দেলেও চলবে না। ছোমেদ একই সূত্রে গানটি গ্রথিত রাখে। বলে, এবার লাচারিতে কই। হোনেন বেয়াকে।

    অতি মনোহর সব্বাঙ্গ সুন্দর
    লোকে ষড়ানন কয়
    ময়ূরের পিডে লাফ দিয়া ওডে
    কান্ধে ধনুক বয়।
    পাহানইয়া মোছ সোগার মইদ্যে গোছ
    আমাগো কাত্তিক বাবু
    সাজগোজ বার চুলের বাহার
    সোগার ব্যাতায় কাবু।

    ছোমেদ পাঁচালির ঢঙে আবৃত্তি করে যায় এইসব ছন্দোবদ্ধ পদ, যেন এসব তার মুখস্থ করা। আসলে সে এসবই তাৎক্ষণিক বুনোট করছে। কয়েকজন শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে তারিফ করে। কেউ কেউ-বা, ‘মারহাবা মারহাবা’ বলে উল্লাস প্রকাশ করে। প্রত্যুত্তরে ছোমেদের পুনরায় আদাব আরজ। এরকম একটি লক্ষ্নৌই মুশায়েরি তরিকা সে কবে কোথায় শিখেছে জানি না, তবে ব্যাপারটি বেশ খাপ খেয়ে যায়। কবিয়াল, আউল বাউল, জারিয়াল বয়াতিদের সব কুড়িয়ে বাড়িয়ে ব্যাপার। তাই তাদের ঝোলায় এইসব শাহী তরিকাও থাকে। জুতমতো ঠিক প্রয়োগ করে। এইসব হলে, সে পাশে রাখা ঘটি থেকে জল খায়। কাঁধের গামছা নিয়ে হাতমুখ ঘাড়গলা মোছে। আবহ অব্যাহত থাকে। যেন এসবও জারি কথকতার অঙ্গ। তারপর আসে লক্ষ্মীর কথা। অবলীলায় আবার ছন্দে চলে যায় সে। সেই একই মুখস্থ বলে যাওয়ার ভঙ্গি।

    আহা লক্ষ্মী ঠাইরেন
    আ আহা লক্ষ্মী ঠাইরেন দ্যাখতে হোনতে
    কিবা চোমৎকার।
    ডেরেস দিয়া পরছেন শাড়ি।
    তুলনা নাই তার
    আহা তুলনা নাই তার।
    মায় নজর দেলে পয়সা মেলে
    মেলে প্যাডের ভাত
    শরম নিবারণের কাফুর মেলে চৈদ্দহাত
    আহা মেলে চৈদ্দহাত।
    কোলায় সোনা ফলে
    কোলায় সোনা ফলে ধানে চাউলে
    ভরইয়া ওডে ঘর
    খালি ছোমেদ আলির পিরতিমায়
    এট্টু সাত্থপর।
    হ্যারে কিছু দেনা
    হ্যা অ্যারে কিছু দেনা সোনাদানা
    জাগা জমি বাড়ি
    দেওয়ার মইদ্যে দেছে কেবল
    গুষ্টি এককাড়ি।
    আহা…
    হ্যারগো খাওয়ায় কেডা
    হ্যারগো খাওয়ায় কেডা এমন ল্যাডা
    ক্যার ধারে বা-কই।
    আমিও তো মাগো তোমার প্যাডের ছাওয়াল হই।
    আহা প্যাডের…
    এট্টু দয়া কর
    এট্টু দয়া কর খুলইয়া ধর
    তোমার হাতের ঝাপি
    পেচণ্ড ভুকের জ্বালায়
    মাগো মুই কাপি।
    আহা মাগো…
    মোরে অন্ন দেও
    মোরে অন্ন দেও বস্তর দেও
    দেও জমি জমা
    দোষ ঘাড যা করছি মা গো
    করইয়া দিও ক্ষমা।
    আহা করইয়া দিও ক্ষমা।

