Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    সরদার ফজলুল করিম এক পাতা গল্প669 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৯. অভিভাবকদের শিক্ষা

    অধ্যায় : ৯ [৩৮৬–৪১২]

    অভিভাবকদের শিক্ষা

    প্লেটো সুবিস্তারিতভাবে তাঁর রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাখ্যা করেছেন। এজন্য রিপাবলিককে অনেকে বিখ্যাত শিক্ষাবিষয়ক গ্রন্থের অন্যতম বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্লেটো শিক্ষার বিভিন্ন স্তরকে পর্যায়ক্রমে স্থির করেছেন। প্লেটোর রাষ্ট্রে শিক্ষা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, শিক্ষা হচ্ছে নাগরিকদের স্বাভাবিক গুণ-নির্ধারণের উপায় এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রত্যেক নাগরিকের চরিত্রবিকাশের প্রধান মাধ্যম। তাই পরিকল্পিত এই রাষ্ট্রে শিক্ষার পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্র ব্যতীত অপর কারও এখতিয়ারে ন্যস্ত থাকতে পারে না। প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে রাষ্ট্রীয় এবং সামগ্রিক। এ ক্ষেত্রে যা স্মরণযোগ্য সে হচ্ছে এই যে, রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা স্পার্টার জন্য অভিনব কোনো ব্যাপার না হলেও এথেন্সের প্রচলিত শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা অপরিচিত এবং অভিনব ছিল বলে ইতিহাসকারগণ মনে করেন। কারণ, এথেন্সের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ব্যক্তিগত। পরিবারই শিশুদের আদর্শ নিয়ন্ত্রণ করত। এথেন্সের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল : পাঠ এবং লিখন; শরীরচর্চা এবং তৃতীয় পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা বা সাহিত্যপাঠ সাহিত্যপাঠ দ্বারা হিসিয়ড, হোমার প্রভৃতি প্রখ্যাত কবির কাব্য মুখস্থ করা এবং যন্ত্রসহযোগে গীত হওয়া বোঝাত। এর মধ্যে সঙ্গীতও তাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পর্যায়ের পর অষ্টাদশ বর্ষে শিক্ষার্থীদের দুবৎসরের জন্য সামরিক শিক্ষাও গ্রহণ করতে হত। প্লেটো তাঁর পরিকল্পনায় এই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মোটামুটিভাবে গ্রহণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত করে তাকে সংস্কার করার কথা চিন্তা করেছেন। কবি এবং কাব্যের শোধন এবং নিয়ন্ত্রণ-ব্যাপারে প্লেটোর যে উদ্বেগ এবং আগ্রহ আমাদের কাছে বিস্ময়কর বোধ হয় তার প্রধান কারণ এই যে, প্ৰাচীন গ্রীসে নীতিমালার উৎস হিসাবে কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থের পরিবর্তে প্রখ্যাত কবিদের কাব্য ও বাণীই কাজ করত। ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপারে কবিদের বাণীকে মান্য বলে উদ্ধৃত করা হত। প্লেটো তাঁর রাষ্ট্রের নীতির প্রয়োজনে কবিদের এই প্রভাবকে এবং ধর্মের পৌরাণিক কাহিনী এবং বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব করেন।

    .

    আমি বললাম : আমরা যদি চাই, আমাদের শিষ্যগণ তরুণবয়স থেকেই তাদের পিতা-মাতা এবং দেবতাদের ভক্তি করবে এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বের মূল্য দেবে তা হলে ধর্মের ক্ষেত্রে উপরোক্ত নীতিই আমাদের অনুসরণ করতে হবে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, আমাদের এই নীতি যে সঠিক তাও আমি বিশ্বাস করি।

    কিন্তু সাহসী হতে হলে তাদের এ ছাড়া অন্য শিক্ষাপ্রদান কি আমাদের কর্তব্য হবে না? আর সে শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে তরুণদের মন থেকে মৃত্যুর ভয় বিদূরিত হতে পারে। কেননা, যার মনে মৃত্যুর ভয় আছে সে কি সাহসী হতে পারে?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : নিশ্চয়ই না।

    কিন্তু পাতালভুবনকে যে বাস্তবিক এবং ভয়ংকর বলে বিশ্বাস করে তার পক্ষে মৃত্যু সম্পর্কে নির্ভয় হওয়া কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় এবং দাসত্বের পরিবর্তে মৃত্যুকে বরণ করা কি সম্ভব?

    না সক্রেটিস, তা অসম্ভব।

    তা হলে অন্যান্য গল্পের ন্যায় পাতালপুরীর গল্পকারদেরও নিয়ন্ত্রিত করার দায়িত্ব আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এরূপ কাহিনীকারদের আমরা অনুরাধ করব, পাতালপুরী সম্পর্কে তারা আতঙ্ক প্রচার না করে পাতালপুরীকে যেন আকর্ষণীয় করে বর্ণনা করে। কারণ, পাতালের জগৎ সম্পর্কে তাদের বর্ণনা মিথ্যা। এ বর্ণনা আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ যোদ্ধাদের মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, এটাও আমাদের কর্তব্য হবে।

    আমি বললাম : তা হলে মৃতের রাজ্যে সম্রাট হওয়ার চেয়ে দরিদ্র ভূস্বামীর ভূমির সামান্য অংশের দাস হওয়াকে আমি শ্রেয় মনে করব’ আমাদের কবিদের এরূপ আপত্তিকর উক্তিকে আমরা নিষিদ্ধ করে দেব। শুধু এই উক্তি নয়, কবির যে স্তবকে এমন কথা রয়েছে : প্লুটো ভয়ার্ত হয়ে বলছে : যে-ভয়ংকর এবং ভগ্ন ভবনকে দেবতারা পর্যন্ত ভয়ের চোখে দেখে মর অমর সবাইকে সেই ত্রাসসঙ্কুল ভবনের সম্মুখে আনয়ন করা হবে, সে উক্তিকেও তার রচনা থেকে আমরা মুছে ফেলব। তা ছাড়া কবি যেখানে বলেছে : উঃ কী ভয়ংকর হেডিসের প্রাসাদ! সে তো প্রেতাত্মাদের আশ্রয়স্থল। সেখানে কি মানুষের মনের কোনো ঠাঁই হতে পারে? কিংবা কবির উক্তিতে যেখানে রয়েছে : “পাতালপুরীতে সাধারণ আত্মার পক্ষে অপসৃয়মাণ প্রেতছায়ার ভাগ্যবরণ করা ছাড়া গত্যন্তর নাই” এবং “যে-আত্মা তার যৌবনকে পরিত্যাগ করে হেডিসে গমন করেছে সে তার ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়েছে এবং আর্তচিৎকারে সে পৃথিবীর অধঃদেশে ধূম্র হয়ে রহস্যময় গুহার গহ্বরে কেবল চক্রাকারে ঘুরে বেরিয়েছে; পর্বতগাত্র থেকে বাদুড় পড়ে গেলে যেমন আর্তস্বর তুলে পরস্পরকে অবলম্বন করতে চায়, হতভাগ্য এই আত্মার দলও তেমনি ভয়ার্তভাবে একে অপরকে পাতালপুরীতে খুঁজে বেড়ায়” রচনার এ-সমস্ত স্থানকে আমরা অবশ্যই নিষিদ্ধ ঘোষণা করব। হোমার এবং অন্য কবিদের কাছে আমাদের আবেদন হবে, তাঁরা যেন এ-কারণে আমাদের উপর রাগান্বিত না হন। তাঁদের এ-সমস্ত উক্তিকে আমরা অকাব্যিক, বা জনতার জন্য আকর্ষণশূন্য বলে নিষিদ্ধ করছিনে। আমরা নিষিদ্ধ করছি, কারণ, যে-তরুণসম্প্রদায় এবং নাগরিককে মুক্ত ও স্বাধীনচিত্ত হতে হবে এবং মৃত্যুর চেয়ে দাসত্বের শৃঙ্খলকে যাদের অধিকতর ভয়ের বিষয় বলে গণ্য করতে হবে, তাদের জন্য কবিদের এ-সমস্ত উক্তি যত বেশি আকর্ষণীয় বলে বোধ হবে তত বেশি এগুলিকে আমরা ক্ষতিকর বলে গণ্য করব।

    সক্রেটিস, একথা নিঃসন্দেহে সত্য।

    তা ছাড়া প্রেতপুরী, কবন্ধ, ছায়াবাস ইত্যাদি লোমহর্ষক যেসব নাম পাতাল জগতের উপর প্রয়োগ করা হয় সেগুলিকে আমাদের নিষিদ্ধ করতে হবে। এ-আখ্যানগুলি এত ভয়ংকর যে এগুলি শ্রবণমাত্র মানুষের অন্তর ভয়ে কেঁপে ওঠে। এ-সমস্ত ভয়ংকর কাহিনীর আদৌ কোনো উপযোগিতা থাকতে পারে না, এমন কথা আমি বলছিনে। কিন্তু এগুলির বিপদের দিক হচ্ছে এই যে, এ-সমস্ত ভয়ংকর কাহিনীর আঘাতে আমাদের রাষ্ট্রের রক্ষীগণের স্নায়ু যেমন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, তেমনি তাদের স্বভাব স্ত্রীজনোচিত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    হ্যাঁ, এ-আশঙ্কা ভিত্তিহীন নয়।

    তা-ই যদি হয় তা হলে এরূপ ভীতিজনক কাহিনীর আর প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।

    যথার্থ সক্রেটিস।—এ-সমস্ত কাহিনীর এখানে শেষ হোক।

    ভয়ের কাহিনী নয় নতুন মহত্তর বাণী আমাদের কণ্ঠে গীত হবে।

    অবশ্যই, সক্রেটিস।

    কিন্তু খ্যাতিমানদের ক্রন্দন এবং বিলাপেরও কি পরিসমাপ্তি ঘটা উচিত নয়?

    হ্যাঁ, অপরগুলির মতো, এগুলিকেও নিষ্ক্রান্ত হতে হবে।

    কিন্তু এদের বর্জন করা কি আমাদের পক্ষে সঙ্গত হবে? এসো, আমরা বিষয়টি চিন্তা করে দেখি। আমাদের নীতি হচ্ছে এই যে, উত্তম তার উত্তম সহযোদ্ধার জন্য মৃত্যুকে ভয়ংকর বলে গণ্য করবে না।

    হ্যাঁ সক্রেটিস, একথা ঠিক। এটাই আমাদের নীতি।

    আর সে-কারণেই গতায়ু সুহৃদ নির্মম কোনো দুর্ভোগে পতিত হয়েছে, এমন মনে করে বিলাপ করা তার পক্ষে সঙ্গত নয়।

    না, তার পক্ষে এরূপ বিলাপ করা সঙ্গত নয়।

    শুধু তা-ই নয়, আমরা আরও বলব, এরূপ লোক তার সুখে এবং স্বভাবে সুসম্পূর্ণ। তার বিলাপকারীর কোনো আবশ্যকতা নেই।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা যথার্থ।

    আর সে-কারণে সম্পদের বিনষ্টি, পুত্র কিংবা ভ্রাতার মৃত্যু এমন লোকের নিকট আদৌ কোনো ভয়ংকর ব্যাপার নয়।

    নিঃসন্দেহে সক্রেটিস।

    তা হলে এরকম দুর্ভাগ্যকে এরূপ উত্তম লোক যেমন কোনো বিলাপের বিষয় বলে গণ্য করবে না, তেমনি সর্বাধিক স্থিরতার ভাব নিয়েই তার মোকাবেলা করার ক্ষমতা সে প্রদর্শন করবে।

    হ্যাঁ সক্রেটিস, অন্যের চেয়ে এরূপ লোক তার দুর্ভাগ্যকে অধিক সহজভাবে গ্রহণ করবে।

    তা হলে খ্যাতিমানদের বিলাপ করা চলবে না। এরূপ বিলাপকে আমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করব। দেশের প্রতিরক্ষক হিসাবে যাদের আমরা শিক্ষিত করতে চাই তারা মরণকে পরোয়া করবে না। বিলাপের দায়িত্ব এদের নয়। বিলাপের দায়িত্ব বরঞ্চ আমরা অধম পুরুষ এবং নারীদের উপরই ন্যস্ত করব। নারীদের মধ্যেও যাদের কিছুমাত্র যোগ্যতা আছে বিলাপ তাদের জন্যও বাঞ্ছিত হবে না।

    এ-নীতি অবশ্যই যথার্থ হবে, সক্রেটিস।

    তা-ই যদি হয় তা হলে আমরা হোমার এবং অন্যান্য কবিকে আবার অনুরোধ করব যেন তাঁরা দেবীর সন্তান একিলিসকে অমন করুণ করে আর চিত্রিত না করেন। বিলাপরত একিলিস একবার শায়িত হলেন তাঁর পার্শ্বদেশের উপর, তারপর পৃষ্ঠদেশের উপর এবং তার পরে তিনি মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন। পরক্ষণে দণ্ডায়মান হলেন একিলিস, আর উন্মাদের ন্যায় শূন্য সমুদ্রের বুকে পাল তুলে ছুটে চললেন আবার। একবার তিনি দুহাত ভরে তুলে নিচ্ছেন কালিময় ভস্ম, নিজের মাথায় ঢেলে দিচ্ছেন, আবার তিনি আর্তচিৎকারে ভেঙে পড়ছেন। এমনি করে চিত্রিত করেছেন হোমার একিলিসকে। বিচিত্র ভঙ্গি একিলিসের আর্তনাদের। দেবকুলের আত্মজন প্রায়াম। তাঁকেও হোমার এমনি করে অঙ্কিত করেছেন। আর্ত আকুতিতে ভেঙে পড়ছে প্রায়াম, ধুলায় গড়িয়ে পড়ছে, সাথিদের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছে। না, বীরের এমন বিবরণ আমরা নিশ্চয়ই চাইব না। কিন্তু এর চেয়েও অধিক অবাঞ্ছিত বলব কবিদের হাতে দেবতাদের বর্ণনা। দেবতারাও বিলাপ করছেন, বলছেন :

    ‘হায়রে আমার দুর্ভাগ্য! এজন্যই কি আমি
    অসম সাহসীকে বক্ষে ধারণ করেছিলাম …

    আমরা বলব কবিকে : আপনি যদি অঙ্কিত করেন দেবতাদের চিত্র, তবে দোহাই আপনার, আপনার কলমের মুখে আমাদের দেবাদিদেবকে যেন বলতে না হয় :

    “হায়রে কপাল! আমার নিজের চোখে দেখতে হচ্ছে, আমার প্রিয় সুহৃদ পশ্চাদ্ধাবিত হচ্ছেন নগরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে আর আমার হৃদয় ভরে উঠছে বেদনায়!”

    কিংবা বলতে না হয় তাঁকে :

    কী হতভাগ্য আমি যে, মানবকুলের মধ্যে
    আমার প্রিয়তম সরিপেডনকে আমি
    পরাভূত হতে দেখছি প্যাট্রোক্লাসের হাতে” …

    কারণ, প্রিয় এ্যাডিম্যান্টাস, দেবতাদের এমন অপকাহিনী যদি আমাদের তরুণদের মনকে গুরুতররূপে প্রভাবিত করে, তা হলে তারাও অনুরূপ আচরণকে পরিহার না করে তার প্রতি আকর্ষণই বোধ করবে। ফলে আত্মসংযম বা লজ্জার বদলে তারাও অজুহাত পেলেই বিলাপের বিকারে ডুবে যাবে।

    এ্যাডিম্যান্টাস জবাব দিলেন : হ্যাঁ, সক্রেটিস, একথা খুবই সত্য।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, কিন্তু এরকম হওয়াটা সঙ্গত নয়। আমাদের যুক্তি তা-ই প্রমাণ করেছে। আর এর চেয়ে উত্তম যুক্তির সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত এই যুক্তির পথই আমরা অনুসরণ করব।

    হ্যাঁ, ঠিকই। এরকম হওয়াটা সঙ্গত নয়।

    আমাদের রক্ষকদেরও হাস্যাস্পদ হতে দেওয়া ঠিক নয়। কারণ উপহাসকে যদি মাত্রা অতিক্রম করতে দেওয়া হয়, তা হলে তার প্রতিক্রিয়াও সর্বদা মারাত্মক আকার ধারণ করে।

    আমারও তাই মনে হয়।

    কাজেই মানুষের মধ্যে যারা মর্যাদাবান তাদেরও যেমন উপহাসের বশীভূত বলে পরিচিত হওয়া উচিত নয়, তেমনি দেবতাদের ক্ষেত্রে একথা আরও সত্য। দেবতাদের এরূপ চিত্রিত করা অধিকতর অসঙ্গত।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, দেবতাদের ক্ষেত্রে একথা আরও সত্য। তাই যদি হয় তা হলে হোমারের মুখেও আমরা দেবতাদের এমন বর্ণনা শুনতে রাজি থাকব না, যে-বর্ণনায় বলা হয়েছে :

    “হিপাস্টাসকে প্রাসাদের চতুর্দিকে উত্তেজিত
    পরিক্রমায় রত দেখে মহান দেবতাদের মধ্যে
    অদৃশ্য এক হাসির দমক উছলে উঠতে লাগল”

    তোমার অভিমত অনুযায়ী এরূপ বর্ণনাকে আমরা স্বীকার করতে পারিনে।

    অভিমতটা আমার স্কন্ধে চাপাতে চাও, তাতে ক্ষতি নেই। যে কথা সত্য সে হচ্ছে এই যে, এরূপ বর্ণনাকে আমরা স্বীকার করতে পারিনে। আর তা ছাড়া সত্যকে আমাদের অবশ্যই অধিক মূল্যবান মনে করা উচিত। তাই পূর্বকথার ভিত্তিতে আমাদের বলতে হয়, দেবতাদের জন্য মিথ্যাচার যদি অপ্রয়োজনীয় এবং মানুষের জন্য কেবল ঔষধের মতোই প্রয়োজনীয় বোধ হয় তা হলে এরূপ ঔষধের ব্যবহার আমরা চিকিৎসাবিদের হাতেই সীমাবদ্ধ রাখব। সাধারণ মানুষ এরূপ মারাত্মক ঔষধ নিয়ে যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হতে পারে না।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : অবশ্যই নয়।

    আর তাই মানুষের মধ্যে কারু যদি মিথ্যা বলার অধিকার থাকে তবে সে-অধিকার কেবল রাষ্ট্রের শাসকবর্গেরই থাকতে পারে। রাষ্ট্রের শাসক শত্রুর মোকাবেলায় কিংবা নাগরিকদের শাসনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে। মিথ্যার আশ্রয়গ্রহণের অধিকার অপর কারুর থাকবে না। আবার নাগরিকের কাছে শাসকের মিথ্যা বলার এই অধিকার থাকলেও শাসকের সঙ্গে মিথ্যা বলার অধিকার শাসিতের থাকতে পারে না। শাসকের সঙ্গে শাসিতের মিথ্যাচারকে চিকিৎসকের কাছে নিজের দেহের কোনো রোগ সম্পর্কে মিথ্যা বলা কিংবা শারীরাগারের প্রশিক্ষকের কাছে শিক্ষানবিশের মিথ্যা বলার চেয়েও আমরা ঘৃণ্য মনে করব। কিংবা এরূপ মিথ্যাকে আমরা জাহাজের অধিনায়কের কাছে জাহাজের অবস্থান এবং তার সাথিদের অবস্থা সম্পর্কে নাবিকের সত্য বিবরণ না দেওয়ার চেয়েও নিন্দনীয় মনে করব।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : এ তো খুবই সত্য কথা।

    তা হলে শাসক যদি দেখে, সে ছাড়া অপর কেউ মিথ্যা বলছে তা হলে তাকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসাবে দণ্ডদানের তার অধিকার থাকবে। নয় কি?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : নিঃসন্দেহে! রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত করতে হয়, তা হলে অবশ্যই শাসকের এই অধিকার থাকবে।

    এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে সংযম বা মিতাচারের প্রশ্ন। আমাদের রাষ্ট্রের যুবশক্তিকে অবশ্যই সংযমী হতে হবে।

    নিশ্চয়ই।

    কিন্তু সংযমের চরিত্র কী? সাধারণভাবে যদি বলি তা হলে সংযম দ্বারা আমরা আদেশদাতার প্রতি বাধ্যতা এবং ইন্দ্রিয়সুখের ক্ষেত্রে আত্মসংযম বুঝব।

    একথা সত্য।

    তা হলে হোমারের কাব্যে ডায়োমেড যখন বলেন : ‘সুহৃদ তুমি স্থির থাকো এবং আমার অনুগত হও’, তখন সে-উক্তিকে আমরা অনুমোদন করব। নিচের কবিতার ছত্র দুটিতেও আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না :

    গ্রীসবাসীগণ শক্তিমত্তার সঙ্গে

    এবং তাদের নেতৃবৃন্দের প্রতি সভয় আনুগত্যে সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে চলল। অনুরূপ আবেগের প্রকাশে আমাদের অনুমোদন থাকবে।

    হ্যাঁ, এরূপ আবেগে আমাদের অনুমোদন থাকবে।

    কিন্তু আর-একটি ছত্রের কথা ধরো। ছত্রটি হচ্ছে : আহা! সুরায় সে আবিষ্ট। কুকুরের ন্যায় তার চোখ আর হরিণের ন্যায় তার অন্তর। কবির কাব্যে এর পরে আরও বাক্য আছে। শাসকদের লক্ষ্য করে কোনো নাগরিক এমনি পদ্যে কিংবা গদ্যে যদি ঔদ্ধত্যের উক্তি উচ্চারণ করে তা হলে আমরা কী বলব? এর উদ্দেশ্য কি মহৎ, না এ-উক্তি কুৎসা-রটনার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত?

    এ অবশ্যই কুৎসার উক্তি।

    এরূপ উক্তিতে কিছু আমোদের খোরাক থাকতে পারে। কিন্তু এমন উক্তি নিশ্চয়ই সংযমের সহায়ক নয়। কাজেই এমন উক্তি আমাদের তরুণদের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। এ-ব্যাপারে নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে একমত হবে?

    হ্যাঁ, আমি তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস।

    আবার যখন দেখি কবি সবচেয়ে জ্ঞানীর মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন যে, নিচের কথার চেয়ে মহত্তর কথা কিছু তিনি শোনেননি :

    “আহারের টেবিল সজ্জিত করা হয়েছে; রুটি আর মাংস অপরিমেয়; পরিচারক সুরাপাত্র-হাতে সুরা পরিবেশন করে চলেছে”, তখন আমরা কী সিদ্ধান্ত করব? আমাদের তরুণদের সংযমবৃদ্ধির জন্য এরূপ কাহিনীর অবতারণা কি মঙ্গলকর? শুধু উপরের কাহিনী নয়, আর-এক ছত্রে কবি বলেছেন : “বুভুক্ষায় মৃত্যুবরণের চেয়ে দুঃখজনক ভাগ্য আর কী হতে পারে?” এখানেই শেষ নয়। ধরো জিউসদেবের কাহিনীর কথা। মনুষ্যকুল নিদ্রামগ্ন। দেবতাকুলও তা-ই। দেবাদিদেব জিউস একাকী জাগ্রত। তিনি জগৎ সম্পর্কে চিন্তা করছেন, পরিকল্পনা প্রণয়ন করছেন। কিন্তু হীরাদেবীকে দর্শনমাত্র জিউসদেব আত্মহারা হয়ে পড়লেন। ইন্দ্রিয়লিপ্সা তাঁকে মুহূর্তের মধ্যে পরাভূত করে ফেলল। জগৎ সম্পর্কে পরিকল্পনার কথা তিনি বিস্মৃত হলেন। হীরাকে নিয়ে শয্যাশায়ী হবার জন্য তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। কুটিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের বিলম্ব তার অসহনীয় হয়ে উঠল। জিউস বললেন : “হীরার সঙ্গে এমন বিমোহিত অবস্থা তাঁর আর কখনো ঘটেনি—এমনকি তারা যখন পিতামাতার দৃষ্টির অন্তরালে প্রথম মিলিত হয়েছিল, তখনও নয়।’

    কিংবা ধরো হিপাসটাসের কাহিনী। প্রেমরত আরিস এবং আফ্রোদিতের দর্শনে তাদের দুজনকেই হিপাসটাস শেকল দিয়ে বেঁধে ফেললেন।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি এমন কাহিনী আমাদের তরুণদের কোনোক্রমেই শ্রবণ করা উচিত নয়।

    কিন্তু প্রখ্যাত ব্যক্তিগণের ধৈর্যের কীর্তি এবং কাহিনী তরুণদের জন্য পরিবেশন করা যায়। এসব কাহিনী তাদের শ্রবণ করা উচিত। নিচের ছত্র দুটিতে এরূপ কথারই উল্লেখ আছে :

    “বক্ষকে সে আঘাত করল এবং নিজের অন্তরকে সে তিরস্কৃত করে বলল, হে আমার হৃদয়, ধৈর্যধারণ করো; এর চেয়ে অধিকতর কষ্টকর অবস্থা কি তুমি সহ্য করনি?”

    হ্যাঁ, এরূপ কাহিনী আমাদের তরুণদের অবশ্যই শ্রবণ করা সঙ্গত।

    তা ছাড়া আমাদের তরুণদের জন্য পারিতোষিক গ্রহণ এবং অর্থের কামনাকে নিষিদ্ধ করতে হবে। আমরা তরুণদের পারিতোষিক গ্ৰহণ কিংবা অর্থের কামনাকে অনুমোদন করতে পারিনে।

    না, আমরা তা অবশ্যই অনুমোদন করতে পারিনে।

    “উৎকোচে দেবতা এবং পূজ্য রাজা সবাই বশীভূত” সঙ্গীতের এমন ধুয়া আমরা তরুণদের জন্য পরিবেশন করব না। আবার আর-একটা কাহিনী ধরো। একিলিসের শিক্ষক ফিনিক্স তাঁর ছাত্রকে গ্রীসবাসীদের নিকট থেকে পারিতোষিক গ্রহণ করে তাদের সহায়তাদানের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এমন উপদেশদানকে আমরা উত্তম বলে অনুমোদন করতে পারিনে। কিংবা একথাও আমরা স্বীকার করতে পারিনে যে, একিলিস এত অর্থলিপ্সু বা পারিতোষিকপ্রার্থী ছিলেন যে, পারিতোষিক লাভ করেই তিনি হেক্টরের মৃতদেহ প্রত্যর্পণ করতে সম্মত হয়েছিলেন এবং যতক্ষণ তিনি তা পাচ্ছিলেন না ততক্ষণ হেক্টরের মৃতদেহ তিনি প্রত্যর্পণ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : না, এরূপ মনোভাবকে আমরা অনুমোদন করতে পারিনে।

    হোমার আমার যেরূপ প্রিয় কবি তাতে একথা আমি বলব না যে, কবি একিলিসের মধ্যে এরূপ মনোভাব সৃষ্টি করে নিন্দনীয় অধর্মের অপরাধে অপরাধী হয়েছেন। এ্যাপোলোদেবের প্রতি ঔদ্ধত্যের যে-কাহিনীর উল্লেখ কবি করেছেন তাকেও আমি বিশ্বাস করতে চাইনে। …

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তোমার এ কথা ঠিকই।

    পসিডনের পুত্র থিস্যুস কিংবা জিউসের পুত্র পিরিথুস কিংবা অপর কোনো বীর ঘৃণ্য বলাৎকারের ন্যায় পাপকার্যে লিপ্ত হবে এমন কাহিনী আমরা বিশ্বাস করতে পারিনে। দেবতা এবং বীরদের সম্পর্কে এ-অপবাদ মিথ্যা। কবিদের কাছে আমাদের দাবি হবে, হয় তাঁরা ঘোষণা করবেন এরূপ অপরাধজনক কাজ তাঁরা করেননি অথবা বলবেন, এমন অপকর্মের নায়ক দেবতাদের সন্তান নয়। কিন্তু আমরা কবিদের মুখে একই নিশ্বাসে দেবতাদের সম্পর্কে উভয় রকম অপবাদ উচ্চারিত হতে দিতে পারিনে। দেবতারা সব পাপকার্যের নায়ক আর সাধারণ মানুষ থেকে বীরপুরুষ আদৌ পৃথক নয়—আমাদের তরুণরা কবিদের কাছ থেকে এমন ভ্রান্ত শিক্ষা পাবে, এ আমরা হতে দিতে পারিনে। কবিদের এমন মনোভাব যেমন নিষ্কলুষ নয়, তেমনি যথার্থও নয়। কেননা আমরা পূর্বেই প্রমাণ করেছি : দেবতারা কোনো অন্যায়ের উৎস হতে পারে না।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : নিশ্চয়ই নয়।

    তা ছাড়া এসব উপাখ্যান যারা শ্রবণ করে তাদের ওপরও এর অবাঞ্ছিত প্রভাব ঘটতে পারে। কারণ তখন সকলেই নিজের অপকর্মকে, এই বলে ক্ষমা করতে শুরু করবে যে, দেবাদিদেব জিউসের আত্মীয়স্বজনরা দেবতা হয়েও যখন এরূপ পাপকর্মে লিপ্ত হতে পারে তখন মানুষ হিসাবে আমাদের পক্ষে এগুলো অন্যায় নয়। কাজেই এসব ভিত্তিহীন উপাখ্যান আমাদের বন্ধ করে দেওয়া কর্তব্য। নচেৎ তরুণদের নীতিবোধের বন্ধনকে এরা শ্লথ করে দেবে।

    এতে কোনো সন্দেহ নেই সক্রেটিস।

    তরুণদের আমরা কী কী বিষয়ে শিক্ষিত করে তুলব তা নিয়ে আমরা যখন আলোচনা করছি, তখন আমাদের দেখা আবশ্যক, কোনো বিষয়কে আমরা বিস্মৃত হয়েছি কি না। দেবতা, অধিদেবতা আর মর্ত্যলোকের বীর—কাদের সম্পর্কে কী শিক্ষা দেওয়া হবে তা আমরা ইতিপূর্বে নির্দিষ্ট করেছি।

    অবশ্যই তা আমরা করেছি।

    তা হলে সাধারণ মানুষ সম্পর্কে আমরা কী বলব? আমাদের আলোচ্য বিষয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপারে আমাদের বক্তব্যটি এখনও বাকি।

    একথা ঠিক, সক্রেটিস।

    কিন্তু সুহৃদবর, এ-প্রশ্নের জবাবদানের অবস্থা আমাদের এখনও হয়নি বলেই আমার মনে হচ্ছে।

    কেন সক্রেটিস?

    কারণ আমাদের বলতেই হবে যে, কবি এবং কাহিনীকার—এঁরা সাধারণ মানুষ সম্পর্কে যখন বলেন যে, জগতে যারা অন্যায়কারী তারাই সুখী এবং যারা উত্তম তারা অসুখী এবং অসহায়; যখন তাঁরা বলেন, অন্যায়কর্ম ধরা না পড়লে লাভজনক এবং ন্যায় ধর্ম একের লোকসান আর অপরের লাভ ছাড়া কিছু নয়, তখন তাঁরা মারাত্মক রকমের মিথ্যাচারণে লিপ্ত হন। এরূপ মিথ্যাভাষণকে কবি এবং কাহিনীকারদের জন্য অবশ্যই নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করতে হবে। এর বিপরীত-মর্মী কাব্য এবং কাহিনী রচনার জন্য তাঁরা আদিষ্ট হবেন। এ-ব্যাপারে তোমার কী মনে হয়?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : অবশ্যই কবি এবং কাহিনীকারদের উপর এরূপ আদেশই আমরা জারি করব।

    আমি বললাম : এ-বিষয়ে আমাকে যদি তুমি সঠিক বলে স্বীকার কর, তা হলে আমি বলব, যে-নীতি নিয়ে আমরা এ-যাবৎ পরস্পর তর্ক করেছি তুমি তাকেও মেনে নিচ্ছ?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তোমার অনুমানকে আমি মেনে নিচ্ছি সক্রেটিস। অবশ্য মানুষ সম্পর্কে এমন উক্তি করা চলে কি চলে না তার শেষ নিষ্পত্তি আমরা ন্যায় কী এবং ন্যায়বান অপরের চোখে ভালো কিংবা মন্দ যেভাবেই দৃষ্ট হোক-না কেন, ন্যায় যে তার জন্য মঙ্গলকর—এ-সত্য উদ্ধার করার পরেই আমরা করতে পারি, তার পূর্বে নয়।

    এ কথা যথার্থ।

    বেশ, তা হলে কবিতার প্রসঙ্গ আমরা ছেড়ে দিই। কাব্যের ওপর যথেষ্ট হয়েছে। এবার বরঞ্চ আমরা কাব্যের রীতি নিয়ে আলোচনা করব। এ-কাজ সমাধা হলে কাব্যের কথা এবং কৌশল—দুটো দিকের আলোচনাই আমাদের শেষ হবে।

    এবার এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তুমি কী বলতে চাচ্ছ, আমি বুঝতে পারছিনে সক্রেটিস।

    তা হলে কথাটা আমায় বুঝিয়ে বলতে হয়। বোধগম্য হওয়ার জন্য ব্যাপারটা এভাবেও বলতে পারি। তুমি নিশ্চয়ই জান, কবিতা আর পুরান অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ ঘটনার বর্ণনা বই আরকিছু নয়।

    অবশ্যই।

    আর বর্ণনা সহজ বর্ণনা, বর্ণনার অনুলিপি কিংবা এ-দুটোর মিলনে রচিত হতে পারে। ঠিক নয় কি?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : না সক্রেটিস, এ-ব্যাপারটাও আমি বুঝতে পারলাম না।

    এবার তো শিক্ষক হিসাবে লজ্জা আমারই। আমি এক অপদার্থ শিক্ষক। না হলে বিষয়টা বুঝতে এত অসুবিধে হচ্ছে কেন? এবার তা হলে কৌশলটা বদলাতে হয়। খারাপ বক্তার ন্যায় বরঞ্চ আমি সমগ্র বিষয়টা একসঙ্গে উত্থাপন না করে এর একটি অংশকে আমার অর্থের দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করছি। তুমি তো ইলিয়াডের উদ্বোধনী ছত্র ক’টি জান। কবি এ-চরণগুলোতে ক্রাইসেস-এর উল্লেখ করে বলছেন ক্রাইসেস আগামেমননের কাছে তাঁর কন্যার মুক্তির দাবি করেন। কিন্তু এ-দাবি শুনে আগামেমনন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ক্রাইসেস নিজের উদ্দেশ্যসাধনে ব্যর্থ হয়ে একিয়ানদের বিরুদ্ধে দেবতার সাহায্য কামনা করেন। এই ছত্রগুলি সম্পর্কে লক্ষণীয় হচ্ছে যে, কবি এখানে উত্তম পুরুষে কথা বলছেন। তাঁর উক্তি থেকে আমরা আদৌ বুঝতে পারিনে যে তিনি অপর কেউ। কিন্তু এর পরবর্তী পঙ্ক্তিতে আমরা দেখি কবি ক্রাইসেস-এর জবানিতে কথা বলছেন। আর এর পরে দেখা যায় কবি এমনভাবে বর্ণনা করছেন যেন বক্তা হোমার নন, বক্তা হচ্ছে বৃদ্ধ পুরোহিত স্বয়ং। এই দ্বৈত ভূমিকায় কবি সমগ্ৰ ওডিসিতে ট্রয় এবং ইথাকার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ অবশ্যই ঠিক

    কবির বর্ণনার এই কৌশলকে কবির নিজের আবৃত্তি কিংবা আবৃত্তির অন্তর্বর্তী চরণ সর্বত্রই আমরা দেখতে পাই।

    যথার্থ সক্রেটিস।

    কিন্তু কবি যখন অপর কারুর জবানিতে কথা বলেন তখন কি তিনি সেই অপর চরিত্রের প্রকাশরীতিকেই আত্মস্থ করে নেন না?

