সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – ১৩
তেরো
বৈকালিক আসরে জামাই মেম্বার পুরো পাঁচশো টাকা নিয়ে হাজির। মেজাজ তার বেশ শরীফ। আসর বসার আগেই, আমার সাথে দেখা করে সে কিছু আর্জি পেশ করে রেখেছে। তার মর্মার্থ একটাই, ছ্যামড়ারা যেন তাকে নিয়ে আর আচাইল কুচাইল না করে। হালি ফালি নিয়ে যেন হাসকাব্য না করে। আল্লাকসম জামাই ওসবের মইদ্যে নাই। ট্যাহা হে দেবে। তয় হেয়া ভয়ডরের লাইগ্যা না। হে এই পোলাপানেগো খুব ভালো পায়। পেরানের থিহাও অধিক। ফাজিল হউক, বদমাইস হউক– এ্যরাই তো গেরামডার লইগ্যা কিছু করে, আর বেয়াকে তো, লুডইয়া পুডইয়া খায়।
জামাই মানুষটি খারাপ না। কিন্তু পোলোপানেরা তাকে একেবারে সাইদ্যের জ্বালাতন করে। তয় দুলাভাই, কই, ওরা ওসব না করলেও মুই যেন ভাল ঠেহি না। নাইলে কয়েন, এ বালের দ্যাশে গেরামে আছেডা কী? কী লইয়া থাহে মাইনসে? জমিজিরাত আছে। ধানপান কলাকচু যা পাই– হেথে অইয়া বাইয়াও পড়ে। ছ্যামড়ারা কথাডা অলেয্য কয় নায়। পোলা– মোডে এট্টা। আর তো কিছু অইলে না। এউক্কা ছাও বিয়াইয়াই মাগি যে হেই খামডি দেলে, আর কোনো রাও নাই। মোরও দ্যাহেন বয়স কোম করইয়া চৌপঞ্চাশ বচ্ছর তো অইবেই। পোলায় পড়ে দশ কেলাশে। বউডা এট্টু আছে আকান্দা– তয় চলইয়া যায়।
জামাই নাগারে আত্মপরিচয় দিয়ে যায়। মনটা তার প্রকৃতই ফুরফুরে এখন। বোধহয় বিবির সাথে ভাব হয়েছে। কথায় কথায় বলেও তা। বলে, তা দ্যাহেন, ঘডিবাডি পাশাপাশি থাকলে এট্টু ঠোহাঠুহি অয়ই। একদিনের সোম্পক্কো তো না। হেই কোন ছেডোকালে হ্যারে বিয়া করইয়া আনছেলাম। বয়সে মোর থিহা কোমছে কোম চৈদ্দ বচ্ছরের ছোডো। তো হেয়া যাউক। বউ, হালির বিয়ায় মত হেছে। হে, কইলে, এ তো ভাল কতা। দশ জোনে যহন দেইক্যা হুনইয়া দেতে চায় মোগো আফইত্য কী? বেওয়া মাগি, মোর থিহা মোডে দ্যাড় বচ্ছরের বড়। অল্প বয়সে রাড়ি অইছে, এহনও গায়ের ম্যাকমেকি যায় নায়। হারা জেবনডা রইছে পড়ইয়া। কইন কী করইয়া ফ্যালায় কওন তো যায় না। জামাই বিবির বুদ্ধির তারিফ করে বলেন, বোজজেন দুলাভাই, কতাও তো হত্য। দিনকাইল তো ভাল না। মাইনসের নিয়ইত খারাপ। তয়, নিয়ত, কইলম মাইন্সে নিজেই খারাপ করে। এহন হে ছেমড়ি যদি এট্টা আকাম কিছু ঘডায়।– মোর মাতারি এমনে খরখরইয়া অইলে কী অইবে, বুদ্ধি রাহে মোক্তারের। তো হে কইলে, দেন বিয়া দিয়া। এহন আফনে এহানে থাকতে থাকতে যদি কামডা অইয়া যায়, কলমার দিন খাসি কাডুম তিনডা– কইলাম আাফনেরে। তয় আপনেও মুরুব্বি মানু, পাত্তরের লগইতটা এট্টু বুজইয়া দ্যাখফন। মোরা আভোদা আলেহা আলেহা পাডার আড়ইয়া বিচি। মোরানি কোনো কায়দাকানুন সোবত বুজি? আফনে আছেন, থাইক্যা, কামডা করইয়া দিয়া যায়েন। আল্লায় আপনেরে ভাল রাখফে।
একে দুইয়ে সবাই আবার এসে ভিড় করে। নসু এখনও আসেনি। সকালের উত্তেজনার রেশ মাত্রও যেন কারুর মধ্যে নেই। জামাই-এর এই পরিবর্তনও যেন কেউ নজর করছে না। যেন এমনটিই হবার কথা ছিল এবং এ তাদের আগে থেকেই জানা। খলিল খুব কেজো সুরে জিজ্ঞেস করে।–
জামাই, মাইয়ার লগে বন্দেজ করছ?
