৮. অভিভাবকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
অধ্যায় : ৮ [৩৭৫–৩৮৩]
অভিভাবকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
রাষ্ট্র রক্ষার জন্য যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পারদর্শী রক্ষিবাহিনীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অভিভাবক বা রক্ষক—এরূপ শব্দেই রাষ্ট্রের এই শ্রেণীর দায়িত্বের কথা প্রকাশ পায়। এদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। প্রথমত বৈদেশিক আক্রমণ থেকে। দ্বিতীয়ত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে। এই দায়িত্বপালনে তাদের কুকুরের মতো তেজ এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে। এরা কুকুরের ন্যায় মিত্রের প্রতি মিত্রসুলভ এবং শত্রুর প্রতি শত্রুসুলভ আচরণ করবে। “শত্রুর জন্য তার তেজ হবে বিপজ্জনক। কিন্তু বন্ধুর প্রতি সে তেজকে হতে হবে স্নিগ্ধ। তা যদি না হয় তা হলে রক্ষাকারীর এ-তেজ শত্রু আক্রমণের পূর্বে নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে” এ পর্যায়ে রক্ষাকারী বা অভিভাবকই হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী। কারণ রাষ্ট্রের উপর বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্লেটোর পরিকল্পনায় এখনও শাসনের সমস্যাটি আলোচিত হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ে এই রক্ষাকারীর মধ্য থেকেই দার্শনিক শাসকবর্গকে বাছাই করা হবে। তখন অভিভাবক বা শাসক বলতে দার্শনিক-শাসক এবং সৈন্যবাহিনী বা সহায়ক বাহিনীকে আমাদের পৃথক করতে হবে। কিন্তু তখনও সামগ্রিকভাবে সৈন্যবাহিনী এবং শাসকবর্গই হবে রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এজন্য ‘অভিভাবক’ দ্বারা প্রায় সময়ই রক্ষী বা সৈন্যবাহিনী এবং শাসক, উভয়কে প্লেটো বোঝাতে চেয়েছেন। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে পরিমাণগত পার্থক্য ব্যতীত উৎপাদকদের সঙ্গে এই দুই শ্রেণীর পার্থক্যের মতো মৌলিক গুণগত কোনো পার্থক্য প্লেটো নির্দেশ করতে চাননি।
.
আমি বললাম : কিন্তু এ-নির্বাচনের কাজটি খুব সহজ হবে না, গ্লকন। তথাপি এ-ব্যাপারে সাহসের সঙ্গেই আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সাধ্যমত নির্বাচনের কাজটি আমরা সম্পন্ন করব।
আমরা তা-ই করব, সক্রেটিস।
তা হলে কাজটি শুরু করা যাক। নির্বাচনের ক্ষেত্রে অভিজাত বংশের যুবকদের আমরা প্রথমে নির্বাচন করতে পারি। কারণ পর্যবেক্ষণ এবং প্রহরাদানের ব্যাপারে অভিজাত বংশের একটি তরুণকে তুমি একটি সুশিক্ষিত কুকুরের সঙ্গে তুলনা করতে পার।
সক্রেটিস, তোমার এ কথার তাৎপর্য কী?
আমি বলতে চাচ্ছি যে, অভিজাত বংশের যুবক আর একটি কুকুর এরা উভয়েই স্বভাবগতভাবে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণকারী এবং শত্রুর পশ্চাদ্ধাবনে দ্রুতগামী। এদের উভয়ের দেহ শক্তিশালী এবং শত্রুকে কবজা করে তাকে পর্যুদস্ত করতে এরা সক্ষম।
হ্যাঁ, শত্রুর সঙ্গে লড়াই-এর জন্য এ-সমস্ত গুণ অবশ্যই আবশ্যক।
তা ছাড়া গ্লকন, তোমার রাষ্ট্রের যে রক্ষাকারী, লড়াইতে দক্ষ হতে হলে তাকে সাহসীও হতে হবে। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক। তাকে সাহসীও হতে হবে।
কিন্তু যার তেজ নেই সে অশ্ব, কুকুর কিংবা অন্য যে-প্রকার জন্তুই হোক তার পক্ষে সাহসী হওয়া কি সম্ভব? তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে গ্লকন, তেজ বা মনোবলই হচ্ছে একমাত্র গুণ যা তার অধিকারীকে করে নির্ভীক এবং অপরাজেয়।
একথা আমি স্বীকার করি, সক্রেটিস।
তা হলে রাষ্ট্ররক্ষাকারীর জন্য কী ধরনের শারীরিক গুণের আবশ্যক তার একটি স্পষ্ট ধারণা আমরা লাভ করেছি।
একথা সত্য।
কেবল শারীরিক নয়, তার মানসিক গুণের ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। তার মনকেও অবশ্যই তেজোদীপ্ত হতে হবে?
যথার্থ।
কিন্তু এর আর-একটি দিক আছে। তেজ নির্মম। তেজ কাউকে সহ্য করে না, একথা কি সত্য নয়?
হ্যাঁ, তেজের এদিকটি সংবরণ করা সহজ নয়।
অথচ গ্লকন, আমাদের রাষ্ট্রের যে রক্ষাকারী তার তেজের লক্ষ্য হবে শত্রু মিত্র নয়। শত্রুর জন্য তার তেজ হবে বিপজ্জনক কিন্তু বন্ধুর প্রতি সে-তেজকে হতে হবে স্নিগ্ধ। তা যদি না হয় তা হলে রক্ষাকারী এ-তেজ শত্রুআগমনের পূর্বে নিজেদেরই ধ্বংস করে ফেলবে।
গ্লকন বললেন : এ আশঙ্কা যথার্থ, সক্রেটিস।
তা হলে এ তো এক সঙ্কটের বিষয়। শান্তস্বভাবের মধ্যে তেজি মনকে আমাদের আবশ্যক। অথচ এর একটি অপরটির একেবারে বিরোধী।
হ্যাঁ, সঙ্কটই বটে, সক্রেটিস।
যাকে আমরা রাষ্ট্রের রক্ষাকারী বলে নির্বাচিত করব এ-দুটি গুণের কোনোটিতেই তার অভাব থাকলে চলবে না। অথচ একই আধারে উভয় গুণের এরূপ সম্মেলন অসম্ভব। এ থেকে আমাদের তা হলে সিদ্ধান্ত করতে হয়, উত্তম রক্ষাকারী বলে কিছু হতে পারে না। কী বল গ্লকন?
এ সিদ্ধান্তই আমাদের গ্রহণ করতে হয় সক্রেটিস।
এমন সঙ্কটে হতবুদ্ধি হয়ে আমি স্মরণ করার চেষ্টা করলাম, এ-পর্যন্ত কী ঘটেছে। একটু চিন্তা করে গ্লকনকে বললাম : সুহৃদবর, নিঃসন্দেহে আমরা একটি জটিল পরিস্থিতিতে এসে উপনীত হয়েছি। কারণ, যে-কল্পলোক আমরা গোড়াতে তৈরি করেছিলাম সে-কল্পলোক যেন এবার হারিয়ে যাচ্ছে।
গ্লকন বললেন : তার মানে?
গ্লকন, আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, পরস্পরবিরোধী যে-গুণের উল্লেখ আমরা করেছি সেরূপ চরিত্র কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়।
কোথায় তুমি তার সাক্ষাৎ পেয়েছ?
অনেক জন্তুর মধ্যেই তুমি এরূপ গুণের সাক্ষাৎ পাবে। যেমন ধরো, আমাদের প্রিয় সহচর কুকুরের কথা। কুকুরের ব্যাপারে এটা আমাদের জানা কথা যে কুকুর তার পরিচিতজনদের প্রতি যেমন অত্যন্ত নম্র ব্যবহার করে, তেমনি অপরিচিতদের প্রতি তার ব্যবহার হয় একেবারে বিপরীত।
হ্যাঁ, একথা আমি জানি।
হ্যাঁ, একথা যদি সত্য হয় তা হলে আমাদের রাষ্ট্রের প্রহরার কাজেও এমন লোক পাওয়া অসম্ভব হওয়া উচিত নয় যার চরিত্রে এই উভয় গুণের একটা সম্মিলন সংঘটিত হয়েছে।
অবশ্যই, এরূপ চরিত্র পাওয়া অসম্ভব হওয়া উচিত নয়।
আর দ্যাখো রাষ্ট্রের রক্ষক হওয়ার যোগ্যতা যার চরিত্রে আছে তার মধ্যে দার্শনিকের গুণ থাকারও আবশ্যক হবে। একথা কি ঠিক নয়?
তোমার কথার তাৎপর্য আমি বুঝতে পারছিনে, সক্রেটিস।
আমি বললাম, নতুন যে-গুণের কথা আমি বলছি, কুকুরের চরিত্রে তারও আমরা সাক্ষাৎ পাই।
নতুন কী গুণের কথা বলছ তুমি?
আমি বুঝিয়ে বলছি। কুকুরের স্বভাবটি লক্ষ করো। অপরিচিত কাউকে যখন কুকুর দেখে তখন সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে; আবার পরিচিত কাউকে দেখলে সে আহ্লাদে আটখানা হয়ে পড়ে। অথচ অপরিচিত লোকটি যে তার কোনো ক্ষতি করেছে এমন নয়, আর পরিচিত ব্যক্তিও হয়তো তার কোনো উপকার সাধন করেনি। কুকুর-চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য কি তোমার চোখে অদ্ভুত বলে বোধ হয়নি?
গ্লকন বললেন : বিষয়টিকে আমি পূর্বে আবশ্য এভাবে দেখিনি। কিন্তু তোমার বক্তব্যের যাথার্থ্যকে আমি স্বীকার করি সক্রেটিস
কুকুরের সহজাত এই বোধশক্তিকে অবশ্যই তুমি উত্তম বলবে। আমি বলব, এ-কারণে সে একজন খাঁটি দার্শনিক বলে পরিগণিত হতে পারে।
কুকুরটা তোমার দার্শনিক হয়ে গেল!
হ্যাঁ, আশ্চর্যের কী আছে? কুকুর কেবল মুখ দেখেই জানা-অজানার ভিত্তিতে সুহৃদ আর শত্রুতে পার্থক্য করে ফেলে—এটা কি তার কম গুণের কথা! যে-পশু জানা-অজানার ভিত্তিতে তার পছন্দ এবং অপছন্দকে নির্দিষ্ট করে সে যে জ্ঞানের একজন প্রেমিক, একথা আমাদের মানতে হবে।
হ্যাঁ, সক্রেটিস, সে নিশ্চয়ই জ্ঞানপ্রেমিক।
আবার দ্যাখো জানা বা শিক্ষার আগ্রহ হচ্ছে জ্ঞানের প্রতি প্রেমস্বরূপ। এবং জ্ঞানের প্রেমিকই হচ্ছে দার্শনিক।
হ্যাঁ, জানার আগ্রহ আর জ্ঞানের প্রেমে কোনো পার্থক্য নেই।
এবার তা হলে মানুষের দিকে তাকানো যাক। মানুষের ব্যাপারেও আমরা তা হলে জোরের সঙ্গেই বলতে পারি, বন্ধুজনদের প্রতি যে বিনম্র, স্বভাবগতভাবে জ্ঞানেরও সে প্রেমিক হতে বাধ্য।
একথা নির্বিঘ্নেই আমরা বলতে পারি।
তা হলে আমাদের রাষ্ট্রের যে উত্তম রক্ষক হবে তাকে একাধারে যেমন দার্শনিক হতে হবে, তেমনি তার চরিত্রে থাকতে হবে তেজ, ত্বরা এবং শক্তির পরিচয়। ঠিক নয় কি গ্লকন?
নিঃসন্দেহে।
তা হলে অভীষ্ট আমাদের সিদ্ধ হয়েছে : আমাদের লক্ষ্যে আমরা পৌঁছে গেছি। রাষ্ট্রের রক্ষক হওয়ার জন্য যে-চরিত্রের আবশ্যক তার হদিস আমরা পেয়েছি। এবার প্রয়োজন হচ্ছে এই চরিত্রের লালন ও শিক্ষা। আর একথাও নিশ্চিত যে এই আলোচনার মাধ্যমে ন্যায়-অন্যায়ের চরিত্র নির্ধারণের প্রধান লক্ষ্যেও আমরা পৌঁছতে পারব। রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায় এবং অন্যায়ের উদ্ভব কেমন করে ঘটে, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে তাদের উদ্ঘাটন করা। এ-প্রয়াসে আমরা যেমন প্রয়োজনীয় কোনো বিষয়কে উপেক্ষা করব না, তেমনি লক্ষ্যে পৌঁছার পথকে আমরা কষ্টকর দৈর্ঘ্যেও প্রলম্বিত করতে চাইনে।
এ অনুসন্ধানকার্য যে আমাদের উপকারসাধন করবে, এ্যাডিম্যান্টাস সেরূপ অভিমতই প্রকাশ করলেন। আমি বললাম, তবু পথ যদি কিছুটা দীর্ঘ হয় তা হলেও এ দায়িত্ব আমরা কোনোক্রমেই পরিত্যাগ করতে পারিনে।
না, দায়িত্ব আমরা পরিত্যাগ করতে পারিনে।
এসো, তা হলে অবসর বিনোদনের উপায় হিসাবে আমরা গল্প বলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এই গল্পের মাধ্যমে আমাদের নায়কদের শিক্ষাদানও ঘটতে থাকবে।
হ্যাঁ, এ সিদ্ধান্ত উত্তম।
কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে পুরাতন শিক্ষার চেয়ে উত্তম কিছু কি আমরা চিন্তা করতে পারি? পুরাতন শিক্ষার দুটি দিকের কথা আমরা জানি। এর একটি হচ্ছে দেহগঠনের জন্য ব্যায়াম এবং আত্মার উন্নতির জন্য সঙ্গীতের ব্যবস্থা।
এ কথা সত্য।
এ দুটি বিভাগের কোটির আলোচনা আমরা শুরু করব? সঙ্গীত দিয়ে শুরু করে ব্যায়ামের ক্ষেত্রে পরে প্রবেশ করাই কি উত্তম হবে না?
অবশ্যই।
কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। সঙ্গীত বলতে কি তুমি সাহিত্যকেও বোঝাতে চাও?
হ্যাঁ, সঙ্গীত বলতে সাহিত্যও বোঝাবে।
কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন আছে : সাহিত্য সত্য হতে পারে; সাহিত্য অ-সত্যও হতে পারে।
হ্যাঁ, তা পারে।
আমাদের রাষ্ট্রের যুবকদের নিশ্চয়ই উভয়প্রকার শিক্ষা হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু তাদের শিক্ষা কি মিথ্যা দিয়েই আমরা শুরু করব?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তোমার কথার অর্থ আমি বুঝতে পারছিনে, সক্রেটিস।
আমি বললাম : আমার কথার অর্থ হচ্ছে, যে বয়সে আমরা শিশুদের গল্প বলতে শুরু করি সে বয়সে তারা শরীরগঠনের কৌশল শিক্ষার উপযুক্ত হয় না। আর যে-গল্প আমরা তাদের বলি সে গল্প একেবারে অসত্য না হলেও প্রধানত তা কল্পকথা।
তা ঠিক।
আমি একথাই বলতে চাচ্ছিলাম। আমি বলতে চাচ্ছিলাম, ব্যায়ামের আগে সঙ্গীত শেখানোই আমাদের কর্তব্য।
একথা খুবই সত্য।
কারণ যে-কোনো কাজের শুরুটাই হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তরুণদের অর্থাৎ যারা কচি তাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে একথা তো অবশ্যই সত্য। কচি বয়সেই চরিত্র গঠিত হয়; যা কিছু বাঞ্ছিত তার দাগ মনের উপর এই বয়সে সহজেই কেটে দেওয়া যায়। নয় কি?
নিশ্চয়ই।
তাই যদি হয়, তা হলে শিশুদের গল্প বলার ক্ষেত্রে কি আমরা অসতর্ক হতে পারি? অপরিণামদর্শী যেকোনো লোক শিশুদের যেকোনো অলীক কাহিনী শোনাবে আর সে কাহিনী থেকে তারা অবাঞ্ছিত ধারণা নিজেদের মনে গেঁথে নেবে, এরূপ অবস্থার অনুমোদন নিশ্চয়ই আমরা করতে পারিনে।
না, তা আমরা অনুমোদন করতে পারিনে।
তা হলে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় হচ্ছে বিধিনিষেধের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এ ব্যবস্থানুযায়ী যে কাহিনী শিশুদের জন্য উত্তম হবে, কেবল সে কাহিনী শিক্ষার অনুমতি দেওয়া হবে। যে কাহিনী উত্তম নয় সে কাহিনী নাকচ করা হবে। শিশুর জননী আর ধাত্রীর প্রতিও নির্দেশ থাকবে তারা শিশুদের কাছে কেবল অনুমোদিত গল্পই বলতে পারবে, নিষিদ্ধ গল্প নয়। তারা যত্নের সঙ্গে শিশুর তুলতুলে শরীরকে যেমন তৈরি করে, তার চেয়েও যত্নের সঙ্গে এই উত্তম গল্পের শিক্ষায় শিশুদের নরম মনকে তৈরি করে তুলবে। কিন্তু বর্তমানে যেসব কল্পকথা আছে তার বেশির ভাগই আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে।
এ্যাডিমেন্টাস জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কোন্ গল্পের কথা বলছ সক্রেটিস।
আমি বললাম : এর ক্ষুদ্রের নিদর্শন বৃহতের মধ্যেই পাওয়া যাবে। কারণ ক্ষুদ্র-বৃহৎ এদের চরিত্র অভিন্ন; একই মনোভাব উভয়ের মধ্যে কাজ করছে।
তা হতে পারে। কিন্তু কাকে তুমি বৃহৎ বলছ তা কিন্তু আমার কাছে এখনও বোধগম্য নয়, সক্রেটিস।
আমি বলছি কবিকুলের কথা আর সেই কবিকুলশ্রেষ্ঠ হোমার এবং হিসিয়ডের বর্ণিত কাহিনীর কথা। হোমার আর হিসিয়ড যে মানবজাতির কাহিনীকারদের শ্রেষ্ঠ, একথা তো আমরা জানি।
কিন্তু তাদের কোন্ গল্পের কথা তুমি বলছ আর সে-গল্পের ত্রুটিই-বা কী? তাদের গুরুতর ত্রুটি হচ্ছে এই যে, তাদের ভাষণ মিথ্যা আর কেবল মিথ্যাই নয়, নিকৃষ্ট প্রকারের মিথ্যা।
কিন্তু কখন তারা এরূপ ত্রুটির প্রশ্রয় দিয়েছে বলে তুমি মনে কর?
কেন? যখনই তারা দেবতাদের আর কাহিনীর নায়কদের কথা বর্ণনা করেছে তখনই তারা এই মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তাদের এ-ত্রুটি তুমি শিল্পীর অলীক চিত্রের সঙ্গে তুলনা করতে পার। শিল্পী যখন মূল বস্তুর সঙ্গে বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য ব্যতিরেকে তার চিত্র অঙ্কিত করে তখন সে যেমন এক মিথ্যার সৃষ্টি করে, এই কবির দলও তেমনি তাদের কাহিনীতে এক অলীক জগৎ তৈরি করে।
এ্যাডিমেন্টাস বললেন : এটা অবশ্যই দোষণীয়। কিন্তু কবিদের কোন্ কাহিনীকে তুমি নির্দিষ্ট করে বোঝাতে চাইছ, সক্রেটিস?
আমি বললাম : এদের মধ্যে বৃহত্তম মিথ্যা হচ্ছে ইউরেনাস সম্পর্কে কবির ভাষণ। ইউরেনাস সম্পর্কে হিসিয়ডের* ভাষণ আর ক্রোনাসের পালটা প্রতিশোধের কাহিনী কেবল যে বৃহত্তর মিথ্যা তা-ই নয়, এ মিথ্যা নিকৃষ্ট ধরনেরও বটে। ক্রোনাসের কার্যকলাপ এবং ক্রোনাসের উপর তার পুত্রের প্রতিশোধের কাহিনী স্মরণ করো। এ কাহিনী যদি সত্য হয় তা হলেও তরুণ এবং চিন্তার ক্ষমতাশূন্য লোকের কাছে এ কাহিনী এরূপ হালকাভাবে আদৌ বর্ণনা করা সঙ্গত নয়। সম্ভব হয় তো, এ কাহিনীকে নৈঃশব্দের আবরণে ঢেকে রাখাই কর্তব্য। কিন্তু এমন যদি হয় যে, এ কাহিনী বর্ণনা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই, তা হলেও এ কাহিনী কেবলমাত্র কিছুসংখ্যক নির্বাচিত শ্রোতার কাছেই বলতে হবে। সে বর্ণনার অনুষ্ঠান সাধারণ শুয়োর বলির মাধ্যমে সার্বজনীন করে তোলা চলবে না। সে অনুষ্ঠানে দুষ্প্রাপ্য কোনো পশুর বলিদান হোক যাতে শ্রোতার সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই নগণ্য হবে।
[*হিসিয়ড : থিওগনি]
এ্যাডিমেন্টাস বললেন : আমি তোমার সঙ্গে একমত সক্রেটিস। এ-কাহিনীগুলি খুবই আপত্তিজনক।
হ্যাঁ, এ্যাডিমেন্টাস, এ কারণেই আমি বলেছিলাম, আমাদের রাষ্ট্রে এমন কাহিনীর শিক্ষাদান চলবে না। আমাদের রাষ্ট্রের তরুণদের মনে এই মনোভাব সৃষ্টি করা চলবে না যে, পিতার ত্রুটি সংশোধনের নামে পিতাকে অসম্মানিত করার ন্যায় গর্হিত অন্যায় কার্য আসলে অন্যায় নয়, কারণ দেবশ্রেষ্ঠ যিনি তিনিও অনুরূপ কার্য করেছেন আর তরুণরা সেই আদর্শই অনুসরণ করছে।
আমি তোমার সঙ্গে সম্পুর্ণ একমত সক্রেটিস। এমন কাহিনী অবশ্যই পুনরাবৃত্তির অযোগ্য।
তা ছাড়া আমরা যদি চাই যে, আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষকগণ আত্মকলহকে সবচেয়ে খারাপ বলে মনে করবে, তা হলে স্বর্গের দেবতাদের আত্মকলহ, একের বিরুদ্ধে অপরের ষড়যন্ত্র এবং একের সঙ্গে অপরের লড়াই-এর যে কাহিনী প্রচলিত আছে, তার সঙ্গেও আমাদের তরুণদের পরিচিত হতে দেওয়া চলবে না। এগুলো অসার কাহিনী। দেবতাদের মধ্যকার এই সমস্ত লড়াইয়ের কথা তরুণদের নিকট আদৌ উল্লেখ করা চলবে না। পরিচ্ছদ-গাত্রে এ কাহিনীর উৎকীরণও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে। দেবসমাজে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও আত্মকলহের আরও বহু কাহিনী আছে। এসব কাহিনীর ব্যাপারে তরুণ সম্প্রদায়ের কাছে আমরা সম্পূর্ণরূপেই নীরব থাকব। বৃদ্ধা এবং জননী অর্থাৎ শিশুদের যারা গল্প শোনাবে তাদের কাজ হবে শিশুদের এরূপ শিক্ষা দেওয়া যে, আত্মকলহের ন্যায় ঘৃণ্য অপবিত্র কাজ আর কিছু হতে পারে না। তাদের বলতে হবে যে, মানুষ কখনো আত্মকলহে লিপ্ত হয়নি। শিশুদের বয়স যখন বৃদ্ধি পাবে তখন কবিরাও তাদের জন্য এমনই কাহিনী তৈরি করবে। কবিদের উপর নির্দেশ থাকবে তারা তরুণদের জন্য এমনই শিক্ষামূলক কাহিনী রচনা করবে। কিন্তু হোমার যেভাবে হেপিস্টাসকে দিয়ে তার জননী হেরাকে রজ্জুবদ্ধ করিয়েছেন কিংবা অপর কোথাও আবার মায়ের পক্ষ সমর্থন করায় হেপিস্টাসের উপর জিউসের নির্যাতন কিংবা দেবতায় দেবতায় লড়াই-এর কথা বর্ণনা করেছেন তার প্রচার সাধারণ কিংবা রূক যে-কোনো অর্থের বাহক হিসাবে নিষিদ্ধ করা হবে। কারণ একটি কিশোর-মন সাধারণ এবং রূপক অর্থের মধ্যে কী পার্থক্য তা নিরূপণ করতে পারে না। তার মনের কাছে তখন যা উপস্থিত করা হয় তা-ই অপরিবর্তনীয় হয়ে মনের পটে বিদ্ধ হয়ে যায়। সে কারণে একটি কিশোর তার জীবনে যে কাহিনীর কথা সবচেয়ে আগে শুনবে সে কাহিনীকে অবশ্যই পবিত্র ভাবের আধার হিসাবে আদর্শ হতে হবে।
তুমি ঠিকই বলছ সক্রেটিস। কিন্তু যদি প্রশ্ন ওঠে এমন আদর্শ কোথায় পাওয়া যাবে এবং কোন্ গল্পকে আদর্শ গল্প হিসাবে নির্দিষ্ট করা হবে, তখন আমরা কী বলব?
এ্যাডিম্যান্টাসের প্রশ্নের জবাবে আমি বললাম : তুমি এবং আমি এই মুহূর্তে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করছি। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ নীতি বা কাঠামোর কথা বলবে। কোন নীতির ভিত্তিতে কবিরা তাদের কাহিনী রচনা করবে এবং কোন নিয়ম-নিষেধ তারা মেনে চলবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা তারই নির্দেশ দেবে। কাহিনী রচনা তার দায়িত্ব নয়।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তোমার কথা যথার্থ। কিন্তু ধর্মতত্ত্বের ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কী?
আমি বললাম : এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য মোটামুটি এই যে, কাহিনীর আধার কাব্য, গীতিকাব্য বা বিষাদগাথা—যা-ই হোক না কেন, বিধাতাকে তার যথার্থ রূপেই প্রকাশ করতে হবে।
ঠিক কথা।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিধাতার রূপ কী? আমি বলব বিধাতার রূপ হচ্ছে উত্তম। তা-ই যদি হয়, তা হলে তাকে উত্তমরূপেই বিবৃত করতে হবে।
একথাও ঠিক।
কিন্তু কোনো উত্তম কি ক্ষতিকর বলে পরিচিত হতে পারে?
না, তা কী করে হবে?
আবার যা ক্ষতিকর নয় তা কোনো ক্ষতির কারণও নয়।
অবশ্যই সে কোনো ক্ষতির কারণ হতে পারে না।
যা ক্ষতির কারণ হতে পারে না সে কোনো অন্যায়ও সাধন করতে পারে না। ঠিক নয় কি?
না, সে কোনো অন্যায় করতে পারে না।
কিন্তু যে অন্যায় করতে পারে না, সে কি কোনো অন্যায়ের কারণ হতে পারে?
অসম্ভব। সে অন্যায়ের কারণ কীরূপে হবে?
বেশ! এবং উত্তম মঙ্গলকর। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
আর এজন্য তাকে মঙ্গলের কারণ বলে আখ্যায়িত করা যায়। তা ঠিক।
তা হলে কথাটা দাঁড়াচ্ছ এই যে, উত্তম সবকিছুরই কারণ নয়; উত্তম কেবল উত্তমেরই কারণ।
নিশ্চয়ই।
তা হলে এ্যাডিম্যান্টাস, বিধাতা সবকিছুরই মূলে বা সবকিছুরই কারণ বলে যে কথা প্রচলিত আছে সে কথা যথার্থ নয়। বিধাতা যদি উত্তম হয় তা হলে সে সবকিছুর কারণস্বরূপ হতে পারে না। সে মনুষ্যজীবনের কোনো কোনো বিষয়েরই মাত্র কারণ-স্বরূপ। মানুষের জীবনে অন্যায়ের পরিমাণ বা সংখ্যাই অধিক; ন্যায়ের পরিমাণ কম। বিধাতা মনুষ্যজীবনের ন্যায়ের কারণ; অন্যায়ের কারণ নয়। অন্যায়ের উৎস আমাদের অপর কোথাও সন্ধান করতে হবে; বিধাতার মধ্যে নয়।
তোমার একথা আমি খুবই যথার্থ বলে মনে করি।
তা যদি সত্য হয় তা হলে হোমার কিংবা অপর কোনো কবি যখন বর্ণনা করে বলেন :
দেবাদিদেব জিউসের কাছে রক্ষিত আছে ভাগ্যের দুটি ভাণ্ড :
একটি ন্যায়ের অপরটি অন্যায়ের।
আর সেই ভাণ্ড থেকে ন্যায় ও অন্যায়ের মিশ্রণ ঘটিয়ে
যার ভাগ্য তৈরি করেন দেবাদিদেব জিউস, তার জীবনে
খেলা চলে দুঃসময় আর সুসময়ের।
কিন্তু যার ভাগ্য তৈরি হয় কেবলমাত্র অন্যাযের আরক দিয়ে
সুন্দর পৃথিবীর বুকে বুভুক্ষার তাড়নে সে তাড়িত হয় নিশিদিন
কারণ দেবাদিদেব জিউস হচ্ছেন ন্যায় এবং অন্যায়ের বিধাতা।*
[* ইলিয়াড]
তখন সে কাহিনীর প্রতি আমরা কিছুতেই কর্ণপাত করতে পারিনে। আবার তেমন প্রতিজ্ঞাভঙ্গের উৎস হিসাবে প্যান্ডারাসের পরিবর্তে কেউ যদি এথেনি এবং জিউসকে নির্দিষ্ট করে কিংবা বলে দেবকুলের আত্মকলহের উৎপত্তি ঘটেছিল থেমিস এবং জিউসের প্ররোচনায়, তখন তার সে বর্ণনাকেও আমরা স্বীকার করতে পারিনে। একিলাসের ক্ষেত্রেও আমাদের একই সিদ্ধান্ত। ‘মানুষের ধ্বংসের জন্য বিধাতা মানুষের মধ্যে অন্যায়ের বীজ বপন করে দেয়’—একিলাসের এরূপ উক্তিও আমরা আমাদের তরুণদের কাছে প্রচারিত হতে দিতে পারিনে। তেমনি কোনো কবি যদি তার রচনায় নিওব বা পেলপে দুর্ভোগ এবং ট্রয়ের যুদ্ধকে বর্ণিত করতে মনস্থ করে তা হলে এসবের মূলে বিধাতা রয়েছে এমন কথা যেমন তাকে বলতে দেওয়া হবে না, তেমনি বিধাতার উল্লেখ থাকলেও অবশ্যই তার ভিন্নরূপ ব্যাখ্যা তাকে দিতে হবে। কবিকে বলতে হবে : যা যথার্থ এবং ন্যায় বিধাতা তারই কারণ হিসাবে কাজ করেছে। সে-কারণে যদি দুর্ভোগ কারও ভাগ্যে নিপতিত হয় তবে তা ন্যায্য বলেই নিপতিত হয়েছে। কিন্তু কবির একথা বলা চলবে না যে, দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে বিধাতা। কবি বলতে পারে যে, দুরাচারের দুর্ভোগ আসে, কারণ এ তার প্রাপ্য। বিধাতা যদি সে দুর্ভোগ দিয়ে থাকে তবে তার মঙ্গলের জন্যই দিয়েছে। কিন্তু একদিকে বিধাতা উত্তম, অপরদিকে সে অন্যায়ের কারণ—একথা শিশু কিংবা বৃদ্ধ কারও কাছেই ভাষণে, সঙ্গীতে, পদ্যে কিংবা, গদ্যে কোনোপ্রকারে একটা সুসংবদ্ধ সমাজব্যবস্থায় প্রচারিত হতে পারে না। এমন কাহিনী সে-রাষ্ট্রের জন্য অধর্ম, ধ্বংস, আত্মহত্যামূলক।
তোমার সঙ্গে আমি একমত, সক্রেটিস। আর এ বিধানকে আমি স্বীকার করি।
তা হলে এ্যাডিম্যান্টাস, বিধাতার ব্যাপারে এই হচ্ছে আমাদের বিধান যে, বিধাতা জগতের সবকিছুর কারণ বলে বর্ণিত হবে না; বিধাতা কেবল উত্তমেরই উৎস হিসাবে কাজ করবে। আমাদের কবি আর চারণকুলকে এ বিধান স্বীকার করতে হবে।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : অবশ্যই।
এবার একটি দ্বিতীয় নীতির কথা বলা যাক। নীতিটি হচ্ছে বিধাতার রূপ সম্পর্কে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিধাতা কি জাদুকর? জাদুকরের ন্যায় সে এখন একরূপ, তখন অন্যরূপে কি প্রকাশিত হতে পারে? বিভিন্ন রূপের প্রকাশ দ্বারা সে কি আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে? অথবা আমরা বলব যে, বিধাতার রূপ এক এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে সে আপন রূপে প্রতিষ্ঠিত। তুমি কী বল?
এ্যাডিমান্টাস বললেন : সক্রেটিস, আর একটু চিন্তা না করে তোমার এ প্রশ্নের আমি জবাব দিতে পারিনে।
আমি বললাম : বেশ। পরিবর্তনের কথা ধরা যাক। কোনোকিছুতেই যখন কোনো পরিবর্তন সংঘটিত হয় তখন সে পরিবর্তনের কারণ হয় সেই বস্তু নিজে নয়তো অপর কোনো শক্তি। নয় কি?
অবশ্যই।
কিন্তু বস্তুর ব্যাপারে যে বস্তু যত উত্তম সে তত অপরিবর্তনীয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যে ব্যক্তি যত সুস্থ এবং শক্তিশালী সে মদ্য কিংবা মাংসাহারে তত কম অসুস্থ হয়। এমনকি যে উদ্ভিদ যত সতেজ বায়ুর আঘাত, সূর্যের তাপ বা অপর কোনো কারণে তারও ক্ষতি তত কম। একথা কি সত্য নয়, এ্যাডিম্যান্টাস?
একথা অবশ্যই সত্য।
তা হলে যে সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে জ্ঞানী বাইরের কোনো প্রভাবে সে বিভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট হবে খুবই সামান্য। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
কেবল মানুষের ক্ষেত্রে নয়। তৈজসপত্র, গৃহ বা বস্ত্রাদি অর্থাৎ যে-কোনো সুমিশ্রিত বস্তুর ক্ষেত্রেই এ নীতি প্রয়োগ করা চলে। এ সমস্ত বস্তু যখন সুগঠিত হয় তখন সময় কিংবা অবাস্থান্তরের আঘাতে তাদের পরিবর্তনও খুব সামান্য ঘটে
খুবই সত্য কথা সক্রেটিস।
তা হলে আমরা দেখছি, যা-কিছু উত্তম তা মানুষের শিল্পকর্ম কিংবা প্রকৃতির সৃষ্টিকর্ম যা-ই হোক-না কেন, বাইরের আঘাতে তার পরিবর্তন খুব সামান্যই সংঘটিত হয়।
যথার্থ।
কিন্তু বিধাতা বা বিধাতার সৃষ্ট বস্তুসামগ্রী সম্পর্কে তুমি কী বলবে? বিধাতা নিজে এবং বিধাতার সৃষ্টি নিশ্চয়ই তা হলে সর্বপ্রকার সুসম্পূর্ণ?
নিশ্চয়ই তারা সুসম্পূর্ণ।
তা হলে বাইরের অভিঘাত তাকে বিভিন্ন রূপগ্রহণে নিশ্চয়ই বাধ্য করতে পারে না।
না, রূপান্তর গ্রহণে তাকে বাধ্য করা যায় না।
কিন্তু নিজের রূপান্তর নিজে সাধন করা তো তার পক্ষে সম্ভব। কী বল তুমি?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : সে যদি আদৌ পরিবর্তিত হয় তা হলে সে-পরিবর্তন সুস্পষ্টত নিজে থেকেই সাধিত হবে।
বেশ। কিন্তু নিজের পরিবর্তন সে কি অধিকতর উত্তমের উদ্দেশে সাধন করবে, না অধিকতর নিকৃষ্টের জন্য সে নিজেকে পরিবর্তিত করবে?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : বিধাতা যদি আদৌ পরিবর্তিত হয় তা হলে তাকে নিকৃষ্টতরই হতে হবে, সক্রেটিস। কারণ ধর্ম বা কান্তি কোনো ক্ষেত্রেই বিধাতা অসম্পূর্ণ ছিল এমন কথা আমরা ভাবতে পারিনে।
তোমার কথা খুবই যথার্থ, এ্যাডিম্যান্টাস। কিন্তু এমন কথাও কি আমরা ভাবতে পারি যে, বিধাতাই হোক আর মানুষই হোক, কেউ নিজেকে নিকৃষ্টতর করে পরিবর্তিত করতে চাইবে?
না, তা অসম্ভব।
তা হলে এমন কথাও ভাবা যায় না যে, বিধাতা আদৌ নিজের কোনো পরিবর্তন কামনা করতে পারে। কারণ বিধাতা হচ্ছে সর্বোত্তম এবং মনোহরতম। তাই সে তার নিজের রূপে নিত্যকালের জন্যই থাকবে অপরিবর্তিত।
আমার বিচারে যুক্তি পরম্পরায় এ-সিদ্ধান্তই আমাদের গ্রহণ করতে হয়।
তা হলে প্রিয় এ্যাডিম্যান্টাস, কবির দল যখন বলে :
দেবতার দল বৈদেশিকের বস্ত্র ধারণ করে
বিচিত্র রূপে আমাদের মধ্যে বিচরণ করে
তখন কবিদের আমরা স্তব্ধ হতে বলব। আমরা বলব, তোমাদের বিষাদাত্মক বা অপর কোনো কাব্যরীতিতেই প্রটিউস এবং থেটিসকে অপপ্রচারিত করতে পার না। হেরাকে ভিক্ষুণীর · বেশেইনাকাসের জীবনদায়িনী কন্যাগণের প্রার্থনাকারিণীর আকারে প্রকাশ করতে পার না। তোমাদের এমনিধারা মিথ্যার এবার শেষ হোক। কবিদের তৈরি উপাখ্যানের মিথ্যা ভাষ্যে জননীও তার শিশুদের শঙ্কিত করে তুলতে পারবে না। দেবতাদের দল বিচিত্র বেশে রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়ায়—এমন ভয়ংকর মিথ্যা কাহিনী বলে একদিকে জননীগণ তাদের শিশুদের মনে আতঙ্কের বীজ বপন করবে এবং অপরদিকে দেবতাদের চরিত্র দুর্নামে দুষ্ট করবে, এমন স্বাধীনতা জননীদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে।
এ্যাডিমান্টাস বললেন : অবশ্যই তাদের সে-স্বাধীনতা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে।
কিন্তু দেবতাগণ অপরিবর্তনীয় হলেও জাদুমন্ত্রাদির সাহায্যে তারা আমাদের সামনে বিভিন্ন রূপের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে কি উপস্থিত হতে পারে না?
তা হয়তো তারা পারে।
কিন্তু বিধাতা কথায় কিংবা কর্মে নিজেকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে বা নিজের মিথ্যা প্রতিভাস তৈরি করবে, এমন কথাকি তুমি ভাবতে পার?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমি তা বলতে পারিনে, সক্রেটিস।
আমি বললাম : কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস তুমি তো জান ‘সত্যমিথ্যা’ বা ‘যথাৰ্থ মিথ্যা’ বলে কোনো কথা যদি তৈরি করা যায় তা হলে এমন কথাকে দেবতা বা মানুষের যে কেউই ঘৃণা করবে।
তুমি কী বলতে চাচ্ছ সক্রেটিস?
আমি বলতে চাচ্ছি, কেউই তার যথার্থ প্রকৃতিতে মিথ্যা প্রতিপন্ন হতে চায় না। যাকে সে নিজের সর্বোত্তম বা যথার্থতম প্রকৃতি বলে বিবেচনা করে সে-প্রকৃতি মিথ্যার করায়ত্ত হোক, এমন ইচ্ছা কারোর পক্ষেই স্বাভাবিক নয়।
আমি এখনও তোমার কথা বুঝতে পারছিনে সক্রেটিস।
আমি বললাম : এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি বুঝতে পারছ না, কারণ তুমি আমার কথায় কোনো গভীর তাৎপর্য আরোপ করতে চাচ্ছ। কিন্তু আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, মানুষ নিজের আত্মার সত্তায়—অর্থাৎ তার চরিত্রের সর্বোত্তম ক্ষেত্রে প্রতারণা বা মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। এমন প্রবণতা মানুষের কাছে অবশ্যই ঘৃণ্য।
এবার অ্যাডিম্যান্টাস বললেন : মানুষের কাছে এর চেয়ে ঘৃণ্য আর কিছু হতে পারে না।
প্রতারিতের আত্মার এই অজ্ঞানতাকেই আমি ‘সত্যিমিথ্যা’ বা ‘যথার্থ মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করতে চেয়েছিলাম। কারণ শব্দের মিথ্যা তো আত্মার জন্য কেবল মিথ্যার আভাস মাত্র, বলতে পার মিথ্যার আঁচ। এ-মিথ্যা অবিমিশ্র মিথ্যা নয়। আমার একথা কি ঠিক নয়, এ্যাডিম্যান্টাস?
অবশ্য ঠিক, সক্রেটিস।
এমন অবিমিশ্র মিথ্যা কেবল দেবতাদের কাছে ঘৃণ্য নয়, মানুষও একে ঘৃণা করে।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
কিন্তু শব্দগত মিথ্যা সব সময় ঘৃণ্য নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শব্দগত মিথ্যার ব্যবহারগত সুবিধার দিক আছে। শত্রুর সঙ্গে আচরণ, এর একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। অথবা ধরো আমাদের কোনো সুহৃদ উন্মাদনা বা বিভ্রান্তির মুহূর্তে কোনো ক্ষতিকর কার্য সম্পাদন করতে যাচ্ছে। তেমন অবস্থায় আমাদের পক্ষে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ তার জন্য নিরাময় বা প্রতিরোধের মাধ্যম হিসাবে কাজ করতে পারে। পুরাণের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। পুরাণের প্রকৃত কথা আমরা জানিনে। তাই পুরাণ সম্পর্কে আমাদের মিথ্যাকে আমরা সত্যের আকার প্রদান করি। সেই সত্যেই আকার দিয়ে আমরা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করি।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : খুব ন্যায্য কথা।
কিন্তু মিথ্যা ব্যবহারের এ সমস্ত কারণের কোনোটিকেই কি আমরা বিধাতার উপর প্রয়োগ করতে পারি? বিধাতা কি পুরাণের বিষয়ে অজ্ঞ যে পুরাণের কারণে সে মিথ্যার আশ্রয় নেবে?
না সক্রেটিস, সে তো এক হাস্যকর ব্যাপার।
তা হলে আমাদের কবিকুলের মিথ্যা কাহিনীর সঙ্গে বিধাতা সম্পর্কে আমাদের ধারণার কোনো সম্পর্ক নেই।
আমি বলব, কোনো সম্পর্ক নেই।
আবার কোনো শত্রুর ভয়ে ভীত হয়ে বিধাতা মিথ্যার আশ্রয় নেবে, এমনও কল্পনা করা যায় না।
না, তেমন কথা কল্পনাতীত।
কিন্তু এমন তো হতে পারে যে, বিধাতার জ্ঞানহীন কিংবা উন্মাদ কোনো সুহৃদ আছে।
তা কেমন করে হবে! জ্ঞানহীন বা উন্মাদ কি বিধাতার বন্ধু হতে পারে? বেশ, তা হলে এমন কোনো কারণ বা উদ্দেশ্যের কথা আমরা চিন্তা করতে পারিনে যেজন্য বিধাতা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে।
না, তেমন কোনো কারণের কথাই আমরা চিন্তা করতে পারিনে।
তা হলে অতিমানব আর বিধাতা, মিথ্যার আশ্রয়গ্রহণে এরা একেবারেই অক্ষম।
হ্যাঁ, তারা একেবারেই অক্ষম।
তা হলে আমরা বলব, বিধাতা কথায় এবং কর্মে সরল এবং সত্য; তার কোনো পরিবর্তন নেই; নিদ্রায় বা জাগরণে, শব্দে বা সংকেতে বিধাতা কাউকে প্রতারণা করতে পারে না।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তুমি আমার মনের কথাই বলছ, সক্রেটিস।
তুমি তা হলে আমার সঙ্গে একমত যে, স্বর্গীয় ব্যাপার নিয়ে আমাদের ভাষণ বা রচনার দ্বিতীয় রীতি হবে এটাই। দেবতাকুল জাদুকর নয়। তারা জাদুমন্ত্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে না কিংবা মানবজাতিকেও তারা প্রতারিত করে না।
তোমার একথা আমি স্বীকার করছি।
তা হলে হোমারকে আমরা যতই প্রশংসা করিনে কেন, আমরা তার আগামেমননের কাছে জিউস দেবের স্বপ্ন প্রেরণের মিথ্যাকে প্রশংসা করতে পারিনে। একিলাস থেটিসের বিবাহের ব্যাপারে এ্যাপোলো সম্পর্কে যে-কাহিনী তৈরি করেছে, তাকেও আমরা স্বীকার করতে পারিনে। থেটিসের মুখে কাহিনীটি এরূপ :
এ্যাপোলো আমার বিয়ের আনন্দোৎসবে যোগ দিয়ে আমার সন্তানসন্ততির দীর্ঘ এবং সুস্থ জীবন কামনা করেছিল। আমার জীবন স্বর্গীয় আশীর্বাদে ধন্য হবে এই ছিল এ্যাপোলোর ভবিষ্যদ্বাণী। তার বাণীতে আমি সেদিন উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাম। ফিবাসের দৈববাণী বিফল হবে না—এই ছিল আমার ভরসা। অথচ যে-এ্যাপোলো আমার বিয়ের উৎসবে উপস্থিত হয়ে এই বাণী উচ্চারণ করেছিল সেই-ই আমার পুত্রকে আজ হত্যা করেছে।
দেবতাদের সম্পর্কে এরূপ মনোভাবের প্রকাশ আমাদের ক্ষুব্ধ না করে পারে না। অন্তত যারা এমন অপবাদের প্রচার করে তাদের সঙ্গে আমরা কণ্ঠ মেলাতে পারিনে। আমাদের তরুণ সম্প্রদায়কে শিক্ষকগণ এই মিথ্যা শিক্ষায় শিক্ষিত করবে, এমনটিও আমরা হতে দেব না। কারণ, তরুণ সম্প্রদায়ই হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষাকারী। তারা দেবতাদের অবশ্যই অকৃত্রিম পূজা-অৰ্চনায় ভক্তি করবে এবং ভালোবাসবে।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : সক্রেটিস, আমি তোমার সমস্ত নীতিকেই স্বীকার করছি। এ-সমস্ত নীতিকে আমি আমার বিধান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