    এতক্ষণের সব রঙ্গরসিকতার চৌহদ্দি পেরিয়ে ছোমেদের গানে মূল সংকটের সুর লাগে। তার প্রখর দারিদ্র্যের আঁচ এসে যেন সবার শরীর স্পর্শ করে। ‘পেচণ্ড ভুখের জ্বালা’ তার একার নয়। এখানের সবারই। কিন্তু সে আছে এখন দশায়। দশা বলতে একধরনের ভাবসমাধি। শিল্পী, বিশেষ করে জাত শিল্পীদের এমত হয়। একে ভর হওয়াও বলে। ছোমেদের উপর এখন ভর হয়েছে যেন কোনো অলৌকিক শক্তির। সে আর নিজের বশে নেই। অন্য কোনো সত্তাকে সে এখন বহন করছে তার দেহে। অনুভবে বোধ হচ্ছে, তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে, দেহের প্রতি অণু পরমাণুতে এখন নেচে বেড়াচ্ছে ছন্দ। তাই দুঃখ দৈন্যের আর্তি ছাপিয়ে তার প্রকাশ। লক্ষ্মী শেষ তো সরস্বতী শুরু।

    আহা সরেস্বতী
    আ আ আহা সরেস্বতী বিদ্যাবতী গুণবতী নারী।
    হ্যার রূপের বন্ননা কিবা মুই দিতে পারি?
    হ্যার গুণ কত?
    আহা–
    হার গুণকত বিধিমতো কওয়া বড় দায়
    হাচা কতা কইলে মোল্লা মৌলারা বিগড়ায়।
    আহা মৌলারা বিগড়ায়।

    ঠাকুর, পুরুত, মোল্লা মৌল্লা, সমাজপতি তো আবহমান কাল বিগড়াতে থাকে।

    তবু কি ছোমেদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়? হয় না। তারা “বিগড়োক না” কত বিগড়োবে। ছোমেদ গায়–

    কয় হিন্দুয়ানি
    এয়া হিন্দুয়ানি এ শয়তানি
    ছাড় মেয়ার পুত
    এছলামেতে শরিক অইয়া
    ভজ হিন্দুর ভূত
    আহা ভজ হিন্দুর ভূত
    পরে বোজবা ঠেলা
    পরে বোজবা ঠেলা লীলাখেলা
    পোঙ্গার মইদ্যে যাইবে
    তোমার বেয়াক বিচার আচার
    কেয়ামতে অইবে
    আহা কেয়ামতে
    তমো হোনেন কই
    তমো হোনেন কই গাইয়া লই
    মিডাই মনের আশ
    কব্বরেতে য্যানো আল্লায়
    হোগায় সান্দায় বাশ
    আহা হোগায়–
    মাইয়া সরেস্বতী শিষ্ট অতি
    মনের মইদ্যে রয়
    মাইয়ার কেরপায় ছোমেদ আলি
    কথকতা কয়
    আহা কথকতা–
    হেসব হোনে কেডা?
    হে এসব হোনে কেডা ক্যার ধারেবা কই মোর কতা বুলি
    য্যারগো বুহের মইদ্যে বিষাদ বিক্ষের আকুলি বিকুলি
    আহা আকুলি বিকুলি।

    ‘বুহের মইদ্যে বিষাদ বিক্ষ’? আহা কী শব্দবন্ধ, কী তার প্রকাশ! ছোমেদ তো প্রায় নিরক্ষর। তার এই বোধ, এই অনুভব কোথা থেকে আসে? এখানে উপস্থিত সবারই বুকের মধ্যে এক বিষাদবৃক্ষ আছে। সে শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর তার সাথে সুর মিলিয়ে পাতা ঝরায়। সেই ঝরা পাতাই সবার সুখদুঃখের সাথী। সে-ই তো সব নস্টালজিয়ার মূলাধার। দুঃখ, দুর্দশা, অভাব এখন ছোমেদের তো শুধু নৈমিত্তিক ভোগই নয়, নস্টালজিয়ার আধারও বটে। সেখানেই, সেই আধারে, এক বিষাদবৃক্ষ জন্মেছে, সে পাতা ঝরায়, পাতা ঝরার গল্পকথাও বলে। এ বোধ তো মনুষ্যমাত্রেরই। এ বোধ সর্বজনীন। রব ওঠে, বেশ কইছে, বেশ কইছে, ভালো কইছে, মোগো ছোমেদ ভাইরতালেব এলেম ম্যালা। ছোমেদ ভাই, এবার অসুরইয়া হালারে লইয়া এট্টু বান্দো হুনি। ছোমেদের ভাব দেখে বোধ হচ্ছে সে কাউকেই ছাড়বে না। শ্রোতাসাধারণের প্রতিক্রিয়ার উত্তরে সে বেশ আপ্লুত এবং তার স্বীকৃতি হিসেবে তার আদাব আরজ জারিই থাকে। আবহ জারি রাখতে কখন যেন কার্তিক তার সানাই পরিত্যাগ করে একটি বাঁশের বাঁশি, মোহনবাঁশি যাকে বলে, তাই নিয়ে এসেছে। তার ফুঁয়ে সে মূল সুরটি ধরে রাখতে প্রয়াস পাচ্ছে। এখন অসুরকে নিয়ে সে গান ধরে। ধরতাই পূর্ববৎ–

