৩. থ্র্যাসিমেকাস : ন্যায় হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ
অধ্যায় : ৩
[৩৩৮–৩৪৮]
থ্র্যাসিমেকাস : ন্যায় হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ
ন্যায় সম্পর্কে পলিমারকাসের সংজ্ঞা সক্রেটিস নাকচ করেছেন। কিন্তু এখনও তিনি নিজের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা উপস্থিত করেননি। বস্তুত সরাসরি কোনো প্রশ্নের সমাধান পেশ করা সক্রেটিসের রীতি নয়। সক্রেটিসের রীতি আপাতদৃষ্টিতে নেতিবাচক। অসার তত্ত্বের অসঙ্গতি দেখাবার মাধ্যমে তিনি অগ্রসর হন। কিন্তু ন্যায়ের প্রশ্নে পলিমারকাসের তত্ত্বই তো একমাত্র অসার তত্ত্ব নয়। সক্রেটিস পলিমারকাসের তত্ত্বের অসঙ্গতি দেখাতে পলিমারকাস অমনি স্বীকার করলেন, তাঁর সংজ্ঞাটি গ্রহণ করা যায় না। থ্র্যাসিমেকাস পলিমারকাসের এমন সহজ পরাজয় স্বীকারটি পছন্দ করলেন না। তিনি একটি নূতন সংজ্ঞা উপস্থিত করলেন : ন্যায় হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ। তাঁর মতে ‘ন্যায়’ ‘অন্যায়’ ইত্যাকার নীতিবাচক শব্দ শক্তিমান অর্থাৎ শাসকের তৈরি। তাদের জন্য যা স্বার্থবহ তাকেই তারা ন্যায় বলে শাসিতের ওপর জবরদস্তিভাবে আরোপ করে। শাসিতের যে-কাজ তাদের স্বার্থের পরিপন্থী তাকে শক্তিমান শাসক অন্যায় বলে। কাজেই ‘ন্যায়’ ‘অন্যায়’ মানুষেরই তৈরি, শক্তিমানের তৈরি। ব্যক্তিনিরপেক্ষ, অবস্থানিরপেক্ষ ন্যায় বলে কোনো সত্তা থাকার যে-তত্ত্ব সক্রেটিস উপস্থিত করতে চাচ্ছেন এ-তত্ত্ব তার চরম বিরোধী তত্ত্ব। এ-তত্ত্ব যে প্লেটো কেবল একটি সংজ্ঞার পালটা সম্ভাব্য অপর একটি সংজ্ঞা হিসাবে উপস্থিত করেছেন, এমন নয়। সমসাময়িক গ্রীসীয় রাষ্ট্রীয় জীবনে নানা মতাদর্শের সংঘাত চলছিল। এ্যাসিমেকাসের মুখে যে-তত্ত্বটি স্থাপন করা হয়েছে তা কাল্পনিক নয়। পেশাদার শিক্ষকসম্প্রদায় বা সফিস্টগণের সাধারণভাবে কোনো দর্শন না থাকলেও একটি বিষয়ে তাঁদের সবার মধ্যে সাদৃশ্য ছিল। প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বসমূহের তারা সমালোচনা করতেন। কেবল সমালোচনা নয়, কোনো কোনো সমস্যায় প্রখ্যাত সফিস্ট দার্শনিকদের বিশিষ্ট অভিমতও ছিল। এ্যাসিমেকাসের মুখে ন্যায়ের প্রশ্নে প্লেটো সফিস্টদের প্রচারিত তত্ত্বকেই প্রকাশ করেছেন। থ্রাসিমেকাসের মতে ন্যায় হচ্ছে দুর্বলকে শোষণ করার জন্য শক্তিমানের কৌশল কিংবা শক্তিমানকে প্রতিরোধের জন্য দুর্বলের জোট। ন্যায়ের এরূপ ব্যাখ্যায় অনেকে সামাজিক চুক্তিতত্ত্বের প্রাচীন প্রকাশ আঁচ করেন। কিন্তু থ্রাসিমেকাসের এরূপ ব্যাখ্যায় সামাজিক চুক্তির প্রকাশ দেখা যায়, এরূপ বলা চলে না। কারণ এরূপ মতে জনসাধারণ চুক্তির মাধ্যমে যে ন্যায় বা নীতিকে তৈরি করেছে এমন নয়। শাসক শক্তির জোরে তার নীতিকে সমাজের উপর চাপিয়ে দিয়েছে, গ্র্যাসিমেকাসের তত্ত্বের বক্তব্য এরূপ।
থ্রাসিমেকাসের তত্ত্বকে নাকচ করতে যেয়ে সক্রেটিস বললেন : শাসকের স্বার্থই যদি ন্যায় হয় তা হলে শাসক যেখানে নিজের স্বার্থ কী তা বুঝতে ভুল করে, সেখানে তার স্বার্থকে কেমন করে ন্যায় বলে অভিহিত করা চলবে? এখানেও সক্রেটিসের চেষ্টা তার সেই বিশ্বাসকে প্রকাশ করা যে, শাসকমাত্রই যে তার স্বার্থকে সঠিকভাবে জানবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সঠিকভাবে জানা নির্ভর করে জ্ঞানের উপর। সে-জ্ঞান স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারুর মধ্যে আসে না। সক্রেটিসের এই তত্ত্বের পথেই থ্রাসিমেকাসের জবাবের দুর্বলতা উন্মুক্ত হয়। থ্র্যাসিমেকাস জবাব দেন : শাসক, শাসক হিসাবে তার স্বার্থকে কখনো ভুল বুঝতে পারে না। এর পালটা জবাবে সক্রেটিস উল্লেখ করেন যে, প্রত্যেক শিল্পেরই একটা নিজস্ব সার্থকতা আছে। এ-সার্থকতা শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছা বা তার নিজের স্বার্থের উপর নির্ভর করে না। চিকিৎসা শিল্পের সার্থকতা রোগীর রোগ-নিরাময়ে। যে-চিকিৎসক যত অধিক তার রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারবে সে-চিকিৎসক তত বেশি সার্থক, রোগী তাকে প্রয়োজনীয় বা উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে সক্ষম হোক বা না হোক অর্থাৎ চিকি ৎসকের স্বার্থ রক্ষিত হোক বা না হোক। ঠিক তেমনি শাসনশিল্পের সার্থকতাও শাসনে অর্থাৎ শাসিতের মঙ্গলসাধনে। শাসকের ব্যক্তিগত স্বার্থ-অস্বার্থ বা লাভ-ক্ষতির ওপর শাসনশিল্পের সার্থকতা নির্ভর করে না। কাজেই এ্যাসিমেকাসের শাসক যেখানে মনে করে যে, তার ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষাই ন্যায় সেখানে সে তার শিল্পের স্বার্থকে অনুধাবন করতে ভুল করে। কাজেই শাসক, শাসক হিসাবে তার স্বার্থ বুঝতে ভুল করতে পারে না, থ্রাসিমেকাসের এরূপ দাবি যুক্তির বিচারে টিকতে পারে না।
.
মজলিসের গ্লকন এবং অপরাপর সবাই আমার এ-কথার সঙ্গে একমত হয়ে থ্র্যাসিমেকাসকে জবাবদানের অনুরোধ করতে লাগল। বস্তুত থ্রাসিমেকাসও তখন তাঁর বক্তব্য পেশ করার জন্য অস্থির হয়ে উঠছিলেন। কেননা, বোঝা যাচ্ছিল যে, থ্র্যাসিমেকাস মনে করছিলেন, আমাদের প্রশ্নের মোক্ষম জবাব তাঁর জানা আছে আর সে-জবাবদানে তিনি আমাদের সবাইকে বিস্মিত করে দেবেন। কিন্তু তবু তিনি আমাদের জবাবদানের ওপর আরও কিছুক্ষণ জোর দিতে লাগলেন। পরিশেষে তিনি নিজেই জবাব দিতে সম্মত হলেন। কিন্তু, এবারও বলতে যেয়ে তিনি প্রথমেই আমাকে আক্রমণ করে বললেন : তোমরা সবাই সক্রেটিসের জ্ঞানের বহরটি দ্যাখো। একদিকে সে নিজেকে শিক্ষিত করে তুলতে নারাজ, অপরদিকে সে ঢাক পেটাচ্ছে যেন সে অপরের কাছ থেকে সত্যই শিক্ষিত হতে আগ্রহী। অথচ, যার কাছ থেকে সে জ্ঞান পাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত একটি ‘ধন্যবাদে’র কথাও সে নিজমুখে উচ্চারণ করবে না।
আমি বললাম : থ্র্যাসিমেকাস, আমি যে অপরের নিকট থেকে শিক্ষা গ্ৰহন করি একথা যথার্থ; কিন্তু তাই বলে আমি অকৃতজ্ঞ, এ-অভিযোগ আমি স্বীকার করিনে। অর্থ-সম্পদ বলতে আমার কিছু নেই। এজন্য অর্থদান করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ যদি আমাকে উত্তমরূপে জ্ঞানদান করে তা হলে তার প্রশংসায় আমি অকৃপণ। প্রশংসায় অমি দীন নই। প্রশংসা দিয়েই আমি কৃতজ্ঞতার ঋণ পরিশোধ করি। প্রিয় গ্র্যাসিমেকাস! আমার একথার সত্যতা তুমি তোমার জবাবদানকালেই বুঝতে পারবে। তোমার জবাবদান নিশ্চয়ই উত্তম হবে এবং আমিও তোমার প্রশংসায় অবশ্যই অকৃপণ হব।
উত্তম কথা! তা হলে এবার আমার জবাব শোনো। আমি ঘোষণা করছি : ধর্ম কিংবা ন্যায়পরায়ণতা সবলের স্বার্থ ব্যতীত অপর কিছুই নয়।…. কিন্তু সক্রেটিস, এজন্য আমার প্রতি তোমার প্রশংসা কোথায়? আমি জানি এজন্য তুমি আমায় আদৌ প্রশংসা করবে না।
একটু অপেক্ষা করো, থ্র্যাসিমেকাস। আমাকে প্রথমে বুঝতে দাও। তুমি বলছ : ‘ধর্ম সবলের স্বার্থ।’—বেশ। কিন্তু এর তাৎপর্য কী হতে পারে? তুমি তোমার এই কথা দ্বারা নিশ্চয়ই এরূপ বোঝাচ্ছ না যে, কুস্তিগির পলিডামাস-এর জন্য যা উত্তম, দুর্বল আমাদের জন্যও তা উত্তম। পলিডামাস একজন কুস্তিগীর; কুস্তিক্রীড়ায় সে বিজয়ী; তার দেহের শক্তি আমাদের মতো দুর্বল মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। গোমাংস তার দেহের শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। সুতরাং, সে-মাংস তার জন্য উত্তম। থ্র্যাসিমেকাস, তুমি কি বলতে চাও যেহেতু গোমাংসভক্ষণ পলিডামাসের জন্য উত্তম, সুতরাং গোমাংসভক্ষণ দুর্বল আমাদের জন্যও উত্তম?
সক্রেটিস, এখানেই তুমি অসহ্য! তুমি মানুষের কথার এরূপ বিকৃত অর্থ কর যার ফলে যুক্তি নস্যাৎ হয়ে যায়।
আমি বললাম : ক্রুদ্ধ হয়ো না, জ্ঞানীবর। আমি তোমার কথার আদৌ বিকৃত অর্থ করিনি। আমি তোমার কথাকে শুধুমাত্র বোঝার চেষ্টা করছিলাম। সেই বোঝার প্রয়োজনেই বলছি, তুমি যদি তোমার বক্তব্যে দয়া করে আর একটু স্পষ্ট হও তা হলে আমাদের বড় উপকার হয়।
থ্রাসিমেকাস এবার গুরুত্বসহকারে বললেন : সক্রেটিস, তুমি কি জীবনে একথা কোনোদিন শোননি যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় পার্থক্য রয়েছে? স্বৈরতন্ত্র কিংবা অভিজাততন্ত্র-রূপ বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা কি তোমার অজ্ঞাত?
না, থ্র্যাসিমেকাস, এরা আমার অজ্ঞাত নয়। আমি এদের কথা শুনেছি।
তুমি কি একথাও জান না যে, একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বা সরকারই হচ্ছে শাসকশক্তি?
হ্যাঁ, অবশ্যই, সেই হচ্ছে শাসকশক্তি।
আর বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা তাদের আপন-আপন স্বার্থানুযায়ী তাদের আইনকানুন বিধিব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক, অভিজাততান্ত্রিক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক রূপ দান করে। অথচ, এই আইনকানুন বা বিধিব্যবস্থাকেই তারা ধর্ম বা ন্যায়পরায়ণতা বলে অভিহিত করে। নিজেদের স্বার্থে রচিত এই বিধিব্যবস্থাকে তারা ধর্ম বলে তাদের শাসিত নাগরিকদের নিকট উপস্থিত করে। নাগরিকদের মধ্যে কেউ যদি তাদের বিধানকে লংঘন করে, তা হলে তাকে তারা বিধানভঙ্গকারী এবং অন্যায়কারী বলে দণ্ডদান করে। এজন্যই, সক্রেটিস, আমি বলেছি যে, ধর্ম বা ন্যায় রাষ্ট্রব্যবস্থা-নির্বিশেষে সকল রাষ্ট্রেই এক। অর্থাৎ, রাষ্ট্রব্যবস্থা যা-ই হোক, সর্বত্রই ন্যায়পরায়ণতার অর্থ হচ্ছে শাসকের স্বার্থ। আবার শাসকই হচ্ছে শক্তি। তাও আমি বলেছি। কাজেই এ থেকে আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে এরূপ সিদ্ধান্তও করতে পারি যে, ন্যায়রায়ণতা শক্তিমানেরই স্বার্থ।
আমি বললাম : থ্র্যাসিমেকাস, এবার আমি তোমায় বুঝতে পারছি। এবার আমি দেখতে চেষ্টা করব, তোমার একথা সঠিক কি সঠিক নয়। কিন্তু গোড়াতেই একটা কথা আমি বলে নিচ্ছি। কথাটা এই যে, ন্যায়ের সংজ্ঞাদানে তুমি ‘স্বার্থ’ কথাটিকে ব্যবহার করতে কসুর করনি। অথচ, এটি তোমার একটি নিষিদ্ধ শব্দ। আমি শব্দটিকে ব্যবহার করাতে তুমি আপত্তি তুলেছ। অবশ্য, তোমার ক্ষেত্রে পার্থক্য এতটুকু যে, তোমার সংজ্ঞায় তুমি স্বার্থের সঙ্গে সবল কিংবা শক্তিমান কথাটি যোগ করে ন্যায়ের সংজ্ঞাটিকে শক্তিমানের স্বার্থ বলে অভিহিত করেছ।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : হ্যাঁ, তা আমি করেছি। কিন্তু সেই সামান্য যোগটুকুতে তোমার আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে না, সক্রেটিস।
তোমার যোগটুকু ছোট কি বড়, সেটি আসল কথা নয়। আমাদের এখন দেখতে হবে; তুমি যা বলেছ, সেকথা সত্য কি না। ধর্ম বা ন্যায় যে একপ্রকার স্বার্থ, সে-সম্পর্কে তুমি এবং আমি উভয়েই একমত। অবশ্য, স্বার্থের সঙ্গে তুমি শক্তির যে-যোগসাধন করেছ, সেটি যথার্থ কি না সে-সম্পর্কে আমি এখনও নিশ্চিত নই। এ-সম্পর্কে অধিকতর বিচার আমাদের প্রয়োজন।
বেশ, তা হলে তা-ই করো।
হ্যাঁ, সে-বিচার করারই আমি চেষ্টা করব। কিন্তু তার পূর্বে তুমি আমার একটি কথার জবাব দাও। তুমি বলো, তুমি কি একথা স্বীকার কর যে, শাসিতের পক্ষে শাসককে মান্য করাই ধৰ্ম?
হ্যাঁ, আমি একথা স্বীকার করি।
কিন্তু, তুমি কি মনে কর, রাষ্ট্রের শাসকগণ সর্বদাই অভ্রান্ত? না, কোনো কোনো সময়ে ভুল করাও তাদের পক্ষে সম্ভব?
অবশ্যই, তাদের পক্ষে ভুল করাও সম্ভব।
বেশ, তা হলে আমাদের স্বীকার করতে হয় যে, রাষ্ট্রের বিধিব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোনো সময়ে তারা সঠিক হতে পারে, আবার কোনো সময় তারা ভ্রান্তও হতে পারে।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
আর যখন তারা তাদের বিধানের ক্ষেত্রে সঠিক হয়, তখন সে-বিধান তাদের স্বার্থকে সাধন করে; কিন্তু, যখন বিধানের ক্ষেত্রে তারা ভ্রান্ত হয়, তখন সে-বিধান তাদের স্বার্থবিরোধী হয়। থ্র্যাসিমেকাস, একথা কি তুমি স্বীকার কর?
হ্যাঁ, একথা আমি স্বীকার করি।
কিন্তু, বিধান ভ্রান্ত কিংবা অভ্রান্তই হোক, তাকে মান্য করাই শাসিতের পক্ষে কর্তব্য; আর তোমার মতে সেটাই ধর্ম?
নিঃসন্দেহে, তা-ই তার ধর্ম।
তা হলে, তোমার যুক্তি অনুযায়ী ন্যায় কিংবা ধর্মের অর্থ কেবলমাত্র শাসকের স্বার্থকেই মেনে চলা নয়, ধর্মের অর্থ শাসকের স্বার্থের বিরোধিতা করাও হতে পারে?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, তুমি কী বলতে চাও, সক্রেটিস?
থ্রাসিমেকাস, আমি নতুন কথা বলছিনে। তুমি যা বলেছ, কেবল তারই পুনরাবৃত্তি করছি। তবু আমার কথাটাকে বুঝতে না পারলে আমি আবার বুঝিয়ে বলছি : একথা তো ঠিক যে, বিধানের ক্ষেত্রে শাসক তার স্বার্থের ব্যাপারে ভ্রান্ত হতে পারে; আর এও আমরা স্বীকার করেছি যে, শাসককে মান্য করাই হচ্ছে শাসিতের ধর্ম?