হ।
হে কী কয়?
কমু হ্যানে, নসুভাই আউক।
ট্যাহা আনছ জইরমানার?
আনছি, দিমু হ্যানে নসুভাই আইলে।
খলিলকে যেন আদৌ পাত্তাই দিচ্ছে না জামাই। নসুভাই ছাড়া আর কাউকে যেন সে চেনেই না। খলিল বলে, ঠিক আছে, নসুভাই আউক হ্যারডেই বেয়াক কইও। হ্যার ধারেই ট্যাহা দিয়ো। মোরা কেডা? মোরা তো তোমার দুশমন। তয় হালার বিয়া কইলম নসুভাই একলা দিতে পারবে না। তহন কইলম খলিল ঠাহুররে আবার লাগবে হ্যানে। এইসব কথার মধ্যে নসু এসে হাজির। বলে, কী অইলে আবার? খলিল বলে, না কিছু না। তুমি আও নায় দেইখ্যা জামাই ফোপাইতে আছেলে। মুই হ্যারে বোজাইতে আছেলাম, আর কতাও তো হাচা, মোরা কেডা? নেও এবার যা করার তুমি কর। তুমি মোন লয় এহন হ্যার মুরশিদ।
ও হেই কতা। তয়, তোরা যাই কও, জামাই কইলম মোরে এট্টু বেশি ভাল পায়। হেথে তোমরা রাগ হও আর ঢিল হও। খলিল বলে, হেয়া পাউক, হেথে মোগো কী। কইবোলে, হেকারণ, বাকি বেয়াকেরে অপচ্ছেদ্দা করবে, হেডা কি ঠিক? জামাই এবার বিরক্ত। বলে, এ তো আচ্ছা ক্যাচাল। মুই কইলাম, নসুভাই আউক, তহন বেয়াক কতা একলগে কমুহ্যানে। এত কতা চৈদ্দ জোনারে চৈদ্দবার কইতে ক্যারও ভাল লাগে? এথে রাগ ঢিলের কী আছে? নসু বলে, রাহ ওসব ফ্যাত্রা প্যাচাল। আসল কতাডা কী কও। ট্যাহা আনছ? জামাই লুঙ্গির গেঁজ থেকে টাকা বার করে নসুর হাতে দেয়। নসু থুথু দিয়ে ঠিক মুহুরির মতো ভঙ্গিতে গুনে নিতে থাকে সেই টাকা। টাকাটা কালু ভাই-এর হাতে দিয়ে বলে, কালুভাই, এই আইজকার আর কাইলকার খরচ। হিসাব করইয়া ব্যবস্থা করইও। পরশুর খরচের লইগ্যা নতুন কেস ধরতে অইবে। দিনকাল বড় মাহেঙ্গা, কেসও পাওন যায় না জুইত মতন। ঠাহুরেরডা এট্টু বিবেচনা করতে অইবে। হেয়া যাউক, জামাই কও মাইয়ায় কী কইলে?
হে কয় বিয়াডা হউক।
তয় হউক।
অইবে ক্যামনে? পাত্তরের কতাডা তো তোমরা কিছুই কইলা না। খালি কইলা পাত্তর রেডি। হেডা ফুডা না ফাডা, হেয় দ্যাখতে অইবে না?
পাত্তর তোমার এহানেই পাবা, ব্যস্ত হও ক্যান?
এহানে কেডা?
ক্যান, মোকছেদইয়া।
মোকছেদইয়া? হ্যার বয়স তো মাত্তর বত্তিরিশ। মোর হালির বয়স কোমছে কোম চৌতিরিশ পয়তিরিশ অইবে। হে বয়সে বড় অইয়া যায় না?
খাদিজা বিবি হযরতের থিহা পনারো বছরের বড় আল্হে, হেয়া জান?
জানমু না ক্যান? কিন্তু হযরতের তো মোট তেরো জন বিবি আল্হে। তেনায় মোগো নবী, তেনার লগে তুলনা কীয়ের?
তুলনার কতা না। মোরা কইতে চাই এইডুক ছোডো বড়তে কিছু আটকায় না।
না আটকাইলেও দ্যাহন দষ্টব্যে এডা ঠিক না।
ঠিক না তো, মোকছেদইয়া হ্যানে এদিক উদিক এউক্কা লগৎইয়ামত ব্যবস্থা করইয়া লইবে। আর হেয়া যা অউক হেতে তোর কী? মোকছেদইয়া তোর হালিরে বিয়া করতে চায়, তোর হালিও মোকছেদইয়রে চায়। ব্যাস, এ্যার মইদ্যে আর ক্যারও কিছু কওনের নাই।
হে মোকছেদইয়ারে বিয়া করতে চায়, কইছে?
না কইলে কি মোরা জোর জুলুম করতে আছি? হেই তো মোগো ধরছে এই বিয়ার লইগ্যা। কইছে যে, তোমরা মোর এট্টা বেবস্তা কর। এরহম আর থাহন যায় না, রাইতবিরাইতে ডর লাগে। এ-ও টালায় যহন তহন। তয় না আমরা লাগছি এ কামে। নাইলে মোগো কোন ঠেহাডা তোর হালির বিয়াদি।
এবার জামাই বোঝে এ এরা এতক্ষণ ধরে যা করে চলেছে, তা ঠিক চ্যাংড়ামো নয়। এর ভেতরে কিছু গুহ্য কথা আছে। সে গুহ্য কথা বা তত্ত্ব, সংলাপে বললে শালীনতার শেষ সীমা লঙঘন করা হবে এমত বোধে, বর্ণনায় রাখছি। বর্ণনার দোষঘাট পাঠিকা/পাঠকেরা ক্ষমা করে থাকেন। তাছাড়া সে-ক্ষেত্রে ঘোমটা দিয়ে বলার উপায়ও থাকে অনেক।
মোকছেদই নাকি সেই ব্যক্তি, সভার ‘বাহাসে’ প্রকাশ, যে, শালির বাড়ির ‘ছাইচে’ এদানি ঘুর ঘুর করে। শালিকে মোকছেদ নাকি বেশ কিছুদিন ধরেই নিকার কথা বলে আসছিল। শালির বক্তব্য, যা এই গতপরশু দিন সে মোকছেদকে জানিয়েছে যে, দুলাভাই যদি কয়েন তবেই সে রাজি হতে পারে। কারণ দুলাভাই, অর্থাৎ জামাই-ই নাকি তার মুরুব্বি। আর একারণেই সভাজনের “সন্দ” যে জামাই-এর লগে হ্যার এট্টা কিছু ব্যাফার আছে। নাইলে এত কী?
জামাই এসব শুনে ‘থ’, বলে, হে চুৎমারানির প্যাডে প্যাডে এত? তয় হেয়া মোরে কয়নায় ক্যান? আর এ্যার লইগ্যা বলদারা মোরে সন্দ কর? মোর বয়সটা দ্যাহ না? নসু বলে, তোমার বয়স ধরলে তো মোগো মাইয়ারেও তোমার নাতনি কইতে অয়। বিয়া করনের সোমায় তো হিসাব আছেলে না। এহন খালি বয়স করতে আছ। একথায় জামাই আবার দিশাহারা বোধ করে। ভাবে বোধহয়, এই অসমবয়সী বিয়েটা তার পক্ষে একটু অন্যায়ই হয়ে গেছে। এ কারণ চুপ করে থাকে সে। তখন খল্ইয়া আবার ‘বাহাস’ তোলে, “তোমার লগে যদি তোমার বিবির বয়সের ফারাক এতহানি অইয়াও বিয়া অইতে পারে, তয় মোকছেদের লগে তোমার হালির বিয়া হওন দোষডা কী?”
বঃ এহানে দুলা ছোডো, মাইয়া বড় না?
হেথে অহছে কোন কাফাডা? দুলা বড়, মাইয়া ছোডোতে বিয়া অইতে পারে, মাইয়া বড় দুলা ছোডোতে হওনে দোষ কী? হেথে কি পোলামাইয়া হওনে কোনো অসোবিদা আছে?
মোগোর দ্যাশে হে রহম অয়?
মোছোলমানগো অইতে দোষ নাই।
তয় তোরা দিবিই এ বিয়া?