    যাউক হেসব কথা
    যাহাউক হেসব কথা পরানব্যাতা
    কইলজা চিরইয়া খায়–
    এদিগে তো কুদইয়া খাড়য় অসুরইয়া হালায়।
    আহা অসুরইয়া হালায়।
    আহা অসুরইয়া হালায়।
    হালার ত্যাজ কত
    হা আলার ত্যাজ কত মৈষের মতো
    জন্ম মৈষের ঘরে
    দুগ্‌গা বিডির লগে হেডায়
    হুড়াহুড়ি করে।
    মুহে খামার দিয়া–
    মুউহে খামার দিয়া বুক ফুলাইয়া
    কয় চুৎমারানি–
    ঠাণ্ডা করইয়া দিমু আইজগা তোর খরখরানি।
    আহা তোর খরখরানি।
    এইসব কতা হুনইয়া
    এ এইসব কথা হুনইয়া গুনইয়া ভগবতী কয়
    দশ অস্তরে মোর হস্তে তোমার অইবে ক্ষয়।
    আহা–
    এহন অসুর হালায়
    এ এহন অসুর হালায় পড়ছে গলায়
    কালনাগিনী সাপ
    ল্যাজার খোচা খাইয়া হালায়
    করে পরিতাপ–
    আহা করে পরিতাপ।
    কয় আইলাম ক্যালায়
    কহ্‌অয় আইলাম ক্যালায় মারইয়া ফ্যালায়।
    দশ হাতইয়া মাতারী
    মাইয়া মাইনসের লগে কি মুই যুইদ্দ করতে পারি।
    আহা– সিংগ লইয়া–
    আহা আবার সিংগ লইয়া আইছে ধাইয়া
    দজ্জালইয়া ওই মাগি
    চিরহয়া ফারইয়া করছে মোরে
    পয়লা নম্বর দাগি।
    আহা পয়লা নম্বর দাগি।
    আহা শোনেন ভাইগণ,
    আআহা শোনেন ভাইগণ আমার বচন
    কত কব আর–
    হিন্দুগো এই দুগ্গা বিডি অতি চোমোৎকার
    আহা অতি–
    এ সব শোনায় কেডা?
    এ এসব শোনায় যেডা হেডার মতো লক্ষ্মীছাড়া নাই
    এই ছোমেদ আলির লইগ্যা এট্টু ধানি জমি চাই
    আহা ধানি জমি–
    হেডুক দয়া করইয়া
    আহা দয়া কইরয়া লেইখ্যা পড়াইয়া যদি দিয়া দেন
    ভাই বন্ধুরা মা বুইনেরা দোয়া করবেন
    আহা দোয়া করবেন।
    এহন ইতি করি
    এ এহন ইতি করি আমার জারি সভা পঞ্চজনা
    ছোমেদের করবেন না যেন আখেরে বঞ্চনা
    আহা আহা আখেরে বঞ্চনা।

    গানটি শেষ হয় এভাবে। ছোমেদ বলে, জারিগান শ্যাষ হয় না। শ্যাষ করতে গ্যালে রাইতও শ্যাষ অয়। তয় যদি অনুমতি দেন, সভা পঞ্চজনার চরণে নিবেদন, আইজ এখানেই ইতি হউক। কাইল আবার হোনবেন হ্যানে, যদি মন লাগে।

    কিন্তু সভাস্থ সকলে সে কথায় কান দেয় না। বলে, এয়া কয় কী, এ কী ফাইজলামি কতা। রাইত এহন মাত্তর দশটা। হারা রাইত পড়ইয়া রইছে। পূজার কামধাম আউজগার মতন শ্যাষ। হউক না রাইত ভোর, তোর অসবিদাডা কোথায়?

