২১. কতিপয়তন্ত্র এবং কতিপয়তন্ত্রী চরিত্র
অধ্যায় : ২১ [৫৫০—৫৫৫]
কতিপয়তন্ত্র এবং কতিপয়তন্ত্রী চরিত্র
উচ্চাভিলাষতন্ত্র থেকে কতিপয়তন্ত্র। উচ্চাভিলাষতন্ত্র কালক্রমে সম্পদকে সম্মান ও শক্তির কেন্দ্র বলে মনে করে, জ্ঞানকে নয়। ফলে শাসকরা ব্যক্তিগত সম্পত্তি জড়ো করতে শুরু করে। আর এই সম্পদের লোভ যখন শাসককে পরিপূর্ণরূপে গ্রাস করে তখনই কতিপয়তন্ত্রের উদ্ভব হয়। সম্পদ যেখানে লক্ষ্য, সেখানে শাসন কতিপয়ের হাতে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। কারণ, সকলেই চাইবে সর্বাধিক পরিমাণ সম্পদ সংগ্রহ করতে। এই প্রতিযোগিতায় দুর্বলরা ক্রমান্বয়ে নিঃস্ব হবে এবং সবলরা ধনবান হবে। দুর্বলের এবং দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং সবলের তথা সম্পদবানের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে কতিপয় হয়ে দাঁড়াবে। বিচ্যুতির যে-ক্রম, তাতে দেখা যায় প্রত্যেক পর্যায়ে রাষ্ট্রের ঐক্য ক্রমাধিক পরিমাণে বিনষ্ট হচ্ছে। আদর্শ রাষ্ট্রে ঐক্য ছিল। কারণ, সেখানে যার যা করণীয় সে তা-ই করত। উচ্চাভিলাষতন্ত্রে যার শাসন করা সঙ্গত নয় সেই ‘বিক্রম’ শাসন করতে শুরু করে। এই অসঙ্গতির মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রে অন্তর্দ্বন্দ্বের সূচনা। কতিপয়তন্ত্রে রাষ্ট্রের ঐক্য অধিকতর বিনষ্ট হয়। কারণ, সম্মান বা শক্তির আকাঙ্ক্ষা অর্থের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে উৎকৃষ্ট। অর্থের ক্রমাধিক আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকে সম্পদবান এবং নিঃস্ব—এই দুই পরস্পরবিরোধী ‘দ্বন্দ্বমান শ্রেণীতে’ বিভক্ত করে ফেলে। প্লেটোর ভাষায় ‘এমন রাষ্ট্রকে আমরা আর একটি রাষ্ট্র বলতে পারিনে। এ হচ্ছে দুটি রাষ্ট্র কিংবা এমন রাষ্ট্র যার একপ্রান্ত অপর প্রান্তকে অবিশ্বাস করে এবং অপর প্রান্তকে ধ্বংস করতে চায়।’ কতিপয়তন্ত্রের প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্র হচ্ছে কতিপয়ী চরিত্র যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অর্থগৃধুতা এবং আলস্য। “অর্থের লিপ্সা তার অন্তরে সম্রাট। যুক্তি এবং আকাঙ্ক্ষা সেই সম্রাটের পদপ্রান্তে দাস। যুক্তির জন্য জিজ্ঞাসা কিংবা হিসাব বা অনুমান এখন নিষিদ্ধ। কেমন করে অধিকতর অর্থ অর্জন করা যায়, এই হচ্ছে এখন সম্রাটের আদেশে যুক্তির বিবেচ্য। উচাচাকাঙ্ক্ষাও এখন সম্পদ এবং সম্পদবান ব্যতীত অপর কিছুর মূল্যদানে অক্ষম। “ [৫৫৩]
.
এবার তা হলে আমরা এসকাইলাস* যেমন বলেছেন ‘যেমন ব্যক্তি তেমন রাষ্ট্র’ সেরূপ আর-একটি চরিত্রের পরিচয় নিই? অথবা যদি বল, তা হলে আমাদের পরিকল্পনা অনুসরণ করে রাষ্ট্রটি সম্পর্কে আগে আলাপ করে নিই?
[* এসকাইলাস (৫২৫–৪৫৬ খ্রিঃ পূঃ) গ্রীক বিষাদাত্মক নাট্যকলার স্রষ্টা।]
হ্যাঁ, আমাদের এরূপ করাই উচিত।
সেই ধারায় আমার বিশ্বাস কতিপয়তন্ত্র নিয়েই এবার আমাদের আলাপ করতে হয়?
কিন্তু সক্রেটিস, কী ধরনের সরকারকে তুমি ‘কতিপয়তন্ত্র’ বলে অভিহিত করতে চাও?
কতিপয়তন্ত্র আমরা তাকেই বলব, যেখানে সরকারের ভিত্তি হচ্ছে সম্পত্তি এবং যেখানে অর্থবানরাই ক্ষমতাবান আর দরিদ্রগণ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
কিন্তু আমাদের বোধহয় উচ্চাভিলাষতন্ত্র থেকে কতিপয়তন্ত্রের পরিবর্তনটা আগে ব্যাখ্যা করা আবশ্যক।
হ্যাঁ, এই পরিবর্তনটি আমাদের জানা আবশ্যক।
অবশ্য এর একটি অপরটিতে কীভাবে পরিবর্তিত হয় সেটি দেখার জন্য খুব তীক্ষ্ণ চোখের নিশ্চয়ই আবশ্যকতা নেই?
কেন?
ব্যক্তিগতভাবে সম্পত্তির অর্জন এবং ব্যক্তিগত ভাণ্ডারে তা জমা করার মধ্যেই উচ্চাভিলাষতন্ত্রের ধ্বংস নিহিত। উচ্চাভিলাষতন্ত্রের শাসকগণ বেআইনি উপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ ব্যয়েরও নানা উপায় আবিষ্কার করে। কারণ, তারা কিংবা তাদের স্ত্রীগণ আইনের কোনো পরোয়া করে না।
হ্যাঁ, একথা ঠিক।
ফলে একজন যখন অপরজনকে ধনী হতে দেখে তখন সে নিজে তার চেয়েও অধিক ধনী হতে চায়। ধন-উপার্জনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এমনিভাবে অধিকসংখ্যক নাগরিকই অর্থলিপ্সু হয়ে দাঁড়ায়।
এরূপ হওয়াই সম্ভব।
এমনিভাবে তারা অধিক থেকে অধিকতর ধনবান হতে আরম্ভ করে। আর যত অধিক তারা সম্পদের কথা চিন্তা করে, তত কম তারা ন্যায়ধর্মের বিষয়ে আগ্রহবোধ করে। কারণ, দাঁড়িপাল্লায় তুমি যখন ধনসম্পদ আর ন্যায়ধর্ম একসঙ্গে ওজন করতে চাইবে, তখন একদিকে যখন ধনসম্পদ ভারী হতে থাকবে তখন অপরদিকে ন্যায়ধর্ম হ্রাস পেতে থাকবে।
এ কথা যথার্থ।
এবং যে-অনুপাতে এরূপ রাষ্ট্রসম্পদ এবং সম্পদবানের সম্মান বৃদ্ধি পেতে থাকবে ঠিক সেই অনুপাতে অপরদিকে ন্যায়ধর্ম এবং ন্যায়বান অসম্মানিত হতে থাকবে।
নিঃসন্দেহে
আর একথাও সত্য, যাকে তুমি সম্মান কর তারই চর্চা হয়, তারই বৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু যে অসম্মানিত, সে অবজ্ঞাত হতে থাকে।
এ-সত্য স্পষ্ট।
পরিণামে এরূপ রাষ্ট্রে সম্মানের দ্বন্দ্ব সম্পদের দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। সম্মানের জন্য দ্বন্দ্বের বদলে এবার সকলে অর্থ এবং ব্যবসায়কামী হয়ে ওঠে। এখন তারা সম্পদবানকেই সম্মানিত করে; তার প্রতি সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় এবং সম্পদবানকে শাসক হিসাবে নিযুক্ত করে এবং দরিদ্রকে তারা অসম্মান করে।
তারা এরূপই করে।
এর পরবর্তী ধাপে এরা এরূপ একটা আইন প্রণয়ন করে, যে-আইনের আদেশে বিশেষ বিশেষ পরিমাণ অর্থকে নাগরিকত্বের শর্ত হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়। এ-অর্থের পরিমাণ কোথাও কম, কোথাও বেশি হতে পারে। কারণ, কতিপয়তন্ত্রের শাসকের সংখ্যা কম কিংবা বেশি হতে পারে। নির্দিষ্ট অর্থের চেয়ে কম যাদের অর্থের পরিমাণ, সরকারের সকল ক্ষমতা থেকে তাদের বঞ্চিত রাখা হয়। সন্ত্রাসের মাধ্যমে যদি তারা সংবিধানের মধ্যে এই সমস্ত পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম না হয়, তা হলে অস্ত্রের জোরে শাসকগণ তাদের বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধন করে।
খুবই সত্য কথা।
মোটামুটি এভাবেই কতিপয়তন্ত্রের সরকার স্থাপিত হয়।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তুমি ঠিকই বলেছ, সক্রেটিস। কিন্তু এরূপ সরকারের চরিত্রিক বৈশিষ্ট্য কী এবং এদের যে-ত্রুটির কথা তুমি একবার উল্লেখ করেছিলে, সেগুলিই-বা কি?*
[* ৫৪৪ দ্রষ্টব্য।]
আমি বললাম : প্রথমত, শাসনের শর্তের কথা ধরো। জাহাজ কে চালাবে? মনে করো শর্ত করা হল, যার অর্থ আছে সে-ই জাহাজ চালাবে, সে নয় যে জাহাজ চালাতে জানে। একজন দরিদ্র যদি নৌচালনায় দক্ষ হয় তবুও সে নৌযানের নাবিক হতে পারবে না। কারণ নৌযানচালনার গুণ নির্দিষ্ট হয়েছে—অর্থ, নৌচালনার দক্ষতা নয়। এমন যদি হয়, তার পরিণাম কী হতে পারে বলে তুমি মনে কর?
এর পরিণাম নির্ঘাত ধ্বংস। জাহাজ সমুদ্রে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
হ্যাঁ। তাই হবে, আর এ কেবল জাহাজের ক্ষেত্রেই কি সত্য? যে-কোনো কিছুর চালনার ক্ষেত্রেই কি এ কথা সত্য নয়?
হ্যাঁ, সর্বত্রই এ কথা সত্য।
কিন্তু একটি রাষ্ট্র? সে কি এ-সত্য থেকে বাদ থাকবে? না, রাষ্ট্রচালনার ক্ষেত্রেও এ-পরিণাম সত্য?
শুধু সত্য নয়, আমি বলব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ সবচেয়ে বেশি সত্য। কারণ, একটি রাষ্ট্রচালনা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ।
তা হলে কতিপয়তন্ত্রের এটাই হচ্ছে প্রথম ত্রুটি?
নিঃসন্দেহে এটা তার ত্রুটি।
কিন্তু এর আর-একটি ত্রুটির কথাও আমাদের বলতে হয়, যে-ত্রুটি প্রথমটির মতোই মারাত্মক।
কী সে ত্রুটি?
রাষ্ট্রের মধ্যকার অনিবার্য বিভেদ ও বিভাগ। এরূপ রাষ্ট্র আসলে একটা রাষ্ট্র নয়। এ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে দুটা রাষ্ট্র। এর একটি হচ্ছে দরিদ্রের রাষ্ট্র। অপরটি হচ্ছে ধনবানের রাষ্ট্র। একই স্থানে এই দুই রাষ্ট্রের অবস্থান এবং সর্বদা এরা অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত। সর্বদাই এরা পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে রত থাকে।
এমন হলে এ-ত্রুটি অবশ্যই প্রথমটির মতোই মারাত্মক।
এরূপ রাষ্ট্রের অপর অবাঞ্ছিত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এই কারণেই এরা যুদ্ধ-পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়ে। তাদের সম্মুখে উভয়সংকট। হয় তাদের জনতাকে যুদ্ধের জন্য সশস্ত্র করতে হয়, নয়তো তাদের সামরিক বাহিনীর একেবারে বাইরে রাখতে হয়। জনতাকে সশস্ত্র করতে তাদের ভয়। সশস্ত্র জনতাকে তারা তাদের বৈদেশিক শত্রুর চেয়েও অধিক ভয় করে। অপরদিকে যুদ্ধের সময়ে জনতাকে যুদ্ধে না পাঠালে কে যুদ্ধ করবে? কারণ কতিপয়তন্ত্র যথার্থই কতিপয়ের তন্ত্র। তার শাসকও যেমন কতিপয়, তার যোদ্ধাও কতিপয়। তা ছাড়া তাদের অর্থগৃধুতা রাষ্ট্রীয় কর এবং যুদ্ধের ব্যয়-পরিশোধেও তাদের অনাগ্রহী করে তোলে।
এও তো এক মারাত্মক ত্রুটি।
ফলে, আমরা পূর্বে যা বলেছিলাম সেই ব্যাপারই এখানে সংঘটিত হয়। এরূপ শাসনব্যবস্থায় এক ব্যক্তির উপর একাধিক দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। যে কৃষক, সে-ই বণিক এবং সে-ই আবার যোদ্ধা : একসঙ্গে সে সবকিছু। এ-ব্যাপারটা কি তুমি উত্তম মনে কর?
না, এ কিছুতেই উত্তম হতে পারে না।
কিন্তু সবচেয়ে বড় যে, ত্রুটি, যার প্রবণতা এর মধ্যে প্রথমেই দেখা যায় তার কথা বলা এখনও বাকি আছে।
কী সে-ত্রুটি?
সে-ত্রুটি হচ্ছে এই যে, একজন নাগরিক ইচ্ছা করলে তার সকল বিষয়-আশয়ই বিক্রি করে দিতে পারে এবং অপর একজন তার সেসব সম্পত্তি ক্রয় করতে পারে এবং এরূপ বিক্রয়ের পরে সে আর নগরীর নাগরিক না থাকা সত্ত্বেও নগরীতে বাস করতে পারে। অথচ সকল কিছু বিক্রয়ের পরে সে আর এই নগরীর না বণিক, না কারিগর, না সেই সৈনিক। সে তখন একেবার নিঃস্ব এক অধিবাসী। কতিপয়তন্ত্রে এর উপর কোনো নিষেধ নেই। এর ফলেই এই শাসনব্যবস্থায় চরম সম্পদ এবং চরম দারিদ্র্যের তীব্র বৈষম্যের সৃষ্টি হয়।
একথা সত্য।
এক্ষেত্রে আর একটা কথা আছে। এখন যে নিঃস্ব অধিবাসীতে পরিণত হয়েছে সে যখন ধনবান ছিল, তখন কি সে তার অর্থ কোনো প্রয়োজনীয় সামাজিক দায়িত্বপালনে ব্যয় করেছে? না, তা সে করেনি। তাকে যদিও শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে বোধ হয়েছে তবু না সে শাসনের দায়িত্ব পালন করেছে, না সে সামাজিক অপর কোনো কর্তব্যসম্পাদন করেছে। সে কেবল ভোগ্যবস্তুকে ভোগ করেছে।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : এ কথা যথার্থ। তাকে যেমনই বোধ হোক না কেন, সে কেবলমাত্র ভোগীই ছিল।
তা হলে আমরা তাকে কী বলতে পারি? সঙ্গতভাবেই আমরা বলতে পারি সে ছিল পুরুষ-মৌমাছির মতোই অলস। পুরুষ-মৌমাছি যেমন মৌচাকের জন্য ক্ষতিকর, এমন লোকও নগরীর জন্য ক্ষতিকর। ঠিক নয় কি?
ঠিক কথা সক্রেটিস।
কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস, পার্থক্য এই যে, বিধাতা উড়ন্ত পুরুষ-মৌমাছিকে যেখানে একেবারে হুলবিহীন করে তৈরি করেছেন, সেখানে তিনি পায়ে-হাঁটা এই পুরুষ-মৌমাছির কাউকে হুলবিহীন করলেও অপরগুলোর মধ্যে মারাত্মক হুল জুড়ে দিয়েছেন। হুলবিহীন যেগুলি সেগুলি বৃদ্ধ বয়সে নিঃস্ব হয়ে জীবন শেষ করে। কিন্তু হুলযুক্তগুলি থেকেই রাষ্ট্রের যত অপরাধী, তাদের সৃষ্টি।
খুবই সত্য কথা।
আর তাই নগরীর যেখানে তুমি এই নিঃস্ব ভবঘুরেদের দেখতে পাবে, নিশ্চিত জেনো সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে নগরীর যত চোর, বাটপাড়, মন্দির-লুণ্ঠনকারী ডাকাত এবং আরসব দুষ্কর্মকারীর দল।
নিঃসন্দেহে।
কতিপয়তন্ত্রে তুমি কি এরূপ নিঃস্ব লোকের সাক্ষাৎ পাও না?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : হ্যাঁ। আমি তো বলব এমন রাষ্ট্রে যে শাসক নয় সে-ই ভিক্ষুক, সে-ই নিঃস্ব।
তা হলে আমাদের একথাও বলতে হয় যে, এদের মধ্যে বহু অপরাধী রয়েছে—বহু দুষ্কর্মকারী রয়েছে যারা মারাত্মক রকমের হুলযুক্ত। এদের দমন রাখার জন্য শাসকদের বিশেষ বেগ পেতে হয়, সর্বদা তাদের সতর্ক থাকতে হয়?
হ্যাঁ, একথাও আমাদের বলতে হয়।
কিন্তু এরূপ লোকের অস্তিত্বের কারণ কী? এর কারণ হচ্ছে শিক্ষার অভাব, কুশিক্ষার আধিক্য এবং রাষ্ট্রের ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
এই হচ্ছে তা হলে কতিপয়তন্ত্রের গঠন এবং তার ত্রুটি। এর বাইরেও এমন শাসনব্যবস্থার আরও অনেক ত্রুটি থাকতে পারে।
হ্যাঁ, আরও ত্রুটি থাকতে পারে।
তা হলে কতিপয়ের তন্ত্র বা যে-ধরনের শাসনব্যবস্থায় সম্পদের ভিত্তিতে শাসক নির্দিষ্ট হয় সে-সরকারের আলোচনা এবার আমরা শেষ করতে পারি। এবার এসো, আমরা এর প্রতিরূপ-ব্যক্তির চরিত্র অর্থাৎ যে-চরিত্র এইরূপ রাষ্ট্রের বাহক তার আলোচনা করি।
হ্যাঁ, সে-আলোচনা এবার আমরা করতে পারি।
যেভাবে অভিলাষতন্ত্র কতিপয়তন্ত্রে পরিণত হয়েছে, অনুরূপভাবেই উচ্চাভিলাষী কি কতিপয়তন্ত্রের বাহক-চরিত্রে পরিণত হয় না?
কেমন করে?
ধারাটি এইরূপ। উচ্চাভিলাষীর ছেলের কথা ধরো। প্রথমে সে পিতার পথ ধরেই চলতে আরম্ভ করে। কিন্তু এমন একটা সময় আসে যখন সে নিজেকে রাষ্ট্রের মুখোমুখি একটা নিমজ্জিত প্রবাল-প্রাচীরের উপর স্থাপিত বলে বোধ করে। তার নিজেকে হৃতসর্বস্ব মনে হয়। তার পিতা হয়তো কোনো সমরাধিনায়ক বা উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মচারী ছিল। কিন্তু গুপ্তচরের ষড়যন্ত্রে আজ তাকে বিচারে সোপর্দ হতে হয়েছে। এবং সে বিচারে হয় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, নয়তো সে নির্বাসিত হয়েছে। কিংবা সকল নাগরিক-অধিকার হতে তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তার সকল সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
এরূপ হওয়া খুবই সম্ভব।
আমি বললাম : পিতার এ-ভাগ্য পুত্রের চোখের সম্মুখেই ঘটেছে। পুত্র সবকিছুই দেখতে পেয়েছে। পিতার এই দুর্ভাগ্য, বিশেষ করে সম্পদের ক্ষেত্রে তার হৃতসর্বস্ব অবস্থা পুত্রের মনে সাহস এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার যে-ভাব ছিল তাকে বিনষ্ট করে ফেলে। সে তার সাহস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু দারিদ্র্যে নিপতিত হয়ে এবং নিজের পরিশ্রমে জীবিকা-অর্জনে বাধ্য হয়ে পুত্র কষ্টকর মিতব্যয়ে এবং কঠিন কাজের মাধ্যমে পুনরায় যখন সম্পদ সঞ্চয়ে সক্ষম হয়, তখন সে কি তার অন্তরে সম্পদের কামনাকেই সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করবে না? অর্থের কামনাই কি এবার প্রাচ্যের একচ্ছত্র সম্রাটের মতো তাকে মুকুট, শৃঙ্খল এবং তরবারিতে সজ্জিত হয়ে শাসন করতে শুরু করবে না?
অবশ্যই।
অর্থের লিপ্সা তার অন্তরে সম্রাট। আর যুক্তি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা সেই সম্রাটের পদপ্রান্তে দাস। যুক্তির জন্য জিজ্ঞাসা কিংবা হিসাব বা অনুমান এখন নিষিদ্ধ। কেমন করে অধিকতর অর্থ অর্জন করা যায়, এই হচ্ছে এখন সম্রাটের আদেশে যুক্তির বিবেচ্য। উচ্চাকঙ্ক্ষাও আর সম্পদ এবং সম্পদবান ব্যতীত অপর কিছুকে মূল্যদানে অক্ষম। তার জন্য তা নিষিদ্ধ। তার করণীয় এখন শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করা। অর্থ-উপার্জনের প্রতিযোগিতাতে যোগদান করা—অপরকিছুতে নয়।
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : উচ্চাভিলাষ থেকে অর্থের লিন্সায় এর চেয়ে দ্রুত পরিবর্তন আর কিছু হতে পারে না।
এবং যে-চরিত্রটি আমরা এখানে তুলে ধরলাম, সে কি কতিপয়তন্ত্রের বাহকেরই চরিত্র নয়?
এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : যে-সমাজব্যবস্থা কতিপয়তন্ত্রকে সৃষ্টি করে এ-চরিত্র অবশ্যই সে-অবস্থারই সৃষ্টি।
তা হলে দেখা যাক এই চরিত্রের বৈশিষ্টও একইরূপ কি না।
ঠিক আছে, দেখা যাক এর বৈশিষ্ট্য কী?
কতিপয়ের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে এ-চরিত্রের প্রথম সাদৃশ্য অর্থের উপর এর সর্বাধিক গুরুত্বদানে নিহিত
একথা সত্য।
আবার দ্যাখো, সে মিতব্যয়ী এবং কঠিন পরিশ্রমী। তার যা অপরিহার্য প্রয়োজন তাকেই সে পূরণ করে, যথেষ্ট ব্যয়ের অভ্যাস তার থাকে না। অপর সব কামনাকে সে অপ্রয়োজনীয় বলে দমন করে রাখে।
যথার্থ।
হ্যাঁ, আমরা তাকে একটি কৃপণ এবং অপরিচ্ছন্ন চরিত্র বলে আখ্যায়িত করতে পারি। কারণ, সে সবকিছুর মধ্যেই অর্থের অন্বেষণ করে এবং তার অর্থের থলিটি সে ক্রমান্বয়ে ভারী করে তুলতে চায়। এরূপ চরিত্র স্থূলমনাদের কাছ থেকেই প্রশংসালাভ করে। কাজেই যে-রাষ্ট্রের সে প্রতিনিধি তার সে সত্যকার প্রতিরূপই বটে। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, আমার কাছেও তাকে সত্যকার প্রতিরূপ বলেই বোধ হয়। মোটকথা, অর্থকে মূল্যবান বিবেচনার ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্র এবং এই চরিত্র—উভয়েরই সাদৃশ্য স্পষ্ট।
আর এরূপ চরিত্র যে খুব সংস্কৃত চরিত্র নয়, সেটিও পরিষ্কার?
হ্যাঁ,একথা ঠিক। না হলে এক অন্ধ চরিত্রকে* তার জীবননাট্যের নায়কে সে পরিণত করত না।
[* অর্থের দেবতা অন্ধ বৈ অপর কিছু নয়—গ্রীকদের এরূপ একটি ধারণা ছিল।]
তুমি বেশ বলেছ এ্যাডিম্যান্টাস; কিন্তু দ্যাখো, এই সংস্কৃতির অভাবই তার চরিত্রে আবার নিঃস্ব এবং বর্বর সেই পুরুষ-মৌমাছির প্রবণতার বীজ বপন করতে থাকবে। তার সতর্ক দৃষ্টি এ-প্রবণতাকে প্রকট হতে না দিতে পারে, কিন্তু সে-বীজ অবশ্যই উপ্ত হবে।
হ্যাঁ, একথা মিথ্যা নয়।
আর এই মারাত্মক প্রবণতা কোথায় প্রকাশ পাবে, জান?
কোথায়?
প্রকাশ পাবে, অনাথদের ব্যবস্থাপনা কিংবা অনুরূপ সব ক্ষেত্রে যেখানে তার অসৎ হওয়ার সুযোগ মিলবে প্রচুর। এক্ষেত্রেই স্পষ্ট হয়ে যায়, জীবনের লেনদেনের অপরক্ষেত্রে এই চরিত্র যে-সম্মানজনক সততার পরিচয় এতদিন দিয়ে আসছিল, সে-সততার মূল হচ্ছে তার বৈষয়িক জীবনে অসততা থেকে লোকসানের ভয়। এই ভয়ই তার মারাত্মক প্রবণতাকে এতদিন একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছিল।
একথা খুবই সত্য।
তা ছাড়া আরও মারাত্মক যা তা হচ্ছে এই যে, এরূপ লোকের এই অধম প্রবৃত্তি সবচেয়ে প্রকট হয়ে দেখা দেয় তখন, যখন সে অপর লোকের অর্থব্যয়ের দায়িত্ব লাভ করে।
তুমি যথার্থ বলেছ, সক্রেটিস।
এরূপ লোকের কিন্তু অন্তরে শান্তি থাকে না। তার ব্যক্তিত্ব দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। অবশ্য সামগ্রিকভাবে এখনও তার উত্তম প্রবৃত্তি তার অধম প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম থাকছে।
তা ঠিক।
কাজেই এ-চরিত্রের একটা পরিমাণ সম্মান থাকে। কিন্তু তা হলেও, একটা সুসংহত ঐক্যসূত্রে গ্রথিত চরিত্রের যে যথার্থ উৎকৃষ্টতা, তাকে লাভ করা কিংবা তার নিকটবর্তী হওয়া এ-চরিত্রের পক্ষে সম্ভব নয়।
তোমার অভিমতের সঙ্গে আমি একমত।
আসলে সে একটি দুর্বল লোক আর তাই সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে কোনো উচ্চ অভিলাষের ক্ষেত্রে কিংবা সাফল্যের প্রতিযোগিতার জন্য সে অনুপযুক্ত। সম্মান এবং বিশিষ্টতার সংগ্রামে অর্থব্যয়ে সে অনাগ্রহী এবং নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পক্ষে লড়াই-এর ব্যয়সাপেক্ষ প্রবৃত্তিসমূহকেও সে জাগরিত করার ব্যাপারে ভীত। আর তাই কতিপয়তন্ত্রের একজন যথার্থ প্রতিভূ হিসাবে সে নিজের সত্তারই একটি অংশের বিরুদ্ধে লড়াইতে ব্যস্ত থাকে। তার একটি অংশকে সে দমিত করে। এ-লড়াইতে সে তার অর্থকে বাঁচাতে পারে বটে, কিন্তু মূলত সে পরাজিত হয়।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
তা হলে আমরা দ্বিধাহীনভাবেই কি বলতে পারিনে যে, এরূপ অর্থগৃধু চরিত্রই হচ্ছে কতিপয়তন্ত্রের যথার্থ প্রতিভূ চরিত্র?
এ-সিদ্ধান্তে আমাদের দ্বিধার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