হ।
তয় দে–।
নসু তখন রায় দেয় যে, কথা পাকা। জামাই মত দিছে। হ্যার মুরুব্বি, শ্বশুর হালায় মরছে। এহন জামাই-ই কত্তা। তয় এই কতাই পাহা, জামাই, এহন মোল্লা ডাইক্যা দিন দ্যাহ। জামাই জানায় যে, দুলাভাই অর্থাৎ আমি থাকতে থাকতেই শুভ কামডা সারতে অইবে। শুভস্য শীঘ্রম। তয় আইজ আর একতা লইয়া লাড়াচাড়া করণের কাম নাই। পূজা মিডুক, পরে দ্যাহন যাইবে, কবে কী করন যায়।
সব বিষয়েরই বেশ একটা মধুরেণ সমাপ্তি ঘটে। যুবজন খুশি, জামাই খুশি। এবার জামাই-এর টাকার সদ্ব্যবহার শুরু করা যায়। ‘মদমাদী’ এসেছে। বলির পাঁঠার মাংস খলিল ঠাহুর পাক করে রেখেচে। পাঁঠার ‘কালীপোক’ অর্থাৎ মেটেগুলো সে অত্যন্ত সুচতুরভাবে গোপন করে রেখেছে চমৎকার চ্চ্চড়ি করে। সে কালীপোক– সব্বোসাধারণের জন্য নয়। যারা মদমাদী খাবে, তাদের অনুপানের জন্য। গোঁসাই-এর সন্ধ্যারতি শেষ হয়েছে। আশপাশ গ্রাম থেকে লোকজন এসেছে। হ্যাসাক পেট্রোম্যাক্সের আলোয় অঙ্গন প্রাঙ্গণ প্লাবিত। বুড়ির ঘরে ছোকরাদের যাতায়াত শুরু হয়ে গেছে।
গুটিকয় ছোকরা জামাইকে ডাকে। বলে, জামাই, নসুভাই মোণ্ডোপের পিছে তোমারে কতা হোনতে বোলায়। জামাই সরল বিশ্বাসে উঠে মণ্ডপের পেছনে যায়।
উন্মুক্ত আকাশের নীচে বসে আছি একটি আরামকেদারায়। সারা গায়ে ষষ্ঠীর ম্লান জোছনা। মাঝে মাঝে এখনও ঢাক বাজছে। কখনও ক্ল্যারিওনেট এবং সানাই, নাগারা টিকারা সহযোগে পূরবীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। সব মিলিয়ে এক মনমাতানো মনকাঁদানো মূচর্ছনা। শৈশব কৈশোরের অনুভবগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছি। সামনে আলোছায়ার লুকোচুরিতে, চালতা, চম্বল, জামরুল জারুলের যূথবদ্ধ মৌনে সুখ এবং বিষাদ, মিলন ও বিচ্ছেদ-বেদনা, এক সাথে যেন এই শারদী শিশিরের মতোই শরীরের প্রতিটি লোমকূপে প্রবেশ করছে। সারা দেহে তার আমেজ। মাটির নীচের নিভৃত প্রকোষ্ঠে রাখা প্রাচীন দামি মদের মতো তার প্রতিটি বিন্দু যেন তারিয়ে তারিয়ে চাখছি। এই সুখ, প্রাচীন কিংবদন্তির সুখ, যা জীবনে একবার বা দুবার আস্বাদ করা যায়। বার বার করা যায় না। গোটা শরীর দিয়েই এই সুখ চাখতে হয়। তারপর এক সময়ে তা জারিত হয়ে মনে প্রাণে আত্মায় গিয়ে স্থায়ী এক অনুভবের সৃষ্টি করে, আর সেই অনুভবই তো আমাদের আমরণ অন্বেষা।
মণ্ডপের পিছনে তারা জামাইকে নিয়ে রগড় করে। সেই রগড়েরর শব্দ কানে পৌঁছোতে প্রৌঢ় রক্তে যৌবনিক চাপল্যের সাড়া জাগে। মণ্ডপের পেছনে গিয়ে দেখি, জামাই ভূমিশয্যায়। তার হাত পা চেপে ধরে আছে চার জোয়ান। পঞ্চম যুবক তার মুখের ভেতর বোতল ঠুসে ধরে তাকে জবরদস্তি মদ খাওয়াচ্ছে। জামাই ছটফট করে মিনতি করছে, ওরে ওরে, তোরা এরহম করিস না। মোর মাগি মোরে খ্যাদাইয়া দেবে। কে শোনে কার কথা। ‘ওরে ও চুৎমারানির পো। ও হালার পো হালা, তুমি নাকি মদ খাও না? তয় এডা কী? আইজ না মোগো পূজা? আইজ না তোর হালির সোমন্দ পাহা অইছে? আইজ তোরে খাওয়ামুই।’ আর সামান্য সময়ের ব্যবধানে অবাক হয়ে শুনি জামাই বেশ যেন আদেশ দিচ্ছে, মোরে আরেক গেলেস দেতে অইবে। এথে মোর কইলজা ভেজে নায়।
নৈতিক বা ধর্মীয় বিধিনিষেধের ব্যাপারে যারা যাবেন, তাঁরা এগোন, আমরা আপত্তি করব না, আমরা বরং একটু পিছিয়েই থাকি। মাদকবিরোধী জনস্বাস্থ্য, কল্যাণকামীদেরও এক্ষেত্রে দূর থেকেই দণ্ডবৎ করব। তবে একটি সাধারণ কথাও বলব যে, এরা কেউই নিয়মিত মাদক সেবনে অভ্যস্ত নয়। উৎসব পার্বণেই এদের মদাচরণ ঘটে থাকে। তখন তারা কোনো শাস্ত্রীয় বিধান মানে না। বৈজ্ঞানিক অনুশাসন বোঝে না। আনন্দকে পূর্ণতায় ভোগ করার, উপলব্ধি করার বাসনা তখন তাদের জেগে ওঠে। এ সময়ে তাদের যাবতীয় চপলতা সহ্য করতে হবে। তারপর? তারপর–
আছে তো তারপরে বারোমাস,
উঠিবে কত কথা কলহাস
আসিবে কত লোক, কত না দুখশোক
একথা কোনখানে পানে নাশ।
বছর চলে যাবে বারোমাস।
ঋগ্বেদীয় কাল থেকেই মনুষ্য সুরপায়ী। বৈদিক যজ্ঞে কলসি কলসি সুরার ব্যবস্থা হতো। সেমেটিক যাবতীয় পুরাণাদিতে সুরার বিস্তারিত ব্যবহার। ইন্দ্র নিজে সুরা এবং গোমাংসের উত্তম ব্যবহারী, একথা বেদে আছে। উদ্দেশ্য একটাই, আনন্দবর্ধন। সুরা আনন্দবর্ধন করে। নৈতিকতা, সামাজিক, অনুশাসন, স্বাস্থ্যবিধি কোনো কিছুই সুরাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়নি। বোধকরি, সভ্যতার যে লগ্নে মানুষ তার নশ্বরতা বিষয়ে অবহিত, যখন সে জেনেছে– জাতস্য হি মৃত্যুধ্রুবম্, তখন থেকেই সে ধর্মীয় সামাজিক, নৈতিক তথা স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুশাসন লঙঘন করতে শুরু করেছে। কবিরা, বোধকরি, এই বোধকেই পুষ্ট করেছেন পদ্যবন্ধে।
তারা বলে সুখ স্বর্গের দূরে
আমি বলি সুখ মদিরে বধূ
বাকি ত্যজি আর নগদ যা লহ
দূরের ঢোলক শুনিতে মধু।
কী ন্যায়মার্গী, কী অপবর্গী, সবার জীবনেই বোধহয় এ সত্য অনিবার্য পরম্পরায় বিধৃত। মানুষ নেশা করবেই, সে তার বিধিলিপিপ্রায়।
তাই জামাইয়ের উপর এই জবরদস্তিতে দোষ ধরার কিছু নেই। উৎসবে নিয়মোনাস্তি। তাছাড়া একদিন মদ খেলে মানুষ কিছু মরে না। জামাই এখন রস বৈসঃ। বলে, খামু না, ক্যান? আইজ মোগো পূজা না? আইজ মোগো পূজা, কাইল মোগো ঈদ, পরশু মোগো কী? সে এখন দ্রব্যে চুর।
এরপর সে একসময় গুড়াগ্যাদাদের সাথে বাজনার তালে তালে নাচে। দুর্গাপূজার সময় ধুনুচি নিয়ে নাচা এদেশীয় অপবর্গীদের আবহমানকালের একটি শিল্পচর্চা। জামাইয়ের মতো মানুষের ক্ষেত্রে নাপাক হলেও, নাচটা সে ছন্দেই নাচে। রক্তের মধ্যে পরম্পরাটা বোধ হয় ধর্মীয় অনুশাসনে পুরোপুরি লোপ পায় না।
ফকির বলেছিলেন, মধুর দিলদরিয়ায় যে-জন ডুবেছে, ও সেনা জবর খবর পেয়েছে। এখানে বোধ হচ্ছে, জবর খবর পাচ্ছি। আমি এখন এদের দিলদরিয়ায় ডুবতে বসেছি। আমি এখন জবর খবর অবশ্য পাব।