    ছোমেদ বলে, অসবিদা কিছুই নাই। গাইলেই অয়। আর মূল পদ তো বান্‌ধইয়াই লইছি। তকলিফ নাই কোনো। তকলিফ এট্টু আসান হইতে খাওনদাওনডা অইলে। কতায় কয়, প্যাটগোখরা বড় গোখরা। তেনায় যদি তুষ্ট হয়েন তো জাহান তুষ্ট। হেই কোন বেয়ানে মাগি এক সানকি পান্তা আর এট্টা প্যাজ খাওয়াইছেলে, হেয়া যে কোতায় গেছে হ্যার নামে নাই উদা। উদা অর্থে উধাও। তা অর্থ যাই হোক, বাংলা ভাষায় এই ধরনটি একটু বুজইয়া শুনইয়া লওন লাগবে। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত হওয়া এ আলেখ্যের বিষয় নয়। পাঠক, নিজের মতো ধরণটি একটু বুঝে নিন।

    সিদ্ধান্ত হয়, ‘খাওনদাওনটা’ সেরে আবার শুরু হবে আসর। ছোমেদ যতক্ষণ গাইতে পারবে ‘থামন নাই’। হিন্দু মুসলমান গরিব গুর্বারাই এখানকার সভাজন। তাঁতি, নমশূদ্র, জালিক, দাস, হালিক দাস এরা সব হিন্দু। মুসলমানদের মধ্যে আছে আনছারিরা যাদের মধ্যে নিকিরি, জোলা, কাহার, নগ্‌দী আর জনা কয় ‘পরদেশইয়া’ আছে, তার কোনো জাত জানা নেই। এদের বিষয়ে কিছু বলার আছে। এরা সাধারণত ‘খরার’ দিনে অর্থাৎ শুকনো ঋতুতে এ দেশে আসে পুকুর, খালবিল এ সব সংস্কার করতে। খরা বলতে এই নিম্নবঙ্গে কেউ ড্রট্‌ বোঝে না। খরা হচ্ছে শুকনো ঋতু। শীতকাল। এরা সবাই ‘মাডিকাডা কামলা’। ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ। তারা আসে প্রধানত নোয়াখালি অঞ্চল থেকে। কাঁধে একটি করে ঝুড়ি এবং বেঁটে হাতলের কোদাল হাতে। সমুদ্র কুক্ষিস্থ এই জিলার ভূমিপুত্রদের উচ্চারণে ‘ক’ স্থানে ‘খ’ বর্ণ এবং ‘প’ স্থানে ‘ফ’ বর্ণ বড় প্রকট। অধিকন্তু হিসেবে শব্দের মধ্যে অহেতুক ‘হ’ বর্ণীয় উচ্চারণও সাধারণের কানে ধরা পড়ে। ঝুড়ি কোদাল নিয়ে এরা হাঁক দিয়ে বেড়ায় ‘ফুস্কনির খাম খরাইবেন বাহ্‌বুউউ’। সেই সময় বাড়ির বউ-ঝিরা এদের নেমন্তন্ন করে রাখত। ‘খাডো পেডো, ছাই ছাতা দিয়া খাইতে দিই। ভালমন্দ তো তহন জোডে না। পূজার সোমায় আইও। ভালমন্দ খাওয়ামু। মাছ মাংস যত পারো খাবা’। বাড়ির মা ঠাইনেদের এরকম দরাজ নেমন্তন্নের বিলক্ষণ হেতু আছে। তা পরে বলছি। তাই তাদের কেউ কেউ এসময় এসে পড়ে। কাজের সময়ের দু মাস আগেই হয়তো। ফেরে একেবারে ‘খরার কালের শ্যাষে’। তাদের কথায় বিশেষ বর্ণীয় প্রভাব হেতু, রঙ্গরস হয় বিস্তর। যদি কেউ শুধোয়, তুমি কোনহানের মানুষ? উত্তর হবে, খ্যান? আঁইই ন’খ্যালা। এখানের লোকেরা গল্প বলে তাদের নিয়ে। কোন এক ন’খাল্যা যেন চিঁড়ে ভেজাবার জন্য কুয়োর ধারে জল আনতে গিয়েছিল। কুয়োর জলের মধ্যে এক ব্যাঙ গোলা গোলা চোখে তাকিয়ে। বেচারা বয়ে আধখানা। সাহসে ভর করে সে নাকি বলেছিল দুই চৌখ ফাঁহাইআ, তুমি রইছ তাঁহাইয়া মুইত্তা ছিঁড়া বিজাইতাম তাঁও, খুঁয়ার ফাঁনির দারে যাইতাম না। পুকুরের পাঁক তোলার কজে বহাল হলে বাড়ির মেয়েরা গিন্নিরা এদের খুব খাতির করত। পুকুরে নাওয়া বা গা ধোয়ার সময় কারও কানপাশা, টব, দুল বা হার হয়তো হারিয়েছিল। যদি পাওয়া যায়। তাই, ও পরবাসইয়া, দেইখ্য তো সাদা পাথর লাগানইয়া এউক্কা আঙ্গুট পাও কিনা। হেই কবে যে কোথায় হারাইলে। হয়তো পুহরইরেই আছে। এরকম হাজার অনুরোধ। কখনও-বা পাওয়াও যেত এরকম কিছু। তখন পরবাসইয়ার খাতির দ্যাখে কে? একের জায়গায় দু-বাটি। এ্যাত্তো বড় একটা হুমদো রুইয়ের মুড়ো। সে যত বলে, মা ঠাইরেন, হাঁর ন ফাঁরতাম, ফ্যাড ছোড়বে, খামে খামাই অইবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আহা খাও খাও। এই নেও আর এট্টু মিডা দিতাছি, ওই দুগ্‌গা ভাত খাইয়া ফ্যালাও।