    অবশ্যই কবি অপর চরিত্রের রীতি গ্রহণ করেন।

    কিন্তু অপর চরিত্রের রীতির এরূপ গ্রহণ, সে কণ্ঠধ্বনিতে হোক কিংবা ভঙ্গিতেই হোক, সেই প্রক্ষিপ্ত চরিত্রের কি অনুকরণ নয়?

    অবশ্যই তা অনুকরণ।

    তা হলে এক্ষেত্রে কবির বর্ণনা অনুকরণকে অনুসরণ করেছে, একথা আমরা বলতে পারি?

    অবশ্যই একথা আমরা বলতে পারি।

    আবার অন্যদিকে কবি যদি কোনো ক্ষেত্রেই অপর কোনো চরিত্রের ভূমিকা গ্রহণ না করেন তা হলে তাঁর মধ্যে আর অনুকরণ থাকে না এবং তাঁর বর্ণনা সরাসরি বর্ণনাতে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু আমার বক্তব্যটি আর একটু স্পষ্ট করার জন্য এবং যাতে তুমি আবার বলে উঠতে না পার “সক্রেটিস, আমি তোমায় বুঝতে পারছিনে” সেজন্য এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিও আমি তোমাকে দেখাতে চাই। ধরো হোমার বলছেন : “পুরোহিত তাঁর কন্যার মুক্তিপণ হাতে নিয়ে একিয়ানদের এবং তাঁদের রাজার কাছে আবেদনে ভেঙে পড়লেন।” আর ক্রাইসেসের কোনো জবানি উল্লেখ না করে তাঁর বর্ণনাটা কবি যদি এই রীতিতে চালিয়ে যেতেন তা হলে আমরা বলতাম কবি নিজের ভাষায় কথা বলছেন এবং তাঁর বর্ণনা সাক্ষাৎ বর্ণনার চরিত্র গ্রহণ করেছে। এই রীতিতে কবির বর্ণনাটি যেমন হত তার আমি উল্লেখ করছি। আমি অবশ্য কবি নই তাই ছন্দ বাদ দিয়েই আমি বিবরণটি পেশ করছি : “এবার পুরোহিত এলেন। হাতে তাঁর মুক্তিপণ। তিনি গ্রীকদের হয়ে দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন তারা ট্রয়কে জয় করে নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। তাঁর অনুরোধ, গ্রীকগণ যেন মুক্তিপণ গ্রহণ করে তাঁর কন্যাকে মুক্তিদান করে এবং দেবতাকে সম্মান প্রদর্শন করে। পুরোহিত এমনিভাবে তাঁর আবেদনটি গ্রীকদের সামনে উপস্থিত করলেন। গ্রীকগণ পুরোহিতকে সম্মান করত। তারা তাঁর আবেদনটি গ্রহণের জন্য সম্মতি প্রকাশ করল কিন্তু আগামেমননের ক্রোধ প্রশমিত হল না। তিনি পুরোহিতকে নিষ্ক্রান্ত হতে বললেন। আগামেমনন পুরোহিতকে সতর্ক করে দিলেন, পুরোহিত পুনরায় তাঁর আবেদন নিয়ে এলে দেবতাগণও তাঁকে কোনো সাহায্য করতে সক্ষম হবে না। ক্রাইসেসের কন্যাকে মুক্তি দেওয়া হবে না। তাঁর কন্যা আরগসে আগামেমননের সঙ্গে জীবনপাত করে একদিন বার্ধক্যে উপনীত হবে। পুরোহিত নিরাপদে আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে চাইলে তাকে উত্তেজিত না করে যেন তিনি অবিলম্বে আগামেমননের সম্মুখ থেকে প্রস্থান করেন। এই উক্তি শ্রবণ করে বৃদ্ধ নীরবে আতঙ্কিত হৃদয়ে আগামেমননের শিবির পরিত্যাগ করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে দেবতা এ্যাপোলোকে তাঁর সকল নামে আরাধনা করতে লাগলেন। দেবতা এ্যাপোলোকে বৃদ্ধ পুরোহিত স্মরণ করিয়ে দিলেন তাঁর মন্দিরস্থাপনে কিংবা তাঁর উদ্দেশে পশু উৎসর্গে তাকে তুষ্ট করতে কোনোদিন তিনি কার্পণ্য করেননি। আজ তার বিনিময়ে যেন তিনি তাঁকে রক্ষা করেন এবং তাঁর চোখের অশ্রু যেন দেবতার বাণ নিয়ে একিয়ানদের উপর নিপতিত হয়।” এভাবে কবির বিবরণ একটি সাক্ষাৎ বর্ণনার আকার গ্রহণ করবে।

    আমার এ-বিবরণ শুনে এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : এবার আমি বুঝতে পারছি।

    আবার তুমি এর বিপরীতটিও চিন্তা করতে পার। মনে করো মধ্যবর্তী অনুচ্ছেদগুলিকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র সংলাপটিকে রাখা হল।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, এটাও আমি বুঝতে পারছি। তুমি হয়তো বিয়োগান্ত নাটকের কথা বলতে চাচ্ছ।

    আমার কথার তাৎপর্য তুমি যথার্থই ধরতে পেরেছ। আর আমার তো মনে হয়, যে-কথা তুমি এর পূর্বে বুঝতে পারনি, সেকথা তুমি এবার বুঝতে পারছ। অর্থাৎ কাব্য এবং পুরাণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোপুরি অনুকারী। বিয়োগান্ত আর মিলনান্তক নাটকে আমরা এর দৃষ্টান্ত পাই। আর এর বিপরীত রীতিরও দৃষ্টান্ত আছে যেখানে কবি হচ্ছে একমাত্র কথক। বীররসাত্মক কাব্যে এর উত্তম উদাহরণ পাওয়া যায়। মহাকাব্য এবং অপরাপর রচনায় উভয় রীতির সাক্ষাৎ মেলে। কী বল এ্যাডিম্যান্টাস? আমার কথার তাৎপর্যটি তুমি ধরতে পারছ?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ সক্রেটিস, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি। আমি তোমায় আর-একটি কথাও স্মরণ করিয়ে দেব। আমি বলেছিলাম,এ-বিষয়ে যথেষ্ট হয়েছে; এবার আমরা রীতির আলোচনায় চলে যাব।

    হ্যাঁ, তাও আমার মনে আছে।

    আমার সেকথা বলার অর্থ ছিল, অনুকারী কাব্যকলা সম্পর্কে আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। ঘটনার বর্ণনায় কবিদের কি অনুকারী রীতি অনুসরণ করতে দেওয়া হবে? যদি কবিদের তা করতে দেওয়া হয় তবে তা কি সমগ্র রচনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, না তার অংশবিশেষের উপর? যদি অংশবিশেষের উপর হয় তা হলে রচনার কোন্ অংশে এ-রীতি ব্যবহৃত হবে? অথবা অনুকারী-রীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হবে?

    সক্রেটিস, তোমার প্রশ্নটা কি এই, বিয়োগান্ত এবং মিলনান্তক রচনাকে আমরা আমাদের রাষ্ট্রে রচিত হতে দেব কি দেব না?

    আমি বললাম : হ্যাঁ, তা-ই বটে। তবে প্রশ্নের তাৎপর্য আরও অধিক কিছু হতে পারে। আমি নিজেও নিশ্চিত নই। আমি কেবল এটুকু বলতে পারি, যুক্তির হাওয়া আমাদের যেদিকে টেনে নেবে, আমরা সেদিকেই যাব।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : অবশ্যই। সেদিকেই আমাদের যেতে হবে।

    তা হলে, এ্যাডিম্যান্টাস, আমার প্রশ্ন হচ্ছে : আমাদের রাষ্ট্রের যারা অভিভাবক তারা কি অনুকারী হবে? অথবা বলব, এ-প্রশ্নের জবাব আমাদের মূল বিধানেই রয়ে গেছে? মূল বিধানের সিদ্ধান্ত ছিল : একটি মানুষ কেবল একটি কাজই সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারে, একাধিক কাজ নয়। যদি কেউ একাধিক কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে তা হলে সে কোনোটিতেই তেমন সুনাম অর্জনে সক্ষম হবে না।

    নিঃসন্দেহে।

    আর একথা অনুকরণের ক্ষেত্রেও সত্য। একটি বিষয়ের অনুকরণে একজন মানুষ যে-দক্ষতা অর্জন করতে পারে, একাধিক বিষয়ের অনুকরণে সে-দক্ষতা সে নিশ্চয়ই অর্জন করতে পারে না।

    না। তা সে পারে না।

    তা হলে একই ব্যক্তির পক্ষে কোনো গুরুচরিত্রের দায়িত্বপালন এবং অন্য চরিত্রের অনুকরণ একই সময়ে সম্ভব হতে পারে না। কারণ, অনুকরণীয় বিষয়ের চরিত্র যতই সাদৃশ্যমূলক হোক-না কেন, একই সঙ্গে একাধিক চরিত্রের ভূমিকাপালনে সাফল্য অর্জন করা কারো পক্ষে সহজ নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ একই সঙ্গে কারো পক্ষে বিয়োগান্ত এবং মিলনান্ত নাটক যে সুদক্ষতার সঙ্গে রচনা করা সম্ভব নয় আমরা তার উল্লেখ করতে পারি। কারণ এই উভয় শিল্পকেই তুমি অনুকারী শিল্প বলে অভিহিত করেছ। ঠিক নয় কি?

    হ্যাঁ সক্রেটিস, আমি তা করেছি। এবং তোমার একথাও যথার্থ যে একই শিল্পীর পক্ষে উভয়ক্ষেত্রে সমান সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।

    যেমন কেউ একই সঙ্গে কবিওয়ালা এবং অভিনেতার ভূমিকা পালন করতে পারে না।

    যথার্থ।

    ঠিক যেমন ভাঁড় এবং বিষাদাত্মক চরিত্রের অভিনয় কেউ একই সঙ্গে করতে পারে না। আর এগুলি সবই অনুকরণের বিষয়। নয় কি?

    হ্যাঁ, এরা অনুকরণের বিষয়।

    আসলে, এ্যাডিম্যান্টাস, মানুষের ক্ষমতা খুবই কম। যে-ছাঁচে সে সৃষ্ট হয়েছে সে-ছাঁচের আকারক্ষুদ্র, ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তার পক্ষে একাধিক অনুকরণীয় চরিত্রের অনুকরণ করা যেমন কষ্টকর তেমনি একাধিক কাজ সুসম্পন্ন করাও অসম্ভব।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা যথার্থ, সক্রেটিস।

    এবার যদি রাষ্ট্রের অভিভাবক অর্থাৎ শাসকদের সম্পর্কে আমাদের স্থূল অভিমতের কথা স্মরণ করি তা হলে আমরা দেখব যে, যেহেতু অভিভাবকদের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষায় নিজেদের উৎসর্গ করা এবং এই কর্তব্য-সম্পাদনকে নিজেদের বিশেষ দক্ষ কলায় পরিণত করা, সে-কারণে অভিভাবকদের পক্ষে এই কর্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য অপর কোনো কাজ সম্পাদন করার চেষ্টা করা কিংবা অপর কোনোকিছুকে অনুকরণ করা সঙ্গত নয়। অভিভাবকদের পক্ষে কোনোকিছু যদি অনুকরণীয় হয় তবে তারা অনুকরণ করবে অল্প বয়স থেকে কেবল সেই সমস্ত চরিত্রকেই যে-চরিত্র মূল কর্তব্য সম্পাদনে তাদের উপযুক্ত করে তুলবে : তাদেরকে সাহসী, সংযমী, পবিত্র এবং স্বাধীনচেতা করে তুলবে। অন্য কথায়, অভিভাবকগণ কোনো গর্হিত কিংবা অনুদার চরিত্রের অনুকরণের চেষ্টা করবে না। কারণ অনুকরণের মাধ্যমে অনুকৃত ভূমিকা যথার্থই তাদের চরিত্রের অংশে পরিণত হয়ে যেতে পারে। কারণ, এ্যাডিম্যান্টাস তুমি কি লক্ষ করনি যে, ছোটকাল থেকে শুরু করে দীর্ঘকাল ধরে কেউ কিছু অনুকরণ করতে থাকলে অনুকৃত বৈশিষ্ট্য অনুকারীর শরীর, কণ্ঠ এবং মনকে প্রভাবান্বিত করে তার দ্বিতীয় স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা অবশ্যই সত্য।

    তা হলে যাদের আমরা মঙ্গল কামনা করি এবং যাদের উত্তমরূপে গঠিত হওয়া আবশ্যক তাদের কেউ কোনো স্ত্রীলোককে অনুকরণ করবে, এটি আমরা হতে দিতে পারিনে। কোনো স্ত্রীলোক, সে তরুণী কিংবা বৃদ্ধা যা-ই হোক-না কেন, যে তার স্বামীর সঙ্গে কলহরতা, যে সুখের অহঙ্কারে কিংবা যাতনা, দুঃখ বা ক্রন্দনের তীব্রতায় দেবতাদের তুচ্ছ করে, তেমন স্ত্রীলোক অনুকরণের পাত্রী হতে পারে না। এবং যে অসুস্থা, প্রেমে নিমজ্জিতা বা প্রসবের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট সেও কোনোক্রমে অনুকরণীয় হতে পারে না।

    খুবই যথার্থ কথা, সক্রেটিস।

    আর তা ছাড়া আমাদের তরুণরা দাসদের করণীয় কোনো কাজও করবে না। স্ত্রী কিংবা পুরুষ কোনো দাসের প্রতিনিধিস্থানীয়ের ভূমিকা তারা গ্রহণ করবে না।

    না, তেমন কোনো কাজ তারা অবশ্যই করবে না।

    আর অধমের অনুকরণ তো কোনোক্রমেই অনুমোদনযোগ্য হতে পারে না। কারণ, অধম, সে কাপুরুষ কিংবা অপর যে-চরিত্রের হোক না কেন, আমরা যা উত্তম মনে করেছি তার বিপরীত কার্যে লিপ্ত থাকে। তারা পানাসক্ত কিংবা সচেতন অবস্থায় পরস্পরকে এবং তাদের প্রতিবেশীকে কটুবাক্যে এবং আচরণে আহত করে। এরূপ স্বভাবই তাদের মজ্জাগত। কাজেই এদের আচরণ যেমন তরুণরা অনুকরণ করবে না, তেমনি পাগলের কোনো আচরণও তাদের অনুকরণীয় নয়। কারণ, পাপকর্মের ন্যায় পাগলামিকে জানতে হবে কিন্তু তাকে জীবনে আচরিত হতে দেওয়া চলবে না।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা খুবই সত্য, সক্রেটিস।

    তা ছাড়া কর্মকার বল কিংবা নৌকোর দাঁড়ী বা অপর কোনো চাতুর্যের কথা বল–এরূপ গুণের অনুকরণও আমাদের নিষিদ্ধ করতে হবে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : এ-ব্যাপারে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। আমাদের তরুণরা যখন এরূপ কোনো জীবিকা গ্রহণের কথা চিন্তাই করতে পারবে না, তখন এদের অনুকরণও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।

    কিংবা ধরো অশ্বের হ্রেষাধ্বনি, ষাঁড়ের শব্দ, নদীর মৃদু কুলুরব বা সমুদ্রের গর্জন এবং বজ্রের নির্ঘোষ—এসবও আমাদের তরুণদের অনুকরণীয় নয়।

    অবশ্যই নয়। পাগলামিকে যদি আমরা নিষিদ্ধ করি, তা হলে পাগলের ক্রিয়াকাণ্ডের অনুকরণ অবশ্যই নিষিদ্ধ হবে।

    আমি বললাম, এ্যাডিম্যান্টাস, তোমার বক্তব্য যদি আমি সঠিকভাবে বুঝে থাকি তা হলে আমার মনে হচ্ছে তোমার মতে বর্ণনার দুটো রকম হতে পারে। একটি উত্তম, অপরটি অধম। সত্যিকারের উত্তম ব্যক্তি যেখানে বর্ণনার উত্তম রীতি গ্রহণ করে, অধম শিক্ষা ও চরিত্রের ব্যক্তি সেখানে বর্ণনার অধম রীতি গ্রহণ করে।

    কিন্তু রীতি দুটির পার্থক্য কী?

    আমি বলছি। ধরো, একজন উত্তম এবং ন্যায়বান ব্যক্তি বর্ণনাকালে অপর কোনো উত্তমের কোনো বাণী কিংবা কর্মের বর্ণনার মুহূর্তে উপস্থিত হলেন। এমন মুহূর্তে বর্ণনাকারী উত্তমের বাণী বা কর্মকে প্রত্যক্ষ ভঙ্গিতে বর্ণনা করতে কোনো সঙ্কোচ বোধ করবেন না। অর্থাৎ এই উত্তম চরিত্র যদি মহৎ কর্ম এবং দৃঢ়তার পরিচয় দেয় তা হলে বর্ণনাকারী তাকে সরাসরি অনুকরণ করবেন। অবশ্য সে চরিত্র যদি অসুস্থ, পানাসক্ত, প্রেমাসক্ত বা অপর কোনো বিপর্যয়ে নিপতিত হয়ে থাকে তা হলে হয়তো এ-অনুকরণ অত প্রত্যক্ষ হবে না। কিন্তু বর্ণনাকারী যখন অধম চরিত্রের সাক্ষাৎ পান তখন তিনি তার কর্মের প্রতি নজরই দেন না। আর যদি তার অনুকরণ করেন তবে কেবল এই চরিত্রের উত্তম মুহূর্তটুকুরই অনুকরণ করবেন। এর অতিরিক্ত অনুকরণে বর্ণনাকারী লজ্জিত বোধ করবেন। অধমের আদর্শে নিজেকে রূপায়িত করাকে তিনি অমর্যাদাকর বলে গণ্য করবেন। বস্তুত পরিহাসের মাধ্যম ব্যতীত এমন শিল্পরীতির ব্যবহারকে তিনি নিজের অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করবেন। এরূপ রীতির বিরুদ্ধে তাঁর মন বিদ্রোহ করে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমারও তা-ই মনে হয়, সক্রেটিস।

    এমন ক্ষেত্রেও হোমারের যে-দৃষ্টান্ত আমরা উল্লেখ করেছি বর্ণনাকারী তেমন রীতি অনুসরণ করবেন। অর্থাৎ তার রীতি হবে অভিনয়মূলক এবং বর্ণনামূলক—উভয়ই। অভিনয়ের অংশ এতে অল্পই থাকবে; বর্ণনামূলকই অধিক হবে। তুমি কি আমার সঙ্গে একমত এ্যাডিম্যান্টাস?

    অবশ্যই, সক্রেটিস। আমাদের বক্তা এরূপ রীতিই অনুসরণ করবেন।

    কিন্তু অন্য ধরনের চরিত্রও আছে যার কোনোকিছু বর্ণনাতেই আপত্তি হবে না। বরঞ্চ বর্ণনার বিষয় যত অধম হবে সে তত সঙ্কোচহীন হয়ে উঠবে। কোনো অধমই তার কাছে অধম বলে গণ্য হবে না। কোনোকিছুর অনুকরণেই তার কোনো দ্বিধা হবে না। এবং শুধু পরিহাসের জন্য নয়, যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গেই সে বিপুলসংখ্যক দর্শকের সম্মুখে এইরূপ চরিত্রের অভিনয় করবে। মুহূর্ত পূর্বেই আমি বলেছি : এমন চরিত্র বজ্রের নির্ঘোষ অনুকরণ করবে; ঝড়ের শব্দ, শিলাপাতের ধ্বনি, চক্র এবং কপিকলের ঘরঘর, বাঁশি বা অপরাপর বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজের সে অনুকরণ করবে; কুকুরের ন্যায় ঘেউঘেউ করতে তার সঙ্কোচ হবে না; ভেড়ার ভ্যাভ্যা ধ্বনি কিংবা কুক্কুটের রবেও সে নিঃসঙ্কোচ। মোটকথা, তার সমগ্র শিল্পই বর্ণিতের কণ্ঠধ্বনি এবং অঙ্গভঙ্গির অনুকরণে পর্যবসিত হবে। বর্ণনার অংশ তাতে খুব কমই থাকবে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, তার বলার রীতি এটাই হবে।

    তা হলে রীতির ক্ষেত্রে আমরা এই দুটো রীতিকে নির্দিষ্ট করতে পারি। তুমি কী বল।

    হ্যাঁ, এরূপভাবে আমরা নির্দিষ্ট করতে পারি।

    আমি বললাম : তা ছাড়া তুমি আমার সঙ্গে এ বিষয়েও একমত হবে যদি আমি বলি যে, এই রীতি দুটির একটি হচ্ছে খুবই সরল; এর পরিবর্তন ঘটে সামান্যই। আর বর্ণনাকারী যদি এই সঙ্গতি এবং ছন্দকে এর সারল্যের জন্য গ্রহণ করে তা হলে তার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে যে, আবৃত্তিকারী যদি সঠিকভাবে আবৃত্তি করতে সক্ষম হয়, তা হলে রীতিটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠবে এবং পরিবর্তনের খাদ অল্প হওয়াতে সে একই গ্রামে যেমন বিচরণ করতে সক্ষম হবে, তেমনি একই ছন্দ ব্যবহারেও তার কোনো অসুবিধে হবে না।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : একথা অবশ্যই সত্য।

    অপরদিকে দ্বিতীয় রীতির ক্ষেত্রে সঙ্গীতের সঙ্গে রীতির সঙ্গতি রক্ষার জন্য, পরিবর্তনের খাদ্যের বাহুল্যের কারণে তাল এবং ছন্দের আধিক্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

    হ্যাঁ, একথাও যথার্থ।

    এই দুই রীতি এবং এই দুই-এর মিশ্রণের মধ্যেই কিন্তু সমস্ত কাব্য এবং কথার অবস্থান। এই দুই রীতির বাইরে কারুর পক্ষেই কিছু বলা সম্ভব নয়। ঠিক নয় কি?

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ, ঠিক। এদের মধ্যেই সবকিছুর অবস্থান।

    তা হলে প্রশ্ন ওঠে, আমাদের রাষ্ট্রে আমরা কী করব? আমরা কি এই তিনটি রীতির সব রীতিকেই স্বীকার করব, অথবা এদের মধ্যে অবিমিশ্র দুটি রীতিকে আমরা গ্রহণ করব? তোমার কী মনে হয়? তুমি কি মিশ্ররীতিকেও গ্রহণ করার পক্ষপাতী?

    না, আমি বরং কোনো গুণের বিশুদ্ধ অনুকারকের রীতিটি গ্রহণ করার পক্ষপাতী।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ, এ্যাডিম্যান্টাস। কিন্তু মিশ্ররীতিরও একটি দিক আছে। মিশ্ররীতিটি বেশ চিত্তাকর্ষক। বিশেষ করে তোমার বিশুদ্ধ রীতির বিপরীত রীতি হিসাবে মূকাভিনয়ের রীতিটি বালক-বালিকা, তাদের পরিচারকবৃন্দ এবং সাধারণভাবে দর্শকদের নিকট খুবই জনপ্রিয়।

    আমি তা অস্বীকার করছিনে, সক্রেটিস।

    কিন্তু তুমি হয়তো যুক্তি দিয়ে বলবে, আমাদের রাষ্ট্রের জন্য এরূপ রীতি উপযুক্ত নয়। আমাদের রাষ্ট্রে একজন মানুষ কেবল একটি ভূমিকাই পালন করবে, কারণ মানুষের চরিত্রে ক্ষমতার আধিক্য নেই। একের মধ্যে একাধিক দক্ষতার সমাবেশ ঘটতে পারে না।

    হ্যাঁ, আমি বলব, এমন রীতি আমাদের রাষ্ট্রের জন্য খুবই অনুপযুক্ত।

    আর এ-কারণেই অন্য কোনো রাষ্ট্রে না হলেও আমাদের রাষ্ট্রে জুতা তৈরিকারক জুতা তৈরিকারকই হবে, সে নৌচালক হবে না, কৃষক কৃষকই হবে, একই সঙ্গে সে বিচারক হবে না, এবং যে সৈনিক সে সৈনিকই হবে, একই সঙ্গে সে বণিক হবে না। কর্মের অপর সব ক্ষেত্রে এই একই কথা।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : যথার্থ।

    কাজেই সবকিছুর অনুকরণে দক্ষ এই যে মূকাভিনেতাগণ—তাঁদের কেউ যদি আমাদের রাষ্ট্রে আসেন এবং প্রস্তাব দেন যে আমাদের রাষ্ট্রের মধ্যে তিনি তাঁর কাব্য-শক্তি এবং অভিনয়শক্তি প্রদর্শন করবেন তা হলে আমরা নতজানু হয়ে তাঁকে মধুর এবং পবিত্র এবং বিস্ময়কর বলে প্রশংসা করব, কিন্তু সেইসঙ্গে তাঁকে আমরা জানিয়ে দেব যে আমাদের রাষ্ট্রে তাঁর মতো ব্যক্তির কোনো স্থান নেই। আমাদের আইন তাঁর এরূপ গুণ-প্রদর্শনের অনুমতিদানে অক্ষম। আর তাই সুগন্ধি নির্যাসে তাঁকে যখন আমরা লিপ্ত করেছি, তাঁর মস্তকোপরি পশমের মাল্যস্থাপন যখন আমাদের সম্পন্ন হয়েছে, তখন ভিন্নতর একটি রাষ্ট্রে আমরা তাঁকে প্রেরণ করে দেব। কারণ আমাদের আত্মার স্বাস্থ্যের জন্য আমাদের প্রয়োজন কাঠিন্যের, আমাদের প্রয়োজন কঠিন এবং দৃঢ়তর এমন কবি এবং কাহিনীকারের যাঁরা কেবলমাত্র ন্যায়বানের রীতি অনুকরণ করবেন এবং আমাদের দেশরক্ষা বাহিনীর শিক্ষার জন্য যে-আদর্শ আমরা প্রণয়ন করেছি কেবল সেই আদর্শকে অনুসরণ করবেন।

    আমাদের ক্ষমতা থাকলে অবশ্যই তাঁকে আমরা অন্য রাষ্ট্রে পাঠিযে দেব।

    আমি বললাম, এ্যাডিম্যান্টাস, এবার তা হলে কাহিনী কিংবা উপকথার সঙ্গে সম্পর্কিত সাহিত্য এবং তা শিক্ষাদানের প্রশ্নটির আলোচনা সমাপ্ত হয়েছে বলে আমরা বিবেচনা করতে পারি। কারণ, এর বিষয় এবং রীতি—উভয় দিকই আলোচিত হয়েছে।

    এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : আমিও তা-ই মনে করি, সক্রেটিস।

    তা হলে এর পরে আসবে সুর এবং সঙ্গীতের বিষয়।

    হ্যাঁ, এ-সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই।

    আমি বললাম : আর আমরা যদি যুক্তির সঙ্গতি রাখতে চাই তা হলে এ-বিষয়েও আমাদের বক্তব্য কী হবে তা বুঝতে কারুর অসুবিধে হবে না।

    কিন্তু গ্লকন সহাস্যে বলে উঠলেন : ‘কারুর অসুবিধে হবে না’—একথার মধ্যে আমি নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারছিনে, সক্রেটিস। কারণ কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও এই মুহূর্তে আমি জানিনে এ-বিষয়ে তোমার বক্তব্য কী হবে।

    আমি বললাম, গ্লকন, তুমি অন্তত একথা বলতে পার যে, একটি গান কিংবা গাথার তিনটি অংশ আছে : একটি তার শব্দ, অপরটি সুরমাধর্য এবং তৃতীয়টি তার ছন্দ বা তাল লয়ের অংশ। এ-বিষয়ে তোমার এতটুকু জ্ঞানকে আমি ধরে নিতে পারি, কী বল গ্লকন?

    গ্লকন জবাব দিলেন : হ্যাঁ, সক্রেটিস, যতটুকু তুমি বললে, ততটুকু ধরে নিতে পার।

    আর শব্দের কথা যদি বলি তা হলে সে-বিষয়েও আমরা বলতে পারি, যে-শব্দে সুর যোজনা করা হয়েছে এবং যে-শব্দে সুর যোজনা করা হয়নি, তাদের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই। এদের উভয় একই বিধান অর্থাৎ যে-বিধানকে আমরা পূর্বে নির্দিষ্ট করেছি সেই বিধান মেনে চলবে।

    হ্যাঁ, তা-ই মেনে চলবে।

    কিন্তু সুর এবং ছন্দকে তো শব্দের উপর নির্ভর করতে হয়, নয় কি?

    অবশ্যই।

    গ্লকন, আমরা যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলাম তখন আমরা বলেছি হুতাশের সুরের কোনো প্রয়োজন আমাদর নেই।

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    কিন্তু গ্লকন, বিষাদের সুর কোনগুলি? তোমার সঙ্গীতের ধারণা আছে। তুমি আমাদের বলতে পার, বিষাদের ভাব ফুটে ওঠে কোন সুরে?

    গ্লকন বললেন : তুমি যে-সুরের কথা বলছ সেগুলি বিশুদ্ধ কোনো সুর নয়, সেগুলি মিশ্র সুর। এগুলিকে আমরা উচ্চগ্রামী এবং ভারী নিম্নগ্রামী লীডীয় সুর বলতে পারি।

    আমি বললাম : এগুলিকে তা হলে আমাদের নির্বাসিত করতে হবে। পুরুষদের কথা বাদ দিলেও, স্ত্রীলোকদের জন্যও এ-সুর চরিত্র রক্ষার উপযুক্ত নয়।

    সেকথা যথার্থ।

    তা ছাড়া মদ্যাশক্তি, কোমলতা এবং আলস্য—এগুলি আমাদের শাসকদের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত। নয় কি?

    কিন্তু কোমল এবং পানাসক্তির সুর কোনগুলি?

    গ্লকন বললেন : এগুলি হচ্ছে আয়োনীয় এবং লীডীয়। এগুলিকে ‘আয়েশি’ সুর বলা হয়।

    আচ্ছা, কিন্তু এ-সুরের কি কোনো সামরিক তাৎপর্য আছে?

    গ্লকন উত্তর দিলেন : বরঞ্চ তার বিপরীত। এ ছাড়া সুরের ক্ষেত্রে অবশিষ্ট থাকে কেবল ডোরীয় এবং ফ্রিজীয় সুর।

    আমি বললাম : আমি সুরের বিষয়ে কিছু জানিনে। কিন্তু আমি বুঝি যে, আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে যুদ্ধের সুরের—এমন সুরের যার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হবে সেই ধ্বনি যে-ধ্বনি উচ্চারিত হয় বীরের কণ্ঠে তার আসন্ন বিপদ কিংবা দৃঢ় সংকল্পের মুহূর্তে কিংবা যখন তার লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম করে কিংবা বীর আঘাত কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি দণ্ডায়মান হয়। জীবনের সঙ্কটে ভাগ্যের এরূপ আঘাত সহ্য করার দৃঢ়তায় বীর যে ধ্বনি উচ্চারণ করে আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে সেই সুরের। আমাদের শান্তির সুরেরও আবশ্যক। প্রয়োজনের অনিবার্যতা থেকে রাষ্ট্র যখন মুক্ত, শান্তি এবং কর্মের স্বাধীনতা যখন রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং শাসক যেখানে দেবতার নিকট প্রার্থনায় রত কিংবা রাষ্ট্রের নাগরিককে সে যখন নির্দেশ বা মৃদু ভর্ৎসনার মাধ্যমে শাসনের প্রয়াস পাচ্ছে কিংবা ধরো শাসক যখন বিজ্ঞতার মাধ্যমে তার লক্ষ্যসাধনে সক্ষম হয়েছে কিংবা সাফল্যে আত্মহারা না হয়ে যখন সে মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করছে তখন যে-সুর ধ্বনিত হয়, তেমন শান্তির সুরেরও আমাদের আবশ্যক। এই দুটি সুরকে তুমি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে পার। আমাদের এ-সুর হচ্ছে অনিবার্যতা এবং স্বাধীনতার সুর; ভাগ্যহত এবং ভাগ্যবানের সুর; সাহস এবং ধৈর্যের সুর।

    গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, এ দুটোই হচ্ছে ডোরীয় এবং ফ্রিজীয় সুর। আমি এই সুরের কথাই একটু পূর্বে উল্লেখ করছিলাম।

    আমি বললাম : আমাদের সঙ্গীত এবং রাগে আমরা যদি এই দুটোমাত্র সুরই ব্যবহার করি তা হলে সুরের বৈচিত্র্যের আমাদের আর প্রয়োজন কি?

