১৫. দার্শনিক শাসক : দার্শনিকের সংজ্ঞা
অধ্যায় : ১৫ [৪৭৩–৪৮০]
দার্শনিক শাসক : দার্শনিকের সংজ্ঞা
কাজেই বাস্তবকে পরিবর্তন করাই বড় প্রয়োজন; আদর্শকে বাস্তব করা নয়। কিন্তু সে-পরিবর্তনের উপায় কী? “আমার মনে হয় গ্লকন, রাষ্ট্রের সংস্কার একটিমাত্র পরিবর্তন-সাধনের মাধ্যমেও হতে পারে। অবশ্য এ-পরিবর্তনটি সামান্য বা সহজ, একথা আমি বলছিনে। তবু এ-পরিবর্তন সম্ভব বলেই আমি মনে করি।” গ্লকন বললেন : “কিন্তু কী সে পরিবর্তন?” প্রথমে সঙ্কোচ সক্রেটিসের। ভয়। কেননা সমাধানের সে-প্রস্তাব অদ্ভুত হবে। সঙ্কোচ কাটিয়ে পরিশেষে তিনি বললেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত দার্শনিকগণ রাষ্ট্রের রাজা অর্থাৎ শাসক না হবে, কিংবা রাষ্ট্রের ‘রাজাগণ’ দার্শনিকের ভাব এবং শক্তিতে সমৃদ্ধ না হবে—অর্থাৎ যতক্ষণ শক্তি এবং প্রজ্ঞা একই ব্যক্তির মধ্যে সম্মিলিত না হবে…ততক্ষণ কোনো নগরী যেমন তার বর্তমান দুঃশাসন থেকে মুক্ত হবে না, তেমনি মানব জাতিরও মঙ্গল সাধিত হবে না।” উক্তিটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দার্শনিক কে, সে-প্রশ্ন এসে পড়ে। দার্শনিক সমগ্র জ্ঞানের প্রেমিক, তার অংশ মাত্রের নয়; সত্য বা পরম উত্তম সম্পর্কে দার্শনিকের কেবল ‘ধারণা’ থাকলে হবে না, তার থাকতে হবে ‘জ্ঞান। সত্য বা পরম উত্তম হচ্ছে অপরিবর্তনীয় নিত্য সত্তা। দার্শনিক সেই পরম সত্যের জ্ঞানী। দার্শনিকের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে প্লেটো তাঁর বিখ্যাত ‘জ্ঞান’ এবং ‘ধারণার’ পার্থক্যের তত্ত্ব এখানে উপস্থিত করেছেন।
.
আমার মনে হয় গ্লকন, রাষ্ট্রের সংস্কার একটিমাত্র পরিবর্তন-সাধনের মাধ্যমে ও হতে পারে। অবশ্য এ-পরিবর্তনটি সামান্য বা সহজ, একথা আমি বলছিনে। তবু এ-পরিবর্তন সম্ভব বলেই আমি মনে করি।
কিন্তু কী সে পরিবর্তন?
সেকথা বলতে হলে আমাকে সবচেয়ে মারাত্মক সেই ঢেউ-এরই মোকাবেলা করতে হয়। তবু আমাকে সেকথা বলতে হবে। আমি জানি না সেকথা বলার জন্য আমি পরিহাস এবং অসম্মানের ঢেউ-এ নিমজ্জিত হয়ে যাব কি না। আমার কথাগুলো খেয়াল করো, গ্লকন।
তুমি বলো, সক্রেটিস।
আমি বললাম : যতক্ষণ পর্যন্ত দার্শনিকগণ রাষ্ট্রের ‘রাজা’ না হবে কিংবা পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহের ‘রাজাগণ’ যতক্ষণ দার্শনিকের ভাব এবং শক্তিতে সমৃদ্ধ না হবে—অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনীতিক শক্তি এবং প্রজ্ঞা একই ব্যক্তির মধ্যে সম্মিলিত না হবে—এবং যারা রাষ্ট্রকে শাসন করতে যেয়ে এই দুই গুণের একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির চর্চা করার নীতি অনুসরণ করে, তাদের যতক্ষণ রাষ্ট্রশাসনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ কোনো নগরী যেমন তার বর্তমান দুঃশাসন থেকে মুক্ত হবে না, তেমনি মানবজাতিরও মঙ্গল সাধিত হবে না। এবং এই পরিবর্তনের মাধ্যমেই মাত্র যে-রাষ্ট্রের আমরা কল্পনা করেছি সে-রাষ্ট্রের জীবন লাভ সম্ভব হবে। তখনই মাত্র আমাদের সে-রাষ্ট্র বাস্তবজগতের আলোর সাক্ষাৎলাভ করতে সক্ষম হবে। প্রিয় গ্লকন, আমার এই চিন্তাটিকেই তোমাদের সম্মুখে উচ্চারণ করার ইচ্ছা পোষণ করেছি। কিন্তু এর অত্যধিক অভিনবত্বই আমাকে আতঙ্কিত করেছে, আমার সাহসকে বিনষ্ট করেছে। কারণ, অপর কোনো রাষ্ট্রে ব্যক্তি বা সমাজের মুক্তি নেই, একথা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন।
গ্লকন বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন : সক্রেটিস, এই যদি তোমার কথা হয় তা হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না যদি সম্মানীয় ব্যক্তিগণও উত্তেজিত হয়ে তাদের গাত্র-পরিচ্ছদ পরিত্যাগ করে নিকটস্থ যে-কোনো অস্ত্র হাতে নিয়ে তোমার ওপর মারাত্মক কোনো আঘাত হানার জন্য তোমাকে ধাওয়া করতে শুরু করে। উপযুক্ত কোনো যুক্তি দিয়ে এদের গতি রোধ করে পলায়নে যদি তুমি সক্ষম না হও তা হলে সক্রেটিস, পরিহাসের যথার্থ অর্থ কী তা তোমাকে বিশেষ মূল্যের বিনিময়েই শিখতে হবে—একথা আমি বলে দিচ্ছি।
কিন্তু এপথে তুমিই তো আমাকে নিয়ে এসেছ, গ্লকন।
আমি কাজটি খারাপ করিনি। যাহোক, আমি তোমাকে রক্ষা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। তোমার জন্য আমার সদিচ্ছা আছে। তবে তোমাকে আমি সৎ পরামর্শই মাত্র দিতে পারি। হয়তো অন্যের চেয়ে তোমার প্রশ্নের জবাবদানে আমার আগ্রহ অধিক হবে। এই সাহায্য নিয়েই তোমাকে এবার এই অবিশ্বাসীদের মনে বিশ্বাস উৎপাদনের উপযুক্ত যুক্তি নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। তুমি অগ্রসর হও, সক্রেটিস।
আমি সে-চেষ্টা করব, গ্লকন। তোমার অমূল্য সাহায্য আমাকে অবশ্যই উৎসাহিত করে তুলছে। আমার পরিত্রাণের যদি কোনো সুযোগ থাকে তা হলে আমি তাদের কাছে নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করে বলব, ‘দার্শানিকগণ শাসক হবে’ একথার অর্থ কী? এ-ব্যাখ্যা আমাদের রক্ষা করবে। আমরা দেখতে পাব রাষ্ট্রের মধ্যে এমন ধরনের মানুষ আছে যাদের দর্শন অধ্যয়ন করা উচিত এবং যারা রাষ্ট্রের শাসক হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু আবার এমন ধরনের মানুষের সাক্ষাৎও আমরা পাব যাদের চরিত্রে দার্শনিকের গুণ নেই, যাদের জন্ম দার্শনিক হওয়ার জন্য নয়, যারা নেতৃত্বদানের উপযুক্ত নয়, যারা উপযুক্ত কেবল অনুগমনের।
তা হলে দার্শনিকের সংজ্ঞাটি এবার দাও, সক্রেটিস।
আমি বললাম : অনুধাবন করো গ্লকন। আমি আশা করি, তোমাকে আমি একটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যাদানে সক্ষম হব।
তুমি অগ্রসর হও, সক্রেটিস। আমি তোমাকে অনুসরণ করব।
গ্লকন, আমার বিশ্বাস একটি কথা তোমার স্মরণ আছে। বস্তুত তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আবশ্যক হয় না। কথাটি প্রেমিককে নিয়ে। যে যথার্থ প্রেমিক সে তার প্রেমাস্পদকে সামগ্রিকভাবেই ভালোবাসে,—তার কোনো অংশকে মাত্র নয়। ঠিক নয় কি?
সক্রেটিস, আমি ঠিক বুঝতে পারছিনে। তুমি আমার স্মৃতিকে একটু সাহায্য কর।
এমন জবাব তোমার মতো রসিক মানুষের সাজে না, গ্লকন। অপর কেউ এমন জবাব দিতে পারত। তোমার নিশ্চয়ই জানা উচিত যে, যৌবনের কুসুম প্রেমিকের মনে একটা আর্তি এবং আবেগের সঞ্চার করে যার ফলে তার প্রেমাস্পদের অনুরাগের চিন্তায় সে বিভোর হয়। সুন্দরের সঙ্গে সুন্দরের এই তো সম্পর্ক। প্রেমাস্পদের নাকটি হয়ত খাঁদা। তুমি প্রেমিক বললে : আহা! কী চম ৎকার মুখখানি! অপর একজনের নাকটি বড়শীর মতো বাঁকা। তুমি প্রেমিক বলছ : আহা! কী রাজকীয় দৃশ্য! আর যার নাক খাঁদাও নয়, বাঁকাও নয় তার সম্পর্কে প্রেমিক বলে : আহা! সমতলের কী মাধুর্য! যে কৃষ্ণবর্ণ সে তার কাছে পুরুষোচিত; যে গৌরবর্ণ সে দেবতার সন্তানের ন্যায় শুভ্র। আর ‘মধুময় পাণ্ডুরতা’–এরূপ বাক্য প্রেমিক বই অপর কার সৃষ্টি! তার প্রেমাস্পদের চিবুকের পাণ্ডুরতা তাকে উদ্বেল করে তোলে। মোটকথা, কুসুমিত যৌবনের প্রশংসার অন্ত নেই।
সব প্রেমিকের আচরণকে যদি তুমি আমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাও সক্রেটিস, তা হলেও আমাদের যুক্তির স্বার্থে আমি তার কোনোটিকে অস্বীকার করব না।
আহা! এ তো সুরা-প্রেমিকেরই কথা। যতপ্রকার সুরা আছে তা পান করার সুযোগ পেলে যে-কোনো উপলক্ষতেই সে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
উত্তম কথা।
উচ্চাভিলাষী মানুষ সম্পর্কেও একই কথা সত্য। তারা সামরিক বাহিনীর অধিনায়কত্বের কামনা করে; সেটি পেতে ব্যর্থ হলে তারা নিম্নতর অপর কোনো বাহিনীর অধিনায়ক হতে চায়; মান্য লোকের কাছ থেকে তারা সম্মান চায়। না পেলে হীনতরের সম্মানেও তারা খুশি। মোটকথা, সম্মান তাদের পেতেই হবে।
একথা তোমার খুবই ঠিক, সক্রেটিস।
আমার আর-একটি প্রশ্ন গ্লকন : কেউ যখন কোনো উত্তম দ্রব্য পেতে চায় তখন কি সে এই ধরনের সকল দ্রব্যকেই পেতে চায়, না এই শ্রেণীর কোনো অংবিশেষকে পেতে চায়?
সে সবটাই পেতে চায়।
তা হলে দার্শনিক সম্পর্কেও কি আমরা বলতে পারিনে, সে যখন জ্ঞানের প্রেমিক তখন সে সমগ্র জ্ঞানেরই প্রেমিক, তার অংশমাত্রের নয়।
হ্যাঁ, সে সমগ্র জ্ঞানের প্রেমিক!
আবার যে বিদ্যাকে অপছন্দ করে, বিশেষ করে যে-তারুণ্যে ভালো এবং মন্দ বিচারের কোনো ক্ষমতা জাগ্রত হয় না, সে-বয়সেও যে বিদ্যার প্রতি বিরাগ প্রদর্শন করে তাকে আমরা দর্শন বা জ্ঞানের প্রেমিক বলে অভিহিত করতে পারিনে। যেমন, খাদ্যে যার বিরাগ বা অরুচি তার হয় ক্ষুধা নেই, নয়তো তার অগ্নিমান্দ্যের অসুখ আছে—একথাই আমাদের বলতে হয়?
খুবই সত্য কথা।
তেমনি আবার যার সব রকম জ্ঞানের জন্য আগ্রহ, যে জানতে চায়, শিখতে চায়, যে অনুসন্ধিৎসু এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে সর্বদা অতৃপ্ত তাকে আমরা সঠিকভাবেই একজন দার্শনিক বলে অভিহিত করতে পারি। আমি কি ঠিক বলিনি, গ্লকন?
গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, কৌতূহলই যদি একজনকে দার্শনিক করে দিতে পারে তা হলে দার্শনিকের সংখ্যা কিংবা বৈচিত্র্য কোনোটিরই তোমার অভাব হবে না। তা হলে দৃশ্য-প্রেমিককেও তোমার দার্শনিক বলতে হবে। সঙ্গীতের অর্বাচীনগণও বাদ পড়বে না। এরা দর্শনিক কোনো আলোচনায় আগ্রহবোধ করার লোক আদৌ নয়। কিন্তু গ্রাম কিংবা নগরীর কোনো সঙ্গীত-উৎসবেই তারা অনুপস্থিত নয়। সমস্ত রকম সঙ্গীতকেই তারা শ্রবণ করে—যেন শ্রবণ করার দায়িত্বে তারা চুক্তিবদ্ধ; তা হলে আমাদের কি বুঝতে হবে এরা সবাই এবং নগণ্য অপর সকল কলার পণ্ডিতগণই দাৰ্শনিক?
আমি বললাম : অবশ্যই না। তারা দার্শনিকের অনুকারী মাত্র।
তা হলে যথার্থ দার্শনিক কে?
সত্য দর্শনকে যারা ভালোবাসে।
ভালো কথা। কিন্তু তোমার একথার অর্থ কী?
একথার অর্থ অপর কারও নিকট ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে কঠিন হত। কিন্তু আমার বিশ্বাস আছে, আমি তোমার নিকট যে-প্রস্তাবটি করব তা তুমি স্বীকার করবে।
কী প্রস্তাব, সক্রেটিস?
আমার প্রস্তাবটি হচ্ছে : সুন্দর যখন অসুন্দরের বিপরীত তখন তারা পৃথক।
অবশ্যই।
এবং যেহেতু তারা পৃথক, তাদের প্রত্যেকেই একটি সত্তা?
একথাও ঠিক।
একথা ন্যায় এবং অন্যায়, মঙ্গল এবং অমঙ্গল এবং অপর সব অস্তিত্ব সম্পর্কে সত্য। পৃথকভাবে এরা প্রত্যেকেই একটি সত্তা। কিন্তু বিভিন্ন বস্তু এবং কর্মের সঙ্গে এবং নিজেদের মধ্যে একের সঙ্গে অপরের সম্মিলনে এরা বহু এবং বিচিত্র বলে বোধ হয়।
খুবই সত্য কথা।
এই পার্থক্যের কথাই আমি বলছি। দৃশ্যপ্রেমিক এবং শিল্পপ্রেমিক এবং কর্মী এবং ভাবুক অর্থাৎ যারা দার্শনিক নামের উপযুক্ত তাদের আমি এভাবে পৃথক বলে মনে করি।
তুমি কেমন করে এদের পৃথক করতে চাও, সক্রেটিস?
আমি বললাম : শব্দ এবং দৃশ্যের যারা প্রেমিক তারা কেবল শব্দ এবং বর্ণ এবং শিল্পকর্মের বহিরাবরণকেই ভালোবাসে—কিন্তু তাদের মন সুন্দরের যথার্থ সত্তার উপলব্ধিতে অক্ষম। সুন্দর যথার্থ সত্তায় আনন্দবোধের ক্ষমতা তাদের নেই।
হ্যাঁ, একথা সত্য।
তাই চরম সুন্দরের কাছে যারা যেতে পারে এবং তার আপন সত্তায় যারা তাকে অবলোকন করতে পারে তাদের সংখ্যা অবশ্যই কম।
হ্যাঁ, তাদের সংখ্যা অবশ্যই কম হওয়ার কথা।
তা-ই যদি হয়, তা হলে সুন্দর বস্তুর প্রতি যার আকর্ষণ আছে কিন্তু চরম সুন্দর সম্পর্কে যার কোনো ধারণা নেই এবং অপর কেউ যদি তাকে চরম সুন্দরের জ্ঞান দানের চেষ্টা করে সে-জ্ঞানকেও যে অনুধাবন করতে পারে না—এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আমরা কী বলব? সে কি জাগ্রত? কিংবা স্বপ্নের মাঝে নিদ্রামগ্ন? তুমি চিন্তা করে দ্যাখো : যে স্বাপ্নিক সে জাগ্রত কিংবা নিদ্ৰামগ্ন যা-ই হোক-না কেন, সে বিরুদ্ধ বস্তুতে ঐক্যের সন্ধান করে এবং আসল বস্তুর স্থানে তার প্রতিচ্ছবিকে স্থাপিত করে।
আমি বলব, এরূপ লোক নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছে।
কিন্তু অপর ব্যক্তির কথা ধরো : এ মানুষ চরম সুন্দরের অস্তিত্বকে জানে এবং বস্তু এবং ভাবের মধ্যে, অর্থাৎ বস্তু এবং যে-ভাব নিয়ে বস্তু তৈরি তার পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে। এ যেমন বস্তুকে ভাবের স্থানে স্থাপিত করে না, তেমনি ভাবকেও বস্তুর স্থানে বসায় না। তুমি এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কে কী বলবে? এ কি স্বপ্ন দেখছে, না জাগ্ৰত আহে?
এ অবশ্যই জাগ্রত আছে।
তা হলে আমরা কি বলতে পারিনে যার মন সত্যিকারভাবে জানে তার জ্ঞান আছে এবং যার মন জানে না, কেবল বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে, তার জ্ঞান নেই, মাত্র ধারণা আছে?
অবশ্যই আমরা তা-ই বলব।
কিন্তু ধরো এই দ্বিতীয় ব্যক্তি আমাদের এ-অভিমতে ক্ষুণ্ন হল, আমাদের সঙ্গে সে ঝগড়ায় প্রবৃত্ত হল, তা হলে আমরা কেমন করে তাকে শান্ত করব? তার বুদ্ধির বিভ্রম ঘটেছে, একথা প্রকাশ না করে আমরা কি তাকে শান্ত করতে পারি?
তাকে কোনো উত্তম উপদেশ আমাদের অবশ্যই দিতে হবে।
বেশ, এসো, তা হলে আমরা চিন্তা করি, কী তাকে বলা যায়। আমরা কি তাকে এই আশ্বাস দিয়ে শুরু করব যে, তার যে-কোনো জ্ঞানকেই আমরা স্বাগত জানাই। বস্তুত তার জ্ঞান আছে দেখে আমরা বেশ উৎফুল্ল। কিন্তু আমরা তাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই : যার জ্ঞান আছে সে কি কিছু জানে, অথবা সে কিছু জানে না? গ্লকন, এর পক্ষ হয়ে তোমাকেই জবাব দিতে হবে।
হ্যাঁ, আমি তার জবাব দিচ্ছি : যার জ্ঞান আছে সে অবশ্যই কিছু জানে।
সে যা জানে, তা কি অস্তিত্বময়, না অস্তিত্বহীন?
অবশ্যই তার অস্তিত্ব আছে। কারণ যার অস্তিত্ব নেই, তাকে সে জানবে কী করে?
তা হলে আমরা কি বলব, যেদিক থেকেই আমরা দেখি-না কেন, যা পরিপূর্ণরূপে অস্তিত্বময় তা পরিপূর্ণরূপে জ্ঞেয়? এবং যা পরিপূর্ণরূপে অস্তিত্বহীন তা পরিপূর্ণরূপেই অজ্ঞেয়?
হ্যাঁ, এর চেয়ে নিশ্চিত সত্য আর কী হতে পারে?
উত্তম কথা। কিন্তু এমন কিছু যদি থাকে যা না অস্তিত্ব, না অনস্তিত্ব, তা হলে তার অবস্থান পূর্ণ অস্তিত্ব এবং পূর্ণ নাস্তিত্বের মাঝখানে হবে?
হ্যাঁ, এই দু-এর মাঝখানেই তার অবস্থান হবে।
এবং জ্ঞানী যখন অস্তিত্বের প্রতিরূপ এবং অজ্ঞান অনস্তিত্বের, তখন যার অবস্থান অস্তিত্ব এবং নাস্তিত্বের মধ্যখানে তার জন্য জ্ঞান এবং অজ্ঞানতার মধ্যবর্তী একটা প্রতিরূপ আমাদের আবিস্কার করতে হয়। ঠিক নয় কি?
অবশ্যই।
কিন্তু আমরা কি ধারণার অস্তিত্বকে স্বীকার করি?
হ্যাঁ, তাকে আমরা স্বীকার করি।
কিন্তু ‘ধারণা’ কি জ্ঞান? কিংবা সে জ্ঞান থেকে পৃথক
সে একটা পৃথক প্রতিরূপ।
তা হলে ‘জ্ঞান’ এবং ‘ধারণা’ ভিন্নরূপ অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত?
হ্যাঁ, তা-ই।
জ্ঞানের সঙ্গে অস্তিত্বের সম্পর্ক। জ্ঞান অস্তিত্বকে জানে। কিন্তু অধিক অগ্রসর হওয়ার পূর্বে আমি একটি বিভাগকরণের কাজ সমাধা করতে চাই, গ্লকন।
কীরূপ বিভাগ, সক্রেটিস?
আমি আমাদের সকল ক্ষমতাকে একটি শ্রেণীভুক্ত করতে চাই। এগুলি আমাদের কর্মক্ষমতা। এই ক্ষমতা বা শক্তির মাধ্যমেই আমরা বিভিন্ন কর্ম সমাধা করি। দৃষ্টি এবং শ্রবণ, এরাও আমাদের শক্তি। শক্তির শ্রেণী বলতে আমি কী বোঝাতে চাই, আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছ, গ্লকন?
হ্যাঁ, আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি সক্রেটিস।
এখন এই শক্তির শ্রেণী সম্পর্কে আমার বক্তব্যটি আমি বলছি। শক্তির কোনো বিশিষ্টাত্মক গুণ নেই। বস্তুর বর্ণ, আকার ইত্যাদি গুণ আছে। এইসব গুণের ভিত্তিতে আমরা একটি বস্তুকে অপর বস্তু থেকে পৃথক করি। কিন্তু শক্তির এরূপ কোনো গুণ নেই। একটি শক্তিকে আমরা কেবল তার কর্ম এবং লক্ষ্য দ্বারাই নির্দিষ্ট করতে পারি। এই ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, একটি শক্তির কর্ম এবং লক্ষ্য এই; এবং আর-একটি শক্তির কর্ম এবং লক্ষ্য ঐ। তুমি কী বল গ্লকন? তুমি এক্ষেত্রে কী করবে?
তুমি যেমন করছ, আমিও তেমন করব, সক্রেটিস।
তা হলে আবার একটু পেছনে যাওয়া যাক। গ্লকন, তুমি বলো, জ্ঞানকে কি তুমি একটি শক্তি বলে বিবেচনা কর না? জ্ঞানকে কি ভিন্নভাবে শ্রেণীভুক্ত করা চলে?
না, একে ভিন্নভাবে শ্রেণীভুক্ত করা চলে না। জ্ঞান সকল শক্তির সেরা শক্তি।
কিন্তু ধারণাকে কি আমরা একটি শক্তি বলব?
হ্যাঁ, ধারণাও একটি শক্তি। কারণ ধারণার মাধ্যমে আমরা বিশ্বাস করি।
কিন্তু গ্লকন, একটু পূর্বে তুমি স্বীকার করেছিলে যে জ্ঞান এবং ধারণা ভিন্ন ব্যাপার?
হ্যাঁ, তা আমি করেছিলাম। কারণ, কোনো যুক্তিপূর্ণ মানুষই ‘অভ্রান্তি’ এবং ‘ভ্রান্তি’কে অভিন্ন বলবে না।
খুবই উত্তম কথা, গ্লকন। তা হলে এ-বিষয়ে আমরা নিশ্চিতরূপে একমত যে, ধারণা এবং জ্ঞান ভিন্ন, ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, আমরা একমত। জ্ঞান এবং ধারণা ভিন্ন।
উভয়ের লক্ষ্য এবং কর্ম ভিন্ন। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, এটি তো অনুসিদ্ধান্ত।
জ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে অস্তিত্ব এবং এর কর্ম হচ্ছে অস্তিত্বকে জানা।
হ্যাঁ।
কিন্তু ধারণার কাজ হচ্ছে বিশ্বাস করা। এ কথাই তো আমরা বলেছিলাম। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, আমরা তা-ই বলেছিলাম।
কিন্তু তার লক্ষ্য এবং জ্ঞানের লক্ষ্য কি এক? এদের কর্মের ক্ষেত্র? তাও কি জ্ঞান এবং ধারণার অভিন্ন? না, এদের অভিন্ন হওয়া অসম্ভব?
যে-নীতির ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি, তার ভিত্তিতে এদের অভিন্ন হওয়া অসম্ভব। কারণ, বিভিন্ন শক্তির যদি বিভিন্ন লক্ষ্য থাকে এবং জ্ঞান ও ধারণা যদি দুটি ভিন্ন শক্তি হয়, যে কথা আমরা ইতিপূর্বে স্বীকার করেছি, তা হলে এ কথাও আমাদের বলতে হয় যে, জ্ঞান এবং ধারণার ক্ষেত্র অবশ্যই বিভিন্ন
তা-ই যদি হয়, তা হলে জ্ঞানের লক্ষ্য যেখানে অস্তিত্ব, সেখানে ধারণার লক্ষ্য অবশ্যই ভিন্ন কিছু
হ্যাঁ, ধারণার লক্ষ্যকে ভিন্ন হতে হয়।
তা হলে আমরা কি বলব যে, অনস্তিত্ব হচ্ছে ধারণার লক্ষ্য? কিন্তু অনস্তিত্ব সম্পর্কে আদৌ কোনো ধারণা কেমন করে সম্ভব? চিন্তা করে দ্যাখো, গ্লকন : কোনো মানুষের যখন কোনো ধারণা থাকে, তখন তার সে ধারণাও তো কোনো বিষয় সম্পর্কে। তার কি এমন কোনো ধারণা থাকা সম্ভব যে-ধারণা কোনো বিষয় সম্পর্কে নয়?
না, তা অসম্ভব।
কারণ, যার কোনো ধারণা থাকে, তার সে-ধারণা কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে ধারণা।
হ্যাঁ, তা ঠিক।
কিন্তু অনস্তিত্বকে আমরা বিষয় বা বস্তু বলতে পারিনে। সঠিকভাবে বললে অনস্তিত্ব হচ্ছে ‘কিছু না’।
ঠিকই।
অনস্তিত্বের প্রতিরূপ হল অজ্ঞানতা। অস্তিত্বের প্রতিরূপ জ্ঞান। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, ঠিক।
তা হলে ধারণার লক্ষ্য অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব—এর কোনোটাই নয়?
না এর কোনোটার সঙ্গেই ধারণা সম্পর্কিত নয়।
তা হলে ধারণাকে আমরা অজ্ঞানতা বা জ্ঞান—এর কোনোটাই বলতে পারিনে?
হ্যাঁ, তা-ই তো ঠিক বলে মনে হয়।
তা হলে ধারণার সন্ধান আমরা কোথায় পাব? তার অবস্থান কি জ্ঞান এবং অজ্ঞানতার বাইরে, জ্ঞান এবং অজ্ঞানতাকে অতিক্রম করে? ধারণা কি জ্ঞানের চেয়ে স্বচ্ছ? না, সে অজ্ঞানতার চেয়ে অন্ধকার? কোথায় তার অবস্থান?
কোথাও নয়।
তা হলে গ্লকন, তুমি কি মনে কর ধারণা জ্ঞানের চেয়ে অন্ধকার কিন্তু অজ্ঞানতার চেয়ে স্বচ্ছ?
হ্যাঁ, ধারণা এই দুটোই। এবং তাদের পরিমাণও কম নয়।
এবং তার অবস্থানও এই উভয়ের মধ্যে?
হ্যাঁ, তা-ই বটে।
তা হলে তোমার অনুমান হচ্ছে, ধারণা জ্ঞান এবং অজ্ঞানতার মধ্যবর্তী অবস্থা?
নিঃসন্দেহে।
কিন্তু আমরা পূর্বে বলেছিলাম : এমন কিছু যদি থাকে যা একই সঙ্গে ‘অস্তিত্ব’ এবং ‘অনস্তিত্ব’ তা হলে তার অবস্থান হবে পরিপূর্ণ অস্তিত্ব এবং পরিপূর্ণ অনস্তিত্বেরই মধ্যভাগে। জ্ঞান কিংবা অজ্ঞানতা কারুর লক্ষ্যই এ নয়। জ্ঞান এবং অজ্ঞানতার মধ্যবর্তী অপর কোনো শক্তির লক্ষ্য হচ্ছে এটি। ঠিক নয় কি?
ঠিক, আমরা একথা বলেছিলাম।
এখন সেই মধ্যবর্তী স্থলে আমরা ধারণার অবস্তান নির্দিষ্ট করছি?
হ্যাঁ, তার অবস্থান এই মধ্যবর্তী স্থলেই।
তা হলে এবার আমাদের করণীয় হচ্ছে এমন কোনো বিষয়কে আবিষ্কার করা যার মধ্যে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব—উভয়ের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান; অর্থাৎ যাকে বিনা শর্তে অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্ব—কোনোরূপে অভিহিত করা চলে না। এই অজানিত ‘বিষয়কে’ আমরা যদি আবিষ্কার করতে পারি তা হলে আমরা যথার্থভাবে তাকে ধারণার ‘বিষয়’ বলে অভিহিত করতে পারব। এই কার্য সিদ্ধ হলে আমরা যার যা বিষয় তা স্থির করে দিতে সক্ষম হব। তখন চরমের বিষয় যেমন চরম হবে, তেমনি দুই চরমের মধ্যবর্তী মধ্যমের বিষয়ও মধ্যম হবে।
সত্য কথা।
এই যদি আমাদের সিদ্ধান্ত হয় তা হলে আমরা সেই ভদ্রমহোদয়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করব যার ধারণা, পরম সুন্দরের অপরিবর্তনীয় কোনো অস্তিত্ব নেই। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করব : আপনি তো সুন্দরের প্রেমিক এবং আপনার সুন্দর বিচিত্র এবং আপনি বিশ্বাস করেন না যে সুন্দর কিংবা ন্যায় হচ্ছে এক, বহু নয়। আপনি বলুন আপনার বিচিত্র সুন্দরের মধ্যে কেউ কি কখনো অসুন্দর বলে মনে হতে পারে না? ন্যায়ের মধ্যে কেউ কি অন্যায় বলে বোধ হতে পারে না?
এ-প্রশ্নের জবাব কী হবে?
গ্লকন বললেন : অবশ্যই বলতে হবে সুন্দর অপর কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অসুন্দরও বোধ হতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ কথাই সত্য।
এবং যে-সংখ্যা দ্বিগুণ, তা কি আবার অর্ধেক হতে পারে না? অর্থাৎ একটি বিশেষ সংখ্যার তুলনায় একটি সংখ্যা যখন দ্বিগুণ, তখন আর-একটি সংখ্যার তুলনায় সে অর্ধেক। ঠিক নয় কি?
অবশ্যই ঠিক।
এবং যে-সকল বস্তুকে আমরা বড় এবং ছোট, ভারী এবং হালকা ইত্যাদি বলে চিহ্নিত করি তারা আবার এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যেও কি আখ্যায়িত হয় না?
যথার্থ। এ-সকল বস্তুর উভয় রকম বৈশিষ্ট্যই থাকতে পারে।
তা হলে এই বিচিত্র বস্তুর কাউকেই কি কেবল একটি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বলা যায় যে, এর বিপরীত নাম কখনো এদের ওপর প্রযোজ্য হবে না?
গ্লকন বললেন : সক্রেটিস, এগুলো হচ্ছে সেই সমস্ত ধাঁধার মতো যেগুলোকে আমরা বিভিন্ন উৎসবে বা ছোটদের খেলার আসরে শুনতে পাই। যেমন : ‘মানুষ হলেও মানুষ নয় সে, ছুড়েছিল একটি পাখির গায়ে, যে-পাখি পাখি নয়, একটি প্রস্তরখণ্ড যা প্রস্তর নয়’। অর্থাৎ এরা যেমন একটি বিশেষ অস্তিত্ব তেমনি সে বিশেষ অস্তিত্ব নয়।* ফলে কারোর পক্ষে এদের কাউকে অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব এবং এদের উভয়ই অস্তিত্ব কিংবা অনস্তিত্ব কিছুই নয় কোনোটাই ভাবা সম্ভব হয় না।
[* একজন খোজা (যে না পুরুষ না মেয়ে) একটি বাদুড়ের গায়ে (যে না পাখি না পশু) একটি লাভাখণ্ড (যে না পাথর না মাটি) নিক্ষেপ করেছিল।]
কিন্তু এদের সম্পর্কে অধিক উত্তম কিছু কি চিন্তা করা যায়, যার ফলে আমরা এদের অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মধ্যভাগে স্থাপন করতে পারি? কারণ, এরা যেরূপ অনস্তিত্বের চেয়ে এত অধিক অন্ধকার নয় যে অনস্তিত্বের চেয়েও অধিক অনস্তিত্ব বলে এদের অভিহিত করা যায়, তেমনি আবার অস্তিত্বের চেয়ে অধিক স্বচ্ছ নয় যাতে এদের অস্তিত্বের চেয়ে অধিক অস্তিত্বময় বলা চলে।
তোমার একথা সত্য, সক্রেটিস।
তা হলে আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে : সাধারণ মানুষ সুন্দর এবং এরূপ অন্যান্য সত্তা সম্পর্কে যে-প্রচলিত ধারণা পোষণ করে তা চরম অস্তিত্ব এবং চরম অনস্তিত্বের মধ্যভাগে দোদুল্যমান বিশ্বাস বই অপর কিছু নয়।
হ্যাঁ, এটিই আমাদের সিদ্ধান্ত।
হ্যাঁ, এটিই আমাদের সিদ্ধান্ত হবে। কারণ, আমরা পূর্বে স্থির করেছি এরূপ মধ্যবর্তী বিষয় যদি কিছু আবিষ্কৃত হয় তা হলে আমরা তাকে ‘ধারণা’ বলে নির্দিষ্ট করব, ‘জ্ঞান’ বলে নয়। আর এই মধ্যবর্তী বিষয়ের ধারণা মধ্যবর্তী শক্তি দ্বারাই মানুষ লাভ করে।
ঠিকই বলেছ।
তা হলে যারা কেবল বিচিত্র সুন্দরকে দেখে কিন্তু পরম সুন্দরকে উপলব্ধি করতে পারে না, কিংবা পরম সুন্দরের পথপ্রদর্শককে অনুসরণ করতেও অক্ষম, যারা বহু ন্যায়কে দেখে কিন্তু পরম ন্যায়কে উপলব্ধি করতে পারে না—এরূপ লোকের ‘ধারণা’ আছে, কিন্তু ‘জ্ঞান’ নেই।
অবশ্যই।
কিন্তু যারা পরম, চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয় সত্তাকে অবলোকন করতে সক্ষম তাদের যথার্থ জ্ঞান আছে, কেবল ধারণা নয়—একথা আমরা বলব। ঠিক নয় কি?
হ্যাঁ, এ-সত্যও অনস্বীকার্য
তা হলে এদের একজন যেখানে জ্ঞানের সাক্ষাৎ লাভ করে, অপরজন সেখানে ধারণার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। আর তোমার নিশ্চয়ই স্মরণ আছে গ্লকন, এই শেষোক্ত মানুষ হচ্ছে তারা যারা সুন্দর শব্দের এবং দৃশ্যের বৈচিত্র্যে বিমোহিত হয়ে পড়ে কিন্তু পরম সুন্দর অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা সইতে পারে না।
হ্যাঁ, সক্রেটিস, আমার স্মরণ আছে।
তা হলে এদের যদি আমরা ‘জ্ঞানের প্রেমিক’ না বলে ‘ধারণার প্রেমিক’ বলি তবে নিশ্চয়ই আমরা কোনো অন্যায় করব না। এ-কারণে আমাদের উপর কি তারা খুব ক্রোধান্বিত হয়ে উঠবে বলে তুমি মনে কর?
আমি তাদের ক্রোধান্বিত না হওয়ারই পরামর্শ দেব। কারণ যা সত্য তার প্রতি কারও ক্রোধান্বিত হওয়া উচিত নয়।
এবং যারা প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যকে ভালোবাসে আমরা তাদের জ্ঞানের প্রেমিক’ বলব, ‘ধারণার প্রেমিক’ নয়।
অবশ্যই সক্রেটিস।