    খলিলঠাহুর খাওয়ার ব্যবস্থা করে। হোগলার চাটাইয়ের উপরই সবাই একসাথে নিয়ে থুয়ে খাচ্ছে। একটা সময় ছিল, যখন এমন পঙক্তিভোজের কথা ভাবা যেত না। যেমন ভাবা যেত না খলিলের ‘ঠাহুর’ হবার কথা। কিন্তু এখন দিনকাল আলাদা। খাবার খুব ছিমছাম। বলির পাঁঠার ঝোল, ডাল, ভাত। সবাই তৃপ্তি করে খায়। খলিল পরিবেশনকারী। ছোমেদকে এক হাতা বেশি মাংস দিতে গেলে সে হাঁ-হাঁ করে ওঠে। বলে, ক্যান। মোরে বেশি দেও ক্যান? খলিল বলে, দিমু না তয়? তুমি না এ বাড়ির বড় পোলা? কালু ভাই সবার ছোটো। সে বলে, হেইর লইগ্যা তো ভাগের ট্যাহা নেতে আইছে। আবার জমিরও ভাগ চায়। হোনো নায়, গানের মইদ্যে তো হেসুর ধরছে। দ্যাহ, এহন কোথায় ঠ্যাকে। এইসব রঙ্গরসে খাওয়া শেষ হয়। সবাই আবার আসর সাজিয়ে বসে। ছোমেদ পান চিবোতে চিবোতে বলে, এহন আর ফরমাইস চলবে না। এহন ইচ্ছা মতন গাওয়া।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
    Next Article বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    Related Articles

    মিহির সেনগুপ্ত

    বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

    January 20, 2026
    মিহির সেনগুপ্ত

    বিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত

    November 12, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026
    Our Picks

    আদিবাসী লোককথা : ২য় খণ্ড – দিব্যজ্যোতি মজুমদার

    April 27, 2026

    বৈদ্যুতিক চুল্লি – শঙ্কর চ্যাটার্জী

    April 27, 2026

    সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – মিহির সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }