Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    সরদার ফজলুল করিম এক পাতা গল্প669 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ১১. ন্যায় আবিষ্কৃত হয়েছে : রাষ্ট্রে ন্যায়ের অবস্থান : ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ

    অধ্যায় : ১১ [৪১৯–৪৪৫]

    ন্যায় আবিষ্কৃত হয়েছে : রাষ্ট্রে ন্যায়ের অবস্থান : ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ

    রাষ্ট্রগঠনের মূল উদ্দেশ্যটিকে আমাদের আবার স্মরণ করা আবশ্যক। আমরা রাষ্ট্র গঠন করেছি ন্যায়কে বৃহৎ আকারে প্রত্যক্ষ করার জন্য। রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে উৎপাদক, সহায়ক এবং শাসক দিয়ে। অথবা গুণ হিসাবে বলা চলে রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে সংযম, সাহস এবং জ্ঞান দ্বারা। গুণের প্রাধান্য হিসাবে উৎপাদক বা উৎপাদনকারী কৃষক, কারিগর, বণিক, ব্যবসায়ী মজুর সবার প্রধান গুণ সংযম। সহায়ক বা রাষ্ট্রের রক্ষকদের প্রধান গুণ সাহস। এবং শাসকদের প্রধান গুণ জ্ঞান। কিন্তু ন্যায়ের অবস্থান কোথায়? অবশিষ্টের পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমরা ন্যায়কে নির্দিষ্ট করতে পারি। সংযম, সাহস এবং জ্ঞানের সমন্বয়ে রাষ্ট্র কেমন করে চলছে? তার মূল কারণটি কী? সে কেবল এই নয় যে রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় গুণকে আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি। তার মূল কারণ হচ্ছে ‘সংযম’ জানে তার কী দায়িত্ব। এবং তার যা দায়িত্ব সে দায়িত্ব পালন করা এবং অপরের দায়িত্বে হস্তক্ষেপ না করাকেই সে তার কর্তব্য বলে বিশ্বাস করে। ‘সাহস’ জানে তার কী করণীয় এবং তার সেই করণীয় সে সমাধা করে। অপরের দায়িত্বে সে হস্তক্ষেপ করে না। ‘জ্ঞান’ জানে তার কী কর্তব্য। মোটকথা, যার যা করণীয় সেটি জানা এবং সেই করণীয় সম্পাদন করার মাধ্যমেই আমাদের আদর্শ রাষ্ট্র আদর্শভাবে ক্রিয়াশীল থাকছে : তার সুস্থতা বজায় থাকছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি সংযম, সাহস এবং জ্ঞানের দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছে। কেবল বাকি রয়েছে ন্যায়ের দায়িত্ব স্থির করা। এবং ন্যায়ের জন্য অপর কোনো বিশেষ কার্য বলে যখন কিছু নেই তখন সংযম, সাহস এবং জ্ঞানের এই সঙ্গতি, পরিমিতিবোধ অর্থাৎ নিজের কর্তব্য জানা এবং তা সম্পাদন করা এবং অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করাটাই হচ্ছে ন্যায়। অর্থাৎ ন্যায় হচ্ছে রাষ্ট্রের সকল অপরিহার্য উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গতি। এই সিদ্ধান্তেরই বারংবার উচ্চারণ পাই আমরা সক্রেটিসের এরূপ কথায় : “প্রকৃতি যাকে যে-কাজের জন্য তৈরি করেছে সে সেই কাজই সম্পাদন করবে। আমি বলব এই নীতিই হচ্ছে ন্যায়।” “ন্যায় হচ্ছে নিজের কাজ করা এবং অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করা।” তাই শেষ সিদ্ধান্ত হল : জ্ঞান, সাহস, সংযম এবং ন্যায়—এই হচ্ছে রাষ্ট্রের মূল উপাদান। বলা চলে রাষ্ট্রের মূল শক্তি বা রাষ্ট্রের আত্মার একক। এবার ব্যক্তির উপরে ন্যায় সম্পর্কে আমাদের এই সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করা আর কঠিন নয়। ব্যক্তির আত্মারও তা হলে মূল উপাদান হবে সংযম, সাহস এবং জ্ঞান এবং এই তিনের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গতি—অর্থাৎ ন্যায়। ব্যক্তির মধ্যেও প্রবৃত্তি জানে তার কী কাজ। এবং সে সেই কাজই মাত্র করে। দেহের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণের উপায় করে। সাহস বা তেজ জানে তার কী কাজ। সে সেই কাজই মাত্ৰ করে। শত্রুর আক্রমণ এবং প্রয়োজনবোধে প্রবৃত্তির বিদ্রোহ-চেষ্টাকে দমন করে দেহকে সে রক্ষা করে। জ্ঞান বা বুদ্ধি দেহের প্রবৃত্তি এবং সাহসকে শাসন করে। সে হচ্ছে দেহের আত্মা, দার্শনিক। সে জানে কার কী করণীয়, কার কাজের কী সীমা। এই সঙ্গতি যে দেহ এবং আত্মায় বিরাজ করে সেই দেহ তথা সেই আত্মাকেই আমরা সুস্থ দেহ, সুস্থ আত্মা বলি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তি রাষ্ট্রের একক হলেও ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে প্লেটো প্ৰথমে নির্দিষ্ট করে তার ভিত্তিতে তাঁর রাষ্ট্র গঠন করেন নি। ব্যক্তির চারিত্রিক বিশ্লেষণ থেকে তাঁর রাষ্ট্রে উত্তরণ ঘটেনি। তিনি রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় উপাদান দিয়ে গঠিত করে তার ভিত্তিতে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত হচ্ছে : রাষ্ট্রে আমরা যেরূপ দেখেছি, ব্যক্তির মধ্যে আমরা সেরূপ দেখি; রাষ্ট্রে যেরূপ সংযম, সাহস এবং জ্ঞান, ব্যক্তির মধ্যেও তেমনি সংযম, সাহস এবং জ্ঞান। একথা ঠিক যে, তাঁর এ-সিদ্ধান্ত আমাদের সাধারণ বাস্তব অভিজ্ঞতার কিছু বিরোধী নয়। তাই প্লেটোর বিশ্লেষণ ও যুক্তি এবং সিদ্ধান্ত আমাদের নিকট বাস্তব এবং স্বাভাবিক বলে বোধ হয়। যার যা কাজ তার তাই করা উচিত—এটি সামাজিক জীবনের একটি বাঞ্ছিত নীতি। প্লেটো এ-নীতিকে চরমে নিয়ে যেয়ে শ্রমের বিভাগকে অনড় শ্রেণী বিভাগে পরিণত করেছেন—এ-অভিযোগ তোলা যায়। কিন্তু সাধারণভাবে শ্রমের বিভাগ এবং কাজের দক্ষতার সিদ্ধান্তটি মূল্যবান। তত্ত্বগতভাবে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে উত্তরণের পরিবর্তে রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিতে পৌঁছার পৌঁছার পদ্ধতিটির তাৎপর্য এখানে যে, প্লেটো রাষ্ট্রকে ব্যক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। এর অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে : ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র নয়, রাষ্ট্রের জন্য ব্যক্তি। অবশ্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চয় এই যে, রাষ্ট্র একটি যৌগিক জীবন-সংস্থা। এর প্রত্যেকটি অংশ পরস্পরনির্ভরশীল। ইংরেজিতে বললে : এ হচ্ছে একটি ‘অরগানিক হোল’, পরস্পরনির্ভর সংগঠিত সংস্থা। তাই ব্যক্তির জন্য যেমন রাষ্ট্র; রাষ্ট্রের জন্য তেমনি ব্যক্তি। একটিকে বাদদিয়ে অপরটি অস্তিত্বহীন। কিন্তু সঙ্গতির সাধক প্লেটো ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের এই পারস্পরিকতার দিকটিতে তত জোর দেননি, যত দিয়েছেন ‘ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য’–এই দিকটিতে। এ-কারণে প্লেটোর রাষ্ট্রে সাধারণ ব্যক্তি ব্যক্তিত্বহীন। দার্শনিক শাসক তার চিকিৎসক। সে তার রুগি। নিজের এবং রাষ্ট্রের মঙ্গল-অমঙ্গল, ন্যায়-অন্যায়ের সিদ্ধান্তের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যক্তি শাসকের মুখাপেক্ষী। প্লেটোর রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী এবং ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিলোপকারী রূপের মূল প্লেটোর এই বিশ্বাসে যে, রাষ্ট্র আগে, ব্যক্তি পরে। এই সত্যকে সমসাময়িক গ্রীকসমাজ অস্বীকার করার চেষ্টা করছে বলেই রাষ্ট্রের মধ্যে সংকট দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। তাই প্লেটোর এ-তত্ত্ব তাঁর ব্যক্তিগত তত্ত্বই নয়, এটি প্রাচীন গ্রীসের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের অন্যতম। এর রেশ আমরা এ্যারিস্টটলেও পাই। এ্যারিস্টটলেরও ঘোষণা : রাষ্ট্রের বাইরে কারওর অস্তিত্ব নেই। রাষ্ট্রের বাইরে বাস করতে পারে কেবলমাত্র দেবতা এবং পশু—অপর কেউ নয়।

    .

    আলোচনার এই স্থানে এ্যাডিম্যান্টাস একটা প্রশ্ন করলেন : সক্রেটিস, কেউ যদি প্রশ্ন করে, তুমি এদের অর্থাৎ আমাদের এই রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবন শোচনীয় করে তুলছ, তা হলে তুমি কী বলবে? কারণ এই নগররাষ্ট্র তো নাগরিকদের, অথচ এরা নিজেরাই নিজেদের জীবনের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপর সকলে যেখানে জমির মালিক হয়, বৃহৎ এবং মনোহর ঘরবাড়ি তৈরি করে, অন্যান্য আকর্ষণীয় দ্রব্যাদিও তারা যেখানে ভোগ করে, দেবতাদের নিকট নিজেরাই বলি উৎসর্গ করে, অতিথি সৎকার করে, স্বর্ণ এবং রৌপ্য এবং ভাগ্যবানদের মূল্যবান দ্রব্যাদি যেখানে তারা ব্যবহার করে সেখানে আমাদের রাষ্ট্রের হতভাগ্য নাগরিকগণ বেতনভুক এবং শিবিরবাসী এবং সর্বক্ষণ চৌকিরত সৈন্য ব্যতীত অপর কিছু নয়।

    আমি বললাম : এ্যাডিম্যান্টাস, ঠিকই বলেছ এবং তোমার সঙ্গে আমি আরও বলতে পারি, এদের কেবল খাদ্য পরিবেশন করা হয়, খাদ্যের অতিরিক্ত কোনো মাহিনা তাদের দেওয়া হয় না। তারা বিলাসভ্রমণে বেরুতে পারে না। তাদের হাতে এমন কোনো বাড়তি অর্থ নেই যা দিয়ে তারা কোনো সঙ্গিনীকে পুষতে পারে কিংবা আর্থিক সুখ বলতে যা বোঝায় তার কোনো সুখ তারা উপভোগ করতে পারে। বস্তুত এ্যাডিম্যান্টাস, এরূপ আরও অনেক অভিযোগ উত্থাপন করা চলে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, এই সবগুলোকেই অভিযোগ হিসাবে ধরো সক্রেটিস।

    আমি বললাম : তার মানে তোমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই সবগুলি যদি অভিযোগ হয় তা হলে এর জবাব কী হবে?

    হ্যাঁ, আমার প্রশ্ন তা-ই।

    আমি বললাম : আমরা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছিলাম, অর্থাৎ আমাদের পুরনো পথ ধরে যদি আমরা এগুই, তা হলে, আমার বিশ্বাস, এর জবাব আমরা পেয়ে যাব। এবং আমাদের সে-জবাব হবে, এই অভিযোগ সত্ত্বেও আমাদের অভিভাবক অর্থাৎ শাসকগণ সবচেয়ে সুখী ব্যক্তি বলে পরিগণিত হতে পারে। তবে এখানে একটি কথা বলা আবশ্যক : আমাদের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য অসম অনুপাতে কোনো বিশেষ শ্রেণীর সুখসৃষ্টি নয়। আমাদের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হচ্ছে সমগ্র রাষ্ট্রের সর্বাধিক সুখের সৃষ্টি করা। কারণ আমরা ভেবেছি, যে-রাষ্ট্র সমগ্রের মঙ্গলের ভিত্তিতে গঠিত সে-রাষ্ট্রেই ন্যায়ের সন্ধান লাভের সম্ভাবনা সবচেয়ে অধিক; আবার যার গঠনের মূলে অসঙ্গতি সে রাষ্ট্রেই অন্যায়ের বাস। এভাবে ন্যায় এবং অন্যায়ের সাক্ষাৎ যদি আমরা লাভ করতে পারি তা হলে এদের মধ্যে কে অধিকতর সুখী তা নির্ধারণ করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে। বর্তমানে আমরা সুখী রাষ্ট্র গঠন করছি। কিন্তু এ-গঠনকার্য আমরা খণ্ডাকারে কিংবা এর কতিপয় নাগরিককে সুখী করার ভিত্তিতে সম্পাদন করতে পারিনে; আমরা এ-রাষ্ট্রকে সংগঠিত করছি সমগ্র হিসাবে। একাজ সম্পন্ন হলে এর বিপরীত ধরনের রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে। বিষয়টিকে পরিষ্কার করার জন্য আমরা একটি দৃষ্টান্ত গ্রহণ করতে পারি। মনে করো আমরা একটি মূর্তি অঙ্কন করছি। এমন সময় একজন এসে বলল : তোমরা দেহের সবচেয়ে সুন্দর অংশসমূহে সবচেয়ে সুন্দর রং কেন ব্যবহার করছ না? তোমাদের উচিত মূর্তির চোখ দুটিকে লালরঙে রঞ্জিত করা। কিন্তু তোমরা তাকে কালো কেন করেছ? তার এমন প্রশ্নের জবাবে সঙ্গতভাবেই আমরা বলতে পারি : সুজনেষু, আপনি কি চান মূর্তির চোখ দুটিকে আমরা এত সুন্দর করে রঞ্জিত করি যেন চোখ দুটি চোখ বলেই প্রতীয়মান না হতে পারে? তার চেয়ে বরঞ্চ আপনার দেখা উচিত, মূর্তির সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের যথার্থ অনুপাত রক্ষা করে আমরা সামগ্রিকভাবে মূর্তিটিকে সুন্দর করতে পারি কি না। অনুরূপভাবে আমি তোমাকেও বলব, এ্যাডিম্যান্টাস, রাষ্ট্রের যারা অভিভাবক বা শাসক তাদেরও আমাদের এমনভাবে সুখী করা সঙ্গত হবে না, যাতে তারা আর শাসক হওয়ারই উপযুক্ত থাকতে না পারে। হ্যাঁ, যারা কৃষক তাদেরও আমরা রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত করতে পারি; তাদের মাথায় আমরা স্বর্ণমুকুট স্থাপন করতে পারি। সেইসঙ্গে তারা তাদের জমি যেমন ইচ্ছা চাষ করুক। পাত্র তৈরির কুম্ভকারকে আমরা আয়েশের গদিতে উপবিষ্ট করাতে পারি। অগ্নিকুণ্ডের পার্শ্বে উপবিষ্ট হয়ে তারা একহাতে তাদের পাত্রতৈরির চক্রকে ধারণ করে অপর হাতে সুরাপাত্র গ্রহণ করতে পারে। এমনিভাবে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণীকে সুখী করতে পারি এবং তুমি যেরূপ চাচ্ছ সেরূপে সকলকে সুখী করে সমগ্র রাষ্ট্রকে সুখী করে গঠন করতে পারি। কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস, এমন ধারণাটি তুমি আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিও না, এই আমার অনুরোধ। কারণ এরূপ ধারণার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংগঠিত হলে আমাদের রাষ্ট্রে কৃষক কৃষক থাকবে না, কুম্ভকার কুম্ভকার থাকবে না। বস্তুত রাষ্ট্রের কোনো শ্রেণীরই নিজস্ব কোনো বৈশিষ্ট্য থাকবে না। অবশ্যই রাষ্ট্রের এই বিকার এবং সত্যকারভাবে যা নয় সেরূপ প্রতিভাত হওয়ার প্রবণতা যদি কেবল চর্মকার অর্থাৎ নিকৃষ্ট শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তা হলে আমাদের উদ্বেগের কারণ তত থাকে না। কিন্তু যেখানে বিধান এবং শাসনের যারা রক্ষক তারা মাত্র দৃশ্যত রক্ষক, যথার্থ রক্ষক নয় সেখানে রাষ্ট্রের সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেতে বাধ্য। কারণ রাষ্ট্রের শান্তি এবং শৃঙ্খলা সৃষ্টি করার ক্ষমতা একমাত্র শাসকদের। আমরা চাই আমাদের রাষ্ট্রের শাসকগণ রাষ্ট্রের যথার্থ পরিত্রাতা হবে, রাষ্ট্রের ধ্বংসকারী হবে না। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষীয়গণ শাসককে ভাবছেন কোনো উৎসবে পানাহারে মত্ত কৃষক হিসাবে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব-সম্পাদনে নিযুক্ত নাগরিক হিসাবে নয়। এমন হলে আমাদের দুজনার দৃষ্টিভঙ্গি যে পৃথক, তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের থেকে যাদের ভিন্ন মত তারা এমন কিছুর কথা ভাবছে, যা রাষ্ট্র নয়। কাজেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে রাষ্ট্রের শাসক নিযুক্তিতে আমরা শাসকদের সর্বাধিক সুখের কথা নিয়ে উদ্বিগ্ন হব, না সুখকে আমরা সমগ্র রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচনা করব। এই দ্বিতীয় নীতি যদি আমাদের যথার্থ নীতি হয় তা হলে রাষ্ট্রের অভিভাবক বা শাসক, সহায়ক বা সৈন্যবাহিনী এবং অপর সকলেরই কর্তব্য হবে আপন-আপন দায়িত্ব সর্বোত্তমভাবে সাধন করা। এই নীতি অনুসরণে তাদের প্রভাবিত অথবা বাধ্য করা হবে। এই নীতির ভিত্তিতেই সমগ্র রাষ্ট্র একটি মহৎ শৃঙ্খলার মধ্যে গড়ে উঠবে এবং প্রকৃতির অনুপাত অনুযায়ী সকল শ্রেণী আপন-আপন সুখলাভে সক্ষম হবে।

    সক্রেটিস, তোমার অভিমত সঠিক বলেই আমি মনে করি।

    কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস আর একটি কথা আছে। আমি জানিনে তার সঙ্গে তুমি একমত হবে কি না।

    তুমি কী কথা বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    শিল্পের অবনতির দুটি কারণ আছে বলে আমার মনে হয়।

    কী সে-কারণ দুটি?

    আমি বললাম : সম্পদ এবং দারিদ্র্য।

    কেমন করে এরা কার্যকর হয়?

    এদের প্রভাবের ধারাটি এরূপ : যখন একজন কুম্ভকার ধনবান হয়, তুমি কি মনে কর, তখন সে আর পূর্বের ন্যায় তার শিল্পের প্রতি যত্নবান হয়?

    না, নিশ্চয়ই সে পূর্বের ন্যায় তার শিল্পের প্রতি আর যত্নবান হয় না। সে ক্রমান্বয়ে অলস এবং অসতর্ক হয়ে ওঠে।

    ঠিক কথা।

    তার ফলে সে কুম্ভকার হিসাবে পূর্বের চেয়ে নিকৃষ্ট কুম্ভকারে পরিণত হবে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, এর ফলে তার বেশ অবনতি ঘটবে।

    অপর পক্ষে যদি তার অর্থ না থাকে, যদি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাদির ব্যবস্থা করার কোনো সঙ্গতি তার না থাকে তা হলেও তার পক্ষে উত্তমরূপে কাজ করা, কিংবা তার সন্তানদের কিংবা তার অধীনস্থ অপর শিক্ষানবিশদের উপযুক্তরূপে তার শিল্পে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব হবে না।

    না, তার পক্ষে উত্তমরূপে কাজ করা সম্ভব হবে না।

    তা হলে দেখা যাচ্ছে সম্পদ কিংবা দারিদ্র্য—উভয়ের প্রভাবে শিল্পী এবং তার শিল্প, কারিগর এবং তার কর্ম—দুএরই অবনতি ঘটতে পারে। ঠিক নয় কি?

    এ তো স্পষ্ট, সক্রেটিস

    তা হলে এখানে আমরা এক নতুন রোগের সন্ধান পাচ্ছি। এ-রোগের বিরুদ্ধে আমাদের শাসকদের সতর্ক থাকতে হবে। না হলে অ-দৃষ্টভাবে আমাদের রাষ্ট্রের মধ্যে এ-রোগের অনুপ্রবেশ ঘটে যাবে।

    রোগ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    আমি বললাম : আমি সম্পদ এবং দারিদ্র্যের কথা বলছি। এর একটি বিলাস এবং আলস্যের, অপরটি নীচতা এবং ক্রুরতার জনক। এবং উভয়ই হচ্ছে অসন্তোষের উৎস।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা খুবই সত্য, সক্রেটিস। কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছি আমাদের রাষ্ট্রকে যদি আমরা যুদ্ধের সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত রাখি তা হলে কোনো ধনবান এবং পরাক্রমশালী শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের রাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষেত্রে অগ্রসর হবে কোন্ শক্তির ভিত্তিতে?

    এ-শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অসুবিধার কথা আমি অস্বীকার করিনে। কিন্তু একের বদলে তারা দুজনে হলে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।

    এ্যাডিম্যান্টাস জিজ্ঞেস করলেন : কেমন করে?

    আমি বললাম : প্রথমত আমাদের যদি যুদ্ধ করতে হয় তা হলে আমাদের পক্ষ যেখানে গঠিত হবে দক্ষ যোদ্ধাদের দ্বারা—সেখানে আমাদের প্রতিপক্ষের বাহিনী হবে সম্পদের সৈন্যবাহিনী।

    একথা ঠিক।

    তা-ই যদি হয় এ্যাডিম্যান্টাস, তা হলে তুমি কি মনে কর না একজন দক্ষ শিক্ষিত মুষ্টিযোদ্ধার পক্ষে তার প্রতিপক্ষীয় দুজন সম্পদবান অ-মুষ্টিযোদ্ধাকে সহজে পরাভূত করা সম্ভব?

    দুজন যদি একই সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা হলে আমাদের যোদ্ধার পক্ষে তত সহজ হবে না।

    আমি বললাম : কিন্তু মনে করো আমাদের যোদ্ধা প্রথমে দৌড়ে পালাল এবং তার পরে ফিরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের সম্মুখবর্তীকে আঘাত করল, তা হলে? এবং মনে করো সূর্যের খরতাপের মধ্যে আমাদের যোদ্ধা তার প্রতিপক্ষীয়কে এমনিভাবে বেশ কয়েকবার আঘাত করল। তখন দক্ষ যোদ্ধা হিসাবে তার পক্ষে বিপুলকায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভূপাতিত করা কি তেমন কষ্টকর হবে?

    না, এমন হলে তার পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধরাশায়ী করা মোটেই বিস্ময়কর কিছু হবে না।

    অথচ যারা ধনবান তারা সামরিক কলাকৌশলের চেয়ে মুষ্টিযুদ্ধের কলাকৌশলে অধিক দক্ষ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

    হ্যাঁ, তাদের মুষ্টিযুদ্ধে দক্ষ হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।

    তা হলে আমরা ধরে নিতে পারি যে, আমাদের মুষ্টিযোদ্ধা বা ক্রীড়াবিদগণ তাদের সংখ্যার চেয়ে দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ অধিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গেও লড়াইয়ে পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হবে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস। তোমার সঙ্গে আমি একমত।

    তা ছাড়া যুদ্ধের পূর্বে আর-একটা কাজ করা যেতে পারে। মনে কর আমাদের নাগরিকদের তরফ থেকে শত্রুপক্ষীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একটির কাছে দূত পাঠিয়ে আমরা সত্য কথা বললাম। আমরা বললাম : আমাদের রাষ্ট্রে স্বর্ণ কিংবা রৌপ্যের কোনো সম্পদ নেই। স্বর্ণ-রৌপ্য সংগ্রহের বিধান আমাদের নয়। কিন্তু ধনসংগ্রহের বিধান তোমাদের আছে। এসো, তোমরা এই যুদ্ধে আমাদের পক্ষ অবলম্বন করো। আমাদের সাহায্য করো। তা হলে আমাদের শত্রুপক্ষের সমস্ত ধনসম্পদ তোমরা লাভ করতে পারবে। এমন প্রস্তাব শোনার পরে এই রাষ্ট্র নিশ্চয়ই আমাদের সম্পদহীন কিন্তু দক্ষ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বদলে এই যোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে মেদবহুল তাজা মেষবৎ অপর রাষ্ট্রের যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই অধিক আগ্রহান্বিত হয়ে উঠবে।

    হ্যাঁ, এমন প্রস্তাবের পর আমাদের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ করতে না চাওয়াই সম্ভব। কিন্তু সক্রেটিস, সম্পদশালী রাষ্ট্রগুলি যদি ঐক্যবদ্ধ হয় তা হলে সে-ঐক্য সম্পদহীন আমাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি তো বেশ সহজে এই রাষ্ট্রগুলির এক-একটিকে ‘রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করছ!

    তোমার আপত্তি কী কারণে, সক্রেটিস?

    কারণ, আমাদের রাষ্ট্র ব্যতীত অপর কোনো রাষ্ট্রকেই ‘রাষ্ট্র’ বলা চলে না। তুমি এদের কাউকে ‘একটি রাষ্ট্র’ না বলে ‘একাধিক রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করতে পার। কারণ এদের কোনো একটি নগররাষ্ট্রই একটিমাত্র নগর নয়। তাদের প্রত্যেকটি বহু নগরে বিভক্ত। বস্তুত যে-কোনো নগররাষ্ট্রকে ধর-না কেন, সে যত ক্ষুদ্র হোক তবু সে নিজের মধ্যেই বিভক্ত। একদিকে সে দরিদ্রের নগর, আর একদিকে সে সম্পদবানদের নগর। একই নগরের মধ্যে এই দুই নগর : দারিদ্র্যের এবং সম্পদের নগর নিয়ত যুদ্ধমান। আর এই যুদ্ধমান পক্ষদ্বয়ের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্রতর আরও অনেক বিভাগের অস্তিত্ব বিদ্যমান। কাজেই তুমি যদি এদের কাউকে একটিমাত্র রাষ্ট্র বলে অভিহিত কর তা হলে সে-আখ্যা সত্যের নির্দেশক হবে না। অপরদিকে তুমি যদি এদের যে-কোনো রাষ্ট্রকে একের বদলে একাধিক বলে গণ্য কর এবং অভ্যন্তরের বিবদমান পক্ষসমূহের কোনো একটি পক্ষের সম্পদ, শক্তি ও সংখ্যাকে অপর পক্ষকে দিয়ে দেবার নীতি অনুসরণ কর তা হলে সে-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তোমার মিত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং তোমার শত্রুর সংখ্যা হ্রাস পাবে। অপরদিকে যে-উত্তম বিধানের ভিত্তিতে আমরা আমাদের রাষ্ট্র গঠন করেছি সেই বিধানের ভিত্তিতে আমাদের রাষ্ট্র সকল রাষ্ট্রের সেরা রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সুনাম কিংবা বহির্দৃশ্যে সে সেরা হবে, এমন কথা আমি বলেছিনে। আমাদের রাষ্ট্রের যদি সহস্রের অধিক রক্ষাকারী নাও থাকে তবু সে সেরা হবে তার কর্মগুণে এবং সত্যের কারণে। গ্রীক কিংবা বর্বর কারুর মধ্যে এরূপ ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের সাক্ষাৎ তুমি কোথাও পাবে না। হতে পারে এ-সমস্ত রাষ্ট্র আকারে আমাদের রাষ্ট্রের সমান কিংবা বহুগুণ বৃহত্তর, কিন্তু তথাপি ঐক্যের ভিত্তিতে শক্তিশালী আমাদের রাষ্ট্রের সমকক্ষ তারা নয়। এ-বিষয়ে তোমার কী মত?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তোমার কথা খুবই যথার্থ, সক্রেটিস।

    এবার তা হলে আমাদের রাষ্ট্রের আকারের কথাটি ধরো। আকার এবং ভূখণ্ডের পরিমাণের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকগণ রাষ্ট্রের সীমা কিরূপে নির্ধারণ করবে? কী পরিমাণ ভূখণ্ড আমাদের রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কোন্ পরিমাণকে অতিক্রম করা আমাদের পক্ষে সঙ্গত হবে না?

    এ ক্ষেত্রে কোন্ সীমাকে তুমি উপযুক্ত মনে কর, সক্রেটিস?

    আমি বলব, আমাদের রাষ্ট্রের ঐক্যের পরিপোষক যতখানি, আমাদের রাষ্ট্রের সীমা ততখানি হবে। তার অধিক নয়। এই সীমাকেই আমি সঠিক সীমা মনে করি।

    উত্তম প্রস্তাব।

    এখানে তা হলে আর-একটা বিধানের প্রশ্ন আসে। আমাদের শাসকবর্গের জন্য তা হলে এই বিধান নির্দিষ্ট হবে : আমাদের রাষ্ট্র বৃহৎ কিংবা ক্ষুদ্র হবে না; আমাদের রাষ্ট্র হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমাদের শাসকদের জন্য এ-বিধান নিশ্চয়ই কোন কঠিন বিধান নয়।

    আমি বললাম : তা যদি হয় তা হলে অপর যে-বিধানের কথা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি সে-বিধান অধিকতর সহজ। শাসকের সন্তান যদি অধঃগুণের হয় তা হলে তাকে অধঃস্তরে স্থাপন এবং যদি অধঃশ্রেণীর সন্তানের মধ্যে উত্তমগুণের সাক্ষাৎ মেলে তা হলে তাকে উচ্চতর শ্রেণীতে স্থাপন করার দায়িত্বের কথা বলছি। এ নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে প্রত্যেককে প্রকৃতিদত্ত গুণের ভিত্তিতে যার যে স্থান তাকে সেই স্থানে স্থাপন করা। এবং একজন নাগরিককে একটি দায়িত্বে নিযুক্ত করা। কারণ তা হলেই প্রত্যেকে আপন দায়িত্বপালনে সক্ষম হবে। তখন এক ব্যক্তি একজন ব্যক্তি হিসাবেই বিবেচিত হবে, বহু নয়। আমাদের রাষ্ট্রও তখন যথার্থভাবে একটি রাষ্ট্রের রূপ গ্রহণ করবে, একাধিক রাষ্ট্রে সে বিভক্ত হবে না।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, এ-নীতিও তেমন শক্ত কোনো নীতি নয়। প্রিয় এ্যাডিম্যান্টাস, যেসব নীতির কথা আমরা বলছি এগুলি বিরাট নীতি নয় ঠিকই। এগুলিকে আমরা একটি নীতিরই অংশ বলতে পারি। সে-নীতি বৃহৎ না হতে পারে, কিন্তু সে-নীতি আমাদের জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত।

    কোন্ নীতির অংশ বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    আমি বললাম : আমাদের নীতি হচ্ছে, শিক্ষা এবং প্রতিপালনের নীতি কারণ, আমাদের রাষ্ট্রের নাগরিকগণ যদি যথার্থরূপে শিক্ষিত হয় এবং বুদ্ধিমান মানুষরূপে তারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় তা হলে এই সমস্ত প্রয়োজনের কথা এবং বিবাহ কিংবা নারীর উপর স্বামিত্ব এবং সন্তানের উৎপাদন প্রভৃতি যেসব বিষয়ের আমরা এখানে উল্লেখ করছিনে, সকল দ্রব্যের উপর বন্ধুজনের যৌথ-স্বত্বের নীতির যা অনুসিদ্ধান্ত, সে সব বিষয়ও তাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সহজ হবে।

    হ্যাঁ, এ সব সমস্যার সমাধানের সেটাই হচ্ছে সর্বোত্তম উপায়।

    তা ছাড়া রাষ্ট্রটাকে তুমি যদি উত্তমরূপে একবার চালু করে দিতে পার তা হলে আপন গতির শক্তিতে নিজের চাকার ওপর ভর করে সে তার পরে আপনিই চলতে থাকবে। কারণ উত্তম শিক্ষা এবং প্রতিপালন মানুষের মধ্যে উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। আবার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উত্তম শিক্ষার মাধ্যমে দৃঢ়মূল হয়ে ক্রমান্বয়ে অধিকতর উন্নত হয়ে ওঠে। চরিত্রের উন্নতি বংশধারাকেও উন্নত করে তোলে। একথা অপরাপর পশুর ক্ষেত্রে যেমন সত্য, মানুষের ক্ষেত্রেও তেমনি সত্য।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : এমন হওয়া খুবই সম্ভব।

    এবার আমরা তা হলে সারসংক্ষেপ হিসাবে বলতে পারি : আমাদের রাষ্ট্রের শাসকদের দৃষ্টি সর্বোপরি নিবদ্ধ থাকবে এই লক্ষ্যে যেন সঙ্গীত এবং শরীরচর্চার কোনো বিকৃতি ঘটতে না পারে, যেন এদের বিশুদ্ধ বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হয় এবং কোনো নূতন উদ্ভাবনের প্রশ্রয় না ঘটে। শাসকগণ সর্বতোভাবে সঙ্গীত ও শরীরচর্চার বিশুদ্ধ রীতিকে রক্ষা করবে। যদি কেউ হোমারকে উদ্ধৃত করে বলে : ‘গায়কদের কণ্ঠে সবচেয়ে নূতন সঙ্গীতই সর্বাধিক যত্নের সঙ্গে গীত হয়’* তা হলে শাসকদের মনে করতে হবে তার এই প্রশংসা কোনো নূতন সঙ্গীতের নয়, এ-প্রশংসা নূতন ধরনের কোনো সঙ্গীতের। কিন্তু কবির বাক্যে নূতন ধরনের কোনো সঙ্গীতের প্রশংসা আরোপ করা আমাদের পক্ষে উচিত হবে না। কারণ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন সমগ্র রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। আর তাই তেমন উদ্ভাবনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। দামনের বাণীতে আমি এই শিক্ষাই লাভ করেছি। দামন বলেছেন : সঙ্গীতের নীতি যখন পরিবর্তিত হয় তখন অনিবার্যভাবে রাষ্ট্রের মৌলিক বিধানসমূহও তৎসঙ্গে পরিবর্তিত হয়।

    [*হোমার : ওডিসি]

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : ঠিক কথা সক্রেটিস। এ-বিষয়ে দামনের পক্ষে তোমার যেমন সমর্থন, আমারও তেমনি।

    আমি বললাম : তা হলে আমাদের শাসকবৃন্দকে সঙ্গীতের মধ্যেই তাদের দুর্গের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে?

    হ্যাঁ, সক্রেটিস। কারণ, যে-অরাজকতার কথা তুমি বলেছ তা সহজে এবং সঙ্গোপনেই অনুপ্রবেশ করে।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, প্রথমে মনে হয় এতে ক্ষতি কী? কিন্তু ক্ৰমান্বয়ে অল্প করে উচ্ছৃঙ্খলতার এই মনোভাব সঙ্গোপনে আমাদের আচরণে এবং রীতিতে আশ্রয় গ্রহণ করে। এখান থেকে এই উচ্ছৃঙ্খলতা অধিকতর শক্তি সংগ্রহ করে মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রকে আক্রমণ করে। সম্পর্কের ক্ষেত্র থেকে এই অরাজকতা দুর্বারভাবে রাষ্ট্রের বিধান এবং সংগঠনে বিস্তারিত হয়ে পরিশেষে ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় সকল অধিকারকে ধ্বংস করে ফেলে।

    আমি বললাম : এ্যাডিম্যান্টাস, তোমার এ কথা সত্য?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমার তা-ই বিশ্বাস, সক্রেটিস।

    তা হলে আমি যেমন বলছিলাম, আমাদের যুবকদের গোড়া থেকেই কঠিন শৃঙ্খলার মধ্যে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। কারণ আমোদ-প্রমোদ যদি উদ্দাম হয়ে ওঠে এবং যুবকরা যদি উচ্ছৃঙ্খল হয় তা হলে তাদের পক্ষে সুশৃঙ্খল এবং ন্যায়পরায়ণ নাগরিক হিসাবে গড়ে ওঠা কখনোই সম্ভব হবে না।

    তোমার কথা খুবই সত্য, সক্রেটিস।

    আর আমাদের যুবকগণ যদি তাদের আমোদ-প্রমোদও সুন্দরভাবে শুরু করতে পারে এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে নিয়মকে যদি তারা তাদের জীবনের আচরণে পরিণত করতে সক্ষম হয় তা হলে সব কর্ম এবং বুদ্ধিতেই এই শৃঙ্খলাবোধ তাদের নিত্যসঙ্গী হিসাবে বিরাজ করবে। ফলে রাষ্ট্রের মধ্যে কোথাও কোনো অপূর্ণতা থাকলে তাকে পূর্ণ করে তুলতেও তারা সক্ষম হবে।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    এরূপে শিক্ষিত হয়ে উঠলে তাদের পূর্ববর্তীগণ যদি কোনো অপ্রধান বিধান প্রবর্তন নাও করে থাকে তবু তাকে প্রবর্তন করতে তরুণদের কোনো অসুবিধা হবে না।

    তোমার এ কথার কী অর্থ, সক্রেটিস?

    বিধান বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি, ছোটরা বড়দের সামনে কখন্ নীরব থাকবে, বয়োজ্যেষ্ঠরা এলে কেমন করে ছোটরা দাঁড়িয়ে তাদের সম্মান দেখাবে এবং তাদের উপবেশনে সাহায্য করবে, পিতামাতাকে কীরূপে সম্মান করতে হবে, পরিধানের পরিচ্ছদ কিংবা পাদুকা কেমন হবে, কেশবিন্যাসের ধরন কীরূপ হবে : অর্থাৎ তরুণদের সাধারণ আচার-আচরণ কীরূপ হবে তার বিধান। এ-বিষয়ে তুমি কি আমার সঙ্গে একমত, এ্যাডিম্যান্টাস?

    হ্যাঁ সক্রেটিস, আমি তোমার সঙ্গে একমত।

    কিন্তু এসবের উপর আইন-প্রণয়নের খুব প্রয়োজন পড়ে না। তা ছাড়া এর উপর লিখিত কোনো বিধান যে খুব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এমনও আমার মনে হয় না।

    না, এর ওপর বিধান প্ৰণয়ন অসম্ভব।

    এ্যাডিম্যান্টাস, আমার মনে হয়, শিক্ষা মানুষের জীবনকে কীভাবে শুরু করে দেয় তার উপরই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। কেননা সদৃশ কি সর্বদা সদৃশকে আকর্ষণ করে না?

    নিঃসন্দেহে।

    এটা একটা পরিক্রমার ব্যাপার। একটা পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত এ অগ্রসর হতে থাকে। পরিণতি অবশ্য উত্তম কিংবা তার বিপরীতও হতে পারে।

    হ্যাঁ, একে অস্বীকার করার কারণ নেই।

    আর এ-কারণে এসব খুঁটিনাটির ক্ষেত্রে অধিক আর কোনো বিধান আমি নির্দিষ্ট করতে চাইনে।

    তা-ই সঙ্গত।

    কিন্তু বিকিকিনির স্থানের ব্যাপারে, মানুষে মানুষে সাধারণ আদান-প্ৰদান কিংবা কারিগরদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে, কারুর অপমান এবং আঘাত অথবা কোনো কাজ শুরু করা অথবা বিচারকমণ্ডলীর সভ্য নিয়োগের প্রশ্নে তুমি কী বলবে? বাজারে কর আরোপ এবং আদায় করা, শান্তিরক্ষার জন্য পুলিশ নিযুক্ত করা, বন্দরের নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতির জন্যও তো আইন-প্রণয়নের প্রশ্ন আছে। কাজেই আমরা কী করব? এই সমস্ত বিষয়ে কি আমরা আইন-প্রণয়ন করব?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমার মনে হয় উত্তম মানুষের জন্য এসব বিষয়ে কোনো আইন-প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। এসব বিষয়ে যে-সমস্ত নীতির আবশ্যক হবে তা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে।

    নিশ্চয়ই, প্রিয় এ্যাডিম্যান্টাস। কেবল বিধাতা যদি আমাদের মূল বিধানগুলি মান্য করার সুমতি তাদের দেন।

    তা তো বটেই। বিধাতার সহায়তা ব্যতীত তারা তাদের জীবনকে ত্রুটিশূন্য করার আশায়, চিরকাল কেবল আইন-প্রণয়ন এবং আইন-সংশোধনই করতে থাকবে।

    তুমি এদের সেই অক্ষমদের সঙ্গে তুলনা করতে পার যারা আত্মসংযমের অভাবে উচ্ছৃঙ্খলতাকে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হয় না।

    খুবই সত্য কথা।

    হ্যাঁ, কিন্তু কী অদ্ভুত আনন্দের জীবন তারা যাপন করছে দ্যাখো। তারা কেবল নিরাময়ের কথা ভাবছে, কেবল চিকিৎসাপ্রণালীর পরিবর্তন করছে এবং কেবল তাদের রোগসমূহের জটিলতা বৃদ্ধি করছে। পরিণামে তাদের রোগ-নিরাময়ের আশ্বাস দিয়ে যে-কেউ যে-কোনো টোটকার সন্ধান দিক-না কেন তাকেই তারা বিশ্বাস করে।

    রোগে অক্ষম ব্যক্তিদের মধ্যে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।

    হ্যাঁ, আর মজার ব্যাপার হল কেউ যদি তাদের সত্য কথা বলে, যদি বলে যে তাদের পানাহারের অসংযম, যুবতীর-আসক্তি এবং আলস্যে সময়ক্ষেপণের স্বভাব যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পরিত্যাগ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ঔষধ, তপ্ত লোহার দহন, মন্ত্র বা মাদুলি – কোনোকিছুই তাদের কোনো উপকারসাধন করতে পারবে না, তখন তাকেই তারা তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে বিবেচনা করে।

    অদ্ভুত তাদের আচরণ। যে তোমাকে সত্য বলছে তার ওপর ক্ষিপ্ত হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে, আমি বুঝিনে।

    যা-ই হোক, এমতো ভদ্রলোকদের তোমার নিশ্চয় পছন্দ নয়?

    অবশ্যই নয়।

    শুধু ব্যক্তি নয়, যে-রাষ্ট্র এরূপ মানুষের ন্যায় আচরণ করে তাকেও নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা করবে না। অথচ এরূপ রাষ্ট্রের তো অভাব নেই যেখানে নিয়ম-শৃঙ্খলার অস্তিত্ব নেই, কিন্তু চরমদণ্ডের হুমকি দিয়ে সেখানে সংবিধানের সব সংশোধন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তথাপি যারা এই রাষ্ট্রের রাজত্বে বাসকারীকে স্তোকবাক্যে তুষ্ট করে, তোষামোদে তাদের মন জয় করার চেষ্টা করে এবং তাদের খেয়ালখুশিকে চরিতার্থ করে তাদেরই বিরাট রাজনীতিজ্ঞ বলে গণ্য করা হয়। যেরূপ মানুষের বিবরণ আমি একটু পূর্বে দিয়েছি তার সঙ্গে কি এই রাষ্ট্রের সাদৃশ্য নেই?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : অবশ্যই আছে। আর সেই মানুষ যেমন অধম, এই রাষ্ট্রও তেমনি অধম। এমন রাষ্ট্রকে আমি আদৌ প্রশংসা করতে পারিনে।

    কিন্তু এই রাজনৈতিক-দুর্নীতি পরিপোষকদের প্রশান্তভাব এবং দক্ষতাকে নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসা না করে পারবে না।

    হ্যাঁ, তাদের দক্ষতার প্রশংসা করতে হয় বটে। তবে তাদের সকলের প্রশংসা করা চলে না। কারণ এদের মধ্যে অনেকে আছে যারা জনতার হর্ষধ্বনিতে মূর্খের ন্যায় বিশ্বাস করে যে, তারা সত্যই রাজনীতিজ্ঞ। এমন লোকের বুদ্ধির প্রশংসা করা চলে না।

    কেন এ্যাডিম্যান্টাস? এমন লোকের জন্য তো তোমার করুণা হওয়া উচিত। যে-মানুষ নিজে পরিমাপ করতে জানে না এবং তার যে-পারিষদগণও নিজেরা পরিমাপ করতে পারে না, তারা যখন তাকে বলে যে সে চার হাত উঁচু তখন তার বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় কী?

    না, এমন ক্ষেত্রে তার বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় থাকে না।

    তা হলে এমন লোকের ওপর আমাদের ক্রোধান্বিত হওয়া সঙ্গত নয়। এরা আনাড়ি বই আর কিছু নয়। কারণ এরা তুচ্ছ সংস্কার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। তাদের কল্পনা, আইন করেই তারা চুক্তির প্রতারণা কিংবা মানুষের অন্য সব শঠতাকে নির্মূল করতে পারবে। অথচ তারা জানে না, এ তাদের বৃথা চেষ্টা। বহুশিরবিশিষ্ট রাক্ষসের মাথায় আঘাত করা ব্যতীত এ কিছুই নয়।

    হ্যাঁ, তাদের এ-চেষ্টাকে সেরূপ মনে হয়।

    আমার মনে হয়, যে যথার্থ আইন প্রণয়নকারী সে অধম কিংবা উত্তম কোনো রাষ্ট্রেই এরূপ আইনের প্রণয়ন কিংবা সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করবে না। কারণ অধম রাষ্ট্রে এরূপ চেষ্টা অর্থহীন এবং উত্তম রাষ্ট্রে এরূপ আইন-প্রণয়ন অপ্রয়োজনীয়। এবং এ-আইনের অনেকগুলি আমাদের মূল বিধান থেকে স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে আসবে।

    তা-ই যদি হয়, সক্রেটিস, তা হলে আইন-প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমাদের আর কী করণীয় থাকবে?

    আমি উত্তর দিলাম : আমাদের আর করণীয় কিছুই নেই। কিন্তু ডেলফীর দেবতা এবং এ্যাপোলোর করণীয় আছে। তাঁদের এবার সবচেয়ে বৃহৎ, সবচেয়ে মহৎ এবং সবচেয়ে প্রধান কাজ সম্পাদন করতে হবে।

    কী সে-কাজ?

    তাঁদের কাজ হচ্ছে মন্দির-স্থাপনা, মন্দির-দেবতাদের উদ্দেশে বলিদান, দেবতা, উপদেবতা এবং প্রধান দেবতাদের উপঢৌকনের ব্যবস্থা করা। তা ছাড়া মৃতদের কোথায় সমাহিত করা হবে এবং মৃতের মঙ্গলের জন্য পাতালপুরীর অধিবাসীদের তুষ্টি সাধন কেমন করে করতে হবে, এসবও দেবতাদের স্থির করে দিতে হবে। এ-সমস্ত বিষয়ে আমরা নিজেরা অজ্ঞ। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে আমাদের পৈতৃক দেবতা ব্যতীত অপর কোনো ব্যাখ্যাদাতার হাতে এসব ব্যাপার ছেড়ে দেওয়া আমাদের পক্ষে বিজ্ঞের কাজ হবে না। এ-সমস্ত জটিল বিষয়ে একমাত্র ব্যাখ্যাদাতা হচ্ছেন এ্যাপোলো। তিনি মর্ত্যের কেন্দ্রভূমিতে স্থাপিত তাঁর আসন থেকে এ-সমস্ত বিষয়ের মীমাংসা করে থাকেন।

    এ বিষয়ে তোমার কথাই ঠিক, সক্রেটিস। এক্ষেত্রে তুমি যেমন প্রস্তাব করছ তেমনই করা হবে।

    কিন্তু আমার প্রশ্ন, এ্যারিস্টন-পুত্র প্রিয় এ্যাডিম্যান্টাস, এসবের মধ্যে ন্যায় কোথায়? আমাদের রাষ্ট্রকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করেছি। সে এখন অধিবাসী অধ্যুষিত। এ্যাডিম্যান্টাস, এবার তোমার ভ্রাতাকে এবং পলিমারকাসকে এবং অপর সকলকে আহ্বান করো। এসো, আমরা একটি মোমদণ্ড প্রজ্জ্বলিত করি এবং আমাদের রাষ্ট্রে ন্যায়ের অন্বেষণ আরম্ভ করি। আমাদের অনুসন্ধান করে বার করতে হবে, কোথায় ন্যায় এবং কোথায় অন্যায়। আমাদের স্থির করতে হবে এ দুই-এর মধ্যে পার্থক্য কোথায়।

    গ্লকন বলে উঠলেন : একী কথা সক্রেটিস? ন্যায়ের অন্বেষণ তুমি নিজে করবে। তুমি তো আমাদের সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলে। তুমি বলেছিলে ন্যায়কে সাহায্য না করা তোমার পক্ষে পাপের বাড়া হবে।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, আমি সেকথা অস্বীকার করছিনে, গ্লকন। আমি অবশ্যই আমার প্রতিশ্রুতি পালন করব। কিন্তু তোমাদের সকলকেও আমার সঙ্গে যোগ দিতে হবে।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, আমরা তাতে সম্মত আছি।

    এসো, তা হলে আমরা সন্ধানের কাজটি শুরু করি। আমাদের সন্ধানের পথটি হবে এরূপ : আমরা ধরে নেব আমাদের রাষ্ট্র যদি সঠিকভাবে সংগঠিত হয়ে থাকে তবে সে সুসম্পূর্ণ, সে সর্বোত্তম।

    নিঃসন্দেহে।

    এবং যেহেতু সে ত্রুটিশূন্য, সর্বোত্তম কাজেই সে প্রাজ্ঞ, সে নির্ভীক, সে সংযমী এবং সে ন্যায়বান।

    সে-সম্পর্কেও কোনো সন্দেহ নেই।

    এবং রাষ্ট্রের মধ্যে এ-গুণগুলির কয়েকটিকে যদি আমরা চিহ্নিত করতে পারি তবে অবশিষ্টকেই আমরা আমাদের অন্বিষ্ট বলে গণ্য করব।

    খুব ভালো কথা, সক্রেটিস। তারপর?

    ধরো চারটি জিনিস আছে। আমরা এদের একটিকে অন্বেষণ করে বার করতে চাই। এক্ষেত্রে হতে পারে যে, আমার অন্বিষ্ট বস্তুটিকে আমি পূর্ব থেকেই চিনি। তেমন হলে আমার কোনো অসুবিধা হবে না। অথবা এমন হতে পারে, আমি তিনটিকে চিনি কিন্তু অন্বেষিত বস্তুটিকে নয়। তা হলে তিনটি নির্দিষ্ট হবার পরে যেটি অবশিষ্ট থাকবে সেটিই আমার অন্বেষিত বস্তু হবে। ঠিক নয় কি?

    অবশ্যই ঠিক।

    তা-ই যদি হয় তা হলে গুণ বা ধর্মের ক্ষেত্রেও আমাদের অন্বেষণের পদ্ধতিটি কি একই হবে না? এবং এক্ষেত্রেও যখন গুণের সংখ্যা চার?

    হ্যাঁ, স্পষ্টতই একই পদ্ধতি আমরা অনুসরণ করব।

    রাষ্ট্রের গুণের মধ্যে প্রথমে আমাদের নজরে পড়ে জ্ঞান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়।

    কী বৈশিষ্ট্য?

    বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে এই যে, আমাদের বর্ণিত রাষ্ট্র যথার্থই জ্ঞানী। কারণ আমাদের রাষ্ট্রের বিবেচনা উত্তম।

    খুবই সত্য কথা।

    কারণ, উত্তম বিবেচনা অজ্ঞানতা থেকে নয়, কেবল জ্ঞান থেকেই উদ্ভূত হতে পারে। মানুষ জ্ঞানের ভিত্তিতে উত্তম বিবেচক হয়।

    স্পষ্টত তা-ই।

    কিন্তু রাষ্ট্রে জ্ঞানের প্রকারভেদ আছে। জ্ঞান বহু প্রকারের হতে পারে। অবশ্যই।

    যেমন সূত্রধরের জ্ঞান। কিন্তু এ-জ্ঞানের ভিত্তিতে কি আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে জ্ঞানী এবং সুবিবেচক বলে অভিহিত করতে পারি?

    না, এ-জ্ঞানের জন্য রাষ্ট্রকে আমরা জ্ঞানী বলতে পারিনে। এ-জ্ঞান রাষ্ট্রকে আসবাবপত্রের নির্মাণে দক্ষতার সুনাম দান করতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী নয়।

    তা হলে কাষ্ঠদ্রব্যাদি নির্মাণে সুবিবেচনা বা দক্ষতা থাকার কারণে আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে জ্ঞানী বলতে পারিনে।

    নিশ্চয়ই না।

    কিংবা পিত্তল পাত্রাদি নির্মাণের দক্ষতা কিংবা অনুরূপ অপর কারণে আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে জ্ঞানী বলতে পারিনে।

    না, এরূপ কোনো কারণে আমরা তাকে জ্ঞানী বলতে পারিনে।

    কিংবা জমিকর্ষণের দক্ষতার কারণেও পারিনে। সেক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্র কৃষিরাষ্ট্র বলে অভিহিত হবে।

    হ্যাঁ, তা-ই।

    তা-ই যদি হয়, তা হলে আমাদের এই নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের নাগরিকদের কারুর মধ্যে এমন কোনো জ্ঞানের সাক্ষাৎ কি আমরা পাই, যে-জ্ঞান বা দক্ষতা কোনো বিশিষ্ট বিষয়ে নয়, সমগ্র রাষ্ট্রের ব্যাপারে, অপর রাষ্ট্রের সঙ্গে এর সম্পর্কের বিষয়ে এবং তার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করতে পারে?

    এমন জ্ঞান নিশ্চয়ই আছে।

    আমি জিজ্ঞেস করলাম : কী সে জ্ঞান গ্লকন এবং কার মধ্যে আমরা তার সাক্ষাৎ পেতে পারি?

    গ্লকন বললেন : সে-জ্ঞান হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রের অভিভাবক বা শাসকদের জ্ঞান এবং এর সাক্ষাৎ সর্বোত্তম শাসকদের মধ্যেই পেতে পারি। যাদের বিষয়ে আমরা একটু পূর্বে আলোচনা করছিলাম।

    এবং এই জ্ঞানের কারণে আমাদের রাষ্ট্রকে আমরা কী বলে অভিহিত করতে পারি?

    আমরা তাকে যথার্থ জ্ঞানী এবং সুবিবেচক রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করতে পারি।

    কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে কাদের সংখ্যা অধিক? যথার্থ শাসকদের কিংবা কর্মকারদের?

    কর্মকারদের সংখ্যাই আবশ্য অনেক বেশি হবে।

    জ্ঞানের প্রকারভেদের ভিত্তিতে যে-শ্রেণীভেদ সেখানে তা হলে শাসকদের শ্রেণী কি সংখ্যায় সবচেয়ে ক্ষুদ্র হবে না?

    অবশ্যই সংখ্যায় তা সবচেয়ে ক্ষুদ্র হবে।

    তা হলে রাষ্ট্রের এই অংশ বা ক্ষুদ্র শ্রেণীর জ্ঞানের কারণেই আমাদের রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে জ্ঞানী বলে অভিহিত হবে। কারণ, প্রকৃতির বিধানে সকল শ্রেণীর মধ্যে ক্ষুদ্রতম এই শ্রেণীর মধ্যেই মাত্র যথার্থ জ্ঞানের অবস্থান ঘটতে পারে।

    খুবই সত্য কথা সক্রেটিস।

    আমি বললাম : তা হলে আমাদের চারটি গুণের মধ্যে একটির অবস্থান এবং চরিত্র আমরা কোনোপ্রকারে আবিষ্কার করতে পেরেছি, একথা বলতে পারি?

    সক্রেটিস, আমি তো বলব, কাজটি আমরা সন্তোষজনকভাবেই করেছি।

    এবার আমরা সাহসিকতা বা বিক্রমের বিষয়টি আলোচনা করতে পারি। কিন্তু সাহসিকতা বা বিক্রমের চরিত্র কী এবং তার কোন্ অবস্থানের জন্য একটি রাষ্ট্র সাহসী বা বিক্রমশালী বলে অভিহিত হয় সেটি নির্ধারণ করা খুব কঠিন কিছু নয়।

    কেমন করে কঠিন নয়, সক্রেটিস?

    আমি বললাম : কেন গ্লকন, একটি রাষ্ট্র তো সাহসী কিংবা কাপুরুষ বলে অভিহিত হয় যারা সে রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে যায় এবং লড়াই করে, তাদের কারণেই?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক। অপর কোনো কারণে একটি রাষ্ট্রকে এরূপ অভিহিত করা চলে না।

    রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকগণও সাহসী কিংবা ভীরু হতে পারে কিন্তু তাদের সাহস কিংবা ভীরুতার কারণে রাষ্ট্র সাহসী কিংবা ভীরু বলে পরিচিত হবে না। ঠিক নয় কি?

    না, তা নিশ্চয়ই হবে না।

    তা হলে আমাদের নগরী সাহসী হচ্ছে তার নাগরিকদের সেই অংশের কারণে যে-অংশ রাষ্ট্রের শিক্ষার ভিত্তিতে সকল অবস্থার মধ্যেই তাদের সাহস এবং ভীরুতার জ্ঞানকে ধারণ করে। একেই তো আমরা সাহস বলি?

    সক্রেটিস, তোমার কথাটি আর একবার বলো। কারণ আমার মনে হয় না তোমার কথাকে আমি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছি।

    আমি বলছি : সাহস হচ্ছে কিছু ধারণ করা, কিছু রক্ষা করা।

    কাকে ধারণ করা, সক্রেটিস?

    ধারণ করা হচ্ছে, কাকে ভয় করতে হবে, কেন ভয় করতে হবে প্রভৃতি বিষয়ের যে-জ্ঞান রাষ্ট্র তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিককে দান করেছে সেই জ্ঞানকে ধারণ করা এবং তাকে পরিত্যাগ না করা। ‘সকল অবস্থার মধ্যে কথাটি দ্বারা আমি সকল ভয়-ভীতি, আনন্দ, আকর্ষণ ও যন্ত্রণা-নির্বিশেষে সেই জ্ঞানকে বিস্মৃত না হওয়াকে বোঝাতে চেয়েছি। তোমাকে একটি দৃষ্টান্ত দিই, গ্লকন?

    দাও।

    তুমি নিশ্চয়ই দেখেছ, যে রং করে অর্থাৎ যে রঞ্জক সে যখন পশমকে সমুদ্রের নীল-লোহিতে রঞ্জিত করতে চায় তখন তার রং-নির্বাচন শুরু হয় সাদা থেকে। এই সাদার পটভূমিটি সে যথেষ্ট যত্ন এবং পরিশ্রমসহকারে তৈরি করে যেন সাদা ভূমিতে নীল-লোহিতটি উত্তমভাবে খোলে। এই প্রস্তুতির পরে রং করার কাজটি অগ্রসর হয়। এই পদ্ধতিতে তুমি যে-কোনোকিছুই রং কর-না কেন, তোমার রং স্থায়ী। এর পর একে ক্ষারের পানি কিংবা ক্ষারশূন্য পানি—যার মধ্যেই ধোও-না কেন রঙের সৌন্দর্যটি বিনষ্ট হবে না। কিন্তু ভূমিকাটি যদি উপযুক্তভাবে প্রস্তুত করা না হয়, তা হলে নিশ্চয়ই দেখেছ, নীললোহিত কিংবা অপর কোনো রংই খোলে না। রং কেমন নিষ্প্রভ দেখায়। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক। আমি জানি, এরূপ হলে রংগুলোকে কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া এবং অদ্ভুত বলে মনে হয়।

    আমি বললাম : গ্লকন, এবার তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমাদের রাষ্ট্রে সৈন্যদের বাছাই করা এবং তাদের সঙ্গীত ও শরীরচর্চায় শিক্ষিত করার উদ্দেশ্য আমাদের কী ছিল। আমরা একটি পটভূমি প্রস্তুত করছিলাম যার উপর আমাদের রাষ্ট্রীয় বিধানের রং উজ্জ্বলভাবে খুলবে। ভীতি কাকে বলে কিংবা এ-সম্পর্কিত অন্য ধারণার রংও এমন পাকা হয়ে যাবে যে কোনো সোডা বা ক্ষারের চেয়ে ধুয়ে ফেলার অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্দাম আনন্দরূপ ক্ষারে কিংবা দুঃখ, ভীতি বাসনারূপ সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দ্রাবক রসে নিমজ্জিত হলেও এ-অভিমতের রং মুছে যাবে না। আর এই যে প্রকৃত এবং অলীক বিপদ সম্পর্কে রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী যথার্থ অভিমতকে ধারণ করার ক্ষমতা—একেই আমি সাহস বলে অভিহিত করেছি। আমি জানিনে তুমি এর সঙ্গে একমত হবে কি না।

    গ্লকন বললেন : আমি তোমার সঙ্গে একমত সক্রেটিস। কারণ আমার মনে হয় ‘সাহস’ থেকে যাকে তুমি বাদ দিতে চাচ্ছ সে পশু কিংবা দাসের অজ্ঞান সাহস। তুমি মনে করছ, রাষ্ট্রের আইন এরূপ সাহসের পরিপোষক নয়। এ কারণে এ-সাহসের অপর কোনো নাম থাকা সঙ্গত?

    অবশ্যই।

    তা হলে তুমি যাকে সাহস বলছ, তাকেই আমাদের সাহস বলে অনুমোদন করতে হয়।

    আমি বললাম : তা বটে, তবে এর সঙ্গে ‘একজন নাগরিকের’ কথাটি যোগ করতে পার—অর্থাৎ ‘একজন নাগরিকের সাহস’। তোমার এ-অনুমান খুব ভুল হবে না। পরবর্তীকালে তুমি চাইলে বিষয়টির অধিকতর আলোচনা করা যাবে। তবে এই মুহূর্তে যাকে আমরা অন্বেষণ করছি সে সাহস নয়। সে ‘ন্যায়’। আমাদের বর্তমান প্রয়োজনের দিক থেকে ‘সাহস’ সম্পর্কে যথেষ্ট বলা হয়েছে।

    সক্রেটিস, এ-বিষয়ে তুমি ঠিকই বলেছ।

    আমাদের রাষ্ট্রে এখনও দুটি গুণের নির্ধারণ বাকি আছে। একটি সংযম, অপরটি আমাদের অনুসন্ধানের শেষ লক্ষ্য : ন্যায়।

    যথার্থ।

    কিন্তু সংযমের চিন্তা না করে আমরা কি ন্যায়কে আবিষ্কার করতে পারি?

    গ্লকন বললেন : আমি জানিনে সেটি করা সম্ভব কি না। তবে আমিও চাইনে যে ন্যায়ের আবিষ্কারে আমাদের দৃষ্টি সংযম থেকে ভ্রষ্ট হয়ে যাক। আর সেজন্য আমার ইচ্ছা, সক্রেটিস, তুমি সংযমের আলোচনাটি প্রথমে সেরে নেবে।

    নিশ্চয়ই, তোমার যখন তেমন ইচ্ছা, তখন তোমার অনুরোধকে আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারিনে গ্লকন।

    তা হলে আলোচনাটি শুরু করো।

    হ্যাঁ, আমি শুরু করছি। যতটা আমি বুঝতে পারি তাতে আমার মনে হয়, সংযমের মধ্যে ঐকতান এবং সঙ্গতির স্বভাব অপর গুণের চেয়ে অধিক।

    কেমন করে সক্রেটিস?

    আমি বললাম : সংযম কাকে বলবে? বিশেষ কতগুলি আনন্দ এবং কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করাকে আমরা সংযম বলি। ‘যার প্রভু সে’–এই কথাটির মধ্যেও সংযমের এই অর্থটি নিহিত আছে। ভাষার ব্যবহারেও আমরা এই ধারণার আভাস পাই।

    একথা ঠিক।

    ‘যার প্রভু সে অথবা যে যার প্রভু’ এ কথার মধ্যে একটা অর্থের বৈপরীত্য আছে। কারণ যে প্রভু সে তো একই সময়ে অপর কারু সেবক বা দাসও বটে; এবং যে সেবক সে আবার কারুর প্রভু। কাজেই এখানে পরিচারক ও প্রভু বলতে একই ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে।

    হ্যাঁ, একথাও ঠিক।

    এরূপ কথার অর্থ আমার মনে হয় এই যে, মানুষের আত্মার দুটি ভাগ আছে : একটি তার উত্তম ভাগ, অপরটি তার অধম ভাগ। আত্মার উত্তম ভাগ যখন তার অধম ভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে তখন আমরা কোনো মানুষ সম্পর্কে মন্তব্য করি : ‘সে নিজেই তার প্রভু’। এরূপ মন্তব্য তার প্রশংসাসূচক। কিন্তু অসৎসঙ্গ এবং অসৎশিক্ষার কারণে মানুষের আত্মার ক্ষুদ্রতর অর্থাৎ তার উত্তম ভাগ যখন অধমের অধীনে চলে যায় তখন আমরা এমন ব্যক্তিকে নিজের দাস এবং নীতিহীন বলে আখ্যায়িত করি।

    হ্যাঁ, এমন বলার যুক্তি আছে।

    এবার আমাদের নব প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রতি আমরা দৃষ্টি দিই, তা হলে সেখানেও এই দুটি অবস্থার একটিকে বাস্তবায়িত হতে দেখি। কারণ ‘সংযম’ এবং ‘নিজের প্রভু’ এই কথা দ্বারা যখন অধমের উপর উত্তমের শাসন বোঝায় তখন আমাদের রাষ্ট্রকে ‘নিজের প্রভু’ বলে যথার্থই অভিহিত করা চলে।

    হ্যাঁ, তুমি যা বলছ, তা সত্য।

    তা ছাড়া দ্যাখো, আনন্দ, বেদনা, কামনা প্রভৃতি বিচিত্র এবং জটিল আবেগ প্রধানত দেখা যায় শিশু, নারী, ভৃত্য এবং নাগরিকদের মধ্যে অর্থাৎ যারা অধম এবং সংখ্যায় অধিক তাদের মধ্যে।

    অবশ্যই।

    কিন্তু যে-ইচ্ছা বা কামনা সরল, পরিমিত এবং যুক্তিনির্ভর এবং মন ও যথার্থ অভিমত যে-কামনার নিয়ন্ত্রক তেমন কামনা সংখ্যায় অল্প সেই নাগরিকদের মধ্যেই মাত্র দেখা যায়, যারা সুজাত এবং সুশিক্ষিত।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    সরল এবং পরিমিত—এই দুটি কামনার একটি ভূমিকা আমাদের রাষ্ট্রে আছে। কারণ অধিকের যে-কামনা অধম, তাকে রাষ্ট্রের সংখ্যাল্পের জ্ঞান এবং মহৎ কামনাই বশীভূত করে রাখে।

    একথা ঠিক।

    তা হলে কোনো রাষ্ট্রকে যদি তার আনন্দ এবং বাসনার বশকারী এবং নিজের প্রভু বলে আখ্যায়িত করা যায় তবে সে-আখ্যা আমাদের রাষ্ট্রেরই প্রাপ্য। নয় কি?

    অবশ্যই।

    এবং আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে যথার্থভাবে সংযমী বলেও আখ্যায়িত করতে পারি।

    হ্যাঁ, তা পারি।

    তা ছাড়া আমাদের রাষ্ট্রই একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে শাসক কে হবে এ-প্রশ্নে শাসক এবং শাসিত উভয়ই ঐকমত্য পোষণ করে।

    হ্যাঁ, এ-বিষয়ে তারা ঐকমত্য পোষণ করে।

    এ-বিষয়ে আমাদের নাগরিকগণ যখন ঐকমত্য পোষণ করে তখন সংযমকে আমরা কোথায় নির্দিষ্ট করব? শাসক কিংবা শাসিতের মধ্যে?

    গ্লকন বললেন : আমার তো মনে হয় উভয়ের মধ্যে আমরা সংযমকে নির্দিষ্ট করতে পারি।

    কিন্তু গ্লকন, তুমি একটা বিষয় নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ যে, আমরা সংযমকে একটা ঐকতান বলে অভিহিত করেছিলাম?

    কিন্তু কেন সক্রেটিস?

    কারণ, সংযম তো জ্ঞান এবং সাহসের মতো নয়। জ্ঞান এবং সাহস উভয়ের অবস্থান রাষ্ট্রের অংশবিশেষের মধ্যে। এদের একটির কারণে রাষ্ট্রকে আমরা প্রাজ্ঞ বলি, অপরটির জন্য রাষ্ট্রকে সাহসী বলি। কিন্তু সংযমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তেমন নয়। সংযম রাষ্ট্রের সমগ্রের উপরই পরিব্যাপ্ত। সংযম সঙ্গীতের সকল গ্রামের মধ্যে সূত্রের ন্যায় প্রবহমান হয়ে উত্তম, অধম, মধ্যম, জ্ঞান, শক্তি, সংখ্যা এবং সম্পদে সবল কিংবা দুর্বল সকলকে সম্মিলিত করে একটি ঐকতানের সৃষ্টি করে। তা হলে সংযমকে আমরা রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তি—উভয় ক্ষেত্রে শাসনের অধিকারের প্রশ্নে উত্তম এবং অধমের ঐকমত্য বলে অভিহিত করতে পারি। ঠিক নয় কি?

    আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, সক্রেটিস।

    তা হলে গ্লকন, এই নিয়ে আমাদের অন্বিষ্ট চারটি গুণের মধ্যে তিনটিকে আমরা আমাদের রাষ্ট্রের মধ্যে আবিষ্কার করেছি, একথা আমরা বলতে পারি। রাষ্ট্রকে মহৎ করে যে-সকল গুণ তার মধ্যে সর্বশেষ গুণ তা হলে ন্যায় ব্যতীত অপর কিছু না?

    এ-অনুমান তো স্বাভাবিক।

    উত্তম কথা গ্লকন। সময় তা হলে সন্নিকট। শিকারির মতো এবার আমাদের ঘিরে ধরতে হবে। দৃষ্টি আমাদের তীক্ষ্ণ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে ন্যায় যেন আমাদের লক্ষ্য এড়িয়ে সরে পড়তে সক্ষম না হয়। কারণ আমরা নিঃসন্দেহ, আমাদের রাষ্ট্রের মধ্যে কোথাও সে অবশ্যই রয়েছে। কাজেই গ্লকন, তোমার দৃষ্টি সতর্ক করো, দ্যাখো সে কোথায়। তুমি যদি প্রথমে তাকে দেখে ফেলো তা হলে আমাকে বোলো কিন্তু।

    আহ! সক্রেটিস, সে-ক্ষমতা যদি আমার থাকত! কিন্তু আমি তো কেবল অনুসারী। তোমার দেওয়া চোখ দিয়ে আমি দেখি। ততটুকুই আমার ক্ষমতা

    তা হলে এসো, প্রার্থনায় যোগদান করো এবং অনুসরণ করো।

    আমাকে তুমি পথ দেখাও সক্রেটিস, আমি তোমাকে অনুসরণ করব। কিন্তু গ্লকন, এখানে কোনো পথ নেই। ঘন অন্ধকার, পথের রেখা জটিল। তবু আমাদের অগ্রসর হতে হবে।

    হ্যাঁ চলো, আমরা অগ্রসর হই।

    এই সময়ে আমি কিছু একটা যেন দেখতে পেলাম। আমি চিৎকার করে উঠলাম : গ্লকন, একটি পথের রেখা আমি দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে শিকার পালাতে সক্ষম হবে না।

    তা হলে তো সুখবর, সক্রেটিস।

    কিন্তু আমরা কী মূর্খ, গ্লকন!

    কেন?

    কারণ, বন্ধু, সেই যুগ যুগ আগে যখন আমরা শুরু করেছিলাম আমাদের অন্বেষণ, তখন কিন্তু ন্যায় আমাদের পদপ্রান্তেই পড়ে ছিল। কিন্তু আমরা তাকে দেখলাম না। কী অদ্ভুত অবস্থা! আমরা যেন সেই লোক যে তার লক্ষ্যকে হাতের মুঠোয় বন্ধ করে লক্ষ্যের সন্ধানে কেবল ছুটে বেড়ায়। আমরাও তেমনি। যে আমাদের লক্ষ্য তার দিকে আমরা দৃষ্টিপাত করলাম না। আমরা ছুটে বেড়ালাম দূর-দূরান্তে। আর সে-কারণেই আমরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলাম।

    তুমি কী বলছ, সক্রেটিস!

    আমি বলতে চাচ্ছি : বহুকাল ধরেই আমরা ন্যায়ের কথা বলছি। অথচ সে-ন্যায়কে আমরা চিনতে ব্যর্থ হলাম।

    সক্রেটিস, তোমার এই রহস্যময় ভূমিকার শেষ হোক।

    আমি বললাম : বেশ গ্লকন, তুমি আমার কথার জবাব দাও : তোমার নিশ্চয় স্মরণ আছে, আমরা যখন আমাদের রাষ্ট্রের গঠন শুরু করি তখন তার একটি মৌলিক বিধান আমরা এই নির্দিস্ট করেছিলাম যে, একজন নাগরিক মাত্র একটি কাজই সমধা করবে,—প্রকৃতি যাকে যে-কাজের জন্য উত্তমরূপে তৈরি করেছে সে সেই কাজই সম্পাদন করবে। আমি বলব : এই নীতিই হচ্ছে ন্যায়। অথবা ন্যায় এই নীতির সঙ্গেই যুক্ত।

    হ্যাঁ সক্রেটিস, একথা ঠিক যে আমরা বলেছি : একজন মানুষ একটি কাজই সম্পাদন করবে।

    তা ছাড়া আমরা বলেছিলাম, ন্যায় হচ্ছে নিজের কাজ করা এবং অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করা। একথা আমরা বারবারই বলেছি। শুধু আমরা নয়, অন্য অনেকে এই অভিমতই পোষণ করে।

    হ্যাঁ, সক্রেটিস, এরূপ আমরা বলেছি।

    তা হলে নিজের কাজ করাও ন্যায়,–একথা আমরা অনুমান করতে পারি। কিসের ভিত্তিতে আমার এই অনুমান তুমি বলতে পার গ্লকন?

    না, তুমি বলো।

    অনুমানের ভিত্তি আমাদের সেই অবশিষ্টের পদ্ধতি। কারণ জ্ঞান, সাহস এবং সংযম যখন চিহ্নিত হয়েছে তখন ন্যায়ই মাত্র অবশিষ্ট থাকে। শুধু তা-ই নয়, ন্যায় যেমন সব গুণের চরম লক্ষ্য, তেমনি সব গুণের নিয়ামকও হচ্ছে ন্যায়। সব গুণের মধ্যে যেমন এর অবস্থান তেমনি এর কারণেই সব গুণের অস্তিত্ব। আমরা বলেছি গুণের মধ্যে তিনটিকে যদি আমরা আবিষ্কার করতে পারি, তা হলে অবশিষ্ট চতুর্থটি অবশ্যই ন্যায় হবে।

    এ সিদ্ধান্ত অনিবার্য।

    এখন আমাদের সামনে যদি প্রশ্ন হয়, এই চারটি গুণের মধ্যে কোন্ গুণটির দান রাষ্ট্রের উৎকর্ষের ক্ষেত্রে সর্বাধিক—সে কি শাসনের প্রশ্নে শাসক এবং শাসিতের ঐকমত্য, কিংবা সৈন্যদের মধ্যে রাষ্ট্রের বিপদের প্রকৃতি সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় শিক্ষার অনুসরণ কিংবা শাসকের প্রজ্ঞা এবং সতর্কতা অথবা যে-গুণের সাক্ষাৎ শিশু, নারী, দাস এবং মুক্ত মানুষ, কারিগর, শাসক এবং শাসিত—সকলের মধ্যে পাওয়া যায় অর্থাৎ প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে, অপরের দায়িত্বে হস্তক্ষেপ করছে না—সেই গুণের অবদান সর্বাধিক, তা হলে প্রশ্নটির জবাব খুব সহজ হবে না, গ্লকন

    নিশ্চয়ই। কার্ অবদান সবচেয়ে অধিক সে জবাব দেওয়া কঠিন বইকী।

    তা হলে আমাদের বলতে হয় যে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ কাজ সম্পাদন করার নীতির প্রতিযোগী হচ্ছে জ্ঞান, সাহস এবং সংযম?

    হ্যাঁ, সক্রেটিস

    ন্যায় তা হলে অন্য গুণের সঙ্গে প্রতিযোগী?

    তাই তো হচ্ছে।

    এসো গ্লকন, ব্যাপারটিকে আমরা অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি : রাষ্ট্রের শাসক কে? রাষ্ট্রের শাসক কি তারা নয় যারা আইনগত বিরোধের মীমাংসা করে?

    হ্যাঁ।

    এবং এই বিরোধ-মীমাংসায় একমাত্র নীতি কি এই নয় যে, কেউ যেমন অপরকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না, তেমন নিজেও সে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হবে না?

    হ্যাঁ, অবশ্যই এই নীতি।

    এবং এটাই হচ্ছে ন্যায্যনীতি।

    হ্যাঁ।

    তা হলে এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বলতে হয় যে, ন্যায় হচ্ছে যার যা প্রাপ্য তা-ই পাওয়া এবং যার যা করণীয় তা-ই করা।

    খুবই সত্য কথা সক্রেটিস।

    এবার তা হলে তুমি চিন্তা করে বলো, তুমি আমাদের সঙ্গে একমত কি না। মনে করো, যে সূত্রধর সে চর্মকারের কাজ করতে শুরু করল এবং যে চর্মকার সে সূত্রধরের কাজ করতে শুরু করল। তারা তাদের কাজের যন্ত্রাদি পরস্পর পরিবর্তন করে নিল। অথবা ধরো একই ব্যক্তি উভয় কাজ করতে শুরু করল। এমন যদি হয় তাতে রাষ্ট্রের কি কোনো ক্ষতি হবে বলে তুমি মনে কর?

    না, তেমন কী ক্ষতি হবে সক্রেটিস?

    কিন্তু যখন চর্মকার কিংবা অপর কেউ যাকে প্রকৃতি বণিক হিসাবে তৈরি করেছে সে তার অর্থের শক্তিতে কিংবা তার অনুসারীদের সংখ্যা অথবা অপর কোনো সুবিধার ভিত্তিতে শক্তিমান বোধ করে যোদ্ধাশ্রেণীতে জোর করে স্থান গ্রহণ করে কিংবা যখন কোনো যোদ্ধা জোর করে সে যে-কাজের উপযুক্ত নয় সেই আইন প্রণয়নকারী এবং শাসকের আসন দখল করে অথবা যখন একই ব্যক্তি একসঙ্গে বণিক, আইন-প্রণয়নকারী এবং যোদ্ধার ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করে তখন নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে একমত হয়ে বলবে যে, কাজের এই পারস্পরিক পরিবর্তন এবং একের কাজে অন্যের এই হস্তক্ষেপ রাষ্ট্রের ধ্বংসেরই সূচনা করে।

    খুবই সত্য কথা।

    তা হলে আমাদের রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট শ্রেণী যখন তিনটি, তখন একের কাজে অন্যের হস্তক্ষেপ বা অনধিকার চর্চা কিংবা একের বদলে অপরের আসন গ্রহণ রাষ্ট্রের জন্য সর্বাধিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এরূপ কাজকে আমরা যথার্থই সর্বনাশসাধন বলে অভিহিত করতে পারি?

    অবশ্যই, সক্রেটিস।

    আর নিজের রাষ্ট্রের এরূপ সর্বনাশসাধনকে নিশ্চয়ই তুমি অন্যায় বলবে?

    নিশ্চয়ই।

    এটাই হচ্ছে তা হলে অন্যায়। অপরদিকে বণিক বা সৈনিক বা শাসক যখন নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে তখনই ন্যায়ের উদ্ভব হয়, এই দায়িত্বপালনই একটি রাষ্ট্রকে ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রে পরিণত করে।

    তোমার সাথে আমি একমত, সক্রেটিস।

    অবশ্য এখনও জোর করে আমরা কথাটা বলতে পারিনে। পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়ের এই তত্ত্ব যদি প্রমাণিত হয় তা হলে এ-সম্পর্কে আর সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। কিন্তু যদি তা প্রমাণিত না হয় তা হলে নূতনভাবে আমাদের অনুসন্ধানের কাজটি শুরু করতে হবে। যা-ই হোক, এসো গ্লকন, প্রথমে আমরা আমাদের পুরনো অনুসন্ধানটি সম্পন্ন করি। এর গোড়াতে আমরা বলেছিলাম ন্যায়কে প্রথমে বৃহদাকারে যদি আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি, তা হলে পরবর্তীকালে ক্ষুদ্রাকারে ব্যক্তির মধ্যে তাকে অনুধাবন করা কম কঠিন হবে। এই বৃহদাকারের দৃষ্টান্ত হচ্ছে রাষ্ট্র। আর এ-কারণেই আমাদের পক্ষে যত উত্তম সম্ভব তত উত্তম রাষ্ট্র গঠন করেছি। এই গঠনের পেছনে আমাদের এই প্রত্যয় কাজ করেছে যে, উত্তম রাষ্ট্রে ন্যায়ের সাক্ষাৎ লাভ করা যাবে। রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়কে আমরা আবিষ্কার করেছি। এসো আমরা এখন সেই আবিষ্কারকে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করি। ব্যক্তির উপর প্রয়োগে উভয়ে যদি মিলে যায় তা হলে আমাদের কাজ সমাধা হবে। যদি ন্যায়ের প্রয়োগে ব্যক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্যের সৃষ্টি হয় তা হলে আমরা আবার রাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করব এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আমাদের তত্ত্বকে পুনরায় পরীক্ষা করে দেখব। এই দু-এর ঘর্ষণে* এমন আলোর সঞ্চার হতে পারে যে আলো ন্যায়ের প্রকৃতিকে আলোকিত করে তুলবে। তেমন হলে ন্যায়ের মূর্তিটি আমরা নিজেদের আত্মায় অনড় করে ধরে রাখব।

    [* রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায় এবং ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়—এ দুই-এর তুলনা।]

    সেরূপ করাই ঠিক হবে। এসো সক্রেটিস, আমরা সেরূপই করি।

    আমি এবার গ্লকনকে জিজ্ঞেস করলাম : দুটো বস্তু, একটি বড় অপরটি ছোট—এদের উভয়কে যখন আমরা একই নামে অভিহিত করি তখন তারা এই নামের কারণে সদৃশ কিংবা সদৃশ নয়?

    তারা সদৃশ, সক্রেটিস।

    তা হলে, ন্যায়ের ভিত্তিতে যদি আমরা কথাটি বলি তবে ন্যায়বান ব্যক্তি ন্যায়বান রাষ্ট্রের সদৃশ হবে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, সে ন্যায়বান রাষ্ট্রের সদৃশ হবে।

    এবং আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট তিনটি শ্রেণী যখন আপন-আপন দায়িত্বপালন করে তখনই মাত্র রাষ্ট্র ন্যায়বান হয়। শুধু তা-ই নয়, এই শ্রেণীগুলির বিভিন্ন গুণের কারণে ন্যায়বান রাষ্ট্র আবার সংযমী, সাহসী এবং জ্ঞানী বলেও বিবেচিত হয়।

    হ্যাঁ, একথা সত্য।

    ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একথা সত্য। আমরা ধরে নিতে পারি রাষ্ট্রে যেরূপ, ব্যক্তির আত্মায়ও সেরূপ তিনটি উপাদান রয়েছে। এবং রাষ্ট্রকে আমরা যেরূপ ব্যাখ্যা করেছি ব্যক্তিকেও সেরূপ ব্যাখ্যা করতে পারি। কারণ তিনটি নীতি বা উপাদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেরূপ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ব্যক্তিরও সেরূপ।

    অবশ্যই।

    এখানেও তা হলে একটি সহজ প্রশ্নের আমাদের জবাব দিতে হয় : আত্মার এই তিনটি নীতি বা উপাদান আছে কিংবা নাই?

    তুমি একে সহজ প্রশ্ন বলছ, সক্রেটিস! না, এ মোটেই সহজ নয়। তবে প্রবাদের সে-কথাটি সত্য, কঠিন যা, উত্তম তা।

    তুমি যথার্থ বলেছ, গ্লকন। এবং যে পদ্ধতি আমরা প্রয়োগ করছি, সঠিক সমাধানের জন্য সে-পদ্ধতি যে যথেষ্ট তাও আমি মনে করতে পারছিনে। উপযুক্ত পদ্ধতি দীর্ঘতর হবে। কিন্তু বর্তমান পদ্ধতিতেও আমরা একটি সমাধান পেতে পারি। এ-সমাধান আমাদের পূর্বকার অনুসন্ধানের চেয়ে কম সঠিক হবে না।

    বর্তমান অবস্থায় এ সমাধানও আমাদের জন্য কম নয়। আমি এতেই সন্তুষ্ট।

    আমি বললাম : আমিও সন্তুষ্ট হব।

    তা হলে সক্রেটিস, আলোচনাটি চালিয়ে যেতে ভীত হয়ো না।

    আমি বললাম : এ ক্ষেত্রে একটা জিনিস আমাদের স্বীকার করতে হয়। রাষ্ট্রের মধ্যে যে-নীতি এবং আচরণ কার্যকর হয়েছে, ব্যক্তির মধ্যে সেই নীতি এবং আচরণই ক্রিয়াশীল। এবং এ-নীতি ও আচরণ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে উপগত হয়। তা না হলে অপর কোথা হতে রাষ্ট্রে তাদের আগমন ঘটতে পারে? ধরো বীর্য কিংবা বিক্রমের কথা। আমরা যখন রাষ্ট্রে এর সাক্ষাৎ পাই তখন কি আমরা বলতে পারি যে, থ্রেসবাসী কিংবা সিদীয় অর্থাৎ উত্তরাঞ্চলের যে-জাতিদের মধ্যে এ-গুণের সাক্ষাৎ দেখা যায় তাদের নিকট থেকে রাষ্ট্র এ-গুণকে লাভ করেনি? তেমন বলা অদ্ভুত হবে। জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রেও একথা সত্য। জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা আমাদের* বৈশিষ্ট্য। অর্থের প্রতি ভালোবাসা তেমনি ফিনিশীয় এবং মিশরীয়দের বৈশিষ্ট্য।

    [*এথেনীয়দের]

    তোমার কথা ঠিক, সক্রেটিস।

    এটা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না।

    না, এতে কোনো অসুবিধা নেই।

    কিন্তু প্রশ্নটি যখন দাঁড়ায়, এই নীতি বা উপাদান তিনটি কিংবা একটি, তখন জবাবটি আর সহজ থাকে না। আমরা কী করি? আমরা কি আমাদের স্বভাবের একটি অংশ দ্বারা জ্ঞান অর্জন করি, অপর কোনো অংশ দ্বারা ক্রোধান্বিত হই এবং তৃতীয় কোনো অংশ দ্বারা আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিসমূহের নিবারণ করি? অথবা যে-কোনো আচরণের ক্ষেত্রে আমাদের সমগ্র আত্মাই ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে? এ-প্রশ্নের সমাধান কঠিন।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, এখানেই অসুবিধা।

    তা হলে গ্লকন, এসো, আমরা দেখি তারা এক কিংবা ভিন্ন।

    কেমন করে আমরা দেখব?

    গ্লকনের প্রশ্নের জবাবে আমি বললাম : একই বস্তু কোনো বস্তুর একই অংশে কিংবা ঐ বস্তুর সঙ্গে একই মুহূর্তে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরোধীভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারে না। কাজেই যে-বস্তু আমাদের কাছে দৃশ্যত এক তার মধ্যে যদি পরস্পর বিরোধিতার আমরা সাক্ষাৎ পাই তা হলে বুঝতে হবে যে বস্তুটি এক নয়, তারা বিভিন্ন।

    উত্তম।

    দৃষ্টান্ত স্বরূপ : একটি বস্তু কি একই সময়ে স্থির এবং অস্থির অর্থাৎ গতিময় হতে পারে?

    অসম্ভব।

    আমি বললাম : তবু আমাদের পদগুলির সংজ্ঞা অধিকতর সুনির্দিষ্ট হওয়া আবশ্যক। না হলে পথে আবার বিভ্রাট ঘটতে পারে। মনে করো একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এই দণ্ডায়মান অবস্থায় সে তার মাথা এবং হাত সঞ্চালিত করছে। আরও মনে করো, এই দৃশ্য দেখে অপর এক ব্যক্তি মন্তব্য করল : এখানে একই ব্যক্তি একই সময়ে স্থির এবং অস্থির। এরূপ মন্তব্যের বিরুদ্ধে আমরা নিশ্চয়ই আপত্তি করে বলব : না, তা নয়। বরঞ্চ ব্যক্তিটির একটি অংশ অস্থির এবং তার অপর একটি অংশ স্থির।

    তোমার কথা সত্য, সক্রেটিস।

    কিন্তু ধরো আমাদের এ-জবাবের প্রতিবাদী সূক্ষ্মতর যুক্তির ভিত্তিতে বলল : একটা নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানরত ঘূর্ণমান একটি লাটিমের অংশবিশেষ যে একই সময়ে স্থির এবং অস্থির তা-ই নয়; সমগ্র লাটিমটিই একই সময় স্থির এবং অস্থির। লাটিমের ন্যায় ঘূর্ণমান অপর যে-কোনো বস্তু সম্পর্কেই প্রতিবাদী এরূপ কথা বলতে পারে। কিন্তু তার এ-বক্তব্যকে আমরা গ্রাহ্য মনে করব না। আমরা বলব : এমন ক্ষেত্রে বস্তু তার একই সময়ে স্থির এবং গতিময়—একথা বলা চলে না। কারণ লাটিমের যেমন একটি পরিধি আছে, তেমনি তার একটি অক্ষ আছে। লাটিমের অক্ষ স্থির থাকে। কারণ লম্ব থেকে তার কোনো বিচ্যুতি নেই। কিন্তু লাটিমের পরিধি ঘূর্ণমান সুতরাং অস্থির। কিন্তু পরিধির সঙ্গে অক্ষ যদি লম্বের ডানে কিংবা বামে বিচ্যুত হয় তা হলে লাটিমের কোনো অংশকেই আমরা স্থির বলে অভিহিত করতে পারিনে ।

    এ বিবরণই ঠিক, সক্রেটিস।

    তা হলে এরূপ কোনো আপত্তির কারণে আমরা বিভ্রান্ত হব না কিংবা বিশ্বাস করব না যে, একই বস্তু তার একই অংশে কিংবা একই বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই সময়ে পরস্পর বিরোধী ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।

    না, আমার ধারণামতে আমিও মনে করিনে যে, এরূপ হওয়া সম্ভব।

    আমি বললাম : এরূপ অভিযোগের প্রত্যেকটি পরীক্ষা করা এবং পরীক্ষাশেষে তাদের অসত্যতা প্রমাণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এরূপ অভিযোগ অসার বলে আমরা ধরে নেব। তা ছাড়া এই এরূপ নিয়ে আমরা অগ্রসর হব যে, পরবর্তীকালে আমাদের অনুমান যদি অসত্য প্রমাণিত হয় তা হলে এর সকল সিদ্ধান্তকেই আমরা প্রত্যাহার করে নেব।

    তা-ই উত্তম হবে, সক্রেটিস।

    আচ্ছা, অপর একটি বিষয়ে আসা যাক। সম্মতি এবং অসম্মতি, ইচ্ছা এবং অনিচ্ছা, আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ—এগুলো সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় যা-ই হোক না কেন, তুমি তো এদেরকে বিপরীত বলে আখ্যায়িত করবে। ঠিক নয় কি?

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, এরা বিপরীত

    ঠিক তেমনি ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা এবং আমাদের সাধারণ কামনা এবং আমাদের ইচ্ছা ও বাসনা—এগুলোকেও আমরা যে-শ্রেণীগুলির উল্লেখ করেছি, তুমি নিশ্চয়ই তার অন্তর্ভুক্ত করবে। নয় কি? যেমন তুমি নিশ্চয়ই বলবে : যার বাসনা আছে তার আত্মা বাসনার সেই বস্তুকে অন্বেষণ করে; কিংবা যে-বস্তুকে আমি অধিকার করতে চাই সে-বস্তুকে আমি আমার নিকটবর্তী করে তুলি কিংবা যখন কেউ কোনো দ্রব্য প্রদত্ত হতে চায় তখন সেই বাঞ্ছিত বস্তু অধিকারের জন্য মন তার ইচ্ছাটিকে সম্মতিসূচক মস্তক সঞ্চালনের মাধ্যমে দাতাকে জ্ঞাত করায়। তার ভাবটি এমন যে ইতিমধ্যেই তাকে এ-সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে।

    খুবই যথার্থ, সক্রেটিস।

    কিন্তু অনিচ্ছা এবং বিরাগ এবং ইচ্ছার অভাব—এগুলি সম্পর্কে তুমি কী বলবে? এগুলিকেও কি তুমি বিকর্ষণ এবং আকর্ষণ—এই প্রকার বিপরীত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করবে না?

    অবশ্যই।

    ‘বিশেষ ইচ্ছা’ এবং ‘কেবল মাত্র ইচ্ছা’

    ইচ্ছা সম্পর্কে সাধারণভাবে একথা যদি সত্য হয় তা হলে এসো ইচ্ছার মধ্যে যেগুলি প্রধান যেমন ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা তাকে নিয়ে আমরা আলোচনা করি।

    ঠিক আছে, এসো আমরা তা-ই নিয়ে আলোচনা করি।

    এ-দুটোর একটির লক্ষ্য হচ্ছে খাদ্য, অপরটির পানীয়। নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    আমাদের মূল বক্তব্য এখানেই : আমরা যখন তৃষ্ণা বোধ করি তখন আমরা কেবল পানীয়ের তৃষ্ণাই বোধ করি। তৃষ্ণা বলতে নিশ্চয়ই আমরা গরম কিংবা ঠাণ্ডা কিংবা অল্প কিংবা অধিক পানীয়ের তৃষ্ণা বুঝিনে। কিন্তু যখন তুমি কেবল তৃষ্ণার্ত নও, তুমি তপ্তও বটে, তখন তুমি নিশ্চয়ই ঠাণ্ডা পানীয় পান করতে চাইবে; কিংবা যদি তুমি ঠাণ্ডা বোধ কর তা হলে গরম পানীয় পান করতে চাইবে। তোমার তৃষ্ণা যদি তীব্র হয় তুমি অধিক পরিমাণ পানীয় এবং তৃষ্ণার বেগ কম হলে তুমি অল্প পানীয় পান করতে চাইবে। ঠিক নয় কি? কিন্তু শুধু তৃষ্ণা বলতে এরকম কোনো বিশেষণ ব্যতীত কেবল পানীয়কেই বুঝাব। ক্ষুধার ক্ষেত্রেও একথা সত্য। নয় কি?

    গ্লকন বললেন : একথা ঠিক সক্রেটিস। সাধারণ ইচ্ছার ক্ষেত্রে আমরা ইচ্ছার স্বাভাবিক বা সহজ বস্তুটিকেই বুঝি। কিন্তু ইচ্ছা যদি বিশেষ রকমের হয় তা হলে তার তৃপ্তির বস্তুও বিশেষ রকমের হবে।

    কিন্তু গ্লকন, এখানে একটা বিভ্রমের আশঙ্কা রয়েছে। এ-সম্পর্কে আমি আগে থেকে সতর্ক হতে চাই। আমাদের প্রতিবাদী বলতে পারে, কোনো মানুষই কেবলমাত্র পান করার ইচ্ছা করে না, সে উত্তম কিছু পান করারই ইচ্ছা করে। কেউ কেবল খাওয়ার ইচ্ছা করে না, উত্তম কিছু খাওয়ার ইচ্ছা করে। কারণ ইচ্ছা মাত্রেরই লক্ষ্য হচ্ছে উত্তম। এবং যেহেতু তৃষ্ণা হচ্ছে একটা ইচ্ছা, সে-কারণে তৃষ্ণার লক্ষ্য হবে উত্তম কিছু পান করার ইচ্ছা। অপর যে-কোনো ইচ্ছা সম্পর্কে একথা সত্য। আমাদের প্রতিবাদী কি এমন কথা বলতে পারে না?*

    [*এখানে ইচ্ছাকে ‘কেবলমাত্র ইচ্ছা’ এবং ‘কোনো বিশেষ বস্তুর জন্য ইচ্ছা’ হিসাবে দেখাবার চেষ্টা করা হচ্ছে। সক্রেটিসের যুক্তিতে এখানে ‘বিশেষ’ এবং নির্বিশেষ ভাবের সূচনা দেখা যাচ্ছে।]

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ সক্রেটিস, আমাদের প্রতিবাদী এমন কথা বলতে পারে।

    তথাপি আমরা বলব, দুটি অনুবন্ধীসাপেক্ষ পদের ক্ষেত্রে বিশেষণ প্রয়োগ করলে দুটোকেই বিশেষিত করতে হবে, নয়তো কাউকেই বিশেষিত করা চলবে না।

    তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    আমি বললাম : গ্লকন তুমি নিশ্চয়ই জান, যাকে আমরা ‘অধিকতর’ বলি সে ‘অল্পতর’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত?

    অবশ্যই।

    আবার যাকে বলি ‘অধিকতর বেশি’ সে ‘অধিকতর কম’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত?

    এ কথা যথার্থ।

    এবং যাকে বলি ‘কোনো কোনো সময়ে অধিক’ সে ‘কোনো কোনো সময় অল্প’-এর সঙ্গে এবং ‘অধিকতর’ ‘অল্পতর’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ সক্রেটিস, একথা অবশ্যই ঠিক

    শুধু এরা নয়, ডবল এবং অর্ধেক, অধিকতর ভারী এবং হালকা, অধিকতর দ্রুতগামী এবং অধিকতর ধীরগামী কিংবা গরম এবং ঠাণ্ডা অর্থাৎ সকল সাপেক্ষ পদ সম্পর্কেই একথা সত্য। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, ঠিক।

    বিজ্ঞানে তো এই একই নীতিকে প্রয়োগ করা হয়? কারণ, বিজ্ঞানের লক্ষ্য কী? বিজ্ঞানের লক্ষ্য জ্ঞান। বিশেষ বিজ্ঞানের লক্ষ্য বিশেষ জ্ঞান। যেমন গৃহনির্মাণের বিজ্ঞান। এরও লক্ষ্য জ্ঞান। কিন্তু এ-জ্ঞানকে অপর জ্ঞান থেকে বিশিষ্ট করে আমরা একে স্থাপত্যবিজ্ঞান বলে অভিহিত করি।

    হ্যাঁ, আমরা তাকে এই বিশিষ্ট নামে অভিহিত করি।

    কারণ, এ বিশিষ্ট অর্থাৎ এর এমন একটি গুণ আছে যা অপর বিজ্ঞানের নেই।

    এ কথা সত্য।

    এবং এই বিজ্ঞানের এই বৈশিষ্ট্য থাকার কারণ, এর একটি বিশেষ লক্ষ্য আছে। একথা অপর সকল কলা এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই সত্য। ঠিক নয় কি গ্লকন?

    হ্যাঁ, এ কথা ঠিক, সক্রেটিস।

    আমার কথাটি আমি যদি পরিষ্কার করতে পেরে থাকি তা হলে গ্লকন, সাপেক্ষ পদ সম্পর্কে আমি যা বলেছি তার তাৎপর্যটি এবার তুমি বুঝতে পারবে। আমার কথার অর্থটি ছিল : কোনো সম্পর্কের একটি পদকে যদি তুমি বিচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ কর তা হলে তার অপর পদটিকেও তোমাকে বিচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করতে হবে; একটিকে যদি তুমি বিশেষিত কর, অপরটিকেও তোমার বিশেষিত করতে হবে। আমি একথা বলছিনে যে, উভয়কে একই বিশেষণে বিশেষিত হতে হবে। স্বাস্থ্য এবং রোগের বিজ্ঞান বলতে স্বাস্থ্যের জ্ঞানটাকেই স্বাস্থ্য এবং রোগের জ্ঞানটাকেই রোগ বলতে হবে, কিংবা উত্তমের জ্ঞান উত্তম এবং অধমের জ্ঞান অধম এমন কথা আমি বুঝাতে চাইনি। আমি বলতে চাচ্ছি তোমার জ্ঞান যখন বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, ধরো স্বাস্থ্য কিংবা রোগের ক্ষেত্রে, তখন সে-জ্ঞান শুধু জ্ঞান নয়, একটি বিশেষ জ্ঞান বলে অভিহিত হওয়া আবশ্যক। তখন সে-জ্ঞানকে আমরা কোনো নির্দিষ্ট বস্তুনিরপেক্ষ ‘শুধুমাত্র জ্ঞান’ বলতে পারিনে। তখন ‘জ্ঞানের’ সঙ্গে আমাদের একটি বিশেষণ যুক্ত করতে হয় ‘নিরাময়জ্ঞান’ বা ‘চিকিৎসাবিজ্ঞান’।

    সক্রেটিস, এবার আমি তোমার কথাটি বুঝতে পারছি এবং তোমার সঙ্গে আমি এক্ষেত্রে একমত।

    তা হলে এসো আমরা ‘তৃষ্ণায়’ ফিরে যাই। ‘তৃষ্ণা’ আমাদের উল্লিখিত সাপেক্ষ পদগুলিরই একটি। তৃষ্ণা মানে কিছুর জন্য তৃষ্ণা। নয় কি?

    হ্যাঁ, পানীয়ের তৃষ্ণা।

    তা হলে তৃষ্ণারও প্রকার আছে। একটি বিশেষ তৃষ্ণা একটি বিশেষ পানীয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু তৃষ্ণাকে যদি পানীয়নিরপেক্ষভাবে ধর তা হলে সে-তৃষ্ণা না অধিকের, না অল্পের; না অধমের, না উত্তমের—অর্থাৎ তাকে কোনো বিশেষ তৃষ্ণা বলেই অভিহিত করতে পারিনে। সে কেবলমাত্র তৃষ্ণা।

    যথার্থ, সক্রেটিস।

    তা হলে আমরা বলব, তৃষ্ণার্তের আত্মা কেবল পানীয়ের জন্যই তৃষ্ণার্ত। পানীয়ের জন্য সে ব্যাকুল এবং সেই লক্ষ্যসাধনেরই সে চেষ্টা করে?

    হ্যাঁ, এ তো স্পষ্ট।

    কিন্তু তৃষ্ণার্ত আত্মা যদি তার পানীয় থেকে অপর কিছু দ্বারা বিকর্ষিত হয় তা হলে সে-বিকর্ষণের কারণ নিশ্চয়ই তৃষ্ণা থেকে ভিন্নতর কিছু। কারণ আমরা পূর্বেই বলেছি, একই বস্তু একই সময় একই বস্তুর উপর পরস্পর বিরোধী ক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে না।

    না, তার পক্ষে পরস্পরবিরোধী ক্রিয়ার সৃষ্টি অসম্ভব।

    যেমন আমরা বলতে পারিনে, তীরন্দাজের হাত একই সঙ্গে ধনুকের ছিলাকে টেনে ধরে এবং ঠেলে দেয়। আমাদের বলতে হয় তীরন্দাজের এক হাত ধনুকের ছিলাটিকে টেনে ধরে এবং তার অপর হাত তাকে ঠেলে দেয়।

    হ্যাঁ, তা-ই ঠিক

    তা হলে আমরা কি বলতে পারি, কোনো ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত কিন্তু পানে সে অনিচ্ছুক?

    গ্লকন বললেন : অসম্ভব নয়। এরকম আমরা প্রায়ই ঘটতে দেখি।

    তাই যদি সম্ভব হয় তা হলে আমরা বিষয়টিকে কেমন করে ব্যাখ্যা করব? আমাদের ব্যাখ্যা হবে : তার আত্মার মধ্যে একদিকে যেমন এমন এক শক্তি আছে যে-শক্তি তাকে তৃষ্ণার্ত করে তুলছে, তেমনি আবার এমন আর-এক শক্তি আছে যে তাকে পান করা থেকে নিবৃত্ত করছে। সে যে তৃষ্ণার্ত হয়েও পান করছে না তার কারণ তার মধ্যকার নিবারণী শক্তি তৃষ্ণার্তকারী শক্তির চেয়ে অধিকতর পরাক্রমশালী। ঠিক নয় কি, গ্লকন?

    আমার তা-ই মনে হয় সক্রেটিস।

    আর এই নিবারণী শক্তির উৎস হচ্ছে তার বিবেক কিংবা প্রজ্ঞা। অপরদিকে যা তাকে পানীয়ের দিকে আকর্ষণ করে তার উৎস হচ্ছে তার প্রবৃত্তি, তার বিকার।

    হ্যাঁ সক্রেটিস, একথা পরিষ্কার।

    তা হলে এই দুই শক্তিকে আমাদের দুটি পৃথক শক্তি বলে অভিহিত করতে হয়। একটি অপরটি থেকে পৃথক। যে-শক্তিতে ব্যক্তি চিন্তা করে সে তার আত্মার প্রজ্ঞার দিক। কিন্তু যে-শক্তিতে ব্যক্তি ক্ষুধা বোধ করে, তৃষ্ণাকে অনুভব করে কিংবা অপর সব কামনা-বাসনা দ্বারা তাড়িত হয়, তাকে আমরা বলব তার প্রবৃত্তির দিক। তার অজ্ঞানতার দিক। তার এই প্রবৃত্তি হচ্ছে তার সব কামনা-বাসনার, তার ভোগ এবং তৃপ্তির উৎস। এই দুই শক্তি তা-ই পৃথক। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, আমরা যথার্থই এদের পৃথক বলে অনুমান করতে পারি।

    তা হলে এসো আমরা সিদ্ধান্ত করি : আত্মার দুটি দিক। একটি প্রজ্ঞা, অপরটি প্রবৃত্তি। কিন্তু ব্যক্তির বিক্রম বা সাহস সম্পর্কে আমরা কী বলব? এটিকে কি আমরা আত্মার তৃতীয় উপাদান বলব কিংবা এটিকে আমরা আগের দুটির কোনো একটির সদৃশ শক্তি বলে মনে করব?

    সক্রেটিস, আমার তো মনে হয় প্রবৃত্তিরই এ সদৃশ।

    আমি বললাম : গ্লকন, এখানে আমার একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে। গল্পটিকে আমি বিশ্বাসও করেছিলাম। গল্পটি হচ্ছে লিওনটিয়াসকে নিয়ে। আগলায়নের পুত্র লিওনটিয়াস। একদিন লিওনটিয়াস পাইরিউস বন্দর থেকে ফিরে আসছিল। বন্দরের উত্তরদিকের প্রাচীরের নিচে দিয়ে আসতে লিওনটিয়াস দেখতে পেল বধ্যভূমির ওপর কয়েকটি মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। এই দৃশ্য তার মধ্যে একদিকে যেমন আরও কাছে যেয়ে মৃতদেহগুলোকে ভালো করে দেখার একটা বাসনা জাগাল, তেমনি অপরদিকে তার মধ্যে ভীতি এবং ঘৃণার ভাবও সঞ্চারিত হল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হাত দিয়ে চোখকে আবৃত করে লিওনটিয়াস এই দুটো ভাবের সঙ্গে লড়াই করল। কিন্তু পরিণামে মৃতদেহ দেখার ইচ্ছার জোরে চোখ থেকে তার হাত নেমে এল এবং সে দৌড়ে ছুটে গেল মৃতদেহগুলোর কাছে আর ক্রোধের সঙ্গে নিজের চোখ দুটোকে বলতে লাগল : নে নরাধম, নে। এবার প্রাণভরে এই মনোহর দৃশ্য দেখে নে।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, গল্পটি আমি শুনেছি।

    আমি বললাম : গল্পের শিক্ষাটি এই যে, ব্যক্তির জীবনে এমন সময়ও আসে যখন তার ক্রোধ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে লড়াইতে লিপ্ত হয়। তখন মনে হয় যেন, ক্রোধ এবং ইচ্ছা দুটি শক্তি, ভিন্ন সত্তা।

    হ্যাঁ, সক্রেটিস, এ-গল্পের এটিই তাৎপর্য

    গ্লকন, এরকম দৃষ্টান্ত আমরা আরও দিতে পারি। এ সব ক্ষেত্রে আমরা যা দেখতে পাই সে হচ্ছে এই যে, মানুষের বাসনা যখন জোর করে তার প্রজ্ঞাকে পরাভূত করে ফেলে তখন সে নিজেকেই ভর্ৎসনায় ভরে তোলে। নিজের সত্তার ভেতরে ইচ্ছার প্রচণ্ডতায় সে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। এই দ্বন্দ্বকে তুমি রাষ্ট্রের মধ্যে উপদলীয় দ্বন্দ্বের সঙ্গে তুলনা করতে পার। আর এই উপদলীয় দ্বন্দ্বে তার মধ্যকার যা বিক্রম তাকে সে প্রজ্ঞার পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু বিক্রম প্রবৃত্তির সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রজ্ঞার বিরুদ্ধাচারণ করেছে, এমন অভিজ্ঞতা গ্লকন, তুমি নিজের মধ্যে কিংবা অপর কোথাও কি প্রত্যক্ষ করেছ?

    না সক্রেটিস, আমি সেরূপ অবশ্যই দেখিনি

    মনে করো কোনো ব্যক্তি অপর কারো প্রতি অন্যায় করেছে। তার এ-অন্যায় সম্পর্কে সে সচেতন এবং দুঃখিত। এই অন্যায়ের প্রতিক্রিয়ায় আহত ব্যক্তি যদি অন্যায়কারীর উপর ক্ষুধা, হিম-কষ্ট কিংবা অপর কোনো যন্ত্রণা এবং দুর্ভোগের প্রত্যাঘাত করে তা হলে অন্যায়কারী যত অধিক মহৎ মনোভাবের হবে, আহত ব্যক্তির এরূপ আঘাতে সে তত কম ক্ষুদ্ধ হবে। কারণ, এই প্রত্যাঘাতকে সে ন্যায্য বলেই মনে করবে। আহত ব্যক্তির আঘাত তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলতে ব্যর্থ হবে। ঠিক নয় কি গ্লকন?

    ঠিক সক্রেটিস।

    কিন্তু যখন সে মনে করবে সে অন্যায়ভাবে আহত, তখন তার ক্রোধ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, সে উত্তেজিত হয়ে উঠবে এবং মনে করবে সে ন্যায়ের পক্ষে রয়েছে। তার আঘাতকারী অন্যায়ের পক্ষে। এমন অবস্থায় আঘাতকারীর জন্য ক্ষুধা, হিম-কষ্ট কিংবা অপর যে-দুর্ভোগে সে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তার প্রতিজবাবের জন্য সে প্রতিজ্ঞায় অধিকতর দৃঢ় হয়ে উঠবে। তার এই মহৎ বিক্রম-বোধ প্রতিপক্ষকে হত্যা করা কিংবা এ-দ্বন্দ্বে নিজে নিহত না হওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না। কিংবা বলা চলে তার অন্তরের মেষপালক অর্থাৎ তার বিবেক যতক্ষণ তার ক্রুদ্ধ কুকুরকে গর্জন বন্ধ করতে না বলবে ততক্ষণ তার ক্রোধ প্রশমিত হবে না।

    সক্রেটিস, তোমার দৃষ্টান্তটি একেবারে ত্রুটিহীন। আমাদের রাষ্ট্রে সহযোগী অর্থাৎ সৈন্যবাহিনী হচ্ছে কুকুর এবং শাসকরা হচ্ছে মেষপালক। আমাদের রাষ্ট্রেও কুকুর তার মেষপালকের নির্দেশই পালন করবে।

    তুমি আমার কথাটি ঠিক ধরতে পেরেছ, গ্লকন। কিন্তু আর-একটি বিষয় তুমি বিবেচনা করে দ্যাখো।

    কী বিষয়?

    তোমার হয়তো স্মরণ আছে, এই বিক্রম বা তেজ আমাদের কাছে প্ৰথমে একটা বাসনা বা ইচ্ছা বলেই বোধ হয়েছিল। কিন্তু এখন আমাদের সে-মতটি পরিবর্তন করতে হয়। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আত্মার দ্বন্দ্বে বিক্রম বিবেকের পক্ষ অবলম্বন করে। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা অবশ্যই ঠিক, সক্রেটিস।

    কিন্তু এখানে আর-একটি প্রশ্নেরও জবাব আবশ্যক : বিক্রম কি বিবেক থেকে পৃথক, অথবা বিক্রম বিবেকেরই আর-একটি রূপ? যদি বিক্রম বিবেক হয় তা হলে আত্মার উপাদান তিনটি নয়, দুটি : প্রজ্ঞা এবং প্রবৃত্তি। আর তা যদি না হয় তা হলে রাষ্ট্র যেমন বণিক, সৈনিক এবং শাসক এই তিন শ্রেণী দিয়ে গঠিত হয়েছে তেমনি আত্মারও একটি তৃতীয় উপাদান থাকবে। এই তৃতীয় উপাদান হবে বিক্রম। এবং কু-শিক্ষা যদি তাকে কলুষিত করে না ফেলে তা হলে সে প্রজ্ঞার সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে?

    গ্লকন বললেন : তা হলে আত্মার একটি তৃতীয় উপাদান থাকতে হয়।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, গ্লকন, বিক্রম যখন প্রবৃত্তি থেকে পৃথক বলে প্রতিপন্ন হয়েছে, তখন সে যদি প্রজ্ঞা থেকেও পৃথক হয় তা হলে তাকে আমরা আত্মার তৃতীয় উপাদান বলে ধরতে পারি।

    গ্লকন বললেন : বিক্রম যে প্রজ্ঞা থেকেও পৃথক, এটি সহজেই প্রমাণ করা যায়। ছোট শিশুদের কথা ধরো। শিশুদের মধ্যে প্রায় জন্মের পর থেকেই আমরা তেজ বা সাহসের গুণ দেখতে পাই। কিন্তু তাদের কারোর মধ্যে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার বিকাশ আদৌ না ঘটতে পারে এবং প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটে বেশ বিলম্বে।

    চমৎকার বলেছ, গ্লকন। তা ছাড়া পশুদের মধ্যেও আমরা সমভাবেই তেজের সাক্ষাৎ পাই। আর এ-সত্য তোমার কথার যথার্থতাকে অধিকতর জোরদার করে তোলে। এক্ষেত্রে আমরা আবার হোমারকে উদ্ধৃত করে বলতে পারি :

    সে তার বক্ষে করাঘাত করল এবং আত্মাকে ভৎসনা করল* …কারণ এই শ্লোকে কবি যে-যুক্তিহীন ক্রোধকে ভর্ৎসনা করছে তাকে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারকারী শক্তি থেকে পৃথক বলেই সে বিবেচনা করছে।

    [* হোমার : ওডিসি]

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    তা হলে গ্লকন, সমুদ্রের অনেক দোলার পরে আমাদের তরী নিয়ে আমরা তীরে পৌঁছেছি, একথা বলতে পারি। এখন আমরা একমত যে, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যে-উপাদান, ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সেই উপাদান। ব্যক্তির আত্মার উপাদানও তিনটি। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ সক্রেটিস, একথা খুবই ঠিক।

    তা হলে আমরা কি বলব না যে, রাষ্ট্রের প্রজ্ঞা যাতে নিহিত, ব্যক্তির প্রজ্ঞাও তাতে নিহিত?

    অবশ্যই আমরা একথা বলব।

    তা ছাড়া আমরা আরও বলব : রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যে-গুণকে আমরা বিক্রম বলি, ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সেই গুণকে আমরা বিক্রম বলব। অন্যান্য গুণের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির সম্পর্ক অনুরূপ।

    অবশ্যই।

    এবং রাষ্ট্রকে আমরা যেমনভাবে ন্যায়পরায়ণ বলি, ব্যক্তিকেও আমরা সেইভাবে ন্যায়পরায়ণ বলব।

    হ্যাঁ, এ তো একটা অনুসিদ্ধান্ত।

    আর একথাও আমরা বিস্মৃত হব না যে, রাষ্ট্রের ন্যায় হচ্ছে রাষ্ট্রের তিনটি শ্রেণীর আপন-আপন কর্তব্য সাধন করা?

    না, একথা আমরা বিস্মৃত হতে পারিনে।

    আর একথাও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, ব্যক্তির স্বভাবের যা উপাদান সেই উপাদান যখন নিজ নিজ কার্যসাধন করে তখনই ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণ হয়, তখনই ব্যক্তি তার নিজ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, একথাও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে।

    তা হলে যে-বিবেক হচ্ছে প্রাজ্ঞ এবং আত্মাকে রক্ষা করা যার দায়িত্ব সেইই আত্মাকে শাসন করবে এবং বিক্রম তার সহায়ক হবে?

    অবশ্যই সক্রেটিস।

    তা হলে আমরা বলতে পারি সঙ্গীত এবং শরীরচর্চা যুক্তভাবে প্রজ্ঞাকে মহৎ বাক্যে এবং শিক্ষায় সঞ্জীবিত রাখবে; সঙ্গতি এবং ছন্দের মাধ্যমে তারা বিক্রমের বন্যতাকে নম্র করে আনবে এবং তাকে ভদ্র করে তুলবে? ঠিক নয় কি, গ্লকন?

    হ্যাঁ সক্রেটিস, তুমি ঠিক বলেছ।

    তা হলে এমনিভাবে পরিপোষিত এবং শিক্ষিত প্রজ্ঞা এবং বিক্রম, যে-প্ৰজ্ঞা এবং বিক্রম জানে তাদের করণীয় কী, তারাই আমাদের প্রবৃত্তিকে শাসন করবে। আমাদের আত্মার অধিক পরিমাণ হচ্ছে এই প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির বাসনার শেষ নেই। প্রজ্ঞা এবং বিক্রমের দায়িত্ব হবে এই প্রবৃত্তির উপর সতর্ক প্রহরা রক্ষা করা যেন সে দেহের আরাম এবং আয়েশের প্রাচুর্যে স্ফীত হয়ে নিজের ক্ষেত্রকে অতিক্রম করে, যারা স্বভাবতভাবে তার শাসিত প্রজা নয় তাদেরও তার দাসে পরিণত করার চেষ্টা করে ব্যক্তির সমগ্র জীবনকে গ্রাস করতে না পারে।

    যথার্থ কথা সক্রেটিস।

    কিন্তু প্রজ্ঞা ও বিক্রম যুক্ত হলে নিশ্চয়ই তারা সমগ্র আত্মার সর্বোত্তম রক্ষকে পরিণত হতে পারবে এবং আমাদের দেহকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হবে। কারণ প্রজ্ঞা তখন নির্দেশ দেবে এবং বিক্রম তার নির্দেশ অনুযায়ী সাহসের সঙ্গে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে।

    অবশ্যই. সক্রেটিস।

    আর সাহসী বলব আমরা তাকেই যার বিক্রম আনন্দ কিংবা ক্লেশ—সর্ব অবস্থায় কাকে ভয় করা সঙ্গত এবং কাকে ভয় করা সঙ্গত নয় সে-প্রশ্নে প্রজ্ঞার আদেশ শিরোধার্য বলে স্বীকার করে।

    গ্লকন বললেন : ঠিক কথা।

    আর প্রজ্ঞা বলব আমরা তাকে যার মধ্যে শাসনের সেই মূল গুণটি আছে, যে-গুণের শক্তিতে সে অপরকে নির্দেশ দিতে পারে, যে-গুণ জানে আত্মার তিনটি উপাদানের কার কী করণীয় এবং সমগ্রভাবে আত্মার কী করণীয়।

    অবশ্যই, সক্রেটিস।

    এবং পরিমিত তুমি কাকে বলবে? পরিমিত নিশ্চয়ই তাকে বলবে যার মধ্যে এইসব উপাদানের পারস্পরিক সুমিত্র-সঙ্গতিকে তুমি প্রত্যক্ষ করবে—অর্থাৎ যার মধ্যে শাসকরূপ প্রজ্ঞা এবং শাসিতরূপ বিক্রম এবং প্রবৃত্তি সকলেই এরূপ ঐকমত্য পোষণ করছে যে প্রজ্ঞারই শাসন করা সঙ্গত এবং প্রজ্ঞার শাসনের বিরুদ্ধে বিক্রম এবং প্রবৃত্তি বিদ্রোহের কোনো মনোভাব পোষণ করে না। ঠিক নয় কি?

    গ্লকন বললেন : ঠিকই সক্রেটিস। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কিংবা ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধ বা সংযমের এই হচ্ছে সত্যিকার সংজ্ঞা।

    আমি বললাম : গ্লকন, আর ন্যায়বান আমরা কাকে বলব, অর্থাৎ কোনো গুণের কারণে কেউ ন্যায়পরায়ণ হবে, তা তো আমরা বারংবারই বলেছি। নয় কি?

    নিশ্চয়ই। আমরা তা বলেছি।

    তা হলে ব্যক্তির মধ্যে ন্যায় কি রাষ্ট্রের তুলনায় অনুজ্জ্বল এবং ভিন্ন কিছু কিংবা রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা যেরূপ দেখেছি, ব্যক্তির মধ্যেও আমরা তাকে সেরূপই দেখতে পাব?

    গ্লকন বললেন : আমি তো এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখিনে।

    ঠিকই। কিন্তু তবু এখনও যদি কোনো সন্দেহ আমাদের মনে থেকে থাকে তা হলে সাধারণ কয়েকটি দৃষ্টান্ত দ্বারাই আমাদের কথার সত্যতা আমরা প্রমাণ করতে পারি।

    তুমি কীরূপ দৃষ্টান্তের কথা বলছ, সক্রেটিস?

    ধরো, আমাদের বলা হল : কিছু স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য জমা রাখা রয়েছে একটি রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তির কাছে। এখন এই অর্থের নিশ্চয়তা কী? এক্ষেত্রে আমরা কি বলব না, যে-রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তি ন্যায়বান তার দ্বারা এই অর্থ অপহৃত হওয়ার আশঙ্কা, অন্যায় রাষ্ট্র কিংবা অন্যায় ব্যক্তির দ্বারা এর অপহৃত হওয়ার চেয়ে অবশ্যই কম? কেউ কি এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারবে?

    গ্লকন বললেন : না, একথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

    ন্যায়বান ব্যক্তি কিংবা নাগরিক কি তার সুহৃদ কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্বাস-ঘাতকতা কিংবা চৌর্য বা অধমের কোনো কার্যে লিপ্ত হতে পারে?

    কখনোই না।

    যে ন্যায়বান সে শপথ কিংবা চুক্তিকেও ভঙ্গ করতে পারে না?

    না, একাজ করা তার পক্ষে অসম্ভব।

    তা ছাড়া ব্যভিচার, পিতামাতার অসম্মান বা ধর্মীয় কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থতাও ন্যায়বানের চরিত্রেই সবচেয়ে কম সংঘটিত হবে। নয় কি?

    অবশ্যই।

    তার কারণ, শাসন করার ক্ষেত্রে কিংবা শাসিত হওয়ার ক্ষেত্রে তার চারিত্রিক উপাদানসমূহ আপন-আপন কর্তব্য সম্পাদন করে।

    হ্যাঁ, যার যে-কাজ সে তা-ই সম্পাদন করে।

    তা হলে এরূপ রাষ্ট্র বা চরিত্রগঠনের মূলে যে ন্যায় বিরাজ করছে সেকথা স্বীকারে তোমার নিশ্চয়ই কোনো অসুবিধা হবে না? কিংবা তুমি এর মূলে অপর কোনো গুণকে আবিষ্কার করার প্রত্যাশা কর, গ্লকন?

    না সক্রেটিস, আমার সেরূপ কোনো প্রত্যাশা নেই।

    তা হলে, গ্লকন, আমরা বলতে পারি, আমাদের স্বপ্ন সার্থক হয়েছে। গোড়াতেই আমার অনুমান করেছিলাম, এই নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো ঐশ্বারিক শক্তি ন্যায়ের একটি মৌলিক রূপের দিকে আমাদের টেনে নিচ্ছে। আমাদের সে-অনুমান এবার সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। ঠিক নয় কি?

    অবশ্যই, সক্রেটিস।

    এবং শ্রমের যে-বিভাগের কথা আমরা বলেছি, শ্রমের যে-বিভাগে সূত্রধরের কার্য সূত্রধর সম্পাদন করে, পাদুকাকার পাদুকা তৈরি করে এবং অনুরূপভাবে প্রত্যেক নাগরিক আপন-আপন কর্তব্য সম্পাদন করে, অপরের কর্তব্যে হস্তক্ষেপ করে না—শ্রমের সে-বিভাগ ন্যায়েরই প্রতিরূপ। আর সে-কারণেই এই শ্রমবিভাগ সার্থক। নয় কি?

    নিঃসন্দেহে সক্রেটিস।

    এবং যথার্থভাবে বলতে গেলে যে-ন্যায়ের কথা আমরা বলছি, সে-ন্যায় মানুষের বাইরের কোনো ব্যাপার নয়, সে হচ্ছে মানুষের অন্তরের ব্যাপার, তার যথার্থ আত্মার ব্যাপার। আর এই যথার্থ আত্মার চিন্তাই হচ্ছে মানুষের সত্যকার চিন্তা। কারণ, ন্যায়বান ব্যক্তি তার অন্তরের বিভিন্ন উপাদানের একটিকে যেমন অপরের দায়িত্বে হস্তক্ষেপ করতে দেয় না, তেমনি একের কাজকে অপরের করণীয় করেও তোলে না। সে নিজের জীবনকে সংঘবদ্ধ করে তোলে। সে নিজেই তার জীবনের এবং বিধানের প্রভু। তার নিজের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। এবং ব্যক্তি যখন তার অন্তরের তিনটি নীতিকে ঐক্যের সূত্রে গ্রথিত করতে সক্ষম হয়েছে, বলা চলে স্বরগ্রামের উচ্চ, মধ্য ও নিম্নস্বরকে যখন সে ঐকতানে একত্রিত করেছে, সুরের বিভিন্নতা যখন বিলুপ্ত হয়েছে, যখন সুরের মধ্যে পরিমিতি এবং স্বভাবের সাযুজ্য সৃষ্ট হয়েছে তখনই মাত্র তার সক্রিয় সিদ্ধান্তের সময় সমুপস্থিত। সম্পত্তি, দেহের ব্যায়াম বা রাজনীতি কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবসায়—যে-কোনো সমস্যায় এবার সিদ্ধান্তগ্রহণের জন্য সে প্রস্তুত। এ-বিচারে যা এই সঙ্গতির স্বার্থ বহন করে তাকে সে ন্যায় এবং উত্তম কাজ এবং যে-জ্ঞানের ভিত্তিতে এই ন্যায় ও উত্তম কাজের সাধন, তাকে সে প্রজ্ঞা বলে যেমন অভিহিত করে, তেমনি যা-কিছু এই সঙ্গতিকে বিনষ্ট করে তাকে সে অন্যায় এবং যে-অভিমতের ভিত্তিতে এই অন্যায়ের সাধন, তাকে সে অজ্ঞানতা বলে অভিহিত করে।

    সক্রেটিস, তুমি এক্ষেত্রে যথার্থ সত্যকেই বিবৃত করেছ।

    বেশ। তা হলে আমরা যদি বলি যে, আমরা এবার ন্যায়বান মানুষ এবং ন্যায়বান রাষ্ট্রকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি এবং আমরা স্থির করতে পেরেছি ব্যক্তির মধ্যে এবং রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়ের প্রকৃতি কী, তা হলে নিশ্চয়ই আমরা মিথ্যাচারের দায়ে দোষী বলে বিবেচিত হব না?

    নিশ্চয়ই না, সক্রেটিস।

    তা হলে এসো আমরা আমাদের আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করি।

    এসো, আমরা তা-ই করি।

    আমি বললাম : এবার তা হলে ‘অন্যায়ের’ বিষয়টিও আমাদের বিবেচনা করতে হয়?

    অবশ্যই।

    কাকে আমরা অন্যায় বলব? অন্যায় তো অপরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা, অপরের কাজে নাক গলানো। অন্যায় হচ্ছে আত্মার সমগ্র সত্তার বিরুদ্ধে তার কোনো-একটি উপাদানের বিদ্রোহ। অন্যায় হচ্ছে যথার্থ শাসকের বিরুদ্ধে অবাধ্য শাসিতের অযৌক্তিক বিদ্রোহ। আমাদের চারিদিকে আত্মবঞ্চনা এবং বিভ্রমের সংযমহীনতা এবং কাপুরুষতা এবং অজ্ঞানতার যে-বিস্তার—এসব অন্যায় বই আর কী?

    তুমি যথার্থ বলেছ, সক্রেটিস।

    এবং আমরা যদি ন্যায় এবং অন্যায়ের প্রকৃতি জানতে পারি, তা হলে ‘অন্যায় কার্য’ এবং ‘অন্যায়কারী’ এবং ‘ন্যায় কার্য’ এবং ‘ন্যায়কারী’র অর্থও আমাদের নিকট পরিষ্কার হয়ে যাবে। নয় কি?

    তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    আমি বললাম : কেন গ্লকন, এতে বিস্ময়ের কী আছে? ন্যায় এবং অন্যায় হচ্ছে সুস্থতা এবং অসুস্থতার মতো। আমাদের দেহের মধ্যে সুস্থতা এবং অসুস্থতার অবস্থান যেরূপ, আত্মার মধ্যেও ন্যায় এবং অন্যায়ের অবস্থান সেরূপ।

    কেমন করে?

    আমি বললাম : কেন, যা সুস্থতা তা-ই কি স্বাস্থ্যের কারণ নয় এবং যা অসুস্থতা তা কি আমাদের অসুখের কারণ নয়?

    তা বটে।

    তেমনি ন্যায় কর্মই ন্যায়ের সৃষ্টি করে, অন্যায় কর্ম অন্যায়ের সৃষ্টি করে। নয় কি।

    হ্যাঁ, এটাও নিশ্চিত।

    শরীরের মধ্যে স্বাস্থ্যের সৃষ্টি হচ্ছে দেহের মধ্যে যার যা করণীয় তার ভিত্তিতে স্বাভাবিক শাসনের প্রতিষ্ঠা; দেহের মধ্যে অসুখ হচ্ছে এই স্বাভাবিক শাসনেরই ব্যত্যয়। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক

    আর আত্মার মধ্যে ন্যায়ের সৃষ্টিও হচ্ছে আত্মার যে-উপাদানের যা করণীয় তার ভিত্তিতে একটি স্বাভাবিক শাসনের প্রতিষ্ঠা। আত্মার মধ্যে অন্যায়ের উদ্ভবও ঘটে এই স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থার ব্যত্যয়ে।

    খুবই যথার্থ।

    তা হলে ধর্ম বা ন্যায় হচ্ছে আত্মার স্বাস্থ্য, আত্মার সৌন্দর্য এবং আত্মার মঙ্গল। এবং আত্মার অধর্ম বা অন্যায় হচ্ছে তার পাপ, তার অস্বাস্থ্য, তার হীনতা এবং তার বিকার। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    আবার দ্যাখো, উত্তম আচরণেই উত্তম বা ধর্মের সৃষ্টি, পাপাচারেই পাপের সৃষ্টি। তুমি কী বল?

    নিশ্চয়ই।

    কিন্তু গ্লকন, ন্যায় এবং অন্যায়ের লাভ-লোকসানের আমাদের পুরনো প্রশ্নটির এখনও জবাব দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন ছিল : কোনটি লাভজনক? ন্যায়বান হওয়া এবং ন্যায় কর্ম সাধন করা, ধর্মকে কর্মের নীতি করা, সে-কাজ মানুষ কিংবা দেবতা দেখুক কিংবা না-দেখুক; অথবা অন্যায়কারী হওয়া এবং দণ্ডকে এড়ানো গেলে অন্যায় কর্ম সাধন করা?

    গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, আমার মতে প্রশ্নটি এখন অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আমরা জানি, দেহের স্বাস্থ্য যদি ভেঙে পড়ে তা হলে তুমি যতই মাংস এবং মদ্য, সম্পদ এবং শক্তির যোগান দাও-না কেন, জীবন আর সহনীয় থাকে না। তেমনি আমরা বলব, জীবনের মূল শক্তি যেখানে শিকড়হীন এবং দূষিত হয়ে পড়েছে সেখানে ব্যক্তি ধর্মের পথ ত্যাগ করে। পাপাচারের সংশোধনকে অস্বীকার করে জীবনে দুর্মদ হয়ে সে মনে করে তার জীবন খুব মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    আমি বললাম : গ্লকন, তুমি ঠিকই বলেছ। প্রশ্নটি এখন হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু আমরা যখন সত্যের সন্নিকটে পৌঁছে গেছি এবং সত্যকে আবরণহীনভাবে অবলোকন করার মুহূর্ত যখন সমুপস্থিত তখন সংজ্ঞা হারানো আমাদের অনুচিত। সত্যকে লাভ করার চেষ্টাটি শেষ মুহূর্তে আমাদের পরিত্যাগ করা সঙ্গত নয়।

    গ্লকন বললেন : অবশ্যই নয়।

    আমি বললাম : তা হলে এই স্থানটিতে আর-একটু এগিয়ে এসো এবং অন্যায় এবং অধর্মের যত রূপ আমাদের দর্শন করা আবশ্যক, এসো আমরা তা দর্শন করি।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ সক্রেটিস, আমি তোমাকে অনুসরণ করে এগিয়ে আসছি।

    আমি বললাম : গ্লকন, যুক্তিটি এবার পর্যবেক্ষণের চূড়ায় যেয়ে আরোহণ করেছে। এখান থেকে কেউ নিচের দিকে তাকালে ধর্ম বা ন্যায়কে সে এক বলেই দেখতে পাবে। কিন্তু অধর্মের রূপ বিচিত্র। তাকে সে বিচিত্ররূপেই দেখতে পাবে। এই রূপের মধ্যে অধর্মের চারটি রূপের আমরা উল্লেখ করতে পারি। অধর্মের এ-চারটি রূপ উল্লেখযোগ্য।

    গ্লকন বললেন : তোমার এ কথার অর্থ কী সক্রেটিস?

    আমি বললাম, আমার কথার অর্থ হচ্ছে : রাষ্ট্রের যত রূপ দেখা যায় আত্মার রূপও তুমি ততটি দেখতে পাবে।

    এ-রূপ কতটি?

    আমি বললাম : রাষ্ট্রের রূপ পাঁচটি এবং আত্মার রূপ পাঁচটি। তারা কী সক্রেটিস?

    প্রথম রূপটির বর্ণনাই আমরা দিচ্ছিলাম। একে তুমি রাজতন্ত্র এবং অভিজাততন্ত্র—এই দুনামেই অভিহিত করতে পার। এদের পার্থক্য কেবল সংখ্যার ক্ষেত্রে; শাসনকার্য কি একটিমাত্র অভিজাত ব্যক্তি পরিচালনা করছে, না একাধিক অভিজাত দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, তার মধ্যেই এর পার্থক্য।

    ঠিকই, সক্রেটিস।

    কিন্তু দুটো নাম দিলেও এদের রূপ একটিই। কারণ আমরা রাষ্ট্রশাসনের যে-নীতি নির্দিষ্ট করেছি সেই নীতি অনুযায়ী শাসককুলকে শিক্ষিত করা হলে শাসনকার্য একের হাতে ন্যস্ত হোক কিংবা একাধিকের হাতে, তাতে আমাদের শাসনের মূলনীতি বিনষ্ট হবে না। মূলনীতি রক্ষিত হবে।

    গ্লকন বললেন : তোমার একথাও সত্য, সক্রেটিস

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার
    Next Article প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Our Picks

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }