৪. থ্র্যাসিমেকাস : অন্যায় ন্যায়ের চেয়ে অধিক লাভজনক
অধ্যায় : ৪ [৩৪৮–৩৫৪]
থ্র্যাসিমেকাস : অন্যায় ন্যায়ের চেয়ে অধিক লাভজনক
থ্রাসিমেকাসের সঙ্গে যুক্তির লড়াই সক্রেটিস এখনও শেষ করেননি। শাসনের প্রশ্ন শেষ করে সক্রেটিস এ্যাসিমেকাসের ন্যায়ের তত্ত্বের অপরদিকের উপর তাঁর লক্ষ্য উদ্যত করেছেন। কোটি লাভজনক? ন্যায় কিংবা অন্যায়? কিসে সুখ? ন্যায়ে কিংবা অন্যায়ে? থ্র্যাসিমেকাস পূর্বের মতো এখানেও সজোরে বলছেন : ‘অন্যায়’ বল আর যা-ই বল দক্ষতার সঙ্গে যে আত্মস্বার্থ সাধন করতে পারে, সেই-ই সুখী। সবলের স্বার্থই ন্যায় বলতে থ্র্যাসিমেকাস তাই একথাও বলতে চেয়েছেন যে, অন্যায়েই সুখ : ন্যায়ের চেয়ে অন্যায় লাভজনক
‘দক্ষতার মাধ্যমে আত্মস্বার্থ সাধন’ কথা দ্বারা থ্র্যাসিমেকাস সক্রেটিসের দক্ষতার তত্ত্বটি স্বীকার করেছেন। অথবা বলা চলে দক্ষতার ব্যাপারে দু’জনার ঐকমত্য আছে। অর্থাৎ সবলকে যদি তার স্বার্থসাধন করতে হয় তা হলে তাকে স্বার্থসাধনে দক্ষ হতে হবে। দক্ষ হওয়ার জন্য প্রয়োজন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের সম্যক জ্ঞানলাভ। এক্ষেত্রে সক্রেটিস এবং এ্যাসিমেকাসের পার্থক্য যা সে হচ্ছে এই যে, থ্র্যাসিমেকাস যেখানে জীবনের স্বার্থ বলতে ব্যক্তির প্রাপ্যের অধিক জীবনের উপাদানের অর্থাৎ তার আনন্দ, সম্পদ এবং শক্তি লাভ করাকে বোঝেন, সক্রেটিস সেখানে জীবনের স্বার্থ বলতে তার কী প্রাপ্য তার অনুধাবন এবং তার প্রাপ্যের চেয়ে অল্প বা অধিক না পাওয়া—অর্থাৎ তার যথার্থ প্রাপ্যকে পাওয়া বোঝেন।
যুক্তির শুরুতে থ্র্যাসিমেকাস বলেছিলেন, অন্যায়কারী কেবল যে অধিক লাভ করে তা-ই নয়; অন্যায়কারী একাধারে জ্ঞানী, উত্তম এবং মঙ্গলকারী অর্থাৎ অন্যায়কারী’ কোনো নিন্দাজনক আখ্যানে আখ্যায়িত হতে পারে না। কিন্তু সক্রেটিস ধাপে ধাপে প্রশ্নের পর প্রশ্নের ভিত্তিতে এবং প্রতি ধাপে আপন স্বীকৃতির মাধ্যমে পরিণামের যেখানে তাঁকে পৌঁছালেন সেখানে সক্রেটিস যখন প্রশ্ন করছেন : “থ্র্যাসিমেকাস, তা হলে ন্যায়কে আমরা বলতে পারি জ্ঞানী এবং উত্তমের সদৃশ এবং অন্যায়কে অপকর্ষ এবং অজ্ঞানের সদৃশ। নয় কি?” সেখানে থ্র্যাসিমেকাস না বলে পারছেন না : ‘হ্যাঁ, এ-অনুমান ঠিক প্রতিপক্ষকে দিয়ে প্রতিপক্ষের নিজের যুক্তি অস্বীকার করাবার সক্রেটিসীয় দক্ষতার অতুলনীয় প্রকাশ ঘটেছে সংলাপের এই অংশটিতে।
.
ভাল কথা। কিন্তু এদের দুটিকে তুমি কী বলে আখ্যায়িত করবে? এদের একটিকে কি তুমি ধর্ম এবং অপরটিকে অধর্ম বলে অভিহিত করবে?
অবশ্যই।
বেশ, তা হলে আমি কি বুঝব যে তুমি ন্যায়কে ধর্ম এবং অন্যায়কে অধর্ম বলে অভিহিত করছ?
বাঃ! কী মজার অনুমান! আমি অন্যায়কে লাভজনক বলেছি বলেই অন্যায় অধর্ম হয়ে গেল?
তা হলে তুমি কী বলবে?
আমি এর উলটো কথাই বলব।
তার মানে তুমি ন্যায়কে অধর্ম বলতে চাও?
না, বরঞ্চ আমি তাকে সরল মানুষের মূর্খতা বলব। তা হলে তুমি কি অন্যায়কে দ্বেষ বলে অভিহিত করবে? না, তাও নয়। তাকে আমি বরং বিচক্ষণতা বলব।
তার মানে, অন্যায় তোমার নিকট জ্ঞান এবং মঙ্গল বলেও বোধ হয়? থ্র্যাসিমেকাস বললেন : হ্যাঁ, অন্তত যারা যথার্থরূপেই অন্যায়কারী আর যাদের ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্র এবং জাতিকে বশীভূত করার, তারা জ্ঞান এবং মঙ্গলের আকর বটে। অবশ্য তুমি গাঁটকাটাদের প্রশ্নটা তুলতে পার। তবে এ-বিদ্যার সুবিধাও কিছু কম নয় কেবল আশঙ্কা হচ্ছে ধরা পড়ার। ধরা না পড়লে এটিও উত্তম বিদ্যা। কিন্তু গাঁটকাটাদের প্রশ্ন বড় নয়। কেননা আমি যাদের কথা বলছিলাম তাদের সঙ্গে এদের কোনো তুলনা হয় না।
আমি বললাম : থ্র্যাসিমেকাস, আমার মনে হয় না তোমার কথার কোনো ভুল অর্থ আমি করছি। তথাপি একথা না বলে আমি পারছিনে যে, তুমি যখন অন্যায়কে জ্ঞান এবং ধর্ম আর ন্যায়কে এর ঠিক বিপরীত বিষয় বলে অভিহিত কর তখন আমি বিস্ময়ান্বিত না হয়ে পারিনে।
কিন্তু আমার অভিমতে কোনো দ্বিধা নেই।
আমি বললাম : থ্র্যাসিমেকাস, তোমার এখনকার বক্তব্য পূর্বের চেয়ে অধিকতর জোরদার। বস্তুত এবার তোমার কোনো জবাব দেবার আমাদের উপায় নেই। কারণ, অন্যায়কে লাভজনক বলেও তুমি যদি আর দশনজনার মতো তাকে অধর্ম এবং অপকর্ম বলে অভিহিত করতে, তা হলে প্রচলিত নীতির ভিত্তিতে তার যাহোক একটা জবাব দেওয়া সম্ভব হত। কিন্তু এখন দেখছি তুমি অন্যায়কে যেমন শক্তি এবং সম্মানের বিষয় বলে অভিহিত করছ, তেমনি আমরা ন্যায়ের ধর্ম বলে যেসব গুণকে এ-পর্যন্ত চিহ্নিত করে এসেছি সে-সমস্ত গুণকে তুমি অন্যায়ের উপর আরোপ করে তাকে জ্ঞান ও ধর্মের আকর বলেই ঘোষণা করতে চাচ্ছ।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : সক্রেটিস, আমার সম্পর্কে তোমার এ-অনুমান যথার্থই অভ্রান্ত।
আমি বললাম : তা হলে থ্র্যাসিমেকাস আমাদেরও উচিত নয় এই যুক্তির পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটি বার করে আনার চেষ্টা থেকে পিছু হটে আসা। তুমি যতক্ষণ তোমার বিশ্বাস অনুযায়ী কথা বলবে ততক্ষণ আমরাও তোমার সঙ্গে আলোচনা করা অসঙ্গত বোধ করব না। আমার নিজের বিশ্বাস, এই মুহূর্তে তুমি নিষ্ঠাসহকারেই কথা বলছ, আমাদের মূর্খতার মাশুলে নিজেকে কেবল আমোদিত করে তুলছ না।
আমি নিষ্ঠ অ-নিষ্ঠ, সেটি তো বড় কথা নয় সক্রেটিস; বড় কথা হচ্ছে আমার যুক্তিকে অসার প্রতিপন্ন করা। নয় কি?
আমি বললাম : একথা খুবই সত্য। আমাকে অবশ্যই তাই করতে হবে। কিন্তু তার পূর্বে তুমি দয়া করে আর একটি প্রশ্নের জবাব দাও : বলো, কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি কি অপর কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির প্রতিকূলে কোনো সুযোগলাভের চেষ্টা করে?
না, তা তো নয়ই, বরঞ্চ উল্টো। বস্তুত সে যদি তেমন সুযোগলাভের চেষ্টা করত তা হলে তার অবস্থাটি অমন করুণ হয়ে দাঁড়াত না।
বেশ, কিন্তু যে-কাজ ন্যায়, তাকে অতিক্রম করে যাবার চেষ্টাও কি সে কখনো করে?
না, তাও সে করে না।
কিন্তু ধরো অন্যায়কারীর প্রতিকূলে কোনো সুযোগলাভের কথা। এক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির ব্যবহার কীরূপ? সে কি অন্যায়কারীর প্রতিকূলে কোনো সুযোগলাভের প্রয়াসকে ন্যায় বলে বিবেচনা করে, না তাকে অন্যায় বলে মনে করে?
অন্যায়ের প্রতিকূলে সুবিধালাভের চেষ্টাকে সে ন্যায় বলে বিবেচনা করবে। কিন্তু তা হলেও এরূপ চেষ্টায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সে কোনো সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে না।
আমি বললাম : সেরূপ চেষ্টায় সে কৃতকার্য হবে কি হবে না সেটি প্রশ্ন নয়। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, একজন ন্যায়বান অপর একজন ন্যায়বানের বিরুদ্ধে অধিকতর কোনো সুযোগলাভে অস্বীকার করেও অন্যায়ের প্রতিকূলে কোনো সুযোগলাভের চেষ্টা সে করবে কি না?
হ্যাঁ, সেরূপ চেষ্টা ন্যায়বান অবশ্যই করবে।
কিন্তু অন্যায়কারী নিজে কী করবে? সে-ও কি ন্যায়ের চেয়ে অধিকতর সুযোগলাভের চেষ্টা করবে?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : নিশ্চয়ই, কেননা অন্যায়ের দাবি সবকিছুকেই অতিক্রম করে যায়।
তা হলে অপর সবার চেয়ে অধিক সুযোগলাভের জন্য এক অন্যায়কারী অপর অন্যায়কারীর বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করবে। নয় কি?
এ কথা যথার্থ।
আমি বললাম : তা হলে ব্যাপারটাকে আমরা এভাবে প্রকাশ করতে পারি : ন্যায় যেখানে কেবল অন্যায়ের প্রতিকূলে অধিকতর সুযোগলাভের চেষ্টা করে, তার সমচরিত্র অর্থাৎ ন্যায়ের প্রতিকূলে নয়, সেখানে অন্যায় তার সম, অসম উভয় চরিত্রের প্রতিকূলেই নিজের জন্য অধিকতর সুযোগলাভের চেষ্টা করে।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : এরচেয়ে উত্তম প্রকাশ আর কিছু হতে পারে না। এবং অন্যায় যেখানে জ্ঞান এবং মঙ্গল উভয়ই, ন্যায় সেখানে না জ্ঞান, না মঙ্গল। সে কোনোটিই নয়।
তোমার এ কথাটিও উত্তম।
তা হলে জ্ঞান এবং মঙ্গলের সঙ্গেই অন্যায়ের চারিত্রিক সাদৃশ্য আর ন্যায়ের সঙ্গে তার বৈসাদৃশ্য। ঠিক নয় কি?
এ কথাও যথার্থ। কেননা সদৃশ চরিত্রের মধ্যেই সাদৃশ্য থাকবে, বিসদৃশের মধ্যে নয়।
আর সদৃশের ক্ষেত্রে একটি সদৃশ অপরটির হুবহু অনুরূপ।
হ্যাঁ, অবশ্যই একটি অপরটির অনুরূপ।
আমি বললাম, খুবই উত্তম থ্র্যাসিমেকাস। এবার তা হলে শিল্পের ক্ষেত্রে আসা যাক। এ কথা নিশ্চয়ই তুমি স্বীকার করবে যে, এক ব্যক্তি সঙ্গীতজ্ঞ হতে পারে, অপর এক ব্যক্তি সঙ্গীতজ্ঞ নাও হতে পারে।
হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি।
কিন্তু সঙ্গীতজ্ঞ এবং সঙ্গীতে অজ্ঞ—এদের মধ্যে কাকে তুমি জ্ঞানী এবং কাকেই বা তুমি মূর্খ বলে অভিহিত করবে?
স্পষ্টতই যে সঙ্গীতজ্ঞ সেই জ্ঞানী, আর যে সঙ্গীতে অজ্ঞ সে মূর্খ।
তা হলে যে জ্ঞানী সে তার জ্ঞানের কারণে উত্তমও বটে; আবার যে মূর্খ সে তার মূর্খতার কারণে অধম।
তা বটে।
একজন চিকিৎসক সম্পর্কে তুমি নিশ্চয়ই একই অভিমত পোষণ করবে? হ্যাঁ। আমার মত অনুরূপই হবে।
বেশ, কিন্তু বন্ধু থ্র্যাসিমেকাস, দু’জন সঙ্গীতজ্ঞ সম্পর্কে তুমি কী বলবে? ধর দু’জন বীণাবাদকই তাদের বীণার তারগুলিকে সুর যোজনের জন্য কঠিন কিংবা নম্র করে সঙ্গত সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এমন ক্ষেত্রে এদের একজন কি তার তারগুলিকে কঠিন কিংবা নম্র করার ব্যাপারে অপরজনকে অতিক্রম করে যেতে চাইবে?
না, আমি সেরূপ মনে করিনে।
কিন্তু যে সঙ্গীতজ্ঞ, সে নিশ্চয়ই সঙ্গীতে অজ্ঞকে অতিক্রম করেই অগ্রসর হতে চাইবে। নয় কি?
এতে আর সন্দেহ কী?
বেশ, এবার একজন চিকিৎসকের কথা ধরা যাক। রুগিকে সে মাংস এবং পানীয়ের বিধান দিচ্ছে। এরূপ ক্ষেত্রে সে কি অপর একজন চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসাশাস্ত্রকে অতিক্রম করে যেতে চাইবে?
না, তা সে চাইবে না।
কিন্তু অ-চিকিৎসককে সে নিশ্চয়ই অতিক্রম করে যেতে চাইবে? হ্যাঁ, তা সে চাইবে।
এবার তা হলে সাধারণভাবে জ্ঞান এবং অজ্ঞানতার ক্ষেত্রে আসা যাক। তুমি চিন্তা করে দ্যাখো, এ ক্ষেত্রে যে জ্ঞানী সে কী করে? সে কি অপর এক জ্ঞানীর চেয়ে জ্ঞানের ব্যাপারে অধিকতর কিছু বলার কিংবা করার ইচ্ছাপ্রকাশ করে? না, তার সদৃশ জ্ঞানী যা বলে কিংবা করে সে ততটুকুই বলতে কিংবা করতে চায়?
সদৃশ যেমন করবে, সেও ঠিক তেমনি করবে, এতে আর সন্দেহ কী?
কিন্তু অজ্ঞানীর বেলা ব্যাপারটি কিরূপ হবে? অজ্ঞানী কিংবা জ্ঞানী উভয়ের চেয়েই অধিক লাভের আকাঙ্ক্ষা কি সে পোষণ করবে না?
হ্যাঁ, তা-ই সে করবে, একথা আমি জোরের সঙ্গেই বলছি।
কিন্তু যে জ্ঞানী সে বিজ্ঞ তো বটে।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
আর জ্ঞানী উত্তমও বটে।
তাও সত্য।
তা হলে জ্ঞানী আর উত্তম কখনো তার সদৃশের চেয়ে অধিক লাভের ইচ্ছা পোষণ করবে না। বিসদৃশ বা বিপরীতের প্রতিকূলেই সে অধিক লাভের চেষ্টা করবে। নয় কি?
আমার তা-ই মনে হয়।
কিন্তু যে অজ্ঞ এবং অধম সে জ্ঞানী-অজ্ঞানী উভয়ের চেয়েই অধিক লাভে সচেষ্ট হবে। নয় কি?
হ্যাঁ।
অন্যায় কি শক্তির আকর?
কিন্তু থ্রাসিমেকাস, তোমার কথা ছিল যে, একমাত্র অন্যায়ই তার অনুরূপ কিংবা বিরূপ উভয়ের প্রতিকূলে অধিক সুযোগলাভের চেষ্টা করে। একথাই তো তুমি বলেছিলে, নয় কি?
হ্যাঁ, আমার কথা এরূপই ছিল।
তা ছাড়া, তুমি একথাও বলেছিলে যে, ন্যায় অনুরূপের বিরুদ্ধে নয়, কেবলমাত্র বিরূপের বিরুদ্ধেই গমন করে।
হ্যাঁ, সে কথাও সত্য।
তা হলে ন্যায়কে আমরা বলতে পারি জ্ঞানী এবং উত্তমের সদৃশ আর অন্যায়কে অপকর্ষ এবং অজ্ঞানের সদৃশ, নয় কি?
হ্যাঁ, এ অনুমান ঠিক।
আর এদের প্রত্যেকে তার সদৃশের অনুরূপ?
এতো আমাদের স্বীকৃত কথা!
তা হলে এবার ন্যায় জ্ঞান এবং উত্তম, আর অন্যায় অজ্ঞান এবং অধম বলে প্ৰতিপন্ন হল।
থ্র্যাসিমেকাস এই স্বীকৃতিগুলোকে যে আমার জিজ্ঞাসার সঙ্গে সঙ্গে খুব আগ্রহের সঙ্গে করছিলেন এমন নয়। বস্তুত বিশেষ অনিচ্ছাসহকারইে কথাগুলো তাঁকে মেনে নিতে হচ্ছিল। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল; দিনটা ছিল ভয়ানক গরম; এ্যাসিমেকাসের শরীর বেয়ে তখন ঘামের স্রোতধারা নেমে আসছিল। এবার আমি তাঁর মুখপানে চাইতেই পূর্বে কোনোদিন যা দেখিনি তা-ই দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম এ্যাসিমেকাসের গণ্ডদেশ লজ্জারক্ত হয়ে উঠেছে যাহোক এ-ব্যাপারে আমরা যখন একমত হলাম যে, ন্যায় হচ্ছে জ্ঞান ও ধর্ম, আর অন্যায় হচ্ছে অজ্ঞান এবং অধর্ম তখন আমি অপর একটি বিষয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলাম।
আমি বললাম, থ্র্যাসিমেকাস, এ-বিষয়টার তো একটা মীমাংসা হল। কিন্তু অপর একটি বিষয়েও তো আলোচনা প্রয়োজন। তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে যে, অন্যায়কে আমরা শক্তির আকর বলেও উল্লেখ করেছিলাম, নয় কি?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, হ্যাঁ, আমার স্মরণ আছে। কিন্তু তাই বলে সক্রেটিস তুমি এরূপ মনে কোরো না যে এ-ব্যাপারে তোমার বক্তব্যকে আমি সমর্থন করছি, কিংবা আমার নিজের কোনো জবাব নেই। আমি জানি, আমি জবাব দিলে তুমি অভিযোগ করে বলবে আমি বক্তৃতাবাজি করছি। আমি তাই বলছি, হয় তুমি আমাকে আমার বক্তব্য পেশ করতে দাও, নাহয় তুমি যদি প্রশ্ন করতে চাও, প্রশ্ন করো। গল্পবুড়ির শ্রোতাদের ন্যায় আমিও তখন তোমার প্রশ্নের উত্তরে ‘উত্তম’ ‘বেশ’ ‘আচ্ছা’ ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বলে আমার মাথা ঝাঁকাব।
আমি বললাম, না, তা কেন থ্রাসিমেকাস? তোমার সত্যকার মতের বিরুদ্ধে হলে তুমি নিশ্চয় আমার কথায় সায় দেবে না।
থ্রাসিমেকাস বললেন, আমি তা-ই করব। তুমি যখন আমার বক্তব্যকে পেশ করতে দেবে না, তখন তুমি আমার নিকট থেকে এ ছাড়া আর কী আশা করতে পার?
আমি বললাম : না, আশা আর কী করব? বেশ, তুমি যদি এরূপই স্থির করে থাক, তা হলে আমি তোমাকে অবশ্যই প্রশ্ন করব?
বেশ, করো।
আমি তা হলে আমার পুরোনো প্রশ্নকেই আবার জিজ্ঞেস করে নিতে চাই। ন্যায় অন্যায়ের পারস্পরিক বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিক আলোচনায় এ-পুনরুক্তিটি আমাদের সাহায্য করবে। পূর্বে এরূপ অভিমত আমরা প্রকাশ করেছিলাম যে, ন্যায়ের চেয়ে অন্যায়ই অধিকতর শক্তিশালী। কিন্তু এখন ন্যায়কে জ্ঞান এবং ধর্ম বলে অভিহিত করার অর্থ হচ্ছে এ কথা বলা যে, ন্যায়ই অন্যায়ের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী; কারণ অন্যায় হচ্ছে অজ্ঞানতা। এ অভিমতকে এখন আর কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু থ্র্যাসিমেকাস, আমি ব্যাপারটিকে একটু ভিন্ন ভাবে দেখতে চাই। রাষ্ট্রের ব্যাপারে একথা নিশ্চয়ই তুমি অস্বীকার করবে না যে, একটা রাষ্ট্র অন্যায়াচারী হতে পারে। অন্যায়াচারী রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে অপর রাষ্ট্রসমূহকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধার চেষ্টা করতে পারে। এমনকি এই চেষ্টায় কৃতকার্য হয়ে সে অপর রাষ্ট্রসমূহকে আপন দাসে পরিণত করেও ফেলতে পারে। নয় কি?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : যথার্থ। সক্রেটিস, তোমার কথার সঙ্গে বরঞ্চ আমি যোগ করে এও বলব যে সর্বোত্তম অন্যায়াচারী রাষ্ট্রের পক্ষে এরূপ আচরণ সবচেয়ে স্বাভাবিকই হবে।
আমি বললাম : হ্যাঁ, এ-ব্যাপারে তোমার মত আমি জানি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে শক্তিশালী রাষ্ট্রে এরূপ ক্ষমতার অস্তিত্ব কিংবা এর প্রয়োগ কি অন্যায় ব্যতিরেকে সম্ভব? অথবা আমরা বলব যে, শক্তিকে কেবলমাত্র ন্যায়ের সাহায্যেই ব্যবহার করা সম্ভব?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : ন্যায়ই জ্ঞান আর ধর্ম, তোমার এই অভিমত যদি সত্য হয় তা হলে ন্যায়ের মাধ্যমেই মাত্র শক্তির ব্যবহার সম্ভব। কিন্তু আমার কথা যদি সত্য হয় তা হলে ন্যায় ব্যতিরেকেই শক্তির প্রয়োগ সম্ভব।
আমি বললাম : থ্র্যাসিমেকাস, তুমি যে কেবল ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বলে মাথা নাড়ছ না, বরঞ্চ আমার প্রশ্নের দস্তুরমতো সুন্দর জবাব দিচ্ছ তা দেখে আমি যথার্থই আনন্দিত হচ্ছি।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : কী আর করা! তোমার সঙ্গে তো আর অভদ্রতা করতে পারিনে।
তোমার অসীম দয়া গ্র্যাসিমেকাস। তুমি তা হলে দয়া করে আমায় বলো, তুমি কি মনে কর একটা রাষ্ট্র, একটা সৈন্যবাহিনী, একদল দস্যু কিংবা চোর কিংবা অপর যে-কোনো অন্যায়কারীর দল যদি পরস্পরকে আক্রমণ এবং আঘাত করে তা হলে কি তারা তাদের কোনো পরিকল্পনাই কার্যকর করতে পারে?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : না, এমন হলে তাদের পক্ষে কোনোকিছু করাই সম্ভব নয়।
কিন্তু পরস্পর আঘাত না করে যদি তারা পরস্পর মিলিত হয় তা হলেই তারা সংঘবদ্ধভাবে কোনো কার্যকে সম্পাদন করতে পারে। নয় কি?
হ্যাঁ, একথা সত্য।
কিন্তু এদের পারস্পরিক এই আক্রমণ ও আঘাত কেন? সে তো এইজন্য যে অন্যায় বিরোধের সৃষ্টি করে, ঘৃণার উদ্রেক করে এবং আক্রমণের প্রেরণা যোগায়। অপরদিকে ন্যায় সৌহার্দ্য এবং সখ্যেরই সৃষ্টি করে। একথা কি যথার্থ নয়, থ্র্যাসিমেকাস?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : সক্রেটিস, তোমার সঙ্গে আমি ঝগড়ায় লিপ্ত হতে চাইনে। তাই বলছি, তোমার এ কথাকে আমি মেনে নিলাম।
তোমার দয়ার শেষ নেই, থ্র্যাসিমেকাস! কিন্তু আমি জানতে চাই, অন্যায়ের স্বভাব যদি এই হয়, তা হলে দাস কিংবা নাগরিক যাদের মধ্যেই তার অবস্থান ঘটুক-না কেন সে তাদের মধ্যে ঘৃণা এবং বিরোধের সৃষ্টি করে তাদের যে-কোনো প্রকার মিলিত কার্যক্রমকেই কি অসম্ভব করে তুলবে না?
অবশ্য সে তা-ই করবে।
এমনকি যদি কেবলমাত্র দুজন মানুষের মধ্যেও অন্যায়ের অবস্থান ঘটে তা হলে সেখানেও কি এরা উভয় উভয়ের শত্রুতে পরিণত হয়ে নিজেদের মধ্যে এবং ন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে না?
হ্যাঁ, তারা অবশ্যই সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।
এবার মনে কর, দুজন নয়। অন্যায়ের অবস্থান একটিমাত্র ব্যক্তির মধ্যে ঘটেছে। তা হলেও অন্যায়ের অবস্থিতিতে তোমার জ্ঞানের কী অবস্থা ঘটবে? জ্ঞান কি তখন নিজের স্বাভাবিক শক্তিকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে, না সে অন্যায়ের কারণে বিনষ্ট হয়ে যাবে?
থ্র্যাসিমেকাস এবার বললেন, মনে করা যাক অন্যায় সত্ত্বেও জ্ঞান তার নিজের ক্ষমতাকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে।
কিন্তু অন্যায়ের ক্ষমতা কি এরূপ নয় যে নগর, সেনাবাহিনী, একটি পরিবার কিংবা অপর যে-কোনোকিছুতেই তার অবস্থান ঘটুক-না কেন সবকিছুতেই সে বিরোধ, বিদ্রোহ কিংবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তার ঐক্যবদ্ধ কর্যক্রম গ্রহণের ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়? বস্তুত অন্যায় যাকে আশ্রয় করে তার আপন সত্তাকেই সে নিজের প্রকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে, নয় কি?
হ্যাঁ, অবশ্যই অন্যায়ের ক্ষমতা এরূপ।
আর তা ছাড়া, থ্রাসিমেকাস, একক ব্যক্তির ক্ষেত্রেও অন্যায় কি অনুরূপভাবেই মারাত্মক নয়? কারণ, প্রথমত অন্যায় ব্যক্তির সত্তার মধ্যে বিরোধ ঘটিয়ে কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অক্ষম করে ফেলে; দ্বিতীয়ত, অন্যায় ব্যক্তির জন্য মারাত্মক। কেননা, সে তার স্বভাবের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ের বিরুদ্ধে তাকে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়। আমার এ কথা কি সত্য নয়, থ্র্যাসিমেকাস
হ্যাঁ, এ কথা সত্য, সক্রেটিস।
কিন্তু বন্ধুবর, দেবতাদের তুমি কী বলবে? দেবতারা নিশ্চয়ই ন্যায়বান।
ধরা যাক, তাঁরা ন্যায়বান।
তা-ই যদি হয়, তা হলে অন্যায় অবশ্যই দেবতাগণের শত্রু হবে, এবং ন্যায় তাঁদের মিত্র। কি বল থ্র্যাসিমেকাস?
থ্র্যাসিমেকাস রাগতভাবে বললেন : যেমন ইচ্ছা তুমি বলে যাও। তোমার যুক্তির চরম তুমি দেখিয়ে দাও, সক্রেটিস। আমি তোমার কথার প্রতিবাদ করে আমাদের সঙ্গীদের বিরাগভাজন হতে চাইনে।
আমি বললাম : বেশ, তা হলে তুমিও তোমার জবাবদানে দ্বিধা কোরো না। এই ভুরিভোজের বাকিটাও আমাকে তৃপ্তি সহকারেই গ্রহণ করতে দাও। থ্রাসিমেকাস, একথা তুমি অস্বীকার করতে পার না যে, ন্যায়ের শক্তিকে আমরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছি। বস্তুত আমরা প্রমাণ করেছি যে, ন্যায় নিঃসন্দেহে অন্যায়ের চেয়ে অধিকতর ক্ষমতাবান, জ্ঞানী এবং উত্তম। অপরদিকে অন্যায়াচারীগণ কখনো মিলিত কার্যক্রম গ্রহণ করতেই সক্ষম নয়। শুধু তা-ই নয়, অন্যায়াচারীগণ যদি যথার্থভাবে অন্যায়াচারী হয় তা হলে তাদের পক্ষে আদৌ সংঘবদ্ধ হওয়াই সম্ভব নয়। কেননা স্বভাবগতভাবে তখন তারা পরস্পরের মধ্যে বিরোধে লিপ্ত হতে বাধ্য। তবু যে অন্যায়কারী ক্ষমতা দেখা যায় তার কারণ এই অন্যায়কারীগণ যথার্থরূপে অন্যায়াচারী নয়; তাদের সত্তার মধ্যে ন্যায়ের কিছু অবশিষ্ট রয়েছে বলেই তাদের পক্ষে সংঘবদ্ধ হওয়া সম্ভবপর হয়েছে। তাদের চরিত্রে ন্যায় কিছু অবশিষ্ট না থাকলে তারা অবশ্যই কোনো মিলিত কার্যাক্রমের বদলে একে অপরকে আক্রমণ করে আহত করে ফেলত। কাজেকাজেই অন্যায়কারী কিংবা অসৎ, চরিত্রগতভাবে অসম্পূর্ণ অসৎ। কেননা পরিপূর্ণরূপে অসৎ হলে অসৎ-এর পক্ষে কোনোপ্রকার কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপেই অসম্ভব হত। থ্র্যাসিমেকাস, এ-ব্যাপারে মনে হয় আমিই যথার্থ, তুমি যা বলেছ, তা ঠিক নয়। তবে ন্যায়বানের জীবন অন্যায়কারীর চেয়ে অধিকতর উত্তম এবং সুখী কি না, সে-প্রশ্নের মীমাংসাও প্রয়োজন। আমি অবশ্য মনে করি যে ন্যায়ের জীবন অন্যায়ের চেয়ে উত্তম এবং সুখী। তার কারণও আমি বলেছি। তবু বিষয়টি নিয়ে অধিকতর আলোচনাই বাঞ্ছনীয়। কেননা কোনো হালকা বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করছিনে—আমরা আলোচনা করছি মানবজীবনের গুরুতর নিয়মনীতির বিষয় নিয়েই।
বেশ, তুমি আলোচনা করো।
হ্যাঁ, আমি তোমাকে প্রশ্ন করেই আলোচনা করব। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তুমি কি মনে কর না যে, একটি অশ্বেরও কিছু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে?
আমার তাই মনে করা উচিত।
আবার একটি অশ্ব কিংবা অপর কিছুর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকার অর্থ হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য সে ছাড়া অপর কারুর পক্ষে সে-উদ্দেশ্যের সার্থক সাধন আদৌ সম্ভব নয়।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, আমি তোমার কথা বুঝতে পারলাম না, সক্রেটিস।
আমি ব্যাখ্যা করে বলছি। তোমার চোখ বাদে কি তুমি দেখতে পার?
না, তা অবশ্যই পারিনে।
অথবা কান বাদে কি তুমি শুনতে পাও?
না।
কিন্তু এই দেখা এবং শোনাটা কাদের লক্ষ্য? সে অবশ্যই চোখ এবং কান—এই ইন্দ্রিয় দুটিরই।
তা হতে পারে।
আবার দ্যাখো, একটি আঙুরশাখাকে তুমি একখানি ছোরা কিংবা একখানি বাটালি দ্বারা সহজেই কেটে ফেলতে পার। নয় কি?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। এ কাজ বাটালি কিংবা বড় রকমের ছুরি দ্বারা সহজেই করা যায়।
কিন্তু তাই বলে কাজটি গাছ ছাঁটাইয়ের কাঁচি দ্বারা যেরূপ উত্তমভাবে করা যায় সেরূপ উত্তমভাবে বাটালি দ্বারা নিশ্চয়ই করা সম্ভব নয়। নয় কি?
হ্যাঁ, এ কথা সত্য।
তার কারণ, লতাপাতা ছাঁটাই করাকে আমরা কাঁচির লক্ষ্য বলে মনে করতে পারি। যথার্থ নয় কি?
হ্যাঁ, সেরূপ আমরা মনে করতে পারি।
তা হলে, থ্র্যাসিমেকাস, এবার আশা করি তুমি বুঝতে পারবে কেন আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, কোনোকিছুর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বলতে আমরা তাকেই বোঝাই কি না, যার কার্য তার মতো উত্তমরূপে অপর কারু দ্বারা সাধন করা সম্ভব নয়?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : হ্যাঁ সক্রেটিস, তোমার প্রশ্নটির তাৎপর্য এবার আমি বুঝতে পেরেছি এবং তোমার কথার সঙ্গে আমি একমত হচ্ছি।
আবার, যে-বস্তুর লক্ষ্য আছে তার নিশ্চয়ই উৎকর্ষও আছে। যেমন চোখের একটি লক্ষ্য আছে। চোখের যে লক্ষ্য আছে এটি নিশ্চয়ই আবার প্রশ্নের বিষয় হয়ে উঠবে না, থ্র্যাসিমেকাস?
না। কেননা চোখের যে লক্ষ্য আছে, সেটি আমি স্বীকার করি।
বেশ। কিন্তু চোখ কি কিছু উৎকৃষ্টতারও অধিকারী নয়?
হ্যাঁ, তার উৎকৃষ্টতাও রয়েছে।
ঠিক তেমনি কানের যেমন আছে লক্ষ্য, তেমনি আছে উৎকৃষ্টতা, নয় কি?
যথার্থ।
অপরাপর যে-কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে এ কথাটি সত্য। অর্থাৎ তাদের প্রত্যেকেরই যেমন আছে একটি লক্ষ্য তেমনি আছে আপন-আপন উৎকৃষ্টতা।
একথা সত্য।
বেশ। কিন্তু চোখের যদি কোনো বিকার থাকে তা হলে সে কি তার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে সাধন করতে পারে?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : না, তা কী করে সম্ভব! চোখ যদি অন্ধ হয় তা হলে দেখার লক্ষ্য সে সাধন করবে কী করে?
থ্র্যাসিমেকাস, তুমি বলছ যে চোখের যা বিশেষ উৎকৃষ্টতা অর্থাৎ দৃষ্টিশক্তি, সেটি হারালে চোখ তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হবে। কিন্তু এখনও আমি এতদূর এসে পৌঁছিনি। আমি বরঞ্চ আমার প্রশ্নটিকে একটু সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করতে চাই। আমার বর্তমান প্রশ্ন হচ্ছে : এ কথা কি যথার্থ নয় যে, কোনো বস্তু যখন তার উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম হয় তখন সে তার উৎকৃষ্টতার কারণেই সক্ষম হয়; আর যদি সে উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয় তা হলে তার বিকারের কারণেই সে ব্যর্থ হয়। নয় কি?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
কানের ব্যাপারেও আমরা একই কথা বলতে পারি। আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয় যখন তার শ্রবণশক্তি হারায় তখন সে আপন লক্ষ্য সাধনে ব্যর্থ হয়। নয় কি?
হ্যাঁ, এ কথা সত্য।
এ কথা অপরাপর বস্তু সম্পর্কেও সত্য। কী বল, থ্র্যাসিমেকাস?
আমি তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস।
বেশ! তা হলে এবার আত্মার বিষয়টি বিবেচনা করো। আত্মার ব্যাপারেও কথাটি কি সত্য নয় যে, আত্মারও একটি লক্ষ্য আছে আর সে লক্ষ্য আত্মা ব্যতীত অপর কেউ সাধন করতে পারে না? উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি, আত্মার লক্ষ্য হচ্ছে তত্ত্বাবধান এবং অভিনিবিষ্টতার লক্ষ্য। এ-লক্ষ্য কি একান্তভাবে আত্মার নয়? অপর কারুর উপর কি তুমি এ-লক্ষ্যসাধনের দায়িত্বকে অর্পণ করতে পার?
না, অপর কারুর উপর এরূপ দায়িত্ব অর্পণ করা সম্ভব নয়।
বেশ! কিন্তু জীবন সম্পর্কে তুমি কী বলবে? জীবনও কি আত্মার একটি লক্ষ্য বলে পরিগণিত নয়?
হ্যাঁ, অবশ্যই জীবন আত্মার একটি লক্ষ্য।
কিন্তু আত্মা নিজেও কি উৎকৃষ্টতার অধিকারী নয়?
হ্যাঁ, আত্মারও উৎকৃষ্টতা রয়েছে।
বেশ! কিন্তু এই উৎকৃষ্টতা ব্যাতিরেকে আত্মা কি তার আপন লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম?
না, উৎকৃষ্টতা ব্যতীত আত্মার পক্ষে তার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
তা হলে অসৎ আত্মা অবশ্যই শাসক এবং তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে অসৎ এবং সৎ আত্মা শাসক এবং তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে সৎ। নয় কি?
হ্যাঁ, অবশ্যই তারা সেরূপ।
আর একথাও আমরা স্বীকার করেছি যে, ধর্ম বা ন্যায় হচ্ছে আত্মার একটি মহৎ গুণ-বিশেষ আর অন্যায় বা অধর্ম হচ্ছে আত্মার একটি বিকারবিশেষ।
হ্যাঁ, একথাকে স্বীকার করা হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়। একথাও বলা হয়েছে যে, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি একটি মহৎ জীবন-যাপন করে; অপরদিকে অন্যায়কারী একটি নিকৃষ্ট জীবনই যাপন করে।
সক্রেটিস, তোমার যুক্তি তা-ই প্রমাণ করে বটে।
সেদিক থেকে মহৎ জীবন যে যাপন করে সে অবশ্যই পবিত্র এবং সুখী; আর যে নিকৃষ্ট জীবন যাপন করে সে অভিশপ্ত এবং অসুখী। নয় কি?
হ্যাঁ, অবশ্যই।
তা হলে যে ন্যায়পরায়ণ বা ধার্মিক সে সুখী; আর যে অন্যায়কারী সে অভিশপ্ত?
তা-ই বটে।
তা হলে সুখই সৌভাগ্যের আকর, দুঃখ নয়?
এতে আর সন্দেহ কি?
তা হলে, প্রিয় বন্ধু থ্র্যাসিমেকাস, ধর্মের চেয়ে অধর্ম কখনোই অধিক লাভজনক বলে বিবেচিত হতে পারে না।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, সক্রেটিস, তোমার মনস্তুষ্টির জন্য কথাটাকে আমি স্বীকার করেই নিলাম।
আমি বললাম : প্রিয় গ্র্যাসিমেকাস, এতক্ষণে তুমি যেন খানিকটা নরম হয়ে এসেছ! সে যাহোক, তিরস্কারের পরিবর্তে তুমি যে আমার তুষ্টিবিধানের নীতি গ্রহণ করেছ সে জন্য তোমার নিকট আমি অবশ্যই ঋণী। তা হলেও ব্যাপারটাতে আমি যে খুব তুষ্ট হতে পেরেছি এমন মনে হচ্ছে না। কিন্তু সেজন্য আর আমি তোমাকে দায়ী করছিনে। এজন্য দায়ী আমি নিজেই। কারণ, ভোজের আসরে বসে অধৈর্য লোভী যেমন স্বাদ অনুভবের বিরাম বাদেই একটার পর একটা ভোজ্যবস্তুকে গলাধঃকরণ করে চলে আমিও তেমনি আমার অন্বিষ্টের অপেক্ষা না করে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে পরিক্রম করেছি। ন্যায় বা ধর্মের প্রকৃতি স্থির করাই ছিল আমার লক্ষ্য। কিন্তু সে-লক্ষ্যকে পরিত্যাগ করে আমি জানতে চাইলাম ন্যায় জ্ঞান এবং উত্তম কিংবা অ-জ্ঞান এবং অধম? এখান থেকে যখন প্রশ্ন উঠল লাভ এবং লোকসানের ক্ষেত্রে কে বেশি ভাগ্যবান, ন্যায় কিংবা অন্যায়, তখন সে-আলোচনার লোভকেও আমি সংযত করতে পারলাম না। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, স্থিরভাবে আমি কিছুই এখন জানিনে। কারণ, আমি জানিনে, ন্যায় কিংবা ধর্ম কী? আর এই মূল কথাই যদি না জানি তা হলে আমি কেমন করে জানব, ন্যায় সৎ কিংবা অসৎ; কী করে আমি বুঝব যে ন্যায়পরায়ণ বা ধার্মিক, সে সুখী কিংবা অ-সুখী?