হ্যাঁ, সেকথা আমরা বলেছি।
তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, ধর্ম কিংবা ন্যায়ের অর্থ সব সময়ে শক্তিমান কিংবা শাসকের স্বার্থরক্ষা নাও হতে পারে। বিশেষ করে স্বার্থের ব্যাপারে শাসক যেখানে ভ্রান্ত, ন্যায় সেখানে শাসকের স্বার্থরক্ষা নয়। সেখানে শাসক বা শক্তিমানের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করাই হবে শাসিতের ধর্ম। কারণ, প্রাজ্ঞবর, তুমিই বলেছ যে, ধর্মের অর্থ হচ্ছে শাসিতের পক্ষে শাসকের বিধানকে মেনে চলা। তোমার এ-যুক্তির অনিবার্য সিদ্ধান্ত হিসাবে তোমাকে তাই স্বীকার করতে হয় যে, সবল শুধু তার স্বার্থরক্ষার জন্যই দুর্বলকে হুকুম দেয় না, তার স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্যও সে হুকুম দিতে পারে। তোমার পূর্ব যুক্তি থেকে এ-সিদ্ধান্তকে এড়িয়ে যাবার তো কোনো উপায় নেই, থ্র্যাসিমেকাস।
এখানে পলিমারকাস বলে উঠলেন : এ-সম্পর্কে আর সন্দেহ কী, সক্রেটিস?
তার সঙ্গে ক্লিটোফোন যোগ করলেন : তোমার সাক্ষ্যটি মূল্যবান পলিমারকাস। কিন্তু, থ্র্যাসিমেকাস তোমাকে মান্য করলেই তো তার মূল্য।
পলিমারকাস বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি বলে বলছিনে। বস্তুত এখানে অপরের সাক্ষ্যদানেরই কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, থ্র্যাসিমেকাস নিজেই স্বীকার করেছেন, শাসকরা শাসিতের উপর যে-বিধান প্রয়োগ করে সে-বিধান কোনো কোনো সময়ে শাসকের স্বার্থবিরোধীও হতে পারে। তথাপি বিধানমাত্রকে মেনে চলাই হচ্ছে শাসিতের ধর্ম।
হ্যাঁ, পলিমারকাস, একথা সত্য যে, থ্র্যাসিমেকাস বলেছেন, শাসক শাসিতের জন্য যে-বিধান স্থির করবে তাকে মেনে চলাই শাসিতের ধর্ম।
হা, ক্লিটোফোন, তা ছাড়া তিনি একথাও বলেছেন যে, শাসকের স্বার্থই হচ্ছে ধর্ম। এই দুটো কথাকে স্বীকার করতে যেয়ে থ্র্যাসিমেকাস একথাও স্বীকার করেছেন যে, সবল দুর্বলের প্রতি অথবা বলা চলে, শাসক শাসিতের প্রতি এমন আদেশ জারি করতে পারে যে-আদেশ শাসকের আদৌ স্বার্থবহ নয়। এ থেকেই সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়, সবল কিংবা শাসকের স্বার্থরক্ষাতেই কেবল ধর্ম নয় : ধর্ম তার স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করাতেও।
ক্লিটোফোন বললেন : শাসকের স্বার্থ বলতে থ্র্যাসিমেকাস নিশ্চয়ই ‘শাসক যা তার স্বার্থ বলে মনে করে’ তা-ই বোঝাতে চেয়েছেন। শাসক যাকে নিজের স্বার্থবহ বলে মনে করে, শাসিত তাকেই মান্য করে চলবে, এ্যাসিমেকাসের মতে এটাই ধৰ্ম।
পলিমারকাস বললেন, কিন্তু থ্রাসিমেকাসের ভাষা এরূপ ছিল না।
আমি বললাম : তাতে কিছু যায় আসে না। থ্র্যাসিমেকাস যদি এখন এরূপভাবেই বলতে চান তা হলে আমরা এটাকেই তাঁর বক্তব্য বলে ধরে নেব। কাজেই, থ্র্যাসিমেকাস, তুমি এবার পরিষ্কার করে বলে : ধর্ম কিংবা ন্যায় বলতে তুমি কি সবল বা শাসক যাকে তার নিজের স্বার্থবহ বলে মনে করে, সত্যকারভাবে তা তার স্বার্থবহ হোক বা না হোক, তাকেই বোঝাতে চেয়েছ?
না, এরূপ আমি বোঝাতে চাইনি। কখনোই আমি একথা বলতে পারিনে। তুমি কি মনে কর, যে নিজে ভ্রান্ত তাকে আমি অভ্রান্ত বলে অভিহিত করতে পারি?
আমি বললাম, থ্র্যাসিমেকাস, তুমি যখন বললে যে, শাসক অভ্রান্ত নয়, সে কোনো কোনো সময়ে ভ্রান্তও হতে পারে, তখন তোমার কথার অর্থকে তো আমি এরূপেই গ্রহণ করেছিলাম।
থ্রাসিমেকাস রেগে বললেন, সক্রেটিস, তুমি কথা বলছ গুপ্তচরের ন্যায়। তুমি কি মনে কর, যে-চিকিৎসক তার রোগীর ব্যাপারে ভ্রান্ত, যে-অঙ্কবিদ তার অঙ্কের ব্যাপারে ভ্রান্ত, কিংবা যে-ব্যাকরণিক ভাষার ব্যাকরণের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত, সে এই ভ্রান্ত অবস্থায়ও চিকিৎসক, কিংবা অঙ্কবিদ, কিংবা ব্যাকরণিক বলে অভিহিত হতে পারে? অবশ্য, একথা সত্য যে, আমরা সাধারণত বলে থাকি, চিকিৎসক একটি ভুল করেছেন কিংবা অঙ্কবিদ এই অঙ্কটি ঠিক করেননি কিংবা ব্যাকরণিক এখানে ভ্রান্ত। কিন্তু, এ হচ্ছে শুধুমাত্র আমাদের কথার একটি ভঙ্গি। তা না হলে সত্যই আমরা ভ্রান্ত চিকিৎসককে চিকিৎসক বলিনে। বস্তুত চিকি ৎসক, অঙ্কবিদ কিংবা ব্যাকরণিক—দক্ষতার ক্ষেত্রে কোনোক্রমেই ভ্রান্ত হতে পারে না। দক্ষতা এবং দক্ষতার ভ্রান্তি একই সঙ্গে সম্ভব হতে পারে না। যেখানে দক্ষতা ভ্রান্ত অর্থাৎ দক্ষ যেখানে অ-দক্ষ সেখানে কিংবা সে-মুহূর্তে সে আর দক্ষ নয়। সুতরাং, সে-নামে তাকে অভিহিত করাও চলে না। কাজেই কোনো ব্যক্তি শিল্পী কিংবা জ্ঞানী থাকা অবস্থায় তার শিল্পে কিংবা জ্ঞানের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত হতে পারে না। একথা সত্য হলেও সাধারণভাবে শিল্পী কিংবা জ্ঞানীও ভুল করতে পারে—এরূপ আমরা বলে থাকি। কিন্তু, আমি পূর্বেই বলেছি, এটা আমাদের একটা কথার ভঙ্গিমাত্র। এ ক্ষেত্রেও আমি এই ভঙ্গিতেই কথাটি বলেছিলাম। কিন্তু, আমরা যদি আমাদের ভাষায় পুরোপুরি সঠিক হতে চাই, আর তুমি যখন কথা বলার সঠিকতার উপর আগ্রহটা একটু অধিক পরিমাণেই দেখাচ্ছ, তখন আমাদের বলা উচিত যে, শাসক শাসক হিসাবে ভ্রান্তিহীন; আর যেহেতু শাসক ভ্রান্তিহীন সেজন্য যে-বিধান সে শাসিতের জন্য রচনা করে সে-বিধানও ভ্রান্তিহীন; সে ভ্রান্তিহীন বিধান অবশ্যই তার স্বার্থমূলক। শাসিতের কর্তব্য বা ধর্ম হচ্ছে শাসকের বিধানকে পালন করা। কাজেকাজেই সবলের কিংবা শাসকের স্বার্থই হচ্ছে ন্যায় বা ধর্ম—একথা যেমন আমি পূর্বেও বলেছি, এখনও আমি তার পুনরাবৃত্তি করছি।
কিন্তু, থ্রাসিমেকাস, আমি গুপ্তচর কী করে হলাম! আমার কথায় কি তোমার সত্যই মনে হচ্ছে যে, আমি তোমার বিরুদ্ধে গুপ্তচরের কাজ করছি?
হ্যাঁ, অবশ্যই, তা ছাড়া আর কী?
তুমি কি মনে কর যুক্তির মধ্যে তোমাকে আঘাত করার উদ্দেশ্য নিয়েই আমি তোমাকে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করছি?
না, আমার ‘মনে করার’ ব্যাপার নয়, আমি জানি এই তোমার উদ্দেশ্য। কিন্তু সক্রেটিস, একথা তুমি ঠিক জেনো যে, কেবলমাত্র যুক্তির জোরে তুমি আমাকে কখনো পর্যুদস্ত করতে পারবে না।
প্রিয় সঙ্গী, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, তোমায় পর্যুদস্ত করার কোনো চেষ্টাই আমি করব না। কিন্তু, ভবিষ্যতে আমাদের মধ্যে যেন কোনো ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় সেজন্য এখানে আমি একটি প্রশ্ন পরিষ্কার করে নিতে চাই। থ্র্যাসিমেকাস, তুমি আমায় বলো, তুমি কোন্ অর্থে শাসককে সবলতর কিংবা শাসক বলতে চাচ্ছ? তুমি বলেছ, শাসক শক্তিমান, সুতরাং শাসিত দুর্বলের কর্তব্য হচ্ছে তার স্বার্থের বিধানকে পালন করা। কিন্তু, তুমি কী অর্থে একথা বলছ? কথাটি কি তুমি জনপ্রিয় বা সাধারণ অর্থে বলছ, না ‘শাসক’ কথাটির সঠিক অর্থে বলছ?
শুধু সঠিক নয়, সঠিকতম অর্থেই আমি কথাটি বলেছি, সক্রেটিস! এখন তুমি গুপ্তঘাতক কিংবা গুপ্তচর যেমন ইচ্ছা তেমন হতে পার। তোমার নিকট কোনো করুণা ভিক্ষা করার পাত্র আমি নই। কিন্তু তোমার সব চাতুরীই ব্যর্থ হবে, সক্রেটিস। আমাকে বাগে পাওয়া তোমার ঘটবে না, একথা জেনে রেখো।
কী বলছ, থ্র্যাসিমেকাস! তুমি কি আমাকে পাগল ভেবেছ যে, আমি তোমার সঙ্গে চাতুরী করতে চেষ্টা করব? সে কি একটি সহজ কাজ? তার চেয়ে একটা সিংহের শ্মশ্রু মুণ্ডন করাও কি আমার পক্ষে অনেক বেশি সহজ নয়?
আহা! কী নির্দোষ! মুহূর্তখানেক পূর্বে তুমি কি আমার উপর সেই কাজটি করতে যেয়েই ব্যর্থ হওনি?
কিন্তু, আমাদের এই বাক্চাতুর্য এবার থাক। যথেষ্ট হয়েছে। এরচেয়ে বরঞ্চ তোমায় আমি একটি প্রশ্ন করি। চিকিৎসকের সঠিক অর্থেই তুমি বলো, একজন চিকিৎসককে তুমি কী মনে কর? সে কি রোগের নিরাময়কারী, না সে অর্থের উপার্জনকারী? জবাব দেয়ার পূর্বে তুমি মনে রেখো থ্র্যাসিমেকাস, আমি একজন সত্যিকারের চিকিৎসক সম্পর্কে বলছি।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, চিকিৎসক রোগীর নিরাময়কারী।
বেশ। একজন নাবিক বা কর্ণধার—অর্থাৎ, যে সত্যিকারের কর্ণধার, তার সম্পর্কে তুমি কী বলবে? সে কি শুধুই নাবিক, না সে জাহাজের খালাসিদের পরিচালক?
সে খালাসিদের পরিচালক।
হ্যাঁ, তুমি তাকে খালাসিদের নাবিক বা কর্ণধার বলবে। কিন্তু কর্ণধারকে যখন তুমি কর্ণধার বল তখন নিশ্চয়, সে একটি জাহাজে আরোহণ করে সমুদ্রে ভেসেছে—এই ঘটনাটিকেই তার এরূপ আখ্যার কারণ হিসাবে দেখ না; কিংবা তাকে তুমি কেবলমাত্র একজন খালাসি বলেও এ-কারণে আখ্যায়িত কর না। বস্তুত এই মুহূর্তে তার জাহাজে আরোহণের সঙ্গে তার—পরিচালক হওয়ার কোনো কার্যকারণগত সম্পর্ক নেই। তার নাবিক আখ্যাটিও তার জাহাজে আরোহণ-নিরপেক্ষভাবেই একটি দক্ষতা এবং জাহাজিদের উপর ক্ষমতার প্রকাশচিহ্ন-বিশেষ।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, তোমার একথা খুবই সত্য, সক্রেটিস।
এবার আমি বললাম : তার কারণ, যে-কোনো দক্ষতা বা শিল্পেরই একটা কার্য বা লক্ষ্য থাকে।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, অবশ্যই। এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা তার কর্তব্য।
আর শিল্পের লক্ষ্য নিশ্চয়ই সম্পূর্ণতা। সম্পূর্ণতা ব্যতীত তার লক্ষ্য অপর কিছুতেই নিবদ্ধ হতে পারে না। নয় কি?
তুমি কী বলতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?
থ্র্যাসিমেকাস! আমার কথাটিকে আমি দেহের দৃষ্টান্ত দিয়ে হয়তো তোমাকে বোঝাতে পারব। ধরো, তুমি আমাকে জিজ্ঞাস করলে : দেহের মধ্যে কি কোনো অভাববোধ আছে, না দেহ অভাবহীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ? তোমার সে-প্রশ্নের জবাবে নিশ্চয়ই আমি বলব : দেহের মধ্যে অবশ্যই অভাববোধ রয়েছে। কারণ, দেহ—অসুস্থ হলে তার নিরাময়ের আবশ্যক হয়; তার এই নিরাময়ের লক্ষ্য নিয়েই তৈরি হয়েছে চিকিৎসাশিল্প। দেহের অসুস্থতাতেই যে নিরাময় শিল্পের উদ্ভব—একথা নিশ্চয়ই তুমি স্বীকার করবে?
হ্যাঁ, একথা আমি স্বীকার করি। নিরাময়শিল্পের সূত্রপাত অবশ্যই দেহের অসুস্থতায়।
কিন্তু থ্র্যাসিমেকাস, শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কি হবে? অভাবের বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে বলা যায়। আমাদের চোখের দৃষ্টিশক্তির অভাব হতে পারে; তেমনি আমাদের কর্ণেরও শ্রবণশক্তির অভাব ঘটতে পারে। এজন্য আমাদের চোখ বা কান অভাবহীন নয়; তাদের এই অভাব পূরণের জন্য—অর্থাৎ, দৃষ্টিশক্তি কিংবা শ্রবণশক্তি লাভের জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় নিরাময়শিল্পের উপর। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, চোখের ন্যায় কিংবা আমাদের কানের ন্যায় শিল্পের মধ্যেও কি অনুরূপ কোনো অভাব সম্ভব? এমন কি সম্ভব যে, একটি শিল্পও কোনো একটি বিশেষ বিষয়ে ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, আর তার এই ত্রুটিপূরণের জন্য তাকে ভিন্নতর আর এক শিল্পের দ্বারস্থ হতে হয়? শুধু এখানেই শেষ নয়। যে শিল্পের সে দ্বারস্থ হল, তার মধ্যেও কি অপর কোনো ত্রুটি থাকা সম্ভব নয় যার পূরণের জন্য তাকেও দ্বারস্থ হতে হবে আর এক শিল্পের? আর এমনি করে প্রক্রিয়াটি চলতে থাকবে সীমাহীনভাবে? অথবা, ব্যাপারটা এমনই যে, কোনো শিল্পের মধ্যে ভুলত্রুটি বা অসম্পূর্ণতার কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। কাজেই সংশোধনের জন্য নিজের সত্তার চর্চা কিংবা অপর কারও দ্বারস্থ হওয়া কোনোটিরই কোনো প্রয়োজন তার পড়ে না? অপরের দ্বারস্থ না হয়ে আপন সত্তায় নিমগ্ন থাকাকেই তারা তাদের কর্তব্য বলে জ্ঞান করে। কেননা, শিল্পমাত্রই যতদিন সৎ ততদিনই সে সত্য। আর, সত্যকে অবলম্বন করেই তার যা-কিছু বিশুদ্ধতা এবং সম্পূর্ণতা। থ্র্যাসিমেকাস, আমার কথাগুলোকে সঠিক অর্থে গ্রহণ করে এবার বলো আমার বক্তব্য যথার্থ কি না।
তোমার কথার যথার্থতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, সক্রেটিস। স্পষ্টতই তুমি সঠিক কথা বলেছ।
তা হলে নিরাময়শাস্ত্রের লক্ষ্য ঔষধাদি নয়, তার লক্ষ্য হচ্ছে দেহের মঙ্গল। নয় কি?
অবশ্যই।
ঠিক তেমনি, অশ্বচালনার কৌশলেরও লক্ষ্য এই কৌশল বা বিদ্যাটি নয়। তার লক্ষ্য অশ্বের মঙ্গলসাধন। অনুরূপভাবে শিল্প বা কলামাত্রই আত্মস্বার্থে নয়, বরঞ্চ পরের হিতার্থেই নিয়োজিত। কেননা, শিল্পের আত্মস্বার্থ বা নিজ প্রয়োজন কিংবা অভাব বলতে কিছু নেই। শিল্পের লক্ষ্য হচ্ছে, যে-বিষয় নিয়ে তার কারবার, সে-বিষয়ের ধ্যান করা, তার উন্নয়নের চেষ্টা করা।
াসিমেকাস বললেন, নিশ্চয়ই সক্রেটিস।
কিন্তু তা হলে, থ্র্যাসিমেকাস, একথা আমাদের স্বীকার করতে হবে, শিল্প এবং বিষয়ের মধ্যে অর্থাৎ বিষয়ী ও বিষয়ের মধ্যে শিল্পই উত্তমর্ণ, বিষয় নয়। শিল্প হচ্ছে বিষয়ী, আর বিষয়ী বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে। এ কথা ঠিক নয়?
থ্র্যাসিমেকাস আমার এ-মন্তব্যটিও অবশ্য স্বীকার করলেন। কিন্তু তাঁর সম্মতির মধ্যে বেশ পরিমাণ অনিচ্ছার ভাবটিও আমি দেখতে পেলাম।
এর পরে আমি বললাম : তা হলে কোনো শিল্প বা বিজ্ঞানই তার নিজের চেয়ে শক্তিমান কারুর স্বার্থ সাধন করে না, তার লক্ষ্য হচ্ছে দুর্বলতরের স্বার্থই সাধন করা।
থ্রাসিমেকাস আমার এবারের অভিমতটিতে বেশ একটু আপত্তি জানাবারই প্রয়াস পেলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমার এ-মতটিকেও স্বীকার করে নিলেন।
আমি বলে চললাম : তাই যিনি সত্যকারভাবে চিকিৎসক তিনি যখন কোনো নিরাময়-পত্র তৈরি করেন, তখন তিনি আপন স্বার্থের কথা আদৌ চিন্তা করেন না, তিনি তাঁর রোগীর মঙ্গলের কথাই চিন্তা করেন। কারণ যিনি যথার্থই চিকিৎসক, তিনি কেবল অর্থোপার্জনকারী ব্যাবসাদার নন, তিনি একটি দেহের শাসকও বটে। একথা আমরা পূর্বেই বলেছি। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
তেমনি নৌপোতের যে কর্ণধার বা চালক সে একজন সাধারণ নাবিক নয়, সে নাবিকদের পরিচালক বা শাসক।
হ্যাঁ, একথা তো আমরা ইতিপূর্বেই স্বীকার করেছি।
বেশ, তা হলে এ-নৌচালকের কাজ হবে তার অধীনস্থ নাবিকদের মঙ্গলামঙ্গলের কথা চিন্তা করা, তার নিজের স্বার্থের চিন্তা করা নয়। এ কথাও নিশ্চয় ঠিক?
থ্রাসিমেকাস অনিচ্ছাসহকারে জবাব দিলেন : হ্যাঁ, ঠিক।
তা হলে, থ্র্যাসিমেকাস, একথা আমাদের স্বীকার করতে হয় যে, নিয়ম কিংবা নিয়ামক যার কথাই তুমি বল-না কেন, নিয়ামক হিসাবে তার কর্তব্য হচ্ছে তার উপর ন্যস্ত বিষয় বা শিল্প নিয়েই চিন্তা করা, তার নিজের স্বার্থ নিয়ে নয়। তাই যা-কিছু সে বলে কিংবা করে তার প্রত্যেকটিরই লক্ষ্য থাকে তার সেই দায়িত্বকে পালন করা।
যুক্তির স্রোতে আমরা যখন এই জায়গাতে এসে উপস্থিত হলাম আর যখন উপস্থিত সবার নিকট পরিষ্কাররূপে ধরা পড়ল যে, ন্যায়পরায়ণতার যে-সংজ্ঞা নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম সেটি এতক্ষণে একেবারে পালটে গেছে, তখন থ্র্যাসিমেকাস আমার প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে আমাকে পালটা জিজ্ঞেস করলেন, সক্রেটিস, তোমার কি কোনো শুশ্রূষাকারী পরিচারিকা আছে?
আমি বললাম, আমার কথার জবাব না দিয়ে এমন প্রশ্ন আমায় তুমি জিজ্ঞেস করছ কেন থ্র্যাসিমেকাস?
থ্র্যাসিমেকাস জবাব দিলেন, কারণ তেমন কোনো পরিচারিকা তোমার থাকলে সে তোমার নাকটি অন্তত পরিষ্কার করে দিত। কিন্তু এখন দেখছি, যদি এমন কেউ তোমার থেকেও থাকে তা হলে সে তোমাকে মেষপালক আর মেষশাবক—এ দুই-এর পার্থক্যটি পর্যন্ত রপ্ত করিয়ে দিতে পারেনি।
কিসের জন্য একথা তুমি বলছ, থ্র্যাসিমেকাস?
কেননা তুমি এখনও মনে করছ যে, মেষপালক বা রাখাল যে মেষশাবকগুলোকে বড় করে তোলে, সে যে তাদের সবল, তাজা করে তোলে, তাদের গায়ে চর্বি জমুক, এ-কামনা যে সে করে তা নিজের কোনো স্বার্থ-চিন্তায় নয়, তা মেষশাবকদেরই মঙ্গলের জন্য! তা ছাড়াও তুমি ভাবছ যে, রাষ্ট্রের শাসকবর্গ যদি যথার্থই শাসক হয় তা হলে তারা কখনোই তাদের প্রজাকুলকে মেষশাবকদের ন্যায় বিচার করে না, তারা যে দিনরাত চিন্তা করে সে আদৌ তাদের নিজেদের কোনো সুবিধা বা স্বার্থ লাভের জন্য নয়, সব চিন্তাই তাদের শাসিত প্রজাবর্গের মঙ্গলের জন্য! সক্রেটিস, ব্যাপারটি আদৌ সেরূপ নয়। বস্তুত ন্যায়-অন্যায়ের যুক্তিতে তুমি এতখানি ভ্রান্ত যে, তুমি আদপে বুঝতেই পারছ না, ন্যায় বলতে আসলে বোঝায় শক্তির ন্যায়—অর্থাৎ শাসকের যা ন্যায়, শাসিতের কাছে তা অন্যায়। ন্যায় হচ্ছে যে শক্তিধর তার লাভের বিষয়, আর যে অসহায় তার লোকসানের বিষয়। অন্যায় সম্পর্কেও এই কথাই সত্য। একের কাছে যা অন্যায়, অপরের কাছে তা ন্যায়। কেননা, যে অন্যায়কারী সে শক্তির জোরেই অন্যায়কারী। যে শাসিত সে যে শাসকের সুখ ও স্বার্থে যোগান দিয়ে চলে, সে এজন্য নয় যে সে নিজের কোনো সুখ লাভ করে। আদৌ তা সত্য নয়। শাসকের স্বার্থ সে রক্ষা করে চলে কেননা সে দুর্বল, কেননা সে শাসিত। তা ছাড়া মূর্খপ্রবর, এটা কি তুমি দেখতে পাও না, ন্যায়-অন্যায়ের লড়াই-এ যে সর্বদা হেরে যায় সে ন্যায়ই, অন্যায় নয়। ব্যক্তিগত দেনা-পাওনা বা দায়চুক্তির ব্যাপারটিই বিবেচনা করে দ্যাখো। ন্যায়-অন্যায় বা সৎ অসৎ-এর মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে যদি কোনো যৌথ ব্যবসায়ের ব্যবস্থা ঘটে তা হলে এই ব্যাবসার পরিণতিতে তুমি সৎকেই সর্বদা লোকসানের ভাগী আর অসৎকে লাভের মালিক হিসাবে দেখতে পাবে। আবার রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির দেনা-পাওনার সম্পর্কেও দেখবে যে আয়কর পরিশোধের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ আয়ের উপর অসৎ যা দিয়ে পার পাচ্ছে সৎ ব্যক্তিকে দিতে হচ্ছে তার চেয়ে ঢের বেশি; কিন্তু বিনিময়ে কিছু সুবিধা-সুযোগ প্রাপ্য হলে সে ক্ষেত্রেও যে অসৎ সেই-ই লাভ করে তার সিংহভাগ, সৎ-এর প্রাপ্তির ভাণ্ডটি থাকে রিক্ত। শুধু এখানেই শেষ নয়। এবং দুজনেই যদি রাষ্ট্রীয় কোনো পদে আসীন হয় তা হলে সেখানেও যে সৎ সে ব্যক্তিগত বিষয়-সম্পত্তির অবহেলা করে রাষ্ট্রীয় সেবা করে। বিনিময়ে সে লাভ করে না কিছুই, কেননা সে হচ্ছে সৎ। লাভ নয়, কিন্তু বকশিশ হিসাবে তার যা উপরি জোটে সে হচ্ছে বন্ধুবর্গ আর আত্মীয়জনদের নিকট থেকে ঘৃণা, কেননা তাদের অনুরোধ অনুযায়ী বেআইনি কাজ করে তাদের স্বার্থসাধন করতে সে অস্বীকার করেছে, তাই তারা রুষ্ট। কিন্তু অসৎ ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই বিপরীত। অবশ্য অন্যায়কে যখন আমি লাভজনক বলছি তখন বৃহৎ আকারের অথবা অন্যায়ের সামগ্রিকতাকেই আমি বোঝাতে চাইছি। পূর্বেও আমি অসৎ এবং অন্যায়ের কথা এই অর্থেই বলেছি। কেননা অন্যায়কে যখন তুমি বৃহৎ কিংবা ব্যাপক আকারে বিচার করবে তখনই মাত্র তুমি তার লাভের ব্যাপারটি স্পষ্টরূপে দেখতে পাবে। আর অন্যায়ের চরম হচ্ছে স্বৈরাচার। তাই স্বৈরাচারের দিকে দৃষ্টি দিলেই তোমরা আমার কথার অর্থ পরিষ্কাররূপে বুঝতে পারবে। কেননা, একদিকে স্বৈরাচারের মধ্য দিয়েই স্বৈরাচারী তার চরম সুখ যেমন লাভ করে, তেমনি অপরদিকে স্বৈরাচারের দুর্ভোগ যাদের ভুগতে হয় তাদের অবস্থাও হয় চরমরূপে শোচনীয়। কেননা, প্রবঞ্চনা আর পরাক্রম মারফত স্বৈরাচার মানুষের সম্পদ ও শক্তিকে সামগ্রিকভাবেই গ্রাস করে ফেলে। এ-গ্রাসে তার কোনো দ্বিধা কিংবা সঙ্কোচ নেই, তার কোনো ধীর গতি বা রওয়া-সওয়া নেই। বেপরোয়াভাবে এক থাবাতেই স্বৈরাচার মানুষের যা-কিছু সম্পদ : ইহলৌকিক কিংবা পারলৌকিক, কিংবা সর্বজনীন—সবকিছুকে করায়ত্ত করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সামগ্রিকতার বাইরে এ-পাপাচারগুলোকে আমরা চিনতে ভুল করিনে। আমরা এর কোনোটাকে বলি চুরি, কোনোটাকে ডাকাতি, কোনোটাকে বা প্রবঞ্চনা। আর ক্ষুদ্রাকারের এই পাপাচারের কোনো-একটির সম্পাদন-সময়ে আমরা যদি দুষ্কৃতকারীকে হাতেনাতে ধরতে পারি তা হলে তার শাস্তিদানেও আমরা কুণ্ঠিত হইনে। এই দণ্ডের মধ্য দিয়ে দুষ্কৃতকারী লোকচক্ষে অবমানিত হয়, তার সামাজিক মর্যাদা লুপ্ত হয়। কিন্তু স্বৈরাচারী যখন মানুষের কেবলমাত্র সম্পদকেই হরণ করে না, হরণ করে সব সম্পদের বাড়া তার স্বাধীনতাকেও, স্বাধীন নাগরিকগন যখন স্বৈরাচারীর দাসে পরিণত হয়ে যায়, তখন নিন্দার পরিবর্তে আমরা প্রশংসার ডালিতে তাকে বিভূষিত করে দিই, পৃথিবীর সর্বাধিক সুখী ব্যক্তি বলে তাকে অভিহিত করি। শুধু আমরা নাগরিকগণ নই, যারাই তার এই অন্যায়ের সাফল্যজনক অনুষ্ঠানের কথা শোনে তারাই তার সাফল্যে বাহবার যোগান দেয়, নিজেরা উৎফুল্ল বোধ করে। কারণ, মানুষ যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তখন সে অন্যায়কে অন্যায় বলে, এজন্য নয় যে অন্যায় তারা আদৌ করতে পারে না; মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে পাছে অপরের অনুষ্ঠিত অন্যায়ের অঘাতটি তার নিজের উপরও বা এসে পড়ে। কাজেই সক্রেটিস, আমার কথা হচ্ছে, অন্যায়ের আকার বৃহৎ হলে অবশ্যই সে ন্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়; ন্যায়ের চেয়ে তখন তার পরাক্রম ও পরিধি দুই-ই বৃহত্তর হয়ে দাঁড়ায়। আমি তাই পূর্বেও যেমন বলেছি এখনও তেমনই বলছি : অন্যায় যেমন ব্যক্তির নিজের লাভালাভের চিন্তা বই অপর কিছু নয়, তেমনি ন্যায়ও আসলে শক্তির স্বার্থসাধন ব্যতীত অপর মহৎ কোনো গুণের নাম নয়।
থ্র্যাসিমেকাস তাঁর কথার এই ঝরনাধারায় আমাদের অভিসিক্ত করে প্রস্থানের উদ্যোগ করছিলেন। কিন্তু শ্রোতৃমণ্ডলীর তা আদপেই পছন্দ হচ্ছিল না। তারা হুল্লোড় তুলল : থ্র্যাসিমেকাসকে অবশ্যই থেকে যেতে হবে এবং পালটা জবাবের বিরুদ্ধে তাঁকে দাঁড়াতে হবে। অন্যান্যদের সঙ্গে আমিও বিনীতভাবে অনুরোধ করে বললাম : কী মনোহর তোমার বক্তব্য, থ্র্যাসিমেকাস! বস্তুত কত তাৎপর্যই-না সে বহন করে! কিন্তু তাই বলে তোমার কি এই মুহূর্তে সরে পড়া চলে? এখন তো তোমার কর্তব্য হচ্ছে, হয় আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া যে তোমার বক্তব্য যথার্থ, নয়তো অপরের কাছ থেকে শিখে নেওয়া যে, শব্দমাত্রই সত্য নয়। মানুষের জীবনের তুমি পথনির্দেশ করতে চেয়েছ। আমরা সবাই কেমন করে সর্বাধিক সার্থকতার ভিত্তিতে আমাদের জীবন পরিচালিত করতে পারি সে প্রশ্নই তুমি আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছ। কিন্তু এ বিষয়টিকে কি তুমি এত ক্ষুদ্র মনে কর যে, বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য ধৈর্যধারণকেও তুমি সঙ্গত বোধ কর না?
থ্র্যাসিমেকাস বললেন : কিন্তু প্রশ্নটির গুরুত্ব সম্পর্কে তোমাদের সঙ্গে তো আমার কোনো দ্বিমত নেই।
আমি বললাম : কিন্তু আমাদের মনে হচ্ছে যেন তুমি যে সত্য জ্ঞাত হয়েছ তাকে আমরাও জ্ঞাত হই কিংবা না হই এবং তার ফলে আমাদের জীবনে ক্ষতি আসুক কিংবা লাভ পৌঁছাক কিছুতেই তোমার যায় আসে না। আমাদের জন্য যেন তোমার আদৌ কোনো উদ্বেগ বা চিন্তা নেই। কিন্তু আমি বলি, দোহাই বন্ধু, তোমার জ্ঞানকে কেবল তোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখো না। তুমি আমাদের কথাও একটু চিন্তা কোরো। আমরা সবাই মিলে একটা বান্ধবগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছি, একথা তোমার বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। তোমার জ্ঞান থেকে যে-সার্থকতায় আমরা ধন্য হব তার বিনিময়ে আমাদের কৃতজ্ঞতায় তুমি কোনো কার্পণ্য পাবে না। অবশ্য আমার কথা বলতে গেলে আমি প্রকাশ্যভাবেই বলব, তোমার বক্তব্যকে আমি গ্রহণ করতে পারিনি। কেননা আমি বিশ্বাস করিনে, বেপরোয়া অন্যায়ও ন্যায়ের চেয়ে লাভজনক বলে গণ্য হতে পারে। কারণ, আমি যদি ধরেও নিই যে, শক্তিমদমত্ত অন্যায়কারী প্রবঞ্চনা কিংবা জবরদস্তি মারফত অন্যায় করতে পারে তবুও তা থেকে একথা আমি বিশ্বাস করতে পারিনে যে, সেই অন্যায়সাধনই তাকে ন্যায়ের চেয়েও সার্থক করে তুলতে পারে। এ-প্রশ্নে আমার মতো সমস্যাসঙ্কুল অবস্থা আমার আর বন্ধুদেরও যে না হতে পারে, এমন নয়। হতে পারে আমাদের এ-বিশ্বাস ভ্রান্ত। কিন্তু তেমন হলে বন্ধু হিসাবে তোমার জ্ঞান দ্বারা আমাদের মনকে আলোকিত করে বুঝিয়ে দেওয়া কর্তব্য, কীভাবে অন্যায়ের বদলে ন্যায়কে সমর্থন করে আমরা ভ্রান্ত পথকে গ্ৰহণ করেছি।
থ্র্যাসিমেকাস রূঢ়ভাবে আমার কথার জবাব দিয়ে বললেন : আমি যা বলেছি তাতে যদি তোমরা না বুঝে থাক, তা হলে তোমাদের আর কী করে বোঝাব? তোমরা কি মনে কর যে আমার বক্তব্যের প্রমাণকে আমি জোর করে তোমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেব?
বিধাতার দোহাই, এমন তুমি কোরো না। আমার প্রার্থনা শুধু এইটুকু, সঙ্গতি রেখে তুমি কথা বলো। কিংবা তোমার মত তুমি যদি পরিবর্তন কর তা হলে খোলাখুলিভাবেই যেন সেটা কর। তা হলে আমরা অন্তত প্রতারিত হব না। কেননা, একটা কথা আমি বলতে বাধ্য থ্র্যাসিমেকাস যে, তুমি যখন চিকিৎসক দিয়ে তোমার বক্তব্য শুরু করেছিলে তখন চিকিৎসকের সংজ্ঞাটি তুমি যথার্থই দিয়েছিলে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মেষপালকের প্রসঙ্গ যখন এল তখন আর তোমার সংজ্ঞার সেই সঠিকতাকে তুমি রক্ষা করলে না। কেননা, মেষপালকের ব্যাপারে তুমি বললে, মেষপালক মেষশাবকদের স্বার্থে তাদের পরিচর্যা করে না, মেষপালক পরিচর্যা করে মেষশাবকদের ভোজের টেবিলে সুন্দররূপে উপহার দেওয়ার জন্য, কিংবা ব্যবসায়ীর ন্যায় অর্থলাভের জন্য বাজারে তাদের বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য। অথচ মেষপালক কথাটির অর্থ হচ্ছে মেষশাবকদের পালন করা। এটি একটি কাজের কলা বা পদ্ধতি। মেষশাবকের মঙ্গলসাধনের মধ্য দিয়েই মাত্র এ-কলার দক্ষতা বা সম্পূর্ণতা আয়ত্ত করা সম্ভব। আর, একটি কলা বা শিল্পের কর্তব্যই হচ্ছে নিজেকে দক্ষ বা পূর্ণ করে তোলা। কাজেই এ থেকেই বোঝা যায় যে, মেষপালক তার মেষশাবকদের সর্বোত্তম মঙ্গলসাধনের মধ্য দিয়েই মাত্র সর্বোত্তম মেষপালক বলে প্রমাণিত হতে পারে। শাসক সম্পর্কেও আমি এইমাত্র সেই কথাই বলছিলাম। কেননা, আমি মনে করি, সত্যিকার যে শাসক, রাষ্ট্রীয় কিংবা অরাষ্ট্রীয়, সর্বক্ষেত্রেই তার কর্তব্য হচ্ছে তার মেষশাবক অর্থাৎ তার প্রজাকুলের মঙ্গলের কথা চিন্তা করা। কিন্তু তুমি যেন মনে করছ, রাষ্ট্রের যে যথার্থ শাসক তার মনোবাসনা হচ্ছে শাসকের আসনকেই কেবল করায়ত্ত করা, প্রজাবর্গের মঙ্গলসাধন করা নয়।
আমার একথা শুনে থ্র্যাসিমেকাস জবাব দিলেন : আমার মনে করার ব্যাপার নয়, এটিকে আমি নিশ্চিত বলেই জানি।
বেশ, তা হলে ছোটখাটো পদের বেলা মানুষ কেন শুধুমাত্র পদলোভেই বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্বগ্রহণে রাজি হয় না? অপরের সেবা করছে সুতরাং সেজন্য তাদের পারিশ্রমিক প্রয়োজন, এরূপ ধারণা যদি তাদের না হয়—অর্থাৎ তারা যদি ধারণা করত যে পদলাভেই তাদের স্বার্থ, তা হলে তো বিনা পারিশ্রমিকেই এ-সমস্ত পদগ্রহণে তাদের আগ্রহ জাগা স্বাভাবিক হত। থাক একথা। আমি তোমাকে সোজা একটা প্রশ্ন করতে চাই, থ্র্যাসিমেকাস। তুমি বলো, শিল্পকলা থেকে শিল্পকলায় কি পার্থক্য নেই? অর্থাৎ প্রত্যেকটি শিল্পকলার কি আপন-আপন নির্দিষ্ট করণীয় নেই? বন্ধুপ্রবর, এ-প্রশ্নটির যাহোক একটি জবাব দাও, কেননা যুক্তির ক্ষেত্রে তো আমরা নিশ্চল হয়ে থাকতে পারিনে।
থ্র্যাসিমেকাস বললেন, বেশ, আমি জবাব দিচ্ছি : করণীয়ের ক্ষেত্রেই একটি শিল্পকলা থেকে অপর একটি শিল্পকলা পৃথক।
আর এক-একটি শিল্পকলা আমাদের জীবনে এক-একটি সার্থকতা বহন করে আনে—যেমন নিরাময়কৌশল আমাদের স্বাস্থ্যকে রক্ষা করে। নৌচালনার শিল্প সমুদ্রবক্ষে আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। অপর সমস্ত শিল্পের ক্ষেত্রেই এইরূপ। নয় কি?
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
ঠিক তেমনি পারিশ্রমিক দানের যে-কলা তার করণীয় হচ্ছে, পরিশ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দান করা। কিন্তু তাই বলে একটি দক্ষতা বা শিল্পকলাকে অপর একটি দক্ষতার সঙ্গে আমরা গুলিয়ে ফেলিনে। যেমন ধরো, নৌযান পরিচালনার যে-দক্ষতা তাকে আমরা নিরাময়দক্ষতার সঙ্গে এক করে দেখিনে। সমুদ্র-অভিযানে সমুদ্রযানের পরিচালকের স্বাস্থ্যের অবশ্যই উন্নতি ঘটতে পারে, কিন্তু তাতেই নৌযান পরিচালনা আর স্বাস্থ্যোন্নতির ব্যাপার এক হয়ে যাবে না। কেননা, তোমার সঠিক শব্দপ্রয়োগের কৌশলটিকে যদি আমরা স্বীকারও করি তা হলেও তুমি নিশ্চয়ই একথা বলবে না যে নৌযান পরিচালনাই হচ্ছে নিরাময়কৌশল। কী বল থ্র্যাসিমেকাস?
না, তেমন কথা আমি অবশ্যই বলব না।
আবার দ্যাখো, আমাদের কাজের পারিশ্রমিক পাওয়ার সময়ে আমাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকতে পারে। কিন্তু সেজন্যও নিশ্চয়ই তুমি বলবে না যে পারিশ্রমিক দান আর স্বাস্থ্যের নিরাময়বিজ্ঞান একই ব্যাপার?
না, তাও আমি বলব না।
কিংবা ধরো, চিকিৎসকের পারিশ্রমিকের বিষয়টি। চিকিৎসক চিকিৎসার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করে। কিন্তু তাই বলে চিকিৎসাকৌশল আর অর্থপ্রাপ্তির কৌশলও এক নয়?
তা নিশ্চয়ই নয়।
আর তা ছাড়া একথা আমরা আগেই স্বীকার করেছি, প্রত্যেক শিল্পের সার্থকতা তার নিজের লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ। নয় কি?
হ্যাঁ, আমরা তা বলেছি।
তা হলে এমন কোনো সার্থকতা যদি থাকে যা সমস্ত শিল্প বা শিল্পীর মধ্যেই বিরাজমান তা হলে বলতে হবে যে, সমস্ত শিল্প বা শিল্পীর মধ্যেই এই সার্থকতা একটি লক্ষ্য হিসাবে বিদ্যমান আছে। এ-বিষয়ে তোমার মত কী?
হ্যাঁ, তোমার একথা সত্য, সক্রেটিস।
সুতরাং শিল্পী যখন তার দক্ষতার বিনিময়ে পারিশ্রমিক লাভ করে তখন তার পারিশ্রমিকের এই সার্থকতা পারিশ্রমিকদানের কৌশল থেকেই প্রাপ্ত, শিল্পীর নিজের শিল্পের স্বীকৃত লক্ষ্যসঞ্জাত নয়। কী বল, থ্রাসিমেকাস?
এবার থ্র্যাসিমেকাস অনিচ্ছাসহকারে আমার কথায় সায় দিলেন।
তা হলে যে-কোনো শিল্পীর ক্ষেত্রে শিল্পী যে-পারিশ্রমিক পান তা তাঁর শিল্পের সত্তাভুক্ত নয়। বস্তুত ব্যাপারটা হচ্ছে এই যে, নিরাময়কৌশলের কাজ যেমন আমাদের স্বাস্থ্যকে রক্ষা করা, গৃহনির্মাণ-শিল্পের কাজ যেমন গৃহাদি নির্মাণ করা, তেমনি বেতন বা পারিশ্রমিকদানেরও এক শিল্প রয়েছে যার কাজ হচ্ছে শিল্পীর পরিশ্রমের জন্য পারিশ্রমিক দান করা। নিরাময়শিল্প যখন নিরাময়ের কর্তব্যসাধন করে, কিংবা গৃহনির্মাণ শিল্পী যখন গৃহনির্মাণের কাজ সমাধা করে, তখন পারিশ্রমিকশিল্পের দায়িত্ব হচ্ছে আপন কর্তব্য নিষ্পন্ন করা। অর্থাৎ শিল্পকে তার প্রাপ্য পরিশোধ করা। কাজেই শিল্পের আপন সত্তার সঙ্গে তার পারিশ্রমিকলাভের কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা পারিশ্রমিক না দিলে শিল্পী অবশ্যই লাভবান হয় না, কিন্তু পারিশ্রমিক দান না করেও আমরা শিল্পের সেবা থেকে লাভবান হতে পারি। নয় কি?
হ্যাঁ, আমার তো তা-ই মনে হয়।
তাহলে শিল্পী যখন কোনোকিছু প্রাপ্ত না হয়েও তার আপন কর্তব্য পালন করে তখন কি সে অপরের কোনো মঙ্গলসাধন করে না?
নিশ্চয়ই সে মঙ্গলসাধন করে।
তা হলে থ্রাসিমেকাস, আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, শিল্প কিংবা শাসনব্যবস্থা—কেউই নিজের স্বার্থসাধনের জন্য নিজ কর্তব্য পালন করে না। বরঞ্চ, আমরা আগেও বলেছি, তারা কর্তব্যপালন করে তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব বা শাসিত প্রজাকুলেরই স্বার্থে। অর্থাৎ শিল্পী বা শাসক শক্তিমানের স্বার্থে কাজ করে একথা সত্য নয়; বরঞ্চ তারা দুর্বলতরের স্বার্থকেই রক্ষা করে, তাদের মঙ্গলসাধনকেই নিজেদের কর্তব্য বলে তারা জ্ঞান করে। গ্র্যাসিমেকাস, এজন্য খানিক পূর্বেও আমি বলছিলাম, স্বেচ্ছায় শাসক হতে কেউ চায় না। কারণ বিনা পারিশ্রমিকে কে আর বনের মোষ তাড়াতে চায়? নিকৃষ্টকে উৎকৃষ্ট করা কিংবা অধমকে উত্তম করার দায়িত্ব কে আর এমনিতে বহন করতে চায়? কারণ যিনি সত্যকারের শিল্পী বা শাসক তিনি যখন তাঁর কর্তব্যপালন করেন কিংবা তা পালন করার প্রয়োজনে অন্যকে পরিচালিত করেন তখন প্রজাকুলের স্বার্থ ছাড়া নিজের স্বার্থের কথা তিনি আদৌ চিন্তা করতে পারেন না। বিনিময়ে তাঁকে পারিশ্রমিকদানের একটা ব্যবস্থা আমাদের রাখতেই হবে। সে পারিশ্রমিক সম্পদ, সম্মান বা শাস্তি—এই তিন প্রকারের যে-কোনো প্রকারের হতে পারে।
গ্লকন বিস্ময়ের সুরে বলে উঠলেন : তুমি কী বলছ, সক্রেটিস! তোমার তিন প্রকার পারিশ্রমিকের মধ্যে প্রথম দুটিকে বোঝা যায়। কিন্তু ‘শাস্তি’ যে কী করে পারিশ্রমিক হতে পারে তা আমি বুঝে উঠতে পারছি না।
আমি বললাম : অর্থাৎ তুমি বুঝতে পারছ না, কী করে শাসনের ক্ষেত্রে শাস্তি সত্যিকারের উত্তম শাসকের নিকট আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক বলে বোধ হতে পারে? বেশ, কিন্তু তুমি তো জান যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর লোভকে মানুষ ঘৃণ্য বলেই মনে করে। আর তারা তা সঙ্গতভাবেই করে, নয় কি?
হ্যাঁ, একথা খুবই সত্য।
আমি বললাম, আর এজন্যই যাঁরা উত্তম মানুষ, অর্থ কিংবা সম্মানকে তাঁরা আকর্ষণীয় বলে মনে করতে পারেন না। কেননা শাসনের বিনিময়ে প্রকাশ্যভাবে পারিশ্রমিক দাবি করলে তাঁরা ভাড়াকরা শাসক বলে অভিহিত হতে পারেন; অপরদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদ থেকে গোপনে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করলে তাঁরা অপহরণকারী আখ্যাত হবেন। এর কোনোটাই তাঁদের কাম্য নয়। তা ছাড়া তাঁদের মনে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষাও নেই। তাঁরা তাই সম্মানকেও কামনা করেন না। এমন অবস্থায় জবরদস্তিই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বস্তুত এমন অবস্থায় উত্তমকে শাস্তির ভয় দেখিয়েই মাত্র শাসক হতে সম্মত করানো যেতে পারে। আমার মনে হয় এ-কারণেই মানুষ বাধ্য হয়ে শাসক হওয়ার বদলে স্বেচ্ছায় শাসক হওয়াকেই বাঞ্ছনীয় বলে মনে করে। আবার দ্যাখো, শাস্তির যে-ভয়ের কথা আমি বলেছি তার সবচেয়ে অবাঞ্ছিত দিক এই যে, উত্তম যদি শাসক হতে অস্বীকার করেন তা হলে অধম দ্বারাই তাঁর শাসিত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। কাজেই উত্তম যখন শাসক হতে সম্মত হন তখন তিনি এই চিন্তা থেকে সম্মত হন না যে শাসনের দায়িত্ব তাঁকে সম্পদের ভাগ্য এনে দেবে, কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত ভোগের সুযোগ তিনি সৃষ্টি করবেন। কোনো আগ্রহ থেকে নয়, বরঞ্চ গত্যন্তর নেই বলেই শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য হন। বস্তুত উত্তম লোকের যদি অভাব না হত, কিংবা তাঁদের চেয়ে অধিকতর উত্তম লোকের উপর যদি তাঁরা শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করতে পারতেন তা হলে অবশ্যই তাঁরা শাসনের এই ভার বহন করতে সম্মত হতেন না। বরঞ্চ এমন যদি হত যে একটি নগরীর সব নাগরিকই উত্তম তা হলে দেখা যেত যে, আজ যেখানে শাসক হওয়ার বাসনায় মানুষ একে অপরের সঙ্গে প্রতিযেগিতা করছে সেখানে তখন শাসক না-হওয়ার প্রতিযোগিতাই নাগরিকদের মধ্যে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন আর আমাদের প্রমাণ করতে কোনো অসুবিধাই হত না যে, সত্যিকারের যাঁরা শাসক তাঁদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে শাসিতের স্বার্থরক্ষা করা, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা নয়। শাসকের এই সংজ্ঞা থেকে একথা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হয় না যে, এমন অবস্থায় বুদ্ধিমান ব্যক্তি অপরকে শাসন করার পরিবর্তে অপরের দ্বারা শাসিত হওয়াকেই অধিকতর বাঞ্ছনীয় বোধ করবে। কাজেই থ্র্যাসিমেকাস যেখানে ন্যায়কে শক্তিমানের স্বার্থ বলে অভিমত প্রকাশ করেন, সেখানে আমি তাঁর সঙ্গে আদৌ একমত হতে পারিনে। তথাপি এ প্রশ্নটার আলোচনা আমরা আপাতত মুলতুবি রাখতে পারি। কিন্তু থ্রাসিমেকাস যখন বলেন যে, অন্যায়কারীর জীবনই অধিকতর সার্থক তখন তাঁর এ অভিমতটি যেমন নূতন, তেমনি গুরুতর বলেই আমার নিকট বোধ হচ্ছে। এ প্রশ্নে তোমাদের বিচার করতে হবে, কে যথার্থ অভিমত প্রকাশ করেছে : থ্রাসিমেকাস, না আমি? বরঞ্চ গ্লকনকেই আমি জিজ্ঞেস করছি, গ্লকন, কার জীবন তোমার নিকট অধিকতর কাম্য, ন্যায়বানের কিংবা অন্যায়কারীর?
গ্লকন বললেন : আমার নিজের কথা বলতে গেলে আমি বলব, ন্যায়বানের জীবনই অধিকতর সার্থক।
কিন্তু থ্র্যাসিমেকাস অন্যায়কারীর জীবনের সুযোগ-সুবিধাকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তাও নিশ্চয়ই তুমি শুনেছ?
হ্যাঁ, তাঁর কথাও আমি শুনেছি। কিন্তু তাঁর বর্ণনা আমার প্রত্যয় সৃষ্টি করতে পারেনি।
বেশ। তিনি যদি যথার্থ না হন তা হলে আমাদের কি উচিত নয় তাঁকে সত্যের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা?
গ্লকন বললেন, অবশ্যই আমাদের তা-ই করা কর্তব্য।
আমি বললাম : কিন্তু উপায়টি কী হবে সেটা হচ্ছে প্রশ্ন। এক হতে পারে যে, এ-ব্যাপারে থ্র্যাসিমেকাস একটি বক্তৃতা দিলেন; আমরা তার জবাবে আর একটি বক্তৃতা দিলাম। তিনি আবার তাঁর প্রত্যুত্তর দিলেন। এভাবে জবাব এবং পালটা জবাবের মধ্য দিয়ে উভয়পক্ষের সুবিধাসুযোগের তুলনা করা যেতে পারে। কিন্তু এরূপ বাদ-প্রতিবাদের মীমাংসার জন্য প্রয়োজন হবে বিচারকের। অপরদিকে এ-পর্যন্ত আমাদের আলোচনাটি যেভাবে চালিয়েছি অর্থাৎ আমাদের আলোচনার ক্ষেত্রে একের অভিমতে যা যুক্তিসঙ্গত অপরে যদি তা গ্রহণ করি তা হলে আমরা সবাই নিজের মধ্যে বিচারক এবং বক্তা উভয় ভূমিকার মিলন ঘটিয়ে মীমাংসার দিকে অধিকতর সুষ্ঠুভাবে অগ্রসর হতে পারি
গ্লকন বললেন, উত্তম কথা।
তা হলে বলো কোনো উপায়টিকে আমরা গ্রহণ করব?
তোমার প্রস্তাবিত উপায়টিই আমাদের গ্রহণ করা কর্তব্য।
বেশ, থ্র্যাসিমেকাস, তা হলে শুরু করা যাক। তুমি তা হলে গোড়া থেকে আবার শুরু করো। আমার প্রশ্নের তুমি জবাব দাও : সত্যকারের অন্যায়কে কি তুমি সত্যকারের ন্যায়ের চেয়ে অধিকতর সার্থক মনে কর?
হ্যাঁ, আমি তা-ই মনে করি; আর এ-ব্যাপারে আমার যুক্তি আমি পূর্বেই পেশ করেছি।