    না, এর অধিক সুরের আমাদের প্রয়োজন হবে না।

    তা হলে ত্রিকোণ বীণা এবং তার জটিল স্বরগ্রাম কিংবা অনুরূপ বহু তারযন্ত্র এবং তাদের দুর্গম বাঁধুনিতে দক্ষ যন্ত্রীদের পোষণ করারও আমাদের প্রয়োজন হবে না।

    না, সে-প্রয়োজন আমাদের হবে না।

    কিন্তু গ্লকন, বংশী প্রস্তুতকারক এবং বংশীবাদকদের সম্বন্ধে আমাদের কী বক্তব্য হবে? চিন্তা করে দেখলে ঐকতান সৃষ্টিতে বাঁশির ভূমিকা অন্য সব তারযন্ত্রের চেয়েই নিকৃষ্ট। এমনকি সকল বাদ্যযন্ত্র মিলিয়ে যে-সুরলহরি সৃষ্টি করা হয় তাও আসলে বাঁশির অনুকরণ বই আরকিছু নয়।

    সে কথা ঠিক।

    তা হলে আমাদের নগরে ব্যবহারের জন্য রইল কেবলমাত্র বীণা এবং সেতার। গ্রামের মেষপালকগণ তাদের একনলী বাঁশিটি অবশ্য রাখতে পারবে। হ্যাঁ, আমাদের যুক্তি থেকে এই সিদ্ধান্তই আমাদের গ্রহণ করতে হয়।

    আমি বললাম : আমরা পূর্বে যে-আলোচনা করেছি তাতে এবার বোঝা যাচ্ছে সাধারণের মধ্যে মারসিয়াস এবং তার বাদ্যযন্ত্রের চেয়ে এ্যাপোলো এবং তার বাদ্যযন্ত্রসমূহের অধিকতর খাতিরে বিস্ময়ের কিছুই নেই।

    না, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

    তা হলে এবার মিশরের সারমেয়র নামে আমরা শপথ করে বলতে পারি যে, অচেতনভাবে হলেও আমাদের বিলাসবহুল রাষ্ট্র থেকে আমরা তার বাহুল্যকে ছেঁটে ফেলতে শুরু করেছি।

    গ্লকন বললেন : আমাদের এ-কাজ বিজ্ঞজনোচিত হয়েছে বলেই আমরা বলব।

    আমি বললাম : তা হলে এসো রাষ্ট্রের ছাঁটাই বা বিশোধনের কাজটি আমরা সম্পন্ন করে ফেলি। সুরের পরে ছন্দের প্রশ্নটি আসে। আর এক্ষেত্রেও আমাদের নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হবে না। কারণ জটিল ছন্দপ্রকরণ কিংবা সকল প্রকার ছন্দের আমাদের আবশ্যকতা নেই। আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে নির্দিষ্ট করা কোন ছন্দ বীরত্বময় এবং সঙ্গতিপূর্ণ জীবনকে প্রকাশ করতে সক্ষম। এ-কাজে সিদ্ধ হলে আমরা বীরত্বব্যঞ্জক ও সঙ্গতিময় শব্দকে গাঁথার জন্য ছন্দকে ব্যবহার করব, ছন্দের মাত্রাকে গাঁথার জন্য শব্দকে ব্যবহার করব না। সুরের প্রশ্নে তুমি যেমন আমায় শিখিয়েছ, এখানেও গ্লকন, তোমাকে বলতে হবে আমাদের রাষ্ট্রের জন্য উপযুক্ত ছন্দ কী হবে।

    গ্লকন বললেন : কিন্তু সক্রেটিস, এ-বিষয়ে তো আমি তোমাকে কিছু বলতে পারব না। আমি শুধু জানি সুরের জগতে যেমন সমস্ত সুর চারটি মাত্রা থেকে তৈরি হয়, তেমনি ছন্দের ক্ষেত্রেও তিনটি নীতি আছে যার ভিত্তিতে ছন্দপ্রকরণের সৃষ্টি হয়। আমি এই মন্তব্যই কেবল করতে পারি। কিন্তু কোন্ জীবনের অনুকারী কে তা বলতে আমি অক্ষম।

    আমি বললাম : তা হলে তো আমাদের দামনের* সাহায্য গ্রহণ করতে হয়। দামন আমাদের বলে দিতে পারবেন কোন্ ছন্দ হীনতা, ঔদ্ধত্য, প্রচণ্ডতা কিংবা অনুরূপ অবাঞ্ছিত ভাবপ্রকাশের ছন্দ এবং কোন্ ছন্দ এ-সমস্ত ভাবের বিপরীত উ ৎকৃষ্ট ভাবপ্রকাশের উপযুক্ত ছন্দ। আমার অবশ্য দামনের উল্লেখিত একটা জটিল ক্রীটিয় ছন্দের কথা অস্পষ্টভাবে মনে পড়ছে। দামন তিন পদাংশবিশিষ্ট বীরত্বব্যঞ্জক একটা ছন্দের কথাও বলেছিলেন। এগুলিকে সাজাবার জন্য যে-কৌশল তিনি ব্যবহার করেছেন, তা আমার ঠিক বোধগম্য নয়। তিনি এই ছন্দটাকে হ্রস্ব এবং দীর্ঘমাত্রার উঁচু এবং নিচুগ্রামের মধ্যে সমভাবে উত্থান-পতনের ভিত্তিতে বিন্যস্ত করেছেন। আর আমি যদি খুব বেঠিক না হই তা হলে বলব তিনি দুই স্বরের হ্রস্ব-দীর্ঘ ছন্দেরও উল্লেখ করেছিলেন এবং ক্ষুদ্র এবং দীর্ঘ পদের ভিত্তিতে তাদের বিভক্ত করেছিলেন! আবার দেখা যায় দামন কোথাও মাত্রা এবং ছন্দের গতি দ্রুততার পক্ষে বলেছেন, কোথাও তার বিপক্ষে বলেছেন। আবার কোথাও তিনি দুটোর মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। আসলে বিষয়টি জটিল এবং আমি ঠিক বুঝতে পারিনে, তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন। এর বিশ্লেষণ আমাদের পক্ষে কঠিন ব্যাপার। বিষয়টি দামনের কাছে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়, কী বল একন?

    [*দামন : খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ এবং এথেন্সের রাষ্ট্রীয় নেতা পেরিক্লিসের বন্ধু—কর্নফোর্ড (রিপাবলিকের অনুবাদ : পূঃ ৮৬)]

    আমারও তা-ই মনে হয় সক্রেটিস।

    তবে এটা বুঝতে আমাদের কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট ছন্দের পার্থক্য তার উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট প্রভাবের মধ্যেই দৃষ্ট হয়।

    না, এটা বুঝতে আমাদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

    এ ছাড়া একথাও আমরা বুঝতে পারি যে, উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট ছন্দের সঙ্গে উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট শিল্পরীতিও জড়িত। আবার সঙ্গতি এবং বিরোধ শিল্পরীতির সঙ্গে জড়িত। কারণ, আমরা বলেছি, ছন্দ এবং সঙ্গতির নিয়ামক হচ্ছে শব্দ, শব্দের নিয়ামক ছন্দ এবং সঙ্গতি নয়।

    হ্যাঁ, তাই শব্দকে অনুসরণ করেই ছন্দ এবং সঙ্গতি।

    আমি বললাম : কিন্তু রীতির চরিত্র এবং শব্দসম্পদ কি আত্মার মেজাজের উপর নির্ভর করে না?

    হ্যাঁ, তা করে।

    বাকি সবকিছু রীতির উপর নির্ভর করে।

    তা ঠিক।

    তা হলে রীতির সৌন্দর্য, সঙ্গতি, লাবণ্য এবং উত্তম ছন্দ—সবই সারল্যের উপর নির্ভর করে, নয় কি? আমি অবশ্য এখানে মহৎ সঙ্গতি এবং চরিত্রের ভিত্তিতে সুবিন্যস্ত আত্মার সত্যকার সারল্যের কথা বলছি, যে-সারল্য নির্বুদ্ধিতার অপর নাম তার কথা বলছিনে।

    তোমার কথা খুবই যথার্থ, সক্রেটিস।

    এবং আমাদের তরুণদের যদি জীবনের কর্তব্য সম্পাদন করতে হয় তা হলে এই সঙ্গতি এবং সারল্যকেই তাদের জীবনের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করা আবশ্যক, নয় কি?

    হ্যাঁ, তাদের অবশ্যই এই লক্ষ্য স্থির করা আবশ্যক।

    সঙ্গতির প্রশ্নে আমরা বলতে পারি যে, বয়নশিল্প, সূচিকর্ম, স্থাপত্য কিংবা অপর যে-কোনো নির্মাণশিল্প হোক, প্রত্যেক শিল্পীর সৃজনশীল শিল্পকর্মের মধ্যে এই সঙ্গতির আমরা সাক্ষাৎ লাভ করি। তা ছাড়া প্রকৃতির সৃষ্টির মধ্যে, পশুই বল কিংবা বৃক্ষলতাই বল—এদের সব অস্তিত্বের মধ্যেও আমরা একটা সারল্যের অস্তিত্ব কিংবা তার অভাবকে প্রত্যক্ষ করি। এবং সৌন্দর্য এবং সঙ্গতি যেমন উত্তম এবং ন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের চরিত্রের সাদৃশ্যে তারা যেমন যুক্ত, ঠিক অনুরূপভাবে অসুন্দর, বিষম এবং অসঙ্গত চরিত্র অবাঞ্ছিত শব্দ এবং অবাঞ্ছিত মেজাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।

    একথা যথার্থ, সক্রেটিস।

    তা হলে আমাদের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমা কী হবে? আমাদের কবিদের বলব, তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিতে উত্তমের ছবি তুলে ধরবেন। এর অন্যথা হলে আমাদের রাষ্ট্র থেকে তাঁদের বহিষ্কৃত হতে হবে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ কেবল কি কবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে? অথবা ভাষ্কর্য, নির্মাণ কিংবা সৃজনশীল অপর সকল শিল্পক্ষেত্রের শিল্পীকেও আমরা বলব, তাঁরাও তাঁদের সৃষ্টিতে অধর্ম, অন্যায়, অধৈর্য, হীনতা এবং অসুন্দর কোনো ভাবের প্রকাশ ঘটাতে পারবে না। এবং কেউ যদি এই নির্দেশ অনুসরণ করতে না পারেন তা হলে তাঁর শিল্পচর্চাকেও নিষিদ্ধ করা হবে। না হলে তাঁর শিল্পকর্মের প্রভাবে আমাদের নাগরিকদের মন কলুষিত হয়ে যাবে। কেননা আমাদের রাষ্ট্রের শাসককুলকে আমরা নৈতিক বিকারের মধ্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে দিতে পারিনে। তেমন হলে বিষাক্ত এঁদো চারণভূমিতে চরে বিষাক্ত লতাগুল্ম ভক্ষণ করার ন্যায় দিনে-দিনে নিঃশব্দে বিন্দু বিন্দু করে বিকারের ঘায়ে তাদের আত্মা বিষাক্ত হয়ে উঠবে। কাজেই আমাদের শিল্পী হবে তারা যারা সৌন্দর্য এবং কমনীয়তার যথার্থ প্রকৃতিকে অনুধাবন করতে সক্ষম। তা হলেই মাত্র আমাদের রাষ্ট্রের তরুণসমাজ স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, মনোহর প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং উত্তম পরিবেশের মধ্যে বৃদ্ধিলাভ করতে পারবে। আমাদের শিল্পীর সৃষ্টির সৌন্দর্য আমাদের তরুণদের দৃষ্টি এবং শ্রবণকে বিশুদ্ধ পরিবেশ থেকে প্রবাহিত স্বাস্থ্যপূর্ণ মলয় হিল্লোলে অভিষিক্ত কর দেবে। এর প্রভাবে তরুণদের আত্মা শিশুবয়স থেকেই অচেতনভাবে যুক্তির সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠবে।

    গ্লকন বললেন : এর চেয়ে মহৎ শিক্ষা আর কী হতে পারে?

    আমি বললাম : গ্লকন, এজন্যই সঙ্গীতের শিক্ষা অপর যে-কোনো শিক্ষার চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী। কারণ সুরের ছন্দ এবং সঙ্গতি আত্মার গভীরে প্রবেশ করে তার চেয়ে সুদৃঢ় প্রভাবে যে সুশিক্ষিত তাকে সুন্দর এবং যে কু-শিক্ষিত তাকে অসুন্দর করে তোলে। আর এ-কারণে যে তার আত্মার গভীরে সুশিক্ষিত সে তার তরুণ বয়সে চেতনার পূর্বেই শিল্পের যা ব্যর্থতা বা অপূর্ণতা, যা তার ত্রুটি তাকে যেমন চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে তেমনি শিল্পের যা মহৎ, উত্তম এবং সুন্দর তাকেও সে নিজের আত্মার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নিতে পারবে; যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা প্রাপ্তির পূর্বেই যা মন্দ তাকে সে চিহ্নিত করতে এবং ঘৃণা করতে সক্ষম হবে। এবং যখন যুক্তির চেতনা তার মধ্যে জাগ্রত হবে তখন অনায়াসে তার যথার্থ যে সুহৃদ, তার আত্মার শিক্ষা যার সঙ্গে তাকে দীর্ঘ পরিচয়ের বন্ধনে বেঁধে দিয়েছে সেই উত্তম এবং সুন্দরকে সে স্বাগত জানাতে পারবে।

    গ্লকন বললেন : আমি তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস। তুমি যেমন-ভাবে বলেছ, আমিও মনে করি আমাদের তরুণদের তেমনভাবেই সঙ্গীতে শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

    আমি বললাম : অক্ষরপরিচয়ের ক্ষেত্রে যা সত্য, এখানেও তা-ই। অক্ষরের সংখ্যা আমাদের অধিক নয়। সেগুলিকে তার বিভিন্ন আকার এবং সংযুক্তির প্রকারে যতক্ষণ-না আমরা উত্তমরূপে চিনতে পারি ততক্ষণ আমরা বলিনে যে আমাদের বর্ণপরিচয় সম্পূর্ণ হয়েছে। অক্ষরের আকার ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ যা-ই হোক না কেন, কোনো আকারকেই গুরুত্বহীন মনে না করে আমরা সর্বত্র এই অক্ষরগুলোকে খুঁজে খুঁজে বার করতে থাকি। বস্তুত যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা যে-কোনো স্থান থেকে আমাদের এই অক্ষরগুলোকে চিনে বার করতে না পারি ততক্ষণ আমরা বলিনে যে আমাদের বর্ণপাঠ সুসম্পূর্ণ হয়েছে।

    একথা যথার্থ।

    অথবা প্রতিবিম্বের কথা ধরো। জলে কিংবা আরশিতে যদি অক্ষরের ছায়া পড়ে তা হলে অক্ষরগুলোকে আমরা পূর্বে যদি জেনে থাকি তবেই মাত্র তাদের প্রতিবিম্বকে আমরা চিনতে পারি। ঠিক নয় কি?

    অবশ্যই।

    তা হলে সঙ্গীতশিক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা কিংবা আমাদের শাসক যাদের আমরা শিক্ষিত করতে চাই তারা সঙ্গীতের মূল আকার এবং তার সংযুক্তির প্রকারের সঙ্গে পরিচিত না হলে, ক্ষুদ্র-বৃহৎ নির্বিশেষে সবকিছুর মধ্যে সে আছে এমন উপলব্ধি তাদের না হলে এবং যেখানে তাদের প্রতিবিম্ব পড়ে সেখানে তাদের চিহ্নিত করতে না পারলে কখনোই তারা সঙ্গীতজ্ঞ হয়ে উঠতে সক্ষম হবে না।

    নিঃসন্দেহে একথা সত্য, সক্রেটিস।

    আর সুন্দর আত্মা যখন সুন্দর আকারের সঙ্গে সঙ্গতির মাধ্যমে মিলিত হয় এবং দুটি মিলে একটি অস্তিত্বে পরিণত হয় তখন যে-মনোহর দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তা কেবল যার সত্যকার দৃষ্টি আছে তার চোখেই ধরা পড়ে।

    এমন সৃষ্টি অবশ্যই সবচেয়ে সুন্দর।

    এবং যা সবচেয়ে সুন্দর তা-ই সবচেয়ে মনোহর। নয় কি?

    হ্যাঁ, একথাও আমরা ধরে নিতে পারি।

    এবং যে-মানুষের মধ্যে সঙ্গতির বোধ আছে সে এই মনোহরের প্রতি সর্বাধিক অনুরাগ বোধ করবে; কিন্তু যার আত্মার মধ্যে অসঙ্গতি সে তার প্রতি কোনো অনুরাগ বোধ করবে না।

    গ্লকন বললেন : একথা ঠিক। তার অপূর্ণতা যদি আত্মার অপূর্ণতা হয় তা হলে অবশ্যই সে সুন্দরের প্রতি অনুরাগ বোধ করবে না। কিন্তু তার অক্ষমতা যদি কেবল দৈহিক অক্ষমতা হয় তা হলে সুন্দর তার সে-অক্ষমতাকে ক্ষমার চোখে দেখবে এবং সে অক্ষমতা সত্ত্বেও তাকে সে ভালবাসবে।

    আমি বললাম : গ্লকন, আমি দেখছি এ-বিষয়ে তোমার বেশ অভিজ্ঞতা আছে। তোমার অভিমতের সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু আমার আর-একটি প্রশ্ন আছে : আনন্দের আধিক্যের সঙ্গে কি মিতাচারের কোনো সাদৃশ্য আছে?

    গ্লকন বললেন : না, এদের মধ্যে সাদৃশ্য কেমন করে থাকতে পারে? বেদনার আধিক্য যেমন, আনন্দের আধিক্যও তেমনি মানুষের কর্মক্ষমতাকে বিনষ্ট করে।

    কিন্তু সাধারণভাবে ন্যায়ের সঙ্গেও কি কোনো সাদৃশ্য নেই?

    না, আদৌ কোনো সাদৃশ্য নেই।

    কিন্তু যথেচ্ছার এবং অনাচারের সঙ্গে কি কোনো সাদৃশ্য আছে?

    হ্যাঁ, এক্ষেত্রে এদের মধ্যে সর্বাধিক সাদৃশ্য বিদ্যমান।

    কিন্তু গ্লকন, ইন্দ্রিয়প্রেমের চেয়ে অধিকতর কিংবা তীব্রতর কোনো আনন্দ কি আছে?

    না। ইন্দ্রিয়প্রেমের চেয়ে উন্মত্ততর আনন্দ আরকিছু নেই।

    অথচ যথার্থ প্রেম হচ্ছে সুন্দর এবং শৃঙ্খলার প্রেম, মিতাচার এবং সঙ্গতির প্রেম। তা-ই নয় কি?

    খুবই যথার্থ কথা সক্রেটিস।

    তা হলে কোনো অনাচার কিংবা উন্মত্ততাকে যথার্থ প্রেমের নৈকট্যলাভের অধিকার দেওয়া চলে না?

    না, তেমন অধিকার দেওয়া চলে না।

    তা হলে উন্মত্ত কিংবা অসংযত আনন্দ প্রেমিক এবং প্রেমাস্পদের নৈকট্যলাভ করতে পারে না। প্রেমিক প্রেমাস্পদের প্রেম যদি যথার্থ হয় তা হলে তাদের কেউ উন্মাদনা কিংবা অসংযমকে নিজেদের চরিত্রের অঙ্গীভূত করতে পারে না।

    যথার্থ বলেছ সক্রেটিস। উন্মাদনা এবং অসংযমকে প্রেমিক এবং প্রেমাস্পদের নৈকট্যলাভ করতে কখনো দেওয়া চলে না।

    তা হলে যে-রাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠিত করছি সেখানে এই বিধান আমাদের প্রবর্তন করতে হবে যে, পিতা তার পুত্রকে যেমন করে ভালোবাসে তার চেয়ে ভিন্নতর কোনো ঘনিষ্ঠতায় প্রেমিক তার প্রেমাস্পদকে ভালোবাসতে পারবে না। মহৎ কোনো উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে তারা ঘনিষ্ঠ হতে পারবে না। এবং এমন ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে প্রেমাস্পদের সম্মতির প্রয়োজন হবে। পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতাকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এই সীমাকে যে অতিক্রম করবে তাকে স্থূলতা এবং কুরুচির দোষে দোষী বলে গণ্য করা হবে।

    এ-বিষয়ে তোমার সঙ্গে আমি একমত, সক্রেটিস।

    তা হলে সঙ্গীত সম্পর্কে আর নয়। সঙ্গীতের আলোচনার এ-সমাপ্তিকে নিশ্চয়ই তুমি উপযুক্ত সমাপ্তি বলবে। কারণ সুন্দরের প্রেমের চেয়ে সঙ্গীতের উত্তম সমাপ্তি আর কী হতে পারে?

    ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস।

    সঙ্গীতের পরে আসে শরীরচর্চা। আমাদের রাষ্ট্রের তরুণদের শরীরচর্চায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

    অবশ্যই।

    শরীরচর্চা এবং সঙ্গীতের শিক্ষা ছোটকাল থেকেই শুরু করা আবশ্যক। এ-শিক্ষাকে যেমন সতর্কতার সঙ্গে দিতে হবে তেমনি সমগ্র জীবন ধরেই এ-শিক্ষাকে কার্যকর রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, শারীরিক কোনো উৎকর্ষ আত্মার কোনো উৎকর্ষসাধন করে না। কিন্তু আত্মার উৎকর্ষ শারীরিক উৎকর্ষকে সম্ভবমতো সাহায্য করে। আমার এ-বিশ্বাস ঠিক কি না আমি জানিনে। এ-বিষয়ে, গ্লকন, আমি তোমার অভিমতটি জানতে চাই। তুমি কী বল?

    তোমার বক্তব্যকে আমি স্বীকার করি, সক্রেটিস ।

    তা হলে আত্মা যখন উপযুক্তরূপ শিক্ষিত হয়েছে তখনই মাত্র আমরা তার কাছে আমাদের শরীরের উৎকর্ষের প্রশ্নটি ছেড়ে দিতে পারি। ঠিক নয় কি? তা-ই যদি হয় তা হলে বর্ণনার দৈর্ঘ্যকে পরিহার করার জন্য আমরা বরঞ্চ বিষয়টির একটি সাধারণ চিত্র উপস্থিত করব।

    তা-ই ভালো।

    আমাদের শাসকের যে সুরামত্ততা পরিহার করতে হবে, সেকথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, আর যে-কেউ সুরামত্ত হোক-না কেন, রাষ্ট্রের যে শাসক তার পক্ষে সুরামত্ত হয়ে তার আপন অবস্থানের কথা বিস্মৃত হওয়া কোনোক্রমেই চলতে পারে না।

    গ্লকন বললেন : একথা ঠিক। কারণ রাষ্ট্রের শাসককে সুস্থ রাখতে যদি আর-এক শাসকের প্রয়োজন হয় তা হলে ব্যাপারটি যথার্থই হাস্যকর হয়ে ওঠে।

    কিন্তু যারা শরীরচর্চায় নিয়োজিত তাদের আহারাদি সম্পর্কে আমাদের কী বিধান হবে? এটিও তো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষায় নিযুক্ত রয়েছে, নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    তা যদি হয় তা হলে সাধারণ ক্রীড়াবিদদের স্বাস্থ্য কি তাদের জন্য যথেষ্ট?

    কেন নয়, সক্রেটিস?

    আমি বললাম : না। তার কারণ, এদের শরীরের মেজাজ আমার নিকট নিদ্রালু বলে বোধ হয়। আর এ-মেজাজ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক। গ্লকন, তুমি কি একটা বিষয় খেয়াল করে দেখনি যে, এই ক্রীড়াবিদগণ তাদের জীবনের অধিক সময় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়? এর ফলে তাদের প্রচলিত জীবনপদ্ধতির সামান্য ব্যতিক্রম ঘটলে তারা বিষম সব রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

    হ্যাঁ, আমি খেয়াল করেছি। একথা ঠিক।

    তা হলে আমাদের রক্ষক অর্থাৎ সামরিক ক্রীড়াবিদদের জন্য আবশ্যক হবে উন্নততর প্রশিক্ষণের। কারণ আমাদের সামরিক ক্রীড়াবিদগণ হবে জাগ্রত কুকুরের ন্যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে শীত, গ্রীষ্ম, খাদ্য এবং আবহাওয়ার সমস্ত রকম পরিবর্তনকে তাদের সহ্য করতে হবে। সমস্ত অবস্থার মধ্যেই তাদের চোখ ও কানকে সর্বাধিক তীক্ষ্ণতায় সজাগ রাখতে হবে। কোনো অবস্থায় তাদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লে চলবে না।

    আমার অভিমতও তাই।

    যথার্থ শরীরচর্চাকে আমরা সঙ্গীতের যমজ সহোদরা বলে অভিহিত করতে পারি।

    কেমন করে?

    কারণ, আমার মনে হয় শরীরচর্চার মধ্যেও এমন প্রশিক্ষণ আছে যা আমাদের সঙ্গীতের ন্যায় সরল এবং উত্তম। বিশেষ করে সামরিক শরীর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একথা সত্য।

    তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

    হোমারের উল্লেখ করলে আমার কথার অর্থ তোমার নিকট পরিষ্কার হবে। তুমি জান হোমার যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর নায়কদের যে-বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় তাদের খাদ্যের মধ্যে কৃষ্ট্রের লক্ষণ আছে। তাদের খাদ্য হচ্ছে সৈন্যবাহিনীর খাদ্য। সমুদ্রতীরে তাদের অবস্থান। কিন্তু কবির বর্ণনায় তাদের খাদ্যে কোনো মৎস্যের পরিবেশন নেই। মাংসের ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া হচ্ছে পোড়া মাংস, রান্না মাংস নয়। কারণ মাংস সিদ্ধ কিংবা রান্না করার জন্য আবশ্যক হরেক রকম পাত্রের। এগুলোকে বহন করার অসুবিধা আছে। কিন্তু সৈন্যদের পক্ষে আগুন জ্বালিয়ে মাংস পুড়িয়ে আহার করা অনেক সহজ।

    হ্যাঁ, তা ঠিক।

    তা ছাড়া হোমারের বর্ণনায় কোথাও মিষ্টান্নের ব্যবস্থা আছে, এমন তো আমার আদৌ স্মরণ হয় না। অবশ্য মিষ্টিদ্রব্যাদি নিষিদ্ধকরণে হোমার কোনো একক ব্যক্তি নন। পেশাদার ক্রীড়াবিদমাত্রই জানে যে যারা তাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে চায়, মিষ্টদ্রব্য খাওয়া তাদের জন্য কিছু উপকারী নয়।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, একথা ঠিক। তারা একথা জানে এবং সে-কারণেই মিষ্টদ্রব্য আহার করা থেকে তারা সঠিকভাবেই বিরত থাকে।

    তা-ই যদি হয় তা হলে তুমি নিশ্চয়ই সাইরাকুজের ভূরিভোজ এবং সিসিলির রন্ধন প্রণালীকে অনুমোদন করবে না।

    না, এসব অনুমোদন করা যায় না।

    তা ছাড়া সৈনিককে যদি সুস্থ থাকতে হয় তা হলে কোরিন্থের তরুণীকেও তুমি তার সঙ্গিনী করে দেবে না নিশ্চয়ই?

    নিশ্চয়ই না।

    কিংবা ধরো এথেন্সের বেকারি সামগ্রীর কথা। এগুলিও নিশ্চয়ই তুমি তার জন্য অনুমোদন করবে না।

    না, এগুলি তার জন্য নিশ্চয়ই অনুমোদন করা চলে না।

    এই সমস্ত পানাহার এবং জীবনযাত্রা—একে আমরা সঠিকভাবেই বিচিত্র সুর এবং ছন্দের সৃষ্টি আর্কেষ্ট্রার সঙ্গে তুলনা করতে পারি। ঠিক নয় কি?

    তুমি ঠিকই বলেছ।

    সুরের আধিক্য যেমন স্বেচ্ছাচারিতার সৃষ্টি করে তেমনি পানাহারের আধিক্যও রোগের সৃষ্টি করে। অপরদিকে সুরের সারল্য যেমন আত্মার সংযমের জনক, শরীরচর্চার সারল্যও তেমনি শরীরের সুস্থতার কারণ।

    তোমার কথা খুবই সত্য সক্রেটিস।

    কিন্তু রাষ্ট্রে যখন যথেচ্ছাচার এবং রোগের বৃদ্ধি ঘটতে থাকে, তখন একদিকে যেমন ‘হাকিম কাছারি’ অর্থাৎ বিচারালয়ের আধিক্য ঘটতে থাকে তেমনি অপরদিকে ডিসপেন্সারি এবং ডাক্তারের বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রের বিচারক আর চিকিৎসক এদেরই জয় জয়কার। কেবল দাস নয়, স্বাধীন নাগরিকও সর্বদা শরণাপন্ন হয় বিচারক আর চিকিৎসকের। বিচারক এবং চিকিৎসকদের মনে তাই ভাব জাগে যেন তারা মস্ত কেউ।

    এতে আর সন্দেহ কী?

    শিক্ষার দুর্দশার নিদর্শন এর চেয়ে অধিক আর কী হতে পারে? যে-শিক্ষায় কেবল মাত্র কারিগর এবং নিকৃষ্ট ধরনের মানুষেরই বিচারকের এবং চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় উচ্চশিক্ষিত নাগরিকদেরও, সে-শিক্ষা অবশ্যই দুর্দশাগ্রস্ত। ব্যক্তিকে যখন বিচার এবং চিকিৎসার জন্য অর্থাৎ ন্যায় এবং স্বাস্থ্যের জন্য অপরের নিকট ছুটতে হয় কারণ তার নিজের মধ্যে ন্যায় এবং স্বাস্থ্যের অস্তিত্ব নেই এবং এ-কারণে যখন সে অপরকে তার বিচারক এবং প্রভুতে পরিণত করে নিজকে তার কাছে সমর্পণ কর দেয়, তখন তার আত্মার অমর্যাদা চরমে উপনীত হয়।

    গ্লকন বললেন : যথার্থ। এর চেয়ে লজ্জাজনক আরকিছু হতে পারে না।

    কিন্তু গ্লকন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হচ্ছে, যখন কোনো ব্যক্তি কেবল যে জীবনভর বিচারালয়ে মামলার বাদি কিংবা প্রতিবাদি হিসাবে জড়িত থাকে তা-ই নয়, তার কুশিক্ষার কারণে সে তার এই হীন অবস্থাতে আনন্দ এবং গর্ব বোধ করে। সে নিজেকে অসততার সেরা কারিগর মনে করে। তার কাছে ন্যায় কিছু না। সে মনে করে বিচারালয়ের প্রতিটি জটিল কন্দর এবং বন্ধন থেকে সে পিচ্ছিল জীবের ন্যায় অনায়াসে বেরিয়ে আসতে পারবে। সে মনে করে, যে-কোনো অবস্থাকে নিজের স্বার্থে মোচড় দেবার তার অপার ক্ষমতা। কিন্তু এতসব কিসের কারণে? এতে তার যা লাভ তা উল্লেখের অযোগ্য। অথচ সে জানে না, কোনো বিচারকের শরণাপন্ন না হয়ে নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে পারা অধিকতর মহৎ। এই যে বিচারালয়ের বন্দিত্ব—এ কি ব্যক্তির জন্য অধিকতর অসম্মানকর নয়?

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, সক্রেটিস। এ অবস্থা অধিকতর অসম্মানজনক।

    আমি বললাম : আবার ঔষধের কথা ধরো। মহামারি শুরু হলে কিংবা তুমি যখন আহত হও তখন নিরাময়ের জন্য ঔষধের ব্যবহার অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেরূপ কারণে নয়, কেউ যখন আলস্যে এবং শ্লথ জীবনযাপনে নিজের শরীরকে বদ্ধ জলাভূমিতে পরিণত করে নিত্যনূতন রোগের উদ্ভবভূমিতে পর্যবসিত করে ঔষধের আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে তখন তার জীবনে কি দুর্দশার চরম নেমে আসে না? এমন অবস্থায় এসলেপিয়াসের* শিষ্যদেরও উদর স্ফীতি, ছানি ইত্যাকার অদ্ভুত রোগের নাম আবিষ্কারে গলদঘর্ম হতে হয়।

    [* এসলেপিয়াস (কিংবা এসকিউলেপিয়াস) : চিকিৎসকদের পৌরাণিক পৃষ্ঠপোষক। (কর্নফোর্ড : রিপাবলিকের অনুবাদ পৃঃ ৯৩)]

    তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস। এরা অদ্ভুত সব রোগের নাম আবিষ্কার করতে থাকে।

    আমি বললাম : আমি মনে করি না, এসলেপিয়াসের যুগে এমন সব রোগের অস্তিত্ব ছিল। হোমারের কাহিনী থেকেই আমি এ সত্য অনুমান করতে পারি। আমরা হোমারের কাহিনীতে দেখি, নায়ক ইউরিপাইলাস যখন আহত হল তখন তাকে পান করানো হল বার্লি এবং পনিরমিশ্রিত প্রামানীয় সুরা। নিরাময়ের এমন উত্তেজক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এসলেপিয়াসের যে-শিষ্যবৃন্দ ট্রয়ের যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিল তাদের কোনো বিরূপ মন্তব্য আমরা দেখতে পাইনে। যে-তরুণী এই সুরাকে নায়কের হাতে তুলে দিল কিংবা যে-প্যাট্রোক্লাস আহত নায়কের চিকিৎসায় রত ছিল তাদের কাউকে এসলেপিয়াসের অনুসারীগণ ভর্ৎসনা করার কারণ দেখেনি।

    গ্লকন বললেন : আহত নায়কের যে-অবস্থা তাতে এমন সুরার ব্যবস্থা করা অসাধারণই বটে।

    আমি বললাম : গ্লকন, খুব যে অসাধারণ এমন কথা আমি বলতে পারিনে। কারণ তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, হেরোডিকাসের পূর্বে এসলেপিয়াস সম্প্রদায় আমাদের বর্তমান কালের রোগশিক্ষা ও নিরাময়ব্যবস্থার চর্চা করত না। কিন্তু হেরোডিকাস নিজে ছিল শারীর-শিক্ষক এবং রোগাক্রান্ত। ফলে শারীর-শিক্ষণ এবং চিকিৎসা—এই উভয়ের সংযোগে হেরোডিকাস যেমন নিজেকে পীড়িত করেছে, তেমনি সে পীড়িত করেছে পৃথিবীর অপর সকলকে।

    গ্লকন জিজ্ঞেস করলেন, কেমন করে?

    আমি বললাম : মৃত্যুকে দীর্ঘায়িত করার পন্থা আবিষ্কার করে। কারণ হেরোডিকাসের ছিল এক মারাত্মক রোগ। এ রোগ নিরাময়ের কোনো উপায় ছিল না। ফলে হেরোডিকাস সর্বদা এ রোগকে পোষণ করে চলত। সমগ্র জীবন সে এমনি রুগ্ন অবস্থায় কাটাতে বাধ্য হয়। এই রোগের পরিচর্যা করা ব্যতীত তার কোনো উপায় ছিল না। তার অভ্যস্ত জীবনের ব্যতিক্রম ঘটলে রোগের যন্ত্রণায় সে ক্লিষ্ট হত। এমনিভাবে নিজের নিরাময়ব্যবস্থায় মৃত্যু বিলম্বিত হতে হতে হেরোডিকাস বিরামহীন যন্ত্রণার মধ্যে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবিত থাকে।

    নিজের নিরাময় দক্ষতার এক চমৎকার পুরস্কার বটে।

    হ্যাঁ গ্লকন, এক চমৎকার পুরস্কার বটে। আর এ পুরস্কার সে লাভ করেছে তার এই অজ্ঞতা থেকে যে, তার এমন নিরাময়ব্যবস্থার উল্লেখ এসলেপিয়াস যে তাঁর বংশধরদের জন্য করে যাননি তার কারণ এই নয় যে এসলেপিয়াস এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন কিংবা তাঁর অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। কারণ, এসলেপিয়াস জানতেন একটি সুব্যবস্থিত সমাজে প্রত্যেকেরই একটা করণীয় থাকে এবং কারুর পক্ষে কেবল রোগের পরিচর্যা এবং নিরাময়ব্যবস্থায় জীবনপাত করা সঙ্গত নয়। কারিগর বা শ্রমিকের ক্ষেত্রে এ কথাটি বুঝতে আমাদের অসুবিধে হয় না। কিন্তু কী আশ্চর্য এ-সত্য যে ধনবান এবং সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য, একথাটিই আমরা বুঝতে চাইনে।

    কেমন করে প্রযোজ্য?

    আমি বলতে চাচ্ছি, একজন সূত্রধর যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন সে কী করে? সে তার চিকিৎসকের নিকট গমন করে এবং তার রোগের আশু নিরাময়ের কোনো ব্যবস্থার অনুরোধ করে। এজন্য চিকিৎসক তার পাকস্থলী পরিশোধনের কিংবা দহনের কিংবা প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে। কিন্তু কেউ যদি তার জন্য একটি দীর্ঘ পথ্যের পরামর্শ দেয়, যদি বলে তার মাথাটা বস্ত্রাবৃত রাখা আবশ্যক কিংবা অঙ্গের কোথাও পট্টি বাঁধা প্রয়োজন কিংবা অনুরূপ আরও কিছু তার করা আবশ্যক তখন সূত্রধর তেমন ব্যবস্থার জবাবে বলে : অসুস্থ হওয়ার তার সময় নেই এবং তার দৈনন্দিন কর্মকে অবহেলা করে তার রোগের পরিচর্যা করার কোনো সার্থকতাও সে স্বীকার করে না। একথা বলে সে অবশ্যই তার চিকিৎসকের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে নিজের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় প্রত্যাবর্তন করে এবং দৈনন্দিন কর্তব্য-সম্পাদনে সে রত হয় এবং এমন অবস্থায় হয় সে রোগমুক্ত হয়ে জীবনধারণ করে এবং নিজের দায়িত্ব পালন করতে থাকে নয়তো শারীরিক শক্তি নিঃশেষিত হলে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মোটকথা, তার উদ্বেগের আর কারণ থাকে না।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, ঠিকই। এমন অবস্থা যার, তার পক্ষে এর অধিক ঔষধ ব্যবহার করা সঙ্গত নয়।

    কারণ তার একটা জীবিকা আছে। তার নিরাময়ব্যবস্থা যদি তাকে তার জীবিকা থেকে বঞ্চিত করে তা হলে তার বিনিময়ে সে কী লাভ করবে?

    ঠিক কথা, সক্রেটিস।

    কিন্তু যে সম্পদশালী তার কথা ভিন্ন। যার অর্থ আছে তার সম্পর্কে আমরা বলিনে যে তার করণীয় একটা নির্দিষ্ট জীবিকা আছে।

    হ্যাঁ, ঠিক কথা। বরঞ্চ সাধারণত মনে করা হয় যে তার কিছুই করণীয় নেই।

    কিন্তু ফসিলাইডিসের বাণীর কথা কি তুমি শোননি? ফসিলাইডিস বলেছেন, যার জীবনধারণের উপায় আছে অর্থাৎ যার জীবিকার জন্য চিন্তা করতে হয় না তার ন্যায়ের চর্চা করা আবশ্যক।

    ফসিলাইডিসের এ কথা আরও পূর্বে বলা আবশ্যক ছিল।

    গ্লকন, এ বিষয়ে ফসিলাইডিসের সঙ্গে ঝগড়ায় আমরা প্রবৃত্ত হতে চাইনে। তার চেয়ে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত : যে সম্পদশালী তার জন্য ন্যায়ের চর্চা কি অনিবার্য? কিংবা ন্যায়ের চর্চা ব্যতিরেকেই সে জীবনধারণ করতে পারে? আর যদি অনিবার্য হয় তা হলে আমাদের অপর প্রশ্ন হবে : সূত্রধর কিংবা অপর কোনো কারিগরের ক্ষেত্রে নিরাময় ব্যবস্থা যদি তার জীবনধারণের প্রতিবন্ধক হয়, তা হলে ধনবানের ক্ষেত্রেও রোগের পরিচর্যা কি ফসিলাইডিসের বাণীর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় না?

    গ্লকন বললেন : এ-সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, সক্রেটিস। শরীরের যত্ন—সেও যদি শরীরচর্চার নিয়মকে অতিক্রম করে তা হলে সে ন্যায়চর্চার গুরুতর বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

    আমি বললাম : যথার্থ বলেছ গ্লকন। এমন পরিচর্যা, সংসারযাপন, সামরিক বাহিনীর রক্ষা কিংবা রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বপালনের প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। এবং সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, পরিচর্যার এই আধিক্য যে-কোনো অধ্যয়ন, চিন্তা কিংবা সাধনার প্রতিবন্ধক। এমন ব্যক্তির মনে সর্বদাই সন্দেহ, তার শিরঃপীড়া কিংবা শিরঘূর্ণন সবই তার দর্শন অধ্যয়নের কারণে ঘটছে। এই সন্দেহ থেকে ন্যায়ের সব চর্চাই সে বন্ধ করে দেয়। তার কেবল কল্পনা, এই বুঝি সে অসুস্থ হয়ে পড়ল; তার সার্বক্ষণিক উদ্বেগ তার শরীরের অবস্থান্তর সম্পর্কে।

    হ্যাঁ, তার উদ্বেগ এরূপ হওয়াই স্বাভাবিক।

    এসলেপিয়াসকে আমাদের রাজনীতিজ্ঞই বলতে হয়। কারণ তিনি তাঁর নিরাময়-ক্ষমতা কেবলমাত্র তাদের জন্যই প্রকাশ করেছেন যারা সাধারণত সুস্থ শরীরের অধিকারী কিন্তু যারা নির্দিষ্ট কোনো রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এদের তিনি বিশোধন এবং অস্ত্রোপচার প্রভৃতি পদ্ধতিতে নিরাময় করে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন করার উপদেশ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা চিন্তা করেছেন। কিন্তু রোগ যাদের দেহকে বিদীর্ণ করে ফেলেছে তাদের ক্রমান্বয়ে বিশোধনপ্রক্রিয়া ইত্যাদির দ্বারা নিরাময় করার কোনো চেষ্টা তিনি করেন নি। কারণ যে-জীবনের সার্থকতা নেই, তাকে তিনি প্রলম্বিত করতে চান নি; দুর্বল পিতাকে তিনি দুর্বলতর সন্তানের জনক হতে দিতে চান নি। যে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম হয়ে গেছে তাকে নিরাময় করার কোনো সার্থকতা তিনি দেখেন নি। কেননা, এরকম নিরাময় না ব্যক্তির নিজের, না রাষ্ট্রের কোনো যথার্থ উপকার সাধন করতে পারে।

    সক্রেটিস, তা হলে তোমার মতে এসলেপিয়াস একজন রাজনীতিজ্ঞ ছিলেন?

    অবশ্যই। এবং তাঁর এ চরিত্রের দৃষ্টান্ত আমরা তাঁর সন্তানদের মধ্যেও পাই। এঁরা সেই প্রাচীনকালের লোক ছিলেন এবং নিরাময়ের যে-পদ্ধতির কথা আমি উল্লেখ করেছি তার চর্চা তাঁরা ট্রয়ের অবরোধের মধ্যে করেছেন। তোমার নিশ্চয়ই সেই কাহিনীর কথা স্মরণ আছে, যেখানে প্যান্ডারাস মেনেলাসকে আহত করেছে। কবি* বলেছেন, “আহত মেনেলাসের ক্ষত থেকে চুমুক দিয়ে রক্ত টেনে বার করে তার ওপর চিকিৎসকগণ ঠাণ্ডা প্রলেপ লাগিয়ে দিলেন।” কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করার রয়েছে : ইউরিপাইলিসের ক্ষেত্রে যেমন মেনেলাসের ক্ষেত্রেও তেমনি আমরা পথ্যের কোনো নির্দেশ দেখিনে। এর অর্থ এই যে, যারা আঘাতের পূর্বে সুস্থ ছিল এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছে তাদের জন্য আঘাতের ঔষধই যথেষ্ট। এবং সে কারণেই আঘাতের পরে প্রামানিয়ার সুরাপানেও তার সুস্থ হয়ে উঠতে কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু যারা অসংযমী এবং অসুস্থ জীবনযাপনকারী, যাদের জীবনের সার্থকতা তাদের নিজেদের নিকট কিংবা অপরের নিকট আর কিছুই নেই, তাদের জন্য চিকিৎসকদের কিছু করণীয় নেই। নিঃশেষিত এমন জীবনের জন্য চিকিৎসাপ্রণালীর আবিষ্কার নয়। এমন অসুস্থ বক্তি যদি রাজা মিডাস-এর ন্যায়ও ধনবান হত, তা হলেও এসলেপিয়াসের চিকিৎসক-সন্তানগণ এমন ব্যক্তির চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করতে নিশ্চয়ই অস্বীকার করতেন।

    [*হোমার : ইলিয়াড]

    এসলেপিয়াসের সন্তানদের তা হলে খুবই ন্যায়নীতিজ্ঞ বলে অভিহিত করতে হয়।

    অবশ্যই তাঁদের ন্যায়নীতিজ্ঞ বলতে হয়। কিন্তু তথাপি পিন্ডার এবং শোকাত্মক নাট্যকারগণ যে আমাদের নীতি অনুযায়ী কোনো কাহিনী রচনা করেছেন এমন নয়। তাই যদিও তাঁরা এসলেপিয়াসকে দেবতা এ্যাপোলোর পুত্র বলে পরিচিত করেছেন তথাপি তাঁদের কাহিনীতে দেখা যায় যে, এক মরণোন্মুখ ধনাঢ্য ব্যক্তি পারিতোষিকের বিনিময়ে এসলেপিয়াসকে তার চিকিৎসায় সম্মত করাতে সক্ষম হয়েছে এবং এই অপরাধে এসলেপিয়াস পরিণামে বজ্রাহত হয়ে নিহত হন। কিন্তু আমাদের নীতির ভিত্তিতে আমরা উভয় কাহিনীকে বিশ্বাস করতে পারিনে : এসলেপিয়াস যদি দেবতার পুত্র হয়ে থাকেন তা হলে তিনি অর্থলোভী হতে পারেন না; আর যদি তিনি অর্থলোভী হয়ে থাকেন তা হলে তিনি দেবপুত্র নন।

    গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, তোমার বক্তব্য মনোহর। কিন্তু তোমার নিকট আমার একটি প্রশ্ন আছে। আমাদের রাষ্ট্রে কি উত্তম চিকিৎসকের আবশ্যকতা নেই? এবং কাদের তুমি উত্তম চিকিৎসক বলবে; যে-চিকিৎসক ভালো, মন্দ সর্বপ্রকার রোগের এবং সর্বাধিকসংখ্যক রুগির চিকিৎসা করছে তাকেই তো আমরা উত্তম চিকিৎসক বলব। ঠিক নয় কি? এবং উত্তম বিচারক কে? সর্বপ্রকার চরিত্রের সঙ্গে যারা পরিচিত তারাই তো সর্বোত্তম বিচারক?

    আমি বললাম : হ্যাঁ, উত্তম চিকিৎসক এবং উত্তম বিচারকের প্রয়োজনের কথা আমিও স্বীকার করি। কিন্তু আমি উত্তম কাকে বলব?

    তুমি বলো সক্রেটিস, কাকে তুমি উত্তম বলবে?

    আমি বলার চেষ্টা করছি। কিন্তু তার আগে আমার বলা প্রয়োজন, তোমার প্রশ্নের মধ্যে তুমি দুটো জিনিস একত্র করেছ। অথচ দুটো জিনিস এক নয়?

    কী রকম, সক্রেটিস।

    আমি বললাম : তুমি চিকিৎসক এবং বিচারককে যুক্ত করেছ। কিন্তু সবচেয়ে দক্ষ চিকিৎসক কাদের বলব? আমরা দক্ষ চিকিৎসক তাদের বলব যারা তাদের তরুণ বয়স থেকে চিকিৎসাপ্রণালীর জ্ঞানের সঙ্গে রোগের সর্বাধিক অভিজ্ঞতার সংযোগসাধন করতে সক্ষম হয়েছে। আর তাই তারা দেহে সবল হবে, এটা বড় প্রয়োজন নয়। বরঞ্চ প্রয়োজন হচ্ছে নিজেরাই সবরকম রোগ তারা ভোগ করবে। কারণ চিকিৎসক তার নিজের শরীর দ্বারা তো অপরের শরীরকে নিরাময় করে না। চিকিৎসকের দেহ তো নিরাময়ের যন্ত্র নয়। তা-ই যদি হত তা হলে চিকিৎসকের কোনোদিন রোগাক্রান্ত হওয়াকে আমরা নিষিদ্ধ করতাম। কিন্তু চিকিৎসক অপরের চিকিৎসা করে তার মনের জ্ঞান দ্বারা। এবং এ-কারণেই, মনের অসুস্থ হওয়া চলে না। যে-মন রোগের দ্বারা আক্রান্ত এবং অসুস্থ সে-মন কাউকে সুস্থ করতে পারে না।

    কিন্তু বিচারকের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিন্তু ভিন্নরূপ। বিচারক মন দ্বারা মনের বিচার করে। এ-কারণে অপরাধী মনের সংসর্গে তার শিক্ষা পরিচালিত হবে, একথা যেমন আমরা বলতে পারিনে, তেমনি রোগের ন্যায় অপরাধকে দ্রুত চিহ্নিত করার ক্ষমতার জন্য সে তার তরুণ বয়স থেকে সর্বপ্রকার অপরাধ সম্পাদন করবে, এমন কথাও আমরা বলতে পারিনে। বরঞ্চ আমাদের বলতে হয়, যে-মনের দায়িত্ব হচ্ছে সুস্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, সে-মনকে তার তরুণকালে অসৎসঙ্গে কলুষিত হতে দেওয়া চলে না। এ-কারণে যারা সৎ, তরুণকালে তাদের সরল বলে বোধ হয় এবং অসৎকর্মে তাদের অনভিজ্ঞতার সুযোগে অসৎ ব্যক্তিগণ এদের প্রতারণার সুযোগ লাভ করে।

    হ্যাঁ, এরা প্রতারণার সহজ শিকারে পরিণত হয়।

    এ-কারণেই আমার বক্তব্য হচ্ছে : বিচারককে তরুণ হলে চলবে না। অস ৎকে সে জানবে বটে; কিন্তু তার নিজের আত্মাকে অসৎ করে নয়। অপর চরিত্রের মধ্যে অসৎ-এর পরিপক্ক এবং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সে অসৎ এবং অপরাধের জ্ঞান অর্জন করে। এক্ষেত্রে জ্ঞান তার পরিচালক বটে, কিন্তু জ্ঞান তার আপন অভিজ্ঞতা নয়।

    গ্লকন বললেন : হ্যাঁ, একজন বিচারকের আদর্শ তা-ই হবে।

    আমি বললাম : হ্যাঁ, এবং তোমার প্রশ্নের জবাব হিসাবে বলছি, এমনিভাবে বিচারক উত্তম ব্যক্তি হবে। কেননা উত্তম কে? যার আত্মা উত্তম, সেই-ই উত্তম। আর যে ক্রূর এবং সন্দেহপরায়ণ, যে বহু অপরাধের কৃতকর্মা পুরুষ এবং অসৎ-এর সংসর্গে যে নিজেকে নষ্টামির প্রভু বলে গণ্য করে (কেননা সে অপরকে নিজের মানদণ্ডে পরিমাপ করে) এমন ব্যক্তি যখন এমন সৎ-এর সংসর্গে আসে যে সৎ-এর বয়সগত অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়েছে, তখন সে-অসৎ নিজেকে আবার মূর্খরূপেই দেখতে পায়। কারণ, অসৎ তার অস্বাভাবিক সন্দেহপরায়ণতা এবং সৎ-এর বিষয়ে তার অনভিজ্ঞতার কারণে সৎ-কে চিহ্নিত করতে অক্ষম হয়। কিন্তু অসৎ-এর এই সুবিধা যে, তার সংখ্যা অধিক; তার সাক্ষাৎ সৎ-এর চেয়ে অসৎ-এর সঙ্গে অধিক আর তাই অসৎ-এর সমাজে সে মূর্খের চেয়ে জ্ঞানী বলেই অধিক বিবেচিত।

    এতে আর সন্দেহ কি?

    তা হলে উত্তম এবং জ্ঞানী বিচারক, যার আমরা অন্বেষণ করছি সে নিশ্চয়ই অমন অসৎ-এর অভিজ্ঞ ব্যক্তি নয়; বরঞ্চ সে হচ্ছে অপর ব্যক্তি। অসৎ সৎ-কে জানে না, একথা ঠিক। কিন্তু সৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত হয়ে ওঠে এবং এই শিক্ষার মাধ্যমে সে সৎ এবং অসৎ—উভয়ের পার্থক্য চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। কাজেই, আমার মতে, যে সৎ সেই-ই জ্ঞানী, যে-অসৎ সে জ্ঞানী নয়।

    আমারও সেই মত, সক্রেটিস।

    কাজেই আমাদের রাষ্ট্রে যে-ঔষধ এবং যে-বিধানকে আমরা অনুমোদন করতে চাই তাদের প্রকৃতি হবে আমরা যেরূপ উপরে উল্লেখ করেছি সেরূপ। এরা উভয় সৎপ্রকৃতির সহায়ক হবে; এরা আত্মা এবং দেহ—উভয়ের স্বাস্থ্যকে নিশ্চিত করবে। কিন্তু রোগাক্রান্ত দেহকে যেমন তারা মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দেবে তেমনি দূষিত এবং দূরারোগ্য আত্মার অস্তিত্বও তারা বিনষ্ট করে দেবে।

    হ্যাঁ, এ-ব্যবস্থা রোগী এবং রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই মঙ্গলকর।

    কাজেই আমাদের তরুণ সম্প্রদায়, যারা কেবল সরল সঙ্গীতে শিক্ষিত হয়েছে, এবং যে-সরল সঙ্গীত মানুষের মধ্যে সংযমের প্রেরণা যোগায়—তারা যখন-তখন আইনের দ্বারস্থ হওয়াতে অনিচ্ছুকই হবে।

    নিঃসন্দেহে।

    তেমনি সঙ্গীতজ্ঞ যে এই একই নীতিতে সরল শরীরচর্চায় নিবদ্ধ রয়েছে, সে যখন-তখন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়াকে উত্তম কাজ বলে বিবেচনা করবে না। কেবলমাত্র বিশেষ প্রয়োজনেই সে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হবে।

    আমিও তা-ই বিশ্বাস করি।

    কারণ, যে-পরিশ্রম এবং অনুশীলনকে সে স্বীকার করে সে-পরিশ্রম এবং অনুশীলন তার মধ্যে দৈহিক শক্তির চেয়ে একটি সাহসী মনোভাবের সৃষ্টি করে। আর তাই পরিশ্রম এবং অনুশীলনের মাধ্যমে কেবল তার পেশিগুলিকেই সে দৃঢ় করার চেষ্টা করে না।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    এবং এই সঙ্গীত এবং শরীরচর্চা, এদের কারুরই প্রকৃত উদ্দেশ্য আত্মা কিংবা দেহের প্রশিক্ষণ নয়।

    তা হলে এদের প্রকৃত লক্ষ্য কী?

    আমি বললাম : আমার বিশ্বাস, এই উভয় ক্ষেত্রের শিক্ষাদাতার প্রধান লক্ষ্য আত্মার উৎকর্ষসাধন।

    গ্লকন বললেন : তা কেমন করে সম্ভব?

    আমি বললাম : গ্লকন, কেবল শরীরচর্চায় কেউ নিজেকে নিয়োজিত রাখলে তার আত্মার উপর কীরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয় এবং কেবল সঙ্গীতে নিবিষ্ট থাকলে তার আত্মার উপর অপর কী প্রভাব সৃষ্টি হয়, তা কি তুমি লক্ষ করনি?

    কী প্রভাব সৃষ্টি হয়?

    আমি বললাম : একটি ক্ষেত্রে যেখানে ব্যক্তির মন কঠিন এবং হিংস্র হয়ে ওঠে, অপরক্ষেত্রে সেখানে তার মন একেবারে কোমল এবং স্ত্রীসুলভ হীনবল হয়ে পড়ে।

    গ্লকন বললেন : তুমি ঠিক বলেছ সক্রেটিস। আমি দেখেছি, যে কেবল শরীরচর্চাবিদ সে স্বভাবে প্রায় বর্বর হয়ে ওঠে এবং যে কেবল সঙ্গীতজ্ঞ সে এত অধিক নরম এবং দ্রাব্য হয়ে পড়ে যে এই সঙ্গীত তার কোনো মঙ্গলসাধন করতে পারে না।

    এই বর্বরতার কিংবা হিংস্রতার উদ্ভব কিন্তু তেজ থেকে। অথচ সুশিক্ষা এই তেজকে সাহসে পরিণত করতে পারে। কিন্তু তেজের আধিক্য আবার কাঠিন্য এবং বর্বরতায়ও পরিণত হতে পারে।

    আমিও তা-ই মনে করি।

    কিন্তু যে দার্শনিক, তার মধ্যে থাকবে একটা সুজনতা। আবার সৌজন্যের আধিক্য দুর্বলতায় রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু সঠিক শিক্ষা তাকে ভদ্র এবং পরিমিত করে তুলতে পারে।

    এ কথা সত্য।

    এবং আমাদের অভিমত হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্রের শাসকের এই উভয় গুণই থাকতে হবে; সাহস এবং সুজনতা।

    অবশ্যই।

    এবং উভয়ের মধ্যে থাকতে হবে একটা সঙ্গতি।

    নিঃসন্দেহে।

    আর যে-আত্মা সঙ্গতিপূর্ণ সে যেমন সংযমী তেমনি সাহসী। নয় কি?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    আবার যে-আত্মা অসঙ্গতিপূর্ণ সে যেমন ভয়ার্ত তেমনি সে অশিষ্ট। কী বল গ্লকন?

    খুবই যথার্থ কথা, সক্রেটিস।

    এখন সেই সঙ্গীতের কথা ধরো যে-সঙ্গীতের কথা আমরা একটু পূর্বেই আলোচনা করছিলাম। সেই পেলব, মধুর এবং বিষাদময় সঙ্গীতের ধারা যদি কারুর কর্ণকুহরের মধ্যে ঢেলে দেওয়া হতে থাকে এবং এই কর্ণকুহরের মধ্য দিয়ে সেই সঙ্গীতধারা যদি সঙ্গীতপায়ীর আত্মাকে প্লাবিত করে এবং সে তার সমগ্র জীবন এই সঙ্গীতের ধারায় অতিবাহিত করে তা হলে তার ফল কী হয়? এর ফলে গোড়ার দিকে তার মনের তেজ লোহার ন্যায় শক্ত হয়ে ওঠে, মনের ভঙ্গুরতা এবং অপদার্থতা কেটে যায়। কিন্তু সঙ্গীত পানের উপরোক্ত ধারাটি যদি চলতে থাকে তা হলে পরবর্তী পর্যায়ে এই ব্যক্তি আবার দ্রব হতে শুরু করে এবং এই প্রক্রিয়ায় তার তেজ নিঃশেষিত হয়ে যায়। তার আত্মার বাঁধনগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং পরিণামে সে একজন নাজুক যোদ্ধায় পর্যবসিত হয়।

    একথাও সত্য, সক্রেটিস।

    এই ব্যাপারটাকে আর একটু দেখা যাক। সঙ্গীত-পায়ীর তেজ যদি দুর্বল হয় তা হলে তার ভেতরে পরিবর্তন দ্রুত সাধিত হয়। কিন্তু তার তেজের পরিমাণ যদি অধিক হয়, তা হলে সঙ্গীতের দ্রাব্য শক্তি তাকে উত্তেজনক্ষম করে তোলে। সামান্য মাত্র উদ্দীপকেই সে মুহূর্তে জ্বলে ওঠে এবং মুহূর্তেই নিৰ্বাপিত হয়ে যায়। এখন থেকেই তার মধ্যে তেজের পরিবর্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে সে অবাস্তব অক্ষমে পরিণত হয়ে যায়।

    তোমার বর্ণনা খুবই ঠিক, সক্রেটিস।

    এবং যেমন সঙ্গীতে, তেমন শরীরচর্চায়। যে ব্যক্তি শরীরচর্চায় আধিক্য দেখায়, সঙ্গীত এবং দর্শনচর্চার বদলে যে কেবল ব্যায়াম এবং খাদ্যগ্রহণেই পারদর্শী সে-ও এর ফলে প্রথমে নিজের তেজ এবং দেহের সুঠাম গঠনে গর্ববোধ করে এবং গর্বের স্ফীতিতে সে নিজেকে নিজের পূর্ব অস্তিত্বের দ্বিগুণ বলে কল্পনা করে।

    হ্যাঁ, সে এরূপ কল্পনা করে।

    কিন্তু এর ফলে কী হয়? এমন ব্যক্তি যদি আর কিছু না করে, সঙ্গীতের সঙ্গে যদি তার কোনো সম্পর্ক না থাকে তা হলে যতটুকু বুদ্ধি তার মধ্যে ছিল সে-বুদ্ধিও জিজ্ঞাসা, চর্চা এবং চিন্তার অভাবে ক্রমান্বয়ে ক্ষীণতর, ভোঁতা এবং অন্ধ হয়ে যায়। ফলে তার মনের চেতনা লোপ পায়, তার সব পরিপোষণ বন্ধ হয়ে যায় এবং তার অনুভূতিগুলো কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ঠিক নয় কি, গ্লকন?

    যথার্থ, সক্রেটিস।

    পরিণামে এমন ব্যক্তি দর্শন-বিদ্বেষী এবং বর্বর হয়ে পড়ে। বুদ্ধি বা যুক্তির ব্যবহার তার লোপ পেয়ে যায়। এমন ব্যক্তি বস্তুত বন্য জন্তুতে পরিণত হয়। তার চরিত্রে হিংস্রতা এবং বন্যতা ব্যতীত অপর কোনো গুণের সাক্ষাৎ মেলে না। ফলে অজ্ঞতা এবং নিকৃষ্ট পরিবেশের মধ্যে তার জীবন অতিবাহিত হয়। তার জীবনে কোনো পরিমিতিবোধ থাকে না; তার জীবনে সৌন্দর্যের কোনো স্পর্শ থাকে না।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    মানুষের স্বভাবে দুটি ধারা আছে : একটি তেজের। অপরটি চিন্তার, দর্শনের। এবং আমার মনে হয়, দেবতা মানুষের মধ্যে এই দুটি ধারার প্রয়োজনে দুটি দক্ষতার সৃষ্টি করেছে। এ-দুটি নীতি বা দক্ষতা হচ্ছে বীণার দুটি তারের ন্যায়। এদের সৃষ্টি এ-কারণে যেন তার দুটিকে আমরা জীবনে সঙ্গত তৈরির জন্য যেমন প্রয়োজন তেমনভাবে ঢিলা অথবা শক্ত করে বেঁধে দিতে পারি।

    হ্যাঁ, এ-কারণেই জীবনে দুটি ধারার সৃষ্টি।

    এবং যে-ব্যক্তি সঙ্গীতকে শরীরচর্চার সঙ্গে সঠিক পরিমাণে মিশ্রিত করতে পারে এবং আত্মার সঙ্গে সঙ্গতির সঠিক বন্ধনে তাদের বাঁধতে পারে তাকে আমরা অপর যে-কোনো সুরকার এবং তন্ত্রীর চেয়ে যথার্থ সঙ্গীতজ্ঞ এবং সুরকার বলে অভিহিত করতে পারি।

    তুমি ঠিক বলেছ, সক্রেটিস।

    আমাদের রাষ্ট্রে সরকারকে যদি স্থায়ী হতে হয় তা হলে এমন দক্ষ প্রতিভার নিশ্চয়ই আবশ্যক হবে।

    হ্যাঁ, এরূপ প্রতিভার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

    তা হলে আমাদের পরিপোষণ এবং শিক্ষার এই হচ্ছে নীতি। এর পরে কেমন করে আমাদের নাগরিকগণ নৃত্য করবে কিংবা শিকারে বার হবে, কেমন করে তারা শরীরচর্চা করবে বা অশ্বচালনার প্রতিযোগিতা কেমন করে অনুষ্ঠিত হবে—এর বিস্তারিত আলোচনা অনাবশ্যক। কারণ এ সবই আমাদের মূলনীতি দ্বারা নির্দিষ্ট হবে। সেই মূলনীতি যখন আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি তখন এ-সমস্ত নির্ধারণে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।

    হ্যাঁ, আমিও জোর দিয়ে বলতে পারি, এ-বিষয়ে কোনো অসুবিধা হবে না।

    বেশ ভাল। তা-ই যদি হয় তা হলে আমাদের পরবর্তী জিজ্ঞাসা কী? আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন কি এই নয় : কে রাষ্ট্রের শাসক হবে এবং কে শাসিত হবে?

    অবশ্যই। এটাই এখন প্ৰশ্ন।

    এক্ষেত্রে একটা বিষয়ে সন্দেহ নেই যে বয়োজ্যেষ্ঠ বয়োকনিষ্ঠকে শাসন করে।

    নিঃসন্দেহে।

    এবং এদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম তারাই শাসন করবে।

    সে-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই।

    আচ্ছা, সর্বোত্তম কৃষক আমরা কাকে বলব? যারা কৃষিকাজে একনিষ্ঠ তাদেরই তো আমরা সর্বোত্তম কৃষক বলব, নয় কি?

    অবশ্যই।

    তা হলে আমাদের রাষ্ট্রে সর্বোত্তম শাসক যখন আমরা চাচ্ছি তখন শাসকের চরিত্র যাদের মধ্যে সর্বাধিক তাদেরই তো আমরা সর্বোত্তম শাসক বা রাষ্ট্রের সর্বেত্তম অভিভাবক বলব?

    হ্যাঁ, একথা ঠিক।

    কিন্তু রাষ্ট্রের বিশেষ যত্ন যদি তাদের দায়িত্বে হয় তা হলে তাদের জ্ঞানী

    এবং দক্ষ হতে হবে।

    একথাও সত্য।

    কারণ মানুষ যত্ন গ্রহণ করে কার? যাকে সে ভালোবাসে তাকেই সে যত্ন করে, নয় কি?

    নিশ্চিত।

    এবং সে ভালোবাসবে তাকে যার স্বার্থের সঙ্গে তার স্বার্থের মিল রয়েছে এবং যার সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য তার নিজের সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য বহন করে আনবে বলে সে মনে করে।

    খুবই সত্য কথা, সক্রেটিস।

    তা হলে আমাদের শাসক বাছাই করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য করতে হবে অভিভাবকদের মধ্যে কারা তাদের জীবনে রাষ্ট্রের জন্য যা মঙ্গলকর তা সম্পাদনের সর্বাধিক আগ্রহ প্রদর্শন করেছে এবং দেশের জন্য যা অমঙ্গলকর তার প্রতি কারা সর্বাধিক ঘৃণা পোষণ করেছে।

    হ্যাঁ, এরাই উপযুক্ত শাসক।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার
    Next Article প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026
    Our Picks

    প্রবাদ মালা – রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার

    May 9, 2026

    প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

    May 9, 2026

    অপেক্ষার বারোমাস – অর্পিতা সরকার

    May 1, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }